বুধবার, ২১ জুন, ২০১৭

মার্কেস-হেমিংওয়ে মোলাকাত

মূল :  গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
অনুবাদ: বিনয় বর্মন

আমি সঙ্গে সঙ্গেই তাঁকে চিনতে পারলাম। প্যারিসের বুলভার্ড সেইন্ট মিশেল এলাকা, ১৯৫৭ সালে বসন্তের এক বর্ষণমুখর দিন। তাঁর সঙ্গে ছিলো স্ত্রী ম্যারি ওয়েলশ। তিনি রাস্তার অন্যপাশ দিয়ে লুক্সেমবুর্গ গার্ডেনের দিকে হেঁটে যাচ্ছিলেন। পরনে পুরনো কাউবয় প্যান্ট, প্লেইড শার্ট এবং বলপ্লেয়ারের ক্যাপ। যে জিনিসটি তাঁর সঙ্গে বেমানন ঠেকছিলো তা হলো ধাতব ফ্রেমের ছোট গোলাকার চশমা, যার জন্য তাঁকে ইঁচড়ে-পাকা নানাজানের মতো মনে হচ্ছিলো।
তাঁর বয়স ৫৯, বিশালদেহী, দর্শনধারী। কিন্তু সরু পশ্চাদ্দেশ ও উরুর কারণে তাঁর ভয়াবহ শক্তি আমাদের বোধে ধরা পড়ে না। সেকেন্ডহ্যান্ড বুকস্টলে সরবনের তারুণ্যে তিনি এতোটা উদ্দীপ্ত ছিলেন যে তাঁকে দেখে বোঝাই যায়নি তিনি আমাদের মধ্যে আর মাত্র চার বছর থাকবেন। 

আমি দ্বিধান্বিত। কী করা যায়? তাঁকে কি একটি সাক্ষাৎকার দেওয়ার জন্য অনুরোধ করবো, নাকি রাস্তা পার হয়ে তাঁকে আমার বিনীত শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করবো? কিন্তু উভয় ক্ষেত্রেই কিছু অসুবিধা আছে। আমি ভাঙা-ভাঙা ইংরেজিতে কথা বলি, আর তাঁর বুলফাইটারের স্প্যানিশ যে ক্যামন! কাজেই ও’দুটোর কোনোটাতেই গেলাম না। আমি বরং আমার দু’হাতের তালু এক করে মুখের কাছে নিয়ে আসলাম, অনেকটা টারজানের ভঙ্গিতে, এবং রাস্তার এপাশ থেকে চিৎকার করে উঠলাম, ‘মা-য়ে-স্ত্রো (মহাশয়)!’ আর্নেস্ট হেমিংওয়ে বুঝলেন যে এখানে ছাত্রদের মধ্যে অন্য কোনো মহাশয় নেই। তিনি হাত তুলে কাস্তিলিয়ান ভাষায় শিশুসুলভ কণ্ঠে বললেন, ‘আদিয়স, আমিগো (বিদায়, বন্ধু)!’ সেটাই তাঁর সঙ্গে আমার একমাত্র সাক্ষাৎ। 

সে-সময় আমার বয়স ছিলো ২৮। পত্রিকায় কাজ করতাম। ইতোমধ্যে একটি উপন্যাস বেরিয়েছে এবং একটি সাহিত্য পুরস্কারও জুটেছে কমম্বিয়া থেকে। কিন্তু প্যারিসের রাস্তায় আমি দিকভ্রান্তের মতো ভেসে বেড়াচ্ছিলাম। আমার প্রিয় দু’জন মহান সাহিত্যিক ছিলেন উত্তর আমেরিকার, যদিও তাঁদের মধ্যে তেমন কোনো মিল ছিলো না। তাঁদের প্রকাশিত সব লেখা আমি পড়ে ফেলেছি। বিপরীত প্রবণতার দু’জন লেখকের অনন্যসাধারণ লেখাগুলো পড়ে সাহিত্য বোঝার চেষ্টা করেছি। এঁদের একজন হলেন উইলিয়াম ফকনার। তাঁকে দেখার সৌভাগ্য আমার হয়নি। কার্টিয়ার ব্রেসনের তোলা বিখ্যাত ছবিতে দেখেছি তিনি কৃষকের শার্ট পরে দুটি সাদা কুকুরছানার গায়ে আঙুল বুলাচ্ছেন। মহান সাহিত্যিকদ্বয়ের অন্যজন হলেন ক্ষণিক-দেখা সেই লোক যিনি রাস্তার অপর পার্শ্ব থেকে আমাকে বিদায় সম্ভাষণ জানিয়েছেন। এতেই আমার মধ্যে এই বোধ জন্ম নেয় যে, আমার জীবনে কিছু একটা ঘটেছে এবং তা সামগ্রিক সময়ের জন্য। 

কে যেনো বলেছিলো, একজন ঔপন্যাসিক অন্যের উপন্যাস পড়েন সেগুলো কিভাবে লেখা হয়েছে তা হৃদয়ঙ্গম করার জন্য। আমি মনে করি কথাটা সত্যি। বইয়ের পাতায় যে গোপন কথা প্রকাশিত তাতে আমরা তৃপ্ত নই: আমরা উল্টেপালটে সংযোগগুলো দেখি। এটা ব্যাখ্যা করা অসম্ভব। আমরা বইটাকে এর উপাদানে বিশ্লিষ্ট করি, তারপর যখন ব্যক্তিগত ঘড়িকর্মের রহস্যভেদ করে ফেলি, তখন আবার জোড়া লাগাই। ফকনারের বই নিয়ে এই প্রয়াস হতাশাজনক, কারণ তাঁর লেখায় অর্গানিক পদ্ধতি অনুসৃত হয় না। তিনি বাইবেলীয় মহাবিশ্বের মধ্য দিয়ে অন্ধভাবে হেঁটে যান, যেনো কাচপাত্রের দোকানে এক দঙ্গল ছাগল। তাঁর একটা পৃষ্ঠা ভেঙেচুড়ে জোড়া লাগাতে গেলে দেখা যায়, স্প্রিং আর স্ক্রুগুলো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে, কিছুতেই আগের রূপে আনা যাচ্ছে না। অন্যদিকে, কম অনুপ্রেরণা, কম আকর্ষণ, কম উন্মাদনার কিন্তু চমৎকার সৌষ্ঠবের হেমিংওয়েতে স্ক্রুগুলো পুরোপুরি উন্মুক্ত থাকে, যেমনটা ফ্রেইট কারে দেখা যায়। সে-কারণে লেখক হিসেবে ফকনার আমার আত্মাকে টানেন। আর হেমিংওয়ে আমার লেখার শৈল্পিক বুননে প্রভাব ফেলেন। এটা কেবল তাঁর বইয়ের জন্য নয়, বরং লিখনবিজ্ঞান সম্পর্কিত গভীর শিল্পজ্ঞানের জন্য। দ্য প্যারিস রিভিউতে জর্জ প্লিম্পটনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি সৃজনশীলতার রোমান্টিক ধারণাকে খর্ব করে দেখিয়েছেন যে, মিয়ব্যয়িতার আরাম এবং ভালো স্বাস্থ্য লেখার জন্য হিতকর; লেখার অন্যতম প্রধান সমস্যা শব্দের বিন্যাস; যখন লেখা কঠিন হয়ে দাঁড়ায় তখন লেখককে তার নিজের বই পুনঃপাঠ করা উচিত যাতে তার মনে পড়ে এটা সবসময়ই কঠিন ছিলো; লেখক যে-কোনো জায়গায় লিখতে পারেন যদি সেখানে অতিথির আনাগোনা ও টেলিফোন না থাকে; এবং এটা সত্য নয় যে সাংবাদিকতা একজন লেখককে নিঃশেষ করে ফেলে, বরং এ-থেকে ইস্তফা দেওয়ামাত্র তার লেখনিশক্তি হ্রাস পেতে থাকে। ‘যখন লেখালেখি অনিবার্য হয়ে দাঁড়ায় এবং মহত্তম আনন্দের উৎসরূপে বিবেচিত হয়,’ তিনি বলেন, ‘তখন মৃত্যুই তাকে থামাতে পারে।’ পরিশেষে, তাঁর শিক্ষা হলো, নিত্যকার কাজে তখনই ছেদ টানা উচিৎ যখন লেখক বুঝতে পারবেন পরের দিন তিনি কোথা থেকে শুরু করবেন। আমার মনে হয় না যে লেখার ব্যাপারে এর চেয়ে দরকারী উপদেশ আর কেউ দিয়েছেন। সকালবেলায় সাদা পৃষ্ঠার দিকে তাকিয়ে থাকার যন্ত্রণার সময় এটাই কমবেশি সব লেখকের জন্য চূড়ান্ত নিরাময়। 

হেমিংওয়ের সব লেখাই সাক্ষ্য দেয় যে তাঁর চেতনা উজ্জ্বল কিন্তু ক্ষণস্থায়ী। এটা সহজেই বোধগম্য। তাঁর অন্তর্গত উত্তেজনা টেকনিকগত কারণে উপন্যাসের বিস্তৃত ও জটিল পটভূমিতে বেশিক্ষণ টিকে থাকতে পারে না। এটা তাঁর নিজস্ব প্রকৃতি, এবং নিজের আশ্চর্য সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করার প্রয়াস তাঁর এক ধরনের ভ্রম। এজন্যই উপরিতলের জিনিস অন্যান্য লেখকের তুলনায় তাঁর লেখায় বেশি দৃষ্টিগোচর হয়। তাঁর উপন্যাসগুলো ছোটগল্পের মতো, যেগুলো একটু বড় পরিসরে ব্যাপ্ত এবং অনেক বেশি জিনিস ধারণ করে। অন্যদিকে, তাঁর গল্পের সবচেয়ে ভালো দিক হলো সেগুলো এমন ধারণা দেয় যে মনে হয় সেখানে কিছু একটা অনুপস্থিত। সুনির্দিষ্টভাবে এটাই রহস্যের আভাস দেয় এবং এটাই হলো সৌন্দর্য। আমাদের সময়ের অন্যতম মহান লেখক হোর্হে লুই বোর্হেসের একই রকম সীমাবদ্ধতা ছিলো, কিন্তু সেগুলো অতিক্রম না করতে যাওয়ার বোধ তাঁর মধ্যে ছিলো। 

সিংহকে তাক করে ফ্রান্সিস ম্যাকম্বারের একটামাত্র গুলি শিকারের জন্য এক বিরাট শিক্ষা। এটা লিখনবিজ্ঞানের সারবত্তাও বটে। একটি গল্পে হেমিংওয়ে লিখেছেন যে লিরিয়ার একটা ষাঁড় ম্যাটাডরের বুকে ঘঁষা দিয়ে একটি বিপজ্জ্বনক স্তর পার হয়ে বিড়ালের মতো ফিরে আসে। আমি বিশ্বাস করি, পর্যবেক্ষণ হলো বোকামির ছিটেফোঁটা যা সবচেয়ে মহৎ লেখকদের কাছ থেকে পাওয়া যায়। হেমিংওয়ের লেখায় আছে এমনি অনেক সাধারণ ও উজ্জ্বল উদ্ভাবনা যা থেকে উদ্ভূত তাঁর সাহিত্যের সংজ্ঞা: আইসবার্গের মতো কোনোকিছু ভালোভাবে ভিত্তিশীল হবে যদি তার তলে থাকে আটভাগের সাতভাগ বস্তুর সমর্থন। 

টেকনিকের সচেতনতার কারণে প্রশ্নাতীতভাবে হেমিংওয়ে তাঁর উপন্যাসে গৌরব অর্জন করতে পারবেন না, কিন্তু তিনি তা পারবেন তাঁর অধিক শৃঙ্খলাবদ্ধ গল্পের মধ্যে। ‘ফর হুম দ্য বেল টলস (যার জন্য ঘণ্টা বাজে)’ সম্পর্কে তিনি বলেন যে তিনি আগেভাগে পরিকল্পনা করে বইটি লেখেননি, বরং প্রতিদিন একটু একটু করে আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে কাহিনিবলয় প্রসারিত হয়েছে। এটা তাঁর বলার প্রয়োজন নেই, এমনিতেই স্পষ্ট। বিপরীতপক্ষে, তাঁর মুহূর্তজাত ছোটগল্পগুলো অনন্য। যেমন সেই তিনটা গল্প যেগুলো তিনি মাদ্রিদে বসে লিখেছিলেন কোনো এক মে মাসের বিকেলে, যখন তুষারঝড়ের কারণে সান ইসিদ্রোতে ষাঁড়ের লড়াই বাতিল ঘোষিত হয়েছিলো। সেই গল্পগুলো হলো, জর্জ প্লিম্পটনের তথ্য অনুযায়ী, ‘দ্য কিলারস (খুনিরা)’, ‘টেন ইন্ডিয়ানস (দশ ইন্ডিয়ান)’ ও ‘টুডে ইজ ফ্রাইডে (আজ শুক্রবার)’। একইভাবে বলতে পারি, আমার বিচারে যে ছোটগল্পগুলোতে তাঁর ঘনীভূত শক্তির সর্বোত্তম প্রকাশ ঘটেছে সেগুলোর মধ্যে সংক্ষিপ্ততম একটি হলো ‘ক্যাট ইন দ্য রেইন (বৃষ্টিতে বিড়াল)’। 

তা সত্তে¡ও, ভাগ্যের পরিহাসের মতোই শোনায়, তাঁর সবচেয়ে অসফল কাজই সবচেয়ে চমৎকার কাজ: ‘অ্যাক্রস দ্য রিভার অ্যান্ড ইন্টু দ্য ট্রিজ (নদী পেরিয়ে বৃক্ষরাজির মধ্যে)’। তিনি নিজেই বলেছেন, এর শুরু একটি গল্প হিসেবে এবং পরে উপন্যাসের ম্যানগ্রোভ জঙ্গলে গিয়ে পথ হারিয়েছে। বিশ্বাস করা কঠিন, এমন একজন জ্ঞানী টেকনিশিয়ানের সাহিত্যের মেকানিক্সে এতো গাঠনিক ফাটল; জ্ঞানচর্চার ইতিহাসে অন্যতম সেরা স্বর্ণশিল্পীর কাজে এতো কৃত্রিম, এমনকি মেকি কথোপকথন! ১৯৫০ সালে যখন বইটি প্রকাশিত হয়, এর তীব্র সমালোচনা হয়েছিলো, যদিও কিছুটা ভুলপথে। হেমিংওয়ে আহত হয়েছিলেন এবং তিনি হাভানা থেকে একটি আবেগময় টেলিগ্রামের মাধ্যমে নিজেকে বাঁচানোর প্রয়াস পেয়েছিলেন, যা তাঁর উচ্চতার একজন লেখকের জন্য অগৌরবজনক। এটা কেবল তাঁর শ্রেষ্ঠ উপন্যাসই নয়, এটা তাঁর সবচেয়ে ব্যক্তিগত কথনও বটে। এটা তিনি লিখেছিলেন এক অনিশ্চিত শারদীয় সকালে যাপিত জীবনের স্মৃতিকাতরতা থেকে এবং অনাগত কয়েকটি বছরের তীব্র পূর্বানুভূতি নিয়ে। তাঁর আর কোনো বইতেই তিনি নিজের জীবনকে এতোটা গভীরভাবে আনেননি, আর কোনোখানে এতোটা লাবন্যে-ভরা পেলবতাময় চিত্র অঙ্কিত হয়নি যার মধ্য দিয়ে তিনি তাঁর জীবন ও কর্মের অন্তঃরূপকে বিজয়ের উপযোগিতায় প্রকাশ করতে পেয়েছেন। কাহিনির প্রধান চরিত্রের শান্তিময় ও স্বাভাবিক মৃত্যু ছিলো তাঁর নিজেরই আত্মহত্যার পূর্বাভাস!

কেউ লেখালেখি নিয়ে তীব্র সংবেদশীলতায় দীর্ঘদিন বেঁচে থাকলে তার পক্ষে আর বাস্তবতা থেকে কল্পবাস্তবকে পৃথক করার উপায় থাকে না। সেইন্ট মিশেলের কফিগৃহে আমি বহুদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়েছি। আরামদায়ক, উষ্ণ, পরিষ্কার ও বন্ধুত্বপূর্ণ হওয়ার দরুণ এ জায়গাটিকে তিনি লেখার জন্য উপযোগী বিবেচনা করতেন। আমি আবারও সেই সুন্দর ও সতেজ মেয়েটিকে দেখার প্রত্যাশা করেছি যে এক ঝড়ো দিনে সেখানে প্রবেশ করেছিলো। মেয়েটির মুখের সামনের চুল ছিলো কাকের ডানার মতো কোনাকুনিভাবে কাটা। তাঁর লেখনিশক্তির অবারিত অপব্যবহার করে তিনি মেয়েটিকে নিয়ে লিখেছিলেন, ‘তুমি আমার এবং প্যারিস আমার।’ তিনি যা-কিছু বর্ণনা করেছেন, যে-মুহূর্তটি আপন করে নিয়েছেন, সেগুলো সব চিরদিনের জন্য তাঁর নিজের হয়ে গেছে। আমি প্যারিসের লোদিওনে ১২ নম্বর সড়কের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় সিলভিয়া বিচের সঙ্গে তাঁকে না দেখে পারি না। তিনি মেয়েটির সঙ্গে কথা বলছেন একটি বইয়ের দোকানে বসে। সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত, যখন জেমস জয়েসের আগমন ঘটবে। সেই দোকানটি এখন আর সে-রকম নেই। কেনিয়ার প্রেইরিতে একবার মাত্র দেখে তিনি মহিষ ও সিংহগুলোর মালিক বনে গিয়েছিলেন, এবং শিখে ফেলেছিলেন শিকারের একান্ত গোপন কৌশল। তিনি বুলফাইটার ও প্রাইজফাইটারের মালিক বনে যেতেন, শিল্পী ও বন্দুকধারীদেরও, যারা মাত্র মুহূর্তের জন্য বিরাজমান। ইতালি, স্পেইন, কিউবা—পৃথিবীর অর্ধেক জায়গা দখল করে নিয়েছেন তিনি কেবলমাত্র নামোল্লেখের মাধ্যমে। হাভানার কাছে কোহিমার নামক একটা ছোট গ্রামে, যেখানে ‘দ্য ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি (বৃদ্ধ ও সমুদ্র)’-এর নিঃসঙ্গ মাছশিকারী বাস করতেন, তাঁর বীরত্বপূর্ণ কাজের স্মৃতিস্বরূপ হেমিংওয়ের একটি আবক্ষ মূর্তিসহ নামফলক আছে। কিউবায় তাঁর আশ্রয়কেন্দ্র ফিঙ্কা দে লা ভিজিয়া, যেখানে তিনি মৃত্যুর আগের দিনগুলো কাটিয়েছেন, ছায়াময় বৃক্ষের মধ্যে অক্ষত দাঁড়িয়ে আছে। সেখানে আছে তাঁর বইয়ের বিচিত্র সংগ্রহ, হান্টিং ট্রফি, লেখার টেবিল, বিশালাকার জূতা, জীবনের অগণন সম্ভার যেগুলো তিনি পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে এনে জড়ো করেছিলেন। এগুলো যাঁর ছিলো তিনি এখন আর নেই। এগুলোর আত্মার মধ্যে আছে তাঁর মালিকানার যাদু। 

কয়েক বছর আগে, আমি ফিদেল ক্যাস্ত্রোর গাড়িতে চড়েছিলাম। তিনি সাহিত্যের একজন নিবিষ্ট পাঠক। তাঁর সিটের ওপর লাল কাপড়ে বাঁধা একটি ছোট বই নজরে এলো। ‘এ হলো আমার মাস্টার হেমিংওয়ে,’ আমাকে বললেন তিনি। আসলে, যেখানে তিনি সবচেয়ে কম প্রত্যাশিত, সেখানেই তাকে দেখা যায়। এভাবে মৃত্যুর বিশ বছর পরও তিনি টিকে আছেন। তিনি ক্ষণিকের হয়েও দীর্ঘস্থায়ী। মে মাসের সেই সকালের মতো, যখন বুলভার্ড সেইন্ট মিশেলের ওপার থেকে তিনি বলেছিলেন, ‘বিদায়, বন্ধু’।



সূত্র : বিশ্বসাহিত্যের নির্বাচিত প্রবন্ধ

1 টি মন্তব্য: