বৃহস্পতিবার, ২৪ মে, ২০১৮

মার্গারেট মিচেলের ধারাবাহিক উপন্যাস : যে দিন ভেসে গেছে--পঞ্চম অধ্যায়


অনুবাদ : উৎপল দাশগুপ্ত


সকাল দশটা। এপ্রিল মাস হিসেবে, দিনটা উষ্ণ। সূর্যের সোনালী রশ্মি, জানালার নীল পর্দার ফাঁক দিয়ে ঢুকে স্কারলেটের ঘরকে আলোকিত করে দিয়েছে। দেওয়ালের হালকা হলুদ রঙের ওপর আলো পড়ে ঝলমল করছে। মেহগিনি কাঠের আসবাবপত্র দেখাচ্ছে গাঢ় লাল। মেঝেতে রোদ্দুর পড়ে কাঁচের মত চক চক করছে, কার্পেট পাতা জায়গাটুকু ছাড়া।
বাতাসে গ্রীষ্মকালের পূর্বাভাস। জর্জিয়া থেকে বসন্ত বিদায় নেয় নেহাতই আনিচ্ছায়। কাঠফাটা গরম আসার আগে অনেকদিন পর্যন্ত বাতাসে থাকে হালকা ঊষ্ণতার ছোঁয়া। নতুন ফোটা ফুলের হালকা সুবাসে স্কারলেটের ঘর ভরে গেল। জানালার বাইরে ড্রাইভওয়ের দু’পাশে ফোটা ড্যাফোডিল ফুলের রঙ্গীন সমাহার। মাটি জুড়ে জুঁই ফুলের হলুদ আস্তরণ। জানালার নীচে, মকিংবার্ড আর জে পাখিরা মাগনোলিয়া গাছের দখল নিয়ে তাদের চিরাচরিত ঝগড়া শুরু করেছে। জে পাখির কর্কশ চিৎকারের বিনিময়ে মকিংবার্ডের মিষ্টি সুরেলা প্রত্যুত্তর। 

এরকম উজ্জ্বল সকালগুলোতে স্কারলেট জানালার সামনে গিয়ে কার্ণিশে ভর দিয়ে দাঁড়ায়। টারার বাতাস থেকে সুরভি আর পরিবেশ থেকে নিসৃত ধ্বনি উপভোগ করার জন্য। তবে আজ টারার নীল আকাশ আর রোদ উপভোগ করতে মন চাইল না। শুধু মুখ ফুটে বেরিয়ে গেল, “যাক বাবা, বৃষ্টি হচ্ছে না!” বিছানার ওপর আপেল-সবুজ সিল্কের বল ড্রেসটা সুন্দর করে প্যাক করে রাখা আছে একটা কার্ডবোর্ড বাক্সের মধ্যে। টুয়েল্ভ ওকসে নিয়ে যাবার জন্য, যাতে বল-ডান্সের আগে পরে নেওয়া যায়। স্কারলেট একটু মাথা নাড়ল। সব কিছু ওর পরিকল্পনা মত চললে, ওই ড্রেসটা পরার দরকার হবে না। বল শুরু হবার অনেক আগেই ও আর অ্যাশলে বিয়ে করার জন্য জোন্সবোরো রওয়ানা হয়ে যাবে। এখন চিন্তার কথা হল – বারবেকিউতে কি পরে যাবে? 

কোন পোশাক পরলে ওকে সুন্দরী লাগবে আর অ্যাশলের চোখে দুর্নিবার দেখাবে? সকাল আটটা থেকে ও এই নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। ওয়ার্ডরোব থেকে একটার পর একটা ড্রেস বের করে চলেছে। একটাও পছন্দ হচ্ছে না। বাতিল করা পোশাকে মেঝে, টেবিল, চেয়ার আর বিছানার ওপর ডাঁই হয়ে আছে। গোলাপি রঙের অরগ্যাণ্ডির ড্রেসটা খুবই মানানসই। কিন্তু গত গ্রীষ্মে, যখন মেলানি এসেছিল, তখন টুয়েল্ভ ওকসে ওটাই পরে গেছিল। নিশ্চয়ই ওর মনে থাকবে! কালো রঙের পোশাকটাও ওর গাত্রবর্ণের সাথে খাপ খায়। তবে বয়সটা একটু বেশি লাগে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ওর ষোল বছরের মুখটা দেখল। কোথাও কি চামড়া কুঁচকে গেছে? বলিরেখা দেখা যাচ্ছে? থুতনির পেশী ঝুলে পড়েছে? মেলানির তারুণ্যের পাশাপাশি তাকে বয়ষ্ক দেখালে একদম চলবে না! ল্যাভেণ্ডার রঙের মসলিনের পোশাকটা সুন্দর হলে কি হবে ওকে একেবারেই মানায় না। ক্যারীনের মত স্কুলের মেয়েদেরই বেশি মানায়। মেলানির গাম্ভীর্যের কাছে ওকে স্কুলের মেয়ে লাগা চলবে না! আর এই সবুজ রঙের টাফেটা ড্রেসটা খুবই পছন্দের, ওকে মানায়ও ভাল, কিন্ত বুকের কাছে একটা ছোট তেলের দাগ রয়েছে! ওখানে পিন দিয়ে একটা ব্রোচ লাগিয়ে নেওয়াই যায়। কিন্তু মেলানির নজরে ঠিক পড়ে যাবে। সূতির নানা রঙের আরও অনেক পোশাক রয়েছে। কিন্তু সেগুলো এই পার্টিতে পরবার মত না। কাল যে সবুজ রঙের মসলিনের বম্ব্যাজ়িন ড্রেসটা পরেছিল, সেটাও ভাল, কিন্তু ওটা তো বিকেলে পরার জন্য। গ্রীবার কাছটা নীচু। বারবেকিউতে পরা উচিত না। কিন্তু কিছু করার নেই! তাছাড়া নিজের গ্রীবা আর বাহু নিয়ে ওর যথেষ্ট গর্বই আছে। যদিও একেবারে সকালেই সেগুলো প্রদর্শণ করা শোভন নয়। 

আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে পার্শ্বাভিমুখ থেকে দেখল। না, ওর গঠন নিয়ে লজ্জা পাবার মত কিছু নেই। মরাল গ্রীবা, সুডৌল বাহু মনোরঞ্জক। উন্নত, আকর্ষণীয় বক্ষ। অনুন্নত বক্ষ পোশাকের কারসাজীতে আড়াল করে রাখার প্রয়োজন ওর কখনও হয়নি। যেমন বেশির ভাগ ষোল বছরের মেয়েদের হামেশাই করতে হয় নিজেদের পরিনত দেখানোর জন্য। এলেনের তন্বী বাহুসৌষ্ঠব আর শুভ্র গাত্রবর্ণ ওর চেহারার মধ্যেও প্রতীয়মান। এজন্য ওর মনে খুবই অহঙ্কার। একটু যদি মায়ের মত লম্বা হতে পারত! পেটিকোট তুলে পা দু’খানা দেখল। সত্যিই সুন্দর। এমন কি ফ্যেয়াটভিল অ্যাকাডেমির মেয়েরাও বলত! কি দুঃখের কথা এগুলো দেখানো যাবে না! আর কটিদেশ? ফ্যেয়াটভিল, জোন্সবোরো কিংবা তিন তিনটে কাউন্টিতে কারও এমন পাতলা কটি নেই! ম্যামিকে বলতে হবে কোমরে লেসটা যেন বেশ টাইট করে বাঁধে। দরজা খুলে কান পাতল। নীচের তলায় হল থেকে ম্যামির ভারি পায়ের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। খুব চেঁচিয়ে বেশ অধৈর্যভাবে ম্যামিকে ডাকল। ও জানে মা এখন রান্নাঘরে। কুকিকে আজকের রান্নার সামগ্রী বের করে দিচ্ছেন। সুতরাং ওর চিৎকার শুনতে পাবেন না। 

“কেউ কেউ মনে করে আমি বোধহয় উড়তে পারি,” ম্যামির গজগজ শোনা গেল। সিঁড়ি দিয়ে ওপরে ওঠার শব্দও পাওয়া গেল। বেশ রণংদেহী মূর্তিতে ঢুকল। হাতের ট্রে’তে ধূমায়িত প্রাতরাশ। মাখন লাগানো দুটো রাঙা আলু, বাজরার কেক, আর গ্রেভীসহ একটা বড় হ্যামের টুকরো। খাবারের পরিমাণ দেখে স্কারলেট একেবারে জ্বলে গেল। ম্যামির লৌহকঠিন নিয়মটা মনে পড়ল না। কোন পার্টিতে যাবার আগে ও’হারা পরিবারের মেয়েদের পেটপুরে খেয়ে যেতে হবে, যাতে পার্টিতে আর খাবার ইচ্ছে না হয়। 

“মিথ্যেই এনেছ এসব। আমি খাব না। তুমি কিচেনে ফেরত নিয়ে যেতে পার।” 

ম্যামি ট্রে’টা টেবিলে রাখল। তারপর কোমরে দু’হাত রেখে দাঁড়াল। 

“আজ্ঞে হ্যা ম্যাডাম! তুমিই খাবে! আগের বারবেকিউএর সময় আমার শরীর ভাল ছিল না। তাই তোমাকে খাইয়ে পাঠাতে পারি নি। এখানকার প্রত্যেকটা জিনিস তোমাকে খেতে হবে।” 

“মোটেই খাব না! এখন এস, এই লেসটা আমার কোমরে খুব টাইট করে বেঁধে দাও। এমনিতেই অনেক দেরি হয়ে গেছে। বাইরে থেকে গাড়ির শব্দ শুনতে পাচ্ছি।” 

“মিস স্কারলেট! লক্ষ্মীটি! একটু খেয়ে নাও। মিস ক্যারীন আর মিস স্যুয়েলেন কোন ঝামেলা করে নি।” 

“ওরা তো খাবেই!” ব্যাঙ্গের সুরে বলল স্কারলেট। “একটা খরগোশের যতটুকু বুদ্ধি আছে সেটাও ওই দুটোর নেই! আমি খাচ্ছি না! মনে সেবার ক্যাল্ভার্টদের পার্টিতে যাবার আগে তুমি আমাকে পূরো এক ট্রে খাইয়ে পাঠিয়েছিলে! ওরা স্যাভান্নার আইসক্রীম আনিয়েছিল। আমি মাত্র এক চামচই খেতে পেরেছিলাম! আজ আমি মজা করতে চাই। প্রাণভরে খাব!” 

এই অবাধ্যতায় ম্যামির মনে একটা ধিক্কারবোধ তৈরি হল। রাগে ওর ভুরু কুঁচকে গেল। ম্যামির ভাবনায় একজন অল্পবয়সি মেয়ের কি করা উচিত আর কি করা উচিত নয় সে ব্যাপারে কতগুলো বদ্ধ ধারণা ছিল, ঠিক যেমন ওর মনে সাদা চামড়া আর কালো চামড়ার মানুষের মধ্যে প্রভেদের ব্যাপারে ছিল। এ ব্যাপারে কোন মাঝামাঝি অবস্থান নেওয়া তার কল্পনার বাইরে। স্যুয়েলেন আর ক্যারীন ওর হাতের পুতুল। ওর সব কথাই মান্য করে চলে। কিন্তু স্কারলেটের সঙ্গে রীতিমত যুদ্ধ করতে হয় ওকে বোঝাতে যে ওর স্বাভাবিক প্রবণতাগুলো একেবারে ‘অলেডিসুলভ’। সেই কঠিন যুদ্ধে জেতার জন্য যে সব ছল চাতুরির আশ্রয় নিতে হয় সেগুলো কোন সাদা চামড়ার মানুষের মাথা থেকে বেরোবে না। 

“লোকে এই পরিবার সম্বন্ধে কি বলে সেটা নিয়ে তোমার মাথাব্যথা না থাকলেও আমার আছে!” ও গরগর করতে লাগল। “আমি কারও কাছে শুনতে চাই না যে তুমি পার্টিতে গিয়ে হ্যাংলার মত খেয়েছ। পার্টিতে পাখির মত অল্প খেতে হয়। তাহলেই লেডি বলে বোঝা যায়। আমি চাই না তুমি মিস্টার উইল্কসের পার্টিতে গব গব করে খাও।” 

“মা তো খান। কিন্তু মা তো লেডি,” স্কারলেট খড়কূটো ধরার চেষ্টা করল। 

“বিয়ে হয়ে গেলে, তুমিও খেতে পারবে। তোমার বয়সে মিস এলেন পার্টিতে গিয়ে দাঁতে কুটোটাও নাড়তেন না। তোমার ইউল্যালী মাসীও নয়। কিন্তু এখন ওঁদের বিয়ে হয়ে গেছে। যে সব মেয়েদের বিয়ে হয় নি, তারা পার্টিতে বেশি খেলে বর পাকড়াও করতে পারে না।” 

“বিশ্বাস করি না। আগের বার, যেবার তুমি অসুস্থ ছিলে। আমি আগে থেকে খেয়ে যাই নি। অ্যাশলে উইল্কস বলেছিল, মেয়েদের ঠিকমত খেতে দেখলে ও খুব আনন্দ পায়।” 

ম্যামি আশঙ্কাজনকভাবে মাথা নাড়ল। 

“দেখ ভদ্রলোকেরা যেটা বলেন আর যেটা ভাবেন দুটো একেবারে আলাদা। আর মিস্টার অ্যাশলে তোমাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছেন বলে তো শুনিনি।” 

স্কারলেট মুখভঙ্গী করে কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু সামলে নিল। ম্যামিতো খাঁটি কথাই বলেছে! ওর মুখের অবস্থা দেখে ম্যামি কৌশল বদল করল। ট্রে নিয়ে দরজার দিকে যেতে যেতে বলল, 

“ঠিক আছে। এই তো কুকিকে তখন বলছিলাম, লেডি চেনা যায় সে কি খায় না তাই দেখে। আর আমি তো মিস মেলি হ্যামিলটনের মত কম খেতে আর কাউকেই দেখি নি। ওই সেই যে যখন উনি মিস্টার অ্যাশলে – না না – মিস ইন্ডিয়ার সাথে দেখা করতে এসেছিলেন।” 

একটু সন্দেহের চোখে ম্যামির দিকে তাকাল স্কারলেট। কিন্তু সারল্য আর অনুশোচনা ছাড়া কিছুই চোখে পড়ল না। স্কারলেট যে মিস মেলানি হ্যামিলটনের মত লেডি নয় এর জন্য অনুশোচনা। 

“আচ্ছে রাখ ট্রে’টা। আর লেসটা আমাকে টাইট করে বেঁধে দাও,” একটু বিরক্তি দেখিয়ে বলল। “তারপর আমি অল্প খাবার চেষ্টা করব। এখনই খেয়ে নিলে ওটা টাইট করে বাঁধতে অসুবিধে হবে।” 

“যুদ্ধজয়ের আনন্দ লুকিয়ে, ম্যামি ট্রে’টা টেবিলের ওপর রাখল। 

“কি পরবে আমার সোনা?” 

“ওটা,” স্কারলেট মসলিনের সবুজ ড্রেসটা দেখাল। আবার ম্যামির রণংদেহী মূর্তি। 

“ককখনো না। ওটা সকালে পরবার পোশাক নয়। বিকেল তিনটের আগে তুমি বুক খোলা পোশাক পরতে পারো না। আর ওই ড্রেসটা শুধু বুক খোলা নয় হাতকাটাও। তাছাড়া রোদ লাগিয়ে তুমি চামড়াটা যেরকম কালো করে ফেলেছিলে, অনেক যত্ন করে, দুধের সর লাগিয়ে সেটা আমি ঠিক করেছি। আমি কিছুতেই ওটা নষ্ট হতে দেব না। তোমার মাকে আমি এখুনি বলছি।” 

“আমার ড্রেস পরার আগে মা’কে একটা কথাও যদি বলেছ, তাহলে আমি কিচ্ছু খাব না বলে দিচ্ছি,” স্কারলেট শীতল স্বরে বলল। “ড্রেস পরে নেবার পর আর বদলাতে দেবার জন্য সময় পাবেন না।” 

ম্যামি হাল ছেড়ে দিল। বিকেলের ড্রেস সকালে পরাটা মেনে নেওয়া ভাল। বরং খেয়ে না গিয়ে পার্টিতে হামলে পড়ে খাওয়া দাওয়া করলেই বেশি খারাপ দেখাবে। 

“নাও কিছু একটা ধরে, নিঃশ্বাস বন্ধ করে দাঁড়াও,” ও হুকুম দিল। 

স্কারলেট বিছানার একটা ছত্রী ধরে নিঃশ্বাস চেপে দাঁড়াল। ম্যামি ওর সরু কোমরের দিকে গর্বের সঙ্গে তাকাল। 

“আমার সোনার মত এত সরু কোমর কোন মেয়ের নেই,” অনুমোদনের আভাস ম্যামির গলায়। মিস স্যুয়েলেনের কোমরে কুড়ি ইঞ্চি টাইট করলেই ও মুচ্ছো যায়!” 

“ফুঃ!” হাঁপাতে হাঁপাতে বেশ কষ্ট করেই বলল স্কারলেট। “আমি জীবনে কখনও মূর্চ্ছা যাই নি।” 

“কখন সখনো মুচ্ছো যাওয়াটা খারাপ কিছু নয়,” ম্যামি উপদেশের সুরে বলল। “তোমার আবার বেশি বেশি সাহস! অনেকদিন থেকেই বলব বলে ভেবেছি, সাপ, ইঁদুর, পোকামাকড় দেখে ভয়ে মুচ্ছো যাওয়াটা একটু ভাল। বলছি না বাড়িতে এসব করতে। কিন্তু যখন অন্যদের সাথে থাক তখন। আর তোমাকে বলেছি --” 

“উঃ, একটু তাড়াতাড়ি কর। অত কথা বোলো না। দেখে নিও, আমি ঠিক বর পাকড়াও করে নেব। মূর্চ্ছা না গিয়েও, ভয় না পেয়েও। উফ, খুব টাইট লাগছে। ড্রেসটা পরিয়ে দাও।” ম্যামি সাবধানে সেই বারো গজের বুক আর হাতকাটা সবুজ মসলিনের পোশাক স্কারলেটকে পরিয়ে দিল। 

“রোদ্দুরে, কাঁধের ওপর শালটা ফেলে রাখবে। খবরদার, গরম লাগলেও সরাবে না,” ও আদেশ দিল। “নইলে বুড়ী মিস স্ল্যাটারলির মত বাদামী হয়ে ফিরবে। এখন খেয়ে নাও, সোনা। বেশি তাড়াহুড়ো করার দরকার নেই। তাহলে বমি হয়ে যাবে।” 

স্কারলেট বাধ্য মেয়ের মত খেতে বসল। ভাবল পেট ভরে গেলে কি ওর কি আর নিঃশ্বাস নেবার জায়গা থাকবে! বেসিনের স্ট্যাণ্ড থেকে একটা বড় তোয়ালে এনে স্কারলেটের বুক আর ঘাড়ে পেঁচিয়ে দিয়ে কোলের ওপর পেতে দিল। স্কারলেট প্রথমেই হ্যামটা তুলে নিয়ে জোর করে মুখের মধ্যে ঠেলে দিল। হ্যাম ও ভালবাসে। 

“হে ভগবান! কেন আমার বিয়ে হয়ে যায় নি?” বিতৃষ্ণার সাথে কথাটা বলে রাঙা আলুটা খেতে শুরু করল। “যা আমি করতে চাই না, সেটাই সারাক্ষণ করতে করতে আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি! আমাকে দেখাতে হবে আমি নাকি পাখির থেকেও কম খাই! যখন আমার দৌড়তে ইচ্ছে করবে তখন আমাকে পা টিপে টিপে হাঁটতে হবে। ওয়াল্টজ় নাচতে নাচতে অজ্ঞান হয়ে পড়বার ভান করতে হবে! যদিও আমি দু’দিন ধরে ক্লান্ত না হয়ে নেচে যেতে পারব! যে ছেলেটার মাথায় আমার অর্ধেক বুদ্ধিও নেই তাকে হেসে হেসে বলতে হবে, “সত্যি, আপনি কি দারুণ!” ‘আমি কিছুই জানি না’ ভান করতে করতে আমি ক্লান্ত হয়ে গেছি যাতে ছেলেরা আমার জানা জিনিস আমাকে বোঝাতে পারে আর মনে মনে আত্মশ্লাঘা অনুভব করতে পারে! – না আর একটুও খেতে পারব না।” 

“একটা গরম কেক খাও,” ম্যামি অনড়ভাবে বলল। 

“আচ্ছা বল তো বর ধরবার জন্য একটা মেয়েকে বোকাসোকা সাজতে হবে কেন?” 

“মনে হয়, পুরুষ মানুষ কি চায় সেটা জানে না। কিন্তু ভাব দেখায় যে জানে। ওরা যেটা চায় বলে ভাবে, সেটা দিতে পারলে অনেক ঝামেলা এড়ানো যায়। ওরা আসলে চায়, মেয়েরা ছোট্ট হবে, কম খাবে, আর বুদ্ধিশুদ্ধি একদম থাকবে না। ছেলেদের মনে যদি সন্দেহ থাকে যে মেয়েটার ওর থেকে বেশি বুদ্ধি, তাহলে ওকে বিয়েই করবে না। তাহলে তো মেয়েটা লেডিই নয়।” 

“বিয়ের পরে তো বুঝতেই পেরে যায় যে বউএরও বুদ্ধিশুদ্ধি আছে!” 

“ঠিক। কিন্তু তখন তো দেরি হয়ে গেছে। বিয়ে করে ফেলেছে। আর তাছাড়া ভদ্রলোকেরা চান তাঁদের বউদের বুদ্ধিশুদ্ধি থাকুক।” 

“দাঁড়াও, একদিন না একদিন, আমি ঠিক যা খুশি বলব, যা খুশি করব। সেটা যদি কারও কারও পছন্দ না হয় তো আমার বয়েই গেল!” 

“তুমি এরকম কিছুই করবে না,” ম্যামির গলা গম্ভীর। অন্তত যতক্ষণ আমি বেঁচে আছি। কেকগুলো খেয়ে নাও। দরকার হলে একটু গ্রেভি মাখিয়ে নাও।” 

“ইয়াঙ্কি মেয়েদের মনে হয় না এরকম বোকা সাজতে হয়। যখন আমরা সারাটোগা গিয়েছিলাম – গত বছর – দেখলাম ওরা দিব্বি বুদ্ধিমানের মত আচরন করছে – আর ছেলেদের সামনেই।” 

ম্যামি নাক কোঁচকাল। 

“এটা সত্যিই যে ইয়াঙ্কি মেয়েরা মুখের ওপর কথা বলে দেয়। কিন্তু আমি সারাটোগাতে কোন মেয়েকে বিয়ের প্রস্তাব পেতে দেখিনি।” 

“কিন্তু বিয়ে তো ইয়াঙ্কিদের করতেই হবে। নইলে এমনি এমনি ওরা বেড়ে যাবে কি করে? ওরা নিশ্চয়ই বিয়ে করে। বাচ্চা কাচ্চা হয়। ওদের সংখ্যা তো নেহাত কম নয়!” 

“ছেলেরা ওদের টাকার জন্য বিয়ে করে,” ম্যামি হার মানার পাত্রী নয়। 

স্কারলেট কেকটা গ্রেভিতে ভিজিয়ে নিয়ে মুখে পুরল। ম্যামি খুব একটা ভুল বলছে না মনে হয়। এলেনও ওকে এই ধরনের কথা বলেছিলেন কিছুদিন আগে। তবে আরেকটু সূক্ষ্ম ভাবে। সব মায়েরাই তাঁদের মেয়েদের অসহায়, নির্ভরশীল, লাজুক হতে শেখাতেন। আর সত্যি বলতে কি, এই সব অভিনয়ে অভ্যস্ত হওয়ার জন্য যথেষ্ট মাথা খাটাতে হয়। ও হয়ত সত্যিই একটু হঠকারী। মাঝে মাঝে দু’একটা ব্যাপারে আশলের সঙ্গে ওর যে মতভেদ হয় নি তা তো নয়! ও বেশ জোরের সাথেই আশলেকে নিজের মতামত জানিয়েছে। হয়ত ওর ঘোড়ায় চড়া, খেলাধুলো করা এসব অভ্যেস পছন্দ না হওয়ায় অ্যাশলে ওকে ভুলে গিয়ে মেলানির দিকে ঝুঁকেছে। কৌশলটা পাল্টাতে হবে বলে মনে হচ্ছে। তবে অ্যাশলে যদি এই সব মেয়েলি ন্যাকামিতে ভুলে যায়, তাহলে অবশ্য ওর সম্বন্ধে যে শ্রদ্ধা স্কারলেটের আছে সেটা একেবারে নষ্ট হয়ে যাবে। যে পুরুষ মেয়েদের কান্না আর ন্যাকামিতে গলে যায়, সেই রকম পুরুষকে পাওয়ার থেকে না পাওয়াই ভাল। কিন্তু মনে হয় সব পুরুষমানুষই একরকম। 

আগে যদি কৌশলে ভুল হয়েই থাকে কি আর করা যাবে! আজকে ওকে ঠিক রাস্তা নিতে হবে। ওকে ওর চাইই চাই। তার জন্যে আর মাত্র কয়েক ঘন্টাই সময় বাকি আছে! যদি অজ্ঞান হলে, বা অজ্ঞান হবার ভান করলে কাজ হয়, তবে তাই সই। যদি বোকার মত হাসা-কাঁদা, বোকা সাজা, ন্যাকামি করা এসবও করতে হয় সেও মঞ্জুর। দরকারে ওকে ক্যাথলীন ক্যাল্ভার্টকেও ন্যাকামিতে ছাড়িয়ে যেতে হবে। আজকের দিনটা হাতছাড়া করা কোনমতেই চলবে না। 

দূর্ভাগ্যের ব্যাপার হল, স্কারলেটকে এ কথা বলার মত কেউ ছিল না যে যেটা ওর সত্যিকারের ব্যক্তিত্ব, যদিও কারো কারো কাছে প্রচণ্ডভাবে সজীব, সেটাই ওর আকর্ষণীয় হয়ে ওঠার আসল কারণ। সেটা আড়াল করতে গেলেই বরং ও জৌলুস হারাবে। কেউ বললেও হয়ত খুশি হত, কিন্তু বিশ্বাস করতে পারত না। সভ্যতার যে খণ্ডমুহুর্তের অংশ সে, তার অনেক আগে থেকেই, স্ত্রীজাতির বুদ্ধিমত্তার ঔৎকর্ষকে কোন রকম স্বীকৃতি দেওয়ার ধারনাটাই হাস্যকর ছিল। 

*** 

লালমাটির পথ ধরে, ঘোড়ার গাড়িতে উইল্কসদের প্ল্যান্টেশনে যেতে যেতে স্কারলেটের মনে একটা পাপমিশ্রিত আনন্দ কাজ করছিল। মা কিংবা ম্যামি কেউই আজকের বারবেকিউএর পার্টিতে থাকবেন না। তাই ওর পরিকল্পনা অনুযায়ী এগিয়ে যাবার সময়, ভুরু কোঁচ করে বা ঠোঁটের ইশারায় কেউ বাধা দেবে না। স্যুয়েলেন নির্ঘাত কাল ওর নামে লাগাবে। তাতে অবশ্য খুব কিছু এসে যাবে না। যদি প্ল্যান মত সব কিছু চলে তাহলে অ্যাশলের সাথে বিয়ে কিংবা পালিয়ে যাওয়ায় প্রথমে একটু আধটু বিরক্ত হলেও আখেরে সবাই খুশিই হবে। নাঃ মা আজ পার্টিতে যেতে না পারায় স্কারলেট খুশিই হয়েছে। 

ব্র্যান্ডির ঝোঁকে সকাল সকালই জেরাল্ড জোনাস উইল্কারসনকে বরখাস্ত করে দিয়েছেন। ছেড়ে যাবার আগে ওর কাছ থেকে প্ল্যান্টেশনের হিসেবপত্তর বুঝে নেবার জন্য এলেনকে টারাতেই থেকে যেতে হয়েছে। তাঁর ছোট অফিসে স্কারলেট ওর মাকে একটা চুমু খেয়ে বিদায় নিয়ে এসেছে। তখন উনি ওঁর লম্বা সেক্রেটারি আর তাড়া তাড়া কাগজপত্র নিয়ে বসেছিলেন। জোনাস উইল্কারসন পাশেই দাঁড়িয়ে। অপমানজনক ভাবে বরখাস্ত হওয়ায় চোখেমুখে চাপা ঘৃণা ফেটে পড়ছে। কাউন্টির সেরা ওভারসিয়ারের চাকরি থেকে বরখাস্ত! তাও কেন? না একটু সামান্য ফষ্টিনষ্টি করার জন্য! এমি স্ল্যাটারির বাচ্চার বাবা ও ছাড়া আরও অনেকেই হতে পারে! জেরাল্ডকে বারবার বোঝানোর চেষ্টা করেছে সে। জেরাল্ডও সম্ভাবনাটা উড়িয়ে দিতে পারেন নি। কিন্তু মিস এলেনের সেই এক গোঁ! এই দক্ষিণের সব্বাইকে জোনাস ঘেন্না করে। ওদের শীতল সৌজন্যবোধের জন্য। আর ওর সামাজিক প্রতিষ্ঠা নিয়ে এদের অবজ্ঞার মনোভাব! আর সব থেকে ঘেন্না এলেন ও’হারাকে। দক্ষিণের যা কিছু ঘৃণ্য এলেন হচ্ছেন সেই সবের প্রতিমূর্তি। 

প্ল্যান্টেশনের প্রধান পরিচারিকা হিসেবে ম্যামি এলেনকে সাহায্য করার জন্য থেকে গেছে। গাড়ির চালক টোবির পাশে ডিলসি মেয়েদের নাচের ড্রেসের লম্বা বাক্স কোলে নিয়ে বসেছে। জেরাল্ড তাঁর নিজের বড় শিকারি ঘোড়ার পিঠে পাশে পাশে চলছেন। ব্র্যান্ডির কৃপায় শরীর বেশ গরম আর মনটাও ফুরফুরে হয়ে আছে। উইল্কারসনকে বিদায়ের ঝামেলাটা এত সহজেই মিটে যাবে আশা করতে পারেন নি। দায়িত্বটা উনি এলেনের ঘাড়ে চাপিয়ে নিশ্চিন্ত হলেন। বারবেকিউতে যেতে না পারার জন্য এলেনের হতাশা, বান্ধবীদের সাথে দেখা না হওয়ার দুঃখ, এসব তাঁর মাথায়ও এলো না। বসন্তের এই সুন্দর সকালে, তাঁর ক্ষেত সবুজ হয়ে আছে, পাখিরা সুন্দর গান গাইছে, আর তাঁর নিজেকে খুব অল্পবয়সি আর ফূর্তিবাজ লাগছে, তখন অন্যের কথা ভাবার সময় কোথায়? কখনো কখনো ছোট ছোট আইরীশ খুশির গান গেয়ে উঠছেন আবার কখনো রবার্ট এমেটের লেখা “তার বীর যোদ্ধা যেথায় ঘুমায়ে রয়েছে, সেথা হতে বহুদূরে” জাতীয় দুঃখের গানও গুনগুন করে উঠছেন। 

জেরাল্ড খুশির জোয়ারে ভাসছিলেন। সারাটা দিন ধরে ইয়াঙ্কি আর যুদ্ধ নিয়ে গলা ফাটাতে পারবেন। তাঁর তিন কন্যাকে তাদের পোশাকে ভারি সুন্দর দেখাচ্ছে। তিনি ওদের নিয়ে বেশ গর্বিত বোধ করছেন। গতকাল সন্ধ্যেয় স্কারলেটের সঙ্গে তাঁর কথোপকথন তিনি বেমালুম ভুলে মেরে দিয়েছেন। তাঁর কেবল একটা কথাই মনে হচ্ছে যে ও খুব সুন্দরী, আর এ ব্যাপারে তাঁর কৃতিত্বও কিছু কম নয়। আয়ার্ল্যান্ডের পাহাড়ের মত সবুজ ওর চোখ দুটো। আর দেশের কথা মনে পড়তেই তাঁর বেশ ভাল লাগতে লাগল; কেমন একটা কাব্যিক মূর্ছনা আছে দেশটার নামে। এ কথা মনে হতেই তিনি বেসুরো গলায় মেয়েদের শোনাবার জন্য গেয়ে উঠলেন “পরনে সবুজ বাস”। 

মায়েরা যেমন দুষ্টু শিশুদের দিকে স্নেহময় প্রশ্রয়ে দৃষ্টিতে তাকায়, তেমনি ভাবে ওঁর দিকে তাকিয়ে স্কারলেট ভাবল, সন্ধ্যে হতে না হতেই বাপী একেবারে মদে চূর হয়ে যবেন। ফেরবার পথে অভ্যেস মত টুয়েলভ ওকস আর টারার যত বেড়া আছে, ঘোড়া নিয়ে ঝাঁপ দিয়ে আসতে থাকবেন। শুধু ভাগ্য আর ঘোড়ার শিক্ষার ওপর ভরসা করে। সেতুর ওপর দিয়ে না এসে, ঘোড়া নিয়ে নদী সাঁতরে ফিরবেন। তারপর তর্জন গর্জন করতে করতে বাড়ি ফিরবেন। পোর্ক নিয়ত একটা ল্যাম্প নিয়ে সমনের হলে অপেক্ষা করবে। উনি আসলে অফিসের সোফাতে শুইয়ে দেবে। 

যে ধূসর রঙের স্যুটটা পরে যাচ্ছেন, সেটা একেবারে কর্দমাক্ত হয়ে যাবে। তখন এলেনকে শপথ নিয়ে বোঝাবেন যে কাল রাতে তাঁর ঘোড়া সেতু থেকে নদীতে পড়ে গিয়েই এই দশা। সবাই তাঁর মিথ্যে ধরে ফেলবে। অবশ্য কেউ স্বীকার করবে না। ফলে উনি নিজেকে খুব চতুর ভাববেন। 

বাপী খুবই মিষ্টি স্বভাবের মানুষ। কিন্তু বেশ স্বার্থপর আর দায়িত্বজ্ঞানহীন, সেটা মানতেই হবে। স্কারলেট মনে মনে ভাবল। সকাল থেকেই ও এত উদ্দীপ্ত আর খুশি ছিল যে জেরাল্ডসহ সবার জন্যই ওর মনে একটা বাৎসল্য জেগে উঠল। নিজের সৌন্দর্য সম্বন্ধে ও যথেষ্ট ওয়াকিবহাল। আজকের দিন ফুরোনোর আগেই ও অ্যাশলেকে নিজের করে পেয়ে যাবে। সূর্যের তাপটা আরাম দিচ্ছে। ওঁর চোখের সামনে জর্জিয়ার বসন্ত নিজেকে মেলে ধরেছে। শীতকালে বৃষ্টিতে তৈরি খানাখন্দ জাম গাছের সবুজ ঝোপে ঢাকা পড়ে গেছে। বড় বড় গ্র্যানাইট পাথরের চাঁইগুলোর ওপর হালকা বেগুনি রঙের চেরোকির ফুলের আস্তরণে ঢেকে গেছে। নদী পেরিয়ে টিলাগুলোর মাথায় ঝলমলে সাদা ডগউড ফুলের বিন্যাস যে সবুজ বনানীর ওপর তুষারের আস্তরণ। চারদিকে সাদা থেকে গাঢ় গোলাপী রঙের সমাহার। মৃদুমন্দ বাতাস বুনো ফুলের সৌরভ বহন করে নিয়ে আসছে। 

“আজকের এই সুন্দর সকাল সারা জীবন আমার মনে গেঁথে থাকবে,” মনে মনে বলল স্কারলেট। “ কে বলতে পারে, আজ আমার বিয়ের দিনও হতে পারে।” 

দুরুদুরু বুকে ভাবতে লাগল, আজ বিকেলে এই শ্যামলিমার মধ্যে দিয়ে কিংবা সন্ধ্যেবেলা চাঁদের আলোয় ও আর অ্যাশলে ঘোড়া ছুটিয়ে জোন্সবোরোর পথে রওয়ানা হয়ে যাবে। একজন যাযককে সঙ্গে নিয়ে। পরে অবশ্য ওদের আবার অ্যাটলান্টার কোনো পুরোহিতের সামনে নতুন করে বিবাহের শপথ নিতে হবে। তবে সেটা এলেন আর জেরাল্ডের মাথাব্যথা। স্কারলেটের অন্য কোন মেয়ের প্রেমিকের সঙ্গে পালিয়ে যাওয়ার খবর পেয়ে এলেন কতটা বিরক্ত হবেন সেটা ভেবে অবশ্য ও একটু ঘাবড়ে যাচ্ছিল। যদিও ওর আনন্দ দেখে, এলেন নিশ্চয়ই ক্ষমা করবেন। আর যে জেরাল্ড কাল বারবার অ্যাশলেকে বিয়ে করার ব্যাপারে ওকে বার বার চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে সাবধান করছিলেন, উনিও নিশ্চয়ই তাঁদের পরিবারের সাথে উইল্কস পরিবারের এই কুটুম্বিতা খুব আনন্দের সঙ্গেই মেনে নেবেন। 

“ওসব বিয়ের পরে ভাবলেও চলবে,” এই ভেবে স্কারলেট মন থেকে অস্বস্তিটা সরিয়ে দিল। 

এমন সুন্দর বসন্তের সকালে, যখন চারদিক সবুজ, পাখিরা গান গাইছে, আর পাহাড়ের ওপাশ থেকে উইল্কসদের প্ল্যান্টেশনের চিমনি দেখা যাচ্ছে, তখন ভাল লাগা ছাড়া অন্য কোন অনুভুতি আসা খুব মুশকিল। 

“ওই বাড়িতেই আমি সারা জীবন থাকব। এই রকম পঞ্চাশ কিংবা তারও বেশি বসন্ত আমার জীবনে আসবে। আমি আমার ছেলেমেয়েদের আর নাতিনাতনিদের কাছে আজকের এই সুন্দর দিনটার অনেক গল্প করব।” ওর খুশি আর বাঁধ মানছিল না। এত খুশি যে জেরাল্ডের সঙ্গে “পরনে সবুজ বাস” গানে গলা মেলাল। জেরাল্ড ওকে গলা চড়িয়ে উৎসাহ দিলেন। 

“সকাল থেকেই তোর এত খুশি হবার কারণটা বুঝলাম না,” স্যুয়েলেন একটু বিরক্ত ভাবেই বলল। স্কারলেটের সবুজ ড্রেসটা পরলে ওকে অনেক বেশি ভাল লাগত এই ভাবনাটা এখনও মন থেকে সরাতে পারেনি। নিজের ড্রেস আর বনেট ধার দেবার ব্যাপারে স্কারলেট এত স্বার্থপর! আর মা সব সময়ই ওঁর হয়ে কথা বলবেন! যেন সবুজ স্যুয়েলেনের মানানসই রঙ নয়! “তুই আর আমি খুব ভাল করেই জানি – বাপীও বলছিলেন – আজ অ্যাশলের বাগদানের ব্যাপারটা ঘোষণা করা হবে। তুই তো আবার বেশ কিছুদিন ধরে ওর পেছনে লেগে আছিস!” 

“সেটা যা তুই ভাবিস,” স্কারলেট সংযত ভাবে জবাব দিল। আজ কোন ভাবেই মনের প্রসন্নতা নষ্ট হতে দেবে না। কাল সকালে মিস স্যু যে কি অবাকই না হবে! 

“স্যুসি, এটা তুই ঠিক বললি না,” ক্যারীন বলে উঠল। “স্কারলেটের নজর ব্রেন্টের দিকে।” 

স্কারলেট সবুজ চোখে ছোট বোনের দিকে তাকিয়ে একটু হাসল। ওঁর মত মিষ্টি মেয়ে সত্যি হয় না! ওরা সবাই জানে যে ত্রয়োদশী ক্যারীনের ব্রেন্টের প্রতি একটা দূর্বলতা আছে। ব্রেন্ট টার্লটন অবশ্য ওকে স্কারলেটের ছোট্ট বোন হিসেবেই দেখে। তবে এলেনের অনুপস্থিতিতে, ও’হারা পরিবারের সবাই ব্রেন্টকে নিয়ে ক্যারীনের পেছনে লাগে যতক্ষণ না ও কেঁদে ফেলে। 

“না রে বোন, ব্রেন্ট মোটেই আমার মনের মানুষ নয়,” স্কারলেট খুব উদার। “আর ব্রেন্টও আমার সম্বন্ধে সেরকম ভাবে না। ও তো তোর বড় হবার অপেক্ষায় রয়েছে।” 

আনন্দে ক্যারীনের গালদুটো গোলাপী হয়ে উঠল। মনের মধ্যে একটা বিশ্বাস অবিশ্বাসের দোলা চলতে থাকল। 

“স্কারলেট, সত্যি!” 

“তুই জানিস স্কারলেট মা চান না এত অল্প বয়সে ক্যারীন ভালবাসা, বিয়ে এসব নিয়ে কথা বলুক। আর তুই ওর মাথার মধ্যে আজেবাজে ভাবনা ঢুকিয়ে দিচ্ছিস!” 

“যা তুই মায়ের কাছে নালিশ কর! কিচ্ছু এসে যায় না,” স্কারলেট জবাব দিল। “তুই বোনকে দাবিয়ে রাখতে চাইছিস কারণ তুই জানিস আর বছরখানেকের মধ্যে ও তোর থেকে অনেক বেশি সুন্দর দেখতে হয়ে যাবে।” 

“এই মেয়েরা, তোমরা ভদ্রভাবে কথাবার্তা বল, নাহলে তোমাদের পিঠে আমাকে দু’চার ঘা লাগাতে হবে,” জেরাল্ড সাবধান করলেন। “একটু চুপ কর! চাকার শব্দ আসছে না? টার্লটন কিংবা ফোনটেনরা হবেন।” 

মিমোজ়ার ঘন অরন্যে ঘেরা পাহাড়ি রাস্তা আর ফেয়ারহিলের পথ যেখানে এসে মিশেছে, সেদিকে এগোতেই ওঁরা ঘোড়ার খুরের আর গাড়ির চাকার শব্দ শুনতে পেলেন। গাছের পাতার আড়াল থেকে মেয়েদের হাসি আর কথাবার্তার আওয়াজ কানে এল। জেরাল্ড আগে আগে চলছিলেন। পথদুটো যেখানে এসে মিশেছে, টোবিকে বললেন গাড়ি থামাতে। 

“টার্লটনদের মহিলারা,” জেরাল্ড মেয়েদের জানালেন। তাঁর চোখমুখ উদ্ভাসিত। এলেনের পরে, এই কাউন্টিতে অন্যান্য মহিলাদের চেয়ে মিসেজ় টার্লটনকেই তিনি সবথেকে বেশি পছন্দ করতেন। “আর লাগাম মিসেজ় টার্লটনের হাতেই! ইনি এমন একজন অসামান্যা মহিলা যিনি কুসুমের মত কোমল কিন্তু বজ্রের মত কঠিন হাত দিয়ে ঘোড়াদের ভাল বাগ মানাতে পারেন! দুঃখের কথা হল তোমাদের কারও হাতই ওরকম নয়।” মেয়েদের দিকে করুণা মেশানো স্নেহের চোখে তাকিয়ে বললেন। “ক্যারীন তো ঘোড়া দেখলেই ভয় পায়; লাগাম ধরলে স্যু’র হাতে ফোসকা পড়ে যায়, আর স্কারলেট তোমার --” 

“তবুও আমি কোনদিনই ঘোড়া থেকে পড়ে যাই নি,” স্কারলেট রেগে গিয়ে বলল। “আর প্রত্যেকবারই শিকারে গিয়ে মিসেজ় টার্লটন ঘোড়া থেকে ছিটকে পড়ে যান!” 

“আর পুরুষ মানুষদের মত কলারের হাড় ভেঙে ফেলেন, সেটা বল!” জেরাল্ড বললেন। “অজ্ঞানও হয়ে যান না বা হইচইও করেন না। এখন এ সব কথা থাক, এসে পড়লেন মনে হয়।” 

জেরাল্ড পাদানীর ওপর দাঁড়িয়ে পড়ে এক ঝটকায় টুপিটা খুলে ফেললেন। টার্লটনদের গাড়ি দেখা গেল। রঙচঙে পোশাকে মেয়েরা গাড়ি ভরে রয়েছে। জেরাল্ডের অনুমান ঠিক। লাগাম মিসেজ় টার্লটনের হাতে। টার্লটনদের চার মেয়ে, তাদের ম্যামি, বল-ড্যান্সের ড্রেস ভর্তি লম্বা লম্বা কার্ডবোর্ডের বাক্স, সব মিলিয়ে এত ভর্তি, যে কোচোয়ানের বসবার জায়গা হত না। তাছাড়া নিজের ইচ্ছেতে বিয়্যাট্রিস টার্লটন কখনওই ঘোড়ার রাশ – কালো কিংবা সাদা – কারও হাতে ছাড়তেন না। তিনি কৃশ হলেও তাঁর দেহ সুগঠিত। তাঁর গাত্রবর্ণ অত্যন্ত শুভ্র আর তাঁর চুল ছিল টকটকে লাল। মনে হত শরীরের সমস্ত রঙ যেন তাঁর চুলই দখল করে নিয়েছিল। খুব ভাল স্বাস্থ্য আর অফুরন্ত শক্তির আধার ছিলেন তিনি। আটটি সন্তানের জন্ম দিয়েছিলেন। প্রত্যেকেই প্রাণোচ্ছল আর তাঁরই মত লাল চুলের অধিকারী। এদের প্রত্যেকের প্রতিই ছিল তাঁর স্নেহমিশ্রিত অযত্ন অথচ কঠিন শৃঙ্খলার শাসন। ঠিক যেমন ছিল তাঁর অশ্বশাবকদের প্রতি। “শাসন কর, কিন্তু ওদের মেরুদণ্ড ভেঙে দিও না” এই ছিল তাঁর নীতি। 

ভদ্রমহিলা ঘোড়া ভালবাসতেন আর সারাক্ষণ ঘোড়ার ব্যাপারে কথা বলতে ভালবাসতেন। তিনি শুধু ওদের ব্যাপারে ভাল বুঝতেনই না, কাউন্টির পুরুষদের তুলনায় ওদের অনেক ভাল সামলাতে পারতেন। টিলার ওপরে বাড়িতে ওঁর আট ছেলেমেয়ে যেমন এলোমেলো ঘুরে বেড়াত, ঠিক তেমনি তাঁর অশ্বশাবকরাও আস্তাবল থেকে বেরিয়ে লনে দৌড়াদৌড়ি করে। যখন তিনি প্ল্যান্টেশন পরিদর্শনে যান তখন তাঁর ছেলেমেয়েরা, অশ্বশাবকেরা আর বেশ কিছু শিকারি কুকুর তাঁর সঙ্গী হয়। তিনি মনে করতেন তাঁর ঘোড়াদের, বিশেষ করে নেলী নামে ঘোটকী, মানুষের মতই বুদ্ধি ধরে। গৃহস্থালীর কাজে ব্যস্ত থাকার জন্য যদি কোনদিন সে ঘোটকীকে নিয়ে ঘুরতে বেরোনোর সময় পেরিয়ে যেত, তখন তিনি কোনো নীগ্রো শিশুকে এক বাটি চিনি দিয়ে বলতেন, “যা, নেলীকে এক মুঠো চিনি খাইয়ে দে আর বলে দিস কিছুক্ষণের মধ্যেই ওকে নিয়ে বেরোব।” 

ঘোড়ায় চড়তে হোক বা না হোক, দু’একটা উপলক্ষ ছাড়া, তিনি অশ্বারোহীর পোশাকেই চলাফেরা করতে ভালবাসতেন। যদি হঠাৎ ঘোড়ায় চড়ার দরকার পড়ে? রোদ বৃষ্টি যাই থাকুক না কেন, প্রতিদিন সকালে নেলীকে জিন চড়িয়ে বাড়ির সামনে ঘোরানো হত। যাতে মিসেজ় টার্লটন গৃহকাজ থেকে ঘন্টাখানেকের জন্য ফুরসৎ পেতে পারেন। তবে ফেয়ারহিল পরিচালনা করা বেশ শক্ত কাজ। অনেকদিনই নেলী এরকম পায়চারি করতে থাকত আর বিয়েট্রিস টার্লটন তাঁর অশ্বারোহীর পোশাক অন্যমনষ্কভাবে বাহুর ওপর তুলে নিয়ে কাজে ব্যাপৃত থাকতেন। সকলে স্কার্টের তলায় তাঁর চকচকে বুটজোড়া দেখতে পেত। 

আজ একটা ফ্যাকাশে কালো সিল্কের ড্রেস পরেছেন পুরোনো বেষ্টনী দিয়ে পায়ের দিকটা আঁটসাঁট করে বাঁধা। তবুও তাঁকে অশ্বারোহীর পোশাক পরে আছেন বলেই মনে হচ্ছে। কারণ ড্রেসটা প্রায় সেরকম ভাবেই সেলাই করা হয়েছে। যে কালো টুপিটা পরেছেন তার ওপরে একটা কালো পালক। যেন তাঁর পুরোনো কোন শিকারে যাবার টুপির প্রতিরূপ। 

জেরাল্ডকে দেখতে পেয়ে তিনি চাবুকের ইশারায় লাল ঘোড়াদুটোকে দাঁড় করালেন। গাড়ির পেছনে থেকে তাঁর চার মেয়ে হই হই করে ওঁদের অভ্যর্থনা করল। যেন টার্লটনদের সাথে ও’হারাদের কতদিন পরে মোলাকাত হল! মাত্র দু’দিন আগেই পরষ্পরের সাথে পরষ্পরের দেখা হয়েছে। আসলে ওরা ছিল অত্যন্ত মিশুকে, বিশেষ করে ও’হারার মেয়েদের সাথে ওদের খুব ভাব। মানে স্যুয়েলেন আর ক্যারীনের সাথে। স্কারলেটের সাথে মাথামোটা ক্যাথলীন ক্যালভার্ট ছাড়া কউন্টির আর কোন মেয়েরই তেমন সদ্ভাব ছিল না। 

গ্রীষ্মকালে, প্রায় প্রতি সপ্তাহেই, কাউন্টিতে কোথাও না কোথাও বারবেকিউ আর বলডান্সের আসর লেগেই থাকত। লালচুলো টার্লটনরা সবাই ছিল খুব হুল্লোড় আর ফূর্তিবাজ। প্রতিটি বারবেকিউতেই ওদের হই হই দেখে মনে হত যেন জীবনে এই প্রথম ওরা কোন বারবেকিউতে এল। গোলগাল মিষ্টি চার বোন ঘেঁষাঘেঁষি করে বসে আছে। ওদের পোশাক হাওয়ায় পতপত করে উড়ে একে অন্যের ওপর পড়ছে। ঘাসে বোনা রোদটুপিগুলোর ওপর দিয়ে ছোট ছোট ছাতাগুলো গায়ে গায়ে ধাক্কা খাচ্ছে। টুপিগুলোর তলা থেকে এক একজনের মাথার এক একরকম লালচুল দেখা যাচ্ছে। হেটির গাঢ় লাল, ক্যামিলার স্ট্রবেরি লাল, র‍্যান্ডার তামাটে লাল, আর ছোট্ট বেটসির গাজরের মত লাল। 

“কি সুন্দর লাগছে আপনার মেয়েদের,” ওঁদের গাড়ির পাশে ঘোড়া দাঁড় করিয়ে জেরাল্ড বললেন। “কালে কালে ওরা আপনাকেও ছাড়িয়ে যাবে!” 

মিসেজ় টার্লটন ঈষৎ কটাক্ষ করে মৃদু হেসে প্রশংসা উপভোগ করলেন। মেয়েরা চেঁচিয়ে উঠল, “মা আবার তুমি ওরকম চোখ বাঁকিয়ে তাকাচ্ছ? বাপীর কাছে নালিশ করে দেব বলে দিলাম!” “কি জানেন মিস্টার ও’হারা, মা আপনার মত সৌম্যদর্শন মানুষ কাছে থাকলে আমাদের কোন সুযোগই দেন না!” 

এই সব হাস্য পরিহাসে, অন্যদের সাথে স্কারলেটও হেসে উঠল। আবার মায়ের সংগে মেয়েদের এই সহজ সম্পর্কে খানিক আশ্চর্যও হল। মা যেন ওদেরই সমবয়সী! মায়ের সঙ্গে এই ধরনের কথাবার্তা ও ত কল্পনাতেই আনতে পারে না! অথচ টার্লটনদের মেয়েদের সঙ্গে তাদের মায়ের সম্পর্ক কত মধুর! মায়ের পেছনে লাগার জন্য, বা মায়ের সমালোচনা করার জন্য, বা মা কে বকার জন্য ওরা যা কিছু বলে তার মধ্যে একটা স্নেহমিশ্রিত প্রশ্রয়ও লুকিয়ে আছে। তা বলে এই নয়, স্কারলেট তাড়াতাড়ি নিজের মনে বলল, যে ও এলেনের পরিবর্তে মিসেজ় টার্লটনকেই মা হিসেবে চায়, কিন্তু মাঝে মাঝে মায়ের সঙ্গে এই রকম হই চই করতে পারলে মন্দ হত না। অবশ্য এলেনের সম্পর্কে এরকম ভাবনাটাই তাঁকে অসম্মান করা। স্কারলেট বেশ লজ্জাই পেল। ও ভাল করেই জানে ওঁর মেয়েরা এর জন্য কোন অপরাধ বোধ করে না। অথচ ওর মনে কেন যে এই ধন্দ কিছুতেই বুঝতে পারে না। 

তীক্ষ্ণ বুদ্ধি থাকলেও স্কারলেটের মধ্যে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করবার ক্ষমতার অভাব ছিল। তবুও অবচেতনভাবে ওর মনে হল, যে টার্লটনরা বাচ্চা ঘোড়ার মত অশান্ত আর খরগোশের মত চঞ্চল। বাবা আর মা দু’দিক থেকেই ওরা জর্জিয়া – বলতে গেলে উত্তর জর্জিয়ারই আদি বাসিন্দা। সেই জন্যই ওদের মধ্যে একটা স্বভাবসিদ্ধ একরোখা ভাব আছে আর আছে একটা প্রবল আত্মবিশ্বাস। এই মনোভাব উইল্কসদের মধ্যেও আছে, তবে ওদের চিন্তা ভাবনার পরিসর সম্পূর্ণ ভিন্ন। চিন্তা ভাবনার বৈষম্য থাকলেও কোন দ্বন্দ্ব নেই। অথচ মৃদুভাষী সম্ভ্রান্ত ফরাসি মনোভাবাপন্ন মা আর ঘোর বিষয়ী মনোভাবাপন্ন আইরীশ বাবার মেয়ে স্কারলেটের মনে এত সংশয়, এত দ্বিধা কেন! স্কারলেট মা কে যেমন দেবীর মত ভক্তি করতে চায়, তেমনই তাঁর সঙ্গে আহ্লাদিও করতে চায়। ওথচ দুটোই একসাথে সম্ভব বলে মনে করতে পারে না। আর এই সংশয় থেকেই ও পুরুষ মানুষের কাছে নিজেকে একজন কমনীয়, লজ্জাশীলা নারী হিসেবে তুলে ধরতে চায় অথচ মনে মনে তাদের কাছে থেকে দু’একটা চুম্বনেরও প্রত্যাশা করে। 

“এলেন সকাল সকাল আবার কোথায় গেল?” মিসেজ় টার্লটন জিজ্ঞেস করলেন। 

“আমাদের ওভারসিয়ারকে জবাব দেওয়া হল। তাই ওর কাছে হিসেবপত্র বুঝে নিতে হচ্ছে। আর তিনি কোথায়? আর ছেলেরা?” 

“আরে, ওরা তো সেই সাত সকালেই টুয়েলভ ওকসে চলে গেছে। পানীয়ের মিশ্রণ ঠিক মত হল কি না টেস্ট করার জন্য! যেন এখন থেকে কাল সকাল পর্যন্ত সেটা করবার আর কোন সুযোগ আসবে না! আমি তো মিস্টার উইল্কসকে অনুরোধ করব কাল সকাল পর্যন্ত আটকে রাখতে। দরকার হলে আস্তাবলেই শুতে দিতে! পাঁচ পাঁচটা মাতাল লোক সামলানো খুব মুশকিল! তিনটে অব্দি তাও চলে --” 

জেরাল্ড লক্ষ্য করলেন মেয়েরা মুখ টিপে হাসছে। উইল্কসদের আগেরবারের বারবেকিউ থেকে কি অবস্থায় বাড়ি ফিরেছেলিনে সেটা মনে পড়ে গেল। তাড়াতাড়ি বাধা দিয়ে প্রসঙ্গ পাল্টাতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। 

“আপনি আজ ঘোড়ায় চড়ে এলেন না, মিসেজ় টার্লটন? নেলীকে ছাড়া আপনাকে ভাবাই যায় না! আপনি হলেন যাকে বলে একজন স্টেন্টর১!” [১ স্টেন্টর – গ্রীক পুরাণে ইলিয়াডে বর্ণিত একজন দূত (সংবাদ বাহক) যার কণ্ঠস্বর ছিল বজ্রের মত।] 

“কি বললেন? আমি স্টেন্টর!”, মিসেজ় টার্লটন জেরাল্ডের বাচনভঙ্গী নকল করে চেঁচিয়ে উঠলেন। “মানে সেই যার কাংস্যনিন্দিত গলা! আপনি নিশ্চয়ই সেন্টর২ বলতে চেয়েছিলেন?” [২ সেন্টর – গ্রীক পুরাণে বর্ণিত কল্পিত প্রাণী যার ঘোড়ার মত শরীর আর মানুষের মত মুখ।] 

“আরে স্টেন্টরই হোক, কি সেন্টর!” ভুল বুঝতে পেরেও একটুও ঘাবড়ে না গিয়ে জেরাল্ড প্রত্যুত্তর দিলেন। “যখন শিকারি কুকুরগুলোকে উৎসাহ দেন তখন আপনার গলা থেকে বজ্রনির্ঘোষ বের হয়।” 

“ঠিক হয়েছে, মা”, বেটি বলল। “তোমাকে কতবার বলেছি যে শেয়াল দেখলেই তুমি তারস্বরে চেঁচাও।” 

“ম্যামি তোমার কান পরিষ্কার করার সময় তুমি যেভাবে চেঁচাও, তত জোরে নয়!” মিসেজ় টার্লটন জবাব দিলেন। “আর তোমার মাত্র ষোল বছর বয়স! ও হ্যা আজ নেলীর বাচ্চা হয়েছে, তাই আজ ওকে নিয়ে বেরোতে পারি নি।” 

“তাই বুঝি!” জেরাল্ডের চোখ খুশিতে চকচক করে উঠল। তাঁর আইরীশ রক্তে ঘোড়া নিয়ে আসক্তি প্রবল। মিসেজ় টার্লটনের পাশাপাশি মা কে রেখে স্কারলেট আবার ধাক্কা খেল। মায়ের কাছে ঘোড়া কিংবা গরুর বাচ্চা হয় না। মূর্গিরাও বলতে গেলে ডিম পাড়ে না। এলেন এই সব ব্যাপারে কথা বলা পছন্দই করেন না। মিসেজ় টার্লটনের কাছে এসব নিয়ে আলোচনা করা কোন ব্যাপারই নয়! 

“নিশ্চয়ই মাদা বাচ্চা!” 

“না না, সুন্দর মদ্দা বাচ্চা। লম্বা লম্বা ঠ্যাং। একদিন এসে দেখে যাবেন। একেবারে সত্যিকারের টার্লটন ঘোড়া। আমার বেটির কোঁকড়া চুলের মত লাল রঙের।” 

“আর দেখতেও একেবারে বেটির মত,” বলে উঠল ক্যামিলা। তারপর ড্রেস, টুপি, স্কার্টের ভিড়ে হেসে গড়াগড়ি খেয়ে লুটিয়ে পড়ল। বেটি চটে গিয়ে ওকে চিমটি কাটতে শুরু করল। 

“মেয়েরা তো সকাল থেকে উৎসাহে ডগমগ করছে,” মিসেজ় টার্লটন বললেন। “যখন থেকে অ্যাশলে আর ওর ওই অ্যাটলান্টার পিসতুতো বোনের ব্যাপারটা জানতে পারলাম – কি যেন নাম মেয়েটার? – মেলানি? – ঈশ্বর ওর মঙ্গল করুন – কি মিষ্টি মেয়ে! – তখন থেকেই আমার মেয়েরা ওখানে যাবার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। তবে ওর নাম আর মুখটা ঠিক মনে করতে পারছি না। আমাদের কুকি আবার উইল্কসদের খানসামার বউ। আজ সন্ধ্যেবেলা যে ওদের দু’জনের বাগদানের ঘোষণা হবে ওর কাছেই জানা গেছে। কুকি আজ সকালে আমাদের বলল। শুনে মেয়েদের উত্তেজনা দেখে কে! আমি তো এত উত্তেজনার কারণ খুঁজে পাচ্ছি না! এ তো জানা কথাই, যে অ্যাশলে যদি ম্যাকনের ওদের আত্মীয় বার পরিবারের কোন মেয়েকে বিয়ে না করে তাহলে একেই বিয়ে করবে! যেমন হানি উইল্কস মেলানির ভাই চার্লসকে বিয়ে করবে। আপনিই বলুন, মিস্টার ও’হারা উইল্কসরা নিজেদের পরিবারের বাইরে বিয়ে করলে কি মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে? ধরুন যদি --” 

আরও যেসব কথা হেসে হেসে উনি বলে যাচ্ছিলেন সেগুলো স্কারলেটের কানে আর ঢুকছিল না। এক মুহুর্তের জন্য ওর মনে হল সূর্য যেন মেঘের আড়ালে লুকিয়ে পড়ে সারা পৃথিবী ছায়ায় ঢেকে গেছে, আর সব কিছু থেকে রঙ শুষে নিয়েছে। শ্যামল প্রকৃতি হঠাৎ যেন ফিকে হয়ে গেছে। সাদা সাদা ডগঊডের ফুলগুলো মলিন হয়ে গেছে। একটু আগের দেখা রঙীন ফুলের সমাহার ফ্যাকাসে আর বিবর্ণ লাগছে। স্কারলেট গাড়ির পর্দা ধরে নিজেকে সামলে নিল। মাথার ওপর ছাতাটা নড়ে গেল। অ্যাশলের বাগদানের কথাটা জানা এক রকম ব্যাপার। কিন্তু যখন সেটা নিয়ে সবাই ঘরোয়া আলোচনা ফেঁদে বসে তখন অসহ্য হয়ে যায়। আস্তে আস্তে ও নিজেকে সামলে নিল। আকাশের আড়াল থেকে সূর্য বেরিয়ে এল। আবার চারদিক ঝকঝকে হয়ে উঠল। অ্যাশলে ওকেই ভালবাসে, সেটা নিশ্চিত। যখন সন্ধ্যেবেলা বাগদানের ঘোষণা করা হবে না, তখন মিসেজ় টার্লটনের মুখের অবস্থা কি হবে, ভেবে ও মনে মনে একটু হেসে ফেলল। কি অবাকই না হবেন যখন ওদের পালিয়ে যাবার খবর পাবেন! সবাইকে বলে বেড়াবেন, ‘দেখেছো কি ধড়িবাজ মেয়ে ওই স্কারলেটটা! মেলানি সম্বন্ধে যা যা বললাম, চুপটি করে সব শুনে গেল-- আর এদিকে অ্যাশলে আর ও--’ নিজের মনে হেসে ওর অজান্তেই গালে টোল পড়ল। বেটি সবই শুনছিল আর লক্ষ্য করছিল। সব দেখে শুনে বেশ ধাঁধায় পড়ে গেল। 

“সে আপনি যাই বলুন না কেন, মিস্টার ও’হারা,” মিসেজ় টার্লটন বেশ জোরের সঙ্গে বলে চলেছেন। “এই যে নিজেদের মধ্যে বিয়ে হওয়ার ব্যাপারটাই খুব বাজে! অ্যাশলের সাথে মেলানির বিয়ের ব্যাপারটাই মেনে নিতে পারছি না! তার ওপর আবার ইন্ডিয়া বিয়ে করবে ওই ফ্যাকাসে দেখতে চার্লস হ্যামিলটনকে --” 

“চার্লিকে বিয়ে না করলে ইন্ডিয়া আর কোন বর পাকড়াও করতে পারবে না,” র‍্যান্ডি নিষ্ঠুরভাবে বলে উঠল। নিজের জনপ্রিয়তার নিয়ে ওর খুব অহঙ্কার। “ওই ছেলেটাকে ছাড়া আর কাউকে ধরতেও পারে নি এখনও! ছেলেটা অবশ্য ওকে খুব একটা পাত্তাটাত্তাও দেয় না। তোর নিশ্চয়ই মনে আছে স্কারলেট, গত ক্রিসমাসের সময় ও কিভাবে তোর পেছন ছাড়ছিলই না!” 

“বোকার মত কথা বলিস না,” ওর মা বললেন। “পিসতুতো জ্যাঠতুতো ভাই বোনের মধ্যে বিয়ে হওয়া একেবারেই ঠিক নয়। এমনকি পরবর্তি প্রজন্মের হলেও। এতে বংশ দূর্বল হয়ে পড়ে। ঘোড়াদের মত ন্য় ব্যাপারটা। কুলুজি ঠিক রাখলে ভাইয়ের সাথে বোনের কিংবা বাবার সাথে মেয়ের সঙ্গেও ভাল ঘোড়ার বাচ্চা পয়দা করা যায়। তবে মানুষের ক্ষেত্রে এটা খাটে না। হয়ত বংশের আভিজাত্য অক্ষুণ্ণ থাকে, কিন্তু ক্রমেই দূর্বল হয়ে পড়ে।” 

“না, ম্যাডাম, আমি একমত হতে পারলাম না। আপনিই বলুন আমাদের তল্লাটে উইল্কসদের থেকে ভাল পরিবার আর একটাও আছে কি? আর সেই ব্রায়ান বোরু যখন ছোট ছিল, তখন থেকেই ওরা নিজেদের মধ্যে বিয়ে করা শুরু করেছে।” 

“এটা বন্ধ করার সময় হয়ে গেছে। এর কুফলটা তো দেখাই যাচ্ছে। না অ্যাশলের ব্যাপারে বলতে চাই না। খুবই সুদর্শণ আর বলিষ্ঠ। তবুও কি ___ সে যাক। উইল্কসদের মেয়ে দুটোকে দেখুন – কি ফ্যাকাশে চেহারা। আর ওই মেলানি? কঞ্চিবাঁশের মত লিকপিকে – ফুঁ দিলেই উড়ে যাবে! কিছুতেই উৎসাহ নেই। নিজের মতামতও নেই। সবসময় “হ্যা ম্যাডাম”, “না ম্যাডাম”। মুখ দিয়ে আর কিছু রা’ই কাড়বে না! বুঝতে পারছেন তো কি বলতে চাইছি? নতুন রক্ত দরকার। আমার লাল চুলের মেয়েদের কিংবা আপনার স্কারলেটের মত মেয়ের। আমাকে ভুল বুঝবেন না। মানুষ হিসেবে উইল্কসদের তুলনা হয় না। আমিও ওঁদের পছন্দ করি, সেটাও আপনি জানেন। তবে সত্যি কথাটা খোলাখুলি বলা ভাল। সাধারণ পরিস্থিতিতে ওঁদের অসুবিধে হবে না। কিন্তু সঙ্কটে পড়লে? আমাকে একটা বড় ঘোড়া দিন। বর্ষার দিন হোক কি খটখটে শুকনো দিনে, আমার তাকে নিয়ে কোন অসুবিধে হবে না। নিজেদের মধ্যে বিয়ে ওঁদের অন্যদের থেকে কেমন যেন আলাদা করে দিয়েছে। সারাক্ষণ বই নিয়ে বসে থাকবেন, বা পিয়ানোয় টুং টাং করবেন। আমি বাজি ধরে বলতে পারি, অ্যাশলে শিকার করার থেকে বই পড়তে বেশি পছন্দ করবে। হ্যা, মিস্টার ও’হারা আমি সত্যিই বিশ্বাস করি! আর ওঁদের হাড়ের গঠনও লক্ষ্য করে দেখবেন – খুবই সরু। ওঁদের প্রয়োজন স্বাস্থ্যবান বাবা আর স্বাস্থ্যবতী মা _____” 

“উঁ – হু ---উঁ --- উঁ --- ম,” সহসা এলেনের কথা মনে পড়তেই, জেরাল্ড বেশ অস্বস্তি বোধ করলেন। যে আলোচনা উনি এত উপভোগ করছেন, এলেন সেটা মোটেই পছন্দ করতেন না। যদি জানতে পারেন এসব আলোচনা মেয়েদের সামনে খোলাখুলি চলেছে তাহলে হয়ত উনি অজ্ঞান হয়ে যাবেন। কিন্তু নিজের প্রিয় বিষয় – সেটা ঘোড়া নিয়েই হোক কি মানুষ নিয়ে – একবার কথা বলতে শুরু করলে, মিসেজ় টার্লটনের আর আর পাঁচজনে কি ভাবছে না ভাবছে তার পরোয়াই করেন না। 

“আমি যা বলছি, ভেবেচিন্তেই বলছি। আমার কয়েকজন তুতো ভাইবোন ছিল। তারা নিজেদের মধ্যে বিয়ে করেছিল। সত্যি বলছি, তাদের ছেলেমেয়েদের কোলাব্যাঙের মত ড্যাবড্যাবে চোখ। কি দুঃখের কথা! আমার বেলায় তো আমিএকদম বেঁকে বসেছিলাম। বলেছিলাম, “দেখ মা, আমি পারব না। তারপর আমার ছেলেমেয়েরা কুঁদো হবে না রুগ্ন হবে কে জানে! মা তো একবারে অজ্ঞান, তবে ঠাকুমা আমাকে সাথ দিয়েছিলেন। তিনিও ঘোড়াদের প্রজননের ব্যাপারে অনেক কিছু জানতেন কিনা। বলেছিলেন যে আমি একদম ঠিক কথা বলছি। মিস্টার টার্লটনের সঙ্গে পালিয়ে যেতে সাহায্যও করেছিলেন! দেখুন আমার ছেলেমেয়েদের! স্বাস্থ্যবান, লম্বাচওড়া; কেউই রুগ্ন, হাড়জিরজিরে নয়। অবশ্য বয়েড মাত্র পাঁচ ফুট দশ। আর উইল্কসদের দিকে তাকান _____” 

“না – মানে – বলছিলাম কি ম্যাডাম,” মেয়েদের দিকে চোখ পড়তেই সন্ত্রস্ত হয়ে জেরাল্ড মাঝপথে কেটে বলে উঠলেন। ক্যারীন হাঁ করে কথাগুলো গিলছে, আর স্যুয়েলেনের চোখেমুখে অপার কৌতুহল। এলেনকে গিয়ে যদি আপত্তিকর কিছু জিজ্ঞেস করে বসে তাহলে! এরপর কি আর তাঁর সঙ্গে মেয়েদের পাঠাতে ভরসা পাবেন? স্কারলেট অবশ্য এসব কথায় কানই দেয় নি। তাঁর আদরের পুস সত্যিকারের লেডির মত নিজস্ব কোন ভাবনায় মশগুল হয়ে আছে। 

বেটি টার্লটন তাঁর মুখরক্ষা করল। 

“কি হল মা! এবা চল!” অস্থির হয়ে চেঁচিয়ে উঠল। “এই রোদ আর ভাল লাগছে না। ঘাড়ে ঘামাচি বেরিয়ে গেল!” 

“এক মিনিট, ম্যাডাম,” জেরাল্ড বললেন। “আমাদের ট্রুপে আপনার ঘোড়াদের বিক্রি করবার ব্যাপারে কিছু ভেবেছেন কি? যুদ্ধ তো যে কোন দিন বেধে যেতে পারে। ছেলেরা ব্যাপারটাকে মিটিয়ে নিতে চাইছিল। এটা ক্লেটন কাউন্টির ট্রুপ। সেজন্য ক্লেটন কাউন্টির ঘোড়াই ওদের দিতে চাই আমরা। অথচ আপনি একগুঁয়ের মত আপনার সেরা ঘোড়াগুলো হাতছাড়া করতে চাইছেন না।” 

“যুদ্ধ হয়ত হবেই না,” মিসেজ় টার্লটন তাল মিলিয়ে জবাব দিলেন। অ্যাশলেদের অদ্ভুত বিবাহরীতি থেকে তাঁর মন সম্পূর্ণ অন্য খাতে বইতে শুরু করেছে। 

“সে কথা অমন নিশ্চিত করে বলা যায় না, ম্যাডাম ____” 

“মা!”, বেটি আবার অসহিষ্ণু। “তুমি আর মিস্টার ও’হারা একথাগুলো তো টুয়েলভ ওকসে পৌছেও বলতে পার। এখন থাক না!” 

“ঠিক আছে, মিস বেটি,” জেরাল্ড বললেন। “ঘড়ি ধরে দেখ, তোমার মা’কে মিনিট খানেকের বেশি আটকাবো না। এই তো আমরা টুয়েলভ ওকসে পৌঁছে গেলাম বলে। কিন্তু ওখানে সবাই – বড় ছোট সকলেই – ঘোড়ার ব্যাপারে জানতে চাইবেন। বলতে আমার খারাপই লাগছে – তোমাদের মা এমন মার্জিত এবং সুন্দরী লেডি হওয়া সত্ত্বেও নিজের ঘোড়ার ব্যাপারে একটু কিপটে। আপনার দেশাত্ববোধের দোহাই, মিসেজ় টার্লটন! আমাদের কনফেডারেসি নিয়ে কি আপনার একটুও মাথাব্যাথা নেই?” 

“মা!” ছোট্ট বেটসি কেঁদে উঠল। “র‍্যান্ডা আমার জামার ওপর বসে পড়েছে। আমার ড্রেস কুঁচকে যাচ্ছে!" 

“ঠিক আছে বেটসি, র‍্যান্ডাকে তুমি ঠেলে সরিয়ে দাও, আর চুপ কর! আর মিস্টার ও’হারা অ্যামার কথা শুনুন,” চোখ পাকিয়ে জেরাল্ডকে বললেন। “কনফেডারেসি নিয়ে আমাকে খোঁটা দেবেন না। আমি আপনাদের থেকে কনফেডারেসিকে কোন অংশে কম ভালবাসি না। আমার চারজন ছেলে ট্রুপে আছে। আপনার একজনও নয়! আমার ছেলেরা নিজেদের সামলাতে পারে, কিন্তু আমার ঘোড়ারা নয়! যদি জানতাম যে সে ঘোড়াগুলো ভদ্রলোকেরা চড়বেন, যাঁরা ঘোড়ায় চড়তে জানেন, তাহলে আমি বিক্রি কেন, এমনিই দিয়ে দিতাম। কিন্তু চড়বে তো সব ছোটলোকের দল, যারা খচ্চরে চড়ে থাকে, যারা জানেই না ঘোড়ায় জিন কি করে চড়াতে হয়। সেটাতেই আমার আপত্তি! সেই বুদ্ধুগুলো আমার সুন্দর ঘোড়াগুলোর অযত্ন করবে, সে আমি সইতে পারব না। ভাবলেই আমার গায়ে কাঁটা দিচ্ছে। আমার ঘোড়া নিতে চাওয়ার জন্য ধন্যবাদ। কিন্তু না মিস্টার ও’হারা, আপনারা বরং অ্যাটলান্টা থেকে অন্য ঘোড়া ওই ছোটলোকদের জন্য কিনে নিন। ওরা বুঝতেও পারবে না!” 

“মা আমরা কি যাব না?” এবারে ক্যামিলা অস্থির হয়ে পড়ল। “তুমি ভাল করেই জান যে শেষমেশ তুমি তোমার প্রিয় ঘোড়াগুলো দেবে! বাপী আর ভাইরা যখন তোমাকে বোঝাতে থাকবেন যে ঘোড়াগুলো কনফেডারেসির দরকার, তখন তুমি কাঁদতে কাঁদতে হলেও ঘোড়াগুলো দিয়ে দেবে!” 

মিসেজ় টার্লটন মৃদু হেসে চাবুক তুললেন। 

“এরকম কিছুই আমি করব না,” হালকা করে ঘোড়াদের স্পর্শ করে বললেন। ওরা আবার ছুটতে লাগল। 

“একজন সত্যিকারের বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন মহিলা,” মাথায় টুপি পরে নিজেদের গাড়ির পাশ নিয়ে বললেন। “চালাও টোবি। আমরা ওঁকে ঠিক রাজি করিয়ে ফেলব। তবে উনি একদম ঠিক কথা বলেছেন। ভদ্রলোক না হলে তার ঘোড়ায় চড়ার অধিকারই হয় না। ওদের সঠিক জায়গা হল পদাতিক বাহিনীতে। দুঃখের কথা হল, পুরো ট্রুপ তৈরি করার জন্য এই কাউন্টির প্ল্যান্টারদের যথেষ্ট ছেলে নেই। কি বলিস পুস?” 

“বাপী, তুমি একটু পেছনে পেছনে চল, আর নয়ত আগে আগে। তোমার ঘোড়ার পায়ে পায়ে এত ধুলো উড়ছে – আমাদের দম বন্ধ হয়ে আসছে,” স্কারলেট বলল। কথাবার্তা বলতে ওর একদম ভাল লাগছিল না। এতে ওর নিজের ভাবনার তাল বার বার কেটে যাচ্ছিল। টুয়েলভ ওকসে পৌঁছানোর আগেই যেন ওর মুখ আর মন দুশ্চিন্তামুক্ত দেখায়। জেরাল্ড বাধ্য ছেলের মত লাল ধুলোর ঝড় উঠিয়ে টার্লটনদের গাড়ির দিকে এগিয়ে গেলেন যাতে উনি প্রাণভরে ঘোড়া নিয়ে আলোচনা চালিয়ে নিয়ে যেতে পারেন।
চলবে>>



অনুবাদক
উৎপল দাশগুপ্ত
ফটোগ্রাফার। অনুবাদক। 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন