শনিবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০১৭

মাহমুদা মায়ার টুকরো লেখা : সেপ্টেম্বর-অক্টোবর ২০১৭

১১ অক্টোবর ২০১৭
অবকাশ পাইলে, বাগানের গাছগাছালিদের স্নান করাইতে আমার উৎসাহের অন্ত থাকে না। 
তদুপরি, বর্তমান-সময়ে, যখন চারিদিকে সংকটকাল চলিতেছে, দাবানলের ভস্ম আসিয়া উহাদের বদন মলিন করিয়া দিতেছে, তখন আমি আহার-নিদ্রা ত্যাগ করিয়া, এই কার্যে নিজেকে নিয়োজিত রাখি। 
অদ্যও তাহাই করিতেছিলাম। 
প্রস্তুতিবিহীন অকস্মাৎ লক্ষ করিলাম, আমার কন্ঠ হইতে গান ভাসিয়া আসিতেছে--- "আমার অঙ্গে অঙ্গে কে ... বাআআজায়, বাজায় বাঁশি
আনন্দে বিষাদে মন উদাসী 
কে বাজায় বাঁশি"
মূলত, মৌন থাকিয়া কোনও কার্যসম্পাদন আমার চরিত্রবিরোধী।

অনতিবিলম্বে কন্ঠ হইতে গান থামিয়া গেল, কেহ শুনিয়া ফেলিল কিনা সেই আশঙ্কায়। চতুর্দিকে অবলোকন করিয়া--- কাকপক্ষীটিরও অনুপস্থিতি সম্বন্ধে নিশ্চিত হইলাম। 
তথাপি, ডানপার্শ্বে, শ্বেতাঙ্গ প্রতিবেশীর গৃহখানি, আমার পাঁচিলের সহিত 'কাঁঠালের-কোষ'সম ঘেঁষিয়া অবস্থান করিতেছে। নিজ ভিটের চোহদ্দিতে থাকিয়াও, ক্বচিৎ-কদাচিৎ উহাদিগের অন্দরমহলের ফিসফিসানি ও গুজগুজানি আমার কর্ণগোচর হয়।

অত্যন্ত সুখের বিষয় হইল, ইংরেজি ভাষায় আমার দখল থাকিলেও, বাংলাভাষার এক বর্ণও উহাদের আয়ত্তের বাহিরে। এমত ভাবিয়া সহসা রোমাঞ্চিত বোধ করিলাম। 
আকাশপানে চাহিয়া, এমন সৌভাগ্য পকেটে গুঁজিয়া দিয়া আমাকে ধরায় পাঠাইবার নিমিত্তে তাঁহার অবয়ব দর্শন করিবার প্রয়াস পাইলাম। 
"... ... চাহো তাঁরি প্রেমমুখপানে" গাহিলাম।



৯ অক্টোবর ২০১৭
বেডরুম থেকে হাতে করে নিয়ে আসা পিলটা কাউন্টারে রাখা একটা কাগজের ডিসপোজাব্‌ল্‌-প্লেটে রেখে পানির গ্লাসটা আনতে হাত বাড়িয়েছি। পিলটা গড়াতে শুরু করল। পিল্‌টাকে ধরে শুইয়ে দিলাম। “গোল হলেই গড়াতে হয় না, আমি তো গোল, কই গড়াচ্ছি না তো!” পিল্‌টার উদ্দেশ্যে বিড়বিড় করতে-করতেই চোখ গেল--- কাউন্টারে-পড়া রোদের দিকে।
গোলাপি রঙের রোদ। বাইরে তাকিয়ে দেখলাম, গোলাপি আভার ঝাপসা আলোয় অচেনা ঠেকছে চারপাশ। অদ্ভূত চেহারার চরাচর। 

তখুনি ছেলে এলো। সঙ্গে-সঙ্গেই বলে উঠল, “ইট’স উইয়ার্ড, মাম!” প্রতিদিনের চেনা 'ঝাঁ-চকচকে সকাল' তার অতি অবিশ্যি চাই। 

মানে... আলোটা প্রতিদিনের মতো নয়। ঘরের ভেতরে। জানলার বাইরে। 
বলতে বলতেই দরজা খুলে বারান্দায় চলে গেল, “লুক অ্যাট দ্য সান!” আমি বললাম, “ আর্থকোয়েক-টোয়েক হবে কি না, কে জানে!” ক্যালিফোর্নিয়ার লোকেরা জানে, আর্থ-কোয়েক হবার আগে এই ধরনের একটা অন্যরকম থমথমে-ভাব পরিলক্ষিত হয়। 

“ইজ দেয়ার আ ফায়ার সামহোয়্যার!?”--- বলে ভেতরে এসে টিভি অন করল ছেলে। হ্যাঁ, ফায়ার। এ্যানাহাইম হিল্‌স্‌-এ। আমাদের এখান থেকে ছাব্বিশ মাইল। তখন শুনলাম, দু’হাজার একর পুড়েছে অলরেডি। তারপর চার হাজার। পাঁচ হাজার। এক হাজার বাড়ি ‘আন্ডার ইভ্যাকুয়েশান’। টিভির লোকাল চ্যানেলগুলোতে রেগুলার প্রগ্রাম বন্ধ রেখে সারাদিন ধরে দাউ-দাউ আগুন দেখাচ্ছে। 
তখন থেকে সারাটা দিন, রাতের মতো হয়ে থাকল। 

ঝাপসা সূর্য ছিল আকাশে। পোচ্‌ ডিমে, সাদা ভেদ করে যেরকম কুসুমটা দেখা যায়। এতো দূরে আমাদের এখানেও ছাই উড়ে-উড়ে চলে আসছে। বারান্দায় ঝুর-ঝুর করে ছাই পড়ছে। চারিদিকে নিঃশ্বাস নেয়া ভীষন অস্বাস্থ্যকর এখন। রেড-ফ্ল্যাগ-ওয়ার্নিং চলছে। মে গড ব্লেস ক্যালিফোর্নিয়া!



৭ অক্টোবর ২০১৭
শুটকি দিয়ে ভাত খেয়েও মন খারাপ সারছে না। 
সক্কালবেলা ভাত খেলাম! 
আমি আর কতো বাংলাদেশ এনে দিলে তুই খুশি হবি রে, মন!?



৬ অক্টোবর ২০১৭
'জিভে-জল-আসা' ছাড়া তেঁতুল হ্যান্ডল করা যায় না! 
আমার জিভের আদিখ্যেতা দেখে আমিই তাজ্জব বনে গেলাম। খেয়েছি সেই ছেলেবেলায়, এখনও? চোখে দেখলাম, আর জিভে জলের বন্যা বয়ে গেল! 
আমাদের এখানে তেঁতুল একটা চৌকো 'বার' হিসেবে পাওয়া যায়। ওটা থেকে একটুখানি কেটে ভিজিয়ে রাখতে হবে, ইউজ করতে হলে।



৬ অক্টোবর ২০১৭
"সতত সরলচিতে চাহো তাঁরি প্রেমমুখপানে..."



৫ অক্টোবর ২০১৭
কী মিষ্টি রোদ! 
দুধসাদা লাউয়ের ফুলেরা যেন বেণী-দোলানো বালিকা, খিলখিল হাসে, অকারণেই।



২ অক্টোবর ২০১৭
কে রে তুই, 
স্মরণ করিলি আমায়!? 
কফিতে চুমুক দিয়ে বিষম খেলাম।
শালা!



১ অক্টোবর ২০১৭
অমন পলক ফেলতে তো কেউ পারে না...!



১ অক্টোবর ২০১৭
আজ আবার সকাল থেকে রান্নার তোড়জোড়। খাসীর ঝাল তরকারি হচ্ছে । 
ভুঁড়িটাও আজ নিলাম। ভুনা করব।

গ্যারেজের রেফ্রিজারেটর থেকে একসঙ্গে অনেকগুলো আইটেম দু'হাতে করে নিয়ে আসতে গিয়ে, একটা লেবু পড়ে গেল। ইয়া বড়। আপেলের সাইজ। স্পেশাল দোকান থেকে আনি ওটা। পুরো এককাপ রস বের করা যায়, এমন লেবু। 

সেই লেবু গড়াতে গড়াতে গড়াতে গড়াতে একেবারে মেয়ের গাড়ির নীচে গিয়ে ল্যাণ্ড করল। সেখান থেকে লেবু উদ্ধারের চেষ্টায় প্রাণ ওষ্ঠাগত হল। শেষমেশ ধৈর্য হারালাম। 

এখনও তা' নিয়ে মনে খুঁতখুঁতুনি, যদিও দম ফেলার সময় নেই। একা। একহাতে সব সামলাচ্ছি। পুত্র ঘুমায়। মেয়ে গেছে স্যান-ডিয়েগো। কর্তা, এ্যাজ ইউজুয়াল, বিজনেস সামলাতে গেছে। মেয়ে স্যান-ডিয়েগো থেকে ফিরে, পুরো সপ্তাহের খাবার নিয়ে, আবার রাতেই এলএ যাবেন। 

ও গাড়িটা বের করতে নিলে লেবুটা যে চিঁড়েচ্যাপটা হয়ে যাবে, সেই ভাবনায় বয়স আমার বাড়ে না!


২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৭
একটা কমেন্ট লিখতে গিয়ে 'পিঁড়ি' প্রসঙ্গ এলো।
একসময়ে কতোগুলো করে পিঁড়ি থাকত সবার বাড়িতে! আমার নানাবাড়ির রসুইঘরে, একপাশে ডাঁই করে রাখা থাকত পিঁড়িগুলো।
আজ আর 'বউ-ঝি'রা পিঁড়িতে বসে মাছ কুটে না! পিঁড়ি কি লুপ্তপ্রায়? দেখিনি --- অনেক বছর।
আমার লাইগা এক্কান পিঁড়ি উডাইয়া রাহো!


২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৭
বাগানে গেছিলাম পুদিনা পাতা আনতাম।
অহন দেহি... চশমার ফ্রেমে পিঁপড়া হাঁটতাছে। গরমে মেজাজ খারাপ, পিঁপড়ারে 'এফ-ওয়র্ড' কইয়ালছি।
আল্লাহ্‌, মাফ কইরা দেইন যে!


২৩ সেপ্টেম্বর
এক ঝিমধরা বিকেলে আমি আমার ঘনিষ্ঠতম বন্ধুর বাড়ি গেলাম। হেঁটে। আধা মাইল হতে পারে। তখনকার দিনে টুকটাক কাজে যেতে হতো। না ছিল হাতে-হাতে ফোন, না ছিল ফেসবুক। এমন্‌কী ল্যাণ্ডফোনও ছিল না বাড়িতে। কোনও বিষয়ে জানতে হলে, শারীরিক ভাবে সেখানে চলে-যাওয়া ছাড়া গতি ছিল না। কখনও বা ও আসত। ছোট ভাইবোনদেরও পাঠানো হতো, নোট-খাতা-বই এসব লেনদেন করতে। উল্লেখ করা দরকার--- আমি তখন ইন্টারমেডিয়েট শুরু করেছি।

বিকেলে ওরা বেশ পাড়া বেড়ায়। আমাকে খুব সঙ্গে নিতে চায়, যখনই যাই। ওদের বাড়ির পেছন দিকটা গ্রামের মতো। তো আমাকে সঙ্গে নিয়ে গেছে সেদিন, ধারেকাছে এক বাড়িতে। অন্যরকম মানুষগুলো। সরল। আন্তরিক। ওর সঙ্গে যেমন, আমি প্রথম গিয়েছি, আমার সঙ্গেও তেমনি। জড়িয়ে ধরলেন সেই বাড়ির অভিভাবিকা, স্থূলকায়া এক প্রৌঢ়া। একে-ওকে ডেকে আমাকে দেখিয়ে বলছিলেন, “একদম দুর্গার মতো না দেখতে!”
আমি মনে-মনে বেজায় খুশি। দুর্গার মতো! দুর্গা বলতেই প্রতিমা দুর্গা, দেবী দুর্গা এসেছিল আমার মনে।
একটু বাদেই ভুল ভাঙল যদিও। তা’দের কতাবার্তায় বুঝতে পারলাম। এ বাড়ির কোনও এক মেয়ের নাম দুর্গা, যার বিয়ে হয়ে গেছে কিছুদিন আগেই। আমি একটু দমে গেলাম। তবুও তা’দের সেই না-দেখা-মেয়ের মতো হতে পেরেও আমি মিছিমিছি খুশি থাকবার চেষ্টা করলাম।
দেবী দুর্গা সম্বন্ধে আমার যে কী গভীর কৌতুহল ছিল, তা বলে বোঝানো সম্ভব হবে না। সেই ছোটবেলায়, ক্লাস-টু থেকে সিক্স পর্যন্ত আমরা ছিলাম একটা শহরতলি-মতো জায়গায়। সেই ছেলেবেলায়, একটা বছর কখন গ্রীস্ম থেকে বসন্তে যায়, হিসেব কে রাখে! তবে ওই শহরতলিতে বর্ষাকে এড়ানো কারুর বাবার সাধ্যি ছিল না। এমন জমজমাট বর্ষা। চারিদিকে পানি। গাছগাছালির সেকী রমরমা। ঝোপঝাড় খেয়ালখুশিমতো বেড়ে উঠত। মাছ, ব্যাঙ, ব্যাঙের মিনিয়েচার বাচ্চাগুলো যত্রতত্র। আর সাপ-জোঁক সব একেবারে কিলবিল।
আর শরৎ আসত বাড়তি আনন্দ নিয়ে। দুর্গার আগমন উপলক্ষে তোড়জোড়। দুর্গা-পরিবারের সকল চরিত্রের প্রতি পুঙ্খানুপুঙ্খ নজর ছিল আমার। তবে দুর্গা ছিল আমার কৌতুহলের কেন্দ্রবিন্দু। মাসখানেক ধরে স্কুলে যাওয়া-আসার পথে, একটা জায়গায় পুজার মণ্ডপ হতো প্রতিবছর, সেখানে থামতাম, দেখতাম, রোজই নতুন করে এটাসেটা জানতাম এই দুর্গা-পরিবার সম্বন্ধে। আমি তো আর একা থাকতাম না। কতো ছেলেপুলে। অনেকেই থাকত---আমার মতো স্কুলগামী, অথবা স্কুলফেরত। আবার ওই পাড়ার ছেলেপুলেরাও থাকত। একটা আলোচনা সভাই চলত সেখানে। কতো জিজ্ঞাসা! কৌতুহলের শেষ নেই, শেষ নেই বিস্ময়ের।
বিস্ময়-বিহ্বল হয়ে থাকা এই দিনগুলো তখনকার জীবনে একটা খুচরো আনন্দ যোগ করত। দুর্গা গড়ে উঠছে। ধীরে-ধীরে, একটু-একটু করে। যেন আমিই তা’কে গড়ে তুলছি। এতোটাই সেই কাজে আমি নিজেকে একাত্ম করে ফেলতাম। ভালবেসে ফেলতাম। আর তাই বিসর্জনে আমি রীতিমতো মুষড়ে পড়তাম। বেশ কিছুদিন ধরে খা-খা করত বুকের ভেতর।
তারপর ঢের বছর পরে, দুর্গা পুজার আভাস পাই সোশ্যাল নেটওয়র্কে।
আজও ‘দুর্গা-ভাবনা’ মাথায় এলো। তাঁর দশ হাতে কী-কী থাকত, উদ্ধার করতে চাইলাম স্মৃতি হাতড়িয়ে। আজও সেই কৌতুহল অক্ষত। মুহূর্তকাল দেরি না করে, ‘গুগ্‌ল্‌ সার্চ’ দিলাম।
দশ হাতে... খড়গ, চক্র, গদা, বাণ, ধনুষ, পরিঘ, শূল, ভুশুণ্ডি, নরমুণ্ড ও শঙ্খ। সবগুলোই প্রায় যুদ্ধাস্ত্র। শঙ্খ বাদে। আর ‘ভুশুণ্ডি’ আমি বুঝতে পারলাম না। ভুশুণ্ডি বলতে জানি এক কাক। ভুশুন্ডির কাক।
আমাকে কেউ ব্যাখ্যা করতে পারো? লেখাটা কাল শেষ করব। আজ এটুকুই থাক!


১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৭
হবিগঞ্জের জালালী কইতর, সুনামগঞ্জের কুড়া, সুরমা নদীর গাঙচিল আমি শুন্যে দিলাম উড়া..
শুন্যে দিলাম উড়ারে আমি যাইতে চান্দের চর, ডানা ভাইঙ্গা পড়লাম আমি কোলকাত্তার উপর- তোমরা আমায় চিনোনি...!

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন