শনিবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০১৭

বিশ্বদীপ চক্রবর্তীর গল্প : বিচ্ছিন্ন দ্বীপসমূহ

জানলার ধারে জায়গা পেয়ে অসিত ঘুমিয়ে পড়েছিল ।

এমন আখছার ঘটে না। অফিস ফেরত জনতার চাপে টইটম্বুর বাসে দাঁড়ানোই মুশকিল, বসা দূরের কথা। কিন্তু আজ বাসের রড ধরে ধনুকের মত ঝুলতে থাকা অসিতের ভাগ্যে শিকে ছিঁড়ে গেল।
তাও আবার জানলার ধার! সন্ধ্যার ফুরফুরে হাওয়ায় দেখতে না দেখতে চোখ ভারী। দুবার জানালার রডে ঠোকা খেয়ে ভুরুর উপরে আলু, একবার তো পাশের লোকটার কাঁধে গোঁত্তা। তার জোড়াভুরুর কটমটেও ঘুম যায়নি। চোখে যে কি আঠা লেগেছিল!

কেমন করে নিজের স্টপে নামল, সেই শুধু জানে। বাসটা ব্রেক কষে থামতেই আবার রডে মাথা ঠোকার সাথে সাথে চোখে পড়েছিল চৌধুরী মেডিক্যালসের সাইন বোর্ডটা। ওমনি পড়ি কি মরি করে নামার জন্য ডাইভ। ভিড় তখনো বেশ, কলকাতার বাস রাত এগারোটার আগে কোথাও খালি হয়? দরজার চারপাশের লোকজন যেন চিঁড়ে চ্যাপ্টা করে দিচ্ছিল। কেউ এক পা যেতে দেবে না। অসিতের হাতে সময় কোথায়, চেঁচাল-স্টপ চলে যাচ্ছে দাদা, নামতে দিন। কেউ ফুট কাটল, এতক্ষণ কি গড়ের মাঠে হাওয়া খেতে গেছিলেন দাদা? অ্যাই অ্যাই পা মাড়াবেন না- ছুঁচ হয়ে ঢুকে ফাল হয়ে বেরোবেন নাকি-– দাদা, এটা পা না খুড়? এক হেঁড়ে গলা বলল, লেজে মোচড় মারুন দাদা, না হলে শুনবে না। কালীপূজোর রাতের বাজী ফোটার মত ফুটফাট কথা ফাটছিল। সেসবে কান দেওয়ার সময় ছিল না তার।

এই সবের মধ্যে দিয়ে, গায়ে অন্য লোকের ঘামের গন্ধ মেখে যখন রাস্তায় পা দিতে পারল, ততক্ষণে পরের স্টপে পৌঁছে গেছে। যাক, কি আর করা যাবে। ঘুমনোর খেসারত তো দিতেই হবে। একদিকে ভালই হল, হাঁটার মুখে বাজারটা পড়বে, কটা টুকটাক জিনিস তুলে ফেলবে। সকালে দেখেছে পেস্টটা শেষ হয়ে এসেছে, সাবি বলছিল নতুন কি মশা মারার ট্যাবলেট বেরিয়েছে গুডনাইটের থেকে ভাল- এইসবই নিচ্ছিল পালের দোকান থেকে। যা হয়, দুটো দরকারি জিনিসের সাথে আর পাঁচটা অদরকারী জিনিস ঠিক জুড়ে যায়। একশো টাকার বেশি বিল হয়ে গেল। তাতে কিছু না, মুশকিলটা হল পকেটে হাত দিয়ে। মানিব্যাগ নেই। এবার বুঝতে পারল এত কথার পটকা কেন পড়ছিল নামার সময়। সেই সময়েই তার পকেট থেকে তুলে নিয়েছে। জানলার ধারে বসে বড্ড গচ্চা গেল তো আজ! হাতের ফোলিওতে শুধু টিফিনের বাক্স, ওখানে কোন টাকা নেই। জিনিসগুলো নিয়ে এখন কি করে? দোকানটা মুখচেনা, ধারে নেবে?

অসিতের হঠাৎ মুখের পরিবর্তনটা নিশ্চয় চোখে পড়ার মত ছিল। কারন লোকটা প্লাস্টিকের মধ্যে রাখা জিনিসগুলো তার হাতে ধরাতে এসে থমকে গেল – কিছু প্রবলেম হল নাকি দাদা?

আর বলবেন না, পিকপকেট হয়ে গেছে। বুঝতেও পারিনি, কি হাতের সাফাই বলুন! এখন যেই টাকার জন্য পেছন পকেট ধরেছি- আমি বাড়ি হয়ে আপনাকে টাকাটা দিয়ে যাই?

লোকটা কিছু না বলে মাছের চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইল।

কেন, অসুবিধা আছে? অসিতের কান গরম হচ্ছিল।

দেখুন কিছু মনে করবেন না। কত লোকই তো আসে, সবাইকে কি অত চিনি? তাছাড়া আমার দাদার দোকান। আপনাকে আমি ঠিক- আপনি এক কাজ করুন না হয়। আমি আপনার জিনিসটা সাইডে রেখে দিচ্ছি। ঝাঁপ পড়ার আগে এসে পড়লেই পেয়ে যাবেন।

অসিতের বেজায় রাগ হল। কিন্তু গিলে নিতে হল। রোজ এর থেকে কিছু না কিছু নিচ্ছে, নগদ টাকা দিয়ে। এই লোকটাই থাকে বেশির ভাগ সময়। অথচ আজ একটা অসুবিধায় পড়েছে, এখন আর চিনতেই পারছে না।

জিনিস ফেলে হনহন করে হাঁটা লাগাল অসিত। আর দেখ না দেখ ঠিক সেই সময়েই ঝপ করে আলো নিভে গেল। বেশির ভাগ দোকানেই সাথে সাথে অন্য আলো জ্বলে উঠল, কোথাও কোথাও জেনারেটরের গোঁ গোঁ শব্দ। যদিও সব আলো কি আর জ্বলল? জ্বললেও মলিন হয়ে, কিংবা দুটোর জায়গায় একটা- এরকম। চারদিকে একটু আলো আঁধারি । অবশ্য এসব রাস্তায় অসিত এত বছর ধরে হাঁটছে যে চোখ বুঁজে বাড়ি পৌঁছে যেতে পারে। আর গেলোও। ক মিনিটের তো হাঁটা পথ। তার বাড়িতে জেনারেটরের দুটো পয়েন্ট নেওয়া আছে। কোনার ঘরে বিলু পড়ছে, তাই সেখানে আলো। রান্নাঘরেও জ্বলছে, সাবি নিশ্চয় খাবার গরম করছে এখন। না হলে এখন ওই পয়েন্টটা দিয়ে টিভি চলত।

কারেন্ট নেই, তাই বেল কাজ করছে না। দরজায় একবার ঠুকঠুক করে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল। কেউ খুলল না। আবার। আস্তে আস্তে অধৈর্য হচ্ছিল অসিত। আবার কড়া বাজাল, এবার জোরে ঠকঠক, ঠকঠক। এবার কারো আসার শব্দ পেলো , সাবির গলাও। আসছি বাবা, আসছি। একটু দাঁড়াও না বাপু!

কুট করে ছিটকিনি নামিয়ে দরজা খুলে দাঁড়াল সাবি। হাতের মোমবাতির কাঁপা আলোয় সাবির মুখের হাসি বিরক্তিতে বদলাতে দেখল অসিত।

উফ, আর বলো না দিনটা যা খারাপ যাচ্ছে আজ, আর দেখো পাড়ায় ঢুকতে ঢুকতে পাওয়ার কাট। হাতের টিফিনবাক্স ভরা ফোলিওটা সাবির দিকে বাড়িয়ে দিতে দিতে বলল অসিত।

কাকে চাই? দুটো পাল্লার একটা বন্ধ করে কঠিন গলায় বলল সাবি।

মানে? কি ইয়ারকি মারছ? কাউকে চাই না, নিজের বাড়িতে ঢুকতে চাই।

দেখুন অন্ধকারে আপনি কিছু ভুল করেছেন, এটা আপনার বাড়ি নয়। আপনারটা হয়তো আগে পরে, কত নম্বর বলুন, আমি বলে দিচ্ছি।

পার্স হারিয়ে মনটা এমনিতেই খিঁচরে ছিল। সাবিত্রীর এইসব অদ্ভুত কথায় একদম জ্বলে উঠল অসিত। এসবের কি মানে সাবি? আমি অসিত, তোমার বর। এমন কি লোড শেডিং হল যে আমাকে চেনা যাচ্ছে না?

আপনি কি যা তা বলছেন? ভাবছেন বাড়িতে ব্যাটাছেলে নেই , অন্ধকারে বাড়ির বউ ঠকাতে এসেছেন? বিলু, এই বিলু! দৌড়ে আয় তো একবার এদিকে। সাবিত্রী ভয় পাচ্ছিল, তার কাঁপা হাত থেকে মোমবাতি ধুপ করে মেঝেয় পড়ে নিভে গেল। সাথে সাথে চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। ওমা গো! বলে সাবিত্রী দড়াম করে দরজা বন্ধ করে দিল।

এটা কি সন্ধ্যা যাচ্ছে আজ! অসিতের নিজেরই কিরকম গা ছমছম করছিল। মানি ব্যাগ গেছে, সে না হয় বোঝা গেল। কিন্তু তার নিজের বাড়ি, মানে ভাড়া বাড়ি কিন্তু থাকে তো আজ প্রায় দশ বছর। নিজের বউ,সেও আঠেরো বছরের সম্পর্ক। তাকে চিনতে পারছে না? মাথাটা ভোঁ ভোঁ করছিল। কোথায় ভাবছিল এখন বসে ফোন করে করে হারিয়ে যাওয়া ক্রেডিট কার্ডগুলো ব্লক করবে, তা না অন্ধকার রাস্তায় নিজের বাড়ির বন্ধ দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। প্রচন্ড রাগে নাকের ডগাটা তিরতির করে কাঁপছিল অসিতের। এবার আর কড়া নাড়া নয়, ধাম ধাম করে দরজায় মারতে শুরু করল।

ক্যাঁচ করে দরজা খুলল, অর্ধেক। সাবি, পিছনে বিলু, হাতে দরজার খিল। দেখুন এটা ভদ্রলোকের বাড়ি, বিরক্ত করলে এবার পুলিশ ডাকব।

কি পাগলামি করছ সাবি? বিলু, এই বিলু! মাকে বোঝা না। এমন কি হল যে আমাকে চেনা যাচ্ছে না?

বিলু ক্লাস টেনে পড়ে। নাকের নিচে বেশ হালকা মত গোঁফ গজিয়েছে। দেখতে দেখতে কত বড় হয়ে গেল ছেলেটা। স্যান্ডো গেঞ্জির আড়াল ভেদ করে সারা গায়ে পুরুষোচিত রোমরাশি, একটু বেশিই। অসিতের এমনটা নেই, মামার বাড়ির ধারা পেয়েছে। বড় হয়েছে, ও বুঝবে, মাকে সামলাতেও পারবে।

আপনার কি চাই বলুন তো। ভদ্র পাড়ায় এসে কিসব করছেন ভর সন্ধ্যাবেলায়? মাল খেয়ে হল্লা করার জায়গা এটা নয়। না কি ভাবছেন লোডশেডিঙের সুবিধে নিয়ে ঘরে ঢুকে পড়বেন?

বিলুর গলাটা কেমন বড়দের মত হয়ে গেছে। নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিল না অসিত। এও কি সম্ভব? এমন কি হয়ে গেছে যে মা ছেলে দুজনেই আজ তাকে চিনতে অস্বীকার করছে? ইয়ার্কি মারছে? কিন্তু এটাতো পয়লা এপ্রিল নয়।

দেখো তোমরা মা ছেলেতে হয়তো আজ মজা করবে ভেবে রেখেছিলে, কিন্তু আজকের দিনটা সেরকম নয়। আমার এক্ষুনি বাসে আসতে পার্স চুরি গেছে, পাড়ার দোকানে জিনিস কিনে পয়সা দিতে না পেরে রেখে এসেছি। আমার এসব ইয়ারকি মারার সময় নেই।

বিলু এতক্ষণে সাবিত্রীকে আড়াল করে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। দেখুন আমাদেরও ইয়ারকি মারার সময় নেই। গলা মোটা করে কথা বলছে এবার। আপনি অন্যের বাড়িতে এসে ফালতু ঝামেলা করছেন। আমার বাবা এখনো ফেরেনি। কিন্তু একটু জোরে ডাক দিলে পাড়ার দাদারা এসে পড়বে। তাদের মারের হাত থেকে আপনাকে বাঁচাতে পারব না কিন্তু।

রাগে অসিতের মাথা ঝাঁ ঝাঁ করছিল। ইচ্ছে করছিল ছেলেটাকে ঠাঁটিয়ে এক চড় মারে, নিজের বাবাকে চিনতে পারিস না হারামজাদা! কোনমতে নিজেকে সামলাল অসিত। কি প্রমান চাই তোদের? নিজের বাড়িতে ঢোকার আগে যে প্রমান পরিচয়পত্র দেখাতে হবে সেটা আগে কখনো বুঝি নি।

কি প্রমান আছে আপনার কাছে?

আই কার্ড, ক্রেডিট কার্ড সবই তো গেছে ওই মানি ব্যাগের সাথে। কি প্রমান দেবে এখন অসিত? দিশেহারা অসিত ফোলিও ব্যাগ থেকে টিফিন বাক্স বের করতে চায়। সাবিত্রিকে উদ্দেশ্য করে বলতে চায়, এটা দেখলে তো চিনতে পারবে? আজ সকালেও রুটি আর কালকের রান্না করার চিকেন দিয়ে সকাল বেলায় ভরে দিয়েছিলে। কিন্তু ফোলিও খুলতে খুলতেই বুঝতে পারে এটা অন্য কারো। ঘুম চোখে বাস থেকে তাড়াহুড়োয় নামতে গিয়ে হয়তো পাশের লোকটার ব্যাগ নিয়ে নেমে পড়েছে।

অসহায় লাগে অসিতের। বিলু, তুই তোর বাবাকে চিনতে পারছিস না? তুই কি রে?

দেখুন বাবা হলে ঠিকই চিনতে পারতাম। আপনার যদি ওয়েট করতে হয়, রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকুন। আমার বাবা এখুনি আসবেন।

বিলু, রমেনকে একবার ডাকবি? এই লোকটা যদি তোর বাবা না আসা অবধি এখন দরজার বাইরে বসে থাকে, শান্তিতে কোন কাজ সারতে পারব?

রমেনকাকু এখনো ফেরেনি মা, আজ মাঠে খেলা দেখতে যাবার কথা ছিল। নটার আগে ফিরবে না। বিলু এবার তার দিকে ফিরে গম্ভীর গলায় বলল, দেখুন আমরা কোন পুলিসের ঝামেলায় যেতে চাই না। আপনি যাই করতে এসে থাকুন, সেসব ভুলে-

বিলু, বিলু আমি তোর বাবা, চিনতে পারছিস না তোরা? দিশেহারা অসিতের গলা থেকে বেরোনো হাহাকার এখন গোঙানির মত শোনায়। তার চোখের সামনে থেকে চেনা জীবনটাকে কে যেন টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে বাতাসে উড়িয়ে দিচ্ছে এখন। অসিত হাঁকপাঁক করতে করতে সেই ছেঁড়া টুকরো ধরার চেষ্টা করছে। হঠাত মনে পড়ল – মোবাইল! সাবি, এই দেখো আমার মোবাইল, চিনতে পারছ? এই দেখো আমাকে আজ সকালে মেসেজ পাঠিয়েছিলে, তোমাকে ফোন করবো এই মোবাইল থেকে ?

সাবিত্রী ডুকরে কেঁদে উঠল – বিলু, তোর বাবার কি হয়েছে রে? এই লোকটা তোর বাবার মোবাইল হাতাল কি করে?

বিলু এক ঝটকায় অসিতের হাত থেকে মোবাইলটা কেড়ে নিল। নিশ্চয় পকেটমার, বাবার পকেট থেকে মোবাইলটা চুরি করে এখন এবাড়িতে এসেছে বড় দাঁও মারবে বলে। কি সাহস! বেরো, বেরো এখান থেকে। রাস্তার ভিখারীর মত ধাক্কা মেরে বের করে দিল ওরা অসিতকে। চোখের সামনে দড়াম করে দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল।

কয়েক মিনিটের মধ্যে অসিতের জীবনটা কিরকম তালগোল পাকিয়ে গেল যেন।

কবে যে সবকিছু এমন করে বদলে গেল! কিভাবে যে বদলে গেল! বিলু তার পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত। রাতে ফিরে ছেলের ঘরের পর্দা সরিয়ে দেখেছে ছেলে বইয়ের উপর উপুড় হয়ে আছে, অসিত খুশি হয়ে নিজের ঘরে চলে গেছে। ছুটির দিনে ছেলে মোবাইলের দুনিয়ায়, কথা বলতে গেলে শুনতেও পেতো না। অসিত কথা বাড়ায় নি। আর সাবি সারাদিন কাজ কর্মে ব্যাস্ত, সন্ধ্যা বেলায় তার টিভির জগত। অসিত খবরের কাগজ, ম্যাগাজিন এদিক ওদিক ঘাঁটাঘাঁটি করে হয়তো খেয়ে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ল। তার আবার ক্যুরিয়ার কোম্পানির কাজ, সকাল বেলায় হাজিরা না দিলেই নয়। সাবি কখন শুতে আসে, কি করে অসিত জানেও না, কথাও হয় না। আর কি কথা হবে? তাদের সবকথা যেন ফুরিয়ে গিয়েছিল। কেমন আছো, কিছু লাগবে, টেলিফোন বিলটা দিতে ভুলো না, বিলুর স্কুলের ফি, বাড়িওয়ালা এসেছিল, এইতো সব কথা। এসব কথাও তো বাইরেরই, সম্পর্কের বারান্দায় দাঁড়ানো। অন্দরমহলের অন্তরঙ্গতাহীন।

আজ তারা সমুদ্রে ভেসে বেড়ানো কটা বিচ্ছিন্ন দ্বীপমাত্র।

এইসময় টুক করে একটা আওয়াজ হল। অসিত দেখল তার বাড়ির দরজা খুলে গেল। ও কে? কে ও? হ্যাঁ, ওই তো অসিত। সাবি দরজা খুলে দিল। সাবির বাড়ান হাতে টিফিন বাক্স ধরিয়ে দিল গলিটা এখনো অন্ধকারে ডুবে রয়েছে। প্রতি বাড়িতে একটা দুটো আলো জ্বলছে, তার বেশি না। সবাই এখন টিভিতে মেগা সিরিয়াল দেখায় ব্যস্ত। কোন কোন বাড়ি থেকে ছেলে মেয়েদের পড়ার আওয়াজ ভেসে আসছে। কোথাও বা টুকরো কথা, এদিক ওদিক ছিটকে পড়া হাসির আওয়াজ। তার বাইরে গলিটা পরিচিত নিস্তব্ধতায় ডুবে। শুধু এসবের মধ্যে অসিত এক ঝটকায় অপরিচিত আগন্তুক হয়ে গেছে।

কি হয়েছে তার? অসিতের ভাবতে ইচ্ছে হল যে শুধু অন্ধকার বলে সাবি কিংবা বিলু তাকে চিনতে পারে নি। কিন্তু এটা কি সম্ভব যে নিজের বউ ছেলে তাকে আলোর অভাবে চিনতে পারবে না? এইসব সম্পর্ককে চেনার জন্য কি আলো লাগে? এইতো সেদিন এমনি অন্ধকার রাস্তা দিয়ে আসছিল। পাড়ার পান বিড়ির দোকানটার পাশে আরও দুটো ছেলের সাথে দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছিল বিলু। অন্ধকারে মুখ দেখা যায় না। কিন্তু জ্বলন্ত সিগারেটের লাল আলোর বিন্দুর মধ্যে নিজের ছেলেকে ঠিক খুঁজে নিয়েছিল অসিতের চোখ। তারপর বাড়িতে এসে – সুতরাং আলোটা কোন সমস্যা না। তাহলে তার মধ্যে কি এমন কোন পরিবর্তন হল? এমনি সময়ে এটা একটা আজগুবি ভাবনা বলে উড়িয়ে দিত অসিত, কিন্তু আজকে যা সব ঘটছে তারপর সেরকম কিছু অসম্ভব নয়। নিজের মুখটা একবার দেখতে পেলে হত। মোড়ের পান বিড়ির দোকানটায় টিমটিম করে আলো জ্বলছে। ওদের দোকানে কি আয়না থাকে? পান সিগারেট খাওয়ার কোন অভ্যাস নেই অসিতের। শুধু মাঝে মাঝে কোল্ড ড্রিঙ্কসের বোতল নিতে যায় ওই দোকানে। উলটো দিকের ফুটপাথে দাঁড়িয়ে দেখল দোকানে একটা আয়না আছে কোনের দিকে। কিন্তু সেখানে মুখ দেখতে হলে একদম কাছে যেতে হবে। কিভাবে যাবে? পকেটে একটা পয়সা নেই যে কোল্ড ড্রিঙ্কস কেনার বাহানায় সামনে গিয়ে দাড়াবে। রাস্তা পার হয়েও তাই দোকানের কাছে হুমড়ি খেয়ে পরতে পারছিল না অসিত।

লোকটাই চোখ তুলে তাকাল। কিছু চাই নাকি বাবু? রাস্তা হারিয়ে ফেলেছেন?

অসিত বুঝতে পারল যে এই লোকটাও তাকে চিনতে পারে নি। না হলে আসা যাওয়ার পথে রোজ দেখছে, আর এদের নজর সাঙ্ঘাতিক, একবার দেখলেই মনে রাখে। তাই চেনা দেওয়ার ব্যার্থ চেষ্টা না করে বলল, আমি একজনের বাড়ি যাবো, ওনার নাম অসিত চৌধুরী। ওর বাড়িটা কোথায় বলতে পারেন?

অসিতবাবুর বাড়ি যাবেন? ওইতো আর তিনটে বাড়ি বাদ দিয়ে ডান দিকে, ঐযে একটা জানালায় মোমবাতি জ্বলছে না – ওই বাড়িটা।

অসিতের দেখা হয়ে গেছে। এটা সে নয়। মানে আয়নায় যে লোকটাকে দেখল সে অসিত নয়, অন্তত অসিত তাকে চেনে না। একটু আগে ভাবছিল তার বোন মিনতির বাড়ি কসবা, হেঁটে চলে যাবে সেখানেই। কিন্তু এখন বুঝতে পারল তাতেও কোন লাভ নেই। বরং নিলয় মানে মিনতির বর একটু মারকুটে, মারধোর খাওয়ার বিস্তর সম্ভাবনা।

আর কিছু চাই বাবু, পান সিগারেট? লোকটা চোখ একটু সন্দিগ্ধ এখন। অসিত তাড়াতাড়ি করে সরে গেল দোকানটার সামনে থেকে। তার যা দেখার দেখা হয়ে গেছিল। আয়নায় যে মুখ দেখল সেটা অসিত চৌধুরীর নয়, অন্য কারো। মুশকিল যে কোন চেনা লোকের সাথেও মিল খুঁজে পেলো না অসিত। ওই রকম জোড়া ভুরু, সরু করে ছাঁটা গোঁফ, পুরু ঠোঁট – সাধে সাবি আর বিলু তাকে চিনতে পারে নি। ওদের উপর যে ভীষন রাগ হচ্ছিল আগে, সেটা চলে গিয়ে একটা দুশ্চিন্তা জায়গা নিল মনে। ছেলেটা এখনো স্কুলে পড়ে, সাবিত্রীও কোন চাকরি বাকরি করে না। কে দেখবে ওদের? তার এরকম চেহারার পরিবর্তন তো মরে যাওয়ারই সামিল, কেউ যদি চিনতে না পারে তবে কাল থেকে অফিসেও তো ঢুকতে পারবে না। কাউকে বোঝাতে পারবে না যে সেই অসিত। ওদিকে সাবি আর বিলু অসিতের অপেক্ষায় বসে থাকবে। হয়তো রমেন ফিরলে রমেনকে ডাকবে। এরপর কি পুলিসে খোঁজ দেবে? তাতে কি কোন উপায় হবে? ডেডবডি তো পাবে না, ফলে মরলে পড়ে অন্তত ইন্সিওরেন্স, পিএফ এসবের টাকা সাবি পেয়ে যেতো। এখন কি পাবে?

আচ্ছা,যখন কোথাও অসিতকে পাওয়া যাবে না, তখন কি ওরা তার কথা শুনবে? হয়তো চেহারার বদল হয়েছে , কিন্তু অন্য কোন উপায়ে কি প্রমান করা যাবে সেই অসিত? হাতের লেখা? সই? ব্লাড গ্রুপ কিছু একটা দিয়ে। হতে পারে, নিশ্চয় হতে পারে। অসিত ঠিক করল রাস্তার ধারে বসে অপেক্ষা করবে, দেখবে কি হয়। বাড়ির লোকটা না ফিরলে ওরা তো এক সময় নড়া চড়া দিয়ে উঠবেই, তখন না হয় সামনে আসবে।

সে আবার নিজের বাড়ির দিকে পা বাড়াল। বাড়ির দরজার অপোসিটে সান্যালদের বাড়ি, মানে আগে ছিল। এখন অনেকগুলো ফ্ল্যাট হয়ে গেছে যার একটাতে সান্যালরা থাকে, অন্যগুলো যে যারা কিনেছে। কিন্তু নামে সান্যালদের বাড়ি এখনো। যেহেতু অনেকগুলো ফ্ল্যাট, অনেক লোকের যাতায়াত- ওদিকে দাঁড়ানটাই সুবিধের হবে। ওখানে সকালবেলা গাছের তলায় একটা ইস্ত্রিওলা বসে, এখন শুধু তার ঠেলাটা পরে আছে। অসিত গিয়ে ওই ঠেলাটার গা ঘেঁষে বসল।

সন্ধ্যা থেকে যেসব ঘটছে সেটা নিয়ে এই প্রথম ভাবার অবকাশ পেলো অসিত। এটা কি হল? এও কি সম্ভব যে অসিতের আত্মা অন্য একটা লোকের মধ্যে ঢুকে গেছে। তাহলে কি আসল অসিত মারা গেছে আর ও আসিতের ভুত? অথবা সে সত্যিই অন্য একটা লোক যার শুধু স্মৃতিভ্রংশ হয় নি, পারসোনালিটি ডিস অর্ডারও হয়েছে। এবার নিজের জামা প্যান্টের দিকে নজর পড়ল। ওগুলোতো তারই, মানে অসিতের। আজকালকার দিনেও পিস কিনে টেলরকে দিয়ে জামা প্যান্ট স্টিচ করানোর অভ্যাস তার, সব নন্দ টেলারিং-এর বানানো। জামা খুললে কলারে দোকানের ফ্ল্যাপ লাগানো পাওয়া যাবে। তাই সে যে অন্য কেউ, আর নিজেকে অসিত বলে চালানর চেষ্টা করছে তেমনটাও নয়। একটু কি আঁটো হয়ে গেছে? প্যান্টটা খানিক উঁচুতে লাগছে বটে। হয়তো লম্বা চওড়ায় কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে।

কিন্তু আসল বদল মুখে, কিভাবে যে মুখটাই বদলে গেল! সকালবেলা একভাবে অফিসে বেরুল , কিন্তু ফিরল মুখোশ বদলে। হ্যাঁ, মুখোশই তো। কারন মুখটা পালটে গেলেও, সেতো ভিতরে এখনো অসিত চৌধুরীই আছে। কিন্তু কে এই অসিত চৌধুরী? কে আমি? এরকম ধন্ধের মুখোমুখি হতে হবে সে কখনো ভাবেনি। চাকরিসূত্রে ফার্স্ট ফ্লাইট কুরিয়ার সার্ভিসের ব্রাঞ্চ ম্যানেজার। কিন্তু এই থোবড়া নিয়ে গেলে অফিসে কাল ঢুকতে দেবে না। অফিসের বাইরে সে সাবিত্রী চৌধুরীর বর, বিল্বদল চৌধুরীর বাবা। ব্যাস এই তো তার পরিচয়, শুধু এই সে? আছে এক বোন , কিন্তু এতক্ষণে সেও নিশ্চয় বৌদির কথায় সাবধান হয়ে আছে – দাদা সেজে কেউ আসতে পারে বলে।

এরকম একটা বন্ধুও তো নেই যাকে এসব বলে একটা পরামর্শ চাইতে পারে। না, নেই কেন? যতীন আছে, ছোটবেলার বন্ধু। এখন নমাসে ছমাসে কথা হয়। ইস মোবাইলটা থাকলে দুয়েকটা ফোন করে দেখা যেত। মোবাইল হওয়ার ফলে কারুর নাম্বারই তো আর মনে রাখে না কেউ। তাই কাউকে ফোন করে জানানোরও উপায় রইল না। আচ্ছা, তাকে দেখে না হয় চেনা যায় না, কিন্তু শুনে? নিজের গলা নিজের কানে শুনতে ইচ্ছে হল। কি বলবে? হ্যালো টেস্টিং ওয়ান, টু, থ্রি – বলেই এত দুঃখেও হাসি পেলো। একি মাইক টেস্টিং হচ্ছে? ধ্যাত! তার চেয়ে ডাকি সাবি, বিলু। প্রথমে ফিসফিস, তারপর জোরে। তখনই বুঝতে পারল ওদের নাম ধরে ডাকতে গিয়ে গলাটা কেমন ধরে যাচ্ছে, বিষণ্ণ বাতাসে কেঁপে কেঁপে উঠছে। নিজের অজান্তেই চোখ বেয়ে নামছে জল। তখনই দড়াম করে পাশের বাড়ির দোতলার জানালা খুলে গেল, কেউ জানলা দিয়ে উঁকি মারছে। ঘাবড়ে গিয়ে থেমে গেল অসিত। হাতের চেটোয় মুছে নিল চোখের জল।

আচ্ছা সাবি, বিলু তো তার গলা শুনে চিনতে পারেনি। তার মানে গলাও বদলে গেছে! নাকি চোখের সামনে অন্য মুখ দেখছিল বলে গলা বুঝতে পারে নি? হতেও তো পারে। সাবির মুখটা যদি হঠাত বাসন্তীর মায়ের মত হয়ে যায়, তখন কি সাবির গলা চিনতে পারবে? এটা ভেবে অসিত মনে জোর পেলো। একটা ফোন বুথে গিয়ে ফোন করবে? পয়সা কোথায় পাবে? ভিক্ষে করতে হবে তো। তাছাড়া তাতেই কি কাজ হবে? এমনিতে সাবির সাথে ফোনেই বা কবে কথা হয়, কালেভদ্রে যদি কোন দরকারী কাজে আটকে গেল তো বাড়িতে ফোন করে দিল। কিংবা সাবির যদি কিছু আনানোর থাকে তো ফোন করল। সেও নমাসে, ছমাসে একবার। আজকে সন্ধ্যায় যা ঘটল তার পরে বরং ফোন করলে আরও ভড়কে যাবে। না, ফোন করে কাজ নেই।

দীর্ঘশ্বাস ফেলল অসিত, একেবারে অনাথ হয়ে গেল সে এবার।

এত দুঃখেও হাসি পেলো। আটচল্লিশ বছর বয়সে কেউ কি অনাথ হয়? ঠিক আছে অনাথ না হোক, একেবারে একা তো হয়ে গেল। একার থেকেও বড় কথা তার আর কোন আস্তিত্ব রইল না। ভেবে কিরকম পাগল পাগল লাগে অসিতের। ও যদি সাবির হাত ধরে, সাবির গালের দুধারে হাত দুটোকে পান পাতার মত চেপে ধরে, সেই স্পর্শেও চিনবে না সাবি?

হয়তো নয়। শেষ কবে হাত ধরেছিল সাবির? ওই যে সেদিন পার্ক স্ট্রীটের মুখে রাস্তা পার হবার সময় হ্যাঁচকা টানে ওকে চলন্ত ট্যাক্সির মুখ থেকে সরিয়ে আনল, সেও মাস দুয়েক আগে এক লহমার জন্য। কিন্তু হাত ধরার জন্য হাত ধরা, কোথায়? অফিস যাবার সময় টিফিন বাক্স হাতে তুলে দিল, হয়তো আঙ্গুল ছুঁল কি ছুঁল না। কেমন সাবির হাতের স্পর্শ এখন তাওতো অসিত আর জানে না। মনে পড়ে তাদের বিয়ে হয়েছিল বোশেখ মাসের গরমে। পুরুত সাবির উপুর হাতের উপর তার হাত রাখতে বলল- বিন্দু বিন্দু ঘামে ভিজেছিল, সঙ্গে চন্দন মিশে একটু চটচটে। অসিতের সেই প্রথম কোন মেয়েকে ছোঁয়া, কেমন শিউরে উঠেছিল। ফুলশয্যার রাতে আবার ওর হাতে হাত রেখেছিল। সাবির না, কাঁপছিল অসিতের হাতই। ও বরং মুখে আঁচল চাপা দিয়ে হাসছিল ।

কেন, হাসছ কেন? ঘাবড়েই গেছিল অসিত।

দেখেছ আমার হাতের পাশে তোমার হাতটা কেমন লাগছে? ফুলের পাপড়ির উপর বনমানুষের থাবা!

সাবির ফরসা হাতের পাশে তার কালো রোমশ হাত মানাচ্ছে না? লজ্জা পেয়ে হাত সরাতেই সাবি মুখের আঁচল সরিয়ে খিলখিল করে হেসে উঠেছিল, দেখেছো আমার বন্ধুরা ঠিকই বলেছিল।

কি বলেছিল? আমি বনমানুষ? খুব রাগ হচ্ছিল অসিত।

উফ, না। ছেলেদের হাতের বড় বড় লোম থাকলে তবে না পুরুষ! ওরা বলেছিল যে তুমি খুব লাজুক আর মেয়েদের কিচ্ছু জানো না।

সত্যি তো কিছু জানত না অসিত। মনে আছে বিয়ের প্রথম প্রথম একসাথে কোথাও বেরোলে সাবি নিজের হাতটা তার আঙ্গুলের ফাঁকে গলিয়ে নিত। বলত, মশাই, আমার সাথে বেরিয়ে হনহন করে হেঁটে চলে যাবে আর আমি পিছন থেকে হাঁকপাঁক করতে করতে তোমার পিছনে দৌড়াব সেটা হবে না। একসাথে বেরিয়েছ, একসাথে হাঁটতে হবে।

সাবির সাথে ছোট ছোট পায়ে হাঁটতে অসুবিধা হত, আবার হাতে হাত ধরে যেতে মন্দও লাগত না। তারপর তো বিলু এসে গেল, হাতের দাবিদারও বদলে গেল। এখন কেউ চোখ বন্ধ করে ওর হাতে হাত ধরিয়ে দিলে সে কি চিনতে পারবে সেটা সাবি না অন্য কেউ? ওর হাত এখনো কি সেরকম নরম ফুলো ফুলো আছে, নাকি ঘর বাড়ি সামলাতে সামলাতে সেই হাতে অন্য ধার, অন্য অনুভুতি?

নাঃ, কতদিন তারা একে অপরকে ছোঁয় নি, হাতেহাত ধরেনি। ভুলেই গেছে সে অনুভূতি। হাতের ছোঁয়ায় ওর মনে আর পৌছাতে পারবে না।

সাবি কেন, বিলুকেও কি আর স্পর্শে চিনতে পারবে? ছোটবেলায় হাঁটি হাঁটি পা পা করত ছেলে, আঙ্গুলের ডগা ধরা থাকত অসিতের হাতে। কখনো খেলার ছলে উপরে ছুঁড়ে দিত, নেবে আসলে বুকে জড়িয়ে নিত। খিলখিল করে হাসত ছেলে, আর হাঁ হাঁ করে ছুটে আসত সাবি। পড়ে গেলে কি হবে বলতো? তোমার কি কোন হুঁশ নেই?

ততক্ষণে অসিত আবার ছুঁড়ে দিয়েছে ওপরে, নেমে আসা ছেলের সাথে বুকে টেনে নিয়েছে সাবিকেও। সেসব দিন-

শেষ কবে জড়িয়ে ধরেছে ছেলেকে? ছ বছর বয়সে গাছ থেকে পড়ে বিলুর পা ভাঙল, সেবার। কিন্তু তারপরে-হ্যাঁ মা মারা গেল, ঠাম্মাকে হারিয়ে ছেলে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বাবাকে জড়িয়ে ধরেছিল। ব্যাস, সেও কত বছর হয়ে গেল। আজ যদি বিলুকে জড়িয়ে ধরে সে কি চিনবে স্পর্শে বা গন্ধে? তার নাকে বিলুর গন্ধ, সে তো বেবী পাউডারের। বড় হয়ে ওঠা ছেলের গন্ধ কি সে শুঁকে চিনে নিতে পারবে? কিংবা ছেলে তার কর্মক্লান্ত ঘামে ভেজা শরীরের? মনে পড়ল বিয়ের পর পর সাবি বোরোক্যালেন্ডুলা মাখত আর পন্ডসের পাউডার। স্নান করে সারা শরীরে, বগলে, বুকে পাউডার না দিলে চলত না ওর। অন্ধকারে রাতে সাবির বুকে মুখ ঘষতে ঘষতে পন্ডস, ক্যালেন্ডুলা আর সাবির নিজের গন্ধ- সব মিলে মিশে মাতাল করে দিত অসিতকে। চুমুতে চুমুতে ভরিয়ে দিত, জিভে জিভ জড়িয়ে যেতো। মাঝে মাঝে সাবি ওকে ঠোনা মারত। ইস, মুখে কি গন্ধ, এসব করার আগে এলাচ মুখে ফেলে নেবে। সাবির গরম জিভ জুড়ে কিন্তু থাকত একটা মিষ্টি গন্ধ। অসিত জিজ্ঞেস করত, তোমার জিভে এত স্বাদ? তুমি কি এলাচ রাখ?

পেটুক, এবার কি আমার জিভটাকে খেয়ে ফেলবে?

কে জানে সাবি এখন কি ক্রীম, কোন পাউডার ব্যবহার করে! ওর জিভে কি এখনো তেমনি স্বাদ?

অসিত জানে না। জানত একসময়, কিন্তু এখন ভুলে গেছে। অসিত, সাবি কিংবা বিলু একে অপরকে দেখার দূরত্বে দাঁড় করিয়ে রেখেছে কতদিন, আটকে গিয়েছে পরিচয়ের দোরগড়ায়।। সেই দেখার বাইরে ভিতর থেকে, কাছের থেকে পায়নি বহুদিন। মনের কথা বলেনি এক অপরকে, এক অপরকে জড়িয়ে বাঁচতেই ভুলে গেছে। ওরা কেউ কাউকে আর চেনে না, শুধু জানে বাইরের মুখোশটাকে।

অসিতের চেহারার লোকটা। কেমন করে এবার সাবিকে জানাবে যে আসল অসিত হারিয়ে গেছে? সাবি কোনদিন জানতেও যে পারবে না, ওই লোকটা অন্য কেউ, অন্য স্পর্শ, অন্য স্বাদ-গন্ধের। যা অনেকদিন আগে হারিয়ে গেছে, তার খোঁজ কেনই বা কেউ রাখবে?

-----------------------------
Biswadip Chakraborty, 1371 N Bay Drive, Ann Arbor, Michigan-48103, biswadip9@gmail.com

1 টি মন্তব্য: