বৃহস্পতিবার, ১৫ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রশান্ত মৃধার আলোচনা - ছোটগল্পের হুমায়ূন আহমেদ

হুমায়ূন আহমেদের প্রায় অগণ্য উপন্যাসের পাশে এক কোনায় ম্রিয়মাণ আলোর সর্বস্বতা নিয়ে হেলে থাকে গল্পসমগ্র। এ বড় অবাক কাণ্ড! বাংলা কথাসাহিত্যে যাঁরাই গল্প-উপন্যাস লিখেছেন, একেবারে অসাধারণ ব্যতিক্রম ভিন্ন প্রত্যেকেরই গল্পের সংখ্যা উপন্যাসের চেয়ে অনেক বেশি। এমনকি যে লেখকদের পরিচয় শুধু ঔপন্যাসিকই, পার্বণে প্রয়োজনে, প্রকাশকদের অগ্রাহ্য দাবির মুখে যাঁরা উপন্যাস লিখে গেছেন, তাঁদেরও গল্পসংখ্যা উপন্যাসের চেয়ে বেশি। এ ক্ষেত্রে হুমায়ূন আহমেদের বেলায় যেমন, তাঁদের ক্ষেত্রেও তাই। তাঁরা লিখেছেন গল্প, লিখেছেন সাময়িক পত্র ও সাহিত্য সাময়িকীর সম্পাদক মহাশয়দের চাপে। সেই চাপেও গল্পের সংখ্যা তাঁর উপন্যাসের সংখ্যাকে অনায়াসে ছাড়িয়ে গেছে।

তাই হুমায়ূন আহমেদের ‘গল্পসমগ্র’ হাতে নিয়ে বারবার বিস্ময় এর পৃষ্ঠায় নুয়ে পড়ে। গল্প এক শরও কম (হয়তো সর্বশেষ সংস্করণে আরো কিছু বাড়তে পারে) আর উপন্যাস! সে সংখ্যার হিসাব এই মুহূর্তে অপ্রয়োজনীয়। কিন্তু সংখ্যার বিস্ময়, গল্প-উপন্যাসের সংখ্যার তুলনা তো উঠত এই জন্য, ছোটগল্প লেখক হিসেবে হুমায়ূন আহমেদের অনায়াস সিদ্ধি। সে জন্যই আফসোস, কী হতো এ দেশের সাহিত্য সাময়িকী পত্রের সম্পাদকমণ্ডলী তাঁর কাছে আরো গল্পের তাগিদ দিলে, সম্পাদকদের সেই অনুরোধ তিনি রক্ষা করতেন কী করতেন না সেই প্রশ্ন পরে। কিন্তু তাঁর গল্পের এই সংখ্যা অন্তত বলে দেয়, প্রকাশক ও পার্বণি কাগজ (ঈদ সংখ্যা) তাঁর কাছে অক্লান্তভাবে উপন্যাসের দাবি জানিয়েছে, তিনি তা মিটিয়েছেন। কিন্তু দৈনিকের বিশেষ সংখ্যায় তাঁরা তাঁকে একই তাগিদ দিলে হয়তো গল্পের সংখ্যা বাড়ত। হুমায়ূন আহমেদের গল্পসমগ্র হাতে নিলে, দীর্ঘকাল, অন্তত ত্রিশ বছর, তাঁর গল্পের পাঠক হিসেবে এই তুলনা হঠাৎ লতিয়ে ওঠে।

ছোটগল্পের যে আঁটসাঁট গঠন, প্রায় কোথাও ঔপন্যাসিক-গদ্যের কোনো প্রকার বিস্তারে যাওয়ার সুযোগ নেই, যদি একটি সাহিত্যমাধ্যম হিসেবে ছোটগল্পের গঠনের প্রাথমিক ‘মান্য’ কায়দাটার কথা মনে রাখি, তাহলে সেই কৌশল একেবারে শুরু থেকেই হুমায়ূন আহমেদ রক্ষা করেছেন। অথবা বলা যায়, এটি তাঁর প্রধান কৌশল। কথা কত কম বলা যায়। কত কম বলে লক্ষ্যে পৌঁছানো যায়। বর্ণনার কৌশলে কতটা মন্তব্যহীন আর থাকা যায় প্রায় নির্লিপ্ত। এমনকি সংলাপের ক্ষেত্রেও, গল্পের কাহিনীর প্রয়োজনে, গল্পের গন্তব্যমুখে যেতে প্রয়োজনীয় সংলাপটিই শুধু। যদিও কোনো কোনো গল্পের কাহিনী তাঁর কোনো কোনো উপন্যাসের বীজ। কখনো কখনো ওই গল্পের নামেই পরবর্তীকালে একটি উপন্যাসও লিখেছেন। তখন দেখা গেছে, সেই উপন্যাসটি হয়তো ওই গল্পের কাহিনীর চুম্বক অংশই মাত্র ধারণ করে আছে, বাকিটুকু কাহিনীর বিস্তার। এটি ঘটতেই পারে, তারাশঙ্কর থেকে কায়েস আহমেদ পর্যন্ত বাংলা কথাসাহিত্যে এমন ঘটনা ঘটেছে।

সেটুকু পাশে সরিয়ে রাখলে, একেবারে শুরু ‘নন্দিত নরক’, ‘শঙ্খনীল কারাগার’ থেকেই হুমায়ূন আহমেদের বলয় ছোটগল্পের বিপরীতমুখী। সোমেন চন্দর ‘ইঁদুর গল্প’ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে লিখে ফেলেছেন তিনটি বড়গল্প বা ছোট উপন্যাস। সেই কলমেই যখন একটি নির্দিষ্ট আয়তন মেনে গল্প লিখতে শুরু করেছেন, তখন কলমের উপন্যাস কি বড়গল্প রচনার ঝোঁককে এখানে রূপান্তর করেছেন দারুণ সফলতায়। ফলে তাঁর ছোটগল্পের পাঠক হিসেবে কোনোভাবে ভোলা যায় না। ‘খাদক’, ‘সাদা গাড়ি’, ‘শ্যামলছায়া’, ‘জলিল সাহেবের পিটিশন’, ‘মন্ত্রীর হেলিকপ্টার’, ‘মৃত্যুগন্ধ’, ‘চোখ’ অথবা ‘ইতর’-এর মতো গল্প।

সমকাল সব সময়ই গল্প লেখকের এক বড় দায়! ঔপন্যাসিক সেই দায়ে সব সময় ভোগেন না। অথবা বাংলা গল্প বাংলা উপন্যাসের তুলনায় সব সময়ই অনেক বেশি সমকালমুখী। আবার গল্প লেখক গল্পে যতটা ব্যক্তিকে রেখে তার আশপাশে সমকালের সংকটে স্থাপিত হতে পারেন অর্থাৎ ওই সমকালীনতার ভেতরে ব্যক্তি, ঔপন্যাসিকও সেটি পারেন না।

‘সাদা গাড়ি’র সাব্বির, ‘জলিল সাহেবের পিটিশন’-এর জলিল সাহেব, ‘খাদক’-এর খাদক মতি, ‘মৃত্যুগন্ধ’র বাসেত ও ডাক্তার, ‘চোখ’-এর ডাকাত, ‘ইতর’ (স্মৃতি থেকে এখন পর্যন্ত কোনো সংকলনে গল্পটা দেখিনি)-এর শারীরিকভাবে পঙ্গু লোকটিও তার স্ত্রী। এই কথাগুলো বলার পরে, মনে হতে পারে, এখানে তো গল্পের চরিত্রদের কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু একটু আগেই তো বলা হয়েছে, ছোটগল্পের পরিসরে ব্যক্তির ওই বিকাশের সুযোগ যেমন থাকে না, সে কাজটিও হুমায়ূন আহমেদ করেননি। কিন্তু ওই চলমান সময়ের সঙ্গে ব্যক্তি তার স্থান ও ভূগোল নিয়ে তীব্রভাবে উপস্থিত!

জলিল সাহেবের দুই ছেলে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ। কিন্তু সেটি তাঁর কাছে কোনো বিষয় নয়। বিষয় ত্রিশ লাখ মানুষের গণহত্যা। সে জন্য মুক্তিযুদ্ধের পরপরই সারা দেশে স্বাক্ষর সংগ্রহ করার উদ্যোগ তাঁর। বয়সী শরীরে সেই কাজটি করছেন। কিন্তু পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত অন্য অনেকেরই স্বাক্ষর না দেওয়ার ইচ্ছা কিংবা জলিল সাহেবের দুই ছেলের বিনিময়ে পরিত্যক্ত বাড়ি তাকে দেওয়ার কথাও ওঠে। আবার ধনীর ছেলে সাব্বির। যার পরিবারের কেউ-ই ত্রিশ বছরের বেশি বাঁচে না। বাপ-মায়ের কড়া নজরে থাকে। বাইরে বের হয় একটা সাদা গাড়ি নিয়ে। এই গাড়িতে সাব্বির গল্পের উত্তমপুরুষকে অনুসরণ করে। কিংবা ‘চোখ’ গল্পে একটু পরে যে ডাকাতের চোখ তোলা হবে, পাঠকের স্নায়ুতে যে চাপ পড়তে থাকে, ডাকাত অপেক্ষা করছে কখন তার চোখ তোলা হবে। এই নির্লিপ্ততা। আবার ‘মৃত্যুগন্ধ’-এর বাসেত যে মানুষের শরীরে মৃত্যুর আগাম গন্ধ পায়, আর বুঝতে পারে লোকটি কখন মারা যাবে। কিংবা নীলক্ষেত বস্তিতে থাকা একটি পরিবার, স্বামী দুর্ঘটনায় প্রায় অচল, বউটি একদিন সঙ্গে করে একজন খদ্দের নিয়ে আসে, আর লোকটি তখন তাদের ছেলেটাকে নিয়ে বস্তির বাইরে ঘুরতে যায়।

ঔপন্যাসিক হুমায়ূন আহমেদ যেখানে সাধারণ মধ্যবিত্ত নাগরিক, কখনো গ্রামীণ কখনো আধানাগরিক জীবনই তাঁর কাহিনী কথনে বেছে নিয়েছেন, সেখানে সেই জীবনেরই পাশাপাশি আপাত তুচ্ছ জীবন, তুচ্ছ ঘটনা, একেবারেই চোখে না পড়াকে দিনযাপনেরই অংশ করে তুলেছেন গল্পে। সেটিই স্বাভাবিক। বাংলা ছোটগল্পের সাধারণ উত্তরাধিকারই তাই। কিন্তু যারা তাঁর উপন্যাস ও বড়গল্পের পাঠক, সে হুমায়ূন আহমেদকে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই কাহিনী-পাঠকের ভেতর দিয়ে ‘নির্মল মনোরঞ্জনকারী’ হিসেবে মনে রাখে, তাদের কাছে তাঁর ছোটগল্প একটু কষা আর তীব্র! সেখানে গল্পের লেখন কৌশলে যেমন ফাঁক নেই, গদ্যের চলনে চোখ তোলা যায় না, আপাত প্রাপ্তি নেই, একই রকমভাবে প্রতিদিনের জীবনযাপনে চোখে না পড়াটা চোখে পড়ায়। এমনকি একটু তলিয়ে ভাবলে, একটি গল্প লেখার সময়ে লেখক হিসেবে তাঁর অন্তর্গত প্রস্তুতিও বুঝে নেওয়া যায়।

এই কথাগুলো ভাবনায় বলকে উঠতে উঠতেই ঔপন্যাসিক হুমায়ূন আহমেদের অতিপ্রজতার পাশে গল্পকার লেখক হুমায়ূন আহমেদের (প্রায়) বিরলপ্রজতার কথা মনে আসে। মনে হয়, ছোটগল্প কখনোই হুমায়ূন আহমেদের পূর্ণ মনোযোগ পায়নি; আরো অনেক ধরনের গদ্য রচনার পাশাপাশি ছোটগল্প তাঁর এক প্রকার পার্শ্বরচনা। জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক কখনো কখনো লিখেছেন গল্প। ছোটগল্প উপন্যাসের মতো পাঠকপ্রিয় মাধ্যমও নয়। কিন্তু সেই মাধ্যমটিতে তাঁর আরো শ্রম ও মনোযোগের কথা তোলা যায়, তা তো ওই মাধ্যমে তাঁর সাফল্যের জন্য। বাংলা সাহিত্যের এই কনিষ্ঠ সন্তান গদ্য লেখকদের একনিষ্ঠ মনোযোগ ছাড়াই কবিতার পরে সবচেয়ে শিল্পসফল! সেখানে এতখানিক আফসোসের পরে হুমায়ূন আহমেদের যে সফলতা বিরাজমান, তাতে তাঁর কয়েকটি ছোটগল্পের কাছে বারবার ফিরে যাওয়া যায়। তাঁর গল্পসমগ্র পড়া যায় যেকোনো সময়!

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন