বৃহস্পতিবার, ১০ নভেম্বর, ২০১৬

মোজাফ্ফর হোসেন'এর গল্প : কীটপতঙ্গের জীবন

দিন সাতেক অফিসে আসেননি বড়সাহেব। আছিয়া আজও বড়সাহেবের রুমের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে খানিকক্ষণ। নিজের পেটের দিকে কয়েকবার তাকায় সে। ‘অভিশাপ!’ বিড় বিড় করে বলে। মন্থর গতিতে ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়ায়। টয়লেটগুলোর যে অবস্থা, তাকালেই খিঁচিয়ে বমি বের হয়ে আসে। পেটে কিছু পড়েনি সকাল থেকে, আছিয়া সান্ত্বনা পায় এই ভেবে। বমি করে খাবার নষ্ট করার মতো বিলাসিতা তার সাজে না! এদিক-ওদিক তাকায় না সে।
টয়লেটের নড়বড়ে কপাটটা লাগিয়ে সালোয়ারের ফিতা ঢিলা করে ওখানটাতে হাত দিয়ে পরখ করে, মাসিক হওয়ার কথা এক-সপ্তাহ আগেই, আজও হল না।
মাসিকের সময় তলপেটের ব্যথায় কুঁকড়ে যায় আছিয়া। দম বন্ধ হয়ে আসে যন্ত্রণায়। কষ্টে চুপ করে বসে থাকা যায় না, আবার নড়াচড়া করলেই ব্যথাটা বাড়ে। কিশোরী বয়সে বহুবার হাতদুটো একজোড় করে ওপরের দিকে তাকিয়ে প্রজাপতি হতে চেয়েছে। ছেলে হতে পারলে বেশ হত, মনে মনে ভেবেছে, শুধু এই ব্যথা সহ্য করতে না পেরে। এখন ঐ ব্যথাটাই প্রতিমাসে তাকে কত শত দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি দেয় ওকে। এইবার এত দেরি হওয়া দেখে তার ভেতরটা শুকিয়ে একবারে কাঠের দশা। নিষ্প্রাণ একটা ধড় বয়ে বেড়াচ্ছে যেন। বাথরুমের কপাট খুলতেই কে বা কারা দ্রুত সরে পড়ে। একগুচ্ছ ছায়া নড়েচড়ে। রাস্তায় শুকনো পাতা চলাচলের খসখস শব্দ হয় ওদের চলাচলে। আছিয়া ভালো করেই বোঝে মহিলাদের বাথরুমের পাশে এই পুরুষরা কেন এত ঘুরঘুর করে!


কাজে ফিরে যায় আছিয়া। সহকর্মী মহিলারা কি যেন এক বিষয় নিয়ে হাসাহাসি করছিল, ওকে দেখে চোখ টিপাটিপি করে থেমে গেল।

‘রূপ আর গতর থাকলি কি আর একিনে পড়ি থাকি, বু!”—চোখ টিপে এক অল্পবয়সী মেয়ে বলে।

‘হামি তু আর কম চিষ্টা করলুম না। বড়সাহেবের নজর কি আর যেকিন সেকিন পড়ে লো!’ আধাবয়স্ক বিশ্রিরকমের শুকনো শরীরের মহিলাটা বলে। না খেয়ে খেয়ে বুক-পিঠ এক হয়ে গেছে ওর। একসময় বুকে কত মাংস ছিল—পথেঘাটে সব বয়সী পুরুষ কেমন ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে থাকত, সুযোগ পেলেই সেই গল্প পাড়ে।

বড়সাহেবকে আসতে দেখে সকলে কথা এঁটে মনোযোগ দেয় কাজে। অফিসের বড়সাহেব শমসের হাজী, গতবছর হজ্জ করে নামের শেষে ঘটা করে হাজী শব্দটা লাগিয়েছেন তিনি। বেশ কিছুক্ষণ ওদের কাজ পর্যবেক্ষণ করলেন। কদিন আগে অল্পবয়সী যে মেয়েটা এসেছে, তার পিঠে হাতটা রেখে বললেন, ‘শোনো মেয়েরা, আমার খুব কাছের এক নারীনেত্রীর তত্ত্বাবধানে একটা বিদেশি সংস্থা গার্মেন্টসে মহিলাদের সার্বিক অবস্থা নিয়ে জরিপ চালাচ্ছে। আমার এখানেও আসবে। নেগেটিভ কোনো কথা যেন না শুনি। ঢাকায় একটা কাজ খুঁজে পাওয়া কত কঠিন, তা নিশ্চয় সকলের জানা আছে!’ কথাগুলো শেষ করে, ‘এই, কি যেন নাম তোমার, এদিকে একটু আসো!’ বলে বড়সাহেব নিজ রুমের দিকে চলে গেল। আছিয়া দেখলো নতুন আসা অল্পবয়সী মেয়েটা কারো দিকে না তাকিয়ে উঠে গেল হনহন করে।




রাত দশটার দিকে ঘরে ফেরে আছিয়া। বস্তির এক-কক্ষে শিশু বাদে ওরা ৯জন নারী দলা পাকিয়ে থাকে। মাঝে মধ্যে এরওপর আবার কারো মেহমান এসে জুটলে সংখ্যাটা বাড়ে। আছিয়া থাকে রাধার চৌকির তলে। এখানকার চৌকিগুলো সাধারণ চৌকির থেকে কিছুটা উঁচু। চৌকিতে থাকে রাধা আর রাধার তিন মেয়ে। চৌকির যা অবস্থা কবে না ভেঙে পড়ে মাথায়! ঘরে ঢুকেই পায়খানায় যায় আছিয়া। পানি নেই। পেটের ভেতর মোচড় দিয়ে ওঠে তার। পুরনো একটা শাড়ীর একপাশ ছিঁড়ে প্রবেশ করে। এই পরিস্থিতির সাথে এখানকার সকলেই অভ্যস্থ্। পানি না থাকার কারণে পায়খানার মুখ মলে ভরে গেছে। প্রস্রাবে হলদে জলে থৈ থৈ করছে চারপাশ। কাজ সারতে সারতে বমি করে ফেলে আছিয়া। টয়লেট থেকে বেরিয়ে চৌকির তলে ঢুকে যায়। আজ আর ভাত চাপাতে ইচ্ছে করছে না। কয়েক-ঢোক খাওয়ার পানি ছিল সেটি দিয়ে হাতটা ধুয়ে ফেলে। বিস্কিট ছিল কেনা, কৌটাটা খালি পড়ে। ‘মাগিদের জন্য কিচ্ছু রাখার জো নেই,’ বলতে বলতে শুয়ে পড়ে। ‘মাগিতে যেকুন এত ঘেন্না, নাঙদের সাথ থাকলিই পারিস!’—ওপর থেকে আওয়াজ আসে। কথার পিঠে কথা ঠুকলে রাত পার নিশ্চিত জেনে উত্তর করে না আছিয়া। সকালে কাজে যাওয়ার সময় পিওন একখান চিঠি দিয়েছিল; আছিয়া জানে চিঠির বক্তব্য। এখানে আসার পর থেকে একই চিঠি বার বার পেয়ে আসছে সে।

‘বেটি আছিয়া,
তোর বাপের শরীল ভালো না। ঔষুধ কিনতি আরু ট্যাকা লাগবি। তুই যা দিস তাতে তোর বাপের কিছুই হয় না। তুই তো জানিস কত কষ্ট করি আমি সংসার চালাই। এবার পারলি কিছু ধরি পাঠাস, মা। আর গতরটার যত্ন নিস।
ইতি-
তোর মফি চাচা।’

‘গতরটার যত্ন নিস! শালা জু’খোর-মাতাল! এবার এই শরীরে হাত দি দেকিস!’—চাচাকে গালি দিতে দিতে চিঠিটা ছিঁড়ে ফেলে সে। ছেড়া অংশটা বালিশের তলে রেখে দেয়, সকালে পানি না এলে কাজে লাগাবে ভেবে।

‘দুধ দে। দুধ খাবো। দুধ দে, মা।’ রত্নার ছেলে দুটো এই যে শুরু করলো, সারারাত চলবে। রত্নার শুকনো বাটে মুখ লাগিয়ে কাঁদতে থাকে বাচ্চাদুটো আর রত্না অঘোরে ঘুমায়। সারাদিনের ক্লান্তি জড় হওয়ার পর ওকে ছিঁড়ে-কুটে খেয়ে ফেললেও ও যেন টের পাবে না। আছিয়া নিজের বুকে হাত দিয়ে অনুভব করে, এখনো দিব্যি আছে ওর মাই দুটো। তড়িৎ কি যেন ভেবে রত্নার ছেলে-দুটোর দুপা ধরে একটান মেরে ওর বুকের ভেতর টেনে নেয়। ওরা কিছুক্ষণ চুষে চুষে কিছু না পেয়ে আবার সেই কান্না জোড়ে।

‘দে বালিশ চেপে! রোজ রোজ এই প্যানপ্যানানি আর ভাল লাগে না।’—চৌকির ওপর থেকে বলে রাধা।

“লাভ কি? আবার তো বিয়োবে মাগি!’ উত্তর দেয় আছিয়া।

‘একুনো তো মাস পুজতি দিন দশেক বাকী রে! বাড়িতে কি পাঠাবি?’ অন্যকথা পাড়ে রাধা।

‘ভাবছি এবার বাড়ি গেলে ঐ বুড়োকেই মেরে আসবো। মাকে শেষ করেছে, এখন আমাকে শেষ করবে।’

‘হুম। তাই করিস। চোখ বন্ধ কর। ভোরে আবার উঠতি হবে। এই মাগিরা চিৎ হয়ি শুস্ ক্যান, কাত হয়ি শো।’ রাধা মেয়েদেরকে গুঁতিয়ে গুঁতিয়ে নিজের জায়গা করে নেয় একপাশে। অন্যদিকে চেঁচিয়ে ওঠে মরিয়ম, ‘এই হারামজাদি রত্না, ছেলেদের সামলা বলছি। আমারগুলান কি খাবে শুনি?’ আছিয়া আর কোনো শব্দ করে না। চাটায়ের ছিদ্র দিয়ে পাশের বহুতল ভবন থেকে একছটা আলো তার মুখের ওপর এসে পড়ে। মাঝে মধ্যে ঘুম না আসলে আছিয়া ঐ ছিদ্র দিয়ে ভবনটার দিকে তাকিয়ে থাকে। ঢাকা শহরের ভবনগুলো নাকি খুবই নড়বড়ে। একটা যুতসই ভূমিকম্প হলে সব হুড়মুড় করে ধসে পড়বে আছিয়াদের ওপর! ‘কেনে যে পড়ে না!’—এসময় ভাবে আছিয়া। আজ সে আলো থেকে মুখটা ফিরিয়ে মুখের ওপর কাপড় টেনে নেয়, ঘুমানোর চেষ্টা করে আপ্রাণ। এই একছটা আলো ঘুমাতে দেয় না ওকে। আলোর নেশা বড়নেশা! আছিয়া ঘুম কামায় দিয়ে উপুড় হয়ে চাটাইয়ের ছিদ্র দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকে। পাশাপাশি দুটি উঁচু ভবন। হালকা আলোয় দূর থেকে ওর মনে হয়, পৃথিবী মাগি শুয়ে আছে বুক কেলিয়ে। ফুলে-ফেঁপে এখনই ফেটে যাবে ওর মাই দুটো। এমন ভাবনায় হাসি পায় আছিয়ার। চিকন আলোয় দৃষ্টি চুবিয়ে মৃদুভাবে হাসে ও। বড়সাহেব এরকমই উঁচু এক ভবনে থাকেন, ভাবে আছিয়া। কত ব্যবধান এখন ওদের মাঝে। অথচ বড়সাহেবের চেম্বারে, দেহের কাপড় গলে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই ব্যবধান কোথায় যেন উবে যায়! জগতের সব ব্যবধান ঘুচে যায় মুহূর্তের জন্যে। আছিয়া বিস্মিত হয়ে পরখ করে তার দেহের শক্তি। কি আছে এই মাংসে? নিজের অজান্তেই হাত চলে যায় বুকে। একটা ওর অজান্তেই নেমে যায় দুই পায়ের খাঁজে।


৩.


‘৩০ টাকা দেবে, উঠে আয় নাজু’—দরজার ওপাশ থেকে নাজমাকে ফিসফিস করে ডাকে হিরা খালা। এ ঘরের নাজমা আর সফেলা স্বাধীন কারবার করে। লুলা বঙ্গ আর হিরা খালা ওদের দালাল। লুলা বঙ্গর অভাব নেই। চারটা ঘর ওর নামে আছে। ভাড়া তোলে আর খায়। এ কাজে ওর লাভ হল মেয়েদের বুকে-নিতম্বে একটু হাত ঘষাঘষি করা। এর বেশি কিছু করতে পারে না বলেই নাজমারা ওর নাম পড়িয়েছে লুলা। আর হিরা খালা কাস্টমার ধরে ৩০% পর্যন্ত কমিশন খায়। নাজমা সুরসুর করে উঠে যায় হিরা খালার ডাকে। ‘সবসময় একখান ব্লেড বা চাকু রাখবি সাথে।’ নাজমাকে উঠে যেতে দেখে বলে আছিয়া।

সফেলার ঘটনার পর পাঁচদিন থেকে নাজমা ফুলনাইট কন্ট্রাক্ট নিচ্ছে না। ভয়ে ভয়ে আছে। সফেলাকে সেদিন একজনের কথা বলে রাতে এক ভদ্রলোকের বাড়িতে তিনবন্ধু যাচ্ছেতাই ভাবে করেছে। ওর পাছাটা খুব ভারি দেখে একজন ওর পায়ুপথে সঙ্গম করেছে। সেই থেকে ওখান থেকে রক্ত ঝরছে। তিনজনে মিলে হাত পা বেঁধে, মুখে কাপড় দিয়ে একটুও প্রতিবাদ করতে দেয়নি। এর আগে নাজমাকে একবার এক লোক বেল্ট দিয়ে ঘোড়া পেটানোর মতো করে পিটিয়ে তবে উত্তেজিত হয়েছিল। নাজমা প্রায় একমাস ধরে শরীরের ঘা শুকিয়েছে। এরপরও সে নাইট ডিউটিতে গেছে। কিন্তু এবার সফেলার ঘটনায় ও খুব ভয় পেয়ে গেছে। লেখাপড়া জানা মেয়ে সফেলা। ওর আগেপিছে কেউ নেই। যা আয় হয় তা দিয়ে স্বেচ্ছায় বস্তির ছেলেমেয়েদের পড়ালেখা করায়। বই-খাতা-কলম কিনে দেয়। তাই ওর পেশার কথা সকলের জানা থাকলেও ওকে বেশ পছন্দ করে। সম্মানও জানাই।




বড়সাহেবের সঙ্গে আরো কিছুদিন পরে সাক্ষাৎ হয় আছিয়ার।

‘স্যার, আমার প্যাট হয়িছে।’ বড়সাহেবের পায়ের কাছে বসে পড়ে বলে আছিয়া। পাদুটো ধরার জন্য বসলেও সাহস হয় না ওর।

‘নতুন কি? ফেলে দে!’ বড়সাহেব কিছুটা সরে গিয়ে বিরক্তির সুরে বলেন।

‘স্যার, এটা থাক। খুব মায়া হচ্ছি ওর জন্যি।’

‘তাহলে কিছু টাকা নিয়ে কেটে পড় এই শহর থেকে।’

‘আপনি না আমাকে আলাদা ব্যবস্থা করি দিয়ার কতা বুলিলেন?’

‘আমি তো তোকে বুদ্ধিমান ভাবতাম। এখন তো দেখছি খুবই বোকা তু্ই!’ আছিয়ার মতিগতি দেখে ওকে অফিস থেকে বের করে দেন বড়সাহেব।

রাধা সব শোনার পর আছিয়াকে গর্ভপাত করানোর জন্য অনুরোধ করে। বিভিন্নভাবে বোঝায় সে, কিন্তু কিছুতেই রাজি হয় না আছিয়া। ও জানে, এই শহরে এখন আর ওর থাকা ঠিক হবে না। বড়সাহেব থাকতে দেবে না ওদের। আবার পেট বাঁধিয়ে গ্রামেও ফিরে যাওয়া সম্ভব না। শালিস ডেকে বের করে দেওয়া হবে নির্ঘাত। অথবা একঘরে করে গাঁয়ের এককোণে তাড়িয়ে দেওয়া হবে। এরপর অন্ধকারে গাঁয়ের পুরুষদের চলাচল বেড়ে যাবে ঐ-পথে। এই করেই একদিন খুন হল গাঁয়ের সেই মেয়েটি। আত্মহত্যা বলেই আশেপাশের দশগাঁয়ের লোক জানে। ঐ বৃষ্টির রাতে দুধের শিশুটিকে কয়েকটি শেয়াল কিভাবে টেনে-হিঁচড়ে হল্লা করেছে ভাবতেই ওর গা শিউরে ওঠে।




এক অন্ধকার রাতে—যেদিন আকাশে চাঁদ ছিলো না কোথাও, কারা যেন মুখ চেপে ধরেছিল তারাদের, শহরের সবগুলো বাতি নিভে গিয়েছিল ক্লান্তিতে, যেদিন বৃষ্টি হবে বলে মেঘগুলো জমাট বেঁধে ঘন হয়ে আবার কি যেন ভেবে দুধের ছানা কাটার মতো ছড়িয়ে পড়েছিল পৃথিবীময়--সেদিন আলো খুঁজতে খুঁজতে নিরুদ্দেশ হলো আছিয়া।

২টি মন্তব্য: