বুধবার, ২১ জুন, ২০১৭

কল্যাণী রমার স্মৃতিকথা : দমবন্ধ-- দ্বিতীয় পর্ব

কল্যাণী রমা 


দ্বিতীয় পর্ব 
------------------
মা’র ভাইবোনদের মধ্যে দাদুভাই-এর গ্রীন থাম্ব পেয়েছে আর একজন। বাপিমামা(আমার সবচেয়ে ছোট মামা)। এই সুদূর আমেরিকায় বসে দেখবার মত তার দেশী শাক-সব্জীর বাগান। পিভিসি পাইপ দিয়ে মাচা ক’রে তাতে ঝুলছে লাউ।
ঝিঙ্গা, পালংশাক, লালশাক, পুঁইশাক, বেগুন, মিষ্টি কুমড়া, ঢেঁড়স, বড় বড় সাদা দেশী মূলা, টমেটো – কি নেই সে বাগানে। আছে বিরাট গন্ধরাজ লেবুর গাছ। মামী মুশুরীর ডাল করলে গাছ থেকে সেই লেবু পেড়ে সাথে সাথে খাওয়া। এত বছর ধরে যে প্লাম গাছটা ছিল, এবার পোকা হওয়ায় তা কেটে ফেলতে হয়েছে। প্রিয় গাছ হারানোর শোক স্বজন হারানোর মতই। কী মিষ্টি যে ছিল এই প্লাম। এত রস! মা তো সব সময় বলত, ‘নিয়ে এসে বেসিনে মুখ রেখে খা’। চারদিকে রস পড়বে। অনেক প্লাম ওয়াইন বানিয়েছে বাপিমামা এই প্লাম থেকে। 

তখন আমরা ছোট। ভট্‌, ভট্‌, ভট্‌। আকাশ ফাটানো দারুণ শব্দ। কি ব্যাপার? বাপিমামা ঢাকা থেকে রাজশাহী আসছে চার বন্ধু নিয়ে। তখন বুয়েটের ছাত্র। মোটর সাইকেলের সাইলেন্সর খুলে নিয়েছে যেন সবাই জানতে পারে। সেবার বাপিমামা আমাদের অবাক ক’রে দিয়ে বন্ধুদের নিয়ে চখা শিকার করতে গেল। এখনো দেখি শিকার করবার নেশাটা বাপিমামার আছে। ডিপ সি তে যায় মাছ ধরতে। সে সব মাছ আমার থেকে লম্বা। 

দিদার কাছে সবসময়ই বাপিমামার দস্যিপনার কথা শুনেছি । ছেলেবেলায় বাপিমামা আর কাজলমামায়(আমার বড় মামা)এদিকে তো খুব ভাব। কিন্তু মারামারিতেও কম যায় না । রাতে মাথার কাছে বাটি নিয়ে ঘুমাত। রাতে উঠে নাকি দাদাকে কেটে ফেলবে। বাপিমামা ঘুমালে মাথার কাছ থেকে বটি সরানো দিদার এক কাজ। আমি তাই ভাবি। এমন কান্ড আমার ছেলেমেয়ে করলে আমি বুঝি বাকি জীবন ট্রমাতেই ভুগতাম। দিদা নির্বিকার। পাঁচ ছেলেমেয়ে। একটু দুষ্টামি তো ওরা করবেই। বড় হ’লে নিজেই শান্ত হবে। ওত উথাল পাথাল করবার কি আছে? 

এদিকে দস্যি হ’লে কি হবে? যখন বুয়েটে পড়ে তখনো দেখেছি বাপিমামা রাজশাহী এলে দিদার কাছে গুটিসুটি মেরে ঘুমাত। আর দিদার বাড়ি তো আমাদের পাশেই। মানে দিদার বেডরুম আমাদের পাশের বেডরুমেই। আমিও তো। মার সাথে ঝগড়া হয়েছে। ব্যাস, চললাম। দিদার বাড়ি। পাশের ঘরে। দিদার খাটের পাগুলো গোল গোল করে কেটে বানানো। গাঢ় খয়েরী রঙ সে খাটের । জানালার পাশেই দিদার খাট রাখা।শীত, গ্রীষ্ম বারো মাস জানালা খুলে ঘুমায় দিদা। দম নাকি বন্ধ হ’য়ে আসে তা না হলে। মীরাদিদাও এমন। দিদার পাশে শুয়ে দিদার নরম তুলতুলে মোটাসোটা হাত নিয়ে খেলা করতাম আমি। চামড়ায় অনেক ভাঁজ বয়সের ভারে। এক একটা ভাঁজ যেন জীবনের ফেলে আসা বছরগুলোর অভিজ্ঞতা। গাছের গায়ের রিং-এর মত? আমি নিশ্চিন্ত মনে দিদার পাশে ঘুমিয়ে পড়তাম। বর্ষিয়সী জীবনের অভিজ্ঞতা আর ভালোবাসা এমন ক’রে পুরোটা জীবনই আমাকে ঘিরে রেখেছিল। আমি নির্ভয়ে নিঃশ্বাস নিতে পেরেছিলাম। যেন কখনো কোন চিন্তা নেই। মাথার উপর একটা হাত আছে। নরম তুলতুলে। চামড়ায় অনেক ভাঁজ বয়সের ভারে। 

বাপিমামা তার সিভিল ইঞ্জিনিয়ারীং-এর সব পড়াশোনাও দিদাকে বোঝাত। রাজশাহী বাসার বারান্দা থেকে দেখা যায় যে জলের ট্যাঙ্ক, কিভাবে তা বানানো হ’ল? কিভাবে তা কাজ ক’রে? দিদা সব বুঝে যাচ্ছে। দাদুভাই-এর কি মুচকি হাসি! ‘তুমি এখন জলের ট্যাঙ্কের কারুকার্য-ও বুঝে যাচ্ছ?’ ‘বুঝব না কেন? কেউ ভালো ক’রে বোঝাতে পারলে পৃথিবীর সব জিনিস বোঝা যায়।’ দিদা পড়তে খুব ভালোবাসত। ননস্টপ পড়া। ‘বই নেই পাশে। তাতে কি? হলুদ, লবণ এসেছে যে ঠোঙা ক’রে তাই পড়ে ফেলি।’ দাদুভাই বলত, ‘ঠোঙা সাহিত্য।’ কত রান্না যে পুড়েছে এই ভাবে। দিদা ইংরেজী বই ও পড়ত। স্কুলের বেশি আর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা পাওয়ার সুযোগ হয়নি দিদার। বিয়ে হয়ে গেছে পনেরো বছর বয়সে। কিন্তু কি অসীম উত্‌সাহ পড়াশোনা করবার। পি এইচ ডি করবার সময় যেসব পি এইচ ডি থিসিস আনত মা রেফারেন্স হিসাবে পড়বার জন্য, মা’র আগে দিদার তা পড়া শেষ। কতটুকু কি বুঝত দিদা জানি না, কিন্তু বই-এর নেশা থেকে দূরে রাখতে পারেনি কেউ কোনদিন তাঁকে। যারা বই পড়ে তাদেরও খুব ভালোবাসত দিদা। নাত জামাই লালকে একটা সোনার জল ক’রা বুকমার্ক দিয়েছিল দিদা। জীবনের ভালোবাসা চোখের জল নয়, সোনার জলেই মোড়া থাকে। 

তখন বাপিমামা ঢাকায় চাকরি করে। কিন্তু হঠাত্‌ কি ব্যাপার? রাত প্রায় পার ক’রে বাড়ি ফিরছে। কাজলমামার সাথে থাকে। মহাচিন্তা। কত কি 

খারাপ কথা মনে আসে। খোঁজ খোঁজ খোঁজ। পরে জানা গেল বাপিমামা দু’টো চাকরি নিয়েছে। একটা চাকরিতে কাজপাগল বাপিমামার কাজ কম হ’য়ে যাচ্ছিল? 

বাবার খুব প্রিয় ছিল বাপিমামা। আর বাপিমামারও দাদাবাবু। বাবা আজ নেই। কিন্তু অসম্ভব প্রাণোচ্ছল মানুষ বাবার অন্ধ ভক্ত বাপিমামা সেই তেমনই আছে। এই সেদিনও আমায় বলল, ‘দাদাবাবুর কাছে দিদির পরেই ছিলাম আমি।’ আমার মনে হ’ল বাপিমামা বুঝি সেই বুয়েটের ছাত্র জীবনেই ফিরে যাচ্ছে। সেই রমনাতে একসাথে হেঁটে চলা আর তারপর বাপিমামার ভাষায় ফ্রিতে খাবার খাওয়া। হোস্টেল জীবনে বাসার রান্না খাবারের লোভ কেউ ছাড়ে না। 

হঠাত একদিন বাপিমামার কাছ থেকে ফোন এল। তখন আমাদের বাসায় ফোন ছিল না। প্রতিবেশীর বাসায় পড়িমড়ি মা’র দৌড়। বাপিমামার গলা। ‘বাবাকে বল দশ হাজার টাকা দিতে। প্রশ্ন ক’রা যাবে না কেন।’ তখনকার দিনে দশ হাজার টাকা অনেক টাকা। মা, দিদা সবাই দাদুভাইকে বলল, ‘এটা কি ঠিক হ’বে? কিছু না জেনে এতগুলো টাকা দিয়ে দেবে?’ দাদুভাই-এর উত্তর, ‘হয় টাকা যাবে নয় ছেলে যাবে। টাকাই যাক।’ প্রশ্ন না করে বাপিমামাকে দশ হাজার টাকা দিয়ে দিল দাদুভাই। পরে জানা গেল বাপিমামা দুবাই গেছে। দুবাই গিয়েও কত যে কান্ড! পরবর্তী জীবনেও সবসময়। অথচ এইসব নিয়েই কবিতা মামী বাপিমামার সাথে সুখে সংসার ক’রে যাচ্ছে । 



দুবাই থেকে কত কি যে পাঠাত আমাদের বাপিমামা। আমার লাল রঙের সাইকেল। অমন সাইকেল ক্যাম্পাসে কারো ছিল না। রোলার স্কেটস এল। সেও শুধু আমাদেরই আছে। এক পা যেতে পারি না। তাতে কি? আর কারো তো নেই। মনিমার লম্বা চুলের জন্য কমলা রঙের হেয়ার ড্রায়ার। বাপিমামা দিদাকে দিল ফ্রিজ আর টিভি। এগুলোও তখন ক্যাম্পাসে কোন বাড়িতেই ছিল না। দাদুভাই-এর প্রতিদিন ফ্রেশ ফেশ বাজার করবার নেশায় আমাদের বাসার ফ্রিজে বেশির ভাগ সময় যদিও শুধু জল রাখা হ’ত। রাজশাহীর গরমে ঠান্ডা জলের বোতল আমরা কিছুক্ষণ গালে ছুঁইয়ে রাখতাম, তারপর ঢক্‌ ঢক্‌ করে খেতাম। কিন্তু বই-এর পরই দিদার টিভির নেশা হ’য়ে 

গেল । উলের সোয়েটার বুনতে বুনতে টিভির সামনে বসে থাকা দিদার চেহারা মনে করবার জন্য আমার কখনো চোখ বন্ধ পর্যন্ত করতে হয় না। সন্ধ্যা হলেই বন্ধুরা আমাদের বাড়ি আসত। সবাই মিলে মাটিতে চাদর পেতে বসে বিটিভি তে টারজান দেখতাম। 

‘ও ও ঔ---’। আর দুধ জমিয়ে নতুন পাওয়া ফ্রিজে আইস্ক্রীম বানানো হ’ত। কিভাবে আইস্ক্রীম বানাতে হ’য় জানতাম না, তাতে যে ক্রীম দিতে হ’য় তাও জানতাম না। শক্ত ইঁটের মত দুধের কিউব, তাই আমরা চেটে চেটে খাই। আবেশে চোখ বুজে আসে। 

আজ ৯ই মে। হৈ-এর জন্মদিন। ১৭ বছর আগে এই দিনে দেখি মাথার কাছে দাঁড়িয়ে আছে মা। ছোট্ট হৈ-কে কোলে ক’রে দেখাচ্ছে আমাকে। আমি হসপিটালের বেডে, অনেক কমপ্লিকেশনস্‌ হয়েছিল হৈ-এর জন্মের সময়। মা-র চোখে জল। তার নিজের মেয়েটা মরে যাবে নাতো? বাচ্চাটা? 

আর পাশে দাঁড়িয়ে আছে আমার ননদ মৌ। দাঁড়িয়ে আছে পথিক। ওর বর। নীল রঙের বেলুন নিয়ে এসেছে ওরা। ‘ইটস আ বয়।’ সাথে কার্ড। মা পেঙ্গুইন আর বাবা পেঙ্গুইন –এর সাথে বেবী পেঙ্গুইন। মা বাবা আগলে রেখেছে বাচ্চাকে। পশুদের মধ্যে দেখি বাচচাকে আগলে রাখবার জন্য আশে পাশের অন্যদের আক্রমণ করতে। মানূষ তার সেই পশু অবস্থা পেরিয়ে এসেছে। সে নিজের বাচ্চাকে রক্ষা করতে অন্যদের আক্রমণ করে না। সে স্বার্থপর নয় । মানুষের মনুষত্ব তার নিজের অস্তিত্বকে অতিক্রম ক’রে যায়। 

মৌ চারমাসের ছোট্ট ইমনকে ওর শাশুড়ির কাছে রেখে সারারাত আছে আমার কাছে। এই প্রথম ইমনকে রেখে বাইরে থাকা। তারপরেও আমার বাকি জীবন মৌ নিরপেক্ষভাবে সবসময় আমার হাতদুটো ধরে রেখেছে। মানুষের জীবনে কত কঠিন সময়ই যে আসে। সে শূন্যে ভাসতে থাকে। তাকে বুকের কাছে আবার টেনে নেওয়ার মত মানুষ পৃথিবীতে খুব বেশি নেই। চিরদিনই মানুষের ভালোবাসা আমার দুই হাতের মুঠো উপচে পড়েছে। আর ওদের ছোট মেয়ে এলা তো আগের গ্রামের বাড়িতে আমার পিছন পিছন সারাক্ষণ রবিন পাখির বাসা খুঁজে বেড়াত। অবাক হ’য়ে দেখত ট্রী সোয়ালোর উড়ে যাওয়া। প্রকৃতি প্রেমিক এলা।ওদের পুরনো বাড়ি ছেড়ে আসবার সময় অনেকক্ষন বাড়ির দেয়াল টা জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে ছিল ও। "I am hugging the house-it will be lonely and I miss it already." 

হৈ-এর জন্মের পর নানা উপহার নিয়ে প্রথম এক মাসের মধ্যে ওকে দেখতে এসেছিল দূর দূর থেকে আমার বন্ধুরা। ম্যাজাই? 

ওয়াশিংটন ডি সি থেকে হৈ-কে দেখতে এসেছিল বুবুন, সন্তু, চন্দন। প্রায় বাইশ ঘন্টা গাড়ি চালিয়ে। আমি তো গাড়িতে দুই ঘন্টার বেশি বসে থাকতে পারি না। ‘কিসের টানে কেমন ক’রে’ মানুষ এমনটা করতে পারে? 

পারডু থেকে এসেছিল আমার প্রাণের বন্ধু নীল। ওর সাথে আই আই টি-তে থাকতে সালুয়ার বনে কত যে সাইকেল চালিয়েছি। আর সেই সাথে গলা ছেড়ে আমাদের গান, ‘হা রে রে রে রে রে, আমায় ছেড়ে দে রে দে রে।’ অসম্ভব মেধাবী নীল। যদিও প্রথম যখন ও এল, পরীক্ষায় বসেছি, নীল মাঝামাঝি সময়ে উঠে রওয়ানা দিল। আমি ভাবলাম,’বেচারা নীল, কিছুই উত্তর করতে পারেনি।’ 

পরীক্ষা শেষে আমি, ‘কি রে সুবিধা হ’ল না?’ 

‘না তো, সব উত্তর করেছি।’ 

শুধু সেই পরীক্ষায় নয়, তারপর যতদিন খড়গপুরে ছিল, সব পরীক্ষায় ‘এ’ পেয়েছিল নীল। যদিও টিচার ওর পেপার পড়ে দেওয়ার জন্য ওকেই ডাকত। নিজের হাতের লেখা নিজেই পড়তে পারত না ও। এতই হিজিবিজি। 

বিরাট বিজ্ঞানী হয়েছে আজ নীল। তবু এখনো মনে পড়ে এস এন হলের ওই ছোট রুমে কেমিস্ট্রি পড়তে পড়তে ওর ঘুরে ঘুরে নাচ, ‘তার অন্ত নাই গো নাই, যে আনন্দে গড়া আমার অঙ্গ।’ ওর শরীরের প্রতিটি অণু পরমাণু নেচে উঠত অজানাকে জানবার আনন্দে। আমি ওকে মাদাম কু্রী ভাবতাম। 

ওয়াশিংটন ডি সি থেকে এসেছিল আমার প্রাণের অংশ মালা। ডেটন থেকে পাঁচ মাসের নীল কে নিয়ে সুপ্রিয় ভিজি। সবাই হৈ-কে দেখবে। মালা কোথা থেকে যেন রুপার জল করা এক এলবাম জোগাড় করেছিল। উপরে হৈ-এর নাম খোদাই ক’রে ও হাজির। প্রিয় টংসার কথা মনে ক’রে ছোট্ট হৈ-এর জন্য মনে ক’রে খয়েরী রঙের একটা স্টাফড কুকুর আনতেও ভুলে নি ও। ভীষন নরম তুলতুলে। ভিজি কেমন ক’রে পাঁচ মাসের নীল কে নিয়ে এত সময় পেল জানি না। বানিয়ে আনল লেস লাগানো নীল রঙের এলবাম। এলবাম বোঝাই আমার আর হৈ-এর ছবি। যত ছবি হৈ হওয়ার পর ওদের পাঠিয়েছিলাম সব। কম্বল মুড়ে সারাদিন প্যাকেট ক’রে রাখতাম ব’লে ভিজি হৈ-কে ডাকত প্যাকি বেবি বলে। 

পৃথিবীতে তোমাকে জাজ্‌ করবার লোক তো কিছু কম নেই। মিথ্যাকে সত্য বানানোর লোকও কম নেই। কীটের মত এইসব মানুষ পুরোটা জীবন ধরে তোমাকে কুঁড়ে খাবে। কিন্তু বন্ধুরা? সবসময় হাতটা ওরা বাড়িয়েই রেখেছে। কোন কিছুর বিচার না করেই। 

পথিক বানিয়েছিল এক অসাধারণ গাঢ় নীল আর হাল্কা নীল মিলিয়ে প্যাচ ওয়ার্ক কুইল্ট। বাংলার বাঙ্গালী সমাজে ছেলেরা যেখানে জামার একটা বোতাম খুলে গেলে তা আর সেলাই ক’রে লাগাতে পারে না সেখানে প্যাচ ওয়ার্ক কুইল্ট? আমাদের চোখ চড়কগাছ। 

হৈ-এর জন্য সঞ্চিতা বানিয়েছিল সূর্যমুখি হলুদ রঙের আর একটা প্যাচ ওয়ার্ক কুইল্ট। খুব অসাধারণ সব কুইল্ট বানাত সঞ্চিতা। ছোট ছোট গল্পের টুকরো বুনে আস্ত একটা জীবন যেন। 

ইন্ডিয়া থেকে আমার প্রিয় বন্ধু সুজি ইউ এস এ এসেছিল তখন। ওর সাথে আই আই টি-র এস এন হলে কাটানো রাতের কথা মনে পড়ে। ছাদে চাদর বিছিয়ে শুয়ে আছি। ঝমঝম ক’রে বৃষ্টি হচ্ছে। ভিজে যাচ্ছি। ছাতিম ফুলের গন্ধ বুকের ভিতরটা মুচড়ে দিচ্ছে। সুজি একই দেশে এসে আমার হৈ_কে দেখবে না তা কি হয়? সুজিও এল স্টউটনের বাড়িতে। তখন হৈ-এর এক মাস মত বয়স। ও ভুলল না নেটিভ আমেরিকান ড্রিম ক্যাচার আনতে। উইলোর ডাল দিয়ে হাতে বোনা। মাঝখানে মাকড়সার জালের মত। পাখির পালক ঝুলছে। পুঁতি দিয়ে গাঁথা। নেটিভ আমেরিকানরা বিশ্বাস ক’রে রাতের বাতাস স্বপ্ন আর দুঃস্বপ্ন দিয়ে ভরা। যদি বিছানার যেখানে ভোরের সূর্য এসে পড়ে সেখানে ড্রিম ক্যাচার ঝুলিয়ে রাখা যায়, তবে তা সব ধরণের স্বপ্ন জালের ভিতর আঁকড়ে ধরে। সুন্দর স্বপ্নগুলো জালের মাঝ থেকে ধীরে ধীরে পালক বেয়ে নেমে নীচে ঘুমিয়ে থাকা মানুষটিকে ঘিরে ধরে। আর দুঃস্বপ্নগুলো জালের মধ্যে আটকা পড়ে ভোরের সূর্যের আলোয় পুড়ে ধ্বংস হয়ে যায়। আমার হৈ-এর আজ সতেরো বছর বয়স। আমি ভাবি এই সতেরো বছর ধরে ওর সব দুঃস্বপ্ন বুঝি ওই ড্রিম ক্যাচারে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। আর স্বপ্নগুলো ওকে আগলে রেখেছে। 

একজন বন্ধু আমাকে বলেছিল যখন খুব মন খারাপ হ’বে তখন লিখবি। দেখবি থেরাপির মত কাজ করবে। যত বেদনা বাড়বে তত শক্তিশালী হ’বে লেখা। রক্তাক্ত হ’য়ে যাবার মত মন খারাপ, শরীর অবশ হ’য়ে যাবার মত মন খারাপ আমার অনেক হয়েছে। আমি লিখেছি। তবু বারবার মনে হয়েছে যদি আমায় লিখতে না হ’ত। 

'হ্যাঁ, এখনো হৈ-এর জন্মের দিনটার প্রতিটি মুহুর্ত মনে আছে আমার। কি ভয়ানক উতকন্ঠা।' মা-র গলা ধরে আসে। হৈ-এর জন্মদিন আর আমার জন্মদিন কাছাকাছি। মে মাসে। আর এবার তো আমার বিগ মাইল স্টোন বার্থডে। পঞ্চাশ বছরের। মা সেভাবেই টিকিট কেটেছিল যেন দেশ থেকে এসে দু'জনের জন্মদিন করতে পারে। শেষ পর্যন্ত হ'ল না। 

হৈ, তাথৈ দু’জনেরই জন্মের দিন থেকে শুরু ক’রে ছেলেবেলার অনেকটা সময় কেটেছে মা’র সাথে। হৈ-কে কোনদিন ডে কেয়ারে কাটাতে হয়নি। তাথৈও জীবনের প্রথম সাড়ে তিন বছর ডে কেয়ারে যায় নি। ওরা যখন ছোট ছিল প্রথম ছয় বছর আমি চাকরি করিনি। মাঝে মাঝেই মা এসে সাহায্য করেছে। হৈ, তাথৈ খুব পিঠাপিঠি। প্রায় জমজ বাচ্চার মত। আমার তো মাথা খারাপ হ’য়ে যেত। মা ছিল বলে রক্ষা। আমি তো প্রায়ই বিকালে গাড়ি নিয়ে মগজে বাতাস লাগাতে বের হ’য়ে পড়তাম। তারপর আমি যখন চাকরি শুরু করলাম, মা গরমকালে থেকেছে। ফলে গরমকালের লম্বা তিনমাস ওরা বাড়িতে থাকতে পেরেছে। আমার সৌভাগ্য! স্টউটনের বাড়ির মাঠে আমার দুই কুকুর টংসা সিম্বার সাথে দৌড়াদৌড়ি করেছে হৈ, তাথৈ। জলের হোস নিয়ে একজন আরেকজনকে ভিজিয়েছে। বাঁধনহারা দিন উপহার পেয়েছে। আর মা শুধু বলে গেছে, ‘করো না, আর করো না।’ কে কার কথা শোনে! যে বছরগুলো মা আসতে পারেনি, হৈ, তাথৈ-কে সামার ক্যাম্পে যেতে হয়েছে। মিলিটারি শাসন। ঘড়ি ধরে গাছে চড়, ঘড়ি ধরে নৌকা বাও। 

শুধু হৈ, তাথৈ নয়, আমার মাসতুত বোন প্রমার মেয়ে রাইকেও বাচ্চাবেলায় রেখেছে মা। প্রমা আর ওর বর শুভাশীষ কিছুতেই ভুলতে পারে না তা। পি এইচ ডি র থিসিসে লিখে দিয়েছে মা কে ছাড়া কিছুতেই ওদের পি এইচ ডি হ’ত না। 

“এটা কি শাক,মা?” –লালের প্রশ্ন। 

“এই তো, তুমি যে ফারমারস মার্কেট থেকে এনেছিলে।মটরশুঁটির শাক। একটু বেগুন দিয়ে রেঁধেছি।” 

কত রকম রান্না যে করে মা। আমেরিকান সবজি আর মাছ দিয়ে দেশী রান্না। বেগুনী বাঁধাকপি, ব্রাসেল স্প্রাউটস, স্প্যাগেটি স্কোয়াস, ফেনেল, মোটা মোটা ঘ্যাঁসঘ্যাঁসে মাস্টার্ড গ্রীন, স্বাদহীন ক্যাটফিস, একমাত্র ত্রাণকর্তা ট্রাউট। বাঁধাকপির পাতা, ফুলকপির ডাঁটা, বেগুনের বোঁটা আর অন্য যে সব্জি বাঁচে তা দিয়ে ক’রে ফেলে ‘গারবেজ তরকারি।’ এই নামটা দিয়েছে আমার ছোটবোন শ্যামার বর সুজয়। ভারি মজার ছেলে ও। ধীর স্থির।ভদ্র। চিন্তায় আর ব্যবহারে বৈপরীত্য নেই সুজয়ের।দায়িত্ব নেওয়ার বেলায় দু’পা এগিয়েই রেখেছে ও। অথচ অনেক বই পড়ে ফেলেছে জাতীয় আঁতলামো নেই কোন।নীরবকর্মী।ওর বক্তব্য মা যখন থাকে তখন গারবেজের পরিমাণ কমে যায়। ট্র্যাসের বিন হাল্কা হয়ে যায়। মা সব ফেলে দেওয়ার অংশ দিয়ে তরকারি রেঁধে ফেলে। ‘গারবেজ তরকারি’। 

ফারমারস মার্কেটে মটরশুঁটির শাক শুধু নয়, একবার পাওয়া গেল পাটশাক। কি উত্তেজনা মা’র। মুশুরীর ডালের ছিটা দিয়ে রেঁধে ফেলল তা।উপরে একটু ঘি দিয়ে নামাতে হয় এই শাক। পাটশাক আমার খুব প্রিয়। খেতে গেলেই দাদুভাই-এর কথা মনে পড়ে। খুব ভালবাসত পাটশাক দাদুভাই। ডাকত ময়মনসিংহের ভাষায় ‘নাইল্লা শাক’। এই নাইল্লা ক্ষেতে বসেই নাকি দাদুভাই প্রথম বিড়ি ফুঁকতে শিখেছিল। সেই সময়েও নিয়ম ভাঙার নিয়মটাই ছিল বড় হ’য়ে উঠবার পথ। 

মানুষের সাথে কিভাবে যেন কোন কোন খাবারের স্মৃতি মিশে থাকে। মাছের তেলের বড়ার কথা যখন ভাবি খুব দিদার কথা মনে হ’য়। শাহী টুকরা, কমলালেবু দিয়ে কই মাছ, ফুলকপির রোস্ট, সবজি দিয়ে মুগডাল, ডিমের হালুয়া, মিষ্টি মিষ্টি মুরগির কোর্মা আর রাজশাহীতে বসে জীবনের প্রথম প্যানকেক-এর কথায় হোস্নেয়ারা মাসী। মা’র প্রিয় বন্ধু, আমার প্রাণের বন্ধু সুস্মির মা, বিদগ্ধ বুদ্ধিজীবি আলী আনোয়ার মেসোর স্ত্রী। কত মানুষ যে কত চব্য, চোষ্য,লেহ্য, পেয় খেয়েছে মাসীদের বাসায়। শুধু কি আমরা? হয়ত আমাদের বাড়ি কোন আত্মীয় এসেছে। ব্যাস, হ’য়ে গেল। হোস্নেয়ারা মাসীর বাসায় নিমন্ত্রণ। টেবিলের এমাথা থেকে ওমাথা খাবার। 

প্রত্যেক দিন বিকালে আমরা বন্ধুরা হাজির হতাম সুস্মিদের বাসায়। ওদের রাজশাহী ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসের পশ্চিম পাড়ার বাড়ির খাওয়ার টেবিল এখনো আমার ছেলেবেলার স্মৃতিতে উজ্জ্বল। চোখ বন্ধ করলেই ওদের বাসার আলুর চপের গন্ধ পাই। প্রতিদিন খেয়েছি।মাসী একবার মা-কে বলেছিল, ‘উঠতি বয়সের ছেলেমেয়ে। বাইরে গিয়ে কি করবে, আমি তো চোখে চোখে রাখতে পারব না। তার চেয়ে সব বন্ধু মিলে বাড়িতেই আড্ডা দিক। জানব কি করছে।’ আমরাও চপ, কাটলেট খেতে খেতে মাসীর চোখের সামনে থেকে তা জানাতে দ্বিধা করিনি। 

মাসীর মত উদার আর ধর্ম নিরপেক্ষ মানুষ আমি খুব কম দেখেছি। ইউনিভার্সিটির কত ছেলে মেয়ের যে পড়বার খরচ দিয়েছেন মাসী। কত ছেলে মেয়ে যে সুস্মিদের বাড়িতে থেকেছে। মানুষের জন্ম যে শুধু নিজেকে নিয়ে স্বার্থপরের মত বেঁচে থাকবার জন্য নয়, মানুষের জন্ম যে নিজের পাশাপাশি অন্য কারো দায়িত্ব নেওয়ার জন্যও তা মাসী-মেসোকে দেখেই বুঝতাম। ছেলেবেলায় বহুবার ভেবেছি যদি আমার জীবনে মা বদল করবার কোনদিন সুযোগ আসে, তবে হোস্নেয়ারা মাসীকেই ‘মা’ ডাকব। মানুষের মহত্ব চিরদিন চুম্বকের মত আমায় টানে। মানুষের মনুষত্ব। 

শুধু আমার হৈ, তাথৈ-কে রাখাই তো নয়, অফিস থেকে বাড়ি এসে দেখি রান্নাঘরের চূলা, কাউন্টার টপ, বাথরুম, ঘরের মেঝে সব ঝক্‌ঝক্‌ করছে। মা সব ঘষে মেজে পরিষ্কার ক’রে রেখেছে। এত বয়সে কেন এত কাজ ক’রা বলে চীত্‌কার চেঁচামেচি করলে মা’র উত্তর, ‘এখানে তো আর বসে বসে ঘর মুছতে হয় না।’ সেই। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সিন্ড্রেরেলা সবাই। 

আসলে এখানে তো আর দেশের মত দুইজন লোক আর তাদের পাঁচজন গৃহকর্মী মত পরিস্থিতি নয়। মা আপ্রাণ চেষ্টা করে যদি আমাদের একটু পরিশ্রম কম হ’য়। তিয়াত্তর বছর বয়স এখন মা’র। তবুও মা যখন থাকে কোন রান্না করিনা আমি। সব মা’ই সামলায়। আর চেষ্টা করলেই কি হবে মার মত করে মুশুর বেগুন? মুশুর ডাল অল্প সিদ্ধ করে আর তাতে ছোট ছোট ক’রে বেগুন ভেজে সব মিশিয়ে পিঁয়াজ দিয়ে ভাজা ভাজা! অমৃত। 

একদিন রান্নাঘরে ঢুকে দেখি সারা মেঝেময় সব হাড়ি পাতিল, কৌটো। লাল আর মা মিলে সব ক্যাবিনেট থেকে নামিয়েছে। ঝেড়েঝুড়ে সর্ট করে আবার তুলে রাখবে দু’জনে মিলে। 



আমাদের রাজশাহী বাসায় একটা খুব ছোট চা বানানোর হাড়ি ছিল। চা প্রায় আঁটেই না। কোথা থেকে এল? কিসের হাড়ি এটা? মা বলল, ‘না আসলে মন্নুজান হলে যখন হাউস টিউটর ছিলাম এতে ক’রে ভাত রান্না করতাম। তা প্রতিদিনই ভাত বেঁচে যেত।’ তখন বাবাকে মাত্র রাজাকাররা মেরে ফেলেছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে। আমার বয়স সাড়ে চার, শ্যামার দেড়। মা রাজশাহী ইউনিভার্সিটিতে জয়েন করেছে কারো উপর নির্ভরশীল প্রাণী হিসাবে বেঁচে থাকবে না বলে। সাতাশ বছর বয়সে বিধবা হ’য়ে কেমন থাকতে পারে একটা মানুষ তা মা’কে দেখে বুঝতে পারতাম না। কেননা মা’র চোখে কোনদিন জল দেখিনি আমি।একটু বড় হ’য়ে ওই চা-এর হাড়িতে রান্না হওয়া ভাত আর তা বেচে যাওয়ার গল্পটা ভেবে মা কেমন ছিল বুঝতে চেষ্টা করতাম। আমার দম বন্ধ হয়ে আসত। 

তাথৈ সবসময় আমাকে বলে, “Dadeen is an amazing person.” আর হৈ আমাকে একদিন বলেছিল “Do you realize? Dadeen was so young when she lost your dad? But she did not take a husband?” 

আর এক মহাগুণ আছে মা’র। ক্যাম্পাসে কারো হসপিটালে থাকতে হ’বে। সাথে চলল মা। একবার মামী খুব অসুস্থ। রাজশাহীর জেনারেল ওয়ার্ডে রাখা যাবে না। কলেরা, আন্ত্রিকের রোগী যারা, তাদের স্পেশাল ওয়ার্ড। কারো সাথে মেশা যাবে না। এতই দুর্বিসহ সেই জায়গা যে রোগী ছাড়া আর কেউ থাকতে পারে না। মা’র ভ্রূক্ষেপ নেই। মামীর সাথে কয়েকটা দিন সেখানেই কাটিয়ে এল। মামী সুস্থ হয়ে, ‘দিদি, তুমি কিভাবে এ নরকে ছিলে?’ মা নির্বিকার। 

দরজায় কড়া নাড়বার শব্দ। রাজশাহীতে দুপুরবেলা। দরজা খুলতেই, “মা আছে?” 

আমার তো মেজাজ তিরিক্ষি। আবার একজন। এমন আমার মা’কে ‘মা’ ডাকা লোকজন অনেক ছিল। মা কারো স্কুলের খরচ, কলেজের খরচ, বই কিনবার খরচ, খাওয়া থাকার খরচ দিচ্ছে। তখন কত টাকা আর মা পেত ইউনিভার্সিটির লেকচারার হিসাবে। তার উপর বাড়িতে আমাদের এত লোকজন। কিন্তু ‘মা’ ডাক শুনবার লোভ কি ছাড়া যায়? 

হ্যাঁ, এই হ'ল মা। স্বর্গ বলে যদি কিছু থাকে তবে সেই উজ্জ্বল জায়গা থেকে নেমে আসা এক মানুষ। সারাক্ষণই অন্যকে সাহায্য করবার জন্য হাত বাড়িয়ে রেখেছে। কোনদিন কারো অমঙ্গল কামনা করেনি। দানব নামের যে সব মানুষ মাকে ছিঁড়ে ছিঁড়ে খেয়েছে শকুনের মত, তাদের পাপও ক্ষমা ক'রে দিয়েছে। সবসময় ভাবি সেই সব হতভাগ্য ছেলেমেয়েদের কথা যাদের বাবা মা-কে নিয়ে গর্ব করবার মত কিছু নেই। নিজেরটুকু আর নিজেদের ছেলেমেয়েদেরটুকু ছাড়া কোনদিন অন্যের জন্য অল্প একটুও ভাবেনি এইসব বাবা-মা, কোন স্বার্থ ত্যাগ করে নি। 

কেউ যদি মা'কে অপমান ক'রে আমার মনে হয় বুঝি আমার হাত পা কেটে ফেলা হয়েছে। মনে হয় যে রক্তক্ষরণ শুরু হ’ল, সারা জীবনেও বুঝি তা থামবে না। 'অন্যায় যে ক'রে আর অন্যায় যে সহে তব ঘৃণা যেন তারে তৃণসম দহে। ' কোন শব্দটি বেশি শক্তিশালী? অভিশাপ না ক্ষমা? আমার দম বন্ধ হয়ে আসে। 

হৈ, তাথৈ ওদের দাদীনকে খুব ভালোবাসে। 

“একটু সর্‌, আর একটু সর্‌, বসতে পারছি না তো।” বসতে পারবার কথা তো না। আমাদের খাবার ঘর, বসবার ঘর, বারান্দা, করিডোর সব বোঝাই। মণিমা একশ’টা বাচ্চা নিয়ে অনুষ্ঠান করবে। কোনমতে আমরা ঠেলাঠেলি ক’রে বসবার চেষ্টা ক’রি।কাঁকন, পিয়া, গীতি, ফেরদৌসী, মুনা, প্যামেলা, শ্যামা, শিউলি, সিমি, কুহিন, ইরাম, এলি, দীনা, কেয়া, ক্যামেলিয়া, শাওন, নিক্কন, লুবু, শ্যামলী, মিতু, সালেহা, সুস্মি, ময়না, শিমকি, আনন্দ, টুম্পা, কুসুম, রবিন, লিসা, তানিয়া, লোপা, বিদিশা, নাজ, ইয়াসমিন,টিসা,শুচি,সুমন, চুমকি, সুরভি, শ্যামলিনা, সীমা... 

আমাদের বাড়ি পশ্চিম পাড়ায়। পূর্ব পাড়া থেকে রিহারসাল দিতে আসত সুস্মি, ইয়াসমিন, প্যামেলা, সালেহা, আনন্দ, টুম্পা, কুসুম। প্রায় এক মাইল হেঁটে। পথের মাঝে পড়ত শহীদ মিনার। ১৯৭৪ সালে পোড়া ইঁটের টুকরো দিয়ে শহীদ মিনারে অপূর্ব মোজাইক করেছেন বিখ্যাত শিল্পী মুর্তজা বশীর। সন্তানেরা আত্মাহুতি দিচ্ছে আগুনে। মা’র হাত থেকে ফুল ঝরে পড়ছে। তারপর সন্তানেরা আকাশের তারা হ’য়ে যাচ্ছে। 

শহীদ মিনারের চারপাশ ঘিরে বড় বড় মেরুন, গোলাপি আর হলুদ রঙের ডালিয়া, সোনালি রঙের গাঁদা, বেগুনি বোতাম ফুল। শহীদ মিনারের পিছনের দিকটা টিলামত। তার ঢাল বেয়ে না গড়িয়ে আমরা ওই পথ পার হ’ই না। পাশেই রাকসু ভবনের সামনে কড়ই আর শিরীষের গাছ। চুলবুলি কাটা তার ফুল। হালকা সবুজ আর গোলাপি রঙের। আলতো ভালোবাসায় চোখের উপর বুলাতাম কড়ই আর শিরীষের ফুল। আর ছিল প্যারিস রোডে আকাশ ছোঁওয়া মেঘ শিরীষ। ওয়াহিদুল হক কাকুর কাছে গাছের নাম শিখতাম আমরা। 

অনুষ্ঠানের নাম ‘ছেলে ঘুমিও না।’ ছেলে ঘুমালো, পাড়া জুড়ালো গানটার কথা পালটে আমাদের গান, ‘ছেলে ঘুমিও না, পাড়া জুড়াবে না, বর্গী আছে দেশে।’ এখনো মাথার ভিতর গুনগুন করে ওই সুর। ঘরে শত্রু। অস্ত্র তো হাতে তুলে নিতেই হ’বে। 

একশ জনের অনুষ্ঠানে কি যে উত্তেজনা। গায়ক গায়িকার বয়স তিন থেকে ষোল। সাদা শাড়ী লাল পাড় পড়ে গান গাইব। নাচ হ’বে। চর্যাপদ থেকে শুরু ক’রে আধুনিক সময় সব ফুটে উঠবে সেখানে। হরিপদ দাদুর ছেলে অনুপমামা তবলা বাজাবে। অসাধারণ মিউজিক সেন্স অনুপমামার। রাজশাহীর বিখ্যাত উচ্চাঙ্গ সংগীতের ওস্তাদ হরিপদ দাস। মনিমা বহুদিন হ’ল ওঁনার কাছে উচ্চাঙ্গ সংগীত শেখে। খুব একনিষ্ঠ ছাত্রী। ভোরবেলা উঠে রেওয়াজ ক’রে, বিকালবেলা রেওয়াজ ক’রে। গলা খুসখুস করলে বড়ই-এর পাতা গরম জলে সিদ্ধ ক’রে সেই জল খায়।কিন্তু সবাই তো আর উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত ভালোবাসে না। ‘সা’ শুনলেই তাদের ‘যা রে যা’ বলতে ইচ্ছা ক’রে। এমনই এক প্রতিবেশী তো শেষ পর্যন্ত বলেই বসল মণিমাকে নাকি চাঁদা তুলে অস্ট্রেলিয়া পাঠিয়ে দেবে। সব ছেড়ে অস্ট্রেলিয়া কেন? কোয়ালাদের উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত শেখাবে? 

স্টেজের পিছনে ছায়াচিত্রের মত ক’রে বেবীআপা বসে আছে কোলে সন্তান নিয়ে। দেশমাতৃকার প্রতিচ্ছবি। আর আমরা গেয়ে চলেছি, ‘পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে, রক্ত লাল রক্ত লাল রক্ত লাল।’ 

সেদিন ঘেঁষাঘেঁষি ক’রে একশ জন বসেছিলাম পাশাপাশি। তারপর প্রায় চল্লিশ বছর কেটে গেছে। মানুষের খুব কাছে বসবার উত্তাপটুকু মনে আছে আর সেই সাথে গানের সুর। 

মন্নুজান হলের রুমে রুমে ঘুরে আমরা টিকিট বিক্রী করছি। হরিপদ দাদুর জন্য অনুষ্ঠান। ওঁনার শরীর ভালো নেই। অনুষ্ঠান ক’রে যা হ’বে তা ওঁনার চিকিতসায় যদি অল্প হলেও কোন কাজে লাগে। বিখ্যাত সঙ্গীত শিল্পী রফিকুল আলম হরিপদ দাদুর ছাত্র ছিলেন। তিনি আসবেন গান করতে। গান করবে তাঁর স্ত্রী প্রখ্যাত সঙ্গীত শিল্পী আবিদা সুলতানা। গাইবেন বিপুল জনপ্রিয় এন্ড্রু কিশোর। আর শুরুতে আমাদের - বাচ্চাদের সমবেত সংগীত। টিকিট বিক্রী ক’রে আমাদের সোয়েটারের পকেট, প্যান্টের পকেট উপচে পড়ল। মণিমা জানাল চল্লিশ হাজার টাকা জোগাড় হয়েছে। তখনকার সময়ে চল্লিশ হাজার টাকা অনেক টাকা। এ ছিল আমাদের ছেলেবেলার জীবনের এক ভীষণ বড় অর্জন। 

সিরাজউদ্দৌলা নাটক হ’বে। আমার ক্লাশমেট আজাদ হ’বে সিরাজউদ্দৌলা।মনসুর-উল-মুল্‌ক সিরাজউদ্দৌলা হাইবাত জং। বাংলার নবাব আলিবর্দী খাঁর যৌগ্য দৌহিত্র বাংলার স্বাধীন নবাব আর বিহার, উড়িষ্যার নিজাম মির্জা মোহাম্মদ সিরাজউদ্দৌলা ।ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী দুই শত বছর ধরে বাংলা শাসন করবার আগে শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলা । এখনো আজাদের ঔদাত্ত গলা কানে ভাসে। বড় ভালো অভিনয় করেছিল ও। গায়ে কাঁটা দেয় বাংলার পরাজয়, শিকল পড়া দেখে। গলা বুজে আসে। ১৭৫৭ সালের ২৩শে জুন ভাগিরথী নদীতে, পলাশীর প্রান্তরে দুইশ’ বছরের জন্য ডুবে গিয়েছিল বাংলার সূর্য । পলাশীর যুদ্ধ ইতিহাসের পাতা থেকে উঠে এসে আমাদের হৃত্‌পিন্ড রক্তাক্ত ক’রে দেয়। অল্প বয়সে ইতিহাস রক্ত ঝরায়। দিনে দিনে মানুষের স্মৃতিশক্তি লোপ পায়। ১৯৭১-এ বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধও কিভাবে যেন মানুষ ভুলে যায়। ভুলে যায় কে তার শত্রু ছিল। মীর জাফররা আজও জিতে যায়। 

আলেয়া হয়েছিল লিসা। আজকের বিখ্যাত রবীন্দ্র সঙ্গীত শিল্পী লাইসা আহমেদ লিসা। এখন ওর গান শুনে চোখে জল আসে। বুকের ভিতরটা মুচড়ে দিয়ে যায় ওর সুর। কিন্তু ছেলেবেলায় শুধু গান নয়, অসম্ভব ভালো নাচ আর অভিনয় করত লিসা। আমাদের নাটকে লিসাকে নাচ শিখিয়ে দিয়ে গেলেন বাদল মাষ্টার। আলেয়া লিসা ছাড়া আর কাউকে মানাত না। কী গান, কী নাচ, কী অভিনয়। নাজ তো আজ জানালো লিসা নাচের সাথে নিজে গান গেয়েছিল, 

"কেন প্রেম যমুনা আজি হলো অধীর, 

দোলে টলোমলো রহে না স্থির।" 

দর্শকের সারি থেকে একজন পাঁচশ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করল আলেয়ার অভিনয় দেখে। তখনকার দিনে পাঁচশ টাকা? একজন সোনার চেইন-ও ঘোষনা করল। আমাদের তো চোখ ছানাবড়া। 

লিসার দাদা টিয়াজ হয়েছিল গোলাম হোসেন। আজ টিয়াজ অনেক বড় ডাক্তার হয়েছে। সেই সাথে বড় রবীন্দ্র-সঙ্গীত শিল্পী ইমতিয়াজ আহমেদ। কিন্তু এখনও মনে পড়ে গোলাম হোসেনের ভূমিকায় টিয়াজকে। আর ওর লম্বা কুর্নিশ। 

প্লেটো হয়েছিল মোহনলাল। মোহনলাল আর মীর মদন নবাবের পক্ষে প্রাণপণ যুদ্ধ করেছিল। মীর মদনের মৃত্যুর পর মোহনলাল ব্রিটিশ সেনাবাহিনীকে সাথে সাথে আক্রমণ করতে চেয়েছিল। কিন্তু সিরাজউদ্দৌলা বিশ্বাসঘাতক মীর জাফরের কথা শুনে মোহনলালের মতামতকে কোন পাত্তাই দেয় নি। প্লেটো কি ভালোই যে ফুটিয়ে তুলেছিল দেশপ্রেমিক মোহনলালের চরিত্র। আর মীর জাফরের চরিত্রে রোমেল। মীর মীরন সালেহা। 

ঘসেটি বেগমের (মেহের-উন-নিসা বেগম) ভূমিকায় অভিনয় করেছিলাম আমি। ঘাগড়া আর উড়নিতে কারুকাজ। পরনে মণি মাণিক্যের শেষ নেই। প্রচন্ড ধনী সিরাজের মাসী। কিন্তু সিরাজের শত্রু। 

আর শুচি বলল সিরাজউদ্দৌলার সুন্দরী স্ত্রী 'লুৎফা'-র 

চরিত্রে ছিল সুমন। 

নাদুস নুদুস ভুঁড়ি নিয়ে, গলায় সোনালি পুঁতি পুঁতি মালা পড়ে হেলেদুলে জগত্‌ শেঠ হয়েছিল সুস্মি। চমৎকার গোঁফ। 

উমিচাঁদ হয়েছিল রুমি। জগত্‌ শেঠ, উমিচাঁদ, মীর জাফর মিলে সিরাজউদ্দৌলার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করায় পলাশীর প্রান্তরে পরাজয় হ’ল স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার।লর্ড ক্লাইভ আর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী জেঁকে বসল ভারতবর্ষে। সুমন হয়েছিল লর্ড ক্লাইভ।শ্যামা, পিয়া আর ছোট ছোট ওদের বয়েসী মেয়েরা সেজেগুজে লর্ড ক্লাইভের বলরুমে নেচেছিল। দুলে দুলে কী চমত্‌কার সে নাচ! 

অবশেষে মীর জাফর আর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর চুক্তিমত মীর জাফরের ছেলে মীর মীরনের আদেশক্রমে ১৭৫৭ সালের ২রা জুলাই সিরাজউদ্দৌলাকে হত্যা ক’রে ঘাতক মোহাম্মদী বেগ। মোহাম্মদী বেগের কালো পোশাক আর তলোয়ারে এত চমতকার মানিয়েছিল পাপ্পুকে যে আমরা ভয়ে কেঁপে উঠেছিলাম। সার্থক অভিনয় পাপ্পুর। 

ইসমাইল ভাই দারুণ মেক আপ দিয়ে আমাদের নবাব, বেগম, বিশ্বাসঘাতক, ঘাতক বানিয়ে ছেড়েছিলেন। সুস্মি তো বলল বিপুল সাফল্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের অনুরোধে আমরা নাকি দু'বার সিরাজউদ্দৌলা করেছিলাম। একবার নজরুল মিলায়তনে, একবার জুবেরী ভবনে। 

আমাদের রিহারসাল হ’ত লিসাদের বাসায়। ইউনিভার্সিটির প্রগতিশীল শিক্ষক মফিজ চাচা, হাসান আজিজুল হক চাচা, আলী আনোয়ার চাচা, নাজিম মাহমুদ চাচা সবাই আমাদের উত্‌সাহ দিতে, সবাই আমাদের নাটক শেখাতে উপস্থিত। মূল নির্দেশক ছিলেন জাহিদুল হক টুকু চাচা। সাথে থাকতেন সুখেন কাকু। মাঝে মাঝে কাজলার মোড় থেকে তেল চপচপ সিঙ্গারা আসত। লিসাদের বারান্দায় একতলা থেকে দুইতলা উঠে গেছে জুঁইফুলের গাছ। মাতাল ক’রা গন্ধ। সিঙ্গারার গন্ধ না জুঁইফুলের গন্ধ কিসের টানে আমি যেতাম মনে নেই। তবে আজ যখন পাপ্পুকে জিজ্ঞাসা করলাম ‘মনে আছে সিরাজদৌল্লা নাটকের কথা’? ও হুঁড়মুড় ক’রে প্রায় চল্লিশ বছর আগের কথা বলে উঠল। কারা কারা অভিনয় করেছিল সব ওর মনে আছে। যে ভালোবাসা বুকের ভিতর দাগ কেটে যায় তা সুযোগ পেলেই মাথায় মুকুট পড়ে সামনে এসে দাঁড়ায়। 

‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি 
আমি কি ভুলিতে পারি 
ছেলেহারা শত মায়ের অশ্রু গড়ায়ে ফেব্রুয়ারি 
আমি কি ভুলিতে পারি’ 

সুরকার শহীদ আলতাফ মাহমুদ। গীতিকার আব্দুল গাফফার চৌধুরী। 

প্রতিবছর ২১শে ফেব্রুয়ারিতে ভাষা শহীদদের শ্রদ্ধা জানাতে এই গান গেয়ে আমরা শহীদ মিনারে ফুল দিতে যেতাম। চাচীদের পরনে সাদা শাড়ি কালো পাড়। গায়ে কালো চাদর। চাচাদের পরনে সাদা পাজামা, পাঞ্জাবী। ছোট এক টুকরো কালো কাপড় দিয়ে বানানো ব্যাজ বুকের কাছে পিন দিয়ে আঁটা। হাতে ফুল। খালি পা। প্রভাতফেরি। রাত বারোটা এক মিনিটে ফুল দিতে আসতেন ভাইস-চ্যান্সেলর, নানা রাজনৈতিক দল, ইউনিভার্সিটির শিক্ষক, শিক্ষিকাবৃন্দ। সাদা আর লাল রঙে আলপনা আঁকা শহীদ মিনারের বাঁধানো চত্বর। 

রীদের পর রীদে ঢেকে যেত শহীদ মিনারের সামনেটা। 

আমি কয়েকবার মাত্র রাত বারোটা এক মিনিটে ফুল দিয়েছি। আমরা বাচ্চারা সাধারণতঃ ভোর ছয়টার দিকের প্রভাতফেরিতেই অংশ নিতাম। রাত বারোটা এক মিনিট থেকে শুরু ক’রে সারাদিন নানা অনুষ্ঠান হ’ত শহীদ মিনারে, জুবেরি ভবনে, নজরুল ইসলাম মিলনায়তনে। 

প্রভাত ফেরির সামনের দিকে থাকত ছোট্ট পাপ্পু। তখন বছর দুই বয়স ওর। পাপ্পু কোনদিন ওর বাবাকে দেখেনি। ওর জন্ম ১৯৭২ সালের ২৯শে ফেব্রুয়ারি। আমাদের বাড়ির নাম্বার ছিল ডাব্লিউ-৬৭-সি। আর মাস্তুরামাসী অপুভাই, কেয়া, পিয়া, পাপ্পুকে নিয়ে থাকতেন আমাদের পাশের বাসায় - ডাব্লিউ-৬৭-ডি তে। 

১৯৭১ সালের ২৫শে নভেম্বর রাজশাহী শহরের বাসা থেকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক; অপুভাই, কেয়া, পিয়া, পাপ্পুর বাবা; মাস্তুরা চাচীর স্বামী মীর আব্দুল কাইয়ুম চাচাকে তুলে নিয়ে যায় পাকিস্তানী সেনাবাহিনী। রাত নয়টার দিকে একটা লোক কাইয়ুম চাচাদের বাসায় গিয়ে জানায় যে তাকে বাইরে একজন আর্মি অফিসার ডাকছে। চাচা আর্মি অফিসারের সাথে দেখা করতে যান।এরপর কাইয়ুম চাচা আর কখনো বাসায় ফিরে আসেননি। তখন অপুভাই-এর বয়স ছিল সাড়ে ছয় বছর। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার দু’দিন পরে ১৮ই ডিসেম্বর রাজশাহী শহরের কাছে পদ্মার চরে এক গণকবরে কাইয়ুম চাচার মৃতদেহ পাওয়া যায়। শার্ট আর হাতের আংটি দেখে মৃতদেহ শনাক্ত করা হ’য়। 

আমাদের ফ্ল্যাটগুলোর খুব লম্বা বারান্দা ছিল। কেয়াদের বাসা আর আমাদের বাসার সদর দরজা বেশিরভাগ সময় ই খোলা থাকত। ফলে বারান্দা হয়ে যেত আরো লম্বা। অন্যান্য বন্ধুরাও যখন খুশি এসে যোগ দিত। এ মাথা থেকে ও মাথা আমরা দৌড়ে বেড়াতাম। কিত কিত খেলতাম। দাদুভাই-এর দোতালা বেয়ে ওঠা মাধবীলতা বাতাসে দুলে উঠত। ছেলেবেলা থেকে পাশাপাশি বাসায় থেকেও কোনদিন বাবা নিয়ে কথা বলতাম না আমরা। দম মনে হয় বন্ধ হয়ে আসত। 

একুশে ফেব্রুয়ারির প্রভাত ফেরিতে থাকতেন ঊর্মিআপা। অঙ্কের অসম্ভব মেধাবী অধ্যাপক শহীদ বুদ্ধিজীবি হবিবুর রহমান চাচার সবচেয়ে ছোট মেয়ে। মিন্টু ভাই , রুনু আপা, সীমা আপা, ঊষা আপা, নান্টু ভাই আমাদের থেকে বড় হলেও ঊর্মি আপা পড়তেন আমাদের দুই ক্লাশ উপরে, অপুভাইদের সাথে। সবাই বলত হবিবুর রহমান চাচার অঙ্কের মাথা পেয়েছে ঊর্মি আপা। খুব ভালো পড়াশোনায় উনি। 

একাত্তরের যুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিবাদী কন্ঠস্বর ছিলেন হবিবুর রহমান চাচা। নিয়মিতভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে যোগাযোগ রাখতেন। ২৫ মার্চের পরে প্রতিরক্ষা শক্তি হিসাবে ইপিআর বাহিনীর একটা অংশ ক্যাম্পাসে অবস্থান করছিল।হাবিবুর রহমান চাচার বাসা থেকে তাদের জন্য খাবার ও অন্যান্য জিনিস পাঠানো হত। শুনেছি ওয়াহিদা রহমান চাচী তাদের জন্য নিজ হাতে শত শত রুটি বানাতেন। 

কিছু রাজাকার যুদ্ধে হবিবুর রহমান চাচার ভূমিকা পাকিস্তানী আর্মিকে জানায়। বহু মানুষ ওঁনাকে ক্যাম্পাস ছেড়ে চলে যেতে বলেছিল। কিন্তু চাচা বলেছিলেন,'Like the captain of a ship I shall be the last to leave'। বিপদ সামনে জেনেও পরিবারের সবাইকে নিয়ে 'প-১৯/বি' নম্বর বাসায় ক্যাম্পাসেই থেকে যান হবিবুর রহমান চাচা। ১৫ই এপ্রিল ব্রিগেডিয়ার আসলাম আর কর্নেল তাজের নেতৃত্বে পাকিস্তানী আর্মি হবিবুর রহমান চাচার বাসায় এসে তাঁকে তুলে নিয়ে যায়। আর কোনদিন উনি ফিরে আসেন নি। 

১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, চিকিৎসক এবং সাংবাদিকসহ বিভিন্ন পেশার প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিদের এভাবেই নির্মমভাবে হত্যা করেছিল পাকিস্তানী বাহিনী। 

দেশ যখন প্রায় স্বাধীন হতে যাচ্ছে ঠিক তার প্রাক্কালে বুদ্ধিজীবিদের হত্যা করবার নীল নকশাও তৈরী হয়েছিল। উদ্দেশ্য একটাই। যদি দেশ স্বাধীনও হয়, তবুও মেরুদন্ডটা ভাঙ্গা থাকবে। কোনভাবেই এগিয়ে যেতে পারবে না নতুন দেশ বাংলাদেশ। 

পাকিস্তানী বাহিনীকে সহযোগিতা করেছিল আল-বদর, রাজাকার, আল-শামস। কিন্তু রাজাকারের দল ১৯৭১-এর যুদ্ধের সাথেই নিঃশ্চিহ্ন হয়ে যায়নি। আজও এইসব মীর জাফর প্রকাশ্যেই বাংলাদেশের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার বিরুদ্ধ শক্তি হ’য়ে নির্ভয়েই সমাজে নিজেদের স্থান করে নিচ্ছে। 

কিছু কিছু নৃশংসতাকে ঘৃণা করলেও কম ক’রা হয়। 

রক্তের দাগ কি কথা বলে? 

প্যারিস রোড দিয়ে প্রভাত ফেরি ক’রে আমরা এসে থামি জোহা চাচার কবরে। রাজশাহী প্রশাসনিক ভবনের সামনে ঘন হ’য়ে গায়ে গায়ে লেগে দাঁড়িয়ে থাকা গাছ দিয়ে ঘেরা জোহা চাচার মাজার। সুন্দর বাগান। যদিও এখন শুনি জোহা চাচার কবরের চেহারা নাকি বদলে গেছে। সেই গাছ আর নেই। পুরাতনের জন্য বুকের ভিতরটা মুচড়ে ওঠে। 

১৯৬৯ সালের ১৮ই ফেব্রুয়ারি হানাদার বাহিনীর গুলিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেইন গেটের সামনে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছিলেন রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ও প্রক্টর ড. শামসুজ্জোহা। তিনিই প্রথম শহীদ বুদ্ধিজীবী। তাঁর আত্মদানেই দেশের গণআন্দোলন গণঅভুত্থ্যানের রূপ নিয়েছিল। ড. জোহা হত্যার খবর ছড়িয়ে পড়লে আইয়ুব সরকারের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে তখনকার পূর্ব পাকিস্তানের সব স্তরের মানুষ ফুঁসে উঠেছিলো। উনি বলেছিলেন একটা ছাত্রের বুকে গুলি চালানোর আগে আমার উপর গুলি চালাও। 

জোহা চাচার মাজারে ফুল দিয়ে আমরা যাই সমাদ্দার কাকুর সমাধিতে ফুল দিতে। লাইব্রেরীর সামনে ডানপাশ ঘেঁষে সংস্কৃতের অধ্যাপক সুখরঞ্জন সমাদ্দার কাকুর সমাধি। খোকন, খুকুমণি, শিউলির প্রিয় বাবা, চম্পামাসীর স্বামী এখানে শুয়ে আছেন। অধ্যাপক সুখরঞ্জন সমাদ্দার মুক্ত চিন্তা আর ধর্ম নিরপেক্ষতাতে বিশ্বাস করতেন। একজন অত্যন্ত জ্ঞানী মানুষ ছিলেন তিনি। 

কাকু মারা যাবার পর চম্পামাসী অনেক কষ্ট করেছেন ছেলে মেয়েদের মানুষ করতে। একেবারেই অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্য ছিল না। মাসী তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। কিন্তু আপ্যায়নে কোনদিন কমতি ছিল না। এখনো মনে আছে লক্ষীপূজা হলেই আমরা খুকুমণিদের বাসায় হাজির হতাম। খিচুড়ি, বেগুনভাজা, বাঁধাকপি, ফুলকপির তরকারি খেয়ে বাড়ি ফিরতাম। সাথে থাকত নারকেলের নাড়ু, পায়েস। গান হ’ত। সবাই মিলে আবার জীবনটা চালানোর চেষ্টা হ’ত। 

এপ্রিল মাসের ১৪ তারিখে পাকিস্তানী সৈন্যরা এসে ইউনিভার্সিটির স্টাফ কোয়ার্টার থেকে সমাদ্দার কাকুকে ধরে নিয়ে যায়, তারপর নির্মমভাবে হত্যা ক’রে। সমাদ্দার কাকুকে হত্যা করবার পর ইউনিভার্সিটির রাজাকার শিক্ষক ওঁনার চশমা এনে বাড়ির দরজার কড়া নেড়ে চম্পা মাসীর হাতে দিয়ে গিয়েছিল। মানুষের ধৃষ্টতা তার হিংস্রতাকেও অতিক্রম করে যায়। 

প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার জহির রায়হান নিখোঁজ হয়ে যান ১৯৭২ সালের ৩০শে জানুয়ারি। বড় ভাই বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবি শহিদুল্লাহ কায়সারকে খুঁজতে গিয়েছিলেন উনি। ৩রা ফেব্রুয়ারি ঢাকায় সায়েন্স লেবরেটরি থেকে আমরা আমার বাবার মৃতদেহ পাই। ছোটবোন শ্যামার বয়স ছিল দেড়, আমার সাড়ে চার। মার সাতাশ। যেসব মানুষকে যুদ্ধ ছুঁয়ে গেছে তাদের মনে হয় ফুসফুসের মধ্যে একটা ছিদ্র হয়ে যায়। তারা আর কোনদিন অন্য মানুষদের মত করে নিঃশ্বাস নিতে পারে না। 

শহীদ মিনারে আসলেই আমরা যেতাম শহীদ স্মৃতি সংগ্রহ শালায়। সাথে প্রাণ প্রিয় বন্ধু সুস্মি, শাওন। আজ সকালেই সুস্মি আমায় শহীদ স্মৃতি সংগ্রহশালার নানা তথ্য দিল। 

শহীদ মিনারের যে মুক্তমঞ্চ তার গ্রিনরুমেই প্রথম গড়ে উঠেছিল এই শহীদ স্মৃতি সংগ্রহশালা।মুক্তমঞ্চের সামনের ৪০/১২ ফিট ম্যুরালটা 

শিল্পী ফণীন্দ্রনাথ রায়ের করা। বিধস্ত গাছ। পাতা নেই। শকুনেরা চারপাশে। তারপর স্বাধীনতা এল। গাছে আবার ফুল, গাছে আবার পাতা। সাদা পায়রা উড়ছে। শান্তির কপোত। নাটক, আবৃতি, গান - কত অনুষ্ঠানই যে হ'ত এই মুক্তমঞ্চে। 

খালি পায়ে আমরা সংগ্রহশালার ভিতরে ঘুরতে থাকি। সুস্মির চোখ ভর্তি জল। শাওন কোন কথা বলছে না। আমার গলার কাছে একটা শক্ত দলা মত আটকে আছে। 

বাংলাদেশের প্রথম মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সংগ্রহশালা এই শহীদ স্মৃতি সংগ্রহশালা । গড়ে উঠেছে স্বাধীনতা যুদ্ধে শিক্ষক, ছাত্র, কর্মচারীদের স্মৃতিচিহ্ন নিয়ে। চোখের সামনে শহীদ জোহা চাচার বিভিন্ন ছবি, হবিবুর রহমান চাচা, সমাদ্দার কাকু, কাইয়ুম চাচার ব্যবহৃত জিনিস, মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যবহৃত বিভিন্ন পোশাক, ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানের আলোকচিত্র, নিহত শহীদ আসাদের কিছু দুর্লভ ছবি, বিভিন্ন শিল্পীর আঁকা মুক্তিযুদ্ধের ছবি, রাজশাহীতে উত্তোলিত প্রথম জাতীয় পতাকা, শহীদ বুদ্ধিজীবীদের ব্যবহৃত চশমা, ঘড়ি, একাত্তরের গণহত্যায় নিহত অসংখ্য শহীদের মাথার খুলি আর হাড়। বেশির ভাগ খুলি আর হাড় উদ্ধার করা হয়েছে জোহা হলের পাশের গণকবর থেকে। 

বিস্ময়ে আমরা তাকিয়ে থাকতাম পাকিস্তানী বাহিনীর আত্মসমর্পণের ছবির দিকে। পাকিস্তানের লেফটেন্যান্ট জেনারেল নিয়াজী, ভারতের লেফটেন্যান্ট জেনারেল অরোরার উপস্থিতিতে স্বাক্ষর করছে। অপলকে দাঁড়িয়ে দেখতাম বিজয়ী মুক্তিসেনাদের ছবি। গেঞ্জি, লুঙ্গি, কোমরে গামছা বাঁধা , পাজামা পড়া খুব সাধারণ চেহারার মানুষের হাতে রাইফেল। ওরা বাংলাদেশ স্বাধীন করেছে। নির্যাতন কতটা ভয়ঙ্কর হ'লে এরকম মানুষেরা একটা দেশ স্বাধীন করতে পারে! 

ডিকশনারিতে পড়ছিলাম 'জেনোসাইড' মানে কি? কোন জাতির বিলোপসাধন, কোন সস্প্রদায়ের বিলোপসাধন, গণহত্যা, কোন জাতির পরিকল্পিত ধ্বংসসাধন হচ্ছে 'জেনোসাইড'। ছোট্ট একটা দেশ বাংলাদেশের জেনোসাইডে ১৯৭১ সালে ৩ মিলিয়ন লোক হত্যা করা হয়েছিল। ৩,০০০,০০০ মানুষ হত্যা ; ৪০০,০০০ ধর্ষণ , এর বিনিময়ে আমার দেশ। 

পৃথিবীর অন্যান্য অসংখ্য 'জেনোসাইডের' মধ্যে কয়েকটা জেনোসাইডের কথাও পড়ছিলাম। 

হলোকস্ট-এ ১৯৪২ সাল থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত হত্যা করা হ'য় ১৭, ০০০,০০০ জন মানুষ। 

কম্বোডিয়ার জেনোসাইডে ১৯৭৫ সাল থেকে ১৯৭৯ সালের মধ্যে হত্যা ক'রা হয় ৩,০০০,০০০ জন মানুষ। 

আর্র্মেনিয়ার জেনোসাইডে ১৯১৫ সাল থেকে ১৯২২ সালের মধ্যে হত্যা ক'রা হয় ১,৫০০,০০০ জন মানুষ। 

বসনিয়ার জেনোসাইডে ১৯৯২ সাল থেকে ১৯৯৫ সালের মধ্যে হত্যা ক'রা হয় ৩৯,১৯৯ জন মানুষ। 

মানুষের মৃত্যুর সংখ্যা দেখে হাত পা অবশ হ'যে যায়। কী অপরিসীম কষ্টের ভিতর, কী নৃশংসতার ভিতর মৃত্যু হয়েছে এইসব নিরীহ মানুষদের তা ভাবতে পারি না। যারা হত্যা করেছে সেইসব দানবদের উল্লাস দু'হাত দিয়ে কান চাপা দিয়েও শুনতে পাই। নরপিশাচ পৃথিবীর মাটিতেই হেঁটে বেড়ায়। 

‘এক নদী রক্ত পেরিয়ে 
বাংলার আকাশে রক্তিম সূর্য আনলে যারা 
তোমাদের এই ঋণ কোন দিন শোধ হবে না। 
না না না শোধ হবে না। 

মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সাত কোটি মানুষের 
জীবনের সন্ধান আনলে যারা 
সে দানের মহিমা কোন দিন ম্লান হবে না 
না না না ম্লান হবে না।। 

হয়ত বা ইতিহাসে তোমাদের নাম লেখা রবে না 
বড় বড় লোকেদের ভীড়ে 
জ্ঞানী আর গুনীদের আসরে 
তোমাদের কথা কেউ কবে না। 
তবু হে বিজয়ী বীর মুক্তিসেনা 
তোমাদের এই ঋণ কোন দিন শোধ হবে না। 
না না না শোধ হবে না।। 

থাক ওরা পড়ে থাক ইতিহাস নিয়ে 
জীবনের দীনতা হীনতা নিয়ে। 
তোমাদের কথা রবে সাধারণ মানুষের ভীড়ে 
মাঠে মাঠে কিষাণের মুখে 

ঘরে ঘরে কিষাণীর বুকে 
স্মৃতি বেদনার আঁখি নীড়ে। 

তবু হে বিজয়ী বীর মুক্তিসেনা 
তোমাদের এই ঋণ কোন দিন শোধ হবে না। 
না না না শোধ হবে না।।’ 

গীতিকার ও সুরকার খান আতাউর রহমান । ‘আবার তোরা মানুষ হ’ । সামনের সারিতে বসে আছে যুদ্ধফেরত মুক্তিযোদ্ধারা। ক্যামেরা একজন একজন ক’রে তাঁদের মুখের উপর দিয়ে সরে যাচ্ছে। কারো গলায় ফুলের মালা, কারো কোলের উপর ফুলের মালা । বঙ্গবাণী মহাবিদ্যালয়ের অনুষ্ঠানে গান হচ্ছে। ‘তোমাদের এই ঋণ কোন দিন শোধ হবে না।’ উইস্কনসিনে বসে এই এতদূরে প্রতি বছর স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবসে এই গানটা আমি শুনি । বারবার। দু’চোখ বেয়ে অঝোর ধারায় জল গড়িয়ে পড়ে। দুর্নীতি আর রাজনৈতিক ছলা-কলায় ব্যর্থ হয়ে গেছে শহীদের এত রক্ত। নিজেকে দোষারোপ করি। পড়ে আছি বিদেশ বিভুঁই –এ সেই আঠারো বছর বয়স থেকে। আজকের বসবাসের অযোগ্য বাংলাদেশে প্রতিদিন বেঁচে থাকবার যুদ্ধটুকু পর্যন্ত করিনি আমি। 

ছেলেবেলায় প্রভাতফেরি সেরে ফিরবার পথে মনটা ভারি হ’য়ে থাকত। নানা কিছু চিন্তা করতাম। দশ বছর বয়সের নিষ্পাপ আর সব কিছুই করে ফেলা সম্ভব ধরণের মনটা নিয়ে ভাবতাম নিজের দেশটার জন্য কি করা যায়। ধীরে ধীরে দেশপ্রেমের থেকে উচ্চাকাংখাটা বড় হয়ে উঠল। নিজের কথা ভাবতে শিখলাম। এখন আমার চেনাশোনা বেশির ভাগ বন্ধুই বাংলাদেশে থাকে না। আমরা বিদেশে থাকি। শীতের পাখির মত ঠান্ডা পড়লে দেশে যাই। কিছুদিন ট্যাংড়া মাছ, বাঁশপাতা মাছ, কাজরী মাছ খেয়ে বিদেশে যার যার ঘরে ফিরে আসি। বিশ বছর, ত্রিশ বছর থাকবার পর নিজেদের বাংলাদেশি-আমেরিকান, বাংলাদেশি-ক্যানাডিয়ান হিসাবে ভাবতে শিখে যাই। রক্তের ভিতর শুধু একটা অস্বস্তি কাজ করে। বেঁচে থাকবার অস্বস্তি। 

একবার একুশে ফেব্রুয়ারিতে আমরা করেছিলাম ‘ঘুম ভাঙার গান’ নাটক। দর্শন বিভাগের উতসাহী নাট্যকার সুখেন কাকুর লেখা ও নির্দেশনায়। সুখেন কাকু হাসান আজিজুল হক চাচা, মমতাজ মাসী, মফিজ চাচা সকলের খুব প্রিয় পাত্র। সবাই দর্শন বিভাগের। আর হাসান আজিজুল হক চাচা এতবড় লেখক হলে কি হবে, আমাদের কাছে উনি ছিলেন হাসান চাচা। আমাদের নাটকে কিভাবে কি করতে হবে, আবৃতি করতে হ’লে কোন উচ্চারণটা কেমন হ’বে সব চাচার বলে দেওয়া চাই। আর আছেন নাজিম মাহমুদ চাচা। নাটক, আবৃতি সবকিছুতেই নাজিম মাহমুদ চাচার পথ নির্দেশনা। চাচার প্রতিষ্ঠিত আবৃতি সংগঠন ‘স্বনন’-এ আমি, সুস্মি, পিয়া গুটিগুটি গিয়ে যোগ দিয়েছিলাম যদিও তা ছিল মূলতঃ ইউনিভার্সিটির ছাত্র, ছাত্রীদের সংগঠন। আমরা তখন নাইন, টেন এ পড়ি। রী আ আপার গলায় পূর্ণেন্দু পত্রীর কথোপকথন কিংবা রানা আপার কর্ণ কুন্তী সংবাদ – অত ভালো আবৃতি বুঝি আর শুনি নি।তারপর আঠারো বছর হতেই সুস্মিটা রাশিয়া চলে গেল পড়তে, আমি ইন্ডিয়া। তবু “যতো দূরেই যাই, আমরা সবাই স্বনন পরিবার।” 

আমাদের নাটক ‘ঘুম ভাঙার গান’ হয়েছিল ১৯৭৮ সালে। টিয়াজ, লিসা, শুভ বালক বালিকা। হাসান চাচার মেয়ে সুমন ফুলপরীর মত দেখতে বলেই কিনা জানিনা হয়েছিল ফুলপরী। আমি পাতা কুড়ানী গরীব মেয়ে। ছেঁড়া শাড়ি পড়েছি ঠিকই কিন্তু মামস আর একশ চার ডিগ্রী জ্বর নাটকের দিন। ঠান্ডা বাঁচাতে পায়ে সাদা মোজা পড়েই গরীব মেয়ের ভূমিকা করে ফেললাম। আমারটা তো অভিনয়, সত্যি সত্যি তো আর পাতা কুড়ানি মেয়ে নই আমি, আমার জুতা আছে। 

প্লেটো হয়েছিল ‘হিং টিং ছট’ সন্ন্যাসী। বড় ভালো অভিনয় করেছিল প্লেটো। প্লেটো আমাদের মত ছিল, কিন্তু ছিল আমাদের থেকে আলাদা। খুব ছেলেবেলায় ওর মা মারা গিয়েছিল। স্বাধীনতা যুদ্ধের জন্য আমার অনেক বন্ধুর ছেলেবেলায় বাবা ছিল না। দিদা বলত বাবা ছাড়াও হয়ত দিন চলে যায়। কিন্তু মা ছাড়া? জেবুন্নেসা চাচী চলে গিয়েছিলেন রোজার ঈদের দিন। আনন্দের দিন মানুষ চলে গেলে প্রতি বছর সেই দিনটা এলে বুকের ভিতরটায় যেন আরো বেশি করে বাজে। রাস্তায় কার কাছে কি শুনে কষ্ট পাবে ভেবে হবিবুর রহমান চাচী ছোট প্লেটোকে বাড়ি নিয়ে এসে খাইয়ে দাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছিলেন। ঘুমে স্বপ্নের ভিতর দুঃস্বপ্নের মত মা চলে গেল? নাজিম মাহমুদ চাচা তারপর থেকে মায়ের যত্নে রী আ আপা আর প্লেটোকে বড় করেছেন। আগে যে গ্রামের বাড়িতে থাকতাম, সেখানে গাছপালা বেশী ছিল। অনেক পাখি বাসা করত। মা পাখি, বাবা পাখি দু’জনে মিলে বাচ্চাদের দেখাশোনা করত দেখেছি। কিন্তু মা পাখি না থাকলে একা বাবা পাখি বাচ্চাদের বড় করে উঠতে পারত না। নাজিম মাহমুদ চাচার অসীম স্নেহ দেখে মনটা ভিজে উঠত। স্বননের রিহারসাল দিতে প্লেটোদের বাসায় আমরা প্রায়ই যেতাম। দু’টো দেয়াল এসে যেখানে মিশেছে সেখানে চাচীর প্রায় লাইফ সাইজ একটা পোর্টেট ছিল। অসম্ভব জীবন্ত পেইন্টিং। মনে হ’ত চাচী বুঝি আমাদের দিকে হাসি হাসি মুখে তাকিয়ে আছেন। 

মৃত্যুর পর আমাদের স্কুলের মৌলবী স্যার জেবুন্নেসা চাচীর নামাজে জানাজা পড়তে রাজি হয় নি। চাচী নাটক করতেন, চাচী স্লিভলেস ব্লাউজ পড়তেন। পাপের শেষ নেই। ধর্ম জীবনের থেকে বড়? ধর্ম মৃত্যুর থেকে বড়? ধর্ম মানুষের থেকে বড়? 

চুমকি সেদিন বলছিল, 'কি রে তোর পুতুল নাচের কথা মনে আছে? রাশিয়ান দল জুবেরী ভবনে এসেছিল?' হ্যাঁ, মনে নেই আবার? দলের নাম 'টিন টুকি'। কি মুগ্দ্ধ যে হয়েছিলাম। প্রায় আমাদের সমান সব পুতুল। ছেলেদের পরনে গ্যালিস দেওয়া প্যান্ট। প্লেইড শার্র্ট। লালচে চুল। মেয়েদের পরনে এপ্রন দেওয়া ফ্রক। মাথায় দু'টো বেনুনি। দড়ি ধরে টানলেই কুয়ো থেকে জল তুলছে। ফুলের গন্ধ শুঁকছে। হ্যান্ডশেক করছে। হেঁটে যাচ্ছে রাস্তা দিয়ে। বেঞ্চিতে বসে গল্প করছে। দড়ি ধরে না টানলে কিছুই ওরা করতে পারছে না। 

বাড়িতে এসে আমরা খুব চেষ্টা করতাম পুতুল নাচ করবার। নিজেদের পুতুলগুলোর মাথায় দড়ি বেঁধে তারপর দড়ির মাথায় কাঠি দিয়ে ডানদিকে, বামদিকে নাড়াতাম। আমাদের পুতুল মাঝে মাঝে কথা শুনত। বেশিরভাগ সময়ই না। আমরা রাজনীতিবিদ ছিলাম না। আমরা অন্য কোন শাক্তিশালী দেশ ও ছিলাম না। নির্দোষ 'টিন টুকি' নয়, যে পুতুল নাচে বাংলাদেশ নাচছে আজ বানরের মত, দেশের যে নিরীহ মানুষগুলোকে পুতুল নাচ নাচাচ্ছে দেশের রাজনীতিবিদ আর বিদেশী শক্তি গুলো - তা ঘৃণার যোগ্য। 

মানুষের দেশ নামের যে মা থাকে, আমার সে মা হারিয়ে গেছে। 

“হাউ মাউ খাও মানুষের গন্ধ পাও 
হাউ মাউ খাও মানুষের গন্ধ পাও 
রূপ দেখতে তরাস লাগে বলতে করে ভয় 
কেমন করে রাক্ষসীরা মানুষ হয়ে রয় 
চপ চপ চপ চিবিয়ে খেলে আপন পেটের ছেলে 
লোহার ডিম সোনার ডিম কৃষাণ কোথায় পেলে” 

আমাদের নাটক ‘নীল কমল লাল কমল’। তপন হয়েছিল লালকমল, আমি নীলকমল। পিয়া আর শ্যামা বরাবরের মত সুন্দরী রাজকন্যা! নাটকের নির্দেশনায় মণিমা। মণিমা - মা, কুংকীমা, মণিমা (মা, মেজমাসী, ছোটমাসী) আমার এই তিন মায়ের এক মা। জুবেরী ভবন, নজরুল মিলায়তনে আমাদের অনুষ্ঠান তো হ'তই। কিন্তু যখন সেখানে না হচ্ছে, অনুষ্ঠান হ'ত আমাদের বাড়িতে। এক মাস ধরে নাটকের রিহারসাল। শুধু ফ্ল্যাটের সবাই দেখবে। কিন্তু তার জন্য কি পরিশ্রম। সেই তো। ‘কেমন করে রাক্ষসীরা মানুষ হ'য়ে রয়?’ 

দিদার কাছে মণিমার অনেক গল্প শুনতাম। শুনতাম মা, কুংকীমা, কাজলমামা, বাপিমামারও ছেলেবেলার গল্প। দিদার বলা রামায়ণ, মহাভারতের গল্প ছাড়াও এইসব গল্প আমার খুব ভালো লাগত। জীবনের নকশিকাঁথায় ছোট ছোট ফোঁড় যেন। দিদাকে আমার বনের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা বয়স্ক মহীরুহ বলে মনে হত। বনের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া সব ঝড়, সব চারাগাছগুলোর বড় হয়ে ওঠার গল্প, সব পাতাদের আলতো করে গায়ে পরশ বোলানোর কথা, সব সব সে জানে। দাদু, দিদা, ঠাকুমা, ঠাকুরদার জন্যই বুঝি একটি পরিবারের ধারাবাহিকতার গল্পগুলো হারিয়ে যায় না। ভালোবাসা গোলাপ ফুলের তোড়ায় ফোটে। “জানিস না তো তোর মণিমার দুধ খাওয়ার কেচ্ছা। তোর দাদুর খুব প্রিয় ছিল তোদের মণিমা। ডাকত নিমো বলে। মণি উল্টালে নিমো। একদিন রাত প্রায় নটা বাজে। মণির তো ক্লাশ টেন পর্যন্তও দুধ-ভাত না খেলে চলত না।ভীষণ দাপাদাপি। দুধ চাই। শেষে তোর দাদু সেই অত রাতে কনডেন্সড মিল্ক কিনে আনল। তাতে জল মিশিয়ে তবে শান্তি। আর পুতুল খেলা? তখন নাইন টেনে পড়ে। তোর মার বিয়ে হয়ে গেছে। সবাই কি বলবে এত বড় মেয়ের পুতুল খেলা দেখে? তাই পাজামার ফিতায় লুকিয়ে লুকিয়ে পুতুল বেঁধে যেত তোর মার বাড়ি।” 

আমার সাতমাস বয়সে মা ইংল্যান্ড যাওয়ায় আমি ছিলাম মণিমা, কুংকীমা, দিদা, দাদুভাই, কাজলমামা, বাপিমামার কাছে। এই মণিমাই তখন পুতুলখেলা বন্ধ করে জ্যান্ত মানুষছানা নিয়ে মেতে উঠল। আমাকে বড় করেছে আমার মণিমাই। প্রতিদিন একটা করে জামা বানাত আমার। এত সুন্দর সুন্দর ডিজাইনের সেই সব জামা, ছবি দেখে বিশ্বাস হয় না এগুলো বাড়িতে বানানো। চাইনীজ কাট চুল। মণিমার বানানো জামা পড়ে স্টুডিওতে ঢোলের উপর বসে আছি। প্রফেশনাল ছবি তোলা হচ্ছে। বহুদূরে মা, বাবার কাছে পাঠানো হবে। কত যত্নে আছে রমা! 

তখন রংপুরে। আমার জন্ডিস হয়েছে। চার বছর মত বয়স। সব কিছু সিদ্ধ খেতে হবে। দাদুভাই বলে দিল যতদিন রমা সিদ্ধ খাবে বাড়ির সবাই সিদ্ধ খাবে। সেটাই রান্না। বাড়িতে দাদুভাই, দিদা, পরিতোষমামা, মণিমা তখন। মণিমা সবচেয়ে ছোট। কিন্তু কোন আবদার নেই। যতদিন আমি সুস্থ হইনি সবাই ঢেঁড়স সিদ্ধ খেয়ে ছিল! 

‘এ কি এ কি কি করছেন?’ সীটে বসা ভদ্রলোকের ত্রাহি চীত্কার। মণিমা আর উপরতলার বেবীআপা, রীণাআপা গেছে সিনেমা দেখতে। দেরী হয়ে গেছে। সিনেমা শুরু হয়ে গেছে। সানগ্লাস খোলা হয় নি। ব্যাস কিছু না দেখতে পেয়ে সীট ভেবে কোলের উপরই বসে পড়েছে তিনজন। 

বেবীআপা, রীণাআপা, মণিমার দৌড়াত্বি আমি মুগ্ধ হয়ে দেখতাম। তিনজনেরই লম্বা চুল । মাথার বেনী আমাদের দোতালার বারান্দার রেলিং-এ বেঁধে একতলার বাগানের ডালিম চুরি করত ওরা। বাকি দুজন ধরে থাকত। যদি বেণী ছিঁড়ে পড়ত? 

আমাদের ঘরে দু'টো বিছানা। দাদুভাই দিদার বিয়ের বার্মা টিকের খাটটায় থাকি মা, শ্যামা, আমি। আঠারো বছর বয়সে খড়্গপুরে যাওয়ার আগে পর্যন্ত এ বিছানাতেই আমি শুয়েছি। পাশের বিছানায় মণিমা। বাড়িতে অনেক লোক। আমাদের আলাদা বিছানা বা ঘর দেওয়ার মত পরিস্থিতি ছিল না। কিন্তু ঠেলাঠেলি মনে হ'য় নি কোনদিন। আমার তো মনে হ'ত মা বুঝি পাখার নিচে সবসময় মুরগির ছানা নিয়ে ঘুরছে। একদিন ভোর রাতে হঠাৎ ধুপুস শব্দ। কি ব্যাপার? মণিমা দু:স্বপ্ন দেখে মশারি টশারি পেঁচিয়ে সোজা মাটিতে। তখন ইউনিভার্সিটি তে পড়ে। আর ঘুমাব কি? বাকি রাত হাসতে হাসতেই গেল। আমাদের নৃশংসতা ... 

মণিমাকে ভালোবাসত যেমন আমার সব বন্ধুরা, ভয় ও পেত। উপর তলায় থাকত কাকলিরা। কাকলি প্রবাদপ্রতিম শিক্ষক ও বিদগধ পণ্ডিত ড.সুনীল কুমার মুখোপাধ্যায়ের মেয়ে। ভারী মিষ্টি। কিন্তু মণিমার তো কড়া নিয়ম। প্রতিদিন দুপুরবেলা ঘুমাতে হ'ত আমার আর শ্যামার। একদিন দুপুর দু'টা বাজে। ছোট্ট কাকলির তো খেলতে ইচ্ছা করছে। আমাদের বাসায় এসে কড়া নেড়েছে। পড়বি তো পড় মালির ঘাড়ে। মণিমা দরজা খুলতেই থতমত কাকলি আর কোন কথা খুঁজে না পেয়ে বলে বসল , 'মনিমাসি, আমি না ঘুরতে ঘুরতেই চলে এলাম। ' 

একদিন শুনি আমার বন্ধু সুস্মি, ইয়াসমিন আর দীনা বলছে তোদের বাসায় রবিবার সকাল দশটার দিকে যাব না। কি ব্যাপার? জানা গেল মণিমা নাকি তখন করলার রস ক'রে আমাদের খাওয়াচ্ছে। বন্ধুরা এলে তাদের ও খেতে হ'বে। 

সারা ছেলেবেলা মণিমা আমাদের রুটিন বানিয়ে দিয়েছে । কখন অংক করবো কখন বাংলা ব্যাকরণ। 

ঢাকায় থাকবার সময় ও দেখতাম প্রমার জন্য দরজায় রুটিন সাটানো। কিন্তু দুই বছরের প্রভার রুটিন কই ? মণিমা বানিয়ে দিল সকাল নয়টা থেকে কান্না, দশটা পনেরো থেকে হাসি, এগারোটায় আহ্লাদ, বারোটায় খাওয়া, একটায় ঘুম, বিকাল চারটায় নাচ, সাড়ে চারটায় গান আর পাঁচটা পঁয়তাল্লিশে ‘যা খুশী তাই’। 

ছেলেবেলার কথা ভাবলে মনে হ’য় বেবী আপা, রীণা আপা, মণিমার লম্বা খিচুড়ি রান্না করবার কথা। ঢলঢলে লম্বা মুশুরির ডালের খিচুড়ি, তাতে আস্ত আস্ত পিঁয়াজ দেওয়া। আমার পিঁয়াজ খেতে একদম ভালো লাগত না। কিন্তু মণিমাদের বক্তব্য ছিল আস্ত পিঁয়াজ না দিলে নাকি খিচুড়িই হয় না। 

যখন নাইন, টেনে পড়ি আমি মহা পড়াশোনা করতাম। রাত তিনটা থেকে উঠে বসে যেতাম অংক করতে। ওটা নাকি ব্রাহ্ম-মুহুর্ত। যা করা যাবে তাই অব্যর্থ শক্তিশেলের মত বুকে এসে বিঁধবে। আর কোনদিন তা ভুল হবে না। আমার অঙ্ক তো চলছে। কিন্তু রাত তিনটায় মণিমার কি হল? দুটো ডিমের জল পোচ করে আমার সামনে হাজির। জল পোচ খেলে মাথা খুলবে। 

খুব কড়া নজর মণিমার আমাদের পড়াশোনার উপর। ‘সন্ধ্যার আজান দিলেই তড়িঘড়ি বাড়ি এসে হাত পা ধুয়ে পড়তে বসবে। অংকতে একশ’তে একশ’ পাওয়া চাই। বাংলা আর ইংরেজী রচনা যেন আর কেউ তোমার মত লিখতে না পারে। ক্লাশের পড়া তো অনেক আগেই শেখা শেষ। এবার তবে পরের ক্লাশের বই পড়।’ অত্যাচারের এক শেষ। মা কিছু বলত না। ভাবখানা এমন যে মণির হাতে ছেড়ে দিয়েছি। রমা শ্যামাকে নিয়ে ও যেমন ভালো মনে করে করুক। আর মণিমা এতই ভালো করেছিল আমাদের সারাদিন এটা কর সেটা কর বলে ডাকাডাকি করে যে এখনো নিজের মেয়ে প্রমা, প্রভাকে ডাকবার সময় প্রতিবার ভুল করে রমা শ্যামা বলে ডাকে। 

আর শুধু কি পড়াশোনা? আমি তখন নব্য কবি। স্কুলে পড়ি। কবিতা লিখলেই মণিমাকে দেখানো চাই। মণিমা ছন্দ ঠিক করে দেয়, মণিমা শব্দ বদলে দেয়। 

ম্যাট্রিক পরীক্ষার সময় মণিমার চেম্বারে গিয়ে পড়তাম আমি। এখনও মনে আছে ওই বিশাল ইজি চেয়ারের কথা। মনে হয় দুটো মানুষ ঘুমাতে পাড়বে ওই চেয়ারে। আমি ভাবতাম বুঝি এগুলো ব্রিটিশ আমলের চেয়ার। আর মণিমা যে চেয়ারে বসত তার পিছনে হলুদ আর হাল্কা গোলাপি নকশা করা খুব বড় একটা তোয়ালে থাকত। মাঝে মাঝে তোয়ালেতে হেলান দিয়ে বসে আমিও জজসাহেব জজসাহেব ভাব করতাম। 

খড়্গপুর থেকে পাশ করবার পর আমি মণিমার বাসায় থেকে দুই বছর ঢাকায় এটমিক এনার্জি কমিশনে চাকরি করেছি। মণিমা ভোর চারটায় উঠে নিজের অফিস যাওয়ার আগে আমার জন্য ভাত, ডাল, তরকারি, মাছ বা মাংস রান্না করে তা হটপটে ভরে সাজিয়ে দিত। উপরে এক টুকরো লেবু। এখন আমি সকালবেলা আমার ছেলেমেয়েদের জন্য লাঞ্চ বানাই। হৈ খায় পিনাট বাটার জেলি স্যান্ডউইচ। পাউরুটিতে মূলতঃ পিনাট বাটার আর জেলি মাখাই। তাথৈ-এর জন্য গ্রীলড্ চীজ স্যান্ডউইচ। খুবই সোজা বানানো, তবু সকালে উঠে অফিস যাওয়ার আগে কিছু করতে হলেই আমি হাঁপিয়ে উঠি। আমি যখন মণিমার বাড়ি ছিলাম, বয়স ছিল তেইশ, চব্বিশ। তবু একদিনও মনে হয় নি মণিমার একটুও কষ্ট হচ্ছে আমার জন্য এতকিছু দিয়ে লাঞ্চ বানাতে। হৃত্পিন্ডটা পাশের বাড়িতে রেখে মনে হয় তখন আমি চলাফেরা করতাম। এখন ভাবলেও লজ্জা লাগে। 

শুধু জজিয়তি করা নয়, মণিমার সবদিকে কড়া নজর। তবু মাঝে মাঝে বলতে শুনেছি, ‘বাবাও জজিয়তি করত, আর আমিও করছি।’ আসলেই তো। দাদুভাই অফিস যাওয়ার আগে দিদা গরম গরম ভাত রান্না করে দাদুভাই-এর সামনে ধরত। যেদিন কোন কঠিন রায় দিতে হবে বাড়ির সবাই চুপ। দাদুভাই-কে চিন্তা করবার সুযোগ দেওয়া চাই। আর মণিমা? ভোর চারটায় উঠে রান্না করে, বাড়ির কাজ করবার লোকজনের ঝগড়াঝাটি সামলে তারপর অফিস যায়। কে খোঁজ নিতে যাচ্ছে যে আজ আদালতে গিয়ে চারটা খুনের ফাঁসি দিতে হবে? মেয়েদের জজিয়তি আর ছেলেদের জজিয়তিতে আকাশ পাতাল তফাত্। 

১৯৮১ সালে মণিমার বিয়ে হয়ে গেল স্বপনমেসোর সাথে। এবার আমি কিভাবে বাঁচব? সেই জন্মের পর থেকে প্রতিটা দিন মণিমা ছিল আমার পাশে পাশে। আমার মার থেকেও বেশি সময় কাটিয়েছি মণিমার কাছে। আমার মনে হয়েছিল, আর যেন বাতাস নেই। আমি বুঝি আর নিঃশ্বাস নিতে পারব না। জীবনে সেই প্রথম বুঝি চিরকালের স্বার্থপর আমি স্বার্থহীন হ’তে শিখেছিলাম। মণিমার রাজশাহী সিল্কের বেনারসী শাড়ীর লাল রঙে সোনালি সূতার কাজ ছিল। 



স্বপন মেসো এবার মণিমাকে নিয়ে চলে যাবেন। খুবই শান্ত মানুষ মেসো। রবীন্দ্র সংগীত গান। আমার তো এবার 'সিভিল' আচরণ ক'রা দরকার। আমি তখন রেডক্রস, গার্ল গাইড করতাম। আসলে আকাশের নিচে যা কিছু বাচ্চাদের সংগঠন ছিল সব করতাম। সূর্যশিশু, কিশোর কুঁড়ি, খেলাঘর, রেডক্রস, গার্ল গাইড, পাতাকুড়ানি ছেলেমেয়েদের পড়ানোর স্কুল সব সব। আর সেই যে সিঁড়ি ঘরের নীচে বাড়িতে না জানিয়ে বাচ্চা বিড়াল পোষা! অথচ আমার তাথৈ যখন আজ সফটবল, কয়্যার, ক্রস কান্ট্রি, স্টেজ ক্রু , অর্কেস্ট্রা সব ক'রে বেড়ায় আমি ভাবি এত উৎসাহ ও কোথা থেকে পেল? আর অসংখ্য বন্ধুপ্রেমে তাথৈ-এর মত আমাকেও বাড়িতে পাওয়া যেত না। সারাদিন টো টো। 

রেড ক্রস-এ কিজন্য যেন আমাদের গিফট দিল।বিদেশী সব উপহার। ভারী সুন্দর টিফিন ক্যারিয়ার, নীল সাদা নরম তুলতুলে তোয়ালে। বিদেশী জিনিস আমাদের বেশি ছিল না বলেই কিনা জানি না তার উপর বড় লোভ ছিল। লোভ ছিল মিসেস ক্লার্কসনের দেওয়া সাবানের উপর ও । আমার টা সবুজ কৌটায়, শ্যামার টা কমলা। কৌটার উপর সোনালী এম্বস ক'রা ফুল, লতা আঁকা ছিল। কি যে খুশবু ছিল সে সাবানে। জমিয়ে রাখতাম , শুধু সকালবেলা ঈদ আর পূজাতে মেখে স্নান করতাম। প্রায় চুয়াল্লিশ বছর পর এখনো বুঝি সেই সাবানের কৌটা আমার সিন্দুকে পাওয়া যাবে। নীল সাদা তোয়ালেও আমার তেমন প্রিয় হ'যে গেল। নাড়ি চাড়ি, গালে একটু ছুঁইয়ে দেখি, তারপর ভাঁজ ক'রে রাখি। মণিমাকে নিয়ে চলে যাচ্ছেন ব'লে যে আমি একটুও কষ্ট পাচ্ছি না বোঝাতে সেই সবচেয়ে প্রিয় তোয়ালেটা আমি স্বপন মেসোকে দিয়ে দিলাম। 



কাজলমামা যাবে মণিমাদের সাথে বগুড়ার দুপচাঁচিয়ায় স্বপনমেসোর বাড়ি। শেষ মুহূর্তে আমিও আর সহ্য করতে না পেরে চেপে বসলাম ট্রেনে। কি যে সুন্দর দুপচাঁচিয়া গ্রাম। 'ছায়া সুনিবিড় শান্তির নীড়'। বিরাট বড় একটা পুকুরের কথা আমার এখনো মনে পড়ে। 'কালো জল তার মাজিয়াছে কেবা কাকের চক্ষু নিয়া'। মনে পড়ে খড়ের গাদার কথা। এই খড়ের গাদার চুড়ায় চেপে প্রমা, প্রভার ও ছবি আছে পরে। 

গ্রাম ভেঙে মানুষ বৌ দেখতে এল। মেয়েরা গোপনে ফিস ফিস করে বললো বৌ-এর গায়ের রং বেশ কালো। মণিমার শাশুড়ি অসাধারণ মানুষ। শাশুড়ি মানেই অসম্ভব কেউ যে নয়, তা আমি সেই বয়সেও ওঁনাকে দেখে বুঝতে পারলাম। সেই দিদার নাম ও ভারী সুন্দর। পূর্র্ণশশী। বৌ-এর গায়ের রং কালো শুনে পূর্ণশশী দিদা চোখের পলক না ফেলে মণিমাকে বললেন, 'মা, তোমার চুলগুলো একটু খুলে বস তো ' । মণিমার কোমর ছাড়িয়ে ঘন কালো চুল ছিল। নতুন বৌ হ'য়েও মণিমার হাসি পেল। 

এই গল্পটা আজ ও যখন ভাবি, আর বিভিন্ন শাশুড়িদের নানা হিংস্রতার গল্প শুনি, আমার চোখ জলে ভরে যায়। ভালোবাসা সহজাত, তা শিখবার কিছু নেই। 

জুলাই মাসে বিয়ে হয়েছিল মণিমার। বাংলার আকাশ ভেঙে বৃষ্টি এ মাসে। ভেজা কদমফুলের গন্ধে আমার ভিতরটাও তোলপাড়। এমন অঝোর ধারায় বৃষ্টি এই পশ্চিম মুলুকে দেখি না। সন্ধ্যা হয়ে আসছে। পূর্র্ণশশী দিদা রান্না করছেন। স্বপন মেসোর নাম ভানু। আর বড়দাদার নাম কানু। কানু আর ভানু মা'কে ডাকল, 'মা আয়, একটা গান করে যা ' । দিদা সাথে সাথে হাতের হলুদ মুছে গান করতে এসে গেলেন। শেখেন নি কোথাও। শুধু শুনে শুনে গান। কি সুন্দর যে গলা। আঙুরবালার মত । পুরানো দিনের গায়কী। স্বপন মেসো বুঝি মায়ের গানের গলা ই পেয়েছেন। 

বৃষ্টি ঝরেই চলেছে। বেশ রাত। গ্রামে রাতকে আরো যেন গভীর ব'লে মনে হয়। বেশি আলো নেই চারপাশে। সবশেষে গান গাওয়ার পালা মেসোর। মেসো গেয়ে উঠলেন, 

"হায় বরষা, এমন ফাগুন কেড়ে নিয়ো না 
আমার প্রিয়ার চোখে জল এনো না 
মধুর স্বপন ভেঙে দিয়ো না … 
বাদল হাওয়া যেন ঝড় তুলো না 

আরো ধীরে ধীরে বও না 
পাতার কানে কানে বৃষ্টিধারা 
চুপি চুপি কথা কও না । 

অনেক চাওয়ার পরে যাকে পেলাম সেই যে আমার শেষ ভরসা "। 

কাজলমামা পূর্র্ণ শশী দিদা আর দাদুকে দেখে মুগ্দ্ধ। বৈষ্ণব মানুষ। কারো সাতে পাঁচে নেই। শুধু মানুষকে ভালোবেসে জীবনটা কাটিয়ে দিচ্ছেন। কাজলমামা আমাকে বললো এঁনাদের দেখে তোমার ঠাকুরদা, ঠাকুরমার কথা মনে পড়ে। একই রকম পূর্র্ণ মানুষ। আমার তো নিজের ঠাকুরমা, ঠাকুরদার কথা মনে নেই। ছয় সাত মাস বয়সে ওঁনারা আমাকে শেষ দেখেছেন । কাজলমামার কথা শুনে মাথা শ্রদ্ধায় নত হ'য়ে গেল। 

রাজশাহী ইউনিভার্সিটি তে 'শ্যামা' হ'বে। অঙ্কের বিশিষ্ট, বিদগ্ধ শিক্ষক প্রফেসর সুব্রত মজুমদার কাকু নির্দেশনা দেবেন। আর বাড়িতে রিহারসালে আপ্যায়ন করবেন দীপিকা মাসী। বেশিরভাগ রবীন্দ্র সংগীতের অনুষ্ঠানেই কাকু নির্দেশনা দেন। কাকী, কাকুর গুণী মেয়ে আনন্দ। যেমন পড়াশোনায়, তেমন গানে , অনুবাদে , কবিতা লেখায় , মুক্তিযুদ্ধ চর্চা কেন্দ্রের 

কাজে । আমি আনন্দের মত গুণী মেয়ে খুব কম দেখেছি। আর কি অসম্ভব বিনয়ী। একদম কাকুর মত। 

তখন আনন্দ বেশ ছোট। ওরা পূর্ব পাড়ায় আমার বন্ধু ইয়াসমিনদের পাশের বাসায় থাকে। কাকু ইয়াসমিন, প্যামেলা, আনন্দ, শ্যামা আর আমার জন্য গণিত বিভাগ থেকে একটা টেলিস্কোপ নিয়ে আসলেন। এর আগে কোনদিন টেলিস্কোপ দেখি নি। অবাক বিস্ময়ে সে রাতে আমরা শনির বলয় দেখলাম , বৃহস্পতির চাঁদ দেখলাম। আকাশের ভালোবাসা আমাদের চোখের তারায় ঝিলমিল ক'রে উঠল। সাত আট বছরের জীবন যেন মুগ্ধতায় ভরে গেল। 

শ্যামা গীতিনাট্যে বজ্রসেন হয়েছিলেন স্বপন মেসো। শ্যামা কবিতা মাসি, মণিমা সখি। 

মনে পড়ে অনেক অনেক বছর পর শ্যামা দেখে বেবী আপার চার পাঁচ বছরের মেয়ে ছোট্ট অমি বলেছিল, ' শ্যামা প্রেমও পেল না , ক্ষমাও পেল না। ' 

খুব ভালো হয়েছিল এই গীতিনাট্য। এত বছর পর এখনো কানে বাজে মেসোর গলায়, 

‘ক্ষমিতে পারিলাম না যে 

ক্ষম হে মম দীনতা পাপীজনশরণ প্রভু!’ 

দিদার যখন খুব শরীর খারাপ, স্বপন মেসো বেড়াতে ইন্ডিয়া ছিলেন । আমায় বললেন তিন মেয়ের শ্বশুরবাড়ি ঘুরে আসব। আমার শ্বশুরবাড়ি, শ্যামার শ্বশুরবাড়ি, প্রভার শ্বশুরবাড়ি। ব্যাকরণ মতে শুধু প্রভাই তাঁর নিজের মেয়ে। দিদা ভালো নেই জেনে সব বাতিল ক'রে তড়িঘড়ি ঢাকাতে ফিরে এলেন মেসো। তারপর দিদা তো চলে গেল। 

আগে মনিমারা কুংকিমাদের বাসার চারতলায় থাকত। মা, দিদা থাকত তিনতলায়। একতলা, দোতলা মিলিয়ে থাকত কুংকিমা। মণিমা কাঁকড়াইলে কোয়ার্টার পাবার পর মণিমা, স্বপনমেসো, মা, দিদা চলে আসল কাঁকড়াইলের বাসায়। স্ত্রী, স্ত্রীর মা, স্ত্রীর বড় বোন - এই নিয়ে গড়ে উঠল পরিবার। স্বপন মেসোর পরিবার। স্বপনমেসো আমায় বলেছিলেন এটাই একমাত্র সলুউশন। এটাই সবচেয়ে স্বাভাবিক। 

আমার খুব আশ্চর্য লেগেছিল। এ কেমন পরিবার? সমাজ বিজ্ঞান বই-এ এমন পরিবারের সংগা নেই। আত্মীয় স্বজন, বন্ধু বান্ধবের মধ্যে যে ‘সুডো’ মানুষগুলোর নাম সমাজ সংস্কারক হিসাবে, বিপ্লবী হিসাবে শোনা যায়, স্বপন মেসোর নাম কোনদিন তাদের মাঝে ছিল না। 

অসম্ভব গরম পড়েছে। বেগুনি রঙের জারুল ফুল ফুটে আছে। টিনের চালের স্কুল আর দ্বিতীয় কলাভবনের মাঝখানে সারি বেঁধে জারুল গাছের সারি। ফুলগুলোর পাপড়ি নরম টিস্যু পেপারের মত। প্রচন্ড গরমে বছরে একবারই ফোটে জারুল ফুল। কলিটা ফেটে হঠাৎ ক'রে যেন পুটুস ক'রে ফুটে ওঠে ফুল। 

যখন গরম আর সহ্য করা যাচ্ছে না ঠিক তখন বৃষ্টি নামল। টিনের চালে ঝম ঝম শব্দ। টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ ভুলে যাওয়া স্বপ্নের মত মনে হয়। অন্ধকার হ'যে গেছে ক্লাসরুম। আল মাহমুদ স্যার ফিজিক্স পড়াচ্ছেন। ল্যাবরেটরিতে ব্যাঙ কাটা শেখাচ্ছেন অনু স্যার। ভদ্র স্যার হয়ত অংক করাচ্ছেন। হেডস্যার বলছেন বাংলা রচনায় সব সময় কোটেশন দেওয়া চাই। 

এই আমাদের স্কুল। রাজশাহী ইউনিভার্সিটি এক্সপেরিমেন্টাল স্কুল। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় পরীক্ষামূলক শিক্ষায়তন। হ্যাঁ সত্যি, ইউনিভার্র্সিটির ভিতর এক এক্সপেরিমেন্ট হিসাবেই শুরু হয়েছিল এই স্কুল ইউনিভার্র্সিটির টিচারদের ছেলে মেয়েদের জন্য। 

শহরের অন্যান্য বিখ্যাত সরকারি স্কুল থেকে একটু আলাদা স্কুলটা। আলাদা পি.এন স্কুল, হেলেনাবাদ স্কুল , কলেজিয়েট স্কুল, শিরোল স্কুল থেকে। ম্যাট্রিক পরীক্ষায় কোন সাজেশন পাওয়া যায় না আমাদের স্কুলে। কোন চ্যাপ্টার ইমপরট্যান্ট তা কোন স্যার বা আপা বলে দেন না। বই এর এ মাথা থেকে শেষ পর্যন্ত পড়তে হয়। মাঝে মাঝে ইউনিভার্র্সিটির টিচার রা এসে ক্লাস নেন। ইউনিভার্র্সিটির অসম্ভব প্রতিভাবান তরুণ শিক্ষক তরফদার চাচা এসে কেমিস্ট্রি পড়িয়ে যান। আমরা শিখি কেমিস্ট্রি শুধু মুখস্ত করবার জিনিস নয়। 

কিছুদিন আগে আমাদের স্কুলের পঞ্চাশ বছর পূর্তি অনুষ্ঠান হ'ল। তার পত্রিকায় বন্ধুপ্রতিম নাজ(নাজনীন সুলতানা) একটা অসাধারণ লেখা লিখেছে। তার কিছুটা তুলে না দিয়ে পারছি না। 

“টিন শেড স্কুলের গাড়ি বারান্দা, আর প্রথম সারি ও দ্বিতীয় সারি রুমগুলোর মাঝে ছিল সামান্য ফাঁকা জায়গা। ক্লাশ শুরুর আগে বা টিফিনের সময় বন্ধুরা মিলে সেখানে নিয়মিত ' কুমির তোর জলে নেমেছি' খেলতাম। 

আমরা যারা পূর্বপাড়া থেকে যেতাম তারা টিফিনের সময় ক্লাশ রুমে সবার টিফিন বক্স এক সাথে খুলে সবাই মিলেমিশে খেতাম। হাতে বানানো আটার রুটি, সাথে আলু ভাজা বা ডিম ভাজা, শুকনো মিষ্টি, ফল -এসবই ছিল আমাদের নিত্যদিনের খাবার। স্কুলের পাশে বিক্রি হত লোভনীয় তেঁতুলের আঁচার, বরফ। শুধু পানির বরফের দাম ছিল ১০ পয়সা, আর সামান্য দুধ দেওয়া, আগায় নারিকেলের কুঁচি বসানো আইসক্রিমের দাম ছিল ২৫ পয়সা। কখনও কখনো কাঁচা আম ক্লাশের দরজার ফাঁকে চাপ দিয়ে থ্যাতলানো অবস্থায় লবন ছিটিয়ে খেতাম।” 

আমাদের 'কুমির তোর জলে নেমেছি' খেলায় কুমির জলে থাকত মানে থাকত বারান্দার নিচে মাঠে। আর আমরা সব বারান্দায়। তারপর কুমিরের এপাশ, ওপাশ দিয়ে কুমিরকে লোভ দেখিয়ে জলে নামতাম। আর ছড়া কাটতাম, ‘কুমির তোর জলে নেমেছি, কুমির তোর জলে নেমেছি।’ কুমির ছুঁয়ে দিলেই যাকে ছোঁবে সে তখন নতুন কুমির। 

ছেলেবেলায় এমন কত যে খেলা খেলতাম আমরা। আমার ছোটমাসীর মেয়ে প্রভার সাথে গল্প করছিলাম সেদিন এই খেলাগুলো নিয়ে। ও আমার থেকে অনেক ছোট। কিন্তু ওরাও হলিক্রস স্কুলে খেলত এসব খেলা। এতদিন পর খেলাগুলো ঠিকমত মনে নেই আমার। প্রভার কাছে শুনে আবার ফিরে এল ছেলেবেলা। যদিও বেশীর ভাগ খেলাতে সবাই আমাকে ‘মিল্ক রাইস’ করত। ‘দুধ ভাত।’ আমি কাউকে ছুঁয়ে দিলেও কিছু যায় আসে না, কেউ আমাকে ছুঁয়ে দিলেও কোন লাভ ক্ষতি নেই । চিরকালীন এলেবেলে । আসলে স্কুলের পড়াশোনাটা আমি করতে পারতাম, খেলাধূলা একেবারেই না। কিন্তু খুব ইচ্ছা ছিল কেউ আমায় দলে নিক, আমাকেও কেউ খেলোয়াড়ের সম্মান দিক । জীবনে সব ইচ্ছা কি পূরণ হয়? ‘মিল্ক রাইস’ আর ‘দুধ ভাত’ হয়েই কেটে গেছে আমার স্কুল জীবন। 

মনে পড়ছে "এল ও এন ডি ও এন লন্ডন" খেলাটার কথা । লীডার উল্টোদিকে মুখ ক'রে দাঁড়িয়ে থাকত। আমরা আড়াআড়ি লাইন ক'রে পিছনে। লীডার বলত টানা সুরে, "এল ও এন ডি ও এন লন্ডন"। সে কথার ফাঁকে আমরা এক পা এক পা ক’রে এগিয়ে যেতাম । তারপর লীডার ঘুরে দাঁড়ানোর আগে নড়াচড়া না ক’রে শান্ত হ’য়ে, স্থির হ’য়ে দাঁড়িয়ে পড়তে হ'ত। লীডার ঘুরে যদি কাউকে নড়তে চড়তে দেখত সে আউট। আর যে এক পা এক পা ক’রে এগিয়ে লীডারকে ছুঁতে পারবে তখন সেই হবে নতুন লীডার । 

খেলতাম ‘টি টি টি তোমার কি রং চাই?’ ‘টি টি’ র বাংলা ক’রে ‘চাচা তোমার কি রঙ চাই?’ একজন চোর হ’ত। এ খেলায় দলে অনেক লোক থাকত । আমরা সবাই চোরকে ঘুরে ঘুরে সুর ক’রে বলতাম ‘টি টি টি তোমার কি রং চাই?’ ‘চাচা তোমার কি রঙ চাই?’ হাত পা নেড়ে ভেংচি কেটে নানা রকম নাচানাচি করতাম । তারপর চোর কোন একটা রঙ বললেই সেই রঙ খুঁজতে দৌড়াদৌড়ি শুরু করে দিতাম আমরা। রং খুঁজে পাওয়ার আগে যদি কাউকে ছুঁয়ে দিত চোর তবে সে তখন হ’বে নতুন চোর। 

স্কুলে নানা রঙ খুঁজে পেতে একটু মুশ্‌কিল হ’ত যদিও। আমরা স্কুল ড্রেস পড়ে থাকতাম, নানা রঙের পোশাকের সুযোগ নেই। ছোট ক্লাশে মেয়েদের নেভী ব্লু স্কার্ট, সাদা শার্ট। গলায় সাদা স্কার্ফ। ছোট ছেলেদের নেভী ব্লু হাফ প্যান্ট, সাদা শার্ট । বড় ছেলেদের নেভী ব্লু ফুল প্যান্ট, সাদা শার্ট । সাদা কেডস সকলের। সাদা চক দিয়ে ঘষে ঘষে সাদা রং করতাম তা। কালো চামড়ার জুতাও ছিল। কিন্তু পি টি ক্লাশের দিন কেডস পড়ে আসতে হ’ত। বড় ক্লাশের মেয়েদের নেভী ব্লু টিউনিক; সাদা শার্ট; সাদা সালোয়ার; সাদা স্কার্ফ ; সাদা বেল্ট; কড়কড়ে মাড় দেওয়া, ফোল্ড করে ইস্ত্রি ক’রা সাদা ওড়না । অবশ্য আমাদের টিফিন বক্স আর স্কুলের ব্যাগে রঙের অভাব ছিল না । স্কুলের স্যার আপাদেরও তো আর স্কুল ড্রেস ছিল না। কিন্তু ‘টি টি টি তোমার কি রং চাই’ বলে ওঁনাদের ছোঁবার সাহস আমাদের কোনদিন হ’ত না। 

আমাদের গলার সাদা স্কার্ফ খুব কাজে আসত রুমাল চুরি খেলা আর কানা মাছি ভোঁ ভোঁ খেলা খেলবার সময়ও। 

রুমাল চুরি খেলায় সবাই গোল হ’য়ে চোখ বন্ধ ক’রে বসতাম । একজন চোর হ’ত। কোন একটা জনপ্রিয় গান করতে থাকতাম । গান চলবার সময়ে চোর রুমাল অর্থাৎ গলার স্কার্ফটা বসে থাকা কারো পিছনে খুব সন্তর্পণে রেখে দিত। যদি সে সাথে সাথে বুঝতে পারত তার পিছনে রুমাল রাখা হয়েছে, তবে উঠে চোরকে ধরতে পারলে সে তখন নতুন চোর হ’ত আর চোর তার জায়গায় বসে পড়ত । তা না হ’লে গান শেষ হ’লে, ঘুরে ঘুরে চোর এসে যার পিছনে রুমাল আছে তার পিঠে টোকা দিত। সে তখন উঠে চোরের পিছনে দৌঁড় দৌঁড়। চোরকে ছুঁতে হবে। আর চোরও দৌঁড়াচ্ছে তার খালি জায়গা টা নেওয়ার জন্য। চোরকে ছুঁতে না পারলে সেই তখন হ’বে নতুন চোর। 

গলার স্কার্ফ কাজে আসত ‘কানামাছি’ খেলাতেও । সবাই গোল হ’য়ে দাঁড়াতাম। মাঝখানে একজন চোখে স্কার্ফ বেঁধে। সেই হচ্ছে ‘কানামাছি’ । আমরা আমাদের গোলটার পরিধি আস্তে আস্তে বড় করতে থাকতাম । ‘কানামাছি’ আমাদের ছোঁওয়ার চেষ্টা করত । আর আমরা সুর ক’রে ক’রে ছড়া বলতাম, ‘কানামাছি ভোঁ ভোঁ যাকে পাবি তাকে ছোঁ।’ আর কানামাছির গায়ে টোকা দিতাম । যদি ‘কানামাছি’ চোখ বাঁধা অবস্থায় কাউকে ছুঁয়ে তার ঠিক ঠিক নাম বলতে পারত তবে সে হ’ত নতুন কানামাছি। 

আমাদের খুব প্রিয় খেলা ছিল ওপেনটি বায়োস্কোপ। দুই দলের রাজা মুখোমুখি দাঁড়িয়ে দু’ হাত উঁচু ক’রে ধনুকের মত করত। তার ভিতর দিয়ে আমরা সবাই কাঁধে হাত দিয়ে লম্বা লাইন ক’রে ঘুরে ঘুরে যেতাম । সেই সাথে সুর তুলে গান করতাম 

“ওপেনটি বায়োস্কোপ 
নাইন টেন টেইস্কোপ 
সুলতানা বিবিয়ানা 
সাহেব বাবুর বৈঠক খানা 
সাহেব বলেছে যেতে 
পান সুপারি খেতে 
পানের আগায় মরিচ বাটা 
ইস-স্প্রিঙের চাবি আঁটা 
যার নাম রেনু বালা গলায় দিলাম মুক্তার মালা।” 

গলায় দিলাম মুক্তার মালা ব’লে যে সে মুহুর্তে ধনুকের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিল তাকে ধরে ফেলা হ’ত। রাজারা তাকে জিজ্ঞাসা করত সে কোন দলে যাবে। এইভাবে সবাই একে একে ধনুকে ধরা পড়ে নিজেদের দল ঠিক ক’রে নিত। তারপর আসল মজা। দুইদলে দড়ি টানাটানির মত টানাটানি খেলা হ’ত। দড়ি ছাড়াই। কোন দল জিতল? 

এখনো মাঝে মাঝে স্বপ্নের ভিতর ফুল টোক্কা খেলাটার কথা মনে পড়ে। কে যেন বলছে, ‘আয় রে আমার টগর’ ‘আয়রে আমার বেলী’। সন্ধ্যা হ’য়ে আসছে। আজান এই বুঝি দিল। তবু ‘আয় রে আমার টগর’। 

ফুল টোক্কা খেলাটা দাবা খেলায় বোড়ের এগিয়ে যাওয়ার মত। দু’ দলে খেলা হ’বে। দু’ দলে দু’টো রাজা থাকবে । প্রত্যেক রাজা তার দলের সবার এক একটা ক’রে ফুলের নাম দেবে। দল দু’টো মুখোমুখি লম্বা লাইনে বসবে । এক দলের রাজা অন্য দলের কাছে গিয়ে একজনের চোখ দু’হাত দিয়ে ঢেকে নিজ দল থেকে ডাকবে, ‘আয় রে আমার টগর’ কিংবা ‘আয়রে আমার বেলী’। তখন টগর বা বেলী এসে কপালে টোকা দিয়ে যাবে। রাজা যখন চোখ খুলে দেবে, তখন বলতে হবে কাকে ডেকেছিল । ঠিক বলতে পারলে এক লাফে যতদূর এগোতে পারে 

যাবে । ঠিক বলতে না পারলে যে টোকা দিতে এসেছিল সে লাফ দিয়ে অন্য দলের দিকে যতদূর যেতে পারে যাবে। এভাবে যে দল আগে অন্যদলকে পার করে যেতে পারবে সেই দল জিতবে । 

ইঁদুর, বিড়াল খেলায় একজন ইঁদুর হ’বে, একজন বিড়াল হ’বে। বাকি সবাই হাতে হাত ধরে ধরে গোল হ’য়ে দাঁড়াবে। সবাই ইঁদুরের পক্ষে। ইঁদুর ভিতরে থাকবে, বিড়াল বাইরে। বিড়াল হাতের ভিতর দিয়ে হোক যেভাবে হোক ভিতরে ঢুকে ইঁদুর ধরবার চেষ্টা করবে। সবাই বাঁধা দেবে। ইঁদুর ধরা যাবে না । ইঁদুরকে বাঁচানো চাই। 

আরো কত খেলা। ইচিং বিচিং চিচিং চা, প্রজাপতি উড়ে যা। দু’জন মাটিতে পা ছড়িয়ে বসত। পায়ের পাতায় পায়ের পাতা লাগিয়ে। অন্য দু’জন ইচিং বিচিং চিচিং চা, প্রজাপতি উড়ে যা বলে ঘুরে ঘুরে লাফ দিত সে দুই পা’র ফাঁকে। 

দড়ি টানাটানি খেলা আমরা এমনি খেলতাম না। কিন্তু সবসময় দড়ি টানাটানি খেলা থাকত স্কুলের স্পোর্টস ডে তে। আহা স্পোর্টস ডে! লাল নীল কাগজে তিন কোণা ফ্ল্যাগ বানিয়ে ময়দা দিয়ে আঠা ক’রে সেই ফ্ল্যাগ চিটানো হ’ত দড়িতে। তারপর সেই ফ্ল্যাগওয়ালা দড়ির মালা চারদিকে ঝোলানো হ’ত। দড়ি টানাটানিতে ক্লাশ নাইনের উল্টোদিকে ক্লাশ টেন বা স্যারদের বিপরীতে আপারা। দড়ির মাঝখানে একটা রুমাল বাঁধা থাকত। তার দু’পাশে দু’দল। যে দল টেনে অন্য দলের সবাইকে নিজেদের দিকে নিয়ে আসতে পারবে সে দলের জিত। আপারা জিততে পারল না স্যাররা জিততে পারল তা নিয়ে ভীষণ হুল্লোড় পড়ে যেত আমাদের মধ্যে। 

যখন এসব দেশজ খেলা খেলতাম না, আমরা খেলতাম স্কুলের মাঠে ব্যাডমিন্টন। যদিও আমি ব্যাডমিন্টন পর্যন্ত খেলতে পারতাম না। মনে মনে যদিও সবসময় ভাবতাম খেলাতেও আমি ট্রফি পাব। আসলে স্কুলে মনে হ’য় শুধু দাবা খেলায় আমি পুরস্কার পেয়েছিলাম। তাও দাবার পুরস্কার স্পোর্টস ডে তে মনে হ’য় দেয় নি । কালচারাল অনুষ্ঠানের বিতর্ক প্রতিযোগিতা , আবৃতি এইসবের সাথে দিয়েছিল। অথচ স্পোর্টসের মাঠে সকলের সামনে দিয়ে গর্বভরে হেঁটে গিয়ে পুরস্কার নেওয়ার কত যে লোভ ছিল আমার! আর সেই ভিক্টরি স্ট্যান্ড! আহা! 

সময়ের অভাবে যে সব খেলা আমরা স্কুলে খেলতে পারতাম না তা খেলতাম বাড়ি গিয়ে। বাড়ির সামনের মাঠে খেলতাম দাঁড়িয়া বাঁধা, নুনা, বদন, বৌচি, টিপু, মোরগ লড়াই, লুকোচুরি, গোল্লাছুট। বারান্দায় খেলতাম কিত্ কিত্, এক্কা দোক্কা । ছেলেরা খেলত গুলি, লাট্টূ, উড়াত ঘুড়ি। বন্ধুদের সাথে ধাক্কাধাক্কি ক’রে খেলে হাঁটুর আর কনুই-এর চলটা উঠিয়ে ফেলেছিলাম আমরা। আমাদের ভিডিও গেম ছিল না । 

এখনো খুব মনে পড়ে টিপু খেলার কথা। দুই দল হ’ত। দল দু’টো নিজেদের মধ্যে কয়েক গজ দূরে দাঁড়াত । মাঝখানে পিরামিডের মত ক’রে সাতটা, নয়টা বা এগারোটা পাথর সাজিয়ে রাখা হ’ত। প্রথম দলের থেকে একজন একটা বল দিয়ে পিরামিডের দিকে ছুঁড়ে মারত। যদি পিরামিডটি ভাংতে পারে। তিনবার সুযোগ দেওয়া হ’ত । যদি সে পিরামিড ভাংতে না পারে তখন দ্বিতীয় দল চেষ্টা করত । আর যদি প্রথমদলের জন পিরামিড ভাংতে পারল কিন্তু দ্বিতীয় দলের কেউ বল মাটি ছোঁওয়ার আগে তা ধরে ফেলল, তবে দ্বিতীয় দলের টার্ন এসে যেত। তারা তখন পিরামিডে বল ছুঁড়বে। আর যদি দ্বিতীয় দলের কেউ বল্ টা ধরতে না পারে, তবে তাদের কাজ হবে প্রথম দল যেন আবার পিরামিড বানাতে না পারে তা দেখা। দ্বিতীয় দল বল ছুঁড়ে ছুঁড়ে প্রথম দলের কাউকে ছুঁতে পারলে তারা হেরে যাবে। আর যদি প্রথম দলের কাউকে বল ছুঁতে না পারে আর তারা পিরামিড সাজাতে পারে তবে তাদের আবার টার্ন হ’বে পিরামিডে বল ছোঁড়ার। আর তা না হ’লে দ্বিতীয় দলের টার্ন এসে যাবে। পিরামিড সাজিয়ে আমরা তারস্বরে সুর ক’রে বলে উঠতাম ‘টিপু’। 

আর সেই যে মোরগ লড়াই? ডান হাত পিছনে নিয়ে গিয়ে বাম পায়ের গোঁড়ালি ধরতে হ’বে । তারপর পিঠের পিছন দিক দিয়ে বাম হাত নিয়ে গিয়ে ডান হাত ধরতে হ’বে। তারপর অন্য দের পাশে ঘুরে ঘুরে একজন আর একজনকে ধাক্কা দিতে হবে। ধাক্কা খেয়ে যার হাত বা পা আর মোরগের ভঙ্গীতে থাকবে না, সে আউট। শেষ পর্যন্ত যে মোরগের মত থাকতে পারবে সেই জিতবে। 

কাচের মার্বেল দিয়ে গুলি খেলা হ’ত। ছেলেরাই বেশি খেলত। আর আমি অবাক হ’য়ে মার্বেলগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকতাম । মসৃণ কাচের মার্বেল। নীল, সবুজ, সাদা বা লাল রঙের । ভিতরে সাদা, হলুদ , নীল বাবল মত । আমি খালি ভাবতাম কিভাবে ওই সাদা, হলুদ , নীল রং মার্বেলের ভিতরে গেল । 

মাটিতে পায়ের গোড়ালি দিয়ে একটা ছোট গর্ত করা হ’ত। নীচু হ’য়ে বসে আঙ্গুল ধনুকের মত ক’রে মার্বেল ছুঁড়ে দিতে হ’ত গর্তে। নিজের গুলি দিয়ে গর্ত থেকে অন্যদের গুলি সরাতে হ’ত । আর যে প্রথম নিজের সব গুলি ওই গর্তের ভিতর ছুঁড়তে পারত সে জিতে যেত আর সব গুলি পেত। 

ছেলেরা ছাদে উঠে লাল, নীল ঘুড়ি দিয়ে আকাশটা ছেয়ে ফেলত। আমার বড় লোভ হ’ত। কিন্তু মেয়েরা ঘুড়ি উড়ায় না। আমি পাশে দাঁড়িয়ে দেখতাম ওরা কাচের গুঁড়ো ক’রে তা দিয়ে মাঞ্জা বানাচ্ছে। সূতায় লাগিয়ে তা দিয়ে অন্যের ঘুড়ি কাটাকাটি করছে। দিদা সবসময় বলত ছাদের কার্নিশের কাছে যাবি না। আকাশে চোখ রেখে কার্নিশ টপকে মাটিতে পড়ে যাবি। বয়স্কদের কথা না শুনে কতবারই আমরা জীবনের কার্নিশ টপকে পড়েছি, আকাশে উড়ে গেছে নানা রঙ্গের ঘুড়ি। 

তথ্যসূত্রঃ 



(চলবে)

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন