বৃহস্পতিবার, ১০ নভেম্বর, ২০১৬

হেলাল মহিদীন'এর গল্প : অশরীরিজন, বৃষ্টি ও জলের ছায়া হয়না

অনেকগুলো চেম্বার। অনেকগুলো দরোজা পাশাপাশি। সাইক্যায়াট্রিস্ট ভদ্রমহিলার নামটি কোনোভাবেই মনে পড়ছিলনা অনুপমের। চেম্বারের নম্বরটিও স্মরণসীমায় নাই। মনে পড়ে-পড়ে-পড়েনা অবস্থাতেই একটি দরজা খুলে একজন মানবী জিজ্ঞেস করলেন— আপনি নিশ্চয়ই অনুপম?


মনোমানবীর কানে সেলফোন ধরে রাখা। বুড়ো আঙ্গুলে ফোনের মাইক-হোলটি চেপে বললেন—“আপনার বন্ধু শ্যামল আপনার সম্পর্কে সামান্য কিছুকিছু মাত্র বলেছে— আপনি দেখতে কেমন ইত্যাদি আরকি! তাও আপনাকে চিনতে সামান্যও ভুল করিনি। জানতাম এই ঘোর বৃষ্টিতে আপনি হাটবেন; ভিজে চুপসে হয়ে আসবেন। আমার ওয়াশ রুমটি আপনার জন্য খুলে রেখেছি। সেখানে টাওয়েল আছে, লন্ড্রি করা অ্যাপ্রন জামা পায়জামা আছে, চিরুনিও আছে। চেঞ্জ করে আসুন। আপনার পা বেয়ে রক্ত গড়াচ্ছে। ওয়াশ রুমেই ডেটল-গজ-ফিতা ব্যান্ডেজ-ব্যান্ডেইডও পাবেন”।

শ্যামল গত কয়েকদিন ধরে অনুপমকে একনাগাড়ে বুঝিয়ে শুনিয়ে গেছে। বারবার হাতে হাত চেপে স্বভাবসিদ্ধ বাংলা-ইংরেজির মিশেলে অনুরোধ রেখেছিল— প্লিজ, নো অ্যাটিচিয়ুড শোয়িং। দ্যাট সাইক্যায়াট্রিস্ট লেডি যা যা প্রশ্ন করবে ঠিকঠিক রেস্পন্ড করবি। শি ইজ ডিফ্যারেন্ট, একেবারেই অন্যরকম— অ্যাক্সেপশনাল অ্যান্ড এক্সট্রাওর্ডিনারি। তোর মত আমার মত তারও বাইরের পড়াশোনা-ট্রেইনিং। সে বুঝবে। কোঅ্যাপ্যারেইট হার অ্যাজ মাচ অ্যাজ ইয়্যু ক্যান! শি উওড বি দ্যা রিয়্যাল হেল্প, আই সিন্সিয়ারলি মিন ইট! যুগ যুগ ধরে এমন সাত রাজ্যের কষ্ট ভিতরে চেপে রেখে বাঁচা যায়না। তুই অলরেডি এনাফ ড্যামেজ করে ফেলেছিস, এমন এক টিকিং পয়েন্টে চলে গেছিস বেঁচে থাকতে হলে তোর প্রফেশনাল হেল্প লাগবেই। নইলে তোর নিজেনিজেই রিকাভার করতে হবে। সেটা তুই আগে পেরেছিস, এখনো পারবি— সে বিশ্বাসও আমার হান্ড্রেড পার্সেন্ট। তাও মিট দ্যাট লেডি। বাকি সব আমি দেখছি”।

শ্যামলকে কথা দেয়া হয়েছে। অনুপম নিজেও নিশ্চিত এখনই ব্যবস্থা না নিলে যে কোনো সময় বড়সড় বিপদ ঘটে যেতে পারে। তাই সব খুলে বলবে সিদ্ধান্ত নিয়েই এখানে এসেছে অনু্পম। শ্যামল সকালে ইউরোপের উদ্দেশ্যে ঢাকা ছেড়ে যায়। তার আগে পর্যন্ত সাতসাতটি দিন ব্যবসাপাতি ব্যস্ততা সব ছুঁড়েছেড়ে অনুপমকে আগলে রেখেছিল বেচারা। মুরগি যেমন দুই ডানার নীচে ছানাদের আগলে রাখে ঠিক তেমনি মুরগি-মা হয়ে উঠেছিল শ্যামল। বলেছিল— “আমি একা মানুষ— ডিভোর্সি, সংসারহীন; বন্ধুত্ব ছাড়া আর তেমন বড় কোনো দায়ইতো নেই— সেই দায়টুকুই শোধ করছি, মোটেই কোনো রকম কিছু দায়িত্ব করছিনা যা নিয়ে তোর ভাবাভাবির দরকার আছে। এক সপ্তা আগে তুই সমুদ্রের পেটের মধ্যে প্রায় চলেই গিয়েছিলি। মরে গেলে অতীত হয়ে থাকতি অথচ এখনো তুই বর্তমান, বাস্তব। এই মির‍্যাক্যল এনজয় করার কাছে সারা জীবনভর টাকা কামাই এনজয় করা্র আদৌ কোনো কম্প্যারিজন হয় নাকি, বেকুব! অনুপমের গহীন গহনে বেঁচে থাকার হাহাকার দমকা হাওয়ার মত ঝাপটা মেরে যায়। অনুপম দ্যাখে শ্যামলের শরীরের আশেপাশেও কোনো ছায়া-প্রতিচ্ছায়া পড়ছেনা। অশরীরিদের যেমন ছায়া হয়না, ঘোর বৃষ্টির যেমন ছায়া হয়না, জলের যেমন ছায়া হয়না সে’রকম।

ইতিবৃত্ত শুধু শ্যামলই জানে। অনুপমের বয়স তখন নয় বছর ছুঁইছুই। সে বছর জনে জনে ভুতের আছর আতংক ছড়িয়ে পড়েছিল। এক ইমাম সাহেব ঘর ঘর ঘুরে নির্ভয়ের সবক দিয়ে যাচ্ছিলেন যে যা কিছুরই ছায়া পড়বে সেসব ভুত নয়, কেউ যেন অহেতুক ভয় না পায়। তিন বছরেই মা-হারা, অনাদর-অবহেলা আর স্নেহ-মমতা ছাড়াই বছর বছর বেড়ে চলা অনুপমের হঠাত খুব মনে হল তাকে ভুতে ধরুক। আদরের কাঙ্গাল বালকের মনে হয়েছিল ভুতে ধরলে সবার নজরে পড়া যাবে। আদরযত্ন সেবা-শশ্রুষা মিলবে। রাত হ’লে সে খিড়কি খুলে বেরিয়ে পড়ত ভুতের সন্ধানে। ভুতের দেখা তবু কোনোভাবেই মিলত না। রাতের ঘুটঘুটি আঁধারকেও যার সামান্যও ভয় হয়নি, এক পড়ন্ত বিকেলে কুড়ি হাত লম্বা হয়ে উঠা এক নারীছায়া দেখে আতংকে তার দাঁতকপাটি লেগে গিয়েছিল। আশেপাশে আরো কিছু সমান লম্বাটে ছায়া জড়ো হয়েছিল। সে ছায়াগুলোর পেছনের রক্তমাংসের দু’পেয়েরাও ছিল সমান ভীতিকর। সেদিন হতে বালকটির ছায়া-আতঙ্ক শুরু। সেদিন হতেই অশররীরিজনের মত ছায়াহীন সবকিছুতে তার নিরাপত্তা-নির্ভরতার অনুসন্ধানযাত্রা শুরু। সেই অভিযাত্রায় সে দেখল ঝরোঝরো ভারী বর্ষণ আর জলেরই শুধুমাত্র ছায়া-প্রতিবিম্ব হয়না। ঘনঘোর বর্ষায় সে মিশে যেত বৃষ্টিজলে। এবং কী আশ্চর্য! বাদলের ধারা কষ্টজমাট পাহাড়গুলো ধ্বসিয়ে ধুয়েমুছে মাটিতে মিলিয়ে দিত। বর্ষাবিহীন দিনগুলোয় সে নেমে পড়ত জলে। কান্নার জল উজানে মিশে গেলে সাফসুতরো বালকটি ডাঙ্গায় উঠে আসত আরো হাজার বছর বেঁচে থাকবে বলে।

পরিপাটি হয়ে ফিরে এসে অনুপম দেখল টি-টেবিলে এক কাপ কফি রাখা। মনোমানবীর এক হাতে কফি কাপ অন্য হাতে কানের সঙ্গে চেপে ধরা টেলিফোন। চোখের ইংগিতে জানালেন কফিটি অনুপমের জন্য। কফিটি বিস্বাদ। আশেপাশে নজর বুলায় অনুপম। চেম্বারটি চমৎকার সাজানো গুছানো। খোলামেলা। বিদেশি আদলের সিলিংয়ে সেঁটে থাকা তারার মত বাতিগুলো আলোর বন্যা বইয়ে দিয়েছে ঘরটিতে। শাদা এক সেট দামী সোফা দামী কাঁচের টি-টেবিলটির দু’পাশে কাশফুলের শুভ্রতা ঢেলে দিয়েছে। মনোমানবী খানিকটা দুরে গিয়ে টেলিফোনে কাউকে শাসাচ্ছিলেন। সহসাই যে ফোনটি ছাড়বেননা তেমন লক্ষণ স্পষ্ট। অনুপম কফি মুখে তুলছেনা খেয়াল করে ক্ষ্ণিক কাছে এসে বললেন— ফ্রিজে জ্যুস আছে, ড্রিংক্স সফট হার্ড দু’টোই আছে। প্লিজ ম্যেইক য়্যুরসেলফ ক্যম্ফর্ট্যাব্যল!

- গান শোনা যাবে? রবীন্দ্র সংগী...

- স্যরি, নট মাই কাপ অব টি! টি-টেবিলের নীচে রিডিং স্টাফস রাখা আছে।

অনেকগুলো সিনে-ম্যাগাজিনসহ চিকিৎসা ও মনোজগত নিয়ে নিউজপ্রিন্টে ছাপা সচিত্র বিচিত্র সব দেশি সাময়িকি আর ঝকমকে বিদেশি ফ্যাশন ম্যাগাজিন-এর বিপ্রতীপ গাদাগাদি ছাড়া তেমন কিছু সেখানে ছিলনা। পাশে একটি বড়সড় শেলফ। অনুপম ভাবল সময় কাটাতে দু’য়েকটি বই নিয়ে উল্টেপাল্টে দেখা যেতে পারে। শেলফের সব ক’টি তাক জুড়েও কাঁচের ফ্রেমে বাঁধানো অসংখ্য সার্টিফিকেট এবং আলোকচিত্র। মনোমানবী এর-ওর হাত হতে সার্টিফিকেট-ক্রেস্ট নিচ্ছেন, হাত মেলাচ্ছেন, ভরা স্টেজে স্বীকৃতিমাল্য পরছেন, গ্র্যাজুয়েশন গাউন পরে ভি-চিহ্ন দেখিয়ে সার্টিফিকেটের ফ্ল্যাপ বুকে ধরে আছেন— এমনতরো ছবিছাবা মিউজিয়মের যত্নে সাজিয়ে রাখা। বাইরে ঝুম বর্ষণ। এমনই বৃষ্টি যে চেম্বারের ভারি কাঁচের দেয়াল এবং কংক্রিট ভেদ করেও জাঁহাবাজ কোরাসের মত শব্দ আছড়ে পড়ছে ভিতরে। দরজাটি খুলে না গেলে হয়ত আবারো রাস্তায় নামত অনুপম। চরাচর দিগন্তভর ধোঁয়াশা-কুয়াশা ঢাকা ঝাপ্টা-জলের এমন দিনে খোলা মাঠে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকা যেত। অ্যাপ্রন-পায়জামা আর পরিপাটি চুলে নিজেকে চিনতে কষ্ট হচ্ছিল অনুপমের। এ’রকম পোষাকের মানুষেরা সম্ভবত বৃষ্টিপাগল হ’তে পারেনা। মনোমানবী খানিকটা গলা চড়িয়ে বললেন— “স্যরি, আর দু’টো মিনিট! অ্যাত্তসব ফোন! কী যে জ্বালাতন! আমার মধ্যে যে কী পেয়েছে মানুষ? বলে দিয়েছি আগামী ছয় মাস পর্যন্ত বুকড, নো নিউ অ্যপয়েন্টমেন্ট! তাও রিকোয়েস্টের পর রিকোয়েস্ট! মন্ত্রী-মিনিস্টার, ধরাধরি! স্যরি, টু মোর মিনিটস প্লিজ!” কফি ধরা হাতেই বৃদ্ধাঙ্গুলি-তর্জনির রিং বানিয়ে চোখ টিপে প্রশংসা-ইংগিত দিলেন যে ডাক্তারের সাজে অনুপমকে অপূর্ব লাগছে!

এ’রকম অর্থহীন সময়গুলোতেই অনুপম-এর হ্যালুসিনেশন ফিরে আসে। সেই একই দৃশ্যকল্প! যুবকটি এক জংশন হ’তে আরেক জংশনে এক রেল হ’তে অন্য রেলে ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে একদিন এক অচিন স্টেশনে থামল। হঠাৎ অদ্ভূত ভিন্ন রকম ভিন্ন জগতের রেলের গাড়ি এসে থামল তার সামনে। সেই রেলের ইঞ্জিন-বগি সবই স্বচ্ছ কাঁচের। দেখা যাচ্ছিল কাঁচের বগির ভিতরে বেহেশ্ত বাগান। সবুজে-নীলে ফুল-পাখি-প্রজাপতিদের হুটোপুটি উড়াউড়ি। হঠাত চোখের সামনে থাকা বগিটির বিরাট দরোজা দু’পাশে সরে যায়। ভিতর হতে একটি সৌম্য কায়ার আহবানে যুবকটি মন্ত্রমুগ্ধের মত বগিতে উঠে পড়ে। চলতে শুরু করে রেল। উলটো সেই রেল। উল্টো পথেই ছুটছিল সে। বাতাসের গতিতে রেলগাড়িটি একটি টানেলের ভিতর ঢুকে পড়ে। যুগের পর যুগ সে টানেলের কোনোই শেষ মেলেনা। সে টের পায় তার জরা লেগে আসা শরীরের চারপাশ জুড়ে শক্ত দেয়াল গড়ে উঠেছে। সেখানে নিঃশ্বাস নেবার বাতাসটুকুও নেই। মাথার উপরটাই শুধু ছাদহীন। খোলা। টানেলের অমাবশ্যা-কৃষ্ণপক্ষের ঘুটঘুট্টি অন্ধকারের মাঝে ক্বচিৎ আলোর দেখা মেলে। সেটুকু আলো্তেও বন্দি মানব দেখে আবাহনি কায়াটির চারপাশে অজস্র সহস্র ছায়ার ছড়াছড়ি। ছায়ায় ছায়ায় অন্ধকার আড়ালেই ডুবে থাকে কায়াটি। ছায়াদের তার আশৈশব ভয়, ছায়াহীনকে নয়। শুধু ছায়াহীনেই আশ্রয় মেলে যুবকটির। একসময় জলের গভীরে নেমে যায় রেলটি। জল ছায়াহীন। জলের গভীরে অক্সিজেনের অভাব নেই। ছাদ ধরে উদ্বায়ু হ’য়ে জলে মেশা যুবকটি প্রাণ খুলে শ্বাস নেয়।

“ওহ! আই অ্যাম স্যরি! কী যে যন্ত্রণা করে মানুষগুলো।” মনোমানবী ফিরে আসায় হ্যালুসিনেশনের ঘোর কেটে যায় অনুপমের।

“শুনুন অনুপম সাহেব, মিস্টার শ্যামল হঠাৎ জোরাজুরি শুরু করলেন আপনাকে আজই নাকি আসতে হবে! লম্বা সময় দিতে হবে। আমার অ্যাসিস্ট্যান্টসহ সব স্টাফকে ছুটি দিয়ে দিতে বললেন। বিকেলের সব অ্যপয়েন্টমেন্টগুলোও ক্যান্সেল করলাম তাঁর রিকোয়েস্টে। মিস্টার শ্যামল কোটিপতি মানুষ; কম্পেন্সেইট করবেন জানিয়েছে্ন। রিচ ম্যান’স বার্ণ, রিচ ম্যান্’স বার্ডেন! হিহিহিহি! এটি মাত্র শুরুর দিন। আপনাকে আরো বহু বহুবার আসতে হতে পারে। আপনি যতক্ষণ ইচ্ছা মন খুলে কথা বলতে পারেন, থাকতে পারেন। এখন বেলা তিনটা। বাসায় জানিয়ে দিয়েছি আজ রাতে আমার ফিরতে এগারোটা বারোটা বাজবে। এ’রকম ভারী বৃষ্টি, দু’চারদিনেও থামবেনা। আশেপাশের সব চেম্বার বন্ধ। সবগুলো ফোনই বন্ধ করে দেব একটু পর। কোনো ডিস্টার্বেন্স রাখবনা। আপনার গল্পগুলো বলে যাবেন...”

গল্প? স্যরি, গল্প নয়, আই সিন্সিয়ারলি নিড য়্যুর হেল্প। সমস্যাটি ব্রিফ করতে আধঘন্টা লাগবে। তারপর বৃষ্টিতে ঘুরতে বেরোব।

মনোমানবী অনুপমের কথাটি কানেই তোলেননি হয়তবা। ঠোঁটে রহস্যময় হাসি টেনে নিজের কথাই বলে চলছিলেন— এই আমাকে দেখুন, বয়স মাত্র পঁয়ত্রিশ। এই সেদিন মাত্র প্র্যাক্টিস শুরু করলাম। সারা দেশের মানুষ এখন আমাকে এক নামে চিনে। ছয় মাস এক বছরের আগে কোন ভিজিটরকে বুকিং দিতে পারিনা। আমার পঁচিশ-তিরিশ বছর আগে প্র্যাক্টিস শুরু করা সিনিয়রদের ব্যবসায় লালবাতি জ্বালিয়ে দিয়েছি। পারে তো সবাই মিলে আমাকে খুন করে! আমাকে নিয়ে কত কথা যে চালু আছে বাজারে! কারণ এই আমি জানি কীভাবে কী হয়, কার জন্য কি কি কীভাবে কীভাবে করতে হয়! এই আমিই... এই আমিই...”

অনুপমের ইন্দ্রিয়ময় শুধু ‘এই আমিই ... এই আমিই’ শব্দ দু’টি বৃষ্টির বাড়বাড়ন্ত গর্জনের মাঝে মিশে পড়া অনর্গল অবিরত ঝংকার হয়ে বাজছিল। দূরে কোথাও সশব্দে ট্রান্সফর্মার ফাটল। বিদ্যুত চলে যেতেই ঘরের কোনায় রিচার্জেবল ব্যাটারিতে চলা একটা ইমার্জেন্সি লাইট স্বল্প-স্বপ্নালোয় হেসে উঠল। মনোমানবী নড়েচড়ে উঠলেন— “হাহাহা! ইলেক্ট্রিসিটি ইজ সো রোম্যান্টিক! জানতাম যাবে। আপনিও নিশ্চয়ই লোডশেডিং এর অপেক্ষায় ছিলেন!”

অনুপম টের পায় গাঢ় ঘন ছায়ায় ঢেকে যাচ্ছে মনোমানবীর চারপাশ। সে অনুমতি চাইল— কিছু মনে করবেন না। আ্মি কি একটু বাইরে যেতে পারি? সিগারেট খাব।

আনকোরা নতুন বেনসন প্যাকেটের প্লাস্টিক র‍্যাপ ছাড়িয়ে একটি সিগারেট ধরিয়ে দু’টান শেষেই ছুঁড়ে ফেলে দিল অনুপম। পাঁচ বছর আগে সিগারেট ছেড়েছিল। তবু আজই কি মনে করে যেন প্যাকেটটি কিনেছিল। ধোঁয়াটা এতটা বিস্বাদ হবে ভাবেনি। চেম্বারে ফিরতেই ভদ্রমহিলা অনুপমের চোখে সরাসরি চোখ সেঁধিয়ে প্রশ্ন করলেন— “অনুপম শব্দের ইংরেজি কি হয়? ইউনিক? নামটি আপনার সাথে খুব মানিয়ে গেছে। আমি পাকা জহুরি। এক নজর দেখেই মানুষ চিনতে বুঝতে পারি। এনিওয়ে মিঃ ইউনিক, দ্যা ফার্স্ট অ্যন্ড ফোরমোস্ট রুল অব এঙ্গেজমেন্টটি হচ্ছে উকিল এবং ডাক্তারের কাছে কখনো কোনো কিছুই লুকাতে হয়না। সাইক্যায়াট্রিস্টের কাছেতো মোটেই নয়! শরীর-মনের কষ্ট, সুখ-দুঃখ, ব্যাথা-বেদনার গোপন কথা, গোপন অসুখ, চাওয়া-পাওয়া, আক্ষেপ হাহুতাশ কামনা-বাসনা বিনা বাধায় বিনা সংকোচে জানতে দিতে হবে! যাহা বলিব সত্য বলিব... আমি নিজে কিন্তু একজন লাইভ লাই ডিটেক্টর। আপনার কথা বলছিনা...আজ পর্যন্ত যত ভিজিটর-ক্লায়েন্ট-কাস্টমার,যত যত ক্যেইস... কেউ কিছু ফ্যাব্রিকেইট করে কখনোই পার পায়নি। আমার কান-চোখ রাডারের মত। ওহ ইয়েস, আর একটা নিয়ম। এটা আমার কিংডম। আমিই রাণী। আমার অঙ্গুলিহেলনেই চলতে হবে আপনাকে। আই উইল ডমিনেট দ্যা হৌল শো। হোপ দ্যাটস ওক্যে উইদ য়্যু!”

ভিজিটর-ক্লায়েন্ট-কাস্টমার-ক্যেইস! ফ্যাব্রিকেশন! লাইভ লাই ডিটেক্টর! কিংডম! অঙ্গুলিহেলন! ডমিন্যান্স! মনোমানবীটির অস্তিত্ব ঘেঁষে ঝাঁকড়া ঝাঁকড়া গাছের মত কতকগুলো ছায়া একযোগে ডালপালা ছড়াচ্ছে। গা শিরশিরে অনুভূতিতে অনুপমের মনে হয় নারীকন্ঠটি পর্দার আড়াল হতে ভেসে আসছে— “মিস্টার শ্যামলের কাছে আপনার অসচেতন আত্মহত্যাপ্রবণতা নিয়ে কিছুটা শুনেছি। আনকনশিয়াস সুইসাইডাল টেন্ড্যান্সি! জ্বি, বলুন, আমি শুনছি”।

নতুন করে হ্যালুসিনেশন হচ্ছে, ভয় পাচ্ছি সমস্যাটি স্কিজোফ্রেনিয়ায় টার্ণ করছে। নদী-সমুদ্রের কাছে গেলে ঘোরের মধ্যে জলে নামি

“আপনি নিজেই নিজের রোগ ধরতে পারেন? ইন্টারেস্টিং! স্কিজোফ্রেনিক কিন্তু বুঝেনা সে হ্যালুসিনেট করছে, তার বদ্ধমূল বিশ্বাস যা কিছু ঘটছে তার সবই নিরেট বাস্তব”।

মনোমানবীর চোখেমুখে কৌতুকের হাসি। তাতে অবিশ্বাসের ছাপ। গায়ে পড়ে হলেও অনুপমকে বলে যেতেই হবে। তাই সে নিজেকে সামলে নিয়ে ব্যাখ্যা দিতে থাকে— জীবনভর বাধ্য হয়েছি নিজেই নিজেকে রেসিলিয়্যান্ট বানাতে, নিজের পথ নিজেই খুঁজতে। খুঁজেছি। নয়-দশ বছরের হ্যালূসিনেশনটিও আমার কৈশোরে যৌবনে পুরোপুরি কাটিয়ে উঠেছিলাম শুধুই মনের শক্তি দিয়ে। ভুতপ্রেতে ভয় পেতে শুরু করেছিলাম আর দশজনের মতই। নিজেনিজেই রাজ্যের ছায়ামানুষের সঙ্গে চলতে শিখেছি। বয়স বাড়ছে। শরীর-মন ছায়ামানুষের বন্দিত্বে এতটাই বিপর্যস্ত যে শৈশবের হ্যালুসেনেশনটি নানাভাবে, ট্রেনের ঘটনা হয়ে প্রতদিনই...

“হুম! গল্পটি আসলেই অন্যরকম, ব্যতিক্রমি। ইউনিক ইন্ডিড তবে ঠিক অনুপম নয়। হাহাহা। জাস্ট কিডিং!”

অনুপম দ্যাখে আরো বড় নতুন নতুন ছায়া্য় মনোমানবীর চারপাশ আঁধারে ঢাকা পড়ছে। আবারো তার খুব ইচ্ছে হল সিগারেটের ধোঁয়ায় ডুব দেয়। অনুমতির অপেক্ষা না করেই অনুপম লবিতে এসে পরপর দু’টি সিগারেট সাবাড় করে। ‘আজ নয়, অন্য কোনো দিন আসি’ বলে বৃষ্টিতে নেমে পড়ার একটি ভাবনাও মুহূর্তখানেক ঝাঁকি দিয়ে যায় অনুপমের মগজে। কিন্তু শ্যামলকে কথা দেয়া হয়েছে। গায়ে বৃষ্টির ছাঁট নিয়ে ভিতরে ফিরল অনুপম। আবারো প্রশ্নোত্তর পর্বের শুরু।

আপনার বাম পা’ বেয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছিল। কি হয়েছিল বলুন তো!

জোঁকে কেটেছিল।

জোঁক? এই ঢাকা শহরে? ভারি স্ট্রেঞ্জ তো! কিভাবে? কোথায় পেল আপনাকে?

উদ্যানের ভিতরের পুকুরটিতে পা ডুবিয়ে বসেছিলাম। ঘন্টাখানেক।

এমন ভারি বৃষ্টির মধ্যেও পা ডুবিয়ে...?

হুঁ

পা তোলার পরও দেখেননি, তাই না?

না, দেখেছি।

তা-ও ফেলেন নি? ভয়টয় হয়নি?

না।

উদ্যান হতে আমার চেম্বার দেড় দুই কিলো পথ। পায়ে করে পেলেপুষে নিয়ে এসেছিলেন?

হুঁ

আপনার ট্রাউজার হাঁটু অব্দি গুটানো দেখলাম। বৃষ্টিতে রাস্তা ডুবে আছে, সেই পানিতেও রক্তটুকু ধু’য়ে গেলনা! জোঁকটার জন্য আপনার অনেক আদর হয়েছিল তাই না?

অনুপম এই প্রশ্নের উত্তর দেয়না। উত্তর হ্যাঁ! কিন্তু নিরুত্তর থাকাই ঠিকঠিক উত্তর মনে হচ্ছে তার। দোতলার এই চেম্বারটিতে উঠার সিঁড়িতে পা রাখার সময়ই জোঁকটি গাছপাকা রক্তরং পারুল মরিচের মত বেলুনফোলা হয়ে টুস করে ঝরে পড়েছিল। মনোমানবী অবশ্য উত্তর পাবার কোনোই আগ্রহ না দেখিয়েই প্রশ্ন চালিয়ে গেলেন— জোঁকটি ফেলে দিলেন না কেন?

জোঁকটিরও কোনো ছায়া ছিলনা।

মনোমানবী হাসছেন বুঝিবা! নিরব হাসি। সিঁদকাটা চোরের সিঁদের ভিতরে-বাইরে আসা-যাওয়া যে’রকম শব্দহীন হয় সে’রকম। সে’ দৃশ্য অনুপমের নজর এড়াল না। হাসি চাপতে চাপতে বলছিলেন— “হিমু সিন্ড্রোম! হিমু অবশ্য কুড়ি-একুশ। আপনার ডাবল বয়স তাই আপনার মধ্যে ডাবল হিমু বাস করা অস্বাভাবিক কিছু নয়! হুমায়ুন আহমেদ এই এক উদ্ভট আনসানয়েন্টিফিক হিমু ক্যারেক্টার পপুলার করিয়ে কতো হাজার রিয়্যাল লাইফ হিমুর জন্ম দিয়েছেন জানেন? কতো কতো হ্লুদ বালকদের যে নিত্য ঘোরাঘুরি চলতে থাকে আমার চেম্বারের আশেপাশে! শুনবেন সেসব গল্প? কতশত বিচিত্র মানুষজন আসে, কেন আসে শুনবেন?

অনুপমের অনুভবরাজ্যের চারপাশ জুড়ে সাত দুনিয়ার মৌমাছিরা যেন হিমু সিন্ড্রোম’ ‘হিমু সিন্ড্রোম’ বিদ্রূপের ভনভন শ্লোগানের মিছিল নামিয়েছে। মনোমানবীর দায়টুকু কি? অবিশ্বাস? শ্লেষ? বিদ্রূপ? খোঁচা? কৌতুক? কৌতুহল? বৃষ্টিও আরো বেড়েছে। শব্দও। অনুপম টের পায় আরো কিছু ছায়া মনোমানবীর চারপাশে হাওয়াখেকো বেলুনের মত বাড়তে বাড়তে চারপাশ অন্ধকারে ঢেকে দিচ্ছে। একসময় মনোমানবীকে ঘোর অন্ধকারে ঢেকেই দিবে বুঝিবা! সে সাপশীতল প্রশ্ন ছোঁড়ে— আমি কি আরেকবার বাইরে যেতে পারি? সিগারেট খাব, বৃষ্টি দেখব।

ইলেক্ট্রিসিটি ফিরে আসে। চেম্বারের উপছে পড়া আলোয় মনোমানবীর চোখে চোখ রাখতেই আত্মার আত্মীয় নিকটজনের মত আহ্লাদি আদুরে-মমতাভেজা মায়াবি এক কন্ঠ ভেসে আসে— আপনি খুব খুব খুব বেশি সিগারেট খান। ম’রে যাবেন তো!

অট্টহাসিতে ভেঙ্গে পড়ে অনুপম। কাঁচঘেরা বদ্ধ ঘরের সেই হাসির প্রতিধ্বনি আধিভৌতিক তরংগ হয়ে শহরময় ছড়িয়ে পড়ছে যেন। মনোমানবী শুনল একটি ভুতূড়ে মুখ হিসহিস শব্দে কানের কাছে মুখ এনে বলল— আমি সিগারেট খাইনা পাঁচ বছর। আপনার সম্পর্কে সবই জানালেন, জানলাম। কিন্তু আপনার নামটিই এখনো বলেননি সম্ভবত। অনেক চেষ্টাতেও আপনার নামটি মনে করতে পারছিনা।

জোঁকটি মরে ফেটে গিয়ে সিঁড়িটির একটি ধাপ রক্তাক্ত করে দিয়েছে। খোলসটি কারো জুতার তলায় লেপ্টে অন্য জলে মিশেছে নিশ্চিত। রক্ত এড়িয়ে সন্তর্পণে সিঁড়ি পেরোয় অনুপম। সিগারেটসহ প্যাকেটটি ছুঁড়ে মারে পাশের ড্রেনে। সিঁড়ি লাগোয়া দেয়ালটি আঁকড়ে রেখেছে বিশাল নিয়ন সাইন। তাতে মনোমানবীর ডিগ্রীফিগ্রী-কৃতিত্ব-যোগ্যতার ফিরিস্তি খোদাই করা। সবচে’ ওপরে অস্বাভাবিক বড়বড় ফ্লোরোসেন্ট হরফে মনোমানবীর নাম। গাড়ির হেডলাইটের আলোয় সেগুলো জ্বলে জ্বলে উঠছিল। বৃষ্টির সঙ্গে বাতাসের ছাঁট আরো বেড়েছে। রাস্তায় নামে অনুপম। মুহুর্তের ঝলকে মনোমনোমানবীর নামটি একবার চোখে পড়েছিল। আশ্চর্য! মুহূর্তপর এখন আর কোনোভাবেই নামটি মনে পড়ছেনা।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন