দ্বিতীয় অধ্যায়-- (২)
যমজ দু’ভাই দেউড়ি থেকে বিদায় নিয়ে চলে যাবার পর আর ঘোড়ার খুরের আওয়াজ মিলিয়ে যাবার
পর স্কারলেট স্কারলেট অন্যমনস্কভাবে চেয়ারের কাছে ফিরে এল। ব্যথায় অসাড় হয়ে আছে মুখ,
ওদের কাছে মনের খবর লুকিয়ে রাখার জন্য, মুখটা হাসি হাসি করে রাখতে হচ্ছিল, ঠোঁট ফাঁক
করে হাসতে বেশ কষ্ট হচ্ছিল। পরিশ্রান্তভাবে চেয়ারে বসে পায়ের পা তুলে দিল। বুকে খুব
কষ্ট হচ্ছে, মনে হচ্ছে ফেটে যাবে। মনের মধ্যে এক অদ্ভুত শূন্যতা ছেয়ে গেছে, বরফের মত
ঠাণ্ডা হাত, বিপর্যয়ের আশঙ্কায় দম বন্ধ হয়ে আসছে। বিভ্রান্ত আর বিষণ্ণ লাগছে ওকে –
প্রশ্রয় পাওয়া শিশুর মতই বিহ্বল। বিনা বাধায়
সব কিছু পেয়ে অভ্যস্ত, জীবনে প্রথমবার বেদনাদায়ক এক সত্যের মুখোমুখি হতে হয়েছে।
অ্যাশলে নাকি মেলানি হ্যামিলটনকে বিয়ে করতে চলেছে!
এটা কিছুতেই সত্যি হতে পারে না! দু’ভাইয়ের কোথাও ভুল হচ্ছে। কথায় কথায় যেরকম মজা
করা ওদের স্বভাব, সেরকমই কিছু করেছে নিশ্চয়। অ্যাশলে কিছুতেই মেলানি ভালবাসতে পারে
না – কিছুতেই পারে না! ওই রোগাপাতলা, নেংটি ইঁদুরের মত ছোট্টখাট্টো চেহারা, কেউই ওকে
ভালবাসতে পারে না! রুগ্ন শিশুদের মত গড়ন, পানপাতার মত মুখ – একেবারে ছলাকলাহীন, একেবারে
সাদামাটা – বেশ অবজ্ঞার সঙ্গেই স্কারলেট ভাবল। অনেক মাসের মধ্যে অ্যাশলের সঙ্গে ওর দেখা হয়েছে বলেও
মনে হয় না। ওই গত বছর টুয়েল্ভ ওকসে ওরা যে
পার্টিটা দিয়েছিল, তারপর থেকে অ্যাশলে বড়জোর দু’বার অ্যাটলান্টা গেছে। উহুঁ, অ্যাশলে কিছুতেই মেলানির প্রেমে পড়ে থাকতে
পারে না, কারণ – এই ব্যাপারে স্কারলেটের কোনও ভুল হওয়ার কথাই নয়! কারণ অ্যাশলে তো ওর
প্রেমে পড়েছে! একমাত্র ওকেই – স্কারলেট ও’হারাকেই – অ্যাশলে ভালবাসে! স্কারলেট জানে!
হলের মেঝে কাঁপিয়ে ম্যামির থপ থপ করে আসার শব্দ শুনতে পেল স্কারলেট। তাড়াতাড়ি পায়ের
ওপর থেকে পা নামিয়ে, মুখটা স্বাভাবিক করার চেষ্টা করল। গোলমাল যে একটা হয়েছে সেটা ম্যামিকে
সন্দেহ করতে দেওয়া যাবে না। ম্যামি মনে করে যে ও’হারা পরিবারকে রক্ষা করার সমস্ত দায়িত্ব
ওর ওপরেই বর্তায়, এই পরিবারের সমস্ত গোপন কথার শরিকও ও, তাই কোনোক্রমে রহস্যের গন্ধ
পেয়ে গেলেই, শিকারি কুকুরের মত পেছনে পড়ে গিয়ে সেই রহস্য উদ্ধার করেই ছাড়বে। স্কারলেট
এটাও জানে যে সময় থাকতেই ওর কৌতুহল নিবৃত্ত না করতে পারলে, ব্যাপারটা মায়ের কানে তুলেই
ছাড়বে, আর তখন মায়ের কাছে সব কিছু খুলে বলা ছাড়া কিংবা খুব বিশ্বাসযোগ্য কোনও মিথ্যের
অবতারণা করা ছাড়া আর কোনও উপায়ই থাকবে না।
হল পেরিয়ে ম্যামি এসে পড়ল, বিশাল বপুর এক বৃদ্ধা, হাতির মত কুতকুতে চোখে তীক্ষ্ণ
দৃষ্টি। পালিশ করা কালো ত্বক, বিশুদ্ধ আফ্রিকান, জীবনের শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত ও’হারা
পরিবারের জন্য উৎসর্গীকৃত। এলেনের ভরসার জায়গা, আর ওঁর তিন মেয়ের হতাশার, আর গৃহের
অন্যান্য দাসদাসীদের ত্রাসের। ম্যামি কৃষ্ণাঙ্গ, কিন্তু ওর অহংকারবোধ প্রবল, বলা যায় ওর মালিকদের চেয়েও প্রবলতর। এলেনের মা, সোল্যাঁঞ্ঝ রোবিল্যার – যিনি ছিলেন সুন্দরী,
দাপুটে এবং উন্নাসিক প্রকৃতির একজন ফরাসী মহিলা, শালীনতায় পান থেকে চুন খসতে দেখলেই
যিনি নিজের ছেলেমেয়ে বা দাসদাসী কাউকেই জুতসই সাজা দিতে দ্বিধা করতেন না - তাঁরই তত্ত্বাবধানে ম্যামি বড় হয়ে উঠেছে। ও ছিল এলেনের ম্যামি। এলেনের বিয়ের পর ওঁরই সঙ্গেই
স্যাভান্না থেকে এই পশ্চিম দেশে চলে এসেছে। ম্যামি যাদের ভালবাসে, তাদের কড়া শাসনে
রাখে। আর যেহেতু স্কারলেটের জন্য ওর ভালবাসা
আর গর্ব খুব বেশিই ছিল, ওকে শাসনে রাখার ব্যাপারেও
বাস্তবিকই কোনো ছেদ পড়ত না।
“ভদ্দ্রনোকরা চলি গেলেন? তুমি সাপারে থাকতি বললে না কেনে, মিস স্কারলেট? আমি পোককে
দুটো বাড়তি থালা লাগানোর কথা বলে এলাম যে। এই তোমার আদত?”
“কী বলব, সারাক্ষণ ধরে যুদ্ধ যুদ্ধ শুনতে শুনতে কান ঝালাপালা হয়ে যাচ্ছিল, সাপার
অবধি সহ্য করা আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না, তার ওপরে আবার বাপি এসে মিস্টার লিঙ্কনকে নিয়ে
চেঁচামেচি জুড়ে দেবেন!”
“একটা খেতমজুর আর তোমার সহবতের মধ্যে কোনো ফারাক নেই! মিস এলেন আর আমি এত পই পই
করে শেখানোর পরেও! সে কী, তুমি এখানে শাল না জড়িয়েই বসে আছ! এদিকে সন্ধে নামল বলে।
কতবার তোমাকে বলেছি, কাঁধের ওপর কিছু না দিলে সন্ধের পর ঠাণ্ডা লেগে তোমার জ্বর এসে
যায়। অন্দরে চল, মিস স্কারলেট!”
ইচ্ছাকৃত বিরক্তির একটা ভাব টেনে এনে স্কারলেট ম্যামির দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিল।
ভাগ্য ভাল যে শাল নিয়ে উচাটন হয়ে থাকায় ওর মুখের দিকে ম্যামি নজর দেয়নি।
“না, আমি এখানে বসেই সূর্যাস্ত দেখতে চাই। কী সুন্দর লাগছে! তুমি দৌড়ে গিয়ে আমার
শালটা নিয়ে এসো না। লক্ষ্মী ম্যামি আমার, বাপি না ফেরা পর্যন্ত আমি এখানেই বসে থাকব।”
“গলা শুনে তো মনে হচ্ছে, ঠাণ্ডা তোমার লেগেই গেছে,” ম্যামির গলায় সন্দেহের সুর।
“না, লাগেনি,” স্কারলেট অধৈর্য গলায় বলল। “যাও, আমার শালটা নিয়ে এস।”
ম্যামি হেলতে দুলতে হলে ফিরে গেল। স্কারলেট ম্যামিকে সিঁড়ির গোড়ায় দাঁড়িয়ে ওপরতলার
পরিচারিকাকে হালকা গলায় ডাকতে শুনতে পেল।
“এই রোজা! মিস স্কারলেটের শালটা ওপর থেকে ছুঁড়ে দে তো।” তারপর একটু জোরে, “অপদার্থ নিগার! দরকারের সময় যদি
ওর টিকির দেখা পাওয়া যায়! আমাকেই ওপরে গিয়ে নিয়ে আসতে হবে!”
স্কারলেট সিঁড়িতে মচমচ শব্দ শুনতে পেল। নিঃশব্দে উঠে দাঁড়াল। ম্যামি ফিরে আসলেই
সহবত নিয়ে আবার বক্তৃতা শুরু করে দেবে। ওর মনে হল এই তুচ্ছ একটা ব্যাপার নিয়ে বকবক
শোনা একদম পোষাবে না, বিশেষ করে যখন ওর মন ভেঙ্গে খানখান হতে চলেছে। দাঁড়িয়ে একটু ইতস্তত
করতে লাগল, বুকের চাপ একটু না কমা পর্যন্ত কোথায় গিয়ে গা ঢাকা দেওয়া যায়, সহসা একটা
মতলব মাথায় এল, মনে একটা আশার আলো দেখতে পাচ্ছে। ওর বাপি ঘোড়ায় চেপে বিকেলে টুয়েল্ভ ওকসে – উইল্কসদের প্ল্যান্টেশনে – গেছেন,
ডিলসিকে কিনে নেবার প্রস্তাব নিয়ে। ডিলসি ওঁর ভ্যালে পোর্কের বউ। ডিলসি টুয়েল্ভ ওকসের
মুখ্য পরিচারিকা আর ধাত্রী। মাস ছয়েক আগে পোর্ক ওকে বিয়ে করার পর থেকে মালিকের পেছনে
দিন রাত লেগে আছে, যাতে করে ওরা দুজনে একই প্ল্যান্টেশনে এক সঙ্গে থাকতে পারে। আজ বিকেলে শেষ পর্যন্ত জেরাল্ডের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে
পড়ে, তাই ডিলসিকে কিনে নেবার প্রস্তাব নিয়ে গেছেন।
এই বিচ্ছিরি গুজবটা সত্যি কিনা, বাপি নিশ্চয়ই জানতে পারবেন, স্কারলেট মনে মনে ভাবল।
যদি আজ বিকেলে সত্যি সত্যি কিছু শুনতে না পেয়েও থাকেন, তাহলেও কিছু না কিছু তো লক্ষ্য
করেই থাকবেন, নিদেনপক্ষে উইল্কস পরিবারের হাবভাব বা ব্যস্ততা, কিছু একটা খেয়াল করবেনই।
সাপারের আগেই যদি ওঁর সঙ্গে একলা দেখা করতে পারি, তাহলে হয়ত খবরটা সত্যি কিনা সেটা
জেনে যাব – জেনে যাব এটা ওই ভাই দুটোর কোনো বজ্জাত রসিকতা কিনা।
জেরাল্ডের ফেরার সময় হয়েই এসেছে, যদি ওঁর সঙ্গে একলা দেখা করতে চায়, তাহলে কিছুই
না, কেবল যেখানে ড্রাইভওয়েটা রাস্তায় গিয়ে মিশেছে, সেখানে গিয়ে অপেক্ষা করা ছাড়া আর
কিছুই করার নেই। শব্দ না করে বারান্দার সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এল। চারপাশে সন্তর্পণে
নজর ঘুরিয়ে বুঝে নিল ম্যামি দোতালার জানলা থেকে ওর ওপর নজর রাখছে কিনা। ধবধবে সাদা পাগড়ি মাথায় পেঁচিয়ে রাখা চওড়া কালো কোনো
মুখ হাওয়া দুলতে থাকা পর্দার ফাঁক দিয়ে ওর দিকে ভুরু কোঁচ করে তাকিয়ে আছে বলে মনে হল
না, তখন সাহস করে ফুলকাটা স্কার্টটা দুহাত দিয়ে সামান্য তুলে নিয়ে সামনের পথ বেয়ে ড্রাইভওয়ের
দিকে তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে চলল, অবশ্য ওর ছোট ছোট রিবন লাগানো চটি পরে যতটা তাড়াতাড়ি
সম্ভব।
ড্রাইভওয়ের পাথরে বাঁধানো পথের দু’পাশের কালো কালো সেডার গাছের সারি মাথার ওপরে
একে অপরের দিকে খিলানের মত করে ঝুঁকে পড়ায় রাস্তাটা একটা অন্ধকার সুড়ঙ্গের চেহারা নিয়েছে।
সেডার গাছের গ্রন্থিল ডালপালার আড়ালে এসে দাঁড়াতেই, স্কারলেট বুঝে গেল এখন আর বাড়ি
থেকে ওর ওপর আর কেউ নজরদারি করতে পারবে না, তাই চলার গতি কমিয়ে ফেলল। রীতিমত হাঁপিয়ে উঠেছিল, কোমরের ফিতেটা এত আঁট করে
বাঁধা যে বেশি ছোটাছুটি করা বেশ কঠিন। তবু যত তাড়াতাড়ি পারল পা চালিয়ে চলল। একটু পরেই
ড্রাইভওয়ে পেরিয়ে বড় রাস্তায় এসে পড়ল, তবুও যতক্ষণ না একটা মোড় ঘুরে ওর আর বাড়ির মাঝখানে
বিশাল একটা গাছের ঝাড়ের আড়াল পেল, চলা বন্ধ করল না।
পরিশ্রান্ত হয়ে, জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিতে নিতে একটা গাছের গুঁড়ির ওপর বসে ও বাপির
প্রতীক্ষা করতে লাগল। ওঁর বাড়ি ফেরার সময় অনেকক্ষণ পেরিয়ে গেছে, কিন্তু ওঁর দেরি হওয়াতে
স্কারলেট খুশিই হল। শ্বাসপ্রশ্বাস স্বাভাবিক করে আনার জন্য আর চেহারায় শান্তভাব ফুটিয়ে
তোলার জন্য সময়টা কাজে লাগবে, যাতে ওঁর মনে কোনোরকম সন্দেহ চাগাড় দিয়ে না ওঠে। প্রতি
মুহূর্তে ঘোড়ার খুরের শব্দ আর টিলার ওপর দিয়ে বিদ্যুতগতিতে ঘোড়া ছুটিয়ে আনা বাপিকে
দেখতে পাওয়ার জন্য উন্মুখ হয়ে রইল। কিন্তু সময় বয়ে যেতে লাগল, ওঁর দেখা নেই। রাস্তার
ওপরে চোখ রাখল, ওঁকে দেখতে পাওয়ার জন্য, বুকের মধ্যে কষ্টটা আবার তোলপাড় করে উঠছে।
“না, না, এটা কিছুতেই সত্যি হতে পারে না!” মনে মনে ভাবল। “এখনও কেন আসছেন না উনি?”
“আঁকাবাঁকা পথটা ধরে ওর দৃষ্টি সুদূরে মিলিয়ে গেল। সকালে বৃষ্টি হওয়ার জন্য পথটা
এখন রক্তের মত লাল। মনে মনে দৃষ্টিটা টিলা পেরিয়ে অলস গতিতে বয়ে চলা ফ্লিন্ট নদীর ধারে
চলে গেল, তারপর জলাভূমি পেরিয়ে, পরের টিলাটা পেরিয়ে টুয়েল্ভ ওকসে চলে গেল, অ্যাশলে
যেখানে থাকে। ওর চেতনায় রাস্তা বলতে তো একটাই – যে রাস্তা ধরে অ্যাশলের কাছে পৌঁছে
যাওয়া যায়, পৌঁছে যাওয়া যায় সাদা থাম দেওয়া সুন্দর বাড়িটাতে, গ্রীক মন্দিরের মত টিলার
চূড়া আলো করে দাঁড়িয়ে আছে।
“ওহ্, অ্যাশলে! অ্যাশলে!” জপতে জপতে ওর হৃৎস্পন্দন দ্রুত হয়ে উঠল।
টার্লটন ভাইরা কথাটা ওকে বলার পর থেকে যে বিহ্বলতা আর বিপর্যয়ের আশঙ্কা ওর বুকের
ওপর চেপে বসেছিল সেটাকে জোর করে পেছনে সরিয়ে দিল, তার বদলে গত দু’বছর ধরে সযত্নে পালন
করা একটা বাসনা ওর মনকে আচ্ছন্ন করে ফেলল।
ব্যাপারটা একটু অদ্ভুতই মনে হয় ওর, অ্যাশলের পাশাপাশি এত বছর ধরে বড় হয়ে ওঠার সময়ও
ওর প্রতি তেমন আকর্ষণ কখনও অনুভব করেনি। ছোটবেলায়
অ্যাশলে কতবার এসেছে, আবার চলে গেছে, কিন্তু সেভাবে ওকে নিয়ে কখনো ভাবেনি। কিন্তু দু’বছর
আগে একদিন অ্যাশলে এল, একটা লম্বা সফর করে ইউরোপ থেকে সবে ফিরেছে, নেহাতই সৌজন্যমূলক
সাক্ষাৎ, কিন্তু স্কারলেট ওর প্রেমে পড়ে গেল। ঘটনাটা এতটাই সহজ আর সরল।
গাছে ছাওয়া লম্বা রাস্তা বেয়ে ঘোড়ায় চড়ে ও যখন আসছিল, স্কারলেট তখন বাড়ির সামনের
বারান্দায় বসে। পরনে ধূসর বনাতের পোশাক, কুঁচি
দেওয়া শার্টের ওপর মানানসই চওড়া কালো টাই। আজও ওই পোশাকটা স্কারলেটের চোখে ভাসে, ওর
জুতোজোড়া ঝকঝক করছিল, টাইয়ের পিনের ওপর মেডুসার মাথা খোদাই করা, চওড়া পানামা হ্যাট,
ওকে দেখতে পেয়েই মাথা থেকে খুলে হাতে চলে এসেছে। ঘোড়া থেকে নামল, লাগামটা একটা নিগ্রো
শিশুর হাতে ছুঁড়ে দিল, দাঁড়িয়ে ওর দিকে চেয়ে রইল স্বপ্নময় ধূসর চোখে, হাসল, সোনালি
চুলে সূর্যের আলো পড়ে রুপোলি শিরস্ত্রাণের মত দেখাচ্ছে। বলে উঠল, “তুমি কত বড় হয়ে গেছ, স্কারলেট!” তারপর হালকা
পায়ে সিঁড়ি বেয়ে বারান্দায় উঠে ওর হস্তচুম্বন করল। কী ভরাট সেই কণ্ঠস্বর! শুনতেই ওর
বুকের মাঝে গুরু গুরু করে উঠেছিল। যেন সেই প্রথমবার শুনছে ওই কণ্ঠস্বর, মন্থর, অনুনাদিত,
সুরেলা।
ঠিক সেই খণ্ডমুহূর্ত থেকেই স্কারলেট অ্যাশলেকে কামনা করে এসেছে, যুক্তিহীনভাবে
ওকে কামনা করেছে, ঠিক যেমনভাবে উপাদেয় খাদ্য কামনা করে, অশ্বারোহণ কামনা করে, আর পালকের
বিছানায় আরাম করে ঘুমোনোর কামনা করে থাকে।
তারপর গত দু’বছর ধরে ও যোগাযোগ রক্ষা করে গেছে, এই কাউন্টিতেই, বলড্যান্সের আসরে,
চড়ুইভাতিতে এবং আরও নানান উপলক্ষে, হয়ত টার্লটনদের যমজ ভাই বা কেড ক্যালভার্টের মত
অতটা ঘন ঘন নয়, তবে এমন একটা সপ্তাহও যায়নি যখন অ্যাশলে টারাতে অন্তত একবারের জন্যেও
দেখা করতে আসেনি।
একথা সত্যি যে ভালবাসার কথা ও প্রকাশ করে বলেনি কখনও, ওর স্বচ্ছ ধূসর চোখে সেই
দীপ্তিটাও কোনোদিন দেখতে পায়নি যেটা অন্যান্য পুরুষমানুষের চোখে স্কারলেট দেখে অভ্যস্ত।
তবুও – হ্যাঁ তবুও – ও নিঃসন্দেহে জানে যে অ্যাশলে ওকে ভালবাসে। এই ব্যাপারে ওর কিছুতেই
ভুল হতে পারে না। যুক্তিবোধের চেয়েও ধারালো নিজের সহজাত বুদ্ধি দিয়ে, অভিজ্ঞতালব্ধ
জ্ঞানের সাহায্যে স্কারলেট বুঝতে পারে যে অ্যাশলে ওকে ভালবাসে। কতবার এমন হয়েছে যখন
স্কারলেট ওর চোখে বিস্ময় দেখেছে, স্বপ্নময়তা আর দূরত্ব কেটে গিয়ে, কী আকুলতা, কী বিষণ্ণতা
নিয়ে স্কারলেটের দিকে চেয়ে থেকেছে, স্কারলেট বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছে। স্কারলেট
জানে যে অ্যাশলে ওকেই ভালবাসে। কিন্তু
কথাটা মুখ ফুটে বলেনি কেন? কারণটা স্কারলেট বুঝতে পারে। তবে অ্যাশলের এমন অনেক ব্যাপারই
আছে যা ও কিছুতেই বুঝতে পারে না।
আচার আচরণ সর্বদাই মার্জিত, কিন্তু কেমন যেন উদাসীন, নির্লিপ্ত। কী ভাবছে, কারও
সাধ্য নেই আঁচ করে ফেলা, স্কারলেট তো একেবারেই পারে না। পাড়াপড়শিদের একটা কিছু ভাবনা
মাথায় এলেই কালবিলম্ব না করে খোলাখুলি বলে ফেলে, কিন্তু সেই ব্যাপারে অ্যাশলের মন্ত্রগুপ্তি
রীতিমত বিরক্তিকর। এই কাউন্টিতে মনোরঞ্জনের জন্য যেসব ব্যবস্থা আছে, যেমন শিকার করা,
জুয়ো খেলা, নাচগান, রাজনীতি নিয়ে আলোচনা করা, এই সমস্ত ব্যাপারে অ্যাশলের দক্ষতা অন্য
কারোর তুলনায় কম নয়। আর অশ্বচালনায় কাউন্টির মধ্যে ও সর্বোত্তম। কিন্তু অন্যদের সঙ্গে
ওর তফাৎ হচ্ছে এই যে এই ধরণের স্ফূর্তি করাকেই চরম সার্থকতা বলে মনে করে না বা ওর জীবনের
লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য নয়। বই এবং সংগীতের প্রতি ওর প্রীতি আর কাব্য রচনা করবার উৎসাহ
– এই সব ব্যাপারে ও একমেবাদ্বিতীয়ম।
ওর মত গৌরবর্ণ সুপুরুষ একজন মানুষ কেন যে এমন মার্জিতভাবে উদাসীন হয়ে থাকে, ইউরোপ,
বই, সংগীত, কাব্য এসব নিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা ধরে কথা বলে স্কারলেটকে বিরক্ত করে দেয়
– অথচ তবুও কেন যে ওকেই সবার থেকে বেশি আকাঙ্খিত বলে মনে হয়? অ্যাশলের
সঙ্গে বাড়ির সামনের বারান্দায় ঘন্টার পর ঘন্টা আধো অন্ধকারে বসে গল্প করার পর স্কারলেট
কত রাত যে বিছানায় শুয়ে এপাশ ওপাশ করেছে, আর মনে মনে নিজেকে স্তোক দিয়েছে, পরের বার
ও ঠিক বিয়ের প্রস্তাব দেবে। কিন্তু এর পরে
অনেক পরের বার এসে চলে গেছে, হতাশ হতে হয়েছে, কেবল অ্যাশলের প্রতি আকর্ষণ আর আকুলতা
উত্তোরোত্তর বেড়েই গেছে।
স্কারলেট অ্যাশলেকে ভালবাসে, ওকে কামনা করে, কিন্তু ওকে বুঝতে পারে না। টারার ওপর
দিয়ে যে বাতাস বয়ে যায়, যে হলুদ নদীটা টারাকে প্রদক্ষিণ করে যায়, স্কারলেট তাদেরই মত
সোজাসাপটা, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত জটিল কিছু বুঝে ওঠার ক্ষমতা ওর হবে না। আর আজ এক
জটিলতার মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে, জীবনে প্রথমবার।
অ্যাশলে হল সেই ধরণের ব্যক্তি যে অবসর পেলে চিন্তা করতে ভালবাসে, কাজে লেগে পড়তে
নয়, রঙিন, উজ্জ্বল স্বপ্নের জাল বুনে যাবে, যার মধ্যে বাস্তবের কোনও ছোঁয়া থাকবে না।
অন্তঃস্থিত এক দুনিয়ায় ওর বিচরণ যা জর্জিয়ার চেয়েও সুন্দর, মাঝে মাঝে বাস্তবে ফিরে
আসতে হয়, নিতান্তই অনিচ্ছাভরে। মানুষকে ও পর্যবেক্ষণ করে, কিন্তু ভাল লাগা বা মন্দ
লাগার দ্বন্দ্বে নিজেকে জড়ায় না। জীবনকে ও লক্ষ্য করে, কিন্তু লক্ষ্য করে সুখী হওয়া
কী বিষণ্ণ হওয়ার বালাই নেই। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে এবং সেখানে নিজের জায়গাটুকু ও
মেনে নিয়েছে, কিন্তু তার থেকে পরম অস্বস্তিভরে মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে সংগীত, বই আর নিজের
শ্রেয়তর দুনিয়ায় ডুবে যেতে দেরি করেনি।
ওর মনোজগত স্কারলেটের এতটাই অচেনা হওয়া সত্ত্বেও, কেন যে অ্যাশলে ওকে মুগ্ধ করে
রেখেছে, ও জানে না। হয়ত অ্যাশলের রহস্যময়তা নিয়েই ওর এত কৌতুহল, যেমন বন্ধ একটা দরজা,
যার তালা কিংবা চাবি কোনোটাই নেই, সেটা নিয়ে কৌতুহল হয়। অ্যাশলেকে ঘিরে যা কিছু ব্যাপার
স্যাপার, স্কারলেটের কাছে যত দুর্বোধ্য লাগে, ততই স্কারলেটের অ্যাশলেকে বেশি করে ভাল
লাগে। অ্যাশলের উদ্ভট সংযমী পূর্বরাগের ধরণ দেখে ওকে নিজের করে পাবার জন্য স্কারলেটের
সংকল্প দৃঢ়তর হয়ে গেল। বিবাহের প্রস্তাব একদিন না একদিন ও দেবেই, এই ব্যাপারে স্কারলেটের
মনে কোনও সংশয় ছিল না। একে তো স্কারলেটের বয়সটা অল্প, তার ওপরে লাই পেয়ে মাথাটা এতই
বিগড়ে গেছে যে কোনো ব্যাপারেই হার মানতে শেখেনি। আর এখন বিনা মেঘে বজ্রপাত হতে চলেছে!
অ্যাশলে নাকি মেলানিকে বিয়ে করতে চলেছে! একথা সত্যি হতেই পারে না!
এই তো, গত সপ্তাহেই, সন্ধে নামার সময়, ফেয়ারহিল থেকে দুজনে বাড়ির দিকে ফিরছিল,
ও বলেছিল, “স্কারলেট, তোমাকে একটা জরুরি কথা বলার ছিল, কীভাবে বলব সেটাই ভেবে পাচ্ছি
না।”
স্কারলেট লজ্জা লজ্জা মুখ করে চোখ নামিয়ে নিয়েছিল, লাগামছাড়া আনন্দে বুকের ভেতর
হাতুড়ি পিটতে শুরু করল, ভাবছিল অবশেষে বিশেষ
আনন্দের সেই মুহূর্তটা এসেছে। তারপর অ্যাশলে
বলে উঠল, “না, এখন নয়! বাড়ির একেবারে কাছে এসে পড়েছি, এখন সময় হবে না। স্কারলেট, আমি
যে কী কাপুরুষ, কী বলব!” তারপর ঘোড়ার পেটে একটা গোত্তা মেরে টিলা পেরিয়ে টারার দিকে
ঘোড়া ছুটিয়ে স্কারলেটকে পৌঁছে দিল।
গাছের গুঁড়ির ওপর বসে স্কারলেটের সেই কথাগুলো মনে পড়তেই মনটা হালকা হয়ে এল। কিন্তু
তারপরেই মনে হল কথাগুলোর ভিন্ন একটা অর্থও হতে পারে, ভয়ঙ্কর কোনো অর্থ। হয়ত মেলানির
সঙ্গে ওর বাগদানের খবরটাই ওকে দিতে চেয়েছিল!
বাপি তো এবার ফিরে এলেই পারেন! এত উদ্বেগ নিয়ে আর থাকা যাচ্ছে না! আবার রাস্তার
দিকে ব্যাকুল চোখে তাকাল, আবারও হতাশ হল।
সূর্য এখন দিগন্তের নিচে চলে গেছে, দিকচক্রবালে লাল রঙের আভা ধীরে ধীরে গোলাপি
হয়ে উঠছে। মাথার ওপরের আকাশের আসমানি রঙ খুব ধীরে ধীরে রবিন পাখির ডিমের মত কোমল নীলচে
সবুজ রঙে বদলে যাচ্ছে। পল্লীর গোধূলির অপার্থিব নৈঃশব্দ চুপিচুপি নেমে এসে ওকে বেষ্টন
করে ফেলছে। ছায়াচ্ছন্ন অস্পষ্টতা সমগ্র পল্লী অঞ্চলকে গ্রাস করে ফেলছে। হলরেখা আর পথের উজ্জ্বল লাল মোহিনী রক্তবর্ণ হারিয়ে
ফেলে সাধারণ পিঙ্গল বর্ণ ধারণ করেছে। রাস্তার
ওপারের তৃণভূমিতে ঘোড়া, খচ্চর, আর গরু কঞ্চির বেড়ার ওপর মাথা রেখে শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে,
আস্তাবলে, গোশালায় নিয়ে যাবার আর সাপারের প্রত্যাশায়। তৃণভূমির খাতকে ঘিরে থাকা ঝোপের
ছায়ায় ওরা অস্বস্তি বোধ করছে, মানব সঙ্গ পেয়ে কৃতার্থ হয়ে স্কারলেটের দিকে তাকিয়ে কান
নেড়ে যাচ্ছে।
নদীর জলাভূমিতে দাঁড়িয়ে থাকা লম্বা পাইন গাছের সারি, সূর্যালোকে চোখ জুড়িয়ে যাওয়ার
মত সবুজ, এই আধা আলো আঁধারিতে, খড়িবর্ণ আকাশের পটভূমিতে মসীবর্ণ ধারণ করেছে, যেন কতগুলো
মহাকায় দানব ওদের পায়ের নিচের মন্থর হলুদ জলকে দুর্ভেদ্য প্রাচীরের মত ঘিরে দাঁড়িয়ে
আছে। নদী পেরিয়ে টিলার ওপরে উইল্কসদের গৃহের লম্বা সাদা চিমনিগুলো, ওদের বেড় দেওয়া
মোটা মোটা ওকগাছের অন্ধকারে ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে, শুধু দূর থেকে সাপারের জন্য জ্বালানো
আলোর ছোট ছোট বিন্দু জানিয়ে দিচ্ছে যে একটি গৃহ এখানে বিদ্যমান। বসন্তকালের কুয়াশাচ্ছন্ন মসৃণ উষ্ণতা স্কারলেটকে
আচ্ছন্ন করে ফেলল, সদ্য হল দেওয়া জমির সোঁদা গন্ধে আর বনানীর নবীন সৌরভে বাতাস ভরে
উঠেছে।
সূর্যাস্ত, বসন্তকাল আর বনানীর নবীন শ্যামল প্রাকৃতিক শোভা স্কারলেটের কাছে নতুন
কিছু নয়। শ্বাসপ্রশ্বাস নেওয়ার মতই, জলপান করার মতই, প্রকৃতির এই শোভন রূপ ওর পরিচিত
অভ্যেসেরই অংশ। সচেতনভাবে স্কারলেট সৌন্দর্য বলতে বোঝে কেবল নারীর মুখ, ঘোড়া, রেশমের
সুন্দর পোশাক এবং অন্যান্য স্পর্শযোগ্য বস্তুসমূহই। তবুও টারার এই বিস্তীর্ণ খেতে,
আলো আঁধারির যে শান্ত পরিবেশ রচিত হয়েছে , স্কারলেটের অস্থির মনকে কিঞ্চিৎ স্বস্তি
প্রদান করল। নিজের অজান্তেই এই ভূমিকে ও খুব ভালবেসে ফেলেছে। প্রার্থনার সময় প্রদীপের আলোয় মায়ের মুখটা যেমন ভাল
লাগে, ঠিক সেই রকমই।
এঁকেবেঁকে যাওয়া অচঞ্চল রাস্তায় এখন পর্যন্ত জেরাল্ডের দেখা নেই। আর দেরি হলে ম্যামি ঠিক ওর খোঁজে এখানে চলে আসবে
আর জোর করে বাড়িতে নিয়ে যাবে। আঁধার হয়ে আসা রাস্তায় চোখে মেলে বসে থাকতে থাকতেই স্কারলেটের
কানে তৃণভূমির ঢালের দিকে থেকে ঘোড়ার খুরের আওয়াজ কানে এল, লক্ষ্য করল ঘোড়া আর গরুর
পাল ভয়ে এদিক ওদিক ছিটকে সরে যাচ্ছে। জেরাল্ড ও’হারা বাড়ি ফিরছেন, তিরগতিতে।
টিলা পার হয়ে উনি আসছেন, ওঁর পিপের মত চওড়া, লম্বা পাওয়ালা শিকারি ঘোড়াকে রীতিমত
তিরের গতিতে ছুটিয়ে। দূর থেকে মনে হবে বিশাল একটা ঘোড়ার ওপর একজন বালক বসে আছে। ওঁর
শুভ্র কেশ পেছনে খাড়া হয়ে আছে, ঘোড়াটাকে জোরে হাঁক মেরে, চাবুক চালিয়ে আরও জোরে ছুটতে
বলছেন।
নিজের উদ্বেগ সত্ত্বেও স্কারলেট ওঁর দিকে তাকিয়ে রইল, মমতা আর গর্বের সঙ্গে, কারণ
জেরাল্ড একজন অতি উত্তম ঘোড়সওয়ার।
“পেটে কয়েক পেগ তরল পড়লেই ওঁর এই বেড়া টপকে আসার ইচ্ছেটা প্রবল হয়ে যায়, খুব অবাক
লাগে আমার,” মনে মনে ভাবল। “আর গত বছর ঠিক এই জায়গাতেই পড়ে গিয়ে হাঁটু ভাঙলেন। কিন্তু
উনি শুধরে যাওয়ার মানুষই নন। অথচ মা’কে কথাও দিয়েছিলেন আর কখনও ঝাঁপাবেন না।”
বাপিকে স্কারলেট একটুও ভয় পায় না, বরং নিজের বোনেদের তুলনায় ওঁকেই নিজের বেশি সমসাময়িক
বলে মনে করে। বেড়া টপকিয়ে আর সেটা নিজের বউয়ের
কাছে গোপন রেখে উনি বেশ একটা বালকোচিত গর্ব অনুভব করতেন আর এক ধরণের নিষিদ্ধ আনন্দ
পেতেন। ম্যামির চোখে ধুলো দিতে পারলে স্কারলেট যেরকম আত্মতৃপ্তি লাভ করত। ওঁর এই আনন্দের
সঙ্গে নিজের আত্মতৃপ্তির বেশ একটা মিল খুঁজে পাওয়া যায়।
বিশাল ঘোড়াটা বেড়ার কাছে পৌঁছল, তারপর নিজেকে একটু সামলে নিয়ে অনায়াস দক্ষতায় পাখির
মত আকাশে লাফ মারল, আর এদিকে ওর আরোহী প্রবল উৎসাহে হাওয়ায় চাবুক চালাতে চালাতে হাঁক
লাগাচ্ছেন। মাথার পেছনে ওঁর কোঁকড়া চুল মোচড় দিয়ে উঠছে। গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েকে
জেরাল্ড লক্ষ্যই করেননি। রাস্তার ওপর নেমে
আসা মাত্র লাগাম টেনে ধরে ঘোড়ার কাঁধে আদর করে হাত বোলাতে লাগলেন।
“কাউন্টিতে একজনও তোকে ছুঁতে পারবে না, হয়ত সারা রাজ্যেও তোর জুড়ি পাওয়া যাবে না,”
নিজের বাহনকে উদ্দেশ্য করে বললেন, উনচল্লিশ বছর আমেরিকায় কাটানোর পরেও কাউন্টি মীথের১
টান এখনও ওঁর কথায় স্পষ্ট। তাড়াতাড়ি এলোমেলো চুলগুলো বাগে আনলেন, লাট খাওয়া
শার্ট হাত বুলিয়ে মসৃণ করে নিলেন, টাইটা ছিটকে গিয়ে একটা কানে লটকে গেছিল, সেটা ঠিক
করলেন। স্কারলেট জানে তড়িঘড়ি করে এই সব করার পেছনে একটু পরেই স্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের ব্যপারটা কাজ করছে, নিপাট
ভদ্রলোক একজন প্রতিবেশীর সঙ্গে দেখা করে ফিরছেন এই রকম একটা ভাব দেখানো। এসব করে স্কারলেট
ওঁর সঙ্গে নিজের উদ্দেশ্য গোপন রেখে কথা বলার যে মওকা খুঁজছিল, সেটা উনি নিজেই করে
দিলেন।
সশব্দে হেসে উঠল। ঠিক যেমনটা চাইছিল, ওর হাসির শব্দে জেরাল্ড চমকে উঠলেন; তারপর
মেয়েকে লক্ষ্য করলেন; একটু অপ্রতিভ, কিন্তু লালচে মুখে একটা বেপরোয়া ভাব ফুটে উঠল।
হাঁটুটা এখনও পুরোপুরি স্বছন্দ হয়নি, তাই খুব সাবধানে ঘোড়া থেকে নামলেন, লাগামটা কাঁধের
ওপর ফেলে পা টেনে টেনে ওর দিকে এগিয়ে এলেন।
“তা বেশ, পুস্,” ওর গালে একটা টোকা দিয়ে বললেন, “তুমি আমার ওপর নজরদারি করতে লেগে
গেছ। গত সপ্তাহে তোমার বোন স্যুয়েলেন যেমন
করেছিল, তুমিও আমার নামে মায়ের কাছে লাগাবে, তাই না?”
গলার আওয়াজটা ঘড়ঘড়ে, বিরক্ত, কিন্তু তার মধ্যে একটা আবেদনের রেশও আছে। দাঁত আর
জিভ দিয়ে মজার একটা আওয়াজ বের করে স্কারলেট একটু ওঁর পেছনে লাগল, তারপর কাছে গিয়ে টাইটা
সোজা করে দিল। ওঁর নিঃশ্বাসে ব্যুরবোঁ হুইস্কির তীব্র গন্ধের সঙ্গে পুদিনার হালকা সৌরভ।
এছাড়াও রয়েছে তামাক চিবোনোর গন্ধ, পালিশ করা চামড়ার গন্ধ আর ঘোড়ার গায়ের গন্ধ – এই
গন্ধের মিশেলটার মধ্যেই স্কারলেট ওর বাপিকে খুঁজে পায়, এবং এই গন্ধটা যখন অন্য কোনো
পুরুষমানুষের কাছ থেকে পায়, তখন স্বভাবতই ওর ভাল লাগে।
“না, বাপি, আমি স্যুয়েলেনের মত চুগলিবাজ নই,” স্কারলেট ওঁকে আশ্বস্ত করল। একটু
সরে এসে বিজ্ঞের মত মুখ করে পুনর্বিন্যাসের পর ওঁর পরিধানটা ঠিকঠাক দেখাচ্ছে কিনা বোঝার
চেষ্টা করল।
জেরাল্ড ছোট্টখাট্টো মানুষ, পাঁচ ফুটের থেকে সামান্য বেশি লম্বা, কিন্তু ওঁর ভুড়ি
এমন দশাসই আর কাঁধটা এতই চওড়া, যে বসে থাকা অবস্থায় অপরিচিত মানুষরা ওঁকে বিশালদেহী
বলেই মনে করতেন। ওঁর পেশল ধড়টা খাটো কিন্তু
বলিষ্ঠ দুটো পায়ের ওপর বসানো। পা দুখানা ঢাকা থাকত বাজারের সব চেয়ে মহার্ঘ চামড়ার বুটজোড়ায়,
ঘোড়ায় সওয়ারি হওয়ার পর সেই দু’পা দু’পাশে বালকোচিত আত্মগর্বী ভঙ্গিতে ঝুলে থাকত। ছোটখাটো মানুষরা আত্মগর্বী হলে একটু হাস্যকরই দেখায়;
মোরগ খর্বকায় হলেও মুরগির পালে সেটার প্রতিপত্তি
কম হয় না, জেরাল্ডের ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা সেরকমই। জেরাল্ড ও’হারাকে খর্বকায় হাস্যকর
মানুষ বলবার হঠকারিতা কেউই করবেন না।
ওঁর বয়স ষাট বছর, ওঁর মাথার ঢেউ খেলানো কোঁকড়া চুল দুধের মত সাদা, কিন্তু ওঁর বুদ্ধিদীপ্ত
মুখে বলিরেখার চিহ্নও নেই, আর তীক্ষ্ণ নীল চোখজোড়া তারুণ্যে উজ্জ্বল, দেখে মনে হয় যে
পোকার খেলায় কতগুলো তাস টানতে হবে, এর চেয়ে জটিল কোনো সমস্যা নিয়ে মাথাই ঘামাননি কোনোদিন।
জন্মুভূমি আয়ার্ল্যান্ড বহুদিন ছেড়ে এসেছেন, তবুও ওঁর হাবে ভাবে, চেহারায় রেশটা থেকে
গেছে – গোলগাল চেহারা, টকটকে রঙ, চাপা নাক, চওড়া মুখ আর বেশ রাগী।
মুখটা রাগী রাগী হলে কী হয়, জেরাল্ড ও’হারার মনটা ছিল কুসুমের মত কোমল। বকুনি খেয়ে
কোনো চাকর যদি মনমরা হয়ে থাকত, সেটা উনি সহ্য করতে পারতেন না, ওর বকুনি খাবার যথেষ্ট
কারণ থাকলেও। কোথাও একটা বেড়ালের বাচ্চা মিউ মিউ করলে বা কোনো শিশুর কান্না শুনলেও
উনি বিচলিত হয়ে পড়তেন। তবে এই দুর্বলতা ধরা পড়ে যাওয়া নিয়ে ওঁর খুব ভয় ছিল। যারা দেখা
করতে আসত তারা যে পাঁচ মিনিটের মধ্যেই ওর কোমল হৃদয়ের হদিশ পেয়ে যায় সেটা উনি বুঝতে
পারতেন না; বুঝতে পারলে হয়ত মানে লাগত, কারণ ওঁর ধারণা যে ওঁর ধমকচমকে ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে
সবাই ওঁর হুকুম তামিল করে। কিন্তু এই প্ল্যান্টেশনে মাত্র একজনের মৃদুস্বরে দেওয়া হুকুম
সবাই মান্য করে চলত, আর তিনি হলেন ওঁরই পত্নী, এলেন, আর সেই কথাটা কোনোদিনই জেরাল্ড
জানতেও পারেননি। অবশ্য ওঁর জানতে না পারার পেছনে একমাত্র কারণ হল এলেন থেকে শুরু করে
একজন সাধারণ খেতমজুর পর্যন্ত প্রত্যেকের ওঁকে জানতে না দেওয়ার একটা সহৃদয় চক্রান্ত।
উনি যা বলেন সেটাই আইন, এই বিশ্বাসটা যেন ওঁর ভেঙ্গে না যায়।
অন্যদের তুলনায় স্কারলেট ওঁর মেজাজ আর তর্জনগর্জনের কমই তোয়াক্কা করত। ও বাপির
জ্যেষ্ঠ সন্তান, তাছাড়া জেরাল্ড এখন বুঝে গিয়েছেন, যে তিনজন পুত্রসন্তান পারিবারিক
সমাধিক্ষেত্রে ঘুমিয়ে আছে, তাদের ছাড়া আর কোনও পুত্রসন্তান লাভের সম্ভাবনা তাঁর নেই,
ফলে ক্রমশ স্কারলেটকে উনি একজন পুরুষমানুষ ভেবে নিয়েই কথাবার্তা বলতে অভ্যস্ত হয়ে পড়লেন।
স্কারলেট এতে খুব আনন্দ পেত। ওর ছোট বোনদের চেয়ে হাবে ভাবে বাপির সঙ্গে ওর মিলই বেশি
ছিল – ক্যারীন, জন্মের পর যার নাম রাখা হয়েছিল ক্যারোলাইন আইরিন – হল নারীসুলভ কমনীয়
আর স্বপ্নবিলাসি – আর স্যুয়েলেন – জন্মের পর যার নাম রাখা হয়েছিল সুস্যান এলিনর – একজন
মার্জিত রুচির অভিজাত মেয়ে হিসেবে নিজেকে জাহির করে গর্ববোধ করে।
তাছাড়া, স্কারলেট আর ওর পিতৃদেব এক পারস্পরিক অপলাপ চুক্তিতে আবদ্ধ ছিলেন। আধ মাইল
পথ হেঁটে না গিয়ে স্কারলেট বেড়া টপকে যাতায়াত করত বা প্রণোয়ীদের সঙ্গে অনেক রাত পর্যন্ত
আড্ডা মারত, জেরাল্ডের কাছে ধরা পড়ে গেলে উনি ওকে খুব বকাবকি করতেন ঠিকই, তবে এলেন
কিংবা ম্যামিকে বলে দিতেন না। অপর পক্ষে, স্ত্রীর কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিজ্ঞা করা
সত্ত্বেও জেরাল্ড যখন ঘোড়ায় চড়ে বেড়া টপকাতেন বা জুয়ো খেলায় ঠিক কত টাকা খুইয়েছেন
(যেটা কাউন্টির কথা চালাচালি থেকে জেনে ফেলাটা শক্ত নয়), সেসব যখন স্কারলেট ধরে ফেলত,
খবরটা সাপারের টেবিলে বসে স্কারলেট স্যুয়েলেনের মত বোকা সেজে রাষ্ট্র করে দিত না। স্কারলেট আর বাপি দুজনেই একে অপরকে আশ্বস্ত করতেন
এই বলে যে এসব কথা এলেনের কানে তুললে উনি মিছিমিছি কষ্ট পাবেন, আর এমন কোমলপ্রাণ মহিলাকে
দুঃখ দেওয়াটা মোটেও ঠিক হবে না।
ম্লান হয়ে আসা আলোয় স্কারলেট বাপিকে দেখতে লাগল, আসল কারণটা না বুঝতে পারলেও এটা
বুঝতে অসুবিধে হল না যে ওঁর সান্নিধ্য পেয়ে বেশ স্বস্তি বোধ করছে। ওঁর মধ্যে খুব প্রাণবন্ত কিন্তু খুব মেঠো, খুব স্থুল
একটা আবেদন আছে যেটা ওর ভাল লাগছে। বিশ্লেষণ করবার ক্ষমতা বিশেষ না থাকায়, ও বুঝতেই
পারল না এইসব গুণাবলী কিছু পরিমাণে ওর মধ্যেও বর্তমান, এলেন আর ম্যামির ষোলো বছরের
সযত্ন প্রয়াস সত্ত্বেও এগুলো মুছে ফেলা যায়নি।
“এখন তোমাকে বেশ ঠিকঠাক লাগছে,” ও বলল, “মনে হয় না এখন কেউ তোমার চালাকি ধরে ফেলতে
পারবে, অবশ্য যদি না তুমি নিজেই সেগুলো নিয়ে বড়াই করতে আরম্ভ কর। তবে আমার কী মনে হয়
জানো, গত বছর যখন ওই বেড়াটাই টপকাতে গিয়ে তুমি হাঁটু ভেঙ্গে ফেললে – ”
“আহা, কী আনন্দের কথা! আমার নিজের মেয়ে আমাকে জ্ঞান দিচ্ছে, আমি কোথায় ঝাঁপাব বা
ঝাঁপাব না!” ওর গালে আরেকবার টোকা মেরে, উনি গলা ফাটিয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন। “ঘাড়টা আমার,
বুঝেছ? তাছাড়া, মেয়ে, গায়ে শাল না জড়িয়ে এখানে এসে তুমি কী করছ শুনি?”
অপ্রীতিকর প্রসঙ্গ এড়িয়ে যাবার পুরোনো কৌশল নিতে দেখে, স্কারলেট ওঁর বাহুতে নিজের
বাহু গলিয়ে দিয়ে বলল, “তোমারই অপেক্ষা করছিলাম, জানতাম না যে তোমার এত দেরি হবে। জানার
কৌতুহল হচ্ছিল, তুমি ডিলসিকে কিনে নিলে কিনা।”
“কিনেছি তো বটেই, কিন্তু দামটা আমাকে পথে বসিয়ে দিয়েছে। ওকেও কিনে নিয়েছি আর ওর
ওই বাচ্চা মেয়েটা – প্রিসি – ওকেও। জন উইল্কস তো প্রায় এমনি এমনিই দিয়ে দিচ্ছিলেন,
কিন্তু জেরাল্ড ও’হারা লেনদেন করতে গিয়ে বন্ধুত্বের সুযোগ নিয়েছে এমন কথা কাউকে বলতে
দেব না। দুজন মিলে আমি ওঁকে তিন হাজার নিইয়ে
ছেড়েছি।”
“বল কী বাপি, তিন হাজার! আর প্রিসিকে তোমার কেনবার দরকারই ছিল না!”
“কী দিনকাল পড়ল রে বাবা, আমার মেয়েরা কিনা আমার দোষগুণ বিচার করতে বসবে!” স্বভাবসিদ্ধ
ভঙ্গিতে চেঁচিয়ে উঠলেন জেরাল্ড। “প্রিসি একরত্তি একটা মেয়ে, তাই – ”
“চিনি ওকে। খুব চালু আর বেকুব মাল,” স্কারলেট শান্ত গলায় জবাব দিল, ওঁর চিল্লাচিল্লিকে
পাত্তাই দিল না। “আর ওকে কিনে নেওয়ার একমাত্র কারণ হল, ডিলসি তোমাকে বলেছিল ওকে কিনে
নিতে।”
জেরাল্ডের মুখ বিমর্ষ হয়ে উঠল, খুব অপ্রস্তুতও হলেন, সদাশয়তা দেখিয়ে ধরা পড়ে গেলে
যেরকম হন, স্কারলেট ওঁর সরল হাবভাব দেখে মজা পেয়ে জোরে হেসে উঠল।
“যদি কিনেই থাকি তো হয়েছেটা কী? বাচ্চাটার জন্য মনমরা হয়ে থাকলে ডিলসিকে কিনে কোন
লাভটা হত শুনি? তবে ঠিক করে নিয়েছি, ভবিষ্যতে এখানকার কোনো ডার্কিকে অন্যত্র বিয়ে করতে
দেব না। বেশ খরচসাপেক্ষ ব্যাপার। এসো, পুস্, আমরা এগোই, সাপারের দেরি হয়ে যাচ্ছে।”
অন্ধকারটা ঘনিয়ে এসেছে আরও, দিনান্তের শেষ সবুজাভ আমেজটা আকাশ থেকে মিলিয়ে গেছে,
বসন্তের স্নিগ্ধভাবটা কেটে গিয়ে হালকা শীতল ভাব। কিন্তু স্কারলেট আলসেমি করতে লাগল, অ্যাশলের প্রসঙ্গটা
কীভাবে তোলা যায় যাতে জেরাল্ড ওর অভিপ্রায় কোনোভাবেই আঁচ না করতে পারে, মনে মনে সেটা
নিয়েই তোলপাড় করতে লাগল। কাজটা শক্ত, কারণ স্কারলেটের মধ্যে সুক্ষ্মতা জিনিসটার বড়ই
অভাব; আর ওর সঙ্গে জেরাল্ডের মানসিকতার এত মিল যে ওর দুর্বল অজুহাতগুলো উনি সহজেই ধরে ফেলেন। আর তারপর সটান মুখের ওপরেই বলে দেন।
“টুয়েল্ভ ওকসে সকলে আছেন কেমন?”
“ঠিকই আছেন। কেড ক্যালভার্টও ছিল ওখানে, ডিলসির ব্যাপারটা মিটে যাবার পর সকলে মিলে
গ্যালারিতে বসলাম, বেশ কয়েক পেগ তাড়িও খেলাম। কেড সদ্য অ্যাটলান্টা থেকে ফিরেছে, খুব
অস্থির পরিস্থিতি, ওখানে সকলে একসঙ্গে বসে যুদ্ধ লেগে যাওয়া আর – ”
স্কারলেট প্রমাদ গুনল। একবার যদি যুদ্ধ আর বিচ্ছিন্নতা নিয়ে জেরাল্ড কথা বলতে আরম্ভ
করেন তাহলে ঘন্টার পর ঘন্টা ধরে সেই কথাই চলতে থাকবে। বাধা দিয়ে স্কারলেট কথাবার্তা
অন্য দিকে নেওয়ার চেষ্টা করল।
“কালকের বার্বেকিউয়ের ব্যাপারে কোনো কথা বলেননি ওঁরা?”
“হ্যাঁ, বলেছিলেন তো। কথায় কথায় ভুলে গেছিলাম। মিস – কী যেন নামটা – খুব মিষ্টি
মেয়েটা, গত বছর এখানে এসেছিল – তুমি চেনো ওকে, অ্যাশলের কাজ়িন – হ্যাঁ, হ্যাঁ,
মিস মেলানি হ্যামিলটন – নামটা মনে পড়েছে – ও আর ওর ভাই চার্লস অ্যাটলান্টা থেকে এসে
গিয়েছে, আর – ”
“ও, তাহলে সত্যিই ও এসেছে?”
“সত্যি এসেছে, আর কী লক্ষ্মী মেয়ে, নিজেকে জাহির করার চেষ্টাই নেই, ঠিক মেয়েদের
যেমন হওয়া উচিত। চল, চল, সোনা, আর দেরি করলে চলবে না। তোমার মা আমাদের খুঁজতে চলে আসবেন।”
খবরটা শুনে স্কারলেটের হৃদয় বিদীর্ণ হয়ে গেল। একটা ক্ষীণ আশা মনে ছিল যে একটা কিছু
বাধা পড়বেই যার ফলে নিজের জায়গা অ্যাটলান্টা ছেড়ে মেলানি আসতে পারবে না। তার ওপরে নিজের
বাবাও ওর মিষ্টি, শান্ত স্বভাবের তারিফ করে বসলেন, একেবারে ওর বিপরীত চরিত্র – স্কারলেটের
খোলাখুলি কথা বলা ছাড়া কোনো উপায়ই রইল না।
“ওখানে অ্যাশলেও ছিল?”
“ছিল।” জেরাল্ড মেয়ের হাত ছেড়ে দিয়ে ওর দিকে ঘুরে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ওকে দেখতে লাগলেন।
“ঠিক এটাই জানার জন্য যদি তুমি এখানে আমার অপেক্ষা করে থাক, তাহলে সেকথা ধানাইপানাই
না করে সোজাসুজি বললেই পারতে না?”
কী বলবে স্কারলেট কিছু ভেবে উঠতে পারল না। বুঝতে পারছে বেদনায় ওর মুখ ক্রমশই লাল
হয়ে উঠছে।
“কী হল, কিছু বল।”
তারপরেও স্কারলেট চুপ করেই রইল। ইচ্ছে করছিল বাপিকে যদি ঝাঁকুনি দিয়ে চুপ করে থাকতে
বলা যেত।
“হ্যাঁ, ও ছিল ওখানে, আর খুব সৌজন্য দেখিয়ে তোমার কথা জিগ্যেস করেছিল, ওর বোনেরাও
করেছিল। সবাই আশা করছিল, কালকের বারবেকিউতে তুমি অবশ্যই যাবে। আমি কথা দিয়েছি যে তুমি
যাবেই,” খুব চতুরভাবে কথাটা বললেন। “হ্যাঁ, এবার বল তো মেয়ে, তোমার আর অ্যাশলের মধ্যে
ব্যাপারটা কী?”
“কী আবার, কিছুই না,” কথা না বাড়িয়ে স্কারলেট বলল, তারপর ওঁর হাত ধরে টান দিল।
“এবার যেতে হবে, বাপি।”
“আচ্ছা! এবার যত যাবার তাড়া, তোমার?” জেরাল্ডের কথায় সন্দেহের আভাস। “কিন্তু এই
আমি এখানে দাঁড়ালাম, যতক্ষণ না তোমার মতলবটা পরিষ্কার হচ্ছে, আমি এক পা-ও এগোবো না।
এখন আমার মনে হচ্ছে, ইদানিং তোমার হাবভাব কেমন কেমন যেন লাগছিল। ও কি তোমাকে নিয়ে কিছু
খেলা খেলছে? তোমাকে বিয়ের প্রস্তাব-টস্তাব
দিয়েছে নাকি?”
“না,” কোনমতে কথাটা বলল।
“আর দেবেও না,” জেরাল্ড বললেন।
স্কারলেট দপ্ করে জ্বলে উঠল, কিন্তু জেরাল্ড হাত নেড়ে ওকে শান্ত হতে বললেন।
“চুপ করে থাক, মিস! কথাটা আজ বিকেলে খোদ জন উইল্কসের মুখ থেকেই আমি শুনেছি যে অ্যাশলে
মিস মেলানিকে বিয়ে করবে। খবরটা কাল ঘোষণা করা হবে।”
জেরাল্ডের বাহু থেকে স্কারলেটের হাত খসে বড়ল। খবরটা তাহলে সত্যি!
একটা হিংস্র প্রাণীর দংশনের মত বেদনাটা ওর হৃদয়কে ফালা ফালা করে ফেলল। তার মধ্যেই
খেয়াল করল বাপি ওর দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছেন, করুণা মেশানো অসহায় দৃষ্টি, এমন একটা
প্রশ্নের মুখে পড়েছেন, যার উত্তর ওঁর জানা নেই। স্কারলেটকে উনি স্নেহ করেন, কিন্তু ও যখন ওর ছেলেমানুষী
সমস্যাগুলো ওঁর সামনে সমাধানের আশায় এনে হাজির করে, তখন উনি কী করবেন ভেবে পান না।
এলেন তো সব প্রশ্নের উত্তর জানেন। স্কারলেটের উচিত ওর সমস্যাগুলো নিয়ে ওঁর কাছেই যাওয়া।
“তুমি কি নিজেকে – আমাদের সবাইকে – সবার চোখে হাস্যাস্পদ করে তুলতে চাও?” হুঙ্কার
দিয়ে বললেন, যথারীতি উত্তেজনার চোটে ওঁর গলা চড়তে লাগল। “এমন একজনের পেছনে ঘুর ঘুর
করছ তুমি, যে তোমাকে ভালই বাসে না, অথচ চাইলে কাউন্টির যে কোনও ছোকরাকেই তুমি পেতে
পারতে?”
রাগে আর অপমানে চেপে রাখা বেদনার কিছুটা ফেটে বেরোল।
“আমি মোটেও ওর পেছনে ঘুর ঘুর করিনি। আমি – আমি শুধু অবাক হয়েছি।”
“মিথ্যে বলছ তুমি!” জেরাল্ড বলে উঠলেন, তারপর ওর বেদনাবিধুর মুখটা দেখে ব্যথিত
হয়ে নরম স্বরে যোগ করলেন, “আমার খারাপ লাগছে, মামণি। তবে তুমি তো এখনও ছেলেমানুষ, আর
ভাল ছেলের অভাবও নেই।”
“তোমাকে বিয়ে করার সময়, মায়ের বয়স ছিল মাত্র পনেরো বছর, আর আমি এখন ষোলো,” স্কারলেট
ধরা গলায় বলল।
“তোমার মায়ের কথা আলাদা,” জেরাল্ড বললেন। “উনি কখনোই তোমার মত অস্থিরমতি ছিলেন
না। এবার একটু হেসে ফেল দেখি, সোনা। সামনের সপ্তাহেই আমি তোমাকে চার্লস্টনে তোমার ইউল্যালি
মাসির কাছে নিয়ে যাব, ফোর্ট সামটার নিয়ে ওখানে যেরকম মাতামাতি চলছে, এক সপ্তাহের মধ্যেই
তুমি অ্যাশলের কথা ভুলে যাবে।”
“ছেলেমানুষ মনে করছেন আমাকে,” মনে মনে ভাবল স্কারলেট, কষ্ট আর আবেগে ওর গলা ধরে
আসছে, “যেন সামনে একটা নতুন খেলনা দোলালেই আমি সব ভুলে যাব!”
“নাও, এবার কচকচি বন্ধ কর,” জেরাল্ড ওকে সাবধান করলেন। “তোমার ঘটে যদি এতটুকু বুদ্ধি
থাকত, তুমি অনেকদিন আগেই স্টুয়ার্ট বা ব্রেন্ট টার্লটনকে বিয়ে করে ফেলতে। ব্যাপারটা
একটু ভেবে দেখ, মেয়ে, যমজ ভাইদের একজনকে বিয়ে করে নাও, তাহলে প্ল্যান্টেশনগুলো একসাথে
চালানো যাবে আর জিম টার্লটন আর আমি, দুজনে মিলে
তোমাদের জন্য সুন্দর একটা বাড়ি বানিয়ে দেব, ঠিক যেখানে দুটো প্ল্যান্টেশন এসে
মিলেছে, পাইন বনের পাশে আর – ”
“আমাকে বাচ্চাদের মত ভোলানো বন্ধ করবে কি?” চেঁচিয়ে উঠল স্কারলেট। “চার্লস্টনে
আমি যেতে চাই না, না আমার বাড়ি চাই, না আমি যমজ ভাইদের কারোকে বিয়ে করতে চাই। আমি একমাত্র
– ” নিজেকে সামলে নিল, কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে।
জেরাল্ডের কণ্ঠস্বর অস্বাভাবিক রকমের শান্ত, কথা বলছেন খুব ধীরে ধীরে, প্রতিটা
কথা যেন মনের গভীর থেকে উঠে আসছে, যেটা ওঁর স্বভাবের সম্পূর্ণ বিপরীত।
“তুমি একমাত্র অ্যাশলেকেই চাও, কিন্তু ওকে তুমি পাবে না। তোমাকে যদি ও বিয়ে করতে
রাজিও হত, মনে সংশয় নিয়েই রাজি হত। ভেবেই বলছি, আমার আর জন উইল্কসের মধ্যে গভীর বন্ধুত্বের
কথা স্বীকার করেও বলছি।” মেয়ের চোখে বিস্ময় লক্ষ্য করলেন, তারপর বলে চললেন, “আমি চাই
আমার মেয়ে সুখী হোক, কিন্তু ওর সঙ্গে তুমি সুখী হতে পারবে না।”
“সুখী হব! নিশ্চয়ই সুখী হব!”
“সুখী তুমি হবে না, মা। দুজনের মানসিকতার মিল থাকলেই কেবল বিয়ে করে মানুষ সুখী
হতে পারে।”
সহসা স্কারলেটের বেহায়ার মত চেঁচিয়ে উঠে বলতে ইচ্ছে করল, “কিন্তু তোমরা তো সুখী;
তোমার আর মায়ের মানসিকতা তো এক নয়!” কিন্তু কিছু না বলে চুপ করে রইল, বললে হয়ত বাপির
কাছে বেহায়াপনার জন্য কানমলা খেতে হবে।
“আমরা আর উইল্কসরা একে অপরের থেকে আলাদা,” উনি মন্থরভাবে কথা হাতড়ে হাতড়ে বলে চললেন।
“আমাদের প্রতিবেশীদের থেকেও ওঁরা আলাদা – আমার জানা যে কোনও পরিবারের থেকেই ওঁরা আলাদা।
ওঁরা অদ্ভুত ধরণের মানুষ, আর আমার মনে হয় ওঁদের
নিজেদের মধ্যেই বিয়ে হওয়া ভাল, তাহলে ওঁদের অদ্ভুত ভাবনাচিন্তা নিজেদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ
থেকে যাবে।”
“কেন, বাপি, অ্যাশলে মোটেই – ”
“মুখটা একটু বন্ধ রাখ, সোনা! ছেলেটার বিরুদ্ধে আমার কোনো অভিযোগ নেই, বরং আমি ওকে
পছন্দই করি। আর আমি যখন ‘অদ্ভুত’ কথাটা বলছি, আমি ‘খ্যাপা’ বলতে চাইছি না। ও ক্যালভার্টদের
মত খ্যাপা নয় যে একটা ঘোড়ার জন্য সর্বস্ব জুয়ায় বাজি রাখতে পারে, বা টার্লটনদের মতও
নয় যাদের বংশে একটা কি দুটো মাতাল বেরিয়ে যাওয়া আশ্চর্যের কিছু নয়, বা ফোনটেনদের মত
রগচটাও নয় যে পান থেকে চুন খসলেই মানুষ খুন করে ফেলবে। এই ধরণের খ্যাপামি সহজেই বুঝে
ফেলা যায়, ভগবান না করুন, জেরাল্ড ও’হারার মধ্যেও হয়ত এই ধরণের খ্যাপামি পাওয়া যেতে
পারে! এটাও আমি বলছি না যে অ্যাশলে তোমাকে
বিয়ে করেও অন্য কোনও মেয়ের সঙ্গে পালিয়ে যাবে বা তোমার গায়ে হাত তুলবে। যদি সেরকম কিছু করত, তাহলেই হয়ত বেশি ভাল হত, কারণ
তাহলে তুমি ওর স্বভাবটা বুঝতে পারতে। কিন্তু ও অদ্ভুত অন্য কারণে, আর সেই জন্যই ওকে
তোমার বোঝা অসম্ভব। ওকে আমি পছন্দ করি, কিন্তু ওর কথাবার্তার মাথামুণ্ডু আমি কিছুই
বুঝতে পারি না। এবার সত্যি করে বল তো মা, তুমি বই, কবিতা, সংগীত আর তৈলচিত্র নিয়ে ওর
যে পাগলামি, তোমার কি কিছু মাথায় ঢোকে?”
“ও বাপি!” স্কারলেট অধৈর্য গলায় বলে উঠল, “ওর সঙ্গে বিয়ে হলে আমি সব বদলে দিতাম!”
“ও, তাই বুঝি, সব বদলে দিতে?” তীক্ষ্ণ দৃষ্টিবাণ হেনে জেরাল্ড খিটখিটে গলায় বললেন।
“তাহলে মনুষ্যচরিত্র সম্বন্ধে তোমার সামান্যতম জ্ঞানটুকুও নেই, অ্যাশলের কথা নাহয় ছেড়েই
দিলাম! কোনো স্ত্রীই তার স্বামীকে আজ পর্যন্ত
একফোঁটা বদলাতে পারেনি, এই কথাটা ভুলে যেও না! আর একজন উইল্কসকে বদলে দেওয়া – ভগবানেরও
অসাধ্য সেই কাজ, কন্যে! ওদের পুরো পরিবারটাই ওই ধারার, চিরকাল তাই ছিল। হয়ত চিরকাল
তাইই থাকবে। বলি শোনো, ওঁরা জন্ম থেকেই অন্য ধারার। দেখতে পাও না, কীভাবে ওঁরা নিউ
ইয়র্কে, বোস্টনে ছুটে ছুটে চলে যা্ন, অপেরা শুনতে, তৈলচিত্রের
প্রদর্শনী দেখতে? তারপর অর্ডার দিয়ে ইয়াঙ্কিদের কাছ থেকে বাক্স বাক্স জার্মান আর ফরাসী
বই আনান! তারপর বসে বসে সেই বই পড়েন আর স্বপ্ন দেখেন – কিসের স্বপ্ন কে জানে! স্বাভাবিক
মানুষের মত সেসময় ওঁদের জুয়ো খেলে বা শিকারে গিয়ে সময় কাটানো দরকার!”
“এই কাউন্টিতে অ্যাশলের চেয়ে ভাল ঘোড়সওয়ার আর একজনও নেই,” অ্যাশলের ওপরে মেয়েলিপনার
কলঙ্ক আরোপ করায় স্কারলেট রীতিমত চটে গিয়ে বলে উঠল। “হয়ত ওর বাবা ছাড়া আর কেউই নেই।
আর জুয়ো খেলার ব্যাপারে, এই তো গত সপ্তাহেই, জোনসবোরোতে, তোমার কাছ থেকে অ্যাশলে দু’শ
ডলার জিতে নেয়নি?”
“তার মানে ক্যালভার্টদের ছোঁড়াগুলো আবার উল্টোপাল্টা রটিয়ে বেড়াচ্ছে,” জেরাল্ড
হাল ছেড়ে বললেন, “নইলে টাকার অঙ্কটা তুমি জানতেই পারতে না। ঘোড়ায় চড়া আর জুয়ো খেলায়
অ্যাশলে সব চেয়ে সেরা লোকটার সঙ্গেই পাল্লা দিতে পারে – আর সেই লোকটা হলাম গিয়ে আমি,
বুঝেছ, সোনা! আর একথাও অস্বীকার করছি না, মদ্যপানের ব্যাপারে ও টার্লটনদেরও গোহারান
হারিয়ে দিতে পারে। এই সব কাজই ও করতে পারে, কিন্তু এগুলোতে ওর মন নেই। আর এই কারণেই
আমি ওকে অদ্ভুত বলি।”
স্কারলেট হতাশ মনে চুপ করে রইল। শেষের এই কথাগুলোর প্রতিবাদ করতে পারল না, ও জানে
যে জেরাল্ড একদম সত্যি কথা বলেছেন। বিনোদনের
এই উপাদানগুলো সবার চাইতে ভালভাবে করতে পারলেও, এসবে ওর মন নেই। অন্যরা এগুলো করে কত
মজা পায়, অথচ এসবে ওর একটা শালীন আগ্রহ ছাড়া বিশেষ কিছু নেই।
ওর চুপ করে থাকার আসল কারণটা ধরে ফেলে, জেরাল্ড ওর বাহুতে হালকা চাপড় মেরে উল্লসিত
হয়ে বললেন, “তাহলে, স্কারলেট! তুমিও মেনে নিচ্ছ কথাটা। অ্যাশলের মত একজন স্বামী নিয়ে
কী করবে তুমি? ওঁদের সবার মাথায় অল্প অল্প
ছিট আছে, উইল্কসদের সকলের মাথাতেই!” তারপর একটু প্রশ্রয়ের সুর টেনে বলতে লাগলেন, “টার্লটনদের
কথা একটু আগেই বলছিলাম, কিন্তু কোনও জোরাজুরির ব্যাপার নেই। ওরা ভাল ছেলে, কিন্তু তোমার
যদি কেড ক্যালভার্টকে পছন্দ, তাহলে, আমার দিকে থেকে কোনো আপত্তি নেই। ক্যালভার্টরাও
মন্দ লোক নয়, বুড়ো মানুষটা এক ইয়াঙ্কিকে বিয়ে করেছেন, তাহলেও। আর আমি যখন থাকব না –
কথা বোলো না, সোনা, আমার কথাটা শোনো! এই টারা আমি তোমার আর কেডের জন্যই রেখে যাব –
”
“একটা রুপোর থালাতে বেড়ে দিলেও, কেডকে আমি নেব না,” স্কারলেট রেগেমেগে চেঁচিয়ে
উঠল। “দয়া করে তুমি ওকে নিয়ে আমাকে জোর কোরো না! টারা হোক কী আর কোনও সাবেক প্ল্যান্টেশনই
হোক, আমি চাই না। প্ল্যান্টেশনের কীই বা মূল্য আছে যদি – ”
ও বলতে গেছিল ‘যদি মনের মানুষকেই না পাওয়া গেল’, কিন্তু যে অবজ্ঞার সাথে ওঁর দেওয়া
উপহারটা স্কারলেট প্রত্যাখ্যান করল, তাতে জেরাল্ড জ্বলে উঠলেন। এলেনের পরে একমাত্র
এই ভূমিকেই উনি পৃথিবীতে সব চাইতে বেশি ভালবাসতেন। উনি গর্জন করে উঠলেন।
“আমার সামনে দাঁড়িয়ে, স্কারলেট ও’হারা, তুমি বলতে চাইছ যে এই টারা – এর কোনও মূল্যই
নেই?”
স্কারলেট একগুঁয়ে ভাবে ঘাড় নাড়ল। মনের যা বর্তমান অবস্থা তাতে ওর বাপির মেজাজ বিগড়ে
গেল কি গেল না, ওর কিচ্ছু যায় আসে না।
এই পৃথিবীতে মাটিই হল একমাত্র বস্তু যার সত্যিকারের মূল্য আছে,” উনি চিৎকার করে
উঠলেন। পেশল খর্বকায় দুই বাহু নাড়িয়ে ওঁর ক্রোধ ব্যক্ত করলেন। “কারণ এটাই একমাত্র বস্তু
যা টিকে থাকে, এর জন্য পরিশ্রম করতে হয়, লড়াই করতে হয়, এমনকি দরকারে নিজের প্রাণ পর্যন্ত
বিসর্জন দিতে হয়!”
“ওহ বাপি!” বিরক্ত মুখে স্কারলেট বলে উঠল। “তুমি একেবারে আইরিশদের মত কথা বলছ!”
“তার জন্য আমাকে কখনো লজ্জা পেতে দেখেছ? না, আমি গর্ববোধ করি। আর ভুলে যেও না তুমিও
আধা আইরিশ, মিস! আর কারও শরীরে এক বিন্দুও আইরিশ রক্ত যদি থাকে তাহলে যে মাটি তাদের
আশ্রয় দিয়েছে সেই মাটিকে তারা মা বলে মানে। তোমার জন্য, এই মুহূর্তে, আমার লজ্জা হচ্ছে।
বিশ্বের সব থেকে সুন্দর মাটিটা – একমাত্র আমার জন্মভূমির কাউন্টি মীথকে ছেড়ে দিলে
- সেটা তোমাকে দিতে চাইলাম – আর তুমি কী করলে? না, নাক কুঁচকালে!”
হেড়ে গলায় এই রকম তৃপ্তিদায়ক আস্ফালন ক্রমশ জেরাল্ডকে নেশার মত পেয়ে বসছিল, সহসা
স্কারলেটের বেদনাবিধুর মুখে কিছু একটা লক্ষ্য করে থমকে গেলেন।
“অবশ্য তোমার বয়স খুবই অল্প। এই অনুভূতি – মাটির প্রতি এই ভালবাসা – একদিন তোমারও
হবে। তুমি যদি আইরিশ হও, এ তুমি কিছুতেই এড়িয়ে যেতে পারবে না। তুমি এখনও ছেলেমানুষ, ভালবাসার মানুষকে নিয়েই বিব্রত
হয়ে আছ। যখন আরও পরিণত হবে, তুমি বুঝতে পারবে কেন … ঠিক আছে, এখন তুমি কেড, বা যমজ
দু’ভাই, বা ইভান মুনরো’র ছোঁড়াদের একজনকে বেছে নাও, তারপর দেখে নিও আমি তোমার জন্য
কী জবরদস্ত বন্দোবস্ত করি!”
“ওহো, বাপি!”
অনর্গল কথা বলে জেরাল্ড পুরোদস্তুর পরিশ্রান্ত হয়ে পড়েছিলেন, এবং রীতিমত বিরক্তও
হয়েছিলেন এরকম একটা সমস্যা ওঁর ঘাড়ে এসে পড়ার জন্য। কিছুটা ক্ষুব্ধও হয়েছিলেন, কাউন্টির সবচেয়ে ভাল ছেলেদের
কারও সঙ্গে বিয়ের অনুমতি, এমনকি টারার মত একটা উপহার দেবার প্রস্তাব দেওয়ার পরেও স্কারলেট
মুখ ভার করে আছে। ওঁর যে কোনও উপহারই মানুষ
খুশি হয়ে গ্রহণ করবে, হাত তালি দিয়ে, চুম্বন করে কৃতজ্ঞতা জানাবে – জেরাল্ড এরকম আচরণেই
অভ্যস্ত ছিলেন।
“নাও, আর মুখ ভার করে থেকো না, মিস। কাকে বিয়ে করবে তাতে কিছু এসে যায় না, মোদ্দা
কথা হল সে তোমার মত করেই ভাবে কিনা, সে ভদ্রলোক কিনা, সে এই দক্ষিণের মানুষ কিনা আর
এই নিয়ে সে গর্ববোধ করে কিনা। মেয়েদের ক্ষেত্রে, ভালবাসা আসে বিয়ের পরেই।”
“বাপি, এসব তো তোমাদের মান্ধাতার আমলের ধারণা!”
“কিন্তু মজবুত ধারণা!
আমেরিকানদের এই যে প্রেম করে বিয়ে করবার হিড়িক – ঠিক যেন চাকরবাকরদের মত, ইয়াঙ্কিদের
মত! বাবা মা যদি পাত্র খুঁজে মেয়ের বিয়ে দেন,
তার থেকে ভাল আর কিছুই হয় না। নইলে বল তোমার
মত বোকা একটা মেয়ে কী করে একজন ভদ্রলোক আর
একজন বখাটের মধ্যে পার্থক্য করবে? উইল্কসদের
একবার দেখ। এত প্রজন্ম ধরে কী করে ওঁরা ওঁদের অহঙ্কারবোধ আর প্রাধান্য ধরে রেখেছেন?
কি না, একই মানসিকতার ছেলেমেয়েদের মধ্যে বিয়ে
হয়েছে, ওঁদের পরিবার সব সময় আশাও করেন যে ছেলেমেয়েরা
নিজেদের কাজ়িনদেরই বিয়ে করবে।”
“ওহো,” স্কারলেট
ককিয়ে উঠল। জেরাল্ডের কথায় অবশ্যম্ভাবী সত্যটা উপলব্ধি করে আবার নতুন করে ওর বুকে কষ্ট
হতে লাগল। জেরাল্ড ওর নিচু করে রাখা মাথার দিকে তাকিয়ে অসহায়ভাবে পা ঘষলেন।
“তুমি কাঁদছ না
তো?” অপটু হাতে ওর চিবুকে হাত রেখে মুখটা তোলার চেষ্টা করে জিগ্যেস করলেন। সমবেদনায়
ওঁর মুখের বলিরেখাগুলো প্রকট হয়ে উঠেছে।
“না,” বলে আরও জোরে
কেঁদে উঠে ছিটকে সরে গেল।
“কথাটা সত্যি বললে
না, মা, তবে তোমার জন্য আমার গর্ব হচ্ছে। ভাল লাগছে তোমার এই অহঙ্কারবোধটা, মামণি।
কালকের বারবেকিউতেও আমি তোমার এই অহঙ্কারটা দেখতে চাই। আমি চাই না আমার মেয়েকে নিয়ে
কাউন্টির কোনো লোক হাসাহাসি করুক বা বলুক যে সে এমন একজনকে মন দিয়ে বসে আছে যে কখনোই
ওকে নিজের একজন বন্ধুর চেয়ে বেশি কিছু বলে ভাবেইনি।”
“নিশ্চয়ই ভেবেছিল,”
স্কারলেট বেদনার্ত মন নিয়ে ভাবল। “হ্যাঁ, অনেক কিছুই ভেবেছিল! আমি জানি ও ভেবেছিল।
আমি জোর দিয়ে বলতে পারি। ইশ, হাতে যদি আরেকটু সময় থাকত, আমি ঠিক ওকে দিয়ে বলিয়ে নিতাম
– ওহ্, নিজেদের কাজ়িনকেই বিয়ে করতে হবে, এরকম একটা বদ্ধমূল ধারণা যদি উইল্কসদের না
থাকত!”
জেরাল্ড ওর হাতটা
নিজের হাতে তুলে নিলেন।
“এবার আমাদের সাপারে
যেতে হবে, আর হ্যাঁ, এই সব কিছু কেবল আমাদের মধ্যেই থাক। তোমার মা’কে এসব নিয়ে ব্যতিব্যস্ত
করতে চাই না আমি – তুমিও কোরো না। নাও এবার নাকটা একটু ঝেড়ে নাও তো, সোনা।”
স্কারলেট নিজের
ছিঁড়ে যাওয়া রুমালে নাক ঝেড়ে নিল, তারপর ওঁরা অন্ধকারাচ্ছন্ন পথ ধরে, হাতে হাত রেখে,
এগিয়ে চললেন, ঘোড়াটাও ওঁদের পেছন পেছন ধীরে ধীরে এগিয়ে চলল। বাড়ির কাছে এসে স্কারলেট
আবার কিছু বলবার উপক্রম করছিল, তখন দেখতে পেল ওর মা দেউড়ির আলোআঁধারিতে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা
করছেন। বনেটটা মাথায় লাগানো, শাল জড়িয়ে আর
দস্তানা পরে আছেন। পেছনেই ম্যামি দাঁড়িয়ে আছে, থমথমে মুখে, হাতে ধরা কালো চামড়ার ব্যাগটা
যেটা ক্রীতদাসদের চিকিৎসা করতে ব্যবহার হত। ম্যামির ঠোঁট চওড়া হয়ে বাইরী দিকে ঝুলে
আছে, রেগে থাকলে ম্যামির নিচের ঠোঁট স্বাভাবিকের চেয়ে দ্বিগুণ চওড়া হয়ে বাইরের দিকে
ঝুলে থাকে। এখন সেরকমই ঝুলে রয়েছে, স্কারলেট জানে যে ম্যামি এখন এমন কিছু ব্যাপার নিয়ে
মনে মনে গরজাচ্ছে, যেটা ওর পছন্দ হয়নি।
“মিস্টার ও’হারা,”
ওঁদের দুজনকে ড্রাইভওয়ে ধরে এগিয়ে আসতে দেখে এলেন বললেন। (এলেন হলেন সেই প্রজন্মের
মহিলা যিনি বিবাহের সতেরো বছর পরে, ছ’টি সন্তানের জননী হবার পরেও লৌকিকতা ত্যাগ করতে
পারেননি।) “মিস্টার ও’হারা, স্ল্যাটারিদের বাড়ি থেকে অসুখের খবর এসেছে। এমি’র বাচ্চা
হয়েছে, হয়ত বাঁচবে না, তার আগেই ওকে দীক্ষিত করতে হবে। ম্যামিকে নিয়ে আমি ওখানেই চললাম,
দেখি কী করতে পারি।”
ওঁর কথার মধ্যে
একটা প্রশ্নসূচক সুর ছিল, যেন জেরাল্ডের অনুমতির অপেক্ষায় রয়েছেন, নিছকই আনুষ্ঠানিক
একটা অনুমোদন, কিন্তু জেরাল্ড অত্যন্ত পরিতৃপ্তি লাভ করেন।
“ভগবানেরও বলিহারি!”
জেরাল্ড ফেটে পড়লেন। “এই বেজন্মা সাদা চামড়ার আবর্জনাগুলো কী তোমাকে শান্তিতে সাপারটাও
করতে দেবে না! আর এদিকে অ্যাটলান্টায় যুদ্ধ নিয়ে কীরকম সরগরম পরিস্থিতি, আমি তোমাকে
বলবার জন্য ছটফট করছি! কী আর বলি, যাও মিসেজ় ও’হারা। কেউ ঝামেলায় পড়লে তার পেছনে গিয়ে
না দাঁড়াতে পারলে তুমি তো রাতে দু’চোখের পাতা এক করতেও পারবে না।”
“এই সব ঘটিয়া কিসিমের
সাদা চামড়া আর নিগ্রোদের সেবা করবার ঠ্যালায় উনি তো রেতের বেলা বিশ্রামও করতে পারেন
না,” ম্যামি গজগজ করতে করতে ড্রাইভওয়ের পাশ ঘেঁষে দাড় করানো গাড়িটার দিকে এগিয়ে গেল।
“আজ টেবিলে আমার
জায়গাটা তুমিই নিও, সোনা,” স্কারলেটের গালে দস্তানা পরা হাত দিয়ে আলতো করে টোকা দিয়ে
এলেন বললেন।
উদ্গত অশ্রু চেপে
রেখেও মায়ের হাতের অক্ষয় যাদুস্পর্শে স্কারলেট একটু সুস্থির বোধ করল। মায়ের সিল্কের
পোশাক থেকে ভেসে আসা লেবুর ফুলের মধুর সৌরভ প্রাণ জুড়িয়ে দিল। স্কারলেটের মনে হয়, এলেন
ও’হারার মধ্যে উত্তেজনাকর এমন কিছু আছে যা বাড়ির আনাচে কানাচে ছড়িয়ে রয়েছে, যা ওকে
মুগ্ধ করে রাখে, অস্থির হৃদয়ে শান্তি নিয়ে আসে।
জেরাল্ড স্ত্রীকে
গাড়িতে উঠতে সাহায্য করলেন, তারপর কোচোয়ানকে হুকুম দিলেন সাবধানে গাড়ি চালাতে। টোবি,
গত কুড়ি বছর ধরে যে জেরাল্ডের সমস্ত ঘোড়ার তদারকি করছে, নিজের কর্তব্যে জেরাল্ডের অহেতুক
খবরদারিতে নীরব বিরক্তিতে ঠোঁট ফোলাল। ম্যামিকে পাশে বসিয়ে গাড়ি চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার
সময় মনে হল যেন আফ্রিকান অননুমোদনের এক নিখুঁত পরিদৃশ্য।
“ওই বেজন্মা স্ল্যাটারিগুলোর
জন্য আমি যদি এত কিছু না করতাম তাহলে অন্য কোনো জায়গা থেকে টাকা জোগাড় করতে হত,” রাগে
গরগর করতে করতে জেরাল্ড বললেন, “ওদের ওই অল্প কয়েক বিঘা জলাজমি আমার কাছে বিক্রি করতে
বাধ্য হত, তাহলে এই কাউন্টিটা অন্তত ওদের হাত
থেকে নিষ্কৃতি পেত। তারপর একটু রগড় করার কথা মনে হতেই একটু হেসে বললেন, “আয় মা, পোর্ককে
গিয়ে বলি ডিলসিকে কেনবার বদলে ওকেই আমি জন উইল্কসের কাছে বেচে দিয়েছি।”
ঘোড়ার লাগামটা কাছে
দাঁড়িয়ে থাকা এক নিগ্রো শিশুর হাতে ছুঁড়ে দিয়ে সিঁড়ি চড়তে শুরু করলেন। নিজের খানসামার
পেছনে লাগতে পারার উত্তেজনায় স্কারলেটের মনবেদনার খবর ইতিমধ্যেই ভুলে মেরে দিয়েছেন।
ওঁর পেছন পেছন স্কারলেট মন্থর পায়ে সিঁড়ি চড়তে লাগল। পাথরের মত ভারি লাগছে পা দুটো।
মনে মনে ভাবল, ওর সঙ্গে অ্যাশলের মিলন ওর বাপির সঙ্গে এলেন রোবিল্যার ও’হারার মিলনের
চেয়ে বেশি কিছু অদ্ভুত ব্যাপার হবে না। মাঝে মাঝেই ও অবাক হয়ে ভাবে, ওর বাপির মত অমার্জিত,
অনুভূতিহীন মানুষ কীভাবে মায়ের মত একজন মহিলাকে বিয়ে করে ফেললেন, যিনি জন্মসূত্রে,
শিক্ষাদীক্ষায় এবং স্বভাবচরিত্রে ওঁর সম্পূর্ণ বিপরীত।
টীকাঃ
১ কাউন্টি মীথ – আয়ার্ল্যান্ডের
লিস্টার প্রদেশের অন্তর্গত পূর্ব এবং মিডল্যান্ড অঞ্চলের একটি কাউন্টি।
উৎপল দাশগুপ্ত
ফটোগ্রাফার। অনুবাদক।



0 মন্তব্যসমূহ