শনিবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০১৭

পাঠ প্রতিক্রিয়া বেন ওকরি’র গল্প সোনালী দোজখ

উম্মে হাবিবা সুমি


গল্পটা ঠিক যেন গল্প নয়। কতগুলো দীর্ঘশ্বাস, কয়েকজন মৃত মানুষের জীবন্ত হয়ে ওঠার কথা; 

জীবনের নানান বাস্তব উপাদানকে অদ্ভুত অবাস্তবতায় উপস্থাপন করেছেন এমন ভাবে যেন কতগুলো অবাস্তবতার টুকরো কথন এর কোলাজ, সেটাই আবার তার হাতের কলমে হয়ে উঠেছে একটি নিঁখুত চিত্রকলা। কবি এবং সাহিত্যিক হলেও চিত্রকর্মের প্রতি ছিল বেন ওকরির গভীর মনযোগ। স্বপ্নের মধ্যেও তিনি কবিতা লেখেন, খুঁড়ে খুঁড়ে শব্দ দিয়ে আঁকেন অসম্ভবের সম্ভাবনার গল্প।

‘সোনালী দোজখ’ একটি বাড়ি অথবা একটি দেশের গল্প।

কখন একজন মানুষ নিজের দেশটাকে বাড়ি হিসেবে ভাবে? তখনি ভাবে, যখন সে আসলে দেশটাকে নিজের অস্তিত্বের অংশ মনে করে। 

এই গল্পে নিজের ঘর, নিজের আসবাব, বাড়ির আশেপাশের ছেলেমেয়েদের চিৎকার চেচামেচি সবকিছু ভারী জীবন্ত। এই গল্পটা একটা বাড়িকে কেন্দ্র করে; যেন এই বাড়িটাই একটা দেশ। বাড়িটার সামনে একটা বিশাল নর্দমা যা এই বাড়ির মানুষদের নিজেদেরই সৃষ্টি। এই বাড়িটাই বেন এর দেশ ভাবনাকে প্রতিনিধিত্ব করছে। নাইজেরিয়ার উত্তরাঞ্চলে জন্ম নেয়া বেন প্রবাস জীবনে বসে ছেড়ে আসা তৃতীয় বিশ্বের সমস্যা জর্জরিত নিজ দেশটিকে আপন ঘরের মতন করে আপন ভাবার অনুভূতি থেকে লিখেছেন। 

এই অদ্ভুত অন্যরকম গল্পের নর্দমায় ডুবে থাকে গরুর কথা; সেই গরু যা কিনা ঘরের আঙিনায় থাকার কথা। হাসপাতালের খাট এর কথা এসেছে, যা হাসপাতালের মানুষের সেবায় ব্যবহৃত হওয়ার কথা। অথচ, হাসপাতালের খাট ও নর্দমায় পতিত। দেখা যায়, কোনকিছুই ঠিক জায়গামত নেই এবং এগুলো সবই নানাভাবে চাপা পড়ে আছে নর্দমায়। চরম অস্বাভাবিকতার একটি চিত্রকল্প’র গল্প বলেছেন বেন । গল্পের বাড়িটা যা মূলত দেশটির প্রতিনিধিত্ব করছে, সেটি চরম অনিশ্চয়তায় ভুগছে। দিনের পর দিন নর্দমার দুর্গন্ধে কাটাতে কাটাতে চারপাশের মানুষ বোধহীন হয়ে পড়েছে। তখন পাঠক হিসেবে আমরা বুঝতে পারি, মানুষের মগজগুলো ঠিক ঠিক কাজ করছেনা, পুরোটাই যেন নর্দমায় আটকে গেছে। এ'কারণেই তারা চিন্তা করতে পারছে না যে নর্দমাটাকে সরিয়ে ফেলাটা কতটা জরুরী। ষাটের দশকে নাইজেরিয়ায় গৃহযুদ্ধের ক্ষত-বিক্ষতদের দেখে দেখে বড় হওয়া বেন ওকরি সেই স্মৃতিগুলোকেই হয়ত এখানে তুলে ধরেছেন। 

আবার দেখি সকল অস্তিত্বহীনতা, বোধহীনতা, অস্বাভাবিকতাগুলোকে পুঁজি করে বাইরে থেকে আসা এক রকস্টার গান গাইছেন। মানুষের অসহায়তা, করুণ অবস্থাগুলো হয়ে উঠছে তখন আর্ট। এখানে আমরা বেনের সামাজিক ও রাজনৈতিক চরিত্র বিশ্লেষণেরর দক্ষতাটি টের পাই। রকস্টারের উদ্দেশ্য দেশটাকে নর্মদামুক্ত করা না, যদিও এসবের উল্লেখ গল্পে সরাসরি নেই। তবু আমরা বুঝতে পারি রকস্টার একজন বাইরের মানুষ, তার উদ্দেশ্য আলাদা। সে পুঁজিবাদের প্রতিভূ। অসাধারণ সব মেটাফর ব্যবহার করেছেন বেন।

গল্পের একাংশে মেয়েদের দুর্দশার এক অস্বাভাবিক বর্ণনা আছে, যেখানে নরকযন্ত্রণায় কাতরাতে থাকা একটা মেয়ের উল্লেখ পাই যেন বাতাসের সাথে হাত পা ছুড়ে-মুচড়ে সঙ্গমের ইশারা করছে; অথচ মেয়েটা সেটা চাইছিল, তা নয়, সে এমন করছিল শুধু এই ভয়াবহ যন্ত্রণা উপশমের একটু চেষ্টায় মাত্র। গল্পে শেষের দিকে বেন স্পষ্ট করে বলেছেন, লিঙ্গ পরিচয় মৃত্যু দূত হয়ে উঠতে পারেনা (এর অর্থ, লিঙ্গ পরিচয় হয়ে উঠেছিল এক গুরুতর বিষয়, এই পরিচয় মৃত্যু ডেকে আনছিল, যন্ত্রণা বয়ে আনছিল দেশটিতে )। 

গল্পের এক পর্যায়ে যখন আমরা বুঝে যাই, দেশটাকে বাঁচাতে হলে দেশের মানুষকেই কাজ করতে হবে, কারণ বাইরের আর অনেকে দেখবে, কিছু করবে না। আর তখনই দেখি বেন অবহেলা-যন্ত্রনায় দগ্ধ হওয়া নারীদের সেই করুণ দূর্দশার চিত্রটি বদলে ফেলেন। যেখানে দেখা যায় আরেকজন নারী যিনি দেশটি বাঁচাবার জন্য নেতৃত্ব দিচ্ছে এবং বুট জুতা পায়ে দিয়ে নর্দমা পরিষ্কার করতে নেমে গেছে। রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তিনি ‘নারী’র দুটো দিকই তুলে ধরেছেন; ‘অবর্ণনীয় দুর্ভোগ’ এবং ‘নেতৃত্বে অবদান’। লেখক হিসেবে এখানে তিনি গভীর পর্যবেক্ষক, এবং নারীর প্রতি ও সমাজের প্রতি সংবেদনশীল। তিনি আশ্চর্যজনক ভাবে পুরুষতান্ত্রিকতা থেকে নির্মোহ ভাবে মুক্ত মানুষ বলে আমার বোধ হয়। 

এই বুকার পুরস্কার বিজয়ী নাইজেরিয়ান কবি ও ঔপন্যাসিক বেন ওকরি একজন অসাধারণ কল্পচিত্রকর। বর্তমান বিশ্বে বিশেষ করে ভারতীয় উপমহাদেশে তিনি বিপুল জনপ্রিয়। কারন তার লেখা চিত্রকল্পের সাথে আমাদের নিজ দেশের অনেক মিল পাই। যেখানে নর্দমার পর নর্দমা জমে পাহাড় হয়ে আছে, চাপা দিয়ে রাখা হচ্ছে দুর্গন্ধ গুলোকে; কিন্ত দেশ দুর্গন্ধ মুক্ত হচ্ছেনা। ওকরি যেমন নিজের ঘরটাকে বাঁচাতে চেয়েছেন, নিজের দেশটিকে বাঁচাতে চেয়েছেন, গল্পটা পড়তে গিয়ে মনে হতে থাকে আমিও সেভাবে আমাদের দেশটিকে মানে আমার ঘরটিকে বাঁচাতে চাই। 


অনুবাদক পরিচিতি
উম্মে হাবিবা সুমী
সাতক্ষীরা, বাংলাদেশ।
বর্তমানে টরেন্টো কানাডায় থাকেন।
ব্যারিস্টার। 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন