বৃহস্পতিবার, ১০ নভেম্বর, ২০১৬

বিদেহী প্রতিঘাত ||

বিপ্লব বিশ্বাস

আমাদের গ্রামের উত্তরে ভৈরব নদীর ধারে যে প্রকাণ্ড বটগাছটি হাজার পায়ে দাঁড়িয়ে, তারই মাঝখান করে এক ছোট্ট একচালা।

থাকে গাঁয়েরই হরিনাথ। বয়সভারে ন্যুব্জ, চলৎশক্তিহীন প্রায়, তবুও কিসের আশায় যেন নিয়ত অপেক্ষমান সে- দেখলেই মনে হয় অন্তর্গুঢ় আক্রোশ নিয়ে দিন কাটাচ্ছে হরিদা। নির্জনে থাকে। লোকালয়ে বড় একটা আসে না। অথচ এরই একসময় রমরমা আসর ছিল। ছিল ভূতপ্রেতের ওপর বিরাট ঝোঁক। অদেহী আত্মাকে আপন শক্তিবলে জড়ো হওয়া লোকজনের সামনে চোখের পলকে হাজির করে তাকে দিয়ে বহু অলৌকিক কাজ করিয়ে নিত সে। গ্রামিক ভাষায় একে বলত,মশান। অনেকটা প্ল্যানচেট ধরণের। বহু উৎসুক মনের বহু প্রশ্নের মনপছন্দ উত্তর দিত ওরা। পরে হরিদার নির্দেশেই মিলিয়ে যেত। তাদের শরীরী রূপ কেউই কোনদিন দেখতে পেত না। ভিনগাঁ থেকেও আসত অনেকে। সকলেই সন্তুষ্ট হয়ে যা দিত তাতেই হরিদার দিন গুজরান হত।

এসব ঘটনা আমাদের ছোটবেলার স্মৃতি। তারপর পেটতাগিদে যে যার বাইরে চলে গেছি। বেশ ক'বছর পর গ্রামে এসে শুনলাম,হরিদা নাকি কি এক দাগা পেয়ে তার সব ভুতুড়ে কারবার ছেড়েছুড়ে দিয়েছে। এখন নদীধারের নির্জনতায় একা থাকে। কেউ কিছু দিলে খায়, নইলে খায় না। আত্মীয় বলতে বৌমা আর এক নাতি ছিল। সোমত্ত ছেলে হঠাৎই সন্ন্যাসরোগে চলে গেছে। নাতিটি ছিল খুব আদরের। তাদের যে কী হয়েছে, জানতে পারলাম না। 

যাহোক একবুক আগ্রহ নিয়ে এক বিকেলে হাঁটতে হাঁটতে হরিদার ডেরায় গেলাম। তার এইসব ব্যাপারস্যাপারে আমার বরাবরই গোপন টান ছিল। হরিদাকে দেখতাম কী এক নেশাবশে এসব করত,কিন্তু সবসময়ই একটা সর্বনাশের ভয়। প্রায়ই বলত,জানিস শঙ্করা,যে সমস্ত আত্মার গতি হয়না তারাই আমার ডাকে ঘুরেফিরে আসে। ভেবেছিস সহজে এরা আমায় ছাড়ান দেবে? ঠিক দামটি আদায় করে তেবে ছাড়বে। হরিদার এসব কথা ভাবছি আর এগোচ্ছি। গা ছমছমে পথ। বাঁশঝাড় আড়পে আছে দুপাশ। মধ্যেমাঝে একে অপরে টক্কর লাগিয়ে আওয়াজ তুলছে প্রেতশব্দে। চালার কাছ হতেই হরিদার বিকট হুঙ্কার, শয়তানি, তুই ফের এসিছিস! সব খেয়িউ তোর খিদি মিটেনি?

বলতে বলতে হরিদা বিরাট এক দাওলি বাগিয়ে ছুটে আসছে আমারই দিকে।বেকায়দা বুঝে একপাশে ঝটকা মেরে সরে আমি চেঁচিয়ে বলি,ও হরিদা,আরে করছ'টা কি! আমি শঙ্কর, তোমার শঙ্করা গো; তোমার সাথে দেখা করতে এলাম। ও তুই, আমাদের যদু ভট্টের ছেইলা শঙ্করা? আমি ঠাওরালাম... যাকগি, আয় বস। তা কবে এলি? ইদিকি কী মুনে কইরি? সউসা তো কেউ ইদিকপানে আসে না! 

এরপর একটু সমঝে নিয়ে হরিদা থামলে জানতে চাইলাম,হরিদা,শুনলাম তুমি নাকি সব ছেড়েছুড়ে দিয়েছ? কি এক দুর্ঘটনা...। তুই ঠিকই শুনিছিস রে, আমি হেইরি গিয়িছি...। হরিদা যেন হারিয়ে গেল: জানিস, সে রাতটা ছিল শুনশান অমাবস্যির রাত। আকাশ ভরতি ম্যাঘ। মইদ্দি মইদ্দি ঝিল্কায়। যেনে কীসির টান। জনাকয় এসিছে। মুনটা সিদিন জুত বুলছিল না। তুবুও কাজে বইসলাম। কিডা আসে কে জানে। অনেকটা সুমায় পার হয়ি গেল,আসেনা কেউই। পেরায় ঘন্টাখানিক পর এক মেয়িছেলির গলা পেলাম। বইললাম,বড্ড দেরি কইরলি যে আজ? সে হাসতি হাসতি বইলি উঠল,কী আর করি বলো,ছেইলিটাকে দুধ খাইয়ি, ঘুম পাড়িয়ি তেবেগা এলাম। এই কথায় চমক লাইগল আমার। গুটা শরীল আমার কাঁইপতে লাইগল। বুঝলাম,চরম বিপদ হয়ি গিয়িছে। পড়িমরি ছুটলাম ঘরপানে। 

আঙনে পা দিতিই দেখি ভরতি লোক। একটা কাঁদনের সুর ভাইসছে। ব্যাপার কি,বুলতেই বৌমা আমার পাগলিপরায় ডুকরি উইঠলো,বাবাগো, ছিলেটা মুর চইলি গ্যাল গো। শুয়ি শুয়ি বুকির দুধ দিচ্ছি, অমনি গলাতি দুধ আটকিয়ি শুনা আমার শে...এ...এ...ষ হয়ি গেল গো বাব্বা...আ...আ...। বুইঝলাম। 

শয়তানিটা আমার সব্বোনাশ কইরি গেল। উকি যদি আর একটিবার বাগি পাই, বুঝলি... বলতে বলতে হরিদা দাঁতে দাঁত ঘষতে ঘষতে ভেঙ্গে পড়ল। তার কান্নাতোড়ে খানিক থমভাব। টুকুন পরে হরিদাই তা কাটিয়ে বলল,বুইলি শঙ্করা, ই জীবনে বড্ড দাম চুকিইছি। সাধির নাতিটাকে দিলাম। বৌমা আমার পাগল হইয়ি ঘরছাড়া। কুথায় যে গেল! আমুও সব ছেইড়ি দিলাম। ইসব কারবার কইরতি নেইরে ভাই, কইরতি নেই। উরা সব সুদিমূলি আদায় কইরি তেবে ছাড়ান দ্যায়। কি জানি,হবে হয়ত!ভাবতে ভাবতে আমিও ফিরে এলাম।

জন্মসাল : ১৯৫৪
জন্মস্থান : পাংখাবাড়ি, দার্জিলিং
পেশা: অবসৃত প্রধানশিক্ষক
বর্ত্তমান নিবাস: তেঘরিয়া, কোলকাতা- ৫৯
লেখালেখি: ছোটগল্প( মৌলিক ও অনুবাদ), শিক্ষা ও গল্পবিষয়ক প্রবন্ধ- নিবন্ধ।
প্রকাশস্থান : বিভিন্ন দৈনিক ও সাময়িক পত্রপত্রিকা, এ বঙ্গের ও বহির্বঙ্গের।
প্রকাশিত গ্রন্থাদি : এবং গণ্ডারের শোক( গল্প), ক্ষোভ বিক্ষোভের গল্প( গল্প), সামরিক সারমেয় কথা( অনূদিত উপন্যাস), দক্ষিণ ভারতীয় ছোটগল্প ( অনুবাদ), পড়শি ভাষার গল্প( প্রকাশিতব্য)।



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন