রবিবার, ২৮ অক্টোবর, ২০১৮

দীপেন ভট্টাচার্যের ধারাবাহিক উপন্যাস : আন্তারেস--চতুর্থ পর্ব

[পূর্ববর্তী অধ্যায়গুলির লিঙ্ক]
চিৎকার করে উঠি আমি, ঘুম ভেঙে গেল। স্কন্ধকাটা মা নেই কোথাও। আধো-অন্ধকারে দেখি ঘরে কেউ নেই। বিশাল মহাকাশযানের শব্দ শোনা যায়। একটা যান্ত্রিক শব্দ। অসীম শূন্যতায় আন্তারেস চলেছে। এতদিন এই নিয়ে ভাবি নি, কিন্তু আজ গা শিউরে ওঠে। মহাশূন্যের শূন্যতায় ভেসে চলেছে এই ক্ষুদ্র মহাকাশযান। সেই শূন্যতায় মা ছাড়া আমি বাঁচবো কেমন করে? আমি বিড়বিড় করে বলি, মা মা। আমার কথায় ঘরের কোনায় একটা বাতি জ্বলে ওঠে। মিরার মুখ স্ক্রিনে ভেসে ওঠে, মিরা বলে, “শোগি, কেমন আছ?” আমি বলি, “মা কোথায়?” “তোমার মা একটু পরেই আসবে তোমার কাছে। তুমি তো তাকে অন্যভাবে দেখেছ, ভুল দেখেছ, সেজন্য ও তোমার কাছে আসতে ভয় পাচ্ছে।” আমার মা কখনো কিছুতে ভয় পায় না। এ কোন মা আমার? মিরা বলে, “ভেবো না, শোগি, সব ঠিক হয়ে যাবে। তোমার বাবাকে ডাকছি।” বাবাকে? বাবা কি জানে মা’র কী হয়েছে। একটা হাল্কা বাজনায় ঘর ভরে যায়। বাজনাটা আমাকে যেন কিছুটা স্বান্তনা দেয়। মিরাই নিশ্চয় চালিয়েছে। মিরা জানে কোন বাজনায় তাকে শান্ত করা যাবে। 

আমি আবার ঘুমিয়ে পড়ি। আবার স্বপ্ন দেখি, এবার আউরেরগথদের মহাকাশযান আমাদের প্রায় ধরে ফেলেছে। দেখলাম একটা একটা করে আউরেরগথ তাদের মহাকাশযান থেকে বের হয়ে আসছে, মহাকাশের শূন্যতায় তাদের কিছু হচ্ছে না। তাদের দেখতে অষ্টভূজ অক্টোপাসের মত, কিন্তু বিশাল। তাদের লম্বা শূঁড় দিয়ে তারা আমাদের জাহাজকে অনায়াসে জড়াচ্ছে। দুমরে-মুচড়ে যাচ্ছে আমাদের বিরাট মহাকাশযান। আমি চিৎকার করে উঠি, সেই চিৎকারে আমার ঘুম ভেঙে যায়। ঘর আগের মতই আধো-অন্ধকার আলোয় ভরা। শুধু এবার মনে হল আর কী যেন শব্দ শোনা যাচ্ছে। একটা চাপা শব্দ, সাইরেন, আন্তারেসের বিপদ সংকেত। আমাকে যে ঘরে রাখা হয়েছে তার একপাশের কাচের বড় জানালা দিয়ে দেখলাম করিডরের আলো নিভছে আর জ্বলছে, অনেকে করিডর দিয়ে দৌড়াচ্ছে। আমি বিছানা ছেড়ে নিচে নেমে সেই জানালার দিকে এগোই। করিডর দিয়ে যারা দৌড়ে যাচ্ছে তাদের মুখ ভয়ার্ত, আউরেরগথরা কি সত্যিই আন্তারেসকে জড়িয়ে ধরেছে? কিন্তু আউরেরগথদের যে কী চেহারা তা তো আমরা কেউ জানি না। অষ্টভূজ অক্টোপাসেরা আন্তনাক্ষত্রিক মহাকাশযান বানাতে পারবে না বলেই আমার বিশ্বাস। আর স্বপ্নে তাদের যেমন দেখেছি, কোনোরকম বিশেষ পোষাক ছাড়াই তারা মহাশূন্যে ভাসছে, চাপশূন্য বায়ুশূন্য মাধ্যমে কী কোনো প্রাণী ঐভাবে ভ্রমণ করবে? সেটা একটা অসম্ভব ব্যাপার। 

