শনিবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০১৭

উপন্যাসের শৈলী : বর্ণনা ও বিবৃতি

বীরেন্দ্র দত্ত

প্রতিভাবান প্রতিটি লেখকই উপন্যাসের রূপকর্মে বর্ণনা ও বিবৃতিকে পরীক্ষা ও নিরীক্ষার স্তরে রেখেছেন উপন্যাসের ‘প্লট’ শব্দটিকে যদি বিস্তৃত অর্থে ধরা যায়, এই বর্ণনা ও বিবৃতির ব্যাপার নিঃসন্দেহে সেই প্লটের সঙ্গেই সমন্বিত। গল্প বলার ব্যাপার প্লটের অঙ্গাঙ্গী। গল্প বলতে গেলে চরিত্র আঁকতে হবে, চরিত্রের অন্তর্নিহিত মানসলোক স্পষ্ট করতে হবে, মন বোঝাবার জন্য প্রকৃতি-পরিবেশ, পার্শ্বচরিত্র, লেখকের প্রতিপাদ্য, সমসাময়িক সমাজ-অবস্থা ইত্যাদি সবকিছুই লেখকের সূক্ষ্ম অনুভূতির অভিজ্ঞতায় এক এক করে পাঠকের সামনে রাখতে হবে । লেখকের পক্ষে এই জাতীয় প্লট রচনায় একরকম বর্ণনা ও বিবৃতির আশ্রয় নিতেই হয়।

এক্ষেত্রে সাধারণভাবে নাটকের সঙ্গে উপন্যাসের বিবৃতির ( narration ) নিয়মে লক্ষণীয় পার্থক্য আছে। নাট্যকার তাঁর বর্ণনা ও বিবৃতির ব্যাপারগুলি প্রয়োজনবোধে চরিত্রসমূহের সংলাপে সংযোজন করেই দায়িত্ব শেষ করেন। আধুনিক নাটকে দীর্ঘাকার নাট্যনির্দেশনার মধ্যেও নাট্যকার বিবৃতির কিছু অংশ সংযোজিত করেন। কিন্তু উপন্যাসে তা হয় না। সাধারণ প্রচলিত যে ধারণা, তাতে দেখা যায়, ঔপন্যাসিক প্রধাণত তিনটি পদ্ধতি অবলম্বন বা মহাকাব্যিক পদ্ধতি, ২. আত্মজীবনীমূলক রচনা পদ্ধতি, ৩, প্রামাণিক পদ্ধতি সহজ সরল বিবরণধারা প্রথমটির বৈশিষ্ট্য। সাধারণভাবে সমস্ত ঔপন্যাসিকই এই প্রণালী অনুসরণ করেন। এক্ষেত্রে ঔপন্যাসিক ইতিহাসকারের মতো দর্শক হয়ে যেন অত্যন্ত সহজ, সরল ও স্পষ্টতার মধ্য দিয়ে সমস্ত কিছুই বলতে বসেন। মহাকাব্যের বর্ণনায় যে সরলতা, স্পষ্টতা, প্রত্যক্ষতা এবং ঋজুতা থাকে, যে বিশালতা মহাকাব্যকে সর্বসাধারণের বিষয় অবলম্বনে সর্বসাধারণেরই বিষয় করে তোলে ; এই পদ্ধতি অনেকাংশে তারই অনুসারী। লেখক এখানে বহুবিধ ক্ষেত্রে স্বাভাবিক বিচরণ করার সুযোগ পান । ঔপন্যাসিক যথেষ্ট স্বাধীনতা পেতে পারেন উপন্যাসে নিজেকে সহজভাবে সংযুক্ত করার ।

আত্মজীবনীমূলক রচনায় লেখক উত্তমপুরুষে উপন্যাস বর্ণনা করেন। এখানে লেখক স্বয়ং নায়ক বা নায়িকারূপে অবতীর্ণ হয়ে উপন্যাসের যাবতীয় ঘটনা ও চরিত্রের বিবরণ দিতে থাকেন। কখনো বা কোনো একটি সাধারণ পার্শ্বচরিত্র “আমি” রূপে উপস্থিত থেকে নায়ক-নায়িকার যাবতীয় সক্রিয়তা বর্ণনা করে। এখানে লেখকের ভূমিকা গৌণ, অথচ তার জবানীতেই উপন্যাসটির আদ্যন্ত বিবরণধারা মুখ্য হয়ে উঠে। কোথাও কোথাও উপন্যাসের প্রত্যেকটি প্রধান চরিত্র স্বতন্ত্র পরিচ্ছেদে নিজের জবানিতে উপন্যাসের নানাবিধ কাহিনী, ঘটনা ও সংশ্লিষ্ট চরিত্রাবলী বর্ণনা ও পর্যবেক্ষণ করে থাকে। এই পদ্ধতি উপন্যাসের বর্ণনা ও বিবৃতির সূত্রে পরীক্ষামূলক পদ্ধতি, ইংরেজি সাহিত্যে Robinson Crusole, The Vicar of Wakefield, David Copperfield, rif, ifics sist,ফরাসি সাহিত্যে সার্ত্র, কামু, ইত্যাদির রচনা, বাংলা সাহিত্যে বঙ্কিমচন্দ্রের ‘রজনী’, রবীন্দ্রনাথের ‘ঘরে বাইরে’, একেবারে আধুনিক কালে বিমল করের ‘অপরাহ্ন’ ইত্যাদির নাম উল্লেখ্য, তবে আত্মজীবনীমূলক বিবরণপদ্ধতিতে লেখককে যথেষ্ট সচেতন থাকতে হয়। “আমি” রূপে নায়ক ও নায়িকা কেবল নিজের মনকে তুলে ধরবে না, সেই সঙ্গে সমস্ত ছোট বড় চরিত্র, ঘটনা ইত্যাদির স্বরূপ ও পরস্পরের মধ্যে সামঞ্জস্য রচনা করছি। 

প্রামাণিক (ডকুমেণ্টারি) পদ্ধতির মধ্যে চিঠিপত্র, ডায়োরি ইত্যাদির আকারে লিখিত উপন্যাসকে ফেলা হয়। অধুনা ‘রিপোর্টাজ’ ধরনের উপন্যাসগুলিও এই পদ্ধতিতে পড়ে। এটি উপন্যাসের বর্ণনা ও বিবৃতির পরীক্ষামূলক কৌশলে আর একটি জটিল, বিচিত্র ও অভিনব পদক্ষেপ। চিঠিপত্র, ডায়েরি ইত্যাদি মানুষের মনের একান্ত গোপন দর্পণ। রক্তমাংসের নিখুঁত ব্যক্তিগত সত্তাকে উন্মোচিত করার
ভার নেয়। এগুলি। কোনো উপন্যাসের পাত্র-পাত্রীরা যদি চিঠিপত্র বা ডায়েরির গোপনতায় আত্মগোপন ক’রে উপন্যাসোপম বিরাট বিবৃতিতে অংশগ্রহণ করে, সেখানে উপন্যাস নিঃসন্দেহে অন্তরঙ্গ ও মনস্তত্ত্বের বিশ্লেষণে যথেষ্ট গভীরাশ্রয়ী হতে বাধ্য। প্রামাণিক তথ্য ও সত্য এ জাতীয় উপন্যাস বর্ণনায় ঘটনা ও গতিকে নিয়ন্ত্রিত করতে পারে। এই প্রামাণিক পদ্ধতির উদাহরণ হিসেবে রিচার্ডসনের 'ক্লারিসা', 'পামেলা’ ইত্যাদি চিঠিপত্র-জাতীয় উপন্যাস, স্মলেটের 'হামফ্রে ক্লিঙ্কার, ফ্যানি বার্নির 'এভেলিনা’, উইলকি কলিন্‌সের ডায়েরিধর্মী উপন্যাসগুলি উল্লেখ্য।

কিন্তু আত্মজীবনীমূলক বর্ণনাপদ্ধতি ও চিঠিপত্র-ডায়েরি জাতীয় উপন্যাসের লেখককে বর্ণনাকালে নানাবিধ জটিলতার সম্মুখীন হতে হয়। লেখক যখন স্বয়ং অনুমিত নায়ক বা নায়িকা হলে উত্তমপুরুষে কথা বলতে শুরু করেন, তখন অন্যান্য চরিত্রের যাবতীয় বিষয়কে তিনি সমগ্রভাবে উপস্থাপিত করতে সবসময়ে পারবেন কিনা, সন্দেহ থেকে যায়। এমনকি রক্তমাংসের চরিত্র-নিহিত অন্তরঙ্গ দিকগুলি নাও দেখা দিতে পারে |

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন