বৃহস্পতিবার, ২৭ জুলাই, ২০১৭

কল্যাণী রমা'র ধারাবাহিক স্মৃতিকথা : দমবন্ধ--তৃতীয় পর্ব

নাজের লেখা থেকে টিফিনের আলুভাজার কথা মনে হ’ল। একজন বলেছিল প্রত্যেক বাসার আলুভাজা আলাদা আলাদা। কথাটা সত্যি। শুধু ‘গোঁফ’ নয়, আলুভাজা দিয়েও মানুষকে যায় চেনা। ভোরবেলা আয়েশা বুবু এসে আমাদের বাসায় আলুভাজা আর সিদ্ধ আটার নরম তুলতুলে রুটি বানাত। আলুভাজার গায়ে ডিম ছিটানো থাকত। অমন আলুভাজা আর খাই নি। আমি অনেক বানাতে চেষ্টা করেছি। হয় নি। আমারটায় খুব বড় বড় ডিমের টুকরো হ’য়ে যায়। আয়েশা বুবুর মত শুধু ডিমের ছিটা ছিটা নয়। সিদ্ধ আটার রুটি ম্যাজিক রুটি। দুপুর পর্যন্ত শক্ত হ’ত না।

আমাদের বাসার মহা কড়া স্বাস্থ্যরক্ষা আইনের জন্য আমার বা ছোটবোন শ্যামার কোনদিন স্কুলের
সামনের আইসক্রিম বা তেঁতুলের আচার কিনে খাওয়া হয় নি। জুলজুল চোখে শুধু তাকিয়ে থেকেছি । জারুল গাছগুলোর নিচে লাইন ক’রে ছেলে মেয়েরা আচার কিনত, আইসক্রিম কিনত। কে বলেছে মেয়েরা নাকি শুধু তেঁতুলের আচার খায়? আমাদের ক্লাশের মহা ভালো ছাত্র মেহেদী দেখিয়ে দেখিয়ে চেটে চেটে তেঁতুলের আচার খেত ।

মাঝে মাঝে টিফিনের সময় আমি আর শ্যামা হেঁটে বাড়ি আসতাম । খুব কাছে ছিল বাড়ি। বড় পুকুরটার পাশ দিয়ে স্কুলের বড় মাঠ টা পার ক’রে একটা ছোট সাঁকো। তারপর বড় রাস্তা । পার হ’লেই সারি দিয়ে কাঁকনদের বাড়ি, দীনা মুনাদের বাড়ি, কাদের চাচীর বাড়ি, বুলাচাচীর বাড়ি। বাড়ি এসে মাঝে মাঝে দিদার রান্না ক’রা মোচার ঘন্ট দিয়েও ভাত খেয়েছি । স্বর্গসুখ আর কাকে ব’লে? পূর্বপাড়া থেকে যারা আসত তারা এমন বাড়ি যেতে পারত না।

স্কুলের মাঠের পাশে থাকত দু’টো মুদিখানার দোকান। তপন বলল একটা দোকান ছিল ওয়াজিউল্লার। সেখানে ভাবি চাটনি, টিকটিকির ডিম মানে ছোট ছোট গোল গোল লজেন্স, কদমা পাওয়া যেত। থাকত গোলাপি কাগজে মোড়া গ্ল্যাক্সো বিস্কুটের প্যাকেট । মোসাওয়ার খবর দিল গোলাপি প্যাকেটের গায়ে আংগুরের ছবি আঁকা ছিল। হ্যাঁ, সাদা ট্রান্সপারেন্ট রঙ এ। আমাদের বাড়িতে লোক এলে চা-এর সাথে দেওয়ার মত খুব কিছু খাবার থাকত না। সুস্মিদের বাড়ি তো নয়! হোস্নেয়ারা মাসীর বানানো ডিমের হালুয়া কিংবা শাহী টুকরা নেই । কটকটে টোস্ট বিস্কুটের উপর মা’র বানানো পেয়ারার জেলি মাখিয়ে দেওয়া হ’ত। তা আবার বাচ্চারা এলে চেটে বিস্কুট বাদ দিয়ে জেলিটাই খেয়ে ফেলত। থাকত কালো জিরা আর পিঁয়াজ ভেজে মুড়ি। আর একটু উচ্চ মানের গেস্ট এলে আমাদের হাতে পাঁচটা টাকা দিয়ে দৌড়ে স্কুলের মাঠের ওই মুদিখানার দোকানে গ্ল্যাক্সো বিস্কুট আনতে বলা হ’ত। খুব স্পেশাল ছিল এই গ্ল্যাক্সো বিস্কুট। লোক চলে গেলে আমরা একটা দু’টো পেতাম । আজও গ্ল্যাক্সো বিস্কুটের স্বাদ আমার জিভে লেগে আছে।

আজকাল ওই সহজ জীবনের সরলতাটুকু জীবন থেকে হারিয়ে গেছে। কাউন্টার টপের উপর তিরামিসু পড়ে থাকে। আমি ঘুরেও দেখি না।

“ঢোল কীর্তন ভাসান জারি
গাজীর গীত আর কালো সারি
বাংলাদেশের বয়াতিরা নাইচ্যা নাইচ্যা এমনে গায়।”

আমার উৎসাহের শেষ নেই। ভদ্র স্যারের কাছ থেকে জারিগান শিখে তাতেও নাম দিয়ে দিলাম। পরনে লুঙ্গি, কোমরে আর মাথায় লাল, সাদা ডুরেকাটা গামছা বাঁধা। জারিগানের জন্য তৈরী বয়াতি। আসলে স্কুলের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের সবকিছুতেই নাম দিতাম অসীম সাহসী আমি । বিতর্ক, উপস্থিত বক্তৃতা, আবৃতি, অবাস্তব গল্প বলা... খালি রবীন্দ্রসংগীত, নজরুল গীতি, দেশাত্ববোধক গানে নাম দিতাম না লিসার ভয়ে। লাইসা আহমেদ লিসা! এদিকে গান আসলে আমি গাইতে পারতাম না। তাতে কি?

মনে আছে একবার রোকেয়া হলের পিছনের পুকুরটার পাশ দিয়ে হাঁটছি। বিরাট পুকুর। একপাশে শাপলা ফুটে আছে। সাদার ভিতর হালকা হলুদের আভা। কিছু পাতাকুড়ানি ছেলে মেয়ে তা দিয়ে মালা বানিয়ে গলায় পড়ে চলেছে। ফুলটা লকেট। কেউ কেউ মাছ ধরছে। পুকুরের কিনারায় শ্যাওলা জমে আছে। পুকুরের জলে একটা অদ্ভুত ভেজা মাটির গন্ধ । সেই গন্ধ নাকে এসে লাগছে। সাথে আমার খুব প্রিয় বন্ধুর ছোট ভাই। আমি গান শুরু করেছি খুব আবেগ দিয়ে, 'যে সুর গোপন গুহা হতে ছুটে আসে আকুল স্রোতে, কান্নাসাগর-পানে যে যায় বুকের পাথর ঠেলে.....’ । ভাইটি বলল, 'থাক না রমাদি। সুর তো ঠিক লাগছে না। ' ব্যাপারটা বুঝতে পারলাম। আজকাল আমি কোন লোকজনের সামনে তারস্বরে তাই গান গাই না। যতই কুচকাওয়াজ ক'রা বীর বিক্রম হইনা কেন । যখন গাড়ি চালাই তখন শুধু একা একা গান ক’রি। আমার মেশিনগান। খুব ভিড়ের রাস্তা দিয়ে যেতে নিয়ে মাঝে মাঝে নাকে অদ্ভুত মিষ্টি পাউডারের গন্ধ এসে লাগে। মনে করতে পারি না কোথায় এ গন্ধ পেয়েছিলাম। মানুষটাকে চিনি না। শুধু ভুলে যাওয়া স্মৃতিটুকু। তুলতুলে ভালোবাসার স্মৃতি। অচেনা মানুষের মত অচেনা ভালোবাসা পথ আগলে ধরে। অনেক হাতড়েও বহু গানের কথা মনে করতে পারি না।

ইংরেজী কবিতা আবৃতিতে নাম দিতাম আমি।

‘Half a league, half a league,
Half a league onward,
All in the valley of Death
Rode the six hundred.’

কিংবা

‘O Captain! my Captain! our fearful trip is done,
The ship has weather’d every rack, the prize we sought is won,
The port is near, the bells I hear, the people all exulting,
While follow eyes the steady keel, the vessel grim and daring;
But O heart! heart! heart!
O the bleeding drops of red,
Where on the deck my Captain lies,
Fallen cold and dead.’

ইংরেজী উচ্চারণ ঠিক হ’বে না ব’লে যেতাম প্রাণের বন্ধু ইয়াসমিনের মা জোন মাসির কাছে। ইংল্যান্ডের লেক ডিস্ট্রিক্ট-এর মানুষ মাসি। হাসিব মেসোকে ভালোবেসে বাংলাদেশেই থাকেন ।

রাজশাহী ইউনিভার্সিটির ইংরেজী ডিপার্মেন্টে ইংরেজি পড়াতেন মাসি। আমাদের স্পোকেন ইংলিশ ক্লাশ নিতেন। খেলার ছলে বাড়িতেই ইংরেজী নাটকের অভিনয় করত ইয়াসমিন, প্যামেলা । মাসির কাছে শিখে।

ওদের সিন্ডি পুতুল ছিল। তাদের হাঁটুতে ভাজ ক’রে বসানো যেত। আমার কি লোভ যে হ’ত। মনে আছে আমি একবার করড্ররয় কাপড় দিয়ে পুতুলগুলোর স্কার্ট আর জ্যাকেট বানিয়েছিলাম। তাতে ট্যাক পিন দিয়ে বোতাম করেছিলাম।

আমি এত সাজানো, সুন্দর, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন বাড়ি ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে আর দেখি নি। বসবার ঘরে ধবধবে সাদা একটু পুরু কাপড়ের টেবল ক্লথ। তাতে লেজি ডেজি ফুল তোলা হাল্কা নীল, গোলাপি, হলুদে। মাসী করেছেন। মাড় দিয়ে ইস্ত্রি ক’রা । মাসির মত অসাধারণ কেক কেউ বানাতে পারত না। ইয়াসমিন প্যামেলার অপূর্ব সুন্দর সব জামা মাসি মেশিন ছাড়া হাতেই সেলাই করতেন । সব সময় শাড়ী পড়তেন । মাথায় অপূর্ব এক পরিপাটি খোপা।

আমি ইয়াসমিনদের বাড়ির আগে ক্রীসমাস ট্রী দেখিনি কখনো । কিন্তু রাজশাহীতে ফারগাছ কই? একটা লিচুগাছের ডাল দিয়ে ক্রীসমাস ট্রী সাজানো হ’ত ওদের বাড়ি। তাতে ঝুলত মাসীর একটা সোনালি রঙ্গের বলের মত অর্নামেন্ট। আগে কোনদিন অর্নামেন্টও দেখিনি। কি ভালোই যে লাগত আমার । বড় হ’য়ে যখন পাবলো নেরুদার মেমোয়ার পড়ি, বনের ভিতর সেই তিন ফ্রেঞ্চ বোনের কথা পড়তে গিয়ে জোন মাসির কথা মনে হ’ত । নিজ দেশ থেকে বহুদূরে কিভাবে নিজের দেশের ঐতিহ্যটুকু ধরে রেখেছিল তিন বোন! কি আতিথেয়তা আর ফ্রেঞ্চ রান্না!

মানুষের ঔত্‌সুক্য কিন্তু কম ছিল না জোনমাসিকে নিয়ে। আমাদের স্কুলের কিছু আপাই তো। ইয়াসমিনকে ডেকে জিজ্ঞাসা, ‘তোমরা খ্রীষ্টান না মুসলমান?’ কোন মানুষকে এ ধরণের প্রশ্ন করাটা যে অশ্লীল তা কে কাকে শেখাবে? তাও আবার স্কুলের শিক্ষিকাকে!

ইয়াসমিনরা হাসিব মেসো হঠাত ক’রে মারা যাওয়ার কিছুদিন পর ইংল্যাণ্ড চলে গিয়েছিল । আজো মনে পড়ে সেইদিনটা ৮ই মে

ছিল । আমার বুকের ভিতর তোলপাড়। এর আগে কোনদিন বন্ধু হারিয়ে ফেলি নি । ইয়াসমিন খুব বিভুতিভূষণ ভালোবাসত। আমায় যাবার আগে একটা ক্যাসেট ভরে অপুর কথা টেপ করে দিয়ে গেল ও। টানা টানা কাঁপা কাঁপা স্বর ইয়াসমিনের। আমি বারবার রিওয়াইন্ড ক’রে ক’রে তারপর রাত দিন শুনতে থাকলাম, ‘মাঝেরপাড়া স্টেশনের ডিস্‌ট্যান্ট সিগন্যালখানা দেখিতে দেখিতে কতদূরে অস্পষ্ট হইতে হইতে শেষে মিলাইয়া গেল...’

ক্লাশ ফাইভের বৃত্তি পরীক্ষার জন্য স্পেশাল ক্লাশ নিতেন গাফ্‌ফার স্যার । আর ক্লাশ এইটের বৃত্তি পরীক্ষার জন্য ক্লাশ নিতেন মাহবুব স্যার, মোস্তফা স্যার। মোস্তফা স্যার করাতেন অঙ্ক আর মাহবুব স্যার ইংরেজী। আমি খালি ভাবতাম স্যাররা এত জানেন, আমি কি কোনদিন তা শিখে উঠতে পারব? মাহবুব স্যারের ইংরেজী গ্রামারের টেন্স-এর নিয়ম শুনে আমি শুধু ভাবতাম এমন কি কোনদিন হ’বে না যে আমি সব নিয়ম শিখে ফেলব আর মাহবুব স্যারকে এসে তাক লাগিয়ে দেব? গরমের ছুটিতেও বৃত্তি পরীক্ষার জন্য কোচিং ক্লাশ করতাম আমরা। টিনের চালের নীচে গরম লাগত কিনা তা আর আজ মনে নেই। তবে মনে আছে মাঝে মাঝে ক্লাশের পরে টিসাদের বাড়ি যেতাম । ভিসি চাচার বাসার পাশেই মেহেদী আর টিসাদের বাড়ি। টিসার আব্বা ফারুক চাচা আমাদের দেখলেই ইংরেজী গ্রামার জিজ্ঞাসা করতেন । কী ভয় যে পেতাম । চাচা আজ নেই । চাচার মুখটা শুধু চোখে ভাসে । ভিসি চাচার বাড়ি আর টিসাদের বাড়ির মাঝের গলিটায় সবুজ দূর্বা ঘাস। সেদিন রীপা বলছিল, ‘মনে আছে রমা, আমরা কেমন স্যান্ডেল হাতে নিয়ে খালি পায়ে ঘাসের উপর হাঁটতাম?’ মনে আবার থাকবে না? মানুষ অনেক বড় হ’য়ে যায় । কিন্তু ছেলেবেলার কোমলতা ভুলতে পারে না। কে কবে পাশে বসিয়ে আলতো ক’রে পায়ে আলতা পড়িয়ে দিয়েছিল। কার সাথে যেন ঘাসের উপর শুয়ে আকাশের মেঘের ভিতর নরম তুলতুলে খরগোসের ছবি দেখেছিলাম। লাল, হলুদ আর সাদা দিয়ে স্পাইরালের মত ক’রে রং করা ললিপপ খেতে খেতে রাস্তা ধ’রে বন্ধুদের সাথে হেঁটে গিয়েছিলাম। সেইসব দিনে মনে প্রাণে বিশ্বাস হ’ত জীবনটা জটিল নয়, জীবনটা শন পাপড়ির মত মুখে দিলেই জিহবার নীচে নরম হ’য়ে মিলিয়ে যাওয়ার । জীবনটা ভালোবাসবার।

টিসাদের বাড়িতেই আমি প্রথম ফাইবার অপটিকের ল্যাম্প দেখি । কি যে সুন্দর আলোর ফোয়ারার মত ঝরে পড়ছে । সাদা, নীল, হালকা লাল। একটা মাথা ভেঙ্গে ফেললে ছোট হ’য়ে যাওয়া অংশ থেকেই আবার আলো ঝরছে । আলো ভোলা যায় না।

আর মেহেদীর কথা কি বলব? আমি তো সব ক্লাশেই ফার্স্ট হই। কিন্তু ম্যাট্রিক পরীক্ষার টেস্টে মেহেদী চার নাম্বার বেশি পেয়ে ফার্স্ট

হ’ল । আমি তো স্কুলের এসেমব্লীতে সে রেজাল্ট শুনে অজ্ঞান হ’য়ে পড়ে গেলাম। রিক্সা ক’রে কোনমতে বাড়ি নিয়ে আসা হ’ল। শাওন শুনে বলল, ‘The queen has lost her crown.’ আর আমার নিজের দাদুভাই কোনরকম সহানুভূতি না দেখিয়ে বলল, ‘কেন, মেহেদী কেন ফার্স্ট হ’তে পারবে না? তুই ই খালি ভাত খাস? ও কি ঘাস খায়?’ নিজ বাড়ির লোকেরা এক দলে থাকবে সেটাই আশা করা উচিত নয় কি? না, যুক্তির ছড়াছড়ি।

মনে পড়ে অনু স্যার, মোস্তফা স্যার, মানিক স্যার, ভদ্র স্যার, গাফ্‌ফার স্যার, মাহবুব স্যার, মনিমুল হক স্যার, পরেশ স্যার, পেশকার স্যার, আজিজ স্যার (পিটি স্যার), ফেরদৌসি আপা, আসিয়া আপা, হাফিজা আপা, আম্বিয়া আপা, রুনু আপা, ফালাক বানু আপার কথা। আর স্কুলের পিয়ন গৌরদা।

যখন স্কুলে পড়তাম তখন মনে হয় স্যার আপারা তাঁদের তিরিশের কোঠায় ছিলেন। মনের ভিতর তাঁদের সেই বুদ্ধিদীপ্ত, অল্প বয়সটাই গেঁথে আছে। তার পর প্রায় পঁয়ত্রিশ বছর কেটে গেছে। জানি এখন ওঁনাদের দেখলে আমার বুকের ভিতরটা ধক ক’রে উঠবে। কোন কথাই হয়ত বলতে পারব না। সবাইকে তো দেখতেও পাব না। সেদিন চুমকি বলল জানিস আমাদের অনেক স্যার, আপারাই আর নেই। ফালাক আপা, আম্বিয়া আপা, রুনু আপা, হাফিজা আপা, গফফার স্যার...আমার পৃথিবীতে ভয় আর ভালোবাসা মনের ভিতর একসাথে ঝাঁপিয়ে পড়ে যে সব মানুষদের জন্য তাঁরা স্কুলের স্যার আর আপা । তাঁরা সারা জীবন জীবনের অংশ হ’য়ে হৃতপিন্ডের ভিতর বসবাস করেন ।

স্কুলের দিন একসময় শেষ হ’ল । সমাপনীর দিন আবৃত্তি করলাম কাজী নজরুল ইসলামের সংকল্প ।

“থাকব না কো বদ্ধ ঘরে, দেখব এবার জগৎটাকে, –
কেমন করে ঘুরছে মানুষ যুগান্তরের ঘূর্ণিপাকে।
দেশ হতে দেশ দেশান্তরে
ছুটছে তারা কেমন করে,
কিসের নেশায় কেমন করে মরছে যে বীর লাখে লাখে,
কিসের আশায় করছে তারা বরণ মরন-যন্ত্রণারে।।
কেমন করে বীর ডুবুরি সিন্ধু সেঁচে মুক্তা আনে,
কেমন করে দুঃসাহসী চলছে উড়ে স্বর্গপানে।
জাপটে ধরে ঢেউয়ের ঝুঁটি
যুদ্ধ-জাহাজ চলছে ছুটি,
কেমন করে আনছে মানিক বোঝাই করে সিন্ধু-যানে,
কেমন জোরে টানলে সাগর উথলে ওঠে জোয়ার-বানে।
কেমন করে মথলে পাথার লক্ষ্মী ওঠেন পাতাল ফুঁড়ে,
কিসের আভিযানে মানুষ চলছে হিমালয়ের চুড়ে।
তুহিন মেরু পার হয়ে যায়
সন্ধানীরা কিসের আশায়;
হাউই চড়ে চায় যেতে কে চন্দ্রলোকের অচিন পুরে;
শুনবো আমি, ইঙ্গিত কোন ‘মঙ্গল’ হতে আসছে উড়ে।।...
রইব না কো বদ্ধ খাঁচায়, দেখব এ-সব ভুবন ঘুরে-
আকাশ-বাতাস চন্দ্র-তারায় সাগর-জলে পাহাড়-চুড়ে।
আমার সীমার বাঁধন টুটে
দশ দিকেতে পড়ব লুটে;
পাতাল ফেড়ে নামব নীচে, ওঠব আবার আকাশ ফুঁড়ে;
বিশ্ব- জগৎ দেখবো আমি আপন হাতের মুঠোয় পুরে।।”

সংকল্প তো করলাম। কিন্তু দম এদিকে বন্ধ হ’য়ে আসছে। সেই ক্লাশ টু তে ভর্তি হয়েছিলাম রাজশাহী ইউনিভার্সিটি এক্সপেরিমেন্টাল

স্কুলে । এতদিনের স্কুল, এতদিনের ভালোবাসা, এতদিনের এত কথা সব ফেলে যেতে হবে? নীল সাদা স্কুলড্রেস পড়ে আর এখানে আসা হবে না। আমার পথের বাঁকে এখন অন্য পথ এসে মিশেছে। সেই নতুন পথ দিয়ে আমি হেঁটে যাব । ‘কুমির তোর জলে নেমেছি...’ ‘এল ও এন ডি ও এন, লন্ডন...’ ‘টি টি টি তোমার কিরণ চাই...’ ধীরে ধীরে সব পিছনে মিলিয়ে যাবে।

স্কুলের সমাপনী সভায় আমায় বক্তৃতা দিতে বলা হ’ল। খুব কিছু বলতে পারলাম না। গলার কাছে এতগুলো বছরের সব দিন একসাথে ভিড় ক’রে একটা দলা পাকিয়ে উঠল। কোনমতে শুধু বললাম, ‘রাতের সব তারাই থাকে দিনের আলোর গভীরে।’

স্কুল শেষ হ’ল। এবার কলেজে যাওয়ার পালা। এতদিনে আমাদের স্কুলের কলেজ শাখা খুলেছে। সুস্মি, শাওন, লোপা সেখানেই পড়বে। আমি, শ্যামলী, রুনা যাব শহরে রাজশাহী কলেজে। যেন লরা মেরী। গ্রামের ঘর ছেড়ে যাচ্ছি দূরের স্কুলে। হাতে লাঞ্চ পেইল, মাথায় রোদ টুপি।

খুব ভোরে ইউনিভার্সিটির বাসে ক’রে শহরে কলেজ যাওয়া, আর সেই সন্ধ্যায় বাসে ক’রে ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে বাড়ি ফেরা। জোহা চাচার মাজার কিংবা জুবেরি ভবনের সামনে থেকে বাসে উঠি, নামি। জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখি যতদূর চোখ যায় হলুদ সর্ষে ফুল ফুটে আছে। খেজুর গাছে রসের হাড়ি ঝুলছে। কুয়াশায় ঢেকে আছে চারদিক । কুয়াশারও একটা গন্ধ আছে। স্বপ্নের গন্ধ । রাস্তার পাশে মাটিতে বসে ধূপিপিঠা ক’রে বিক্রী হচ্ছে। চালের গুঁড়ার ভিতরে নারকেল আর খেজুরের গুঁড়। শীতকাল। ছোট দিন। যখন বাড়ি ফিরে আসি তখন চারদিক অন্ধকার। এসেই হাতমুখ ধুয়ে মোটাসোটা ফিজিক্স বা কেমিস্ট্রি বই নিয়ে বসি।আমাদের গেস্টরুমের টিমটিমে

আলোয় । এইচ এস সি পরীক্ষার আগে খুব অল্প সময় হাতে।ক্লান্তিতে চোখ বুজে আসে। তবু বই-এর দিকে অপলক তাকিয়ে থাকি। ভালো রেজাল্ট করবার লোভ আমি ছাড়তে পারি না। নেশাও।

১৮৭৩ সালে স্থাপিত রাজশাহী কলেজ । লাল রঙের রাজপ্রাসাদের মত মনে হ’য় আমার কলেজটাকে। সাদা আর হলুদ রঙ্গে কারুকার্য ক’রা লালের উপর।

প্রশাসনিক বিল্ডিংটা ব্রিটিশ-ভারতীয় ঔপনিবেশিক স্থাপত্যের অন্যতম নিদর্শন। শুনেছি দোতালা এই বিল্ডিংটার চূড়ায় এক সময় রোমান পুরাণের জ্ঞান ও চারুশিল্পের দেবী এথেনার ভাস্কর্য ছিল ।

প্রশাসনিক বিল্ডিং-এর পিছনে বিরাট পুকুর। পুকুরের পাশে যে কারুকার্যময় বিল্ডিং সেখানে আমাদের অঙ্ক ক্লাশ হ’ত। এত বড় কলেজ ক্যাম্পাস। এক ক্লাশ থেকে আরেক ক্লাশে দৌড়ে দৌড়ে যেতে গিয়ে আমরা হিমশিম খেয়ে যেতাম। কলেজ ক্যাম্পাসে আছে ঐতিহাসিক ‘ফুলার ভবন’। একশ’ বছর পেরিয়ে গেছে তার বয়স। কলেজ মাঠের একেবারে দক্ষিণে অধ্যক্ষের দোতলা বাসভবন। এ ভবনের দক্ষিণ পাশ দিয়ে বয়ে গেছে পদ্মানদী। আর এর পশ্চিমে হযরত শাহ মখদুম-এর মাজার।

আমাদের বাংলা পড়ান ফরিদা ম্যাডাম, হারুনুর রশিদ স্যার, জিনাত মহল ম্যাডাম। ইংরেজী খালেক স্যার, সরিফুল ইসলাম স্যার, আমীর আলী স্যার, শাহনাজ ম্যাডাম। ফিজিক্স গুহ স্যার, সাইদুর রহমান স্যার। কেমিস্ট্রি কাদের স্যার, ওয়াদুদ স্যার, হাফিজ স্যার। অংক সারওয়ার স্যার। ডাক্তার হওয়ার ইচ্ছা আমার একেবারেই ছিল না। তাই বায়োলজি না নিয়ে নিলাম স্ট্যাটিস্টিক্স। আসাদ স্যার পড়াতেন।

আমাদের ক্লাশমেট রুহুল, ফরহাদ, জাহিদ, সালাম, মাসুদ, চারু, বিটু, মামুন, জিয়া, হেনা, আলো, তুষার, চুনি, গোলাপ, বজলার, মিতু, রুনি, রুমি, কচি, পাঞ্ছি, শাপলা, সোহেলি, জেবা, রোজী…

অসম্ভব স্মৃতিশক্তি রুনার। সব কথা মনে আছে ওর।

ইউনিভার্সিটি স্কুলে যখন পড়েছি তখনো তা কো-এড ছিল। মনে আছে একবার কোনদিকের বেঞ্চে বসব তা নিয়ে মেহেদী, টিয়াজ, রুমি সকলের সাথে প্রায় যুদ্ধ বেঁধে গেল । দাদুভাই-এর বাগান থেকে টমেটো সাপ্লাই দিয়েছিলাম আমি। তারপর আমাদের অস্ত্র সেই টমেটো দিয়ে ছোঁড়াছুঁড়ি। শাওন বলল, ‘পোর্ট আর্থার দখল।’

রাজশাহী কলেজও কো-এড। কিন্তু ছেলেদের সাথে আমাদের কোন কথা নেই । কেমন যেন একটু ভয়ে ভয়ে থাকি। কি জানি হবে হয়ত বাড়ির পাশের ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসের স্কুলে পড়ে আমরা হয়ত একটু নাজুক ছিলাম। শহরের স্কুল থেকে আসা ছেলেদের সাথে পড়তে গিয়ে আমরা একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গিয়েছিলাম।

সেই সকালে গিয়ে সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরা। মাঝে মাঝে মা-দের পিওন বজলুভাই বাড়ি থেকে টিফিন নিয়ে আসতেন। একদম দিদার রান্না ক’রা ডাল, ভাত, মাংস বা মাছ, এমন কি মাঝে মাঝে চাটনি। ভেতো বাঙালী, ভাত খেয়ে মাথা ঠান্ডা থাকত। ভালোমত অংক করতে পারতাম । বজলুভাই-এর বউ কি ভালোই যে ছিলেন। আর অসম্ভব রূপসী। আমাদের বাসায় প্রায়ই আসতেন। আমি অবাক হ’য়ে ওঁনার দিকে তাকিয়ে থাকতাম। নিষ্পাপ সৌন্দর্য মন টানে। বেশ কয়েক বছর আগে বজলু ভাই মারা গেছেন।

আমাদের ক্লাশমেট রুহুল ১৯৮৩ সালে এস এস সি তে ৮৫৫ নম্বর, ১৯৮৫ সালে এইচ সি তে ৯৩৮ নম্বর পেয়ে প্রথম হয়েছিলো। সব বোর্ডের মধ্যে ওর নাম্বার বেশী ছিল। আর এস এস সি তে ও শুধু প্রথমই হয় নি। যেখানে ৬টা লেটারের বেশি আমরা কেউ পাইনি, সেখানে রুহুল পেয়েছে ৭টি। তখন ইংরেজীতে রুহুল ছাড়া আর কাউকে লেটার পেতে দেখিনি। অসাধারণ মেধাবী মীর মোঃ রুহুল কবির লিটন। আমাদের পরিচিত ধারণায় ফার্স্টবয় বলতেই যে ভীষণ শান্তশিষ্ট একটা চেহারা ভেসে ওঠে, রুহুল মোটেও তেমন ছিল না। ওর দুরন্তপনাগুলো ছিল অভিনব। আমরা কিছুতেই ভেবে পেতাম না ও কখন পড়াশোনা করে। শীতের ভোরে কাঁপতে কাঁপতে স্ট্যাটিস্টিক্স ক্লাশ করতে যাওয়া, ভাঙ্গাচোরা কেমিস্ট্রি গ্যালারিতে বসে লেকচার শোনা, দীঘির পাড়ের লাল বিল্ডিং-এ অংক ক্লাশ করা, ফিজিক্স গ্যালারীতে বীট পড়ানোর সময় রুহুলদের ধুপধাপ পালিয়ে যাওয়া অথচ কোন প্রশ্ন ধরলে সকলের আগে রুহুলেরই পড়া বলা, কলেজের ক্লাশ শেষে এক ব্যাচে প্রাইভেটে অঙ্ক, ফিজিক্স, কেমিসস্ট্রি পড়া - রাজশাহী কলেজের প্রতিটা দিন এভাবেই কাটত আমাদের।

রুহুলের সাথে শেষ দেখা ঈদের সময় একরাতে রাজশাহী নিউমার্কেটের দোতলায়। ও তখন বুয়েটে পড়ে। রুহুল, জাহিদ সবাই ছিল । আমি দেখিওনি, হঠাতই অন্ধকারের ভিতর থেকে রুহুল ডেকে বলল – এই যে রমা। তারপর অন্যান্য বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে বলল-

দেখ্‌ , রমা কেমন এটমিক এনার্জি কমিশনে চাকরি করছে। আর আমরা যে কবে পাশ করব? দেশের বাইরে পড়েছিলাম বলে আমি চাকরি শুরু করে দিয়েছি, কিন্তু ওরা তখনও সেশনজটে বুয়েটে। রাজশাহী ইউনিভার্সিটিতে তো চার বছরের কোর্স শেষ করতে আট বছর লাগত। সময়ের কী অপচয়, জীবনের কী অপচয়।

তারপর হঠাত বাড়িতে টিভির ঘরে হৈ চৈ শুনে চমকে উঠলাম। বুয়েটের তড়িৎ কৌশল অনুষদ থেকে দেয়া বিদায় অনুষ্ঠান শেষে রুহুলরা নয় বন্ধু বুড়িগঙ্গায় গিয়েছিল নৌ-বিহার করতে। বৌদ্ধপূর্ণিমার রাত ছিল সেটা। ওদের নৌকার সাথে ধাক্কা লাগে ট্রলারের। মারা যায় রুহুল। অত অল্প বয়সে আমাদের বন্ধুদের মধ্যে আর কেউ চলে যায় নি। অসম্ভব ভালো গান করত ও । মৃত্যুর কিছুদিন আগে বুয়েটের এক অনুষ্ঠানে গান শুরু করবার আগে জানি না কেন রুহুল বলেছিল এটাই আমার শেষ গান,

“বিস্তীর্ণ দু’পাড়ের, অসংখ্য মানুষের-
হাহাকার শুনেও,
নিঃশব্দে নীরবে- ও গঙ্গা তুমি-
গঙ্গা বইছ কেন?”

এটমিক এনার্জি কমিশনে যখন চাকরি ক’রি তখন আমি ঢাকাতে থাকি মনিমার বাসায়। শ্যামলীতে মনিমার ভাড়া বাসা। দু’টো বেডরুম, খাওয়ার ঘর, বসবার ঘর, একটা ছোট বারান্দা। কিন্তু শুধু মণিমা, মেসো, প্রমা, প্রভা ছাড়াও আরো লোকজন থাকবার জন্য পর্যাপ্ত বড় বলে মনে হ’য় বাসাটাকে। একটা বেডরুমে মণিমা, মেসো, প্রমা, প্রভা থাকে। অন্য বেডরুমে দু’টো বিছানায় থাকি আমি আর বুলবুলি দিদি। বুলবুলি দিদি স্বপন মেসোর মামাতো বোন। স্বপন মেসোর ছোটভাই মানুমামা আসে বেড়াতে। মাঝে মাঝে রাজশাহী থেকে মা বা দিদা এসেও থাকে। যার যখন খুশি আসে, যার যতদিন খুশি থাকে। দিদা দাদুভাই বলত মানুষকে আসবার জন্য সাধাসাধি করবে, কোনদিন বলবে না তুমি কবে যাবে। আমাদের চাপাচাপি হয় না, কখনো মনে হয় না ঠেলাঠেলি হচ্ছে, মনে হয় না দমবন্ধ হ’য়ে আসছে। আসলে এতই কম সেটা মনে হ’য় যে আমি কিনে আনলাম আরো জনা পনেরো পাখি। এর পরেও একাকিত্ব ঘোচাতে। নিউমার্কেটে সবচেয়ে বড় যে খাঁচা পাওয়া যায় তা ভর্তি খয়েরী আর হলুদ রঙ্গের মুনিয়া। বেডরুমে মাথার কাছে তার জায়গা করে দিলাম। মেঝের অর্ধেক জুড়ে সে খাঁচা। আমি থাকছি বলে মা আবার আমার জন্য একটা স্টিলের আলমারিও ঢুকিয়ে দিল বেডড়ুমের ভিতর। জামা কাপড় রাখব। অফিস যাচ্ছি। গাম্ভীর্য বজায় রাখতে ইস্ত্রি ক’রা সালোয়ার কামিজ চাই। শাড়িও।

স্বপন মেসো গান গায়। আলাদা গানের ঘর নেই। আমার শোওয়ার ঘরে পাখি আর বসবার ঘরে স্বপন মেসোর হারমোনিয়াম। দু’টোতেই সুর। জীবনে অসুর ব’লে কিছু নেই। বেসুর ব’লে কিছু হয়ই না। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা গান শিখতে আসে। খাওয়ার ঘরে সবাই স্যান্ডেল খুলে বসবার ঘরে ঢুকে। স্যান্ডেলের সংখ্যার দিকে তাকিয়ে আমার মন ভরে ওঠে। এত মানুষ এসেছে! মনের কাছাকাছি। সুরের কাছাকাছি। মনে হ’য় আমি পথ হারিয়ে সমুদ্রে ভেসে এক দ্বীপে এসে দাঁড়িয়ে নেই। একা।

মণিমার ছোট মেয়ে প্রভার তখন দুই বছর বয়স। ওর অনেক নাম। “ছোটবোন ঘর আলো ক’রে এসেছে, ওর নাম প্রভা।”, বলল ছোট্ট প্রমা। স্বপন মেসো দিলেন ভালো নাম রাগিনীর নামে ইন্দিরাকল্যাণ। দিদা ডাকে প্রভঞ্জন, আর আমি কাব্য ক’রে রুপকথা। ভাইবোনদের মধ্যে আমি সবচেয়ে বড়। চাকরি করছি বলে কথা! আর দুই বছরের ছোট্ট প্রভা সারাদিন আমার পিছু পিছু। ভালো ক’রে কথা বলতে পারে না। ‘নমাদি, নমাদি।’ তবলার উপর উঠে বসে থাকে। হারমোনিয়ামের উল্টোদিকে বসে বেলো করে আর গান গায়। বড় মিষ্টি গলা। সানগ্লাস পড়ে আমার অফিস যাওয়ার ব্যাগ কাঁধে নিয়ে পোজ দিয়ে ছবি তোলে। ডোরাকাটা লাল, সাদা ফ্রক পড়নে। বুকের কাছটা পুরোটাই সাদা। মণিমা বানিয়ে দিয়েছে। পাশে দাঁড়িয়ে ‘সরো’(সরস্বতী)। ‘বাবু, বাবু ঠিক ক’রে দাঁড়াও।’ সরস্বতীর বয়স তের, চৌদ্দ হ’বে। প্রভাকে রাখে ও। সারাদিন বাড়িতে ওরা দু’জন একা। বড়রা সবাই অফিস গেছে। মণিমা তো সেই ভোর চারটায় উঠে রান্না ক’রে আমাদের লাঞ্চ দেয়। হটপটে আর একটা লাঞ্চ প্রভাদের জন্য খাওয়ার টেবিলে রেখে যায়। সারাদিন চূলা জ্বালানো নিষেধ সরোর। কি নরম স্বভাবের মেয়েই যে ছিল ও। খুব যত্ন করত প্রমা, প্রভার।

ছোট্ট প্রভা তবু আরো লোকজন চায় সারাদিন। একদিন আমি তৈরী হচ্ছি অফিস যাব ব’লে। বাস ধরতে হ’বে। প্রভার আকুলি বিকুলি কান্না। ‘না, না, নমাদি, আজ অফিস যাবা না। আজ যাবা না।’ আমায় জড়িয়ে ধ’রে সে কি কান্না। আমি কোনমতে ওকে ছাড়িয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে বাস স্ট্যান্ডে। বাস ছেড়ে যাবে শিঘ্রী। পায়ের দিকে তাকিয়ে দেখি ঘরে পড়বার হাওয়াই চপ্পল। সেদিন আর অফিস যাওয়া হ’ল না। বাড়ি ফিরে এলাম। তারপর সারাদিন প্রভার সাথে খেলা। প্রভা শাড়ি পড়ে। বউ সাজে। প্রভা হাতে চুড়ি পড়ে। নাচ ক’রে। প্রভা আমায় গান গেয়ে শোনায়।

যখন দিদা থাকে প্রভার সাথে লুডু খেলে দিদা। কোন চালটায় কার গুটি এগিয়ে যাবে ভাগ্য বলে দেয়। বড় হ’য়ে প্রভাও যোগ দিয়েছে অন্যান্য ভাইবোনদের সাথে দিদার সাথে নানা খেলায়। শুভ, মৌটুসি, প্রমা, প্রীতম, দীপ, অমৃতা সবাই মিলে কত না খেলা। দাবা, স্ক্র্যাবল, মনোপলি...এসব খেলায় দিদার উত্‌সাহ ছোট্ট প্রভার থেকে কিছু কম নয়। নব্বই বছর বয়সেও দুই বছরের বাচ্চার মত সরলতা পৃথিবীতে এই একটি মানুষের মাঝেই দেখেছি। দিদা।

তখন নতুন চাকরি করি। প্রথম চাকরি। এটা সেটা কিনবার জন্য মন উস্‌খুস। প্রতিদিন অফিস থেকে ফিরবার পথে প্রভার জন্য চিপস কিনে আনি। মিঃ টুইস্ট।

প্রভার আর এখন সেই দুই বছর বয়স না। কাবুলিওয়ালা গল্পেও মিনি বড় হয়ে যায়। summa cum laude নিয়ে পাশ করেছে ইউনিভার্সিটি থেকে ও। ভাস্কর কে বিয়ে করেছে। প্রভার আঁকা ছবি দেখে আমি ভাবি ইঞ্জিনীয়ারিং না পড়ে প্রফেশনাল পেইন্টার হ’লেই ভালো হ’ত ওর।

প্রভা আমার থেকে প্রায় বাইশ বছরের ছোট। ওর সাথে বাইরে বাইরে শুধু হাসির কথা বলি। মজার মজার গল্প শুধু। আর যখন মনের ভিতরের কথাগুলো বলতে চাই, ওকে বলি গান করতে । ও আকাশ ভরে দিয়ে গেয়ে ওঠে,


‘তোমার ঘরে বাস করে কারা
ও মন জান না,
তোমার ঘরে বসত করে কয় জনা,
মন জান না
তোমার ঘরে বসত করে কয় জনা
এক জনায় ছবি আঁকে এক মনে,
ও রে মন
আরেক জনায় বসে বসে রং মাখে
ও আবার সেই ছবিখান নষ্ট করে
কোন জনা, কোন জনা
তোমার ঘরে বসত করে কয় জনা
এক জনায় সুর তোলে এক তারে,
ও মন, আরেক জন মন্দিরাতে তাল তোলে
ও আবার বেসুরো সুর ধরে দেখো
কোন জনা, কোন জনা
তোমর ঘরে বসত করে কয় জনা
রস খাইয়া হইয়া মাত, ঐ দেখো
হাত ফসকে যায় ঘোড়ার লাগাম
সেই লাগাম খানা ধরে দেখো
কোন জনা, কোন জনা
তোমার ঘরে বসত করে কয় জনা...’

মণিমার বাসার উল্টোদিকে তখন কুংকীমার বাসা। সেভাবেই ভাড়া নিল মনিমা যেন বিপদে আপদে এক বোন আর এক বোনকে দেখতে পারে।ছুটে আসতে পারে মাঝরাতে। তাৎক্ষনিক ফলাফল স্বরূপ অবশ্য যেটা হ’ল তা আসলে সাত সকালে ঘুম থেকে উঠেই প্রতিদিন আমি কুংকীমার বাসায়। জয় কুংকীমার বড় ছেলে। আমার মাসতুত ভাই। আমার কবিতা লেখা, অনুবাদ কর্মের বুদ্ধিদাতা। প্রচুর বই পড়ে ও। পড়ার বই-এর ভাঁজে চিরদিন গল্পের বই লুকিয়ে লুকিয়ে পড়া বিদগ্ধ ব্যাক্তিত হচ্ছে আমাদের জয়। এখন যদিও নামকরা প্রফেসর হয়েছে ও। দারুণ জ্ঞানী। আমি তাই নির্ভয়ে কবিতার ভুল অনুবাদ ক’রে জয়ের কাছে বসে বসে ঠিক ক’রি। সূর্য কোনমতে কেবল উঠেছে, আমি জয়ের ঘরে। সিলভিয়া প্লাথ অনুবাদ করছি। আমায় সাহায্য করতে জয় কথা বলবার আগেই রাজি। যদিও সিলভিয়া প্লাথকে পছন্দ ক’রে না ও। এদিকে আমি তো সিলভিয়া অন্তঃপ্রাণ।

“Dying
Is an art, like everything else.
I do it exceptionally well.”

বল বল জয়, কোন শব্দটা দেব? ‘মৃত্যু’ না ‘মরণ’ । আমার অত্যাচারে জয়ের কান ঝালাপালা। তবু ও আমায় বলে দেয় কোন শব্দটা শুনতে ভালো লাগছে। কোন অর্থটা বলতে চেয়েছেন কবি। কোনমতে ঘুম থেকে উঠে চোখ কচলাতে কচলাতে। আমি জীবনের পথে না হেঁটে সিলভিয়া প্লাথের মৃত্যুর পথে হাঁটতে থাকি। ঝিনুকে পা কেটে যায়।

“I rocked shut
As a seashell.
They had to call and call
And pick the worms off me like sticky pearls.”

তবে ভাইবোনদের মধ্যে সিলভিয়া প্লাথ পছন্দ করে আমি ছাড়া আর একজন। আনন্দীকল্যাণ প্রমা। ওর জন্মের পর ৬৪টা নাম জমা পড়েছিল। যদিও থেকে গেল আমার দেওয়া নাম রিমঝিম। মণিমার বড় মেয়ে। খাওয়ার টেবিলে একবার আমি হঠাত্‌ কবিতা আবৃতি শুরু করেছিলাম।

“- যে কোন একটা ফুলের নাম বল
- দুঃখ।
- যে কোন একটা নদীর নাম বল
- বেদনা।
- যে কোন একটা গাছের নাম বল
- দীর্ঘশ্বাস ।
- যে কোন একটা নক্ষত্রের নাম বল
- অশ্রু ।”

আমার ছোটবোন শ্যামার অঙ্কে খুব মাথা। বাবার মাথার বুদ্ধি পেয়েছে ও। তবে কবিতা শুনলে একটু অসুবিধা হ’য়। খাওয়ার টেবিলে এই কবিতার লাইনগুলো শুনে ওর গলায় মাছের কাঁটা লেগে গিয়েছিল। ফলে নিজের বোনের কাছে কবিতা নিয়ে সুবিধা করতে পারতাম না আমি। কিন্তু তাতে কি? আমার তো রিমঝিম আছে। এজন্যই মামাতো, মাসতুত, পিসতুত, কাকাতো, জ্যাঠতুত ভাই বোন চাই। অনেক ভাই বোনের মাঝে বন্ধু বেছে নেওয়ার মত কবিতার সাথী ভাই বোন বেছে নেওয়া যায়। প্রমা আমার চোখের জলের সাথী। উপুড় হ’য়ে শুয়ে সিলভিয়া প্লাথ কিংবা অ্যান সেক্সটন পড়তে পড়তে ইস্পাতের মত রুপালি, ঠান্ডা, নিথর হ’য়ে যাওয়ার সাথী। আকাশ কালো ক’রে যখন মেঘ ক’রে, যখন আর কথা বলা যায় না, হাতের মুঠোয় হাতটা ধরে না থেকেও একসাথে থাকবার সাথী। এক ভাষায় কথা বলি আমরা। বড় ভালো গান গায় ও। প্রভার বিয়েতে গেয়েছিল,

“পাগলা হাওয়ার বাদল-দিনে
পাগল আমার মন জেগে ওঠে॥
চেনাশোনার কোন্‌ বাইরে যেখানে পথ নাই নাই রে
সেখানে অকারণে যায় ছুটে॥
ঘরের মুখে আর কি রে কোনো দিন সে যাবে ফিরে।
যাবে না, যাবে না--
দেয়াল যত সব গেল টুটে॥

বৃষ্টি-নেশা-ভরা সন্ধ্যাবেলা কোন্‌ বলরামের আমি চেলা,
আমার স্বপ্ন ঘিরে নাচে মাতাল জুটে--
যত মাতাল জুটে।
যা না চাইবার তাই আজি চাই গো,
যা না পাইবার তাই কোথা পাই গো।

পাব না, পাব না,
মরি অসম্ভবের পায়ে মাথা কুটে॥”
আমার চোখে জল।

‘দিদিভাই, যে কোন একটা ফুলের নাম বলতে বললে আমি তো বলব শাপলা।’ এ কথায় পুর্ণেন্দু পত্রীর অপমান হয়ে যাওয়ায় মৌটুসীকে কি সাজা দেওয়া যায় ভাবছি, তখন ও আবার পড়ল আমার দুঃখ দুঃখ লেখা ভালোবাসবার বেদনা নিয়ে। ‘সখ ক’রে খুব দুঃখের কিছু পড়তে আমার চাপ মনে হ’য়। আসলে গভীরতার অভাব।’ এখন ইংল্যান্ডে উইন্ডসর ক্যাসেলের খুব কাছে থাকে ও। এই সেদিন বেশ কিছু ছবি পাঠিয়ে বলল, ‘আমরা উইন্ডসর বেড়াতে গিয়েছিলাম। উইন্ডসরে রাণীর বাসা। কিন্তু বাসায় তো দাওয়াত দেয় নাই তাই আশেপাশে ঘুরছি।’

এটুকু পড়েই মৌটুসী, 'দিদিভাই, উইন্ডসরে রানীর বাড়ির কাছে থাকি এই লাইনটা পড়ে জনগণ ভাববে তোমার মাথা আউলাইয়া গেছে কিংবা আমার মাথার গন্ডগোল। তাও যে বল নাই আমি রানীর ভাড়াটে।'

'রানীর কাছে থাকবার কথা মুছে দেব?'

'না না অসুবিধা কি? কিছু মোছার দরকার নাই। চলুক। কি আছে জীবনে। রানী জানলে মাইন্ড করতে পারে। আমার তো আর মাইন্ড করবার কিছু নাই।'

মৌটুসী কুংকীমার সবচেয়ে ছোট মেয়ে। ওর গায়ের রঙ সোনালি। ছেলেবেলার কত যে সুন্দর সুন্দর ছবি ওর। ক্যালেন্ডারে দেওয়ার মত। লাল, হলুদ ডুরেকাটা শাড়ি পড়ে ধুপতি নিয়ে আরতি করছে। হাতে লাল চুড়ি। ঘোমটা দেওয়া। বছর তিন বয়স। যখন কুংকীমা শ্যামলীতে বাড়িটা করল ওর জন্য একটা আলাদা ঘর করতে ভুলে গিয়েছিল। পরে ফ্যামিলি রুমের খানিকটা ফ্রস্টেড গ্লাস দিয়ে ঘিরে ওর ঘর করা হ’ল। আগে কখনো ফ্রস্টেড গ্লাস দিয়ে ঘেরা রুম দেখিনি। আমি ভাবলাম এখানে স্লিপিং বিউটি ঘুমিয়ে থাকবে। আপেলের মত গাল। কিংবা সেই রাজকুমারি যার মাথার কাছে সোনার কাঠি, পায়ের কাছে রুপার কাঠি।

বহু বহু বছর দেশে যাইনি। অবশেষে ২০১১ সালে মৌটুসি আর জহরের বিয়েতে পাঁচদিনের জন্য দেশে গেলাম। অত অল্প সময়ের জন্য গিয়ে বিয়ের আসরেই দু’টো চেয়ার জড়ো ক’রে জেটল্যাগে ঘুমিয়ে থাকলাম। স্বপ্নের ভিতর বিয়ে দেখলাম।

ম্যাডিসনে ফিরব। বিদেশে আসবার ফ্লাইটগুলো কেন যে সবসময় শুধু মাঝরাতে থাকে! ভোর চারটায় জড়ো হয়েছে সবাই বাড়িতে। দিদা উঠেছে, মা উঠেছে। মণিমা, স্বপনমেসো, প্রমা, প্রভা এসেছে চারতলা থেকে। কুংকীমা, মেসো, জয়, শুভ, টুম্পা, তনু, পরাণজয়, অর্জুন দোতলা থেকে। কাজলমামা, মামী, প্রীতম, দীপ, অমৃতা সেই মগবাজারের ইস্পাহানি কলোনী থেকে সাতসকালে শ্যামলীতে। কেউ যখন যায়, তখন নিজের স্বাস্থ্যের কথা ভেবে কি ঘুমিয়ে থাকা যায়? তা সে ভোর চারটাই হোক বা রাত তিনটাই হোক না কেন। আমি বড়দের পা ছুঁয়ে ছুঁয়ে প্রণাম করছি। আবার কবে দেশে আসব জানি না। না কাঁদবার চেষ্টা করছি প্রাণপণ। ফ্রীজে একটু পুঁটিমাছের চ্যাপা শুঁটকি ছিল। মা ভাতের সাথে গরম ক’রে দিল। ভোর চারটায় শুঁটকি মাছ খেয়ে ফেললাম। আমার বড় প্রিয়। ঈশ্বরে বিশ্বাস নেই আমার। কিন্তু মা মন খারাপ করবে ব’লে মা’র শোওয়ার ঘরে গিয়ে ঠাকুর প্রণাম করলাম। বাঁশিহাতে কৃষ্ণ ঠাকুর। নীলমত রঙ। বীণাহাতে সরস্বতী। কালি ঠাকুর লাল জবার মালা পড়ে। সব ঠাকুর সেই ছেলেবেলায় আমাদের রাজশাহী বাসাতেও ছিল। বাড়ি বদলের সাথে সাথে সবাই সাথে এসেছে। ঠাকুরের সামনে পিতলের দুই ইঞ্চি ছোট থালায় চিনি দেওয়া। বাতাসা বা কদমা নেই। এক ইঞ্চি গ্লাসে জল। চন্দনের ফোঁটা সব ঠাকুরের কপালে।

দেশ থেকে যাব। এত জিনিস সবাই দিয়েছে যে আমার স্যুটকেস বন্ধ হচ্ছে না। মেঝেময় নতুন শাড়ি, সালোয়ার কামিজ, বাংলা ডিকশনারি, বড়ই-এর আচার। আমার কান্না পাচ্ছে। দাঁত কামড়াচ্ছি। মৌটুসী বলল, ‘সরো দিদিভাই, আমি সব ঠিক ক’রে দিচ্ছি।’ পুরো স্যুটকেস খালি ক’রে সব আবার ও ভাঁজ ক’রে ক’রে গুছাল। ম্যাজিক। সব এঁটে গেল। মৌটুসীর কপালে লাল সিঁদুর। দুই দিন আগে বিয়ে হয়েছে ওর।

তথ্যসূত্রঃ



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন