মঙ্গলবার, ১ জানুয়ারী, ২০১৯

কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের গল্প : শ্যে জ্যানেট

মূল: অ্যালেন মাবানকো 
অনুবাদ: ফজল হাসান 

অনেক বছর বাইরে থেকে কয়েক দিনের জন্য বাড়ি এসেছি । 

আমরা ট্যোঁয়া-স্যঁ কোয়ার্টারের কাছে শ্যে জ্যানেট পানশালায় বসে আছি । এটা ব্যোকা প্রজাতন্ত্রের রাজনৈতিক রাজধানী লজিনোর সবচেয়ে ব্যস্ত জায়গা ।

পানশালার এক কোণে কয়েকজন খদ্দের বসে আছে, কিন্তু ওরা আমাদের কথা শুনতে পায় না । রাত্তির নেমে এলে ওদের মুখাবয়ব ধীরে ধীরে অন্ধকারে তলিয়ে যায় । এখানে আমরা দু’ঘন্টা ধরে বসে আছি । এত বছর পরে আমার আঙ্কেল আমাকে দেখে যারপরনাই আনন্দিত । 

এইমাত্র ওয়েট্রেস এসে আমাদের পানীয় দিয়ে যায় । মেয়েটির ফিরে যাওয়ার সময় আঙ্কেল ওর সুডৌল নিতম্বের দিকে আকুল দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন: 

– হে বৎস, তুমি কী মেয়েটিকে দেখেছ? সুন্দরী, তাই না? 

আমি চুপ করে থাকি । মেয়েটি কাউন্টারে যাওয়া পর্যন্ত আঙ্কেল হা করে তাকিয়ে থাকেন । তারপর তিনি আমার দিকে দৃষ্টি ফিরিয়ে পুনরায় বলতে থাকেন: 

– দেশটা বদলে গেছে । 

আমি যখন তার মুখমন্ডলের বিশাল ক্ষতের দিকে তাকাই, তখন তিনি বললেন: 

– হ্যাঁ, আমি জানি । এই ক্ষতটা যুদ্ধের জন্যই হয়েছে, অথবা তেলের … 

আঙ্কেল আমাদের পেছনে বারান্দায় বসা লোকজনের দিকে চকিতে তাকালেন । কিন্তু ওরা আমাদের কথা শুনছিল বলে মনে হচ্ছিল না । তাই আঙ্কেল তার অসম্পূর্ণ কথা পুনরায় শুরু করেন: 

– মাঝে মাঝে আমি ভাবি, আমাদের দেশে যদি তেলের ভান্ডার না থাকতো, তবে কেমন হতো? শান্তিময় দেশ? সেই দেশ – যার কোনো ইতিহাস নেই? আমি জানি না । আমরা কখনই জানবো না । আয়তনের দিক থেকে যদিও দেশটা ক্ষুদ্র, তবুও ঈশ্বর আমাদের তেলের খনি দিয়েছেন । আমাদের দেশের জনসংখ্যা মাত্র ত্রিশ লক্ষ । তিনি কেন উত্তর দিকে একটু-আধটু তেল দিয়ে বাকি সব তেল দক্ষিণ এলাকায় দিয়েছেন? সমবন্টন হলে সবাই আমরা ভাগ পেতাম এবং আমাদের খুনাখুনি করতে হতো না । উফ্, আসলে আমার অনুযোগ করা উচিৎ নয় । অনেক দেশের সমস্যা আরো প্রকট – জমিনের নিচে অথবা সাগরের তলে কোথাও কোনো তেল নেই । 

একনাগারে বলেই আঙ্কেল গ্লাস উপরে তোলেন এবং অবশিষ্ট পানীয় এক সঙ্গে গলার ভেতর ঢেলে দিয়ে আবার বলতে থাকেন: 

– তেলই শক্তি । যেখানেই তেল, সেখানেই যুদ্ধ । এমন কোনো দেশ আছে, যেখানে পানির জন্য যদ্ধ হয়? ভেবে দেখ, কোনো একটা দেশে কোথাও পানি নেই, সেই দেশের মানুষ কী বাঁচবে? তেল আমাদের অনেক ক্ষতি করেছে । উত্তর থেকে দক্ষিণ পর্যন্ত সমস্ত দেশ জুড়ে গৃহযুদ্ধের একমাত্র কারণ এই তেল । 

ওয়েট্রেস আরো দু’গ্লাস পানীয় এনে টেবিলের ওপর রাখে । আঙ্কেল হয়তো এক পলকের জন্য ওর গোলাকৃতি পাছার দিকে তাকিয়েছিলেন । 

– অপূর্ব অঙ্গসৌষ্ঠব, কী বলো? আমি কোথায় আছি? কী যেন বলছিলাম? 

– তেলের কারণে গৃহযুদ্ধ এবং … 

– ও হ্যাঁ, তাই তো ।তুমি যখন ফ্রান্সে ছিলে, তখন গৃহযুদ্ধ শুরু হয় । প্রেসিডেন্ট মনিয়াটো, যিনি ক্ষমতায় ছিলেন, নির্বাচনে পরাজয় মেনে নিতে পারেননি । তিনি গণতান্ত্রিক ভাবে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিজয়ী সলোলার কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে চাননি । এবং কেন চাননি? 

আমি এই ভেবে অবাক হচ্ছিলাম যে তিনি হয়তো বুঝতে পারছেন না আসলে খবরের কাগজ পড়ে যুদ্ধের সব কিছুই জানি । তবুও আমি চাই আঙ্কেল কথা বলুক । 

তিনি আরো উজ্জীবিত হয়ে বলতে থাকেন: 

– তেলের মালিকানা নিয়ে দ্বন্দ্বই হলো গৃহযুদ্ধের প্রধান কারণ । মালিক হলে গোপনে তেল বিক্রি করা যাবে এবং বিক্রির সেই উপার্জন দিয়ে ইউরোপে আলিশান বাড়ি কেনা যাবে । এদেশে তেলের মালিক জনগণ নয়, বরং প্রেসিডেন্ট এবং তার পরিবারবর্গ । সমস্যা হলো মনিয়াটো ফ্রান্সের সঙ্গে মিলে কাজ করে । কিন্তু সলোলা ফ্রান্সের সঙ্গে কাজ করতে চায় না । সে আমেরিকার সঙ্গে মিলে কাজ করতে চায় । সুতরাং ফ্রান্স ক্ষমতার টিকে থাকার জন্য মনিয়াটোকে সাহায্য করে । কিন্তু আমেরিকা নতুন প্রেসিডেন্টকে নিরাপত্তা দেয়নি, যিনি গণতান্ত্রিক ভাবে জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন । আমেরিকা মোটেও বোকা নয় । তারা জানে, অন্য জায়গায়, যেমন ইরাক, গিয়ে যুদ্ধ বাঁধিয়ে মওকা লুফে নিতে পারবে । এদেশের তুলনায় সেখানে বরং তারা আরো অনেক বেশি তেল পাবে । কেন এখানে তারা ইরাকের চেয়ে অনেক কম তেলের জন্য যুদ্ধ করবে? 

পানশালার সম্মুখেই একটা ট্যাক্সি এসে থামে । খাটো স্কার্ট পরিহিত দু’জন মহিলা বেরিয়ে আসে । আমার আঙ্কেল এবং আমি খুব মনোযোগ দিয়ে তাদের পর্যবেক্ষণ করি ।তাদের পায়ে হাই হিল জুতা । জুতার সাইজ হয়তো নয় নম্বর । তারা বারান্দা পেরিয়ে যায় এবং কাউন্টারে গিয়ে মালিকের সঙ্গে কথা বলে । আমরা শুনতে পাই মালিক বলছিল: 

– এবার আরো বেশী টাকা নিয়ে আসো । গতকাল খুব বাজে দিন ছিল । 

আমার আঙ্কেল বললেন: 

– তুমি দেখেছ? যুদ্ধ সবকিছু তছনছ করে দিয়েছে এবং আমাদের সর্বনাশ করেছে । বেঁচে থাকার জন্য সবাই সংগ্রাম করছে । আমি যেন কী বলছিলাম? 

– যুদ্ধ সম্পর্কে ফ্রান্স এবং আমেরিকা নিয়ে এবং … 

– হ্যাঁ, তাই । তুমি যখন দেশে ছিলে না, তখন গৃহযুদ্ধ ছিল ।তুমি তা জানো । উত্তর এবং দক্ষিণের হানাহানির সংবাদ সবই বিদেশের বিভিন্ন খবরের কাগজে প্রকাশিত হয়েছে । দক্ষিণের লোকেরা ক্ষমতায় এবং তারা তেলের হিস্যা ছাড়তে নারাজ । ভয়াবহ পরিস্থিতি ছিল, বুঝলে প্রিয় বৎস । সবদিক থেকে বিপুল পরিমানে অস্ত্রের আগমণ ঘটেছিল । দক্ষিণের লোকেরা অ্যাঙ্গোলানদের সাহায্য চেয়েছিল, এমনকি ফরাসীদেরও । ওরা এসে উত্তর এলাকা দখল করার উদ্দেশ্যে আক্রমণ করে । ভয়ে-আতঙ্কে উত্তর এলাকার লোকজন পালিয়ে গেছে এবং অনেকে ঝোপ-জঙ্গলের ভেতর আশ্রয় নিয়েছি । ক্ষুধার জ্বালায়, মশার কামড়ে এবং বিভিন্ন অত্যুষ্ণ অঞ্চলের রোগবালাইয়ে মারা গেছে । অনেকে কুমীর এবং সিংহের পেটেও চালান হয়েছে । বিশ্বাস করো, জমিনেও যুদ্ধ ছিল, ছিল আকাশেও যুদ্ধ । 

আঙ্কেল বেশ জোরে কথা বলছিলেন এবং একসময় বুঝতে পারেন যে, উপস্থিত খদ্দেররা তার কথা স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে । পুনরায় কথা বলা শুরু করার আগে তিনি কন্ঠস্বর নিচে নামিয়ে আনেন: 

– বন-জঙ্গলে সামান্য উচুঁ দিয়ে সামরিক বিমান উড়ে যেত । যারা আত্মরক্ষার জন্য জঙ্গলের ভেতর আশ্রয় নিয়েছিল, তাদের উদ্দেশ্যে বিমান থেকে বলা হতো । আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা থেকে বলা হয়েছে যে, ওরা সাহায্য নিয়ে এসেছে এবং খাবার সরবরাহ করবে । অথচ তুমি চাইলে প্রাচীন বামুন অর্থাৎ পিগমিদের মতো বন-জঙ্গলে খাওয়ার জন্য অনেক ফল-ফলাদি পাবে । মশকরা করে পিগমিদের কথা বললাম । তবে ওরা আসলেই খর্ব ছিল এবং ওদের পেটও ছিল ছোট । তাই বিশাল উদরের আমাদের মতো ওদের প্রতিদিন খাওয়ার প্রয়োজন পড়তো না । ওরা খাদ্য এবং পানি ছাড়া সপ্তাহের পর সপ্তাহ বাঁচতে পারতো । কিন্তু আমাদের প্রতিদিন খাবার খেতে হয় । 

আমার আঙ্কেলের চোখ ভিজে ওঠে । মনে হয় যেকোন সময় তার চোখ থেকে অশ্রুর ফোঁটা গড়িয়ে পড়বে । এক মুহূর্তের জন্য তিনি তার গ্লাসের দিকে তাকান । তারপর গ্লাসে পুনরায় পানীয় ঢালেন এবং বলতে আরম্ভ করেন: 

– আমরা কিসের ভেতর দিয়ে গিয়েছি, তুমি তা জানো না । তুমি খবরের কাগজে যা কিছু পড়েছ, বাস্তবে তার থেকেও অনেক খারাপ পরিস্থিতি ছিল । ভয়ঙ্কর অবস্থা ! আমি নিজের চোখে প্রত্যক্ষ করেছি । আমি সেখানে ছিলাম । শরণার্থীদের সঙ্গে আমি জঙ্গলে ছিলাম । কখনো সন্তান সম্ভাবা মহিলারা জঙ্গলের ভেতর শিশু-সন্তান জন্ম দিয়েছে । কেননা তোমাদের দেশে তেল কিংবা যুদ্ধ থাকলেও স্বাভাবিক নিয়মে শিশুদের জন্ম হতো । সবচেয়ে খারাপ দিক হলো, যুদ্ধবিগ্রহের মাঝেও আমরা কিন্তু প্রাকৃতিক খেলায় নিজেদের ব্যস্ত রেখেছি । আমি জানি, তুমি কি বলবে । তুমি বলবে: যুদ্ধ না থামা পর্যন্ত কী প্রাকৃতিক খেলা থেকে বিরত থাকা যায় না? হে প্রিয় বৎস, আমরা যদি যুদ্ধ থামা পর্যন্ত বিরত থাকতাম, তাহলে প্রাকৃতিক খেলা ভুলে যেতাম । তখ্ন আমরা হয়তো জন্তু-জানোয়ারের সঙ্গে খেলতাম । এটা কোনো নতুন কিছু নয় । ইতিহাসে দেখা যায়, কলেরার মতো মহামারীর সময়ও নারী-পুরুষ মিলিত হয়েছে । যাহোক, আমার মনে হয় না কলেরার সঙ্গে তেলের আদৌ কোনো সম্পর্ক আছে … 

দু’জন বারবণিতা আমাদের টেবিলের সামনে দিয়ে চলে গেল । আমার আঙ্কেল ফিরেও তাকায়নি । বরং তার কন্ঠস্বর ভারী হয়ে ওঠে । সেই ভারী গলায় তিনি বললেন: 

– জঙ্গলের ভেতর পরিবেশ খারাপ থেকে আরো খারাপ হয়ে গিয়েছিল । একদিন আমরা মাথার ওপর উড়ন্ত তিনটি হেলিকপ্টারের আওয়াজ শুনতে পেয়েছি । খুব নিচু দিয়ে উড়েছিল । মনে হয়েছিল গাছের উঁচু শাখার সঙ্গে স্পর্শ লাগবে । চতুর্দিকে গুজব রটেছিল যে, হেলিকপ্টারগুলো কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থার । আকাশে তিনটি হেলিকপ্টার আমরা উড়তে দেখেছি । হেলিকপ্টারের গায়ে ইংরেজিতে বড় অক্ষরের স্পষ্ট লেখা ছিল: ‘পিটিলয়ি’ । হেলিকপ্টারগুলো ছিল ফ্রান্সের এক কোম্পানীর । সেই কোম্পানী আমাদের দেশে তেল উত্তোলন করতো । অবশ্যই হেলিকপ্টারগুলো আমাদের সাহায্য করতে এসেছিল । বিড়ালের ভয়ে, যার কোন দাঁত নেই কিংবা ধারালো নখও নেই, নেংটি ইঁদুরের মতো আমরা ঝাঁকে ঝাঁকে জঙ্গলের ভেতর গোপন আস্তানা থেকে বেরিয়ে আসি । উল্লাসে আমরা চিৎকার শুরু করেছি । আমরা রীতিমতো নেচেছি এবং জোরে হাত তালি দিয়েছি । একে অপরকে জড়িয়ে ধরে আনন্দ ভাগাভাগি করেছি । চিৎকার করে বলেছি: ভিভে লা ফ্রান্স! ভিভে লা ফ্রান্স! বেঁচে থাকুক ফ্রান্স! বেঁচে থাকুক ফ্রান্স! অন্যদিকে অনেকে আনন্দে চিৎকার করে বলেছে: লং লিভ আমেরিকা! আমেরিকা অমর হোক! অবশেষে আমরা আরেকবার প্রাকৃতিক খেলায় মত্ত হয়েছি । তবে সেবার কিন্তু বন-জঙ্গলে নয়, বরং নিজেদের ঘরবাড়িতে অনেক শিশু-সন্তানের জন্ম দিয়েছি । এক সময় যুদ্ধ থেমে গেছে । শান্তি অমর হোক । 

হেলিকপ্টারের পাখার মতো আঙ্কেল হাত ঘুরাতে শুরু করেন এবং কাউন্টারের পিছন থেকে মালিক আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকে । তার চোখেমুখে বিস্ময় । আমার আঙ্কেল আরেকবার কন্ঠস্বর নিচু করেন: 

– প্রিয় বৎস, দিব্যি কেটে বলছি, হেলিকপ্টারগুলি ওখানেই ছিল এবং আমাদের মাথার ঠিক কয়েক মিটার ওপরে । আমরা ভেবেছি, ওরা আমাদের দিকে চাউল, দুধ, চিনি, রুটি এবং মাংস ছুড়ে দিবে । খাদ্য-খাবারের প্যাকেট কুড়ানোর জন্য আমরা তাড়াহুড়া করে দোঁড়ে গিয়েছি । আমরা কনুই দিয়ে একজন আরেকজনকে গুঁতা দিয়েছি, ঝগড়া করেছি এবং বাচ্চাদের পদদলিত করেছি । বয়স্করা বলেছেন, আমরা যেন মহিলা এবং শিশুদের অগ্রাধিকার দিই । তুমি কী জানো, আসলে সেদিন কী ঘটেছিল? 

যদিও আমি জানি, তারপরও না-সূচক ভঙ্গিতে মাথা দোলাই যেন তিনি বলতে পারেন । 

– আমরা হেলিকপ্টারের দরজা খুলতে দেখেছি এবং ভেতরের লোকজন ছিল অ্যাঙ্গোলার । ওরা হাতের অস্ত্র দিয়ে নিশানা তাক করে এবং গুলি ছুড়তে শুরু করে । গুলির ভয়ঙ্কর শব্দে আশেপাশের গাছ থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি খোলা হাওয়ায় উড়ে যায় । অনবরত গুলি চলতে থাকে । লোকজন মাটিতে পড়ে যায়, কেউ দোঁড়ে পালায় এবং কেউ পানিতে লাফিয়ে আত্মরক্ষা করে । সৈনিকেরা মেশিন গান ব্যবহার করেছিল । আমরা ঘটনার কিছুই জানতে পারিনি । শরণার্থীদের মধ্যে বয়স্ক একজন চিৎকার করে বলেছিল, নিরাপদে সরে যাও! এটা একটা ফাঁদ! 

পিছনে বসা খদ্দেরদের চোখমুখ দেখে অনায়াসে বোঝা যায় তারা আমাদের কথাবার্তা শুনে মোটেও খুশি না । হয়তো খানিকটা ভড়কে গিয়ে আমার আঙ্কেল এক মুহূর্তের জন্য নিবৃত্ত হয় । ওরা চলে যাওয়া পর্যন্ত তিনি চুপ করে থাকেন । তারপর একসময় বলতে শুরু করেন: 

– প্রিয় বৎস, দেখতেই তো পারছো আমি জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এসেছি । দেশে পুনরায় শান্তি বিরাজ করা শুরু করে । সবাই আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসি । আমরা পানশালায় যাওয়া আরম্ভ করি, সমুদ্র সৈকতে যাই, এমনকি সব জায়গাতেই আমাদের যাতায়াত শুরু হয় । আমরা দুর্দিনের কথা আস্তে আস্তে ভুলে যেতে থাকি । পাঁচ বছর পরে আবার নতুন করে আমাদের নির্বাচন হয় । ফ্রান্স এবং অ্যাঙ্গোলার পূর্ণ সহায়তা পাওয়া সত্ত্বেও দক্ষিণের প্রেসিডেন্ট পরাজিত হয় । আমরা খুশিতে লাফাতে থাকি । দক্ষিণের পরাজিত প্রেসিডেন্টকে সারা দেশে তন্নতন্ন করে খোঁজা হয় । সে প্রাণের ভয়ে ফ্রান্সে পালিয়ে যায় এবং সেখানেই নির্বাসিত জীবন বেছে নেয় । এখন দেশ উত্তরের শাসনে । সলোলা আমাদের শাসনকর্তা । দক্ষিণের প্রেসিডেন্টকে সাহায্য-সহযোগিতা করার জন্য সে ফ্রান্সের প্রতি অত্যন্ত নাখোশ । তাই সে তেল উত্তোলনের দায়িত্ব আমেরিকার হাতে তুলে দেয় । ফ্রান্স খুশি হতে পারেনি । ফ্রান্সের প্রতিনিধিরা প্যারিসের গোপন আস্তানায় নির্বাসিত প্রাক্তন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে প্রতিদিন সাক্ষাৎ করে । তারা প্রাক্তন প্রেসিডেন্টকে আশ্বস্থ করে যে, তাকে আবার ক্ষমতায় বসানো হবে । কিন্তু আমরা বুঝতে পারি না, দক্ষিণের একজন কেমন করে পুনরায় ক্ষমতা লাভ করবে এবং প্রেসিডেন্ট হবে । সমস্ত দেশ জুড়ে আমেরিকার লোকজন । তারা আমাদের ইংরেজি শেখাতে অনেক চেষ্টা করে, কিন্তু সফল হতে পারেনি । কেননা উপনিবেশ শাসনামলে ফ্রান্স তাদের বিদঘুটে উচ্চারণ আমাদের রক্তের ভেতর ঢুকিয়ে দিয়েছে । আমরা আমেরিকাকে বলেছি, তেল নিয়ে তোমরা যা খুশি তাই করো, কিন্তু আমরা ইংরেজি শেখা প্রত্যাখ্যান করেছি । তারা আমাদের কথায় কোনো তোয়াক্কা করেনি, বরং তারা দক্ষিণের প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করিয়ে নিয়েছে । প্রেসিডেন্ট জানেই না যে, সে ভবিষ্যতের জন্য সব তেল আমেরিকার কাছে বিক্রি করে দিয়েছে । 

পাঁচজন উর্দি পড়া লোক পানশালায় প্রবেশ করে এবং পেছনের দিকে বসে । আমার আঙ্কেল কয়েক সেকেন্ডের জন্য তাদের দিকে তাকিয়ে পরখ করেন এবং কন্ঠস্বর নিচুতে নামান । কেননা তিনি জানেন, সেই সময় জোরে কথা বললে নির্ঘাত আমাদের হলুদ বাড়িতে আতিথেয়তা নিতে হতো । সৈনিকদের সম্মুখে যুদ্ধ নিয়ে আলাপ-আলোচনা করা মোটেও সমুচিন নয় । 

– এখন আমাদের নতুন করে নির্বাচন করতে হবে । দক্ষিণের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ফিরে এসেছে এবং ফ্রান্সের সহায়তায় সে নির্বাচনে লড়বে । কিন্তু আমাদের উত্তরের প্রেসিডেন্ট বলেছে দেশের পরিস্থিতি নির্বাচনের অনুকূলে নয় । দক্ষিণের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট পাল্টা ঘোষনা করেছে পরিস্থিতি যা-ই হোক না কেন, নির্বাচন অবশ্যই হতে হবে । সুতরাং তারা প্রস্তুতি নিতে থাকে । এই কী হলো! তুমি কী পানীয় শেষ করতে চাও না? 

আমি গ্লাস উঁচু করে পলকেই গলার ভেতর ঢেলে দিই । আমার আঙ্কেল আমাকে অনুসরণ করে এবং বলতে থাকেন: 

– অ্যাঙ্গোলার মাধ্যমে প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট অস্ত্র এবং গোলাবারুদ এনে জড়ো করে এবং অ্যাঙ্গোলাবাসীদের সাহায্য করার জন্য অনুরোধ করে । উত্তরের প্রেসিডেন্ট যদি নির্বাচন দিতে গড়িমসি করে, তবে শক্তি প্রয়োগে তাকে ক্ষমতা থেকে সরানো হবে । শেষপর্যন্ত কী হবে, কেউ জানে না । অনেকে বলাবলি করে যে, পুনরায় গৃহযুদ্ধ শুরু হবে । কিন্তু শুধু আমি একটা বিষয়ে নিশ্চিত, তেলের জন্য সাধারণ মানুষের জীবনে কোনো পরিবর্তন আসবে না । 

আমি কাউন্টারের পেছন দিকে তাকাই । আমার আঙ্কেল ঘড়িতে সময় দেখে । 

– সময় যেন হাওয়াও উড়ে যায় । ইতিমধ্যে সাড়ে দশটা বেজে গেছে । 

বিল পরিশোধ করে আমরা পানশালার বাইরে এসে ট্যাক্সি নিই । স্বাধীনতা সরণির দিকে যাবো, যা আড়াআড়ি ভাবে ল্যুজিনজো হয়ে চলে গেছে । কদাচিৎ আমি আমার আঙ্কেলের মুখের ক্ষতস্থানের দিকে তাকাই । সে আমার দিকে ঘোরেন: 

– চলো, আগামিকাল আবার পানশালায় যাই । তুমি কী দু’জন বারবণিতাকে দেখেছিলে? একজন তোমার এবং অন্যজন আমার । আমি টাকা দেব । চিন্তা করো না । আমি বাজি ধরতে পারি, তুমি অনেকদিন ল্যুজিনজোর স্কার্ট দেখোনি! 

আমি কিছুই বললাম না । ঘুমে প্রায় অর্ধেক বিভোর । হ্যাঁ, আমি আগামিকাল আবার পানশালায় যাব, আমার আঙ্কেলের সঙ্গে … 


লেখক পরিচিতি: 
সমকালীন বিশ্ব সাহিত্যে আফ্রিকার লেখকদের উপস্থিতি বিশেষভাবে লক্ষণীয় এবং যে কয়জন লেখক উজ্জ্বল ভূমিকা রেখেছেন, তাঁদের মধ্যে কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের বংশোদ্ভূত ‘আফ্রিকার স্যামুয়েল বেকেট’ নামে অভিহিত ফরাসী লেখক অ্যালেন মাবানকো অন্যতম । তিনি একাধারে কথাসাহিত্যিক, কবি, সাংবাদিক এবং অধ্যাপক । তাঁর জন্ম ১৯৬৬ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি । শৈশব কাটে কঙ্গোর সামুদ্রিক শহর পয়েন্ট-নোয়্যারে । তিনি দর্শণ শাস্ত্রে ব্যাচেলর ডিগ্রি অর্জণ করেন । পরবর্তীতে মায়ের ইচ্ছে অনুযায়ী প্রাইভেটে আইন বিষয়ে পড়াশুনা করেন । তিনি বাইশ বছর বয়সে বৃত্তি নিয়ে ফ্রান্সে যান এবং ইউনিভার্সিটি অব প্যারিস থেকে আইন বিষয়ে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জণ করেন । তিনি ২০০২ সালে তিন বছরের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার অ্যান অ্যারবর ক্যাম্পাসে ফ্রাঙ্কোফোন সাহিত্যের শিক্ষক ছিলেন এবং পরে ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া অ্যাট লস অ্যাঞ্জেলেস-এর অধ্যাপক নিযুক্ত হন । 

অ্যালেন মাবানকোর প্রথম উপন্যাস ‘রেড-হোয়াইট অ্যান্ড ব্লু’ প্রকাশিত হয় ১৯৯৮ সালে । প্রথম উপন্যাস প্রকাশের পর তিনি লেখালেখিতে নিয়মিত হন । ‘গ্লাস ব্রোকেন’ (২০০৫), ‘মেম্যোয়্যার অব পর্কুপাইন’ (২০০৬), ‘ব্ল্যাক বাজার’ (২০০৯), ‘টুমরো আই উইল হ্যাভ টুয়েনটি ইয়ার্স্’ (২০১০), ‘লাইটস্ অব পয়েন্টে-নোয়্যার’ (২০১৩) এবং ‘স্মল চিলি’ (২০১৫) তাঁর উল্লেখযোগ্য উপন্যাস । সাহিত্য কর্মের স্বীকৃতি হিসাবে একাধিক পুরস্কার লাভ করেন, যেমন ‘রেড-হোয়াইট অ্যান্ড ব্লু’ উপন্যাসের জন্য ‘গ্র্যান্ড লিটারেরী প্রাইজ ফর ব্ল্যাক আফ্রিকা’, ‘মেম্যোয়্যার অব পর্কুপাইন’ উপন্যাসের জন্য ‘প্রি রেনো’ (২০০৬) এবং ‘স্মল চিলি’ উপন্যাসের জন্য ‘প্রি গনকোর্ট’ (২০১৫) । ‘স্মল চিলি’ উপন্যাসের জন্য ২০১৭ সালে ‘ম্যান বুকার ইন্টারন্যাশনাল প্রাইজ’-এর তালিকায় ছিলেন । এছাড়া ‘ব্ল্যাক বাজার’ এবং ‘লাইটস্ অব পয়েন্টে-নোয়্যার’ উপন্যাস দুটি সমালোচকদের ভূঁয়সী প্রশংসা অর্জণ করে এবং ফ্রান্সের কুড়িটি বেস্ট সেলার উপন্যাসের তালিকায় (যথাক্রমে ২০০৯ এবং ২০১৩ সালে) অন্তর্ভুক্ত হয়। তাঁর উপন্যাসের বিভিন্ন চরিত্ররা অত্যন্ত চিত্তাকর্ষক । তিনি আফ্রিকার অভিবাসীদের বাস্তব অভিজ্ঞতাকে চরিত্রের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন । উপন্যাস এবং ছোটগল্প সংকলন ছাড়াও তিনি একাধিক কাব্যগ্রন্থের রচয়িতা । যদিও তিনি সাহিত্য কর্মের জন্য সমাদৃত, কিন্তু সমালোচনাও কুড়িয়েছেন ।তাঁর সাহিত্য রচনা বিশ্বের পনেরটি ভাষায় অনূদিত হয়েছে । বর্তমানে তিনি ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া অ্যাট লস অ্যাঞ্জেলেস-এর ফ্রাঙ্কোফোন সাহিত্যের অধ্যাপক হিসাবে কর্মরত আছেন । 

গল্পসূত্র: 
‘শ্যে জ্যানেট’ গল্পটি অ্যালেন মাবানকোর ইংরেজিতে ‘শেই জ্যানেট’ গল্পের অনুবাদ । গল্পটি ফরাসী ভাষা থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন হেলেন স্টিভেনসন । ইংরেজিতে গল্পটি লন্ডনের বিখ্যাত ‘দ্যগার্ডিয়ান’ পত্রিকার ২০১১ সালের ২১ এপ্রিল সংখ্যায় প্রকাশিত হয় এবং সেখান থেকে নেয়া হয়েছে। 

অনুবাদক
ফজল হাসান

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন