বুধবার, ২১ জুন, ২০১৭

‘গাবো’ মনে রাখার ব্যক্তিগত চাবি

মামুন হুসাইন


মার্কেজকে, আমাদেরকালে তখনও চল হয়নি, 'গাবো' নামে ডাকা; তবে ওঁকে আবিষ্কারের মুহূর্তটি ছিল সারা পৃথিবীর মানুষের মত আমারও এক অবিস্মরণীয় ঘটনা। ওঁকে নিয়ে তৈরি মন্তব্য, মতামত-এর বাক্য-শব্দ নিশ্চিত এখন ছাড়িয়ে গেছে, ওঁর গ্রন্থরাজি, বক্তৃতা, চিত্রনাট্য, নাটক, রিপোর্টাজ ইত্যাদির ভেতর জমে থাকা 'শব্দ-সংখ্যা'কে এবং এই বলাবলি কেবল বাড়ছেই। পৃথিবীর তাবড়-তাবড় সৃষ্টিশীল মানুষ, মনীষী, ভাবুক, চিন্তক, ওঁকে ভালোবাসায়-সম্মানে-তর্কে এত তীব্র উদ্ভাসিত করে যে সেখানে নতুন করে যুক্ত হওয়ার অবকাশ খুব সামান্যই অবশিষ্ট থাকে।
আমি তাই পুরনো-পৃথিবীর বাতিল মানুষ হিসেবে, একেবারেই চুপ থাকতে চাই। নিস্তব্ধতা কী কখনও ভাষা হয়? গাবো বা মার্সেক'কে নিয়ে আমার তাই না হয় প্রবন্ধ-না হয় গল্পগাছা; মার্কেজের চাউনি, মার্কেজের মাকোন্দো, হলুদ প্রজাপতি, উড়ে বেড়ানো কার্পেট এবং ওঁর পুরোহিতের গরম চকোলেট খাওয়ার দৃশ্য দেখতে-দেখতে অব্যাখ্যেয় এক সুরের আভা তৈরি হয় সারা ঘর জুড়ে। আর সুরের বিস্তার নিশ্চয় লিখে-লিখে বর্ণনা করা যায় না; এ নিতান্ত এক অনুভবের বিষয়। আমি তাই গাবোর স্বর, গাবোর লিরিক এবং গাবোর সুর ছুঁয়ে যাওয়ার বিপন্ন-ইচ্ছে প্রকাশ করি; অথবা নেহায়েত-ই বাক্যরহিত থাকা! বুকে সাহস আনার জন্য ২০১২-এর নোবের বিজয়ী ঔপন্যাসিকের পেন নেম 'মো ইয়ান'-এর তরজমা করি- চুপ, কথা বলো না! মো ইয়ান-এর গায়ে হ্যালুসিনেটরি রিয়েলিজিম্-এর তকমা পাঠ করতে-করতে আবারও নিঃসঙ্গ হই, উদ্বেলিত হই এবং গাবোকে খুঁজতে যেয়ে অপেক্ষাকৃত কম বাচাল হওয়ার অসম্ভব-পরিকল্পনায় ডুবে যেতে থাকি।

পেছন ফিরে দেখি- ১৯৮৬-এর তীব্র এক বৃষ্টির দুপুরে গাবোকে প্রথম আবিষ্কার করছি ওঁর এক সাক্ষাৎকারে; সাক্ষাৎকার নিয়ে পুরো গ্রন্থ- দ্য ফ্র্যাগনেন্স অব গুয়াভা! পেয়ারা চাল বা গমের স্তূপে লুকিয়ে আমার মায়ের দিদিমা, পেয়ারার শরীর নরম করে জিহ্বা ও নাক বরাবর সুগন্ধ তৈরি করতেন। এই মমতাময়ী বৃদ্ধার কাছে, আমি আমার জন্মকাল এবং মায়ের প্রসববেদনার অনুপুঙ্খ বর্ণনা পাই। একাত্তরের যুদ্ধে তাঁর এক সন্তান মৃত্যুবরণ করে, আর অপর সন্তানের কান ছুঁয়ে বুলেট চলে যাওয়ার পর, এই অক্ষত সন্তানের শ্মশ্রুম-িতচিবুক পেয়ারার সুঘ্রাণে ভরা ঠোঁট দিয়ে স্পর্শ করতে-করতে, লাগাতার কান্না করতে-করতে দৃষ্টিহীন হয়ে পড়েন এবং একদিন আধা-খাওয়া পেয়ারা হাতে জগত-চ্যুত হন অথবা মৃত্যুবরণ করেন, যেন বৃদ্ধ মানুষ কেবলই আয়ুষ্মান হয়ে জগত-সংসারে শ্যাওলা-আগাছা না হয়ে যায়।

পেয়ারার সুঘ্রাণ হাতে নিয়ে মার্কেজের শতবর্ষের নিঃসঙ্গতা খুঁজে পাই আরো খানিকটা পরে। ইংরেজি অনুবাদে বইটি হাতে আসে আমাদের স্মরণকালের শেষ সামরিকশাসনের কালে। নতুন চাকরিস্থলে কতিপয় কাপড়-জামা, গানবাদ্য এবং একখ- মার্কেজ নিয়ে যোগদান করতে আসি রাষ্ট্রের বিবিধ আকার-আকৃতির বাস-মোটর-নৌকা ও রিকসা ভ্রমণ শেষে। সারা হাসপাতালে সার্বক্ষণিক অবস্থানরত আমরা মাত্র দু'তিনজন। হাসপাতালের পেছনে শ্মশান থেকে মাঝে মাঝে মানুষ-নিশ্চিহ্ন করার পুণ্য ছাই-ভষ্ম উড়ে আসে খাবারের টেবিলে, ঘরে এবং মার্কেজের বস্নার্বে। দ্রুত পড়তে পারি না, খানিক এগুই আর থমকে যাই; হয়ত এক পৃষ্ঠা পড়া হল, পুরো শরীর-মস্তিষ্ক অবশ হয়ে থাকে। লোড শেডিং-এর অাঁধার উদ্যাপনের জন্য খোলা ছাদে তারা খসে যাওয়া দেখি, ধানক্ষেতের ভেতর জেগে থাকা সিনেমা হলের নৈশ-অধিবেশন থেকে বেরিয়ে আসা সিনেমা প্রেমিকদের সিল্যুট দেখি, আর ষাট ঊর্ধ্ব রমণী, যিনি আমার হাউস-কিপার, যিনি আমার রন্ধনশিল্পী তাঁর বিগত জীবনের অমস্ন-মধুর কাহিনী শুনি, বুকমার্কারে মার্কেজকে আটক করে- ...আমার চুল এত বড় ছিল যে, আমি দাঁড়িয়ে থাকতাম পিঁড়ির ওপর, আর স্বামী সারা চুলে তেল ঘষে দিতেন অপার মায়ায়! মোমবাতির আলোতে মার্কেজের নিঃসঙ্গতা তখন অঁধার ভয়-ভয় ছাদে আরো খানিকটা যেন ছড়িয়ে পড়ে। এদিকে মার্কেজ শেষ হওয়ার আগেই ঐ বছরে সারা শহর-গ্রামে বন্যার জল থৈ-থৈ শুরু করে, কেবল জেগে থাকে হাসপাতাল চত্বর। বানভাসী মানুষ হাসপাতাল করিডোরে জমাট হয়ে হাসি-তামাশা করে, শেয়াল তাড়ায়, শেয়াল হত্যা করে, মদ খায়, সেক্সুয়াল এ্যাবিউজে লিপ্ত হয় এবং প্রধান সামরিক শাসকের দুঃখী-দুঃখী মুখের পোট্র্রেট দেখে লাগাতার—টেলিভিশনের জলে হেঁটে-হেঁটে লে. জেনারেল দরিদ্র-ত্রাণ দিচ্ছেন অথবা ঐ উড়ে চলেছেন হেলিকপ্টারে! বন্যা শেষ হলেও, মার্কেজ-এর নিঃসঙ্গতা তখনও আমি নিঃশেষ করতে পারি না। হাসপাতালের চাকরিতে টিকাদান কর্মসূচির বাধ্যতামূলক মাস্টার মশাই হই, কোন এক সন্ধ্যায় সর্পদংশনে পড়ি, আমার ওপর আরোপিত সর্পদংশনের ফোক-হিলিংয়ে সক্রিয় অংশগ্রহণ করি, নেয়ার ডেথ উদ্যাপন করি এবং হঠাৎ-ই বদলির কাগজ নিয়ে দক্ষিনবঙ্গের এক ক্যাথলিক পল্লীতে নতুন চাকরির দায়ভার নিয়ে উপস্থিত হই। মার্কেজ-এর নিঃসঙ্গতা হাতে, ভাড়া বাড়ির অভাব দূর করার জন্য আমি এবার পুরোহিত মশাইদের এক আধা-পরিত্যক্ত ঘরে আশ্রয় গ্রহণ করি। আমার বারান্দা বেয়ে তীব্র উজ্জ্বল-সৌন্দর্যময় এক সাপ হেঁটে চলে যায় বীরদর্পে। সারা রাত ভীত হয়ে আলো জ্বেলে মার্কেজের নিঃসঙ্গ পৃষ্ঠা দেখি। দিনের বেলায় ভয় কমে গেলে, দরিদ্র-ক্যাথলিকদের গলায় রবীন্দ্রনাথের প্রার্থনা-সঙ্গীত ভেসে আসার শব্দ তৈরি হয়। ঝোঁপ-ঝোঁপ ঘাসের ভেতর পা ফেলতে ভয় হয়, এবং হঠাৎ-ই এক গুঁইসাপ, আমার জলভর্তি কলস আছড়ে, পুরো ঘর জলে সাঁৎলে নিখোঁজ হয়ে যায় নিকটবর্তী বনভূতিতে। মার্কেজের নিঃসঙ্গ পৃষ্ঠার ওপর সাপের লেজ থেকে বিচ্ছুরিত জল ছড়িয়ে পড়লে, জল মুছে আমি নিঃসঙ্গ বইটি ঘাসের ওপর রাখি। হয়ত আমি চেয়ার নিয়ে খানিক দূরে গ্রন্থের শরীর থেকে নিঃসঙ্গ-জলের উবে যাওয়া দেখি, নাকি তখন কেউ তড়ি-ঘড়ি আমার ঘরের ভেতর ঢুকে পড়ে- জোয়ার ভাটার শ্রীমন্ত নদী থেকে জনৈক সফেদ-ধর্মপ্রাণ পাজাকোলা হয়ে আমার সামনে উপবিষ্ট হয়; শীতের কমফোর্টারের মত ওর কান বাঁধা। জিজ্ঞাস্য হলে জানা গেল- মাদ্রাসা কমিটির বিরোধীয় পক্ষ ওর কান চূর্ণ করে নদীর জলস্রোতে ছুঁড়ে দিয়েছে। কান উদ্ধারের জন্য তারা নদীতে জাল ফেলে, কিন্তু জোয়ারভাটার গোপন তা-ব নিশ্চয় কানের ক্ষুদ্র মাংসপি-কে বহুদূরের বঙ্গোপসাগরে বহন করে নিয়ে যায় অনায়াসে। এরকম এক কালে, সাঁঝের তীব্র জোনাকির আলোয় গির্জাঘরের আনন্দ-ঘণ্টা বাজিয়ে ভাটিকানের রাষ্ট্রদূত আসে, লে. জেনারেলের পতন হয় এবং আমাদের এক এ্যাকটিভিস্ট চিকিৎসক গুলিবিদ্ধ হলে সারা শহর-গায়ে নিঃসঙ্গতা আরো তীব্র-ঘনীভূত হতে থাকে।

ফলে মনস্বী পাঠকদের মত অপার প্রাণশক্তিতে ভরপুর চিন্তকের মত আমার সেই মলিন-পাঠপর্ব আর এগোয় না। নিঃসঙ্গতা বাড়ে, একা হই, ক্ষুব্ধ হই, দুর্বল হই, এবং ভীত-সন্ত্রস্ত হই। সারা শহর-গ্রাম জুড়ে নক্ষত্রের মত, কুয়াশার মত, দমকা বাতাসের মত ভয়-ভয় নিঃসঙ্গতা ছড়াতে থাকে ধ্বংসযজ্ঞ বিস্তারের প্রতিভাময় সাহসী রাষ্ট্রনায়কেরা। আর এই গোপন-নিষিদ্ধ ভয় এড়ানোর জন্য আমি এক অপর মানুুষ, এবার শতবর্ষের গাবো'কে খুঁজতে নামি, ওঁর সাহসী আঙুল স্পর্শ করি, ওঁর সারি-সারি গ্রন্থপুঞ্জ দেখি, ওঁকে পত্র লিখি, নাকি সেই পত্র কখনই আবার পাঠানো হয় না!

বন্ধুরা বলেন, পত্র লেখার দিন শেষ হয়ে গেছে! পুরনো চিঠিপত্র খোলামকুচির মত গুঁড়িয়ে আমি গাবো'র ঘরবাড়ি দেখি আর বন্ধুদের পাঠানো, গাবোর টুকরো-টুকরো ফটো দেখি এবং ফটোর ভেতর ভেসে থাকা মার্কেজের 'রিপ্রেজেন্টেশান' তৈরি করি মনে-মনে। দেখি, নোবেল পুরস্কার নেয়ার দিন সবাই পরে 'টেইল কোর্ট', আর গাবো পড়লেন কলোম্বিয়ার কৃষকদের পোশাক 'লিকি লিকি'। ছবিতে এই বড়িটির নাম 'লা কাসা দেল এসক্তিতো'- এর অর্থ লেখকের প্রাসাদ। মা এই বাড়িতে থাকতেন বলে, এটি তাঁদের পারিবারিক সদর দপ্তর। এই ছবির ভেতর আরাকাতাকার একটি রাস্তা, রাস্তার পাশে ক্যাফে বা পাব, আর রাস্তা দিয়ে হেঁটে চলেছে একটি ঘোড়াগাড়ি। ঘোড়াগাড়ির শব্দ হয় এবং গাড়ির পেছনে হেঁটে যেতে-যেতে আবিষ্কৃত হয় গাবো'র আঁতুরঘর। ছবির ভেতর গাবো এবং ক্যাস্ত্রোর পানোৎসব। কর্নেলকে কেউ লেখে না- এই বইয়ের প্রচ্ছদে জেগে থাকা দুই মোরগের ছবি, কোথাও গাবোর ঠোঁটে সিগ্রেট, গাবো লিখছেন ধ্যানমগ্ন হয়ে, গাবো রাস্তায় দাঁড়িয়ে খবরের কাগজ পড়ছেন, গাবোর সঙ্গে বিশিষ্টজনদের ছবি, গাবোর পিঠের ওপর হামলে পড়া দুই শিশুপুত্র, আর বাকি ছবি জুড়ে গাবোর পর্বত প্রমাণ বইপত্র।

গাবো বলেন, বইয়ের চেয়ে গানবাজনার রেকর্ডের সংখ্যাই তার বেশি। ওর ঘর থেকে তখন ভেসে আসছে বাইয়েনাতো, বোলেরো, কিম্বা সেবাস্টিয়ান বাখ। কোলোম্বিয়ার নামজাদা সমালোচক-কবি হুয়ান গুস্তাবো কোবো বোর্দা বললেন, নিঃসঙ্গতার একশ বছর ৩০০ পৃষ্ঠাব্যাপী দীর্ঘ এক বাইয়েনাতো ছাড়া আর কিছুই নয়। এই সঙ্গীতের স্বাদ-গন্ধ পরখ তক্ষণি করা হয় না, নাকি অন্তঃজালিকার কোণ বিশিষ্ট কুঠরিতে কেউ নিভৃতে সঞ্চয় করে রেখেছে সেই সুরের স্বপ্ন-চাদর। খ্যাতিমান সঙ্গীতশিল্পী শাকিরা তখন তাঁর চিরন্তন শ্রোতা-গাবো'র নিঃসঙ্গতায়... আবিষ্কার করেন এক 'সুরেলা চলন', 'ছন্দহীন কাব্য'; অথবা সেখানে আবিষ্কৃত হয় 'যুদ্ধ এবং অনির্বচনীয় শান্তি, ভালবাসা এবং দারিদ্র্য, জাদুময়তা এবং স্বপ্ন।' মার্কেজ বলেন, আমি আমার স্বপ্ন ফেরি করি। স্বপ্নের ঘোর লাগে ফেরিওয়ালার স্বপ্ন-স্বপ্ন দিন-রাত্রির ভেতর একদা ৬ই মার্চ ১৯২৭ ভেসে আসছে- দেখি, গাবিতো অথবা গ্যাব্রিয়েল মার্কেজ-এর প্রায় মৃত-শরীর ভূমিষ্ঠ হচ্ছে; ১৯৮২-এর স্টকহোলমে পেঁৗছানোর জন্য আমরা বলি বার্থ অব ট্রমা অথবা ট্রমা অব বার্থ! গাবিতো'র শরীর ঘন নীল, নিঃশ্বাস শুরু হয়নি, গলায় পেঁচানো নাড়ি এবং অনেক পরে চোখ খুলছে। যদি বা মৃত্যু হয় তাই তড়িঘড়ি ব্যাপটাইজ করার হলি ওয়াটার আসে এবং গাবিতো ওঁর বড়-বড় চোখ দিয়ে শতবর্ষের নির্জনতা দেখার জন্য, স্বপ্ন কেনাবেচার গোপন-অচেনা ফেরিওয়ালা হয়ে উঠতে থাকে। স্বপ্ন দেখার জন্য স্যুটকেস-কম্পিউটার হাতে গাবিতো মেক্সিকো, স্পেন, কিউবা, কলম্বো, সর্বত্র দৌড়াতে থাকে, আর সিদ্ধান্ত নেয়- ইফ আই স্টপ রাইটিং, আই উইল ডাই। তাঁর ধারণা লেখার সময় ভাবা উচিত, সে সার্ভেন্তেসের চেয়েও অত্যন্ত জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ কিছু লিখছে। আমার একদা মলিন পাঠের দুর্বলতা আড়াল করার জন্য মার্কেজ নামক এই অনুবিশ্বের খানিকটা খবরাখবর এবার লিখে রাখি হাতের কাছে, যেন মাকোন্দবাসীর মত ঘুম নষ্ট হতে-হতে বিস্মৃতির জটায় আটকে না যাই। কোথাও দাঁড়িয়ে রাস্তায় দুটি সাইনবোর্ড পড়ি- মাকোন্দো এবং গড এ্যাগজিস্ট! ঈশ্বরের বেঁচে থাকা এবং আমাদের বেঁচে থাকার অন্য সব কৌশল দেখার জন্য গরুর গায়ে লিখে রাখা বাক্যগুলো পড়তে থাকি নেমোনিঙ্রে মত। গাবিতোর মত অপেক্ষা করি- মা আসছেন বহুকাল পরে ঘর বিক্রির জন্য, যখন বোনটি কেবল মাটি কামড়ে খায়। গাবিতো সমুদ্রের জলে টানা দশ দিন ভেসে থাকা নাবিকদের সাক্ষাৎকার নিতে ব্যস্ত। গাবিতো ব্যস্ত জেনেভা-সামিটের কাভার করার জন্য। গাবিতো বলেন, আমি কখনও বিস্মৃত হই না যে, আমি জনৈক টেলিফোন অপারেটরের ষোল সন্তানের একজন। গাবিতো বিস্মৃত হয় না শৈশবে 'সহস্র ও এক আরব্য রজনী' পড়ার অভিজ্ঞতা। পিতামহের ইললেজিমেট সন্তান উৎপাদনের বৃত্তান্তও সে সযত্নে স্মরণে রাখে, 'হাজার দিনের যুদ্ধে' লক্ষাধিক মানুষের মৃত্যু-গান সে কখনও বিস্মৃত হয় না। নো ট্রেসপাসিং লেখা, বিদ্যুতায়িত বেড়া দেখা যাচ্ছিল ইউনাইটেড ফ্রুট কোম্পানির। আখ থেকে তৈরি হচ্ছে চিরিঞ্চি নামক এক আশ্বর্য-স্বপ্নময় লিকার। নতুন জনবসতি গড়ার জন্য মানুষ মৃত আত্মীয়কূলের হাড় নিয়ে ফিরছে। কেউ একজন নিজেকে কবি হিসেবে পরিচয় দেয় এবং ভান করে সে ভাল হোমিওপ্যাথ জানে এবং ভাল বেহালা বাজায়। পছন্দের কন্যার কাছে পদ্য লেখা একটি রুমাল আসে- নদীর তীর বেয়ে বেড়ে ওঠা চমৎকার অর্কিড গ্রীষ্মে সব লাবণ্য হারিয়ে, জীবন্ত হয় শীতে, কিন্তু অতীত আর মনে থাকে না, অনুভবও করে না,... আমার ভালবাসা!

গাবোতো অনুভব করে- একবার চার বছর, এগারো মাস, দুই দিন কী তীব্র বৃষ্টিপাত! বৃষ্টির ভেতর দাঁড়িয়ে অনুভব করে, রেলভর্তি মৃতদেহ সমুদ্রের জলে মিশে যাচ্ছে। মনে হয় ঘরের ভেতর অশরীরী আত্মা। প্রজাপতি উড়ছে, এর অর্থ চিঠি আসবে। দুধ গরম হয়ে উপচে পড়ছে, এর অর্থ পরিবারের কেউ অসুস্থ হতে যাচ্ছে। হয়ত রাস্তায় কোন শবযাত্রা, তখন আমাদের ঘুম থেকে জেগে উঠতে হয়। আমাদের ঘুম কমে যায়, আর দেখতে পাই পাথরের মত শক্ত মাছ। দেখতে পাই, একটি মানুষ পেটের ভেতর ব্যাঙ নিয়ে। একটি মানুষ চাউনি দিয়ে চেয়ার নাড়াতে শুরু করেছে। একটি মানুষ গরুর সামনে দাঁড়ানো মাত্র গরুর মাথা দিয়ে বেরিয়ে আসতে শুরু করে কীটাণুরা। পাশের বাড়ির মৃত মানুষটির কালো দাঁত আঁধারে জ্বল-জ্বল করছে, আর সেই মু-হীন মানুষটি, যে হেঁটে চলেছে গাধার পিঠে।

স্প্যানিশ সাহিত্যের মহান কীর্তি তন কিহোতে'র পৃষ্ঠা জুড়ে আমরা অবশ্য অন্য এক গাধার হাঁটাচলা দেখি বহুকাল আগে, কিন্তু এই ভ্রাম্যমাণ গাধার অদ্ভুত জগৎ আড়াল করে আবার তখন-ই গাবিতো'কে দেখার নতুন আয়োজন নিই। উপন্যাস তৈরির আগে গাবিতোকে দেখতে পাই বাস কোম্পানির পোস্টার লিখে পঁচিশ পেসো আয় করেছেন, পরিবারের দারিদ্র্য মোচনের জন্য। গাবিতো যাচ্ছেন শহরের ব্রোথেল হাউসে বাবার লেখা চিঠি পেঁৗছানোর জন্য। গাবিতোকে ম্যাগদেলেনা নদীতে একবার দেখা যাচ্ছে, নৌকা বাইতে-বাইতে বোলেরস এবং ভেলেনটস গাইছেন। বহুদিন পরে উপন্যাসে এই নদী একবার হয় ভালবাসার নদী, একবার মৃত্যুর নদী, আর একবার জীবনের নদী। 

জীবন্মৃত-আমাদের নদীরাও কখনও মানুষের মত কথা বলে; নদীর ভেতর থেকে ঘোড়ার ডাক ভাসে, আর কখনও নদী বেয়ে মৃত মানুষের, নিখোঁজ মানুষের অবিশ্রান্ত স্রোত তৈরি হয়। মৃত মানুষের স্রোতে নদী নাব্যতা হারিয়ে ফেলে, অথবা নদী মৃত্যুবরণ করে চিরকালের মত। আমাদের মনে পড়ে, শৈশবের জাগ্রত সেইসব নদীতীর ঘেঁষে একদিন দুঃখ ভারাতুর বেশ্যাদের ঘরবাড়ি দেখার স্বপ্ন-গান তৈরি হয়েছিল। নিকট আত্মীয়দের কাউকে দেখতাম বিকেল-সন্ধ্যায় ধবধবে কাপড় পরে, সাইকেল চালিয়ে প্রিয় নিষিদ্ধ রমণীদের সানি্নধ্যের জন্য দুর্বল-মিথ্যাচার করছে গৃহত্যাগের অনুমোদন পাওয়ার লোভে। রমণীদের কেউ চলে আসতেন আমাদের শহরের ভেতর বাড়িতে; দিদিমারা এদের জন্য আলাদা করা গ্লাস-বাটিতে খাবার দিয়ে গল্প করতেন, টিনের চালে ঝুপঝুপ পেয়ারা পড়ার সুগন্ধ খুঁজতেন, বাদুড়ের ওড়াউড়ি দেখতেন, এবং গৃহত্যাগের প্রাচীন বেদনায় জড়িয়ে যেতেন। আমরা দেখতাম নিষিদ্ধ রমণীকুলকে অনেকখানি লুকিয়ে; সারা রাতের ঘাম-রক্ত-গন্ধ-ক্ষত নদীর জলে ধুয়ে, কচুপাতায় বালি-বালি সুগন্ধ-সাবান মুড়িয়ে কাপড় শুকাতে বসেছে ঈষৎ উদোম বুকে। তারপর বাতাসে উড়ে বেড়ানো আহ্লাদিত চুল জব্দ করতে-করতে গোয়ালন্দের ইলিশ এবং গরম ভাতের আড়ালে ডুবে যাচ্ছে ধীরে-ধীরে। গাবো'র কাছে অবশ্য দুঃখ ভারাতুর বেশ্যাদের স্মৃতি আরো বিপুল আনন্দ-বেদনার : শহরের সেরা রাম খাওয়ার জন্য বন্ধুরা ব্রোথেল হাউজে জমা হয়েছে। চারপাশে তাজা মাছ এবং পচা পেয়ারার গন্ধ, চারপাশে ট্যাক্সি ড্রাইভার, নিষিদ্ধ রমণীকুল, বারম্যান, নাপিত, ট্রাক ড্রাইভার, জেলে এবং সেইসব নৃত্যরত মেয়েরা, যারা ক্ষুধার জন্য বিদেশীদের সঙ্গে ঘুমিয়েছিল। রাতভর মদ, সাহিত্য এবং বইয়ের নাম শেষ করে প্রিয়দর্শিনী ব্রোথেলের কাছ থেকে ভাড়া নেয়া ঘরে ঘুমুতে যায়; প্রিয়দর্শিনীর সাবান ঋণ করে এবং তার ব্রেকফাস্ট ভাগাভাগি করে, ক্লান্ত হয়ে ঘুমুতে যায় দুপুর-বিকেল পর্যন্ত। তখন 'লিফস্টর্ম' প্রকাশের আয়োজন চলছে, প্রকাশক ফেরত পাঠিয়েছে-...you will never become a good writer. It is better to devote yourself to something else... কমিউনিস্ট পার্টির কমরেডবৃন্দও ধমকে দেয়- your novel denounces nothing, unmasks nothing; গাবো বিচলিত না হয়ে লেখক হওয়ার প্রতিজ্ঞা নিয়েই এবার আরো সব বিবিধ কর্মকা- এবং জীবনজীবিকায় ডুবে যেতে থাকে। পত্রিকার কাজ ত্যাগ করে, অথবা নতুন পত্রিকা অফিস খুঁজে বের করে। এনসাইক্লোপিডিয়া বিক্রির ছলে, শহর ঘুরে-ঘুরে বিবিধ রহস্য, ভয় এবং ভুল-সত্য কাহিনীর তালিকা জমা করে। ভিত্তোরিয়া ডি সিকা, ফার্নান্দো বিরির সঙ্গে বন্ধুত্ব করে। হোটেলের বিল বাকি পড়ে। প্যারিসের নাইটক্লাবে গান গেয়ে, বোতল-খবরের কাগজ কুড়িয়ে পয়সা জমা করে; অথবা নিজের অবয়বে তুর্কী মানুষের ছায়া থাকায় কেবলই ফরাসি পুলিশের আড়াল খুঁজে চলেন, ফরাসি রাষ্ট্রপতি মিঁতেরোর সঙ্গে দেখা হওয়ার অপেক্ষায়। দেখা যাবে, প্যারিসের রাস্তা, ব্রিজ এবং আইফেল টাওয়ারের গা ঘেঁঘে ভারতবর্ষের বিস্তর মানুষ এই মিলেনিয়ামের কালে বিশ্বায়নের সুখ উদ্যাপন করে চলেছে লুকিয়ে, অথবা পুলিশের প্রহারে জর্জরিত হয়ে তখনও তীব্র স্বপ্ন দেখার রাত-দিন অতিবাহিত করে চলেছে। মার্কেজ সিদ্ধান্ত নেয়— In Paris I learned that nothing, not even hunger, can kill dreams, and that one can sleep under the bridges.

স্বপ্ন দেখা- গাবোর বন্ধুত্ব হয় প্যারিসের টাচিয়া কুইনতানার সঙ্গে এবং সে হঠাৎ সু-প্রচুর লেখার প্রেরণা খুঁজে পায়। গাবো সমুদ্রভাসী মানুষের সাক্ষাৎকার নেয়। সোভিয়েত ভ্রমণের ভিসা নেয়ার জন্য সেক্সোফোনিস্ট অথবা এ্যাকোর্ডিওনিস্ট-এর ছলচাতুরি করে, ইউরোপ বেড়ায়, ক্যামিলো টোরেস নামক 'প্রিস্ট অফ দ্য পুওর'-এর সঙ্গে কথা বলে, বাতিস্তা কাহিনী দেখে, পাঁচশ' পৃষ্ঠার 'এভিল আওয়ার' ছিন্ন করে এবং সিদ্ধান্ত নেয়- I wished to leave a poetical record of the world of my childhood,... যেখানে এমনসব আত্মীয়কুল বসবাস করতো, যারা সুখ এবং উন্মাদনা পার্থক্য করতে পারেনি।

এই অস্পষ্ট ধূসর জগতে চাঁদমারি হয়, মল্লযুদ্ধ হয়, মানুষ নিখোঁজ হয়, হত্যা হয় এবং হঠাৎ মনে পড়ে, বহু বছর আগে বাবা আমাকে বরফ দেখাতে নিয়ে গিয়েছিল। আমরা দেখি বিশটি সাদা মাটির ঘর তৈরি হয়েছে, প্রাচীন পৃথিবীর ডিমের মত স্বচ্ছ নুড়ি-পাথরের ওপর বহমান এক স্রোতস্বিনীর তীরে। প্রতি বছর এই গ্রামে জিপসিদের তাঁবু পড়ে এবং তারা তাদের শেষ আশ্চর্য আবিষ্কার পর্বগুলো খুলে খুলে দেখায়। এই গ্রামে একদিন স্বর্গ থেকে ফুল ঝরে পড়ে রাস্তা বন্ধ হয় এবং শবযাত্রার পথকে সহজ করার জন্য গাঁইতি এবং শাবল আনা হয় তক্ষণি। এই শহর-গ্রামে কখনও তীব্র ধুলিঝড় এবং আগুনে-বাতাস আসে এবং পিঁপড়ের শব্দে মানুষ ইনসোমনিয়াক হয়। এই গ্রামের সামান্য দূরে মরুভূমির ভেতর দুই রমণীর এক গোপন অভিযান শুরু হয়- আমরা দেখি, ইরেনদিরার ক্লায়েন্টবৃন্দ এক কিলোমিটার লাইনে এবং এই সারিবদ্ধতা শেষ হয়, ইরেন্দিরা প্রেমিক উলিসেস যখন তার লোভী দিদিমাকে হত্যা করছে। আমরা দেখি প্রেসিডেন্টিয়াল হাউসে শকুন ঢুকে পড়েছে। মানুষ মুক্তির স্বাদ পেয়ে হল্লা করছে। আমরা, বিশপ আসবে যে নৌকায়, তার অপেক্ষা করি, এবং ভেবে-ভেবে আবিষ্কার করি- পাওয়ার ইজ এ্যাফরোডিসিয়াক। আমাদের ভয় হয়, গাবো গ-১৯ নামক গেরিলা বাহিনীকে সাহায্যের জন্য অভিযুক্ত হতে চলেছে। মানুষ কী তাহলে তার অগ্রিম হত্যা হওয়ার খবর প্রাপ্ত হচ্ছে?

আমরা কর্নেল বুয়েন্দিয়াকে হত্যা করে স্ত্রীর পাশে দুই ঘণ্টা কান্না করি। আমাদের টানা পাঁচ বছর ফোঁড়া হয়, কিন্তু কর্নেলের গায়ে ফোঁড়া উঠলে আমরা ক্ষত থেকে অব্যাহতি পাই। আমরা তখন হেঁটে বেড়াই অথবা তক্ষণি থমকে দাঁড়াতে হয়, কেউ আমাদের পথ রোধ করে- তোমার নানা আমার দাদাকে খুন করেছিল! আমরা ভয়ে পালাই, অথবা প্রতিদিন দেড় পেসো'র বিনিময়ে একটি দরিদ্র হোটেলে, অপেক্ষাকৃত রূপবান বেশ্যার হাতে স্যুপ খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ার আয়োজন নিই। কিন্তু আমাদের বোগোতে শহরে কোন এক ৯ই এপ্রিল দাঙ্গা শুরু হলে, আমরা পালিয়ে যায় এক কাপড়ে। সেখানে কেউ মাছ ধরার গল্প বলছিল। আমি শোনার চেষ্টা করি: পড়শি জেলের কাছ থেকে লোকটি গেল দড়ি আনতে। জেলে ছিল না বাড়িতে। দড়ির বিনিময়ে জেলেনী চাইলো একটি মাছ। মাছ ধরা পড়লো এবং তাকে দেওয়াও হল। কিন্তু মাছের পেটের ভেতর জেলে বউ আবিষ্কার করলো এক হীরকখ-। লোকটির বর্ণনায়, হীরকখ-ের দ্যুতি যেনবা চারপাশে ছড়িয়ে পড়েছিল। ঐ দ্যুতি, উজ্জ্বলতা গাবোর মত আমাদের মন, শরীর এবং আত্মা দ্রবীভূত করে। আমাদের কেউ শখের কবি হয়, কনসার্টে যায় এবং ৬২২ জন মহিলার সঙ্গে বিছানায় যাওয়ার অভিজ্ঞতা প্রকাশের জন্য বই লেখে। মানুষ বই লেখে শূকরের লেজওয়ালা শিশুর প্রসব নিয়ে, বই লেখে রুশবাহিনীর প্রাহা দখল, গাবো, হুলিও কোর্তাসার ও কার্লোস ফুয়েন্তাস বিষয়ে এবং সিদ্ধান্ত নেয় গাবোর 'নিঃসঙ্গতা ...' আদতে একটি জগত-শ্রেষ্ঠ কাব্যরচনা। আমরা বিপদ এড়াতে চারপাশে হলুদ ফুল ছড়িয়ে কন্যাদের নেমন্তন্ন পাঠাই, লেখার ডেস্কে গোলাপ দেয়ার জন্য মৃদু ঝগড়া করি, আর মনে মনে খুঁজি এক জোড়া সবুজ মাথার হাঁস। কেউ ঝলমলে ছাতা মাথায় অরগ্যান্ডি স্কার্টের খসখস শব্দ তুলতে-তুলতে ফুল বিক্রি করছিল। ব্যথা তাড়িত মহামান্য প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি দৌড়ে চলেছে হাইপোকোন্ড্রিয়াক মানুষের মত ডাক্তার, হাসপাতাল এবং ওষুধের দঙ্গল ঠেলতে ঠেলতে।

গাবো এই মহামান্য রাষ্ট্রপতির বর্ণনা দেয়ার ফাঁকে হঠাৎ-ই প্লেনে নিহত হওয়া পানামার লৌহমানব ওমর টোরিওসের কথা বলতে শুরু করেন—'...তাঁর মৃত্যুর খবর শুনে আমার গভীর অন্তরে এক ধরনের অক্ষম রাগ হলো। ভাবতেই পারিনি তাঁকে এতটা ভালোবেসেছিলাম।' গাবো নক্ষত্র চেনানোর মত, মিউজিয়ামের অবিস্মরণীয় পেইন্টিং দেখানোর মত স্বরে ক্যাস্ট্রো, জাহাজ ডোবা নাবিক, ইউরোপ, চিলি, হেমিংওয়ে, ল্যাটিন আমেরিকা, নিকারাগুয়া, এ্যাঙ্গোলা, গ্রাহাম গ্রীন, ইডিপাশ রেঙ্, কর্নেল বুয়েন্দিয়া এবং সিমোন বোলিভার বিষয়ে গল্প বলতে শুরু করেন। গাবো বোর্ডিং স্কুলে, খেলাধুলা না করায় 'বুড়ো মানুষ' হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল যে বন্ধুদের দ্বারা- সেই গল্প একবার ভাবতে চাইছিল। এক সময় দিনে ষাটটা করে সিগারেট নিতেন, সেই কথাটি একবার বললেন। সিনেমা নিয়ে কাগজে প্রচুর লিখতেন- সেই প্রসঙ্গও এল। নাইটক্লাবে গান গেয়ে, বিয়ার ও মদের খালি বোতল কুড়িয়ে বিক্রি করে কিঞ্চিৎ বাড়তি উপার্জনের সম্ভাবনা নিয়ে গল্প হয়। প্যারিস শহরে কবে বান্ধবী-টচিয়া গর্ভবতী হয় এবং নিরুপায়-গোপন এ্যাবর্সনের পর প্যারিস ত্যাগ করে- সে সম্পর্কে দু'এক কথা উঠে আসে। আর কথা ওঠে ম্যাজিক রিয়্যালিজম-এর অন্য উৎপত্তি নিয়ে; শব্দটি প্রথম নাকি উঠে আসে ১৯২৫-এ জার্মান চিত্র সমালোচক ফ্রাঞ্জরে'র লেখায়। অথচ চিত্তশিল্পে এই শব্দবন্ধটি হারিয়ে এখন আশ্রয় পেয়েছে সাহিত্যের সমালোচনায়! আমাদের কেউ প্রশ্ন করে বার্হস, কোরতাসার, ফুয়েন্তেস, ইয়োসা প্রমুখ ম্যাজিক-রিয়্যালিজম সমৃদ্ধ উপন্যাস লেখার পরেও কেন এর পুরো দায়ভাগ গাবো'কেই বহন করতে হবে? এর জবাব দিয়েছিলেন সমালোচক হোর্খে আলি ত্রিয়ানা অপর এক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ- 'দুই আমেরিকার সমস্ত দেশের মধ্যে নিউইয়র্ক হল সবচেয়ে বড়ো মাকোন্দো। এত বেশি ম্যাজিক বিয়্যালিজম আর কোথাও দেখা যায় না।'

নিউইয়র্ক তথা যুক্তরাষ্ট্রের ভেতর বেড়ে ওঠা গোপন ম্যাজিক রিয়্যালিজম নিয়ে আমাদের তরুণ বন্ধুরা গ্রন্থ লেখার স্বপ্ন দেখে। গাবো ক্ষোভ মেশানো গলায় কথা বলে- '...পাবলো নেরুদা স্টকহোলমে উপস্থিত হওয়ার পর ল্যাটিন আমেরিকায় পাঁচটা যুদ্ধ ও সতেরটি সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে গেছে; ঘটেছে এক পৈশাচিক একনায়কের উত্থান যে ঈশ্বরের নামে এখন আমাদের যুগে ল্যাটিন আমেরিকায় গণহত্যার অভিযান চালাচ্ছে। এক বছর বয়স হওয়ার আগেই মারা গেল ল্যাটিন আমেরিকার বিশ লক্ষ শিশু। ... নিপীড়নের ফলে নিখোঁজ হয়ে যাওয়া মানুষের সংখ্যা প্রায় এক লক্ষ বিশ হাজার।... অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় গ্রেফতার হওয়া অসংখ্য মহিলা আরহেন্তিনার কারাগারের ভেতর প্রসব করতে বাধ্য হয়েছেন... মধ্য আমেরিকার তিনটি ছোটো দুর্ভাগা দেশ নিকারাগুয়া, এলসালভেদর এবং গুয়াতেমালায় প্রাণ হারান এক লক্ষের চেয়ে বেশি মানুষ। এমনটা যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ঘটত তাহলে আনুপাতিক সংখ্যাটি চার বছরে ষোল লক্ষ রক্তাক্ত মৃত্যুতে পরিণত হত।' ফুয়েন্তেস বলতেন- 'আমেরিকায় দুঃখ কষ্ট ট্রাজিডি সব পাবে।... আমেরিকাই আমেরিকার স্বপ্নরাজ্য।' যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক তৈরি হওয়া এই অদৃশ্য ম্যাজিক রিয়্যালিজম থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য গাবো বোগোতো শহরে বুলেটপ্রুফ গাড়ি এবং ছয়জন রক্ষী নিয়ে হাঁটতে বাধ্য হন।

গাবো মুক্তি পাওয়ার জন্য মাতৃভূমি ত্যাগ করে অনেকগুলো বাড়ি ক্রয় করেন। আমরা গাবোর ঘরের ভেতর উঁকি দিই। মেঝেতে শ্বেতশুভ্র কার্পেট। ঘরের দেয়ালগুলিও সাদা। সাদা কাপড়ে আবৃত সোফা। দেয়ালে টাঙানো বোতেরোর অাঁকা ছবি। সোফার সামনে সুবিন্যস্ত কফি টেবিল। ঘরের এক কোনায় আধুনিকতম মিউজিক সিস্টেম, সুর ভেসে আসছে। বাইরে হলুদ ফুলের বৃষ্টি; আর আমি গাবোর ঘরে অনুভব করি জাদু, পুরাণ, অলৌকিকতা এবং কল্পনার আশ্চর্য মিশেল। গাবো বলেন- এ্যাকোর্ডিয়ান এবং একগুচ্ছ শব্দের সমারোহে সৃষ্টি হয় কাব্য: সঙ্গীত এবং সাহিত্য। '...সাহিত্যের চেয়ে সঙ্গীতই আমার বেশি প্রিয়, এতটাই প্রিয় যে সুগভীর সঙ্গীত শোনার সময় লিখে উঠতে পারি না, কারণ লেখার চেয়ে গানের প্রতিই মনোযোগ চলে যায় বেশি,... আমি মনে করি জনপ্রিয় সঙ্গীতও পরিশীলিত। যদিও তা ভিন্ন এক সংস্কৃতি। একেবারে বাণিজ্যিক সঙ্গীত তা সব সময়ই খুব বাজে তা কিন্তু নয়, যেমনটা বুদ্ধিজীবীরা বলে থাকেন।... কেবল গানের বেলাতেই আমি সর্বভুক।...'

গাবোর সর্বভুক সঙ্গীতমগ্ন আমাদের গানে-গানে গল্প বলা শেখায়, আর আমরা স্বপ্নে দেখা সেই নারীকে স্বপ্নে দেখি। আমরা কবিকে স্বপ্নে দেখি অথবা স্বপ্নে দেখি যে, সে আমাদের স্বপ্নে দেখা দেয়। স্বপ্নের ভেতর আমরা সাংবাদিকতা নামক একটি 'সাহিত্য আঙ্গিক-এর স্বপ্ন খুঁজে পাই - সাংবাদিকতা চাকরি না, এটা একটা গ্রন্থি। গাবো সাংবাদিকতা শেখার স্কুল গড়েন, 'দেয়ালবিহীন শিক্ষানিকেতন'- ফাউন্ডেশন ফর নিউ ইবেরিয়ান আমেরিকান জার্নালিজম। গাবো লেখার কায়দা-কৌশল শেখান। ফিল্ম স্কুল গড়েন এবং ভাবতে শুরু করেন সাহিত্য, শিল্প ও সাংবাদিকতায় কোন তফাত নেই- ওরা প্রত্যেকে গল্প বলার একটি উপায়। অনুভব করতে শুরু করেন, লেখা যত স্বচ্ছ হয়, তত তুমি কবিতার কাছাকাছি হও। গাবো কবিতা, স্বপ্ন ও সঙ্গীতের ফেরিওয়ালা সেজে পানামার হয়ে, কিউবার হয়ে, কলোম্বিয়ার হয়ে ম্যাজিক-রিয়্যালিজমে ভরপুর যুক্তরাষ্ট্রের কাছে শান্তির প্রস্তাব নিয়ে শ্রমঘনিষ্ঠ হন। ব্যক্তিগত অর্থের আনুকূল্যে মেঙ্েিকার গুয়াদালাহারা বিশ্ববিদ্যালয়ে 'কোরতাসার অধ্যাপক' পদ তৈরি করেন। অপহরণকারীদের কাছে খবর পাঠান- Free Gaviria, bury your weapons and go out and promote your ideas of renewal under the protection of a new constitutional order। বলতে কী, গাবো হয়ে ওঠেন আমাদের আশ্রয়, আমাদের প্রাণশক্তি, আমাদের অাঁধার-কালের এক নির্ভরতার চিহ্ন। অপহরণকারীরাও চাইছেন প্রেসিডেন্ট আর্নেস্টো সামপার-এর জায়গায় গাবো রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিক; সাহায্য চাইছেন ১৯৯৮-এর কলম্বিয়া রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী আন্দ্রেস পাস্তানা - যেন গাবোর হস্তক্ষেপে কলম্বিয়ায় শান্তি ফিরে আসুক। জনৈক সাংসদ ফোন করছেন- 'গাবো, তুমি আমার সম্পর্কে কিছু লেখ, কিছু বল, এমনকি যদি সেটা আমাকে অপমান করার জন্যও হয়।' নির্ভরতা খুঁজে পায় স্বয়ং ফিদেল; ১৯৯৪-এর জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের সামিট চলছে কার্তাহেনয়ে। গাবো বলছেন,- 'শোনা যাচ্ছিল ফিদেলকে মেরে ফেলা হবে। কিউবার নিরাপত্তাকর্মীরা মিছিলে যেতে দিচ্ছিল না বলে আমি তাঁর সঙ্গে সেই ঘোড়ার গাড়িতে বসতে গিয়েছিলাম। ওদেরকে আমি বলেছিলাম এই কোলোম্বিয়ায় আমি যেখানে বসব সেখানে কেউ গুলি করবে না। তাই চেপেচুপে আমরা পাঁচজন এক গাড়িতেই বসেছিলাম, ঠেসেঠুসে মজা করতে করতে। ফিদেলকে আমি যখন বলছিলাম কিচ্ছুটি হবে না, তখন ঘোড়াটা সত্যিই হেলেদুলে চলতে শুরু করে দিল।'

বন্ধুদের লেখায় পড়ি- জগতের সুন্দরী প্রতিযোগিতায় তুমি সবচেয়ে বেশি সম্মান কর কাকে, এই প্রশ্নের জবাব এখন নাকি পুনরাবৃত্তিমূলক! সবচেয়ে সম্মান করি বাবাকে, পোপকে এবং মার্কেজকে; এককথায়, পোপের নাম যতবার আসে তাঁর নামও ততবার আসে। এরকম এক নির্ভরযোগ্য ঘরবাড়ি চূর্ণ করার অভিপ্রায়ে ১৯৯৭-এর কোন সকাল-সন্ধ্যায় গাবোর বুক জুড়ে 'নিওপ্লাসিয়া' নামক এক অচীন ম্যাজিক-রিয়েলিজম শুরু হলে আমরা নিরাপত্তাহীনতায় তীব্র জটায় আবদ্ধ হয়ে পড়ি। জগতের সবচেয়ে লাজুক ও দয়ালু মানুষের মত গাবো ভালবাসার জন্য কাঙ্গালপনার কথা স্বীকার করতে শুরু করেন। গাবো বলেন, আমি চেয়েছিলাম সবার ভেতর ভালবাসার উদ্বোধন ঘটুক। গাবো বলেন, যদিবা, লেখক না হতাম, তাহলে কোনোবার একজন পিয়ানো বাদক হতে চাইতাম। গাবোর উপন্যাস-সঙ্গীত-এর প্রতিভা আমাকে দেখায় কবিতা, স্বপ্ন ও মিথ। গাবোর সঙ্গীত থেকে ভেসে আসে ভালোবাসা, মৃত্যু এবং পৃথিবী। গাবোর সঙ্গীত আমাদের সময়কে মুক্তি দেয়। গাবোর সঙ্গীতময়তা পেঁৗছে দেয় আমাদের এক জানার রাজ্যে, এবং একই সাথে জ্ঞাত জগত সম্পর্কে তৈরি করে মোহভঙ্গের শেষ সীমানা। গাবোর সঙ্গীতে তৈরি হয় একই সঙ্গে আকর্ষণ, বিকর্ষণ, ঐতিহাসিকতা ও পৌরাণিকতা। গাবোর আয়োজনে তৈরি হয় আমাদের বিনাশ, সৃষ্টি, ধ্বংস এবং ভাল-মন্দের উপাখ্যান। গাবোর সঙ্গীত চিহ্ন আমাদের লিখতে উদ্বুদ্ধ করে, নিজের সঙ্গে কথোপকথনের সূত্রমুখ দেয়, আমাদের পাঠপর্ব তৈরি করে, আমাদের শ্রুতিধর করে এবং ইনসোমনিয়া থেকে বাঁচিয়ে স্মৃতিশক্তি জাগানিয়া হয়ে ওঠে। গাবোর বিকল্প তাই নিঃসঙ্গতা, নীরবতা, বিষণ্নতা এবং আমাদের এক চেনা পৃথিবীর মৃত্যু। বলতে কী, গাবো সেই জগতের মানুষ, যে জগতে আমরা বেঁচে থাকি, বেঁচে থাকতে চাই, বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখি। মৃত্যু ভয় তাড়ানোর জন্য তাই এবার ঘরে গাবো-সঙ্গীত-এর অনুরণন তৈরি করি—অনুভব হয় এখনও ঢের বেঁচে আছে আমাদের জীবন, বেঁচে আছে মৃত্যুর এপারে জীবনের নাছোড় গাবো। 

সূত্র : দৈনিক সংবাদ সাময়িকী



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন