বৃহস্পতিবার, ১৫ ডিসেম্বর, ২০১৬

মাহবুবুর রশীদের টুকরো কথা


শীতের সকালে টাংগাইলের দেলদুয়ার উপজেলা ডাকঘরের সামনে দাঁড়াতেই দেখি পাশের চা-দোকানের ঝাঁপ খুলেছে, জ্বলন্ত উনুনে চড়ানো কড়াইতে টগবগ করে ফুটছে গোরুর খাঁটি দুধ, ঘন হয়ে সামান্য মালাই তৈরি হয়েছে, দেখে লোভ সামলানো দায় হয়ে পড়ে, আলগা কাঁচা পাতি যোগ করে ফাসকেলাস করে এক কাপ চা বানানোর জন্য অনুরোধ করি আপাদমস্তক শাল গায়ে জড়ানো শীতে জবুথবু দোকানিকে। তার কম্পমান হাত আস্তে ধীরে যত্ন করে চা বানিয়ে হাতে তুলে দেয়। স্বর্গে চা পাওয়া যাবে কী না তার কোন নিশ্চয়তা নেই, কিন্তু এই চা-এর কাপে চুমুক দিয়ে দিনের প্রথম সিগারেটে যখন টান দিই ইহজগতই স্বর্গ হয়ে ওঠে। মন্ত্রী আসবেন, ডাকঘরে পোস্ট ই-সেন্টার উদ্বোধন করবেন, তাই প্রস্তুতির দেখভাল করতে দেলদুয়ার যাওয়া, নতুন করে রঙ চড়ানো হয়েছে বলে পাশের লেটার বক্সটাকে অমন ঝকঝকে দেখাচ্ছে।

উচ্চমাধ্যমিক শ্রেণিতে প্রথম বর্ষের ছাত্র ছিলাম যখন, সন্তোষ কুমার ঘোষের সম্পাদিত ঐ সময়কার চার কথাসাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, মতি নন্দী, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় এবং শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের 'নির্বাচিত গল্প' নামের চারটা বই প্রকাশ পেয়েছিল। এরা প্রত্যেকেই বাংলা কথা সাহিত্যের এক একজন দিকপাল, কিন্তু 'উজান'সহ অনেক লেখাতেই ঘুরেফিরে তাঁর ময়মনসিংহের ছেলেবেলার স্মৃতিকে ঠাই দিয়েছেন বলে শীর্ষেন্দুর প্রতি আমার পক্ষপাত একটু বেশি। 'নির্বাচিত গল্প' গ্রন্থে পড়েছিলাম তাঁর 'তোমার উদ্দেশে' নামের গল্পটি, সেই গল্পের নায়িকার বাসার ছাদে ছিল শ্বেতপাথরের এক অনিন্দ্যসুন্দর পরীমূর্তি, আর দেয়ালের বাইরে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে এক রংচটা জরাজীর্ণ লেটারবক্স। রোজ গভীর রাতে পরীমূর্তির প্রাণের সঞ্চার হত, উড়ে এসে লেটারবক্সটির সাথে সারারাত গল্প করে আবার স্বস্থানে ফিরে যেত। পড়ে এতটাই আচ্ছন্ন হয়েছিলাম যে, নিজেকেই সেই লেটারবক্স বলে ভেবেছি অনেককাল!

সময় খুব পরিহাসপ্রিয়, আমাকে জুটিয়ে দিয়েছে ডাক বিভাগের চাকুরি, আর শীতের সকালে কোট-টাই পরিয়ে এনে দাঁড় করিয়েছে ঝকঝকে লেটারবক্সের পাশে। তাতে কি জরাজীর্ণ চেহারাটা আড়াল করা গেছে? কে জানে!

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন