বৃহস্পতিবার, ১৫ ডিসেম্বর, ২০১৬

স্ট্যান্ডিং রক ও লাল পিঁপড়ে : টার্কি ও ধন্যবাদের ঝুটা আখ্যান

নামিকা বন্দ্যোপাধ্যায়

নভেম্বরের চতুর্থ বৃহস্পতিবার। ভারত উপমহাদেশের নানারূপ বাসী ও ভারতে থাকা লম্বা ভারতবাসী, বেঁটে ভারতবাসী, রোগা ভারতবাসী, ওবীজ ভারতবাসী, demonetized ভারতবাসী, ভারত থেকে ও প্রতিবেশী দেশ, শহরতলী ও কানাগলি থেকে আমায় সমানে থ্যাংকস-গিভিং জানিয়ে চলেছেন। তাদের সবাই এর কাছে আমি ক্ষমাপ্রার্থী, একজন রাজনৈতিক মানুষ হিসেবে আমি এই শুভেচ্ছা গ্রহণে অপারগ। বাবা বা মা-দিবসের মত থ্যাংকস-গিভিং ও আর্চি-গ্রিটিং প্রসূত কোনও অপূর্ব দিবস বলে তাদের ধারণা হয়েছে বলেই মালুম। যেহেতু থ্যাংকস-গিভিং ভোজে টার্কি খাওয়া রীতি, তাই কেউ কেউ এক পা এগিয়ে আমায় টার্কির ছবি-টবিও পাঠিয়েছেন। আমি টার্কি খাইনা। আর দুইগুণ না-ঐতিহাসিক ওভারডোজ গেলা নিতান্তই না-মুমকিন।


আমেরিকান ইতিহাসের টেক্সট অনুযায়ী, সকলেই জানেন ইতিহাসে বলা হয়েছে মোটামুটি এইরকম-- নেটিভ ইন্ডিয়ানরা ছিলেন 'হিংস্র ও বর্বর' জাতি, ইয়োরোপ থেকে আসা সেটলাররা তাদের সভ্য করেছে, তাদের দেশে মহান জাতি আমেরিকানদের গড়ে তুলেছে। আর থ্যাংকসগিভিং এর ইতিহাস একইরকম অনুসারী। ভুলে ভরা অসত্য এই মিথটি হল--নেটিভ আমেরিকানরা প্লাইমাউথ পিলগ্রিম'দের আমেরিকায় তাদের প্রথম শীতকালটিতে বেঁচে থকার রসদ সরবরাহ করে বাঁচিয়ে দেন। তাদের নতুন জমি, পরিবেশে চাষের কলা-কৌশল শিখিয়ে দেন। তাই হেমন্তে, ফসল ঘরে উঠলে, পিউরিটানরা কৃতজ্ঞতা জানাতে নেটিভ আমেরিকানদের তিনদিন ধরে নিমন্ত্রণ করেন ও টার্কি উপহার দেন। সেই নাকি প্রথম থ্যাংকসগিভিং।

এই পিলগ্রিম শব্দটির ব্যবহারের ইতিহাসও ভালোরকম ঘোলাটে। ১৬২০ সালে ইংল্যান্ড থেকে মেফ্লাওয়ার নামের জাহাজে করে ইংরেজদের একদল এসে ওঠে কেপ কোড হারবারে। সেখানে প্লাইমাউথ বলে তারা এক কলোনি গড়ে তুলতে থাকেন। তাদের কাছে খাদ্য সংস্থানের জন্যে ছিল, গমের বীজ। পাহাড়ি রুক্ষ জমিতে তা ফললনা। এদিকে প্রচণ্ড শীতের সাথে মোকাবিলা করে বাঁচার দক্ষতা তাদের অজ্ঞাত। সত্যি ইতিহাস হোল-- নেটিভ আমেরিকান জনজাতিরা তাদের জাহাজ থেকে নামতে দেখে তাদের সাদর অভ্যর্থনা জানিয়ে খাদ্য দিয়ে সহায়তা করেছিলেন, যা তাদের সংস্কতির স্বাভাবিক প্রক্ষেপণ। এই মেফ্লাওয়ার জাহাজের দলটি ছিল প্রথম এদেশে'র প্রথম সেটলার। শাস্তি এড়াতে ইংল্যান্ড থেকে পালিয়ে এসেছিলেন। আর তাদের উনিশ শতকের টেক্সটে ডাকা হচ্ছে-- পিলগ্রিম নামে।


এই তথাকথিত 'পিলগ্রিমরা' উদয় হওয়ার ২০ বছরের মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশ নেটিভ ( মাসচুসেটস এর ) মানুষ ততদিনে মুছে যাবেন। আর তারও ৫০ বছরের মধ্যে প্রায় সবাই নিশ্চিহ্ন হবেন। তাদের মুছে ফেলতে ব্যবহার করা হবে- মারণ রোগের জীবাণু। এই পলিসির প্রবন্ধ-কমন নাম-- বায়োলজিকাল ওয়রফেয়ার। আর এই পিলগ্রিমদের নেটিভ আমেরিকানদের ভোজ খাওয়ানোর গল্পের সত্য পিঠটি হোল-- সেটলাররা এক কন্সট্যান্ট যুদ্ধের সম্পর্ক জারী রেখেছিলেন এই নেটিভ মানুষদের সাথে। সংগে ছিল হরেক নতুন অত্যচার উদ্ভাবন প্রকৌশল। সর্বোপরি বন্দুকের নল। ক্ষমতার উৎস। সেটলার কলোনিয়াজমের সেই ধাঁচা, যা সবচে দেখা গেছে তা হোল - যুক্তরাষ্ট্র, নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, ইজরায়েল/ প্যালেস্টাইন, কানাডা, আরহেন্তিনায়।

তাই 'ইন্ডিয়ান'দের কাছে থ্যাংকসগিভিং হোল শোক-পালনের পরিসর। অবমাননাকে স্মরণ করার পরিসর, যেখানে ফিরে গিয়ে লোকজ-কালেক্টিভ মনে করার চেষ্টা করেন, কিভাবে তাদের ঔদার্যের সেসব উপহার সমূহ পাল্টা 'প্রতি-উপহার' হয়ে ফিরে এসেছিল। সেই পালটা থালায় শাদারা পরিবেশন করেছিল- বন্দক ও মহামারী। নিশ্চিহ্ন-প্রায় অধিবাসীরা অচিরেই উপলব্ধি করলেন-- নিজভূমে পরবাসী হয়ে গেছেন। চুরি গেছে জমি, উপত্যকা, জঙ্গল, পুরোটা মহাদেশ। পাঁচশ বছর ধরে প্রবঞ্চিত জাতির ইতিহাস কে ব্যঙ্গ করে চলেছে উত্তর আমেরিকা'র ছুটি পালনের, টার্কি ভোজের, ঝুটা ইতিহাসের এই থ্যাংকসগিভিং।

মনে পড়ে যাছে, মধ্য ভারতের জনগোষ্ঠীর 'দুর্গা-পুজো' পালনের কথা। যেখানে দুর্গা অনুপস্থিত। মুদ্রার সেই প্রায় না শোনা অপর পিঠটি। মহিষাসুর সেখানে দেবতা। পরাজিত জনজাতির বিজিত শহিদ। তাই তারা শোকপালন করেন। তারা বিশ্বাস করেন অন্যায় যুদ্ধে মহিষাসুরকে হত্যা করা হয়েছিল। তা ছিল রেসিস্ট আর্য আগ্রাসনের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো কালো মানুষের প্রতিরোধ।

নর্দার্ন আইডাহো এসেছিলাম কাজে। হিম ও হাল্কা বরফ পড়তে শুরু করেছে। শীত প্রায় এসে গেছে। ভেলমা এসেছেন আমাকে থ্যাংকসগিভিং এ নেমন্তন্ন করতে। তার মা মায়ান বংশের মানুষ। বাবা ইন্ডিয়ান, মানে এখানকার ইন্ডিয়ান। মানে নেটিভ আমেরিকান। তার সাথে আমার আলাপ 'স্ট্যান্ডিং রকের' ফান্ড তোলা মারফত। কুটেনা রিসারভেশনে বড় হয়ে ওঠা ভেলমার । এখন তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে 'ইন্ডিয়ান স্টাডিসের' অধ্যাপক।

হেমন্তের পাতা ঝরে পড়ে আছে রাস্তায়। গাছপালা বর্ণহীন হয়ে যাছে দ্রুত। আমি আর ভেলমা আগুণ জ্বালিয়ে কফি নিয়ে বসি। দূর থেকে হাইওয়ের সারি সারি আলো চোখে আসে। এই হাইওয়ে গিয়েছে কুটেনা রিসারভেশনে।

কেউ জানেনা প্রথম থ্যাংকস-গিভিং ঠিক কবে থেকে চালু হোল,

বলেন ভেলমা।

আমি উস্কে দেওয়ার জন্যে বলি,

১৬২১ … এটা ঐতিহাসিকভাবে ভুল হলেও একটা তো তারিখ বটে।

চকিতে মুখ ফেরান ভেলমা। তার উন্নত চোয়াল হিম।

কাজ হয়েছে, ভাবি আমি।

ভেলমা গনগন করে বলেন,

না নয়। প্রাচীন অধিবাসীরা চিরকালই থ্যাংকসগিভিং করে এসেছেন। আর তা বছরে একবার না। প্রতিবার, ফসল কাটার পরবর্তিতে। ১৬২১ এ প্লাইমাউথে যারা নিজেদের পিলগ্রিম বলেছে, তারা কোন পিলগ্রিম ছিলনা। ইটস নট ইয়োর ফল্ট দিস আর ফুল অফ হাফ ট্রুথস অ্যান্ড প্রোপাগ্যান্ডা।

নথি পড়ে দেখেছি, জর্জ ওয়াশিংটন ১৭৮৯ তে যে ঘোষণা দেন, তাতে দেশ জুড়ে থ্যাংকসগিভিংচালু হয়নি, ১৮৬৩ পর্যন্ত, যতদিন না আব্রাহাম লিঙ্কন ছুটি ঘোষণা করলেন । তার উদ্দেশ্য ছিল, পুরো দেশকে একই উৎসবের কমন আওতায় এনে ফেলা। যাতে সিভিল-ওয়রের বিদ্বেষ মূলক সময়ে সমস্ত আমেরিকা বাসী এক যূথবদ্ধ ছুটি উপভোগ করতে পারেন। তাই সম্ভবত থ্যাংকসগিভিংভোজ তালিকার অবশ্যম্ভাবী খাবার গুলি সবই বিশ শতকের খাদ্যাভ্যাস অনুযায়ী । এবার বোঝা গেলো।

এমনকি টার্কি ?

জানতে চেয়েছিলাম ভেলমা'র কাছে।

এমনকি খুব সম্ভবত টার্কিও। মিথ অনুযায়ী থ্যাংকসগিভিং এর সূচনা ১৬২১ হলে টার্কির চাইতে সে সময় ওয়াইল্ড ফাউল, হরিণের মাংস বা ডাক খাওয়ার সুযোগই বেশী থেকে থাকবে। আর ক্রানবেরি বা আলু খাওয়ার চল তখন ছিলনা।

দ্রুত কফি শেষ করতে করতে বলেন ভেলমা।



কাল সকালেই তিনি রওনা দেবেন স্ট্যান্ডিং রকের উদ্দ্যেশ্যে। ফিরে আসবেন, থ্যাংকসগিভিং এর আগের দিন। কদিন আগে বারাক ওবামা এসে ঘুরে গেছেন, সাময়িক পাইপলাইন বন্ধের হুকুম জারী করতেছেন। কিন্তু প্রশ্ন হোল তা তিনি আগে কেনই বা করেননি ? আর এই তার বিদায়বেলায় তা কতটাই বা কার্যকরী হবে ? ট্রাম্প পরবর্তী আমেরিকায় তাদের আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে কত আর দিন ?

অসেটী ক্যাম্পে চলছে এক ঐতিহাসিক সহাবস্থান। সমস্ত আদি জনজাতিরা মিলিত হচ্ছেন এক বিরাট সলিডারিটির ছাতায়। প্রায় তিনশটি জাতির সহাবস্থান, গত ৫০০ বছরের আমেরিকার ইতিহাসে এই প্রথম। মাইনাস ডিগ্রীর আবহাওয়ায় জল কামানের মুখে দাঁড়িয়ে, পুলিশী ঔদ্ধত্যের মোকাবিলা করে চলেছেন তারা।

স্ট্যান্ডিং- রক sioux জনজাতিরা DAPL এর পাইপলাইনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু করেন ২০১৪র গোড়ার দিকে। তাদের পানীয় জল, সেক্রেড সাইট ও অর্থনীতিতে হামলা আনছে এই পাইপলাইন-রুট । ১১৭২ মাইল লম্বা এই টেলের পাইপলাইনে ক্ষতি হবে চাষের জমির, পানীয় জলের। এই জমি চুক্তি অনুযায়ী, নেটিভ ইন্ডিয়ান জনজাতির। ফেডারেল সরকার বা অন্য কারুর এই জমিতে অধিকার নেই।

Tribal Energy Resource Agreements (TERAs), টেরা আইন অনুযায়ী "Tribal land" এর অর্থ হল সেই জমি যার মালিক হলেন এই 'ট্রাইব' বা জনজাতিরা। পরিবেশ জনিত নিয়ন্ত্রনের কথা মাথায় রেখে তৈরি হয়েছিল- "Federal Indian reservation"। '33 U.S. C. 1377(h)' তে বলা হচ্ছে-- ট্রাইবাল জমিতে কিছু উদ্যোগ নিতে হলে 'it requires a 'social impact assessment'। অর্থাৎ বিশেষজ্ঞদের দল জমির মালিকদের সাথে কথা বলে ঠিক করবেন, প্রজেক্টের কারণে জনজাতিদের জীবন, অর্থনীতি ও সাংস্কতিক মূল্যবোধের জায়গায় হস্তক্ষেপ হচ্ছে কিনা।

সেই চুক্তি অগ্রাহ্য করে তৈরি হচ্ছে পাইপলাইন, তেল সরবরাহের জন্যে। মিলিয়ন-মিলিয়ন ডলারের প্রজেক্ট। তাতে মুনাফা তুলবে কর্পোরেট কোম্পানি। আরও একবার দেশ-মহাদেশ হারানো মানুষরা তাদের সামান্য রিজারভেশনের জমিকেও খুইয়ে বসবেন। পাইপ থেকে টক্সিন তাদের জলে আর পূর্বমানুষদের সেক্রেড সমাধিতে, জমিতে গিয়ে মিশছে।

তার প্রতিবাদে এই অসেটী ক্যাম্প।

অ্যারেস্ট ও সরকারি চোখ রাঙ্গানি তুচ্ছ করে তৈরি হয়েছে ক্যাম্প গাইডলাইন। গড়ে তোলা হয়েছে অস্থায়ী ইশকুল, ক্যাম্পের অজানা মেয়াদের কথা ভেবে। ক্যাম্পে থাকা বাবা-মায়েদের বাচ্চারা নিয়মত যাচ্ছেন সেই ইশকুলে। প্রতিদিনের জন্যে শুরু হয়েছে লঙ্গরখানা। হাজার হাজার লোকের চারবেলা খাদ্য-জোগানের মহা-সংস্থান। মহাযাজ্ঞিক কাণ্ড-কারবার।

এসে জড় হয়েছেন, ভেটেরানরা। প্রাক্তন মিলিটারি স্যান্ডারসন জানিয়েছেন, তিনি এই প্রথম ইতিহাসের মুদ্রার সঠিক দিকে রয়েছেন। ডাকোটা আন্দোলনের সহায়তা করে তিনি ইরাক যুদ্ধে যাওয়ার স্মৃতি থেকে মুক্তি চাইছেন। ২০০০ ভেটেরান এসে জড় হয়েছে এখানে, সেকেন্ড ডিসেম্বর ফোন করে জানালেন, ভেলমা। তার গলায় খুশীর কান্না।

আমার পিঠে রোদ এসে পড়ে। বাইরে চলছে অবিশ্রাম নিস্তব্ধ বরফ পতন। শাদা।

*********
থ্যাংকসগিভিং এর মোম-মাখা, মায়া-বিকেলে ডিনারের আগে তার সাথে পরচে বসি গিয়ে। পাতা জড় করে রাখা আছে পরচের এককোণে। বাড়ি জুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে কুটেনা ও মায়ান দের হাতের কাজ, আর্টিফাক্টস, পুতুল ও দেওয়াল চিত্র। ভেলমা আমায় বলে চলেন, তার ঠাকুরমার কাছে শোনা নানাবোঝো'র গল্প-কথা।

সেই একদিন, যখন দুনিয়াটা টলোমলো, নানাবোঝো তার তাঁবুর ছাউনির জানলা বাইরে চোখ রাখে, ছোটো সেই ঝরনার ধারে তাদের টিপি। উপত্যকায় ছড়ানো অবিশ্রান্ত ফুল। রংহীন। ফুলের মেলা। কিন্তু সব শাদা। ঝরনার রঙের মত শাদা। বরফের চাদরের মত শাদা। নানাবোঝা ঠিক করে এই বিবর্ণ শাদাকে পালটে নেবে। সেই মত তার রঙের ঝাঁপি খুলে বসে সে। একে একে রং উপুড় করতে থাকে ঢাল বেয়ে নামা উপত্যকায়। পাহাড়ে। ঝরনার গায়ে।

বলে চলেন ভেলমা। আমি তার কালো বেণীর দিকে তাকিয়ে ভাবি, প্রায় মেটাফরের মতোই, কিভাবে হোয়াইট আমেরিকার কর্পোরেট-তন্ত্রের শাদা বরফ জমাট হয়ে আছে।

এই শীতে প্রায় তিনশটি জন-গোষ্ঠী ও তাদের প্রতিনিধি এসে জড় হয়ে গেছেন এই সেক্রেড স্টোনে।

নর্থ ডেকোটা তৈরি হচ্ছে।

দীর্ঘ লড়াইয়ের প্রস্তুতির ছাপ তাদের চোখেমুখে।

এই উত্তর গোলার্ধ বসেও হঠাৎ টের পাই দক্ষিণ গোলার্ধে ঘটে চলা ভারত ভূখণ্ডে জল-জঙ্গলের লাল-পিঁপড়ের কামড় পায়ের তলায়। দেখতে পাচ্ছি ঝাড়খণ্ড, মধ্যপ্রদেশ, ওড়িশা জুড়ে সার দিয়ে চলছে লাল ডেঁয়োর সারি । কোটি টাকার খনিজ সম্পদ পায়ের তলায় নিয়ে পাতা কুড়িয়ে অর্ধ-আহারে থেকেও জঙ্গল-জমি রক্ষা করে চলা সেই পুঁজিনীতির অ্যান্টিথিসিসে থাকা মানুষগুলির কথা।

সেখানে জঙ্গল তাই চালাচ্ছে বিরামহীন সংগ্রাম। ঝাড়খণ্ডের মাটির তলায় রয়েছে ভারতের মোট মিনারেল সম্পদের ৪০ শতাংশ। ইউরেনিয়াম, বক্সাইট, গ্রানাইট, গোল্ড, সিলভার, ম্যাগনেটাইট, কোয়ার্টজ, কয়লা, লোহা আর তামা।

জঙ্গলের জমি এ রাজ্যের ২৯ শতাংশের বেশী জুড়ে। ১২০ টি মউ সই হয়েছে, তার মানে 200,000 একর বনভূমি। তার মানে ডিসপ্লেসমেন্ট। নিয়মগিরির জঙ্গল- অধিবাসীরা প্রশ্ন তুলছেন- কর্পোরেটের লোভ আর লুঠের বিরুদ্ধে। নিয়মগিরির মানুষ বুঝে গেছেন, এই কর্পোরেট দালাল দের হাতে আছে হাঁড়ি আর জল। চাল রয়েছে জঙ্গলের মানুষের কাছে। সেই চালের সন্ধান দালালরা পেয়ে গেছেন, কিন্তু পাহাড়, জঙ্গল, জমি থেকে চাল তারা আর নিয়ে যেতে দেবেনা।

জঙ্গলের মানুষের জল-জঙ্গল-জমিনের ওপর অধিকারের মান্যতা দিতে সংবিধানে আছে কিছু আইন। যা মোটামুটি এই কথা বলে যে আদিবাসীর জমি বিক্রি বা অধিগ্রহণ করা যায়না।

এরপর রয়েছেন, সংরক্ষিত শ্রেণীর মানুষেরা- শেডিউল কাস্ট ও ট্র্যাডিশনাল ফরেস্ট ডয়েলারস ( (Recognition of Forest Rights) । আর আছে 'পেসা' (PESA ) আইন ( Panchayats (Extension to Scheduled Areas) Act, 1996 or PESA)। যা বলে, জঙ্গলের জমি নেওয়ার আগে কথা বলতে হবে পঞ্চায়েতের সাথে, আর কথা বলতে হবে পুনর্বাসনের পুরোপুরি সম্ভাবনাকে খতিয়ে দেখতে। এই পেসা আইন মূলত ভারতের সরকার ইচ্ছা-মত অগ্রাহ্য করে থাকেন। ক্রমাগত।

আর আছে পরিবেশ রক্ষা আইন (Environment Protection Act ), যাতে বলা আছে, সমস্ত প্রজেক্ট কে আগে পাবলিক কন্সাল্টেশন থেকে মত আদায় করতে হবে ও তারপর পরিবেশ সম্মত ক্লিয়ারেন্স জোগাড় করতে হবে।

এ পর্যন্ত শুনে ভাবতেই পারেন - বাহ এই পথেই তো হাঁটার কথা ছিল, তবে তা হাম্বারাম্বা'রা কিভাবে চিবিয়ে খেয়ে ফেলেছেন? ফেলেছেন, কারণ সুন্দর সেইসব আইনের ফাঁকও তৈরি আছে। যেমন থাকে সবসময়। যেমন-- এই আইন কয়লা-খনির জন্যে বলবত না। অর্থাৎ, ছাড় আছে। আরও আছে, সেখানে খনি করার জন্যে জমির মালিকদের সাথে কথা বলাও আইনের আওতায় পড়েনা।

**************

২০০৮ এর নভেম্বর । দু' তারিখ ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরণ হয়ে গেছে শালবনীর জঙ্গলে। সেইসময়ের মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব জিন্দালকে ইস্পাত ব্যবসা করতে দেবেন জঙ্গলে এই প্রতিশ্রুতিতে জঙ্গলে আসেন পরিদর্শনে। তার কনভয়ের ওপর চলে এই আক্রমণ। সঙ্গে সঙ্গে জরুরী অবস্থা। মাওবাদীরা এর পেছনে আছেন এই অভিযোগে তারা স্বীকার করার সাথে সাথে সেনা নামল লালগড়ে। আমরা রওনা দিলাম ৫ তারিখ। রাস্তা জায়গায় জায়গায় কেটে কেটে গাড়ী আটকানোর চেষ্টা। মাঝে মাঝে বিশালকায় গাছ কেটে তার গুঁড়ি ফেলে রেখে ব্লক করা হয়েছে। চারিদিক শুনশান জঙ্গল। দিনের বেলায় ঝিঁঝিঁ শোনা যায় স্পষ্ট। ৫ ই নভেম্বর শান্তু'দা, অজন্তা'দি, আরও সবাই একিভাবে, লালগড় যখন পৌঁছলাম, তখন অনেকটাই বেলা হয়ে এসছে। চারিদিকে শিঙ্গা, তীর-ধনুক, কাঁসর, বাদ্য নিয়ে জড় হয়েছেন হাজার হাজার গ্রামবাসী। সরকারের তরফে শুরু হয়েছে ঃ অপারেশন লালগড় ।

আমাদের মধ্যে থেকে অধ্যাপক তরুণ সান্যাল উঠে কথা বলতে শুরু করলেন ছত্রধর মাহাতোর সাথে। সেই ছত্রধরকে প্রথম দেখা। আলোচনা চলল পেসা আইন নিয়ে। যারা আমার ১৭০০ কেলভিন ছবিটি দেখেছেন, তারা আন্দোলন শুরুর সেই এই কথোপকথনের সাক্ষী। ছত্রধর তখনও তেমনভাবে শিরোনামে আসেননি। এরপরই এক সপ্তার মধ্যেই লালগড় হয়ে উঠবে ঘোষিত যুদ্ধক্ষেত্র। বসবে ইশকুল, হাসপাতাল বাড়ি দখল করে তারকাঁটার বেড়া দেওয়া সি-আর-পি-এফের ক্যাম্প। নির্দেশ থাকবে দেখা মাত্র গুলির। দফায় দফায় মানুষ প্রাণ হারাবেন, নিখোঁজ হয়ে যাবেন, ধর্ষিতা হবেন।

সে ইতিহাস অন্য পরিসরে আবার বলতে হবে।

শেষ বার লালগড় ফেরত গেছি, ২০১০ সালে। ছত্রধর তখন জেলে। তখনও সিপিএম সরকারের পতন হয়নি, তবে আসন্ন। চারদিক থমথমে। লিখিত-অলিখিত কার্ফুর হাওয়াবাতাস এমন কি জঙ্গল থেকে ক্রোশ দূরে মেদিনীপুর শহরেও। মেদিনীপুর শহরে এসেছি ঋত্বিক ঘটকের 'মেঘে ঢাকা তারা'র পঞ্চাশ বছরের পূর্তি অনুষ্ঠানে মেদিনীপুর ফিল্ম সোসাইটিতে বক্তব্য রাখতে। সংগে নিয়ে গেছি ক্যামেরা ও যন্ত্রপাতি। যদিও কাউকে সংগে পাইনি তাও মনে ভেবে রেখেছি যাবো ছত্রধর মাহাতোর বাড়ি। তিনি তখন বন্দী। যেমন এখনও। জঙ্গলের অবস্থা আরও কঠিন, জায়গায় জায়গায় কারফিউ। কড়া নজরদারী। ভোট এগিয়ে এসেছে, ছত্রধর বন্দী। আন্দোলন ঝিমিয়ে গেছে। তাই মিডিয়া ও 'বাঈট সম্প্রদায়ের' আগ্রহও অনুমান করতে পারেন যে একেবারেই কমতির দিকে।

কাউকেই সংগে পাইনা, রাস্তা চেনাবে। কেউ রাজী না। কারণ ছত্রধর রাজবন্দী। তার বাড়ির ওপর, রাস্তায়, আশেপাশে সর্বত্র কড়া নজরদারী। এদিকে পথে অচেনা কাউকে জিগ্যেস করাও বিপদের, শত্রুপক্ষ ভুল পথে নিয়ে গিয়ে 'অনেক কিছুই' করতে পারে। রাস্তায় পড়বে সি.আর.পি.এফের ক্যাম্প। সেখানে থামা বা গাড়ি আস্তে হওয়া মাত্র গুলি চলবে।

ডাক্তার থেকে দোকানদার কেউই কোনো কথা বলতে চায়না। শীতের রুক্ষ শাল পাতা মাড়িয়ে মাড়িয়ে একজনকে অনেক কষ্টে লুকিয়ে গাড়িতে তুললাম। অনেক কষ্টে তিনি রাজী হলেন। তিনি মেদিনীপুর শহরের এক হোটেলে কাজ করেন। জঙ্গলের ভিতর বাড়ি। সপ্তায় দু'দিন বাড়ি যান। তাকে বললাম জিজ্ঞেস করলে বলবেন, আপনি অসুস্থ ছিলেন তাই আমাদের গাড়িতে রাইড নিয়েছেন। আমরা কেন যাচ্ছি তা জানেননা। অথবা বেশী ধমকালে বলবেন খবরের কাগজের লোক। তারপর দেখবো।

সিয়ারপিএফের জেরা এড়িয়ে সে গ্রামে পৌঁছে দেখলাম, ছত্রধরের বাড়ি পড়ে আছে খালি। দুটো বাড়ি ছাড়া লোক প্রায় নেই সে গ্রামে। তাও মূলত বৃদ্ধ, কিছু নারীরা ও শিশু। মাওবাদী নামে ধরপাকড়ের, প্রতিরক্ষা বাহিনীর অবাধ যৌন অত্যাচারের ভয়ে বেশিরভাগ গ্রামছাড়া নয়ত অ্যারেস্টেড। ছত্রধরের ছেলেটি মাধ্যমিক দেবে। সে প্রায় কোন কথাই না বলে বই নিয়ে সাইকেল চালিয়ে চলে গেলো। আমিও আর তাকে বিরক্ত করলামনা। এই ঘরের ছেলেরা হাতে কালাশনিকভ তুলে নিলেন ? 'কারা মাওবাদী আর কারা নয় সেটা প্রতিরক্ষা বাহিনী শোনেনা। দু বছরের বাচ্চাও মাওবাদী। এই আপনাদের দুটি ভাত দেব ভাবছিলাম দুপুরে, কিন্তু বেশী রান্না করলি বলবে-- মাওবাদীদের জন্যে রান্না হচ্ছে ?' প্রায় ফিসফিস করে বল্লেন একজন। সবার সাথে কথা বলে ক্যামেরায় ধরে রাখছি যতটা সম্ভব। পুরো নাম নেবনা, সরেন পদবী ধারী এক গ্রামবাসী জল দেওয়ার অছিলায় কানের কাছে এসে বলে গেলেন-- 'লোক ঘুরছে, খবর চলে গেছে, আপনারা আলো থাকতে থাকতে ফেরত যান।'

ছত্রধর দেশের কত বড় ক্ষতি করতেন শেষ মেশ তো আর জানা হয়নি কারুরই। নাশকতার রাজনীতিতে আমি বিশ্বাস করিনা। ছত্রধর নাশকতায় জড়িত কিনা তাও কেউ জানিনা। কারণ তা প্রমাণিত নয়। সি আর পি এফের ক্যাম্প আজও বহাল আছে লালগড়ে। তবে জিন্দাল কর্পোরেটের ইস্পাত মুনাফার আগ্রাসনকে রুখে জঙ্গলকে রক্ষা করেছেন আরও একবার। তা করেছে লালগড়ের আন্দোলন।

হাজার হাজার মানুষ বস্তারে, নিয়মগিরিতে প্রতিদিন রাষ্ট্রের সাথে অসম যুদ্ধ করে বাঁচতে বাধ্য হচ্ছেন। সামান্য কারণেই পুলিশি গ্রেপ্তার ও জেল খাটা তাদের জীবনের রুটিন হয়ে গেছে। দেশের গরীবতম অঞ্চলের অধিবাসীরা উন্নয়নের বদলে বন্দুকের নল দেখতে দেখতে বাঁচতে শিখে গেছেন।

সে আলোচনার জন্য অন্য লেখায় আসব।

***********

সভ্যতার' জন্যে কেন বারবার তাদের জমি ছাড়তে হয়। রাষ্ট্রের সাথে সংঘর্ষ করে বেঁচে থাকতে হয় কোন উন্নয়ন ছাড়াই ?

কিভাবে এই শুধু কি পুঁজি ও প্রভুত্বের লোভ শুরুতে নিঃশব্দে এগিয়ে আসে ? কথা হচ্ছিল, ঝাড়খণ্ডের জঙ্গলে বসে জেসিন্টা ও বিজু টোপ্পো'র সাথে মেঘনাদ'দার আখড়ায়। বিজু টোপ্পো ঝাড়খণ্ডের আদি অধিবাসী জনজাতির মানুষ। বন্দুকের নলের সামনে উঠিয়ে নিয়েছেন ক্যামেরা, নিজেদের লড়াইকে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিতে। বিজুর ছবি সারা পৃথিবীতে সমাদৃত। মেঘনাদ'দা দীর্ঘ দিন এই ঝাড়খণ্ডের অধিবাসী, নিজের বাড়ির নাম দিয়েছেন আখড়া। অধ্যাপক। অক্লান্ত সমাজকর্মী। তার বাড়িতেই চলে অ্যাকভিস্টদের আড্ডা। ফাউ হিসেবে থাকে তার প্রাণখোলা, অনাবিল আতিথেয়তা। আমার 'দ্য থার্ড ব্রেস্ট' ছবির শুটিঙ করতে আবার গিয়েছি। আমার ছবিতে সাউন্ডও আমিই করছি বলে বিজু আমার ইন্টার্ভিউয়ের সময় ক্যামেরার কাজ করে দিলেন, নির্দ্বিধায়।

চা-মুড়ি খেতে খেতে গল্প-গান হোল অনেক। শোনালেন তারা মেঘনাদদার লেখা সেই কাল্ট গান, যার চিত্রায়ন করেছিলেন বিজু ---

গাঁও ছোড়াব নাহিন
জঙ্গল ছোড়াব নাহিন
মাই মাটি ছোড়াব নাহিন
লড়াই ছোড়াব নাহিন

এই লাল মাটি, জঙ্গল প্রতিবার আমায় লাল পিঁপড়ের গল্প শোনায়। জঙ্গলের লাল পিপড়েরা এক স্বপ্ন দেখেছিল। বুটের তলায় যেতে যেতে শেষমেশ সার বেঁধে কামড় দেওয়ার স্বপ্ন।

একথা ভাবতেই মনে পড়লই তার কথা। পড়া অনিবার্য বলেই। মনে পড়ল বুনুএলের 'আন্দালুসিয়ান ডগ' দেখে জঁ ভিগো যা বলেছিলেন। সেই দুটি শব্দ ঃ ইট বাইটস।

জাসিন্টা, বিজু টোপ্পো'দের অফুরান রাগ বয়ে চলা দেখতে দেখতে আধফুটে বলে উঠি -

রেড অ্যান্ট ( স )-- ইট বাইটস।





কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন