শনিবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০১৭

যোদ্ধা ও কবির দাস্তান

রিমি মুৎসুদ্দি

করাচি থেকে কলকাতা দীর্ঘ পথযাত্রায়ও কোন ক্লান্তি হয় নি তাঁর। গ্রীষ্মের নিদাঘ অপরাহ্নে উত্তর কলকাতার এ গলি সে গলি ঘুরে শেষে খুঁজে পেলেন বন্ধুর বাড়ি। বন্ধু পত্নীর কাছে বন্ধুর মৃত্যুর খবর পেয়ে এবার কিঞ্চিৎ হতাশ ও ক্লান্ত বোধ করছেন করাচী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও ইতিহাসবিদ প্রায় ষাটোর্দ্ধ এম এইচ বেগ।
এই পরিশ্রম পুরোটাই যে ব্যর্থ হল! সেই যে বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরীতে বসেছিলেন আর পিয়ন একটা চিঠি দিয়ে গিয়েছিল। কলকাতা থেকে তাঁর প্রিয় বন্ধু ও একসময়ের সহকর্মী ইতিহাসবিদ ডঃ সুকুমার রায়-এর চিঠি। এই চিঠি হাতে পেয়ে মনে পড়ে গেল, দুজনের একসাথে গবেষণার দিনগুলো। পাকিস্থান নামে কোন আলাদা দেশের জন্মই হয়নি সেই সময়ে। লাহোর, করাচি, দিল্লি কলকাতা – সব ভারতবর্ষ নামে একটাই দেশ বোঝাত। স্যার যদুনাথ সরকারের এই দুই কৃতী ছাত্রের গবেষণার বিষয় ‘মুঘল ইতিহাস।’ দুজনকেই বড় টানত সে ইতিহাস। তখনও ইউরোপ থেকে জাতীয়তাবাদের ধারণার আমদানী হয় নি হিন্দুস্থান নামে এই ভূখণ্ডে। যে হিন্দুস্থানের শরীরে মিশে রয়েছে ব্রাহ্মণ, অব্রাহ্মণ– সমস্ত বর্ণের হিন্দু, জৈন, বৌদ্ধ, আফগান, পাঠান, ভাগ্যসন্ধানে এদেশে আসা ইরানী, তুর্কী, বিদেশী বণিক, তাওয়াইফ, বাঁদী, গোলাম, কারিগর, আম আদমির ঘাম, রক্ত, যন্ত্রণা, হর্ষের দাস্তান। মসনদ এদের কোনোদিনই চেনে নি। আজও চেনে না। তবু এরাই যুগ যুগ ধরে প্রকৃত হিন্দুস্থান। মসনদের উত্তরাধিকার বদলে যায় এক যুগ থেকে আরেক যুগে কিন্তু এদের গাঁথা যুগযুগ ধরে একই থাকে- “বদল যায় অগর মালি, চমন হোতা নেহি খালি, বাহারে ফির ভি আতি হ্যায়, বাহারে ফিরভি আয়েঙ্গে।” 

একটা ছোট রেকাবীতে কিছু মিষ্টি আর একগ্লাস শরবৎ নিয়ে ঘরে এলেন বন্ধু পত্নী। সদ্য স্বামী হারানোর বিষণ্ণতা লেগে রয়েছে তাঁর চোখে। বেগ সাহেবের খেয়াল হল- নিজের অপ্রাপ্তির চিন্তাই শুধু করে চলেছেন। এইসময়ে তাঁর বন্ধুপত্নীকে সান্ত্বনা দেওয়া উচিত। তিনি কিছু বলার আগেই সুকুমার পত্নী বললেন, “আপনার কথা শেষের দিকে খুব বলত। কি একটা বই লিখছিল আর বলত, এই বইটা স্যার অথবা করাচীতে আমার বন্ধুর কাছে পৌঁছে দিতে পারলে আমার পরিশ্রম সার্থক।” কথাটা শুনেই শোক ভুলে ক্লান্তি ভুলে উত্তেজনায় কেঁপে উঠলেন বেগ সাহেব। “আপনি ওনার পড়ার ঘরে একটু খুঁজে দেখুন। আমি এই গণ্ডগোলে এখনও ও ঘরের দিকে নজর দিতে পারি নি।” কথাটা বলেই টেবিলের উপর একটা রিং সমেত চাবি রেখে তিনি চলে গেলেন। কিছুক্ষণ পর একটা বছর দশেকের বাচ্চা ছেলে এসে বেগসাহেবকে ডঃ সুকুমার রায়ের পড়ার ঘরটা দেখিয়ে দিল।

অবশেষে ইতিহাসের স্তূপ থেকেই খুঁজে পেলেন সেই অমূল্য পাণ্ডুলিপি। ‘হুমায়ুন ইন পারসিয়া’ পড়তে পড়তে কেমন যেন ঘোরের মধ্যে চলে গেলেন। হুমায়ুন ইন পারসিয়া- নামখানি সুকুমারই দিয়েছেন। তবে এ যে শুধু বাদশাহ হুমায়ুনের কথা নয়, জয়-পরাজয়ের মেলবন্ধন ঘটানো তাঁর বিচিত্র জীবন কাহিনীই নয়, একটা গোটা সমাজ, সেই সময়ের কথা, যোদ্ধা ও আমলাদের কাহিনী সবই তাঁর বন্ধু শাদা পৃষ্ঠার মধ্যে ধরে রাখতে চেয়েছেন। পুরোটা অবশ্য শেষ করে উঠতে পারেন নি। তার আগেই মৃত্যু এসে তাঁকে থামিয়ে দিয়ে গিয়েছে। সেই অর্দ্ধসমাপ্ত পাণ্ডুলিপি কলকাতায় বসেই শেষ করলেন করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ও ইতিহাসবিদ।

বাদশাহ আকবরের সঙ্গে গুজরাত অভিযানে এসেছেন সতেরো বছরের এক কিশোর। কিশোর আবদুর রহিম অবশ্যই গর্ববোধ করছেন বাদশাহ তাঁকে এই অভিযানে সঙ্গী করায়। যুদ্ধক্ষেত্রে প্রবল বীরত্ব দেখিয়ে তিনি বাদশাহের নজরও কেড়ে নিয়েছেন। সম্রাট স্বয়ং তাঁকে মির্জা উপাধি দিয়ে সম্মানিত করেন। এই আনন্দ, গৌরবের মাঝেও একটা ব্যথা তাঁকে প্রবল যন্ত্রণা দিচ্ছে। যুদ্ধক্লান্ত শরীর নিয়ে রহিম একাই পৌঁছে যান সহস্রলিঙ্গ লেকের ধারে। 

বিকেলের নরম আলো সেদিনও বোধহয় এরকমই ছিল। রহিমের আব্বাহুজুর, আকবর বাদশাহর খানবাবা দোর্দণ্ডপ্রতাপ বৈরামখান তখন নৌকাবিহার করছিলেন। মুঘল শাহির আকাশে আর কোন মেঘ নেই। এখন শুধুই রৌদ্রকরোজ্জল দিন। একটা সময় ছিল যখন এই আকাশ অন্ধকার থেকে আরো ঘন অন্ধকার ছিল। পালিয়ে বেড়াচ্ছিলেন মুঘল বাদশাহ হুমায়ুন। মরহুম বাদশাহের কথা মনে আসাতে শোয়া অবস্থা থেকে উঠে বসলেন বৈরাম। কিঞ্চিৎ ঝুঁকে যেন কুর্ণিশ জানানোর চেষ্টা করলেন মৃত বাদশাহের উদ্দেশ্যে। সেই আজন্ম আনুগত্য আজও একইরকমভাবে অটুট আছে দেখে নিজের মনেই হেসে উঠলেন বৈরাম।

গঙ্গা আর কীর্তিনাশা নদীর সঙ্গমস্থলে ছোট্ট একটা গ্রাম চৌসা। এইগ্রামের দক্ষিণে হিন্দুস্থানের বাদশাহ মোঘল সম্রাট হুমায়ুন তাঁর সেনাবাহিনী নিয়ে ঘাঁটি গেড়েছেন। খরস্রোতা কীর্তিনাশা নদীর আরেক পাড়ে শের খাঁর আফগান বাহিনীর শিবির। নড়বড়ে একটা পুল অবশ্য আছে নদীতে। তবে সেই পুলে কামান বা কোন অস্ত্র এমনকি বেশী সৈন্যও একসাথে চলাচল করতে পারবে না। ফজরের নামাজ শেষ করে বাদশাহ এখন দাঁড়িয়ে রয়েছেন তাঁর ডুরসানা মঞ্জিল(দোতলা তাঁবুর) বারান্দায়। সূর্য এখনও পুরোপুরি ওঠে নি। পাঁকশালে তৈরি হচ্ছে সম্রাটের জন্য শাহি নাস্তা। ফুলময়দার রুটি আর পরিযায়ী বেলে হাঁসের সুস্বাদু মাংস। তার সঙ্গে তরমুজের সুরা। তরমুজের রসে এসে মিশেছে ভোরের শিশির। এতে সুরার স্বাদ আরও তীব্র হয়।

পশ্চিমের মেঘাচ্ছন্ন আকাশের দিকে তাকিয়ে সম্রাট ভাবছেন গতকাল রাতে পড়া নক্ষত্ররহস্যের সেই বইটার কথা। বিশাল আকাশের এই নক্ষত্রদের অজানা জন্মরহস্যের মধ্যেই নিহিত আছে এই বিপুলা পৃথিবীর সৃষ্টি রহস্য। সম্রাটের নিজের ভাগ্যরহস্যও সেখানেই জমা হয়ে আছে। এইসময় সম্রাট একা থাকতেই পচ্ছন্দ করেন। রক্ষী এসে জানায়, বৈরাম খাঁ দর্শনপ্রার্থী। এই অসময়ে বৈরামকে আসতে দেখে সম্রাট কিঞ্চিৎ বিচলিত হন। খুব জরুরী বিষয় না হলে বৈরাম এইসময়ে আসত না। বৈরামকে চিন্তিত দেখে বাদশাহের কপালেও ঈষৎ ভাঁজ। বাদশাহকে কুর্ণিশ জানিয়ে বৈরাম জানায়, “শের খাঁ একটা ধূর্ত সাপ। কখন আক্রমণ করবে সে আভাষ পাওয়ার আগেই হয়ত তার ছোবলে প্রাণ যাবে মুঘল সেনাদের। আমি হুজুরের জন্য চিন্তিত।” বৈরামের কথা ঠিক প্রমাণিত করে দুচারদিনের মধ্যেই শের খাঁ-র সৈন্যদলের আক্রমণে ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল মুঘল শিবির। সেই থেকে পলাতক বাদশাহের সঙ্গী বৈরাম। বাদশাহের দুর্ভাগ্যের সঙ্গে নিজেকে একেবারে জড়িয়ে নিয়েছিল সে।

সহস্রলিঙ্গ লেকের চারিধারে ফুটে রয়েছে অজস্র ফুল। হিন্দুস্থানের প্রতিটা দুর্গের গুপ্তপথের সন্ধান জানলেও এই ফুলগুলোর নাম জানে না বৈরাম। নৌকার গুলুইতে গা এলিয়ে দিয়ে তিনি ফিরে গেছেন সেই সিন্ধ প্রদেশের স্মৃতিতে। যেখানে পরাজিত সম্রাট হুমায়ুন তাঁর পথশ্রমে ক্লান্ত নববিবাহিত গর্ভবতী স্ত্রীর জন্য একটা ঘোড়া চেয়েছিলেন আমির তারদিবেগের কাছে। তারদিবেগ বাদশাহের আদেশ অমান্য করে ঘোড়া দিতে অস্বীকার করে এবং বাদশাহের পরাজয়ের কারণ তাঁর বিদ্রোহী ভাই কামরানের শিবিরে যোগদান করে। হুমায়ুন বাদশাহের আরেক ভাই আশকারির আশ্রয়ে বাদশাহের বেগম হামিদা বানু পুত্রসন্তান প্রসব করলে তারদিবেগই সেই খবরটা বাদশাহকে দেয়। প্রথম পিতা হওয়ার আস্বাদে রহমদিল বাদশাহ ক্ষমা করে দিয়েছিলেন তারদিবেগের ঔদ্ধত্য। বৈরাম ক্ষমা করতে পারেন নি। তাই পরবর্তীকালে কিশোর বাদশাহ আকবরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হিমুকে সাহায্য করতে তারদিবেগ তাঁর দলবল নিয়ে যাত্রা করলে বৈরাম অতর্কিত আক্রমণ করে সেই সেনাবাহিনীর উপর। তারদিবেগকে নিশ্চিহ্ন করে তবেই বৈরাম নিশ্চিন্ত হয়। কিশোর আকবরকে সেদিন তিনি বুঝিয়েছিলেন- স্বদেশ থেকে এত দূরে তোমার পূর্বজরা নিজেদের যোগ্যতায় হুকুমত কায়েম করেছেন। এখন তুমি যদি আবেগকে প্রশ্রয় দাও, তাহলে এই পরদেশে নিজের জন্য একটুকরো জমিও পাবে না। 

আজ তরুণ আকবর বাদশাহের নির্দেশে তিনি মক্কায় চলেছেন হজ করতে। হিন্দুস্থানের সম্রাটের আর প্রয়োজন নেই তাঁর আতালিককে। তাই অভিমানে বৈরাম মেনে নিয়েছেন বাদশাহের আদেশ। সেদিন নৌকাবিহার করতে করতে একটু বুঝি অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলেন তিনি। তরবারি ছিল পাশেই। মাঝি বললে, ‘হুজুর ঐ পাড়ে কিছু যুবক আপনার চরণে সামান্য তোফা পেশ করতে চান।’ আনমনা বৈরাম তক্ষুনি নির্দেশ দেন নৌকা পাড়ে নিয়ে চল। একদল পাঠান যুবক দেখেও কোন সন্দেহ হয় নি। তাই তরবারি পর্যন্ত নৌকায় রেখে তিনি নেমে পড়েন। তীক্ষ্ণ অস্ত্রটা যখন বুকের ভিতর ঢুকে গিয়ে বৈরামের বিশ্বাস, ভালবাসা সব একে একে অন্ধকার করে দিচ্ছে তখনও বোধহয় সে বুঝতে পারে নি এইভাবেই সব আলো নিভে যাবে।

ক্ষমতার কাছাকাছি থাকলেই হতে হবে চক্রান্তের স্বীকার। এ সত্য হিন্দুস্থানে বরাবরই ছিল। ভারতের অতীত ও বর্তমানের রাজনীতি এই একটা বিন্দুতে একেবারে মিলেমিশে একাকার।

আব্বাহুজুরের কথা ভাবতে ভাবতে এষার নামাজের সময় হয়ে এল। লেকের ধারেই বসে পড়ে নামাজ আদায় করে রহিম। এই পথের ধুলোয় মিশে রয়েছে তার আব্বাহুজুরের রক্ত। ভাবতে ভাবতে তার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। ফেরার পথে তরুণ রহিম দেখে এক পাঠান মহিলা বসে রয়েছে একটা গাছের গুঁড়িতে হেলান দিয়ে। কোন হিজাব নাকাব ছাড়াই সে বসে রয়েছে। তার দুচোখ দিয়ে যেন চুয়ে পড়ছে বিষণ্ণতা। বোধহয় যুদ্ধে সদ্য স্বামী হারিয়েছে সে। তার বিষণ্ণতায় এমনএক মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্য ধরা পড়েছে এই তরুণ যোদ্ধার চোখে যে, এই কবিতা প্রেমী বিদ্বানতরুণের চোখের সামনে ভেসে উঠল, সদ্য পড়া বৈষ্ণব পদাবলীর চারণগুলো। যেন শ্রীরাধিকা তাঁর সখীদের বলছেন, ‘সখী কৃষ্ণ বিনা জীবন ব্যর্থ। তোমরা তাকে এনে দাও আমার কাছে।’ 

আগ্রা পৌঁছেই রহিম লিখে ফেললেন তাঁর প্রথম কবিতার বই ‘মাদানস্তক’। রাধাকৃষ্ণের প্রেম, বৃন্দাবনে গোপীদের সঙ্গে কৃষ্ণের লীলাখেলা এইগুলোই ছিল তার আট চারণবিশিষ্ট এই সংস্কৃত কবিতার বই। তখনও তাঁর সংস্কৃত শিক্ষা সম্পূর্ণ হয় নি। তাই সংস্কৃত শব্দের সঙ্গে জুলফে, রোশন, দিল- এই পারসিয়ান শব্দগুলোও মিশে গিয়েছে। পরবর্তীকালে তিনি অবধি, ব্রজবুলি, খরবৌলি, সংস্কৃত, হিন্দি, পারসি, চাঘতাই তুর্কী ইত্যাদি নানা ভাষার সংমিশ্রণে প্রেম ও দেহতত্ত্ববাদের মিশেল ঘটিয়ে প্রচলন করলেন এক নতুন কাব্যভাষার। যার নাম দোঁহা।

শুধু দেশজ ভাষা নয়, তিনি শিখেছিলেন পর্তুগীজ ও ল্যাটিন ভাষাও। সেই সময় পর্তুগীজ থেকে আগ্রায় আসা ফাদার অ্যাকুয়াভিভার কাছে তিনি বিদেশী ভাষার শিক্ষা গ্রহণ করেন। 

সেইসময়ে তাঁর জীবনে আরও কিছু পরিবর্তন আসে। বাদশাহ নিজে তাঁকে উৎসাহ দিতেন বিভিন্ন ভাষা শিক্ষায়। তাঁর পাণ্ডিত্যে মুগ্ধ সম্রাট স্বয়ং তাঁকে নবরত্নের এক রত্ন ঘোষণা করেন এবং তাঁকে খান-ই-খানান উপাধিতে ভূষিত করেন। সম্রাটের ধাত্রীমা জিজিয়াঙ্গার কন্যা মহা বানুর সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয়। গুজরাটের সুবেদার হয়ে তিনি গুজরাট চলে আসেন। তাঁরই মধ্যস্থতায় শ্বেতাম্বর জৈন প্রধান হিরাভিজয় সুরী ৩৫ জন জৈন সন্ন্যাসীদের নিয়ে মোঘল সম্রাটের শাহী আতিথ্য গ্রহণ করেছিলেন। ‘শুধু উলেমা নয়, আমাদের উচিত সব ধর্মের প্রধানদের কথাই শোনা। সব ধর্মগ্রন্থই কি বলতে চায় সেগুলো জানা।’ এই ছিল তার মতবাদ। আকবরের দীন-ই-ইলাহি ধর্মের আদর্শ তিনিও বহুদিনধরেই লালন করেছিলেন। ইতিহাসের বিচারে আবদুর রহিম খান-ই-খানান একজন প্রোটাগনিস্ট। জাতীয়তাবাদ ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির আইকন বলা যেতে পারে। 

আবদুর রহিম ছিলেন প্রেমিক কবি। তাই বাদশাহের সঙ্গে নগর পরিভ্রমণে বেড়িয়ে তিনি লক্ষ করলেন নগরের সমস্ত নারীকে। অভিজাত নারী নয়, অন্ত্যজ শ্রেণীর ঘরে যে রমণী অপেক্ষা করে আছে হাড়ভাঙ্গা খাটুনির পর তাদের স্বামী ঘরে ফিরে আসাবে এবং তারপর তার জীবনে সেই মধুর মিলন সন্ধিক্ষণ আসবে। এরা সবাই হয়ে উঠল রহিমের দোঁহার বিষয়বস্তু। কামার, ছুতোর, তিলি, মালী- এইসব পেশার মানুষদের স্ত্রীরা কিভাবে তাদের স্বামীর প্রতি ভালবাসা প্রকাশ করবেন এই নিয়ে তিনি লিখলেন কিছু দোঁহা- ‘নগরভ্রমিকা।’ 

হলদিঘাটের যুদ্ধে আবদুর রহিম এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেন। না শুধু যোদ্ধা হিসাবে নয়, বিশ্বপ্রেমিক বা মানবপ্রেমিক রহিমের জয় ঘোষণা হয়েছিল সেদিন। প্রবল সংগ্রামী রাণা অনেক কৃচ্ছসাধন করলেও শেষপর্যন্ত আত্মসমর্পণ করেন নি মুঘল শক্তির সামনে। তাঁরই এক বংশধর উত্তরের এক সমতলভূমিতে তাঁর পরিবার ও পরিজনদের নিয়ে চলে আসেন। মুঘল রাজধানী আগ্রা থেকে খুব বেশি দূরে নয় সে জনপদ। আকবর বাদশাহ সেনা পাঠালেন, ‘বন্দী করে নিয়ে এসো প্রতাপের বংশধরকে।’ 

কয়েকজন আফগান সৈন্য নিয়ে সদ্য যুবক ও সেনাপতি আধম খাঁ চলেছে রানাপ্রতাপের বংশকে নিকেশ করতে। আকবর বাদশাহের হুকুম সে মানে না। বন্দী নয়, প্রাণ নেওয়াতেই তার আনন্দ। খবরটা পৌঁছে যায় দরবারের শ্রেষ্ঠ পণ্ডিত, খান-ই-খানান আবদুর রহিমের কাছে। সম্রাটের কাছে তিনি রানাপ্রতাপের বংশধরদের প্রাণভিক্ষা চান। বাদশাহকে জানান, যুদ্ধের সময়, হারেমের এক সুন্দরী পথ ভুলে প্রতাপের শিবিরে সেনাদের হাতে বন্দী হয়েছিল। খবরটা পেয়ে রাণা নিজে সসম্মানে মুঘল হারেম সুন্দরীকে আবার শাহী হারেমে ফিরিয়ে দেওয়ার বন্দবস্ত করেছিলেন। দীন-ই-ইলাহি ধর্মের প্রবর্তক জিন্দা দিল বাদশাহ আকবর তৎক্ষণাৎ রহিমকে পাঠান আধম খাঁ-কে আটকানোর জন্য। বাদশাহ ঘোষণা করেন, আজ থেকে প্রতাপের বংশধর নিশ্চিন্তে বসবাস করতে পারবে ওই অঞ্চলে। 

রহিমের মত যোদ্ধা ও কবির কি আজ সত্যিই খুব প্রয়োজন ভারতবর্ষে? রাজধানীর এক কোণে একটা মকবরার মধ্যে ঘুমিয়ে আছে হিন্দুস্থানের এক প্রোটাগনিস্ট নায়ক। আজকের ভারতের সব আম-আদমির মধ্যে জাগিয়ে তুলতে হবে সেই প্রোটাগনিস্ট চরিত্র। 

ফিরে যাই সেই ইতিহাসবিদের কাহিনীতে, যিনি সুদূর করাচি থেকে কলকাতায় এসেছেন বন্ধুর অসমাপ্ত পাণ্ডুলিপি উদ্ধার করতে। বেশ কয়েকদিনের অক্লান্ত পরিশ্রমে শেষ করা পাণ্ডুলিপি তিনি জমা দিলেন এশিয়াটিক সোসাইটিতে। ১৯৪৮-এ এশিয়াটিক সোসাইটি সুকুমার রায়-এর ‘হুমায়ুন ইন পারসিয়া’ বইটি প্রকাশ করে। দিল্লির দুই বহু পুরাতন কবি যাঁদের একহাতে ছিল তরবারি আরেক হাতে কলম সেই দুই বীর যোদ্ধা ও কবি যাঁরা আবার পিতা ও পুত্র। তাঁদের দাস্তান প্রথম পাওয়া যায় সেই বইটিতে। 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন