বৃহস্পতিবার, ৬ অক্টোবর, ২০১৬

টুকে রাখা পাঠ উপলব্ধি : ইসমাইল কাদার, হারুকি মুরাকামি ও এরিখ মারিয়া রেমার্ক

স্বকৃত নোমান
১. ব্রোকেন এপ্রিল

‘ব্রোকেন এপ্রিল’ বা ‘খণ্ডিত এপ্রিল’র আগে আলবেনিয়ান লেখক ইসমাইল কাদারের কোনো উপন্যাস পড়ি নাই। উপন্যাসটির হদিস দিয়েছিলেন কবি হিজল জোবায়ের। বলেছিলেন, ‘অনুবাদের কারণে শুরুর দিকে ভালো লাগবে না। বিশ-ত্রিশ পাতার পর ভাল লাগা শুরু হবে। উপন্যাসটি অসাধারণ, পড়তে পারেন।’ গত মাসের ঊনিশ তারিখে শুরু করে শেষ করেছি আজ। কবি হিজল জোবায়েরের কথার আংশিক সত্যতা আছে। শুধু শুরুর দিকে নয়, মাঝে এবং শেষের দিকেও অনুবাদ খুব দুর্বল। দক্ষ কোনো এডিটরকে দিয়ে একবার এডিট করিয়ে নিলে খুব ভালো হতো অনুবাদটা। কিন্তু সন্দেশ বলে কথা! প্রকাশক হিসেবে লুৎফর ভাই ওটা কোনোদিনও করাবেন না। নাকি করিয়েছেন? করানোর পরও এই দশা? কে জানে!


১৬০ পাতার উপন্যাসটি পড়ে শেষ করতে দুদিনের বেশি লাগার কথা নয়, অথচ লেগেছে প্রায় চৌদ্দ দিন। খুব ঢিমেতালে পড়েছি। বিষয়বস্তুর দিক থেকে উপন্যাসটি আসলে ভালোই। আলবেনিয়ান পাহাড়ে বংশানুক্রমিক খুনের লড়াই চলে। এটা তাদের ঐতিহ্য। যেমন, আমাকে যদি কেউ হত্যা করে, আমার ভাই হত্যা করবে ঐ হত্যাকারীকে। ঐ হত্যাকারীর ভাই হত্যা করবে আমার ভাইকে। হত্যা চলতে চলতে কবরের সংখ্যা বাড়তে থাকে। পড়ার সময় মনে হয়, যেন কোনো পৌরাণিক কাহিনি পড়ছি। বর্তমান পৃথিবীতে রক্তের বদলার এমন ধারা প্রচলিত আছে, ঠিক বিশ্বাস হয় না। বিশ্বাস না হলেও আলবেনিয়ার পাহাড়ে এটাই সত্যি।

‘খণ্ডিত এপ্রিল’ দুটি পরিবারের হত্যার বদলার কাহিনি। জর্জ হত্যা করে তার ভাইয়ের হত্যাকারীকে। হত্যার পর থেকে সে হয়ে পড়ে গৃহহীন। তাকে হত্যার জন্য খুঁজে বেড়ায় নিহতের পরিবার। ওত পেতে থেকে। জর্জ তার ভাইয়ের হত্যাকারীকে গুলি করার পর চুক্তি মোতাবেক ত্রিশ দিন বেঁচে থাকার অধিকার পেল। ত্রিশ দিনে পুরো এপ্রিল মাস দেখে যাওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়। জর্জ যাকে হত্যা করল, যখন তার কৃত্যানুষ্ঠান, শোক আর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া ঐতিহ্যগত ভাবগাম্ভির্য নিয়ে পালিত হচ্ছিল, তখন সেই গ্রামে মধুচন্দ্রিমায় এলেন এক দম্পতি। তারা এসেছেন পাহাড়ি মানুষের জীবন-যাপন সম্পর্কে জানতে। এখানে এসে জর্জের প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ল নববধু। ফলে বাইরে থেকে এসে সেই দম্পতিও জড়িয়ে পড়লেন পাহাড়ি জীবনের ভয়ঙ্কর বংশানুক্রমিক দ্বন্দ্বে।

পাঠক হিসেবে আমার মনে হয়েছে, শুধু বিষয়বস্তুর কারণে উপন্যাসটি মোটামুটি খ্যাতি অর্জন করেছে। আঙ্গিকে নতুনত্ব নেই, সেই আটপৌরে প্রচল আঙ্গিক। সাহিত্যের ইতিহাস তো আঙ্গিকেরই ইতিহাস। প্রচল আঙ্গিকের কারণে পড়ার সময় খুব একটা আরাম পাওয়া যায় না। নতুনের আস্বাদ পাওয়া যায় না। জীবনের গভীর বোধের স্ফুটনে আন্দোলিত হওয়ার ব্যাপার নেই, পাঠককে নাড়িয়ে দেওয়ারও ব্যাপার নেই। শুধু এক আনকোরা গল্প, যার সঙ্গে এর আগে আমাদের পরিচয় নেই, সরল ভঙ্গিতে ঐ গল্পটা বলে যান লেখক। সব মিলিয়ে এটিকে ‘মোটামুটি ভালো’ একটা উপন্যাস হিসেবে সাব্যস্ত করা যায়। অন্য পাঠকের কাছে এটি ‘খুব ভালো’ লাগতেও পারে। সবার পাঠ যে এক হবে এমন তো কোনো কথা নেই।


টুকে রাখা পাঠ-উপলব্ধি। ০৩.১০.২০১৬



হারুকি মুরাকামির নাম বহুদিন ধরে শুনে আসছি এবং বহুদিন ধরে তাঁর মাস্টারপিস লেখাটি খুঁজে বেড়াচ্ছি। চলতি বছরের শুরুর দিকে রোদেলা থেকে প্রকাশিত ‘ভাঙনের পর’ নামে তার একটা গল্পের বই পড়েছি, কাসিফুর রহমান নামের একজনের অনুবাদে। পাঠে খুব একটা মনোযোগ দিতে পারিনি। না পারার প্রথম কারণ দুর্বল অনুবাদ, দ্বিতীয় গল্প-উপন্যাসে আমি যে বিশ্ববীক্ষা খুঁজে বেড়াই তা খুঁজে না পাওয়া। এ দুই কারণে গল্পগুলো আমার ভালো লেগেছে বলা যাবে না। ভালো না লাগার আরেকটা কারণ থাকতে পারে―গল্প বলতে যা বোঝায় আমি তা বুঝি না। হয়ত দ্বিতীয় কারণটাই সঠিক।

গত ৪ সেপ্টেম্বর বিকেলে আজিজ সুপার মার্কেটের বই বিক্রয়কেন্দ্র ‘তক্ষশীলা’য় বই দেখতে দেখতে হঠাৎ চোখ আটকে গেল একটা বিড়ালের ওপর। কালো শরীর, সাদা চোখ, লম্বা লেজ। ঘাড় ঘুরিয়ে বেড়ালটা পেছনে তাকিয়ে। মুদ্রিত বিড়াল। তারপর চোখ গেল নিচে, যেখানে লেখা―সমুদ্রতটে কাফকা-১। লেখকের নাম হারুকি মুরাকামি। পেপারব্যাক বাঁধাই। হাতে নিয়ে উল্টেপাল্টে দেখি। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশনা থেকে চলতি বছর প্রকাশিত। ব্যাক কভারে লেখা : ‘পনের বছরের তামুরা কাফকা বাবার দেওয়া ইদিপাস-শাপ থেকে বাঁচতে টোকিও থেকে পালিয়ে রহস্যময় এক পুরনো লাইব্রেরীতে আশ্রয় নেয়। একই সময় দেশের অন্যপ্রান্তে বিড়াল ভাষাবিদ বুড়ো নাকাতাও বেরিয়ে পড়ে রাস্তায়। দুজনের নিয়তি জড়িয়ে যায় অদ্ভুত এক সমান্তরাল জাদুবাস্তব রূপকল্পে।’

এটা হচ্ছে উপন্যাসটির বিষয়বস্তুর সংক্ষিপ্তসার। বষয়বস্তুটা ভালোই লাগল। তবু আমি কবি মাসুদ পথিক ও কথাসাহিত্যিক রেজা ঘটককে জিজ্ঞেস করি―কিনব? দাম কিন্তু ৫৪০টাকা। লস হবে না তো? তারা অভয় দিলেন―কিনেন। মুরাকামি ভালো লেখক। ঠকবেন না।
: কিন্তু এটা তো প্রথম খণ্ড, দ্বিতীয় খণ্ড কই? দুই খণ্ড এক সঙ্গে না হলে তো পড়তে মজা নাই।
তক্ষশীলা’র নির্বাহী সেই ভদ্রনারী জানালেন, দ্বিতীয় খণ্ড এখানো বের হয়নি। আমি বললাম, থাক তাহলে। দুই খণ্ড পরে এক সাথে কেনা যাবে। পেছন থেকে জনৈক ভদ্রলোক, যিনি অনেকক্ষণ ধরে বইয়ের তাকে চোখ বুলাচ্ছিলেন, বললেন, নিয়ে যান, পরে আবার নাও পেতে পারেন।
: আপনি পড়েছেন বইটা?
: না, পড়িনি। তবে মুরাকামি ভালো লেখেন। অভিজিৎ মুখার্জির এই অুনবাদটি খারাপ না। দ্বিতীয় খণ্ড বছরখানেকের মধ্যে বেরিয়ে যাবে, আপাতত প্রথম খণ্ড সংগ্রহ করে রাখেন। পারে যদি না পান!
ভালো পরামর্শ বটে। কিনে নিলাম উপন্যাসখানা। আপাতত সংগ্রহে থাকুক, দ্বিতীয় খণ্ড বেরুনোর পর পড়া ধরব। কিন্তু মাসুদ পথিক বললেন, এখুনি পড়ে ফেলেন। নতুন বই পড়ার মজাই আলাদা। পড়ে আমাকে জানাবেন কেমন। আমিও পড়ব।

রাত ৯টায় বাসায় ফিরে খেয়েদেয়ে পড়া শুরু করি। প্রায় ৩৮২ পৃষ্ঠার উপন্যাস। কবে যে শেষ করতে পারব কে জানে! রাত সাড়ে ১২টার মধ্যে দেখা গেল ৭৬ পাতা শেষ। বাহ! ভালোই তো এগুচ্ছে। পরদিন দুপুর ১২টায় আবার পড়া ধরি। এবার আর থামে না পড়া। বন্যাক্রান্ত নদীর মতো দুরন্ত গতিতে চলতে থাকে। কিন্তু পাঠ আমাকে মুগ্ধ করছে না। আমি সাধারণত বই পড়ার সময় প্রচুর দাগাই। কিন্তু এই উপন্যাসের কোথাও কলমের দাগ পড়ছে না। যে গল্প-উপন্যাসের পাতায় পাতায় দর্শন, নন্দন, চিন্তা, ভাষা ইত্যাদি তৈরি হতে না দেখি, তা পড়ে আমি খুব একটা মজা পাই না। বেশি দূর এগুতেও পারি না। এরকম কত শত বই যে আমি অর্ধেক পড়ে রেখে দিয়েছি হিসাব নাই।

হঠাৎ কলমের দাগ পড়তে শুরু করল। প্রথম দাগটি পড়ে ১৬৫ পাতায়, যেখানে মুরাকামি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে যৌনতাকে অত্যন্ত স্বাভাবিক স্তরে নামিয়ে এনেছেন। যৌনতাকে সাহিত্যে এত স্বাভাবিক স্তরে নামিয়ে আনতে পারাটা আমার কাছে নতুন মনে হলো। পাঠ চলতে থাকে। চেয়ারে বসে, খাটে শুয়ে, কোল বালিশে হেলান দিয়ে, বারান্দায় দাঁড়িয়ে। দুপুর গড়িয়ে যায়, বিকেল গড়িয়ে যায়, সন্ধ্যা গড়িয়ে যায়, আমার পাঠ থামে না। রাতে খাবারের সময় হয়ে গেল, পাঠ তবু থামে না। খেতে বসে কেমন যেন একটা বাজে অনুভূতি হতে লাগল। বুড়ো নাকাতার হাতে নিহত বিড়ালের হৃদপিণ্ড খাদক সেই ভাস্করের মতো আমিও যেন মাছের রক্তাক্ত হৃদপিণ্ড খাচ্ছি। ঘৃণায় আমার পেট উল্টে আসতে চাইল। এও কি এক ধরনের মানসিক বিকার? হয়ত। এই বিকার পাঠের গভীর প্রভাব থেকে উৎপন্ন।

খাওয়া শেষে রিডিংরুমের খাটে শুয়ে আবার পড়া শুরু করি। রাত ক্রমশ গভীর হয়। নগরের শব্দরা কমে আসতে থাকে ধীরে ধীরে। পাঠ চলতে থাকে। নাকাতার ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী টোকিও শহরে যখন মাছবৃষ্টি শুরু হলো, সার্ডিন আর ম্যাকারেল মাছ, আমি তখন জানালার দিকে তাকাই। মনে হলো আমি আর স্বাভাবিক জগতে নেই। বাস্তব পৃথিবী থেকে চলে গেছি এক জাদুবাস্তব পৃথিবীতে। আমার কেমন ভয় ভয় করতে লাগল। বইটি হাতে নিয়ে ডাইনিং রুমের জানালার সামনে গিয়ে দাঁড়াই। পড়তে থাকি। কিন্তু গা চমচম ভাবটা যাচ্ছে না। ভয় কাটাতে বেডরুমে গিয়ে কোলবালিশে হেলান দিয়ে পড়তে থাকি। পাঠ থামিয়ে ভাবি―আশ্চর্য! আমি ভয় পাচ্ছি কেন? কিসের ভয়? মাছবৃষ্টি কি নাকাতার কথামতো হয়েছে? জোঁকবৃষ্টিও কি তার কথামতো হয়েছে? এটা কাকতাল। স্রেফ কাকতাল। মধ্যরাতে চল্লিশ বছর বয়সী ম্যাডাম সাএকি-সান যে পনের বছরের কিশোরীর রূপ নিয়ে তামুরার কক্ষে এলো, সেটাও অস্বাভিক কিছু নয়। এটা তামুরার মানসিক বিভ্রম, যা পাঠক হিসেবে আমার কাছে অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে। এই অস্বাভাবিকতাকে খুব স্বভাবিকভাবে দেখাতে পেরেছেন মুরাকামি। এখানে তিনি দারুণ কলাকৌশলী, দক্ষ কথানির্মাণশিল্পী।

আমি ভয়-ডর ঝেড়ে আবার রিডিংরুমের খাটে এসে শুই। পাঠ চলতে থাকে। বারবার জানালার দিকে তাকাই। কেবলই মনে হতে থাকে, এই বুঝি সাএকি-সান জানালার ফাঁক দিয়ে ঢুকে আমার লেখার চেয়ারে বসে আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে! আমি উঠে জানালাটা বন্ধ করে পর্দা টেনে দেই। পাঠ চলতে থাকে। কী এক গভীর তন্ময়তা নিয়ে। দ্বিতীয় কোনো সত্তা আমাকে বারবার বলে যেতে থাকে―এই বই না পড়ে ঘুমাতে যেও না স্বকৃত। তুমি তো ঘুমের মধ্যে মরেও যেতে পার। হারুকি মুরাকামির লেখা সম্পর্কে না জেনেই তুমি পৃথিবী থেকে চলে যাবে?

রাত ১.৩৫ মিনিটে গোটা উপন্যাস পড়া শেষ করে বইটি কপালে ঠেকিয়ে কভারে একটা চুমু দিই। ভাবি, সাড়ে ২৭ ঘণ্টায় ৩৮২ পৃষ্ঠার কোনো বই কি আমি সাম্প্রতিক কালে পড়েছি? পাঠের এমন অভিজ্ঞতা কি নিকট অতীতে আছে আমার? ঠিক মনে করতে পারি না। বইটা টেবিলে রেখে ঘুমাতে চলে যাই। বালিশে মাথা ঠেকিয়ে চোখে ঘুম নামার অপেক্ষা করতে করতে ভাবি―‘সমুদ্রতটে কাফকার’ দ্বিতীয় খণ্ড কবে বেরুবে? কত দিন পর? এক বছর? দু-বছর? আমার তো সকাল থেকেই পড়া শুরু করা চাই। কোথায় পাব?

একটি উপন্যাস পাঠের অভিজ্ঞতা। স্বকৃত নোমান। ০৬.০৯.২০১৬




বই পড়ে কেউ অসুস্থ হয়ে গেছেন―এ কথা কেউ বললে বিস্মিত হবো না। বই পড়ে দুর্বলচিত্ত বা সবলচিত্তের যে কোনো মানুষ অসুস্থ হয়ে যেতেই পারেন, তার মধ্যে একটা মানসিক বৈকল্য দেখা দিতে পারে―যদি সেই বইটি হয় এরিখ মারিয়া রেমার্কের ‘অল কোয়ায়েট অন দি ওয়াস্টার্ন ফ্রন্ট’র মতো কোনো উপন্যাস। যুদ্ধ এত ভয়াবহ, এত বীভৎস হতে পারে! আর সেই ভয়াবহতা ও বীভৎসতাকে এমনভাবে গদ্যরূপ দেওয়া যেতে পারে―উপন্যাসটি যার পড়া নেই তাকে বিশ্বাস করানো কঠিন।

জনৈক পাউল-এর জবানিতে কাহিনি বর্ণনা করেছেন রেমার্ক। ভাষা বা আঙ্গিকের নিরীক্ষা নেই বলতে গেলে। রেমার্ক অবশ্য নিরীক্ষাপ্রবণ ঔপন্যাসিক নন। তার ‘থ্রি কমরেডস’সহ বেশিরভাগ উপন্যাসই অনেকটা বাস্তব অভিজ্ঞতারই বয়ান। জীবনকে তিনি আমাদের মতো এত সরলভাবে দেখেননি। সে কারণেই জীবনের এত জটিল বাস্তবতা তার উপন্যাসে ভিড় করে। বিষয়বস্তুর কারণেই তার ‘অল কোয়ায়েট অন দি ওয়াস্টার্ন ফ্রন্ট’ উপন্যাসটি একটা মহত্বের জায়গায় পৌঁছে গেছে।

ফ্রন্ট লাইনে যুদ্ধের এমন প্রত্যক্ষ বর্ণনা পৃথিবীর খুব উপন্যাসেই এসেছে। রেমার্ক পেরেছেন তার বাস্তব অভিজ্ঞতা ছিল বলে। মাত্র আঠার বছর বয়সেই তো তাকে জার্মান সেনাবাহিনীর হয়ে প্রথম মহাযুদ্ধে যোগ দিতে হয়েছিল। খুব কাছ থেকে দেখেছেন তিনি যুদ্ধের বীভৎসতা। গোলার বিস্ফোরণে হাত-পা মারাত্মক যখম হয়েছিল তার। যুদ্ধের বাকিটা সময় তিনি সামরিক হাসপাতালেই কাটিয়ে দিয়েছিলেন। নাকি সুস্থ হয়ে আবারও ফ্রন্ট লাইনে যুদ্ধ করতে গিয়েছিলেন? কে জানে। তার জীবনী তো পড়া নেই। উপন্যাসের চরিত্র পাউল তো সুস্থ হয়ে আবার যুদ্ধে যোগ দিয়েছিল। এমনও হতে পারে, সুস্থ হয়ে পাউল যে যুদ্ধে গেল, তা উপন্যাসের সত্য, বাস্তব জীবনের সঙ্গে হয়ত তার সংশ্লিষ্টতা নেই।

উপন্যাসটিতে শুধু যুদ্ধের বীভৎসতার বর্ণনা দেননি রেমার্ক, মানবিক বোধও ছড়িয়েছেন। সেই ফরাসি সৈনিকটিকে নিজ হাতে হত্যা করবার পর তার শিয়রে বসে পাউলের বলা কথাগুলোর মধ্যে এক গভীর জিজ্ঞাসা নিহিত―যুদ্ধ কেন? মানুষ কেন যুদ্ধ করে? সৈনিকটিকে হত্যা করবার আগে সে ছিল পাউলের শত্রু। মানুষ নয়, প্রাণঘাতী শত্রু। কিন্তু যখন তাকে হত্যা করা হয়ে গেল, পাউলের তখন উপলব্ধি হলো―আহা, নিহত সৈনিকটি তো দেখতে তারই মতো মানুষ। ‘আমায় ক্ষমা করো কমরেড। আমার জীবন থেকে কুড়িটা বছর কি তার চেয়ে বেশি নিয়ে নাও কমরেড। নিয়ে তুমি উঠে দাঁড়াও’―পাউলের এই আত্মধ্বনি মানবতার ধ্বনি। এখানে এসে সমস্ত যুদ্ধ এক ভয়াবহ শান্তিতে রূপান্তরিত হয়। আর আমরা পাঠকরা শিউরে উঠি। যুদ্ধের প্রতি আমাদের প্রচণ্ড ঘৃণা জন্মে। এক তীব্র ঘৃণায় আমাদের মুখে দলা হয়ে আসে থুতু। কিন্তু আমরা সেই থুতু নিক্ষেপ করতে পারি না। কোথায় করব নিক্ষেপ? যুদ্ধই যে আমাদের নিয়তি। পৃথিবীটা যে একটা যুদ্ধের মাঠ!

এক নিদারুণ ব্যর্থতা এবং অসঙ্গতির ভয়ংকর কাহিনি ‘অল কোয়ায়েট অন দি ওয়াস্টার্ন ফ্রন্ট’ উপন্যাস। যুদ্ধ মানবতার কী অপমান বয়ে আনে, তারই শৈল্পিক বয়ান। রেমার্কের সেরা কাজগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম সেরা।

টুকে রাখা পাঠ উপলব্ধি। ৩০.০৭.২০১৬

1 টি মন্তব্য:

  1. অনেক পরে হলেও লেখাটি চোখে পড়লো, পড়লাম, বেশ ভালো লাগলো, উৎসাহিত হলাম...

    উত্তরমুছুন