বুধবার, ২১ জুন, ২০১৭

মাহবুব লীলেন'এর গল্প : মালজোড়া

শরীরটা সামনে ঝুঁকিয়ে হাতলের শেষ মাথায় শক্ত করে বাম হাত আর একটু উপরের দিকে আলতো করে ডান হাত রেখে কুড়ালটা বাগিয়ে ধরে আব্দুল ওহাব। তার হাত আর শরীরের এই পজিশন সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে কোপ মারার পজিশন। কোপ মারার আগে হাত আর মেরুদ- একসাথে পেছনে গিয়ে একসাথে নেমে আসবে সামনে। অর্ধেক সেকেন্ড সময় লাগবে কুড়াল মাথার উপর তুলতে আর বাকি অর্ধেক সেকেন্ডে হ্যাপ করে নেমে আসবে সামনে।
সোজা কুড়ালের ফালিটা গিয়ে ভ্যাৎ করে গেঁথে যাবে বাঘের চোয়াল কিংবা কণ্ঠার হাড়ের জোড়ায় কিংবা পাঁজর আর ডানার হাড়ের ফাঁকে। আব্দুল ওহাব এই জীবনে হয়ত আর মাত্র একটা কোপ মারার সুযোগই পাবে। কোপটা ঠিকঠাক মতো লাগাতে পারলে বেঁচেও যেতে পারে। কিন্তু যদি সুযোগ না পায় কিংবা ভুল কোপ বসিয়ে দেয় তাহলে এটাই তার জীবনের শেষ কুড়াল তোলা...

বাঘের চোখে চোখ রেখে কুড়ালের ফালিটা শরীরের একটু বাইরে ডান দিকে পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রি এঙ্গেলে ধরে দাঁড়িয়ে থাকে আব্দুল ওহাব। এখন চোখের পাতাও ফেলা যাবে না। বাঘের হাত পা নড়ার ইঙ্গিত বাঘের চোখে পাওয়া যায়। কোনোভাবে বাঘটা যদি তার চোখ দুটো আব্দুল ওহাবের চোখ থেকে আড়াল করতে পারে তবে সর্বনাশ ঘটে যাবে। মাত্র আট হাত দূরে দাঁড়িয়ে ডানে বামে সুযোগ খুঁজছে বাঘটা। তার একটাই সুযোগ দরকার। আব্দুল ওহাবের চোখ ফাঁকি দিয়ে একটা লাফ কিংবা একটা থাবার সুযোগ...

প্রায় আধা ঘণ্টা ধরে দুজন দাঁড়িয়ে আছে মুখোমুখি। দুজনেই সুন্দরবনে পার করে দিয়েছে নিজেদের তিনভাগের দুইভাগ বয়স। আব্দুল ওহাব পার করেছে চল্লিশ আর বাঘটা করেছে আট বছর। সুন্দরবনে দুজনের কেউই আনাড়ি না। শিকারের কৌশল আর শিকারের শক্তি দুজনেই ভালো করে জানে। তাই আধাঘণ্টা ধরে দুজনেই দুজনের দিকে চোখ রেখে বৃত্তাকারে ঘুরছে। বাঘটা ডানে গেলে আব্দুল ওহাবও ডানে সরে বৃত্তের ডানে বামে সমান দূরত্ব রাখে। আব্দুল ওহাব বামে গেলে বাঘটাও বামে সরে গিয়ে মুখোমুখি থাকে। কেউ কাউকে পিছন দিতে রাজি নয়। কেউ কাউকে চোখছাড়া করতে রাজি নয়...

বাঘটা মাঝে মাঝে দাঁড়িয়ে একটু শরীর শিথিল দেয়। আব্দুল ওহাব তখন এক পায়ে ভর দিয়ে অন্য পা বিশ্রামে রাখে। বাঘটা কখনও মাটিতে পাছা ঠেকিয়ে বসে পড়ে। আব্দুল ওহাব তখন হাত নামিয়ে কুড়াল ঝুলিয়ে ধরে হাতকে বিশ্রাম দেয়। পরক্ষণেই বাঘটা চোখের দুইপাশে কান নিয়ে এসে এক পা সামনে বাড়ায়। মুহূর্তে টান টান হয়ে উঠে আব্দুল ওহাবের হাত-পা আর শরীর...

বাঘের দুই চোখে নজর রাখে আব্দুল ওহাব। আব্দুল ওহাব নজরে রাখে সামনে বাড়ানো ডান পায়। লাফ দেবার আগে শরীরের ভারে এই পা টানটান হয়ে উঠবে আর এই পায়ে ভর দিয়ে বাঘের বাম পা উঠে যাবে শূন্যে। বাঘটা এখন যেখানে দাঁড়িয়ে আছে সেখান থেকে লাফ দিলে সামনে বাড়ানো ডান পা দিয়েই থাবা ঝাড়বে তাকে। ডান পায়ে ভর করে বাম পা বাড়িয়ে লাফ দিয়ে শূন্যের মধ্যেই ডান পা শরীরের বাইরে নিয়ে বৃত্তাকারে ঘুরিয়ে এনে থাপ্পড় বসাবে তার কানে আর মাথায়। পাছার মধ্যে এরকম এক থাপ্পড়ে দৌড়ানো হরিণ পুরা তিনশো আশি ডিগ্রি ঘুরে এসে বাঘের মুখের সামনে ঘাড় বাড়িয়ে দেয়। দুই পাশে এরকম দুইটা থাপ্পড় দিয়েই গোয়ালের খুঁটিতে বাঁধা গরু মহিষের মাথা থেঁৎলে মারে বাঘ। এরকম এক থাপ্পড়ে আব্দুল ওহাব চ্যাপ্টা হয়ে ঢুকে যাবে কাদার ভেতর...

আব্দুল ওহাব নিজের বাম পা সামনে বাড়িয়ে কুড়ালটাও একটু বামে টেনে জুত করে রাখে। বাঘ ডান পায়ে ভর দিয়ে লাফ দিলে আব্দুল ওহাবকে মাথা নুইয়ে বামে সরে বাঘের দিকে হাত দুই এগিয়ে কুড়াল ডানদিকে ঘুরিয়ে কোপ বসাতে হবে বাঘের ডান পাঁজর আর ডান হাতের সন্ধিতে। কিন্তু বাঘ যদি ছোট লাফ দিয়ে তাকে কামড়ে ধরতে চায় তাহলে বাঘের চোয়ালের ডানদিকের জোড়ায় কোপ মেরে পেছনে সরে যেতে হবে। আর যদি বাঘটা লাফিয়ে শরীর দিয়ে চেপে ধরার পরিকল্পনা করে তবে কোথাও না কোথাও একটা কোপ ঠিকই বসানো যাবে কিন্তু তারপর বাঘের নিচ থেকে বের হয়ে আসা মুশকিল...

দল বেঁধেই সবাই জঙ্গলে মধু কাটতে ঢোকে। কিন্তু একমাস জঙ্গলে জঙ্গলে ঘুরে মধু জোগাড় করার পর দেখা যায় আটজনের দলের মধু নয় ভাগ করে প্রথমেই এক ভাগ যায় মহাজনের নামে। তারপর বাকি আট ভাগ আবার একসাথে মিশিয়ে প্রথমে আলগা করা হয় মহাজনের নৌকা ভাড়ার ভাগ। তারপর পারমিট নেয়ার জন্য ধার করা টাকার ভাগ। তারপর ধারের টাকার সুদের ভাগ। তারপর খরচের ভাগ আলাদা করার পর যা থাকে সেই মধু আবার আট ভাগ হয়ে আট মাওয়ালির ভাগে যা পড়ে তা খুবই সামান্য। আব্দুল ওহাব এজন্য দলের সাথে মধু কাটতে আসে না। সে একাই বনে ঢুকে পড়ে। কমপক্ষে দুজন না হলে অবশ্য বনবিভাগ বনে ঢোকার পারমিশন দেয় না। কিন্তু সঙ্গে আরেকজনকে আনা মানে মধুকে আরেকটা ভাগ করা। সেজন্য আব্দুল ওহাব দুজনের নামে পারমিশন নিয়ে একাই আসে। সুন্দরবন যে চেনে তার জন্য একা কোনো সমস্যা না। একটু বুঝেশুনে চললেই হয়। সুন্দরবনে বুঝেশুনে চলা বলতে চোখ আর কান খোলা রেখে সাথে একটা হাতিয়ার রাখাই বোঝায়। সুন্দরবনে জান বাঁচানোর জন্য কুড়ালের কোনো বিকল্প নেই। আব্দুল ওহাব তাই দরকার থাকুক বা না থাকুক বনে ঢুকলে সব সময় লম্বা হাতলের ধারালো কুড়ালটা সাথে সাথে রাখে…

মধু কাটার কাজে মূলত একজনের বেশি লোকের দরকারও পড়ে না। মূল কাজটাই হলো মধুর চাক খুঁজে বের করা। চাক পেয়ে গেলে শুকনা আর কাঁচা হুদু পাতা একসাথে পেঁচিয়ে বানানো রোলটাকে লাঠির আগায় বেঁধে আগুন ধরিয়ে চাকের নিচে নিয়ে ধোঁয়া দেয়া। শুকনা পাতায় চড়চড় করে আগুন ধরে গেলে কাঁচা পাতায় আগুন লেগে তৈরি হয় ধোঁয়া। সেই ধোঁয়া লাগার সাথে সাথে চাক থেকে মৌমাছিগুলো সরে যায়। তখন বাকি থাকে একটাই কাজ; দা দিয়ে চাক কেটে গামলা বা বেতের ধামায় রাখা। এর জন্য আর একজনের বেশি লোকের দরকার কী?

অবশ্য সুন্দরবনে মাওয়ালিরাই সবচে বেশি বাঘের পেটে যায়। এরা হাঁটে উপরে গাছের দিকে তাকিয়ে মধু খুঁজতে খুঁজতে আর নিচ থেকে এসে বাঘ বসায় থাবা। আব্দুল ওহাব বহু বছর থেকে একা একাই মধু কাটে। সে গাছের দিকে যেমন তাকায় তেমনি তার একটা চোখ গাছের গোড়ায় কিংবা ঝোপের ভেতরেও থাকে। সে কোনো বনে ঢুকলে প্রথমেই মাটিতে বাঘের পায়ের ছাপ দেখে নেয়। তারপর বনের অন্য পশুপাখির চলাচল দেখে অনুমান করে নেয় বনের অবস্থা। তারপর গাছের দিকে তাকিয়ে দেখে মাছি ওড়ে কি না কিংবা চাক পাওয়া যায় কি না...

জঙ্গলে আজ তার আট নম্বর দিন। সকাল থেকে দুটো চাক নামিয়ে তিন নম্বর চাকটা মাত্র খুঁজে পেয়েছে। চাকটা দেখে লাঠির আগায় হুদু পাতার রোলটা বেঁধে আগুন ধরানোর জন্য কোঁচড় থেকে দেশলাই খুলতে সে যখন মাত্র উঠে দাঁড়িয়েছে তখনই শোনে সরসর শব্দ। এক সেকেন্ডের মধ্যে আবার নুয়ে কুড়ালটা হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়ায় আব্দুল ওহাব। সুন্দরবনে কোনোদিন হাতিয়ার নাগালের বাইরে রাখে না সে। সুন্দরবনে কোনো শব্দ শুনলে কোনোদিনও হাতিয়ার হাতে না তুলে তাকায় না সে...

কুড়াল হাতে নিয়ে মাথা উঠাতেই আব্দুল ওহাব দেখে মাত্র হাত দশেক দূরে তার দিকে ধেয়ে আসছে বাঘটি। বাঘের চোখে চোখ পড়তে মাত্র দুই সেকেন্ড দেরি হলে বাঘটা তার উপর লাফ দিয়ে বসত...

চোখাচোখি হতেই বাঘটা থমকে দাঁড়িয়ে যায়। তারপর আস্তে করে একপা সামনে বাড়িয়ে আব্দুল ওহাবকে দেখে। আব্দুল ওহাব কুড়াল বাগিয়ে ধরে মধু কাটার গামলা ধামা আর হুদু পাতার বান্ডিলের কাছ থেকে কয়েক পা সরে আসে। তারপর গত আধা ঘণ্টায় দুজনেই অনেকটা খোলা জায়গায় সরে এসেছে। বাঘটা কয়েকবার খাপ ধরে আবার খাপ ছেড়ে দিয়েছে। আব্দুল ওহাবও দুয়েকবার কোপ বসানোর চিন্তা করে বাতিল করে দিয়েছে। এক কোপে কাবু করতে না পারলে কিংবা কোপ দিয়ে সরে আসতে না পারলে মরার আগে বাঘও আব্দুল ওহাবকে মাটিতে পেড়ে ফেলবে। এক কোপ দিয়ে দ্বিতীয়বার কুড়াল তোলার হিসাব মেলায় আব্দুল ওহাব। প্রথম কোপটা দাঁড়ানো কিংবা বসে থাকা বাঘের চোয়ালে বসাতে পারলে বাঘ সেইদিকের হাত দিয়ে চোয়াল চেপে ধরবে। তখন দ্বিতীয় কোপে পাঁজরের কাছ থেকে হাতের জোড়া আলগা করে দেয়া যাবে। তারপর আর বাকি কোপ বসাতে সমস্যা হবে না। কিন্তু চোয়ালে কোপ মেরে সরে আসার আগেই যদি বাঘ হাত বাড়ায় তাহলে মুশকিল। কিংবা কোপ খেয়ে যদি বাঘ লাফ দিয়ে উপরে এসে পড়ে তবে আর উপায় নেই। তাছাড়া কোপ আসছে দেখলে চোখের পলকে বাঘ কুড়ালের ফালি থেকে শরীর সরিয়েও নিতে পারে। আব্দুল ওহাব তাই নিজেকে গুটিয়ে রেখে আক্রমণের অপেক্ষা করে। বাঘ আগে আক্রমণ করলে পাল্টা কিছুর জন্য সে প্রস্তুত থাকবে না। তখন এক কোপ বসিয়ে দিয়ে দেখা যাবে তারপর কী হয়...

আব্দুল ওহাব পায়ের নিচে একটু শক্ত মাটি খোঁজে। কাদার ভেতরে মানুষের জন্য হাঁটা খুবই কঠিন। কিন্তু বাঘ অদ্ভুতরকম স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারে কাদার উপর দিয়ে। পায়ের আঙুলগুলো গুটিয়ে একটার সাথে আরেকটা টাইট করে চেপে ধরে প্রথমে মাটিতে আঙুলগুলো ঢোকায়। এতে আঙুলের চাপে কাদাপানি আর বাতাস চলে আসে পেছনের দিকে। এরপর বিছায় পায়ের পাতা। তখন আঙুলের চাপ খাওয়া পানি বাতাস আর মাটি বাঘের পায়ের নিচে পড়ে পায়ের পাতাকে ঠেলে উপরের দিকে উঠিয়ে রাখে। বাঘের পা খুবই কম দাবে কাদায়। আর পা তোলার সময় সে প্রথমে তোলে গোড়ালি তারপর আঙুলগুলো লম্বা করে কাদা থেকে পিছলে বের করে আনে। কিন্তু মানুষের পা একবার কাদায় ঢুকলে বের করে আনতে খবর হয়ে যায়...

হাতগুলো কাপড়ে মুছে নিলে ভালো হতো। কিন্তু সে সুযোগ নেই। আব্দুল ওহাব একটু শক্ত মাটিতে পা ঠেকিয়ে বাঘের উপর চোখ রেখে কুড়ালের হাতলে হাত নাড়াচাড়া করে ঘামের পিছলা ছাড়ায়- এইসো মামা...

কেউই কাউকে সুযোগ দিতে রাজি নয়। দুজনেই সতর্ক। দুজনেই একটু একটু করে চক্কর দিয়ে নিজেদের জায়গা বদলায়। কেউই হাল ছাড়ে না আবার আক্রমণও করে না কেউ। চক্কর শেষ করে বাঘ সামনের দুইটা পা মাটিতে দাঁড় করিয়ে দুই পাছার উপর বসে পড়ে। আব্দুল ওহাব এই সুযোগে একহাতে কুড়াল ধরে আরেক হাত দ্রুত পাছায় ঘষে ঘাম ছাড়িয়ে আবার তুলে আনে কুড়ালের বাটে। বাঘটা আউ করে একটা হাই তোলে। দুহাতের ঘাম মুছে আব্দুল ওহাব আবারও শক্ত করে কুড়াল বাগিয়ে ধরে। বাঘ আবার একটা হাই তোলে- আউ...

আব্দুল ওহাব দুইহাতে ধরে কুড়ালটা নাভির নিচে ঝুলিয়ে রাখে। বাঘ আবার তৈরি হবার আগে সে তৈরি হয়ে নিতে পারবে। আপাতত বাঘের সেই লক্ষ্মণ দেখা যাচ্ছে না। সে বেশ নিশ্চিন্তে বসে ধ্যান করছে। সাধারণত শিকার ধরার পর মরা শিকারের সামনে বসে বাঘেরা এইরকম ধ্যান করে। আসোলে ধ্যান না। বাঘেদের অনেক জোর থাকলেও জিগর কিন্তু একেবারেই কম। এরা অনেক দ্রুত দৌড়াতে পারলেও সামান্য দৌড়ানোর পর হাঁপাতে শুরু করে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হরিণের পেছনে অর্ধেক রাস্তা দৌড়ে বাঘ ক্ষান্ত দিয়ে দেয়। ক্ষান্ত দিয়ে হাঁপায় আর জিরায়। আর শিকার ধরে ফেলতে পারলে ঘাড় মটকে ফেলে রেখে প্রথমে জিরিয়ে শরীর ঠান্ডা করে; তারপর খায়...

বাঘটা এমন ভাবে বসে আছে যেন মনে হচ্ছে এর মধ্যেই সে আব্দুল ওহাবকে পেড়ে ফেলেছে। এখন গলাটা বাড়িয়ে দিলেই খাওয়া শুরু করতে পারবে। সে সামনের একটা পা মাটিতে ঘষে গরগর করে। আব্দুল ওহাব বাঘের চোখের দিকে তাকায়- হতি পারো তুমি বড়ো বাঘ। কিন্তু তোমার সামনে দাঁড়ি নুইয়েছে এট্টা জ্যান্ত মানুষ। কথাডা কিন্তু ভুলো না মামা…

পেটের মধ্যে চিনচিন থেকে বেলা বুঝতে পারে আব্দুল ওহাব। গামলায় দুইটা মধুর চাক আছে। নৌকায় খাবারও আছে। কিন্তু হা খাবার। অতক্ষণ পর্যন্ত যে বাঘের খাবার না হয়ে নিজে খাওয়ার কথা ভাবতে পারছে সেইটাই তো কপাল…

অনেক মুনশি এই বাঘ। আগায়ও না পেছায়ও না। সে হয়ত জানে সুন্দরবনে কুড়াল হাতে একজন মানুষ বেশিক্ষণ টিকতে পারবে না। জোয়ার এলে কিংবা অন্ধকার হয়ে গেলে আব্দুল ওহাব যখন সাঁতরাবে কিংবা হাতড়াবে তখন একটা ভোঁদড়ের চেয়েও নিরীহ হয়ে পড়বে সে। সেইজন্যই বাঘ সময় কাটাচ্ছে। অবশ্য যারা এরকম মুনশি হতে পারে না তারা বাচ্চা থাকতেই ঠ্যাং তুলে মরে পড়ে থাকে। তারপর যে দুয়েকটা বাঁচে সেগুলোও বেঘোরে মারা পড়ে মায়ে খেদানোর পর; না ধরতে পারে শিকার। না করতে পারে নিজের তালুক। মেয়ে বাঘ তাও যা দুয়েকটা বাঁচে কিন্তু পুরুষ বাঘের তো নিজের তালুক ঠিক না করে বাঁচার কোনো কায়দাই নাই। মাকে ছেড়ে আসার পরই তাকে মুখোমুখি হতে হয় অন্য বাঘার। বাঁচতে হলে জিতো; নয় মরো। সুন্দরবনে কোনো পুরুষ বাঘকে এর মতো আট বছর বাঁচতে হলে বহু কিছু শিখে বাঁচতে হয়। শিখতে হয় বহু কৌশল। চিনে নিতে হয় মানুষের অস্ত্র-বিষ আর বুদ্ধির দৌড়। চিনে নিতে হয় মানুষের দুর্বলতাও...

- সুন্দরবনডা সত্যিই তোমাগের মামা। আমরাই হলাম গিয়ে বাহুল্লি মাত্তর...

একটা দীর্ঘশ্বাসের সাথে মনে মনে কথাটা স্বীকার করে আব্দুল ওহাব। কী নিশ্চিন্তে বসে আছে এই বাঘ। সব চিন্তা শুধু আব্দুল ওহাবের... 

বাঘটা সামনের দুই পায়ের মাঝখান দিয়ে থুতনি মাটিতে নামিয়ে রাখে। একবার তুলে মাছি তাড়িয়ে আবার থুতনিটা মাটিতে ঠেকিয়ে তাকিয়ে থাকে। আব্দুল ওহাব একবার দৌড় দেবার কথা ভেবে আবার বাদ দিয়ে দেয়। এখন হয়ত চুপচাপ বসে আছে কিন্তু ঘুরে দাঁড়ালে যে লাফিয়ে পড়বে না তার বিশ্বাস নেই...

আব্দুল ওহাব তার স্মৃতি নাড়াচাড়া করে। সুন্দরবনে এরকম বাঘের মুখোমুখি থেকে কারো ফিরে যাবার ঘটনা সে শুনেছে কি না। এরকম দুজনেই পুরাপুরি সুস্থ। মুখোমুখি হবার পরেও দুজনেই সুস্থ দেহে যার যার পথে ফিরে যাবার কোনো কাহিনী তার মনে পড়ে না। ওরকম যদি হতো তাহলে অতদিন সুন্দরবন থাকারও কোনো কারণ ছিল না। বাচ্চা বুড়া ল্যাংটা লুলা সবাই ঢুকে হেই-হটহট বলে বাঘেরে সরিয়ে হাতে হাতে সুন্দরবন সাফ করে নিয়ে যেত। বাঙাল বাঘ মানুষ ধরে বলেই সুন্দরবনে পা দেবার আগে সকলেই দশবার করে ভাবে…

বাঘ শরীর তুলে দুই পা সামনে বাড়িয়ে দুই পাছার উপর বসলে আব্দুল ওহাবও কুড়াল বাগিয়ে ধরে। একটু পরে বাঘটা আবার এক পাছার উপর আধশোয়া হয়ে বসে পড়লে আব্দুল ওহাবও কুড়ালটা দুই হাতে ঝুলিয়ে বাঘটার দিকে তাকায়- অনেক দেশে বাঘেরা নির্বংশ হুয়ে গেছে; অনেক দেশে যায় যায়। খালি সুন্দরবনেই তোমরা টিকে নুয়োছো গোন্ডায় গোন্ডায়...

আব্দুল ওহাব মনে মনে হিসাব করে। মানুষের এত কাছে। প্রতিদিন যেখানে অত অত মানুষ ঢোকে। সেইখানেই কীভাবে দুনিয়ার সবচে বেশি বাঘ টিকে যেতে পারল? ...আব্দুল ওহাব অঙ্ক মেলায়। বিষটিষ দিয়ে মানুষ আর কয়টা বাঘ মারতে পারে? বড়োজোর দুই চারটা। গুলিটুলি করেও এর চেয়ে বেশি মারা সম্ভব না। আর আব্দুল ওহাবের মতো বাউলি-মৌয়ালদের হাতে ঘায়েল হয়েও বছরে দুই চারটা মরে। কিন্তু এর বেশি না। সুন্দরবনে বছরে এর চেয়ে বেশি বাঘ মারা সম্ভব না। কারণ বঙ্গোপসাগর...

বঙ্গোপসাগর আসোলে মানুষের সুন্দরবন ঢোকা ঠেকিয়ে রাখে। প্রতিদিন দুইবার করে যদি বঙ্গোপসাগর এই বনটাকে পানিতে ডুবিয়ে না রাখত তাহলে অতদিনে হয়ত পুরা বনই মানুষ বাড়িঘর আর দোকান পাট দিয়ে ভরিয়ে বাঘেদের নিশ্চিহ্ন করে দিতো। কিন্তু সেটা সম্ভব না। সুন্দরবনে কোনোদিন মানুষের পক্ষে বসতি বানানোও সম্ভব না সুন্দরবন থেকে বাঙাল বাঘেদেরও নির্বংশ করা সম্ভব না...

একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে আব্দুল ওহাব- যতদিন বঙ্গোপসাগর আছে ততদিনই এই নোনাপানির বাদায় থেইকে যাবে বাঙাল বাঘ। কী নিশ্চিন্তি বসে আছে ও। জোয়ার ভাঁটায় কিছুই আসি যায় না তার। রাত দিন সবকিছুই তার কাছে সুমান...

লুঙ্গির কোঁচড়ে বিড়ি আর দেশলাই আছে। খুব বিড়ি খেতে ইচ্ছা করে আব্দুল ওহাবের। কিন্তু বিড়ি বের করে ধরানো কঠিন। ওটা করতে গেলে কুড়াল হাত থেকে সরিয়ে রাখতে হবে। আর কে জানে একবার কুড়াল হাতছাড়া করলে দ্বিতীয়বার হাতে উঠানোর সুযোগ পাবে কি না। আব্দুল ওহাব উসখুস করে। মামাটা কিছু করে না কেন?

একজন দাঁড়িয়ে একজন আধশোয়া। দুজনেই মুখোমুখি। এক চুলও নড়ে না কেউ। আব্দুল ওহাব একটা আওয়াজ দেয় আশেপাশে কেউ আছে কি না দেখার জন্য। বাঘটাও জায়গায় বসে একটা হুংকার ছাড়ে। আব্দুল ওহাব মনে মনে খুশি হয়ে উঠে। তার চিৎকারের সাথে বাঘের ডাক শুনলে ঘটনা বুঝে কেউ এগিয়ে আসতে পারে। কিন্তু কেউই আসে না। আব্দুল ওহাব এবার একটু ভয় পেয়ে যায়। এই পুরুষ বাঘের আশেপাশে আরো তিন চারটা মেয়ে বাঘ থাকার কথা। মাঝে মাঝে আবার পুরুষ বাঘেদের একটা দুইটা রাইয়ত পুরুষও থাকে। তালুক দখল করতে এসে মারামারিতে হেরে গিয়ে মাঝে মাঝে অনেকেই বড়ো বাঘের তালুকে গোলাম হয়ে থেকে যায়। রাইয়ত কিংবা বাচ্চাকাচ্চাসহ নারী বাঘগুলা অনেক সময় এসে বড়ো বাঘের শিকার খায়। এইটা অনেকটা মেজবানির মতো। বড়ো বাঘ শিকারের সামনে বসে বসে ধ্যান করে আর মেজবানরা খায়। সবাই খেয়ে জিব দিয়ে মুখ চাটতে শুরু করলে তবে বড়ো বাঘে খায়। এরকম হলে তো বিপদ। এখন যদি এর ডাক শুনে অন্য বাঘেরা আসে তাহলে এই মামা আব্দুল ওহাবকে সামনে থেকে আটকে রাখবে আর বাকিগুলা খাবে পেছন থেকে...

আব্দুল ওহাব ঘাড় ঘুরিয়ে পেছন দেখার চেষ্টা করে। সত্যিই যদি আর কোনো বাঘ আসে তবে আর কিছু করার নেই। অবশ্য সে সম্ভাবনা কম। বাঘেরা নিজেদের তালুকেই থাকতে পছন্দ করে বেশি। গাছের গোড়ায় পেশাব করে করে প্রত্যেকেই নিজের তালুক চিহ্ন দিয়ে আলাদা করে রাখে। ওই পেশাবের গন্ধ দেখেই অন্য বাঘ বুঝতে পারে এটা কার এলাকা। তখন আর এদিকে পা বাড়ায় না...

অনেকক্ষণ কেটে যায়। কারো কোনো সাহায্য আসে না। আব্দুল ওহাব মনে মনে হাসে। যদি এই বাঘের কোনো রাইয়ত থাকে তাহলে এর মৃত্যুতে তার চেয়ে বেশি খুশি হবে না কেউ। এ মরার সাথে সাথেই সেই বেটা হয়ে যাবে তালুকের মালিক। সঙ্গে সঙ্গে চারপাশের সবগুলো বাঘিনির বাচ্চার ঘাড় মটকে নিজেই বাঘিনিদের গর্ভ সঞ্চার করবে। পুরুষ বাঘ আসোলে পুরুষ মানুষের মতো হতভাগা। পুরুষরা যেমন কামাইরোজগার না করলে কোনো মেয়ে পাত্তা দেয় না। তেমনি নিজের তালুক জোটাতে না পারলে কোনো বাঘিনিই পুরুষ বাঘকে কাছে ঘেঁষতে দেয় না...

আব্দুল ওহাব শরীর নাড়িয়ে মশা তাড়ায়। কান নাড়িয়ে মাছি তাড়ায় বাঘ। বাঘটার ডান কানের পেছনে একটা ক্ষত। হয়ত কোনো বাঘের সাথে মারামারি করতে গিয়ে থাবা খেয়েছে। ক্ষতর মধ্যে বারবার এসে মাছি বসছে। শরীরে কোনো ক্ষত হলে বাঘেরা জিব দিয়ে চেটেই তা সারিয়ে ফেলে। কিন্তু এমন কোনো জায়গায় যদি ক্ষত হয় যেখানে জিব দিয়ে নাগাল পায় না; তবে সেখানে মাছি বসে ডিম পাড়ে। আর আস্তে আস্তে সেই ক্ষতই পচতে পচতে বাঘ মারা যায়...

বাঘ মাথা নাড়িয়ে মাছি তাড়ায়। ক্ষতটায় কিছু লাল রক্তও দেখা যায়। হয়ত পেছনের পা দিয়ে জায়গাটা চুলকাতে গিয়ে বাঘ নিজেই আবার ক্ষত বাড়িয়ে দিয়েছে। আব্দুল ওহাব বাঘটার দিকে তাকায়। এমনিতেই হয়ত কয়দিন পরে মাছির কামড়ে এই বাঘ মারা যাবে। অবশ্য মাছির কামড়ে না মরলেও অন্য বাঘের হাতে তো তাকে মরতেই হবে। সুন্দরবনে দশ বারো বছরের বেশি কি আর বাঁচার কায়দা আছে কারো?

বাঘটা বসে আছে। বেশ নিশ্চিন্ত আর বেখেয়াল। আব্দুল ওহাব সাঁই করে কুড়াল তোলে মাথার উপর। টুক করে এক লাফে পিছিয়ে যায় বাঘ। এক পা সামনে বাড়িয়ে ঘাড় নিচু করে মাথাটা বাড়িয়ে দেয় সামনে। আব্দুল ওহাবের কুড়াল থেমে যায় মাথার উপর। অনেকক্ষণ দুজনই দাঁড়িয়ে থাকে ওই অবস্থায়। বাঘ লাফ দিলে আব্দুল ওহাব কুড়াল চালিয়ে সরে যেতে পারবে। আব্দুল ওহাব কুড়াল চালালে সরে গিয়ে থাবা চালাতে পারবে বাঘ...

আব্দুল ওহাব একটা চিৎকার দেয়। বাঘটাও একটা বিকট হুংকার ছাড়ে। একটু পরে দুজনেই আবার খাপ ছেড়ে দেয়। দুজনেই একসাথে ঘাড় ফিরিয়ে পেছন দিকে তাকায়। দুজনেই হয়ত পালানোর রাস্তা খোঁজে। মাত্র কয়েক সেকেন্ড। তারপর দুজনেই আবার একসাথে শরীর টানটান করে মুখোমুখি দাঁড়ায়। আব্দুল ওহাব কুড়াল বাগিয়ে ধরে। খাপ ধরে বাঘটাও চূড়ান্ত প্রস্তুতি নেয়। আব্দুল ওহাব একপা সরে আসে বামে- যা থাকে কপালে আজ...

বাঘটাও একপা সামনে বাড়ায়- যা থাকে কপালে আজ...

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন