বুধবার, ১৭ মে, ২০১৭

দীপেন ভট্টাচার্য'এর ধারাবাহিক উপন্যাস : অদিতার আঁধার--একাদশ পর্ব

ভূমিকা : লোহিতক নেতা অশির'ই চাঁদে হারিয়ে যাওয়া সেনভা - বিষাণ ও অদিতার সন্তান। আর সেনভাকে (অশিরকে) চাঁদে অপহরণ করেছিল প্রফেসর রাস্ত্রো - বিষাণের শিক্ষাগুরু। রাস্ত্রো ও বিষাণ - দুজনের গবেষণাই মস্তিষ্ক কপি করাকে সফল করে, কিন্তু এই পদ্ধতিকে প্রণয়ন করার ব্যাপারে দুজনের মতভেদ হয়। এরপর রাস্ত্রোকে আর খুঁজে পাওয়া যায় নি। এই পর্বে রয়েছে দুহাজার বছর ধরে পৃথিবী কী ধরণের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে তারই এক খতিয়ান। পৃথিবীর বুকে এখন সমুদ্রের উচ্ছাস, ডুবে গেছে বড় সব প্রাচীন শহর - ঢাকা, কলকাতা, সাংহাই, বুয়েনস আইরেস, মায়ামি, নিউ ইয়র্ক, ভেনিস, লন্ডন।
----------------------------------------------------------------
----------------------------------------------------------------

অদিতার আঁধার :  একাদশ পর্ব 



বিষাণ বিনতার ঘরে ঢোকে। ডকটর তারকার ছুটে আসে, “ডকটর বিনতা তাঁর স্বপ্নে আটকা পড়েছেন।” তার কথায় ব্যাকুলতা থাকে, বিষাণ ভাবে এতদিন পরেও তারকার রোগীর প্রতি তার অনুভূতি হারায় নি। 

তার স্বপ্ন থেকে বের হতে পারছে না বিনতা। সেই স্বপ্নে সে বসে আছে সমুদ্রের পাড়ে, দূরে সূর্য নেমে যাচ্ছে জলে, এরকম সূর্যাস্ত সে দেখেছে দিনের পর দিন। বিনতার কপি-করা মস্তিষ্ককে বিনতার মৃতদেহতে বসানো হয়েছে, তাকে জাগানো হয়েছে, কিন্তু বিনতা সেই সমুদ্রতীর থেকে উঠে আসতে পারছে না। 

তারকারের হাতে একটা টর্চ। টর্চ থেকে জোরালো নানা রঙের আলো বের হয়, সেই আলো জ্বলে নেভে এক একটা কম্পাঙ্কে যা চোখে ধরা যায় না। তারকার বিষাণকে জিজ্ঞেস করে বিনতার চোখের মণির ওপর টর্চের আলো ফেলবে কিনা, এই পদ্ধতি ব্যবহার করে অনেককে এর আগে স্বপ্ন থেকে বের করে নিয়ে আসা গিয়েছিল। কিন্তু বিনতার ঘটনাটা ‘লোহিতক’ সংগঠনের কার্যকলাপের ফল, এখানে বিষাণের সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিষাণ তারকারকে একটু অপেক্ষা করতে বলে, সে বিনতার খাটের পাশে একটা চেয়ারে বসে বিনতার বিস্ফারিত মণির দিকে তাকায়, দেখে বিনতার ঠোঁট নড়ছে। ঝুঁকে পড়ে বিনতার অস্ফূট কথা শোনে বিষাণ। বিনতা বলে, “এই সাগরপার থেকে আমাকে নিয়ে যাও। আমি আর সূর্যাস্ত দেখতে চাই না।” 

বিনতার কথা বিষাণকে সংক্রামিত করে। বিনতার ঠোঁট নড়ে, আরো অনেক কথা সে বলতে চায়, কিন্তু সেগুলো মূর্ত হয় না। এক অতল বিষন্নতায় ভরে যায় বিষাণের মন, নিজের অজান্তেই বিনতার পাশে পড়ে থাকা ডান হাতের উন্মুক্ত করতলে নিজের ডান হাত রাখে। আর এক বিনতার সঙ্গে বিষাণ ২৪ ঘন্টা আগে কফি খেয়েছে, সেই বিনতা তাকে তার ছেলে সেনভাকে ফোন করতে বলেছিল। সেই বিনতার সাথে বিষাণ এক ধরণের যোগাযোগ অনুভব করেছে। এই নতুন বিনতা কি পুরোনো বিনতার মত হবে? 

বিষাণের হাতের স্পর্শ অনুভব করে বিনতা মাথা কাৎ করে বিষাণকে দেখে। এই মানুষটিকে সে চিনতে পারে না। এই কি তাকে সাগরপার থেকে নিয়ে যেতে এসেছে? বিনতা বিষাণের করতল তার হাতের মুঠির ভেতর নেয়, একটা অবলম্বন পেয়ে সেটাকে আঁকড়ে ধরে। বিষাণ তার বাঁ হাত বিনতার মুঠির ওপর রাখে, বিনতা যেন তার মধ্যে মমতা ও বিষন্নতা দুটিরই আভাস পায়। তার স্বপ্নে বিনতা দাঁড়ায়, অস্তগামী সূর্যের অপসৃয়মান আলোয় ঠাণ্ডা বালির স্পর্শ সে অনুভব করে তার খালি পায়ে, তার ডান হাত ধরা থাকে বিষাণের হাতে। সেই স্বপ্নে বিষাণের হাত ধরে বিনতা হাঁটে পেছনের পাহাড়ের দিকে যে পাহাড় তাকে বন্দী করে রেখেছে এই সাগরপারে। স্বপ্নে সেই পাহাড় কখনই পার হতে পারে নি বিনতা, কিন্তু আজ বিকেলের লাল আলোয় রাঙা পাহাড়ের দেয়াল সরে যায়, বিনতা নিজেকে আবিষ্কার করে আলোকোজ্জ্বল এক ঘরে, সে বিছানায় শুয়ে আছে, তার হাত ধরে বসে আছে এক মধ্যবয়সী মানুষ, তাকে বিনতা আগে কোনোদিন দেখে নি। 

বিষাণ ডকটর তারকারের দিকে তাকায়, দুজনেই বোঝে বিনতা তার স্বপ্ন থেকে বেরিয়ে এসেছে। এই বিনতা জানে না অদিতাকে হত্যা করা হয়েছে ডামুরির বনে, এই বিনতা দুদিন আগে অদিতার দেহকে বিশালগড়ে নিয়ে আসে নি। বিষাণ বিনতার দিকে তাকায়, কিন্তু তার মন পড়ে থাকে নিলয়ের অন্য একটি ঘরে যেখানে অচেতন অদিতা রয়েছে পর্যবেক্ষণের মধ্যে। অদিতা এখনো জানে না চাঁদে তাদের হারিয়ে যাওয়া ছেলে সন্ত্রাসী নেতা হয়েছে, তারই নির্দেশে বিনতাকে হত্যা করা হয়েছে। তাদের ছেলে সেনভা আর বদলে দেওয়া একই ছেলে আজ লোহিতক নেতা অশির; সমাজের দুই প্রান্তের মানুষ।
জানালা দিয়ে রাতের বিশালগড়ের আলো দেখা যায়, সেইদিকে তাকিয়ে বিষাণ গভীর চিন্তায় নিমজ্জিত হয়, তার মনের অলিগলিতে স্মৃতি আর সম্ভাবনার মিশ্রণে এক বাস্তব সৃষ্টি হয়। তার শিক্ষক প্রফেসর রাস্কো চাঁদে তার ছেলে সেনভার মস্তিষ্ককে দূর থেকে নিয়ন্ত্রণ করে তাকে অপহরণ করেছিল। সেনভার মগজ ধোলাই করে তাকে অশিরে রূপান্তরিত করেছে। এই প্রতিহিংসার অর্থ কী? ভাবে বিষাণ, তাদের মধ্যে দর্শনগত পার্থক্য হয়েছে, তবে এটা সত্যি যে মস্তিষ্ক কপি-করার নীতি প্রণয়ন বিষাণের ভূমিকা ছাড়া হত না। তবুও রাস্কোর এই চরম প্রতিক্রিয়া বিষাণ আশা করে নি। এতসব করেও কি রাস্কো শান্ত হবে? রাস্কোর প্রতিহিংসা আরো সুদূরপ্রসারী হতে পারে। এসব ভাবতে ভাবতেই বিষাণ ভাবে সেনভার কথা, সাগরবিজ্ঞানী সেনভা। সে কি নিরাপদে থাকবে? রাস্কোর হাত কি আর্কটিক সাগরে ভাসমান এক জাহাজে সেনভার ক্ষতি করতে পারবে? বিনতার হাতটা ছেড়ে দেয় বিষাণ, চেয়ার ছেড়ে জানালার কাছে যায়, সেনভাকে একটা ফোন করা দরকার। 

ঐ সময়েই বিশালগড় থেকে কয়েকশো কিলোমিটার দূরে সমুদ্রের কাছাকাছি অশির তার পাহাড়ি গোপন আস্তানায় এক মানচিত্র দেখে। বিশালগড়ের। অশিরের ঘরে বলতে গেলে ইলেকট্রনিক্স জাতীয় কোনো কিছুই নেই। যে মানচিত্রটা সে দেখছে সেটা কাগজের। তাকে যাতে কোনোভাবেই গোয়েন্দা সংস্থাগুলো খুঁজে না পায় সেজন্যই এই ব্যবস্থা। ঘরের কোনায় একটা কফি টেবিলের ওপর রাখা একটা টেলিফোন বেজে ওঠে। পুরোনো দিনের ফোন, কয়েক হাজার বছর আগের। বড় একটা বেঢপ বাক্সের ওপর বড় একটা হাতল। সেটা বেজে ওঠে কর্কশ ধাতব আওয়াজে। এই ফোনটি যুক্ত মাটির তলার তারের সঙ্গে যেটি চলে গেছে সমুদ্রের নিচে। অনেক পুরোনো একটা সাবমেরিন কেবল লাইন, যে লাইনটির অস্তিত্ব কোনো নিরাপত্তা বা গোয়েন্দা সংস্থা জানে না। যে লাইনটির কথোপকথন ধরা পড়বে না কোনো সংবেদী নিরূপক যন্ত্রে। ফোনের হাতল তোলে অশির, ওপাশ থেকে কন্ঠস্বর ভেসে আসে, “সব ঠিক আছে, ২৪ ঘন্টার মধ্যে পৃথিবীর প্রতিটি ‘নিলয়ে’ আক্রমণ হবে, ধ্বংস হবে দুশো কোটি সংরক্ষিত মস্তিষ্ক। তুমি নাগানো, চেংডু, দিল্লী আর ইসফাহানের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের প্রস্তুত হতে বল।” এটুকু বলেই ওপাশ থেকে লাইন কেটে দেয় সেই কন্ঠস্বর। এই দিনটির জন্য সে প্রস্তুত করেছে নিজেকে গত পঞ্চাশ বছর, তার উদ্দেশ্যে সম্বন্ধে অশিরের কোনো দ্বন্দ্ব নেই। 

***********************************************
পৃথিবীর বুকে এখন সমুদ্রের উচ্ছাস, ডুবে গেছে বড় সব প্রাচীন শহর - ঢাকা, কলকাতা, সাংহাই, বুয়েনস আইরেস, মায়ামি, নিউ ইয়র্ক, ভেনিস, লন্ডন। পৃথিবীর জনসংখ্যা ১৮০০ বছর আগে সর্বোচ্চ ১৩ বিলিয়ন ছিল। সেই সময় পৃথিবী যে দুর্বিপাকের মধ্যে দিয়ে যায়, খাদ্য-সংস্থান, বাস্তু-সংস্থান, মহামারী, ধর্ম নিয়ে টানা-পোড়েন, সন্ত্রাস, জাতীয়তাবাদ, জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধি সবকিছু পৃথিবীকে ওলোট-পালট করে দেয়। সমস্ত ধরণের কারিগরী উৎকর্ষতা সত্ত্বেও মানব সমাজ এক মাৎসান্যায়ের সম্মুখীণ হয়। বিভিন্ন প্রাণী প্রজাতিও বিশাল বিলুপ্তির মধ্যে দিয়ে যেতে থাকে। অথচ ঐ একই সময়ে চাঁদে অনেক কটি বৈজ্ঞানিক আর পর্যটন গবেষণাকেন্দ্র স্থাপিত হয়। এর মধ্যে অনেক কটিই ছিল মাটির নিচে। ঐ সময় থেকেই মানব সভ্যতায় এক আমূল বিপ্লব আসে। সেই বিপ্লব সশস্ত্র রক্তক্ষয়ী কোনো বিপ্লব নয়, বরং এক নতুন বোধোদয়ের উন্মেষ। যে জাতিসংঘ প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল তাকেই আবার নতুন করে সংগঠিত করা হয়। কট্টর ধর্মীয় ও সামাজিক জাতীয়তাবাদ নির্বাসিত হয়। ধীরে ধীরে দেশগুলোর সীমানা উঠে যায়, মানুষ তার সংস্কৃতি ধরে রাখে ভাষা দিয়ে। অন্যদিকে ইংরেজীরই একটা রূপান্তরিত ধরণ পৃথিবীর বিভিন্ন সংস্কৃতির মধ্যে আদান-প্রদানের মূল মাধ্যম হিসাবে গড়ে ওঠে। তবু এই সম্মিলিত পৃথিবীর কোনো সরকারি ভাষা নেই। কপালের কাছে বসানো কম্পুটার মুহূর্তে অনুবাদ করে দেয় অবোধ্য ভাষা। প্রকৃতিকে যে অবাধভাবে ভোগ করা যাবে না সেই বোধোদয় হয়। মানুষ পৃথিবীর নাগরিক হিসাবে নিজেকে বিবেচনা করে, তার অধিকার থাকে পৃথিবীর যে কোনো জায়গায় বাসা বাঁধার, সংরক্ষিত বনভূমি, তৃণভূমি, জলাভূমি, পাহাড় বাদে। উষ্ণ পৃথিবীতে গ্রীনল্যান্ড বসবাসের জন্য একটা চমৎকার জায়গা বলে বিবেচিত হয়। 

১৮০০ বছর ধরে পৃথিবীর জনসংখ্যা ক্রমাগত নামতে থাকে। তবে কয়েকশো বছর ধরে তার মান স্থিত হয়েছে দুই বিলিয়নে। 

এর মধ্যে মানুষ মহাকাশ থেকে উন্নত সভ্যতার সঙ্কেত খোঁজে, কিন্তু কোনো সঙ্কেতই তার দূরবীনে ধরা পড়ে না। ধীরে ধীরে মানুষ বোঝে এই ছায়াপথ গ্যালাক্সিতে আরো সভ্যতা থাকলেও তাদের সঙ্গে যোগাযোগ হবার আশা বৃথা। মানুষ বোঝে এই বিশাল মহাবিশ্বে তাকে আর কেউ সাহায্য করবে না, তাকে একাই এই মহাবিশ্বের উদাসীনতার সাথে লড়াই করতে হবে। এর মধ্যে, প্রায় এক হাজার বছর আগে, একটা দুই কিলোমিটার ব্যাসের গ্রহাণুকে আবিষ্কার করা হয় যেটা কিনা পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসছিল। আসন্ন বিপর্যয়ের সমাধানে সমস্ত মানুষেরা তাদের মেধা নিয়োগ করে। অবশেষে শক্তিশালী লেজারের রশ্মি দিয়ে সেই গ্রহাণুকে আংশিকভাবে বাষ্পীভূত করে তার পথ পরিবর্তন করা হয়। এই গ্রহাণুকে আটকাতে গিয়ে পৃথিবীর মানুষেরা বোঝে তাদের ভবিতব্য একই সুতোয় বাঁধা, তাদের একাত্মবোধ দৃঢ় হয়। 

গ্রহাণুর ঘটনার পর পরই সম্মিলিতভাবে আন্টারেস মহাকাশযান তৈরি করা হয়। আন্টারেসের ইঞ্জিন ছিল পারমাণবিক ফিউশনের - কয়েকটি হাইড্রোজেন পরমাণু যোগ করে সৃষ্টি হয় হিলিয়াম ও শক্তি। প্রায় এক হাজার মানুষ আন্টারেসে চড়ে নিকটবর্তী লাল বামন তারাদের গ্রহগুলোকে অনুসন্ধান করতে রওনা হয়। আন্টারেসের যাত্রীরা জানতো তারা আর পৃথিবীতে ফিরে আসবে না। তারা নিজেরাও হয়তো নতুন কোনো গ্রহ দেখবে না, কিন্তু তাদের বিশ্বাস ছিল তাদের পরবর্তী প্রজন্মরা এমন গ্রহের সন্ধান পাবে যাকে কিনা পৃথিবীর মত ঢেলে সাজানো যাবে, যার পৃথিবীকরণ করা যাবে। আন্টারেস থেকে শেষ বার্তা এসেছে প্রায় তিনশো বছর আগে, ১৪ আলোকবর্ষ দূরের এক বামন তারার কাছ দিয়ে যাবার সময়। এর পরে তিনশো বছর সবাই অপেক্ষা করেছে আন্টারেসের পরবর্তী খবরের, কিন্তু ধীরে ধীরে তারা হাল ছেড়ে দিয়েছে। তারা ধরে নিয়েছে মহাকাশের অসীম অন্ধকারে আন্টারেসের সমাধি হয়েছে। 

আন্টারেসের স্মৃতি ধীরে ধীরে মুছে যেতে থাকে। শেষ পর্যন্ত পৃথিবীর মানুষ বুঝতে পারল এই গ্রহ ছেড়ে তাদের যাবার আর কোথাও নেই, তখন তারা পৃথিবীকে শক্তিশালী করে গড়ে তুলতে সময় দিল। তারা ভূমিকম্পের পূর্বাভাস প্রায় পনেরো মিনিট আগে দেবার পদ্ধতিকে উদ্ভাবন করল, মানুষের শরীরে ন্যানোরোবটরা নতুন ধরণের ভাইরাস বা ব্যাক্টেরিয়া সংক্রামক যেমন ধ্বংস করে দিতে সক্ষম হল, তেমনই হার্ট-এটাক বা স্ট্রোককে থামিয়ে দিতে পারল। একদিকে জেনেটিক প্রকৌশল ও অন্যদিকে ন্যানোযন্ত্র ক্যানসারকে শেষ পর্যন্ত পরাস্ত করল। এর মধ্যেই আবার পৃথিবীর সমস্ত জ্বালানী তেল ও গ্যাস ফুরিয়ে গেল। কৃত্রিম তেল তৈরি জন্য শিল্প গড়ে উঠল, কিন্তু সেই তেল শুধুমাত্র রকেট বা জেট বিমানের জন্য ব্যবহার করা হত। বাদবাকি যানবাহন সৌর, বায়ু, জোয়ার-ভাটার বিদ্যুৎ ব্যবহার করত। 

গত কয়েক হাজার বছর ধরে শুধুমাত্র অর্থনৈতিক দক্ষতার ওপর ভিত্তি করে যে সমাজ গড়ে উঠেছিল ধীরে ধীরে সেই স্বয়ংক্রিয় পূর্বনির্ধারিত কাঠামো থেকে মানুষ বের হয়ে আসতে চাইল। বিশাল সুপারমার্কেটের ধারণা উঠে গেল। ফিরে এল পুরোনো দিনের ছোট ছোট বিশেষায়িত দোকান। তবে এই নতুন পৃথিবীতে আর্টের কী ভূমিকা হবে সেটা বোঝা গেল না। কয়েক শ বছর আগেও মানুষ মনে করত ইউটোপিয়া একটা নিতান্তই বোরিং ধারণা, কিন্তু সামাজিক রাজনৈতিক অর্থনৈতিক দ্বন্দ্ব ছাড়া শুধুমাত্র প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের অস্তিত্বের দ্বন্দ্ব নিয়ে যে আর্টের ধারণা সম্ভব মানুষ সেটা ধীরে ধীরে বুঝতে শিখল। তবু এক ধরণের একটা অতৃপ্তি বোধ রয়ে গেল। এই অতৃপ্তি অস্তিত্বের অর্থ না বোঝার অতৃপ্তি। কিন্তু মহাবিশ্বের প্রকৃতির মাঝে নিজের অস্তিত্বর ক্ষণস্থায়ী রূপের অতৃপ্তিকে স্বীকার করে নেবার মধ্যে যে এক ধরণের মুক্তি আছে সেটা মানুষেরা বুঝতে শিখল। একই সাথে তাদের এই একটি মাত্র জীবনে মহাবিশ্বকে অনুভব করার সময়-সীমাকে তারা বাড়াতে চাইল। 

মানুষ মহাবিশ্বে তার সময়ের পরিধি বাড়াতে চাইল। এই ইচ্ছাকেই প্রফেসর রাস্কো ও বিষাণ বাস্তবে পরিণত করতে চেয়েছিল। দু হাজার বছর আগে অনেকে ভেবেছিল মানুষের চেতনা ও স্মৃতিকে কম্পুটারে ধরে রাখা যাবে, কিন্তু সেই ধারণাটা ছিল একেবারেই অবাস্তব। রাস্কো ও বিষাণ বুঝেছিল শুধুমাত্র একটি জৈব মাধ্যমেই মস্তিষ্ককে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব। একটি মস্তিষ্কের প্রতিটি পরমাণুর অবস্থান, উচ্চ-চৌম্বক ক্ষেত্রে সেই মস্তিষ্ককে রেখে, বেতার তরঙ্গ দিয়ে চিত্রিত করা যায়। সেই চিত্র দিয়ে ধীরে ধীরে ত্রিমাত্রিক প্রিন্টারে গড়ে তোলা যায় সেই মস্তিষ্কের একটি যথার্থ কপি। কিন্তু শেষ মুহূর্তে রাস্কো এই প্রজেক্ট সম্বন্ধে দ্বিধান্বিত হল এবং এই সম্বন্ধে তাঁর সমস্ত গবেষণাপত্র ও সরঞ্জাম ধ্বংস করে দিতে চাইল। তখন বিষাণই পরিচালনা কমিটির সঙ্গে যোগাযোগ করে সেগুলো বাঁচায়। এর পর পরই রাস্কো উধাও হয়ে যায়, কোনো ভাবেই তার পদচিহ্ন আর খুঁজে পাওয়া যায় না। 

***********************************************

বিষাণ বিনতার ঘর থেকে বের হয়ে আসে। সেনভাকে ফোন করতে হবে, সেনভার বিপদ হতে পারে, রাস্কোর দ্বেষ সেনভা পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। কিন্তু রাস্কো ব্যক্তিগতভাবে তার আর অদিতার বিরুদ্ধে এত ক্ষোভ কেন পুষে রেখেছে সেটা বোঝে না বিষাণ। সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে আসে সে, নিচে ল্যান্ডিংয়ে দুজন সৈনিক। অনেক বছর পরে নিলয়ে অস্ত্রবহনকারী মানুষ দেখল বিষাণ, তারা মাথা নিচু করে বিষাণকে অভিবাদন জানায়। বিষাণ প্রত্যুত্তরে মাথা ঝুঁকিয়ে ‘নিলয়ের’ বাইরে বের হয়ে আসে। দরজার বাইরেও সান্ত্রী। 

সামনে ফুটপাথের পাশে বেঞ্চে একটি মেয়ে বসে আছে, তার ছাত্রী সিলেয়া। সিলেয়াকে এখানে আশা করে নি বিষাণ। দূর থেকেই ডাক দেয় তাকে বিষাণ। অপেক্ষা করতে করতে সিলেয়া ঘুমিয়ে পড়েছে, কাছে যেয়ে তার কাঁধে হাত রাখে বিষাণ। সিলেয়া চমকে উঠে দাঁড়ায়, বিষাণকে দেখে তার মুখটা রক্তিম হয়ে যায়, তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে বলে, “প্রফেসর, আপনাকে দুদিন ধরে দেখছি না, আমরা সবাই খুব চিন্তা করছি।” 

সিলেয়ার মুখের দিকে একটু আনমনাভাবেই তাকায় বিষাণ, তারপর আর একটু মনোযোগ দিয়ে। সিলেয়ার কালো চুলের একটা গুচ্ছ কানের পাশ দিয়ে এসে গালের ওপর পড়েছে। বহুকাল আগে, একশ বছরেরও আগে, এরকম ভাবেই অদিতার চুল এসে পড়ত গালে। এজন্যই কি সে সিলেয়ার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে? বহুকাল আগে তরুণী অদিতার সঙ্গে বিষাণের পরিচয় হয়েছিল প্রফেসর রাস্কোর গবেষণাগারে। এটাও কি সম্ভব? ভাবে বিষাণ। এটাও কি সম্ভব যে রাস্কো অদিতার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিল? এখন যেমন সে সিলেয়ার আকর্ষণ অনুভব করছে? কিন্তু রাস্কোর সঙ্গে অদিতার যদি কোনো সম্পর্ক থেকে থাকে সেই কথা রাস্কো তাকে বুঝতে দেয় নি, অদিতাও তাকে কোনোদিন কিছু বলে নি। এতদিন পরে সিলেয়ার মুখ দেখে বিষাণের মনে হয় অদিতা বিষাণকে রাস্কোর ওপর বেছে নিয়েছিল, রাস্কো তার প্রতিশোধ নিচ্ছে। আরো অনেক কিছু মনে হয় বিষাণের, রাস্কোর সুর-জ্ঞান ছিল, ভাল বাঁশী বাজাতে পারতো। মাথা ঝিম ঝিম করে বিষাণের। সিলেয়া ক্লান্ত বিষাণকে দু হাত দিয়ে ধরে বেঞ্চে বসায়, সে বিষাণের জন্য স্যান্ডউইচ বানিয়ে নিয়ে এসেছে। 

*************************************
ডামুরির বনে সে রাতে বৃষ্টি নেমেছিল। একটা কাঠের কেবিনে মাটির ওপর শুয়ে ছিল এক প্রৌঢ়, তার বয়স দুশোর ওপর হতে পারে। তার দীর্ঘ লম্বা চুল কোমর ছাড়িয়ে গেছে। কেবিনের একপাশে রাখা ছিল একটি বাঁশী, অন্যদিকে রাখা ছিল একটি ধনুক। তার পাশে রাখা ছিল একটা বহু পুরোনো টেলিফোন, সেই টেলিফোনটার তার বেরিয়ে ঘরের একটা কোনায় মাটির মেঝেতে ঢুকে গিয়েছিল। সেই তারের তথ্য বিশ্বের কেউ জানে না, সেই তার দিয়ে এই প্রৌঢ় নিরাপদে ‘লোহিতকের’ সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে পারে। বাইরে বৃষ্টির ঝাপটায় গাছের শাখারা কাঁপে, শব্দ করে। 

(চলবে)


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন