মঙ্গলবার, ১ জানুয়ারী, ২০১৯

ধারাবাহিক উপন্যাস : যেদিন গেছে ভেসে--দশম অধ্যায়


মূল : মার্গারেট মিচেল
অনুবাদ : উৎপল দাশগুপ্ত



পরের দিন সকালে ব্রেকফাস্টের টেবিলে, পিটিপ্যাটের চোখে জল, মেলানি নিশ্চুপ আর স্কারলেটের মধ্যে একটা বেপরোয়া ভাব। 


“কেউ যদি কিছু বলে, আমি তার পরোয়া করি না। আমি বাজি ধরে বলতে পারি – কাল হাসপাতালের জন্য যত টাকা সংগ্রহ করে দিয়েছি – ওখানকার অন্য কোন মেয়ে করতে পারে নি। এমনকি, ওই সব জাবড়া জিনিষ বিক্রি করে যে টাকা এসেছে তার থেকেও বেশি।”

“টাকার কথা কে বলছে সোনা,” কাঁদো কাঁদো স্বরে হাত দুটো অসহায় ভাবে নাড়তে নাড়তে বললেন পিটিপ্যাট। “নিজের চোখকে আমি বিশ্বাস করতে পারছিলাম না ..... আর চার্লস চলে গেছে – এখনও এক বছরও হয়নি! আর ওই যে হতচ্ছাড়া ক্যাপটেন বাটলার – তোমাকে সবার কাছে লক্ষণীয় করে তুলল! তুমি জানো স্কারলেট – উনি কি রকম ভয়ানক লোক? মিসেজ় হোয়াইটিং-এর তুতো বোন – মিসেজ় কোল্ম্যান – উনি চার্লস্টন থেকে এসেছিলেন। সব বলেছেন ওঁর সম্পর্কে। একজন কুলাঙ্গার! জানিনা যে পরিবারের এত সুনাম – জানিনা সেখানে এরকম লোকের জন্ম কিভাবে হয়? চার্লস্টনে কেউ ওঁকে আমন্ত্রণ জানায় না। এতটাই বদনাম উনি! তারপর একটা মেয়েঘটিত ব্যাপারও আছে – খুবই বাজে! এতটাই খারাপ যে মিসেজ় কোলম্যানও ঠিক কি হয়েছিল সেটা জানতে পারেন নি!” 

“আমি বিশ্বাসই করিনা উনি অত খারাপ,” মেলি শান্ত ভাবে বলল। ওঁকে আমার অত্যন্ত ভদ্রলোক বলেই মনে হয়েছে আর উনি খুবই সাহসী – যে ভাবে অবরোধে ___” 

“উনি মোটেই সাহসী নন,” স্কারলেট মুখ বাঁকিয়ে বলল, কেকের ওপর সিরাপ ঢালতে ঢালতে। “এসব উনি শুধু টাকা কামানোর জন্য করেন। উনি আমাকে বলছিলেন। উনি কনফেডারেসির জন্য বিন্দুমাত্র ভাবেন না। বলছিলেন আমরা নাকি হেরে যাব। তবে উনি খুব ভাল নাচতে পারেন।” 

সবাই বিস্ময়ে বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। 

“আমি ঘরে বসে বসে ক্লান্ত হয়ে গেছি। আর আমি মোটেও সেটা করব না। যদি কাল সন্ধ্যার ব্যাপারে আমাকে নিয়ে সবাই কুৎসা করে তাহলে তো আমার বদনাম হয়েই গেছে। তাই কেউ কিছু বললে আমি পরোয়া করি না।” 

ওর একবারও মনে হল না যে ভাবনাটা ওর নয় রেট বাটলারের। হঠাৎ মাথায় এল আর যা চিন্তা করছিল তার সঙ্গে খাপ খেয়ে গেল। 

“কিন্তু যখন তোমার মা শুনতে পাবেন, তখন কি হবে? উনি আমার সম্বন্ধেই বা কি ভাববেন?” 

এলেনের কথা মনে হতেই স্কারলেটের মনে মধ্যে অপরাধবোধের একটা ঠাণ্ডা স্রোত বয়ে গেল। মেয়ের এই কুৎসার কথা তাঁর কানে পৌঁছাবে কি? কিন্তু যখন মনে হল অ্যাটলান্টা আর টারার মধ্যে পঁচিশ মাইলের দূরত্ব, তখন একটু নিশ্চিন্ত হল। মিস পিটি নিশ্চয়ই এলেনকে নিজে থেকে কিছু বলবেন না। তাতে কর্ত্রী হিসেবে তাঁর মুখও খুব একটা উজ্জ্বল হবে না। আর উনি যদি মুখ না খোলেন, তাহলে কোন ভয় নেই। 

“আমি ভাবছি,” পিটি বললেন, “হ্যা আমি ভাবছি হেনরিকে একটা চিঠি লিখব – যদিও ওকে কিছু বলতে আমার রুচিতে বাধে – তবুও আমাদের পরিবারের সেই একমাত্র পুরুষ সদস্য – ওকে বলব ক্যাপটেন বাটলারকে সামনাসামনি ডেকে তীব্র ভর্ৎসনা করতে – ওহ শুধু যদি চার্লি বেঁচে থাকত! খবর্দার স্কারলেট ভবিষ্যতে যদি ওই লোকটার সাথে কথা বলেছ তো ____” 

মেলানি এতক্ষণ হাত জড়ো করে চুপ চাপ বসে ছিল। প্লেটের অপর রাখা ওর কেকটা ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছিল। ও উঠে স্কারলেটের পেছনে গিয়ে দাঁড়িয়ে ওর ঘাড়ের অপর হাতটা রাখল। 

“লক্ষ্মীসোনা,” ও বলল, “তুমি অত মন খারাপ কোরো না। আমি বুঝতে পারি – কাল সন্ধ্যেয় – হাসপাতালের স্বার্থে তোমাকে কতখানি সাহসী হতে হয়েছিল। কেউ যদি তোমার বিরুদ্ধে একটা খারাপ কথাও বলে – আমি তাঁকে দেখে নেব ..... আন্ট পিটি, মিছিমিছি কেঁদো না। চুপচাপ বাড়িতে বসে থাকা স্কারলেটের পক্ষে কতটা কষ্টের! কত আর ওর বয়স?” স্কারলেটের কালো চুলে ও আস্তে আস্তে আঙ্গুল বুলিয়ে দিতে লাগল। “আর হয়ত মাঝে মাঝে পার্টিতে যাওয়া আমাদের পক্ষেই ভাল। নিজেদের দুঃখে অভিভূত হয়ে, সব কিছু থেকে নিজেদের সরিয়ে রেখে হয়ত আমারা স্বার্থপরের মত ব্যবহার করছি। যুদ্ধের এই সময়টা কি অন্য সময়ের মত? যে সব সৈন্যদের ঘর বাড়ি ছেড়ে এখানে থাকতে হচ্ছে, রাত্রে বন্ধুবান্ধবের সঙ্গেও কথা বলতে পারছে না – যার সুস্থ হয়ে উঠেছে, কিন্তু এখনও যুদ্ধক্ষেত্রে ফিরে যাবার মত সক্ষম হয়নি – আমি এদের সবার কথা ভাবি – আর ভাবি আমরা কি স্বার্থপর! যারা সুস্থ হবার পথে – এমন অন্তত তিনজনকে আমাদের বাড়িতে এনে রাখা উচিত – কিছু সৈন্যকে রবিবারে ডিনারে নেমন্তন্ন করে খাওয়ানো উচিত। না স্কারলেট তুমি দুঃখ কোরো না। সবাই বিষয়টা বুঝতে পারবে আর কেউ কিছু বলবে না। আমরা জানি তুমি চার্লিকে কতটা ভালবাসতে।” 

স্কারলেট মোটেই দুঃখ করছিল না। তাছাড়া মেলানির নরম হাতটা ওর কাছে অসহ্য লাগছিল। ইচ্ছে করছিল এক ঝটকায় মাথা সরিয়ে নিয়ে চেঁচিয়ে বলে, “বোকচন্দর!” হোমগার্ড আর সেনাবাহিনীর লোকেরা, আর হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়া সৈন্যরা ওকে নাচতে দেখার জন্য কত উদগ্রীব ছিল! এত লোক থাকতে শেষমেশ মেলিকে কিনা ওর পক্ষ নিয়ে কথা বলতে হছে। তার দরকার নেই বাপু। আমি নিজেই আত্মরক্ষা করতে জানি! আর ওই বুড়ি বিল্লিগুলো যদি বাড়াবাড়ি করে – তাহলে ওদের নিয়ে মাথা ঘামানোর কোন মানেই হয় না। সময় কাটানোর জন্য অনেক সজ্জন অফিসার আছেন। 

মেলির সান্ত্বনাবাক্যে শান্ত হয়ে পিটিপ্যাট চোখ মুছছিলেন। একটা মোটা খাম নিয়ে প্রিসি ঘরে ঢুকল। 

“আপনার জন্য, মিস মেলি। একটা ছোট্ট নীগ্রো ছেলে নিয়ে এসেছে।” 

“আমার জন্য?” ভাবতে ভাবতে মেলি খামটা ছিঁড়তে লাগল। 

স্কারলেট নিজের কেকটা খেতে ব্যস্ত ছিল। তাই এসব কিছু লক্ষ্য করল না। মেলির কান্নার আওয়াজ শুনে ও মুখ তুলে তাকাল। দেখল আন্ট পিটিপ্যাট বুকের কাছে হাত জড়ো করে রেখেছেন। 

“অ্যাশলে মারা গেছে!” এই বলে মাথা ঝাঁকাতে শুরু করলেন। হাত দুটো ঝুলে পড়ল। 

“হে ভগবান!” স্কারলেট ককিয়ে উঠল। ওর রক্ত ঠাণ্ডা হয়ে গেল। 

“না! না!” মেলি বলে উঠল। “স্কারলেট স্মেলিং সল্টের বোতলটা – তাড়াতাড়ি! এখন ঠিক লাগছে? জোরে জোরে নিঃশ্বাস নাও। অ্যাশলে নয়। খুব দুঃখিত। আমি তোমাদের ভয় পাইয়ে দিয়েছি। আমি কাঁদছি কারন আমি ভীষণ খুশি!” তারপর তালু খুলে কি একটা ঠোঁটে চেপে ধরল। “সত্যিই কি আনন্দ লাগছে!” বলেই আবার কাঁদতে শুরু করল। 

স্কারলেট এক ঝলক জিনিষ্টা দেখতে পেল। মনে হল ওটা একটা সোনার আংটি। 

“এটা পড়ে দেখ,” মেঝের অপর পড়ে থাকা চিঠিটা দেখিয়ে মেলি বলল, “দেখ উনি কত ভদ্র আর দয়ালু একজন মানুষ!” 

হতভম্ব স্কারলেট চিঠিটা কুড়িয়ে নিল। একপাতায় কালো কালিতে লেখা একটা চিঠি – সপ্রতিভ হাতে লেখা – 

“সেনাবাহিনীর রক্ত হয়ত কনফেডারেসির খুব প্রয়োজন। কিন্তু এখনও কোন মহিলার হৃদয় শোনিতের প্রয়োজন হয়ে পড়েনি। আপনার অসমসাহসিকতার প্রতি আমার আন্তরিক শ্রদ্ধার এই সামান্য নিদর্শন আপনি গ্রহণ করলে আমি অত্যন্ত কৃতজ্ঞ বোধ করব। আশা করি আপনি এই ভেবে কষ্ট পাবেন না যে আপনার ত্যাগ বৃথা হয়ে গেল, কারন দশগুণ মূল্যের বিনিময়ে আমি এই আংটি ছাড়িয়ে নিয়েছি। ক্যাপটেন রেট বাটলার।” 

মেলানি আংটিটা আঙ্গুলে পরে নিয়ে প্রে্মপূর্ণ চোখে দেখতে লাগল। 

“বলেছিলাম কিনা উনি একজন ভদ্রলোক,” পিটিপ্যাটের দিকে চেয়ে বলল। চোখের জলের ধারায় ওর চওড়া হাসিটা ঝলমল করে উঠল। “উচ্চমানের রুচিসম্পন্ন মানুষ বলেই উনি বুঝতে আমার কষ্টটা অনুভব করতে পেরেছিলেন। ঠিক আছে আমি এর বদলে আমার সোনার চেনটা পাঠিয়ে দেব। আন্ট পিটিপ্যাট তুমি ওঁকে একটা চিঠি দিয়ে রবিবারে ডিনারে নিমন্ত্রণ করবে। আমি নিজের মুখে ওঁকে আমার কৃতজ্ঞতা জানাতে চাই।” 

উত্তেজনার ফলে ওরা কেউ খেয়ালই করল না যে ক্যাপটেন বাটলার কিন্তু স্কারলেটের আংটিটা ফেরত পাঠান নি। কিন্তু স্কারলেট খেয়াল করল আর মনে মনে উত্যক্ত হয়ে উঠল। স্কারলেট এটাও বুঝতে পারল যে এই কাজটা উনি রুচিবোধ কিংবা মহান অনুভুতি থেকে করেন নি। যাতে উনি এই বাড়িতে নিমন্ত্রিত হতে পারেন তাই এটা ওঁর একটা ছল। 

*** 

“তোমার সাম্প্রতিক কার্যকলাপ আমাকে মর্মাহত করেছে,” এলেন চিঠিতে লিখেছেন। স্কারলেট টেবিলে বসে সেটা পড়তে পড়তে মুখ বিকৃত করল। খারাপ খবর সব সময় খুব দ্রুততার সঙ্গে পৌঁছে যায়। চার্লসটন আর স্যাভান্নাতে ও শুনে এসেছে যে অন্যের ব্যাপারে নাক গলানোর ব্যাপারে দক্ষিণের রাজ্যগুলোর মধ্যে অ্যাটলান্টা সবার থেকে এগিয়ে। কথাটা এখন বিশ্বাস করতে বাধ্য হল। সোমবার মেলাটা হয়েছিল আর আজ মাত্র বৃহষ্পতিবার। কোন বুড়ি বিল্লিটা এলেনকে লেখার কাজটা করল? প্রথমেই ওর পিটিপ্যাটের কথা মনে হল। কিন্তু তারপরেই ভেবে দেখল এই কাজ ওঁর পক্ষে সম্ভব না। এমনিতেই উনি স্কারলেটের আচরণ জানাজানি হবার ভয়ে ঘাবড়ে রয়েছেন, তাই সেটা এলেনকে জানিয়ে নিজের অভিবাবকত্বকেওপর কালিমালিপ্ত করতে মোটেই চাইবেন না। নিশচয়ই এটা মিসেজ় মেরিওয়েদারের কাজ। 

“এটা মনে করতে আমার রীতিমত কষ্ট হচ্ছে যে তুমি তোমার নিজের আর তোমাকে প্রতিপালন করার সময়ে যে সমস্ত শিক্ষা দেওয়া হয়েছিল সেগুলো তুমি বিস্মৃত হয়েছ। ধরে নিচ্ছি শোকপালন চলাকালীন, তুমি জনসমক্ষে নিজেকে উন্মোচিত করে যে অশোভন আচরণ করেছে, সেটা হাসপাতালকে সাহায্য করার সাধু উদ্দেশ্য নিয়েই। কিন্তু আমি ভাবতে পারছি না যে এর জন্য তোমাকে রেট বাটলারের মত একজন মানুষের সাথে নাচের আসরে নামতে হল! ওঁর ব্যাপারে অনেক কথাই আমার কানে এসেছে (কার কাছেই বা আসেনি?)। গত সপ্তাহেই পলিন আমাকে লিখেছে যে ওঁর এত বদনাম যে ওঁকে ওঁর হতভাগ্য মা ছাড়া পরিবারের অন্য কেউি আমন্ত্রণ করেন না। উনি অত্যন্ত দুশ্চরিত্র লোক আর নিশ্চয়ই তোমার অল্প বয়স আর সারল্যের সুযোগ নিয়ে তোমাকে আর তোমার পরিবারকে কলঙ্কিত করবেন। মিস পিটিপ্যাট কিভাবে তোমার প্রতি ওঁর যে দায়িত্ব সেটা অবহেলা করলেন?” 

স্কারলেট টেবিলের অন্যদিকে বসে থাকা পিসীর দিকে তাকাল। চিঠিটা যে এলেনের লেখা সেটা উনি হাতের লেখা থেকেই ধরতে পেরেছেন। তাই মুখে একটা অস্বস্তির ভাব। বাচ্চারা বকুনি খাবার আগে যে রকম ভয় কেঁদে ফেলে ঠিক তেমনি চোখ মুখের অবস্থা। 

“ভেবে আমি খুবই মর্মাহত যে তোমার শিক্ষা-দীক্ষা তুমি এত সহজেই ভুলে যেতে পারলে। আমি ভেবেছিলাম তোমাকে এখুনি বাড়ি ফিরে আসতে বলব। কিন্তু এই ব্যাপারটা তোমার বাপির ওপরে ছেড়ে দিলাম। উনি শুক্রবার অ্যা টলান্টা যাচ্ছেন ক্যাপটেন বাটলারের সঙ্গে কথা বলতে। উনিই তোমাকে সঙ্গে করে নিয়ে আসবেন। হয়ত উনি তোমার সঙ্গে খুব কঠোর ব্যবহার করবেন, যদিও আমি ওঁকে সেরকম কিছু না করার জন্য অনুরোধ করেছি। যাই হোক, আমার মনে হয় তোমার অল্প বয়স আর অপরিণামদর্শিতার জন্যি তুমি এই ধরনের সৃষ্টিছাড়া আচরণ করেছ। মনে রেখো, আমাদের মহান লক্ষ্যের জন্য আত্মত্যাগের ব্যাপারে আমি অত্যন্ত ব্যাকুল, আর আমি চাইবনা যে আমার মেয়ে কোন রকম অসম্মাঞ্জনক ___” 

আরও এরকম ধরনের অনেক কিছুই লেখা ছিল। কিন্তু স্কারলেটের আর পড়বার সাহস হল না। এই প্রথম ও খুব ভয় পেয়ে গেল। ওর মধ্যের সেই বেপরোয়া আর উদ্দাম ভাবটা সম্পূর্ণ অন্তর্হিত হয়ে গেল। দশ বছর বয়সে স্যুয়েলেনের দিকে মাখন লাগানো বিস্কুট ছুঁড়ে মেরে ওর যেরকম অপরাধবোধ হয়েছিল, এখনও নিজেকে সেইরকমই মনে হল। ভাবা যায় ওর শান্ত মা এত তীব্রভাবে ওকে ভর্ৎসনা করছেন আর বাপি ক্যাপটেন বাটলারের সাথে কথা বলার জন্য শহরে আসছেন! ব্যাপারটার অসীম গুরুত্ব ও এখন বুঝতে পারছে। বোঝাই যাচ্ছে জেরাল্ড খুবই রুঢ় ব্যবহার করবেন। এই প্রথম – ও বুঝতে পারছে – কোনোভাবেই শাস্তি এড়ানো সম্ভব হবেনা। 

“কি – কোন খারাপ খবর নয়তো?” পিটিপ্যাট ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলেন। 

“বাপি কাল আসছেন – আর আমার ওপর হিংস্রভাবে ঝাঁপিয়ে পড়বেন,” স্কারলেট খুব ব্যথিত গলায় বলল। 

“প্রিসি – আমার স্মেলিং সল্টটা নিয়ে আয়,” অর্ধসমাপ্ত খাবার ছেড়ে উনি কাঁপতে কাঁপতে উঠে দাঁড়ালেন, “মনে হচ্ছে আমি অজ্ঞান হয়ে যাব!” 

“ওটা আপনার স্কার্টের পকেটেই আছে,” স্কারলেটের আশেপাশে ঘুরঘুর করে মজা দেখতে দেখতে প্রিসি বলল। মিস্টার জেরাল্ডের রাগটা বেশ উপভোগ করার মত হয় – অবশ্যই ওটা ওর দিকে না হলেই! পিটি পকেট থেকে খুঁজে বের করে শিশিটা নাকের কাছে ধরলেন। 

“উনি যখন আসবেন, তখন তোমরা আমার কাছেই থেকো – একমিনিটের জন্যও আমাকে ওঁর কাছে একা ফেলে যেওনা,” স্কারলেট কেঁদে উঠল। “তোমাদের দুজনকেই উনি খুব ভালবাসেন। তাই তোমরা থাকলে উনি আমাকে বেশি কিছু বলতে পারবেন না!” 

“আমি কিছুতেই পারবনা,” পিটিপ্যাট খুব দুর্বলস্বরে বলে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালেন। “আমি – আমার শরীর খারাপ লাগছে। আমাকে শুয়ে পড়তে হবে। কাল সারাদিন আমি শুয়ে থাকব। তোমরা ওঁকে আমার হয়ে বোলো।” 

“কাপুরুষ!” স্কারলেট মনে মনে জ্বলতে লাগল। 

বদমেজাজী মিস্টার ও’হারার মুখোমুখি হবার ভয়ে মেলানির মুখ শুকিয়ে গেছিল। তবুও ও স্কারলেটের পরিত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হল। “আমি – আমি তোমার পাশে থাকব – মিস্টার ও’হারাকে বোঝানোর জন্য – এসব তুমি শুধু হাসপাতালের জন্য করেছ। দেখো উনি ঠিক বুঝবেন।” 

“না আমি জানি উনি কিছুতেই বুঝবেন না,” স্কারলেট বলল। “আর আমাকে যদি মায়ের কথা মত টারায় ফিরতে হয় বদনাম নিয়ে, তাহলে আমি মরেই যাব।” 

“না তুমি কিছুতেই বাড়ি যেতে পার না,” পিটিপ্যাট কাঁদতে শুরু করলেন। “তাহলে বাধ্য হয়ে হেনরিকে আমাদের সঙ্গে এসে থাকার কথা বলতে হবে – হ্যা বাধ্য হয়ে। আর তুমি তো জানোই হেনরি আর আমার মধ্যে বনিবনা নেই। শহরে এখন এত সব অপরিচিত লোকেরা রয়েছে – একা মেলিকে নিয়ে আমি কিছুতেই রাত্রে থাকতে পারব না। তোমার এত সাহস আছে – তাই তুমি থাকলে কোন পুরুষমানুষ না থাকলেও আমার ভয় করে না।” 

“উনি তোমাকে কিছুতেই টারায় নিয়ে যেতে পারবেন না,” মেলি প্রায় কাঁদো কাঁদো গলায় বলে উঠল। “এটাই এখন তোমার বাড়ি। তোমাকে ছাড়া আমরা কিভাবে থাকত?” 

“আমি তোমার সম্পর্কে কি ভাবি সেটা যদি জানতে, তাহলে আমাকে ছাড়াই থাকার কথা ভাবতে,” স্কারলেট তিক্তভাবে মনে মনে বলল। যদি মেলানি না হয়ে অন্য কেউ জেরাল্ডের রাগ সামলানোর জন্য থাকত, তাহলে খুব ভাল হত। যাকে তুমি এত অপছন্দ কর সেই যদি পরিত্রাতার ভূমিকায় থাকে তাহলে খুবই অস্বস্তি হয়। 

“মনে হয় ক্যাপটেন বাটলারকে নিমন্ত্রণটা বাতিল করে দিলেই ভাল হয় ____” পিটিপ্যাট বলতে শুরু করলেন। 

“সেটা আমরা করতেই পারিনা। সেটা চরম অভদ্রতা হবে ওঁর সঙ্গে,” মেলি কাতরভাবে প্রতিবাদ করল। 

“আমাকে বিছানায় নিয়ে চল! আমার শরীর খারাপ লাগছে,” বিলাপের মত করে বললেন পিটিপ্যাট। “স্কারলেট, তুমি কি করে আমাকে এমন বিপদে ফেললে?” 

জেরাল্ড পরের দিন বিকেলবেলায় যখন এলেন, তখন পিটিপ্যাট অসুস্থ অবস্থায় শয্যাশায়ী। বন্ধ ঘর থেকে তিনি বারবার নিজের অক্ষমতার বার্তা পাট্টহাতে লাগলেন। দু’জন শঙ্কিত মেয়ের হাতে সাপারের ভার দিয়ে তিনি আড়ালেই রইলেন। জেরাল্ড থমথমে মুখে স্কারলেটকে চুমু খেলেন আর মেলানির গালে টোকা মারলেন। স্কারলেটের জোর গলায় ঝগড়া করতে ইচ্ছে করছিল। কথামত, মেলানি ছায়ার মত স্কারলেটের পাশে সেঁটে রইল। ফলে ওর সামনে জেরাল্ড স্কারলেটকে কোন কড়া কথা বলতে পারলেন না। স্কারলেটকে মনে মনে স্বীকার করতেই হল যে মেলানি ব্যাপারটাকে খুব সুন্দর ভাবে সামলে নিল – এমন একটা করে যেন কিছুই হয়নি। তারপর সাপার হয়ে গেলে জেরাল্ডকে নানারকম কথাবার্তায় ব্যস্ত রাখল। 

“কাউন্টিতে সকলে কে কেমন আছে, জানতে খুব ইচ্ছে হচ্ছে,” মেলানি হেসে বলল। “ আসলে ইণ্ডিয়া আর হানি এত কম চিঠিপত্র লেখে কি বলব। আপনি তো ওখানকার সব খবরাখবরই রাখেন। জো ফোনটেনের বিয়েতে কেমন হই হুল্লোড় হল?” 

তোষামোদে জেরাল্ড একেবারে গলে গেলেন। বললেন যে বিয়েটা বেশি হইচই না করেই সারা হয়েছে, “তমাদের দু’জনের মত অত জাঁকজমক করে হয়নি”, দারন জো-এর ছুটি খুব বেশি ছিল না। মুনরোদের ছোট্ট স্যালিকে খুব মিষ্টি লাগছিল। না, ও কি পরেছিল, সেটা ওঁর ঠিক খেয়াল নেই। তবে এটা শুনেছিলেন “দ্বিতীয় দিনের” ড্রেস বলে কিছু ছিল না। 

“সে কি কথা?” দুই মেয়ে বাধা দিয়ে চেঁচিয়ে উঠল। 

“ঠিকই, কারন ও আর দ্বিতীয় দিনের ড্রেস পরার সুযোগ কোথায় পেল?” জেরাল্ড বুঝিয়ে বললেন। তারপর জোরে হেসে উঠলেন। হয়ত ভাবলেন মেয়েদের এরকম কথা বলাটা উচিত হয়নি। ওঁকে হাসতে দেখে আস্তে আস্তে স্কারলেটের ভয়টা কেটে যাচ্ছিল। মনে মনে মেলানিকে অনেক ধন্যবাদ দিল। 

“জো তো পরেরদিনই ভার্জিনিয়া ফিরে গেল,” জেরাল্ড তাড়াতাড়ি যোগ করলেন। “কারও বাড়িও যেতে পারেনি, আর কোন নাচের আসরও বসানো যায়নি। টার্ল্টনদের দুই যমজ ভাই এখন বাড়িতে।” 

“হ্যা শুনেছি। ওরা এখন সুস্থ হয়ে উঠেছে?” 

“ওদের তেমন কিছু হয়নি। স্টুয়ার্টের কনুইতে চোট লেগেছিল – আর ব্রেন্টের হাঁটুতে একটা ছোট গুলি লেগেছিল। শুনেছ নিশ্চয়ই সাহসিকতার জন্য ওদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে?” 

“না তো! বলুন না আমাদের!” 

“চটপটে আছে খুব – দুজনেই। আমার দৃঢ় বিশ্বাস ওদের দুজনের মধ্যে আইরীশ রক্ত আছে,” খুব গর্বের সঙ্গে জেরাল্ড বললেন। ঠিক কি করেছেইল – সেটা এখন আর মনে নেই, কিন্তু ব্রেন্ট এখন লেফট্যান্যান্ট।” 

স্কারলেট ওদের কীর্তি শুনে খুব খুশি হল। বিধিসম্মতভাবে আনন্দ প্রকাশও করল। হাজার হোক এক সময় ওরা ওর প্রেমিক ছিল। তাই ওদের যে কোন কৃতিত্ব মানে ওরও কৃতিত্ব। 

“আমার কাছে এমন একটা খবর আছে যেটা শুনলে তোমরা খুব অবাক হয়ে যাবে,” জেরাল্ড বললেন। “ওরা বলছিল যে স্টু আবার টুয়েল্ভ ওকসে যাওয়া আসা করছে।” 

“হানি না ইণ্ডিয়া?” মেলি উত্তেজিতভাবে জিজ্ঞেস করল। স্কারলেট মনে মনে রেগে গেল। 

“মিস ইণ্ডিয়া নিশ্চয়ই। কেন আগে তো ওদের দুজনের মধ্যেই তো মেলামেশা ছিলই – মাঝখানে কিছুদিন আমার এই শয়তান মেয়ে ওকে হাতিয়ে নিয়েছিল।” 

“ওহ!” জেরাল্ডের স্পষ্টভাষণে মেলি একটু লজ্জা পেয়ে গেল। 

“তার থেকেও বড় খবর হল, ব্রেন্ট আজকাল টারাতে খুব যাতায়াত করছে।” 

স্কারলেট বাক্যহারা হয়ে গেল। প্রেমিকের অবস্থান বদল যথেষ্ট অসম্মানজনক। বিশেষ করে যখন স্কারলেট ওদের বলেছিল বলেছিল যে ও চার্লসকে বিয়ে করবে তখন ওদের দুর্দান্ত প্রতিবাদ এখনও চোখে ভাসছে। স্টুয়ার্ট এমনও বলেছিল যে চার্লসকে গুলি করে মারবে, কিংবা আত্মহত্যা করবে, বা তিনজনকেই গুলি করবে। ভাবলে এখনও গায়ে কাঁটা দেয়। 

“স্যুয়েলেন?” মেলি হেসে জিজ্ঞেস করল। “আমি তো জানতাম মিস্টার কেনেডি ___” 

“উনি?” জেরাল্ড বললেন। “এখনও ঝেড়ে কাশেননি। আত্মবিশ্বাসই নেই! এবার মনে হচ্ছে আমাকেই খোলাখুলি জিজ্ঞেস করতে হবে ওঁর মতলবটা কি। না ছোতটার কথা বলছি।” 

“ক্যারীন?” 

“কিন্তু ও তো একেবারেই ছেলেমানুষ!” স্কারলেট বেশ উষ্মার সঙ্গে বলল। যেন অনেকক্ষণ পরে আওয়াজ খুঁজে পেল। 

“ও তোমার থেকে এক বছরের একটু বেশি ছোট – যখন তোমার বিয়ে হয়েছিল,” জেরাল্ডও উষ্মার সঙ্গে জবাব দিলেন। “নাকি পুরোনো প্রেমিক তোমার বোনের প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছে বলে তোমার হিংসে হচ্ছে?” 

মেলি এতটা খোলামেলা কথাবার্তায় অভ্যস্ত নয়। একটু লজ্জা পেয়ে গেল। পীটারকে মিষ্টি আলুর পাই দিয়ে যাবার জন্য ইশারা করল। আর কোন বিষয় নিয়ে কথাবার্তা চালিয়ে যাওয়া যায় তাই মনে মনে হাতড়াতে লাগল – যাতে ব্যক্তিগত ব্যাপারটা না আসে অথচ মিস্টার ও’হারাকে এখানে আসার আসল উদ্দেশ্য নিয়ে কথাবার্তা বলা থেকে বিরত রাখা যায়। কিছুই সেরকম ভেবে উঠতে পারল না। অবশ্য একবার কথা বলতে শুরু করলে, আর শ্রোতা পেলে জেরাল্ডকে থামানো খুব শক্ত ব্যাপার। উনি কমিসারি বিভাগের চুরি নিয়ে বলতে লাগলেন। ওদের চাহিদা নাকি প্রত্যেক মাসেই বেড়ে যাচ্ছে। তারপর জেফারসন ডেভিসের নির্বুদ্ধিতা নিয়ে আলোচনা বললেন। কাঁচা টাকা হাতে পেয়ে নীগ্রো সেনারা ইয়াঙ্কিদের দলে গিয়ে ভিড়ছে। 

টেবিলে ওয়াইন পরিবেশন করার পর মেয়ে দুজন যখন উঠে বিদায় নিল, তখন জেরাল্ড কঠোরভাবে স্কারলেটের দিকে তাকিয়ে চলে না যাবার আদেশ দিলেন। স্কারলেট মেলির দিকে অসহায়ভাবে তাকাল। মেলিও উপা্যান্তর না দেখে অসহায়ভাবে ছর ছেড়ে বেরিয়ে যাবার সময় দরজাটাকে ভেজিয়ে দিয়ে গেল। 

“এবার বল দেখি!” গর্জন করে উঠলেন জেরাল্ড, গ্লাসে পোর্ট ঢালতে ঢালতে। “কি করতে চাইছ তুমি? নাকি এক বছর যেতে না যেতেই নতুন বর পাকড়াও করার জন্য উঠে পড়ে লেগে গেছ?” 

“আহ, আস্থে বাপী, চাকরবাকররা ____” 

“ওদের জানতে বাকি আছে কিছু? আর আমাদের বেইজ্জতির কথা সবাই জেনে গেছে। তোমার মা শয্যাশায়ী – আর আমি কারোর দিকে মাথা উঁচু করে চাইতে পারছি না। খুব লজ্জাকর ব্যাপার! না, পুস – এবার কেঁদে আমার কাছে পার পাবে না।” স্কারলেটের চোখের পাতার ওঠানামা আর মুখের অভিব্যাক্তি দেখে শঙ্কিত হয়ে তাড়াতাড়ি বললেন। “আমি তো তোমাকে চিনি। চার্লস থাকলেও তুমি অন্য পুরুষমানুষদের সঙ্গে ফষ্টিনষ্টি করতে ছাড়তে না। যাই হোক আজ আর তোমাকে বেশি কিছু বলছি না। আমি এখন যাচ্ছি ওই পাজী ক্যাপটেন বাটলারের সঙ্গে বোঝাপড়া করতে। কি ভেবেছে – আমার মেয়ের কোন সম্মান অসম্মান নেই? কিন্তু কাল সকালে – না না কাঁদলে চলবে না – এবারে ভবী ভোল্বার নয়! কাল সকালে তুমি আমার সঙ্গে টারায় ফিরে যাচ্ছ – কোন নড়চড় হবে না। যাতে আমাদের তুমি আর বেইজ্জত করতে না পার! নাও কেঁদোনা! এই দেখ আমি তোমার জন্য ছোট্ট একটা উপহার নিয়ে এসেছি। কি সুন্দর না? আমি বুঝতে পারছি না তুমি এরকম কাজ কি করে করলে! আমাকে সব কাজ ফেলে ছুটে আসতে হল! এত কাজ পড়ে রয়েছে! ঠিক আছে কেঁদোনা!” 

মেলানি আর পিটিপ্যাট অনেক আগেই ঘুমিয়ে পড়েছেন। কিন্তু স্কারলেটের চোখে ঘুম নেই। বুক ভরা আশঙ্কা। সবে অ্যাটলান্টাতে ও জমিয়ে নিতে শুরু করেছে! সেই আবার ফিরে গিয়ে এলেনের মুখোমুখি হতে হবে! এর থেকে মরে যাওয়া ভাল! মনে হচ্ছে এখুনি মরে গেলে ভাল হয়, তাহলে সবাই ওকে ঘেন্না করার জন্য দুঃখ পাবে! বিছানায় এপাশ ওপাশ করছিল, হঠাৎ অনেক দূর থেকে একটা আওয়াজ ভেসে আসতেই সচকিত হল। কেমন যেন চেনা চেনা গলা – যদিও খুব অস্পষ্ট আর জড়ানো। বিছানা থেকে নেমে ও জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। নক্ষত্রখ্বচিত আকাশের তলায় রাস্তার দুধারে খিলানের মত দাঁড়িয়ে থাকা গাছগুলোকে নরম কালো ছায়ার মত দেখাচ্ছে। তারপরই একটা বাঁকা হাসি ওর ঠোঁটে দেখা দিল। হুইস্কির প্রভাবে জড়তা মাখানো ওই বিশেষ উচ্চারণভঙ্গীতে ‘পেগি ইন এ লো-ব্যাকড কার’ গাইতে গাইতে আসা মানুষটি আর কেউ নয়। জেরাল্ড জোন্সবোরো থেকে কোর্টের দিন যেরকম ভাবে ফেরেন ঠিক সেইভাবে তিনি এখন বাড়ি ফিরছেন। 

ও একটা ঘোড়ার গাড়িকে অন্ধকারের মধ্যে বাড়ির সামনে এসে থামতে দেখল। আবছাভাবে দুজন লোককে নামতে দেখা গেল। মানে ওঁর সাথে আরও একজন রয়েছে। দুজনে গেটের সামনে এসে দাঁড়ালেন। স্কারলেট গেট খোলার শব্দ পেল। তারপর জেরাল্ডের গলা স্পষ্ট শোনা গেল। 

“এবার আমি তোমাকে ‘রবার্ট এমেটের জন্য বিলাপ’ গেয়ে শোনাচ্ছি। গানটা তোমার জানা উচিত ছোকরা। ঠিক আছে আমি তোমাকে শিখিয়ে দেব।” 

“হ্যা আমিও শিখতে চাই,” মৃদু হাসি মেশানো চাপা গলায় বিলম্বিত লয়ে একজন বললেন। “কিন্তু এখন নয়, মিস্টার ও’হারা।” 

“হায় কপাল, এতো দেখছি ওই অসহ্য বাটলার লোকটা!” স্কারলেট মনে মনে ভাবল। প্রথমে একটু বিরক্তই হল। তারপর একটু স্বস্তি বোধ করল। অন্তত পরস্পরকে গুলি চালিয়ে দেয়নি। আর হাবভাব দেখে মনে হচ্ছে দুজনের মধ্যে যথেষ্ট বন্ধুত্ব হয়ে গেছে যে এত রাত্রে এই অবস্থায় দুজনে একসাথে চলে এসেছে। 

“না আমি গাইছি – আর তোমাকে শুনতেই হবে। নাহলে তোমার মত অরেঞ্জম্যানকে আমি গুলি করে দেব!” 

“অরেঞ্জম্যান নয় – আমি চার্লস্টনের লোক।” 

“ওই একই হল – বরং আরো খারাপ। চার্লস্টনে আমার দুজন শালী আছে – আমি জানি।” 

“মনে হচ্ছে উনি সমস্ত পাড়াকে জাগিয়ে দেবেন,” স্কারলেট ভয় পেয়ে গেল। তাড়াতাড়ি হাত বাড়িয়ে একটা শাল নিয়ে গায়ে জড়িয়ে নিল। কিন্তু ও কি করবে? এত রাত্রে ও একা একা নীচে গিয়ে বাপীকে টেনেও নিয়ে আসতে পারবে না। 

আর কিছু বলার অবকাশ না দিয়ে জেরাল্ড গেটে ভর দিয়ে মাথা নেড়ে হেঁড়ে গলায় ‘বিলাপ’ শুরু করলেন। স্কারলেট জানালার গবাটে কনুইয়ে ভর দিয়ে শুনতে শুনতে অনিচ্ছাসহকারে হেসে ফেলল। জেরাল্ডের গলায় যদি একটুও সুর থাকত! গানটা কত সুন্দর! ওর প্রিয় গানের বিষাদ মাখা কথাগুলো মন দিয়ে শুনতে লাগল। 

“যেখানে ওর তরুন বীর ঘুমিয়ে রয়েছে, সে যে অনেক দূরের দেশ।” 

গান চলতে থাকল। মেলি আর পিটিপ্যাটের ঘর থেকে নড়াচড়ার আওয়াজ পাওয়া গেল। বেচারারা, ওঁরা নিশ্চয়ই বিচলিত হচ্ছেন। জেরাল্ডের মত উগ্র পুরুষমানুষের ব্যাপারে ওঁদের কোন অভিজ্ঞতাই নেই। গান শেষ হবার পর দুজনে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে আসতে লাগলেন। তারপর দরজায় খুব মৃদু টোকা। 

“আমার নীচে যাওয়া উচিত,” স্কারলেট ভাবল। “হাজার হোক আমারই তো বাপী। আর পিটি বেচারা যাবার আগেই ভয়ে মরে যাবেন।” তাছাড়া জেরাল্ডকে এই অবস্থায় চাকর-বাকররা দেখুক সেটাও ও চায় না। পীটার ওকে বিছানায় শোয়াতে গেলে মারামারি লেগে যেতে পারে। এই সময় একমাত্র পোর্কই পারে ওঁকে সামলাতে। 

চাদরটাকে গলার কাছে পেঁচিয়ে নিয়ে বিছানার পাশে রাখা মোম্বাতিটা জ্বালাল। তারপর তাড়াতাড়ি সিঁড়ি বেয়ে নীচের হলে চলে গেল। বাতিদানের ওপর মোমবাতিটা রেখে দরজার ছিটকিনি খুলল। কাঁপা আলোয় দেখল রেট বাটলার – পোশাক একটুও অবিন্যস্ত হয়নি – ওর ছোট্টখাট্টো কিন্তু পৃথুল বাপীকে ধরে দাঁড়িয়ে আছেন। ‘বিলাপ’ নিশ্চিতভাবে আর গাইছেন না, কারন তাঁর মাথা সম্পূর্ণভাবে তাঁর সঙ্গীর কাঁধে ঝুলে আছে। মাথায় টুপিটা নেই। লম্বা সাদা চুল অবিন্যস্ত। টাইটা ঘুরে কানের কাছে চলে এসেছে। বুকের কাছে শার্টের ওপর পানীয়ের দাগ। 

“তোমার বাবা, মনে হয়?” হাসিভরা মুখে ক্যাপ্টেন বাটলার জানতে চাইলেন। ওর শিথিল বসনের দিকে অন্তর্ভেদী দৃষ্টিতে তাকালেন। 

“ওঁকে ভেতরে নিয়ে আসুন,” বলল ও। পোশাকের জন্য নিজেকে আড়ষ্ট লাগছিল। বাপীর এই কাণ্ডজ্ঞানহীনতার জন্য মনে মনে খুব রেগে উঠল। লোকটার কাছে হাস্যাষ্পদ হতে হল! 

রেট জেরাল্ডকে ঠেলে এগিয়ে নিয়ে এলেন। “ওপরে নিয়ে যাবার জন্য আমি কি তোমাকে সাহায্য করব? উনি যথেষ্ট ভারি – তুমি একা পেরে উঠবে না।” 

এই হঠকারী প্রস্তাবে ও শিউরে উঠল। বলে কি লোকটা! পিটিপ্যাট আর মেলি কি ভাববেন যদি ক্যাপ্টেন বাটলার ওপরে যান! 

“দোহাই আপনার! না! বসবার ঘরের ওই সেটিতে শুইয়ে দিন।” 

“কি বললে? সতী? 

“আপনি ভদ্রভাবে কথা বললে আমি বাধিত হব। নিন, এখানে শুইয়ে দিন।” 

“জুতোগুলো খুলে দেব?” 

“দরকার নেই। উনি এর আগেও জুতো পরে ঘুমিয়েছেন।” 

মুখ ফস্কে কথাটা বেরিয়ে যাবার জন্য মনে হল নিজের জিভটা টেনে ছিঁড়ে ফেলে। জেরাল্ডের পা দুটোকে ঠিক করে রাখতে রাখতে উনি মৃদু হেসে ফেললেন। 

“এবার আপনি দয়া করে বিদেয় হন।” 

স্বল্পালোকিত হলঘর থেকে বেরিয়ে যাবার সময় দরজার গোড়া থেকে ওঁর টুপিটা তুলে নিলেন। 

“রবিবার ডিনারে তোমার সঙ্গে দেখা হচ্ছে,” বলে বেরিয়ে গিয়ে দরজাটা টেনে দিলেন নিঃশব্দে। 

স্কারলেট সাড়ে পাঁচটার সময় বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ল। ব্রেকফাস্ট বানানোর জন্য তখনও চাকর-বাকররা খিড়কী দিয়ে হলে এসে যায়নি। শব্দ না করে হলে নেমে এল। জেরাল্ড জেগে গিয়ে সোফায় বসেছিলেন। দুহাত দিয়ে মাথাটা সজোরে চেপে ধরেছেন। মনে হচ্ছিল যেন হাতের তালু দিয়ে মাথাটা গুঁড়িয়ে ফেলবেন। ওকে ঢুকতে দেখে চুপিচুপি চোখ তুলে তাকালেন। এটুকুতেই এত অসহ্য যন্ত্রণাবোধ হল যে তিনি ককিয়ে উঠলেন। 

“শুভ সকাল।” 

“খুব ভাল দেখালে বাপী!” মৃদুস্বরে স্কারলেট গর্জন করে উঠল। “এত রাত করে বাড়ি ফেরা – আবার তারস্বরে গান গাইতে গাইতে!” 

“আমি গান গাইছিলাম?” 

“গাইছিলে? তারস্বরে চেঁচিয়ে পাড়া মাথায় করছিলে!” 

“আমি তো কিছুই মনে করতে পারছি না।” 

পাড়াপড়শিরা শুধু নয়, মিস পিটিপ্যাট আর মেলানিও মরার আগে পর্যন্ত ভুলতে পারবে না!” 

“হায় কপাল!” পুরু সাদা প্রলেপ দেওয়া জিভ দিয়ে শুকিয়ে যাওয়া ঠোঁটটা ভিজেয়ে মিনমিন করে বললেন, “খেলা শুরু হবার পরে যে কি হল – কিছুই মনে করতে পারছি না!” 

“খেলা?” 

“ওই তো ওই মাগীবাজ বাটলারটা বড়বড় করছিল যে ওর থেকে বড় পোকার খেলোয়াড় নাকি কেউ নেই!” 

“কত হারলে?” 

কেন, আমিই জিতেছি – এসব ক্ষেত্রে যা হয়ে থাকে! তুমি তো জানোই পেটে দু’এক পেগ পেটে পড়লে আমাকে আর কেউ হারাতে পারেনা!” 

“একবার ওয়ালেটটা খুলে দেখ।” 

একটু নড়াচড়া করতে গেলেই যন্ত্রণা বেড়ে যাচ্ছে, তবুও কোনক্রমে কোটের পকেট থেকে ওয়ালেটটা বের করে দেখলেন। ওটা একদম খালি। 

“পাঁচশো ডলার ছিল,” আক্ষেপ করে বললেন, “অবরোধকারিদের কাছ থকে মিস ও’হারার জন্য কিছু জিনিষ কেনবার ছিল – এখন তো আমার কাছে ফেরার ভাড়াটা পর্যন্ত নেই!” 

রাগত চোখে খালি পার্সটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ওর মনে চকিতে একটা ফন্দি খেলে গেল। 

“এই শহরে আর আমার মানমর্যাদা কিছুই রইল না,” ও বলতে শুরু করলে। তুমি আমাদের সবাইকে বেইজ্জত করে দিলে।” 

“মুখ সামলে কথা বল, পুস, দেখছ আমার মাথাটা ফেটে পড়ছে!” 

“মাতাল হয়ে তারস্বরে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে গান গাইতে গাইতে মাঝরাতে বাড়ি ফিরলে – সমস্ত টাকা পয়সা খুইয়ে – কার সাথে – না ক্যাপটেন বাটলারের মত একটা লোকের সঙ্গে!” 

“তাস খেলার ব্যাপারে লোকটা খুব ধুরন্ধর – ভদ্রলোক হতেই পারে না! লোকটা ___” 

“মা যখন শুনবেন তখন ওঁর কি মনে হবে?” 

“তার মানে তুমি মায়ের কাছে লাগাবে – ওঁকে কষ্ট দেবার জন্য? তাই না?” 

স্কারলেট কিছু না বলে মুখ বাঁকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। 

“একবার ভাব কথাটা ওঁকে কতটা আঘাত করবে – উনি এত ভালমানুষ!” 

“আর কাল রাত্রেই বাপী তুমি বলছিলে আমি নাকি আমাদের পরিবারের মর্যাদাহানি করেছি! সেনাবাহিনীর জন্য অর্থ সংগ্রহ করতে আমি একটু নেচেছি, এই জন্যে! ওফ আমার কান্না পাচ্ছে।” 

“থাক থাক, কেঁদো না,” জেরাল্ড মিনতি করলেন। “তাহলে যন্ত্রণায় মাথাটা ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।” 

“আর তুমি বললে কি না ___” 

“ঠিক আছে, ঠিক আছে, পুস, তোমার এই বুড়ো বাপী কি বলতে কি বলে ফেলেছে – তাই নিয়ে তুমি মন খারাপ কোরো না। আমি না বুঝেই তোমাকে ব্যথা দিয়ে ফেলেছি। আমি জানি তুমি ভাল মেয়ে। সত্যি বলছি!” 

“আর আমাকে অপমান করে বাড়ি নিয়ে যেতে চাও?” 

“না গো সোনা, আমি সেরকম কিছু করব না। ওটা তো শুধু তোমাকে রাগানোর জন্য বলেছিলাম। টাকার কথাটা মাকে বোলো না কেমন। এমনিতেই টানাটানিতে তোমার মা এখন একটু অসুবিধের মধ্যে আছেন।” 

“ঠিক আছে, বলব না,” স্কারলেট খোলাখুলি বলল, যদি তুমি আমাকে না নিয়ে যাও – আর মাকে বল যে যা শুনেছ সবই গুজব – ওই বুড়ি বিল্লি গুলো রটিয়ে বেড়াচ্ছে।” 

জেরাল্ড করুণভাবে মেয়ের দিকে তাকালেন। 

“এটা কিন্তু ব্ল্যাকমেলের থেকে কম নয়!” 

“কিন্তু কাল রাতে যেটা হয়েছে সেটা কলঙ্কের থেকে কম নয়।” 

“ঠিক আছে,” জেরাল্ড সমঝোতার সুরে বললেন, “আমরা এই ব্যাপারটা না হয় ভুলেই যাব। আচ্ছা মিস পিটিপ্যাটের মত এমন রুচিসম্পন্ন মহিলার বাড়িতে কি একটু ব্র্যান্ডি পাওয়া যাবে? কুকুরের লেজ ___” 

স্কারলেট পা টিপে টিপে হল থেকে বেরিয়ে ডাইনিং রুমের আলমারি থেকে ব্র্যান্ডির বোতলটা আনতে গেল। ও আর মেলি নিজেদের মধ্যে এই বোতলটার নাম দিয়েছে “মূর্চ্ছা বোতল” কারন যখনই পিটিপ্যাটের বুক জোরে জোরে ধুকপুক করতে করতে অজ্ঞান হবার মত অবস্থা হয়, তখন উনি এর থেকে এক ঢোঁক মুখে ঢেলে দেন। ওর চোখেমুখে জয়ের উল্লাস। জেরাল্ডের প্রতি অসন্তানোচিত ব্যবহারের জন্য একটুকুও অনুতপ্ত নয়। আবার যদি কোন মাতব্বর কিছু বলেও, এলেন নিশ্চিন্ত হবেন এই ভেবে যে এগুলো সব গুজব। ও অ্যাটলান্টাতেই থেকে যেতে পারবে। আর পিটিপ্যাট যেরকম দূর্বল মনের মানুষ, ও নিজের খুশি মত চললেও কিছু বলতে পারবেন না। সেলার খুলে বোতল আর একটা গ্লাস নিয়ে নিল। 

কল্পনায় ওর চোখের সামনে সারি সারি ছবি ভেসে উঠল – পীচট্রীর খাঁড়িতে পিকনিক – স্টোন মাউন্টেনে বারবেকিউ – পার্টি আর নেমন্তন্ন – নাচের আসর - বগীগাড়িতে চড়ে ঘোরা – রবিবার সন্ধ্যেবেলা বুফে সাপার – আরও কত কি। এই সব কিছুতেই ও থাকবে সবার আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে। আর হাসপাতালে ছোটখাটো কিছু করলেই – ছেলেরা কি চট করে প্রেমে পড়ে যায়! না এখন ওর হাসপাতালে যেতেও খারাপ লাগবে না। ছেলেদের এত সহজেই পটানো যায়! বিশেষ করে যখন ওরা অসুস্থ থাকে। চালাক মেয়েদের কাছে ওরা পাকা আমটির মত টুপ করে পড়ে যায়। 

গ্লাসে ব্র্যান্ডি ঢেলে ও বাপীর কাছে নিয়ে গেল। মনে মনে ভগবানকে ধন্যবাদ দিল যে ও’হারার মাথা কালকের ধাক্কা সামলাতে পারেনি। কে জানে রেট বাটলারের কোন কারসাজি এর মধ্যে আছে কি না? ওর মনে কেমন জানি একটু সন্দেহ হল। 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন