রবিবার, ১০ মার্চ, ২০১৯

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় : না লিখে পারি না

কেন লিখি এ-প্রশ্ন বড়োই অবান্তর। না লিখে আমার উপায় ছিল না। অস্তিত্বের সংকট থেকে লিখি। জন্মেছি, বড়ো হয়েছি, জীবনের নানা সংঘাতে নিজেই জর্জরিত, দেশ ভাগ থেকে দাঙ্গা, যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ এবং সমাজের শোষণ আমাকে পীড়া দেয়। আমার অস্তিত্ব নাড়া খায়, না লিখে পারি না। কিছুটা প্রতিবাদের মতো আমি আমার অনুভূতিমালা সমূহ লেখায় ধরে রাখার চেষ্টা করি।

দেশ ভাগ আমাকে ছিন্নমূল করেছে। 

এক জীবনে কত অভিজ্ঞতা! সমুদ্রে ঘুরে বেড়িয়েছি সাধারণ জাহাজী হয়ে। ট্রাক ক্লিনার ছিলাম একটা গ্যারেজে। প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষকতারও অভিজ্ঞতা আছে। তারপর কোনও স্কুলের প্রধান শিক্ষক। সব ছেড়ে কলকাতায় কারখানার ম্যানেজার, তারপর সাংবাদিকতা, নানা পেশায় নানা মানুষজনের ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া আমার লেখার বিষয়—একটা সময়কে ধরে রাখা। এই সব অভিজ্ঞতা এমন উৎপীড়নে ফেলে দেয় যে আমি না লিখে পারি না। 

আমি বার বার আমাকে নিয়েই লিখি। আমি ছাড়া যে আর কাউকে ভালো জানি না। 

ক্ষোভ, দুঃখ, বেদনা, হতাশা এবং কখনও যদি সফল হই কাজে তার আনন্দ আমাকে লেখায় উদ্বুদ্ধ করে। 

আগেই বলেছি আমি ছিন্নমূল, ঘরবাড়ি ছেড়ে আসার বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে বার বার ছিন্নভিন্ন হয়েছি, বারবার রক্তাক্ত হয়েছি। ধর্মান্ধতা মানুষে মানুষে যে বিষক্রিয়া ছড়ায় তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ না জানালে যে চলে না। আমার হাতিয়ার কোথায় প্রতিবাদ জানাবার। কলম ছাড়া আর কী সম্বল থাকতে পারে আমার। আমার বড়ো কাজগুলিই হত না যদি না এই ধর্মান্ধতার আমি অন্বিষ্ট হতাম। ধর্ম বড়ো নয়, মানুষই বড়ো, বার বার এই কথাগুলিই বলতে চেয়েছি। না লিখলে এই সব বোধের সঙ্গে যে মানুষকে জারিত করা যেত না। দেশভাগের বেদনা কী ভয়ঙ্কর, তা যে শিকার হয়েছে সেই জানে। যে এই ধর্মান্ধতার শিকার হয় নি, তার কাছে কে এই খবর পৌঁছে দেবে, ধর্ম বড়ো নয়, মানুষই বড়ো। মনুষ্যত্ব মানুষকে মহৎ করে তোলে—আমার সৃষ্ট চরিত্ররা বার বার সেই কথাই বলেছে, ঈশম সেখ, ফকির সাব, জাহাজের টিণ্ডাল সারেঙ সবাই। এমন কী জাহাজের কাপ্তান স্যালি হিগিলসও। 

ভালোবাসলে মেঘ হয় বৃষ্টি হয়, ভালোবাসলে মানুষ আরোগ্য লাভ করে। লিখতে লিখতে বার বার তা উপলব্ধি করেছি। এই উপমহাদেশের সংকট থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার একমাত্র উপায় মানুষের প্রতি ভালোবাসা। ভালোবাসলে সব দ্বিধা দ্বন্দ্ব দুর হয়, ধর্ম সেখানে কোনোই বাধা সৃষ্টি করতে পারে না। লিখতে লিখতে তাও উপলব্ধি করেছি। না লিখলে এইসব বোধের আশ্চর্য লীলা অনুভবই করতে পারতাম না। 

সুতরাং লিখি। 

লিখে জীবনের সব ক্লেশ দূর করতে চাই।। 

এক স্বপ্নময় জগতে লিখতে লিখতে বিচরণ করতে পারি। এক জীবনে এত বড়ো পাওনাকে অস্বীকার করি কী করে। জীবন ফুরিয়ে যাচ্ছে টের পাই, এবং মৃত্যুর শীতল ঠাণ্ডা গহ্বরে প্রবেশ করার জন্য এগিয়ে যাচ্ছি। আমার জীবনের এই সব রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার কথা না লিখে রেখে গেলে, আমি বলতে যে অস্তিত্ব তাই লোপ পায় মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে। এ-জন্যও লিখি। 

তবে মহাকাল বড়ো নিষ্ঠুর। ভেজা স্লেটের মতো তার পিঠে কোনও দাগই আঁকা যায় না । সুনিপুণ কারিগরের মতো সে অতি হালকাভাবে সব মুছে দেয়। সব বুঝি, তবুও লিখি। 

আসলে মহাকালের প্রতিদ্বন্দ্বী নিজেকে ভাবতে ভালোবাসি। মানুষের ধর্মই যে এমন, সে মহাকালকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখিয়ে বেঁচে থাকতে চায়। বেঁচে থাকতে চায় বলেই কাল কিংবা মহাকাল তাকে কিছুতেই হতাশ করতে পারে না। 

মৃদুমন্দ বাতাস, কিংবা নারীর সুঘ্রাণ, ভালালোবাসা, প্রেম, সবই তো অতি চমৎকার-- মহাকাল যতই নিষ্ঠুর হোক, জানি সে সব গ্রাস করে নেয়, তবু কালের যাত্রা রূপক মাত্র সে আমাকে কিছুতেই ভাবতে দেয় না। আমি বিশ্বাস করি না, কালের যাত্রা রূপক মাত্র। আমি আছি বলেই সে আছে, আমি না থাকলে কালও নেই, মহাকালও নেই। 

আমার এই চৈতন্যের কথা না লিখলে যে কখনোই আবিষ্কার করতে পারতাম না, কাল মহাকাল জীবনের কাছে অতি তুচ্ছ। জীবন আছে বলেই তার অস্তিত্ব, না থাকলে সেও শেষ। 

তাই লিখি। 

লিখতে লিখতে মরে যাবার বাসনা রাখি—যতই ছাইপাশ হোক, এই সৃষ্টিশীলতার মধ্যেই আমার বেঁচে থাকা। আমার জীবন। আমার প্রাণ। আমার অহঙ্কার।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন