রবিবার, ২৮ অক্টোবর, ২০১৮

ধারাবাহিক উপন্যাস : যে দিন ভেসে গেছে --নবম অধ্যায়

মূল : মার্গারেট মিচেল 
অনুবাদ : উৎপল দাশগুপ্ত

হাসপাতালগুলোর সাহায্যার্থে, মধ্যগ্রীষ্মের এক সন্ধ্যেবেলা একটা মেলার আয়োজন করা হল। সেই মেলাপ্রাঙ্গণকে প্রাকৃতিক শ্যামলিমায় সাজিয়ে তোলার উপকরণের সন্ধানে সকাল সকাল এক দঙ্গল ছেলে মেয়ে আর সৈনিক মিলে ওয়াগন আর ঘোড়ার গাড়ি করে বেরিয়ে পড়ল। শোয়ার ঘরের জানালা থেকে স্কারলেট অত্যন্ত বিষন্ন মন নিয়ে সেটাই দেখছিল। রাঙামাটির রাস্তার ওপর গাছের সারির ফাঁক গলে আলোছায়ার খেলা চলছে। ঘোড়ার খুরের ধাক্কা লেগে থেকে থেকে লালমাটির ধুলো উড়ছিল। কুঠার হাতে চারজন নীগ্রোকে সামনে বসিয়ে একটা ওয়াগন সবার আগে আগে চলছিল,। গাছের ডালপালা আর লতাপাতার জঙ্গল সাফ করতে করতে। ওয়াগনের পেছনে ডাঁই করে ওক কাঠের বাসনে রাখা দুপুরের খাবার, তরমুজ আর ন্যাপকিন। দুটো কালো ছেলে ব্যাঞ্জো আর হারমনিকা বাজিয়ে গলা ছেড়ে গাইছিল, “সুসময় পেতে গেলে – অশ্বারোহী বাহিনীতে যোগ দাও”। পেছন পেছন সারি সারি ঘোড়ার গাড়ির শোভাযাত্রা। সুতির তৈরি বাহারে পোশাক পরে, গায়ে শাল জড়িয়ে, মাথায় বনেট দিয়ে আর তালপাখা ঘোরাতে ঘোরাতে পেছনে পেছনে মেয়েরা হই হই করতে করতে যাচ্ছে। অপেক্ষাকৃত বয়স্ক মহিলারা অল্প হেসে এক গাড়ি থেকে অন্য গাড়িতে ছুঁড়ে দেওয়া হাসি আর রসিকতা উপভোগ করতে করতে। এখনও যারা পুরোপুরি আরোগ্যলাভ করেনি, কিন্তু চলাফেরা করতে পারছে তারা পরিচারক আর মেয়েদের মাঝখানে চিড়েচ্যাপ্টা হয়ে বসেছে। অফিসাররা ঘোড়ার পিঠে চেপে খুব আস্তে আস্তে গাড়িগুলোর সাথে সাথে যাচ্ছেন। চাকা থেকে ক্যাঁচক্যাঁচ আওয়াজ হচ্ছে। আর ঘোড়াদের গলার ঘন্টা থেকে টং টং আওয়াজ। মেয়েদের সোনালি বিনুনি রোদ্দুরে চক চক করছে। মাথার ওপর রঙ বেরঙের ছোট ছোট ছাতা গাড়ির চলার সাথে সাথে দুলছে। নিগ্রোরা গান গাইতে গাইতে যাচ্ছে। সবাই পীচট্রী স্ট্রীট ছেড়ে এগিয়ে যাচ্ছে। সবুজ ডালপালা, লতাপাতা সংগ্রহের সঙ্গে সঙ্গে পিকনিকও হবে, তরমুজ কাঁটা হবে। সবাই ফুর্তি করবে, একমাত্র ও ছাড়া! 

যাবার সময় সবাই ওকে হাত নাড়িয়ে বিদায় জানিয়ে গেল। স্কারলেটও হাসিমুখেই বিদায় জানাল। কষ্টটা বুকের মধ্যে লুকিয়ে রেখে। একটা অজানা ব্যথা রিনিরিনিয়ে উঠে গলায় এসে আটকে গেল। এরপরই ওই ব্যথা চোখে এসে অশ্রু হয়ে ঝরে পড়বে। পিকনিকে সবাই গেল, শুধু ও ছাড়া। আর মেলায় আর নাচের আসরে সবাই যাবে, ও ছাড়া। সবাই মানে ও, পিটিপ্যাট, মেলি আর অন্য যে সব অভাগারা শোকপালনের জন্য যেতে পারবে না তারা ছাড়া। কিন্তু মনে হয় মেলি বা পিটিপ্যাটের এর জন্য কোন দুঃখ নেই। ওঁরা যাবার কথা ভাবেনই নি। স্কারলেট কিন্তু ভেবেছিল। মনে প্রাণে যেতে চেয়েছিল।

কি অন্যায়! এই মেলার জন্য শহরে অন্য মেয়েদের থেকে ও কিছু কম খাটাখাটনি করেছে? বরং অনেক বেশিই করেছে। বাচ্চাদের মোজা, টুপি আর আফগান, মাফলার বানিয়ে দিয়েছে। অনেক লেস বুনে দিয়েছে; আধ ডজন সোফার বালিসের ওয়াড়ে কনফেডারেটদের পতাকার এমব্রয়ডারি করে দিয়েছে (যদিও তারাগুলো একটু বাঁকাচোরা হয়েছে – কয়েকটা একেবারেই গোল হয়েছে, আর কোন কোনটাতে সাতটা আটটা মুখে হয়ে গেছে! তবে দেখতে তো মন্দ হয়নি!)। গতকালই সারাদিন ধরে একটা অস্ত্রাগারের ধুলোময়লার পরোয়া না করে হলুদ, গোলাপি আর সবুজ কাপড় দিয়ে দেওয়ালে লাগানো সারি সারি বুথের পর্দা লাগিয়েছে। মহিলাদের হাসপাতাল কমিটির তত্ত্বাবধানে। কাজটা মোটেই হালকা ছিল না। আর যখন মিসেজ় মেরিওয়েদার, কি মিসেজ় এলসিং, কি মিসেজ় হোয়াইটিং তোমার সামনে ঠায় দাঁড়িয়ে থেকে কর্তৃত্ব ফলাতে থাকেন তখন ব্যাপারটায় কোন মজাই থাকে না। যেন তুমি চাকরবাকরদেরই একজন! আর তারপর এক নাগাড়ে শুনে যেতে হয়েছে যে ওঁদের মেয়েদের কত সুনাম! সব থেকে খারাপ ব্যাপার হল, লটারির জন্য মিস পিটিপ্যাট আর রান্নার মেয়েটা যে কেকটা বানিয়েছেন সেটা তৈরিতে সাহায্য করতে গিয়ে ওর হাতে বড় বড় দুটো ফোস্কা পড়ে গেছে! 

এই খেতমজুরদের মত পরিশ্রম করার পুরষ্কার কি? না মুখ বুজে ঘরের মধ্যে সেঁধিয়ে বসে থাক! যখন কি না আসল উৎসব শুরু হতে চলেছে! স্বামী মারা গেছে আর বাচ্চাকে দেখাশোনা করার অজুহাতে ওকে সব আমোদ আহ্লাদ ছেড়ে দিয়ে ঘরে বসে থাকতে হবে – এটা ভীষণ অন্যায়! এই তো মাত্র একবছরের একটু আগেই ও জমকালো পোশাক পরে – এইরকম শোকের কালো পোশাক নয় – কত নাচত গাইত – এমনকি তিন তিনটে ছেলে ওকে বিয়ে করবার জন্য তৈরি ছিল! মাত্র সতেরো বছর বয়স, এখনও কত নাচবার ইচ্ছে ওর দু’পায়ে রয়ে গেছে! খুবই অন্যায়! মনে হচ্ছে যেন গ্রীষ্মের ছায়াঘন রাস্তা ধরে – ধূসর ইউনিফর্ম আর ঘোড়ার খুরের আওয়াজের সঙ্গে সঙ্গে – বাহারে অর্গ্যান্ডির পোশাকের ভিড়ে আর ব্যাঞ্জোর তালে তালে, জীবন যেন ওকে ফাঁকি দিয়ে ছেড়ে যাচ্ছে। যেসব ছেলেদের ও এত ভাল করে জানে, যেসব মানুষের সেবা করেছে হাসপাতালে – তাদের দিকে তাকিয়ে হাত নেড়ে, হাসিমুখে বিদায় জানান ওর উচিত হচ্ছে না হয়ত – হয়ত ওর উচিত মুখ গম্ভীর করে থাকা – কিন্তু কি করবে – ও তো এখনও জীবনকে অবহেলা করতে পারছে না।

হঠাৎ পিটিপ্যাট ঘরে ঢুকে পড়ায় ওকে হাত নেড়ে বিদায় জানানো বন্ধ করে দিতে হল। সিঁড়ি দিয়ে উঠে আসার ফলে ভদ্রমহিলা হাঁপাচ্ছেন। এক ঝটকায় উনি ওকে জানালা থেকে সরিয়ে দিলেন।

“তোমার কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে, সোনা, - তুমি শোবার ঘর থেকে পুরুষমানুষদের দিকে হাত নাড়াচ্ছ! স্কারলেট আমি বলতে বাধ্য হচ্ছি যে আমি খুবই আশ্চর্য হয়েছি! তোমার মা কি বলবেন বল তো!”

“এটা যে আমার শোবার ঘর সেটা তো আর ওরা জানেনা।”

“ভাবতেও তো পারে – সেটা ঠিক ততখানিই খারাপ, সোনা। এরকম কাজ তুমি করতে পার না। সবাই তোমার সম্বন্ধে বলবে যে তোমার কোন চরিত্র নেই – আর তাছাড়া মিসেজ় মেরিওয়েদার তো ভাল করেই জানেন যে এটা তোমার শোবার ঘর।”

“আর ওই বুড়ি বেড়ালটা বুঝি কথাটা সব ছেলেদের কাছে রটিয়ে দেবেন?” 

“চুপ কর, সোনা! ডলি মেরিওয়েদার আমার সব থেকে ভাল বন্ধু।” 

“ঠিক আছে। কিন্তু তা হলেও আমি ওঁকে বুড়ি বেড়ালই বলব – ওহ আন্টি – কেঁদো না – আমি খুব দুঃখিত – তুমি কেঁদো না। এটা যে আমার শোবার ঘরের জানালা, সেটা ভুলেই গিয়েছিলাম। আচ্ছা আর করব না। ওদের যেতে দেখে ভাল লাগছিল। আমারও যেতে ইচ্ছে করছিল।”

“সোনা!”

“হ্যা সত্যিই। ঘরে বসে থেকে থেকে আমার ভাল লাগছে না।”

“স্কারলেট, আমায় কথা দাও, এরকম কথা বলবে না। লোকে কি বলবে? সবাই বলবে, বেচারা চার্লিকে তুমি একটুও ভালবাসতে না --”

“ওহ আন্টি কেঁদো না!”

“যাক তোমার চোখেও জল এসে গেছে,” ফোঁপাতে ফোঁপাতে পিটিপ্যাট বললেন। একটু যেন খুশি দেখাল। স্কার্টের পকেটে রুমাল খুঁজতে লাগলেন।

এতক্ষণ ধরে চেপে রাখা কষ্ট বেরিয়ে পড়ল। স্কারলেট হুহু করে কেঁদে উঠল। তবে পিটিপ্যাট যেটা ভাবছিলেন – চার্লসের জন্য – তা নয়। চাকা আর হাসির আওয়াজ দূরে মিলিয়ে যে্তে থাকল বলে। চিন্তান্বিত মুখে পাশের ঘর থেকে মেলানি ছুটে এল। হাতে একটা ব্রাশ। মাথার কোঁকড়া কালো চুলগুলো কপালের আর গালের ওপর এসে পড়েছে।

ব্যাকুল হয়ে জানতে চাইল, “কি হয়েছে তোমাদের?”

“চার্লি!” বলে ফোঁপাতে ফোঁপাতে মেলানির কাঁধে মাথা রেখে পিটিপ্যাট দুঃখের হাসি আড়াল করলেন।

“ওহ,” ভাইয়ের নাম শুনে মেলানির মুখ ম্লান হয়ে গেল। “মনে জোর আনো, কেঁদো না স্কারলেট!”

স্কারলেট বিছানায় ঝাঁপিয়ে পড়ে উচ্চৈস্বরে ফোঁপাতে লাগল। এক অবুঝ বাচ্চার মত আক্রোশ নিয়ে। নিজের যৌবন বৃথা হয়ে যাবার আশঙ্কায়; যৌবনের সব আনন্দ থেকে বঞ্চিত হবার হতাশায়। এই কিছুদিন আগেও কান্নাকাটি করে সব কিছু আদায় করে নিতে পারত। আজ জানে হাজার কাঁদলেও যা চায় সেটা পাওয়ার আশা নেই। বালিশে মাথা গুঁজে, বিছানার চাদরের ওপর পা আছড়াতে লাগল আর ফোঁপাতে লাগল। 

“এর থেকে আমার মরে যাওয়াই ভাল ছিল!” ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে আক্রোশের সাথে বলতে লাগল। ওর বিলাপ শুনে পিটিপ্যাটের কান্না থেমে গেল। মেলানি ছুটে এসে ভাইয়ের বউকে সান্ত্বনা দিতে লাগল।

“কেঁদো না সোনা! চার্লি তোমাকে কতটা ভালবাসত, সেটা ভেবে নিজেকে সান্ত্বনা দাও! তোমার আদরের ছেলেটার কথা ভাব!”

ওর বেদনার ভুল অর্থ করার রাগে আর সবরকম আনন্দ উৎসব থেকে বঞ্চিত হবার হতাশায়, স্কারলেট স্তব্ধ হয়ে গেল। এটা একদিক থেকে দেখতে গেলে ভালই হল। না হলে জেরাল্ডের স্বভাবসিদ্ধ স্পষ্টভাষায় ও সত্যি কথাটা বলে ফেলত। মেলানি ওর মাথায় পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে লাগল। আর পিটিপ্যাট পা টিপে টিপে ঘরের জানালাগুলোর পর্দা টেনে দিতে লাগলেন।

“ওটা কোরো না,” বালিশের থেকে লাল চোখ মুখ তুলে স্কারলেট বলে উঠল। “আমি এখনও মরে যাইনি, তাই দরকার হলে আমিই জানালার পর্দা টেনে দিতে পারবে। তবে আমার মরে যাওয়াই উচিত। তোমরা দয়া করে এ ঘর থেকে যাও আর আমাকে একটু একলা থাকতে দাও!”

বলে আবার বালিশে মাথা গুঁজে দিল। দুজনে নিজেদের মধ্যে ফিসফাস করে কথাবার্তা বলে পা টিপে টিপে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন। স্কারলেট শুনতে পেল মেলানি পিটিপ্যাটকে নীচু গলায় বলছে,

“আন্ট পিটি, আমি চাইনা যে তুমি স্কারলেটের কাছে চার্লসের কথা বল। তুমি জান ও এতে কত কষ্ট পায়। বেচারা আমি ওর চোখের চাউনি দেখেই বুঝতে পেরেছি ও কিভাবে কান্না চাপার চেষ্টা করছিল। আমরা ব্যাপারটা আরও কঠিন করে দিতে চাইনা।”

নিষ্ফল রাগে স্কারলেট চাদরটাকে লাথি মেরে সরিয়ে দিল। খুব বাজে কিছু একটা বলে মনের ঝাল মেটাতে ইচ্ছে করল।

“চুলোয় যাও তোমরা!” কথাটা চেঁচিয়ে ছুঁড়ে দিয়ে মনে মনে একটু শান্তি অনুভব করল। কি করে যে মেলানি ঘরের মধ্যে ভাইয়ের জন্য শোকের পোশাক পরে থেকেও এত শান্ত থাকে? ওর কি কোন ফুর্তি আনন্দ করতে ইচ্ছে করে না? ওর বয়সও তো মাত্র আঠেরো বছর! মেলানি কি বোঝে না, না বুঝতে চায় না যে জীবন হল চুটিয়ে ভোগ করে নেওয়ার জন্য!

“ওই তো প্যাঁকাটির মত চেহারা,” স্কারলেট বালিশে সজোরে একটা ঘুসি মেরে ভাবল। “আর তাছাড়া আমি যেরকম সবার কাছে জনপ্রিয়, ও কখনই সেরকম জনপ্রিয় হতে পারেনি। তাই আমি যেমন এই অভাব বোধ করছি, ও সেটা বোধ করতেই পারবে না! – আর তাছাড়া ওর তো অ্যাশলে আছে – আমার – আমার তো কেউই নেই!” এটা ভেবে দুঃখটা আবার চাগিয়ে উঠল আর কাঁদতে শুরু করল।

বিকেল পর্যন্ত বিরস মুখে ঘরে বসে রইল। যখন পিকনিকের দল ফিরল – ওয়াগনে বোঝাই পাইন গাছের ডাল, ফার্ন আর লতাপাতা নিয়ে – হইচই করতে করতে – তখনও ওর মন বিষন্ন হয়েই রইল। সবাইকে বেশ ক্লান্ত দেখাচ্ছিল, কিন্তু সবাই ওর দিকে তাকিয়ে হাত নাড়তে নাড়তে যাচ্ছিল। ও ভয়ে ভয়ে ওদের দিকে হাত নাড়াচ্ছিল। এই প্রত্যাশাহীন জীবন নিয়ে বাঁচার কোন মানেই হয়না। 

কিন্তু মুক্তি এল – আশাতীতভাবে – যখন ভোজন পরবর্তি তন্দ্রার আলস্য কাটিয়ে ওঁরা সবে জেগেছেন। মিসেজ় মেরিওয়েদার আর মিসেজ় এলসিং ওঁদের বাড়ি এলেন। মেলানি, স্কারলেট আর আন্ট পিটিপ্যাট তাড়াতাড়ি পরিপাটি হয়ে নীচে বসার ঘরে চলে এলেন।

“মিসেজ় বনেলের ছেলেমেয়েদের হাম হয়েছে,” মেরিওয়েদার এমন সুরে বললেন যেন এরকম একটা ঘটনা ঘটার জন্য মিসেজ় বনেলই ব্যক্তিগতভাবে দায়ী।

“আর ম্যাকলিওরের মেয়েদের ভার্জিনিয়া থেকে ডাক এসেছে,” মিসেজ় এলসিং অলস ভাবে পাখা ঘোরাতে ঘোরাতে তাঁর মৃতপ্রায় স্বরে বললেন, যেন কোন ব্যাপারেই ওঁর কিছু যায় আসে না। “ডালাস ম্যাকলিওর চোট পেয়েছে।”

“কি ভয়ানক ব্যাপার!” ওঁরা তিনজনেই একসাথে চেঁচিয়ে উঠলেন। “ বেচারা ডালাস কি ___”

“না কাঁধের ভেতর দিয়ে চলে গেছে,” মিসেজ় মেরিওয়েদার তাড়াতাড়ি বলে উঠলেন। “কিন্তু এটা হবার আর সময় পেল না। মেয়েরা ওকে উত্তর থেকে বাড়ি ফিরিয়ে আনতে যাচ্ছে। কিন্তু না আমাদের এখন বসে গল্প করলে চলবে না। অস্ত্রাগারে ফিরে গিয়ে সাজানো গোছানো শেষ করতে হবে। পিটি, আজ রাতের জন্য তোমাকে আর মেলিকে মিসেজ় বনেল আর ম্যাকলিওরের মেয়েদের জায়গাটা নিতে হবে।”

“কিন্তু ডলি, আমরা তো যেতে পারি না।”

“আমার কাছে ‘পারিনা’ কথাটা বোলো না পিটিপ্যাট হ্যামিলটন,” মিসেজ় মেরিওয়েদার একটু ঊষ্ণভাবেই বললেন। “তোমাদেরকে আমাদের দরকার – পানাহার নিয়ে নিগ্রোদের ওপর নজর রাখার জন্য। মিসেজ় বনেলকে ওই ভারই দেওয়া হয়েছিল। আর মেলি, তোমাকে ম্যাকলিওরের মেয়েদের বুথটা সামলাতে হবে।”

“ওহ সেটা কি করে হতে পারে – বেচারা চার্লি মারা যাওয়ার ____”

“আমরা তোমাদের কষ্ট বুঝতে পারছি। কিন্তু আমাদের উদ্দেশ্যের জন্য ত্যাগ করার চেয়ে বড় কিছু হতে পারে কি?” মিসেজ় এলসিংএর মৃদু ভর্ৎসনায় ব্যাপারটার মীমাংসা হয়ে গেল। 

“দেখ, সাহায্য তো আমরা করতে চাই, তবু – বুথগুলো সামলানোর দায়িত্ব কমবয়সি কোন সুন্দরী মেয়েদের দিলেই মনে হয় ভাল হবে।”

মিসেজ় মেরিওয়েদার সজোরে ঘোঁৎঘোঁৎ করলেন।

“কমবয়সি মানুষজন আজকাল কি ভাবনা চিন্তা করে সে আমার বুদ্ধির অগোচর। কোন দায়িত্ববোধ আছে ওদের? যে সব মেয়েদের এখনও বুথের দায়িত্ব দেওয়া হয়নি তাদের অজুহাতের যেন কোন শেষ নেই। আমি সবই বুঝতে পারি! ওরা অফিসারদের পেছনে ঘুরঘুর করার সুযোগটা হারাতে চায় না। ওদের ভয় যে ওদের নতুন পোশাকগুলো বুথের পেছন থেকে ঠিক মত দেখা যাবে না। ওই যে অবরোধের চোরাকারবারি – কি যেন বেশ নাম তার?”

“ক্যাপটেন বাটলার,” মিসেজ় এলসিং বললেন।

“আশা করব, মেয়েদের পোশাকআশাকের বদলে উনি বেশি করে হাসপাতালে ব্যবহারের জিনিসপত্র নিয়ে আসবেন। ওঁর আনা নতুন নতুন পোশাক দেখতে দেখতে আমি ক্লান্ত হয়ে গেছি। ক্যাটেন বাটলার – নামটাই আমার কাছে অসহ্য! যাই হোক পিটি আমার এখন তোমার সাথে তর্কাতর্কি করার সময় নেই। তোমাদের আসতেই হবে। সবাই বুঝবে। আর পেছনের ঘরে তোমাকে কেউ লক্ষ্যও করবে না। মেলিও এমন জায়গায় থাকবে যে খুব একটা কারও চোখে পড়বে না। বেচারা ম্যাকলিওর মেয়েদের বুথ একেবারে পেছনের দিকে আর খুব একটা সুদৃশ্যও নয়।”

“মনে হয় আমাদের যাওয়া উচিত,” উৎসাহটাকে কোনরকমে আড়াল করে স্কারলেট বলে উঠল। মুখের ভাবে আন্তরিকতা আর সারল্য ফুটিয়ে তুলল। “হাসপাতালের জন্য এটুকু করা আমাদের কর্তব্য।”

মহিলা অতিথিদের কেউই স্কারলেটের নামোচ্চারণ করেন নি। ওঁরা ওর দিকে ফিরে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন। এই অসুবিধের বাজারেও ওঁদের মনে একজন বিধবাকে – যার বৈধব্যের এখনও এক বছরও পুরো হয়নি – তাকে কোন সামাজিক অনুষ্ঠানে যেতে বলার কথা ভাবেননি। স্কারলেট শিশুসুলভ অভিব্যক্তিসহ বিষ্ফারিত চোখে তাকিয়ে ওঁদের দৃষ্টিকে হজম করল।

“আমার মনে হয় এই অনুষ্ঠান যাতে সাফল্যমণ্ডিত হয় তার জন্যই আমাদের যাওয়া দরকার – সবাইকার। মনে হয় আমারও মেলির সাথে বুথে গিয়ে দাঁড়ানো উচিত – একজনের বদলে দুজন হলে বেশি ভাল হবে। তোমার কি মনে হয় মেলি?” 

“হুম,” মেলি অসহায় ভাবে বলতে শুরু করল। শোকাচারের মধ্যে সামাজিক অনুষ্ঠানে যাওয়ার ব্যাপারটা ওর কাছে এতটাই অশ্রুতপূর্ব, যে ও বেশ বিহ্বল হয়ে পড়েছে।

“স্কারলেট ঠিকই বলেছে,” মিসেজ় মেরিওয়েদার বলে উঠলেন। ওঁদের মধ্যে যে একটা দ্বন্দ্ব চলছে সেটা খেয়াল করলেন। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে পোশাকটাকে ঠিক করে নিলেন। “তোমরা দুজনে – মানে তোমরা সকলেই আসছ তাহলে। শুধু একবার ভাব, হাসপাতালের জন্য শয্যা আর ওষুধের জন্য কত টাকার প্রয়োজন। আর যে কারনে চার্লস আর আজ আমাদের মধ্যে নেই, সেই কারনের জন্য সাহায্য করা হলে ও কত খুশি হত, সেটা আমি আন্দাজ করতে পারি।”

***

“সত্যি বিশ্বাসই হচ্ছে না! একদম বিশ্বাস হচ্ছে না!” স্কারলেট অত্যন্ত আনন্দিতচিত্তে ভাবতে ভাবতে ম্যাকলিওর মেয়েদের গোলাপী-হলুদ পর্দা লাগানো বুথে ঢুকতে ঢুকতে ভাবতে লাগল। মোদ্দা কথা হল ও একটা পার্টিতে আসতে পেরেছে! এক বছর ধরে আড়ালে থেকে থেকে, আর শোকাবাস পরে পরে ও একেবারে পাগল হয়ে যাচ্ছিল। আর এখন ও একটা পার্টিতে – যেটা অ্যাটলান্টার এত বড় একটা পার্টি! লোকজনের ভীড়, আলোর রোশনাই, গান-বাজনা দেখতে আর শুনতে পাচ্ছে। কল্পনায় দেখতে লাগল ক্যাপটেন বাটলার চোরা পথে অনেক সুন্দর সুন্দর পোশাক নিয়ে এসেছেন।

কাউন্টারের পেছনে রাখা ছোট্ট টুলটাতে বসে স্কারলেট লম্বা হলঘরটাকে চোখ দিয়ে যাচাই করল। কে বলবে এটা একটা ছিরিছাঁদহীন অনুশীলনকক্ষ ছিল দুপুরের আগেও। মাত্র কয়েক ঘন্টার মধ্যেই মেয়ের দল এটাকে কি সুন্দর করে সাজিয়ে তুলেছে। অনবদ্য! স্কারলেটের মনে হল অ্যাটলান্টায় রুপো, পেতল আর চীনেমাটির যত জমকালো মোমবাতিদান আছে সব এখানে এনে সুগন্ধি মোমবাতি জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। হলের এক মাথা থেকে আরেক মাথা পর্যন্ত, ফুলে ঢাকা টেবিলগুলোর ওপরে, বুথের কাউন্টারগুলোর ওপর, এমনকি জানালার গবাটের ওপর বাতিদানগুলোকে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। জানালা দিয়ে উষ্ণ হাওয়া মাঝে মাঝে এসে মোমবাতির শিখাকে আলোড়িত করে যাচ্ছে। 

হলের ঠিক মাঝখানে, জঙপড়া শেকল থেকে ঝোলানো বড় কদাকার আলোটাতে আইভি আর আঙুর লতা জড়িয়ে একেবারে ভোল পালটে দেওয়া হয়েছে। দেওয়ালের কোনাগুলো পাইনগাছের শাখা দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। তার মৃদু সুবাস ভেসে আসছে। বয়স্ক মহিলারা তাঁদের সঙ্গিনীদের সাথে সেখানে নিরিবিলিতে বসে গল্প করতে পারবেন। আইভি আর আঙ্গুর লতার দড়ি ছাদের নানা প্রান্ত আর দেওয়াল থেকে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই সবুজের সমারোহে, কনফেডারেসির তারকাখচিত লাল-নীল নিশান আর পতাকা জ্বলজ্বল করছে।

সঙ্গীত পরিবেশন করার উঁচু জায়গাটাও খুব রুচিসম্মত ভাবে তৈরি করা হয়েছে। লাল-নীল নিশান আর সবুজের মধ্যে জায়গাটা দৃষ্টির অগোচরে রয়ে গেছে। স্কারলেট জানে শহরের যত ফুলের আর গাছের টব আছে – কোলিয়াস, জেরানিয়াম, হাইড্রাঞ্জিয়া, করবী – সব এখানে নিয়ে আসা হয়েছে। এমনকি মিসেজ় এলসিং-এর বিরল রবার গাছের চারটে টবকেও চার কোনায় রাখা হয়েছে।

প্ল্যাটফর্মের উল্টোদিকে হলের অন্যপ্রান্তে প্রেসিডেন্ট ডেভিস আর জর্জিয়ার মানুষ অ্যালেক স্টিফেন্স যিনি কনফেডারেসির ভাইস-প্রেসিডেন্টের তাঁদের বিশাল ছবিতে মহিলারা ঢাকা পড়ে গেছেন। ছবির ওপরে একটা বিশাল পতাকা, আর লম্বা টেবিলের ওপর শহরের বাগান থেকে লুট করে আনা ফার্ন, গোলাপের গুচ্ছ – লাল, হলুদ আর সাদা, সোনালি গ্ল্যাডিওলা, রঙ-বেরঙের ন্যাস্টারশ্যাম, মেরুন রঙের হোলিহক এবং আরও নানারকমের ফুল। বাতিদানে মোমবাতি নীরবে আলো বিতরণ করে চলেছে। মনে হচ্ছে ছবির দুই ব্যক্তি যেন ওপর থেকে নীচের দিকে তাকিয়ে সব কিছুর ওপর নজর রাখছেন। এই ঐতিহাসিক মুহুর্তের নেতৃত্ব প্রদানকারী এই দুই ব্যক্তিত্বের মুখের মধ্যে মিলের থেকে অমিলই বেশি। ডেভিসের মসৃণ গ্রীবা – চোখে প্রশান্ত দৃষ্টি। স্টিফেনের বেদনাক্লিষ্ট মুখ ছাপিয়ে তাঁর অন্তর্ভেদি দৃষ্টিতে আগুন ঝরে পড়ছে। কিন্তু এঁদের দুজনই এই ঐতিহাসিক মুহুর্তে সবার নয়নের মনি। 

মেলার দায়িত্বে থাকা বয়স্ক লেডিরা হাসপাতালের অল্পবয়স্ক মেট্রন আর হাস্য পরিহাসে ব্যস্ত মেয়েদের তাড়া দিয়ে বুথে পাঠালেন। তারপর পেছনের যে ঘরে খাবারদাবার রাখা হয়েছে সেখানে গিয়ে ঢুকলেন। আন্ট পিটি হাঁপাতে হাঁপাতে ওঁদের পেছন পেছন দৌড়াচ্ছিলেন। 

গায়ক আর বাদকরা প্ল্যাটফর্মে গিয়ে বসে পড়েছে। ওদের কালো গোল গালগুলো ঘামে চকচক করছে। বেশ গুরুত্ব সহকারে বাদ্যযন্ত্রগুলোকে টিউনিং করে চলেছে। মিসেজ় মেরিওয়েদারের কোচোয়ান – লেভি বুড়ো – যে কিনা অ্যাটলান্টার নাম যখন মার্থাসভিল ছিল – তখন থেকেই এখানকার অর্কেস্ট্রা পরিচালনা করে – বেহালার ওপর ছড় চালিয়ে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করছে। মেলা পরিচালনার দায়িত্বে থাকা লেডিরা ছাড়া খুব কম লোকই এখন পর্যন্ত এসেছে। কিন্তু সবার নজর ওরই দিকে। খুব ধীর লয়ে বেহালা, অ্যাকর্ডিয়ান, ব্যাঞ্জো এবং আরও নানারকম বাদ্যযন্ত্র সহযোগে বেজে উঠল “লোরেনা” – এত ধীর লয়ে যে নাচা অসম্ভব। নাচের অবশ্য দেরি আছে – বুথের জিনিসপত্র সব বিক্রি হয়ে গেলে তারপর। ওয়াল্টজ়ের সুরে বিষাদের মূর্ছনা স্কারলেটের হৃৎস্পন্দন দ্রুত করে দিল। 

“পায়ে পায়ে দিন দলে যায়, লোরেনা!
ঘাসের আগায় আবার তুষারপাত।
সূর্য আবার দিগন্তে এসে নামে, লোরেনা ….”

এক-দুই-তিন, এক-দুই-তিন, ঝুঁকে পড়ে দোল দাও – তিন, ঘোরো – দুই-তিন। কি সুন্দর ওয়াল্টজ়! হাতটা সামান্য প্রসারিত করল, চোখ বন্ধ করে বিষন্ন সুরের তালে তালে দুলে উঠল। এই বিষন্ন সুর আর লোরেনার হারিয়ে যাওয়া প্রেম ওর মনে একাকার হয়ে গিয়ে বুকটা ভারি হয়ে উঠল। 

হলের মধ্যে ওয়াল্টজ়ের মূর্চ্ছনা। বাইরে চাঁদের আলোয় আলোকিত রাস্তা থেকে ঘোড়ার খুরের আওয়াজ ভেসে আসছে। ভেসে আসছে আনন্দ মুখরিত কথাবার্তার আওয়াজ। আবার কখনও কখনও ঘোড়া দাঁড় করানোর জায়গা নিয়ে নীগ্রোদের মধ্যে বচসা। মেয়েদের উচ্ছ্বল হাসি – তাঁদের পুরুষসঙ্গীদের ভরাট গলার কথাবার্তা। একে অন্যকে অভিবাদন করছে। পরিচিত কাউকে দেখে মেয়েদের উচ্ছ্বাস। হয়ত আজ দুপুরেই এরা সকলে একসাথে আনন্দ করেছে। অথচ সন্ধ্যে হতে না হতেই এমন ভাব যেন কতদিন পরে দেখা।

দেখতে দেখতে হলঘরটা গমগম করে উঠল। উজ্জ্বল পোশাকে মেয়েরা যেন প্রজাপতির পাখনায় ভর করে ভাসতে ভাসতে এল। ওদের চওড়া ঘেরের পোশাকের তলা থেকে লেসের অন্তর্বাস উঁকি মারছে। বর্তুলাকার কাঁধ আবরণহীন। বাহুর ওপর অবহেলায় ফেলে রাখা লেসের শাল আর লেসের ওড়নার নীচ থেকে ওদের স্তনসংকটের আভাস দেখা যাচ্ছে। রাজহাঁস আর ময়ূরের পালক দিয়ে তৈরি পাখা সবার হাতে। গলায় সোনার চেন। কান থেকে সোনার ঝোলা দুল মাথা নাড়ানো সাথে সাথে দুলে উঠছে। এইসব লেস, সিল্কের পোশাক, রিবন, খোঁপা সবই এসেছে দূর্ভেদ্য অবরোধের প্রহরা পেরিয়ে চোরা পথে, ইয়াঙ্কিদের চোখে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে, তাই এইসব জিনিষ প্রদর্শনের মধ্যে একটা আলাদা অহঙ্কার কাজ করেছে।

এটাও বোঝা যাচ্ছে, যে শহরের সব ফুলই কনফেডারেসির নেতাদের সম্মান জানানোর জন্য ব্যবহার করা হয়নি। মেয়েদের প্রসাধনের জন্যও কাজে লেগেছে। গোলাপ, চন্দ্রমল্লিকা, আর নানা ধরনের ফুল মেয়েদের কানে, গলায়, পোশাকে শোভা পাচ্ছে। 

যাঁরা ইউনিফর্মে এসেছেন, তাঁদের অনেককেই স্কারলেট চেনে। হয় হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকতে দেখেছে, কিংবা রাস্তায় টহল দিতে দেখেছে। আবার কাউকে কাউকে প্রশিক্ষণ নিতেও দেখেছে। ধূসর রঙের ঝকঝকে ইউনিফর্ম, প্রত্যেকটা বোতাম চকচক করছে। কবজি আর কলারে সোনার চেন, সামরিক বিভাগ অনুযায়ী, প্রত্যেকের পরনে লাল, হলুদ কিংবা নীল স্ট্রাইপ দেওয়া ট্রাউজ়ার। কোমর থেকে তরবারি ঝুলছে। চলাফেরার সময় পালিশ করা বুটের আন্দোলনে সেগুলো দুলে উঠে ঝঙ্কার তুলছে। ভাবভঙ্গী অকুতোভয়।

কি সুপুরুষ ব্যক্তিত্বের সমাহার, স্কারলেট মনে মনে ভাবল – গর্বে ওর বুক ভরে উঠল। ওঁরা এঁকে অন্যকে অভিবাদন করছেন, বন্ধুদের দিকে হাত নাড়ছেন, বয়স্ক মহিলাদের ঘাড় হেঁট করে হাত স্পর্শ করে সম্মান প্রদর্শন করছেন। হলুদ রঙের চওড়া গোঁপ, কুচকুচে কালো কিংবা বাদামি দাড়ি, যেন তারুন্যের প্রতীক সকলে। হয়ত অনেকের মাথায় এখনও ব্যান্ডেজ বাঁধা, কারও কারও হাত স্লিং দিয়ে গলা থেকে ঝোলানো। কিন্তু সেদিকে কারও ভ্রুক্ষেপই নেই। কেউ কেউ আবার ক্রাচে ভর করে হাঁটছে। ওদের সঙ্গিনীরা কি গর্বের সঙ্গে ওদের খুঁড়িয়ে পা ফেলার সাথে সাথে পা মিলিয়ে চলছে। এদের মধ্যে একটা ইউনিফর্ম এতই রঙচঙে ছিল যে মেয়েদের পোশাকের বাহারকেও হার মানিয়ে দিয়েছে। তাকে সবার মাঝে এক পরিযায়ী পাখির মত লাগছিল – একজন লুইসিয়ানার জ়ুয়েভ সৈন্য। সে পরেছে নীল আর সাদা রঙের স্ট্রাইপ দেওয়া ব্যাগি প্যান্ট, ক্রীম রঙের জুতো, ছোট লাল রঙের জ্যাকেট। কালো সিল্কের স্লিঙ্গে ওর একটা হাত ঝোলানো। মুখে মৃদু হাসি। ও হল মেবেল মেরিওয়েদারের বিশিষ্ট প্রণয়ী – রেনে পিকার্ড। মনে হচ্ছে, হসপিটালের সকলেই – অন্তন যারা হাটবার অবস্থায় রয়েছে – সবাই চলে এসেছে। যারা ছুটিতে বাড়ি এসেছে, বা যারা অসুস্থতার জন্য ছুটিতে আছে, কিংবা মেকন আর এই শহরের সমস্ত মানুষ, যিনি রেলের সঙ্গেই যুক্ত থাকুন বাঁ ডাকবিভাগের সঙ্গে, সবাই এসেছেন এই মেলায়। লেডিরা কি খুশিই না হবেন! আর হাসপাতালের আজ অনেক রোজগার হবে।

রাস্তা থেকে ড্রামের আওয়াজ, টহল দেবার পায়ের আওয়াজ, কোচম্যানদের উল্লাসধ্বনি ভেসে এল। বিউগল বাজার সঙ্গে সঙ্গে দলবদ্ধ হয়ে থাকার হুকুম জারি করল কেউ। অল্পক্ষণের মধ্যেই হোমগার্ড তাঁর দলবল নিয়ে সরু সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে এসে ভেতরে চলে এলেন। সাথে সাথে অভিবাদন, হাসি, স্যালুট করা, করমর্দন করার পালা চলতে থাকল। হোমগার্ড সংস্থায় বেশ কিছু কমবয়সি ছেলে গর্বের সঙ্গে যুদ্ধের ব্যান্ডে অংশগ্রহণ করেছে। ওরা আশা রাখছে যে সামনের বছর এই সময় ওরা ভার্জিনিয়াতে ফিরে আসতে পারবে। অবশ্য যুদ্ধ যদি ততদিন চলে। যাঁদের চুল পেকে গিয়েছে, তাঁরাও ইউনিফর্ম পরে এই সন্তানসুলভ ছেলেদের গর্বে গর্বিত হয়ে কুচকাওয়াজ় করতে করতে চলেছেন। বয়স বেড়ে যাওয়ায় এঁরা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারেননি। অবশ্য এই দলের মধ্যে অনেকেই ছিল, যারা যুদ্ধে অংশগ্রহন করতে সক্ষম হলেও এঁদের মত দৃঢ় পদক্ষেপে হাটছিল না। অনেকেই ওদের নিয়ে ফিসফাস শুরু করে দিয়েছে যে ওরা কেন লী’র সৈন্যদলে ভর্তি হয়নি।

কিন্তু এত লোকের জায়গা এই হলে হবে কি করে! একটু আগেও যে হলটাকে এত বড় লাগছিল, দেখতে দেখতে সেখানে এখন ভিড় উপচে পড়ছে। চারধারে কোলোনের আর মাথার তেলের সুগন্ধ মোমবাতির সুগন্দধকে ছাপিয়ে উঠেছে। পায়ে পায়ে হলের মেঝে ধুলোধূসরিত হয়ে উঠেছে। কথাবার্তার গুঞ্জন অন্য সব শব্দকে অস্পষ্ট করে দিয়েছে। লেভি মাঝপথে “লোরেনা” বন্ধ করে জোরে জোরে বেহালার ছড় টানতে লাগল আর অর্কেস্ট্রা “এই সুন্দর নীল পতাকার জয় হোক” ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠল।

সঙ্গে সংগে শত শত কণ্ঠ এই গান গেয়ে উঠল জয়ধ্বনির মত। হোমগার্ডের বিউগলবাদক প্ল্যাটফর্মে উঠে পড়ে গানের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিল। সমবেত সঙ্গীতের মুর্চ্ছ্বনায় হল সরগরম হয়ে উঠল। আবেগে সকলের গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল।

“জয় হো! জয় হো! দক্ষিণের অধিকারের জয় হো!
এই সুন্দর নীল পতাকার জয় হোক,
উজ্জ্বল হয়ে জ্বলে উঠুক এই পতাকার তারা!”

প্রথম স্তবক থেকে গানটা এবার দ্বিতীয় স্তবকে এল। স্কারলেটও সকলের সঙ্গে গলা মিলিয়ে গাইছে। পেছন থেকে মেলানির উদাত্ত কন্ঠ শুনতে পেল। বিউগলের তালের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে সুরেলা গলায় দেশাত্মবোধে বিভোর হয়ে গাইছে। হাতদুটো বুকের কাছে জড়ো করে রাখা, বন্ধ চোখদুটো থেকে অঝোরধারে জল গড়িয়ে পড়ছে। গান শেষ হতেই স্কারলেটের দিকে তাকিয়ে একটু লাজুক হেসে রুমাল দিয়ে চোখ মুছে নিল। 

“এই সব সৈনিকদের দেখে এত ভাল লাগছে – এদের জন্য এত গর্ববোধ হচ্ছে – আমি চোখের জল ধরে রাখতে পারিনি।”

ওর চোখে মুখে এক অনির্বচনীয় জ্যোতি – ওর সাদাসিধে মুখটাকে কমনীয় আর সুন্দর করে তুলেছে।

তরুণী থেকে বৃদ্ধা – সব মহিলাই চোখে গর্বের অশ্রু – মুখে আনন্দের অভিব্যাক্তি নিয়ে পাশের পুরুষ সঙ্গীর দিকে তাকাচ্ছে। কেউ তার স্বামী বা প্রেমিকের দিকে, অথবা মা তাঁর পুত্রের দিকে। সেই আবেগমথিত পরিবেশ, গর্ব আর ভালবাসার অভিব্যাক্তি – নিতান্ত সাধারণ মহিলাকেও অসাধারণ করে তুলেছে।

প্রত্যেক নারীর কাছে পুরুষ তার নির্ভরতার জায়গা, তার বিশ্বাসের জায়গা, তার ভালবাসার জায়গা। ওদের সাহসিকতা, বীরত্ব, উদ্দামতা, ওদের স্নেহ – এগুলো আছে বলেই না ওরা ইয়াঙ্কিদের একটুও ভয় পায়না। যে লক্ষ্য নিয়ে এই যুদ্ধ চলছে, সেটা যে কত মহৎ তাতে ওদের মনে কোন দ্বিধা নেই। এই লক্ষ্যকে ওরা নিজেদের প্রিয়জনের মতই ভালবাসে, সম্মান করে। এ যুদ্ধে ওদের বিপুল জয় নিশ্চিত। অন্য কোনও সম্ভাবনাকে মনে ঠাই দিতেও এরা চায় না। ওরা এই লক্ষ্যের জন্য জান লড়িয়ে পরিশ্রম করেছে, হৃদয় দিয়ে এর গুরুত্বকে অনুভব করেছে। ওরা স্বপ্ন দেখেছে, নিজেদের মধ্যে আলোচনা করেছে। এই লক্ষ্য আদায় করতে প্রিয়জনদের বিসর্জন দিতেও ওরা কেউ পিছপা নয়। সেই বিসর্জনের গর্ব ওদের হৃদয় চিরকাল বহন করে চলবে। ঠিক যে গর্বের সঙ্গে ওদের প্রিয়জনেরা এখন যুদ্ধের ঝাণ্ডা বহন করে চলেছে।

ওদের বুকের মধ্যে গর্ব আর আনুগত্যের জোয়ার – কনফেডারেসির সাফল্যের আশার জোয়ার। কারন চূড়ান্ত জয় ওদের দরজার গোড়ায় কড়া নাড়ছে। উপত্যকায় স্টোনোয়াল জ্যাকসনের বিজয় আর রিচমণ্ডের কাছে ইয়াঙ্কিদের সাত দিনের যুদ্ধে পরাজয় এই ব্যাপারে সন্দেহের কোন অবকাশ রাখেনি। লী আর জ্যাকসনের মত অধিনায়ক থাকতে ওদের কিসের ভয়? আর মাত্র একটা জয়ের প্রয়োজন। তাহলেই ইয়াঙ্কিরা আত্মসমর্পণ করে শান্তি ভিক্ষা করতে বাধ্য হবে। শুধু একটা মাত্র জয়! তারপরই যুদ্ধ শেষ। ঘরের ছেলেরা ঘরে ফিরে আসবে পুনর্মিলনের উৎসব করার জন্য। 

তবু সবাই কি আর ফিরে আসতে পারবে? কোন কোন গৃহ হয়ত শূন্য হয়ে যাবে। কোন কোন শিশু হয়ত তার পিতাকে আর দেখতে পাবে না। কেউ কেউ হয়ত টেনেসির পর্বতমালার গিরিখাতে অচিহ্নিত কোন কবরে চিরনিদ্রায় শায়িত থাকবে। কিন্তু লক্ষ্যলাভের জন্য এই মূল্য কি খুব বেশি? হয়ত মেয়েদের রেশমের পোশাক, কিংবা চা অথবা চিনি দূর্লভ, কিন্তু এই ধরনের রসিকতা তো নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ ব্যাপারটাকে হালকা করে নেবার একটা বাহানা। তাছাড়া ইয়াঙ্কিদের নাকের ওপর দিয়ে চোরাচালানকারীরা এসব জিনিষ নিয়েও তো আসছে। আর এই প্রাপ্তি সাধারণ ভাবে পাওয়ার থেকে অনেক বেশি রোমাঞ্চকর। খুব শিগগিরই র‍্যাফেল সেমস আর তাঁর নৌবাহিনী ইয়াঙ্কিদের যুদ্ধজাহাজের কবল থেকে বন্দর গুলো মুক্ত করে ফেলবেন। কনফেডারেসিকে যুদ্ধে জেতানোর জন্য ইংল্যাণ্ড থেকে সাহায্যও তো আসছে। কারন দক্ষিণের তুলোর সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ওদের কটন মিল্গুলো প্রায় বন্ধ হয়ে আছে। তাছাড়া অভিজাত ব্রিটিশ সমাজ বেনিয়া ইয়াঙ্কিদের বিরুদ্ধে কনফেডারেসিকেই সমর্থন করছে। 

তাই মেয়েরা গর্বের সাথে তাদের সিল্কের পোশাকে, প্রেমিককে পাশে নিয়ে আনন্দে সময় কাটিয়ে নিচ্ছে। যুদ্ধকালীন বিপদের সম্ভাবনা এই আনন্দানুভুতিকে আরও উত্তেজক করে তুলেছে। 

ভিড়ের দিকে তাকিয়ে স্কারলেটের বুক দুরুদুরু করে উঠল। একটা পার্টিতে অংশগ্রহণ করতে পারার উত্তেজনায়। কিন্তু আশেপাশে সবার আনন্দউদ্বেল মুখগুলো দেখে ও একটু ঘাবড়ে গেল। এঁরা যে অনুভুতি থেকে এত খুশি হতে পারছে, ঠিক সেই একই খুশিতে তাঁর মনে কোন সাড়া জাগছে না। একটা হতাশা ওর মধ্যে দানা বাঁধতে থাকল। এত উত্তেজনা, এত হই হুল্লোড়, যুদ্ধের অনুপ্রেরণা সবই ওর কাছে কেমন ফাঁকা মনে হল। 

বিদ্যুৎচমকের মত স্কারলেটের মনে হল যে এইসব মেয়েদের মত ও এই যুদ্ধের উদ্দেশ্য নিয়ে মোটেই অনুপ্রাণিত নয়, এদের মত সর্বস্ব ত্যাগ করার জন্যও ও প্রস্তুত নয়। ভয় পেয়ে ও ভাবল, “না না আমি এরকম চিন্তা করব না। এসব মনে আনাও পাপ!” কিন্তু ও ভাল করেই জানে এই যুদ্ধের উদ্দেশ্যর কোন মূল্যই ওর কাছে নেই। সবাই যখন উদ্দীপ্ত মুখের এই ব্যাপারে কথাবার্তা বলে, তখন ও বেশ ক্লান্তই বোধ করে। ওর কাছে যুদ্ধটা কোন পবিত্র ব্যাপারই নয়। শুধু অনর্থক কিছু মৃত্যু, অনেক টাকা খরচ, আর বিলাসের জিনিষের অপ্রতুলতা। ব্যান্ডেজ গোটানো আর উলবোনা নিয়ে ও একেবারে হাঁপিয়ে উঠেছে। পচা গলা ক্ষত সাফ করতে করতে আর আর্তনাদ শুনতে শুনতে ওর বমি পেয়ে যায়। রুগিদের চোখে মৃত্যুভয় ওকে সন্ত্রস্ত করে তোলে। 

স্কারলেট তাড়াতাড়ি একবার চরদিকে চোখ বুলিয়ে নিল। কে জানে ওর মনের মধ্যে যে সমস্ত আনুগত্যহীনআর অন্যায্য ভাবনা চিন্তা চলছে, সেগুলো ওর মুখ দেখে কেউ যদি বুঝে ফেলে! কেন যে ও অন্য মেয়েদের মত করে ভাবতে পারে না! ওরা কেমন আন্তরিকভাবে, সমস্ত মন দিয়ে যুদ্ধের প্রেরণাকে শ্রদ্ধা করে! যেটা ওরা বলে আর করে সেটা ওরা মন থেকেই করে। আর কেউ যদি একবার সন্দেহ করে বসে যে ও – নাহ এ কথাটা কাউকে জানতে দিলে চলবে না। নাহ ওকে ভান করে যেতে হবে – এই যুদ্ধ নিয়ে ও কতটা অনুপ্রাণিত – যদিও ওর মধ্যে সেই অনুভুতিটাই আসতে চায় না। একজন কনফেডারেট অফিসারের বিধবা হিসেবে সে কত গর্বিত আর কত সাহসের সাথে ও নিজের দুঃখের মোকাবিলা করছে। সর্বদা ম্রিয়মাণ হয়ে থাকতে হবে।

ওহ, কেন যে ও এইসব প্রেমময় মেয়েদের থেকে ও আলাদা? কেন যে ও কোন কিছুকেই বাঁ কারোকেই নিঃস্বার্থভাবে গ্রহণ করতে পারে না? অনুভুতিটা কতটা একাকিত্বের – যেরকম একাকিত্ব ও কোনদিন কল্পনাও করেনি! ভাবনাটাকে দাবিয়ে রাখার চেষ্টা করল প্রথমে। কিন্তু ওর চরিত্রের মধ্যে কোন রকম ছলনাকে প্রশ্রয় না দেবার যে প্রবণতা রয়েছে, তার জন্য বেশিক্ষণ এই ভাব টিকিয়ে রাখতে পারল না। তাই মেলা চলাকালীন, ওর কিংবা মেলানির বুথে মানুষের আসা যাওয়ার মধ্যেই ও খুব দ্রুততার সাথে নিজের কাছে নিজের ভাবনা চিন্তার ন্যায্যতা প্রতিপাদন করার চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকল। এই কাজটা ওর কাছে কখনওই দুরূহ মনে হয়নি। 

মেয়েগুলো কি বোকা আর পাগল! সারাক্ষণ শুধু দেশাত্মবোধ আর যুদ্ধের পবিত্র উদ্দেশ্যর কথাই বলে যাবে! আর ছেলেগুলোও তেমনি – রাষ্ট্রের অধিকার আর কি সব – কি সব নিয়ে কথা বলবে! একমাত্র ওই – স্কারলেট ও’হারা হ্যামিলটন – যার কিনা একমাত্র আইরিশ বাস্তববুদ্ধি আছে! না বাবা, এই যুদ্ধটুদ্ধ নিয়ে ফালতু মাতামাতি করা ওর দ্বারা হবে না! তবে হ্যা, ওর মনের কথা কাউকে বুঝতে দেওয়া চলবে না। তাহলেই কেলেঙ্কারি! এসব ব্যাপারে ওর বাস্তববুদ্ধি খুব টনটনে। কেউ কোনভাবেই ওর মনের কথা আন্দাজ করতে পারবে না। এই মেলার লোকেরা কি আশ্চর্যই না হবে যদি ওরা ওর মনের কথা টের পেয়ে যায়! যদি হঠাৎ ও মঞ্চে গিয় ঘোষণা করে দেয় যে এই যুদ্ধ থেমে যাওয়া উচিত। তাই সবাই যার যার বাড়ি ফিরে যাও আর তুলো চাষে মন দাও। এখন থেকে আবার মাঝে মাঝেই পার্টি হবে – ছেলে মেয়েরা আবার আগের মতই প্রাণখুলে মেলামেশা করবে। সবাই রীতিমত চমকে যাবে! 

এসব ভেবে স্কারলেট কিছুক্ষণের মধ্যে উৎফুল্ল হয়ে উঠল, কিন্তু হলের দিকে বিতৃষ্ণা নিয়েই তাকাল। মিসেজ় মেরিওয়েদার যেরকম বলেছিলেন, ম্যাক্লিওর মেয়েদের বুথটা সত্যিই খানিকটা দৃষ্টি অগোচর। তাঁর ফলে, বেশ অনেকক্ষন ধরে ওই বুথ ফাঁকাই থেকে যাচ্ছে। তাই স্কারলেটের তেমন কিছু করারি থাকছে না, আর খুশিতে মত্ত ভিড়ের দিকে নজর পড়ে হিংসে হচ্ছে। স্কারলেটের ভাবপরিবর্তন মেলানি লক্ষ্য করেছিল, কিন্তু চার্লির জন্য মন খারাপ মনে করে, ওর সাথে কোন কথাবার্তা চালানোর চেষ্টা করেনি। স্কারলেট যখন বিষন্নভাবে হলের চারদিকে দেখছিল ও তখন নিজের বুথের জিনিষগুলো আরো আকর্ষণীয় করে সাজাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। মিস্টার ডেভিস আর মিস্টার স্টিফেন্সের ছবির তলায় রাখা ফুলগুলোও স্কারলেটকে অসন্তুষ্ট করে তুলল। 

“মনে হচ্ছে যেন একটা বেদীতে রাখা আছে,” স্কারলেট নাক কুঁচকাল। “আর এমন আদিখ্যেতা এরা করছে এঁদের নিয়ে মনে হচ্ছে যেন বাবা আর ছেলে!” হয়ত অসম্মানজনক কিছু বলেই ফেলছিল, কিন্তু শেষমুহুর্তে নিজেকে সংযত করে ফেলল।

“সত্যি কথাই তো,” স্কারলেট আবার নিজের বিবেককে বোঝাতে শুরু করল। “সবাই ওঁদেরকে দেবতার মত করে ভাবছে। যদিও আসলে ওঁরা মানুষই। খুব একটা সুপুরুষ নন, এই যা!”

একথা অবশ্য সত্যি যে চেহারার জন্য মিস্টার স্টিফেন্সকে কোনভাবেই দায়ী করা চলে না। বেচারাকে প্রায় সারাটা জীবনই পঙ্গু হয়ে কাটাতে হয়েছে। কিন্তু মিস্টার ডেভিস – স্কারলেট একবার ওই খোদাই করা গর্বিত মুখের দিকে তাকাল। ওই ছাগলে দাড়িটাই সব মাতি করে দিয়েছে। হয় ছেলেরা পুরো দাড়ি রাখবে, না হলে পুরোটাই কেটে ফেলবে। 

“ওই ছাগল দাড়ি দেখে মনে হচ্ছে যেন এর থেকে ভাল কিছু করার কথা উনি ভাবতেই পারেন না,” স্কারলেট ভাবল। ওঁর চেহারার মধ্যে যে একটা শীতল বুদ্ধিমত্তার ছাপ রয়েছে সেটা ওর নজর এড়িয়ে গেল।

না ও মোটেও সুখে নেই। লোকজনের মাঝে আসতে পেরে সাময়িক ফুর্তি একটা হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু শুধু আসতে পারাটাই যথেষ্ট মনে হচ্ছে না এখন। কেউ তো ওর দিকে ঘুরেও তাকাচ্ছে না! ওই হচ্ছে একমাত্র অবিবাহিত যুবতী মেয়ে যার কোন প্রেমিক নেই। অথচ সে কিনা এতদিন সবার মনযোগের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে থেকেছে! কি অন্যায় কথা! ওর বয়স মাত্র সতেরো, ওর পাদুটো চঞ্চল হয়ে উঠেছে সব কিছু ছেড়ে দিয়ে নেচে ওঠার জন্য। এই সতেরো বছর বয়সে ওর স্বামী ওকল্যান্ডের সমাধিস্থলে শায়িত রয়েছে, ওর শিশুসন্তান আন্ট পিটির কোলে শুয়ে আছে। আর সবাই ভাবছে ও এই ভাগ্য নিয়ে খুশি থাকবে? এখানকার সব মেয়েদের থেকে ও তন্বী, সবচাইতে সুন্দরী। অথচ ওকে কিনা সারা জীবন “চার্লসের প্রিয়তমা স্ত্রী” এই তকমা লাগিয়ে চলতে হবে!

এখন ও আর অল্পবয়সী মেয়ে নেই যে সকলের সাথে নাচে যোগ দেবে কিংবা ছেলেদের সাথে ফষ্টিনষ্টি করবে, আবার বউও নয় যে অন্য বউদের সঙ্গে একসাথে বসে নৃত্যরতা কিংবা ফষ্টিনষ্টি করা মেয়েদের সমালোচনা করবে। আর বিধবা হয়ে যাবার মত যথেষ্ট বয়সও ওর হয়নি। বিধবারদের বুড়ি হওয়া উচিত – এত বুড়ি হয়ে যাওয়া উচিত – যে তারা নাচতে, বা ফষ্টিনষ্টি করতে বা কারও তারিফ শোনবার জন্য উদগ্রীব হয়ে থাকবেন না। কি অন্যায়, ওকে এখানে শান্তশিষ্ট হয়ে বসে বসে বৈধব্যের সম্ভ্রমবোধের চূড়ায় পৌঁছতে হবে। আর যখন ওর বয়স কিনা মাত্র সতেরো। কি অন্যায়, যখন পুরুষ মানুষ – এমনকি যাঁরা সুপুরুষ – তাঁরাও ওর বুথে এলে তাদের সঙ্গে মৃদুস্বরে, চোখ নামিয়ে কথা বলতে হবে। 

অ্যাটলান্টার প্রতিটি মেয়ের একজন প্রেমিক রয়েছে। এমনকি একেবারে সাধারণ চেহারার মেয়েরাও ফুলবব হয়ে থাকবে। আর যেটা কিনা সব থেকে অসহ্য – সকলেই কি সুন্দর সুন্দর সব ড্রেস পরে রয়েছে!

আর ও নিজে গলা পর্যন্ত বোতাম লাগানো কব্জি পর্যন্ত ঢাকা একটা কুটকুটে কালো জোব্বা পরে বসে আছে! দেখাচ্ছে ঠিক একটা কাকের মত। গয়নাগাটিও তেমন কিছুই পরেনি – স্ফটিকের তৈরি এলেনের শোকসূচক একটা ব্রোচ ছাড়া। অন্য মেয়েরা সুন্দর সুন্দর ছেলেদের সঙ্গে আঠার মত লেগে রয়েছে। এই সব কিছুর জন্য চার্লসের হাম হওয়াটাই দায়ী। তাও যদি যুদ্ধে বীরের মত মৃত্যু হত তাহলেও না হয় ওর জন্য একটু গর্ববোধ করতে পারত।

ম্যামির পই পই করে মানা করা সত্ত্বেও, কাউন্টারে কনুইয়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে ভিড়ের দিকে তাকিয়ে থাকল। এতে নাকি কনুইটা দেখতে খারাপ হয়ে যায় আর চামড়া কুঁচকে যায়। হলে হবে, কি এসে যায়? আর কি কখনও ওগুলো দেখানোর সুযোগ আসবে? ক্ষুধার্ত চোখে ও মেয়েদের পোশাকআশাকের বাহার দেখতে লাগল। মেবেল মেরিওয়েদার সেই জ়্যুয়েভ সঙ্গীর হাত ধরে পাশের বুথে গেল। ওর পরনে চার্লস্টন্থেকে আনা লেসের সূক্ষ্ম কারূকার্যমণ্ডিত একটা আপেল-সবুজ রঙের মসলিনের পোশাক। সেই পোশাকটা এতটাই ছড়িয়ে আছে, যে ওর কোমরটা যেন তার মধ্যেই হারিয়ে গেছে। এই পোশাক অবরোধের চোরাপথ দিয়ে আনা হয়েছে। কিন্তু মেবেল এমন ভাব করছে যে মিশ্তার রেট বাটলার নয়, ও নিজেই ওটা চোরাপথে আমদানি করেছে।

“কি সুন্দরই না আমাকে লাগত ওই ড্রেসটায়, ঈর্ষান্বিত হয়ে স্কারলেট ভাবল। “ওর কোমর তো একটা গরুর চেয়েও মোটা! ওই সবুজ রঙটা আমাকেই মানায়। ওটা পরলে আমার চোখগুলো – কেন যে সব ফরসা মেয়েরা ওই রঙটাই পরতে ভালবাসে? ওর ত্বককে বাসী ছানার মত সবুজ দেখাচ্ছে! ওই রঙটা আর কখনও আমি পরতে পারব না। এমনকি এই শোকপর্ব মিটে গেলেও না। এমনকি যদি আমি আবার বিয়ে করি তবুও নয়! তখন আমাকে ম্যাড়ম্যাড়ে ধূসর কিংবা বেগুনি রঙের পোশাকই পরতে হবে।”

কিছুক্ষণ ব্যাপারটার অবিচারপূর্ণতা নিয়ে মগ্ন হয়ে রইল। আনন্দ করার সময়, ভাল ভাল পোশাক পরবার সময়, নাচার, ফষ্টিনষ্টি করার সময় কত তাড়াতাড়ি ফুরিয়ে যায়! তারপর তোমার বিয়ে হয়ে গেল আর যত রাজ্যের নিষ্প্রভ পোশাক পরতে হবে, আর ছেলেমেয়ে হলেই তোমার কোমর চওড়া হয়ে যাবে। এক কোনে অন্য মায়েদের সঙ্গে বসে তুমি শুধু অন্যদের নাচতে দেখতে পারবে। আর নাচলেও সেটা একমাত্র তোমার স্বামীর সঙ্গে! অথবা কোন বৃদ্ধ ভদ্রলোকের সঙ্গে, যিনি হয়ত কখনও কখনো তোমার পা মাড়িয়ে দেবেন! আর তুমি যদি কোন অন্যথা করেছ তাহলে লোকে তোমার নিন্দে করবে আর তোমার পরিবার ছোট হয়ে যাবে! আর এই যে ছোটবেলা থেকে তোমাকে শেখানো হয়েছে কি করে নিজেকে আকর্ষনীয় করে তুলতে হয়, কি করে প্রেমিক জোগাড় করতে হয় – এই সব মাত্র দু”একবছরের জন্যই কাজে লাগাতে পার। এলেন আর ম্যামির কাছ থেকে অর্জিত এই সব শিক্ষা কত যথাযথ ছিল! সবসময়ই কাজে লেগেছে। কতগুলো নির্দিষ্ট নিয়ম তোমাকে মেনে চলতে হবে। সেটা যদি পার, তাহলে তোমাকে কেউ আটকাতে পারবে না। 

এই সব বয়স্ক মহিলাদের কাছে তোমাকে সরল আর নিষ্পাপ হয়ে থাকতে হবে, কারন এঁদের নজর করবার ক্ষমতা এত বেশি যে একটু বেগড়বাই করলেই তাঁরা তোমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বেন! বয়স্ক ভদ্রলোকদের সঙ্গে তুমি যদি একটুও প্রগলভতা করেছ কিংবা একটু ফষ্টিনষ্টি করতে গেছে তাহলে আবার তাঁদের অহঙ্গকারবোধে সুড়সুড়ি লেগে যাবে। ওঁরা তখন শালীনতার সীমা লঙ্ঘন করে আর নিজেদের বয়সের কথা ভুলে গিয়ে তোমার চিবুক নেড়ে তোমার ঘনিষ্ঠ হতে চাইবেন। আর তখন যদি তুমি লজ্জা পেয়ে চোখ নামিয়ে না নাও, তাহলে ওঁরা তোমার সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ হতে চাইবেন – যেটা আবার খুবই দৃষ্টিকটু ব্যাপার হবে। আবার নিজেদের সন্তানের কাছে তোমার চরিত্র নিয়ে আজেবাজে কথা বলবেন।

কমবয়সী মেয়েদের কিংবা কমবয়সি বিবাহিত মেয়েদের দেখলেই তাদের সঙ্গে তোমাকে মিষ্টি করে হেসে কথা বলতে হবে আর তাদের গালে চুমু খেতে হবে। সেটা যদি দিনে দশবারও হয় তাহলেও। তোমাকে ওদের কোমর জড়িয়ে ধরতে হবে এবং ওদেরকেও তোমার কোমর জড়িয়ে ধরতে দিতে হবে। তোমার পছন্দ না হলেও। তোমাকে ওদের পোশাকের প্রশংসা করতে হবে, ওদের বাচ্চাকে আদর করে দিতে হবে আর ওদের প্রেমিকাদের নিয়ে মস্করা করতে হবে। বিবাহিত মেয়েদের স্বামীদের দিকে সলজ্জভাবে তাকিয়ে মৃদু হেসে অভিবাদন জানাতে হবে। আর সবসময় এমন ভাব দেখাতে হবে যে তুমি যেন ওদের থেকে অনেক কম সুন্দরী। আর সব থেকে বড় কথা হল, তুমি আসলে যেটা মনে মনে ভাবছ, সেটা কখনওই ওদের মুখের ওপর বলে দেবেনা, যেমন ওঁরাও তোমাকে ওদের মনের আসল অনুভুতিটা তোমার কাছে প্রকাশ করবে না। 

অন্য মেয়েদের বরকে তুমি শক্তভাবে এড়িয়ে চলবে – এমন কি সে যদি তোমার প্রাক্তন প্রণয়ী হয় তবুও। যদি তাদের সৌন্দর্যে তুমি আকৃষ্ট হয় তাহলেও না। তুমি যদি কোন কমবয়সি মহিলার স্বামীর প্রতি বিশেষ আগ্রহ দেখাতে থাক, তাহলে সেই মেয় তোমার চরিত্র নিয়ে অপবাদ দেবে। আর তুমি কোনদিনও নতুন করে প্রেমিক ধরতে পারবে না। 

কিন্তু কমবয়সি অবিবাহিত ছেলেদের সঙ্গে – সেটা একেবারে আলাদা ব্যাপার! তোমাকে হাসতে দেখে ওঁরা যখন তোমার কাছে হাসার কারন জানতে চাইবে, তখন তুমি ওদের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসতে পার। তোমার হাসার কারন নিয়ে তুমি রহস্য করে ওদের যতক্ষণ ইচ্ছে তোমার আশেপাশে লেগে থাকতে দিতে বাধ্য করতে পার। চোখের ইশারায় তুমি ওকে প্রলুব্ধ করতে পার যাতে ও তোমাকে একলা পাওয়ার বাহানা খুঁজবে। যখন তোমাকে ও চুমু খেতে চাইবে তখন তুমি ভান করবে যে তুমি কত আঘাত পেয়েছ, কিংবা কত রেগে গেছ। ও যখন ওর ব্যবহারের জন্য ক্ষমা চাইবে তখন মিষ্টি হেসে ওকে ক্ষমা করে দেবে যাতে ও সারা সন্ধ্যা তোমার পেছন পেছন ঘুরে বেড়ায়। হয়ত ও তোমাকে আবার চুমু খেতে চাইবে। তখন পরিস্থিতি বুঝে কখনও কখনও তুমি ওকে চুমু খেতে দেবে। (এটা অবশ্য এলেন আর ম্যামি ওকে শেখাননি, কিন্তু নিজের অভিজ্ঞতা থেকে জানে এটা খুব কার্যকরী!) তারপর তুমি বিলাপ করতে করতে বলবে তুমি বুঝতেই পারছ না এটা কেন হল, আর হয়ত এর জন্য ছেলেটা ওকে আর শ্রদ্ধা করতে পারবে না। তারপর ও তোমার চোখ মুছিয়ে দিতে চাইবে আর তোমাকে বিয়ে করার জন্য প্রস্তাব দেবে। এটা দেখানোর জন্য, যে ও তোমাকে কতটা শ্রদ্ধা করে। আর এছাড়া অবিবাহিত ছেলেদের ভোলাবার কত উপায় আছে – সবই ওর জানা আছে। আড় চোখে ছেলেদের দিকে তাকানো, হাতপাখার আড়াল থেকে অস্পষ্ট হাসি, কোমরটা একটু দোলানো যাতে স্কার্টের ওপর থেকে ঠিক একটা ঘন্টার মত দেখতে লাগে। কান্না, হাসি, মিষ্টি করে সহানুভূতি দেখানো – কত রকম ছলই না আছে! এই সব ছলা কলা সবার ওপর কি সুন্দর কাজ করে – একমাত্র অ্যাশলে ছাড়া। 

এই সব ছলাকলা শিখে লাভের লাভ কিছুই হল না। মাত্রি এক দুই বছর কাজে লাগিয়ে এখন সারাজীবনের মত শিকেয় তুলে রাখতে হবে। বিয়ে না করলেই কত ভাল ছিল। তাহলে সারাজীবন সবুজ রঙের ড্রেসে সুন্দরী হয়ে ছলাকলা দিয়ে সুন্দর সুন্দর ছেলেদের সঙ্গে ফষ্টিনষ্টি করতে পারত। অবশ্য বেশিদিন চালিয়ে গেলে আবার তুমি বুড়ো বয়স পর্যন্ত আইবুড়ো থেকে যেতে হবে। ঠিক ইন্ডিয়া উইল্কসের মত। সবাই ওকে বেচারা বলে। শুনতে কি খারাপ লাগে! এর থেকে বরং বিয়ে করে নিজের আত্মসম্মান বাঁচানো উচিত – হয়ত ফুর্তি করার সুযোগ একটু কমে যায়। 

জীবনটাই মাটি হয়ে গেল! একদম আহাম্মকের মত চার্লসকে বিয়ে করে বসল! মাত্র ষোল বছর বয়সে! এত ছেলে থাকতে! 

হঠাৎ সবাই মিলে দেওয়ালের দিকে ভিড়কে সরে যেতে দেখে স্কারলেটের অসূয়াপূর্ণ চিন্তাস্রোতে বাধা পড়ল। মেয়েরাও ধাক্কাধাক্কি বাঁচিয়ে দেওয়ালের দিকে চলে এল। স্কারলেট পায়ের আঙ্গুলে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে ভিড়ের ওপর দিয়ে লক্ষ্য করল সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন সিঁড়ি বেয়ে অর্কেস্ট্রার প্ল্যাটফর্মের ওপর উঠে যাচ্ছেন। তিনি জোর গলায় বাহিনীর লোকদের শান্ত হতে সারি বেঁধে দাঁড়াতে বললেন। শতকরা পঞ্চাষভাগ লোকই বাহিনীর। তারা সারিবদ্ধ ভাবে দাঁড়াল। তারপর কয়েক মিনিট ধরে খুব দ্রুততার সঙ্গে কয়েকটা ড্রিল চলল তাতে সকলেই ঘেমে উঠল। হাততালি আর হর্ষধ্বনির মাধ্যমে দর্শকরা স্বাগত জানাল। কর্তব্যবোধে স্কারলেটেও অন্যদের মত তালি দিল। বাহিনীর লোকেরা ড্রিল শেষ হওয়ার পরে পানীয়ের বুথগুলোতে গিয়ে জড় হল। স্কারলেট ভাবল যদি প্রতারণা করতেই হয় তাহলে এখনই শুরু করা দরকার।

মেলানির দিকে ফিরে বলল, “ওদের খুব ভাল লাগছে। তাই না?” 

মেলানি কাউন্টারের ওপর বুনন সামগ্রী সাজিয়ে রাখতে ব্যস্ত ছিল। বলল, “ওদের ধূসর ইউনিফর্মে ভার্জিনিয়াতে আরো ভাল দেখাবে।” কথাটা বেশ জোরের সঙ্গেই, গলা না নামিয়েই বলল। 

বাহিনীর অনেক সৈন্যর গর্বিত মায়েরা আশেপাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাঁরা মেলানির এই মন্তব্য শুনতে পেলেন। মিসেজ় গুইনান শুনতে পেয়ে প্রথমে লাল হয়ে গেলেন, তারপরে সাদা। তাঁর পঁচিশ বছর বয়সি ছেলে উইলিস সেনাবাহিনীতে রয়েছে।

মেলির মুখ থেকে এই ধরনের কথা শুনে স্কারলেট কিছুটা হতবুদ্ধি হয়ে পড়ল।

“এ কথা কেন বলছ, মেলি?”

“কথাটা যে সত্যি, সে কথা তোমাকে নিশ্চয়ই বলে দিতে হবে না স্কারলেট। আমি অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলেদের বা বৃদ্ধ ভদ্রলোকদের কথা বলতে চাইনি। কিন্তু বাহিনীর প্রত্যেকেই রাইফেল চালাতে পারদর্শি। এই মুহুর্তে সেটাই তাদের করনীয়।”

“তবুও – তবুও,” স্কারলেট বলে উঠল – আগে কখনও এটা ও ভেবে দেখেনি। “ কেউ কেউ তো বাড়িতে থাকবেই –“ উইলি গুইনান কি যেন বলেছিল ওকে – অ্যাটলান্টায় এখন থেকে যাওয়ার কারন হিসেবে? “ রাষ্ট্রকে নিরাপত্তা দেবার জন্য, কাউকে কাউকে তো বাড়িতে থাকতেই হবে।”


“কেউই আমাদের আক্রমণ করেনি, কেউ আক্রমণ করতেও যাচ্ছে না,” খুব ঠাণ্ডা গলায় মেলি বলল – একদল বাহিনীর সৈন্যদের দেখতে দেখতে। “তাছাড়া আক্রমণকারীকে আটকানোর সব থেকে ভাল উপায় হল ভার্জিনিয়াতে গিয়ে ইয়াঙ্কিদের সঙ্গে লড়াই করা। আর এই যে শুনতে পাচ্ছি যে নীগ্রোরা আমাদের বিরুদ্ধে নাকি অস্ত্র তুলে নেবে – এটা ভাবাটাই অর্থহীনবলে মনে হয়। ওঁরা তো আমাদেরই লোক। ওঁরা কেন আমাদের বিরুদ্ধে যাবে? কাপুরুষদের জন্য অবশ্য এটা একটা ভাল বাহানা। যদি পুরো বাহিনী ভার্জিনিয়াতে ইয়াঙ্কিদের বিরুদ্ধে লড়াই করে, আমার মনে হয় না এক মাসের বেশি সময় লাগবে ওদের কায়দা করতে। তাহলে বল।”

“কি বলছ তুমি, মেলি,” স্কারলেট অসহিষ্ণু হয়ে বলল।

মেলির শান্ত গভির চোখে ক্রোধের অভিব্যাক্তি। “ আমার স্বামী যেতে ভয় পায়নি। তোমার স্বামীও না। আর আমি মনে করি এখানে বসে থাকার থেকে ওঁরা দুজনেয় যদি যুদ্ধক্ষেত্রে মারা যেত সেটাই বেশি গৌরবের হত, - ওহ সোনা – আমি না জেনে তোমাকে আঘাত দিয়ে ফেলেছি – আমি কি নিষ্ঠুর!

ও ধীরে ধীরে স্কারলেটের বাহুতে হাত বুলিয়ে দিতে থাকল। স্কারলেট ওর দিকে চেয়ে থাকল। কিন্তু ওর চিন্তা জুড়ে চার্লস ছিল না। ছিল অ্যাশলে। সত্যই যদি ও মরে যায়? তাড়াতাড়ি চোখ ঘুরিয়ে নিয়ে ডঃ মিডের দিকে তাকাল। উনি ওদের বুথের দিকে এগিয়ে আসছিলেন।দ

“এই যে মেয়েরা,” উনি ওদের সম্ভাষণ করে বললেন। “তোমরা এসেছ দেখে খুব ভাল লাগছে। কতটা ত্যাগ স্বীকার করে তোমরা আজ সন্ধ্যায় এসেছ, সেটা আমি জানি। কিন্তু আমাদের অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্যি এই ত্যাগটুকুর প্রয়োজন ছিল। আমি তোমাদের একটা গোপন কথা বলেতে যাচ্ছি। হাস্পাতালের জন্য আরো অধিক অর্থসঙ্গগ্রহের জন্য আমি একটা অভিনব উপায় অবলম্বন করতে যাচ্ছি। ভয় পাচ্ছি হয়ত কিছু কিছু মহিলা এ নিয়ে আপত্তি তুলবেন।য়

এই বলে তাঁর ছুঁচলো দাড়িতে হাত বুলিয়ে মুখ টিপে হাসলেন।

“ওহ তাই বুঝি! বলুন না।”

“নাহ, এখন মনে হচ্ছে তোমাদেরও আন্দাজ করবার জন্য সময় দেওয়া উচিত। কিন্তু মনে রেখো, চার্চের লোকরা যদি আমাকে শহরছাড়া করতে চায়, তখন তোমরা কিন্তু আমার পেছনে থেকো। আসলে এটা হাসপাতালের ভালর জন্যই করতে চাইছি। দেখে নিও। এর আগে এরকম ব্যাপার কারুও মাথাতেই আসেনি।”

এই বলে উনি সাড়ম্বরে কোনের দিকে যেখানে পুরুষ সঙ্গীরা বসে আছে সেদিকে এগিয়ে গেলেন। দুই মেয়ে যখন নিজেদের মধ্যে মুখ তাকাতাকি করে সে গোপন রহস্য উদ্ধারের জন্য জল্পনা করতে শুরু করবে তখন দুজন বৃদ্ধ ভদ্রলোক ওদের বুথের দিইকে এগিয়ে এসে বেশ চেঁচিয়ে বললেন যে ওঁদের দশ মাইল লম্বা ট্যাটিং লেস দরকার। লেস মেপে দিতে দিতে স্কারলেট মনে মনে ভাবল যে একেবারে কেউ না আসার থেকে বৃদ্ধ ভদ্রলোক আসাটা মন্দের ভাল। কাজ মিটে যেতেই দুই বৃদ্ধ ধাওয়া করলেন লেমনেড বুথের দিকে। তাঁরা চলে যেতেই কাউন্টারে অন্য গ্রাহক চলে এলেন। অন্য বুথের মত ওদের বুথে অত ভিড় নেই। মেবেল মেরিওয়েদারের অট্টহাসি, ফ্যানি এলসিংএর চাপা গলায় হাসি আর হোয়াইটিং মেয়েদের বাঁকা কথাবার্তা ভেসে আসছে। পাকা দোকানদারের মত মেলি গ্রাহকদের অকাজের জিনিষ বিক্রি করে চলেছে – যেগুলো কোনদিন তাদের কোন কাজে আসবে কিনা সন্দেহ। স্কারলেট মেলিকে দেখাদেখি একই কাজ করতে লাগল।

ওদের কাউন্টার ছাড়া অন্য সব কাউন্টারেই বেশ ভিড়। মেয়েরা গল্প করছে। ছেলেরা কিছু না কিছু কিনছে। যে ক’জন ওদের কাউন্টারে আসছে, তারা অ্যাশলের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ে কবে পড়াসোনা করেছে, ও কত ভাল সৈন্য বলে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছে, চার্লসের মৃত্যুতে অ্যাটলান্টার কত ক্ষতি হয়ে গেছে – এই সব নানারকম আলোচনা করতে লাগল।

এরপরে শুরু হল আলন্দোচ্ছল “জনি বুকার, সেই নিগারকে সাহায্য কর” গানটা বেজে উঠল। স্কারলেটের চেঁচিয়ে উঠতে ইচ্ছে হল। নাচার জন্য ওর পা নিশপিশ করতে লাগল। ড্যান্সিংফ্লোরের দিকে তাকিয়ে ও পা ঠুকে ঠুকে গানের তালে তালে তাল দিতে লাগল। ওর সবুজ চোখ দুটো উত্তেজনায় জ্বলজ্বল করতে লাগল, পলক ফেলতে ভুলে গেল। ফ্লোরের অপর প্রান্তে, দরজা দিয়ে একজন মানুষকে এসে দাঁড়াতে দেখা গেল। তাঁর তীক্ষ্ণ, ঈষৎ বক্র। অবাধ্য চাহনি ওদের ওপর পড়ল। তাঁর চোখে দৃষ্টিতে চিনতে পারার অভিব্যক্তি। তারপর নিজের মনেই হাসলেন। যে আমন্ত্রণ সব পুরুষ্মানুষই আন্দাজ করতে পারে, সেটাই আন্দাজ করে।

কালো বনাতের পোশাক তাঁর পরনে। কাছাকাছি যে সমস্ত অফিসাররা দাঁড়িয়ে ছিলেন, মাথায় তাঁদের ছাড়িয়ে গেছেন – লম্বা মানুষ তিনি। চওড়া কাঁধ কোমরের দিকে সরু হয়ে এসেছে। জুতোর আড়ালে পা দুটো অতিরিক্ত ছোট। রুচিসম্মত কালো পোশাকে, শক্তিশালী গড়নে আর আড়ষ্টতাহীন চাল চলনে তাঁকে অত্যন্ত সাবলীল লাগছে। চুল কুচকুচে কালো, সযত্নে লালিত কালো গোঁপ অন্যদের থেকে তাঁকে আলাদা করে দিয়েছে। তাঁর চেহারার মধ্যে একটা বলিষ্ঠ ভাব। একটা আত্মপ্রত্যয় আর এক ধরনের অস্বস্তিকর ঔদ্ধত্য অপ্রীতিকর অসূয়া খেলা করছে। তিনি স্কারলেটের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন। তখন স্কারলেট বাধ্য হয়েই তাঁর দিকে তাকাল।

স্কারলেটের মনে হল ভদ্রলোককে যেন কোথায় দেখেছে, কিন্তু তিনি কে সেটা তখন তখনই মনে করতে পারল না। কিন্তু একটা ব্যাপার ভেবে ভাল লাগল যে অনেকদিন পরে একজন পুরুষমানুষ ওর সম্বন্ধে কৌতুহল দেখিয়েছেন। ও ভদ্রলোকের দিকে তাকিয়ে সুন্দর করে হাসল। তারপর ভদ্রলোক প্রত্যুত্তরে সৌজন্য প্রদর্শন করলেন ও তাঁর দিকে তাকিয়ে সামান্য ‘বাও’ করল। তারপর তিনি যখন ওর দিকে দ্রুত পায়ে এগিয়ে আসতে লাগলেন তখন ওঁকে চিনতে পেরে শঙ্কায় মুখে হাত চাপা দিল।

ভিড় ঠেলে উনি যত ওর দিকে এগিয়ে আসতে থাকলেন, ততই তড়িতাহতের মত ওর হাত পা আড়ষ্ট হয়ে যেতে থাকল। ও তাড়াতাড়ি জলযোগ কক্ষের দিকে পালিয়ে যেতে গিয়ে একটা পেরেক স্কার্টে আটকে যাওয়াতে ওকে দাঁড়িয়ে যেতে হল। সেটা ছাড়াতে গিয়ে স্কার্টটা ছিঁড়ে গেল। ততক্ষণে ভদ্রলোক ওর পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। 

“দয়া করে আমাকে দেখতে দাও,” এই বলে নীচু হয়ে উনি স্কার্ট থেকে পেরেকটা ছাড়িয়ে দিলেন। “আমাকে আপনি মনে রাখবেন, এমন আশা অবশ্য আমি করিনি, মিস ও’হারা’”

কথাগুলো বললেন অত্যন্ত মধুর স্বরে অত্যন্ত ভদ্র ভাবে। ভরাট গলায়, অত্যন্ত ধীরে ধীরে। মিনতি মাখা চোখে স্কারলেট ওঁর দিকে তাকাল – ওঁর সাথে শেষবার মুখোমুখি হবার সময়কার ঘটনার আড়ষ্টতা ওর চোখে মুখে ফুটে উঠল। ওঁর কালো চোখে একটা নির্দয় প্রসন্নতা খেলা করছে। এই অসভ্য লোকটা, যিনি হামেশাই মেয়েদের সর্বনাশ করে থাকে্ন, যাঁকে কেউ সামাজিক অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানান না – যিনি কিনা ওর আর অ্যাশলের মধ্যে সেই কথোপকথনের একমাত্র সাক্ষী – এত লোক থাকতে ওঁকেই এখানে আসতে হল! এই ঘৃন্য মানুষটাই ওকে বলেছিল যে ও লেডি নয় – অবশ্য সেটা বলার কারন যে ছিল সেটা মানতেই হবে!

ভদ্রলোকের গলা শুনে মেলানি ঘুরে তাকাল। জীবনে এই প্রথম স্কারলেট ওর ননদের সান্নিধ্যে খানিকটা স্বস্তিবোধ করল। 

“আরে – আপনি – আপনি মিস্টার রেট বাটলার – ঠিক ধরেছি না?” অল্প হেসে মেলানি হাত বাড়িয়ে দিল। “আমাদের আগে দেখা হয়েছে __”

“নিশ্চয়ই, আপনাদের বাগদানের শুভ অবসরে,” নীচু হয়ে সৌজন্যের সাথে ওর বাড়িয়ে দেওয়া হাতকে স্পর্শ করে বললেন। “আমাকে মনে রাখার জন্য আমি খুবই কৃতজ্ঞ।”

“চার্লস্টন থেকে এত দূরে – আপনি কোন কাজে আসতে হয়েছে, মিস্টার বাটলার?”

“নেহাতই ব্যবসার স্বার্থে, মিসেজ় উইল্কস। এখন থেকে মাঝে মাঝেই আমাকে আপনাদের শহরে আসতে হবে। দরকারি জিনিসপত্র নিয়ে আসা, তাঁর ওপর সেগুলো সঠিকভাবে বন্টন হল কিনা সেটার খেয়ালও রাখতে হবে।”

“জিনিষপত্র আনা?” মেলানির ভ্রু একটু কোঁচ হল। তারপর প্রসন্ন হেসে বলল, “বুঝেছি, আপনিই সেই বিখ্যাত ক্যাপটেন বাটলার – আপনার সম্বন্ধে আমরা শুনেছি – আপনিই এই অবরোধের বাধা অতিক্রম করে, নানারকম জিনিষপত্র নিয়ে আসেন। এখানে সব মেয়েই আপনার আনা পোশাক পরে। স্কারলেট তোমার রোমাঞ্চ হচ্ছে না – আরে কি ব্যাপার স্কারলেট – তোমার শরীর খারাপ লাগছে? – আরে তুমি অজ্ঞান হয়ে পড়ছ?”

স্কারলেট টুলের ওপর বসে পড়েছে। এত জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিতে হচ্ছে যে মনে হচ্ছে যে ওর কোমরের লেস ছিঁড়ে যাবে। কি সাংঘাতিক ব্যাপার ঘটল! এই ভদ্রলোকের সঙ্গে আবার দেখা হওয়ার কথা ওর কল্পনাতেও আসেনি। উনি ওর কালো হাতপাখাটা তুলে নিয়ে হাওয়া করতে লাগলেন, খুব উৎকণ্ঠিত ভাবে – যেন একটু বেশিই উৎকণ্ঠার সঙ্গে – কিন্তু ওঁর চোখ দুটো তখনও হাসছে। 

“বেশ গরম এখানে,” বললেন তিনি। “মিস ও;হারার অজ্ঞান হয়ে যাওয়া খুব আশ্চর্যের কথা নয়। আমি কি তোমাকে একটা জানালার ধারে নিয়ে যেতে পারি?”

“না,” এত রুক্ষভাবে স্কারলেট বলল যে মেলি চমকে উঠল।

“এখন ও আর মিস ও’হারা নয়,” মেলি বলল। “এখন ও মিসেজ় হ্যামিলটন এখন ও আমার বোন,” বলে মেলি ওঁর দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে একটু হাসল। স্কারলেটের মনে হল ক্যাপটেন বাটলারের জলদস্যুর মত কালচে মুখের দিকে তাকালে ওর দম বন্ধ হয়ে যাবে।

“আমার মনে হয় এটা আপনাদের মত দুজন মনোমুগ্ধকারী ভদ্রমহিলার জন্য খুবই আনন্দের বিষয়,” সামান্য ‘বাও’ করে উনি বললেন। সাধারণত, ভদ্রলোকেরা এরকম ক্ষেত্রে এটাই বলে থাকেন। স্কারলেটের কেমন যেন মনে হল, উনি এটা বললেও বোঝাতে চাইছেন ঠিক তার উল্টোটা।

“আপনাদের স্বামীরাও নিশ্চয়ই আজ সন্ধ্যায় এখানে আছেন। পরিচয়টা ঝালিয়ে নিতে পারলে খুবই আনন্দিত হব।”

“আমার স্বামী ভার্জিনিয়াতে,” মেলি চোখ তুলে খুব গর্বের সঙ্গে বলল। “কিন্তু হেনরি __” বলতে বলতে ওর কন্ঠস্বর রুদ্ধ হয়ে এল।

“ও ক্যাম্পে মারা গেছে,” স্কারলেট অনুভুতিহীন ভাবে বলল। কথাগুলো যেন ছুঁড়ে দিল। এই নোংরা লোকটা কি এখান থেকে যাবে না! মেলি খুব অবাক হয়ে তাকাল। ক্যাপটেন বিষন্নভাবে মাথা নাড়লেন।

“প্রিয় ভদ্রমহোদয়াগণ, আমার জানা ছিল না। আশা করি আপনারা আমাকে ক্ষমা করবেন। আমার মত একজন অপরিচিতকে অন্তত এটুকু বলবার সুযোগ দিন, যে স্বদেশের জন্য লড়াইয়ে মৃত্যু মানে অমরত্ব লাভ।”

মেলানি সজল চোখে সামান্য হাসল। স্কারলেট ভেতরে ভেতরে জ্বলে গেল। আবার উনি একটা ভদ্রলোকোচিত মন্তব্য করলেন – যেটা এই পরিস্থিতিতে যে কোন ভদ্রলোকই করবেন। কিন্তু উনি নিশ্চয়ই এটা মন থেকে বলেন নি। উনি আসলে ওকে পরিহাস করছেন। উনি জানেন যে ও চার্লসকে ভালবাসে না। আর মেলিও এত বোকা যে ওঁর কথার আসল মানেগুলো ও ধরতেই পারছে না। হে ভগবান, কেউই যেন ওঁর কথার আসল মানে ধরতে না পারে! স্কারলেট আতঙ্কিত হয়ে ভাবল। উনি কি সব বলে দেবেন? উনি অবশ্যই ভদ্রলোক নন। আর যে সব লোকেরা ভদ্রলোক হয় না তারা কি করে বসে সেটা কেউ বলতে পারে না। ওদের আচরণকে বোঝবার কোন মাপকাঠি হয় না। ওঁর দিকে তাকাল। দেখল ওঁর মুখে কৃত্রিম সহানুভুতির চিহ্ন। এমন কি যখন উনি পাখাটা নাড়িয়ে বাতাস করছেন, তখনও। ওঁর দৃষ্টিতে এমন কিছু একটা ছিল যাতে ওঁর প্রতি একটা অপছন্দের ভাব থেকে ওঁর মনের জোর আবার ফিরে এল। ও হঠাৎ ওঁর হাত থেকে পাখাটা কেড়ে নিল। 

“আমি ঠিকই আছি,” বলে উঠল। “ হাওয়া করে আমার চুলগুলো এলোমেলো করে দেবার কোন দরকার নেই।”

“এভাবে বলে না, স্কারলেট সোনা। ক্যাপটেন বাটলার, দয়া করে আপনি কিছু মনে করবেন না। বেচারা চার্লির কথা উঠলেই ও – ও আর নিজেকে ঠিক রাখতে পারে না। তা ছাড়া – হয়ত – আমাদের আজ সন্ধ্যায় এখানে আসা উচিত ছিল না। এখনও আমরা শোক পালন করছি – এই সব আনন্দ কোলাহল, গান বাজনা – ওর পক্ষে মেনে নেওয়া একটু কষ্টকর।”

“আমি বুঝতে পারছি,” বিষন্ন গম্ভীর স্বরে ক্যাপটেন বললেন। মেলানির চিন্তিত সুন্দর চোখের দিকে যখন তাকালেন তখন ওঁর অভিব্যাক্তিতে একটা নম্র শ্রদ্ধার ভাব ফুটে উঠল। “আমার মনে হয়, আপনি খুবই একজন সাহসিনী মহিলা।”

“দেখেছ, আমার সম্বন্ধে একটা কথাও বললেন না!” স্কারলেট বিরক্ত হয়ে ভাবল। মেলি একটু বিভ্রান্ত ভাবে হেসে বলল –

“না না – ব্যাপারটা একদম সেরকম নয়! একেবারে শেষ মুহুর্তে হাসপাতালের কমিটি আমাদের দুজনকে এই বুথটা সামলানোর জন্য – বালিসের ওয়াড়? এই নিন – এটা খুব সুন্দর – এর ওপরে একটা পতাকাও লাগানো আছে।” কাউন্টারে যে তিনজন অশ্বারোহী সৈনিক এসে দাঁড়িয়েছিল তাদের দিকে ঘুরে গিয়ে বলল। 

ক্যাপটেন বাটলারের সৌজন্যে মেলানি মোহিত হয়ে গেছিল। হঠাৎ ওর মনে হল বুথের বাইরে রাখা পিকদান আর ওর স্কার্টের মধ্যে একটা জালি কাপড়ের পর্দা না হয়ে আর একটু পুরু কিছু থাকলে ভাল হত। কারন যেসব অশ্বারোহী সৈনিকেরা এসেছিল, পিস্তলে লক্ষভেদ করায় ওস্তাদ হলেও, ঠোঁটের পাশ থেকে গড়িয়ে পড়া তামাকের পিক ওই পিকদানে ফেলার ব্যাপারে ওদের লক্ষ্য ঠিক ততখানি অভ্রান্ত নয়। তারপরই অবশ্য ক্যাপটেন বাটলার, পিকদান, স্কারলেট সব বিস্মৃত হয়ে কাউন্টারে জড় হওয়া ভিড় সামলাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। 

স্কারলেট চুপচাপ টুলের ওপর বসে হাতপাখা নাড়িয়ে হাওয়া করতে লাগল। ওপরে চোখ তুলে তাকানোর সাহস হল না। মনে মনে ভাবল ক্যাপটেন বাটলার তাঁর জাহাজে ফিরে গেলেই সবথেকে বেশি ভাল। সেটাই তাঁর নিজের উপযুক্ত জায়গা। 

“তোমার স্বামী অনেকদিন মারা গেছেন?”

“হ্যা, অনেকদিন হয়ে গেল। প্রায় এক বছর।”

“প্রায় এক যুগ হয়ে গেল। তাই না?”

এক যুগ বলতে কি বলতে চাইছেন ঠিক বুঝে উঠতে পারল না। কিন্তু ওঁর কন্ঠস্বরে যে একটা ব্যঙ্গের রেশ রয়েছে সেটা বেশ বুঝতে পারল। তাই কথাটার কোন জবাব দিল না। 

“অনেকদিন বিয়ে হয়েছিল? জিজ্ঞেস করার জন্য কিছু মনে কোরো না। আমি অনেকদিন এদিকে আসিনি।”

“দু’মাস,” স্কারলেট খুব অনিচ্ছাসহকারে বলল।

“তবুও খুবই দুঃখের ব্যাপার,” উনি ওঁর সহজাত ভঙ্গীতে বললেন।

ওফ, অসহ্য! স্কারলেট মনে মনে হিংস্র হয়ে উঠল। আর কেউ হলে ও মুখে এমন কুলুপ এঁটে বসে থাকত যে সে পালাবার পথ পেত না। কিন্তু উনি ওর আর অ্যাশলের ব্যাপারটা জানেন। এটাও জানেন যে ও চার্লিকে ভালবাসত না। ওর হাত দুটো বাধা। তাই কিছু না বলে নিজের হাতপাখার দিকে তাকিয়ে রইল।

“তার মানে এটাই তোমার প্রথম সামাজিক উপস্থিতি?”

“জানি এটা খুবই বিসদৃশ দেখাচ্ছে,” স্কারলেট তাড়াতাড়ি বলে উঠল। “কিন্তু ম্যাক লিওর মেয়েরা শেষ মুহুর্তে আসতে পারল না। এই বুথটা ওদেরই দেখার কথা ছিল। শেষপর্যন্ত মেলানি আর আমাকে __”

“কিন্তু আমাদের উদ্দেশ্যের জন্য ত্যাগ করার চেয়ে বড় কিছু হতে পারে কি?”

এই কথাটাই তো মিসেজ় এলসিং বলেছিলেন। কিন্তু উনি যখন বলেছিলেন তখন কথাটা ঠিক এরকম শ্লেষাত্মক শোনায়নি। মুখ থেকে খারাপ কথা বেরিয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু ও নিজেকে সামলে নিল। সত্যি কথা বলতে গেলে ও খুব একটা ত্যাগের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তো এখানে আসেনি। এসেছে ঘরের মধ্যে থাকতে থাকতে একঘেয়ে লাগছিল বলে। 

“মাঝে মাঝে আমার মনে হয়,” উনি দার্শনিকসুলভ গলায় বললেন, “মেয়েরা বিধবা হয়ে গেলে তাদের সারা জীবন সাদামাটা পোশাকে, বিষন্ন মনে থাকবার প্রথাটা হিন্দুদের সতীদাহর প্রথা থেকে কম বর্বর নয়।”

“সতীদাহ?”

“ভারতে মানুষ মারা গেলে কবর দেওয়ার বদলে দেহটাকে পুড়িয়ে ফেলে। তার বউকেও সেই চিতার ওপর তুলে দিয়ে একসাথে পুড়িয়ে ফেলা হয়।”

“কি ভয়ানক! কিন্তু ওরকম করে কেন? পুলিশ কিছু বলে না?”

“নিশ্চয়ই না। বউ যদি তাঁর বরের চিতায় একসঙ্গে পুড়ে না মরে তাহলে তাকে সমাজ পরিত্যাগ করবে। সব হিন্দু মহিলারা বলাবলি করবে যে সেই বউএর ব্যবহার লেডিসুলভ নয় – ঠিক যেমন ভাবে ওই কোনে বসে থাকা মহিলারা তোমার সম্বন্ধে বলবেন – যদি তুমি আজ লাল রঙের ড্রেস পরে নাচে অংশগ্রহণ কর। আমি ব্যক্তিগত ভাবে মনে করি সতীদাহ আমাদের দক্ষিণের বিধবা মেয়েদের জীবন্ত কবর দেবার প্রথা থেকে ভাল!”

“কোন সাহসে আপনি বলছেন যে আমাকে জীবন্ত কবর দেওয়া হয়েছে?”

“যে শেকল দিয়ে মেয়েদের বেঁধে রাখা হয় সেটার ওপরই তারা কত নির্ভর করে! তুমি এই হিন্দু প্রথাকে বর্বর মনে করছ – কিন্তু ধর আজ যদির কনফেডারেসির প্রয়োজন না পড়ত – তাহলে কি তুমি এখানে আসার সাহস দেখাতে পারতে?” 

এই ধরনের যুক্তি তর্ক স্কারলেটকে সব সময়ই বিভ্রান্ত করে। এখন আরও বিভ্রান্ত হল এই জন্য যে কথাগুলো শুনে ওর অস্পষ্ট ভাবে মনে হচ্ছে যে কথাগুলো উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কিন্তু আর না, এবার ওঁকে থামাতে হবে।

“আমি নিশ্চয়ই আসতাম না। আসলে সেটা – মানে অসম্মান দেখানো হত – এরকম লাগত যে আমি সত্যি সত্যি চার্লিকে __”

উনি ওর কথাটা বলার অপেক্ষা করছিলেন। মুখে একটা শ্লেষের হাসি খেলা করছিল। স্কারলেট কথাটা শেষ করতে পারল না। ও যে চার্লিকে ভালবাসত না, সেটা উনি ভাল করেই জানেন। আর সে জন্য এই নিয়ে কোন ভান করে আবেগের কথা বললেও সেটা উনি বরদাস্ত করবেন না। কোন মানুষ যদি ভদ্রলোক না হয় তাহলে খুব জ্বালা! অন্তত ভদ্রলোকেরা কোন মেয়ে মিথ্যে বলছে জানলেও এমন ভাব করবেন যেন তিনি ওকে বিশ্বাস করেছেন! একজন ভদ্রলোক সব সময় নিয়ম মেনে চলেন আর যখন যে রকম করার ঠিক সেই রকমই করেন। তাতে একজন লেডির খুব সুবিধে হয়। আর এই লোকটা নিয়ম কানুনের কোন ধার ধারেন না আর যে কথা বলার নয় সেই কথাই বলতে পছন্দ করেন।

“শোনবার জন্য আমি ব্যাকুল হয়ে পড়েছি।”

“আপনি জঘন্য মানুষ।“ খুব অসহায় ভাবে বলে স্কারলেট চোখ নামিয়ে নিল। 

উনি কাউন্টারের ফাঁক দিয়ে মাথাটা নামিয়ে মুখটাকে স্কারলেটের কানের একদম কাছে নিয়ে এলেন। তারপর এথেনিয়াম হল মঞ্চে মাঝে মাঝে দেখতে পাওয়া খলনায়কোচিত ঢঙে ফিস ফিস করে বললেন, “সুন্দরী! তোমার সেই গোপন দুষ্টুমির কথা আমি কাউকে বলিনি।”

“মানে,” স্কারলেট সন্ত্রস্ত হয়ে ফিস ফিস করে বলে উঠল, “এসব আপনি কি বলতে চাইছেন!”

“আমি তোমাকে আশ্বস্ত করতে চাইছিলাম আর কি! তুমি কি শুনতে চাইছিলে? ‘হে রূপসী, তুমি আমার হয়ে যাও, নাহলে আমি সবাইকে বলে দেব?’”

স্কারলেট খুব অনিচ্ছাসহকারে ওঁর চোখের দিকে তাকাল। দেখল একটা বালকসুলভ চপলতা খেলা করছে সেখানে। হঠাৎ ও হেসে উঠল। কি রকম একটা বোকা বোকা পরিস্থিতি। উনিও হেসে উঠলেন। এত জোরে যে আশেপাশে অনেকেই চোখ তুলে তাকাল। হয়ত সবাই ভাবল, দেখ চার্লস হ্যামিলটনের বিধবা কেমন একজন সম্পূর্ণ অপরিচিত লোকের সঙ্গে মস্তি করছে। সবার চোখেই বিতৃষ্ণা ফুটে উঠল। 

এমন সময় ডঃ মিডকে প্ল্যাটফর্মে উঠতে দেখে ড্রাম বেজে উঠল, আর সবাই হর্ষধ্বনি করে স্বাগত জানাল। উনি দুহাত তুলে সবাইকে শান্ত হতে বললেন।

“যে সমস্ত মহিলার দেশাত্মবোধের ভাবনা থেকে আর অক্লান্ত পরিশ্রমে, আজকের এই মেলা আর্থিক সাফল্যের মুখ দেখল, আমি তাঁদের সকলকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাত চাই। আর্থিক সাফল্যই শুধু নয়, এই মেলা প্রাঙ্গণকে এত সুন্দর করে সাজিয়ে তোলার জন্যও তাঁদের অবদান অমূল্য। আমার আশে পাশে যে সমস্ত গোলাপের কুঁড়ি দেখতে পাচ্ছি তারাও এই মনোরম পরিবেশকে যথেষ্ট উপভোগ করতে পারছে।”

সবাই জোরে জোরে হাততালি দিয়ে অভিবাদন জানাল।

“মহিলারা শুধু যে তাঁদের সময় দিয়েছেন তাই নয় – তাঁদের কঠোর পরিশ্রমের ফলে – এই সব বুথগুলোতে যে সমস্ত সুন্দর পণ্য রাখা হয়েছে সেগুলোর সৌন্দর্য দ্বিগুণ হয়ে গেছে, কারন এগুলো আমাদের দক্ষিণের কমনীয় মহিলাদের সুন্দর হাত দিয়ে তৈরি।”

আরো হাততালি। আরো হর্ষধ্বনি। রেট বাটলার – যিনি স্কারলেটের কাউন্টারের পাশে অলসভাবে দাঁড়িয়ে ছিলেন – ফিস ফিস করে বললেন,

“লোকটা খুব আত্মম্ভরী ছাগল মনে হচ্ছে! কি বল?”

অ্যাটলান্টার সর্বজনপ্রিয় নাগরিক সম্পর্কে এরকম কথা শুনে স্কারলেট একটু চমকে উঠে, তিরস্কারের দৃষ্টিতে তাকাল। কিন্তু ডাক্তারের দিকে – বিশেষ করে ওঁর ছুঁচলো দাড়ির নড়াচড়ার দিকে তাকিয়ে – স্কারলেটের মনে হল উপমাটা একেবারে সঠিক। অনেক কষ্টে ও হাসি চাপল।

“কিতু তবুও বলব এই আত্মত্যাগ যথেষ্ট নয়। আমাদের হাসপাতাল কমিটির ভদ্রমহিলারা – যাঁদের সুনিপুণ সেবা অনেক সাহসী সৈন্যকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়ে এনেছে – আহত সৈন্যদের সুস্থ করে তুলেছে – আমাদের মহত্তম উদ্দেশ্য সাধনের লক্ষ্যে – তাঁরাও এটা অনুভব করতে পারবেন। তাই আমি এখানে সেসব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনায় যাব না। আমাদের আরও অর্থের প্রয়োজন – ইংল্যাণ্ড থেকে আমাদের ডাক্তারির সরঞ্জাম কিনতে হচ্ছে। আজ আমাদের মধ্যে দুঃসাহসী ক্যাপটেন রয়েছেন – যিনি গত এক বছর ধরে অবরোধ অতিক্রম করে এই সব জিনিষ সরবরাহ করে চলেছেন। আমার দৃঢ় বিশ্বাস ভবিষ্যতেও তিনি ঝুঁকি নিয়ে আমাদের জন্য ওষুধপত্র এবং অন্যান্য জরুরি জিনিষপত্র আনার ব্যাপারে সাহায্য করবেন। ক্যাপ্টেন রেট বাটলার!”

যদিও সে চোরাচালানকারী একদম প্রস্তুত ছিলেন না, তবু তিনি সৌজন্যসহকারে ‘বাও’ করলেন। স্কারলেটের মনে হল হয়ত একটু অতিরিক্ত সৌজন্যের সঙ্গেই। মনে মনে ও এটাকে ব্যাখ্যা করতে চাইল। এখানে যাঁরা উপস্থিত রয়েছেন তাঁদের প্রতি ওঁর অবজ্ঞা এতই প্রবল যে ওঁর এই সৌজন্য প্রকাশকে স্কারলেট ঠিক মেলাতে পারল না। তুমুল হর্ষধ্বনি করে তাঁকে অভিবাদন জানান হল। মহিলা ঘাড় ঘুরিয়ে ওঁকে দেখতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। তাহলে ইনিই সেই লোক যাঁর সঙ্গে বেচারা চার্লস হ্যামিলটনের বিধবা স্কারলেট মস্তি করছিল? বেচারা চার্লসের মারা যাবার পর এখনও এক বছরও কাটেনি! 

“আমাদের আরও সোনা চাই, আর আমি আপনাদের কাছে সেই সোনা প্রার্থনা করছি,” ডাক্তার বলে চললেন। আমি আপনাদের কাছে একটু ত্যাগ আশা করছি – আমাদের বীর সৈনিকরা ধূসর ইউনিফর্ম পরে যুদ্ধক্ষেত্রে লড়াই করতে করতে যে ত্যাগ করে চলেছে, এ ত্যাগ সেই তুলনায় খুবই নগন্য – হয়ত খানিকটা হাস্যকর শোনাবে। ভদ্রমহিলারা, আমি আপনাদের স্বর্ণালঙ্কার চাই। না আমার নিজের জন্য চাইছি না। কনফেডারেসি চাইছে – আর আমি নিশ্চিত যে আপনারা কেউ আপত্তি করবেন না। ওই রত্নখচিত আভূষণ আপনাদের কমনীয় বাহুমূলের শোভাবর্ধন করছে। স্বর্ণনির্মিত ব্রোচগুলো আমাদের মা বোনেদের হৃদয়ের দেশপ্রেমে উজ্জ্বল। কিন্তু দেশের স্বার্থে যদি সমস্ত অলঙ্কারও দান করে দেওয়া হয় তাহলে তার থেকে মহত্ত্বর আর সুন্দর অন্য কিছু হতেই পারে না। এই সব সোনা গলিয়ে ফেলা হবে, আর রত্ন বিক্রি করে যে অর্থ আসবে তা দিয়ে হাসপাতালের জন্য আরও ওষুধপত্র এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় ডাক্তারির যন্ত্রপাতি কেনা যাবে। ভদ্রমহোদয়াগণ, আমাদের দুজন আহত বীর সৈনিক ঝুড়ি নিয়ে আপনাদের কাছে যাচ্ছেন – আপনারা ___” হাততালি আর তুমুল হর্ষধ্বনির মধ্যে বাকি কথাগুলো আর শুনতে পাওয়া গেল না। 

স্কারলেটের প্রথম প্রতিক্রিয়া হল স্বস্তির। শোকপালন করার জন্য ওর অমূল্য কানের দুল আর বারি সোনার চেন পরে আসতে পারেনি। এগুলো ওর দিদিমা রোবিল্যারের। এছাড়া ছিল সোনার তৈরি কালো জল করা ব্রেসলেট আর গার্নেটের ব্রোচ। ও দেখল ওদের দিকে সেই বেঁটে জ়ুয়েভ একটা ওক কাঠের তৈরি ঝুড়ি হাতে মহিলাদের কাছ থেকে অলঙ্কার সংগ্রহ করছে। মেয়েদের মধ্যে হুড়োহুড়ি পড়ে গেছে গয়না খুলে ওই ঝুড়িতে ফেলার। বেশ টুং টাং আওয়াজ হচ্ছে। মাঝে মাঝে শোনা যাচ্ছে, “এক মিনিট! আমি এখনও খুলে উঠতে পারিনি। এই নাও।” মেবেল মেরিওয়েদার ওর সুন্দর ব্রেসলেট দুটো বাহু আর কব্জি থেকে টেনে খুলল। ফ্যানি এলসিং “মা আমি দিয়ে দিলাম” বলে কেঁদে উঠে ওর সোনার ওপরে মুক্তো বসানো সেটটা বিনুনির থেকে খুলে বের করল। এই সেটটা অনেক প্রজন্ম ধরে ওদের বংশের গৌরব। ঝুড়ি যত ভরে উঠতে থাকল, হাততালি পড়তে থাকল। 

হাসি মুখে বেঁটে লোকটা স্কারলেটদের বুথের দিকে এগিয়ে এল। একটা সোনার তৈরি চুরুট রাখার সুন্দর একটা কৌটো রেট বাটলার অবহেলাভরে ওই ঝুড়িতে নিক্ষেপ করলেন। সে যখন স্কারলেটের সামনে এসে দাঁড়াল, তখন স্কারলেট মাথা ঝাঁকিয়ে জানাল যে ওর কাছে দেবার মত কিছু নেই। খালি হাত দুটো তুলেও দেখাল। ওই হল মেলায় উপস্থিত একমাত্র মেয়ে যে কোন কিছু দিতে পারল না। তারপর হঠাৎ আঙ্গুলের বিয়ের সোনার আংটির দিকে নজর পড়ল।

এক মুহুর্তের জন্য ও চার্লির মুখটা মনে করার চেষ্টা করল – যখন ও ওটা পরিয়ে দিয়েছিল তখন ওকে কেমন দেখাচ্ছিল। কিন্তু সেই স্মৃতি একেবারেই ঝাপসা হয়ে গেছে। যে স্মৃতি মনে করতে গেলেই ওর মধ্যে একটা বিরক্তির ভাব চলে আসে। চার্লস – আজ ওর এই বয়স্ক মহিলাদের মত জীবনযাপনের জন্য ওই তো দায়ী।

ও আংটিটা ধরে টান মারল, কিন্তু ওটা বেরোতে চাইছিল না। জ়ুয়েভ মেলানির দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। স্কারলেট তাড়াতাড়ি বলে উঠল, “দাঁড়াও। আমি কিছু দিতে পারব!” ততক্ষণে আংটিটা বেরিয়ে এসেছে। নানা রকম গয়নার স্তুপের মধ্যে ও যখন ওটা ছুঁড়ে ফেলতে যাচ্ছে তখন ওর চোখ রেট বাটলারের চোখে পড়ল। ওঁর ঠোঁটের কোনে মৃদু হাসি। পরোয়া না করে ও আংটিটা ঝুড়িতে দিয়ে দিল।

“আহা, বেচারা!” ওর হাতটা চেপে ধরে ধরা গলায় মেলানি বলে উঠল। চাউনিতে ভালবাসা আর গর্বের সংমিশ্রণ। “তুমি একজন সাহসী – খুব সাহসী মেয়ে। একটু দাঁড়াও – দয়া করে একটু অপেক্ষা কর, লেফটেনান্ট পিকার্ড! আমারও তোমাকে কিছু দেবার আছে।”

ও নিজের বিয়ের আংটিটা টেনে খোলবার চেষ্টা করল। স্কারলেট জানত ও আশলে পরিয়ে দেবার পর কখনও ওটা এক মুহুর্তের জন্যও খোলেনি। আর কেউ না জানলেও, স্কারলেট জানত ওই আংটিটা ওর কাছে কত মূল্যবান। বেশ কষ্ট করেই ওটা খুলতে হল। খোলার পরে একটুক্ষণ হাতের মুঠোর মধ্যে ধরে রাখল। তারপর, খুব যত্ন করে ঝুড়ির মধ্যে অন্য গয়নার সাথে রেখে দিল। জ়ুয়েভের বয়স্ক মহিলাদের দিকে চলে যাওয়ার দিকে দুজন মেয়েই চেয়ে রইল। স্কারলেটের চোখে একটা বেপরোয়া ভাব। মেলানির অবস্থা কাঁদার চেয়েও অনেক বেশি করুণ। ওদের পাশে যে ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে ছিলেন তাঁর চোখে দুজনের কারও অভিব্যাক্তিই নজর এড়াল না।

“তুমি যদি সাহস না দেখাতে, আমিও কিছুতেই দেখাতে পারতাম না,” সস্নেহে স্কারলেটের কোমর বেষ্টিন করে মেলানি বলল। এক মুহুর্তের জন্য স্কারলেটের বিরক্ত হলে জেরাল্ড যেরকম গলা ফাটিয়ে বলেন ঠিক সেরকম ভাবে বলে ওঠে, “নিকুচি করেছে!” রেট বাটলারের চোখের দিকে তাকিয়ে নিজেকে সামলে নিয়ে একটু তেতো হাসল। মেলানি যে সব সময়ই ওর উদ্দেশ্য গুলো বুঝতে ভুল করে এটা খুবই বিরক্তিকর। না বাবা হয়ত সত্যি কথাটা বুঝে ফেলার থেকে এটাই ভাল! 


“অনুভুতির কি মহৎ প্রকাশ,” খুব আর্দ্রকণ্ঠে বললেন রেট বাটলার। “আপনাদের এই ধরনের ত্যাগ আমাদের ধূসর পোশাকের সৈনিকদের মহিমান্বিত করবে।”

স্কারলেটের মুখ দিয়ে কড়া কথা বেরিয়ে আসছিল। অনেক কষ্ট করে নিজেকে সংযত করল। উনি যা কিছু বলেন সবকিছুর মধ্যেই যেন একটা শ্লেষ লুকানো থাকে। বুথের দেওয়ালে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে ওর মনে হল ভদ্রলোককে ও মন থেকে ঘৃণা করে! কিন্তু ওঁর হাবভাবের মধ্যে একটা যেন উদ্দীপনা আছে, একটা উষ্ণ রোমাঞ্চকর ব্যাপার আছে। ওর ভেতরে লুকিয়ে থাকা আইরিশ সত্ত্বা ওঁর ওই কালো চোখদুটোর দিকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিতে চাইল। একটা উচিত শিক্ষা ভদ্রলোককে দেবার জন্য ও উশখুশ করতে লাগল। ওর একটা বোপন কথা জেনে যাওয়ার হন্য উনি সব রকম সুবিধে নিয়ে চলেছেন। ওঁকে কোনও বিপদের ফেলতে পারলে এই জ্বালাতন থেকে রেহাই পাওয়া যাবে। তবুও ও কোনক্রমে সেই ইচ্ছেটা দমন করল। ভিনিগারের থেকে চিনি ঢাললেই পিঁপড়ে বেশি আসে – ম্যামির এই উপদেশটা ওর মনে পড়ে গেল। আর তখনই ও পিঁপড়েটাকে পিষে ফেলতে পারবে। তখন আর উনি ওর ওপর আধিপত্য করতে পারবেন না। 

“ধন্যবাদ,” খুব মিষ্টি করে বলল, যেন ওঁর ব্যঙ্গ ও বুঝতেই পারেনি। “ক্যাপটেন বাটলারের মত এমন বিখ্যাত ব্যক্তির কাছ থেকে এই ধরনের প্রশংসা সব সময়েই স্বাগত।”

উনি মাথা ঝাঁকিয়ে জোরে জোরে হাসতে লাগলেন। স্কারলেট বুঝতে পারল ও আবার নিজের ওপর সংযম হারিয়ে ফেলছে।

“যেতা তুমি সত্যি মনে কর সেটা বলতে পারছ না কেন?” গলা নামিয়ে এমন ভাবে বললেন, যে ওই কোলাহলের মধ্যে স্কারলেট ছাড়া আর কেউ শুনতে পাবেনা। “কেন তুমি বলছ না যে আমি এক নম্বরের বদমাশ আর একটুও ভদ্রলোক নই। কেন বলছ না ‘আপনি মানে মানে এখান থেকে বিদায় হন, নয়ত আমি একজন ধূসর ইউনিফর্ম পরা বীর সৈনিককে ডেকে আপনাকে ঘাড় ধাক্কা দিতে বলব’।”

জবাব ওর জিভের ডগায় এসে গেছিল, কিন্তু আবার হজম করে ফেলল। তারপর বলল, “কেন ক্যাপটেন বাটলার এখানে তো সবাই জানে যে কত বিখ্যাত, আর কত সাহসী – আর – আর ____”

“নাহ, তুনি আমাকে হতাশ করলে,” উনি বললেন।

“হতাশ!”

“নিশ্চয়ই। সেই ঘটনাবহুল দিনের কথা মনে আছে, যেদিন তোমার সঙ্গে প্রথম দেখা হল? ভেবেছিলাম তুমি শুধু সুন্দরীই নও, সাহসীও। এখন দেখতে পেলাম, তুমি শুধুই সুন্দরী।”

“আপনি আমাকে ভীতু বলতে চাইছেন?” আবার স্কারলেটের রোঁয়া ফুলে উঠল।

“ঠিক বলেছ। তুমি যা ভাব সেটা বলার সাহস তোমার নেই। প্রথম যেদিন তোমাকে দেখেছিলাম, ভেবেছিলামঃ তোমার মত মেয়ে লাখে একটা মেলে। অন্য বোকা মেয়েগুলোর মত নয়, যারা মায়ের কথা পইপই করে মেনে চলে, মনে যাই থাক না কেন। নিজেদের ইচ্ছে অনিচ্ছে, প্রেম ভালবাসা সব অনেক মিষ্টি কথায় আড়াল করে রাখে। ভেবেছিলাম, মিস ও’হারা আলাদা। ও জানে ও কি চায় – আর মনের কথা বলতে ভয় পায় না। এমন কি দরকার পড়লে ফুলদানিও ছুঁড়ে মারতে পারে।”

“ও তাই নাকি?” স্কারলেটের সব প্রতিরোধ ভেঙ্গে পড়ল। “তাহলে আমি এখনই মনের কথা বলে দিচ্ছি। আপনার মধ্যে যদি একটুও ভদ্রতাবোধ থাকত তাহলে আপনে এসে আমার সঙ্গে কথা বলতেন না। কারন আপনি ভাল করেই জানতেন, আমি আপনাকে আর কোনদিনও দেখতে চাই না! কিন্তু আপনি মোটেই ভদ্রলোক নন! আপনি একজন ইতর, অসভ্য লোক! ইয়াঙ্কিদের সঙ্গে দহরম মহরম করে আপনার ছোট ছোট নৌকা ভরে আপনি জিনিষ নিয়ে আসেন বলে আপনার এখানে আসবার অধিকার হয়ে গেছে! যে সব লোকদের আপনি ব্যঙ্গ করেন, তাঁরা আপনার থেকে অনেক বেশি সাহসী – আর মহিলারা তাঁদের সর্বস্ব ত্যাগ করছে এই মহান লক্ষ্যের ____”

“আরে থামো, থামো,” উনি মৃদু হেসে বললেন। “শুরুটা তুমি খুব সুন্দর করেছিলে। যা যা মনে কর সেগুলোই বলছিলে। আর এই সব কি মহান লক্ষ্য-টক্ষ্য কি সব বলতে শুরু করলে, এগুলো শুনতে শুনতে আমার কান পচে গেছে – মনে হয় তোমারও তাই ___”

“কী বললেন? আপনি কি করে ___,”চেঁচিয়ে বলে উঠতে গিয়েও নিজেকে সামলে নিল। ওঁর কথার ফাঁদে পড়ে যাবার জন্য নিজের ওপর রাগ হল খুব।

“আমি এসে দরজার কাছে দাঁড়িয়েছিলাম। তখনও আমাকে তুমি দেখতে পাওনি, কিন্তু আমি তোমাকে লক্ষ্য করছিলাম,” উনি বললেন। “আমি অন্য মেয়েদেরও লক্ষ্য করলাম। সবার মুখই যেন একই ছাঁচে বানানো। তোমার তা ছিল না। তোমার মুখ দেখে মনের কথা বুঝে নেওয়া সহজ। যে কাজের জন্য তুমি এসেছ, তাতে তোমার মন ছিল না। হলফ করে এটাও বলতে পারি তুমি আমাদের মহান উদ্দেশ্য কিংবা হাসপাতাল – এসব নিয়েও ভাবিত ছিলে না। তোমার হাবভাব বলছিল যে তুমি নাচে যোগ দিতে চাও, কিন্তু পারছিলে না। আর তাই তোমার মেজাজ বিগড়ে গেছিল। সত্যি করে বল তো আমি ঠিক বলছি কি না?”

“আপনাকে আমার কিছুই বলার নেই, ক্যাপটেন বাটলার,” যতখানি সম্ভব আত্মমর্যাদার মোড়কে নিজেকে ঢেকে খুব খানিকটা নিস্পৃহ সুরে বলল। “হতে পারেন আপনি একজন ‘বড় অবরোধকারী’, কিন্তু তা বলে কোন মহিলাকে অপমান করবার অধিকার আপনার নেই।”

“বড় অবরোধকারী! সেটা তো একটা তামাশা। আমাকে অন্ধকারে ছুঁড়ে ফেলে দেবার আগে, তোমার মূল্যবান সময়ের অল্প একটু ভিক্ষে চাইছি। তোমার মত একজন সুন্দরী দেশপ্রেমিকাকে কনফেডারেটদের মহান যুদ্ধে আমার অবদানের ব্যাপারে অন্ধকারে রাখতে চাই না।”

“আপনার ওই অতিরঞ্জিত আস্ফালন শোনার আমার মোটেই ইচ্ছে নেই।”

“অবরোধ করাটা আমার ব্যবসা – আর এর থেকে আমি রীতিমত অর্থোপার্জন করি। আর যখন এর থেকে আমার লাভ আসা বন্ধ হয়ে যাবে, আমি সঙ্গে সঙ্গে পাততাড়ি গুটিয়ে ফেলব। কিছু বুঝতে পারলে?”

“আপনি আসলে একজন ভাড়াটে বদমাশ – ইয়াঙ্কিদের মত।”

“একদম ঠিক,” উনি দাঁত বের করে হাসলেন। “আর ওই ইয়াঙ্কিরাই আমাকে এই অর্থোপার্জন করতে সাহায্য করে। তুমি কি জান, গত মাসে আমি নিউ ইয়র্ক বন্দরে আমার জাহাজ নিয়ে গিয়ে মাল তুলেছি?”

“কি বললেন?” স্কারলেটের চোখ কৌতুহলে জ্বল জ্বল করছে। “ওরা আপনাকে গুলি করেনি?”


“হায় রে, সরলমতি বালিকা, নিশ্চয়ই নয়। ইউনিয়নে অনেক দেশপ্রেমিক আছে যারা ঘুষ নিয়ে কনফেডারেটদের জন্য মাল সরবরাহ করতে পিছপা হবে না। আমি জাহাজ নিয়ে নিউ ইয়র্কে পাড়ি দিই – ব্যবসাদারদের কাছ থেকে মাল তুলি – অবশ্যই গোপনে – তারপর চলে আসি। যদি কখনও বিপদ আঁচ করি তাহলে ন্যাসাও চলে যাই। সেখানেও অনেক ইউনিয়ন দেশপ্রেমিক আছে। তাঁরা আমার জন্য, গোলা বারুদ আর মেয়েদের পোশাক রেখে দেয়। ইংল্যাণ্ডে যাবার থেকে এটাতে অনেক সুবিধে। কখনও কখনও চার্লস্টন বা উইল্মিংটনে ফেরা একটু মুশকিল হয়ে যায়। কিন্তু তুমি ভাবতেও পারবে না ঘুষ জিনিষটার কি মাহাত্ম্য!”

“ইয়াঙ্কিরা যে নীচ হয় সেটা আমার জানা আছে। কিন্ত এত নীচে ____”

“কয়েকজন ইয়াঙ্কি যদি ইউনিয়নকে ঠকিয়ে কিছু কামিয়ে নিতে পারে, তাতে কি এসে যায়? একশ বছরেও কোন ফারাক পড়বে না। ব্যাপারটা একই দাঁড়াবে। ওরা জানে – আজ না হয় কাল – কনফেডারেসি ওদের পা চাটবে। এই সুযোগে যদি কিছু কামিয়ে নেওয়া যায় মন্দ কি!”

“পা চাটব – আমরা?”

“সন্দেহ আছে?”

“আপনি কি আমাকে রেহাই দেবেন? না কি গাড়ি ডেকে বাড়ি ফিরে গিয়ে আপনার হাত থেকে নিস্কৃতি পেতে হবে?”

“একেবারে অগ্নিশর্মা বিদ্রোহিণী বালিকা”, বলে আবার হঠাৎ দাঁত বের করে হেসে ফেললেন। তারপর একবার ‘বাও’ করে ক্রুদ্ধ স্কারলেটকে একা রেখে উনি এগিয়ে গেলেন। নিষ্ফল রাগ আর অভিমানে ও তখন ফুঁসছিল। একটা হতাশা ওকে পেয়ে বসল, কিন্তু সেটা বিশ্লেষণ করবার ক্ষমতা ওর ছিল না। একটা বাচ্চার হতাশা, যখন তার স্বপ্ন চুরমার হয়ে যায়। অবরোধকারীদের এভাবে খাটো করার দুঃসাহস উনি পেলেন কি করে! আর কি সাহস বলেন কিনা কনফেডারেসি পা চাটতে বাধ্য হবে! গুলি করে মারা উচিত – গুলি করে মারা উচিত এই দেশদ্রোহীকে! একবার হলের চারদিকে তাকাল – কত পরিচিত মুখ – তাদের প্রত্যেকের চোখে সাফল্যের স্বপ্ন – এই সব বীর সৈনিকেরা – আর তারপরই ওর মনের মধ্যে একটা শীতল অনুভুতি বয়ে গেল। পা চাটবে! মোটেই না! অসম্ভব ভাবনা – বিশ্বাসঘাতকতার ভাবনা! 

“কি তোমরা দুজনে এত গুজগুজ করছিলে?” গ্রাহকদের ভিড় কমে যেতে স্কারলেটের দিকে তাকিয়ে মেলানি জিজ্ঞেস করল। “দেখলাম পুরো সময়টা মিসেজ় মেরিওয়েদার তোমাদের দিকে তাকিয়েছিলেন – আর তুমি তো জানোই ওঁর পেছনে কথা বলার স্বভাবটা।”

“আরে ওই লোকটা অসহ্য একেবারে – একদম ইতর আর বর্বর,” স্কারলেট বলল। “ওই বুড়ি মেরিওয়েদার যা খুশি বলুক – আমি পরোয়া করি না! ওঁর জন্য আমি হাঁদারাম হয়ে থাকতে পারব না।” 

“এরকম কেন বলছ, স্কারলেট,” মেলানি সন্ত্রস্ত গলায় বলল।

“দাঁড়াও – দাঁড়াও,” স্কারলেট ওকে চুপ করতে বলল। “ডঃ মীড মনে হয় আরো কিছু ঘোষণা করতে চলেছেন।”

“ভদ্রমহোদয়া আর ভদ্রমহোদয়গণ – আমি আপনাদের আরেকটা চমকপ্রদ কথা শোনাতে চলেছি – অভিনব কিছু – যাতে আপনারা কেউ কেউ হয়ত বিস্মিত হবেন। কিন্তু আমি আপনাদের খেয়াল রাখতে বলব – আমরা আজ এখানে যা কিছু করছি সবই আমাদের হাসপাতালের আর ওখানে আমাদের যে সব বীর সৈনিকরা পড়ে আছে, তাদের ভালোর কথা ভেবেই করছি।”

সবাই এগিয়ে যাবার চেষ্টা করল – খানিকটা উত্তেজনায় – খানিকটা আন্দাজ করবার চেষ্টায় – এই ধীরস্থির ডাক্তারবাবু এমন কি বলতে পারেন যাতে সকলে বিস্মিত হতে পারে। 

“আমাদের নাচের আসর শুরু হতে চলেছে। প্রথমে অবশ্যই একটি লোকনৃত্য পরিবেশন করা হবে – তারপরে হবে ওয়াল্টজ়। এরপরে পোলকা, শ্যাটিশ আর মাজ়ুরকা নৃত্য – কিন্তু প্রত্যেকবারই তার আগে একটা করে ছোট লোকনৃত্য পরিবেশন করা হবে। আমি জানি প্রত্যেকেই এই লোকনৃত্যগুলোতে ভাগ নেবার জন্য রেশারেশি করবেন আর সেই জন্য __” ডাক্তারবাবু চশমাটা খুলে নিয়ে কপালের ঘাম মুছে নিলেন। যেদিকে ওঁর স্ত্রী সকলের সাথে বসে আছেন, সেদিকে একবার তির্যক দৃষ্টি ফেললেন। “ভদ্রমহাশয়রা, যদি আপনারা কন মহিলার সঙ্গে লোকনৃত্যে অংশ নিতে চান তাহলে আপনাকে নীলামে আপনার দর জানাতে হবে। আমি নিলামদার হব, আর যে অর্থ এভাবে সংগৃহিত হবে সেটা হাসপাতালের খাতে যাবে।”

সবার হাতপাখা চালানো বন্ধ হয়ে গেল আর গুঞ্জন শুরু হয়ে গেল। পুরুষসঙ্গীদের মধ্যে একটা চাঞ্চল্য দেখা গেল। মিসেজ় মীড স্পষ্টতই একটু অস্বস্তির মধ্যে পড়ে গেলেন – তাঁর স্বামীর এমন একটা প্রস্তাবকে সমর্থন করতে গিয়ে – যেটা তিনি নিজেই মনে মনে মেনে নিতে পারছিলেন না। মিসেজ় এলসিং, মিসেজ় মেরিওয়েদার, আর মিসেজ় হোয়াইটিং রেগে লাল হয় গেলেন। হঠাৎ হোম গার্ড হর্ষধ্বনী করল। ওর দেখাদেখি সমস্ত ইউনিফর্ম পরিহিত সেনারা সমস্বরে সমর্থন্সূচক আওয়াজ করল। অল্পবয়সী মেয়েরা উত্তেজিত ভাবে হাততালি দিতে থাকল। 

“তোমার মনে হচ্ছে না – যে এটা - এটা একধরনের ক্রীতদাস বিক্রীর নিলামের মত,” মেলানি ফিসফিস করে বলল। ওর চোখ অনিশ্চিতভাবে হয়রান ডাক্তারের দিকে, যিনি এতদিন ওর কাছে একজন নিখুঁত ভাল মানুষ বলে পরিচিত ছিলেন।

স্কারলেট কোন কথা বলল না। কিন্তু ওর চোখ উত্তেজিত আর মনে মনে একটা ব্যথা অনুভব করল। যদি ও বিধবা না হত! যদি আবার ও স্কারলেট ও’হারা হয়ে যেতে পারত আর ডান্সফ্লোরে আপেল সবুজ পোশাকে, বুকের অপর সবুজ ভেলভেটের ফিতে ঝুলিয়ে আর কালো চুলে রজনীগন্ধা ফুল গুঁজে যেতে পারত! তাহলে ও ওই লোকনৃত্যে সবার থেকে আগে থাকতে পারত! বাস্তবিকই তাই! অন্তত এক ডজন পুরুষ ওর সঙ্গে নাচার জন্য ডাক্তারের কাছে বাজি লাগিয়ে দিত! ওকে এখানে ইচ্ছের বিরুদ্ধে নিষ্কর্মা হয়ে বসে থাকতে হবে, আর ফ্যানি কিংবা মেবেল অ্যাটলান্টা সুন্দরী হয়ে প্রথম লোকনৃত্যে ভাগ নেবে!

এমন সময় কোলাহল ভেদ করে জ়ুয়েভের ক্রেওল উচ্চারণে শোনা গেল, “যদি আমাকে অনুমতি দেওয়া হয়, তাহলে আমি মিস মেবেল মেরিওয়েদারের জন্য কুড়ি ডলার বাজি ধরছি।”

মেবেল লজ্জায় রাঙা হয়ে ফ্যানির কাঁধে মাথা রাখল। তারপর এঁকে অন্যের ঘাড়ে মুখ চেপে হেসে ফেলল। অন্যরাও অন্য অন্য মেয়েদের নাম বলতে থাকল, আর সঙ্গে সঙ্গে বাজি ধরার অঙ্ক বলতে লাগল। ডঃ মীডের মুখ হাসিতে ভরে উঠল। হাসপাতাল কমিটির মহিলাদের ক্রুদ্ধ গুঞ্জনকে গ্রাহ্যের মধ্যেই আনলেন না।

মিসেজ় মেরিওয়েদার প্রথমেই ঘোষণা করে দিয়েছিলেন যে তাঁর মেয়ে মোটেই এতে অংশগ্রহন করবে না। কিন্তু ক্রমে ক্রমে দেখা গেল মেবেলের মূল্য উঠতে উঠতে পচাত্তর ডলারে পৌঁছে গেল, তখন তাঁর প্রতিবাদের স্বর নেমে এল। বুথের কাউন্টারে কনুইয়ে ভর দিয়ে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে স্কারলেট ঈর্ষান্বিত চোখে হাসিমুখে সবাইকে কনফেডারেটের কাগজের টাকা নিয়ে প্ল্যাটফর্মের দিকে যেতে দেখছিল।

এখন সবাই নাচবে – কেবল সে আর বয়স্ক মহিলারা বাদে! সবাই কত ভাল সময় কাটাবে – ও ছাড়া! দেখতে পেল রেট বাটলার ডঃ মীডের পাশেই দাঁড়িয়ে রয়েছেন। ও মুখের ভাব পরিবর্তন করতে পারার আগেই উনি ওকে দেখে ফেললেন। তারপর উনি মুখ নীচু করে কিছু বলতেই একজোড়া চোখ ওপরে উঠে গেল। ও এক ঝটকায় চোখ সরিয়ে নিল – আর ঠিক সেই মুহুর্তেই নিজের নাম – ঠিকই ওর নিজের নাম ঘোষণা শুনতে পেল। নির্ভুল চার্লস্টোনিয়ান উচ্চারণে।

“মিসেজ় চার্লস হ্যামিলটন – একশ পঞ্চাশ ডলার – স্বর্ণমূদ্রায়।

হঠাৎ সমস্ত কোলাহল, গুঞ্জন থেমে গেল। পিনপতন নীরবতা। নাম আর টাকার অঙ্ক দুটো শুনেই। স্কারলেট এতটাই হতচকিত হয়ে পড়েছিল, যে একেবারে স্থানু হয়ে গেল। থুতনিতে হাত দিয়ে, বিস্ফারিত চোখে বসে থাকল। সবাই ঘাড় ঘুরিয়ে ওকেই দেখছে। ও দেখল ডঃ মীড প্ল্যাটফর্ম থেকে মাথা নামিয়ে রেট বাটলারকে কিছু বললেন। হয়ত বোঝাতে চাইলেন যে স্কারলেট এখন শোকপালন করছে। ওর পক্ষে ফ্লোরে আসা সম্ভব নয়। দেখল রেট বাটলার অলস ভাবে ঘাড় ঝাঁকালেন।

“আমাদের অন্য কোন সুন্দরী মেয়ে – যদি আপনি বলেন,” ডঃ মীড বললেন।

“না,” রেট বাটলার খুব স্পষ্ট করে বললেন। “মিসেজ় হ্যামিলটন।”

“আমি আপনাকে বলছি, এটা অসম্ভব,” ডঃ মীড বেশ উষ্মার সঙ্গে বলে উঠলেন। “মিসেজ় হ্যামিলটনের পক্ষে __”

স্কারলেট হঠাৎ একটা গলার আওয়াজ শুনতে পেল। প্রথমে বুঝতেই পারেনি যে ওটা আসলে ওর নিজেরই কন্ঠস্বর।

“হ্যা আমি রাজী আছি।”

ও বসার জায়গা থেকে উঠে দাঁড়াল। বুকের ভেতর যেন হাপর চলছে। মনে হচ্ছিল দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে না। সবার নজরের কেন্দ্রবিন্দুতে ফিরে আসতে পেরে খুব উত্তেজনা। উপস্থিত সব মেয়েদের মধ্যে ও হল সব থেকে আকাঙ্খিত রমণী। আর সব থেকে বড় কথা হল ও আবার নাচতে পারবে।

“আমি পরোয়া করিনা! ্কে কি বলল তার পরোয়া করিনা,” মনে মনে বলল। ওর সারা শরীরে একটা অনাস্বাদিত উন্মাদনার স্রোত বয়ে গেল। মাথাটা একবার ঝাঁকিয়ে নিয়ে বুথ থেকে বেরিয়ে এল।

এক মুহুর্তের জন্য মেলানির অবিশ্বাসী চোখের অপর নজর পড়ল; নজর পড়ল অন্যান্য উপস্থিত পুরুষ ও মহিলাদের দিকে। সেনাবাহিনী করতালি দিয়ে ওকে অনুমোদন জানাল।

ও ডান্স ফ্লোরে পৌঁছে গেল। ভিড়ের মধ্যে পাশ কাটিয়ে রেট বাটলার ওর দিকে এগিয়ে আসছেন। মুখে বিচ্ছিরি শ্লেষের হাসি। কিন্তু ও কোন পরোয়া করে না। স্বয়ং আবে লিঙ্কন হলেও না! ও আবার নাচতে পারবে। লোকনৃত্যে ও সবার আগে নাচবে। এক ঝলক হেসে ও নতজানু হয়ে ওঁকে নমস্কার করল। উনিও ওকে ‘বাও’ করলেন, একটা হাত বুকের কাছে রেখে। অস্বস্তিকর পরিস্থিতি কাটাতে লেভি ঘোষণা করল, “পরের নৃত্যের জন্য যে যার সঙ্গী বেছে নিন।” 

তারপরেই অর্কেস্ট্রায় লোকনৃত্যের সব থেকে প্রচলিত সুর “ডিক্সি” বাজতে শুরু হল।

***

“আমার দিকে সবার দৃষ্টি আকর্ষন করানোর স্পর্ধা আপনি কথা থেকে পেলেন ক্যাপ্টেন বাটলার?”

“প্রিয় মিসেজ় হ্যামিলটন, আপনাকে দেখে বোঝা যাচ্ছিল যে আপনি দৃষ্টি আকর্ষিত হতে চাইছিলেন।”

“সর্বসমক্ষে আপনি আমার নাম ঘোষণা করলেন কেন?”

“অস্বীকার করা তো আপনার হাতেই ছিল।” 

“কিন্তু – আমাদের অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানর জন্য – আমারও তো একটা কর্তব্য আছে। আপনি যখন স্বর্ণমূদ্রায় অতগুলো ডলারের প্রস্তাব করলেন – আমি – আমি নিজের কথা ভাবিই নি। আপনি হাসা বন্ধ করুন – সবাই আমাদের দিকে তাকাচ্ছে।”

“ওঁরা এমনিতেও আমাদের দিকে তাকাবে। ওই অভীষ্ট লক্ষ্য-টক্ষ্যর গল্প আমাকে শুনিও না। তুমি নাচতে চেয়েছিলে, আমি তোমাকে নাচার সুযোগ করে দিয়েছি। এটাই তো বোধহয় শেষ রাউন্ড?”

“হ্যা – সত্যিই এবার বন্ধ করে একটু বসব।”

“কেন? আমি কি তোমার পা মাড়িয়ে দিয়েছি?”

“তা না – কিন্তু ওরা আমাকে নিয়ে নানা রকম কথা বলবে।”

“তুমি কি সত্যিই পরোয়া কর? – মন থেকে বল তো।”

“দেখুন __”

“তুমি কি কোন অপরাধ করছ? বল! ওয়াল্টজ়টাও আমার সঙ্গে নাচবে?”

“মা যদি একবার জানতে পারেন __”

“তাহলে এখনও তুমি মায়ের আঁচলে বাধা পড়ে আছ।”

“ওফ, আপনি এমন বিচ্ছিরি ভাবে কথা গুলো বলেন, মনে হয় যেন সদ্গুণ থাকাটা বোকামি।”

“সদ্গুণ বলে যেগুলো মনে করা হয় সেগুলো তো বোকা বোকাই। যদি লোকে তোমাকে নিয়ে কিছু বলে – তুমি কি তার পরোয়া কর?”

“না – কিন্তু – ঠিক আছে এ নিয়ে কথা না বলাই ভাল। ভাগ্য ভাল, ওয়াল্টজ় শুরু হতে যাচ্ছে। লোকনৃত্য সত্যিই আমাকে হাঁপিয়ে দেয়।”

“আমার কথা এড়িয়ে যেও না। অন্য মেয়েরা কে কি বলল, তাতে কি তোমার কিছু এসে যায়?”

“ওফ, আপনি আমাকে বলিয়েই ছাড়বেন! – না! কিন্তু মেয়েদের কে কি বলল না বলল তা নিয়ে ভাবা উচিত। অবশ্য আজ সন্ধ্যার জন্য আমি পরোয়া করি না।”

“শাবাশ! এবার তুমি নিজের মত করে ভাবতে শুরু করেছ। তোমার হয়ে অন্যকে ভাববার সুযোগ দিচ্ছ না। এটা বিচক্ষণতা বাড়ার লক্ষণ।”

“ঠিক আছে, কিন্তু ___”

“আমাকে নিয়ে লোকজন যত কুৎসা করেছে, যখন ততখানি কুৎসা তোমার নামেও লোকে করে ফেলবে, সেদিন বুঝতে পারবে ওতে কিচ্ছু এসে যায় না। একবার ভাব, চার্লসটনে এমন কোন বাড়ি নেই যেখানে আমাকে আমন্ত্রণ করা হয়। এমন কি এই ‘মহান এবং পবিত্র লক্ষ্যের’ জন্য ার্থিক অবদান সত্ত্বেও এই নিষেধাজ্ঞা ওঠেনি।”

“কি ভয়ঙ্কর!”

“মোটেই ভয়ঙ্কর নয়। যতক্ষণ তুমি তোমার সুনাম না হারাচ্ছ, ততদিন তুমি বুঝতেই পারবে না সেটা কি রকম বোঝা ছিল। অথবা স্বাধীনতার স্বাদ কেমন।”

“আপনি কিন্তু মানহানিকর কথাবার্তা বলছেন!”

“মানহানিকর কিন্তু সত্যি! বদনাম হয়াটা একদম অসুবিধেজনক নয় – অবশ্যই যদি তোমার যথেষ্ট সাহস আর আর্থিক সামর্থ্য থাকে।”

“টাকা দিয়ে সব কিছু কেনা যায় না।”

“নিশ্চয়ই কথাটা কারও কাছে শুনেছ। তুমি নিশ্চয়ই এরকম মামুলিভাবে চিন্তা কর না? কি কেনা যায় না বল?”

“জানিনা – হয়ত যায়। তবে সুখ – বা ভালবাসা তো কোনভাবেই যায় না।”

“সাধারণত যায়। তবে যদি একান্তই না পাওয়া যায়, তার পরিবর্তে অসাধারণ সব বিকল্প কিনতে পাওয়া যায়।”

“আর ক্যাপটেন বাটলার – আপনার এত টাকা আছে?”

“কি অশিষ্ট প্রশ্ন, মিসেজ় হ্যামিলটন! আমি খুব আশ্চর্য হলাম! তবে হ্যা, একদম শূন্য থেকে শুরু করে আজ এই বয়সে, আমি খারাপ অর্থোপার্জন করিনি। এই অবরোধের ব্যবসা থেকে – আমার আশা – এক মিলিয়ন আমি বানিয়েই ফেলব।”

“মোটেই না!”

“একদম সত্যি! যেটা সকলে বুঝতে চায় না সেটা হল কোন একটা সভ্যতার ধ্বংসের থেকেও ঠিক ততখানিই টাকা কামানো যায় যতখানি সভ্যতার বিকাশের থেকে করা যায়।”

“এই কথার মানে কি?”

“তোমার পরিবার, আমার পরিবার, সকলেই মরুভুমি থেকে একটা সভ্যতা গড়ে তুলেছে, অনেক অর্থোপার্জন করেছে। একে বলা হয় সাম্রাজ্যের বিকাশ। অনেক টাকা রোজগার করা যায় এই সাম্রাজ্যের বিকাশের মাধ্যমে। কিন্তু সাম্রাজ্যের বিনাশের মাধ্যমে আরও বেশি টাকা রোজগার করা যায়।”

“কোন সাম্রাজ্যের কথা আপনি বলতে চাইছেন?”

“দক্ষিণের যে সাম্রাজ্যে আমরা বাস করছি – কনফেডারেসি – কার্পাসের রাজ্য – আমাদের পায়ের তলায় আস্তে আস্তে এটা ভেঙ্গে পড়ছে। শুধু যারা বোকা তারা এটা বুঝতে চাইছে না বা এএ সঙ্কোচনের সুযোগ নেবার চেষ্টা করছে না। আর আমি এই ভাঙন থেকে আমার ভাগ্য বানিয়ে নিচ্ছি।”

“আপনি সত্যিই মনে করেন যে আমরা হেরে যাব?”

“নিশ্চয়ই। শুধু শুধু উটপাখি হয়ে থাকার কোন মানেই হয় না।”

“ওঃ হো এসব শুনতে শুনতে আমি বিষন্ন হয়ে পড়ছি। আপনি কি কখনও ভাল কোন কথা বলতে পারেন না, ক্যাপটেন বাটলার?”

“যদি বলি তোমার চোখদুটো টলটলে সবুজ জলে ভরা এক জোড়া গোল্ডফিশ রাখবার পাত্রের মত। আর সেই মাছদুটো যখন সাঁতরে ওপরে চলে আসে – যেমন এখন এসেছে – তখন সে দুটো দেখে মুগ্ধ হয়ে যেতে হয়। এ কথাটা কি তোমার ভাল লাগল?”

“না মোটেই ভাল লাগল না – যে গানটা এখন হচ্ছে সেটা কি জমকালো – না? এই রকম সঙ্গীতের সাথে তাল দিয়ে আমি অনন্তকাল ওয়াল্টজ় নেচে যেতে পারি। ইশ – এতদিন কি যে হারিয়ে গেছিল?”

“আমি যাঁদের সঙ্গে নেচেছি – তুমি তাদের মধ্যে সব থেকে সুন্দরী নর্তকী।”

“ক্যাপটেন বাটলার, আমাকে এত জোরে ধরে রাখবেন না। সবাই দেখছে।”

“কেউ যদি না দেখত, তাহলে তোমার আপত্তি হত না?”

“ক্যাপটেন বাটলার, আপনি আবোল তাবোল বকছেন।”

“ককখনো না। তোমাকে বাহুতে নিয়ে – সেটা সম্ভব? কোন গানের সুর? নতুন মনে হচ্ছে।”

“হ্যা। কি সুন্দর না? এটা আমরা ইয়াঙ্কিদের কাছ থেকে দখল করে নিয়েছি।”

“কি নাম গানটার?”

“ ‘নিষ্ঠুর যুদ্ধ স্তব্ধ হলে’।”

“কথাগুলো কি? আমাকে গেয়ে শোনাও তো।”

“মনে আছে প্রিয়তম সেদিনের কথা, শেষ যবে দেখা হল? 

হাতে হাত রেখে বলেছিলে ভালবাসি, আঁখি করে ছল ছল। 

তুমি এসেছিলে ধূসর ঊর্দি পরে, চোখের ভাষায় গর্বের ছোঁয়া লয়ে। 

কথা দিয়েছিলে রক্তের অক্ষরে 'প্রাণ পণ করি' দেশের দুঃসময়ে। 

বড় একা হয়ে কাটিয়ে চলেছি দিন, বিষাদে জড়ানো রাত। 

জানি নিষ্ঠুর যুদ্ধ স্তব্ধ হলে, তুমি ফিরে এসে ধরবে আমার হাত!”

“এখানে অবশ্য ‘সুনীল ঊর্দি’ ছিল আমরা ‘ধূসর’ করে নিয়েছি। ক্যাপটেন বাটলার – কি অসম্ভব ভাল আপনি ওয়াল্টজ় নাচতে পারেন! আসলে লম্বা মানুষরা পেরে ওঠে না – আপনি জানেন। জানিনা আবার কত বছর পরে নাচার সুযোগ পাব!”

“বছর নয় – কয়েক মিনিট। আমি এর প০অরের লোকনৃত্যের জন্যও তোমার অপর বাজি রাখব – তার পরেরটাও – তার পরেরটাও – সবগুলোই।”

“না না – আমি পারব না! আপনি একদম এরকম করবেন না। আমি একেবারে বদনাম হয়ে যাব।”

“তোমার বদনাম হবার আর কিছু বাকি আছে নাকি? তাহলে আরেকটা নাচে কি এসে যায়? হয়ত চার পাঁচটা নাচের পরে আমি অন্যদের সুযোগ দেবার কথা ভাবব। কিন্তু শেষের নাচটাও আমারই হবে।”

“ঠিক আছে – ঠিক আছে। মাথাটা আমার খারাপই হয়ে গেছে। কিন্তু আমি পরোয়া করিনা। কে কি বলল তাতে আমার কিছু এসে যায় না! বাড়িতে বসে বসে এত ক্লান্ত হয় পড়েছি যে – আমি খালি নাচতে চাই – নেচে যেতে চাই ___”

“নিশ্চয়ই কালো পোশাকটা পরতে চাও না। শোকের প্রতীক এই ক্রেপ কাপড় আমার অসহ্য লাগে।”

“না এই শোকের পোশাক আমি ছাড়তে পারব না – আর আমাকে অত শক্ত করে চেপে ধরবেন না, ক্যাপটেন বাটলার – তাহলে আমি আপনার অপর খুব রেগে যেতে বাধ্য হব।”

“তুমি রেগে গেলে তোমাকে কি সুন্দর দেখায় কি বলব! আমি তোমাকে আরও জোরে চেপে ধরব – দেখব তুমি সত্যিই রেগে যাও কিনা। সেদিন টুয়েল্ভ ওকসে তোমাকে কি দারুণ লাগছিল – তোমার কোন ধারনাই নেই – যখন তুমি সে জিনিষপত্র ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলছিলে।”

“থামুন দয়া করে – আপনি কি ওই কথাটা ভুলতে পারবেন না?”

“না! সেটা আমার কাছে একটা অমূল্য স্মৃতি – বিলাসের মধ্যে বড় হয়ে ওঠা এক দক্ষিণী মেয়ের মধ্যে তার আইরিশ প্রবণতা মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে! তুমি কি জান যে তুমি স্বভাব চরিত্রে ভীষণ আইরিশ?”

“দেখুন, দেখুন – বাজনা থেমে গেছে – আন্ট পিটিপ্যাট ভেতরের ঘর থেকে বেরিয়ে আসছেন। নিশ্চয়ই মিসেজ় মেরিওয়েদার ওঁকে কিছু বলেছেন। ভগবানের দোহাই এদিক থেকে চলুন – আমরা জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকব। আমি চাই না যে উনি আমাকে এই অবস্থায় পাকড়াও করুন। দেখুন, কিরকম গোল গোল চোখ করে তাকাচ্ছেন!”

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন