শনিবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০১৭

কার্ল গুস্তাভ ইয়ুং-এর মনস্তত্ত্ব

মঈন চৌধুরী

কার্ল গুস্তাভ ইয়ুং তাঁর মনস্তত্ত্বে একজন ব্যক্তিমানুষ ছাড়াও সমাজবদ্ধ সামাজিক মানুষকে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। তাঁর মতে, মানুষের ‘মন’ শুধুমাত্র কোনো একজন একক-মানুষকে কেন্দ্র করেই অবস্থান করে না, সমাজে অবস্থানকালে সামাজিক সব মানুষের ‘যৌথ-মনস্তত্ত্ব’ ব্যক্তি ও সমাজের চরিত্র নির্ধারণে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে।
ফ্রয়েডের মনস্তত্ত্বে যে চেতন অহং-এর কথা বলা হয়েছে, তা ইয়ুং-এর দর্শনে গ্রাহ্য, তবে ফ্রয়েড-কথিত অচেতন অহং আর অদ ইয়ুং-এর মনস্তত্ত্বে ব্যক্তিগত অচেতন হিসেবে এসেছে। ব্যক্তিগত অচেতনে সংরক্ষিত যেকোনো ধরনের স্মৃতি (যা হয়তো-বা আপাতত অচেতনে হারিয়ে গেছে, সুপ্ত অবস্থায় আছে) প্রয়োজন হলে অহং-এর উপাদান হয়ে চেতনে মনে ফিরে আসতে পারে। এই ঐতিহাসিক বা প্রত্নস্মৃতি ঘুরে-ফিরে আসাকে কেন্দ্র করেই কাল ইয়ুং প্রস্তাব করেছেন তাঁর বিখ্যাত ‘যৌথ অচেতন’-এর তত্ত্ব ধারণা, যা আমাদের বর্তমানের ব্যক্তি, সমাজ, আন্তর্ব্যক্তিক সম্পর্ক, সমাজ-চেতনা ইত্যাদিকে যৌথভাবে বিশ্লেষণ করতে পারে।

‘যৌথ অচেতন’ বিষয়টি প্রতিটি মানুষের জন্য পূর্বনির্ধারিত। আমাদের পূর্বপুরুষদের ঐতিহাসিক, এমনকি প্রাগৈতিহাসিক চেতনার-কাঠামো-সৃষ্ট সুপ্ত-অচেতনের ক্রিয়া-বিক্রিয়া, জৈবিক উপাদান হিসেবেই আমাদের মনে গভীর গহিন অচেতনে অবস্থান করতে পারে। আমাদের মাঝে ‘যৌথ-অচেতন’ কাজ করার কারণেই আমরা দেখতে পাই, পৃথিবীর সব দেশের রূপকথার কাঠামো প্রায় একই রকম, কুরু-পাণ্ডবের ‘মহাভারত’ ও রাম-রাবণের ‘রামায়ণ’-এর সাথে মিল খুঁজে পাই ‘ইলিয়াড’ ও ‘অডেসিতে। আমাদের বঙ্গদেশের শোষণের ইতিহাস গ্রাহ্য করে বর্তমানের গণতন্ত্রও হয়ে যায় গণশোষণতন্ত্র (কারণ আমরা সব সহ্য করতে পারি, আমাদের ‘যৌথ-মনস্তত্ত্বে’ আছে সমাজে শোষণ ছিল, থাকবে, সুতরাং বিএনপি-আওয়ামী লীগ চুরি করবেই; ধর্ম আমাদের সবসময় সহায় হয়েছে, সুতরাং মুক্তিযুদ্ধের দল আওয়ামী লীগ ফতোয়ার পক্ষে যেতেই পারে; আমাদের সমাজপতিরা ৫/৬টা বিয়ে করত, তাদের হারেম ছিল, সুতরাং এরশাদ সাহেবের দোষ নেই, তিনি ভালো লোক ইত্যাদি)।

যৌথ-অচেতনের কিছু উপাদানকেও শনাক্ত করেছেন ইয়ুং, যাকে তিনি বলেন প্রত্নশ্রেণী। যৌথ-মনস্তত্ত্বের অধিকারী হয়ে একজন মানুষ

যে প্রত্নশ্রেণীতে থাকে, তার চরিত্রও সে রকম হবে। যৌথ-অচেতন-কেন্দ্রিক মানুষের বিভিন্ন প্রত্নশ্রেণী হতে পারে নিম্নরূপ :

ক. মাতৃ-কেন্দ্রিক প্রত্নশ্রেণী
সব মানুষেরই মা আছে এবং মা-কে কেন্দ্র করে একজন মানুষের অচেতনের বিবর্তন হতে পারে (ফ্রয়েডের ইদিপাস কমপ্লেক্স-এর বিষয় এ প্রসঙ্গে স্মরণ করা যায়)। মা-এর কল্পিত প্রতিরূপ মা-এর অবর্তমানে প্রেমিকা, আদিমাতা ইভ, মাতা মেরী, দুর্গা-মা (দেবী), অন্যান্য নারী এমনকি দেশ-মাতার ওপর বর্তাতে পারে।

খ. মানা বা বিশ্বাসী
মানা প্রত্নশ্রেণীর মানুষ অন্ধ বিশ্বাস কোনো জানা বা অজানা বস্তু বা বিষয়ের অতীন্দ্রিয় ক্ষমতায় বিশ্বাসী হতে পার। তারা ধর্মকর্ম, পূজা, পীর-দরবেশ, নেতা ইত্যাদি নিয়ে ব্যস্ত থাকে।

গ. ছায়া
মানুষ এক ধরনের জীব এবং এ-কারণে যৌনতা এবং প্রজন্ম রক্ষার কাজই কোনো কোনো মানুষের জন্য মুখ্য কাজ হতে পারে এবং আমরা তাদের ছায়া প্রত্নশ্রেণীভুক্ত হিসেবে চিহ্নিত করব।

ঘ. সামাজিক
সামাজিক প্রত্নশ্রেণী হলো সমাজের নিয়মকানুন মেনে চলা মানুষ। এ ধরনের মানুষ সামাজিক নিয়মকানুনে বিশ্বাসী কিংবা বিশ্বাস করার ভান করে।

ঙ। এনিমা ও এনিমাস
প্রতিটি মানুষের মাঝেই তার বিপরীত লিঙ্গের কিছু চরিত্র থাকে। একজন পুরুষের মাঝে থাকে এনিমা বা নারী-চরিত্রের উপাদান, আবার একজন নারীর মাঝে থাকতে পারে এনিমাস বা পুরুষ- চরিত্রের উপাদান।

উপরে যে প্রত্নশ্রেণীগুলোর কথা বলা হলো, এগুলো ছাড়াও আরও কিছু প্রত্নশ্রেণী রয়েছে। বাবা, পরিবার, বীর, পশু, ঈশ্বর, অহং ইত্যাদি-কেন্দ্রিক প্রত্নশ্রেণীর উল্লেখ করেছেন ইয়ুং।

অহং, ব্যক্তিগত অচেতন ও যৌথ অচেতন কোনো নীতি মেনে ক্রিয়াশীল থাকে তা নিয়েও মন্তব্য করেন ইয়ুং। মনস্তত্ত্বের নীতি হিসেবে প্রথমেই আমাদের মানতে হবে ‘বৈপরীত্যের নীতি’, যেখানে যে কোনো মানবিক মানস্তাত্ত্বিক ক্রিয়ার প্রেক্ষাপটেই অবস্থান করে এক ধরনের বৈপরীত্য। আলোর চিন্তা করতে আমাদের বুঝতে হয় অন্ধকারকে, ভালো কাজ করতে হলে আমাদের মন্দ কাজ-সম্পর্কীয় ধারণা নিতে হবে। এমন সব যুগ্ম-বৈপরীত্যের ধারণা আমরা ইয়ুং-এর দর্শনে পাই। ইয়ুং আরও বলেন যে, মানুষের কামপ্রবৃত্তি অন্তর্গত বিষয়গুলোতেও বৈপরীত্য ভিত্তিক মনস্তাত্ত্বিক শক্তি সমান থাকে। ভালোবাসা/ঘৃণা, এই দুই বৈপরীত্যকে বিশ্লেষণ করলে ‘ভালোবাসা’ ও ‘ঘৃণা’-র মনস্তাত্ত্বিক শক্তি যে সমান, এ সত্যকে আমরা অস্বীকার করতে পারব না। ইয়ুং-এর দর্শনে উল্লেখিত যুগ্ম-বৈপরীত্যের সমমানের মনস্তাত্ত্বিক ক্রিয়াকে ‘সমমাত্রার নীতি’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। একজন মানুষ যখন মনস্তাত্ত্বিক বৈপরীত্যের কোনটাকে গ্রহণ করবে, এ বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত নিতে পারে না, তখন সৃষ্টি হয় এক ধরনের ‘এষণা’ বা কমপ্লেক্স। একজন মানুষের মনস্তাত্ত্বিক ক্রিয়া সময়কে গ্রাহ্য করে বিভিন্ন মাত্রায় অবস্থান করে। একজন তরুণ বা তরুণীর যৌন-বাসনা যে মাত্রায় থাকবে, ঠিক একই মাত্রার যৌন-বাসনা কোনো বৃদ্ধ বা বৃদ্ধার কাছে আশা করা যায় না। দেশকাল-কেন্দ্রিক মনস্তাত্ত্বিক এই বিবর্তনকে ইয়ুং ‘পতনের নীতি’ হিসেবে চিহ্নিত করেন। মনস্তত্ত্ববিদ কাল ইয়ুং মানুষের আত্মমুখী ও বহির্মুখী চরিত্রের বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন, যা প্রায়োগিক মনস্তত্ত্বের বিষয়। একজন মানুষ আত্মমুখী না বহির্মুখী হবে তা নির্ভর করে অহং, ব্যক্তিগত অচেতন ও যৌথ-অচেতনে বিভিন্ন ক্রিয়াকলাপের উপর এবং মনস্তাত্ত্বিক ক্রিয়া-কলাপের উপাদান হলো চিন্তা, সংবেদ, দূরদৃষ্টি ইত্যাদি। কার্ল ইয়ুং সামাজিক মানুষের মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করেছেন বিস্তারিতভাবে, তবে তাঁর সব প্রকল্প সমানভাবে সবার কাছে গ্রাহ্য হয়নি। কিন্তু এ কথাও সত্য যে, সামাজিক মানুষের যৌথ-অচেতনের বিশ্লেষণ ছাড়া মানুষকে ভালো করে চেনার অন্য কোনো উপায় নেই।



লেখক পরিচিতি
মঈন চৌধুরী
কবি। প্রবন্ধকার।
ঢাকায় থাকেন। 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন