বৃহস্পতিবার, ২৪ মে, ২০১৮

জলের ওপর : গী দ্য মোপাসঁ


মূল ফরাসি থেকে বাংলায় অনুবাদ : যশোধরা রায়চৌধুরী 


(গি দ্য মোপাসঁ (৫ আগস্ট, ১৮৫০ - ৬ জুলাই, ১৮৯৩) একজন বিখ্যাত ফরাসি কবি গল্পকার ও ঔপন্যাসিক। জন্ম ১৮৫০ সালে ফ্রান্সের নরম্যান্ডিতে। গুস্তাভ ফ্লবেয়ার, এমিল জোলা, আলফস দোঁদে-দের উত্তরসূরী হিসেবে ১৮৮০ সালে একটি কাব্যগ্রন্থ( De Ver) প্রকাশের মধ্যে দিয়ে তাঁর সাহিত্যজগতে পদার্পণ। মাত্র এক দশক সাহিত্যচর্চার সুযোগ পান মোপাসঁ, এই সংক্ষিপ্ত সময়ে তিনি তিনশ' ছোট গল্প, ছয়টি উপন্যাস, বেশ কিছু কবিতা এবং তিনটি ভ্রমণকাহিনী লেখেন।)

গত গ্রীষ্মে আমি গাঁয়ের কাছে, স্যেন্‌ নদীর ধারে, একটা ছোট বাড়ি ভাড়া নিয়েছিলাম, পারী থেকে সে বেশ কিছু মাইল দূরে। প্রতিদিন রাতে সেখানেই শুতে যেতাম। কয়েকদিনের মাথায়, সেখানে আমার এক প্রতিবেশীর সঙ্গে আলাপ হল, বয়স ত্রিশ চল্লিশ হবে, লোকটি সত্যি ভারি অদ্ভুত ধাঁচের , এমন লোক আমি কখনো দেখিনি। লোকটি অনেকদিনের মাল্লা, কিন্তু এ একেবারে খ্যাপাটে ধরণের মাল্লা। সর্বদা জলের কাছে-কাছে থাকা, সবসময় জলের ওপরে, সবসময় জলের ভেতরে থাকা লোকটি। ওর জন্মও হয়ে থাকা উচিত নৌকোর ভেতরেই, আর আমি এ বিষয়ে নিশ্চিত যে ওর মৃত্যুও হবে শেষ নৌযাত্রাতেই। 

এক সন্ধেবেলা যখন আমরা স্যেনের ধারে হেঁটে বেড়াচ্ছিলাম, আমি ওঁকে জিগ্যেস করি, নিজের মাঝিমাল্লার জীবনের কোন গল্প বলতে। দেখতে না দেখতে, একেবারে চাঙ্গা হয়ে উঠলেন আমাদের ভদ্রলোক, যেন পাল্টে গেলেন, কথা বলতে লাগলেন ভারি সুন্দর, প্রায় যেন কবিই হয়ে উঠলেন। ওঁর হৃদয়ে আছে এক প্রবলতম আবেগ, বুভুক্ষু , অপ্রতিরোধ্য এক কামনা, এই নদীর বিষয়ে। 

ওহ, আমার কতই না স্মৃতি যে এই নদীকে ঘিরে, এই যাকে আমাদের পাশ দিয়ে বয়ে যেতে দেখছেন। বললেন তিনি। আপনারা তো আবার সব রাস্তায় থাকা মানুষ, আপনারা তো জানেন না, নদী কাকে বলে। এক জেলের মুখ থেকে শুনে নিন কথাটা। এ হল সবচেয়ে রহস্যময়, গভীর, অজানা জিনিশ। মরীচিকা আর ছায়াবাজির দেশ এটা, এখানে এমন সব জিনিস রাতের বেলায় দেখা যায় যা পৃথিবীতেই নেই। এমন সব শব্দ শোনা যায়, যা একেবারেই অচেনা। এর ওপর দিয়ে যাবার সময়ে না জানি কেন, শরীরে এমন শিরশিরানি হয়, যেমনটা হয় কবরখানার পাশ দিয়ে যাবার সময়ে। আসলে এটা তো সবচেয়ে ভয়ংকর কবরখানা কিনা, যেখানে সমাধির পাথরটা অব্দি নেই। 

মাটির ওপরটা জেলেদের জন্য বড্ড সংকীর্ণ। অন্ধকারে, যখন চাঁদ নেই আকাশে, তখন নদী তো সীমানাহীন। সমুদ্রনাবিকদের কথা আলাদা, তাদের কিন্তু সমুদ্রের ব্যাপারে ঠিক এক অভিজ্ঞতা হয় না। তাদের কাছে সমুদ্রটা কঠিন, নিষ্ঠুর ঠিকই, কিন্তু সে কাঁদে, সে চীৎকার করে, বিশাল সমুদ্রটা মানুষের পায়ের নিচে পড়েও থাকে। কিন্তু নদী হল গুমশুম, ওর ওপর বিশ্বাস করা যায় না। নদী হুঙ্কার দেয়না, কোন আওয়াজ ছাড়াই বয়ে চলে । অনন্তকাল ধরে জলের এই বয়ে চলা আমার মত মানুষের কাছে সমুদ্রের বিশাল উঁচু ঢেউগুলোর চেয়ে অনেক বেশি ভয়ঙ্কর। 

স্বপ্ন দেখে যারা, তারা এমন ভাব করেন যেন সমুদ্র তার বুকের মধ্যে লুকিয়ে রাখে বিশাল নীলাভ এক দেশ, যেখানে ডুবে গেলে মানুষ বড় বড় মাছেদের ঝাঁকের মধ্যে, আশ্চর্য বনানীর মধ্যে, ক্রিস্টালের গুহার মধ্যে গড়িয়ে যায়। নদীর কিছুই নেই এক কালো গভীরতা ছাড়া, যেখানে, যারা ডুবে মরে তারা কাদার মধ্যে পড়ে পড়ে পচে। উদীয়মান সূর্যালোকে যখন ঝিলমিল করে, তখন আবার সে সুন্দরী, অথবা যখন ফিসফিসিয়ে ওঠা শরবনে ঢাকা দুই পাড়ের মাঝখানে আস্তে ছলছল করে বইতে থাকে। 

কবি সমুদ্র সম্বন্ধে বলেছেন কবিতায়ঃ 

ও ঢেউ, তুমি তো জানো বিষণ্ন কাহিনিগুলি 

গভীর ঢেউয়েরা, হাঁটু-গেড়ে-বসা মায়েদের মনের ভয় ! 

জোয়ারে দুলতে দুলতে পরস্পর কী কথা বল তোমরা 

তাই কি তোমাদের কন্ঠে আনে নৈরাশ্যের সুর, 

যখন তোমরা সন্ধ্যায় , ফিরে আসো আমাদের কাছে। 


কিন্তু সত্যি বলছি, আমার বিশ্বাস, সরু সরু শরগাছ তাদের হালকা, খুব মিষ্টি গলায় ফিসফিস করে যে গল্পগুলো বলে, সেগুলো অনেক বেশি ভীতিকর, সেই অসুখী গল্পগুলোর চাইতে, যে গল্প বলে সমুদ্রের কলকল্লোল। 


তবে, আপনি যেহেতু আমার কাছে একটা মনে রাখার মত ঘটনা জানতে চাইছেন, আমি আপনাকে আমার একযুগ আগে, এখানে ঘটে যাওয়া একটা অনন্যসাধারণ কাহিনিই বলব। 

এখনকার মতই তখনও আমি থাকতাম লাফঁ মাদামের বাড়িতে, আর আমার এক খুব ভাল বন্ধু লুই বেরনে, এখন সে নৌকো বাওয়া ছেড়ে দিয়েছে, তার পাম্পের ব্যবসা আর স্টেট কাউন্সিল এ ঢোকার চেষ্টায় এলোমেলো হয়ে গিয়ে, সে ছিল ক... গ্রামের বাড়িতে, দু লিগ মত দূরে, ভাটিতে । আমরা প্রতিদিন একসঙ্গে রাতের খাওয়া সারতাম, কখনো ওর বাড়িতে, কখনো আমার বাড়িতে। 

এক সন্ধ্যায় বেরনের বাড়ি থেকে একা আমার ভারি নৌকোটা, যেটা বারো ফুট লম্বা একটা “সাগর”, সেটা কষ্টে বেয়ে ফিরছিলাম যেমন রোজ ওটা বেয়ে ফিরি, ছিলাম একেবারে একা আর বেশ ক্লান্ত, থামলাম কয়েক সেকেন্ডের জন্য একটু জিরিয়ে নিতে ঐ যে দক্ষিণে, দু শো মিটার দূরে রেল সাঁকোটার কাছাকাছি, শরবনগুলোর কাছে। আবহাওয়াটা খুব অপূর্ব, চাঁদ একেবারে ঝলমল করছে, নদীর স্রোত ঝিলমিলাচ্ছে, বাতাসটা শান্ত, মিঠে। 

এই প্রশান্তি আমাকে যেন উশকে দিল, আমি আপনমনে ভাবলাম, এই জায়গায় থেমেছি যখন একটা পাইপ ফুঁকে নিলে বেশ হয়। যেমন ভাবা তেমনি কাজ, নোঙরটা পাকড়ে জলে ছুঁড়ে ফেললাম। 

নৌকোটা, স্রোতের সঙ্গে সঙ্গে যেটা ভাটির টানে নামছিল, সেটা নোঙরের সঙ্গে শেকলটা টেনে নিয়ে এগলো, তারপর থেমে গেল। আমি নৌকোর গলুইতে বসে রইলাম, আমার ভেড়ার চামড়ার গদিটায় যতটা সম্ভব আরাম করে। 

কিচ্ছু শোনা যাচ্ছিল না তখন : মাঝে মাঝে শুধু মনে হচ্ছিল যেন প্রায় অশ্রুত একটা ঢেউ ভাঙার আওয়াজ পাচ্ছিলাম, পাড়ের গায়ে জলের ধাক্কা লেগে, আর দেখছিলাম একটা শরবনের দঙ্গলকে, বেশ উঁচু, যেন একটা অদ্ভূতুড়ে মূর্তির মত, আর ক্ষণে ক্ষণে নড়ে উঠছিল যেন সেটা। 

নদীটা ছিল পুরোপুরি শান্ত, কিন্তু আমার চারিদিকে ঘিরে আসা এই অস্বাভাবিক নীরবতায় আমি ক্রমশ কেমন যেন আলোড়িত হয়ে উঠছিলাম। সব প্রাণী, ব্যাঙ, ব্যাঙাচি, তাদের জলাজমির নৈশ সঙ্গীত বন্ধ করে স্তব্ধ। হঠাৎ , আমার ডানদিকে, উল্টোদিকে, একটা ব্যাঙ ডেকে উঠল। আমি শিহরিত হলাম : ব্যাঙটা চুপ করে গেল। আমি আর কিচ্ছু শুনলাম না , আর ঠিক করলাম একটু ধূমপান করে নিজের মনকে অন্যদিকে ফেরাব। যদিও, যতই আমার ধূমপায়ী হিসেবে নাম থাকুক, পারলাম না। দ্বিতীয় টানটা দিতেই আর ইচ্ছে করল না, পাইপ টানা থামালাম। 

আমি গাইতে চেষ্টা করলাম, আমার নিজের গলা নিজের কাছে খুব করুণ শোনালো, তারপর নৌকোর মেঝেতে নিজে টান টান শুয়ে পড়ে আকাশের দিকে দেখতে লাগলাম। কিছুক্ষণ একেবারে শান্ত রইলাম, কিন্তু শিগগিরি নৌকোটার হালকা দুলুনি আমার শান্তি হরণ করল। কেমন মনে হতে লাগল নৌকোটা বিশাল বড় একটা দুলুনি দিচ্ছে, একবার নদীর এ পাড় একবার ও পাড় ছুঁয়ে ছুঁয়ে দুলছে। তারপর আমার বিশ্বাস জন্মালো যে একটা কোন অস্তিত্ব অথবা একটা অদৃশ্য শক্তি যেন খুব ধীরে ধীরে জলের তলার দিকে টেনে নিচ্ছে নৌকোটাকে, আর তারপর ওপরে উঠিয়ে দিয়ে আবার ফেলে দিচ্ছে, যাতে নৌকোটা উলটে যায়। আমি যেন একটা ঝড়ের মধ্যে আটকে পড়ে গড়িয়ে যাচ্ছি, আমার চারিদিকে আওয়াজ শুনতে লাগলাম, তারপরই লাফ দিয়ে সোজা হয়ে বসলাম : জল ঝিলমিল করছে, সবকিছু একেবারে শান্ত। 

আমি বুঝলাম, আমার স্নায়ু একটু দুর্বল হয়েছে। ঠিক করলাম , এবার ফিরব এখান থেকে। শেকলে টান দিলাম। নৌকো নড়ে উঠল। কিন্তু টের পেলাম কীসে একটা যেন আটকাচ্ছে, আরো জোরে টান দিলাম, নোঙরটা উঠে এল না; জলের তলে কোথায় যেন ওটা বেধে গেছে, আমি তুলতে পারলাম না ওটাকে ; টানতে শুরু করলাম আবার, কিন্তু নিষ্ফল চেষ্টা। তখন, আমার দুটো দাঁড় দিয়ে, আমি নিজের নৌকোটার মুখ ঘুরিয়ে নিলাম, উজানের দিকে নিয়ে চললাম, যাতে নোঙরটার অবস্থান পালটায়। সেটাও বিফল হল, তখনো নোঙর এঁটেই রয়েছে, আমি ক্রুদ্ধ হয়ে উঠলাম, আর ক্ষেপে উঠে ঝাঁকুনি দিলাম শেকলে। 

কিছুই নড়ল না। হতাশ হয়ে বসে পড়লাম, নিজের অবস্থাটা নিয়ে চিন্তা করতে চেষ্টা করলাম। আমার পক্ষে এই শেকলটা ছিঁড়ে ফেলা সম্ভব নয়, নৌকোর গা থেকে শেকলটা আলাদা করাও অসম্ভব, কারণ শেকলটা বিশাল, আর নৌকোর সামনের দিকের কাঠের সংগে লোহার আঙটা দিয়ে জোড়া, কাঠটা আমার হাতের মত মোটা; তবে তখন আবহাওয়া বেশ সুন্দর, আমি ভাবলাম, নিঃসন্দেহে বেশি দেরি নেই আমার কোন না কোন অন্য জেলের দেখা পেতে, কেউ না কেউ আমাকে সাহায্য করতে আসবে। আমার গোলমেলে এই অভিযানটি আমাকে বেশ দমিয়ে দিয়েছিল, আমি বসে রইলাম, আবার পাইপ ধরিয়ে ধূমপান করলাম। আমার সঙ্গে এক বোতল মদ ছিল, দু তিন গেলাস তাই খেলাম , আমার অবস্থাটা ভেবে আমার এবার হাসি পেল। তখন বেশ গরম, আমি ভাবলাম, তেমন দুর্দশায় পড়লে সারারাত এই খোলা আকাশের নিচে কাটাতেও বেশি কষ্ট হবে না। 

হঠাৎ একটা ছোট আঘাতের শব্দ এল আমার নাওয়ের তক্তায়। আমি আঁতকে উঠলাম, একটা ঠান্ডা স্বেদ আমাকে মাথার থেকে পা পর্যন্ত যেন হিম করে দিল। এই আওয়াজ নিঃসন্দেহে জলে টেনে নেওয়া কোন কাঠকুটো থেকে হয়েছে, কিন্তু তখন সেটাই আমাকে আর একটা নতুন বিদঘুটে স্নায়বিক আলোড়নের বিস্রস্ততায় ঠেলে দেবার জন্য যথেষ্ট। আমি শেকলটা চেপে ধরে নিজেকে শক্ত করে একটা বিফল চেষ্টা দিলাম। নোঙর আচ্ছাসে আটকেই রইল। আমি নিঃশেষিত, বসে পড়লাম আবার। 

ইতিমধ্যে, নদী ধীরে ধীরে একটা সাদা ঘন কুয়াশায় ঢেকে গেছে, যেটা জলের ওপোর দিয়ে হামাগুড়ি দিতে দিতে, এমন দ্রুত এসেছে, যে নিজে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় আমি নদীকে আর দেখতে পাচ্ছি না, আমার পা দুটোকেও না, নৌকোটাকেও না, কিন্তু শুধু চোখে পড়ছে শরবনের ডগাগুলো, তারপর, অনেক দূরে, পূর্ণ চাঁদের অতি বিবর্ণ আলো, সংগে, ইটালির পপলারের দঙ্গলগুলোর তৈরি করা বড় বড় কালো ছোপগুলো যারা আকাশের দিকে উঠছে। 

আমাকে যেন ঢেকে ফেলেছে একটা অদ্ভুত সাদা রঙের তুলোর খন্ডের কেন্দ্রে, আর আমার কাছে তখন অবাস্তব কল্পনারা আসতে শুরু করেছে। আমি তখন দেখতে পাচ্ছি কেউ যেন আমার নৌকোয় উঠে আসার চেষ্টা করছে, যাকে আমি পরিষ্কার বুঝতে পারছি না। আর এই অস্বচ্ছ কুয়াশায় আবৃত নদীটা, নিশ্চয়ই ভরে গেছে আশ্চর্য সব প্রাণীতে, যারা আমার চারদিকে সাঁতার কেটে বেড়াচ্ছে। আমি তখন অনুভব করছি এক বীভৎস অস্বস্তি, আমার মাথা ধরে গেছে, হৃৎপিন্ডটা এত জোরে ধকধক করছে যে আমার যেন শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে, আর বোধ লুপ্ত হয়ে আমি ভাবছি, সাঁতরে পাড়ে উঠে নিজেকে বাঁচাব; কিন্তু একটু পরেই এই চিন্তাটায় আমি ভয়ে কেঁপে উঠছি। নিজেকে তখন মনশ্চক্ষে দেখছি, যেন আমি হারিয়ে গেছি, এই ঘন কুয়াশায় অজানায় ঝাঁপ দিয়ে যেন আমি ঘাসপাতা লতা শরবনের ভেতরে হাত পা ছুঁড়ছি, ওগুলোকে সরাতে না পেরে, ভয়ে আর্তনাদ করতে করতে, নদীর কিনারা দেখতে না পেয়ে, নিজের নৌকোটাকে আর খুঁজে না পেয়ে। আর আমার মনে হতে লাগল, যে আমি অনুভব করছি এই কালো জলের তলদেশের দিকে আমার পা ধরে কেউ টেনে নিচ্ছে। 

মোটমাট, যখন আমার কেবল পাঁচশো মিটার সাঁতরে যেতে হবে উজানে, এমন একটা বিন্দুতে, যেখানে ঘাস পাতা বা শরবন নেই, যেখানে পাব পা রাখার জমি , এমনই এই কুয়াশা , যে, তখনই আমার পক্ষে দশবারের মধ্যে নয়বারই নিজের পথ না খুঁজে পাবার এবং ডুবে যাবার সম্ভাবনা, যতটাই ভাল সাঁতারুই আমি হই না কেন। 

যুক্তি দিয়ে চিন্তা করার চেষ্টা করলাম। বোধ করছিলাম যথেষ্ট স্থির ইচ্ছা, আর ভয় পাব না, কিন্তু আমার মধ্যে এই ইচ্ছার বাইরেও তখন আরো কিছু আছে, আর সেই অন্য জিনিসটা হল ভয়। 

নিজেকে প্রশ্ন করলাম, কোন জিনিসটাকে আমি ভয় পাচ্ছি। আমার সাহসী আমি-টি আমার ভিতু আমি-কে নিয়ে পরিহাস করতে লাগল। সেদিনের মত আর কখনো আমি টের পাইনি এই দুই বিপরীত আমির ভেতরের যুদ্ধ, যে দুই সত্তা আমাদের ভেতরেই থাকে, একজন ইচ্ছুক, অন্যজন অনিচ্ছুক, আর দুজনের একে অন্যকে ক্রমশ হারিয়ে দিতে থাকে। 

এই নির্বোধ ব্যাখ্যাতীত শঙ্কা সমানে আরো বিপুল হয়ে উঠতে লাগল, হয়ে উঠল এক আতঙ্ক। আমি নড়াচড়া না করে দাঁড়িয়ে রইলাম, চোখ দুটি খোলা, শ্রবণ উন্মুখ, অপেক্ষমান। কীসের অপেক্ষা? আমি তাকে জানি না, কিন্তু সে নিশ্চয়ই ভয়ঙ্কর কিছু। আমার বিশ্বাস হল যদি একটা মাছও এখন জলের থেকে লাফিয়ে ওঠে, যেমনটা প্রায়ই ওঠে, আমাকে অজ্ঞান করে চিৎপাত করে ফেলার পক্ষে সেটুকুই যথেষ্ট হবে । 

তথাপি একটা প্রচন্ড প্রচেষ্টা করে আমি শেষমেশ আবার আমার যুক্তিবোধকে খানিকটা বাগে আনতে পারলাম, যা আমাকে ছেড়ে চলেই যাচ্ছিল প্রায়। আবার আমি নিজের মদের বোতলটা আঁকড়ে ধরে বড় বড় কয়েকটা ঢোঁক খেয়ে নিলাম । তারপর আমার মাথায় একটা ভাবনা এল, আর আমি দিকচক্রবালের চারটে দিশায় একে একে মুখ ফিরিয়ে ক্রমাগত নিজের সবটুকু শক্তি দিয়ে চেঁচাতে শুরু করলাম। যখন আমার গলা একেবারে অসাড় হয়ে গেল তখন আমি শুনতে লাগলাম। - অনেক দূরে একটা কুকুর ডেকে উঠল। 

আবার এক ঢোঁক মদ গিললাম, আবার নৌকোর মেঝেতে শুয়ে পড়লাম লম্বা বরাবর। বিশ্রাম নিলাম এরকম ভাবেই এক ঘন্টা, বা দু ঘন্টা, না ঘুমিয়ে, চোখ খুলে, নিজের চারিদিকে দুঃস্বপ্নের ঘেরাও নিয়ে। এতটুকু সাহস হল না উঠে বসার , অথচ সেটারই ইচ্ছে করছিল ভয়ঙ্করভাবে। প্রতি মিনিটে একবার করে সেটাই করার চেষ্টা করছি তখন। নিজেকে বলছি : “ চলো , উঠে দাঁড়াও! “ 

কিন্তু এতটুকু নড়াচড়া করতেও ভয় করছে। শেষ পর্যন্ত, নিজেকে তুললাম অসম্ভব সাবধানতার সঙ্গে, যেন আমার সমস্ত জীবন নির্ভর করছে সামান্যতম শব্দ যদি করে ফেলি আমি তার ওপর, আর নৌকোর বাইরেটা আবার দেখলাম। 

আমার চোখ ধাঁধিয়ে গেল এক অপূর্ব, অদৃষ্টপূর্ব, বিস্ময়কর দৃশ্য দেখে। এসব তো পরীর রাজ্যের কল্পনালোকের দৃশ্য, এমন কল্পকাহিনির দৃশ্য, যা দূর দেশ থেকে ভ্রমণ করে এসে লোকে বলে, আমরা অবিশ্বাস নিয়ে শুনি। 

যে কুয়াশাটা দু ঘন্টা আগে জলের ওপরে ভাসছিল, সেটা ধীরে ধীরে সরে গিয়ে দুই পাড়ে জড়ো হয়েছে। জলকে একেবারে মুক্ত করে দিয়ে, সেটা দুই পাড়ে রচনা করেছে এক একটা অবিচ্ছিন্ন পাহাড়, ছয় কি সাত মিটার উঁচু, যা চাঁদের আলোর নিচে জ্বলজ্বল করছে বরফের মত ঔজ্জ্বল্যে। এমনভাবে সেটা করছে, যে কেউ আর কিছু দেখতেই পাবে না শুধু এই নদীর আগুনের ফলা আর দুপাশের দুই শ্বেত পর্বত ছাড়া, আর ওই উঁচুতে, আমার মাথার ওপর, জ্বলজ্বল করছিল , পূর্ণ, বিশাল একটি অতিকায় চাঁদ, নীলাভ দুগ্ধবৎ এক আকাশকে আলোকিত করা। 

জলের সব প্রাণীরা এতক্ষণে জেগে উঠেছে, ব্যাঙেরা সজোরে ঘ্যাঙরঘ্যাং করছে, অন্যদিকে ক্ষণে ক্ষণে, কখনো বাঁদিকে কখনো ডানদিকে আমি শুনতে পাচ্ছিলাম একটা সংক্ষিপ্ত, একঘেয়ে, করুণ স্বর, নক্ষত্রের দিকে ছুঁড়ে দিচ্ছে তামার বাঁশির মত কন্ঠের ব্যাঙাচিরা। আশ্চর্য ব্যাপার, আর আমার ভয় করছিল না, আমি ছিলাম এমন এক অসাধারণ দৃশ্যাবলীর মধ্যে, যে, একটা কোন অসামান্য ব্যাপারেও আর আমি অবাক হতাম না। কতক্ষণ এমনটা চলেছিল আমি জানি না কিছুই কারণ শেষমেশ আমি ঘুমিয়ে পড়লাম। যখন আবার চোখ খুললাম, চাঁদ ডুবে গেছে, আকাশ ঢেকে গেছে মেঘে। জল বিষণ্নভাবে কলকল করে পাড়ে ধাক্কা দিচ্ছে, হাওয়া বইতে আরম্ভ করেছে, ঠান্ডা লাগছে, অন্ধকার একেবারে অতল। 

আমার কাছে যেটুকু মদ ছিল আমি খেয়ে নিলাম। তারপর কাঁপতে কাঁপতে শুনতে লাগলাম শরবনের খসখস আর নদীর জল বওয়ার গায়ে কাঁটা দেওয়া শব্দ। দেখার চেষ্টা করলাম , কিন্তু নৌকোটাও আলাদা করতে পারলাম না চোখে দেখে, এমনকি নিজের হাতটা নিজের চোখের কাছে নিয়ে এসেও দেখতে পেলাম না। 

তবু ধীরে ধীরে কালোর ঘনত্ব কমে এল। হঠাৎ মনে হল আমি আমার কাছে দিয়েই একটা ছায়াকে সরে যেতে দেখলাম; একটা চীৎকার বেরোল গলা দিয়ে, একটি কন্ঠ উত্তর দিল; সে ছিল একজন জেলে। আমি ডাকলাম, সে কাছে এল, তাকে আমি আমার দুর্ভাগ্যের এই অভিজ্ঞতা বললাম। সে তখন তার নৌকোকে আমার নৌকোর পাশাপাশি রাখল, আর দুজনে মিলে শেকলটা টানতে লাগলাম। নোঙর নড়ল না। দিন এল, নিঝুম ধূসর, মেঘলা, শীতল, সেইরকম একটা দিন যা তোমাকে এনে দেয় দুঃখ আর দুর্ভাগ্য। আমি আর একটা নৌকোকে দেখতে পেলাম, তাকেও আমরা ডাকলাম। যে লোকটি সেটায় ছিল, সেও আমাদের প্রয়াসে যোগ দিল। এবার, একটু একটু করে, নোঙরটা আলগা হয়ে এল। সেটা উঠে এল, কিন্তু বড় ধীরে ধীরে, আর বেশ ভারি একটা কিছু তার সঙ্গে সঙ্গে উঠল। শেষ পর্যন্ত আমরা দেখতে পেলাম, একটা কালো বিশাল বস্তুকে। আর সেটাকে টেনে তুললাম আমার নৌকায়: 

সে ছিল এক বুড়ি মহিলার মৃতদেহ, গলায় একটা বড়সড় পাথর বাঁধা। 


মে ১৮৮১



অনুবাদক পরিচিতি
কবি, অনুবাদক, গল্পকার

৫টি মন্তব্য:

  1. এই মন্তব্যটি লেখক দ্বারা সরানো হয়েছে।

    উত্তরমুছুন
  2. বেশ ভালো লাগলো । তবে বড় ও জটিল কিছু বাক্য একটু স্বাধীনতা নিয়ে ছোটো ছোটো বাক্যে ভাঙতে পারলে আড়ষ্টতা হ্রাসজনিত কারণে যে পঠন স্বাচ্ছন্দ্য বাড়তো তাতে হয়তো আরো বেশি না-অনুবাদ মনে হতো ।

    উত্তরমুছুন
    উত্তরগুলি
    1. ঠিক। ভাষার বাক্যগঠনের তফাত থেকে উদ্ভুত এই সব সমস্যা। প্রতিপদে অনুবাদককে লড়াইকরতে হয়। কতটা স্বাধীনতা নেব, কতটা নিজের মত করে লিখব। পড়ে মনে হচ্ছে কিছু বাক্য বেশ দীর্ঘ। ফরাসির এই দীর্ঘ বাক্যগুলো খুব সুন্দর। বাংলায় ভারাক্রান্ত , অনুবাদ-অনুবাদ।

      মুছুন
  3. চমৎকার তরতরে অনুবাদ ভালো লাগলো পড়ে

    উত্তরমুছুন
  4. ভালই।
    এই শরগাছ বা শরবন ওদের অনেক কবিতায় দেখি। ওটা খুব সুন্দর লাগে ওদের। আমি তো অনুবাদ করতে গিয়ে সেসব সময় রস পাই না

    উত্তরমুছুন