বৃহস্পতিবার, ১৫ ডিসেম্বর, ২০১৬

রবিশঙ্কর বলের গল্পের ভূবন : লেখা একটি প্রবৃত্তিগত প্রক্রিয়া, যার মানচিত্র অস্পষ্ট

গল্পপাঠ—
গল্প লিখতে শুরু করলেন কেন? 

রবিশঙ্কর বল—
আর্জেন্তিনার কবি পিজারনিক—মাত্র ছত্রিশ বছর বয়সে এই মহিলা আত্মহত্যা করেন ১৯৭২-এ—একটি কবিতায় লিখেছিলেন, ‘I can not speak with my voice, so I speak with my voices’ তো এই কণ্ঠস্বরগুলি কার—কাদের-আমার ভিতরে কারা কারা কথা বলে? তাদের গল্পই কি আমি লিখতে চাইনি? তবু বলা যাক,’ কেন গল্প লিখতে শুরু করলাম’ এ-প্রশ্নের উত্তর আমার কাছে স্পষ্ট নয়। কেন? যদি জানতাম, তাহলে কি আর গল্প লিখতাম? হোর্হে লুইস বোরহেস শেষ সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘My only destiny is literary.’ একটুও বাড়িয়ে না বললে, এটাই সবচেয়ে স্পষ্ট উত্তর। লেখা একটি প্রবৃত্তিগত প্রক্রিয়া, যার মানচিত্র অস্পষ্ট।



গল্পপাঠ—
শুরুর লেখাগুলো কেমন ছিল? 

রবিশঙ্কর বল—
আমি নিজস্ব এক কণ্ঠস্বর খুঁজছিলাম, তখন। তারপর বুঝতে পারলাম—নিজস্ব কণ্ঠস্বর বলে কিছু নেই। তো, শুরুর দিনগুলোর গল্পও সেরকম ছিল—এক ধরনের illusion—নিজস্ব হওয়ার illusion। এই নার্সিসাস বৃত্তিকে ধীরে ধীরে মেরে ফেলতে হয় বা ঝরে যায়।


গল্পপাঠ—
গল্প লেখার জন্য কি প্রস্তুতি নিয়েছেন? নিলে সেগুলো কেমন? 

রবিশঙ্কর বল—
হাঁটতে শেখার জন্য যেমন প্রস্তুতি লাগে, তার বেশি কিছু নয়। টলতে টলতে শেখা। এ-বাদে কিছু বলতে হলে বানিয়ে বলতে হয়, মানুষ যেমন বয়স হলে তার স্মৃতিকে বানিয়ে তোলে।


গল্পপাঠ—
আপনার গল্পলেখার কৌশল বা ক্রাফট কি?

রবিশঙ্কর বল—
কৌশল বা ক্রাফট তো আলাদা কিছু নয়, যাকে বর্মের মতো খুলে দেখানো যায়। আমার কথা বলা, স্বপ্ন-দুঃস্বপ্ন, কামনা-বাসনা, নানা চরিত্রের সঙ্গে বেঁচে থাকা অস্তিত্বের ভঙ্গুরতা ও ভয়—এসবই কাহিনী ও ক্রাফট; জড়িয়ে –মাড়িয়ে, যেন মৃতের শেষ-শ্বাস ত্যাগ।


গল্পপাঠ—
আপনার নিজের গল্প বিষয়ে আপনার নিজের বিবেচনা কি কি? 

রবিশঙ্কর বল—
ফ্রানস কাফকা যেমন বলেন, নিজের চামড়ার ওপর লেখা, কাফকার একটি অ্যাফরিজম আমাকে অদৃশ্য শক্তির মতো টানতে থাকে। ১৯১৭-’১৮-তে জুরাউ-তে থাকার সময় লিখেছিলেন, “It isn't necessary that you leave home. Sit at your desk and listen. Don't even listen, just wait. Don't wait, be still and alone. The whole world will offer itself to you to be unmasked, it can do no other, it will writhe before you in ecstasy.’’

গল্পপাঠ—
আপনার আদর্শ গল্পকার কে কে? কেনো তাঁদেরকে আদর্শ মনে করেন? 

রবিশঙ্কর বল—
সোমদেব, আরব্যরজনীর গল্পবলিয়েরা, বোক্কাচিও, গোগল, লেসকভ, বু্লগাকভ।
রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ, বিভূতিভূষণ, অংশত মানিক, জগদীষ গুপ্ত, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, মতি নন্দী, দেবেশ রায়।
কাফকা, বোরহেস, মার্কেস, সিলভিয়া প্লাথ, ইতালো কালভিনো, সাদত হাসান মান্টো, ইনতিজার হুসেন, নাইয়ের মাসুদ।
আর অবশ্যই কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাদেব।
তারা আমার ‘আদর্শ’ বা আইডিয়াল নন। আমি তাঁদের সঙ্গেই বাঁচি।


গল্পপাঠ—
কার জন্য গল্প লেখেন? আপনি কি পাঠকের কথা মাথায় রেখে লেখেন? লিখলে কেনো লেখেন? আর যদি পাঠকের কথা মনে না রেখে লেখেন তাহলে কেনো পাঠককে মনে রাখেন না লেখার সময়ে?

রবিশঙ্কর বল—
আমার পাঠক শব্দ দিয়ে তৈরি। তার সঙ্গে সংলাপ চালাতে-চালাতে আমি লিখি। আমার মনে হয়, প্রত্যেক লেখকেরই এমন কল্পিত পাঠক আছেন। রক্তমাংসের পাঠককে কি আমরা চিনি? লেখার কোনো সামাজিক দায় আছে বলে আমি মনে করি না।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন