শনিবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০১৭

মার্গারেট মিচেলের উপন্যাস : যে দিন ভেসে গেছে --দ্বিতীয় পর্ব

অনুবাদ : উৎপল দাশগুপ্ত

প্রথম পর্বের লিংক


দ্বিতীয় পর্ব-- দু’ ভাই চলে যাবার পর যতক্ষণ ঘোড়ার খুরের আওয়াজ পাওয়া গেল, স্কারলেট দাঁড়িয়ে রইল। তারপর স্বপ্নচরের মত নিজের চেয়ারে এসে বসে পড়ল। ব্যথায় ওর মুখ শক্ত হয়ে গেছিল। দু’ভাইয়ের সাথে কথা বলার সময় কষ্ট করে হলেও হাসতে হচ্ছিল। নাহলে ওর গোপন কথাটা ওরা বুঝে ফেলত। খুব ক্লান্ত ভঙ্গীতে বসে পড়ে একটা পায়ের ওপর অন্য পা তুলে দিল। তার হৃদয় এক অদ্ভুত বেদনায় উদ্বেল হয়ে উঠছিল।
হাত দুটো ঠাণ্ডা হয়ে আসছে। মনের ভেতরে তোলপাড় করছে। চোখে মুখে বেদনার ছোঁয়া। প্রশ্রয় পেয়ে বেড়ে ওঠা শিশু – যা চেয়েছে সেটাই পেয়ে অভ্যস্ত – জীবনে প্রথম তার ব্যতিক্রম হতে চলেছে। 

অ্যাশলে শেষ পর্যন্ত মেলানি হ্যামিলটনকে বিয়ে করবে! 

নাঃ এটা কিছুতেই সত্যি হতে পারে না। দু’ভাই নিশ্চয়ই কোথাও ভুল করছে। নিশ্চয়ই এটা বাজে রসিকতা। অ্যাশলে কিছুতেই মেলানিকে ভালবাসতে পারে না। কেউই পারে না ওই ইঁদুরের মত ছোট্টখাট্ট মেয়েটাকে ভালবাসতে। খানিক অবজ্ঞার সাথেই ও মেলানির রোগা অপরিণত চেহারাটাকে মনে করার চেষ্টা করল, ওর পান পাতার মত মুখটাকে, যেটা অত্যন্ত সাধারণ আর বৈশিষ্টহীন। অ্যাশলে নিশ্চয়ই ওকে অনেকদিন দেখে নি। গত বছর টুয়েল্ভ ওকসে পার্টির পরে অ্যাশলে দুবারের বেশি অ্যাটলান্টায় যায় নি। নাঃ অ্যাশলে কিছুতেই মেলানির প্রেমে পড়ে নি। আর নিশ্চয়ই ওর ভুল হচ্ছে না – কারন অ্যাশলে তো ওরই – স্কারলেটের প্রেমেই পড়েছে। ও একদম নিশ্চিন্ত এ ব্যাপারে! 

স্কারলেট ম্যামির থপ থপে পায়ের শব্দ শুনতে পেল। তাড়াতাড়ি পায়ের ওপর থেকে পা টা সরিয়ে নিল, আর মুখটাকে শান্ত করার চেষ্টা করল। ম্যামিকে কোন কিছু সন্দেহ করতে দেওয়া যাবে না। ম্যামি ও’হারা পরিবারকে প্রাণ মন দিয়ে ভালবাসত। ও’হারাদের গোপন কথাকে নিজের গোপন কথা বলে মনে করত। আর যদি মনে করে কেউ তার কাছ থেকে কিছু লুকোতে চাইছে, তাহলে প্রাণপাত করে সেই কথা ঠিক বের করে ফেলবে। স্কারলেট এটাও ভাল করে জানত, যদি ম্যামির কোন কৌতুহল হয়, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে কথাটা এলেনের কানে তুলবে। তখন হয় স্কারলেটকে মায়ের কাছে সব খুলে বলতে হবে অথবা বিশ্বাসযোগ্য মিথ্যে গল্প তৈরি করতে হবে।

হল পেরিয়ে ম্যামি এসে ঢুকল। দশাশই চেহারার মহিলা। বেশ বয়েস হয়েছে। হাতির মত কুতকুতে কিন্তু সজাগ চোখ। কুচকুচে কালো, পাক্কা আফ্রিকান। শেষ রক্তবিন্দু অবধি ও’হারা পরিবারের স্বার্থ দেখবে। এলেনের প্রধান অবলম্বন, কিন্তু তাঁর তিন মেয়ের এবং সমস্ত চাকর-বাকরের হতাশা আর আতঙ্কের কারন। যদিও ম্যামি নিগ্রো ছিল, তবু তাঁর আচার আচরণ আর আত্মসম্মানবোধ অত্যন্ত উচ্চশ্রেণীর ছিল। বড় হয়েছিল সোলঁঞ্ঝ রোবিল্যারের তত্ত্বাবধানে। উনি হলেন এলেন ও’হারার মা, অত্যন্ত সুন্দরী, কিন্তু শীতল এবং উন্নাসিক প্রকৃতির ফরাসী মহিলা,যিনি তাঁর ছেলেমেয়ে কিংবা চাকর-বাকরদের আদব-কায়দা লঙ্ঘণের জন্য যথোপযুক্ত শাস্তি দিতে পিছিয়ে যেতেন না। ম্যামি এলেনেরও ম্যামি ছিল। এলেনের বিয়ের পর সাভান্না থেকে পশ্চিমে চলে এসেছে। যাকে সে ভালবাসত তাকেই সে বকাবকি করত। স্কারলেটের প্রতি ওর ভালবাসা আর গর্ব এত বেশি ছিল যে ও ওকে অনবরত শাসন করত।

“ভদ্রলোকেরা কি চলে গেছেন? কি ব্যাপার মিস স্কারলেট, তুমি ওদের খেয়ে যেতে বললে না? পোর্ককে আমি দুটো প্লেট বেশি লাগাতে বলেছিলাম। এটা কি ধরণের ভদ্রতা তোমার?” 

“খালি যুদ্ধ আর যুদ্ধ নিয়ে ওদের কথাবার্তা শুনে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। খাবার টেবিলেও একই কথা চলতে থাকত! বিশেষ করে বাপী এসে আবার মিঃ লিঙ্কনকে নিয়ে ওদের সঙ্গে হট্টগোল শুরু করতেন।” 

“মিস এলেন আর আমি তোমাকে পইপই করে শেখালেও তোমার আদব কায়দা খেতমজুরদের মতই রয়ে গেল! আর তোমার শাল কোথায়? বাইরে, রাতের বেলা হিম পড়ে তুমি সর্দিজ্বর বাধিয়ে বসবে। চল, ভেতরে চল, মিস স্কারলেট।”

একটা ইচ্ছাকৃত উদাসীনতার সঙ্গে স্কারলেট ম্যামির দিক থেকে মুখটা ঘুরিয়ে নিল। ভাগ্য ভাল ম্যামি তাঁর শাল গায়ে না দেওয়ার ব্যাপারে চিন্তিত হয়ে পড়ায় ওর মুখের দিকে নজর দেয় নি।

“না আমি এখানে বসে সূর্যাস্ত দেখব। কি সুন্দর লাগছে! তুমি দয়া করে আমার শালটা দিয়ে যাও। বাপী আসা পর্যন্ত আমি এখানেই বসি।”

“তোমার আওয়াজ শুনে মনে হচ্ছে যে তোমার ঠাণ্ডা লেগেছে,” ম্যামি সন্দেহের সুরে বলল।

“না মোটেই না,” স্কারলেট অসহিষ্ণুভাবে বলল। “তুমি শালটা এনে দাও।”

ছোট ছোট পা ফেলে ম্যামি ফের হলঘরে গেল। স্কারলেট শুনতে পেল সিঁড়ির তলা থেকে খুব মিহি গলায় ওপরতলার পরিচারিকাকে ডাকল।

“রোজ়া, মিস স্কারলেটের শালটা দাও।” তারপর রেগে গিয়ে, “মহারাণী হয়েছেন সব! দরকারের সময় তার টিকির দেখা পাওয়া যাবে না! এখন আমাকেই সিঁড়ি বাইতে হবে!” 

স্কারলেট সিঁড়ির মচ মচ শব্দ শুনতে পেয়ে উঠে দাঁড়াল। ম্যামি ফিরে আসলেই তো আবার সেই আতিথেয়তার অভাব নিয়ে লেকচার শুরু করবে। ওর মনে হল এই তুচ্ছ ব্যাপার নিয়ে আবার বকাবকি আর সহ্য হবে না। নিজেই যখন সে নিজের জ্বালায় কষ্ট পাচ্ছে। কিন্তু কোথায় লুকোবে যতক্ষণ না তার এই দুঃখ একটু কমে? হঠাৎ একটা আশার আলো দেখতে পেল। বাপী দুপুরে উইল্কসদের প্ল্যানটেশন টুয়েল্ভ ওকসে গেছেন। ডিলসিকে কেনার ব্যাপারে কথাবার্তা বলতে। ডিলসি ওখানকার মুখ্য পরিচারিকা আর ধাত্রী। মাস ছয়েক আগে বাপীর পরিচারক পোর্ক ডিলসিকে বিয়ে করেছে। তারপর থেকে দিন রাত বাপীকে জ্বালাতন করে চলেছে ওকে কিনে নেবার জন্য। যাতে ওরা এক জায়গায় থাকতে পারে। শেষমেশ বাপী নিমরাজি হয়ে ওকে কেনবার প্রস্তাব নিয়ে গেছেন। 

বাপী নিশ্চয়ই দুঃসংবাদটা সত্যি কিনা জানতে পারবেন। যদি কিছু শুনতে নাও পান, তবু ওদের হাবভাব, ব্যস্ততা নিশ্চয়ই লক্ষ্য করে থাকবেন, আর কিছু আন্দাজ তো করবেন। যদি বাপীকে একলা পাই তাহলে ঠিক বুঝে যাব যে সত্যিটা আসলে ওই বজ্জাত ছোঁড়া দুটোর রসিকতা। 

জেরাল্ডের ফেরার সময় হয়ে এসেছে। ওকে যদি ওঁর সঙ্গে একলা দেখা করতে হয়, তাহলে বাইরে গেটের কাছে অপেক্ষা করতে হবে। ও চুপি চুপি বেরিয়ে এল। তারপর ভাল করে নিশ্চিত হয়ে নিল যে ম্যামি ওপর থেকে ওকে লক্ষ্য করছে না। কেউ ওকে দেখছেনা বুঝে ও ওর সবুজ ফুলপাতার স্কার্টটাকে একটু তুলে নিয়ে গেটের দিকে দ্রূতপায়ে এগিয়ে চলল। রাস্তার দুধারে সেডার গাছের সারি একটা অন্তরাল তৈরি করেছে। ওখান থেকে স্কারলেটকে নজর করা খুব শক্ত। 

গাছের একটা গুঁড়ির ওপর বসে সে বাপীর অপেক্ষা করতে লাগল। আসার সময় অবশ্য পেরিয়ে গেছে, কিন্তু স্কারলেট মনে মনে চাইছিল একটু দেরি হোক। এই বিলম্বে সে নিজেকে খানিকটা সামলে নিতে পারবে যাতে বাপীর মনে কোন সন্দেহের উদ্রেক না হয়। সময় পেরিয়ে যেতে লাগল। কিন্তু উদগ্রীব হয়েও জেরাল্ডের ঘোড়ার খুরের আওয়াজ ওর কানে এসে পৌঁছল না। জেরাল্ডের খুব জোরে জোরে অশ্বচালনার অভ্যেস। বেদনা আবার ওকে গ্রাস করে নিল।

“কিছুতেই সত্যি হতে পারেনা,” সে ভাবল। “ইশ, কেন যে বাপী আসছে না!”

ওর চোখ আঁকাবাঁকা রাস্তার শেষ সীমানা পেরিয়ে চেয়ে আছে। সকালে বৃষ্টির পরে পথটা এখন রক্তের মত লাল। মনে মনে সেই রাস্তা ধরে, ফ্লিন্ট নদী পেরিয়ে ও টুয়েল্ভ ওকসে পৌঁছে গেল। যেখানে অ্যাশলে থাকে। পথটাকে মনে হল অ্যাশলের কাছে যাবার রাস্তা। পাহাড়ের চূড়ার ওপরে গ্রীক মন্দিরের ধাঁচে সাদা রঙের সেই বাড়িটা। 

“ওঃ অ্যাশলে! অ্যাশলে!” যতই মনে পড়তে লাগল, ওর হৃতকম্পন তত দ্রূত হতে লাগল।

আস্তে আস্তে ওর মন থেকে টার্লটন ভাইদের কাছ থেকে শোনা গুজব মনের ওপর যে দুঃসহ বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছিল আর নিজেকে বিপর্যস্ত মনে হচ্ছিল, সেই ভাব কাটিয়ে উঠে, দুবছর ধরে নিজের মধ্যে গোপন রাখা অনুভুতিটা দিয়ে সমস্ত মনকে আচ্ছন্ন করে ফেলল।

আশ্চর্যের ব্যাপার হল, আগে কখনই ও অ্যাশলের প্রতি কোন আলাদা আকর্ষণ অনুভব করেনি। ছোটবেলায়, মাঝে মাঝেই অ্যাশলে ওদের বাড়িতে আসা যাওয়া করত, কিন্তু কখনও ওকে কোন বিশেষ চোখে দেখে নি। তবে দুবছর আগে, ইউরোপ ঘুরে আসার পরে, অ্যাশলে যখন সৌজন্যমূলক সাক্ষাতের জন্য ওদের বাড়ি এসেছিল, ওর ওকে ভাল লেগে গেছিল। বাস!

সেদিন স্কারলেট বাড়ির সামনের বারান্দায় বসে ছিল। দেখল অ্যাশলে বৃক্ষাচ্ছাদিত দীর্ঘ পথ বেয়ে ঘোড়ায় চড়ে এল। পরনে একটা ধূসর রঙের ঢোলা পোষাক, গলাবন্ধ শার্ট থেকে টাই ঝুলছে, টাইপিনের ওপর খোদাই করা মেডুসার মাথা, মাথায় পানামা টুপি, পায়ে চকচকে জুতো। আজও ছবিটা ও চোখ বন্ধ করলেই স্পষ্ট দেখতে পায়। ঘোড়া থেকে নেমে, লাগাম এক নিগ্রো শিশুর হাতে ছুঁড়ে দিয়ে স্বপ্নিল চোখে স্কারলেটের দিকে তাকিয়ে হাসল। বলল, “তাহলে তুমি বড় হয়ে গেছ স্কারলেট!” তারপর ধীর পায়ে উঠে এসে স্কারলেটের হাত তুলে ধরে আস্তে চুম্বন করল। সেই কণ্ঠস্বর ওর হৃদয়ে আলোড়ন তুলে দিল। সেই কন্ঠস্বর ও জীবনে ভুলতে পারবে না।

সেই মুহুর্ত থেকে স্কারলেট অ্যাশলেকে কামনা করেছে, ঠিক যে ভাবে একজন অবুঝ শিশু খাবার জিনিসের জন্য কিংবা ভাল ঘোড়ার কিংবা নরম বিছানার জন্য বায়না করে তেমনি। 

তারপরে, দু বছর ধরে সপ্তাহে অন্তত একবার অ্যাশলে টারায় এসেছে আর স্কারলেটের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছে। অবশ্য টার্লটন ভাইদের মত এত ঘন ঘন নয় বা ফোনটেনদের মত এত নাছোড়বান্দা ভাবে নয়। 

এ কথা সত্যি, ও কখনো স্কারলেটকে প্রেম-প্রস্তাব দেয় নি। অন্যরা স্কারলেটকে দেখলে যেরকম গদগদ হয়ে পড়ত, ওর মধ্যে সেরকম কোন অভিব্যাক্তিও লক্ষ্য করেনি। তবুও স্কারলেট নিশ্চিত জানে অ্যাশলে ওকেই ভালবাসে। এতে কোন ভুল নেই। কত সময় ও লক্ষ্য করেছে, কি ব্যাকুলতা আর বিষণ্ণতা নিয়ে অ্যাশলে ওর দিকে চেয়ে থেকেছে। ওর সহজাত প্রবৃত্তি আর অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান অন্য কিছু ভাববার সুযোগই দিচ্ছে না। নাঃ ও একশো ভাগ নিশ্চিত যে অ্যাশলে ওকেই ভালবাসে। আর সে কথা বলতে অসুবিধে কোথায় ছিল? এটা স্কারলেট কিছুতেই বুঝে উঠতে পারে না। অবশ্য, অ্যাশলের অনেক ব্যাপারই ও বুঝে উঠতে পারে না। 

ওর ব্যবহার সবসময়ই খুব মার্জিত। অথচ কি নির্লিপ্ত! কেউই ওর মনের কথা আঁচ করতে পারবে না, আর স্কারলেট তো একেবারেই নয়। আশে পাশে সবাই যখন মনের কথা খোলাখুলি বলতে ভালবাসে, তখন অ্যাশলের মন্ত্রগুপ্তি খুবই বিরক্তিকর। নাচ গান, আড্ডা মারা, শিকার করা, বাজী ধরা, কোন কিছুতেই সে কম যায় না। বিশেষ করে অশ্বচালনাতে তো ও সবার থেকে এগিয়ে। তবু ও সবার থেকেই আলাদা, কারন শুধু ফুর্তি করাকে ও মোটেই অন্যদের মত জীবনের একমাত্র লক্ষ্য বলে মনে করে না। বই পড়া, ধ্রূপদী সঙ্গীত শোনা আর কবিতা লেখা এই হল ওর প্রিয় শখ। 

ও এত সুদর্শন, এত মার্জিতভাবে নির্লিপ্ত, অথচ ক্লান্তিকরভাবে ইউরোপের কথা বলে চলে? আর অসম্ভব স্বপ্নবিলাসি! স্কারলেটের এসব ব্যাপারে একদম আগ্রহ নেই, অথচ অ্যাশলেকে ও ভীষণ চায়। আধো অন্ধকারে সামনের বারান্দায় বসে অ্যাশলের সঙ্গে গল্প করে অনেকদিন কাটিয়েছে, আর সে সব রাতে বিছানায় এপাশ ওপাশ করেছে, আর নিজেকে এই বলে সান্ত্বনা দিয়েছে যে এর পরে যেদিন আবার দেখা হবে, অ্যাশলে ওর পাণি প্রার্থণা করবে। কিন্তু সেই পরের দিনও নতুন কিছু ঘটেনি, শুধু অ্যাশলের প্রতি তার আকর্ষণ আরও দূর্বার হয়েছে।

ও অ্যাশলেকে ভালবাসত, ওকে চাইত, কিন্তু ওকে বুঝতে পারত না। বাতাসের গতির মত কিংবা নদীর স্রোতের মত সে ছিল সরল আর দ্বিধাহীন, তাই জটিলতা বোঝার কোন ক্ষমতা ওর ছিল না। জীবনে এই প্রথম ও কোন জটিল বিষয়ের সম্মুখীন হয়েছে। 

অ্যাশলে হল সেই ধরনের ব্যাক্তিত্ব, যে অবসর সময়ে, কোন কিছু করার বদলে কোন কিছু নিয়ে ভাবতে বেশী ভালবাসবে আর অবাস্তব স্বপ্নের জাল বুনে চলবে। ও একটা সুদূর কল্পলোকে বাস করতে ভালবাসে। মাঝে মাঝে ওকে অত্যন্ত অনিচ্ছাভরে বাস্তবের মুখোমুখি হতে হয়। ভাল লাগা আর ভাল না লাগার দ্বন্দ্বের মধ্যে না পড়ে সে শুধু আশেপাশের মানুষকে পর্যবেক্ষণ করত। জীবন সম্বন্ধেও সে ছিল অত্যন্ত উদাসীন। 

এতটা দূর্জ্ঞেয় হওয়া সত্বেও ও কেন অ্যাশলের প্রতি আকর্ষণ বোধ করে, সেটা স্কারলেটের অজানা। অ্যাশলে যেন এক রহস্যময় বন্ধ দরজা, যার চাবি কিংবা তালা কিছুই নেই। ওর চরিত্রের যে সব দিকগুলো ও বুঝতে পারত না, সেগুলোর জন্যই ওকে আরো ভালবাসতে ইচ্ছে করত। আর ওর সম্ভ্রমপূর্ণ কিন্তু সংযত আচরণ ওকে নিজের করে পাবার জন্য স্কারলেটের জেদ আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল। ও যে ওকে একদিন না একদিন বিবাহের প্রস্তাব দেবেই এ নিয়ে ওর মনে বিন্দুমাত্র সন্দেহ ছিল না। এখন অবধি কোন কিছুর জন্য বায়না করে সেটা না পাওয়ার অভিজ্ঞতা তার হয় নি। আর হঠাৎ বজ্রপাতের মত কি শুনতে পেল? না অ্যাশলে মেলানিকে বিয়ে করছে! হতেই পারে না!

এই তো মাত্র গত সপ্তাহে, যখন ওরা ফেয়ারহিল থেকে বিকেল বেলা ঘোড়ায় চড়ে ফিরছিল, তখন অ্যাশলে বলেছিল, “স্কারলেট, তোমাকে একটা খুব দরকারি কথা বলার আছে। কি ভাবে বলব, বুঝতে পারছি না।”

ও লজ্জা পেয়ে চোখ নামিয়ে নিয়েছিল। ভেবেছিল এতদিনে প্রতীক্ষার অবসান হবে। কিন্তু কি ভেবে অ্যাশলে বলল, “না, আজ থাক। বাড়ির কাছে এসে পড়েছি। এখন গুছিয়ে বলার সময় হবে না। ওঃ স্কারলেট আমি যে কত কাপুরুষ, বোঝাতে পারব না।” তারপর তাড়াতাড়ি ঘোড়া চালিয়ে, স্কারলেটকে টারায় পৌঁছে দিল। 

গাছের গুঁড়ির ওপর বসে স্কারলেট সেই সুখস্মৃতি স্মরণ করছিল। কিন্তু এখন তো মনে হচ্ছে, ওই কথায় অত আনন্দ পাওয়ার কিছু ছিল না। কথাগুলোর ভয়ঙ্কর অন্য কোন অর্থ আছে। হয়ত অ্যাশলে ওকে মেলানির সঙ্গে বাগদানের খবরটাই বলতে চেয়েছিল!

ওঃ বাপী কখন যে ফিরবে? আর এই উদ্বেগ সহ্য হচ্ছে না। স্কারলেট উৎসুক চোখে বিসর্পিল রাস্তায় চোখ রাখল আবার। আবারও হতাশ হল। 

সূর্য দিগন্তের সঙ্গে প্রায় মিশে গিয়েছে। লালচে ভাব মিলিয়ে গিয়ে এখন গোলাপী আভা। আকাশের উজ্জ্বল নীল রঙ ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে এখন নীলচে সবুজ। গোধুলির অপার্থিব নৈঃশব্দ চুপি চুপি স্কারলেটকে সম্পূর্ণ গ্রাস করে ফেলল। চরাচরে নিষ্প্রভ আলো। মাটির রক্তাক্ত লাল রঙ এখন বিবর্ণ বাদামী। খচ্চর, গরু, ঘোড়া আস্তাবলে ফেরার অপেক্ষা করছে। 

নদীর ধারের উজ্জ্বল সবুজ পাইন গাছের সারি আলো আঁধারিতে এখন আকাশের পটভুমিতে কালো। পাহাড় পেরিয়ে উইল্কসদের বাড়ির সাদা সাদা চিমনিগুলোও ধীরে ধীরে ঘন ওক বনের অন্তরালে মিলিয়ে গেল। শুধু কতগুলো আলোর বিন্দু দেখে বোঝা যাচ্ছে যে ওখানে একটা বাড়ি আছে। স্যাঁতস্যাঁতে হেমন্তের বাতাসের সৌরভ আর চষা মাটির সোঁদা গন্ধ স্কারলেটকে আচ্ছন্ন করে তুলল।

সূর্যাস্ত, ঋতু পরিবর্তন, শ্যামল প্রাকৃতিক শোভা, স্কারলেটের কাছে এসব নতুন কোন ব্যাপার নয়। শ্বাস প্রশ্বাস নেবার মত খুবই উদ্দেশ্যহীন ভাবে এই সব সৌন্দর্যকে উপভোগ করেছে। সচেতনভাবে সৌন্দর্য বলতে সে কতগুলো নির্দিষ্ট জিনিসই বুঝত, যেমন নারীর মুখ, সিল্কের পোশাক, আর ঘোড়া। তবুও আজকের সন্ধ্যার আবছায়া আলোয়, টারার স্নিগ্ধ সৌন্দর্য তার অশান্ত মনকে খানিকটা শান্ত করল। এই মাটিকে সে খুব ভালবাসে। প্রার্থণার সময় মোমবাতির আলোয় মায়ের মুখটা যতখানি ভাল লাগে ঠিক ততখানি।

এখনও সেই আঁকাবাঁকা রাস্তার প্রান্তে জেরাল্ডের ফিরে আসার কোনও চিহ্ন দেখা গেল না। আর একটু দেরি হলেই ম্যামি ওকে খুঁজতে বেরিয়ে পড়বে। তারপর ভেতরে নিয়ে গিয়ে তর্জন গর্জন শুরু করবে। হঠাৎ খেয়াল করল, কোন কারনে, খচ্চর, গরুর দল ভয়ে এদিক ওদিক পালানোর চেষ্টা করছে। বুঝতে পারল, জেরাল্ড ও’হারা, খুব দ্রূতগতিতে ঘোড়া ছুটিয়ে ফিরছেন।

টিলার ওপর থেকে তাঁকে আর তাঁর লম্বা স্বাস্থ্যবান ঘোড়াকে দেখা গেল। তাঁর লম্বা ধবধবে সাদা চুল মাথার পেছন দিকে সোজা হয়ে হাওয়ায় ভেসে আছে। পেটে চাপড় মেরে আর চেঁচিয়ে ঘোড়াটাকে বেড়াঝোঁপ টপকাতে উৎসাহ দিচ্ছেন।

মনের দূর্ভাবনাকে সরিয়ে রেখে, স্কারলেট খুব গর্বের সঙ্গে বাপীর ঘোড়া ছোটানো দেখতে লাগল। জেরাল্ড সত্যিই একজন পাকা অশ্বারোহী।

“বুঝতেই পারি না বাপী কেন ঘোড়া নিয়ে লাফ দিয়ে বেড়া ডিঙোতে চান, বিশেষ করে পেটে যদি দু’এক পেগ পড়ে,” স্কারলেট ভাবল। “গত বছর এই সময়ই তো টপকাতে গিয়ে পড়ে হাঁটু ভেঙেছিলেন। মা’কে তো কথাও দিয়েছিলেন যে আর কখনও লাফাবেন না।”

স্কারলেট তাঁর বাপীকে ভয় করত না। মনে করত তার বোনেদের থেকে বাপী তার অনেক বেশী সমসাময়িক। বেড়া টপকানো আর সেটা বউএর কাছ থেকে লুকিয়ে রেখে তিনি এক ধরণের শিশুসুলভ আনন্দ পেতেন; আবার একটা অপরাধবোধও কাজ করত। স্কারলেটও কড়া নজর এড়িয়ে ম্যামিকে ঠকানোতে একই রকম আনন্দ পেত। গাছের গুঁড়ির থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বাপীকে দেখতে লাগল।

তাঁর বিশাল ঘোড়া বেড়ার কাছে পৌঁছেই, পাখির মতই অবলীলাক্রমে শুন্যে ভেসে বেড়া টপকে চলে এল। তার আরোহী চেঁচিয়ে আর পেটে চাপড় মেরে ক্রমাগত উৎসাহ দিয়ে চলেছেন। তাঁর সাদা চুল হাওয়ায় উড়ছে। জেরাল্ড লক্ষ্য করেন নি যে স্কারলেট অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছে। 

“আমাদের কাউন্টি কিংবা আমাদের এই অঞ্চলেই আর একটা ঘোড়াও নেই যেটা তোকে হারিয়ে দিতে পারবে,” ঘোড়ার উদ্দেশ্যে বললেন। তাঁর কণ্ঠস্বরে গর্ব ঠিকরে পড়ছিল। তারপর চুল, টাই আর শার্ট ঠিক করতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। স্কারলেট জানে যে মার সঙ্গে দেখা করার আগে একটু গুছিয়ে নিচ্ছেন, যাতে মায়ের মনে কোন রকম সন্দেহ না হয়। ওর মনে হল এটাই হল বাপীর সাথে কথা বলার সঠিক সময়।

একটু জোরে হেসে উঠল। ও চেয়েছিল জেরাল্ড যাতে একটু চমকে ওঠেন। জেরাল্ড মেয়েকে দেখতে পেলেন। ওঁর চোখে মুখে একটু অপ্রতিভ কিন্তু বেপরোয়া ভাব ফুটে উঠল। ঘোড়া থেকে সাবধানে নামলেন, কারন হাটুটা এখনও স্বচ্ছন্দ হয় নি। তারপর ওর দিকে এগিয়ে এলেন।

“তাহলে পুস,” ওর গালে একটা টোকা দিয়ে বললেন, “তুমি আমার ওপর লুকিয়ে নজর রাখছ? যেমন তোমার বোন স্যুয়েলেন গত সপ্তাহে করেছিল! আর মা’কে গিয়ে আমার নামে লাগাবে?”

তাঁর কণ্ঠে কিছুটা উষ্মা আর কিছুটা মিনতি। স্কারলেট জিভ দিয়ে একটা আমোদসূচক শব্দ করে বাপীর টাই ঠিক করে দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। বাপীর নিঃশ্বাস ওর মুখে এসে পড়ছে। তাতে হালকা বুরবোঁর সৌরভ, তামাকের গন্ধের সঙ্গে মিলে মিশে একাকার। বাপীর শরীরের এই গন্ধের সংমিশ্রণটা স্কারলেট খুব পছন্দ করে। অন্য পুরুষ মানুষের কাছ থেকে এলেও।

“না বাপী, আমি স্যুয়েলেনের মত মাকে গিয়ে লাগাব না,” স্কারলেট আশ্বস্ত করল। তারপর জেরাল্ডের দিকে চেয়ে দেখে নিল পোষাক পরিচ্ছদ ঠিক দেখাচ্ছে কি না।

জেরাল্ড ছোটখাট মানুষ ছিলেন, লম্বায় পাঁচ ফুটের সামান্য বেশি। কিন্তু ভুড়ি আর দশাশই ঘাড় আর কাঁধের জন্য, বসে থাকা অবস্থায়, অপরিচিত লোকেরা তাঁকে লম্বা চওড়া মনে করত। আর এলাকার লোকেরা তাঁকে খুবই মান্যগন্য করত।

ষাট বছর বয়েস, কোঁকড়া চুলগুলো ধবধবে সাদা, মুখে কোন রকম বলিরেখা নেই আর তাঁর নীল চোখদুটো ছিল, সজীব, প্রাণবন্ত আর তারুণ্যে ভরপুর। তাঁর চোখ মুখ দেখে বোঝা যায় তাঁর পূর্বপুরুষেরা অনেকদিন আগে সুদূর আয়ার্ল্যান্ডের বাসিন্দা ছিলেন – গোলগাল, খর্ব নাসিকা, উজ্জ্বল বর্ণ, আর হঠকারী।

কিন্তু এই রাগী চেহারার মানুষটার হৃদয় ছিল খুবই কোমল। তিরষ্কৃত হয়ে কোন ক্রীতদাস যদি মনমরা হয়ে থাকে, কিংবা কোন বেড়ালের বাচ্চা মিউ মিউ করে, অথবা কোন শিশু যদি কান্নাকাটি করে, তবে সেটা তাঁর পক্ষে সহ্য করা খুব মুস্কিল। যারা তাঁর সাথে দেখা করতে আসত, তারা পাঁচ মিনিটেই এই কোমল হৃদয়ের আভাস পেয়ে যেত, কিন্তু সেটা তাঁকে বুঝতে দিত না। কারন সেটা তাঁর অহংকে আঘাত করত। উনি মনে করতেন, যখন উনি কাউকে বকাবকি করছেন, বা চেঁচিয়ে কোন আদেশ দিচ্ছেন, তখন সবাই তাঁর ভয়ে সিঁটিয়ে আছে। উনি কখনও বুঝতে পারেন নি যে একমাত্র যাঁকে এই প্ল্যান্টেশনের লোকেরা অমান্য করতে সাহস করত না তিনি হলেন এলেন, তাঁর স্ত্রী। কিন্তু এই রহস্য তাঁকে কখনও জানতে দেওয়া হয় নি। এলেন সহ বাগানের সকলের মধ্যেই একটা গোপন কিন্তু স্নেহের বোঝাপড়া ছিল যেন জেরাল্ডের হুকুমই এই বাগানের আইন।

স্কারলেট অবশ্য অন্যদের তুলনায়, জেরাল্ডের মেজাজকে কম ধর্তব্যের মধ্যে আনত। ও ছিল জেরাল্ডের সব সন্তানদের মধ্যে বড়। তাঁর তিনজন পুত্রসন্তান শৈশবেই মারা গেছে। জেরাল্ডও বুঝেছিলেন, এই বয়সে, তাঁর আর পুত্র সন্তান পাবার বিশেষ সম্ভাবনা নেই। তাই উনি স্কারলেটের সাথে যখন কথাবার্তা বলতেন, তখন তাকে ছেলের মর্যাদা দিয়েই কথা বলতেন। স্কারলেট এতে খুবই অভিভূত হত। ওর দুই ছোটবোনের থেকে বাপীর সাথে হাবভাবে তারই সব থেকে বেশি মিল। ক্যারীন – যার পুরো নাম ছিল ক্যারোলাইন আইরীন – নারীসুলভ কমনীয় আর স্বপ্নবিলাসী। আর স্যুয়েলেন – যার পুরো নাম স্যুসান এলিনর – নিজেকে একজন মার্জিত রূচির অভিজাত মেয়ে হিসেবে তুলে ধরতে চাইত।

এছাড়া, স্কারলেট আর জেরাল্ডের মধ্যে একটা অলিখিত কিন্তু পারষ্পরিক গোপনীয়তার চুক্তি ছিল। স্কারলেট আধ মাইল ঘুরে গেটের কাছে না গিয়ে অনেক সময়ই বেড়া ডিঙিয়ে বেরোত। আবার অনেকে সময় ছেলেদের সঙ্গে বেশ রাত করে আড্ডা দিত। জেরাল্ডের চোখে পড়লে বকাবকি করতেন ঠিকই। কিন্তু এলেনের কাছে লাগান নি। আর স্কারলেটও কখনও বাপীর ঘোড়া নিয়ে বেড়া টপকানোর কিংবা পোকারে কত টাকা হেরেছেন জানতে পারলেও (যেটা কউন্টির পরচর্চা থেকে জেনে ফেলাটা খুবই স্বাভাবিক), মায়ের কাছে বলে দিত না। জেরাল্ড আর স্কারলেট এ ব্যাপারে একমত ছিল যে এগুলো এলেনের কানে তুললে, এলেনের কোমল মনে আঘাত লাগবে। 

বিলীয়মান আলোয় স্কারলেট জেরাল্ডের দিকে তাকাল। কেন জানি না ওর মনে হল বাপীর সান্নিধ্য খুব স্বস্তিদায়ক। বাপীর মধ্যে সজীব, পার্থিব কিন্তু বন্য একটা ব্যাপার আছে, যেটা ওকে আকর্ষণ করে। বিশ্লেষণ করবার ক্ষমতা না থাকায় ও বুঝতে পারে না যে ওর মধ্যে সেই একই বিশেষত্বগুলো রয়েছে। এলেন আর ম্যামির এই বিশেষত্বগুলো দূর করে দেবার সদৈব প্রয়াস থাকা সত্ত্বেও। 

“যাক এখন তোমাকে ঠিকঠাক লাগছে,” স্কারলেট বলল, “মনে হয় না কেউ তোমার কসরত ধরতে পারবে; অবশ্য যদি না তুমি নিজেই বলে ফেল। কিন্তু, তোমার হাঁটু ভেঙ্গে যাবার পরে – আর এই বেড়াটা টপকাতে গিয়েই – কাজটা মনে হয় _____”

জেরাল্ড রেগে চেঁচিয়ে উঠলেন, “শেষমেশ নিজের মেয়ের কাছে শুনতে হবে না কি আমার কি করা উচিত আর কি উচিত নয়? ভাঙলে আমার ঘাড় ভাঙবে, সেটা মনে রেখো। তাছাড়া, বল তো শাল না জড়িয়ে, তুমি এসময় বাইরে কি করছ?”

স্কারলেট বুঝে ফেলল বাপী খুব অভ্যস্ত কায়দায় নিজেকে এই অপ্রীতিকর পরিস্থিতি থেকে বের করে আনার চেষ্টা করছেন। ও আলতো করে বাপীর হাতের ফাঁকে নিজের হাতটা ঢুকিয়ে বলল, “তোমারই জন্য অপেক্ষা করছিলাম বাপী। এত দেরি হবে তোমার বুঝতে পারি নি। জানতে ইচ্ছে করছিল ডিলসিকে তুমি কিনে ফেললে কি না।”

“হ্যা কিনেছি তো। কিন্তু দামটা আমাকে পথে বসিয়ে দিয়েছে। জন উইল্কস তো এমনিই দিতে চাইছিলেন। কিন্তু আমি – আমি বন্ধুত্বকে কাজে লাগিয়ে কাউকে ঠকিয়েছি, এ কথা বলার সুযোগ আমি দিতে চাই না। দু’জনের জন্য আমি তিন হাজার ডলার দিলাম।”

“হে ভগবান! তিন হাজার ডলার! তোমার তো প্রিসিকে কেনার দরকার ছিল না!”

“তাহলে এখন আমার মেয়েই আমার কাজের দোষগুণ বিচার করবে!” জেরাল্ড আবার চেঁচিয়ে উঠলেন। “প্রিসি একটা একরত্তি মেয়ে ___”

“জানি ওকে। একেবারে চালু মাল,” প্রত্তুত্তরে বলল স্কারলেট, খুব শান্ত ভাবে, বাপীর চেঁচানো কে গায়ে না মেখে। “নিশ্চয়ই ডিলসি বায়না করেছিল।”

জেরাল্ড একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়লেন। কেউ ওঁর কোমল মনের আভাস পেয়ে গেলেই উনি লজ্জিত হয়ে পড়েন। স্কারলেট খুব জোরে হেসে উঠল। 

“ঠিক আছে। না কিনে উপায় ছিল কি? ডিলসি যদি সারাদিন ওর জন্য উতলা হয়ে থাকত তাহলে? তবে আর কখনও আমার কোন নিগ্রোকে এই রকম বিয়ে করতে দেব না। খরচায় পোষাবে না। যাই হোক চল পুস, এবার খাবার জন্য এগোনো যাক।”

ততক্ষণে ছায়া আরও ঘন হয় এসেছে। আকাশে যে সবজে ভাবটা ছিল চলে গেছে, আবহাওয়ায় একটা শীতলতার স্পর্শ। স্কারলেট দেরি করতে লাগল আর ভাবতে লাগল, কি ভাবে বাপীর কাছে অ্যাশলের ব্যাপারটা তুলবে। কি উদ্দেশ্য, সেটা বাপীকে কিছুতেই জানতে দেওয়া চলবে না। ব্যাপারটা বেশ শক্ত। জেরাল্ডের মত ওর মধ্যেও কোন কূটকাচালি নেই, তাই দু’জনেরই গুঢ় উদ্দেশ্য কিছু থাকলে চট করে ধরা পড়ে যায়। 

“টুয়েল্ভ ওকসে কেমন আছে সকলে?”

“ঠিকই আছে। কেড ক্যাল্ভার্টও ছিল। ডিলসির ব্যাপারটা মিটে যাবার পরে আমরা গ্যালারিতে বসে একটু মদ খেলাম। কেড সবেমাত্র অ্যাটলান্টা থেকে ফিরেছে। ওখানে সবাই বিপর্যস্ত, সারাক্ষণ যুদ্ধের কথা ___”

স্কারলেট দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। যদি জেরাল্ড কোনভাবে যুদ্ধ আর জর্জিয়ার বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া এসব নিয়ে আলোচনায় বুঁদ হয়ে যান তাহলে বেশ কয়েক ঘন্টা ধরে সেটাই চলতে থাকবে।

“কালকের বারবেকিউ-এর ব্যাপারে কিছু বলাবলি করছিলেন?”

“হ্যা, মনে পড়েছে। বলছিলেন তো। মিস – কে যেন বেশ ওর নামটা – আরে ওই যে ভারি লক্ষ্মী মেয়ে, তুমি জানো অ্যাশলের পিসতুতো বোন – ও হ্যা মিস মেলানি হ্যামিলটন, ঠিক – ও আর ওর ভাই চার্লস – ওরা ত অ্যাটলান্টা থেকে এসে গিয়েছে আর ____”

“ওহ, ও সত্যিই এসেছে?”

“হ্যা এসেছে। আর সত্যি কি মিষ্টি মেয়ে, নিজেকে নিয়ে কখনও বড়াই করে না – ঠিক যেমন লেডিদের হওয়া উচিত। না চল চল, আর দেরি করলে তোমার মা আমাদের খুঁজতে বেরিয়ে যাবেন।”

খবরটা শুনে স্কারলেট একেবারে নিভে গিয়েছিল। ওর মনে খুব আশা ছিল যে মেলানি হ্যামিলটন কোন না কোন কারনে অ্যাটলান্টাতে আটকে থাকবে। কিন্তু বাপীও যখন ওকে শুনিয়ে মেলানির প্রশংসা করলেন, তখন খোলাখুলি কথা বলা ছাড়া ওর কোন উপায়ই থাকল না। 

“অ্যাশলেও ছিল ওখানে?”

“হ্যা ছিল,” জেরাল্ড নিজেকে স্কারলেটের বাহুমুক্ত করে তীক্ষ্ণ চোখে ওর দিকে তাকালেন। “তাহলে তুমি এজন্যই আমার জন্য অপেক্ষা করছিলে? সেটা সোজাসুজি বললেই পারতে!”

কি বলবে স্কারলেট ভেবে পেল না। ওর মুখমণ্ডল আরক্ত হয়ে উঠল। 

“কি হল, বল!”

স্কারলেট তবুও চুপ করে রইল। ওর মনে হল যদি বাপীকে ও চুপ করতে বলতে পারত!

“হ্যা ও ছিল। আর অত্যন্ত সম্ভ্রমের সঙ্গে তোমার কথা জিজ্ঞেস করেছে। ওর বোনেরাও। ওরা সবাই কালকের বারবেকিউতে তোমাকে নিশ্চয় করে যেতে অনুরোধ করেছে। আমিও কথা দিয়েছি তুমি নিশ্চয়ই যাবে। এবার আমাকে বল তো পুস, তোমার আর অ্যাশলের মধ্যে ব্যাপারটা কি?” 

“সেরকম কিছু নয় তো।” স্কারলেট তাড়াতাড়ি বলে বাপীর হাত ধরে টানল। “চল, ভেতরে চল বাপী।”

“তাহলে এখন তুমি ভেতরে যেতে চাইছ,” জেরাল্ড মন্তব্য করলেন। “কিন্তু তোমার মতিগতি ঠিক মত না বুঝে, আমি তো এখান থেকে নড়ছি না। তাই ইদানিং তোমার হাবভাব আমার কেমন কেমন লাগছিল! ও তোমাকে বিবাহের প্রস্তাব দিয়েছে না কি?” 

“না,” স্কারলেটের সংক্ষিপ্ত জবাব।

“আর দেবেও না,” জেরাল্ড বললেন।

ওর মনের মধ্যে একটা আলোড়ন সৃষ্টি হল। চোখে মুখে রাগ প্রকাশ পেল। জেরাল্ড হাত তুলে ওকে শান্ত করলেন।

“আমার কাছে শুনে নাও। জন উইল্কস নিজে আমাকে বলেছেন। অ্যাশলে মিস মেলানিকে বিয়ে করবে। কাল সবাইকে জানাবে ওরা। এখন কাউকে বলতে মানা করেছেন।”

স্কারলেট জেরাল্ডের বাহু থেকে হাত সরিয়ে নিল। তাঁর মানে খবরটা সত্যি!

একটা তীব্র বেদনার অনুভুতি তার মনকে আচ্ছন্ন করে ফেলল। ওর বাপী মেয়ের ভাবান্তর লক্ষ্য করলেন। তাঁর মনে একটু সহানুভুতি, একটু উষ্মায় উদ্বেল হয়ে উঠল। এ এমন এক সমস্যা, যার সমাধান তাঁর সাধ্যের বাইরে। উনি স্কারলেটকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন। কিন্তু তার ছেলেমানুষী সমস্যা তাঁকে খুব বিব্রত করে তুলল। এলেনকে বলতে পারত। সে ঠিকই একটা উপায় খুঁজে বের করত। 

উত্তেজিত হয়ে পড়লেই তিনি গলা চড়িয়ে কথা বলতেন। চেঁচিয়ে বললেন, “তুমি কি সকলের কাছে নিজেকে হাস্যাষ্পদ করতে চাও ____ আমাদের সবাইকে হাস্যাষ্পদ করে তুলতে চাও? তুমি এমন একজনের পেছন নিয়েছ যে তোমাকে ভালই বাসে না। অথচ তুমি চাইলে এই কাউন্টির অনেককেই তোমার পছন্দের তালিকায় রাখতে পারতে।”

রাগে আর অপমানে, স্কারলেট মনবেদনা চেপে রাখতে পারল না।

“মোটেই আমি ওর পেছন নিইনি। আমি শুধু আশ্চর্য হয়েছি!”

“মিথ্যে কথা বলছ,” বলেই স্কারলেটের মুখ দেখে তাঁর মনও ব্যথিত হয়ে উঠল। “মন খারাপ কোরো না মা। তোমার বয়স তো কত অল্প, আর দেখ কত ভাল ভাল ছেলেরা রয়েছে।”

“তোমাদের যখন বিয়ে হয়েছিল, মায়ের বয়স তখন মাত্র পনেরো। আর আমি এখন ষোল!” ধরা গলায় বলল স্কারলেট। 

“তোমার মায়ের কথা আলাদা,” জেরাল্ড বললেন। “ও কি তোমার মত এত অস্থিরচিত্ত? নাও এবার একটু হাসো। সামনের সপ্তাহে আমি তোমাকে চার্লস্টনে নিয়ে যাব। তোমার পিসী ইউল্যালির কাছে। আর ওখানে ফোর্ট সামটার নিয়ে ওদের মাতামাতি দেখে, এক সপ্তাহের মধ্যে তুমি অ্যাশলেকে ভুলে যাবে। দেখে নিও।”

“উনি ভাবছেন যে আমি ছেলেমানুষ,” স্কারলেট ভাবল। “আর মনে করছেন নতুন কোন খেলনা পেলেই আমি সব ভুলে যাব!” 

“এবার এই আলোচনা বন্ধ কর,” জেরাল্ড বললেন। “একটুও বুদ্ধি থাকলে অনেক আগেই স্টুয়ার্ট বা ব্রেন্ট টার্লটনদের একজনকে তুমি বিয়ে করতে পারতে! একটু ভেবে দেখো মা। ওদের একজনকে তুমি বিয়ে কর। তারপর আমার আর জেমস টার্লটনের খামার একসাথে চলবে, আর আমি তোমাদের জন্য একটা সুন্দর বাড়ি বানিয়ে দেব। ঠিক যেখানে আমাদের দুজনের খামার এসে মিলেছে। সেখানে পাইনগাছের বন থাকবে ______”

স্কারলেট চেঁচিয়ে উঠল। “তুমি কি আমাকে ছেলেমানুষ ভাবা বন্ধ করবে। চার্লসটনে আমার মোটেও যাবার ইচ্ছে নেই। চাই না আমার সুন্দর বাড়ি! ওই দুজনের একজনকেও আমি বিয়ে করতে চাই না! আমি শুধু চাই _____” নিজেকে সামলে নিল, কিন্তু তখন দেরী হয়ে গেছে।

জেরাল্ড খুব শান্ত কণ্ঠে, আস্তে আস্তে বলতে শুরু করলেন। মনে হল খুব ভেবে ভেবে কথাগুলো বলছেন, যেটা ওঁর স্বভাববিরুদ্ধ।

“তুমি শুধু অ্যাশলেকে বিয়ে করতে চাও, কেমন? কিন্তু দুঃখের বিষয় হল যে তুমি ওকে পাবে না। ও যদি তোমাকে বিয়ে করতে রাজীও হত, তাহলেও ওর মনে অনেক সংশয় থাকত।” তারপর স্কারলেটের চোখে মুখে বিস্ময় দেখে বললেন, “হ্যা, জন উইল্কস আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তবুও বলছি। আমি চাই আমার মেয়ে সুখী হোক। কিন্তু তুমি অ্যাশলেকে বিয়ে করে সুখী হতে পারতে না।”

“না, আমি হতাম। নিশ্চয়ই সুখী হতাম।”

“হতে না মা। দুজনে মনের দিক থেকে একরকম না হলে, বিয়ে করে সুখী হওয়া যায় না।”

স্কারলেটের চেঁচিয়ে উঠে বলতে ইচ্ছে করল, “তাহলে তুমি আর মা কি করে সুখী হলে? তোমরা তো মনের দিক থেকে এক নও!” কিন্তু বলল না। তার প্রগলভ আচরণে বিরক্ত হয়ে বাপী ওর কান মুলে দিতে পারেন।

জেরাল্ড ধীরে ধীরে বলে চললেন, “উইল্কসরা আমাদের থেকে আলাদা। এ অঞ্চলের অনেকের থেকেই আলাদা। ওরা নিজেদের আত্মীয় পরিজনদের মধ্যেই বিয়ে করে। সেটাই ভাল। ওদের ব্যতিক্রমী চিন্তা ভাবনা ওদের নিজেদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।”

“কিন্তু অ্যাশলে ___”

“তুমি চুপ কর। ওর বিরুদ্ধে আমি কিছু বলছি না। বরং আমি ওকে খুব পছন্দ করি। ব্যতিক্রমী বলতে আমি ওদের পাগলাটে বলি নি ও ক্যাল্ভার্টদের মত একটা ঘোড়ার জন্য সব কিছু বাজী লাগিয়ে বসবে না, কিংবা টার্লটনভাইদের মত মাতলামি করে বেড়ায় না, বা ফোনটেনদের মত বদরাগি নয়, যারা পান থেকে চুন খসলে মানুষ খুন করতে পারে। এ ধরনের পাগলামো তাও বোঝা যায়। ভগবান না করুন, জেরাল্ড ও’হারার মধ্যেও এসব দোষ থাকতে পারত। এটাও আমি বলব না যে তুমি ওর বউ হওয়া সত্বেও অ্যাশলে অন্য কোন মেয়ের সাথে পালিয়ে যেত। সেটা করলেও ওকে বুঝতে কোন অসুবিধে হত না। কিন্তু ওকে বুঝে উঠতে পারাটাই কঠিন। আমার ওকে ভাল লাগে। তবে ওর চিন্তা ভাবনার মাথা মুণ্ডু আমি কিছুই বুঝতে পারিনা। ওর কথাবার্তা আমার কাছে দুর্বোধ্য লাগে। তুমিই বল না, কবিতা, সঙ্গীত, পুরোনো পেন্টিং এসব তুচ্ছ ব্যাপার নিয়ে ওর মাথা ঘামানোর কোন মানে তুমি খুঁজে পাও?” 

“ওকে বিয়ে করলে, এ সবই আমি বদলে দিতে পারতাম,” স্কারলেট প্রতিবাদ করল।

“ও তাই ভাবছ বুঝি?” একটু শ্লেষের সঙ্গেই জেরাল্ড বললেন। “তাহলে জেনে নাও কোন বউই তার স্বামীকে একটুও বদলাতে পারে না। আর অ্যাশলে কে? ওদের পরিবারের সবাই ওরই মত। চিরটা কাল! নিউ ইয়র্ক আর বোস্টনে নাটক আর তৈলচিত্রের প্রদর্শণীর জন্য কি ভাবে ছুটে যায় দেখনি? আর ইয়াঙ্কিদের কাছ থেকে বাক্স বাক্স ফরাসী আর জার্মান বই কিনে আনে? তারপর সেই সব বই ঘন্টার পর ঘন্টা বসে পড়বে আর ভগবান জানে কি সব স্বপ্ন দেখতে থাকবে? এসব বাজে কাজে লেগে না থেকে, পুরুষমানুষের মত শিকার করে কিংবা পোকার খেলেও তো সময়ের সদ্ব্যবহার করতে পারত!” 

অ্যাশলের পৌরুষ নিয়ে খোঁটা দেওয়ায় স্কারলেট মনে মনে খুব চটে গেল। “এ তল্লাটে অ্যাশলের থেকে ভাল ঘোড়ায় চড়তে আর কেউই পারে না। হয়ত ওর বাবা ছাড়া। আর পোকার খেলার কথা বলছ? কেন গত সপ্তাহেই তো তুমি জোন্সবোরোতে ওর কাছে দুশো ডলার হেরেছ!”

“তার মানে ক্যাল্ভার্টের ছোড়াগুলো আবার আজেবাজে কথা বলতে শুরু করেছে!” জেরাল্ড হাল ছেড়ে দিলেন। “নইলে কত টাকা তুমি কি করে জানবে? অ্যাশলে সব থেকে পাকা লোকের সঙ্গেই ঘোড়ায় চড়ে আর পোকার খেলে, সে হল আমি। আর মদ খেতে থাকলে ও টার্লটনদের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারে। কিন্তু মুশকিল কোথায় জানো – ওর মন এগুলোতে নেই। তাই আমার ওকে অন্য রকম মনে হয়।”

স্কারলেট নিশ্চুপ হয়ে গেল। কোন প্রতিবাদ করতে পারল না। বাপী যা বলছেন সেটা পুরোপুরি সত্যি। এই সব মজার ব্যাপারগুলো, যেটা ও এত ভাল ভাবে করতে পারে, সেগুলোতে ওর শুধুমাত্র একটা আলগা আকর্ষণ রয়েছে। অথচ আর সবাই এসব কাজে কত আনন্দ পায়!

জেরাল্ড স্কারলেটের চুপ করে থাকার কারন ভাল করেই বুঝতে পারলেন। একটু জয়ের হাসি হেসে বললেন, কি সোনা, তুমি নিজেও স্বীকার করছ যে কথাগুলো সত্যি। তাই না? তাহলেই বল অ্যাশলের মত বর নিয়ে তুমি কি করবে? ওদের প্রত্যেকের মাথায়ই একটু ছিট আছে।” তারপর একটু মন ভোলানোর মত করে বললেন, “আমি যে টার্লটনদের কথা বললাম, ভেবো না যে আমি তোমাকে কোন জোর করছি। ওরা খারাপ নয়। কিন্তু তোমার যদি কেড কাল্ভার্টকে মনে ধরে, তাহলেও আমাদের আপত্তি নেই। ওরাও ভাল। তবে দোষের মধ্যে হল যে ওর বাবা একজন ইয়াঙ্কিকে বিয়ে করেছেন। আর একটা কথা মন দিয়ে শুনে রাখ মামনি। আমি এই টারা তোমাকে আর কেডকেই দিয়ে যাব।”

“দোহাই তোমার, তুমি এরকম করে জোর কোরো না। আমি কেডকে চাই না। আর টারা বা অন্য কোন পুরোনো প্ল্যান্টেশন নিয়েই বা কি হবে যদি আমি _____”

স্কারলেট বলতে যাচ্ছিল “যদি আমি মনের মানুষকে না পাই”। কিন্তু ও যেভাবে জেরাল্ডের দেওয়া উপহার অবজ্ঞার সাথে প্রত্যাখান করল, তাতে উনি যার পর নাই অসন্তুষ্ট হলেন। এলেনের পর এই প্ল্যান্টেশনকেই উনি সর্বাধিক ভালবাসতেন। উনি গর্জন করে উঠলেন।

“তাহলে, স্কারলেট ও’হারা, তুমি এটাই বলতে চাও, যে টারা, আমাদের এই খেত, এর কোনোই মূল্য নেই?”

স্কারলেট একগুঁয়েভাবে ঘাড় নাড়ল। ওর মনের এখন যে অবস্থা, তাতে বাপী রেগে গেল কি গেল না, তাতে ওর কিছুই এসে যায় না। 

“জমিই এই সংসারে একমাত্র সম্পদ, যার কোনো মূল্য আছে!” জেরাল্ড চেঁচিয়ে বললেন। তাঁর ছোট ছোট হাত দুটো রাগতভাবে ওঠা নামা করতে লাগল। “কারন এই মাটিই অনন্তকাল টিকে থাকে। এ কথা ভুলে যেও না। এটাই একমাত্র সম্পদ, যার জন্য কাজ করতে হয়, লড়াই করতে, দরকার পড়লে প্রাণ বিসর্জন দিতে হয়।”

অধৈর্য হয়ে স্কারলেট বলে উঠল, “ওঃ বাপী তুমি একদম আইরীশদের মত কথা বলছ!”

“কি মনে কর, আমি তার জন্য লজ্জা পাই? না! গর্বে আমার বুক ফুলে ওঠে। আর ভুলে যেও না তুমিও অর্ধেক আইরীশ! আর যাদের শরীরে বিন্দুমাত্র আইরীশ রক্ত আছে, তারা মাটিকে, নিজেদের আশ্রয়কে, মা বলে মনে করে। এই মুহুর্তে, তোমার জন্যই আমার লজ্জা হচ্ছে। আমি তোমাকে পৃথিবীর সুন্দরতম খেত দিতে চাইলাম। আর তুমি নাক কুঁচকোলে!”

বেশ একটা তৃপ্তি নিয়ে চেঁচিয়ে জেরাল্ড স্কারলেটকে বকছিলেন। হয়ত আরো কিছুক্ষণ চলত। কিন্তু হঠাৎ ওর দুঃখপীড়িত মুখের দিকে নজর পড়তেই থেমে গেলেন। 

“তুমি তো এখনও কিশোরি। তুমিও একদিন অনুভব করবে – এই মাটির টান – যদি তোমার মধ্যে আইরীশ রক্ত থাকে। তুমি তো শিশু। তোমার ভালবাসার মানুষকে নিয়ে ব্যস্ত রয়েছ। আরো একটু বড় হও, তখন বুঝতে পারবে ___। এখন তুমি শুধু কেড, বা যমজভাইদের একজনকে পছন্দ করে নাও – তেমন হলে – ইভান মুনরোর কোন এক ছেলে হলেও চলবে – তারপর দেখো আমি তোমার জন্য কি কি করি।”

“ওহ বাপী।”

এতক্ষণ কথাবার্তা বলে, জেরাল্ড পরিশ্রান্ত বোধ করছিলেন। এমন একটা সমস্যা তাঁর ঘাড়ে এসে পড়ার জন্য বিরক্তও বোধ করছিলেন। সব থেকে বড় কথা হল, কাউন্টির সব থেকে অভিজাত পরিবারের ছেলেদের ব্যাপারে তাঁর অমত নেই জানানোর পর আর টারা প্ল্যান্টেশনের যৌতুক দেবার লোভ দেখানোর পরেও স্কারলেটের মনমরা ভাব মুছে যায় নি, এতে তিনি ক্ষুব্ধ বোধ করছিলেন। ওঁর কাছ থেকে কোন উপহার পেলে সবাই হাততালি দেবে, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে, এটাতেই উনি অভ্যস্ত। 

“নাও, আর মুখ ভার করে থেকো না। কাকে বিয়ে করছ তাতে কিছু এসে যায় না। যেটা প্রয়োজন সেটা হল চিন্তাভাবনার সাদৃশ্য। তাকে ভদ্রলোক হতে হবে। আর সাদার্নার হিসেবে সে গর্ববোধ করে কি না। মেয়েদের ভালবাসা বিয়ের পরেই আসে।”

“বাপী, এটা তো পুরোনো দিনের ধারণা!”

“কিন্তু খুব মজবুত ধারণা। ভালবেসে বিয়ে করার এই আমেরিকান ধারণা – ঠিক যেন চাকর বাকর কিংবা ইয়াঙ্কিদের মত। মা বাবা পাত্র-পাত্রী পছন্দ করে বিয়ে দেবেন – এই সব বিয়েই টেঁকসই হয়। এই ধর তোমার মত একটা বোকা মেয়ে কি করে বুঝবে যে কে ভদ্রলোক আর কে ইতর? উইল্কসদের কথাই ধরা যাক। এত পুরুষ ধরেও কি ভাবে ওদের শক্তি আর গর্ববোধ ধরে রাখতে পেরেছে? কিছুই নয়, ওরা সব সময় নিজেদের মধ্যে বিয়ে করে, তাই। আর ওদের পরিবারও সেটাই চায়।” 

“ওঃ!” স্কারলেটের হৃদয় আবার ব্যথায় ভরে উঠল।

“আবার কাঁদছ মামনি?” জেরাল্ড বিব্রত হয়ে বললেন। ঝুঁকে পড়ে অপটু হাতে স্কারলেটের চিবুক ধরে ওর মুখটা তুলে ধরলেন। তাঁর চোখে সমবেদনার দৃষ্টি।

“না কাঁদছি না” বলে স্কারলেট এক ঝটকায় সরে গেল।

“না তুমি সত্যি বলছ না। কিন্তু আমি তোমার জন্য গর্ববোধ করছি। তোমার আত্মমর্যাদা বোধের জন্য। কাল তুমি বারবেকিউতে মাথা উঁচু করে যাবে। আমি চাই না কেউ বলুক যে তুমি এমন একজন কে ভালবাস যে সাধারণ বন্ধুত্ব ছাড়া তোমাকে তার মনে জায়গা দেয় নি।” 

“মনে জায়গা নিশ্চয়ই দিয়েছিল,” স্কারলেট বেদনার্ত মনে ভাবল। “অনেকখানিই দিয়েছিল। আমি জানি। ওহ, আর একটু সময় পাওয়া গেলে আমি ওকে দিয়ে বলিয়ে নিতে পারতাম! ইশ! নিজেদের মধ্যেই বিয়ে করা উচিত এরকম একটা ধারণা উইল্কসদের মধ্যে না থাকলে কত ভাল হত!” 

জেরাল্ড স্কারলেটের হাতটা নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে নিলেন, আর বললেন, “চল, এবার খাবার সময় হয়ে গেছে। হ্যা আর এসব শুধু তোমার আর আমার মধ্যেই থাকা ভাল। তোমার মা কে এ নিয়ে জ্বালাতন করে লাভ নেই। নাও চোখ মুখ মুছে নাও।”

রুমালে মুখ মুছে বাপীর হাত ধরে ও এগিয়ে গেল। বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছে স্কারলেট আবার কিছু বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু অন্ধকারে মনে হল বারান্দায় তার মা দাঁড়িয়ে রয়েছেন। মাথায় বনেট, গায়ে শাল আর হাতে দস্তানা। পেছনে থমথমে মুখে ম্যামি। তার হাতে এলেনের ওষুধের পেটি,যা দিয়ে তিনি পীড়িতদের শুশ্রুষা করেন। ম্যামিকে দেখে মনে হচ্ছে খুবই রেগে আছে। অপছন্দের কিছু হলে ম্যামির রেগে যাওয়ার অভ্যেস।

“মিস্টার ও’হারা,” এলেন বললেন। সতের বছর বিয়ে হবার আর ছটি সন্তানের জন্ম দেবার পরেও তিনি এই লৌকিক সম্বোধন ছাড়তে পারেন নি। “স্ল্যাটারিদের ওখানে অসুস্থতার খবর পেয়েছি। এমির বাচ্চা হয়েছে। বোধহয় বাঁচবে না। তার আগে ব্যাপটাইজ় করতে হবে। ম্যামিকে নিয়ে ওখানেই যাচ্ছি। যদি কিছু করতে পারি।” 

তারপর প্রশ্নসূচকভাবে জেরাল্ডের দিকে তাকালেন। একটা আনুষ্ঠানিক অনুমোদন কেবল, কিন্তু জেরাল্ডের অহংবোধকে পরিতৃপ্ত করে। 

“জানি না কেন এইসব বেজন্মা সাদারা তোমাকে এই সাপারটাও নিশ্চিন্ত মনে খেতে দেবে না! কি আর করবে? যাও। নইলে তো তুমি নিশ্চিন্ত মনে ঘুমোতেও পারবে না।”

“এইসব নিগ্রো আর গরীব বেজন্মা সাদাদের জন্য উনি কখনও কি রাতে শুতে পারেন!” ম্যামি একঘেয়ে স্বরে গজগজ করতে লাগল।

“আজ খাবার টেবিলে আমার জায়গাটা তুমি নিও সোনা,” দস্তানাপরা হাতে স্কারলেটের গালে আলতো করে হাত বুলিয়ে এলেন বললেন।

অশান্ত মন নিয়েও মায়ের হাতের যাদুষ্পর্শে আর মায়ের সিল্কের ড্রেস থেকে লেবুর ফুলের সুগন্ধ স্কারলেটকে কিছুটা সান্ত্বনা দিল। স্কারলেটের মনে হত তার মাকে ঘিরে এমন কিছু একটা যাদু আছে যা তাকে সব সময় স্বস্তি আর আনন্দ দেয়। 

জেরাল্ড এলেনকে সাবধানে গাড়িতে উঠিয়ে দিলেন। তারপর গাড়োয়ানকে সাবধানে গাড়ি চালাবার আদেশ দিলেন। টোবি এই আদেশটা মোটেই সন্তুষ্ট মনে নিল না। মনে হল তার কাজে এটা জেরাল্ডের ফোপরদালালি। অবশ্য মুখে কিছু বলল না। এলেনকে নিয়ে ম্যামি আর টোবি অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।

“যদি আমি স্ল্যাটারিদের জন্য এত কিছু না করতাম, তাহলে ওদের অন্য জায়গায় পয়সা দিয়ে করাতে হত,” জেরাল্ড রাগতস্বরে বললেন। “আর এর জন্য ওদের কয়েক একর জলা জমি বিক্রী করে দিতে বাধ্য হত। তাহলে অন্তত ওদের হাত থেকে বাঁচা যেত।” তারপর একটু হেসে, যেন কোন পুরোনো রসিকতার কথা মনে পড়েছে, বললেন, “চল, পোর্ককে গিয়ে বলা যাক, ডিলসিকে কেনার বদলে ওকেই আমি উইল্কসদের কাছে বেচে দিয়েছি।”

ঘোড়ার লাগাম একজন নিগ্রো পরিচারকের হাতে দিয়ে তিনি সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে গেলেন। স্কারলেটের মর্মবেদনার কথা বিলকুল ভুলে গিয়ে তাঁর পরিচারকের পেছনে লাগবার জন্য তিনি ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। ভারি মন আর শরীর নিয়ে স্কারলেটও সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠল। ভাবতে লাগল, অ্যাশলের সঙ্গে ওর বিয়ে হলে সেটা নিশ্চয়ই ওর বাপী আর এলেন রোবিল্যার ও’হারার বিয়ের থেকে বেশি অসঙ্গত হবে না। মাঝে মাঝে ও অবাক হয়ে ভাবে যে বাপীর মত একজন অনুভূতিহীন এবং অমার্জিত মানুষের সঙ্গে মায়ের মত একজন মহিলার বিয়ে হয়েছিল, যাঁরা জন্মসূত্রে, শিক্ষাদীক্ষায় আর মানসিকতায় এত আলাদা!
ক্রমশ






অনুবাদক পরিচিতি
উৎপল দাশগুপ্ত
ফটোগ্রাফার। অনুবাদক।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন