বৃহস্পতিবার, ১৫ ডিসেম্বর, ২০১৬

ছোটগল্পের ছুটগল্প, মুলধারার সিনেমায়, একবিংশে



হেলাল মহিদীন



“পৃথিবীর মানুষ দুই পদের। এক, গ্রীক। দুই, যারা গ্রীক হয়ে উঠতে মরিয়া”

অথবা

“সংসারে পুরুষ যদি হয় মাথা, তা’হলে নারী হচ্ছে গর্দান যে মাথাকে যেদিকে ইচ্ছা সেদিকেই ঘুরাতে পারে”


এ’রকম কৌতুককর, বুদ্ধিদীপ্ত, রসালো ও মজাদার চিন্তা জাগানিয়া সংলাপে ভরপুর সিনেমাটির নাম ‘মাই বিগ ফ্যাট গ্রীক ওয়েডিং’ (২০০২)। পারিবারিক কমেডি। গ্রীকরা ভালবাসায় ভরপুর পরিবার ও সামাজিকতাপ্রধান জাতি। বাঙ্গালিদের মতই। বিয়ে অনুষ্ঠানকালে তো বটেই এমনি এমনিও কাছে দুরের আত্মীয়-স্বজন প্রতিবেশিদের নিয়ে হৈচৈ হল্লাবাজিতে মেতে থাকার ঐতিহ্য আছে গ্রীকদের! কথায় কথায় “আমরা গ্রীক” বলে গর্বে ছাতি ফুলিয়ে চলার ঐতিহ্যও আছে। এটি উন্নাসিকতা বা আত্মম্ভরিতা নয়। বরং স্বজাতিপ্রেম এবং প্রাচীন ঐতিহ্যের প্রতি গ্রীক অভিবাসীদের সুগভীর মায়ার স্মারক। এজন্য বলা হয় গ্রীকরা কোথাও অভিবাসী হয়না, গ্রীসকে বগলদাবা করে এদিকে সেদিকে নিয়ে চলে যায়।

সংক্ষেপে সিনেমার গল্পটি এমন— আমেরিকায় এক গৃহসুখময় গ্রীক অভিবাসী পরিবারের এক তরুণী একজন অ-গ্রীক এর প্রেমে পড়ে। গভীর প্রেম। পরিবারের্ অমতে সে বিয়ে করবে না বলে অ-গ্রীক প্রেমিক প্রবরকে পরিবারের সবার সঙ্গে পরিচয় করাতে নিয়ে আসে। মেয়ের জন্য বাবার সীমাহীন আদর। তবুও পরিবারকর্তা বেঁকে বসলেন যে অ-গ্রীক এর কাছে মেয়ের বিয়ে দেয়া যাবেনা। এমন বিয়ে যে ঐতিহ্যের বরখেলাপ! এই নিয়ে সব মজাদার কীর্তিকান্ড।

গল্প হিসেবে এমন কিছু আহামরি নতুন বা মগজে তুফান বইয়ে দেবার মত চমক নেই। যেটি আছে তার নাম প্রাণরসের গল্প বলার তরতর প্রবাহমান টেকনিক। নিজের কৃষ্টি-ঐতিহ্যকে বুকের গহন গহীনে আঁকড়ে ধরেও ভিনদেশে অভিবাসীর মানিয়ে চলার, এগিয়ে চলার, পরিবার আঁকড়ে-আগলে রাখার, ভালবাসার জগত গড়ার, বিশ্ব নাগরিক হয়ে উঠার গল্প। দর্শক ছবিঘর হতে বেরিয়ে যে স্মৃতিটি মাথায় নিয়ে বেরুবেন তা দীর্ঘদিন মগজ জুড়ে থাকবে সত্যিকারের জীবনদৃশ্যের মত। যে সিনেমা দর্শককে ক্যামেরা মুভমেন্ট, লাইট, সম্পাদনা এট-সেটা ইত্যাকার সব টেকনিক্যাল বিষয়গুলো কেমন ছিল কেমন ছিলনা ভুলভালগুলো কি কি ছিল কি ছিলনা ধরণের চিন্তার দিকে যেতেই

দেয়না সেই সিনেমার গল্প বলাটা বেশ কাজের হয়েছে বলতে হবে। 






একটি গল্প যে দৃশ্যচিত্র এবং কথনচিত্র উভয় বিচারেই বিশ্বজনীন মানবিকতার অনবদ্য বার্তা হয়ে উঠার ক্ষমতা রাখে তার প্রামান্য দলিল “নো ম্যানস ল্যান্ড” সিনেমাটি। এটি ২০০১ সালের বিদেশি ক্যাটেগরিতে অস্কার পাওয়া বসনিয় সিনেমা। ‘ইন্টেন্স সাস্পেন্স ড্রামা’ বা টানটান নাটকীয় উত্তেজনার সিনেমা বলে যে প্রকরণ তা ছাড়িয়েও সিনেমাটি ভিন্ন মাত্রার অনন্যসাধারণ মৌলিক গল্পকথন-দৃশ্যায়নের প্রতীক। 

কোনো নির্মাতা ছোটগল্পের আইডিয়া, কথনভঙ্গিও আবহ নিয়ে কালোত্তীর্ণ, মানোত্তীর্ণও শিল্পোত্তীর্ণ সিনেমা বানাতে গেলে ‘নো ম্যান্স ল্যান্ড’কে অতুলনীয় একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচনা করবেন নিশ্চিত। যাই হোক সিনেমাটির প্রেক্ষাপট ১৯৯৩ সালের বসনিয়া হারজেগোভিনা যুদ্ধ। গল্পের মূল চরিত্র তিনটি, যদিও একটি চতুর্থ সাংবাদিক চরিত্র আছে। নো ম্যানস ল্যান্ডে ট্রেঞ্চ-এ আটকা পড়া বিবাদমান দুই পক্ষ—একজন আহত বসনীয়াক এবং আরেক সার্ব সৈন্য। তাদের উদ্ধার পেতে হলে তৃতীয় পক্ষ বা জাতিসঙ্ঘ ছাড়া উপায় নাই। কারণ দুই ধারে দুই পক্ষই পরস্পরকে অ্যাম্বুশের জন্য তৈরি এবং এখানে কোনো সেনা উপস্থিতি টের পেলেই হামলা শুরু হবে। এজন্য মাথা তোলাও অসম্ভব। জাতিসঙ্ঘের যে কনভয় আছে তা কাউকে উদ্ধারের জন্য নয়, বরং মানবিক সহায়তার জিনিশপত্তর— খাবারদাবার, ওষুধপথ্য এগুলোকে পাহারা দিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য।

গল্পের অনবদ্য সৃষ্টি তৃতীয় চরিত্রটি। চরিত্রটি এক আহত বসনিয়াক সৈন্যের। সার্বীয়রা তাকে মানব-বর্ম বানিয়ে একটি জীবন্ত মাইনের উপর শুইয়ে রেখে গেছে। তার নাম চেরা। মানব-ডিটনেটর। সে সামান্য নড়াচড়া করলেই মাইনটি বিষ্ফোরিত হবে। এই অসামান্য আইডিয়াই সিনেমাটির গল্প-কল্পনার প্রাণ। দুই বিবাদমান সৈন্যের যুদ্ধ শুরুর জন্য একজনের অপরজনকে দোষারোপ, আবার বেঁচে থাকার প্রয়োজনে সাহায্য, বাঁচার আকুলতা, চেরাকে বাঁচানোর দায়, পরিবার-সন্তানের ভালবাসা, মানবিক বিপর্যয়ের বৈশ্বিক বোধ কি উঠে আসেনি এই মঞ্চধর্মী উপস্থাপনায়! সিনেমা হতে গেলে শিল্পের ব্যকরণ হতে শুরু করে চোখ-কান ইন্দ্রিয়কে বিশ্বাস করানোর জন্য যা কিছু প্রয়োজন হয় কোনোটিরই কমতি নেই সিনেমাটিতে।




ইটালির ‘লা ভ্যিতা ই বেলা’ ‘লাইফ ইজ বিউটিফুল’ ১৯৯৭ সনের সিনেমা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় রবের্তো নামের এক সহজ সরল হাস্যরসপ্রিয় ইহুদি বইবিক্রেতা হলোকস্টের শিকার হয়। স্ত্রীকে অন্য নারীবন্দীদের সঙ্গে সরিয়ে ফেলার পর শিশুপুত্রটিকেও তার সঙ্গে একই কয়েদখানায় নিয়ে যাওয়া হয়। যুদ্ধের ভয়াবহতা, শাস্তি-নিগ্রহ ও অমানবিকতা যাতে শিশুটিকে স্পর্শ না করতে পারে সে’জন্য অসহায় পিতা শিশুটিকে একটি বানোয়াট গল্প শোনায়। শিশুটি্ একটি বড় খেলনা ট্যাংক পেতে চাইত। এই সুযোগটি নিয়ে রবের্তো তার পুত্রের জন্য গল্পটি ফাঁদে— সে এবং অন্য বন্দীরা যেসব কষ্ট-পরিশ্রম করবে সেসব আসলে কিছুনা, শুধুই খেলা। খেলার নানা লেভেল আছে। সহজ-কঠিন-খুব কঠিন ইত্যাদি। সব লেভেল-এ অনেক অনেক পয়েন্ট। সবচেয়ে বেশি পয়েন্ট যে পাবে সে-ই সবচেয়ে বড় খেলনা ট্যাংকটি জিতবে। বাবার নিখুঁত অভিনয় ধরতে না পারা শিশু শাস্তি-নিগ্রহগুলোকেই সত্যিকারের ‘খেলা চলছে পয়েন্ট জমছে’ বলেই বিশ্বাস করে। এদিকে চোরাগোপ্তা উপায়ে স্ত্রীকে পেতে গিয়ে রবের্তো গুলিবিদ্ধ হয়ে মরে যায়। সেদিন অক্ষশক্তিরও হার হয়।
 

এই ছবির শেষ দৃশ্যটিই সম্ভবত পৃথিবীর সর্বকালের সেরা হৃদয়গ্রাহী দৃশ্য। একটি বড় সত্যিকারের ট্যাংক আস্তে আস্তে শিশুটির সামনে চলে আসে। রাস্তার মাঝ বরাবর দাঁড়িয়ে থাকা শিশুটি আনন্দে চিৎকার করে উঠে— আমরা খেলায় জিতেছি। সে ধরে নেয় এই ট্যাংকটি তার বাবার অনেক লেভেলে খেলে চলা, পয়েন্ট কামানো আর পরিশ্রমে জেতা বড় খেলনা।


৩ক

পাদটীকা হিসেবে বলি সিনেমা কেই বা না দ্যাখে? দ্যাখে সবাই কিন্তু কিছু দর্শক আগ্রহ নিয়ে দেখে, কিছু দর্শক শুধুই দেখার জন্য দেখে। যে সব দর্শক শুধুই দেখার জন্য দ্যাখে তাদের মধ্যেও যে সিনেমাটি আগ্রহ তৈরি করে ফেলতে পারে, ছবিঘর হতে বের হবার পরও লম্বা সময় ঘোরে অভিভূত করে রাখতে পারে, দর্শক একে ওকে ধরে যেচে ‘অমূক বইটা দেখে এসো’ বলে সেটিই সিনেমা। হ’তে পারে শিল্পবোদ্ধাজনের দৃষ্টিতে সেটি আবর্জনা, কিন্তু আমজনের দৃষ্টিতে রত্নভান্ডার। নইলে বাজারে প্রতিদিন এত সিনেমা নামত না।

যে যাই বলুক গল্পের সিনেমা কিন্তু সবার জন্য নয়, ছোটগল্প যেমন সবার জন্য নয়। যাদের শিল্প-সাহিত্য-সংগীতসহ মানবজীবনের সুকুমার বৃত্তিগুলোকে নিয়ে, গভীর-গুঢ় মনোসামাজিক সম্পর্ক বা মানবিক দ্বন্দ্ববিন্যাস নিয়ে বিশেষ ভাবনাচিন্তা মাথাব্যাথা নাই তাদের জন্য হয়ত নয়। বিষয়টি যোগাযোগের সমস্যা। তত্ত্বীয় আলোচনা দিয়ে লেখাটি ভারি না করে সহজ রাখতে চাই।

এই আলাপটির উদ্দেশ্য প্রবন্ধলিখন নয়, তুলনামূলক শিল্পততত্ত্বের আলোচনার ছুতায় গাদাগাদা সাহিত্যিক, গল্পকার, পরিচালক, প্রাবন্ধিক গবেষকের নাম-ধাম পাদটীকা পৃষ্ঠা টেনে পাঠককে বিপদে ফেলাও উদ্দেশ্য নয়। বরং যারা ছোটগল্প এবং চলচ্চিত্র দু’টি মাধ্যমেই আগ্রহবোধ করেন, তাদের মধ্যে ছোটগল্প ও চলচ্চিত্রের সম্পর্কের একটি রূপরেখা নিয়ে ভাব বিনিময় শুরু করা। ব্যক্তিগতভাবে একবিংশের চলচ্চিত্রেই বেশি বেশি নজর রাখার সুযোগ হয়েছে বলেই বিংশ শতকের একেবারে শেষ হতে শুরু করে বর্তমান সময়ের চলচ্চিত্রগুলোর কয়েকটিকে আলোচনায় এনেছি। এটি কোনো পূর্ণাংগ আলোচনা নয়, বরং কয়েকটি উদাহরণ তুলে ধরার অসম্পূর্ণ চেষ্টা মাত্র।




শেষ দৃশ্যে পৌছে অনুভূতিশীল দর্শকের বজ্রাহত, স্তম্ভিত হবার মত আরেকটি সিনেমা ২০১১ সালে বিদেশি ক্যাটেগরিতে অস্কার জেতা ইরানি ছবি “অ্যা সেপ্যারেশন”। গল্পটি আমাদের নৈমিত্তিক যাপিত জীবনে পারিবারিক সম্পর্কসূত্রের দ্বন্দ্ব-টানাপোড়েনের নিদারুণ মনোবাস্তবিক ব্যবচ্ছেদ। পেশা, জীবনাভিলাষ ও প্রজন্মের দায়-দায়িত্বের মধ্যে কি প্রাধান্য পাবে তা নিয়ে দাম্পত্য সম্পর্কের দুরত্ব বা বিচ্ছেদে সন্তানদের অবস্থানের একটি মনোসামাজিক স্টেটমেন্ট ছবিটি। পারিবারিক আদালতে বিচ্ছেদ চাওয়া বাবা-মা’র নিজ নিজ ভাষ্য জানার পর কিশোরি কন্যাটির প্রশ্নোত্তর পর্বের পালা। বিচারক কিশোরির মনোভঙ্গি বুঝতে পেরে বাবা-মাকে বাইরে অপেক্ষা করতে পাঠান। তারপর কিশোরিকে জিজ্ঞেস করতে থাকেন সে কার সংগে থাকতে চায়। শেষমেশ কিশো্রীই প্রশ্ন করে—“আমাকে কি বলতেই হবে?” সুনির্মিত সিনেমাটির দেহ-মন-আত্মা্র পরশ যা দর্শকদের দেড়টি ঘন্টা আচ্ছন্ন করে রাখে, সবই যেন হূড়মুড় করে কিশোরির এই অনাদি-অনন্তের প্রশ্নোত্তরহীন জিজ্ঞাসার পায়ে হঠাতই হুমড়ি খেয়ে পড়ে। কি সহজ স্বাভাবিক সাবলিল সংক্ষিপ্ত জিজ্ঞাসার তিন চারটি বাক্যে এভাবে সমাজ-সংসার-সম্পর্ককে তুলে আনা এ’রকম সিনেমার বাইরে শুধু ছোটগল্পেই সম্ভব। সিনেমাটি ছোটগল্প নাকি একটি ছোটগল্পের সিনেমা এই প্রশ্ন অনেক চিন্তাশীল দর্শককে দীর্ঘদিন আচ্ছন্ন করে রাখবে সন্দেহ নেই।




মুম্বাইর হিন্দি এবং পশ্চিমবঙ্গের বাংলা চলচ্চিত্রে সাম্প্রতিক কিছু চমক জাগানো ছোটগল্প আঙ্গিকের কাজ আছে। ঋতুপর্ণ’র ‘রেইনকোট’ (২০০৪) এক বিশ্বমানের চলচ্চিত্র। ভংগিতে আবহে মেদবাহুল্যহীন ছোটগল্পের কথনভংগিকেও ছাড়িয়ে যায় ছবিটির বিষয়বস্তর বিশালত্ব। ভালোবাসার অনুভবের গভীরতা, সম্পর্কের রসায়ন, কালান্তরে আত্মপ্রবঞ্চনায় ভালবাসা অনুসন্ধান সমস্ত কিছুই একটি বৃষ্টিদিনের গল্পের ব্যঞ্জনায় বলে যাওয়ার মুন্সিয়ানায় সমৃদ্ধ রেইনকোট’ সিনেমাটি। কুলাঙ্গার স্বামীর ঘরে দারিদ্র-অনটন ও সোহাগ-ভালবাসাহীন নিস্তরংগ জীবনে অবরুদ্ধ নিরু মানু নামের যৌবনের ভালোবাসার মানুষটিকে হঠাত কাছে পেয়ে সুখ-সৌকর্যের মনগড়া গল্প বলে যায় নির্দ্বিধ শৈল্পিকতায়। গল্পে গল্পে দুই মানব-মানবীর হৃদয় স্পন্দনের শব্দও যেন দর্শকের কানে বাজে।৫

মুম্বাইর হিন্দি এবং পশ্চিমবঙ্গের বাংলা চলচ্চিত্রে সাম্প্রতিক কিছু চমক জাগানো ছোটগল্প আঙ্গিকের কাজ আছে। ঋতুপর্ণ’র ‘রেইনকোট’ (২০০৪) এক বিশ্বমানের চলচ্চিত্র। ভংগিতে আবহে মেদবাহুল্যহীন ছোটগল্পের কথনভংগিকেও ছাড়িয়ে যায় ছবিটির বিষয়বস্তর বিশালত্ব। ভালোবাসার অনুভবের গভীরতা, সম্পর্কের রসায়ন, কালান্তরে আত্মপ্রবঞ্চনায় ভালবাসা অনুসন্ধান সমস্ত কিছুই একটি বৃষ্টিদিনের গল্পের ব্যঞ্জনায় বলে যাওয়ার মুন্সিয়ানায় সমৃদ্ধ রেইনকোট’ সিনেমাটি। কুলাঙ্গার স্বামীর ঘরে দারিদ্র-অনটন ও সোহাগ-ভালবাসাহীন নিস্তরংগ জীবনে অবরুদ্ধ নিরু মানু নামের যৌবনের ভালোবাসার মানুষটিকে হঠাত কাছে পেয়ে সুখ-সৌকর্যের মনগড়া গল্প বলে যায় নির্দ্বিধ শৈল্পিকতায়। গল্পে গল্পে দুই মানব-মানবীর হৃদয় স্পন্দনের শব্দও যেন দর্শকের কানে বাজে।

দুঃখজনকভাবে নিতান্তই অনালোচিত একটি হিন্দি ছবি ইয়াথার্থ বা যথার্থ (২০০২)। এক হতদরিদ্র ডোম ও তার মাতৃহারা শিশুকন্যার বয়ঃসন্ধিতে পৌঁছার গল্প। ক্ষুধার তীব্রতা নিয়ে দু’জন মানুষ দিন শুরু করত একটি লাশ নিয়ে কেউ আসুক এই প্রার্থনায় এই প্রতীক্ষায়। কাউকে লাশের মত কোনো কিছু কাঁধে ব’য়ে আনতে দেখলে কন্যাটি আনন্দে ভুতগ্রস্ত নারীর মত উত্তুংগ নৃত্য করত। এই নৃত্য করা তার অভ্যাসে রূপ নেয়। কন্যাটি দ্রুতই শিশু হতে রজঃশীলা কিশোরি হচ্ছে। একদিন তার রজস্রাব হয়। অনভিজ্ঞ পিতার সন্তানের রজঃদিবসের অস্থির চিকিতসাচেষ্টা, কষ্টকাতরতা, অসহায়ত্ব, কন্যার মানসিক স্থিতির জন্য ব্যকুলতা, ভবিষ্যত নিরাপত্তার দুশ্চিন্তার অনন্যসাধারণ চিত্রায়ন দেখি। এরই মাঝে বহুদিন পর একটি লাশের দেখা মেলা। কন্যার পুণঃ ভুতনৃত্য শুরু হয়। ক্ষুধার কাছে সব অনুশাসন, রজঃশীলার জন্য সামাজিক মানবিক নিয়ম-বিধি তছনছ হয়ে ভেঙ্গে পড়ে।
 
‘লাঞ্চবক্স’ও (২০১৩) একটি মনকাড়া ছোটগল্পের মত সিনেমা বা সিনেমার ছোটগল্প। মুম্বাইয়ের দুপরের খাবার সরবরাহকারী টিফিন ক্যারিয়ার নেটওয়ার্ক-এর ভুলে একজন বিপত্নিক সাধারণ পেশাজীবীর কাছে একটি ভুল লাঞ্চবক্স চলে যায়। সেই লাঞ্চবক্সে করে প্রতিদিন আসতে থাকে কিছু চিঠি। সংসারধর্মে আটকা এক নারীর গভীর মনোজাগতিক হাহাকার আর শুন্যতার দীর্ঘশ্বাসগুলোর পাঠ নিতে নিতে বিপত্নিক লোকটি এবং সেই নারীর মাঝে সুগভীর হৃদয়বৃত্তিক সংযোগ ও মানবিক মমত্ববোধ গড়ে উঠে।


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন