শনিবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০১৭

ক্ষমতা, সত্তা: মিশেল ফুকোর সাথে একটি কথোপকথন

অনুবাদ : ইমন রেজা 

রেক্স মার্টিন : 
 আপনি ইউনিভাসিটি অফ ভেরমন্ট-এ কী কাজে এসেছেন?

মিশেল ফুকো :
আমি এখানে এসেছি কয়েকজন মানুষের কাছে আরো বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করার জন্য যে, আমি কি ধরনের কাজ করছি, জানার জন্যে তারা কি ধরনের কাজ করছেন এবং তাদের সাথে কিছু স্থায়ী সর্ম্পক স্থাপন করার জন্য।
আমি একজন লেখক, একজন দার্শনিক কিংবা চিন্তা জগতের এক মহান ব্যক্তিত্ব নই: আমি একজন শিক্ষক। এখানে সামাজিক কিছু বিষয় আছে যা আমাকে প্রচ- ঝামেলায় ফেলেছে: ১৯৬০ সাল থেকে এটা শুরু হয়েছে, আরো কয়েকজন শিক্ষক আছেন যারা পাবলিক মেন-এ পরিণত হয়েছেন, একই ধরনের বাধ্যবাধকতা নিয়ে।

আমি একজন নবী হতে চাই না আর বলতে চাই না যে, “দয়া করে বসুন, আমি যা বলছি তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।” আমি এখানে এসেছি আমাদের কমন কাজগুলি নিয়ে আলোচনা করার জন্যে।

রেক্স মার্টিন : 
আপনাকে প্রায়ই অভিহিত করা হয় “দার্শনিক” হিসাবে, কিন্তু আবার “ঐতিহাসিক”, “স্ট্রাকচারালিস্ট” এবং “মার্কসিস্ট” হিসাবেও। কলেজ ডি ফ্রান্সে আপনার চেয়ারের টাইটেল হচ্ছে “চিন্তার পদ্ধতিগুলির ইতিহাসের অধ্যাপক (Professor of the History of Systems of Thought)। এর দ্বারা কী বোঝায়?

মিশেল ফুকো :
আমি মনে করি না যে, এটা জানা খুব জরুরী যে সত্যি সত্যি আমি কে। জীবনে এবং কাজের মধ্যে মানুষের মূল উদ্দেশ্য থাকে এমন একজন হওয়া যা সে প্রথম থেকেই ছিল না। আপনি যদি একটা বই লিখতে চান আর প্রথম থেকেই জানেন যে এর শেষে আপনি কী বলবেন, তাহলে আপনি কি সেটা লেখার সাহস করতে পারবেন? একটা লেখার ক্ষেত্রে বা প্রেমের সর্ম্পকের ক্ষেত্রে যা সত্যি, জীবনের ক্ষেত্রেও তা সত্যি। এই খেলাটা ততদূর পর্যন্তই অর্থপূর্ণ যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা তার শেষটা জানতে পারি না। আমার কাজের ক্ষেত্র হচ্ছে, চিন্তার ইতিহাস। মানুষ একটা চিন্তাশীল প্রাণী। সে যা চিন্তা করে তা তার সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি ও ইতিহাসের সাথে জড়িত এবং কিছু সাধারণ ও সার্বজনীন প্রণালী এবং আনুষ্ঠানিক নির্মিতির সাথেও জড়িত। কিন্তু চিন্তা অবশ্যই সামাজিক সর্ম্পকগুলির বাইরে আলাদা একটা জিনিস। মানুষ সত্যিকারভাবে যেভাবে চিন্তা করে তা যুক্তির সার্বজনীন প্রণালীগুলি দিয়ে পর্যাপ্তভাবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। সামাজিক ইতিহাস এবং চিন্তার পদ্ধতিগত দিকগুলির মাঝখানে আরেকটা পথ আছে, একটা লাইন আছে-হয়ত খুব সরু-সেই পথটাই হচ্ছে চিন্তার ইতিহাসের পথ।

রেক্স মার্টিন : 
যৌনতার ইতিহাসে আপনি এমন একজন ব্যক্তিত্বের কথা বলেছেন, যে “স্থায়ী নিয়মগুলিকে বিব্রত করে এবং কোন না কোনভাবে অনাগত স্বাধীনতাকে এন্টিসিপেড করতে পারে”। আপনি কি আপনার কাজগুলিকে এই আলোকে দেখেন?

মিশেল ফুকো :
না। বরং অনেকসময় ধরে, লোকজন আমাকে জিজ্ঞাসা করত তাদেরকে বলার জন্য যে কী ঘটবে এবং ভবিষ্যতের জন্য তাদেরকে একটা কর্মসূচি দেয়ার জন্যে। আমরা খুব ভালো করেই জানি যে, খুব ভালো উদ্দেশ্য থাকা সত্ত্বেও, এইসব কর্মসূচিগুলি নিপীড়নের জন্য একটা উপায় হিসাবে, একটা হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করা হয়। স্বাধীনতার একজন প্রেমিক হিসাবে রুশোকে ফরাসী বিপ্লবে ব্যবহার করা হয়েছে সামাজিক নিপীড়নের একটা আদর্শ তৈরী করার জন্যে। স্ট্যালিনিজম আর লেনিনিজম দেখলে মার্কস আঁতকে উঠতেন। আমার ভূমিকা হচ্ছে একটা শব্দ আরো জোরালোভাবে বলা-মানুষদেরকে দেখানো যে, তারা যা অনুভব করে তার চাইতে তারা অনেকবেশি স্বাধীন; মানুষ সত্য হিসাবে, প্রমাণ হিসাবে যা গ্রহণ করে, কিছু বিষয়বস্তু যা ইতিহাসের একটা নির্দিষ্ট ক্ষণের মধ্যে গড়ে উঠেছে এবং এইসব তথাকথিত প্রমাণগুলিকে সমালোচনা এবং ধ্বংস করা সম্ভব। মানুষের মনের ভিতরের কোনকিছুকে পরিবর্তন করা-এটাই একজন ইন্টেলেকচুয়ালের কাজ।


রেক্স মার্টিন : 
আপনার লেখাগুলিতে দেখা যায় যে আপনাকে সেই চরিত্রগুলি প্রবলভাবে আর্কষণ করে যারা সমাজের প্রান্তে অবস্থান করে, যেমন: পাগল, কুষ্ঠরোগী, অপরাধী, বিচ্ছিন্ন ব্যক্তি, হিজড়া, খুনী, অখ্যাত চিন্তাবিদ। এটা কেন?

মিশেল ফুকো :
আমাকে প্রায়ই গাল-মন্দ করা হয়েছে ইতিহাসের মূলধারার চাইতে প্রান্তিক চিন্তাবিদদের নির্বাচন করার জন্যে। আমার উত্তরটা এই ক্ষেত্রে উদ্ধতই হবে : বপ এবং রিকার্ডোর মতো চরিত্রদেরকে অবসকিউর হিসাবে দেখা অসম্ভব।

রেক্স মার্টিন : 
 কিন্তু র্নিবান্ধদের (social outcasts) প্রতি আপনার আগ্রহের কারণ কী ?

মিশেল ফুকো :
আমি অবসকিউর চরিত্রগুলি এবং প্রক্রিয়াগুলি নিয়ে কাজ করি মূলত দুইটা কারণে: পশ্চিম ইউরোপীয় সমাজগুলি যে রাজনৈতিক এবং সামাজিক প্রক্রিয়াগুলির মাধ্যমে বিন্যস্ত করে তা খুব বেশি আলাদা কিছু নয়, যা ভুলে যাওয়া হয়েছে অথবা যা অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। তারা আমাদের সবচেয়ে পরিচিত ল্যান্ডস্কেপের অংশ এবং আমরা তাদেরকে আর উপলদ্ধি করতে পারি না। কিন্তু তাদের বেশিরভাগই ছিল খারাপভাবে আলোচিত ব্যক্তি। এটা আমার টার্গেটগুলির মধ্যে একটা যে, মানুষকে দেখানো, এমন অনেক কিছু আছে যা আমাদের ল্যান্ডস্কেপের অংশ-এবং মানুষ যে সার্বজনীন-তা আসলে কয়েকটা খুব সংক্ষিপ্ত ঐতিহাসিক পরিবর্তনের ফলাফল। আমার সমস্ত পর্যালোচনা মানুষের সার্বজনীন অস্তিত্বের প্রয়োজনীয়তার ধারণার বিরুদ্ধে। তারা সংস্থাগুলির আবেগায়িত দিকগুলিকে তুলে ধরে এবং তুলে ধরে স্বাধীনতার কোন স্পেস আমরা এখনো উপভোগ করতে পারি এবং কতগুলি পরিবর্তন এখনো সম্ভব।


রেক্স মার্টিন :
 আপনার লেখাগুলি গভীর আবেগের প্রবণতা বহন করে যা পাণ্ডিত্যপূর্ণ পর্যালোচনাগুলিতে পাওয়া যায় না: যেমন ডিসিপ্লিন এবং পানিশ এ গভীর যন্ত্রণা, দি অর্ডার অফ থিন্কস এ অবজ্ঞা এবং আশা, ম্যাডনেস এন্ড সিভিলাইজেশন এ নিষ্ঠুরতা এবং বিষন্নতা।

মিশেল ফুকো :
আমার প্রতিটা কাজই আমার জীবনের অংশ। যে কোন একটা বা অন্য কারণেই হোক এইসব বিষয় দেখার এবং উপলদ্ধি করার সুযোগ আমার হয়েছিল। একটা সহজ উদাহারণ নেয়া যাক, ১৯৫০ সালের দিকে আমি একটা মনোচিকিৎসার হাসপাতালে কাজ করতাম। দর্শন পড়ার পর আমি দেখতে চাচ্ছিলাম যে, পাগলামিটা কী রকম: আমি যুক্তি বোঝার জন্য যথেষ্ঠ পাগল ছিলাম , আর আমি যথেষ্ঠ যৌক্তিক ছিলাম পাগলামি বোঝার জন্য। আমি রোগী থেকে এটেনডেন্টস পর্যন্ত যাবার জন্য স্বাধীন ছিলাম, আমার নির্দিষ্ট কোন ভূমিকা ছিল না। এটা ছিল নিউরোসার্জারির প্রস্ফুটিত হওয়ার সময়, সাইকোফার্মালজি শুরুর সময়, ট্রাডিশন্যাল সংস্থাগুলির বিদায়ের সময়। প্রথমে আমি এটা ধরে নিয়েছিলাম যে, এর প্রয়োজন আছে, কিন্তু এর তিনমাস পরে (আমি এমনিতেই সবকিছু একটু দেরিতে বুঝি), আমি প্রশ্ন করলাম “এই জিনিসগুলির কী দরকার?” এর তিন বছর পর আমি চাকরিটা ছেড়ে দেই এবং প্রচ- ব্যক্তিগত মানসিক অস্বত্বি নিয়ে সুইডেন যাই এবং এইসব প্রাকটিসগুলির ইতিহাস নিয়ে লিখতে শুরু করি (মেডনেস এন্ড সিভিলাইজেশন)। মেডনেস এন্ড সিভিলাইজেশন প্রথম খ- হওয়ার কথা ছিল। আমি প্রথম খ-টা লিখতে চাচ্ছিলাম এবং দ্বিতীয় খন্ডটা লিখতে ঘৃণাবোধ করছিলাম। এটা দেখা হয়েছিল মনোচিকিৎসা-নিকেতন এর একটা বিষয় হিসাবে, কিন্তু এটা ছিল ইতিহাসের একটা বর্ণনা। আপনি কী বিজ্ঞান এবং কপট বিজ্ঞানের পার্থক্যটা জানেন? একটা সত্যিকারের বিজ্ঞান নিজেকে আক্রান্ত মনে না করে তার নিজস্ব ইতিহাসকে বুঝতে পারে এবং গ্রহণ করে। যখন আপনি কোনো মনোচিকিৎসককে বলেন যে, তার মানসিক হাসপাতাল ল্যাজার হাউজ থেকে উৎপত্তি হয়েছে, তখন সে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠবে।


রেক্স মার্টিন :
 আর ডিসিপ্লিন এন্ড পানিশ এর ঘটনাটা কী?

মিশেল ফুকো :
আমি অবশ্যই স্বীকার করব যে, আমার সাথে জেলখানার বা কয়েদীদের কোনো সরাসরি যোগাযোগ ছিল না, যদিও আমি একটা ফরাসী জেলখানায় সাইকোলজিস্ট হিসাবে কাজ করেছি। আমি যখন তিউনিসিয়ায় ছিলাম, তখন দেখেছি যে, লোকজনকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে জেলে পোরা হচ্ছে, আর এটা আমাকে প্রভাবিত করেছিল।


রেক্স মার্টিন :
আপনার লেখাগুলিতে ক্ল্যাসিক্যাল যুগ কেন্দ্রীয় বিষয় হিসাবে এসেছে। আপনি কি ঐ সময়ের স্পষ্টতার জন্য নস্টালজিক বোধ করেন বা রেঁনেসার “দৃষ্টিগ্রাহ্যতা”র জন্য যখন সবকিছুই সংঘবদ্ধ এবং দৃশ্যমান ছিল?

মিশেল ফুকো :
অতীত সময়ের সৌন্দর্যের একটা প্রভাব আছে এবং তা নস্টালজিয়ার কারণে না। আমি খুব ভালো করেই জানি যে, এটা আমাদের নিজেদের আবিষ্কার। কিন্তু এই ধরনের নস্টালজিয়া থাকা ভালো, যতটা ভালো নিজের ছেলেবেলার সাথে সর্ম্পক থাকা যখন আপনার সন্তান আছে। কিছু সময় ধরে এই ধরনের নস্টালজিয়া থাকা ভালো এই শর্তে যে, বর্তমানের সাথে তখন সুচিন্তিত এবং পজিটিভ একটা সর্ম্পক থাকে। কিন্তু নস্টালজিয়া যদি বর্তমানের সাথে আগ্রাসী হওয়ার জন্যে এবং বর্তমানকে উপলব্ধি না করার জন্য হয়, তাহলে তা বাদ দেয়া উচিত।

রেক্স মার্টিন :
আপনি অবসর সময়ে কী ধরনের বই পড়েন?

মিশেল ফুকো :
যে ধরনের বই আমার সবচেয়ে বেশি আবেগ জাগিয়ে তোলে, তা হচ্ছে: ফকনার, টমাস মান, ম্যালকম লরি’র অ্যান্ডার দ্যা ভলকানো।


রেক্স মার্টিন :
 আপনার চিন্তা-ভাবনার উপর এদের প্রভাবটা কী রকম?

মিশেল ফুকো :
আমি খুব বিস্মিত হয়েছি যখন বার্কলিতে আমার দুইজন বন্ধু আমার সর্ম্পকে লিখেছেন এবং বলেছেন যে, আমার উপর হাইডেগারের প্রভাব আছে Hubert L. Dreyfus and Paul Rabinow, Michel Foucault: Beyond Structuralism and Hermeneutics (Chicago; University of Chicago Press, 1982)]। অবশ্যই এটা খানিকটা সত্যি, কিন্তু ফ্রান্সে এটা কেউ বুঝতে পারবে না। ১৯৫০ এর দিকে যখন আমি ছাত্র ছিলাম, আমি হুসার্ল, সার্ত্রে, মার্লো-পন্টি পড়েছি। আপনি যখন বুঝতে পারবেন যে, কারো প্রভাব আপনাকে ছেয়ে ফেলছে তখন আপনি একটা পথ বের করার চেষ্টা করবেন। স্ববিরোধী মনে হলেও এটা যথেষ্ঠ সত্যি যে, হাইডেগারকে বোঝা একজন ফরাসীর জন্যে এতটা কঠিন নয়। যখন প্রতিটা শব্দই একটা বিভ্রান্তিকর প্রশ্ন তখন হাইডেগারকে বোঝার জন্য আপনি খুব একটা বাজে অবস্থায় থাকবেন না। তার বিয়িং এন্ড টাইম কঠিন; কিন্তু তার সাম্প্রতিক কাজগুলি অনেক বেশি স্পষ্ট। নিটশে-কে আমার একটা বিস্ময়কর প্রকাশ বলে মনে হয়েছে। আমার মনে হয়েছে যে, এ পর্যন্ত আমি যা শিখেছি এটা তার চাইতে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটা কিছু। আমি তাকে প্রচ- আবেগের সাথে পড়েছি এবং আমার জীবন দিয়ে ভেঙেছি, আমি পাগলাগারদের চাকরিটা ছেড়ে দিই এবং ফ্রান্স ছেড়ে দিই : আমার এমন একটা অনুভূতি ছিল যে, আমি আটকা পড়ে যাচ্ছি। নিটশে-র মাধ্যমেই আমি এইসব কিছুর প্রতি একজন অপরিচিত ব্যক্তিতে পরিণত হতে পেরেছি। আমি এখনো ফ্রান্সের সামাজিক এবং বুদ্ধিবৃত্তির সাথে এতটা জড়িত নই। আমি যদি আরেকটু কমবয়স্ক হতাম, তাহলে আমি যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী হতাম।

রেক্স মার্টিন :
কেন?

মিশেল ফুকো :
আমি এর সম্ভাবনা দেখি। কারণ সেখানে একই ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক এবং সাংস্কৃতিক জীবন নেই; একজন বিদেশী হিসাবে আপনার জড়িত হওয়ার প্রসঙ্গ আসতো না। সেখানে আমার উপর কোনো চাপ আসতো না। সেখানে অনেক ভালো বিশ্ববিদ্যালয় আছে, যাদের বিভিন্ন বিষয়ে আগ্রহ আছে। তবে অবশ্যই সেখান থেকে আমাকে বের করে দেয়া হতে পারতো এবং সবচেয়ে জঘন্যভাবে।

রেক্স মার্টিন :
আপনি এটা মনে করছেন কেন যে, আপনাকে তারা বের করে দিত?

মিশেল ফুকো :
আমি খুব গর্বিত এই কারণে যে, কিছু লোক মনে করে আমি ছাত্রদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। যখন লোকজন তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাস্থ্যের কথা চিন্তা করতে শুরু করে আমার মনে হয় সেখানে একটা গ-গোল আছে। তাদের মতামত অনুসারে আমি একজন ক্ষতিকর ব্যক্তি, যেহেতু আমি একজন ছদ্ম-মার্কসবাদী, একজন অযৌক্তিকতাবাদী, একজন নাস্তিবাদী।

রেক্স মার্টিন :
আপনার দি অর্ডার অফ থিন্কস পড়ে যে কেউ এই সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারে যে, সংস্কারের জন্য যে কোনো ব্যক্তিগত প্রচেষ্টা অসম্ভব, কেননা নতুন আবিষ্কারগুলির এত অর্থ এবং নিহিতার্থ আছে যে, আবিষ্কারকের পক্ষে এই বিষয়গুলি বোঝা সম্ভব নয়। আবার ডিসিপ্লিন এন্ড পানিশ এ আপনি দেখিয়েছেন যে, সংঘবদ্ধ পুলিশের সাহসের চাইতে একটা চেইন গ্যাং-এর সাহসের ক্ষেত্রটাতে হঠাৎ একটা পরিবর্তন আছে, জাঁকজমকপূর্ণ শাস্তির জায়গায় এসেছে নিয়মতান্ত্রিক সংস্থার শাস্তি। কিন্তু আপনি এই জিনিসটাও দেখিয়েছেন যে, একটা সময় যা মনে হয়েছে “সংস্কার”, তা আসলে সমাজের শাস্তি প্রদানের ক্ষমতাটাকে স্বাভাবিক করেছে মাত্র। তো, সচেতন পরিবর্তন কীভাবে সম্ভব?

মিশেল ফুকো :
আপনি কী করে ভাবেন যে, আমি চিন্তা করি পরিবর্তন অসম্ভব, যেখানে আমি যা বিশ্লেষণ করেছি তা সবসময় রাজনৈতিক কাজকর্মের সাথে জড়িত? ডিসিপ্লিন এন্ড পানশ এ আমার সমস্ত চেষ্টাই হচ্ছে এই প্রশ্নটার উত্তর দেয়া এবং দেখানো যে, একটা নতুন ধরনের চিন্তা তৈরি হচ্ছে। আমরা সবাই হচ্ছি জীবন্ত এবং চিন্তাশীল বিষয়। আমি যার বিপক্ষে বলি, তা হচ্ছে সামাজিক ইতিহাস এবং চিন্তার ইতিহাসের মধ্যে যে ফাঁকটা আছে, তা নিয়ে। সামাজিক ঐতিহাসিকরা বর্র্ণনা করতে চান যে, কীভাবে মানুষ চিন্তা না করে কাজ করে, আর চিন্তার ঐতিহাসিকরা বর্ণনা করতে চান যে, কীভাবে মানুষ কাজ না করে চিন্তা করে। সবাই কাজ করে এবং চিন্তা করে। মানুষ যেভাবে কাজ করে বা প্রতিক্রিয়া জানায় তা তার চিন্তার পদ্ধতির সাথে জড়িত আর তার চিন্তা অবশ্যই একটা ঐতিহ্যের সাথে জড়িত। যা আমি বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করেছি তা একটা জটিল বিষয় যা অল্প সময়ের মধ্যে মানুষকে অপরাধ এবং অপরাধীদেরকে ভিন্ন একটা দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে বাধ্য করেছে। আমি দুই ধরনের বই লিখেছি। একটা হচ্ছে, দি অর্ডার অফ থিন্কস, যা শুধুমাত্র বৈজ্ঞানিক চিন্তার সাথে জড়িত : আর অন্যটি, ডিসিপ্লিন অ্যান্ড পানিশ, যা সামাজিক রীতি-নীতি এবং প্রতিষ্ঠানগুলির সাথে জড়িত। বিজ্ঞানের ইতিহাস একইভাবে বিকশিত হয় নাই যেভাবে সামাজিক সংবেদনশীলতাগুলি তৈরি হয়েছে। একটা বৈজ্ঞানিক ডিসকোর্স হিসাবে চিহ্ণিত করতে গেলে চিন্তাকে অবশ্যই নির্দিষ্ট কিছু মানদ- মেনে চলতে হবে। ডিসিপ্লিন এন্ড পানিশ এ টেক্সটগুলি, প্রয়োগগুলি এবং মানুষ একে অন্যের বিরুদ্ধে লড়াই করছে। আমার বইগুলিতে আমি এই পরিবর্তনগুলি বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করেছি; বস্তুগত কারণগুলি আবিষ্কার করার জন্য নয় বরং সব উপাদানগুলি দেখানোর জন্য যা মানুষের মিথস্ক্রিয়ায় এবং প্রতিক্রিয়াগুলিতে এসেছে। আমি মানুষের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করি। একই পরিস্থিতিতে মানুষ সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে।

রেক্স মার্টিন :
 আপনি ডিসিপ্লিন এন্ড পানিশ এই বলে শেষ করেছেন যে, এটা “আধুনিক সমাজের বিভিন্ন অধ্যয়নের নিয়মানুগকরণ এবং জ্ঞানের ক্ষমতার মেরুদন্ড হিসাবে কাজ করবে”। এই নিয়মানুগ এবং জ্ঞানের কেন্দ্র হিসাবে মানুষ এর ধারণার মধ্যে সর্ম্পকটা কী?

মিশেল ফুকো :
মনোবিজ্ঞান, চিকিৎসাবিজ্ঞান, প্রায়শ্চিত্তের বিধান, শিক্ষামূলক-এইসব বিভিন্ন কর্মগুলির মাধ্যমে মানবিকতা সর্ম্পকে একটা নির্দিষ্ট রকমের ধারণা বা রূপ তৈরি করা হয়েছে, আর এখন মানুষ সর্ম্পকে এই ধারণাটা অনেকটাই নিয়মাত্মক, স্বতঃসিদ্ধ এবং সার্বজনীন বলে ধরে নেয়া হচ্ছে। মানবতাবাদ সার্বজনীন নাও হতে পারে, কিন্তু নির্দিষ্ট একটা পরিস্থিতির উপর নির্ভরশীল হতে পারে। আমরা যাকে মানবতাবাদ বলছি, তা মার্কসবাদীদের দ্বারা, উদারপন্থীদের দ্বারা, নাজীদের দ্বারা, ক্যাথলিকদের দ্বারা ব্যবহার করা হয়েছে। এর মাধ্যমে এটা বোঝায় না যে, আমরা মানবিক অধিকার বা স্বাধীনতা থেকে মুক্তি পেয়েছি, কিন্তু আবার আমরা স্বাধীনতা বা মানবিক অধিকারকে নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রের ভিতর সীমাবদ্ধ করতে পারি না। উদাহারণস্বরূপ, আপনি যদি আশি বছর আগে প্রশ্ন করতেন যে, নারীর সতীত্ব সার্বজনীন মানবিকতার অংশ কিনা, সম্ভবত সবাই হ্যাঁ-সূচক উত্তর দিতেন। আমি মানবতাবাদের যে দিকটা নিয়ে ভীত তা হচ্ছে এটা আমাদের নৈতিকতার নির্দিষ্ট একটা রূপকে প্রকাশ করে যা যে কোন ধরনের স্বাধীনতার জন্য একটা সার্বজনীন আদর্শ। আমার মনে হয় এখানে আরো অনেক গোপন আছে, আরো অনেক সম্ভাব্য স্বাধীনতা আছে, আরো অনেক উদ্ভাবন অপেক্ষা করছে আমাদের ভবিষ্যতে, যা মানবতাবাদের মধ্যে আমরা কল্পনা করি, যা গোঁড়ামিভাবে প্রকাশ করা হয় রাজনৈতিক রংধনুর প্রতিটা দিক থেকে: বাম, মধ্যপন্থী এবং ডানদের কাছ থেকে।

রেক্স মার্টিন :
আর এটাই কী প্রস্তাব করা হয়েছে “টেকনোলজিস অফ দি সেলফ”-এ?

মিশেল ফুকো :
হ্যাঁ। আপনি এর আগে বলেছিলেন যে, আপনার এইরকম একটা ধারণা আছে যে, আমার সর্ম্পকে ভবিষ্যদ্বাণী করা যায় না। এটা সত্যি। কিন্তু আমি মাঝে মাঝে নিজেকে প্রকাশ করি অনেক সুশৃংখল এবং অপরিবর্তনীয়ভাবে। আমি যা অধ্যয়ন করেছি তা আসলে তিনটি প্রথাগত সমস্যা: (১) বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের মধ্যে দিয়ে সত্যের সাথে আমাদের সর্ম্পকগুলি কী রকম, আর এই “সত্যের খেলাগুলি”র মধ্যে সভ্যতার জন্যে কোনটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর কোনটাতে আমরা বিষয় এবং বিষয়ী উভয়ই? (২) এইসব অদ্ভুত কৌশলগুলি এবং ক্ষমতা-সর্ম্পকগুলির মধ্যে দিয়ে অন্যদের সাথে আমাদের কোন সর্ম্পকগুলি আছে? (৩) সত্য, ক্ষমতা এবং সত্তার মধ্যে কোন সর্ম্পকগুলি আছে? আমি একটা প্রশ্নের মাধ্যমে এই আলোচনাটা শেষ করতে চাই: এই প্রশ্নগুলির চাইতে ক্ল্যাসিক আর কী আছে এবং এর চাইতে সুশৃংখল যাচাইয়ের পথ আর কী আছে প্রশ্ন এক, দুই ও তিন এবং এর থেকে আবার এক এ ফিরে যাওয়ার পথটাতে? আর আমি এই জায়গাটাতেই দাঁড়িয়ে আছি।


২৫ শে অক্টোবর, ১৯৮২
মিশেল ফুকো: জন্ম: ১৫ই অক্টোবর ১৯২৬, মৃত্যু: ২৫শে জুন ১৯৮৪.

http://braungardt.trialectics.com/projects/political-theory/foucault/truth-power-self-interview/

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন