(৬)
নদী পেরিয়ে গাড়িটা টিলার ওপর উঠে পড়ল। টুয়েল্ভ ওকস নজরে আসার আগেই স্কারলেট লক্ষ্য
করল লম্বা লম্বা গাছের মাথার ওপরে কুয়াশার মত ধোঁয়ার কুণ্ডলী অলসভাবে পাক খাচ্ছে আর
হিকরি কাঠের আগুনে পোর্ক আর মাটন ঝলসানোর সুবাস বাতাসে মিশে আছে।
বারবেকিউয়ের চুল্লিগুলো, যেগুলো গতকাল রাত থেকেই ধিমে আঁচে জ্বলছিল, এতক্ষণে নিশ্চয়ই
গনগনে লাল হয়ে উঠেছে, ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ঝলসানোর সময় মাংস থেকে রস আগুনে পড়ে নিশ্চয়ই হিসহিস
শব্দ করে ফুলকি ওড়াচ্ছে। মৃদু বাতাসে ভর করে
যে সুঘ্রাণ নাকে লাগছে, স্কারলেট জানে যে সেটা আসছে ওই বিশাল অট্টালিকার পেছনে বড় বড়
ওক গাছের যে উপবনটা আছে, সেখান থেকে। জন উইল্কস
ওঁর বারবেকিউয়ের আয়োজন সর্বদা ওখানেই করেন, নাতিউচ্চ ঢালে, যেটা গোলাপের বাগানে গিয়ে
মিশেছে। জায়গাটা ছায়াচ্ছন্ন, অতি মনোরম পরিবেশ। ক্যালভার্টরা সাধারণত যেখানে বারবেকিউয়ের
আয়োজন করেন, তার চাইতে অনেক বেশি মনোরম। মিসেজ় ক্যালভার্ট বলেন যে বারবেকিউয়ের খাবার
ওঁর পছন্দ নয়, আর খাবারের গন্ধ নাকি বাড়ির ভেতর অনেকদিন ধরে থেকে যায়। তাই ওঁর অতিথি
অভ্যাগতদের সমতল অনাচ্ছাদিত জায়গায় – বাড়ি থেকে প্রায় সিকি মাইল দূরে – সর্বদাই গরমে
হাঁসফাঁস করতে হয়। আতিথেয়তার জন্য জন উইল্কসের সুনাম সমগ্র রাজ্য জুড়ে,
আর ঠিক কীভাবে বারবেকিউয়ের আয়োজন করতে হয় সেটা উনি জানেন।
ছড়ানো পায়াওয়ালা পিকনিকের টেবিলগুলো মহার্ঘ কাপড়ে পরিপাটি করে ঢেকে ছায়ার নীচে
রাখা থাকে। টেবিলের দু’পাশে দুটো বেঞ্চ, তাতে হেলান দেবার বন্দোবস্ত নেই। যাঁরা বেঞ্চে
বসতে পছন্দ করবেন না তাঁদের জন্য বাড়ির ভেতর থেকে চেয়ার, গদি আর তাকিয়া নিয়ে এসে ফাঁকা
জায়গায় ইতস্তত ছড়িয়ে রাখা হয়। রান্না করার লম্বা লম্বা চুল্লি বেশ অনেকটা দূরে লাগানো
হয়, যাতে ধোঁয়া এসে অতিথিদের জ্বালাতন না করে। বড় বড় লোহার গামলা থেকে বারবেকিউ স্যস আর ব্রানজ়ুইক
স্ট্যু-এর সুবাস ভেসে আসতে থাকে। খাবারের ট্রে নিয়ে অতিথিদের কাছে যাওয়া আসা করার জন্য
মিস্টার উইল্কস অন্তত এক ডজন ডার্কিকে বহাল রাখতেন। গোলাবাড়ির ঠিক পেছনেই আরও একটা
বারবেকিউয়ের চুল্লি বসানো হত, যেখানে বাড়ির দাসদাসী, কোচয়ান আর অতিথিদের পরিচারিকারা
ওদের নিজস্ব খানাপিনা জমিয়ে উপভোগ করতে পারত। বাজরার কেক, রাঙা আলু আর চিটারলিং – শুয়োরের
নাড়িভুড়ি দিয়ে বানানো নিগ্রোদের অতি প্রিয় পদ, আর তরমুজের সময় হলে প্রাণ ভরে তরমুজ।
তাজা পোর্ক ঝলসানোর চনমনে গন্ধ ভেসে আসতেই স্কারলেট দু’নাক ভরে সুবাসটা নিল। যতক্ষণে
ওগুলো তৈরি হবে, আশা করল, ততক্ষণে একটু খিদে নিশ্চয়ই চাগাড় দেবে। পেটটা এত ভরা আর লেসটা এট এঁটে বাঁধা যে প্রতিমুহূর্তেই
মনে হচ্ছে এই বুঝি ঢেকুর তুলে ফেলবে। তাহলে
সর্বনাশ হয়ে যাবে, কারণ একমাত্র বৃদ্ধ পুরুষমানুষ আর অতিবৃদ্ধা মহিলাদেরই সামাজিক অনুমোদনের
পরোয়া না করেই ঢেকুর তোলার অধিকার আছে।
ওরা চূড়ার ওপরে পৌঁছে গেল, আর পরমুহূর্তেই সাদা অট্টালিকাটা নিখুঁত প্রতিসাম্য
নিয়ে ওর চোখের সামনে উদ্ভাসিত হল। লম্বা লম্বা থাক, চওড়া বারান্দা, সমতল ছাদ – পরমাসুন্দরী
মহিলার মত, যে কিনা নিজের আকর্ষক ক্ষমতার ব্যাপারে এতই আত্মবিশ্বাসী যে অকৃপণ হৃদয়ে
মহানুভবতা আর কমনীয়তা প্রদর্শন করতে সক্ষম। টারার চেয়েও টুয়েল্ভ ওকসকে স্কারলেট বেশি
ভালবাসে, কারণ এই অট্টালিকার মহিমান্বিত সৌষ্ঠব আর বিনম্র গরিমা জেরাল্ডের অট্টালিকায়
পাওয়া যায় না।
চওড়া বাঁকানো ড্রাইভওয়েটা জিন পরানো ঘোড়া আর জুড়িগাড়িতে ভরে গিয়েছে। অতিথিরা গাড়ি
থেকে নামছেন, বন্ধুবান্ধবদের অভিবাদন জানাচ্ছেন। প্রতিবারের মতই পার্টিতে আসতে পেরে নিগ্রোরা খুব
উত্তেজিত, হাসি হাসি মুখে ওরা ঘোড়াগুলোকে আস্তাবলের দিকে নিয়ে যাচ্ছে, আজকের মত ওদের
জিন আর লাগাম খুলে দেওয়া হবে। এক দঙ্গল সাদা
আর কালো বাচ্চা সবুজ লনের ওপর শোরগোল তুলে দৌড়োদৌড়ি করে এক্কাদোক্কা খেলছে আর কে কতটা
খাবে সেটা ফলাও করে বলছে। বাড়ির সদর থেকে অন্দর পর্যন্ত লম্বা, প্রশস্ত হলঘরটাও লোকে
লোকারণ্য। ও’হারাদের জুড়িগাড়ি সোপানের দিকে এগিয়ে আসার সময় স্কারলেট দেখতে পেল ক্রিনোলিনের৪
পোশাক পরা মেয়েরা বাহু দিয়ে একে অপরের কোমর জড়িয়ে ধরে রঙিন প্রজাপতির মত একবার সিঁড়ি
বেয়ে দোতলায় উঠছে আবার নেমে আসছে, মাঝে মাঝে পলকা হ্যান্ডরেল ধরে ঝুঁকে হেসে গড়িয়ে
পড়ে নীচের হলঘরের অল্পবয়সী ছেলেদের ডাকাডাকি করছে।
সারি সারি খোলা ফ্রেঞ্চ উইন্ডোর ভেতর দিয়ে প্রৌঢ়া মহিলাদের এক ঝলক দেখতে পেল। গাঢ়
রঙের অনুগ্র রেশমের পোশাকে সজ্জিত হয়ে ড্রয়িং রুমে বসে হাতপাখা চালাতে চালাতে নিজেদের
মধ্যে বাচ্চাকাচ্চা, অসুখবিসুখ, কে কাকে বিয়ে করল, কেন করল, এসব নিয়ে নিজেদের মধ্যে
গল্প করছেন। উইল্কসদের খানসামা রুপোর একটা
ট্রে নিয়ে হলময় মধ্যে ছোটাছুটি করে তামাটে
ধূসর পোশাক আর দামী কিন্তু অবিন্যস্ত লিনেনের শার্ট পরা তরুণদের বাও করে হেসে পানীয়ের
লম্বা গ্লাস পরিবেশন করছে।
রোদ ঝলমলে সদর বারান্দাতেও প্রচুর অতিথির ভিড়। মনে হচ্ছে পুরো কাউন্টিটাই এখানীড়ুঠে
এসেছে, ভাবল স্কারলেট। টার্লটনদের চার ছেলে আর ওদের বাবা লম্বা লম্বা থামে হেলান দিয়ে
দাঁড়িয়ে, স্টুয়ার্ট আর ব্রেন্ট – যমজ ভাইয়েরা – পাশাপাশি, যথারীতি ওদের আলাদা করা যায়নি,
বয়েড আর টম ওদের বাবা জেমস টার্লটনের পাশে। মিস্টার ক্যালভার্ট ওঁর ইয়াঙ্কি বউয়ের গা
ঘেঁষে দাঁড়িয়ে। জর্জিয়াতে পনেরো বছর কাটিয়ে দেবার পরেও ভদ্রমহিলা জায়গাটাকে আপনার করে
নিতে পারেননি। সকলেই ওঁর সঙ্গে নম্র এবং সহৃদয় ব্যবহার করেন, কারণ সকলেই ওঁর জন্য করুণা
বোধ করেন। কিন্তু কেউই ভুলতে পারেনি যে জন্মসূত্রে ইয়াঙ্কি হবার ভুল করার সাথে সাথে
উনি আবার এক সময় মিস্টার ক্যালভার্টের ছেলেমেয়েদের গভর্নেসও ছিলেন। রাইফোর্ড আর কেড,
দুই ক্যালভার্ট ভাই আর ওদের স্বর্ণকেশী দুরন্ত বোন ক্যাথলীন, ওরা তিনজনে মিলে গোমড়ামুখো
জো ফোনটেন আর ওর সুন্দরী হবু বউ স্যালি মুনরোর পেছনে লাগছে। অ্যালেক্স আর টোনি ফোনটেন
ডিমিটি মুনরোর কানে কানে কিছু বলছে আর ও হেসে গড়িয়ে পড়ছে। প্রায় দশ মাইল দূরের লাভজয়
থেকেও কিছু পরিবার এসেছে, ফেয়্যাটভিল আর জোন্সবোরো থেকেও, এমনকি অ্যাটলান্টা আর ম্যাকন
থেকেও কেউ কেউ এসেছেন। সমস্ত বাড়িতেই মানুষ যেন থইথই করছে। অবিরাম বকবক, হাসি ঠাট্টা, নারীকণ্ঠের তীক্ষ্ণ কলরোল,
সব মিলিয়ে বাড়িটা গমগম করছে।
বারান্দার ধাপে জন উইল্কস দাঁড়িয়ে আছেন, শুভ্রকেশ, ঋজু গড়ন, সৌম্য চেহারা থেকে
জর্জিয়ার গরমকালের রবিকিরণের মত অনির্বাণ দীপ্তি ঝরে পড়ছে। ওঁর পাশেই দাঁড়িয়ে আছে হানি
উইল্কস, বাচ্চা থেকে বুড়ো, এমনকি দাসদাসী থেকে খেতমজুর সবাইকেই ওই প্রিয় সম্বোধন করে
বলেই ওর নামটাও ওটাই হয়ে গেছে। বাবার পাশে দাঁড়িয়ে আগত অতিথিদের অভ্যর্থনা করতে গিয়ে
হেসে গড়িয়ে পড়ছে।
সব পুরুষমানুষদের দৃষ্টি আকর্ষণের হানির এই উৎকট প্রয়াসের বিপরীতে ওর বাবার প্রশান্ত
মূর্তি – স্কারলেটের মনে হল মিসেজ় টার্লটন
যা বলেছিলেন তার মধ্যে কিছুটা হলেও যথার্থতা আছে। উইল্কস বংশের পুরুষমানুষদের চেহারায়
একটা পারিবারিক বৈশিষ্ট অবশ্যই আছে। জন উইল্কস আর অ্যাশলের ঘন সোনালি পলক যা ওঁদের
ধূসর চোখে বিশিষ্টতা এনে দিয়েছে, হানি আর ইন্ডিয়ার পলকে সেই নিবিড়তার অভাব এবং বর্ণহীন।
হানির পলকহীন দৃষ্টির সঙ্গে কেবল খরগোশের সঙ্গেই তুলনা করা যায়, আর ইন্ডিয়ার চেহারাকে
বিশেষত্বহীন ছাড়া আর কোনোভাবেই বর্ণনা করা যায় না।
ইন্ডিয়াকে কোথাও দেখতে পেল না, তবে স্কারলেটের ধারণা, ও হয়ত রান্নাঘরে গিয়ে কাজের
লোকদের শেষ মুহূর্তের নির্দেশ দিতে ব্যস্ত। বেচারি ইন্ডিয়া, স্কারলেট ভাবল, মা চলে
যাবার পর থেকে গেরস্থালীর কাজ নিয়ে এতটাই ফেঁসে গেছে যে একমাত্র স্টুয়ার্ট টার্লটনকে
ছাড়া আর একজন প্রেমিকও জোগাড় করে উঠতে পারেনি, আর স্টুয়ার্ট টার্লটন যদি আমাকে ওর থেকে
বেশি সুন্দরী মনে করে তাহলে আমার দোষ কোথায়?
জন উইল্কস সিঁড়ি বেয়ে নেমে এসে স্কারলেটকে দিকে হাত বাড়িয়ে দিলেন। গাড়ি থেকে নামতে
নামতে স্যুয়েলেনকে এক গাল হেসে উঠতে দেখল। নিশ্চয়ই ওই ভিড়ের মধ্যে ও কোথাও ফ্র্যাঙ্ক
কেনেডিকে দেখতে পেয়েছে।
“ওই পাজামা পরা মেয়েলি বুড়োটার থেকে ভাল প্রেমিক আমি যদি জোটাতে না পারি তো কী
বলেছি!” গাড়ি থেকে নেমে জন উইল্কসকে হেসে ধন্যবাদ দিতে দিতে খুব তাচ্ছিল্যের সঙ্গেই
স্কারলেট মনে মনে ভাবল।
ফ্র্যাঙ্ক কেনেডি তড়িঘড়ি করে গাড়ির দিকে আসছেন, স্যুয়েলেনকে সাহায্য করবার জন্য,
আর স্যুয়েলেন এমন গদগদ ভাব দেখাতে লাগল যে স্কারলেটের ওকে টেনে একটা থাপ্পড় কষাতে ইচ্ছে
হচ্ছিল। হতে পারে ফ্র্যাঙ্ক কেনেডি এই কাউন্টির সব চেয়ে বেশি জমির মালিক, হতে পারে
উনি খুবই হৃদয়বান মানুষ, কিন্তু তাতে কী এসে যায়? ওঁর বয়স চল্লিশ ছুঁয়ে ফেলেছে, ব্যস্তবাগীশ
আর স্নায়বিক প্রকৃতির মানুষ, পাতলা দাড়ি পেকে তামাটে হয়ে গেছে, আর হাবভাবটা কেমন যেন
বুড়োটে, ঠিক আইবুড়ো মহিলাদের মত – এগুলোই তো আসল ব্যাপার। যাই হোক, নিজের পরিকল্পনার কথা মাথায় রেখে স্কারলেট
অবজ্ঞার ভাবটা সরিয়ে ফেলে এমন সুন্দর করে হেসে ওঁকে অভিবাদন জানাল যে ফ্র্যাঙ্ক থমকে
গিয়ে স্যুয়েলেনের দিকে বাহু প্রসারিত করেও স্কারলেটের দিকে অভিভূত দৃষ্টিতে তাকিয়ে
রইলেন।
জন উইল্কসের সঙ্গে হাসিমুখে টুকটাক কথাবার্তা চালাতে চালাতেই স্কারলেটের চোখ ভিড়ের
মধ্যে অ্যাশলেকে খুঁজে চলল, কিন্তু বারান্দায় ও নেই। ডজনখানেক কণ্ঠ ওকে সমস্বরে অভিবাদন
জানাল, স্টুয়ার্ট আর ব্রেন্ট টার্লটন ওর দিকে এগিয়ে এল। মুনরো বোনেরা ছুটে এসে ওর পোশাক
নিয়ে হইহই করতে লাগল, আর দেখতে না দেখতেই উত্তরোত্তর বেড়ে চলা শোরগোলের কেন্দ্র হয়ে
পড়ল। কিন্তু অ্যাশলে গেল কোথায়? আর মেলানি – আর চার্লস? কারও নজরে যাতে না পড়ে যায় সেই ভাবে চারপাশে নজর
ঘোরাল, তারপর হলঘরে হাসি মজা করতে থাকা জটলাটার মধ্যে অভিনিবেশ সহকারে দেখল।
আড্ডা দেওয়া, হাসি তামাশা করার সাথে সাথে বাড়ি আর উঠোনের দিকে চোখ বোলাতে বোলাতে
ওর দৃষ্টি একজন অপরিচিত মানুষের ওপর পড়ল, হলঘরে একলা দাঁড়িয়ে বেহায়ার মত ওকেই দেখছেন।
একজন পুরুষমানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পেরেছে বলে একটা নারীসুলভ তৃপ্তি অনুভব করল,
এবং একই সঙ্গে ওর পোশাকটা যে বুকের কাছে কাটা সেটা ভেবে বেশ বিব্রত বোধ করল। বয়সটা
বেশিই লাগছে, অন্তত পঁয়ত্রিশ তো হবেই। দীর্ঘকায়, এবং শক্তিশালী গড়ন। ওই রকম চওড়া কাঁধের
মানুষ আগে দেখেছে বলে স্কারলেট মনে করতে পারল না। পেশিবহুল চেহারা, বোধহয় ভদ্রসমাজে
কদর পাবার নিরিখে একটু বেশিই পেশিবহুল। চোখে
চোখ পড়তেই উনি হাসলেন, সযত্নে ছাঁটা কুচকুচে কালো গোঁপের তলা থেকে ধবধবে সাদা দাঁত
বের করে। কালচে মুখ, জলদস্যুদের মতই শ্যামলা
চেহারা, যেন একটা জাহাজকে ডুবিয়ে দেওয়ার আগে আটঘাট বেঁধে নিচ্ছেন বা কোনও সুন্দরী মেয়েকে
অপহরণ করার মতলব ভাঁজছেন। হাসবার সাথে সাথে চেহারায় একটা বেপরোয়া ভাব জেগে উঠল আর মুখের
হাসিতে নিষ্ঠুর পরিহাসের ছোঁয়া – স্কারলেটের নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে এল। ওর মনে হল ওই দৃষ্টির
সামনে ওর অপমান বোধ করা উচিত ছিল, অথচ একফোঁটাও অপমান বোধ করল না! নিজেই নিজের ওপর
অসন্তুষ্ট হল। মানুষটা কে জানা নেই, কিন্তু ওই কালচে মুখে একটা উচ্চবংশীয় ছাপ যে আছে,
সেটা অস্বীকার করার জো নেই। পুরু লাল ঠোঁটের ওপর ঈগল পাখির ঠোঁটের মত পাতলা নাক, চওড়া
কপাল আর দীর্ঘায়ত চোখ সেটাই জানিয়ে দিচ্ছে।
হাসি ফিরিয়ে না দিয়েই স্কারলেট চোখ সরিয়ে নিল। কেউ একজন ওঁকে ডাকল, “রেট! রেট বাটলার!
এদিকে একবার আসুন! জর্জিয়ার সব থেকে কঠিন হৃদয়া রমণীর সঙ্গে আপনার আলাপ করিয়ে দিই।” ডাক শুনে উনি ঘুরলেন।
রেট বাটলার? নামটা কেমন চেনা চেনা ঠেকছে। কী একটা বেশ মুখরোচক কেলেঙ্কারির সঙ্গে
জড়িয়ে ওঁর নামটা উঠে এসেছিল না? কিন্তু এখন ওর ধ্যান জ্ঞান হল অ্যাশলে, তাই ভাবনাটা
মন থেকে সরিয়ে দিল।
“একটু ওপরে যেতে হবে আমায়, চুল আঁচড়ে নেওয়া দরকার,” স্টুয়ার্ট আর ব্রেন্ট,
যারা ওকে ভিড় থেকে আলাদা করার চেষ্টায় ছিল, তাদের উদ্দেশ্যে বলল। “আমার জন্য
অপেক্ষা করবে বুঝলে! আর কোনো মেয়ের সঙ্গে পালিয়ে যেও না, তাহলে কিন্তু আমি ভীষণ
রেগে যাব।”
স্টুয়ার্টের মুখের দিকে তাকিয়েই বুঝল ও যদি আর কোনও ছেলের সঙ্গে ফ্লার্ট করে,
তাহলে আজ ওকে সামলানো মুশকিল হবে। মদে একেবারে চূর হয়ে আছে, আর একটা হামবড়া ভাব
যেন লড়াই করবার জন্য মুখিয়েই আছে, পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে জানে যে ব্যাপারটা মোটেই
সুবিধের নয়। হলঘরে দু’দণ্ড দাঁড়িয়ে বন্ধুবান্ধবদের
সঙ্গে কথা বলল, ইন্ডিয়া বাড়ির অন্দর থেকে বাইরে এল, আলুথালু কেশ, কপালে বিন্দু বিন্দু
ঘাম, ওকে অভিবাদন জানাল। বেচারি ইন্ডিয়া! এমনিতেই ওই বিবর্ণ কেশ আর বর্ণহীন চোখের পালকের
জন্য ওকে খারাপ দেখায়, আর থুতনিটা সামনের দিকে বেরিয়ে থাকায় চেহারায় একটা একগুঁয়েমির ছাপ, বয়সের তুলনায় অনেক
বেশি বয়স্ক দেখায়। স্টুয়ার্টকে ফুঁসলে নেবার জন্য ইন্ডিয়া কী ওকে ঘৃণা করে, স্কারলেট
মনে মনে ভাবে। অনেকেই বলে থাকে যে ও এখনও স্টুয়ার্টকে ভালবাসে, কিন্তু উইল্কসদের মনে
কথা মুখ দেখে আন্দাজ করা অসম্ভব। ঘৃণা যদি করেও, ব্যবহারে সেটা বোঝা গেল না, বরাবরের
মতই সামান্য নির্লিপ্ত কিন্তু সদাশয় যে সৌজন্য স্কারলেটকে দেখিয়ে থাকে, ঠিক সেভাবেই
ওকে আপ্যায়ন করল।
হাসিমুখে
ওর সঙ্গে দু’চার কথা বলেই স্কারলেট চওড়া সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে লাগল। পেছন থেকে লাজুক গলায় কেউ ওর নাম ধরে ডাকল। ঘাড়
ঘুরিয়ে দেখল চার্লস হ্যামিল্টন। সুদর্শন এক যুবক, ফর্সা কপালের ওপর নরম বাদামি কোঁকড়া
চুল এসে পড়েছে। গাঢ় বাদামি চোখ, কোলি৫ কুকুরের নিবিড় শান্ত দৃষ্টি। সর্ষে-রঙা
ট্রাউজ়ার, কালো কোট, আর কুঁচি দেওয়া শার্টের সঙ্গে ওপরে কেতাদুরস্ত চওড়া কালো টাইতে
ওকে খুব মানিয়েছে। স্কারলেট ঘুরে দাঁড়াতে দাঁড়াতে লক্ষ্য করল ওর মুখে ধীরে ধীরে একটা
হালকা গোলাপি আভা ছড়িয়ে পড়ছে, মেয়েদের সামনে ও খুব ভীরু হয়ে পড়ে। বেশিরভাগ লাজুক পুরুষমানুষদের
মতই, স্কারলেটের চপল, লাস্যময়ী সদাচঞ্চল চালচলনের উপাসক ছিল। এর আগে স্কারলেট ওকে সাধারণ সৌজন্য দেখানোর বেশি
কিছু করেনি, তাই আজ যখন দু’হাত ওর দিকে বাড়িয়ে ধরে মধুর হেসে ওকে অভিবাদন জানাল, উত্তেজনায়
ওর দম বন্ধ হয়ে এল।
“ব্যাপার
কী চার্লস হ্যামিল্টন, তোমাকে তো ফাটাফাটি লাগছে! নিশ্চয়ই তুমি অ্যাটলান্টা থেকে আমার
মন চুরি করে নিতেই এসেছ!”
আনন্দে,
উত্তেজনায় চার্লস একেবারে বাক্যহারা হয়ে গেল। স্কারলেটের ছোট্ট নরম হাত নিজের হাতে
নিয়ে নিবিষ্ট দৃষ্টিতে ওর স্পন্দিত সবুজ চোখের পানে চেয়ে রইল। ঠিক এইভাবেই তো মেয়েরা অন্য ছেলেদের সঙ্গে কথা বলে
থাকে, কিন্তু ওর সঙ্গে কেউ বলে না। কে জানে কেন, মেয়েরা সর্বদাই ওকে ছোট ভাইয়ের মতই
দেখে আর স্নেহ করে, ওর সঙ্গে হাসি-মস্করা করার কথা ওদের মনেও আসে না। ওর থেকে অনেক কম সুদর্শন এবং কম সম্পন্ন ছেলেদের
সঙ্গে মেয়েরা যেমন করে ফ্লার্ট করে, দুষ্টুমি করে, চার্লসও চায় মেয়েরা ওর সঙ্গেও তেমনটাই
করুক। কালেভদ্রে যদি বা এরকম কিছু ঘটেওছে, কীভাবে কথাবার্তা চালাবে সেটা ভেবেই পায়নি
আর নিজের বাকশক্তিহীনতায় নিজেই কুণ্ঠিত বোধ করেছে। অথচ রাতে বিছানায় শুয়ে প্রয়োগ করার
মত অনেক রকম দুঃসাহসী ভাবনা এসে মাথায় গিজগিজ করতে থাকে তার ইয়ত্তা নেই, কিন্তু দুর্ভাগ্যের
বিষয়, এরকম আরেকটা সুযোগ ওর ভাগ্যে খুব কমই জুটত, কারণ একবার দু’বার চেষ্টা করার পর
মেয়েরা ওকে এড়িয়েই চলত।
এমনকি হানি
– সামনের শীতের শুরুতে বিষয়সম্পত্তি হাতে আসার পর যার সঙ্গে ওর বিয়ে হবে বলে মোটামুটি
ঠিকই হয়ে আছে – তার কাছেও কেমন যেন আড়ষ্ট হয়ে পড়ে, মুখ দিয়ে কথাই বেরোতে চায় না। হানির চপল ব্যবহার, ওর ওপর অধিকার ফলানোর চেষ্টা
– সব কিছুই করে ওর ছেলে-হ্যাংলামির জন্য, ওর প্রতি টান থেকে নয় – এইরকম একটা হীনমন্যতাবোধ
প্রায়ই ওকে বিচলিত করে তোলে। সুযোগ পেলে সব
পুরুষমানুষের সঙ্গেই করবে। হানির সঙ্গে বিয়ে হবার সম্ভাবনা চার্লসের মনে বিন্দুমাত্র
সাড়া জাগায় না। প্রেমিক পুরুষের বন্য রোমান্সের যে ছবি প্রিয় উপন্যাসগুলো পড়ে ওর মনে
গাঁথা হয়ে আছে, হানির সঙ্গে কখনোই সেরকম কোনও অনুভূতি হয় না। ওর চিরন্তন আকুলতা, যে
ওকে ভালবাসার মেয়েটা যেন একাধারে সুন্দরী, তেজী এবং দুষ্টু হয়।
আর স্কারলেট
ও’হারা কিনা ওরই সামনে দাঁড়িয়ে উসকানি দিচ্ছে, বলছে ও নাকি ওর মন চুরি করে নিয়েছে!
বেশ জুৎসই
একটা জবাব মনে মনে হাতড়াতে লাগল, কিছুই ভেবে উঠতে পারল না, কেবল স্কারলেটের অবিরাম
বকবকানির জন্য মনে মনে খুব কৃতজ্ঞ হল, কারণ এর ফলে দু’তরফা কথোপকথনের দায় এড়িয়ে যেতে
পারল। ব্যাপারটা এতই অভাবনীয় যে স্বপ্ন বলে মনে হচ্ছে।
“শোনো,
আমি ফিরে না আসা পর্যন্ত, এইখানে চুপটি করে অপেক্ষা কর, বারবেকিউতে তোমার সঙ্গে বসেই
খাওয়াদাওয়া করব। আর খবর্দার, ওই অন্য মেয়েগুলোর সঙ্গে ছেনালপনা করতে যেও না যেন, আমি
কিন্তু ভীষণ হিংসুটে,” ওই লাল টুকটুকে ঠোঁট থেকে এই রকম অবিশ্বাস্য সব কথার ফোয়ারা
ছুটছে, দুটো গালেই কী গভীর টোল পড়েছে; সবুজ চোখের কালো পালক দ্রুত ওঠানামা করছে।
“ঠিক আছে,
যাব না,” হাঁপ ছেড়ে কোনোরকমে বলে উঠল। এদিকে স্কারলেট যে ওকে কসাইয়ের সামনে বাঁধা একটা
পাঁঠা বলেই ভাবছে সেটা ওর কল্পনাতেও এল না।
গোটানো
ছাতিটা দিয়ে ওর বাহুতে আলতো করে একটা টোকা দিয়ে স্কারলেট ঘুরে যেই সিঁড়ি বেয়ে ওপর উঠতে
গেল, ওর নজর আবার রেট বাটলার নামে লোকটার ওপর পড়ল, চার্লসের থেকে কয়েক হাত দূরেই উনি
দাঁড়িয়েছিলেন। নিঃসন্দেহে উনি পুরো কথোপকথনটাই শুনে ফেলেছেন, কারণ ওর চোখে চোখ পড়তেই
উনি হুলো বেড়ালের মত মিচকে হাসলেন, তারপর দৃষ্টি
দিয়ে ওর সর্বাঙ্গ লেহন করে নিলেন, মেয়ে হিসেবে ওর প্রাপ্য সম্মানটুকুও না দিয়ে।
“হারামজাদা!”
রুষ্ট মনে স্কারলেট মনে মনেই জেরাল্ডের অতি প্রিয় গালিটা উচ্চারণ করল। “এমনভাবে তাকালেন
যেন মনে হল আমাকে শেমিজের নীচে পর্যন্ত দেখতে পাচ্ছেন!” তারপর কোনোদিকে না তাকিয়ে গটগট
করে ওপরে উঠে গেল।
শয়নকক্ষে,
যেখানে যৌতুকগুলো এনে রাখা হচ্ছে, সেখানে গিয়ে ক্যাথলীন ক্যালভার্টকে দেখতে পেল। আয়নার
সামনে পরিপাটি করে দাঁড়িয়ে দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে ধরে আছে যাতে ঠোঁটের লাল রঙটা আরও
গাঢ় হয়ে ওঠে। ওড়নাতে কিছু তাজা গোলাপ লাগানো, ওর গালের রঙের সাথে বেশ মানিয়ে গেছে,
ঝুমকো ফুলের মত নীলচে চোখদুটো উত্তেজনায় কেঁপে কেঁপে উঠছে।
“এই ক্যাথলীন,
শোন না,” শেমিজের ফিতেটা ওপরে তুলে বাঁধতে বাঁধতে স্কারলেট বলল, “একতলায় বাটলার নামের
ওই নচ্ছার লোকটা কে রে?”
“হায় কপাল,
তুই জানিস না?” উত্তেজিত স্বরে ফিসফিস করে বলে উঠল, পাশের ঘরে বসে আড্ডা দেওয়া ডিলসি
আর উইল্কসদের মেয়েদের ম্যামির দিকে একবার চোরাচাহনি হেনে। “ওঁকে এখানে দেখে মিস্টার
উইল্কসের মনের কী অবস্থা আমি তো কল্পনাও করতে পারছি না। জোনসবোরতে উনি মিস্টার কেনেডির
সঙ্গে দেখা করতে গেছিলেন – ওই তুলো কেনাবেচার ব্যাপারে মনে হয় – মিস্টার কেনেডিরও ওঁকে
সঙ্গে নিয়ে আসা ছাড়া কোনো উপায় ছিল না। ওঁকে একা রেখে তো আর চলে আসা যায় না।”
“ওঁর ব্যাপারটা
ঠিক কী বল তো?”
“আরে জানিস
না? ওঁকে তো কেউ বাড়িতেই ডাকে না!”
“সত্যি
বলছিস!”
“একদম!”
খবরটা স্কারলেট
নীরবে হজম করার চেষ্টা করতে লাগল। আগে কখনো এরকম কোনও অনাহুত ব্যক্তির সঙ্গে একই ছাদের
তলায় কাটানোর সুযোগ হয়নি। খুবই রোমাঞ্চকর ব্যাপার!
“তা কোন
কুকীর্তি তিনি করেছেন?”
“আরে, স্কারলেট,
মানুষটার ভীষণ বদনাম। ওঁর নাম রেট বাটলার, চার্লস্টনের মানুষ, ওঁর পরিবারের লোকজন ওখানকার
ভদ্র মানুষদের দলেই পড়েন, কিন্তু ওঁরা কেউই রেট বাটলারের নাম মুখেও আনেন না। গতবার
গরমকালে, ক্যারো রেট আমাকে ওঁর সম্পর্কে বলেছিল। ওর সঙ্গে ওঁর পরিবারের কোনো আত্মীয়তা নেই বটে, কিন্তু
ওঁর ব্যাপারে সবই জানে, সে ওঁর ব্যাপারে সকলেই জানে। ওয়েস্ট পয়েন্ট৬ থেকে
ওঁকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। একবার ভাব! আর ঘটনাটা এতই নোংরা যে ক্যারোরও জানা নেই। তারপর
সেই ব্যাপারটা – যে মেয়েটাকে উনি বিয়ে করতে রাজিই হলেন না।”
“খোলসা
করে বল আমায়!”
“বলিস কী,
তুই কিছুই জানিস না? গত বছর গরমের সময় ক্যারো আমাকে সব কিছুই বলেছিল, ওর মা যদি জানতে
পারেন যে ক্যারো এই ব্যাপারে কিছু জানে, তাহলে উনি হয়ত অজ্ঞানই হয়ে যাবেন। ব্যাপারটা
এই রকম, এই মিস্টার বাটলার চার্লস্টনের একটা মেয়েকে ওঁর জুড়িগাড়িতে চাপিয়ে হাওয়া খাওয়াতে
নিয়ে গেছিলেন। মেয়েটা যে কে, জানতে পারিনি, তবে একটা সন্দেহ আমার আছে। ওর চালচলন ভাল হতেই পারে না, কারণ তাহলে কিছুতেই
ওঁর সঙ্গে হাওয়া খেতে যেত না, এক তো সন্ধে নামার মুখে আর সঙ্গে কোনো বান্ধবীও ছিল না।
আর সবচাইতে অবাক করা ব্যাপার কি জানিস, সারা রাতটা বাড়ির বাইরেই কাটালো, তারপর শেষ
পর্যন্ত একা একা হেঁটে বাড়ি ফিরল, বলল, ঘোড়াটা নাকি পালিয়ে গেছে আর বগিগাড়িটা গাছে
ধাক্কা লেগে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে, ওরা নাকি জঙ্গলে পথ হারিয়ে ফেলেছিল। একবার কল্পনা
করে দেখ – ”
“কিছুই
কল্পনা করতে পারছি না রে। তুইই বল,” স্কারলেটে উত্তেজনার চরম সীমায়, মনে মনে আশা করছে,
চূড়ান্ত খারাপ ব্যাপারটাই নিশ্চয় ঘটেছিল।
“কী আর,
পরের দিন উনি ওকে বিয়ে করতে অস্বীকার করলেন!”
“বাস্?”
স্কারলেট রীতিমত হতাশ।
“বললেন
যে উনি – উম – ওর সঙ্গে এমন কিছুই করেননি, তাই ওকে বিয়ে করে ফেলার প্রশ্নই ওঠে না। মেয়েটার ভাই ওঁকে ড্যুয়েলে আহ্বান করল, তো মিস্টার
বাটলার বললেন যে ওই বোকচন্দর মেয়েটাকে বিয়ে করার চেয়ে বরং ওঁর গুলি খাওয়াই ভাল। ওঁরা
ড্যুয়েল তো লড়লেন, তারপর মিস্টার বাটলারকে চার্লস্টন ছেড়ে চলে যেতে হল আর ওঁকে কেউ
নেমন্তন্নও করে না,” কথাগুলো ক্যাথলীন বেশ উল্লাসের সঙ্গে বলে ওর বলা শেষ করল, আর ঠিক
তখনই ডিলসই ঘরে ঢুকে পড়ল প্রসাধনের তদারকি করার জন্য।
“মেয়েটার
বাচ্চা হয়েছিল নাকি?” ক্যাথলীনের কানে কানে স্কারলেট জিগ্যেস করল।
ক্যাথলীন
খুব জোরে জোরে মাথা নাড়ল। “তবে তা সত্ত্বেও মেয়েটার সর্বনাশ তো হয়েই গেল,” ফিসফিস করে
জবাব দিল।
“অ্যাশলের
সঙ্গে আমার এরকম কিছু একটা ঘটে গেলে, বেশ হয়,” হঠাৎ স্কারলেটের মনে হল। “ও এতটাই ভদ্রলোক
যে আমাকে বিয়ে করতে বাধ্য হবে।” কিন্তু নিজের অজান্তেই রেট বাটলার সম্পর্কে মনে মনে
একটা শ্রদ্ধা গড়ে উঠল, “ওই বোকা মেয়েটাকে বিয়ে করতে রাজি তো হননি!”
***
বাড়ির পেছনে বিশাল এক ওক গাছের তলায় রোজ়উডের উঁচু একটা অটোমানে৭ বসে
পড়ল। স্কার্টের কুচি আর লেসের কাজ বাতাসে এলোমেলো
হয়ে যাচ্ছে, ফলে সবুজ রঙের মরক্কো স্লিপারটা ইঞ্চিদুয়েকের মত তলা থেকে উঁকি মারছে
– ঠিক ততটাই যেটা প্রদর্শন করেও একজন লেডি লেডিই থেকে যান। সাতটা ছোঁড়া ওকে ঘিরে রেখেছে, খাবারের প্লেটটা হাতেই ধরা, কিছুই মুখে তোলেনি। বারবেকিউয়ের হুল্লোড় চরম সীমায় পৌঁছে
গেছে, উষ্ণ বাতাসে হাসাহাসি, কথাবার্তা, চিনেমাটি আর রুপোর বাসনে ঠোকাঠুকি লাগার টুংটাং
আওয়াজ ভেসে আসছে। ঝলসানো মাংস আর সুস্বাদু গ্রেভির সুবাসে বাতাস ভারি। মৃদুমন্দ বাতাস
দিক পাল্টালেই বারবেকিউয়ের লম্বা লম্বা চুল্লী থেকে ধোঁয়া এসে জ্বালাতন করছে, মহিলারা
ছদ্ম বিরক্তিতে প্রবল বেগে তালপাতার পাখা নেড়ে চলেছেন।
অল্পবয়সী মেয়েদের প্রায় সকলেই যে যার সঙ্গীকে নিয়ে টেবিলের উল্টোদিকের লম্বা বেঞ্চিগুলোতে
বসেছে। স্কারলেট ভেবে দেখল একটা মেয়ের দুটোর বেশি পাশ নেই, ফলে দু’পাশে দুজন ছেলের
বেশি বসতে পারবে না। তাই ও ঠিক করল ও আলাদা বসবে যাতে যত বেশি সম্ভব ছেলে ওকে ঘিরে
থাকতে পারে।
বিবাহিত মহিলারা উদ্যানের ছায়ায় বসেছেন, ওঁদের গাঢ় রঙের পোশাক চারপাশের রঙিন পরিবেশের
শোভাবর্ধন করছে। বিবাহিতারা, অল্পবয়সী এবং
প্রবীণা নির্বিশেষে, সর্বদাই একসঙ্গে জোট বেঁধে বসেন, অবিবাহিতা মেয়েদের আর ওদের বিউদের
থেকে দূরত্ব রেখে, কারণ এই দক্ষিণে কোনও মহিলা একই সঙ্গে বিবাহিতা এবং পুরুষমানুষের
আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হবেন এটা ভাবাই যায় না। গ্র্যান্ডমা ফোন্টেন – যিনি সশব্দে
ঢেকুর তুলেই চলেছেন – তাঁর থেকে শুরু করে সতেরো বছরের অ্যালিস মুনরো – প্রথম গর্ভাবস্থার
কারণে অব্যাহত বমনেচ্ছা প্রাণপণে দমন করার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে – প্রত্যেকেই নিজেদের
মধ্যে বংশ বৃত্তান্ত আর ধাত্রীবিদ্যা সংক্রান্ত উপাদেয় এবং শিক্ষণীয় বিষয় নিয়ে গভীর
আলোচনায় ব্যস্ত।
ওঁদের দিকে অনুকম্পা মেশানো দৃষ্টিপাত করে স্কারলেটের মনে হল মেদসর্বস্ব কাকের
ঝাঁক যেন। বিবাহিতা মহিলাদের হাসি-মস্করা করবার কোনো সুযোগই নেই। অ্যাশলেকে বিয়ে করলে ওর গন্তব্যও যে আপনাআপনিই ওই
কুঞ্জবনে গিয়ে ঠেকবে, ওকেও ওদের মতই ম্লান পোশাক পরতে হবে, বেলাগাম আনন্দ করার পাট
চুকে যাবে, একথাটা একবারের জন্যও ওর মাথায় এল না। বেশিরভাগ কুমারী মেয়ের মতই ওর কল্পনার দৌড় বিয়ের
পিঁড়ি পর্যন্তই সীমিত, তার বাইরে নয়। তার ওপর মনটাও অস্থির হয়ে আছে, এইসব হাবিজাবি
ব্যাপার নিয়ে ভাবার সময় নেই।
প্লেটের দিকে চোখ নামিয়ে বিস্কুটের একটা টুকরো নিয়ে দাঁতে কাটল, কাজটা এমন সুচারুভাবে
এবং আহারে অরুচি দেখিয়ে করল যে ম্যামি দেখলে তারিফ না করেই পারত না। যে প্রণয়ীরা ওকে ঘিরে রেখেছে, তাদের সংখ্যা যদিও
কম নয়, তবুও এই মুহূর্তে নিজেকে যতটা দুঃখী মনে হচ্ছে আগে কখনোই মনে হয়নি। ঠিক কীভাবে
বুঝতে পারছে না, কিন্তু গতকাল রাতের পরিকল্পনাটা ব্যর্থ হয়ে যেতে বসেছে, অন্তত অ্যাশলের
ব্যাপারে। অন্যান্য অনেক প্রণয়ীকে নিজের দিকে আকর্ষণ করে নিয়ে আসতে পারলেও, অ্যাশলেকে
পারেনি। গতকাল অপরাহ্ণের আতঙ্কটা আবার নতুন করে ওকে গ্রাস করে ফেলছে, বুকের ভেতরটা
ধড়ফড় করছে, তারপর মনে হচ্ছে থেমে যাবে, গাল থেকে সব রঙ উবে যাচ্ছে।
স্কারলেটকে ঘিরে রাখা বৃত্তে অ্যাশলে ভেড়বার চেষ্টাও করেনি; আদতে, এখানে এসে পৌঁছনোর
পর স্কারলেট একবারের জন্যেও অ্যাশলের সঙ্গে একা হবার বা বাক্য বিনিময় করবার সুযোগ পায়নি।
বাড়ির পেছনদিকের বাগানে চলে আসার পর অবশ্য অ্যাশলে নিজেই এগিয়ে এসে ওকে স্বাগত জানিয়েছে,
কিন্তু সেই সময় মেলানি ওর বাহুলগ্না ছিল; মেলানি ওর কাঁধও ছুঁতে পারেনি!
খুবই ছোটখাটো চেহারা, দুর্বল গড়নের এক মেয়ে, মায়ের বিশাল স্কার্টের ভেতর থেকে যেন
পুঁচকে একটা মেয়ের আবির্ভাব – বিশেষ করে ওর ওই ডাগর বাদামি চোখের ভীরু লাজুক দৃষ্টির
ফলে বালখিল্য ভাবটা আরও বেশি করে ফুটে উঠেছে। একমাথা ঘন কোঁকড়া চুল, শক্ত করে বেঁধে
নেটের মধ্যে এমনভাবে দমিয়ে রাখা হয়েছে যাতে এদিক ওদিক থেকে একগুচ্ছও বেরিয়ে আসতে না
পারে। বিধবাদের মত চুড়ো করে বাঁধা এই ঘন কেশরাশির জন্য ওর মুখটা দেখাচ্ছে ঠিক পানপাতার
মত। চোয়ালের কাছটা বেশ চওড়া, থুতনিটা বেশ ছুঁচলো। মুখটা মিষ্টি, একটু ভীতু ভীতু ভাব,
কিন্তু বৈশিষ্টহীন, আর এই বৈশিষ্টহীনতা লোকের সামনে আড়াল করার কোনও মেয়েলি চালও ওর
জানা নেই। ওকে ভীষণ সাদামাটা দেখতে লাগে – বাস্তবেও ও খুবই সাদামাটা – এক পৃথিবী সারল্য, নিপাট ভালোমানুষি আর ঝর্ণার জলের
মত স্বচ্ছ ওর মন। তবুও ওর এই বৈশিষ্টহীন চেহারা আর ছোটখাটো গড়ন সত্ত্বেও এমন এক সুস্থির
ব্যক্তিত্ব নিয়ে চলাফেরা করে যা মানুষকে সহজেই আকর্ষণ করে আর সতেরো বছর বয়সের তুলনায়
ওকে অনেক বেশি পরিণত বলে মনে হয়।
মেলানির অপরিণত নারী শরীর ঢাকা পড়ে গেছে ওর ছাইরঙা অর্গান্ডির পোশাক আর চেরি রঙের
ওড়নার ফাঁপানো কুঁচিতে। চেরির লম্বা চুনট দেওয়া হলুদ রঙের হ্যাট ওর মাখন কোমল ত্বকে
জ্যোতি এনে দিয়েছে। নেটের মধ্যে পরিপাটি করে
বাঁধা চুলের পাশ থেকে ভারি কানের দুলজোড়ার ঝুমকোগুলো ঠিক ওর বাদামি দুই বাদামি চোখের
পাশে ঝুলে আছে; শীতের দিনে অরণ্যভূমিতে জমে থাকা জলের ওপর ঝরে পড়া বাদামি পাতার মত
নিবিড় দীপ্তি ছড়ানো চাহনি।
স্কারলেটকে ভীরু হাসি দিয়ে অভ্যর্থনা জানিয়ে মেলানি ওর সবুজ পোশাকের তারিফ করল,
কিন্তু স্কারলেটের প্রত্যুত্তরকে মোটেই শিষ্ট বলা চলে না, কারণ ও তখন অ্যাশলের সঙ্গে
একলা কথা বলবার জন্য পাগলের মত সুযোগ খুঁজছিল। এরপর অন্যান্য অতিথিদের থেকে একটু দূরে সরে গিয়ে
ছোট একটা টুল নিয়ে মেলানির পায়ের কাছে বসে পড়ল, মৃদুস্বরে ওর সঙ্গে আলাপ করতে লাগল,
ঠোঁটের কোণে স্বপ্নিল মন্থর হাসি, যে হাসিটা স্কারলেট ওর মুখে দেখতে এত ভালবাসে। ব্যাপারটা
আরও সঙ্গীন লাগল ওর কাছে যখন অ্যাশলের হাসিতে মেলানির চোখ থেকে জ্যোতি বিচ্ছুরিত হল,
মনে মনে স্কারলেটও মানতে বাধ্য হল যে তখন ওকে খুবই মিষ্টি লাগছিল। অ্যাশলের দিকে তাকালেই
মেলানির সাদামাটা চোখে মুখে অন্তঃস্থিত জ্যোতি ঠিকরে বেরোয়, প্রেমপূর্ণ হৃদয়ের প্রতিফলন
যদি চেহারায় ফুটে ওঠার সুযোগ কখনো ঘটে তবে মেলানি হ্যামিল্টনের চেহারায় এখন সেটাই ফুটে উঠেছে।
ওদের দুজনের ওপর থেকে চোখ ঘুরিয়ে নেবার জন্য স্কারলেট আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছিল,
কিন্তু পেরে উঠছিল না। যতবার ওদের দিকে চোখ পড়ছিল, ততবারই ওকে ঘিরে রাখা ফূর্তিবাজ
ছোকরাদের সঙ্গে আমোদের মাত্রা দ্বিগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছিল, বেশি বেশি করে হাসছিল, ওদের
উত্যক্ত করছিল, ওদের তারিফ শুনে ঘন ঘন মাথা ঝাঁকাচ্ছিল যাতে ওর দুলজোড়া দুলে ওঠে। মাঝে
মাঝেই “নিকুচি করেছে” বলে চেঁচিয়ে উঠছিল, এমনকি ওদের বলেও দিল যে ওরা সবাই বানিয়ে বানিয়ে
মিথ্যে কথা বলছে, তাই প্রতিজ্ঞা করল যে আর কখনও পুরুষমানুষের কথায় বিশ্বাস করবে না।
তবে অ্যাশলে ওকে লক্ষ্য করেছে বলে মনে হল না। শুধুই মেলানির পানে চেয়ে ওর সঙ্গে কথা
বলেই চলল, আর মেলানিও নত চোখে ওর দিকে এমন করে তাকিয়ে আছে যেন বোঝাতে চাইছে যে অ্যাশলে
একান্তভাবে ওর নিজের।
আর সেজন্যই স্কারলেটের মন খুব খারাপ।
ওপর ওপর দেখে কারোর বোঝার সাধ্যও নেই যে স্কারলেট মনে মনে দুঃখী হয়ে আছে। সন্দেহাতীতভাবে
আজকের বারবেকিউতে ওই হল সুন্দরীদের মধ্যে অগ্রগণ্যা, সবার মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু। ছেলেদের মনে যেরকম উন্মাদনা সৃষ্টি করছে, তার সাথে
অন্যান্য মেয়েদের জ্বলুনি – অন্য কোনো সময় হলে পরিতুষ্টির সীমা থাকত না।
চার্লস হ্যামিল্টন, স্কারলেটের নজরে পড়ে দুঃসাহসী হয়ে পড়ায়, ওকে স্কারলেটের ডানদিক
থেকে কিছুতেই সরান যাচ্ছে না, টার্লটন যমজ ভাইদের শত প্রচেষ্টা সত্ত্বেও। একহাতে স্কারলেটের
পাখা আর অন্য হাতে নিজের অস্পর্শিত বারবেকিউয়ের প্লেটটা ধরে হানির চোখে চোখ না পড়ার
আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে; হানির কাঁদোকাঁদো অবস্থা। কেড স্কারলেটের বাঁদিকটা দখল
করে মনোযোগ আকর্ষণের জন্য ওর স্কার্ট ধরে টানছে
আর স্টুয়ার্টের দিকে চোখ রাঙিয়ে তাকাচ্ছে। ইতিমধ্যেই ওর আর যমজ ভাইদের মধ্যে একটা টানটান
পরিস্থিতি তৈরি হয়ে পড়েছে, এবং দু’চারটে রুক্ষ কথা কাটাকাটি হয়েও গেছে। এদিকে ফ্র্যাঙ্ক কেনেডিও একচোখো মুরগির মত ওকের ছায়া
আর টেবিলের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছেন, সুখাদ্য সাজিয়ে এনে স্কারলেটকে প্রলুব্ধ করার জন্য,
যেন ওই কাজটা করার এক ডজন চাকরবাকর ঘটনাস্থলে অনুপস্থিত। ফলে স্যুয়েলেনের বিরক্তি চূড়ান্ত
পর্যায়ে পৌঁছে গিয়ে ভদ্রতার মুখোশটা বারে বারে খুলে যাচ্ছে আর স্কারলেটের দিকে কটমট
করে তাকাচ্ছে। ছোট্ট ক্যারীন তো প্রায় কেঁদেই ফেলে, সকালে স্কারলেটের দেওয়া আশ্বাসের
পরেও ব্রেন্ট একবার ‘এই যে, বোনু’ বলা আর ওর চুলের ফিতে ধরে আদর করে একটা টান দেওয়া
ছাড়া সমস্ত মনোযোগ স্কারলেটের ওপরেই দিয়ে যাচ্ছে। সাধারণত ব্রেন্ট ওর সঙ্গে খুবই মিষ্টি ব্যবহার করে,
গম্ভীর মুখে মনোযোগ দিয়ে ওর কথা শোনে, ফলে নিজেকে সাবালিকা বলে মনে হয়। মনে মনে ক্যারীন
সেই দিনটার প্রতীক্ষায় আছে যেদিন ঠিক বড়দের মত সাজগোজ করে সত্যি সত্যিই ব্রেন্টকে নিজের
বিউ বলে গ্রহণ করতে পারবে। আর এখন মনে হচ্ছে স্কারলেটই ওকে আগেভাগে দখল করে বসে আছে।
শ্যামলা ফোন্টেন ভাইরা দলছুট হয়ে পড়ায় মুনরো
বোনেরা কোনোক্রমে নিজেদের বিরক্তি চেপে রেখেছে, কিন্তু টোনি আর অ্যালেক্স যেভাবে লাজলজ্জা
বিসর্জন দিয়ে স্কারলেটের পাশের জায়গাটা দখল করার সুযোগ খুঁজছে, তাতে ওরা রীতিমত ক্ষুব্ধ।
স্কারলেটের আচরণের প্রতি নিজেদের অসন্তোষ চোখের সুক্ষ্ম ইশারায় হেটি টার্লটনকে
জ্ঞাপন করল। একমাত্র ‘ছেনাল’ কথাটাই স্কারলেটের
জন্য যথাযথ বিশেষণ। তিন তরুণী নিজের নিজের লেস বসানো ছাতা তুলে নিয়ে বলল যে খুব বেশি
বেশি খাওয়া হয়ে গেছে, আর পারা যাচ্ছে না, তারপর যে যার পাশের যুবকটির বাহুতে আলতো টোকা
মেরে আহ্লাদী গলায় চল না, গোলাপের বাগান আর ঝর্ণা দেখে সামারহাউসে বসে একটু বিশ্রাম নিই বলে বায়না ধরল।
ওদের এই সুকৌশলী প্রস্থানের হেতু বিশেষ একজন মহিলার বুঝতে বাকি রইল না এবং বিশেষ একজন
পুরুষমানুষের নজর এড়িয়ে গেল না।
মেয়েগুলো যেভাবে তিন তিনটে ছেলেকে ওর মোহজাল থেকে উদ্ধার করে আশৈশব পরিচিত দ্রষ্টব্য
অন্বেষণে টানতে টানতে নিয়ে গেল, তা দেখে স্কারলেট মুখ টিপে হাসল আর তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে
অ্যাশলে দেখে বোঝার চেষ্টা করল যে ও ব্যাপারটা খেয়াল করেছে কিনা। কিন্তু অ্যাশলে মেলানির
ওড়না নিয়ে খেলা করতে করতে ওর দিকে হাসিহাসি মুখে তাকিয়ে। স্কারলেট হৃদয়ে বেদনা বোধ
করল। ইচ্ছে করছিল মেলানির শুভ্র ত্বক খামচে ধরে রক্ত বের করে মনের জ্বালা জুড়োয়।
মেলানির থেকে চোখ সরাতেই রেট বাটলারের চোখে চোখ পড়ল, ভিড় থেকে নিজেকে সরিয়ে এনে
উনি জন উইল্কসের সঙ্গে আলাপচারিতায় ব্যস্ত। ওঁর নজর ওর দিকেই, চোখে চোখ পড়তেই নির্লজ্জের
মত হাসলেন। স্কারলেটের মনে হল, এই ভদ্রলোক, যিনি কারোর বাড়িতে আমন্ত্রণ পান না, উনিই
একমাত্র লোক যেইনি ওর উদ্দাম আচরণের আসল কারণটা আন্দাজ করতে পেরেছেন আর সেজন্য বেশ
একটা তাচ্ছিল্যের আনন্দ লাভ করছেন। ভেবে খুব
অস্বস্তি বোধ করল। ইচ্ছে করল ওঁকে খামচে দেয়।
“বিকেল পর্যন্ত মাথাটা ঠাণ্ডা রাখতেই হবে,” স্কারলেট ভাবল। “মেয়েরা যখন সন্ধ্যের
আসরে তরতাজা দেখানোর জন্য বিশ্রাম নিতে ওপরে চলে যাবে, আমি নীচেই থাকব, আর অ্যাশলের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ করে নিতে হবে।
ও নিশ্চয়ই আমার সর্বজনপ্রিয়তাটা খেয়াল করেছে।” আরও একটা আশার বাণী শুনিয়ে নিজেকে শান্ত
করল, “মেলানির দিকে ওকে মনোযোগ দিতে হচ্ছে, এটা তো খুবই স্বাভাবিক। হাজার হলেও মেলানি
আর ও তো সম্পর্কে কাজ়িন, আর মেলানি তো ওর মত এতটা জনপ্রিয় নয়। অ্যাশলে ওর দিকে মনোযোগ
না দিলে ওকে তো পটের বিবিটির মত একলা পড়ে যেত।”
কথাটা মনে হতেই মনে মনে বেশ বল পেল। চার্লসের দিকে আরও বেশি বেশি করে মনোযোগ দিতে
আরম্ভ করল। বেচারার বাদামি চোখদুটো উজ্জ্বল হয়ে উঠে সাগ্রহে ওর পানে তাকিয়ে থাকল। চার্লসের
জন্য দিনটা বড়ই চমৎকার, স্বপ্নময় দিন, বিনা আয়াসেই স্কারলেটের প্রেমে হাবুডুবু খেতে
লাগল। এই নবলব্ধ অনুপ্রেরণায় হানি যেন দূরাগত মলিন এক স্মৃতি। হানির কণ্ঠস্বর যেন চড়াইপাখির
মত রুক্ষ, তুলনায় স্কারলেটের কণ্ঠস্বরে কোকিলের মাধুর্য ঝরে পড়ছে। স্কারলেট ওকে উত্ত্যক্ত করতে লাগল, ওর সঙ্গে আদিখ্যেতা
করতে লাগল, উলটোপালটা প্রশ্ন করে নিজেই তার জবাব দিয়ে গেল, যাতে করে কিছু বলতে না পারলেও
চার্লসকে খুব চালাকচতুর লাগে। স্কারলেটের সবাইকে দেখিয়ে খাতির করা দেখে অন্যান্য ছেলেরা
রীতিমত বিভ্রান্ত আর বিরক্ত হয়ে পড়ল। ওরা ত জানে চার্লস অত্যন্ত লাজুক প্রকৃতির, পরপর
দুটো কথাও গুছিয়ে বলতে পারে না, ফলে ক্রমবর্ধমান রোষে ওদের পক্ষে শিষ্টতার মুখোশ বজায়
রাখা বেশ দুরূহ হয়ে উঠল। সকলেই রাগে ফুঁসছে, এটাকে স্কারলেট ওর নিশ্চিত জয় বলেই গণ্য
করতে পারত, বাদ সাধল কেবল অ্যাশলেই।
পোর্ক, চিকেন আর মাটনের শেষ টুকরোটাও যখন উদরস্থ হয়ে গেল, স্কারলেট আশা ছিল যে
ইন্ডিয়া নিজে উঠে পড়ে সব মেয়েদেরই বাড়ির ভেতরে গিয়ে বিশ্রাম নেবার জন্য আমন্ত্রণ জানাবে। বেলা গড়িয়ে দুটো বেজে গেছে, মাথার ওপরে রোদ্দুরেরও
তেজ কম নয়, কিন্তু বারবেকিউয়ের প্রস্তুতিতে লাগাতার তিনদিন ধরে খাটাখাটুনি করার পর
কুঞ্জবনে ইন্ডিয়ার বসে থাকতে ভালই লাগছিল। ফেয়্যাটভিলের একজন বৃদ্ধ বধির ভদ্রলোকের
সঙ্গে উচ্চৈঃস্বরে বকবক করে যাচ্ছিল।
সমাবেশের ওপর একটা অলস তন্দ্রাচ্ছন্ন ভাবের অবতারণা হয়েছে। নিগ্রোরা ঘুরে ঘুরে
যে লম্বা টেবিলগুলোতে আহার্য পরিবেশন করা হয়েছিল, সেগুলো পরিষ্কার করছে। হাসাহাসি,
কথাবার্তাও স্তিমিত হয়ে এসেছে আর ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা দলগুলোর মধ্যে নীরবতা বিরাজ করছে।
প্রত্যেকেই গৃহস্বামিনীর তরফ থেকে সকালের আসরের সমাপ্তি ঘোষণার প্রতীক্ষায় আছেন। তালপাতার
পাখার আন্দোলনও মন্থর হয়ে এসেছে, অতিরিক্ত ভোজন আর রোদের তাপে অনেক ভদ্রলোকই ঢুলতে
শুরু করেছেন। বারবেকিউ সমাপ্ত, সকলেই সূর্যদেবের পশ্চিমদিকে ঢলে না পড়া অবধি সামান্য
বিশ্রামের জন্য উন্মুখ হয়ে আছেন।
সকালের পার্টি আর সন্ধেবেলার বলড্যান্সের আসরের এই মধ্যান্তরে প্রত্যেককেই খুব
সুস্থির আর শান্তিপ্রিয় বলে মনে হচ্ছে। যে চঞ্চল তৎপরতা একটু আগেও পুরো সমাবেশকে জমিয়ে
রেখেছিল, এখন তার অবশেষ কেবল মাত্র তরুণদের মধ্যেই লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিভিন্ন দলে
ঘুরে ঘুরে মৃদু মন্থর স্বরে গল্প করছে – চনমনে ঘোড়ার বাচ্চার মতই ওদের রূপবান দেখাচ্ছে,
একই রকম বিপজ্জনকও। তপ্ত মধ্যাহ্নের ঢিলেঢালা
স্রোতে জনতা গা ভাসিয়ে দিলেও, একটা অস্থিরতা মাঝে মধ্যেই উঁকি মারছে যা চোখের নিমেষে
মারমুখী হয়ে উঠতে পারে, বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে। এই সব পুরুষ এবং নারী – এরা সুন্দর যেমন, বন্যও ততটাই
– বাইরের হাসিখুশি চেহারার আড়ালে এরা একটা হিংস্র মনোভাব পুষে রেখেছে, সেখানে সংযমের
বড়ই অভাব।
আরও কিছুটা সময় কেটে গেল, সূর্যদেব আরও তপ্ত হয়ে উঠেছেন, স্কারলেট এবং অন্যান্যরা
ইন্ডিয়ার দিকে চাইল। বিশ্রম্ভালাপও প্রায় বন্ধ হয়ে এসেছে, ঠিক এমন সময় প্রত্যেকে জেরাল্ডের
উচ্চকণ্ঠের হুঙ্কার শুনতে পেলেন। বারবেকিউ টেবিল থেকে অল্প দূরে দাঁড়িয়ে জন উইল্কসের
সঙ্গে তুমুল কথা কাটাকাটিতে মশগুল।
“নিকুচি করেছে মশাই! ইয়াঙ্কিদের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সমঝোতার জন্য প্রার্থনা করা
উচিত? ওই শয়তানগুলোকে ফোর্ট সামটের থেকে ঠেঙিয়ে
বার করে দেওয়ার পরেও? শান্তিপূর্ণ? দক্ষিণের উচিত লড়াই করে বুঝিয়ে দেওয়া যে আমাদের
ইউনিয়ন ভেঙ্গে বেরিয়ে আসাটা ওদের দয়ার ওপর ভরসা করে নয়, নিজেদের বাহুবলের জোরে!”
“হে ভগবান!” স্কারলেট মনে মনে প্রমাদ গুনল। “শুরুটা করেই দিলেন! এখন মাঝরাত পর্যন্ত
বসে বসে এইসব শুনে যেতে হবে!”
পলকের মধ্যে ঝিমিয়ে পড়া পরিবেশ একেবারে চাঙ্গা হয়ে উঠল, যেন আকাশ ভেদ করে বিদ্যুৎ
ঝলকে উঠেছে। যে যার বেঞ্চ, চেয়ার ছেড়ে লাফিয়ে উঠে, হাত নাড়তে নাড়তে, গলা তুলে প্রত্যেকেই
নিজের নিজের মতামত সর্বাগ্রে জানানোর রেশারেশিতে বিরাট শোরগোল তুলে ফেলল। সকাল থেকেই রাজনীতি বা আসন্ন যুদ্ধ নিয়ে একটা কথাও
কেউ তোলেনি, কারণ মিস্টার উইল্কস অনুরোধ জানিয়ে রেখেছিলেন যে কোনোভাবেই মহিলারা যেন
বিরক্তবোধ না করেন। কিন্তু যেই জেরাল্ড “ফোর্ট সামটের” বলে হুঙ্কার দিয়ে উঠলেন, গৃহস্বামীর
উপদেশের কথা কারোর মনেই রইল না।
“অবশ্যই লড়াই হবে – ” “ইয়াঙ্কি চোরের দল সব – ” “এক মাসের মধ্যে ওদের ঠেঙিয়ে তাড়িয়ে
দেব – ” “দক্ষিণের একেকটা লোক কুড়িজন ইয়াঙ্কিকে ঘায়েল করতে পারে – ” “এমন শিক্ষা দেবে
যে জীবনেও ভুলতে পারবে না – ” “শান্তিপূর্ণ ভাবে? ওরা আমাদের শান্তিতে থাকতে দেবেই
না – ” “উহুঁ, একবার ভেবে দেখুন, মিস্টার লিঙ্কন কীভাবে আমাদের কমিশনারদের অপমান করলেন!”
“বটেই তো, সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধরে ওদের লাগিয়ে রাখলেন – বলেন কিনা ফোর্ট সামটের খালি
করিয়েই ছাড়বেন!” “ওরা তো যুদ্ধই চাইছে; এমন
শিক্ষা দেব ওদের, যুদ্ধের নাম শুনলেই পালাবে!” আর সব কণ্ঠস্বর ছাপিয়ে জেরাল্ডের কণ্ঠস্বর
গমগম করতে লাগল। একটা কথাই বারবার স্কারলেটের
কানে আসছিল “রাষ্ট্রের অধিকার, ঈশ্বরের নামে দিব্যি!” পরিস্থিতিটা জেরাল্ড রীতিমত উপভোগ
করছিলেন, কিন্তু ওঁর কন্যা মোটেও করছিল না।
বিচ্ছিনতাবাদ, যুদ্ধ – এই কথাগুলো বারবার শুনে বহুদিন থেকেই স্কারলেটের একঘেয়ে
লাগতে শুরু করেছে, কিন্তু এই মুহূর্তে মনে হল এই কথাগুলোকে ও ঘেন্না করে, কারণ এর অর্থ
হল পুরুষমানুষরা এখন ঘন্টার পর ঘন্টা ধরে একে অপরকে শুনিয়ে জ্বালাময়ী বক্তৃতা দিতে
থাকবেন, আর অ্যাশলেকে এই দল থেকে বিচ্ছিন্ন করে নিয়ে আসার সুযোগটাও মাটি হয়ে গেল। সত্যি
সত্যিই তো আর যুদ্ধ হবে না – আর প্রতিটা লোকই সেই ব্যাপারে যথেষ্ট ওয়াকিবহাল।
অন্য্যান্যদের মত চার্লস হ্যামিল্টন উঠে চলে যায়নি, বরং স্কারলেটকে অপেক্ষাকৃত
একলা পেয়ে ওর কাছে ঘেঁষে এল। নবলব্ধ প্রেমের অনুপ্রেরণায় ফিসফিস করে একটা স্বীকারোক্তি
দিয়ে ফেলল।
“মিস ও’হারা – আমি – আমি না ঠিক করে নিয়েছি যে লড়াই যদি সত্যিই বেঁধে যায়, দক্ষিণ
ক্যারোলাইনায় চলে যাবে আমি, ওখানকার একটা ট্রুপে যোগ দেব। শুনেছি, মিস্টার ওয়েড হ্যাম্পটন
একটা অশ্বারোহী বাহিনী গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন, আমি ওঁর দলেই যোগ দিতে চাই। দারুণ ভাল
মানুষ উনি, আর আমার বাপির সব থেকে ভাল বন্ধু।”
স্কারলেট ভাবল, “এতে আমার কী করা উচিত – অভিনন্দন জানানো?” কারণ চার্লসের হাবভাব
দেখে মনে হচ্ছিল যেন হৃদয়ের গোপনতম কথাটা ও স্কারলেটকে বলে দিল। বলার মত কিছুই ভেবে
উঠতে পারল না, তাই চুপচাপ ওর দিকে চেয়ে রইল। কেন যে পুরুষমানুষ বোকার মত ভাবে যে মেয়েদের
এই সব ব্যাপারে জানার প্রবল আগ্রহ! চার্লস ওর অভিব্যক্তি দেখে মনে করল কথাটা শুনে স্কারলেট
হতবাক হয়ে গেলেও ওর সিদ্ধান্তে অনুমোদন দিল। তাই মনে বল পেয়ে তড়বড় করে বলে গেল –
“আমি – আমি চলে গেলে – তুমি কষ্ট পাবে, মিস ও’হারা?”
“কেঁদে প্রতি রাতে বালিশ ভিজিয়ে ফেলব,” কথাটা স্কারলেট একটু ফাজলামি করেই বলল,
কিন্তু চার্লস কথাটা সত্যি ভেবে আনন্দে আত্মহারা হয়ে উঠল। স্কারলেটের হাতটা ওর পোশাকের
মধ্যে গোঁজা ছিল। চার্লস খুব সাবধানে হাতটা স্পর্শ করে আলতো করে চাপ দিল। নিজের দুঃসাহসিকতায়
আর স্কারলেটের দিক থেকে মৌন সম্মতি পেয়ে একেবারে বিহ্বল হয়ে পড়ল।
“আমার জন্য প্রার্থনা করবে?”
“কী বোকচন্দর রে বাবা!” স্কারলেট বিরক্ত মনে ভাবল, আড়চোখে একবার ইতিউতি চাইল, এই
রকম কথোপকথন থেকে নিষ্কৃতি লাভের আশায়।
“করবে তো?”
“হ্যাঁ, নিশ্চয়ই করব, মিস্টার হ্যামিল্টন। রাত্তিরে কম করে তিনবার জপমালা হাতে
নিয়ে জপ করব।”
চার্লস চকিতে চারপাশটা দেখে নিল, তারপর সজোরে শ্বাস নিয়ে, পেটের পেশিগুলো টানটান
করে নিল। ওদের আশেপাশে কেউই নেই, এরকম একটা সুযোগ সচরাচর আসে না। যদিও বা আসে, হয়ত
সাহসে কুলোবে না।
“মিস ও’হারা – একটা কথা জানাতে চাই তোমাকে। আমি না – আমি – আমি তোমাকে ভালবাসি!”
“হুম,” স্কারলেট অন্যমনস্কভাবে বলল। ভিড়ের ভেতর দিয়ে চোখ চালিয়ে দেখে নিল একবার।
অ্যাশলে এখনও মেলানির পায়ের কাছে বসে গল্প করছে।
“সত্যি বলছি!” ভাবাবেগে উদ্বুদ্ধ হয়ে চার্লস ফিসফিস করে বলে উঠল। কথাটা শুনে স্কারলেট
হেসে উঠল না, বা চেঁচিয়েও উঠল না, বা মূর্চ্ছাও গেল না – কোনো মেয়ে এরকম পরিস্থিতিতে
ঠিক যা যা করে থাকে বলে ও কল্পনা করেছিল, সেরকম কিছুই করল না। “আমি তোমাকে ভালবাসি! তুমি হলে সব চাইতে – সব চাইতে
– ” জীবনে প্রথমবার ওর কথা আটকে গেল না। “আমার দেখা সব চেয়ে সুন্দরী মেয়ে – সব চেয়ে
মিষ্টি – সব চেয়ে নরম মনের মেয়ে। তোমার আচার আচরণ আমাকে মুগ্ধ করে, আমার সমস্ত হৃদয়
দিয়ে তোমাকে আমি ভালবাসি। তুমি আর কাউকে ভালবাসবে, সেটা আমি কল্পনাতেও আনতে পারি না।
তুমি আমাকে সাহস দিলে, তোমার ভালবাসা জয় করার জন্য দুনিয়ায় এমন কোনো কাজ নেই যা আমি
করতে পারব না। আমি – ”
চার্লস থেমে গেল, কারণ স্কারলেটের কাছে নিজের প্রেমের গভীরতা প্রমাণ করার জন্য
কোন কাজটা যথেষ্ট কঠিন হতে পারে, ভেবে পেল না। তাই সরল মনে বলল, “আমি তোমাকে বিয়ে করতে
চাই।”
“বিয়ে” কথাটা কানে যেতেই এক ধাক্কায় স্কারলেট পৃথিবীতে ফিরে এল। এতক্ষণ বিয়ের কথাই
ও ভাবছিল, আর অ্যাশলের কথা, চোখেমুখে বিরক্তির ভাবটা ভাল করে চাপা না দিয়েই ও চার্লসের
দিকে তাকাল। বোকার হদ্দ এই ছেলেটার কি খেয়েদেয়ে
কোনো কাজ নেই যে বারবার ওর চিন্তাস্রোতে বিঘ্ন ঘটিয়ে চলেছে? আজকের এই বিশেষ দিনটাতে
যখন ও নিজেই কত দুশ্চিন্তার মধ্যে রয়েছে, মাথাটা প্রায় খারাপ হয়ে যাওয়ার জোগাড়! লাজুক ছেলেটির ব্যাকুল বাদামি চোখে প্রথম প্রেম নিবেদনের
সলজ্জ অনুভূতিটা ধরতে পারল না। ওর হৃদয়ের অনির্বচনীয় আনন্দের প্রকাশটাও লক্ষ্য করল
না। যে সুখানুভূতি, যে কোমলতা বহ্নিশিখার মত
ওর হৃদয়ে আলোড়ন জাগিয়ে তুলেছে, সেটাও আবিষ্কার করতে পারল না। পুরুষমানুষদের কাছ থেকে
পাণিপ্রার্থনার প্রস্তাব পাওয়া স্কারলেটের কাছে নতুন কিছুই নয়। ওরা চার্লস হ্যামিল্টনের
থেকে শতগুণ বেশি আকর্ষণীয়, চালাকচতুর। এই বারবেকিউতে
যখন নিজের সমস্যা নিয়েই এত জর্জরিত, তখন দুম করে ওকে বিয়ের প্রস্তাব না দিয়ে ফেলার
মত বোধবুদ্ধি ওদের আছে। ও শুধু দেখতে পেল যে
কুড়ি বছরের একটা ছেলে, লজ্জায় একেবারে রাঙা হয়ে উঠেছে, আর কী আহম্মকের মতই না ওকে দেখতে
লাগছে। তবে এরকম পরিস্থিতিতে কী করা উচিত সেই ব্যাপারে এলেনের উপদেশটা মনে পড়ে গেল।
নত নয়নে বিড়বিড় করে অভ্যস্ত বুলি আওড়ে গেল, “মিস্টার হ্যামিল্টন, আমাকে স্ত্রী রূপে
লাভ করার প্রস্তাব দিয়ে আপনি আমাকে যে সম্মান প্রদর্শন করেছেন, আমি সেজন্য আন্তরিকভাবে
কৃতজ্ঞ। তবে ব্যাপারটা এতটাই আকস্মিকভাবে ঘটে গেল, আমার ঠিক কী বলা উচিত বুঝতে পারছি
না।”
পুরুষ অহমিকায় আঘাত করাও হল না, আবার পুরুষমানুষটির হৃদয়াবেগের ওপর দখলটাও বরকরার
রইল – খুব পরিচ্ছন্ন একটা কৌশল। এই ধরণের টোপ চার্লসের কাছে নতুন তাই প্রথম সুযোগেই
টোপটা গিলে ফেলল।
“আমি আজীবন তোমার প্রতীক্ষায় থাকব! তুমি পুরোপুরি নিশ্চিত হতে পারলেই আমি তোমাকে
কামনা করব। তবুও, মিস ও’হারা, একবার শুধু আশ্বাস দাও যে আমি তোমার প্রতীক্ষা করতে পারি।”
“হুম,” অ্যাশলের দিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখতে রাখতে স্কারলেট বলল। যুদ্ধ নিয়ে কথা বলবার
জন্যও যে অ্যাশলে উঠে যায়নি, সেটাও লক্ষ্য করল। হাসি হাসি মুখে মেলানির দিকে তাকিয়েই
আছে। এই বুদ্ধুটা, যে ওর হাতটা আঁকড়ে ধরে বসে
আছে, একটু যদি চুপ করে থাকে, তাহলে হয়ত ওদের কথোপকথনটা শুনতে পেত। ওরা কী নিয়ে কথা
বলছে সেটা জানাটা খুবই জরুরি। কী এমন কথা মেলানি বলছে যে অ্যাশলের চোখে আগ্রহ উছলে
পড়ছে?
উৎকর্ণ হয়ে কথাগুলো শোনার চেষ্টা করল, কিন্তু চার্লস আবার কথা বলে ওঠায় অস্পষ্ট
হয়ে গেল।
“উফ, একটু চুপ কর তো!” হিসহিসিয়ে উঠল স্কারলেট, না তাকিয়েই ওর হাতে একটা চিমটি
কাটল।
ধমক খেয়ে ঘাবড়ে গিয়ে চার্লস লজ্জায় লাল হয়ে উঠল, তারপর যখন খেয়াল করল স্কারলেটের
চোখ কীভাবে ওর বোনের ওপর সেঁটে আছে, তখন হেসে ফেলল। স্কারলেট ভয় পাচ্ছে, পাছে কেউ ওর
(চার্লসের) কথা শুনে ফেলে। এতে ওর অস্বস্তি বোধ করা, লজ্জা পাওয়াটা খুবই স্বাভাবিক।
চার্লস অনুভব করল ওর ভেতরে একটা পৌরুষ মাথাচাড়া
দিয়ে উঠছে, এর আগে ও কখনো কোনো মেয়েকে অস্বস্তিতে ফেলেনি। একটা মাদক উন্মাদনা ওকে পেয়ে
বসল। চোখেমুখে এমন একটা ভাব নিয়ে আসল যে ওর নিজস্ব ধারণা অনুযায়ী চেহারায় একটা উদ্বেগহীনতা
ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে, তারপর খুব সাবধানে চিমটিটা ফিরিয়ে দিয়ে বুঝিয়ে দিতে চাইল
যে স্কারলেটের বকুনিতে ও কিছু মনে করেনি।
চিমটিটা স্কারলেট খেয়ালও করল না, কারণ ওর কানে তখন মেলানির মধুর কণ্ঠ, যেটা কিনা
ওর অন্যতম ঐশ্বর্য, ভেসে আসছিল, “মিস্টার থ্যাকারে’র লেখালেখির ব্যাপারে তোমার সঙ্গে
একমত হতে পারলাম না। উনি বড়ই নিন্দুক। আমার
তো মনে হয় না উনি মিস্টার ডিকেন্সের মত একজন ভদ্রলোক হবেন।”
একজন পুরুষমানুষের সঙ্গে কী বোকা বোকা বিষয় নিয়ে আলোচনা, স্কারলেট মনে মনে হেসে
একটু নিশ্চিন্ত বোধ করল। উচ্চশিক্ষার দেমাকটাই যা ওর আছে, আর মেয়েদের উচ্চশিক্ষাকে
ছেলেরা কীভাবে নেয়, সে তো সবার জানা … ছেলেদের মনোযোগ আকর্ষণ করার জন্য এবং সেই আকর্ষণ
ধরে রাখার জন্য দরকার কেবল ওকে নিয়েই আলোচনা করতে থাকা আর তারপর ধীরে ধীরে সেই আলোচনাটা
সুকৌশলে ঘুরিয়ে নিজের দিকে নিয়ে আসা এবং সেখানেই ধরে রাখা। মেলানিকে যদি বলতে শুনত,
“তুমি কী দারুণ!” বা “তুমি কী করে এরকম করে ভাবতে পার? আমি ভাবতে গেলে মাথাটাই বোধহয়
ফেটে যাবে!” তাহলে অবশ্যই স্কারলেটের দুশ্চিন্তার কারণ হত। আর দেখ একবার, একজন পুরুষমানুষ
ওর পায়ের কাছে বসে আর ও এমন গুরুগম্ভীর আলোচনায় ব্যস্ত যেন উনি গির্জায় বসে বাণী বিতরণ
করছেন! নিজের সম্ভাবনাটা স্কারলেটের কাছে যথেষ্ট উজ্জ্বল মনে হল, মনে মনে এমন খুশিয়াল
হয়ে উঠল যে চার্লসের দিকে সহাস্য দৃষ্টিপাত করে নিখাদ আনন্দের হাসি হাসল। অনুরাগের
হাসি মনে করে আনন্দের আতিশয্যে চার্লস ওর হাতপাখাটা তুলে নিয়ে এত জোরে জোরে বাতাস করতে
লাগল যে স্কারলেটের চুলগুলো এলোমেলো হয়ে যেতে লাগল।
“তোমার মতামতটা তো জানতে পারলাম না, অ্যাশলে,” তারস্বরে চীৎকার করতে থাকা জনতার
দিক থেকে ঘুরে জিম টার্লটন জানতে চাইলেন। মেলানির কাছে অনুমতি চেয়ে অ্যাশলে করার জন্য
উঠে দাঁড়াল। অ্যাশলের মত এমন সুপুরুষ এখানে আর একজনও নেই – অনায়াস সুষমায় অ্যাশলেকে
উঠে দাঁড়াতে দেখে স্কারলেট মনে মনে বলল। ওর
সোনালি চুল আর গোঁপে সূর্যের আলো পড়ে ঝলমল করছে।
প্রবীণরাও ওর বক্তব্য শোনার জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠলেন।
“দেখুন ভদ্রমহদয়গণ, জর্জিয়া যদি লড়াইতে যোগদান করে, আমি সেই লড়াইতে অবশ্যই শামিল
হব। তা না হলে শুধু শুধু ট্রুপে যোগ দিলাম কেন?” ও বলল। ধূসর চোখের ভাবালু দৃষ্টি কোন
মন্ত্রবলে যেন অদৃশ্য, পূর্ণদৃষ্টি মেলে সবার দিকে তাকাল। এই তীক্ষ্ণ দৃষ্টি স্কারলেট
আগে কখনও দেখেনি। “তবে বাপির মত আমিও আশা করি যে ইয়াঙ্কিরা আমাদের শান্তিতেই থাকতে
দেবে, লড়াই করার প্রয়োজন হবে বলে মনে হয় না – ” ফোন্টেন আর টার্লটন ভাইদের উত্তেজিত
কণ্ঠস্বর কানে আসতেই অল্প হেসে হাতটা ওপরে তুলল। “হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমি জানি – আমাদের
অপমান করা হয়েছে, আমাদের মিথ্যে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে – তবে আমরা যদি ইয়াঙ্কিদের জায়গায়
থাকতাম আর ওরা ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাবার চেষ্টা করত, তাহলে আমাদের প্রতিক্রিয়া কী হত?
মোটামুটি একই রকম। সেটা আমাদের ভাল লাগত না।”
“ওকে নিয়ে আর পারা গেল না,” স্কারলেট ভাবল। “সব সময় নিজেকে অন্যদের জায়গায় বসিয়ে
দেখার চেষ্টা।” স্কারলেটের কাছে যে কোনো বিতর্কে একটাই মাত্র সঠিক যুক্তি থাকতে পারে।
সত্যিই, মাঝে মাঝে অ্যাশলের মতিগতি বোঝা এত দুষ্কর!
“এত মাথা গরম করা উচিত নয়, আশা করা যাক যুদ্ধ যেন না হয়। পৃথিবীর অধিকাংশ দুর্দশার
মূলেই রয়েছে লড়াই। আর লড়াই থেমে যাওয়ার পর বোঝা যায় লড়াইয়ের আসল উদ্দেশ্যটা কারোরই
জানা ছিল না।”
স্কারলেট নাক সিটকাল। অ্যাশলের ভাগ্য ভাল যে অসমসাহসিকতার প্রশ্নে ওর খ্যাতি সুবিদিত,
নইলে বেশ ঝামেলায় পড়তে হত। এই সব যখন ভাবছে অ্যাশলের চারপাশে শোরগোল আরম্ভ হয়ে গেছে,
চাপা রাগে, অসন্তোষে।
গাছের ছায়ায় বসে থাকা ফ্যেয়্যাটভিলের সেই বধির ভদ্রলোক ইন্ডিয়াকে খোঁচা মারলেন।
“কী নিয়ে কথা হচ্ছে? কী বলছে ওরা?”
“যুদ্ধ!” ওঁর কানের কাছে মুখ এনে দুহাতে ঢেকে ইন্ডিয়া চেঁচিয়ে বলল। “ওরা ইয়াঙ্কিদের
সঙ্গে লড়াই করতে চাইছে!”
“যুদ্ধের কথা, তাই নাকি?” উনি চেঁচিয়ে উঠলেন। হাতড়ে হাতড়ে বেতের ছড়িটা খুঁজে সেটাতে
ভর দিয়ে অতি উৎসাহে চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়লেন, বহু বছর এরকম উত্তেজনা অনুভব করেননি। “আমি
যুদ্ধ নিয়ে ওদের কিছু বলব। আমি নিজে যুদ্ধে গিয়েছি।” যেভাবে বাড়ির মহিলারা ওঁকে চুপ
করিয়ে রাখেন, যুদ্ধ নিয়ে কথা বলবার সুযোগ মিস্টার ম্যাকরে’র বড় একটা আসে না।
বড় বড় পা ফেলে ছড়ি হাঁকিয়ে চেঁচাতে চেঁচাতে উনি ভিড়ের দিকে এগোতে লাগলেন। উনি যেহেতু
আশেপাশের কারোর কণ্ঠস্বরই শুনতে পাচ্ছিলেন না, অবিলম্বে উনিই সমাগমের অবিসংবাদিত বক্তা
হয়ে উঠলেন।
“ওহে, হম্বিতম্বি করনেবালা অর্বাচীনের দল, আমার কথা শোনো। লড়াই লড়াই করে অত নাচানাচি
কোরো না। আমি লড়াই করেছি, তাই আমি জানি। সেমিনোলের১ যুদ্ধে আমি লড়াই করেছি
আর এতই আহম্মক ছিলাম যে মেক্সিকান যুদ্ধেও২ আমি গেছিলাম। যুদ্ধ কী জিনিস তোমরা জানই না। তোমরা ভাবছ যুদ্ধ
হল টগবগে ঘোড়ায় চড়ে লড়াই করতে যাওয়া, মেয়েরা ফুল ছুঁড়ে তোমাদের বিদায় জানাবে, তারপর
যুদ্ধে জিতে বীরের মত বাড়ি ফিরে আসা। একেবারে নয়! না হে! লড়াই মানে দিনের পর দিন অনাহারে
থাকা, স্যাঁতস্যাঁতে মাটিতে ঘুমিয়ে হাম আর নিউমোনিয়াতে কাবু হয়ে পড়া। হাম আর নিউমোনিয়াকে
ঠেকিয়ে রাখতে পারলেও পেটকে পারবে না। হ্যাঁ হে, লড়াইতে গেলে মানুষের পেটের যে কি অবস্থা
হয় – আমাশা আর ওই ধরণের অনেক ব্যারাম – ”
মহিলারা লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠলেন। মিস্টার ম্যাকরে হলেন সেই জমানার নিদর্শন যখন লোকজনের
রুচিবোধ বেশ মোটা দাগের ছিল। এই যেমন গ্র্যান্ডমা ফোনটেনের সশব্দে উদগার মোচন করা।
ওই জমানাটা সকলেই ভুলে যেতে চায়।
“এই তাড়াতাড়ি যা, তোমার দাদুকে নিয়ে আয়,” বৃদ্ধ ভদ্রলোকের এক কন্যা কাছের একটা
অল্পবয়সী মেয়েকে নির্দেশ দিলেন। “কী আর বলব,” ওঁর আশপাশের প্রবীণা সঙ্গীদের বিচলিত
হতে দেখে চাপা গলায় বলে উঠলেন, “দিন-কে-দিন ওঁর বুদ্ধিশুদ্ধি লোপ পেয়ে যাচ্ছে। বললে
বিশ্বাস করবে না, এই আজ সকালেই মেরিকে বলে দিলেন – বেচারি এখন সবে ষোলোতে পা দিয়েছে
- ‘এই ছুঁড়ি …’” তারপরের কথাগুলো এমন ফিসফিস
করে বললেন যে আর শোনা গেল না। মিস্টার ম্যাকরের নাতনি ওর দাদুকে ফিরে আসার জন্য রাজি
করাতে দৌড়ে চলে গেল।
গাছের তলায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে থাকা প্রত্যেকটা দলেই মেয়েরা হেসে গড়িয়ে পড়ছিল, ছেলেরা
উদ্দীপ্তস্বরে আলোচনা করছিল, কিন্তু ওখানে একজন ব্যাক্তিই কেবল ছিলেন যাঁকে দেখে শান্ত
মনে হচ্ছিল। স্কারলেট ঘুরে রেট বাটলারের দিকে
তাকাল, একটা গাছে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন, হাতদুটো ট্রাউজ়ারের পকেটে ঢোকানো। মিস্টার
উইল্কসকেও এখন ওঁর পাশে দেখা যাচ্ছে না, উনি একলাই দাঁড়িয়ে আছেন। কথাবার্তা ক্রমশ গরম
হয়ে ওঠার পরেও উনি একটি কথাও বলেননি। সযত্নে
ছাঁটা কালো গোঁপের নীচের লাল ঠোঁট তলার দিকে সামান্য বাঁকা, কালো চোখের কোণে ব্যঙ্গের
আভাস – এই অর্বাচীন ছোঁড়াগুলোর হাঁকডাক শুনে যেন অত্যন্ত কৌতুক বোধ করছেন। বেশ দৃষ্টিকটু হাসি, স্কারলেটের মনে হল। ওদের কথাবার্তা নীরবেই শুনছিলেন। এমন সময় স্টুয়ার্ট
টার্লটন, ওর লাল চুল ঝাঁকিয়ে, চকচকে চোখে বলে উঠল, “আরে ওদের নিকেশ করতে তো আমাদের
একমাসও লাগবে না! ওই ছোটলোকগুলোর থেকে আমরা ঢের ভাল লড়তে পারি। এক মাস – তাই বা কেন,
একটাই লড়াই – ”
“ভদ্রমহোদয়গণ,” রেট বাটলার বলে উঠলেন – গাছে হেলান দেওয়া অবস্থান থেকে একটুও না
সরে বা পকেট থেকে হাত বের না করেই – কণ্ঠস্বরে কোনো ওঠা নামা নেই, মন্থর স্বরে, উনি
যে চার্লস্টনের মানুষ সেটা ওঁর উচ্চারণেই বোঝা যায়। “আমি কি দুয়েকটা কথা বলতে পারি?”
চোখদুটোর মত ওঁর হাবেভাবেও সুস্পষ্ট একটা অবজ্ঞার আভাস, একটা সৌজন্যের মোড়ক দিয়ে
হাস্যকরভাবে অবজ্ঞাটা আড়াল করার চেষ্টা।
সমবেত জনতা ঘুরে ওঁকে দেখে নিল, তারপর একজন বহিরাগতের প্রাপ্য শালীনতা দেখিয়ে অনুমতি
প্রদান করল।
“এখানে সমবেত ভদ্রমণ্ডলীর মধ্যে এমন কেউ আছেন কি, যিনি কখনো ভেবে দেখেছেন যে ম্যাসন-ডিক্সন
লাইনের৮ দক্ষিণে একটিও কামান তৈরির কারখানা নেই? কিংবা দক্ষিণে লোহা ঢালাইয়ের কারখানার সংখ্যা কত
কম? কিংবা উলের মিল, তুলোর কারখানা বা ট্যানারির সংখ্যা? আপনারা কি ভেবেছেন আমাদের
কাছে একটিও রণতরী নেই, অথচ ইয়াঙ্কিরা ওদের নৌবহর দিয়ে এক সপ্তাহের মধ্যে আমাদের বন্দরগুলো
ঘিরে ফেলে বিদেশে আমাদের তুলো রপ্তানি করা বন্ধ করে দিতে পারে? অবশ্য এইসব ব্যাপারে
আপনারা নিশ্চয়ই ভাবনাচিন্তা করে ফেলেছেন।”
“আরে, এ তো দেখছি, উনি আমাদের ছেলেদের গণ্ডমূর্খের দল বলে মনে করছেন!” রীতিমত রাগের
সঙ্গে স্কারলেট ভাবল, রক্ত গরম হয়ে উঠছে।
ভাবনাটা যে কেবল ওর মনেই আসেনি, সেটা চারপাশের অবস্থা দেখেই বোঝা যাচ্ছিল, কারণ
ছেলেদের অনেকেই একটা সমুচিত জবাব দেবার জন্য তৈরি হচ্ছে। যথাসম্ভব লোকের নজর এড়িয়ে কিন্তু দ্রুতপদে জন উইল্কস
বক্তার পাশে ফিরে এলেন, যেন উপস্থিত সবাইকে বলতে চাইলেন যে এই ভদ্রলোক তাঁর অতিথি,
আর তাছাড়া সেখানে মহিলারাও উপস্থিত রয়েছেন।
“এই যে আমরা দক্ষিণের মানুষরা, আমাদের অনেকেরই মুশকিল হল,” রেট বাটলার বলে চললেন,
“যে দেশভ্রমণের ব্যাপারে আমাদের যথেষ্ট আগ্রহ নেই কিংবা দেশভ্রমণ করলেও আমরা তার থেকে
খুব একটা কিছু শিখি না। মহাশয়গণ, ভ্রমণের যথেষ্ট অভিজ্ঞতা আপনাদের নিশ্চয়ই আছে। কোথায়
কোথায় গেছেন? ইউরোপে, নিউ ইয়র্কে আর ফিলাডেলফিয়াতে গেছেন এবং ভদ্রমহোদয়াগণ সারাটোগাতে
নিশ্চয়ই গেছেন।” (কথাটা বলেই বাগানে উপস্থিত সকলের উদ্দেশ্যে সামান্য মাথা ঝুঁকিয়ে
বাও করলেন।) আপনারা হোটেল দেখেছেন, জাদুঘর
দেখেছেন, বলড্যান্সের অনুষ্ঠানে গেছেন এমনকি জুয়ার আড্ডাতেও নিশ্চয়ই গেছেন। আর এই বিশ্বাস
নিয়ে বাড়ি ফিরেছেন যে দক্ষিণের চেয়ে উত্তম জায়গা আর কোথাও নেই। নিজের সম্বন্ধে বলতে পারি, চার্লস্টনে আমার জন্ম,
কিন্তু গত বেশ কয়েক বছর আমি উত্তরে কাটিয়ে এসেছি।” মৃদু হাসিতে ওঁর ঝকঝকে সাদা দাঁতগুলো
বেরিয়ে পড়ল, যেন উনি ভালই জানেন, ওঁর চার্লস্টনে না থাকার কারণ সম্বন্ধে উপস্থিত সকলেই
যথেষ্ট অবহিত। তবে অবহিত হলেও তা নিয়ে ওঁর কোনোই পরোয়া নেই। “আমি এমন অনেক কিছুই দেখেছি,
যা আপনারা দেখেননি। ওখানে হাজার হাজার অভিবাসী আছে যারা কেবল একটু ইয়াঙ্কি আহার আর
কয়েক ডলারের বিনিময়ে খুশি মনে লড়াই করবে। ওদের কলকারখানা, ঢালাইয়ের কারখানা, জাহাজ
মেরামতির কারখানা, কয়লা আর লোহার খনি – যেসব আমাদের নেই, আমি নিজের চোখে দেখে এসেছি।
আমাদের সম্পদ বলতে তুলো, ক্রীতদাস আর পর্বতপ্রমান ঔদ্ধত্য – এক মাসের মধ্যে ওরা আমাদের
শেষ করে দেবে।”
উত্তেজনাপূর্ণ নীরবতা বেশ কিছুক্ষণের জন্য। রেট বাটলার কোটের পকেট থেকে একটা ধবধবে
রুমাল বের করে আলসভরে আস্তিনের ধুলো ঝাড়তে লাগলেন। প্রথমে ভিড়ের মধ্যে ক্রুদ্ধ অসন্তোষের
প্রবল গুঞ্জন সৃষ্টি হল, তারপর বাগানের দিক থেকে মৌচাকে ঢিল পড়া অশান্ত মৌমাছিদের মত
সম্মিলিত প্রতিবাদ ভেসে এল। রক্ত আগে থেকেই গরম হয়ে থাকলেও স্কারলেটের বাস্তববুদ্ধি
সম্পন্ন মন বলল যে এই লোকটা সঠিক কথাই বলতে চাইছেন আর সাধারণ যুক্তিবোধ দিয়েই সেটা
বোঝা যায়। সত্যিই তো, কারখানা ও কখনও দেখেনি, কেউ দেখেছে বলেও শোনেনি। তবে কথাগুলো
সত্যি হলেও উনি তো আর ভদ্রলোক নন – তাই এসব কথা ওঁর বলা সাজে না – বিশেষ করে এরকম একটা
পার্টিতে যেখানে সবাই জমিয়ে আনন্দ ফূর্তি করছে।
ভুরু কুঁচকে স্টুয়ার্ট টার্লটন এগিয়ে গেল, ঠিক ওর পেছনে পেছনে ব্রেন্টও এগিয়ে গেল।
অবশ্য টার্লটন ভাইদের আচার আচরণ খুবই সংযত, তাই বারবেকিউতে ওরা কোনোরকম আপত্তিকর কিছু
করে বসবে না, যদিও প্ররোচিত হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে। তবুও মহিলারা উপাদেয় কিছু দেখতে পাবার উত্তেজনায়
অধীর হয়ে উঠলেন, কারণ এরকম ঝগড়া বা বাকবিতণ্ডা দেখবার সুযোগ ওঁদের কমই আসে। অন্যদের
কাছ থেকে শুনেই সন্তুষ্ট থাকতে হয়।
“স্যার,” স্টুয়ার্ট গম্ভীর গলায় বলল, “কী বলতে চাইছেন আপনি?”
রেট ওর দিকে শালীন কৌতুকের দৃষ্টিতে চাইলেন।
“বলতে চাইছি,” উনি বললেন, “যে কথাটা নেপোলিয়ন – ওঁর নাম শুনেছ হয়ত?– একবার বলেছিলেন,
‘ঈশ্বর সর্বদাই বলবানদের পক্ষে থাকেন!’” তারপর জন উইল্কসের দিকে ঘুরে অকৃত্রিম সৌজন্যের
সঙ্গে বললেন, “স্যার, আপনার লাইব্রেরিটা দেখাবেন বলে কথা দিয়েছিলেন। এখন দেখতে চাইলে
আপনাকে কি খুব বিব্রত করা হবে? বিকেলের আগেই আমাকে জোনসবোরো ফিরে যেতে হবে, ওখানে ছোট্ট একটা কাজ আমার জন্য পড়ে আছে।”
জনতার দিকে মুখ করে ঘুরে গিয়ে গোড়ালিতে গোড়ালি ঠেকিয়ে নৃত্যগুরুর কেতায় একটা বাও
করলেন। ওঁর তরঙ্গায়িত সুঠাম বলশালী শরীর একই সঙ্গে দৃষ্টিনন্দন লাগল এবং প্রগলভও মনে
হল – যেন সপাটে উনি উপস্থিত সবার গালে চড় কষিয়ে দিলেন। তারপর পেছন ফিরে জন উইল্কসের সঙ্গে লন পার হয়ে এগিয়ে
গেলেন, কালো মাথাটা উঁচু করে আর ওঁর অস্বস্তি জাগানো অট্টহাসির রেশ টেবিলের চারপাশের
জটলার দিকে ছড়িয়ে দিয়ে।
কিছুক্ষণের জন্য এক হতচকিত নীরবতা, তার পরেই আবার গুঞ্জন শুরু হয়ে গেল। ইন্ডিয়া
পরিশ্রান্ত মুখে আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়াল, তারপর ক্রুদ্ধ স্টুয়ার্ট টার্লটনের দিকে এগিয়ে
গেল। কী বলল সেটা স্কারলেট শুনতে পেল না, তবে স্টুয়ার্টের হেঁট মুখের পানে ইন্ডিয়া্কে
চেয়ে থাকতে দেখে স্কারলট নিজের বিবেকে সুক্ষ্ম মোচড় অনুভব করল। মেলানির অ্যাশলের পানে নিমগ্ন দৃষ্টিতে চেয়ে থাকার
সঙ্গে ইন্ডিয়ার চেয়ে থাকায় কোনও তফাত নেই, তফাত শুধু এটুকুই যে স্টুয়ার্ট এই চেয়ে থাকার
মর্ম বুঝতে পারেনি। অতএব, ইন্ডিয়া ওকে মন থেকেই ভালবাসে। পলকের জন্য স্কারলেটের মনে
হল, এক বছর আগের সেই রাজনৈতিক সমাবেশের সময় ও যদি স্টুয়ার্টের সঙ্গে খোলাখুলি ফ্লার্ট
না করত, তাহলে হয়ত অনেক আগেই ও ইন্ডিয়াকে বিয়ে করে নিত। পরমুহূর্তেই মনে হল কোনো মেয়ে
যদি নিজের প্রেমিককে ধরে রাখতে না পারে তাহলে স্কারলেটের কী দোষ? কথাটা মনে হতেই বিবেকের
দংশনটা কেটে গিয়ে খুব স্বস্তিবোধ করল।
অবশেষে স্টুয়ার্ট ইন্ডিয়ার দিকে তাকিয়ে হাসল, অনিচ্ছার সঙ্গে হাসা, তারপর ঘাড় হেলালো।
ইন্ডিয়া হয়ত ওকে মিস্টার বাটলারের পেছন পেছন গিয়ে কোনও ঝামেলা না করার জন্য মিনতি করছে।
অতিথিরা গাত্রোত্থান করে কোল থেকে খাবারের টুকরো ঝাড়তে ঝাড়তে মৃদু শোরগোল বাধিয়ে বসলেন।
স্থানত্যাগ করার আগে বিবাহিতা মহিলারা আয়া আর নিজের নিজের ছেলেমেয়েদের ডেকে নিলেন।
খিলখিল করে হাসতে হাসতে, মজা করতে করতে এক দঙ্গল মেয়ে গৃহ অভিমুখে রওনা দিল, দোতালার
শয়নকক্ষে শুয়ে শুয়ে নিজেদের মধ্যে গুজব চালাচালি করবে আর দিবানিদ্রা দেবে।
মিসেজ় টার্লটন বাদে অন্য মহিলারা পেছনের উঠোনের দিকে চলে গেলেন, ওক গাছের ছায়াময়
পরিবেশ আর কুঞ্জবন পুরুষমানুষদের জন্য ছেড়ে দিয়ে। জেরাল্ড, মিস্টার ক্যালভার্ট এবং আরও কয়েকজন মিসেজ়
টার্লটনকে থাকতে অনুরোধ করলেন, ট্রুপে ঘোড়া সরবরাহ করার ব্যাপারে ওঁর অবস্থান জানার
জন্য।
স্কারলেট আর চার্লস সেখানে বসেছিল, পায়চারি করতে করতে অ্যাশলে সেখানে চলে এল, ঠোঁটে
চিন্তামগ্ন আমুদে হাসি।
“খুব দাম্ভিক আর শয়তান লোকটা, তাই না?” বাটলারের চলে যাওয়া দেখতে দেখতে মন্তব্য
করল। “কখনো কখনো মনে হয় উনি বোর্জিয়া৩ পরিবারেরই একজন কেউ হবেন।”
স্কারলেট খুব তাড়াতাড়ি মনে করার চেষ্টা করল, কিন্তু বোর্জিয়া বলে এই কাউন্টির বা অ্যাটলান্টা বা স্যাভান্নার
কোনো পরিবারের নামই স্মরণ করতে পারল না।
“ওদের চিনলাম না তো। উনি কী ওদেরই আত্মীয়? কারা ওরা?”
চার্লস অবাক চোখে স্কারলেটের দিকে তাকাল, মনে মনে গ্লানি আর ভালবাসার দ্বৈরথে পড়ে
গেল। ভালবাসারই জয় হল শেষ পর্যন্ত, মেয়েদের কেবল মিষ্টি, সুশীলা আর সুন্দরী হওয়াটাই
বেশি জরুরি, বেশি বিদুষী হয়ে উঠলে মাধূর্যটাই চলে যাবে। তড়িঘড়ি বলে উঠল, “বোর্জিয়ারা
ইতালির মানুষ ছিলেন।”
“ও, তাই বল!” স্কারলেটের সব আগ্রহ চলে গেল। “ওরা বিদেশি!”
খুব মিষ্টি করে হেসে অ্যাশলের দিকে তাকাল, কিন্তু কোনো অজানা কারণে ও স্কারলেটের
দিকে তাকিয়ে নেই। চার্লসের দিকে তাকিয়ে আছে, ওর চোখের ভাষায় সহানুভূতি আর সমবেদনার
ছোঁয়া।
***
ল্যান্ডিং দাঁড়িয়ে থামের আড়াল থেকে সতর্কভাবে একতলার হলঘরে উঁকি মারল। ঘরটা ফাঁকাই
আছে। ওপরতলার শোবার ঘরগুলো থেকে অবিরাম বিভিন্ন কণ্ঠের কলকলানি আর খিলখিল করে হাসির
শব্দ ভেসে আসছে, কখনো চড়ায় উঠছে আবার কখনো খাদে নেমে যাচ্ছে, “সত্যি বলছিস! না রে বিশ্বাসই
হচ্ছে না!” আর “তারপরে ছেলেটা কী জবাব দিল?”,
এই ধরণের দু’চারটে আলাপ। বড় বড় ছ’খানা শোবার ঘরে খাটে বা সোফার ওপরে শুয়ে মেয়েরা বিশ্রাম
নিচ্ছে, ঢিলেঢালা পোশাকে, এলোকেশে। দিবানিদ্রা দেওয়ার ব্যাপারটা এই কাউন্টির রেওয়াজ,
আর বিশেষ করে সারাদিনের পার্টিতে – সেই সকাল থেকে শুরু হয়ে সন্ধেবেলা বলড্যান্সের আসর
পর্যন্ত – দুপুরে একটু ঘুমিয়ে নেওয়াটা বেশ প্রয়োজন। আধঘন্টার মত মেয়েরা নিজেদের মধ্যে
গুলতানি মারবে, তারপর দাসীরা এসে পর্দা টেনে দেওয়ার পর আলাপ আলোচনা মন্থর হতে হতে একসময়
বন্ধ হয়ে যাবে, তখন মৃদু শ্বাসপ্রশ্বাস ছাড়া আর কোনও শব্দ পাওয়া যাবে না।
স্কারলেট আগেভাগে নিশ্চিত হয়ে নিল যে মেলানি হানি আর হেটি টার্লটনের সঙ্গে বিছানায়
শুয়ে পড়েছে, তারপর চুপিচুপি হলঘরে এসে সিঁড়ি বেয়ে নামতে লাগল। ল্যান্ডিঙের জানলা দিয়ে
দেখল একদল লোক বাগানে বসে আয়েস করে লম্বা লম্বা গেলাস থেকে পানীয়ে চুমুক লাগাচ্ছে,
পুরো বিকেলটা ওরা ওখানেই কাটাবে, স্কারলেট জানে সেটা। দলের মধ্যে অ্যাশলেকে খুঁজল,
ওখানে নেই ও। তারপর কান পেতে অ্যাশলের কণ্ঠস্বর শুনতে পেল। যেমন আশা করেছিল, ও এখনও
বিবাহিতা মহিলা এবং আর তাঁদের ছেলেমেয়েদের বিদায় জানানোর জন্য গাড়িবারান্দাতেই দাঁড়িয়ে
আছে।
দুরুদুরু বক্ষে দ্রুতপদে সিঁড়ি বেয়ে নীচে চলে এল। যদি মিস্টার উইল্কসের মুখোমুখি
পড়ে যায়, তাহলে? অন্য মেয়েরা দিবানিদ্রা দিচ্ছে আর ও বাড়ির মধ্যে ঘুরঘুর করছে, কী কৈফিয়ত
দেবে? নাহ্, এই ঝুঁকিটা নিতেই হবে।
সিঁড়ির নিচের ধাপে পৌঁছতেই চাকরবাকরদের চলার আওয়াজ পেল। বাড়ির খানসামার হুকুমে
ওরা টেবিল চেয়ারগুলো তুলে নিয়ে যাচ্ছে, বলড্যান্সের আসরের জন্য জায়গা খালি করা হচ্ছে।
চওড়া হল পেরিয়ে লাইব্রেরিতে ঢোকার দরজাটা খোলা। ও নিঃশব্দে দ্রুতপদে ওখানে ঢুকে পড়ল।
অ্যাশলের বিদায় দানের পালা শেষ না হওয়া পর্যন্ত এখানেই অপেক্ষা করা যেতে পারে, তারপর
বাড়িতে ঢুকলে ওর সঙ্গে দেখা করবে।
রোদের জন্য পর্দা টানা থাকার দরুণ লাইব্রেরির ঘরটা আধা অন্ধকার। প্রায়ান্ধকার ঘরের
চারদিকের খাড়া দেওয়াল জুড়ে কালো কালো বইয়ের সারি – স্কারলেট খুব বিষণ্ণ বোধ করল। যে
বিশেষ আশা নিয়ে দেখা করবার এই ব্যাকুলতা তার জন্য জায়গাটা একেবেরেই পছন্দের নয় ওর।
অনেক বই একসঙ্গে দেখলে চিরকালই ওর মন খারাপ
হয়ে যায়, এমনকি যারা সারাক্ষণ বই মুখে নিয়ে বসে থাকে, তাদের দেখলেও। মানে – অ্যাশলে
বাদে বাকি সবাই। ভারি ভারি আসবাবপত্রগুলো – হাতল দেওয়া হাইব্যাক চেয়ারগুলো যা দীর্ঘদেহী
উইল্কস পুরুষদের কথা মনে রেখে বানানো হয়েছে, আর মেয়েদের জন্যে রাখা ভেলভেটের নরম চেয়ারগুলো
আর মেঝেতে রাখা ভেলভেটের কুশনগুলো – এই আলো আঁধারিতে ওকে যেন সবাই গিলে খেতে আসছে।
লম্বাটে কক্ষের একেবারে সুদূর প্রান্তে, ফায়ারপ্লেসের সামনে অ্যাশলের প্রিয় সাত ফুটের
সোফাটা পিঠ উঁচিয়ে আছে, যেন ঘুমন্ত বিশাল জানোয়ার একটা।
আলো আসার মত সামান্য ফাঁক রেখে দরজাটা ভেজিয়ে দিল, বুকের মধ্যে যে ধড়ফড় চলছে, সেটাকে
সামাল দেবার চেষ্টা করল। অ্যাশলেকে ঠিক কী বলবে বলে কাল ভেবে রেখেছিল সেটা মনে করার চেষ্টা করল, কিন্তু কিছুই
মনে করতে পারল না। কিছু বলবে বলে ভেবে রেখে
এখন বেমালুম ভুলে গেছে – না ভেবেছিল যে অ্যাশলেই ওকে কিছু বলবে? কিছুই মনে পড়ছে না,
সহসা ভয়ে হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে গেল। কি জ্বালা, বুকের ধকধকটা একটু থামলে কী বলা যায় ভেবে
নিতে পারে! এমন সময় অ্যাশলের গলা শুনতে পেল,
শেষ বিদায় সম্ভাষণ জানিয়ে সামনের হলঘরে ফিরে এল। কিন্তু ধকধকটা আরও বেড়ে গেল।
ঘুরেফিরে একটা কথাই কেবল মনে হচ্ছে যে ও অ্যাশলেকে ভালবাসে – অ্যাশলের সব কিছুই
ওর ভাল লাগে, ওর গর্বোদ্ধত সোনালি মাথা থেকে ওর পায়ের কালো বুটজোড়া পর্যন্ত। ওকে হাসতে
দেখলে ভাল লাগে, এমনকি সে হাসি যখন রহস্যে মোড়া মনে হয়, তখনও। ওর বিভ্রান্তিকর নীরবতাও
প্রিয়। এখন অ্যাশলে যদি ঘরে এসে ওকে আপন বাহুবন্ধনে আবদ্ধ করে নেয়, তাহলে মুখ ফুটে
কিছু বলার আর প্রয়োজনই হবে না। অ্যাশলে নিশ্চয়ই ওকে ভালবাসবে – “যদি আমি মনে মনে প্রার্থনা
করতে থাকি” – চোখ মুদে বিড়বিড় করে বলে যেতে
লাগল, “হে মা মেরি, অপার করুণাময়ী – ”
“কী ব্যাপার, স্কারলেট!” মনের অস্থিরতা ছাপিয়ে অ্যাশলের কণ্ঠস্বর কর্ণকুহরে প্রবেশ
করে ওকে কিংকর্তব্যবিমূঢ় করে ফেলল। হলঘরে দাঁড়িয়ে ভেজানো দরজার ফাঁক দিয়ে অ্যাশলে ওর
দিকে তাকিয়ে, মুখে জিজ্ঞাসু হাসি।
“কার কাছ থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছ – চার্লস, না টার্লটন ভাইদের থেকে?”
স্কারলেট ঢোঁক গিলল। তার মানে ছেলেরা কীভাবে ওর আশেপাশে ঘুরঘুর করছিল – নজর এড়ায়নি
ওর! অ্যাশলে সামনে দাঁড়িয়ে, চোখদুটো ঝিকমিক করছে, স্কারলেটের ভেতরের উত্তেজনার আভাসও
লাগেনি সেই চোখে – এক অব্যক্ত ভালোলাগায় মনটা ভরে উঠল। ওর মুখে কথা সরল না, হাত বাড়িয়ে ওকে কক্ষের অভ্যন্তরে
টেনে আনল। অ্যাশলে অবাক হল, কিন্তু কৌতুহলীও হল, কক্ষে প্রবেশ করল। স্কারলেটকে আড়ষ্ট
দেখাচ্ছে, ওর চোখদুটো জ্বলজ্বল করছে, এরকম আগে কখনো দেখেনি। আলো কম থাকলেও লক্ষ্য করল স্কারলেটের দুই গালে গোলাপি
আভা। ঘরে ঢুকে নিজে হাতে দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে
স্কারলেটের হাতটা ধরল।
“বল, কী হয়েছে?” প্রায় ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল।
ওর হাতের ছোঁয়া পেয়ে স্কারলেট থরথর করে কাঁপতে আরম্ভ করল। কল্পনায় যেমন
ভেবেছিল, এখন সেটাই হতে চলেছে! হাজার
হাজার অসংলগ্ন ভাবনা এসে মনকে ভারাক্রান্ত করে দিল, কিন্তু কোনো একটা ভাবনাও
গুছিয়ে উঠতে পারল না। ও কেবল কেঁপেই চলল আর একদৃষ্টে অ্যাশলের মুখের পানে চেয়ে
রইল। ও কিছু বলছে না কেন?
“বল, কী হয়েছে?” অ্যাশলে আবার জিগ্যেস করল। “কোনো গোপন কথা আমাকে বলতে চাও?”
সহসা স্কারলেট কথা খুঁজে পেল, নিমেষের মধ্যে এলেনের বহু পরিশ্রম করে দেওয়া
সমস্ত শিক্ষা ধুলোয় লুটিয়ে পড়ল – জেরাল্ডের আইরিশ রক্তের প্রভাব সরাসরি তাঁর
কন্যার মুখের বুলি হয়ে বের হল।
“হ্যাঁ – খুব গোপন কথা। আমি তোমাকে ভালবাসি।”
মুহূর্তের জন্য শব্দহীনতা এমন তীব্র হয়ে উঠল যেন ওদের শ্বাস রুদ্ধ হয়ে গেছে। পরমুহূর্তে
একটা সুখানুভূতি আর গর্ববোধ স্কারলেটকে আচ্ছন্ন করে ফেলল, ওর কাঁপুনি থেমে গেল। এই কাজটা আগে কেন করেনি? লেডি সেজে
থাকার জন্য সহবত-শিক্ষার হাজারটা মারপ্যাঁচের চেয়ে এটা কত সহজ পন্থা! অ্যাশলের চোখে
চোখ রাখল।
সেই চোখে
একটা ত্রাসের দৃষ্টি, অবিশ্বাস আর – আর একটা কী যেন অচেনা – কী ওটা? হ্যাঁ, একবার জেরাল্ডের
চোখেও এরকম কিছু দেখেছিল – যেদিন ওঁর শিকারি কুকুরটার ঠ্যাং ভেঙ্গে গেছিল – গুলি করে
ওর যন্ত্রণার অবসান ঘটাতে হয়েছিল। কিন্তু অতি অল্প সময়ের মধ্যেই ওর চেহারা সুশিক্ষিত
সহবতের মুখোশে আড়াল হয়ে গেল, সৌজন্যের হাসি হাসল।
“আজ একসাথে
এতগুলো ছেলের মন জয় করেও মন ভরেনি তোমার?” অ্যাশলের গলায় সেই আগেকার মতই কৌতুকের স্বর।
“নাকি, কাউকেই বাদ রাখতে চাও না? যাই হোক তুমি সর্বদাই আমার হৃদয়ে আছ, সেটা তুমিও জানো।
তাহলে সেখানে আবার দাঁত বসাতে চাইছ কেন?”
কোথায় যেন
একটা ভুল হচ্ছে – বিশাল একটা ভুল! ওর যেরকম পরিকল্পনা ছিল, ব্যাপারটা ঠিক সেরকম হচ্ছে
না তো! মাথার মধ্যে অনেকগুলো ক্ষিপ্ত ভাবনা পাক খেয়ে চলেছে, একটা ভাবনা দানা বাঁধতেও শুরু করেছে। মনে হচ্ছে – কোনো একটা কারণে – অ্যাশলে এমন একটা
ভাব করছে যেন স্কারলেট ওর সঙ্গে ফ্লার্ট করছে। কিন্তু সত্যিটা তো ওর জানার কথা। স্কারলেট
নিশ্চিত যে ও জানে।
“অ্যাশলে
– অ্যাশলে – বল আমাকে – তোমাকে বলতেই হবে – না, না – তুমি এখন আমার পেছনে লেগো না!
তোমার হৃদয় কি আমি পাইনি? একবার বলে দাও প্রিয়, আমি ভাল – ”
অ্যাশলে
তাড়াতাড়ি হাত দিয়ে স্কারলেটের ঠোঁট চেপে ধরল। মুখোশটা খসে পড়ল।
“এসব কথা
বোলো না, স্কারলেট। একেবারে বোলো না। তুমি নিশ্চয়ই এগুলো মন থেকে বলছ না। এসব কথা বলার
জন্য তুমি নিজেই নিজেকে ঘৃণা করবে, আর এসব কথা শোনার জন্য আমাকেও ঘৃণা করবে!”
এক ঝটকায়
স্কারলেট মাথা সরিয়ে নিল। ওর শরীর জুড়ে তীব্র উষ্ণ একটা স্রোত বইছে।
“না, না,
আমি তোমাকে ঘৃণা করতে পারব না – কখনোই পারব না।
সত্যি বলছি তোমাকে আমি খুব ভালবাসি, এটাও জানি, তুমিও আমার কথা ভাব, কারণ –
” ও চুপ করে গেল। এমন বেদনার্ত দৃষ্টি াগে কারোর চোখে দেখেনি। “তুমি কি ভাব, অ্যাশলে
– ভাব, তাই না?”
কারোর এমন
বেদনার্ত মুখ আগে কখনো দেখেনি। “অ্যাশলে, তুমি কি আমার কথা ভাব – তুমি ভাব, তাই না?”
“হ্যাঁ,”
নিস্তেজ গলায় অ্যাশলে বলে উঠল। “হ্যাঁ, আমি ভাবি।”
যদি অ্যাশলে
বলে দিত যে স্কারলেটকে ও সহ্য করতে পারে না তাহলে হয়ত স্কারলেট এতটা শঙ্কিত হত না।
বাকরুদ্ধ হয়ে অ্যাশলের আস্তিনটা আঁকড়ে ধরল।
“স্কারলেট,”
অ্যাশলে বলে উঠল, “এই মাত্র আমাদের মুখ দিয়ে যে কথাগুলো বেরিয়ে গেল, সেগুলো কি আমরা
ভুলে যেতে পারি না?”
“না,” চাপা
গলায় স্কারলেট বলল। “না পারি না। কী বলতে চাইছ তুমি? তুমি আমাকে – বিয়ে করতে চাও না?”
অ্যাশলে
জবাব দিল, “আমি মেলানিকে বিয়ে করতে চলেছি।”
হঠাৎ ওর
খেয়াল হল যে একটা নীচু ভেলভেটের চেয়ারে ও বসে আছে আর অ্যাশলে ওর পায়ের কাছে একটা গদিতে
বসে দৃঢ় মুষ্ঠিতে ওর দু’হাত ধরে আছে। অ্যাশলে
অনেক কিছুই বলে যাচ্ছিল – অর্থহীন সব কথা বলে মনে হচ্ছিল। স্কারলেটের মন একেবারে শূন্য,
একটু আগেই যে ভাবনাগুলো মনের মধ্যে তোলপাড় করছিল, সব উবে গেছে, কাচের ওপর বৃষ্টির জল
যেমন কোনও ছাপ ফেলে না, অ্যাশলের কথাগুলোও তেমনি ওর মনে কোনও ছাপ ফেলছিল না। বাবা যেমন
করে বেদনার্ত সন্তানকে সান্ত্বনা দেন, ঠিক সেইভাবে ত্বরিতগতিতে স্নেহ আর সমবেদনার মেশানো
কথাগুলো ওর শ্রবণ বিমুখ কর্ণকুহরে পড়ে হারিয়ে যেতে লাগল।
সহসা মেলানির
উল্লেখ ওর সম্বিত ফিরিয়ে দিল, অ্যাশলের স্ফটিক-স্বচ্ছ ধূসর চোখে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিপাত
করল। চোখে সেই পুরনো দিনের মত দূরবর্তিতা – নিজের প্রতি ঘৃণা পরিপূর্ণ দৃষ্টি – যে
দৃষ্টি স্কারলেটকে সর্বদাই বিভ্রান্ত করে ফেলে।
“আজ সন্ধেবেলা
বাপি বাগদানের কথা সর্বসমক্ষে ঘোষণা করবেন। খুব শীঘ্রই আমাদের বিয়ে হয়ে যাবে। তোমাকে
আমার বলা উচিত ছিল, কিন্তু ভেবেছিলাম, তুমি হয়ত জানো। ভেবেছিলাম সবাই জানে – অনেক বছর
ধরেই সকলের জানার কথা। স্বপ্নেও ভাবিনি যে তুমি – তোমার এতজন পাণিপ্রার্থী। ভেবেছিলাম
তুমি স্টুয়ার্ট – ”
ধীরে ধীরে
স্কারলেটের অনুভূতি আর বোধশক্তি ফিরে আসতে লাগল।
“তুমি যে
এই মাত্র বললে, তুমি আমার কথা ভাব?”
অ্যাশলের
উষ্ণ দু’হাত থেকে স্কারলেট নিজের দুই হাতে
বেদনা বোধ করতে লাগল।
“হায়, স্কারলেট,
তুমি কি চাও এমন কিছু বলি যা তোমাকে আঘাত করবে?”
স্কারলেটের
নীরবতা অ্যাশলের মধ্যে চাপ সৃষ্টি করল।
“কীভাবে
তোমাকে বোঝাই বল তো? বয়স তোমার এত অল্প আর এমন হঠকারী তুমি, বিবাহের গুরুত্ব তাই তুমি
বুঝতে পারছ না।”
“আমি কেবল
এইটুকুই বুঝি যে আমি তোমাকে ভালবাসি।”
“সফল বিবাহিত
জীবনের জন্য ভালবাসাই শেষ কথা নয়, বিশেষ করে তোমার আর আমার ক্ষেত্রে, কারণ আমরা দুজনের
মানসিকতাই একে অপরের থেকে এত ভিন্ন। তুমি পুরুষমানুষের সমগ্র সত্তাটাই দখল করতে চাইবে,
তার শরীর, তার হৃদয়, তার ব্যক্তিত্ব, তার মেধা – সব কিছু। সেই দখল পেতে অসমর্থ হলে
তোমার অবস্থা শোচনীয় হয়ে উঠবে। অথচ আমার সম্পূর্ণ সত্তা আমি তোমাকে উজাড় করে দিতে পারব
না। কাউকেই দিতে পারব না। আর আমিও তোমার সমস্ত
সত্তা, সমস্ত মনের দখল পাওয়ার প্রত্যাশা করব না। তোমার খারাপ লাগবে, আর তখনই তুমি আমাকে
ঘৃণা করতে আরম্ভ করবে – তীব্রভাবে ঘৃণা করবে! যেসব বই আমি পড়ি, যে ধরণের সংগীত আমি
শুনতে ভালবাসি, তুমি সেসব ঘৃণা করতে আরম্ভ করবে – কারণ সেগুলো কয়েক মুহূর্তের জন্য হলেও তোমার কাছ
থেকে আমাকে দূরে সরিয়ে দেবে। আর আমি – আমি হয়ত – ”
“তুমি ওকে
ভালবাস?”
“দেখ, ও
আমারই মত, বলতে পার, আমাদের ধমনিতে একই রক্ত বইছে, আমরা দুজনে দুজনকে বুঝতে পারি। স্কারলেট!
স্কারলেট! দুজনের মধ্যে মনের মিল না থাকলে বিবাহিত জীবন যে সুখের হয় না সেটা কি আমি
তোমায় বোঝাতে পারলাম?”
একজন কারোর
মুখে যেন কথাটা শুনেছিল, “বিয়ে করার জন্য দুজনেরই মানসিকতার মিল হওয়াটা জরুরি।” কে
বলেছিল? মনে হল সেই কথাটা শোনার পর কত লক্ষ-কোটি বছর কেটে গেছে, কিন্তু এখনও কথাটা
বোধগম্য হয়নি।
“তবে যে
তুমি বলেছিলে আমার কথা ভাব?”
“বলা উচিত
হয়নি আমার।”
মাথার ভেতরে
ধিকিধিকি করে একটা আগুন জ্বলে উঠতে লাগল, অবরুদ্ধ ক্রোধে হিতাহিত জ্ঞান শূন্য হয়ে পড়ল।
“সে যাই
হোক কথাটা বলার মত ইতর যখন হতে পেরেছ – ”
অ্যাশলের
মুখ চুন হয়ে গেল।
কথাটা ইতরের
মতই বলেছি, কারণ আমি মেলানিকে বিয়ে করতে চলেছি। তোমার প্রতি অন্যায় তো করেইছি, মেলানির
প্রতি করেছি আরও বড় অন্যায়। কথাটা আমার বলাই উচিত হয়নি, কারণ তুমি যে বুঝবে না, আমি
জানতাম। তোমাকে নিয়ে না ভেবে আমার কী উপায় আছে বল – জীবনকে উপভোগ করার যে গভীর আসক্তি
তোমার মধ্যে আছে, যা আমার একেবারেই নেই? যেরকম উদ্দামভাবে তুমি একই সঙ্গে ভালবাসতে আর ঘৃণা করতে পার, আমি কোথায় পারি?
আগুন আর বাতাস আর প্রকৃতির মতই তুমি মৌলিক
শক্তির আধার, আর আমি হলাম – ”
স্কারলেট
মেলানির কথা ভাবল, সহসা ওর বাদামি চোখের শান্ত চাহনি, কালো লেসের দস্তানা পরা শান্ত
হাত, ওর সমাহিত নীরবতা অনুভব করতে পারল। আর তারপরেই স্কারলেট ক্রোধে ফেটে পড়ল, ঠিক
সেই রকম ক্রোধ যা জেরাল্ডকে নরহত্যা করতে প্রবৃত্ত করেছিল, যে ক্রোধের প্রভাবে ওঁর
পূর্বজরা এমন সব দুষ্কর্ম করেছেন যার জন্য তাঁদের ফাঁসির দড়ি গলায় পরতে হয়েছে। সুশিক্ষিত
রোবিল্যারদের – যাঁরা নীরব ঔদ্ধত্যপূর্ণ অবজ্ঞা দেখিয়ে যাবতীয় অমর্যাদার মোকাবেলা করতে
পারে – তাঁদের সেই মার্জিত রুচিবোধের কোনও পরিচয়ই তখন স্কারলেটের মধ্যে প্রকাশ পেল
না।
“আগে বলনি
কেন, কাপুরুষ কোথাকার! আমাকে বিয়ে করতে তুমি ভয় পাও! ওই মেনিমুখো বোকা মেয়েটা – যার
মুখ ফুটে “হ্যাঁ” আর “না” ছাড়া কোনো বুলিই বেরোয় না – ওর সঙ্গেই সারা জীবন কাটিয়ে ঠিক
ওরই মত একপাল মেনিমুখো বাচ্চা পয়দা করবে! কিসের
জন্য – ”
“তুমি মেলানিকে
নিয়ে এই ধরণের কথা বলতে পার না!”
“বলব, বেশ
করব! বলতে পারি না সেটা তুমি বলার কে? কাপুরুষ, ইতর, তুমি – তুমি আমাকে বিশ্বাস করিয়েছিলে যেন আমাকেই তুমি বিয়ে করবে – ”
“অন্যায্য
কথা বোলো না,” অ্যাশলে মিনতি করল। “আমি কি কখনো – ”
কিন্তু
ন্যায্য কথা বলতে স্কারলেটের ভারি বয়েই গেছে, যদিও মনে মনে জানে কথাটা সত্যি। ওর সঙ্গে
বন্ধুত্বের চৌকাঠ অ্যাশলে কখনোই পেরিয়ে আসেনি, আর কথাটা মনে হতেই আবার নতুন করে রুষ্ট
হয়ে উঠল, অহঙ্কারে ঘা পড়ার রোষ, মেয়েলি গুমর চূর্ণ হয়ে যাওয়ার রোষ। স্কারলেট ওরই পেছনে
ছুটেছে আর অ্যাশলে তাতে গুরুত্ব দিতে নারাজ। অ্যাশলের কাছে ওর তুলনায় ওই ফ্যাকাশে মেলানিটাই
বেশি পছন্দের! খুব বেঁচে গেছে, এলেন আর ম্যামির
উপদেশ মেনে ও অ্যাশলেকে ঘুণাক্ষরেও বুঝতে দেয়নি যে ও নিজে ওকে পছন্দ করে - সেই অপমান সইবার চেয়ে বরং মরে যাওয়াও ভাল!
ও লাফ দিয়ে
উঠে দাঁড়াল, হাত মুঠি পাকানো, অ্যাশলেও উঠে দাঁড়াল, স্কারলেটের থেকে একমাথা উঁচু, বেদনা
জর্জরিত বাকশক্তিহীন চেহারা, বাস্তবের সম্মুখীন, বেশ যন্ত্রণাদায়ক বাস্তব।
“যতদিন
বেঁচে থাকব – তোমাকে ঘেন্না করব – অসভ্য, ইতর – ইতর কোথাকার – ” ঠিক কোন গালিটা যেন দিতে চাইছিল?
আরু খারাপ কোনো গালি মনে এল না।
“স্কারলেট
– শোনো – ”
অ্যাশলে
ওর দিকে হাত বাড়িয়ে দিল, আর তারপরেই স্কারলেট গায়ে যত জোর ছিল তাই দিয়ে, ওর গালে সপাটে
একটা চড় কষিয়ে দিল। কক্ষের নৈঃশব্দের মধ্যে
শব্দটা হল চাবুকের আওয়াজের মত, আর তক্ষুনি
স্কারলেটের সব রাগ পড়ে গিয়ে হৃদয় হতাশায় ভরে উঠল।
অ্যাশলের
ফ্যাকাশে শুকনো গালে ওর চড়ের দাগটা লাল হয়ে ফুটে উঠল। কোনো কথা না বলে, স্কারলেটের
নেতিয়ে পড়া হাতটা তুলে নিয়ে চুম্বন করল। তারপর স্কারলেট কিছু বলে ওঠার আগেই ধীর পায়ে
কক্ষ ত্যাগ করে বেরিয়ে গেল। যাবার সময় দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে গেল।
ও ধপ করে
বসে পড়ল, রাগের পরিণামে হাঁটুদুটো অবশ হয়ে গেছে। অ্যাশলে চলে গেছে, ওর বেদনা ভারাক্রান্ত
চেহারাটা আমৃত্যু ওকে তাড়া করে বেড়াবে।
লম্বা হলঘর
পেরিয়ে অ্যাশলের চলে যাবার পদধ্বনি মিলিয়ে যাবার মৃদু খসখস শব্দ শুনতে শুনতে নিজের
কৃতকর্মের ভয়াবহতা উপলব্ধি করল। অ্যাশলে চিরতরে ওর কাছ থেকে হারিয়ে গেল। এখন থেকে অ্যাশলে
ওকে ঘৃণাই করবে, যতবার স্কারলেটের মুখের দিকে তাকাবে, ওর মনে পড়ে যাবে কীভাবে স্কারলেট
ওপরপড়া হয়ে নিজেকে ওর ওপর চাপিয়ে দিতে চেয়েছে। ভাবনাটার মধ্যে য়াশা জাগানোর মত কিছুই
খুঁজে পেল না।
“হানি উইল্কসের
মতই বুদ্ধু আমি,” হঠাৎ ওর মনে হল। কীভাবে হানির গায়েপড়া স্বভাব নিয়ে সবাই হাসাহাসি
করে, এমনকি স্কারলেট নিজেও যে কম যায় না, সেটা মনে পড়ে গেল। নিজের চোখেই কতবার হানির আদেখলাপনা দেখেছে, বোকা
বোকা হেসে ছেলেদের সঙ্গে ঢলাঢলি করতে দেখেছে। কথাটা ভেবেই ও শিউরে উঠে নতুন করে রেগে
উঠল – নিজের প্রতি রাগ, অ্যাশলের প্রতি রাগ,
তামাম দুনিয়ার ওপর রাগ। নিজেকে ঘেন্না করছে বলেই সবাইকেই ঘেন্না করতে ইচ্ছে করছে –
এক ষোড়শবর্ষীয়া কিশোরির প্রেমে ব্যর্থ এবং অপমানিত হবার নিষ্ফল আক্রোশে। ভালবাসা সম্বন্ধে ওর ধারণায় সুবিবেচনার অভাব ছিল।
নিজের মোহিনী ক্ষমতা নিয়ে বড় বেশি আত্মবিশ্বাসী ছিল। পরাজিত হবার পরে এখন পরাজয়ের অনুভূতির
চেয়েও অন্য একটা ভয় ওকে বেশি করে পেয়ে বসেছে – অপরের চোখে নিজে হাস্যাস্পদ হয়ে যাওয়ার ভয়। ও কি তাহলে হানির মতই বেআবরু হয়ে পড়ল? সবাই ওকে নিয়ে হাসাহাসি করছে? কথাটা ভেবে ও কাঁপতে
লাগল।
পাশের ছোট্ট
টেবিলে হাতটা নেমে এসে খুদে একটা ফুলদানিতে আঙ্গুল পড়ল। ফুলদানিতে দুটো জবা হেসে ওর
দিকে তাকিয়ে আছে। ঘরটা এত নিস্তব্ধ যে ওর ইচ্ছে করছিল আর্তনাদ করে নৈঃশব্দ ভঙ্গ করে।
কিছু একটা ওকে করতেই হবে, নইলে পাগল হয়ে যাবে। ফুলদানিটা তুলে নিয়ে ঘরের অপর প্রান্তে
ফায়ারপ্লেসের দিকে হিংস্র আক্রোশে ছুঁড়ে মারল। সোফার উঁচু হেলান দেবার জায়গাতে আটকে
লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে শ্বেতপাথরের ম্যান্টেলপিসে ধাক্কা খেয়ে চুরমার হয়ে মেঝেয় পড়ে গেল।
“এটা,”
সোফার গভীর থেকে একটা কণ্ঠস্বর ভেসে এল, “আর নেওয়া যাচ্ছে না।”
ভূত দেখলেও
স্কারলেট বোধহয় এত চমকে উঠত না, মুখ শুকিয়ে গেল, গলা থেকে কোনো আওয়াজ বেরোল না। হাঁটুদুটো থরথর করে কাঁপছে, নিজেকে সামলাতে চেয়ারের
হেলান দেবার জায়গাটা আঁকড়ে ধরল। রেট বাটলার
সোফা থেকে উঠে অতিরঞ্জিত বিনম্রতার সঙ্গে ওকে বাও করলেন। উনি
এতক্ষণ সোফাতেই শুয়ে ছিলেন।
“দিবানিদ্রার
ব্যাঘাত ঘটিয়ে যে রসালাপ একরকম বাধ্য হয়েই আমাকে শুনতে হল, উপদ্রব হিসেবে সেটাই যথেষ্ট,
কিন্তু তাই বলে আমার প্রাণ নিয়ে কেন টানাটানি করা?”
না, ভূত
নয়, জলজ্যান্ত উনিই। হে ধরণি দ্বিধা হও, উনি আমাদের প্রতিটা কথাই শুনেছেন! মনের সব
সাহস একত্রিত করে চেহারায় সম্ভ্রম ফুটিয়ে তুলতে হবে।
“স্যার,
আপনার উপস্থিতি আমাদের জানানো উচিত ছিল।”
“ও তাই
বুঝি?” ওঁর ঝকঝকে সাদা দাঁতগুলো বেরিয়ে পড়ল, আর কাল দুই চোখ ভরে হাসি। “কিন্তু সত্যিকারের
অনুপ্রবেশকারী তো তুমি। পেছনের উঠোনে নিজেকে বড় অবাঞ্ছিত মনে হচ্ছিল, তাই এখানেই মিস্টার
কেনেডির জন্য অপেক্ষা করতে বাধ্য হয়েছিলাম। নিতান্তই বিবেচনাবোধ থেকেই আমার অনভিপ্রেত
উপস্থিতি এখানে সরিয়ে এনেছিলাম, ভেবেছিলাম কেউ বিরক্ত করবে না। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমার!”
অসহায়ভাবে মাথা নাড়লেন আর মৃদু হাস্য করলেন।
এই অসভ্য,
দুর্বিনীত লোকটা ওদের সমস্ত কথোপকথন শুনেছে ভেবে স্কারলেটের মেজাজ আবার চড়তে শুরু করেছে।
এমন সব কথাবার্তা যা ওর মুখ থেকে বেরোনোর আগেই ওর মৃত্যু হয়ে যাওয়া উচিত ছিল।
“যারা অন্যদের
কথা আড়ি পেতে শোনে – ” বেশ তেজের সঙ্গে বলতে আরম্ভ করল।
“যারা অন্যদের
কথা আড়ি পেতে শোনে, তারা প্রায়ই অত্যন্ত রসালো এবং নীতিমূলক বিষয়ে জ্ঞানলাভ করে,” দাঁত
বের করে হাসলেন উনি। “আড়ি পাতার সুদীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে আমি – ”
“স্যার,”
স্কারলেট বলে উঠল, “আপনি মোটেই ভদ্রলোক নন।”
“একদম ঠিক
ধরেছ তো,” রগুড়ে কণ্ঠে বললেন। “আর মিস, তুমিও মোটেই লেডি নও।” স্কারলেটকে দেখে উনি
যেন খুব মজা পাচ্ছেন, কারণ আবার মৃদু হাস্য করলেন। “কিছুক্ষণ আগেই তোমার মুখ থেকে যেসব
কথা শুনলাম বা যেসব কাজ করে দেখালে, তারপর কেউ আর লেডি থাকতে পারে না। অবশ্য লেডিদের
প্রতি আমার কোনোদিনই খুব একটা আকর্ষণ নেই। ওঁরা মনে মনে কী চান সে আমার জানতে বাকি নেই, কিন্তু
সাহসের অভাব থেকেই হোক বা সঙ্গদোষেই হোক, সেই চাওয়াটা ওঁরা মুখ ফুটে বলতে পারেন না।
তাই মাঝে মাঝেই ওঁরা বড়ই একঘেয়ে হয়ে ওঠেন। কিন্তু, হে প্রিয় মিস ও’হারা, তুমি হলে বিরল
সাহসের অধিকারিণী, অত্যন্ত প্রশংসনীয় সাহসের অধিকারিণী, আর সেই জন্যই আমি তোমাকে কুর্নিশ
করছি। একটা কথাই কেবল আমার বোধগম্য হচ্ছে না – তোমার মত তুমুল প্রকৃতির একজন মেয়েকে
সুরুচিসম্পন্ন মিস্টার উইল্কস কী এমন যাদু করেছেন? তোমার মত একজন – কী যেন কথাটা বলেছিলেন
– ‘জীবনকে উপভোগ করার যে গভীর আসক্তি তোমার মধ্যে আছে’ – এমন একজন মেয়ের খাতিরে, নতজানু
হয়ে ঈশ্বরের কাছে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করা উচিত, অথচ ওঁর মত এমন হতভাগা, কাপুরুষ মানুষের
– ”
“আপনি ওর
পায়ের নখের যুগ্যি নন,” অদম্য ক্রোধে স্কারলেট চিৎকার করে উঠল।
“তুমি নাকি
ওঁকে জীবনভর ঘৃণা করে যাবে!” উনি সোফার ভেতরে ডুবে ফেলেন। স্কারলেট ওঁর হাসির আওয়াজ
পেল।
উপায় থাকলে
স্কারলেট ওঁকে খুনই করে ফেলত। তার বদলে যথাসম্ভব তেড়িয়া ভাব দেখিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে
এল। তারপর সশব্দে দরজাটা বন্ধ করে দিল।
***
এমন দ্রুতপদের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে
লাগল যে ল্যান্ডিং-এ পা রাখতে না রাখতেই মনে হল মূর্চ্ছা যাবে। থাম ধরে দাঁড়িয়ে নিজেকে
সুস্থির করার চেষ্টা করতে লাগল। নিরুদ্ধ আক্রোশে, অপমানে আর ক্লান্তিতে বুকে যেন হাতুড়ি
পিটছে। বুকটা ফেটে যাবে মনে হচ্ছে। জোরে জোরে
নিঃশ্বাস নেবার চেষ্টা করল, কিন্তু কোমরের ফিতেটা ম্যামি খুব শক্ত করে বেঁধে দিয়েছে।
এই ল্যান্ডিং-এ অচেতন হয়ে পড়লে আর তখন কেউ
দেখে ফেললে, কী ভাববে? উফ, সব কিছুই ভাববে, অ্যাশলে আর ওই শয়তান বাটলারটা আর নোংরা
মেয়েগুলো যারা ওকে এত হিংসে করে! জীবনে প্রথমবার
মনে হল অন্য মেয়েদের মতই একটা স্মেলিং সল্টের শিশি কাছে রাখলে ভাল করত। ফিটের ব্যামো
নেই বলে খুব অহঙ্কার ছিল। নাহ্, এখন কিছুতেই
অজ্ঞান হওয়া চলবে না!
অস্বস্তির ভাবটা আস্তে আস্তে কেটে যাচ্ছে।
এক মিনিটের মধ্যেই সামলে উঠতে পারবে বলে মনে হয়, তারপর চুপচাপ ইন্ডিয়ার কক্ষের সংলগ্ন
ছোট্ট সাজঘরে ঢুকে পড়তে হবে। কোমরের লেসটা ঢিলে করে যে কোনো একটা বিছানায় দিবানিদ্রায়
মগ্ন মেয়েদের পাশে শুয়ে পড়তে হবে। বুকের ধড়ফড়ানিটা
কমানোর চেষ্টা করল, মুখচোখও স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরানোর চেষ্টা করল। ওকে নিশ্চয়ই পাগলি
পাগলি দেখাচ্ছিল। একটা মেয়েও জেগে থাকলে ওর কাছে ঠিক ধরা পড়ে যেত। কারুকে এর বিন্দুবিসর্গও
জানতে দেওয়া চলবে না, বুঝতেই দেওয়া যাবে না যে একটা অনর্থ ঘটেছে।
ল্যান্ডিং-এর তিনদিক খোলা চওড়া জানলা
দিয়ে স্কারলেট দেখতে পাচ্ছে যে ছেলেরা এখনও বাগানের গাছের ছায়ায় বসে জটলা করছে। ওদের
দেখে ওর হিংসে হল। ছেলে হয়ে জন্মানো খুব ভাগ্যের
ব্যাপার। একটু আগেই যে দুর্দশার কবলে ওকে পড়তে হয়েছিল, ছেলেদের কখনোই পড়তে হয় না। ব্যাকুল
নয়নে ওদের পানে চেয়ে থাকতে থাকতে সামনের গাড়িবারান্দা থেকে ঘোড়ার খুরের টগবগ আওয়াজ
কানে এল। নুড়িপাথর ছিটকে পড়ার শব্দ, উত্তেজিত কথাবার্তা, কোনো একজন নিগ্রোকে উদ্দেশ্যে করে কিছু একটা প্রশ্ন ছুঁড়ে দেওয়া। আবার কিছু নুড়িপাথর ছিটকে পড়ার শব্দ, একজন লোককে
লনের সবুজে অলসভাবে গুলতানি করতে থাকা ছেলেদের দিকে ঘোড়া ছুটিয়ে যাওয়ার দৃশ্য স্কারলেটের
দৃষ্টিপথে ভেসে উঠল।
কোনো অতিথি হয়ত দেরিতে এসে পৌছেছেন,
কিন্তু তা বলে ইন্ডিয়ার সাধের লনের ওপর দিয়ে ঘোড়া চালালেন কেন? ভদ্রলোককে স্কারলেট
চিনতে পারল না, কিন্তু উনি যখন ঘোড়া থেকে লাফিয়ে নেমে জন উইল্কসের বাহু আঁকড়ে ধরলেন,
তখন ওঁর শরীরের প্রতিটি রেখায় কীরকম উত্তেজনা সেটা স্কারলেট লক্ষ্য করল। সবাই ওঁকে
ঘিরে ভিড় করে দাঁড়াল, তালপাতার পাখা আর লম্বা গ্লাসগুলো টেবিল আর জমিতেই পড়ে রইল। বেশ
দূরে থাকলেও, স্কারলেটের কানে ওদের কথাবার্তার অস্পষ্ট কোলাহল ভেসে আসছিল – হাঁকাহাঁকি, উত্তপ্ত সওয়াল-জবাব, বেশ একটা টানটান
পরিবেশ। এর পর কোলাহলের ভেতর থেকে স্টুয়ার্ট টার্লটনের চিৎকার শোনা গেল – “ই – য়ে
– য়ে!”, যেন শিকার ধরা পড়েছে। সেটা ছিল বিদ্রোহের হুঙ্কার – সেটা না বুঝতে পেরেও স্কারলেট
এই ঘটনার সাক্ষী হয়ে রইল।
দেখল টার্লটনদের চার ভাই, পেছনে পেছনে
ফোনটেন ভাইয়েরা, জটলা থেকে বেরিয়ে এসে জোর কদমে আস্তাবলের দিকে চলল। যেতে যেতে চেঁচিয়ে
চেঁচিয়ে বলতে লাগল, “জীমস! এই যে জীমস! ঘোড়াগুলোতে
জিন চড়া!”
“নিশ্চয়ই কারো বাড়িতে আগুন লেগেছে,”
ভাবল স্কারলেট। সে আগুন লেগে থাকুক বা নাই থাকুক, কেউ দেখে ফেলার আগেই ওকে শয়নকক্ষে
ঢুকে পড়তে হবে।
মনটা এতক্ষণে শান্ত হয়েছে। পা টিপে
টিপে নিঃশব্দ হলঘরে গেল। পুরো বাড়িটা জুড়ে কেমন একটা তন্দ্রাচ্ছন্ন পরিবেশ, যেন মেয়েগুলোর
মত বাড়িটাও দিবানিদ্রার সুখস্বপ্নে নিমগ্ন, যেন সন্ধেবেলা মোমবাতির আলোয়, সংগীতের মূর্ছনায়
পূর্ণ মহিমায় আবার ঝলমল করে ওঠবার প্রতীক্ষায় আছে। খুব সন্তর্পণে সাজঘরের দরজাটা খুলে ঢুকে পড়ল। হাত
দিয়ে পেছন থেকে এখনও দরজার হাতলটা ধরা। হানি উইল্কসের গলা শয়নকক্ষের দরজার সামান্য
ফাঁক দিয়ে ওর কানে এসে পৌঁছল। খুবই মৃদুস্বরে বলা, প্রায় ফিসফিস করে।
“স্কারলেট আজ করল, আমার মনে হয়, সেটা
ছেনালি ছাড়া আর কিছুই বলা যায় না।”
স্কারলেট অনুভব করল ওর বুকে আবার হাতুড়ি
পেটা শুরু হয়ে গেছে। পাগলের মত হাত দিয়ে আঁকড়ে ধরে সেটা থামানোর চেষ্টা করল, যেন মুচড়ে
ধরলেই ওই হাতুড়ি পেটাকে কব্জায় আনা যাবে। “যারা
অন্যদের কথা আড়ি পেতে শোনে, তারা প্রায়ই অত্যন্ত রসালো এবং নীতিমূলক বিষয়ে জ্ঞানলাভ
করে,” একটা স্মৃতি ওকে বিদ্রূপ করল। তাহলে কি আবার বেরিয়ে যাবে? নাকি নিজের উপস্থিতির
জানান দিয়ে হানিকে অপ্রস্তুত করে দেবে – যেটা ওর প্রাপ্য? কিন্তু পরের কণ্ঠস্বর ওকে
থমকে দিল। মেলানির গলা শোনার পর এক দঙ্গল খচ্চর ওর পেছনে লেলিয়ে দিলেও, ওকে ওখান থেকে
নড়াতে পারবে না।
“ছিঃ হানি, ওরকম বলিস না! ওরকম নিষ্ঠুর
কথা বলতে নেই। ও আসলে একটু চপল আর প্রাণোচ্ছল।
আমার তো ওকে খুবই সুন্দর লাগছিল।”
“উফ্!” ব্লাউজ়টা নখ দিয়ে আঁচড়ে ধরে
স্কারলেট ভাবল, “শেষমেশ ওই মিনমিনে ইঁদুরটাকেই কিনা আমার হয়ে হাল ধরতে হল!”
হানির কুচুটেপনা তাও সহ্য করা যায়। স্কারলেট কখনোই কোনো মেয়েকে বিশ্বাস করতে পারেনি।
একমাত্র নিজের মা ছাড়া আর কোনও মহিলারই নিজের স্বার্থটুকু ছাড়া অন্য কোনো মতলব থাকতে
পারে বলে ভাবতেই পারেনি। মেলানি জানে যে অ্যাশলের ওপর ওর নিষ্কণ্টক অধিকার প্রতিষ্ঠিত
হয়ে গেছে, তাই নির্ভয়ে মহানুভবতা দেখাতে পারে। স্কারলেটের ধারণা হল যে এটাই হচ্ছে মেলানির
চালাকি করে নিজের বিজয় ঘোষণা করা এবং সঙ্গে সঙ্গে নিজের বদান্যতা দেখানোরও কৌশল। মেয়েদের
সম্বন্ধে ছেলেদের সঙ্গে আলোচনা করার সময় স্কারলেটও কতবার একই চালাকির আশ্রয় নিয়েছে, আর ছেলেগুলো এতই বোকা যে ওর
মাধুর্য আর নিঃস্বার্থতা দেখে একেবারে গলে গেছে।
“তাহলে শুনে নে,” হানি তীক্ষ্ণস্বরে বলল, ওর গলা চড়তে লেগেছে, “তুই হলি গিয়ে চোখ
থেকেও অন্ধ।”
“আস্তে, হানি, আস্তে,” স্যালি মুনরো ফিসফিস করে বলল। “পুরো বাড়ি তোর কথা শুনে ফেলবে!”
হানি গলা নামাল, কিন্তু বলে চলল।
“দেখলি না, যে ছেলেকেই নাগালে পাচ্ছিল, তার সঙ্গে কী আদিখ্যেতাই না করছিল – এমনকি
মিস্টার কেনেডিকেও রেহাই দেয়নি, আর উনি হলেন ওরই বোনের প্রেমিক। ওরকম নষ্ট মেয়ে আমি
দুটো দেখিনি! আর শোন, ও নির্ঘাত চার্লসের পেছনেও লেগেছে,” হানি খিলখিল করে হেসে উঠল।
“আর তোরা তো জানিসই, চার্লস আর আমি – ”
“সত্যিই কী তাহলে?” অনেকগুলো কণ্ঠ একসাথে ফিসফিসিয়ে উঠল।
“যাই হোক কথাটা কাউকে বলিস না যেন – মানে এখনই কিছু বলে দিস না।”
এর পর আরও কিছুক্ষণ ধরে হাসি মস্করা, হানিকে চেপে ধরে বিছানা ধামসানোর পালা চলল।
মেলানি বিড়বিড় করে হানি ওর বোন হতে যাচ্ছে বলে ওর খুব আনন্দ হচ্ছে বা এই ধরণের কিছু
একটা বলল।
“তবে, স্কারলেট আমার বোন হলে আমার আনন্দ হবে না, কারণ ওর মত ছেনাল আমি দুটো দেখেছি
বলে মনে হয় না,” হেটি টার্লটনের ক্ষুণ্ণস্বর শোনা গেল। “তবে স্টুয়ার্টের সঙ্গে ওর সম্পর্কটা
মোটামুটি পাকা হবার দিকেই এগোচ্ছে। ব্রেন্ট অবশ্য বলে স্কারলেট স্টুয়ার্টকে পাত্তাই
দেয় না। কিন্তু ব্রেন্টও যে ওই মেয়েতেই মজে আছে, তাতে সন্দেহ নেই।”
“যদি আমার কাছে জানতে চাস,” হানি বেশ রহস্যময় কণ্ঠে বলল, “মাত্র একজন ছেলেই আছে
যাকে স্কারলেট পাত্তা দেয়। আর সে হল অ্যাশলে!”
এর পর সকলে সমস্বরে ফিসফিস করতে আরম্ভ করল, কথা কাটাকাটি, প্রশ্ন, প্রতিপ্রশ্ন,
কথা কেটে কথা বলা – স্কারলেটের হাত পা ভয়ে, অপমানে বরফ হয়ে গেল। হানিটা বোকা, ছেলেদের ব্যাপারে এক নম্বরের আহম্মক,
কিন্তু অন্যান্য মেয়েদের সম্বন্ধে ওর সহজাত মেয়েলি প্রবৃত্তিটা যে খাটো করে দেখার নয়
সেটা স্কারলেট দেরিতে বুঝল। লাইব্রেরিতে অ্যাশলে আর রেট বাটলারের হাতে নিগ্রহ হবার
স্মৃতিটা ওকে কাঁটার মত বিঁধতে লাগল। মুখ বন্ধ রাখার ব্যাপারে পুরুষমানুষদের বিশ্বাস করা
যায়, এমনকি রেট বাটলারের মত মানুষকেও, কিন্তু হানি যেরকম শিকারি কুকুরের মত ঘেউ ঘেউ
করতে আরম্ভ করেছে, তাতে সন্ধে ছ’টার মধ্যে পুরো কাউন্টিতে কথাটা জানাজানি হয় যাবে।
আর মাত্র গতকালই জেরাল্ড বলছিলেন না, ওঁর মেয়েকে নিয়ে কাউন্টির মানুষ হাসাহাসি করুক,
সেটা উনি মানতে পারবেন না। আর কথাটা জানতে পারলে সবাই মিলে কী হাসাহাসিই না করবে! বাহুমূল
ঘেমে উঠল, পাঁজর বেয়ে ঘাম ধরতে লাগল।
মেলানির শান্ত, সংযত, সামান্য অনুযোগ মেশানো কণ্ঠস্বর, সবার কণ্ঠস্বর ছাপিয়ে শোনা
গেল।
“হানি, তুই জানিস কথাটা সত্যি নয়। আর কী নিষ্ঠুরভাবে বললি।”
“মানছি, মেলি, কথাটা নিষ্ঠুরভাবেই বলেছি। কিন্তু যাদের মধ্যে বিন্দুমাত্র ভালোমানুষি
নেই, তুই যদি সর্বক্ষণ তাদের মধ্যে ভালোমানুষি খোঁজার চেষ্টা না করতিস, তাহলে তুইও
খেয়াল করতিস। আমি ঠিকই করেছি। এটাই ওর উচিত শিক্ষা। স্কারলেট ও’হারা কী করে থাকে – না কোনো না কোনো ঝামেলা
পাকিয়ে অন্যদের প্রেমিকদের হাতিয়ে নেয়। তুই
ভাল করেই জানিস, স্টুয়ার্টকে ও ইন্ডিয়ার কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছে, যদিও স্টুয়ার্টে ওর
একফোঁটাও আগ্রহ নেই। আর আজ ও মিস্টার কেনেডি, অ্যাশলে, চার্লসকে হাতিয়ে নেবার তালে
ছিল – ”
“আমাকে বাড়ি চলে যেতে হবে!” স্কারলেট ভাবল। “এখুনি বাড়ি ফিরে যেতে হবে!”
জাদুবলে যদি নিমেষের মধ্যে আর নিরাপদে টারায় পৌঁছে যেতে পারত! যদি এলেনের কাছে
চলে যেতে পারত, শুধু একবার ওঁকে দেখতে পেত, ওঁর পোশাক আঁকড়ে কোলে বসে চোখের জলে ভেসে
গিয়ে মন উজাড় করে সব কিছু খুলে বলতে পারত!
আর একটা কথাও যদি ওকে শুনতে হয়, তাহলে তেড়ে
গিয়ে হানির চুলের ঝুঁটি ধরে নাড়িয়ে দিত আর মেলানি হ্যামিল্টনের মুখে থুতু ছিটিয়ে বলে
দিত যে ওর বদান্যতার ও থোড়াই কেয়ার করে। কিন্তু আজ যথেষ্ট বেসামাল আচরণ করে ফেলেছে
– একেবারে সাদা চামড়ার আবর্জনাগুলোর মত – সেখানেই যত ঝামেলা।
স্কার্টটা দু’হাতে শক্ত মুঠো করে ধরল, যাতে খসখস আওয়াজ না হয়, তারপর বেড়ালের মত
চুপিসাড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এল। হল পেরিয়ে, বন্ধ দরজা আর নিস্তব্ধ ঘরগুলোর পাশ কাটিয়ে
যেতে যেতে একটা কথাই মনে মনে আওড়াতে লাগল – বাড়ি যেতে হবে। আমাকে এখুনি বাড়ি ফিরে যেতে
হবে।
সামনের বারান্দায় পৌঁছেই গেছে, এমন সময় নতুন একটা মতলব মাথায় এল – নাহ্, বাড়ি
ফিরে যাওয়ার প্রশ্নই আসে না! কিছুতেই পালিয়ে যেতে পারবে না! সব কিছুর শেষ দেখে চাড়তে
হবে, মেয়েগুলোর সমস্ত বিদ্বেষ, নিজের সমস্ত অপমান আর কষ্ট সহ্য করেও থেকে যেতে হবে।
পালিয়ে যাওয়া মানেই ওদের হাতে আরও অস্ত্র তুলে দেওয়া।
লম্বা সাদা একটা থামের ওপর মুঠি বাগিয়ে একটা ঘুসি মারল – যদি স্যামসনের মত হতে
পারত, এক ঘুসিতে পুরো টুয়েল্ভ ওকস আর এখানকার সবাইকে গুঁড়িয়ে দিতে পারত। ওদের কষ্ট দিতে হবে। ওদের দেখিয়ে দিতে হবে। অবশ্য
কী দেখিয়ে দিতে হবে সেটা ভেবে উঠতে পারল না, কিন্তু ছাড়লে চলবে না। ওকে ওরা যত আঘাত
দিয়েছে, তার চেয়ে অনেকগুণ বেশি আঘাত ওকে ফিরিয়ে দিতে হবে।
সেই মুহূর্তে অ্যাশলেকে আর অ্যাশলে বলে আলাদা করে মনে রইল না। যে দীর্ঘকায়, স্বপ্নিল
ছেলেটাকে ও ভালবাসে সেও তো এই উইল্কসদের, এই টুয়েল্ভ ওকসের, এই কাউন্টিরই অভিন্ন অংশ
– ও এদের সবাইকে ঘৃণা করে কারণ ওরা ওকে নিয়ে হেসেছে। ষোলো বছরের একজন কিশোরির কাছে
ভালবাসার চেয়েও দেমাকের ক্ষমতা অনেক বেশি, ওর শোণিতক্ষরিত হৃদয়ে ঘৃণা ছাড়া আর কিছুরই
স্থান নেই।
“কিছুতেই বাড়ি ফিরব না,” মনে মনে বলল। “আমি এখানেই থাকব, আর ওদের অনুশোচনায় কাতর
হতে বাধ্য করব। মাকে কিছু বলব না, কখনোই বলব না। কাউকেই বলব না।” বাড়ির ভেতরে ফিরে
যাবার জন্য, সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে অন্য একটা শয়নকক্ষে ঢোকার জন্য মন শক্ত করে নিল।
ঘুরে দাঁড়াতেই লম্বা হলঘরের অন্য প্রান্ত থেকে চার্লসকে আসতে দেখল। স্কারলেটকে
দেখতে পেয়েই দ্রুতপায়ে চলে এল। মাথার চুল উস্কোখুস্কো, আর উত্তেজনায় মুখ প্রায় জিরেনিয়াম
ফুলের মত রাঙা।
“জানো কী হয়েছে?” ওর কাছে এসে পৌঁছনোর আগেই চার্লস চেঁচিয়ে বলল। “শুনেছ তুমি? পল
উইলসন এইমাত্র ঘোড়া ছুটিয়ে জোন্সবোরো থেকে এলেন খবরটা নিয়ে!”
স্কারলেটের কাছে পৌঁছতে পৌঁছতে একটু দম নিল। স্কারলেট ওর দিকে তাকিয়েই রইল, কিছু
বলল না।
“মিস্টার লিঙ্কন জনগণকে আহ্বান জানিয়েছেন, সৈন্যবাহিনীতে – মানে যারা যোগ দিতে
ইচ্ছুক – পঁচাত্তর হাজার লোক দরকার!”
আবার সেই মিস্টার লিঙ্কন! ছেলেরা কি সত্যিকারের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে ভাবতেই
পারে না? কী মনে করছে ও – যে মিস্টার লিঙ্কনের শয়তানির কথা শুনে আমি ধেই ধেই করে নৃত্য
করব – যখন কিনা তীব্র বেদনায় ওর মন ভেঙ্গে পড়ছে, যখন ওর সুনাম নষ্ট হতে বসেছে।
চার্লস ওর দিকে তাকাল। কাগজের মত সাদা হয়ে গেছে ওর মুখ, সরু চোখদুটো পান্নার মত
জ্বলজ্বল করছে। কোনো মেয়ের চেহারায় এমন আগুন জ্বলতে, কারোর চোখে এমন দীপ্তি চার্লস
আগে কখনো দেখেনি।
“সত্যিই, আমি কত আনাড়ি,” চার্লস বলল। “খবরটা আরও একটু রয়ে সয়ে দেওয়া উচিত ছিল আমার।
লেডিরা যে কতটা সংবেদনশীল হন, ভুলেই গেছিলাম। খুবই দুঃখিত, তোমাকে এতটা বিচলিত করে
ফেললাম। অজ্ঞান হয়ে যাবে বলে মনে হচ্ছে না তো? একও ফ্লাস জল নিয়ে আসি তোমার জন্য?”
“না,” ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি এনে স্কারলেট বলল।
“তাহলে কি ওই বেঞ্চে গিয়ে দুজনে বসতে পারি?” স্কারলেটের বাহু তুলে নিয়ে চার্লস
জানতে চাইল।
স্কারলেট ঘাড় নাড়ল। চার্লস অতি সন্তর্পণে ওকে সিঁড়ি বেয়ে নামিয়ে ঘাসজমি পেরিয়ে
উঠোনের সব থেকে বড় ওকগাছটার তলার লোহার বেঞ্চের দিকে নিয়ে চলল। কত ঠুনকো আর নরম মনের
হয় মেয়েরা, ভাবল চার্লস, যুদ্ধ আর কঠোরতার কথা মুখে আনলেই ওদের জ্ঞান হারানোর মত অবস্থা
হয়। কথাটা মনে হতেই নিজেকে খুব বীরপুরুষ বলে
মনে হতে লাগল। স্কারলেটকে বসাবার সময় দ্বিগুণ সাবধানতা অবলম্বন করল। কেমন অদ্ভুত দৃষ্টিতে
তাকিয়ে আছে, ফ্যাকাশে মুখে একটা বন্য সৌন্দর্য – চার্লসের হৃদয়ে দোলা লাগিয়ে দিল। ও যুদ্ধে চলে যেতে পারে এটা ভেবেই কি স্কারলেট এত
বিচলিত হয়ে পড়েছে? নাহ্, এতটা আত্মবিশ্বাস
আবার দেমাক দেখানোরই সমতুল। কিন্তু এমন অদ্ভুতভাবে ওর পানে চেয়ে আছে কেন? লেসের রুমালটা
ধরে থাকতে গিয়ে ওর হাতটাই বা এত কাঁপছে কেন? ভুসো কালির মত ওর চোখের পালকগুলো – ওগুলো থেকে থেকে
নেচে উঠছে – রোমান্টিক উপন্যাসেই পড়েছে – ভীরু আর প্রেমে বিহ্বল নায়িকাদের চোখের পালক
নাকি এভাবেই নাচতে থাকে।
বার তিনেক কেশে গলা পরিষ্কার করে চার্লস কিছু বলার চেষ্টা করল, কিন্তু প্রতিবারই
ব্যর্থ হল। চোখ নামিয়ে নিল, কারণ স্কারলেটের সবুজ চোখের দৃষ্টি এতটাই মর্মভেদী যে ওর
মনে হল স্কারলেট ওকে দেখতেই পাচ্ছে না।
“টাকাকড়ি ছেলেটার ভালই আছে,” স্কারলেট দ্রুত চিন্তা করে যাচ্ছিল, যেন নতুন কোনো
মতলব ওর মাথায় খেলা করছে। “আর মা-বাবাও বেঁচে নেই যে আমার সঙ্গে ঝামেলা বাঁধবে। থাকে
অ্যাটলান্টায়। এখুনি ওকে বিয়ে করে ফেললে, অ্যাশলেকে বোঝানো যাবে যে আমি ওকে মোটেও পাত্তা
দিই না – আমি ওর সঙ্গে কেবল ফ্লার্টই করছিলাম। আর হানিরও সর্বনাশ হবে। কিছুতেই আরেকটা
প্রেমিক পাকড়াও করতে পারবে না, ওর সঙ্গে প্রেম করার কথা শুনে ছেলেরা হেসেই খুন হয়ে
যাবে। মেলানিকেও আঘাত দেওয়া যাবে, চার্লসকে
ও অসম্ভব ভালবাসে। স্টু আর ব্রেন্টকেও আঘাত দেওয়া হবে – ” ওদের কেন আঘাত দিতে চায় সেটা
স্কারলেটের কাছে খুব একটা স্পষ্ট নয়, শুধু ওদের কুচুটে বোনগুলোকে কারণ বলা যায়। তারপর
আমি যখন ঝকঝকে জুড়িগাড়িতে চড়ে এখানে বেড়াতে আসব, ামার অনেক দামি দামি পোশাক থাকবে,
নিজের একটা বাড়ি থাকবে – ওরা হিংসেয় জ্বলে উঠবে। আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করার কথা কেউ
কখনো ভাবতেই পারবে না।”
“এর অর্থ এই দাঁড়াচ্ছে যে লড়াই অবশ্যম্ভাবী,” আরও কয়েকবার ব্যর্থ প্রচেষ্টার পর
চার্লস বলতে পারল। “তবে, কিছু চিন্তা করো না, মিস স্কারলেট, বড় জোর এক মাস, ওরা পালাবার
পথ পাবে না। হ্যাঁ, ঠিকই বললাম! পালাবার পথ পাবে না! এই সুযোগ আমি কোনোমতেই হাতছাড়া
হতে দেব না। আজকের বলড্যান্স তেমন জমবে বলে মনে হয় না, কারণ ট্রুপকে আলোচনার জন্য জোন্সবোরো
চলে যেতে হবে। টার্লটন ভাইরা খবরটা সবার কাছে পৌঁছনোর জন্য বেরিয়ে গেছে। জানি যে লেডিরা
এতে ভীষণ মনঃক্ষুণ্ণ হবেন।”
স্কারলেট কি বলবে ভেবে না পেয়ে শুধু “ওহ্” বলল, তবে চার্লসের পক্ষে সেটাই যথেষ্ট।
মাথাটা আস্তে আস্তে ঠাণ্ডা হতে শুরু করেছে, মনটাও বশে আসছে। সমস্ত অনুভূতি জমে
বরফ হয়ে গেছে, মনে হল আবেগের উত্তাপটা আর কোনোদিন ফিরে আসবে না। এই সুদর্শন লাজুক ছেলেটাকেই
কাজে লাগানো যায় না? আর পাঁচটা ছেলের থেকে
আলাদা কিছু তো নয়, আর হলেও ওর ভারি বয়েই গেছে। নাহ্, কোনো কিছুতেই আর ওর কিছু বয়ে
যায় না, যদি নব্বই বছর পর্যন্তও বাঁচতে হয়, তবুও।
“এখনও ঠিক করেই উঠতে পারিনি যে আমার মিস্টার ওয়েড হ্যাম্পটনের সাউথ ক্যারোলাইনা
লেজিয়নে যাওয়া উচিত না অ্যাটলান্টা গেট সিটি গার্ডে।”
আবার স্কারলেট “ওহ” বলল। ওদের দুজনের চোখাচোখি হল। আবার স্কারলেটের নৃত্যরত চোখের
পলক চার্লসকে বিগলিত করে ফেলল।
“তুমি আমার প্রতীক্ষায় থাকবে, মিস স্কারলেট? ওদের খেদিয়ে বের করে দেওয়া পর্যন্ত
তুমি আমার জন্য অপেক্ষা করছ জানা থাকলে আমি – আমি সুখের সপ্তম স্বর্গে ভাসতে থাকব!” স্কারলেটের জবাবের প্রত্যাশায় ও শ্বাস রোধ করে অপেক্ষা
করতে লাগল। ওর অধর প্রান্তের কুঞ্চনটা লক্ষ্য করল, প্রতিবিম্বিত অধর প্রান্তটাও প্রথমবার
নজর করল, ওখানে একবার চুম্বন করলে কী প্রতিক্রিয়া হতে পারে সেটা আন্দাজ করার চেষ্টা
করল। স্কারলেটের হাত – ঘামে স্যাঁতস্যাঁতে হয়ে আছে – ওর হাতে আশ্রয় নিল।
“আমি প্রতীক্ষায় থাকতে চাই না,” স্কারলেট বলে উঠল। কুহেলিকায় ভরা ওর চাহনি।
স্কারলেট হাত আঁকড়ে ধরে চার্লস বসে রইল, বিস্ময়ে হাঁ হয়ে গেছে। আড়চোখে উদাসীনভাবে
ওর দিকে তাকিয়ে স্কারলেটের মনে হল চার্লসকে ঠিক একটা কোলাব্যাঙের মত দেখাচ্ছে। চার্লস
বেশ অনেকবার হোঁচট খেল, বারবার মুখ খোলা বন্ধ করল, আর জিরেনিয়ামের মৎ রাঙা হয়ে উঠতে
লাগল।
“তুমি আমাকে ভালবাসতে পারবে তো?”
স্কারলেট কোনো কথাই বলল না, কেবল মাথা নীচু করে নিজের কোলের দিকে চেয়ে রইল, ফলে
চার্লস আবার নতুন করে খুশি আর কুণ্ঠার জোয়ারে ভেসে গেল। বোধহয় এই ধরণের প্রশ্ন পুরুষমানুষদের
মেয়েদের কাছে করাটা উচিত নয়। বোধহয় এই ধরণের প্রশ্নের জবাব দিলে মেয়েদের কুমারীত্বের
অমর্যাদা হয়। ইতিপূর্বে এই রকম কোনো পরিস্থিতিতে পড়বার সাহস জোগাড় করে উঠতে পারেনি
বলে আজকের এই পরিস্থিতিতে ও একেবারে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ল। ওর ইচ্ছে করছিল খুশিয়াল
হয়ে চেঁচিয়ে ওঠে, গান গেয়ে ওঠে, ওকে চুম্বন করে আর সবুজ লনের ওপর দিয়ে ছুটে গিয়ে সবাইকে
জানাতে – কালো সাদা, সবাইকে – যে স্কারলেট ওকে ভালবাসে। কিন্তু এসব কিছু না করে স্কারলেটের
হাতটা খুব জোরে চেপে ধরল। আঙ্গুলে পরা আংটিগুলো চেপে বসে স্কারলেটের ব্যথা লাগতে লাগল।
“তুমি আমাকে তাড়াতাড়ি বিয়ে করতে চাও, মিস স্কারলেট?”
“হুঁ,” পোশাকের একটা ভাঁজ আঙ্গুল দিয়ে খুঁটতে খুঁটতে স্কারলেট বলল।
“তাহলে দুটো বিয়েই একসঙ্গে হয়ে যাক, মেলি আর – ”
“না,” স্কারলেট তাড়াতাড়ি বলে উঠল। ত্রস্ত চোখে চার্লসের পানে চাইল। চার্লস বুঝতে
পারল আবার একটা ভুল করে ফেলেছে। প্রত্যেক মেয়েই চায় নিজের বিয়ের অনুষ্ঠানটা আলাদা করেই
হোক – অন্য কারোর সাথে ভাগাভাগি করে নয়। ওর এই ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলো মার্জনা করে স্কারলেট
কত বড় মনের পরিচয় দিচ্ছে। একটু যদি আঁধার হত আর ছায়ার অবগুণ্ঠন সাহস জোগাত, তাহলে ওই
হাতদুটো তুলে নিয়ে চুম্বন করে মন খুলে সমস্ত কামনা ব্যক্ত করে ফেলত।
“তোমার বাপির সঙ্গে কবে কথা বলতে পারি?”
“যত শীঘ্র সম্ভব,” স্কারলেট বলল। মনে ক্ষীণ আশা চার্লস আংটি পিষ্ট হাতকে মুক্তি
দেবে যাতে নিজের মুখে ওটা ছেড়ে দেবার কথা বলতে না হয়।
চার্লস একলাফে উঠে দাঁড়াল, মুহূর্তের জন্য স্কারলেটের মনে হল ছেলেটা হয়ত উদ্যাম
নৃত্য শুরু করে দেবে, কিন্তু তার আগেই চার্লস সম্বিত ফিরে পেল। স্কারলেটের দিকে দীপ্ত
চোখে তাকাল, সরল নিষ্পাপ হৃদয়টা ওর চোখে প্রতিফলিত হচ্ছে। ইতিপূর্বে এরকম দৃষ্টি মেলে স্কারলেটের দিকে কোনো
পুরুষই তাকায়নি, ভবিষ্যতেও হয়ত কেউ তাকাবে না, কিন্তু ওর উদাসীন ভাবনায় চার্লসকে একটা
বাছুরের থেকে বেশি কিছু মনে হল না।
“আমি এখুনি তোমার বাপিকে খুঁজতে যাচ্ছি,” হাসিতে উজ্জ্বল মুখে চার্লস বলল। “আমি
আর অপেক্ষা করতে পারছি না। তুমি কি আমাকে অনুমতি দিচ্ছ – প্রিয়ে? সোহাগের সম্বোধনটা
মুখ থেকে বেরোতেই চাইছিল না, কিন্তু একবার বেরিয়ে যাওয়ার পর, ও সেটার পুনরাবৃত্তি করল,
করে বেশ আনন্দও পেল।
“হ্যাঁ,” স্কারলেট বলল। “এখানেই অপেক্ষা করছি আমি। জায়গাটা খুবই শীতল আর মনোরম।”
লন পেরিয়ে চার্লস চলে গেল, বাড়ির কাছাকাছি গিয়ে ও অদৃশ্য হয়ে গেল, বড় ওকগাছের ছায়ায়
স্কারলেট একলা বসে রইল। আস্তাবল থেকে ঘোড়ার পিঠে সওয়ার হয়ে অনেক মানুষ পরপর বের হল,
পেছনে পেছনে ওদের নিগ্রো ভৃত্যরা। মুনরো ভাইয়েরা টুপি নাড়িয়ে ঘোড়া ছুটিয়ে বেরিয়ে গেল,
ফোনটেন আর ক্যালভার্টরা হল্লা করতে করতে রাস্তা ধরে চলল। টার্লটনদের চার ভাই ওর পাশ দিয়ে লনের ওপর দিয়েই
ঘোড়া ছুটিয়ে দিল, ব্রেন্ট হুঙ্কার দিয়ে বলল, “মা আমাদের ঘোড়া দিতে রাজি হয়েছেন! ইয়ে
– য়ে – য়ে!” ধুল উড়িয়ে ওরা নিমেষের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল।
চোখের সামনে সাদা বাড়িটা লম্বা লম্বা থাম উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে, যেন পরম উদাসীনতায় ওর
দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। আর কোনোদিনই এটা ওর নিজের বাড়ি হয়ে উঠবে না। অ্যাশলের
বউ হয়ে ওর কোলে চেপে এই বাড়ির চৌকাঠ কোনোদিনই পেরনো হবে না। অ্যাশলে! ওহ! অ্যাশলে! কী করেছি আমি? মনের গহীনে, আহত অহঙ্কার আর শীতল বাস্তববোধের পরতের
গভীরে কী যেন একটা ওকে অবিরাম বেদনা দিয়ে চলেছে। ওর দম্ভ, ওর স্বেচ্ছাচারী স্বার্থপরতাকে
ছাপিয়ে ওর হৃদয়ে একটা পরিণত আবেগ জন্মলাভ করছে। অ্যাশলেকে ও ভালবাসে, আর অ্যাশলেও যে ওকে ভালবাসে
সেটাও ও জানে। চার্লসের নুড়িপাথরের রাস্তা দিয়ে অদৃশ্য হয়ে যাওয়া দেখতে দেখতে এই অনুভূতিটাই
প্রবল হয়ে উঠেছিল।
টীকাঃ
১ সেমিনোলের যুদ্ধ – ফ্লোরিডার
যুদ্ধ - সেমিনোল আর আমেরিকার সেনাবাহিনীর
মধ্যে লড়াই। ১৮১৬ তে শুরু হয়। শেষ হয় ১৮৫৮
তে। মাঝে মাঝে বিরতি ছিল।
২ মেক্সিকান যুদ্ধ – মার্কিন
যুক্তরাষ্ট্র টেক্সাস দখল করার পরিপ্রেক্ষিতে ১৮৪৬ থেকে ১৮৪৮ পর্যন্ত চলা
মেক্সিকোর সঙ্গে যুদ্ধ।
৩ বোর্জিয়া পরিবার – ইতালির
নবজাগরণের সময়ের একটি সম্ভ্রান্ত পরিবার। পঞ্চদশ এবং ষোড়শ শতাব্দীতে এই পরিবার ধর্ম এবং রাজনীতির ক্ষেত্রে প্রবলভাবে প্রভাবশালী
হয়ে ওঠে।
৪ ক্রিনোলিন – ঘোড়ার লোমের তৈরি বিশেষ ধরণের শক্ত কাপড়, সায়া বা স্কার্ট ফুলিয়ে রাখার
জন্য শক্ত ফ্রেম।
৫ কোলি কুকুর – স্কটল্যান্ডের এক লোমশ
কুকুর।
৬ ওয়েস্ট পয়েন্ট – মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের
মিলিটারি অ্যাকাডেমি।
৭ অটোমান - হাতল এবং
হেলান দেওয়ার পিঠবিহীন গদিআঁটা চেয়ার।
৮ ম্যাসন-ডিক্সন লাইন – প্রাক
গৃহযুদ্ধ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ওহায়ো নদী সহ এই লাইনটি্র দক্ষিণ দিককে ক্রীতদাস
রাজ্য এবং এর উত্তর দিককে ক্রীতদাস মুক্ত রাজ্য বলে মনে করা হত। মেরিল্যান্ড এবং পেনসিল্ভ্যানিয়া
রাজ্যের সীমানাকেই ম্যানস-ডিক্সন লাইন বলা হত।


0 মন্তব্যসমূহ