কিন্তু সবাই দৌড়াচ্ছে, আমি দেখলাম ঘরের দরজা খোলা, আমিও বেড়িয়ে আসি করিডরে। বাবাকে ডাকতে হবে, করিডরে ফোন আছে। থেমে বাবাকে ফোনে ডাকলাম, বাবা ফোন ধরল না। মা’কে ও ফোন করতে গিয়েছিলাম, কিন্তু করলাম না। আমার বন্ধুদের কাউকে দেখলাম না। করিডরে বাচ্চারা কেউ নেই, সবাই বড়, আমার দিকে তাকিয়ে তারা কী যেন বলতে গিয়ে বলছে না, চলে যাচ্ছে। আমি আমাদের ঘরের দিকে হাঁটতে থাকলাম। করিডরের একটা বাঁক ঘুরতেই দেখি মা, আমার খোঁজেই নিশ্চয় আসছিলেন। আমি দাঁড়িয়ে যাই। ভয়ে শরীরে কাঁটা দেয়। এই মানুষটি আমার মা নয়। এ কোনো যান্ত্রিক রোবট। ঘুরে পালাতে চাই, কিন্তু আমার পা চলে না। মা বলেন, যেরকম সবসময় বলেন, “ভয় পাস না, শোগি, আমিই তোর মা।” 

আমি কিছু বলতে পারি না। মা এগিয়ে এসে আমার হাত ধরতে চান, আমি সিঁটিয়ে যাই, হাত টেনে নিই। মা’র চোখের দিকে তাকাই, আহত হয়েছেন বুঝতে পারি। কিন্তু আমি এখানে কী করতে পারি। চোখ নামিয়ে শুধু বলতে পারি, “বাবা কোথায়?” “বাবা ইঞ্জিন ঘরে ব্যস্ত, আউরেরগথদের লেজার আমাদের ইঞ্জিনের ক্ষতি করেছে, তেজষ্ক্রিয় বিকিরণ বের হচ্ছে, আমাদের এখন ঘরে যেয়ে বিকিরণরোধী পোষাক পরে নিতে হবে। সেজন্যই তোকে আমি নিয়ে যেত আসছিলাম।” এই মানুষটি আমার মা এত বছর যেভাবে কথা বলেছিলেন সেভাবেই কথা বলছেন। এত বছর তাহলে ইনিই - যিনি রক্তমাংসের মানুষ নন - তিনিই আমার মা ছিলেন। 

আমার হাত ধরে মা চললেন। পথে অনেকেই তার সঙ্গে কথা বলল। সবাই তাকে আগের মতই 'ইন্দল' বলে সম্বোধন করল। এমন যেন কিছুই হয় নি। তারা কি জানে না ইন্দল মানুষ নয়? আমাদের ঘরের সামনে এলে ইন্দল বলল, “আমি আগে যা ছিলাম তাই আছি, শোগি। আমার কিছু পরিবর্তন হয় নি। আগে যদি আমাকে মা বলে চিনতিস এখনো আমি তোর মা’ই আছি। আমার বাইরেটাই দেখলি শুধু, ভেতরটা আমার ক্ষয়ে যাচ্ছে।” এবার সাহস করে আবার তাকাই ইন্দলের দিকে। ইনি ছাড়া আর কোনো মা’কে আমি চিনি না। তবুও বুকটা কেমন জানি করে। আমরা আমাদের ফ্ল্যাটে ঢুকে একটা তাক থেকে বিকিরণরোধী পোষাক বের করি। ওটা পরতে বেশ কয়েক মিনিট সময় নেয়। আমাদের সারা শরীর ঢাকা থাকে, মাথায় একটা কাচের আবরণ, হেলমেটের মত। আমরা তার ভেতরের রেডিও চালু করি। আমার ঘরে ঢুকে আমাকে চেয়ারে বসিয়ে মা আমার বিছানায় বসেন। বলেন, “তোকে অনেক কথাই বলা হয় নি। আমি জানি না তোকে কতটা আমি বলতে পারব। তবে যত কম তুই জানিস ততই ভাল।” 

এই বলে ইন্দল চুপ করে থাকে অনেকক্ষণ। পরের কথাগুলো তার বলতে কষ্ট হবে, আমি বুঝতে পারছিলাম। ইন্দল বলে, “শোগি, তুই বুদ্ধিমান মেয়ে, আমি যে তোর আসল মা নই তুই বুঝতে পারছিস। পৃথিবীর খুব দুঃসময়ে আন্তারেস পৃথিবী ছাড়ে। আউরেরগথদের আক্রমণে পৃথিবী তখন পর্যুদস্ত। পৃথিবীর কিছু মানুষ যেন বাঁচে সেজন্য বহুবছর ধরে মানুষ মহাশূন্যের গভীরে অন্য একটি গ্রহ খুঁজছিল যা কিনা পৃথিবীর মতই হবে। তারা নতুন নতুন ইঞ্জিনের উদ্ভাবন করছিল যা দিয়ে কিনা আন্তনাক্ষত্রিক শূন্যতাকে অল্প সময়ে পার করা যায়। আয়নিত জেট, নিউক্লীয় ফিশান আর ফিউশন, কণা ও পরাকণার সংঘর্ষ, শূন্যতার শক্তি কত কী চেষ্টা করা হল। অবশেষে কাজ করল এই কণা-পরাকণা বিজ্ঞান। এই প্রকৌশলে আমরা আলোর গতির শতকতা দশভাগ গতি অর্জন করতে পারি, সেকেন্ডে ৩০,০০০ কিলোমিটার। আন্তারেস ছিল ঐ কারিগরী পদ্ধতির প্রথম মহাকাশযান। পৃথিবীর সবচেয়ে বুদ্ধিমান মানুষেরা বাছাই করল আঠারোটি তরুণ দম্পতি। তাদের কোনো সন্তান ছিল না। তারা সবাই এই মহাকাশযানেই জন্মেছ।” 

না, এটা তো সত্যি হতে পারে না, ভাবি আমি। বলি, “তাহলে আমি? আমি কী তোমার থেকে জন্মেছি?”

“না, শোগি, তুই আমার থেকে জন্মাস নি। আমি যা বলব এখন তা তুই কীভাবে সহ্য করবি জানি না। তোকে বলতে আমার ভয় করছে।” এই বলে ইন্দল ঘরের দেয়ালে টাঙ্গানো বড় ছবিটার দিকে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। আমি শুনেছি ছবিটার নাম নক্ষত্রের রাত। বিশাল বিশাল তারা জ্বলছে আকাশে, তার মধ্যে আলোর ঘূর্ণী। সেই উজ্জ্বল আকাশের নিচে, ঝাউগাছ পেরিয়ে গ্রামের বাড়ির ছাদ, তার পেছনে পাহাড়ের মসীরেখা, আর পাহাড় পার হয়ে নক্ষত্রের আলোর ঝর্ণা। মনে হয় ইন্দল সাহস সঞ্চয় করতে পারে কিছুটা, বলে, “ঐ সময়ে আউরেরগথরা পৃথিবীর ওপর ক্রমাগতই আক্রমণ করছিল। সেরকম একটি আক্রমণে তোর মা মারা যান।” 

আমি কী করব বুঝে পাই না। এই খবরে আমার কেমন প্রতিক্রিয়া হওয়া উচিত ভাবি। আমার মা তো আমার সামনেই বসে আছেন। তিনি যে রোবট সেটা সবসময় মনে থাকছে না। শুধু বলতে পারি, “আর বাবা?” 

উত্তর দিতে ইন্দল সময় নেয়। বলে, “তোর বাবা বেঁচে যান। তুই তখন তোর মা’র পেটে। তোকে উদ্ধার করে সংরক্ষণ করা হয়। পৃথিবীর একটা গবেষণাগারে তোর প্রথম কয়েক মাস কাটে, সেখানেই বলতে গেলে তোর জন্ম। এই মহাকাশযানের ছোটদের মধ্যে একমাত্র তোরই জন্ম পৃথিবীতে।” 

আমার মাথা ঝিমঝিম করে। মনে হয় এই ঘর থেকে দৌড়ে পালাই। কোথায় পালাব? অনন্ত মহাকাশে পালানোর জায়গা কোথায়? বলি, “আমি বাবার কাছে যাব।” 

“যাবি নিশ্চয়, শোগি। কিন্তু আউরেরগথের আক্রমণে ইঞ্জিনের ক্ষতি হয়েছে। তেজষ্ক্রিয় বিকিরণ বের হচ্ছে। থেলিনই একমাত্র মানুষ যে কিনা সেটা ঠিক করতে পারে। ঘন্টা খানেকের মধ্যেই ও এখানে চলে আসবে।” 

“তুমি কি তাহলে আমার মা’র মতই দেখতে?” 

“হ্যাঁ, পৃথিবীতে আমার মত কেউ নেই। আমাদের কৃত্রিম উপায়ে বানানো হয় বটে, কিন্তু আমাদের অনুভব মানুষের অনুভবের থেকে ভিন্ন নয়। আমাদের দুঃখ, আনন্দ, বেদনা খুবই মূর্ত। আমি চোখে যে রঙ দেখি তা আমার মনেই ফুটে ওঠে, বর্ণালী বিশ্লেষণ করে কোনো কম্পিউটার বলে না তোমার এখন এই রঙ দেখা উচিত। তোকে যে ভালবাসি সেটাও ঐ অনুভূতির জায়গা থেকেই, তার মধ্যে কোনো কৃত্রিমতা নেই। তোর মা মারা যাবার পরে ওনার ডিএনএ ব্যবহার করে আমার দেহ গঠন করা হয়।” 

এর মধ্যেই ঘরের টেলিভিশন স্ক্রিনে নেনার মুখ ভেসে ওঠে। নেনা খুব দ্রুত বলে, “তেজষ্ক্রিয় বিকিরণের মাত্রা যা ভাবা গিয়েছিল তার থেকে বেশী। আমরা অনুরোধ করছি সবাইকে জাহাজের তেজষ্ক্রিয়রোধী ঘরটায় গিয়ে জড়ো হতে। একমাত্র জরুরী কাজে নিয়োজিত কয়েকজন ছাড়া এই আদেশ সবার জন্য প্রযোজ্য। ইঞ্জিনিয়ার থেলিন বলছেন আমাদের ঘাবড়াবার কিছু নেই। প্রতিকণা সংরক্ষাণাগারের দেয়াল আউরেরগথ আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। তাঁর দল সেটা মেরামত করছে। আগামী এক ঘন্টার মধ্যে আশা করা যাচ্ছে এই কাজটা শেষ হবে।” 

ইন্দল আমার হাত চেপে ধরে। তার চোখে আতংক। বলে, “শোগি, তোর বাবা সাংঘাতিক তেজষ্ক্রিয়তার মধ্য দিয়ে যাবে।” ইন্দল বাবাকে ভালবাসে। মানুষ না হয়েও ভালাবাসার ক্ষমতা তাহলে থাকে। 

“আমরা কী করব….মা?” মা কথাটা বলতে প্রথমে আমার দ্বিধা হয়। তারপর ভাবি এই মানুষটি ছাড়া আমি অন্য কোনো মা চিনি না। আমাকে হাতে ধরে করিডরে বের হয় মা। অনেককেই তেজষ্ক্রিয়-নিরাপদ ঘরের দিকে দৌড়াতে দেখি। আমরাও তাদের সাথে যোগ দিই। সবার মুখে আতংকের ছাপ। পথে এমা, ইলিয়াল আর লাহের সঙ্গে দেখা, তারা তাদের মা সিয়ানার সাথে দৌড়াচ্ছে। ওরা ইন্দলের দিকে অদ্ভূত ভাবে তাকাল, সবাই যেন গেছে আমার স্কন্ধকাটা মা’র কথা। নিরাপদ ঘরে ঢুকে দেখি কেউ বসে, কেউ ভীড় করে দাঁড়িয়ে। সবাই উত্তেজিতভাবে কথা বলছে। মনে হল আমাদের দেখে সবাই যেন চুপ করে গেল। একটা বেঞ্চে মালাই, তিলাই আর বেলক বসা। তার উল্টো দিকে ক্লাভান, মিলা, রিনা আর লেনাক। ওরা সবাই মা’র দিকে তাকিয়ে থাকে। আমি যে মা’র হাত ধরে ভেতরে ঢুকেছি তা ওদের অলক্ষিত থাকে নি। তাহলে ওরা কী ভাবছে আমি যা দেখেছি তা হ্যালুসিনেশনই ছিল। 

আমি বেলকদের সাথে বসতে গেলাম। নেনা আর তমাল ঘরের একদিকে ছিল, মা ওদের সঙ্গে কথা বলতে গেল। দেখলাম ওদের মুখে হাসি নেই। তেজষ্ক্রিয়তা নিয়ে সবাই চিন্তিত। তারা নিশ্চয় জানে মা যে মানুষ নয়। কিন্তু মা যদি মানুষ না হয় তবে মা কী? মা তো রোবটও নয়। রোবটদের অনুভূতি থাকে না, তারা ব্যথা পায় না। মা’কে কী বলা যায়? নিশ্চয় পৃথিবীতে এরকম মানুষদের কোনো বিশেষ নাম আছে। আমি ভাবতে থাকলাম। 

আমাদের সবারই তেজষ্ক্রিয়তা-প্রতিরোধী পোষাক পরা ছিল। শুধু মাথার হেলমেটগুলো খুলে আমরা টেবিলে রাখলাম। ধীরে ধীরে ঘর আরো মানুষে ভর্তি হওয়া শুরু করল। অধিনায়ক ড্রেগলস তাদের মধ্যে ছিল না, কাউকে তো মহাকাশযানের নিয়ন্ত্রণকক্ষে থাকতে হবে। আমার বাবা থেলিন ইঞ্জিন ঘরে। তার সাথে কে আছে জানি না। হয়তো বিজন, হয়তো আস্টার, হয়তো রুডাবা। নেনা, তমাল আর মা’র মুখ দেখে বুঝতে পারছিলাম ইঞ্জিন ঘরের অবস্থা ভাল নয়। এর মধ্যেই বাবার মুখ ভেসে ওঠে দেয়ালের স্ক্রিনে। সবাই চুপ করে যায়। থেলিন বলে, “আমরা পরাকণার সংরক্ষণাগারের দেয়ালকে মেরামত করতে ব্যর্থ হয়েছি। আমাদের হাতে এখন একটাই উপায়। চক্রাকার গুদামটিকে আমাদের মহাশূন্যে উৎক্ষেপণ করতে হবে, নইলে সেখান থেকে যে তেজষ্ক্রিয়তা বার হচ্ছে তা আর এক ঘন্টা পরেই আমরা সহ্য করতে পারব না।” 

বাবা হেলমেট পরে ছিলেন। তবু সেটার কাচের মধ্য দিয়ে দেখলাম উনি ঘামছেন। দূরে দেখলাম মা’র মুখ সাদা হয়ে গেছে। পরাকণা সৃষ্টি করে তাদেরকে চারটা চক্রাকার সংরক্ষণাগারে রাখা হয়। তার মধ্যে তিনটে চক্র সবসময় কাজ করে আর একটা চক্রকে জরুরী সময়ের জন্য ব্যাকআপ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। চারটা চক্রের মধ্যে একটা ফেলে দিলে ব্যাকআপ যে থাকবে না সেটা বোঝাই যাচ্ছে। কিন্তু থেলিনের দল কি এই কাজটা নিরাপদে করতে পারবে? 

বাবা বলতে থাকেন, “গুদাম চক্রটি ফেলে দিতে হলে আমাদের দলকে মহাকাশযানের বাইরে যেয়ে কাজ করতে হবে। এর মধ্যে কিছুটা ঝুঁকি আছে। আশা করি কাজটা নিরাপদেই করা যাবে।” 

আমি ছোট হলেও বুঝতে পারছিলাম ১০০ মিটার ব্যাসের একটা বিশাল টরয়েড মহাশূন্যে ফেলে দেয়া সহজ হবে না। বাবারা যে জায়গায় কাজ করছিল সেখানে মাধ্যাকর্ষণ শক্তি নেই। আমরা দেখলাম বাবা, বিজন, আস্টার আর রুডাবা ভাসতে ভাসতে কিছু নিয়ন্ত্রণ প্যানেলের বোতাম টেপার জন্য তৈরি হচ্ছে। বোতাম টিপলে চক্রটির বাধনগুলো খুলে যাবে। সবাই রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করছিল কখন টরয়েডটি স্থানচ্যুত হয়ে মহাকাশযান থেকে আলাদা হবে। চারখানা ক্ল্যাম্প খুলতে হবে। চারজন চারদিকের চারটি প্যানেলের সামনে দাঁড়িয়ে, তারা একই সঙ্গে বোতামে চাপ দেবে যাতে ক্ল্যাম্পগুলো একই সময়ে খোলে। একই সময়ে যদি তারা না খোলে, কিংবা একটি ক্ল্যাম্প একেবারেই খুলতে ব্যর্থ হয় তবে তার পরিণতি খুবই খারাপ হবে, কারণ ক্ল্যাম্পগুলো খোলা মাত্র একটা নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণ টরয়েডটিকে আন্তারেসের পেছনে মহাশূন্যে উৎক্ষিপ্ত করবে। সব ক্ল্যাম্প না খুললে বিশাল চক্র মহাকাশযানের একটা বিরাট অংশ ধ্বংস করে দিতে পারে। 

চারটা স্ক্রিনে চারজনকে দেখাচ্ছে। নেনা কথা বলছে তাদের সাথে, শেষ মুহূর্তের কিছু সিদ্ধান্ত। ইঞ্জিন ঘরের চারজনই বারে বারে তাদের ঘড়ি দেখছে, সেখানে তাৎক্ষণিক তেজষ্ক্রিয়তার মান দেখা যায়। সেই মানটি আমরাও স্ক্রিনে দেখতে পাচ্ছিলাম। সাধারণ মাত্রা থেকে সেটা প্রায় ২০ গুণ বেশী ছিল। চূড়ান্ত আদেশটি এল অধিনায়ক ড্রেগলস থেকে। আমরা দেখলাম বাবা, বিজন, আস্টার আর রুডাবা চক্রের চারদিকে একসাথে বোতাম টিপল। ক্ল্যাম্প খোলা মাত্র ঐ চারজনের নিরাপদ জায়গায় ফিরে যেতে হবে যাতে পরবর্তী বিস্ফোরণ তাদের ক্ষতি না করে। বাধনগুলো শব্দ করে খুলে যেতে থাকল, কিন্তু বাবার দিকের ক্ল্যাম্পটি খুলল না। বাবা অন্য তিনজনকে নিরাপদ জায়গায় চলে যেতে বলে ক্ল্যাম্পটা হাত দিয়ে খোলার জন্য দ্রুত সেদিকে ভেসে গেলেন। মা চাপা চিৎকার করে উঠলেন। তবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিস্ফোরণ হওয়াটা কম্পিউটার আগেই বন্ধ করে দিয়েছিল। বাবা হাত দিয়ে ক্ল্যাম্প খুলতে পারলেন। দ্রুত তার নিয়ন্ত্রণ প্যানেলে ভেসে এসে একটা বোতাম টিপলেন, বিস্ফোরণ হল। চক্রটির যেখানে ভূমির সঙ্গে সমান্তরাল হয়ে উৎক্ষিপ্ত হবার কথা, আমরা দেখলাম সেটা একদিকে কাৎ হয়ে পড়ছে। সেইদিকের নিয়ন্ত্রণ প্যানেল বাবাসহ কাৎ হয়ে পড়ছে। আমরা সবাই আর্তনাদ করে উঠলাম। তারপর কাৎ হয়েই বিশাল টরয়েডটি মহাশূন্যে উৎক্ষিপ্ত হল, সে সঙ্গে নিয়ে গেল আমার বাবা ইঞ্জিনিয়ার ক্লেভানকে। 
(চলবে) 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন