বুধবার, ২১ জুন, ২০১৭

দীপেন ভট্টাচার্য'এর গল্প : সিনেস্থেশিয়া

১৯৮০র দশকের মাঝামাঝি রথখোলা মোড়ের কাছে নবাবপুর রোডের ওপর আমার একটা চেম্বার ছিল। নিচে ড্রেন পাইপের দোকান, সেটার সাথে একটা সরু গলি, দুজন মানুষও পাশাপাশি হাঁটতে পারে না, সেই গলির সাথেই লাগোয়া সিঁড়ি দিয়ে উঠে আসতে হত দোতলার একটা লম্বা বারান্দায়।বারান্দায় পরপর কয়েকটা দরজা। একটা দরজার ওপরে লেখা - ডঃ আবদুল মতিন, এম বি বি এস, সাইকিয়াট্রিস্ট। সন্ধ্যা ছটায় চেম্বারে যেতাম, চার ঘন্টা বসতাম, রোগীর দেখা খুব একটা মিলত না, মনোরোগী হওয়া সামাজিক ভাবে গৃহীত হতো না বলেপরিবার থেকে মনোচিকিৎসকের কাছে যাওয়াটাকে নিরুৎসাহিত করা হতো। 

সেদিনটা খুব গরম পড়েছিল, জুন মাস হবে। বর্ষার দেখা নেই,গুমোট সন্ধ্যায় সাহানা নামে এক নারী আমার চেম্বারে আসে, বয়স হয়তো ত্রিশ বা পঁয়ত্রিশ। আমার চেম্বারের একটা ছোট জানালা দিয়ে পাশের বাড়ির ছাদ দেখা যায়, সেখানে কাপড় শুকানোর জন্য মেলা থাকত। হয়ত সেদিকে তাকিয়ে আনমনা ভাবেই সাহানা বলেছিল, “আমি শব্দের সঙ্গে রঙ দেখতে পাই।”এরকম অদ্ভূত ব্যাপার আগে শুনি নি, রাস্তার গোলমেলে আওয়াজ সাহানার মনে রূপান্তরিতহয় এক ধরণেরধূসর আলোর ওঠা-নামায়, কাকের কর্কশ ডাকের রঙ হয়ে যায় গাঢ় বেগুনী, মানুষের কথা বর্ণালীর প্রতিটি রঙকে ছুঁয়ে যায়। সাহানা ভেবেছিল এটা এক ধরণের মনোবিকলতা, এরপর সেতার একাত্তর সনের কাহিনী বলে। 

১৯৭১ সনেরজুলাই মাসে সাহানা খুলনা শহরের উত্তরে ভৈরব নদীর পাড়ে গ্রামে তার পৈত্রিক বাড়িতে ছিল। সাহানার কন্যাসন্তান রেবার বয়স যখন তিন বছরের মত। (আমি ভাবলাম সাহানার তাহলে খুব অল্প বয়সেই বিয়ে হয়েছিল।) তার স্বামীআবু মুর্তজা এপ্রিল মাসেই মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিতে চলে যান। জুলাই মাসের এক সন্ধ্যায় স্থানীয় রাজাকারদের সহযোগিতায় পাকিস্তানী সেনারা তাদের গ্রামকে ঘিরে ফেলে। হিন্দুপ্রধান গ্রামটির প্রায় শখানেক নারী পুরুষকে স্কুলের মাঠে জড়ো করে। স্থানীয় হিন্দুদের সাথে সাহানার বাবা ও এক ভাইকেও আর্মি ধরে নিয়ে যায়। অনেক নারী পুরুষ ভৈরবে ঝাঁপ দেয়,অনেকেই নদী সাঁতরানোর সময় মেশিনগানের গুলি এড়াতে পারে না। সাহানাকে তার মা বাড়ির পেছনের ডোবায় লুকিয়ে থাকতে বলে স্কুলের মাঠে স্বামীকে বাঁচানোর জন্য দৌড়ে যায়। 

সাহানাদের উঠোনেরচারদিকে চারটা টিনের চালের ঘর, তার একটির পেছনে ডোবা। সেই ঘরটির এক কোনায় রেবাকে লুকিয়ে রেখে, সন্ধ্যার অবরোহী অন্ধকারে, সাহানা দৌড়ে আকন্দ আর আঁশশেওড়ার মাঝে বৃষ্টির পানি জমা ছোট ছোট খানা পেরিয়ে বাঁশঝাড়ের পাশে কচুরিপানাভরা ডোবায় পৌঁছায়। অন্ধকারে পথ চলতে তার কোনো অসুবিধা হয় না, অন্ধকারেও তার চোখে সবকিছু লাল আবছা আলোয় জ্বলে, তার চেয়েও বড় কথাযেকোনো শব্দ তার কাছে আলো হয়ে ধরা দেয়। ডোবায় নেমে কোমরজলেদাঁড়িয়ে সাহানাদেখেডোবার পাড়ে কে যেন এসে টর্চ দিয়ে তার খোঁজ করছে। অন্ধকারেও রহম রাজাকারকে চিনতে পারে সাহানা, তাকে ধরতেই রহম পাকিস্তানী সেনাদের গ্রামে নিয়ে এসেছে। রহম জানত সেকাছেই কোথাও আছে, কিন্তু তার প্রতিটি পদশব্দ সাহানা অনুসরণ করতে পারছিল।খানার পানিতে পা পড়ে যেখানে ছলাৎ করে উঠছিল সেখানে সে দেখছিল গাঢ় সবুজ আলো, আগাছায় কাপড়ের স্পর্শ হয়ে উঠছিল একটা অবর্ণনীয় গোলাপী।রহমের টর্চের আলো এড়াতে ডোবার আরো গভীরে যেয়ে দমবন্ধ করে পানিতে ডুব দেয় সাহানা। শব্দে ভরা ছিল সেই ডোবা, মাছের শব্দ, হয়তো বা সাপ, কাদা থেকে উঠে আসা অজানা গ্যাসের বুদবুদের শব্দ। সেইসব শব্দ সাদা আর সবুজ রঙে উজ্জ্বল হয়ে তার মনে ভেসে ওঠে। পানির ওপরে টর্চের আলো ধরা থাকে আরো কিছুক্ষণ। শুধুমাত্র তখনই যখন বুকটা মনে হয় ফেটে যাবে টর্চের আলো সরেযায়। পানির ওপরে মাথা তুলে নিঃশ্বাস নেয় সাহানা, রহম রাজাকার চলে গেছে। 

কান্নার শব্দ ভেসে আসছে বাড়ি থেকে। ভেজা কাপড়ে বাড়ি ফিরে সাহানা খুঁজে পায় রেবাকে। কিন্তু তার মা, বাবা ও ভাই আর ঘরে ফিরে আসে না। 

স্তব্ধ হয়ে সাহানার কাহিনী শুনি, কিন্তু সাহানা আমাকে ১৯৭১র ইতিহাস শোনাতে আসে নি।শব্দ থেকে আলো সঞ্চারিত হয় - এ কি ধরণের মনোবৈকল্য? তার স্বামী - আবু মুর্তজা - এ নিয়ে তাকে মানুষের সঙ্গে কথা বলতে নিষেধ করেছে, পাছে লোকে তাকে হয় মিথ্যুক নয় ডাইনী ভাবে। কিন্তু যত দিন যায় তত সে শব্দে সংবেদী হয়ে উঠছে, রাতের পর রাত সে জেগে থাকে, রাস্তার সামান্য শব্দ ঘরকে আলো করে দেয়। এটুকু বলে সাহানা চুপ করে যায়, এমন যেন যা বলতে এসেছিল তার থেকে বেশী বলে ফেলেছে। জানি না সেদিন সাহানার কথা বিশ্বাস করেছিলাম কিনা, তাকে তার ঠিকানাটা রেখে যেতে বলি, যদি এ বিষয়ে কোনো গবেষণা আমার চোখে পড়ে তাকে জানাবো বলে আশ্বাস দিই। সাহানার আচরণে আমি কোনো অস্বাভাবিকতা পাই না, তাকে মাসখানেক পরে আবার চেম্বারে ফিরে আসতে বলি। সাহানা যুগীনগর রোডের একটা ঠিকানা দিয়েছিল। 

কোনো কারণে সাহানাকে আমি চেম্বারের বাইরে বারান্দা পর্যন্ত এগিয়ে দিই। সরু সিঁড়িটা দিয়ে নামার সময় খেয়াল করি সাহানার শরীরে হঠাৎ কেমন যেন একটা স্থবিরতা এসেছে, যেন হঠাৎ করে তার বয়স বেড়ে গেছে, সিঁড়িটা দিয়ে নামতে তার অসুবিধা হচ্ছিল। এর পরে সাহানা আর ফিরে আসেনি। আমিও এর মধ্যে আবার যুক্তরাজ্য যাই একটা ডিগ্রীর জন্য। সেখানে যেয়ে সিনেস্থেশিয়া নামে একটি বৈশিষ্টের কথা শুনি। অনেক মানুষ নাকি লিখিত সংখ্যা দেখলে তাতে রঙ দেখে, যেমন ১ হল লাল, ২ সবুজ ইত্যাদি। রঙটা যে খুব স্পষ্ট তা নয়, বরং সংখ্যাটা ঘিরে আবছা আলোয় জ্বলে। অনেকদিন পরে সাহানার কথা মনে পড়ে, সাহানা শব্দ থেকে রঙ দেখে, সংখ্যা দেখে রঙ দেখা কি তার থেকে খুব দূর হতে পারে? সিনেস্থেশিয়া মানেই হল একটি বোধ দিয়ে আর একটি বোধের জাগরণ। দেখলাম শব্দ থেকে আলো সঞ্চারণ সিনেস্থেশিয়ারই একটা অংশ, সেটাকে ক্রোমেস্থেশিয়া বলে।তখনই ভাবি দেশে যেয়ে সাহানাকে খুঁজে বের করতে হবে। 

দুবছর পরে দেশে ফিরে সাহানার খোঁজে তাদের বাসায় যাওয়াটা ঠিক হবে কিনা এই নিয়ে বহু মাস চিন্তা করলাম। শেষাবধি একদিন সাহস করে ছুটির সন্ধ্যায় যুগীনগরের রাস্তায় বাসাটা খুঁজে বের করলাম। এভাবে হুট করে সাহানার খোঁজে চলে আসা ঠিক হবে কিনা বুঝতে পারছিলাম না, কিন্তু আমার আর কোনো উপায় ছিলা না। বাইরে নামফলকে লেখা ছিল - আবুমুর্তজা। দরজায় কড়া নাড়লে এক মধ্যবয়সী ভদ্রলোক দরজা খুললেন। আমার পরিচয় দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম উনি মুক্তিযোদ্ধা মুর্তজা কিনা। বললাম ওনার সঙ্গে কিছু কথা আছে, একটু যদি সময় দিতেন। ভেতরে এসে বসতে বললেন।

রাস্তার সঙ্গেই লাগোয়া ঘরটায় সন্ধ্যার আবছায়া আলো পৌঁছাতে পারছিল না। আবু মুর্তজা সুইচ টিপে একটা বাতি জ্বালালেন, সেই বাতির দুর্বল তরঙ্গ ঘরটাকে তেমন আলোকিত করতে পারল না। টিমটিমে আলোয় একটা সোফায় বসলাম, মুর্তজা সামনে একটা চেয়ারে বসলেন। কথাটা বলতে ইতস্তত করছিলাম, তারপর সাহস করে একবারেই বলে ফেললাম,“আপনার স্ত্রী সাহানা কয়েক বছর আগে আমার চেম্বারে এসেছিলেন তাঁর একটা বৈশিষ্ট আলোচনা করতে।”কিন্তু সাহানার নামটা উচ্চারণ করা মাত্র ভদ্রলোক চমকে আমার মুখের দিকে চাইলেন, আধো-অন্ধকারে মনে হল তার মুখটা বদলে গিয়ে একটা কদাকার চেহারা ধারণ করল। মনে হল সেই মুখ এক চাপা-ক্রোধে কাঁপছে, সেই ক্রোধ সঞ্চারিত হয়েছে তাঁর শরীরে। চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন মুর্তজা, চিৎকার করলেন, “কী বললেন? আমার স্ত্রী সাহানা। সাহানা! এখনই এই ঘর থেকে বের হন। ব্যাটা জোচ্চর, কী ঠগবাজি করতে এসেছ এখানে। মিথ্যাবাদী। বের হও!”আপনি থেকে তুমি, তারপর তুই, তারপর আরো অনেক ধরণের গালি - যা এখানে লেখা যাচ্ছে না - ব্যবহার করলেন।

সেই সন্ধ্যার অভিযানটা সম্পর্কে আমার যথেষ্ঠ সন্দেহ ছিল, তবু এর প্রতিক্রিয়াটা যে এত তীব্র হবে সেটা অনুমান করি নি। অপমানে, লজ্জায়, রাগে আমার শরীর যে পুড়ে গেল, মুহূর্তে ঘাম জমল কপালে।মাথা নিচু করে ঘর থেকে রাস্তায় বেরিয়ে গেলাম। 

এরকম অপমানিত জীবনে হই নি। মাথা নিচু করে হেঁটে যাচ্ছি, সারা শরীর ঘামে ভিজে গেছে, আর একটা রিক্সার খোঁজ করছি যাতে এই পাড়া থেকে পালাতে পারি। এই ছোট রাস্তায় রিক্সা দাঁড়ানোর কোনো জায়গা নেই, কাজেই রিক্সা পেতে হলে বড় রাস্তায় যেতে হবে। এর মধ্যে বিদ্যুৎ চলে গেল, অন্ধকারে পথ চলতে অসুবিধে হচ্ছিল। হঠাৎ পেছন থেকে কে যেন আমার জামাটা টেনে ধরল। ভাবলাম আবু মর্তুজা, এবার প্রাণ নিয়ে এখান থেকে যেতে পারলে হয়। ঘুরে তাকিয়ে দেখি একটি ১৭/১৮ বছরের মেয়ে। হাঁফাচ্ছে, তাকে আমাকে ধরতে তার অনেকটা দৌড়াতেই হয়েছে। একটু লজ্জিত হয়ে মুখ নিচু করে সে বলল, “আমার নাম রেবা, সাহানা আমার মা’র নাম।” আমি স্তম্ভিত হলাম। সে বলল, “আপনাকে এগিয়ে দিই।” এই মেয়েটি আমাকে এগিয়ে দেবে মানে আমাকে এই পাড়া থেকে নিরাপদে বের করে দেবে - প্রথমে খুব আশ্চর্য হলেও মেয়েটির দৃঢ় উচ্চারণ ও আত্মবিশ্বাস আমাকে আশ্বস্ত করল, তার উপস্থিত আমার অপমানে উত্তপ্ত মুখকে ঠাণ্ডা করল। 

রেবা বলল, “আপনি মিথ্যেবাদী নন। আপনার মুখ দেখেই আমি সেটা বুঝতে পেরেছি। মানুষ সত্য বলে না মিথ্যা বলে সেটা আমি সাথে সাথেই বুঝে যাই। মিথ্যা বলার সময় তাদের ত্বকের তাপমাত্রার সামান্য পরিবর্তন হয়, আমি সেটা ধরতে পারি।”অল্প-বয়সী কেউ এমন গুছিয়ে কথাবলতে পারে? আমিআবার আশ্চর্য হই।

“তুমি ধরতে পার?কীভাবে?”আমি প্রশ্ন করি। 

“ত্বকের তাপমাত্রাভেদে বিভিন্ন আলো বের হয়, আমি সেটা দেখতে পাই। আপনি আমার মাকেখুঁজতেএসেছিলেন, কিন্তু আমার মা বেঁচে নেই। আপনার কাছে যিনি গিয়েছিলেন তিনি আমার মা নন, আমার সৎ মা।”

রেবার কথাগুলো আমাকে ধীরে ধীরে বিশ্লেষণ করতে হল। সাধারণ বাচনে কেউই ‘তাপমাত্রাভেদে’ কথাটা ব্যবহার করে না, সে যত বড় শিক্ষিতই হোক। আর তার মা যদি বেঁচে না থাকে তবে আমার চেম্বারে কে গিয়েছিল? রেবা আমার প্রশ্নের জন্য অপেক্ষা করে না, বলে, “আমার মার মৃত্যুর পরে বাবা তার থেকে বয়সে প্রায় কুড়ি বছরের ছোট একজনকে বিয়ে করেন। আমি তাঁকে সালেহা-মা বলে ডাকি। সালেহা-মা বাবার কাছ থেকে আমার মা সম্বন্ধে শোনেন, বাবা তাঁকেআমার মাযে শব্দতে আলো দেখতে পেতেন, লেখায় রঙ দেখতে পেতেন সে সব বলেন। প্রতিদিনই বলেন। এই শুনতে শুনতে সালেহা-মা বোধহয় এক ধরণের বিভ্রান্তির মধ্যে পড়েযান। নিজেকে আমার মা -অর্থাৎ সাহানা - বলে ভাবতে শুরু করেন। আপনার চেম্বারে যখন তিনিযান নিজেকে সাহানা ভেবেই যান।”

আমার হাঁটা খুবই মন্থর হয়ে যায়। 

“সবসময়ই যে তিনি সাহানা থাকেন তা নয়,” রেবা কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার বলে, “কিন্তু গত কয়েক বছরেএই আচরণটা বেড়েছে।”

“আর তোমার মা? উনি কবে মারা গেলেন?”

“১৯৭১ সনে, জুলাই মাসে। সন্ধ্যাবেলা পাকিস্তানী আর্মি গ্রামে ঢোকে। রহম রাজাকার নামে গ্রামেরই একজন তাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে আসে। বাড়ির পেছনের ডোবায় মা লুকাতে গিয়েছিলেন। সেখানে তলিয়ে যান। সারা গ্রাম আর্মিরা জ্বালিয়ে দেয়, শ খানেক লোককে হত্যা করে, অনেক মেয়েদের ধরে নিয়ে যায়। আমার নানা নানী মামাও মারা যান। পরে ডোবায় মা’র দেহ ভেসে ওঠে, কিন্তু সেটা তুলে কবর দেবার লোক ছিল না।”

ডোবার গভীরতা থেকে তাহলে সাহানা আর মুক্তি পায় নি। “আর তোমাকে নানাবাড়ির একটা ঘরে পাওয়া গিয়েছিল, কাঁদছিলে?” আমি জিগ্যেস করি। 

“হ্যাঁ, আমি নাকি কেঁদে কেঁদে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। গ্রামের বাদবাকি লোকেরা ফিরে এলে তারা আমাকে উদ্ধার করে। বাবা অগাস্ট মাসে ফিরে এসে আমাকে পান। এরপর আমাকে পাশের গ্রামের এক দুঃসম্পর্কীয় আত্মীয়র বাড়িতে রেখে আবার চলে যান। যুদ্ধেরশেষদিকে ঢাকার কাছে একটা পাকিস্তানী ক্যাম্প থেকে উনিএকটি মৃতপ্রায় মেয়েকে উদ্ধার করেন। সে মেয়েই সালেহা-মা।”

সাহানা - না সাহানা নয়,তরুণী সালেহা আমার চেম্বারে এসবই বলেছিল, শুধু সাহানার মৃত্যুর সংবাদটা দেয় নি। কিন্তু সালেহা সেই ডোবার গুপ্তকথা জানতে পেরেছিল, আকন্দ, আঁশশেওড়া আর বাঁশঝাড়ের আলো দেখেছিল। এতদিন পরে মনে পড়ল আমার চেম্বার থেকে বের হবার সময় সালেহা কেমন ঝুঁকে পড়েছিল, যেন হঠাৎ বয়সের ভার বেড়ে গেছে। 

হাঁটতে হাঁটতে নবাবপুর রোডে চলে এসেছিলাম। রেবাকে বললাম, “তুমি এখান থেকে বাড়ি ফিরে যেতে পারবে?” রেবা বলল, “এখান থেকে একটা রিক্সা নিয়ে নেব। আমার জন্য চিন্তা করবেননা। মানুষ সত্য না মিথ্যা বলছে তা যেমন বুঝি, লোকে কী করতে পারে তাও আগে থাকতে বুঝি। এটা আমার মা’র থেকে পাওয়া শক্তি। এই শহরে চলাফেরা করতে আমি ভয় পাই না।”

রেবাকে রিক্সায় তুলে দিয়ে সেই রিক্সার দিকে বহুক্ষণ তাকিয়ে থাকি। সাহানার ক্ষমতা সঞ্চারিত হয়েছে তার মেয়ের মধ্যে, এমনকি অদ্ভূতভাবে সালেহার মধ্যেও। 

এর বহুবছর পরে একবার মার্কিন দেশে বেড়াতে এসে আমার দেখা হয় পুরোনো দিনের বন্ধু অমলের সাথে। এক শীতের তুষার-পড়া অপরাহ্নে অমলকে এই কাহিনী বললে সে বলে, সংখ্যা থেকে রঙ দেখা যাবার ঘটনা সে জানে, আর শব্দ থেকে রঙের কথা - যাকে ক্রোমেস্থেশিয়া বলে - সে পড়েছে। অনেক বড় বড় ক্লাসিকাল সুরকারদেরও নাকি এই বোধটা ছিল। অমলবলল, মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশের মধ্যে অবাঞ্ছিত যোগাযোগ সিনেস্থেশিয়ার কারণ বলে অনেকে ব্যাখ্যা করলেও কিছু বিজ্ঞানীদের মতে এর কারণ আরো গভীর - মস্তিষ্ক ইন্দ্রিয়বোধকে কীভাবে ব্যাখা করছে বা কী অর্থ দিচ্ছে তার ওপর নির্ভর করে। 

অমলের কাছে সাহানার চাইতে সালেহার ঘটনাটা আরো চমকপ্রদ লাগল। ও বলল, আমাদের মাথায় মিরর বা আয়না-নিউরন আছে যেগুলো কিনা অন্য মানুষের কার্যকলাপকেপ্রতিবিম্বিত করে।সাহানাকে না বাঁচাতে পারায় মুর্তজার মনে একধরণের দোষবোধ কাজ করে, যা সালেহাকে আর্মি ক্যাম্প থেকে উদ্ধার করেও দূর হয় না।তাই সে সালেহাকে প্রতিনিয়তই সাহানার গল্প করে।ক্যাম্পে সালেহা ধর্ষিত হয়, অত্যাচারিত হয়, আবু মুর্তজা তাকে উদ্ধার করে, তাকে নতুন জীবন গড়তে সাহায্য করে। কিন্তু মুর্তজার দোষবোধ ধীরে ধীরে সালেহার মধ্যে সঞ্চারিত হয়। বেঁচে থাকার দোষবোধ, যদিও তার অতীতও ক্ষত-বিক্ষত। মুর্তাজার কাছেসাহানার ক্থা শুনতে শুনতে সালেহারআয়না-নিউরনগুলো ধীরে ধীরে সালেহাকে সাহানা করে তোলে, এইভাবে সালেহার ওপর সাহানার অস্তিত্ব আরোপিত হয়, ডুবে যাওয়া সাহানাকে সে বাঁচিয়ে তুলতে চায়। 

“আর রেবা?” প্রশ্ন করি। “রেবা সাহানার সন্তান, তার ক্ষেত্রেওসিনেস্থেশিয়া ঘটে,” বলে অমল,“তবে আমার কেন জানি মনে হয় ঐ পরিবারের সবাই - এমন কি আবু মুর্তজাও - এই বৈশিষ্টের অধিকারী। মুর্তজার সিনেস্থেসিয়া না থাকলেসালেহার নিউরনকে সে হয়তোবাএমনভাবে প্রভাবিত করতে পারত না। 

আমলের কথা শুনেনীরব হয়ে বসে থাকি। কাচের জানালার বাইরে নিস্তব্ধে তুষার পড়ে। সেই নিস্তব্ধতা কোনো আলো সৃষ্টি করে না, কিন্তু সেই নিস্তব্ধতা আমার মনকে বিষণ্নতায় ভরিয়ে দেয়।

1 টি মন্তব্য: