রবিবার, ২৮ অক্টোবর, ২০১৮

দীপেন ভট্টাচার্যের ধারাবাহিক উপন্যাস : আন্তারেস--পঞ্চম পর্ব

[পূর্ববর্তী অধ্যায়গুলির লিঙ্ক]


বাবাকে নিয়ে পরাকণা যেখানে সংরক্ষণ করা হয় সেই চক্রটি মহাশূন্যে উৎক্ষিপ্ত হল। আমরা আর্তনাদ করে উঠলাম। সবচেয়ে বেশি জোরে চিৎকার করে উঠল ইন্দল–যে কিনা আমার মা নয়­–অথচ যাকে আমি মা বলে চিনি জন্ম থেকে, কিন্তু যে কিনা ঠিক মানুষ নয়। মা আমাকে বললে, “এই ঘর থেকে বার হোস না শোগি।” এই বলে ছুটে বেরিয়ে গেল নিরাপদ ঘর থেকে। আমরা স্ক্রিনে দেখতে পেলাম বাবার হেলমেট-পরা মাথাটা ধীরে ধীরে ছোট হয়ে আসছে।
তেজষ্ক্রিয়তা থেকে বাঁচতে হেলমেট পরা ছিল, কিন্তু মহাশূন্যের শূন্য চাপ বা বায়ুহীনতা থেকে বাঁচার জন্য তার সঠিক পোষাক পরা ছিল না। বাবার শরীরটা ধীরে ধীরে বিন্দু হয়ে যেতে লাগল। আধ মিনিটের বেশি মানুষ ঐ চরম পরিবেশে বাঁচে না। নেনা আর তমাল আমার কাছে এল, নেনা আমাকে জড়িয়ে ধরে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল। আমার চোখ দিয়ে জল গড়াতে থাকল।

তিন মিনিটের মাথায়, একটা ছোট মহাকাশযান যাকে সাটল বলা যায় সেটা দেখলাম রওনা হয়ে গেল বাবার দিকে। এরপরে স্ত্রিনটা বন্ধ করে দেয়া হল। নেনা আমার হাত ধরে ঘরের বাইরে নিয়ে গেল, পাশে তমাল। আমি নিঃশব্দে কাঁদছিলাম। নেনা বলল, “শোগি কেঁদো না, তোমার বাবার কিছু হয় নি।” আমার বাবার কিছু হয় নি, ঐ মহাশূন্যে পাঁচ মিনিটেরও বেশী নিশ্চয় সে ভেসে ছিল, তার কিছু হয় নি? আমি বুঝতে পারলাম না নেনা কী বলছে, কিন্তু বাবার কিছু হয় নি শুনে কান্না থামিয়ে দিলাম। নেনার দিকে তাকিয়ে বললাম, “বাবা বেঁচে আছেন?” বাবা কী করে বেঁচে থাকতে পারেন ঐ বায়ুশূন্য, চাপশূন্য মহাকাশে বুঝতে পারলাম না, কিন্তু তার যে বাঁচার একটা সম্ভাবনা আছে সেটা ভেবেই আমার সমস্ত হতাশা দূর হয়ে গেল। নেনা আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছিল বুঝতেই পারছিলাম না। অবশেষে বুঝলাম আমরা এসেছি মহাকাশযানের মূল নিয়ন্ত্রণকক্ষে। সেখানে জাহাজের অধিনায়ক ড্রেগলেস ছাড়া আর কেউ নেই। ড্রেগলসে, নেনা আর তমাল এই তিনজন বড়দের সাথে আমি একা, খুব ভয় করতে লাগল, জানি না কেন। ড্রেগলসকে আমরা বাচ্চারা সবাই ভয় করতাম। কিন্তু এখন ড্রেগলস হেসে বলল, “ভয় পেয়ো না, শোগি! সব ঠিক হয়ে যাবে। তোমার বাবাকে এখুনি দেখতে পাবে।” আমি বললাম, “বাবাকে পাওয়া গেছে?” ড্রেগলস বলল, “পাওয়া শুধু যায় নি, তোমার বাবা অক্ষত আছেন। তোমার মা তার সাথে আছেন।” এই বলে ড্রেগলস নেনার দিকে চাইল। নেনা হ্যাঁসূচকভাবে মাথা নোয়াল।

ড্রেগলস চেয়ার ছেড়ে পায়চারি করা আরম্ভ করল। ড্রেগলসের যেন আরো কিছু বলার ছিল, কিন্তু আমি ভাবছিলাম বাবাকে এখন কীভাবে উদ্ধার করা হচ্ছে। বললাম, “সাটল কি বাবাকে তুলতে পেরেছে?” ড্রেগলস বলল, “অবশ্যই!” ড্রেগলস দুটো ঠোঁট মুখের ভেতর ঢুকিয়ে কী যেন চিন্তা করে। তারপর বলে, “শোগি, তোমাকে আজ একটা কথা বলার সময় এসেছে। ধীরে ধীরে তুমি বা এই জাহাজের তোমার যত ছোট বন্ধুরা তারা এটা জানতে পারবে। আমরা জানতাম এটাকে কোনোভাবেই গোপন করা যাবে না। কিন্তু কিছু অনভিপ্রেত ঘটনারা জন্য তুমিই প্রথম এটা জানছ।”

আমার মনে একটা অবোধ্য প্রকাশ্য ভয় দানা পাকাচ্ছিল, আমার পেটটা মোচড় দিয়ে উঠছিল, ড্রেগলস যে কী বলবে তা যেন আমি বুঝতে পারছিলাম, মনে মনে বলছিলাম বলো বলো না, আমি শুনতে চাই না। সত্যি কথাটা আমি শুনতে চাই না। আমি মা’কে হারিয়েছি, বাবাকেও হারাতে চাই না। ড্রেগলস যেন বুঝল আমার মনের অশান্তি, সাহায্যের জন্য আবার চাইল নেনার দিকে। নেনা বলতে শুরু করল, “শোগি, তুমি খুব বুদ্ধিমান মেয়ে। তোমার মা’র সঙ্গে ইতিমধ্যে তোমার কথা হয়েছে। তুমি এখন বুঝতে পেরেছ সে কে। শোগি…..”

আমি আমার দু-কান চেপে ধরলাম, চিৎকার করে উঠলাম, “শুনতে চাই না, আমি শুনতে চাই না।” নেনা বলে, “শোগি, তুমি বুঝতে হয়তো পারছ আমি তোমাকে কী বলতে চাইছি। তোমার মা’র মত মানুষ যাদের কৃত্রিমভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে তাদের একটা নাম আছে। তাদের বলা হয় রোমা - এই নামটা রোবট ও মানুষ এই দুটি কথার আদ্যাক্ষর নিয়ে গঠিত হয়েছে। শোগি, তোমার মা যেমন একজন রোমা, তোমার বাবাও সেরকম একজন রোমা।”

“না-আ-আ-আ,” বলে চিৎকার করতে করতে আমি নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে বের হয়ে যেতে চাই। তমাল আমাকে জড়িয়ে ধরে আবার ঘরের মধ্যে নিয়ে আসে। “শোগি, রোমা হলেও তোমার বাবা মা তোমাকে মানুষের চেয়ে কম ভালবাসে না, বরং আমি বলব তাদের ভালবাসার বোধ আরো তীব্র। তাদের সংবেদনা আরো গভীর।” আমি কিছু চিন্তা করতে পারছিলাম না। এটা কেমন করে সম্ভব? এর মধ্যেই ঘরে ঢুকল বাবা, তার সাথে মা। কিন্তু এরা কেউ আসলে আমার বাবা মা নয়, যে পৃথিবীটা আমি চিনতাম সেটা ধ্বসে যাচ্ছে। ইন্দল আমাকে মিথ্যা কথা বলেছে, সে বলেছিল আমার বাবা তার মত নয়। তাহলে আমার বাবা কোথায়?

এই মহাকাশযানে যাকে আমি বাবা বলে এতদিন জেনেছি, যার নাম ক্লেভান, সে দূরে দাঁড়িয়ে অসহায় মুখে আমাকে দেখছিল। মায়াময় ছিল আমার বাবার মুখাবয়ব, বেদনা ভরা, কিন্তু সে তো মানুষ নয়। মহাশূন্যের চরম বিরুদ্ধে পরিবেশে মিনিটের পর মিনিট ভেসে থেকেও তার কিছু হয় নি; না কিছু হয় নি বলব না, গালের চামড়া কেমন ঝুলে পড়েছে, ডান হাতের দুটো আঙুল নেই, কিন্তু তাতে তার যেন কোনো যন্ত্রনা হচ্ছে না। আমি সান্ত্বনা চাইছিলাম, কিন্তু ক্লেভানের যেন সাহস হচ্ছিল না আমার কাছে আসবার; কিন্তু ইন্দল এগিয়ে এল, বলল, “শোগি, তোর ভালর জন্যই আমি মিথ্যে বলেছিলাম।” আমি নেনার হাত ধরে পিছিয়ে আসতে চাইলাম, কিন্তু নেনা তার জায়গা থেকে নড়ল না। আর তখনই যখন ইন্দল আমার খুব কাছাকাছি এসে পড়েছে আমার মনে একটা ভয়াবহ চিন্তা জেগে উঠল। আমি নেনার হাত ছেড়ে দিলাম।

ঘরে পাঁচটি মানুষ ছিল, আমাদের মহাকাশজানের অধিনায়ক ড্রেগলস, সহঅধিনায়ক ক্যাপ্তেন নেনা, যে কিনা আমার বন্ধু বেলকের মা; নিরাপত্তা অফিসার তমাল, আমার বাবা ক্লেভান আর মা ইন্দল। ইন্দল আর ক্লেভান যে মানুষ নয় সেটা আমি জানি, কিন্তু এমন কি হতে পারে এর সবাই রোমা, কেউই মানুষ নয়, অর্থাৎ ড্রেগলস, নেনা আর তমালও রোমা। আর তাহলে জাহাজের বাদবাকি সবাই? সিয়ানা, বিজন, আস্টার, রুডাবা? এই বড়রা যদি কেউ মানুষ না হয়, তবে আমরা এতদিন কাদের ওপর ভরসা করে চলেছি, কারা আমাদের ভালবেসেছে, আমরাই বা কাদের ভালবেসেছি? আর বাচ্চারা? আমার বন্ধুরা? লাহে, এমা, ইলিয়াল, মালাই, তিলাই, মিলা, রিনা, লেনাক? তারাও কি রোমা? আর বেলক, আমার প্রিয় বন্ধু। না, সে রোমা হতেই পারে না।

ঘরের পাঁচজন আমার বিস্ফারিত ভয়ার্ত চোখে যেন আমার আতঙ্ক বুঝতে পারে। ইন্দল আর ক্লেভানের চোখের আকুতি আমার কাছে অলক্ষিত থাকে না, কিন্তু তাদের বেদনা কি সত্যিকারের বোধের বেদনা, নাকি যান্ত্রিক? এবার নেনা আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলে, “শোগি, তোমার মনে যে প্রচণ্ড ঝড় বইছে তা আমরা সবাই বুঝতে পারছি। তুমি বোধহয় ধরতে পেরেছ যে এই ঘরে আমরা সবাই রোমা।”

আমার ভয়টা সত্যি হল। নিকষ কালো মহাকাশে, এই জাহাজে এতদিন ধরে যা জেনে এসেছি সবই মিথ্যে। এখান থেকে পালানোর পথ নেই।


(চলবে)

1 টি মন্তব্য: