মঙ্গলবার, ৭ মে, ২০১৯

মার্গারেট মিচেলের গল্পঃ যে দিন ভেসে গেছে ; অনুবাদ : উৎপল দাশগুপ্ত

যুদ্ধ বেশ জমিয়ে চলতে থাকল, দিনের পর দিন। তবে একটা কথা বলতে সবাই ভুলে গেছে, “ব্যস, আরেকটা জিত, তারপরই যুদ্ধ শেষ হয়ে যাবে”। আরও একটা কথা বলতেও আজকাল আর শণা যাচ্ছে না যে ইয়াঙ্কিরা কাপুরুষ। সবার কাছে এটা একদম পরিষ্কার হয়ে গেছে যে ইয়াঙ্কিরা কাপুরুষ হওয়া দূরে থাক, একটা লড়াইতে ওদের কাবু করা অসম্ভব ব্যাপার।
তবে কনফেডারেসি টেনেসিতে জেনারেল মর্গান আর জেনারেল ফরেস্টের নেতৃত্বে জয়লাভ করতে পেরেছে আর বুল রানের দ্বিতীয় লড়াইতে অনেক ইয়াঙ্কি সেনার মৃত্যু হয়েছে, কিন্তু তার জন্য মূল্যও দিতে হয়েছে অনেক। অ্যাটলান্টার হাসপাতালগুলোতে আর বাড়িতে বাড়িতে অসুস্থ আর আহত মানুষ উপচে পড়ছে। আরও অনেক মেয়েকেই কালো পোশাকে দেখা যাচ্ছে। ওকল্যান্ডের সমাধিক্ষেত্রে সমাধির সংখ্যা প্রতিদিনই বেড়ে যাচ্ছে। 

কনফেডারেট টাকার দাম বিপজ্জনকভাবে পড়ে গেছে। সাথে সাথে খাবার আর পোশাক-পরিচ্ছদের দামও বেড়ে চলেছে। প্রতিনিধিদল খাদ্যদ্রব্যের ওপর এত ট্যাক্স বসাচ্ছে যে আটলান্টার প্রত্যেকের খাবার টেবিল ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। ময়দা পাওয়া যাচ্ছে না, আর পাওয়া গেলেও তার অসম্ভব দাম। তার ফলে এখন সকলে বিস্কিট, কেক আর রোলের বদলে ভুট্টার আটার রুটি খাচ্ছে। কসাইখানাগুলোতে গোরুর মাংসের যোগান নেই, ভেড়ার মাংসের যোগানও খুবই কম আর এত দাম যে কেবলমাত্র অর্থবান মানুষই কিনতে পারে। তবে এখনও শুয়োরের মাংস, মুর্গি আর সব্জি যথেষ্ট পরিমানে পাওয়া যাচ্ছে। 

কনফেডারেট বন্দরগুলোতে ইয়াঙ্কি অবরোধ আরও জোরদার হয়েছে। তার ফলে বিলাসের সামগ্রী, যেমন চা, কফি, রেশমের কাপড়, কোলোন, ফ্যাশন ম্যাগাজ়িন, বইপত্র সবকিছুই দুষ্প্রাপ্য কিংবা দুর্মূল্য হয়ে গেছে। এমনকি সস্তার সুতির কাপড়ের দামও এত বেড়ে গেছে, যে মহিলারা তাঁদের গত বছরের পোশাকই এবছরও পরতে বাধ্য হচ্ছেন। তাঁত আর চরকা – যেগুলো বহু বছর ধরে তুলে রাখা ছিল সেগুলো আবার নামিয়ে নিয়ে ধুলো ঝেড়ে কাজে লাগানো হচ্ছে। প্রায় সকলেরই বসার ঘরই কাপড় বোনার আখড়া হয়ে গেছে। কনফেডারেটদের ইউনিফর্মের ধূসর রঙ হিসেবে দূর্লভ হয়েগেছে। তার বদলে ঘরে বোনা আখরোট রঙের ইউনিফর্ম ব্যবহার করতে হচ্ছে। 

কুইনিন, ক্যালোমেল, আফিম, ক্লোরোফর্ম, আর আইডিন পাওয়া না যাওয়ায় হাসপাতালগুলোর অবস্থা যথেষ্ট সঙ্গিন। ব্যবহার করা সুতির কাপড় আর ব্যান্ডেজ আর ফেলে দেওয়া যাচ্ছে না। মেয়েরা বাড়ি ফেরার সময় বালতি ভরে রক্তাক্ত ব্যান্ডেজ আর কাপড় নিয়ে এসে ধুয়ে, পরিস্কার করে, ইস্ত্রি করে ফেরত নিয়ে যাচ্ছে আবার ব্যবহার করার জন্য। 

সদ্য বৈধব্যজনিত শোকের গুটি ভেঙে বেরিয়ে, স্কারলেটের কাছে যুদ্ধের এই সময়টা আনন্দ আর উত্তেজনার সময়। পোশাকআশাক আর খাবারদাবারের খানিক টান থাকলেও, বাইরের জগতের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্স্থাপন হওয়ার আনন্দে এইটুকু অসুবিধে ও মেনেই নিয়েছে। 

নিস্প্রভ সেই দিঙ্গুলোর কথা মনে পড়লেই স্কারলেট অনুভব করে যে তুলনামূলকভাবে জীবন এখন অনেক বেশি গতিময়। একটা রোমাঞ্চকর অভিযানের প্রত্যাশা নিয়ে প্রতিদিন ভোরে ওর ঘুম ভাঙে। নতুন নতুন পুরুষ মানুষের সাথে পরিচয় হবে, যারা ওর সাথে কথা বলতে চাইবে আর ওর সৌন্দর্য নিয়ে প্রশংসাসূচক মন্তব্য করবে। হয়ত বলবে যে ওরা ওর জন্য প্রাণ পর্যন্ত বিসর্জন দিতে প্রস্তুত। এটা ঠিক যে জীবনের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত অ্যাশলেকে ভালবাসবে, কিন্তু তা বলে অন্য কোন ছেলে যদি মুগ্ধ হয়ে ওকে বিয়ে করবার প্রস্তাব দেয় তাতে কোন অসুবিধে নেই। 

যুদ্ধের পরিবেশ সমাজে একটা লৌকিকতাবর্জিত বাতাবরণ সৃষ্টি করেছে। অবশ্য বয়স্ক মানুষ ব্যাপারটাকে মোটেই ভাল চোখে দেখছেন না। মায়েরা মেয়েদের বহিরাগতদের সঙ্গে মেলামেশা করতে দেখছেন, যার একফম অপরিচিত, যাদের অতীত জীবন সম্বন্ধে কিছুই জানা নেই। মায়েরা অত্যন্ত শঙ্কার সাথে লক্ষ্য করলেন যে তাঁদের মেয়েরা এই সব অপরিচিত পুরুষমানুষদের হাত অবলীলায় নিজেদের হাতে তুলে নিচ্ছে। মিসেজ় মেরিওয়েদার, যিনি তাঁর স্বামীকে বিবাহের পূর্বে কখনও চুম্বন করেননি, দেখতে পেলেন মেবেল বিনা সঙ্কোচে রেনে পিকার্ড অর্থাৎ সেই বেঁটে জ়ুয়েভকে চুম্বন করছে। তাঁর ত্রাস আরও বেড়ে গেল যখন এই ঘটনার জন্য মেবেল কোনরকম লজ্জাপ্রকাশ করতে অস্বীকার করল। যদিও রেনে তৎক্ষণাৎ মেবেলের পাণিপ্রার্থনা করল, তবুও ঘটনাটা যথেষ্ট উদ্বেগের। মিসেজ় মেরিওয়েদারের মতে দক্ষিণীরা ক্রমাগত নৈতিক পতনের দিকে এগিয়ে চলছে, আর সেটা তিনি সবাইকে জানাতেও দ্বিধা করতেন না। অন্য মায়েরাও তাঁকে কায়মনোবাক্যে সমর্থন করতেন, আর বলতেন যুদ্ধই এর জন্য দায়ী। 

কিন্তু যে সমস্ত পুরুষমানুষরা এক সপ্তাহ কি এক মাসের মধ্যে যুদ্ধে মারা যেতে পারে, তাঁরা মেয়েদের ডাক নামে সম্বোধন করার জন্য এক বছর অপেক্ষা করতে চাইবে না। অবশ্যই নামের আগে ‘মিস’ লাগিয়েই ডাকবে। না তারা কোন দীর্ঘায়িত পূর্বরাগের লৌকিকতার জন্যে প্রস্তুত ছিল – প্রাকযুদ্ধ সময়ে যেটা কিনা আবশ্যিক বলে মনে করা হত। অন্তত তিন মাস মেলামেশার পরই ছেলেরা মেয়েদের বিবাহের প্রস্তাব দিত। আর মেয়েদেরও শেখানো হত অন্তত তিনবার সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে না দিলে তারা লেডি বলে গ্রাহ্য হবার যোগ্যই নয়। আজকাল ছেলেরা আলাপ হবার পরেই তড়িঘড়ি মেয়েদের বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে দেয়, আর মেয়েরাও চোখের পলক ফেলতে না ফেলতেই সেই প্রস্তাব গ্রহণ করে বসে। 

এই আড়ম্বরহীনতা স্কারলেটের বেশ পছন্দের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। একমাত্র এই রোতী সেবা করার মত নোংরা ব্যাপারটা আর ব্যান্ডেজ গোটানোর মত বিরক্তিকর কাজটা ছাড়া, যদি এই যুদ্ধ অনন্তকাল ধরেও চলে, তাহলেও স্কারলেটের কিছে যায় আসে না। সত্যি বলতে কি হাসপাতালের এই কাজগুলোতে ওর আগ্রহের অভাব নেই কারন এখানে শিকার করবার অফুরন্ত সুযোগ। মোহিনী আকর্ষণে অসহায় আহত মানুষদের কব্জা করতে ওকে একটুও পরিশ্রম করতে হয় না। ওদের ব্যান্ডেজ পালটে দাও, মুখ পরিস্কার করে দাও, মাথার নীচে বালিশ ঠিক করে দাও, পাখা দিয়ে বাতাস করে দাও, আর ওরা টুপ করে ওর প্রেমে পড়ে যাবে। গত এক বছরের ভয়ঙ্কর সময়ের তুলনায় এখন তো স্বর্গ! 

স্কারলেট আবার মনে মনে সেই ফেলে আসা কুমারী দিনগুলোতে ফিরে গেল – যেন চার্লসের সঙ্গে ওর বিয়েই হয়নি, যেন চার্লসের মৃত্যুর শোক ওকে বিধ্বস্ত করেনি, যে ওয়েডের জন্মই হয়নি। যেন যুদ্ধ, বিবাহ, সন্তানের জন্মদান – এইসব ওর মনে কোন রেখাপাতই করেনি – ও যেন আগের মতই আছে। লাল ইটের বাড়িতে ওর ছেলের দেখাশোনা এত ভালভাবে হয়, যে ও নিশ্চিন্তে ওর কথা ভুলে থাকতে পারে। মনে মনে ও আবার সেই স্কারলেট ও’হারা হয়ে গেছে – যে কিনা কাউন্টির হৃদয়ে আলোড়ন জাগানো সুন্দরী। ওর ভাবনা, ওর কাজকর্ম সবই আবার সেই পুরনো দিনের মতই, তফাৎ শুধু এইটুকুই যে বিচরণের পরিধিটা অনেকটাই বেড়ে গেছে। আন্ট পিটির বন্ধুবান্ধবদের কথাবাররতার তোয়াক্কা না করে, বিয়ের আগের মত স্বাধীনভাবে পার্টিতে যায়, নাচে অংশগ্রহণ করে, সৈন্যদের সঙ্গে ঘোড়ায় চড়ে বেরিয়ে পড়ে, ছেলেদের সঙ্গে ফস্টিনস্টি করে – মানে যা বিয়ের আগে করে থাকত সব কিছুই ঠিক তেমন করে করে। যদিও শোকের পোশাকটা এখনও বর্জন করেনি, কারন তাহলে পিটিপ্যাট আর মেলানি তেমন জোর দিয়ে আপত্তি করতে পারবেন না। কুমারী মেয়ে হিসেবে যতখানি মোহময়ী ছিল, বিধবা হিসেবেও ও ঠিক ততখানিই মোহময়ী। নিজের মতে চলতে পারলে ও হাসিখুশি, নিজে অসুবিধেয় না পড়লে সহৃদয়, নিজের সৌন্দর্য আর জনপ্রিয়তা সম্বন্ধে দাম্ভিক ভাবে সচেতন। 

এখন ও সত্যি সুখী, অথচ এই কয়েক সপ্তাহ আগেও কত দুঃখে দিন কেটেছে। ওর প্রণয়ীদের জন্য ও সুখী, যার সবসময়ে ওর রূপের প্রশংসা করে, অবশ্য ওর প্রেমিক অ্যাশলে মেলানির হয়ে গেছে, এবং এই মুহুর্তে বিপদের মধ্যে রয়েছে – এই পরিস্থিতিএ যতটা সুখী হওয়া যায় আর কি। কিন্তু যখন অ্যাশলে দূরে থাকে, তখন ও যে অন্য কারো হয়ে গেছে এই চিন্তাটা মন থেকে সরিয়ে রাখা যায়। অ্যাটলান্টা আর ভার্জিনিয়ার মধ্যে শত শত মাইলের ব্যবধান – খখনও কখনও মনে হয় অ্যাশলে যতখানি মেলানির ঠিক ততখানিই ওরও। 

১৮৬২ সালের হেমন্তের দিনগুলো খুব তাড়াতাড়ি কেটে যেতে লাগল। টারায় কয়েকটা স্বল্পমেয়াদী যাতায়াত ছাড়া রুগীর সেবা, নাচের আসর, ঘোড়ায় চড়া আর ব্যান্ডেজ গোটানো এই সব নিয়ে ও যথেষ্ট ব্যস্ত হয়ে পড়ল। টারায় যাতায়াতগুলো খুব আশাব্যঞ্জক কিছু হয়নি। অ্যাটলান্টায় থাকার সময় মন চাইত এলেন যখন সেলাই করতে বসবেন তখন ওঁর পাশে বসে লেবুর ফুলের সুগন্ধ নিতে নিতে আর মায়ের নরম হাতের স্পর্শ গালে অনুভব করতে করতে অনেক গল্প করবে। কিন্তু একেবারেই সময় করে উঠতে পারেনি। 

এলেন অনেক রোগা হয়ে গেছেন। ভোর থেকে শুরু করে রাত্রে সকলে ঘুমিয়ে পড়ার অনেক পরে পর্যন্ত নানারকম কাজে অসম্ভব ব্যস্ত থাকেন। কনফেডারেট প্রতিনিধিদের দাবি দিনে দিনে, মাসে মাসে বেড়েই চলেছে। সেই অনুযায়ী মধ্যে টারার উৎপাদন বজায় রাখতে হচ্ছে। এমনকি জেরাল্ডকেও অনেক বছর পরে এই প্রথম খুব ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে। জোনাস উইল্কার্সনের চলে যাবার পরে তিনি আর কোন দক্ষ ওভারসীয়ার জোগাড় করতে পারেন নি। এলেনের কেবল শুভরাত্রি জানাবার সময় একটা চুম্বনের ফুরসত ছাড়া আর জেরাল্ডের সারাদিন মাঠে ব্যস্ত থাকার জন্য, স্কারলেটের কাছে টারার জীবনযাত্রা খুবই একঘেয়ে লেগেছে। এমনকি ওঁর বোনেরাও নিজেদের সমস্যা নিয়েই ব্যস্ত। স্যুয়েলেন ফ্র্যাঙ্ক কেনেডির সঙ্গে একটা মোটামুটি বোঝাপড়ায় এসে গিয়ে যখন গুনগুন করে “জানি নিষ্ঠুর যুদ্ধ স্তব্ধ হলে, তুমি ফিরে এসে ধরবে আমার হাত” গাইতে থাকে তখন স্কারলেট সেটাকে খুবই অর্থবহ বলে মনে করে আর ওর পক্ষে সহ্য করা মুশকিল হয়ে পড়ে। ক্যারীনও ব্রেন্ট টার্লটনের সঙ্গ পাওয়ার স্বপ্নে সারাদিন বিভোর হয়ে থাকে। 



যদিও স্কারলেট টারায় আসার সময় একটা সুখানুভুতি নিয়ে আসত, কিন্তু অনিবার্যভাবে যখনই পিটি আর মেলানি চিঠি দিয়ে ওকে ফিরে আসার জন্য অনুনয় করত তখন ওর মনে একটুও দুঃখ হত না। বড় মেয়ে আর একমাত্র নাতি তাঁকে ছেড়ে চলে যাওয়ার সময় প্রত্যেকবারই এলেন মনের দুঃখে দীর্ঘশ্বাস ফেলতেন। 



“আমি স্বার্থপরের মত তোমাকে আটকে রাখতে চাই না – অ্যাটলান্টায় রুগীদের সেবা করার জন্য তোমার কত প্রয়োজন সেটা জানি,” উনি বলতেন। “কিন্তু তুমি যখন ফিরে যাও সোনা, তখন খালি মনে হতে থাকে যে তোমার সঙ্গে ভাল করে কথাই বলা হল না। আর মনে হয় আমার সেই ছোট্ট মেয়েটা আমার কাছ ছেড়ে চলে গেছে।” 



স্কারলেট মায়ের বুকে মাথা গুঁজে বলে, “আমি তোমার সেই ছোট্ট মেয়েই তো আছি।” কিন্তু ওর মনে একটা পাপবোধ কাজ করতে থাকে, কারন ও মাকে বলতে পারে না যে অ্যাটলান্টায় কনফেডারেসির সাহায্যের জন্য মোটেই ও ব্যগ্র নয়, বরং নাচের পার্টি আর পুরুষবন্ধুদের সাথে মেলামেশা করবার জন্যই ওর ওখানে ফেরবার তাড়া। আজকাল মাকে ও অনেক কথাই বলে না, আর যে কথাটা কখনওই বলতে পারেনি সেটা হল রেট বাটলার আজকাল প্রায়ই আন্ট পিটিপ্যাটের বাড়িতে এসে থাকেন। 



সেই মেলার পরবর্তি মাসগুলোতে, রেট বাটলার শহরে থাকলেই ওদের বাড়িতে যাওয়া আসা করতেন। ওঁর গাড়িতে করে স্কারলেটকে বেড়াতে নিয়ে যেতেন, নাচের আসর আর মেলাতে নিয়ে যেতেন, হাসপাতালের বাইরে গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করতেন স্কারলেটকে বাড়ি পৌঁছে দেবার জন্য। ওর সেই গোপন কথাটা যে উনি কাউকে বলে দেবেন না, সেটা স্কারলেট বুঝে গিয়েছিল, কিন্তু মনের মধ্যে একটা অস্বস্তি থেকেই গেল যে উনি সেই দূর্বল মুহুর্তের সাক্ষী হয়ে গেছেন আর অ্যাশলের ব্যাপারে আসল কথাটা উনি জানেন। তাই উনি যখন ওর পেছনে লাগতেন, ও মেজাজ সামলে রাখতে বাধ্য হত। উনি খুবই ঘন ঘন ওর পেছনে লাগতেন। 



মধ্য-তিরিশ বয়সী রেট বাটলারই স্কারলেটের সব থেকে বয়স্ক পুরুষবন্ধু। বাকি যারা ছিল তাঁদের বয়স মোটামুটি ওর বয়সের কাছাকাছি। আর তাই, ওদের ওপর ও যেভাবে ছড়ি ঘোরাতে পারত, ওঁর ওপরে সেটা একদম পারত না। ও যখন রাগে বাক্যহারা হয়ে যেত, উনি ভাব করতেন যেন কিছুই হয়নি, আর উনি সেটা আবার খুবই উপভোগ করতেন। ওঁর উস্কানিমূলক বাকপটুতার ফাঁদে ও মাঝে মাঝেই পা দিয়ে ফেলত আর মেজাজ হারিয়ে ফেলত। কারন এলেনের চেহারার স্নিগ্ধতা ওর বাইরের আবরণ মাত্র, রক্তে ছিল জেরাল্ডের আইরীশ ঔদ্ধত্য। এতদিন এলেনের সামনে ছাড়া ও কখনওই ওর মেজাজ সামলে রাখার দরকার মনে করেনি। কিন্তু আজকাল ওঁর কৌতুকপূর্ণ হাসি এড়ানোর জন্য অনেক কষ্টে নিজেকে সংযত রাখতে হয়। একবারের জন্যও যদি উনিও মেজাজ হারাতেন, তাহলে ওকে এই অসুবিধেয় পড়তে হত না! 



এইরকম একতরফা সংঘাতে ও যখন কোন ভাবেই জিততে পারত না, তখন মনে মনে ঠিক করে ফেলত যে ওঁর মত অসভ্য, অভদ্র, আর ইতর লোকের সঙ্গে ও আর কোন সম্পর্কই রাখবে না। কিন্তু যখনই উনি অ্যাটলান্টায় হাজির হয়ে, আন্ট পিটির খোঁজ খবর নেবার অছিলায় ওদের বাড়িতে আসতেন, তখন হয়ত নাসাউ থেকে আনা বনবনের বাক্স অতিরিক্ত সৌজন্য দেখিয়ে স্কারলেটকে উপহার দিতেন। হয়ত বা কোন জলসায় কিংবা নাচের আসরে এসে স্কারলেটের পাশে বসে পড়তেন, তখন ওঁর অমায়িক চাপল্যে স্কারলেট হেসে ফেলত আর ওঁর অতীত অপরাধের কথা মন থেকে সরিয়ে দিত যতক্ষণ না আবার নতুন কোন ঝামেলা বাধিয়ে বসতেন। 



এত বিরক্তিকর স্বভাব সত্বেও, স্কারলেট ওঁর আগমনের প্রতীক্ষায় উন্মুখ হয়ে থাকত। এমন একটা অজানা আকর্ষণ ওঁর ব্যবহারের মধ্যে ছিল যা অন্য যে কোন পুরুষের থেকে আলাদা। চোখে চটুল আর রহস্যময় হাসি মাখা দৃষ্টি সুঠাম দীর্ঘ শরীর নিয়ে উনি যখন এসে হাজির হতেন তখন স্কারলেটের মনে ওঁকে দমন করার একটা প্রবল ইচ্ছে জাগত। 

“মনে হয় যেন আমি ওঁর প্রেমে পড়ে গেছি,” স্কারলেট খুব বিহ্বল হয়ে ভাবত। “কিন্তু সেটা মোটেই ঠিক নয়। ব্যাপারটা কিছুতেই বোধগম্য হয়না!” 



কিন্তু উত্তেজনায় তা বলে ভাটা পড়ল না। ওঁর পুরুষালী ব্যক্তিত্বে আন্ট পিটির বাড়ির কমনীয় নারীসুলভ পরিবেশকে ম্লান আর সেকেলে মনে হত। শুধু স্কারলেট একা নয়, ওঁর উপস্থিতিতে অন্যরাও নিজেদের অজান্তেই আশ্চর্যজনক ভাবে ভাবে প্রভাবিত হতেন। বিশেষ করে আন্ট পিটিকে উনি হৈচৈ আর হল্লায় মাতিয়ে রাখতেন। 



পিটি ভাল মতই জানতেন ওঁর এই আসা যাওয়া এলেনের অনুমোদন লাভ করবে না, আর এটাও বুঝতেন যে চার্লস্টনের অভিজাত মহলেই মানুষটার ওপর যে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল, সেটাও অবহেলা করার মত নয়, তবুও ভদ্রলোকের সাড়ম্বর প্রশংসা আর হস্ত চুম্বনের জন্য তিনি ততখানিই লালায়িত থাকতে যতখানি মাছি মধুর কৌটোর জন্য ছটফট করে। এছাড়া উনি ছোট ছোট উপহার এনে পিটিকে দিয়ে বলতেন যে এগুলো শুধু ওঁর জন্যেই নাসাউ থেকে কিনে নিজের জীবন বিপন্ন করে অবরোধ ভেদ করে নিয়ে এসেছেন। নানা মাপের ছুঁচের পাতা, বোতাম, রেশমের সুতোর গোলা, মাথার কাঁটা – যুদ্ধের বাজারে এগুলো খুবই দুষ্প্রাপ্য আর বিলাসিতার পর্যায়ে পড়ে। আজকাল সবাই হাতে গড়া কাঠের তৈরি চুলের কাঁটা ব্যবহার করে থাকেন আর বোতামের জায়গায় ওক গাছের ফলের ওপর কাপড় ঢাকা দিয়ে ব্যবহার করেন। এই সব জিনিষ প্রত্যাখ্যান করবার মত মানসিক দৃঢ়তা পিটির ছিল না। তাছাড়া উপহার পেতে আর উপহারের প্যাকেট খুলতে উনি এক শিশুসুলভ আনন্দ পেতেন। তিনি সেগুলো প্রত্যাখ্যান করার কথা ভাবতেই পারতেন না। আর এইসব উপহার গ্রহণ করার পর ওঁর একথা বলার মত নৈতিক সাহস থাকত না যে এই তিনজন পুরুষ অভিভাবকহীন মহিলার কাছে তাঁর ঘন ঘন আসা যাওয়া খুবই অশোভন দেখায়। রেট বাটলারের উপস্থিতিতে পিটি একজন পুরুষ অভিভাবকের অভাব খুবই বোধ করতেন। 



“ওঁর হাবভাব আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারি না,” খুব অসহায় ভাবে বলে উঠতেন। “তবে কি জানো, একটু – একটু যদি মহিলাদের উনি সম্মানের চোখে দেখতে পারতেন – তাহলে বলব ওঁর মত মানুষ হয় না।” 



যেদিন উনি বিয়ের আংটি ফেরত এনে দিয়েছিলেন সেদিন থেকে মেলানি আন্তরিক ভাবে মনে করে রেট বাটলার হলেন অত্যন্ত বিরল ধরনের একজন রুচিশীল ভদ্রলোক। তাই পিটির এই ধরনের মন্তব্যে ও বেশ আহত হল। উনি নিঃসন্দেহে ওর প্রতি সৌজন্য দেখিয়েছেন। যদিও ওঁর উপস্থিতিতে ও কিছুটা অস্বস্তি বোধ করে, কিন্তু সেটা তো ও যে কোন পুরুষ মানুষ সম্বন্ধেই করে যাঁদের ও ছোটবেলা থেকে চেনে না। মনে মনে মেলানি ওঁর জন্য খানিকটা দুঃখই পায়, যদিও উনি সেটা জানতে পারলে মজা পাবেন। ওর মনে হয় উনি জীবনে প্রেমের ব্যাপারে খুব বড় রকম একটা ধাক্কা খেয়েছেন, আর তাই ওঁর কথাবার্তায় এত তিক্ততা ফুটে ওঠে। ওঁর প্রয়োজন একজন দয়ালু নারীর ভালবাসা। ওর অধিশ্রিত জীবনে কখনও অশুভকর জিনিষের সম্মুখীন না হওয়ায়, ও যে কোন মন্দ ব্যাপারের অস্তিত্বেই বিশ্বাস করে না। রেটের সম্বন্ধে যে সব গুজব ও চার্লস্টনের মেয়েদের কাছ থেকে আড়ালে আবডালে শুনতে পেত, সেগুলো ও একফোঁটা বিশ্বাস করত না। আর এই সব কথাবার্তা শুনে ওঁকে ঘৃণা করার পরিবর্তে আরও সহানুভূতিসম্পন্ন হয়ে পড়েছিল। ওর ধারণা হয়েছিল এই সমস্ত রটনাই ওঁর প্রতি অন্যায়ভাবে প্রচার করা হয়। ও এতে যথেষ্ট বিরক্তবোধ করত। 



স্কারলেট অবশ্য মনে মনে আন্ট পিটির সঙ্গেই একমত হত। ওরও ধারণা ছিল যে রেট বাটলার কোন মহিলাকে সম্মান দিতে জানেন না। বোধহয় একমাত্র ব্যতিক্রম হল মেলানি। উনি ওর দিকে তাকালে এখনও নিজেকে আনাবৃত মনে হয়। যদিও উনি এই নিয়ে অর্থবহ কোন ইঙ্গিত কখনও করেন নি। যদি করতেন, তাহলে স্কারলেট ওঁকে বাক্যবানে জর্জরিত করে ফেলতে পারত! এমন উদ্ধত ভঙ্গিতে উনি তাকান, যেন মনে হয় সব মহিলাই ওঁর ব্যক্তিগত সম্পত্তি, যাঁদের উনি নিজের খেয়াল খুশি মত ব্যবহার করতে পারেন। একমাত্র মেলানিকেই উনি অত্যন্ত সমীহের দৃষ্টিতে দেখতেন। ওর দিকে তাকানোর সময় ওঁর দৃষ্টিতে কোন রকম ব্যাঙ্গের আভাস থাকত না। কথা বলতেন অত্যন্ত সম্ভ্রমের সঙ্গে। সব সময়ই ওর প্রয়োজনে লাগবার জন্য ব্যগ্র থাকতেন। 



“আমি বুঝতে পারি না আপনি ওর সঙ্গে যে রকম ভদ্র ব্যবহার করেন, আমার সঙ্গে করেন না কেন?” একদিন স্কারলেট বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞেস করেছিল। আন্ট পিটি আর মেলানি দ্বিপ্রাহরিক নিদ্রার জন্য নিজেদের ঘরে চলেগিয়েছিলেন। স্কারলেট ওঁকে একলা পেয়েছিল। 



স্কারলেট লক্ষ্য করেছিল, সেদিন প্রায় এক ঘন্টা ধরে মেলানি যখন বোনবার জন্য উলের গোলা গোটাচ্ছিল, তখন উনি সেটা ঠায় ধরে দাঁড়িয়েছিলেন। মেলানি খানিকটা গর্বের সাথেই অ্যাশলের পদোন্নতি নিয়ে ওঁর সাথে বকবক করে চলেছিল, আর উনি সেটা অত্যন্ত ধৈর্যের সাথে শুনছিলেন। স্কারলেট ভাল মতই জানত যে ওঁর অ্যাশলে সম্বন্ধে কোন উঁচু ধারনাই নেই, আর ওর মেজর হওয়াতেও ওঁর কিছু এসে যায় না। কিন্তু তবুও উনি ঠিক ঠিক সময়ে সঠিক জবাব দিচ্ছিলেন আর মাঝে মাঝে অ্যাশলের বীরত্বের প্রশংসাও করছিলেন। 



“আর আমি যদি ভুল করেও একবার অ্যাশলের নামটাও উচ্চারণ করি,” মনে মনে বিরক্তির সঙ্গে ভাবল স্কারলেট, “তাহলে চোখ নাচিয়ে ওই সবজান্তা অশ্লীল হাসিটা হাসতেন!” 

“আমি ওর থেকে অনেক বেশি সুন্দর দেখতে,” স্কারলেট বলে চলল। “আর আমি আপনার ওর সাথে এত ভদ্র ব্যবহার করার কোন কারন খুঁজে পাই না।” 



“আমি কি মনে করতে পারি যে তুমি হিংসেয় জ্বলছ?” 

“আপনাকে কিছুই মনে করতে হবে না!” 

“হায়! আরও একবার আমার আশাভঙ্গ হল! আমি মিসেজ় উইল্কসকে সম্মান করি কারন উনি এই সম্মানের যোগ্য। যে অল্প কয়েকজন দয়ালু, অকপট, নিঃস্বার্থ মানুষের সংস্পর্শে আমি এসেছি, উনি তাঁদের মধ্যে একজন। বোধহয়, তুমি ওঁর এই গুণগুলো লক্ষ্যই করনি। আর এছাড়া, বয়স বেশি না হলেও, উনি আমার জানা মহীয়সী মহিলাদের অন্যতম।” 



“ও তাহলে আপনি মনে করেন না যে আমিও একজন মহীয়সী মহিলা?” 

“মনে হয় যেদিন আমাদের প্রথম দেখা হয়েছিল, আমরা মেনে নিয়েছিলাম যে তুমি মোটেই লেডি নও।” 

“ও তার মানে আপনি আবার অভদ্র আর কুৎসিত ভাবে সেদিনের কথা টেনে আনতে চান? ছেলেমানুষি মেজাজে কি না কি বলেছি, সেই প্রসঙ্গ বারবার তোলেন কেন? এত পুরনো একটা ব্যাপার – আমিও এত বদলে গেছি – হয়ত আমি ভুলেই যেতাম, যদি না মাঝে মাঝে আপনি আকারে ইঙ্গিতে মনে করিয়ে দিতেন।” 

“এটা ছেলেমানুষি মেজাজ বলে আমি মোটেই মনে করি না। আর তুমি একটুকুও বদলাও নি। সেদিন যেমন ছিলে, আজও তেমনি, তোমার মতের বিরুদ্ধে হলে, এখনও তুমি ফুলদানি ছুঁড়তে পার। তবে কি জান – আজকাল কেউ তোমার মতের বিরুদ্ধে যায় না। তাই তোমারও ভাঙ্গা টুকরোটাকরার প্রয়োজন পড়ে না।” 

“ওহ – আপনি না – আমি যদি পুরুষ মানুষ হতাম! আপনাকে বলতাম বেরিয়ে আসুন আর ___” 

“আর গুলি খেয়ে মরে যেতে। জান কি পঞ্চাশ গজ দূর থেকেও আমি যে কোন ছোট লক্ষ্যও ভেদ করতে পারি? তাঁর চেয়ে তোমার নিজের অস্ত্রশস্ত্রের ওপর ভরসা রাখ – হেসে গালে টোল খাওয়ানো, ফুলদানি – এই সব।” 

“আপনি একদম নচ্ছার লোক!” 

“আমি রেগে আগুন হয়ে যাই – সেটাই চাও তো? তোমাকে নিরাশ করার জন্য খুব দুঃখিত। মজার ব্যাপার হল, যে সব গালাগালি আমার সম্বন্ধে খাটে, আমি সেগুলোতে রাগ করি না। বাস্তবিকই আমি নচ্ছাড় লোক! আর হবই না কেন? স্বাধীন দেশ! চাইলে নচ্ছাড় হবার স্বাধীনতা আমার আছে বৈকি! কেবল তোমার মত মানুষেরা যারা শঠতা করে নিজেদের আসল রূপ লুকিয়ে রাখতে চায়, তারাই তাদের সঠিক নামে ডাকা হলে রেগে যায়।” 



স্কারলেট রীতিমত অসহায় বোধ করতে লাগল। এরকম নিরুত্তাপ ভাবে হেসে হেসে হুল ফোটানো কথা বলতে আর কাউকেই ও দেখেনি। অবজ্ঞা, ঘৃণা, গালাগালি – ওর যা কিছু অস্ত্র আছে সবই ওঁর সামনে যেন ভোঁতা হয়ে গেছে – কোন কিছুতেই উনি লজ্জা পাবেন না। নিজের অভিজ্ঞতায় দেখেছে যে মিথ্যবাদীরা নিজের কথার সত্যতা প্রমাণ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, ভীতু লোকেরা নিজেদের সাহস। অশিষ্ট লোকেরা নিজেদের ভদ্রলোক হিসেবে তুলে ধরতে চায় আর ইতর ব্যক্তিরা নিজেদের সম্মান। কিন্তু রেট এঁদের দলে পড়েন না। উনি সবকিছুই হাসিমুখে স্বীকার করে নেন আর যাতে আরও কিছু বলা হয় তার ইন্ধন যোগান। 



গত কিছু মাসে উনি অনেকবার এসেছেন। অঘোষিত ভাবে। আবার চলেও গেছেন, কারও কাছে বিদায় না নিয়েই। কি কাজের জন্য উনি অ্যাটলান্টায় আসতেন, স্কারলেট কখনও ধরতে পারেনি। কারন অন্য চোরাচালানকারীদের কখনওই উপকুল থেকে এত দূরে আসার দরকার পড়ত না। এঁরা নিজেদের মাল উইলমিংটন অথবা চার্লস্টনে এনে খালাস করত। দক্ষিনের সব বড় বড় ব্যবসায়ীরা এসে ভিড় জমাতেন। সেখানেই নিলামে সমস্ত মাল বিক্রি হয়ে যেত। ওকে দেখতেই উনি বার বার আসেন এই কথাটা মনে করতে পারলে ওর ভালই লাগত, কিন্তু ওর অসম্ভব আত্মগর্ব থাকা স্বত্বেও কথাটা মন থেকে বিশ্বাস করে উঠতে পারত না। যদি উনি ভুল করেও ওকে একবারও ভালবাসার কথা বলতেন, বা অন্য পুরুষদের সাথে ফষ্টিনষ্টি করতে দেখলে হিংসেয় জ্বলে যেতেন, কিংবা যদি ওর হাত কখনও ধরবার চেষ্টা করতেন বা ওর একটা রুমাল বা ছবি স্মৃতি হিসেবে ওর কাছ থেকে চেয়ে নিতেন, তাহলে ও বুঝতে পারত যে উনি ওর প্রেমে পড়েছেন। শুধু যে ওঁর ব্যবহারই অপ্রেমিকসুলভ ছিল তাই নয়, ওঁকে অপদস্থ করবার ওর সমস্ত প্রচেষ্টাও উনি হাতে নাতে ধরে ফেলতেন। 



উনি শহরে এলেই মহিলামহলে একটা চাঞ্চল্য সৃষ্টি হত। সেটা কেবল ওঁর রঙিন পুরুষালী আবেদনের জন্য নয়, বরং ওঁর সম্বন্ধে বাজারে ছড়িয়ে থাকা নানারকম নিষিদ্ধ মুখরোচক গুজবের কারনে। উনি এতটাই বদনাম ছিলেন! বয়স্ক মহিলারা ওঁর সম্বন্ধে আলোচনা করে ওঁকে আরও বেশি বদনামি করে তুলেছিলেন, ফলে স্বল্পবয়সি মেয়ে মহলে ওঁর আকর্ষণ উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছিল। এদের বেশির ভাগই খুব সরল মনে বিশ্বাস করত যে ভদ্রলোকের ‘মহিলাদের প্রতি এক বিশেষ দূর্বলতা আছে’। কিন্তু ‘মহিলাদের প্রতি বিশেষ দূর্বলতা’ বলতে ঠিক কি বোঝায়, সে নিয়ে ওদের কোন স্পষ্ট আন্দাজ ছিল না। ওরা এও শুনেছিল যে কোন মেয়েই ওঁর কাছে নিরাপদ নয়। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হল, এই রকম বদনাম থাকা সত্বেও, অ্যাটলান্টায় আসা ইস্তক, উনি কখনও কোন অবিবাহিত মহিলার হস্তস্পর্শ করে চুম্বনও করেন নি। তার ফলে উনি ওদের কাছে আরও বেশি রহস্যময় আর আকর্ষক বলে প্রতীত হলেন। 



বীর সৈনিকদের কথা বাদ দিলে, অ্যাটলান্টায় উনি হলেন সবথেকে চর্চিত ব্যক্তিত্ব। সবাই বেশ বিস্তারিত ভাবেই জানত যে ওঁকে ওয়েস্ট পয়েন্ট থেকে মাতলামি আর ‘মহিলাদের সঙ্গে বিশেষ কোন দুষ্কর্মের’ জন্য বহিষ্কার করা হয়েছিল। চার্লস্টনের সেই মেয়েকে বদনাম করা আর তার ভাইকে মেরে ফেলার কলঙ্কজনক ঘটনাটাও এখন সবার মুখে মুখে। চার্লস্টনের সাথে চিঠিপত্র চালাচালিতে সবাই জানতে পেরেছিল যে মাত্র কুড়ি বছর বয়সে ওঁর বাবা – যিনি একজন অত্যন্ত দৃঢ়চেতা এবং সর্বজনপ্রিয় ভদ্রলোক ছিলেন – একেবারে কপর্দকশুন্য অবস্থায় ওঁকে ঘর থেকে বের করে দিয়েছিলেন। এমনকি পারিবারিক বাইবেল থেকেও ওঁর নাম কেটে দিয়েছিলেন। উনি ১৮৪৯ সালের স্বর্ণ-শিকারীদের দলে ভিড়ে ঘুরতে গুরতে ক্যালিফোর্নিয়াতে চলে যান। তারপর সেখান থেকে দক্ষিণ আমেরিকা আর কিউবায় যান। সেই সময়ে ওঁর যেসব কীর্তিকলাপের কথা শোনা যায় সেগুলোও মোটেই সুস্বাদু নয়। নারীঘটিত ব্যাপারে ঝগড়ায় জড়িয়ে পড়া, কথায় কথায় গুলি চালিয়ে দেওয়া, মধ্য আমেরিকার সন্ত্রাসবাদিদের অস্ত্রশত্রের যোগান দেওয়া, আর সব থেকে খারাপ যেটা অ্যাটলান্টার লোকেরা জানতে পেরেছিল, সেটা হল পেশাদারী জুয়া খেলা – এই ছিল ওঁর ক্রিয়াকলাপ। 



জর্জিয়ায় জুয়া খেলে অনেকেই সর্বশান্ত হয়েছে – টাকা কড়ি, জমি-বাড়ি, ক্রীতদাস সব হারিয়েছে। কিন্তু সেটা অন্য ব্যাপার। একজন মানুষ জুয়া খেলে সর্বশান্ত হলেও ভদ্রলোক থাকতে পারেন। কিন্তু একজন পেশাদার জুয়াড়ি সমাজে থাকার যোগ্যই নয়। 



যুদ্ধের জন্য মানুষের জীবন যদি বিপর্যস্ত না হত, কিংবা ওঁর ক্রিয়াকলাপে কনফেডারেট সরকারের কোন সাহায্য না হত, তবে রেট বাটলারকে অ্যাটলান্টার লোকেরা মোটেই স্বাগত জানাত না। কিন্তু এখন অত্যন্ত সঙ্কীর্ণ্মনা লোকও মনে করছে দেশাত্মবোধের জন্য কিছুটা উদার দৃষ্টিভঙ্গি রাখা দরকার। যাঁরা একটু আবেগপ্রবণ তাঁরা ভাবছেন রেট বাটলার অতীতের কূকীর্তির জন্য অনুশোচনা করে এখন পাপস্খালন করার জন্য সচেষ্ট হয়েছেন। তাই মহিলারা ওঁকে খানিকটা ছাড় দেওয়াটা নিজেদের কর্তব্য বলেই মনে করছেন। কারন ওঁর মত সাহসী চোরাচালানকারীদের ইয়াঙ্কিদের নজর এড়িয়ে জিনিষপত্র বোঝাই জাহাজ নিয়ে আসার ওপর কনফেডারেসির এবং যুদ্ধক্ষেত্রে সৈনিকদের ভাগ্য নির্ভর করছে। 



কানাঘূষোর মাধ্যমে সবাই জানতে পেরেছে যে ক্যাপটেন বাটলার সব থেকে দুঃসাহসী চোরাচালানকারী – ভয়ডর বলে কিছুই নেই। চার্লস্টনে বেড়ে ওঠার সুবাদে ক্যারোলাইনা উপকুলবর্তি বন্দরের ঘাঁতঘোত সমস্তই ওঁর নখদর্পণে। এছাড়া উইলমিংটনের সাগর সম্বন্ধেও ওঁর ধারণা খুব স্পষ্ট। এখন অবধি ওঁর কোন জাহাজই ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি, কিংবা কোন মাল বাজেয়াপ্তও হয়নি। যুদ্ধের প্রাক্কালে অজ্ঞাতপরিচয় রেট বাটলারের কাছে কেবল একটা ছোট জাহাজ কেনবার সামর্থ্য ছিল। চোরাইচালানের প্রতিটা মালে শতকরা দুহাজার টাকা মুনাফা করে এখন তিনি চারটে জাহাজ কিনে ফেলেছেন। মোটা মাইনে দিয়ে তিনি তাঁর জাহাজে দক্ষ চালক নিয়োগ করেছেন। এঁরা রাতের অন্ধকারে সকলের অগোচরে নাসাউ, ইংল্যান্ড আর কানাডার জন্য জাহাজে তুলো নিয়ে বেরিয়ে যান। ইংল্যান্ডের তুলোর মিলগুলো তুলোর অভাবে ধুঁকছে, যার ফলে শ্রমিকরা কাজ পাচ্ছে না। তাই কোন চোরাচালানকারীরা ইয়াঙ্কিদের বোকা বানিয়ে তুলো নিয়ে যেতে পারে, তাহলে লিভারপুলে সেই তুলো চড়াদামে বিক্রি হয়ে যায়। কনফেডারেসির জন্য তুলো নিয়ে যাবার ব্যাপারে, আবার দক্ষিণের জন্য যুদ্ধের প্রয়োজনীয় সামগ্রী নিয়ে আসার ব্যাপারে রেটের জাহাজগুলো খুবই করিৎকর্মা। তাই এই রকম সাহসী মানুষের জন্য মহিলারা মনে করতেন অনেক কিছুই মুখ বুজে মেনে নেওয়া উচিত। 



সকলে তাঁকে একজন উদ্যোগী মানুষ বলে মনে করত আর তাঁর ওপরে নির্ভরশীল ছিল। টাকাপয়সার ব্যাপারে উনি খুব মুক্তহস্ত ছিলে। একটা কালো ঘোড়ায় চেপে যাতায়াত করতেন আর কেতাদুরস্ত পোশাক পরতেন। কারও মনযোগ আকর্ষণের জন্য এই শেষের ব্যাপারটাই যথেষ্ট ছিল, কারন সৈন্যরা যে সব ইউনিফর্ম পরত, সেগুলো ছিল অত্যন্ত নিম্নমানের আর নোংরা। এমনকি বেসামরিক মানুষদের সব থেকে ভাল পোশাকেও তালি কিংবা রিফু করার চিহ্ন থাকত। স্কারলেটের মনে হত আর কাউকেই ও এত রূচিশীল আর দামী প্যান্ট পরতে দেখেনি। আর যে সমস্ত কোট উনি পরতেন সেগুলোর মত সুন্দর কোট ও আর দেখেনি- বিশেষ করে সাদা সিল্কের ওপরে ছোট ছোট গোলাপকুঁড়ির এম্ব্রয়ডারি করা কোটটা। কিন্তু এমন একটা তাচ্ছিল্যের ভাব করতেন মনে হত এইসব পোশাকের শিল্পকর্ম সম্বন্ধে উনি যেন উদাসীন। 



উনি চাইলে যে কোন মহিলাকে পটিয়ে ফেলতে পারতেন। শেষ পর্যন্ত, এমনকি মিসেজ় মেরিওয়েদারও ওঁর সৌজন্যে মুগ্ধ হয়ে এক রবিবার ওঁকে ডিনারে আমন্ত্রণ জানালেন। 



মেবেল মেরিওয়েদারের সাথে ওর সেই ছোট জ়ুয়েভের বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে – সাময়িক ছুটি নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফেরার অপেক্ষা। মেবেলের খুব ইচ্ছে সাদা সাটিনের পোশাকে কনে সেজে বিয়ে করার। কিন্তু দুঃখের বিষয় হল কনফেডারেসিতে সাদা সাটিন পাওয়াই যায় না। কারও কাছ থেকে ধার করে পরবে, তারও উপায় নেই। গত বছরের সাদা সাটিনের বিয়ের পোশাকগুলো কেটে লড়াইয়ের পতাকা বানাবার জন্য ব্যবহার করা হয়ে গেছে। মিসেজ় মেরিওয়েদারও ওর মধ্যে দেশাত্মবোধক চেতনা জাগিয়ে তুলে বলেছেন যে এখন কনফেডারেসির ঘরে বোনা সাধারণ পোশাকই হল কনের উপযুক্ত পোশাক। কিন্তু ওঁর সে চেষ্টা ফলপ্রসূ হয়নি। মেবেলের সাটিনই চাই। যুদ্ধের প্রয়োজনে ও গর্বের সঙ্গে চুলের কাঁটা, বোতাম, এমনকি সুন্দর জুতো, ক্যান্ডি আর চা বর্জন করতেও রাজী আছে। কিন্তু বিয়ের জন্য ওর সাটিনের পোশাক চাইই চাই। 



মেলানির কাছ থেকে রেট জানতে পেরে, ইংল্যান্ড থেকে প্রচুর পরিমানে ঝকঝকে সাদা সাদা সাটিনের কাপড় আর লেসের শিরাবরণ মেবেলকে বিবাহের উপহার হিসেবে এনে দিয়েছেন। ব্যাপারটা উনি এত সুক্ষ্মভাবে করেছেন যে কেউ ওঁকে এর দাম দেবার কথা মুখ ফুটে বলতে পারেনি। মেবেল ওটা পেয়ে আনন্দের চোটে ও ওঁকে প্রায় চুমু খেয়ে ফেলেছিল। মিসেজ় মেরিওয়েদারের বিবেক বলছিল যে এই ধরনের দামী উপহার – বিশেষ করে সে উপহার যদি পোশাক সংক্রান্ত হয় – সেটা গ্রহণ করা অনুচিত। কিন্তু রেট যখন ওঁকে অত্যন্ত আলঙ্কারিকভাবে বললেন যে একজন সাহসী সেনার কনেকে বিবাহের উপযুক্ত পোশাকে সাজিয়ে দেবার মত মহৎ কাজ আর কিছুই হতে পারে না, তখন উনি সেই উপহার অস্বীকার করার কোন রাস্তাই খুঁজে পেলেন না। তাই মিসেজ় মেরিওয়েদার রেট বাটলারকে ডিনারে নিমন্ত্রণ করলেন। ভাবলেন এটুকু ত্যাগ স্বীকার করলে, রেটের এই উপহারের দাম ভাল মতই মিটিয়ে দেওয়া হবে। 



উনি শুধু পোশাকের কাপড় দিয়েই ক্ষান্ত থাকলেন না। সেটা দিয়ে কিভাবে সুন্দর পোশাক তৈরি করা যেতে পারে, তার জন্যেও চমৎকার পরামর্শ দিলেন। উনি প্যারিসে দেখে এসেছেন,এ বছর নাকি স্কার্টের তলার বেষ্টনী আরও চওড়া হয়ে গেছে। সেগুলো আজকাল নাকি নীচে লাট হয়ে থাকে না, বরং দু’ভাগে ভাগ করে ওপরে তোলা থাকে যাতে পাতা কাঁটা পেটিকোট দেখা যেতে পারে। উনি আরও বললেন যে প্যারিসের রাস্তায় উনি সালোয়ার বিক্রি হতে দেখেন নি – তার মানে হচ্ছে সেটার বোধহয় আর চল নেই আজকাল। মিসেজ় মেরিওয়েদার পরে মিসেজ় এলসিংকে বলেছিলেন, ওঁর ভয় হচ্ছিল উনি যদি রেট বাটলারকে উৎসাহিত করতেন তাহলে উনি হয়ত প্যারিসের মহিলারা কি ধরনের প্যান্টি পরে থাকে সেটাও বলে দিতেন। 



যেভাবে উনি মেয়েদের পোশাক-আশাকের নিখুঁত বর্ণনা দিতে পারতেন – যদি ওঁর মধ্যে পুরুষালী ভাবটা কিছু কম প্রবল হত, তাহলে মহিলারা ওঁকে নিশ্চিত মেয়েলি স্বভাবের বলে বদনাম করত। মেয়েরা ওঁর কাছে ফ্যাশন আর স্টাইল নিয়ে প্রশ্ন করতে খানিকটা অস্বস্তি পেলেও, শেষমেশ করেই ফেলত। আসলে ওরা ফ্যাশনের দুনিয়া থেকে একদম বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। ফ্যাশনের ম্যাগাজ়িনগুলোও অবরোধের মধ্যে দিয়ে আসতে পারত না। আজকাল ফ্রান্সের মেয়েরা কোন ফ্যাশনের পোশাক পরে সেটা এদের জানাই ছিল না। তাই ওদের রেটের স্মৃতির ওপর নির্ভর করতে হত – যেটা হয়ে দাঁড়িয়েছিল ‘গডি’র ‘লেডিজ় বুকের’ বিকল্প। ওঁর মেয়েদের পোশাক পর্যবেক্ষণ করবার ক্ষমতা কোন মহিলার থেকে কম ছিল না। তাই উনি আসলেই মেয়েরা ওঁকে ঘিরে ধরে ফ্রান্সের সর্বশেষ ফ্যাশনের ব্যাপারে সমৃদ্ধ হত। 



যদিও ওঁর সম্বন্ধে একটা হালকা গুজব ছড়াতে শুরু করেছিল যে উনি শুধু চোরাচালানের মধ্যেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেন নি, বরং খাদ্যবস্তু নিয়েও উনি ফাটকা খেলায় মেতেছিলেন, তবুও বেশ কয়েকমাস ধরে উনি জনপ্রিয়তার একদম শীর্ষে ছিলেন। যাঁরা ওঁকে পছন্দ করতেন না, তাঁরা বলতেন ওঁর প্রতিবার অ্যাটলান্টায় আসার ফলে জিনিষপত্রের দাম পাঁচ ডলার করে লাফিয়ে বেড়ে যেত। এই কানাঘুষো সত্বেও, ওঁর যদি মনে হত যে জনপ্রিয়তা বজায় রাখা প্রয়োজন, তাহলে উনি সেই জনপ্রিয়তা ঠিক বজায় রাখতে পারতেন। তবে ওঁর মধ্যে এক অদ্ভুত স্বেচ্ছাচার কাজ করত। যে সব গম্ভীরপ্রকৃতির দেশপ্রেমিকরা ওঁকে দায়ে পড়ে সম্মান জানাতে বাধ্য হতেন, তাঁএরই মুখের ওপর উনি সরাসরি বলে দেন যে ওঁর সৌজন্যবোধ নেহাতই একটা মুখোশ আর এই মুখোশ পরে থাকতে আজকাল আর একটুও উৎসাহ বোধ করেন না। 



মনে হত যেন দক্ষিণের মানুষজন আর আচার ব্যবহার সব কিছুতেই ওঁর একটা নৈর্ব্যক্তিক অবজ্ঞার ভাব রয়েছে। বিশেষ করে কনফেডারেসির ব্যাপারে। এই মনোভাব উনি মোটেই লুকনোর চেষ্টা করতেন না। এই কনফেডারেসি সম্বন্ধেই ওঁর এক মন্তব্য অ্যাটলান্টার লোককে প্রথমে চমকে দিল। প্রথমে সবাই ওঁকে নিস্পৃহতা দেখাতে শুরু করল, তারপর রীতিমত ক্ষোভে ফেটে পড়ল। ১৮৬২ শেষ হয়ে ১৮৬৩ শুরু হওয়ার আগেই পুরুষমানুষেরা ওঁকে উদাসীনভাবে অভিবাদন জানাতে শুরু করল। মহিলারা কোন অনুষ্ঠানে ওঁকে দেখলেই মেয়েদের নিজেদের বগলদাবা করে ফেলতেন। 



শুধু যে উনি অ্যাটলান্টার মানুষদের আন্তরিক কিন্তু উগ্র আনুগত্যকে ব্যাঙ্গ করে আনন্দ পেতেন তাই নয়, নিজেকেও তিনি সকলের কাছে অত্যন্ত ঔদ্ধত্যের সঙ্গে পেশ করতেন। শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষেরা যখন ওঁর সাহসের প্রশংসা করত তখন উনি নির্দ্বিধায় বলতেন যুদ্ধরত বীর সৈনিকদের মত তিনিও যথেষ্ট ভীতু। সবাই ভাল করেই জানত যে কনফেডারেট সৈন্যরা কেউই ভীতু নয়, আর তাই এ কথা বলাতে সকলেই খুব বিরক্ত হত। বলার সময় উনি সর্বদাই বলতেন ‘আমাদের সাহসী ছেলেরা’ কিংবা ‘ধূসর ইউনিফর্মে আমাদের বীর সৈনিকেরা’। কিন্তু বলার ধরনটা ছিল খুবই অপমানজনক। কম বয়সী কিছু বেপরোয়া মেয়ে যখন ওঁর কাছ থেকে একটু খোশামোদ আশা করে বলত যে উনি বীরের মত ওদের জন্য লড়াই করছেন, তখন উনি অবলীলাক্রমে বলতেন যে একই কাজ উনি ইয়াঙ্কি মেয়েদের জন্যও করতে রাজী আছেন যদি সেটা করলে তাঁর একই রকম অর্থ উপার্জনের সুবিধে হয়। 



মেলার সন্ধ্যেয় স্কারলেটের সঙ্গে দেখা হওয়ার পর উনি এই ভাবেই কথা বলেছিলেন। এখন এই ধরনের লঘু ব্যাঙ্গ উনি সবার সাথেই করে থাকেন। কনফেডারেসির জন্য ওঁর কাজের প্রশংসা করলেই উনি সোজাসুজি মুখের ওপর বলে দেন যে অবরোধের মধ্য দিয়ে চোরাচালান ওঁর কাছে নিছকই ব্যবসা। যদি সরকারি ঠিকাদারী করে উনি এত টাকা উপার্জন করতে পারতেন, তাহলে উনি তাই করতেন। কনফেডারেসির কাছে নকল কাপড়, বালি মেশানো চিনি আর বাজে চামড়ার জিনিষ বেচবার জন্য কে তাহলে এই চোরাচালানের কারবার করার ঝুঁকি নিত! 



ওঁর বেশিরভাগ কথারই কোন জবাব হত না। সেই জন্যই সকলে আরও রেগে যেত। ইতিমধ্যে সরকারি ঠিকাদারদের সম্বন্ধে দু’চারটে বদনামের কথা বাতাসে ভাসতে শুরু করেছে। রণাঙ্গন থেকে কয়েকজন চিঠি লিখে প্রায়ই অভিযোগ জানাচ্ছে যে জুতোগুলো একসপ্তাহও টেঁকে না, বারুদে আগুন লাগতেই চায় না, ঘোড়ার লাগাম একটু গাঁয়ের জোর লাগালেই ছিঁড়ে যায়, মাংস পচা বেরোচ্ছে আর ময়দায় পোকা ভর্তি। অ্যাটলান্টার লোকেরা ভাবতে চেষ্টা করল যেসব ঠিকাদাররা সরকারের কাছে এইসব জিনিষ বিক্রি করেছে তারা নিশ্চয়ই অ্যালাবামা কিংবা ভার্জিনিয়ার লোক হবে, জর্জিয়ার লোক হতেই পারেনা। জর্জিয়ার ঠিকাদারদের সবাইকেই তো সম্মানিত পরিবারগুলি থেকে বেছে নেওয়া হয়েছে, তাই না? আর এঁরাই তো প্রথম হাসপাতালের জন্য মুক্তহস্তে অর্থসাহায্য করেন, এমনকি সৈন্যদের অনাথ পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্ব নেন, তাই নয় কি?। এঁরাই “ডিক্সি” গান শুনলেই উৎসাহে ফেটে পড়েন। ইয়াঙ্কিদের পরাস্ত করার ব্যাপারেও এঁদের উৎসাহ সবার থেকে বেশি – অন্তত জ্বালাময়ী বক্তৃতা দেওয়ার ব্যাপারে এঁদের জুড়ি নেই। তাই প্রথম প্রথম লোকেরা এই সব অভিযোগকে ততটা গুরুত্ব দিল না। রেট বাটলারের কথাগুলোকেও একজন অশিক্ষিত লোকের মস্তানিমার্কা কথাবার্তা বলে উড়িয়ে দিল। 



শুধু ওপরতলার লোকদের ঘুষ খাবার ব্যাপারে ঠেস দিয়ে আর এঁদের বীরত্বের ব্যাপারে সন্দেহ প্রকাশ করেই উনি শহরের মানুষজনকে অপমানের একশেষ করলেন না, উপরন্তু মাঝে মাঝেই এই সব বড় মানুষদের হাতে নাতে ধরিয়ে দিয়ে নাস্তানাবুদ করে বেশ আত্মপ্রসাদ লাভ করতেন। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা পিন ফুটিয়ে বেলুন চুপসে দিয়ে যেরকম আনন্দ পায়, উনিও সেই রকম এঁদের অহমিকা ভঙ্গ করে, ভণ্ডামি ফাঁস করে আর লোক দেখানো দেশপ্রেমকে ব্যঙ্গ করে আনন্দ পেতেন। এত সুক্ষ্ম সৌজন্যের সাথে উনি গোঁড়া আর অহংকারী লোকদের দেমাক চূর্ণ করে ফেলতেন যে ওঁরা প্রথমে চালটা ধরতেই পারতেন না। তারপর ওঁদের কীর্তিকলাপ যখন হাতেনাতে ধরা পড়ে যেত তখন ওঁরা অপ্রস্তুত্তের একশেষ হতেন। 



শহরের সবাই যখন ওঁকে ভালভাবেই গ্রহণ করে নিয়েছিল, তখনও স্কারলেটের মনে ওঁর অভিপ্রায় নিয়ে কোন বিভ্রান্তি ছিল না। ও ভাল করেই জানত যে ওঁর সমস্ত সৌজন্য আর মন কাড়া কথাবার্তার আড়ালে রয়েছে সুচতুর ব্যঙ্গ। এই যে উনি একজন দেশাত্মবোধে উদ্বুদ্ধ একজন সাহসী চোরাচালানকারী হিসেবে নিজেকে তুলে ধরতে চাইছেন সেটার একমাত্র কারন হল এতে উনি আমোদিত বোধ করতেন। মাঝে মাঝে ওর মনে হত উনি যেন সেই সব কাউন্টির ছেলেদের মত যাদের সঙ্গে ও বড় হয়ে উঠেছিল। টার্লটন যমজ ভাইদের মত, যারা কেবল মজা করবার জন্য যে কোন রকম দুষ্কর্ম করতে পারে। কিংবা বদরাগী ফোনটেনদের মত যারা পান থেকে চুন খসলেই খুনোখুনি করতে পারে। অথবা ক্যাল্ভার্টদের মত যারা সারা রাত জেগে ধাপ্পাবাজীর ছক কষতে পারে। তবে একটা তফাৎ আছে। রেটের আপাত নিরুত্তাপ চালচলনের পেছনে কোথাও একটা ক্রুর নষ্টামির অভিসন্ধি কাজ করতে থাকে। 



ওঁর এই কপটতার ব্যাপারে ভালমত অবহিত থাকা সত্বেও স্কারলেট ভদ্রলোককে একজন কল্পনাবিলাসী চোরাচালানকারীর ভূমিকায় দেখতে পছন্দ করত। প্রথমত, তাহলে ওঁর সঙ্গে মেলামেশা করা সহজ হয়ে যেত, যেটা প্রথম আলাপের খানিকটা অসুবিধেই ছিল। তাই উনি যখন ইচ্ছাকৃত ভাবে নিজের ভালমানুষির মুখোশ খুলে ফেলে অ্যাটলান্টার জনগনকে চটিয়ে দিতেন তখন ও বেশ বিরক্তই হত। কারন ব্যাপারটা ওর কাছে খুব বোকা বোকা লাগত। আর ওঁকে যে কঠোর সমালোচনার মুখে পড়তে হত তার আঁচ খানিকটা ওর ওপরও এসে পড়ত। 



আরোগ্যাধীন সৈন্যদের জন্য মিসেজ় এলসিং যে রূপালী সঙ্গীতসন্ধ্যার আয়োজন করেছিলেন, সেখানে রেট বাটলার নিজের সামাজিক উৎখাতের পথ নিশ্চিতভাবে করে ফেললেন। সেদিন বিকেলে যে সমস্ত সৈন্য ছুটিতে বাড়ি এসেছিল, হাসপাতালে যারা ভর্তি ছিল, হোম গার্ড আর স্থানীয় সেনাবাহিনীর লোকেরা, বিবাহিত মহিলা, বিধবা মহিলা আর অল্পবয়সী মেয়েরা সবাই এসেছিল মিসেজ় এলসিং-এর বাড়িতে। একটা চেয়ারও খালি ছিল না, এমনকি, ঘোরানো লম্বা সিঁড়িও অতিথি সমাগমে থিকথিক করছিল। এলসিং-এর খানসামা যে বড় কাঁচের বাটি নিয়ে দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল, তাতে এত পরিমানে রুপোর মুদ্রা জমা পড়ছিল যে সেটা দুবার খালি করতে হয়েছিল। বলা যেতে পারে আয়োজনটা যথেষ্ট সাফল্যমণ্ডিত হয়েছিল, কারন এখনকার হিসেবে রৌপ্যমুদ্রায় এক ডলারের দাম কনফেডারেটের কাগজে ষাট ডলারের সমান। 



যেসব মেয়েদের সামান্যতম দখলও ছিল, তারাও সে সন্ধ্যায় গান গেয়ে, পিয়ানো বাজিয়ে দর্শকদের মনোরঞ্জন করে অনেক হাততালি কুড়োতে সক্ষম হল। স্কারলেটও নিজের পারফর্ম্যান্সে খুশী হল। শুধু যে ও আর মেলানি মিলে হৃদয়বিদারক যৌথ সঙ্গীত “কুঁড়ির ওপর শিশিরের ছোঁয়া” পরিবেশন করল, আর তারপরে আরও প্রাণবন্ত “হে অতিথি, স্টিফেনের দোষ নিও না” এবং অনেক প্রশংসা পেল তাই নয়, ওকে শেষ ট্যাবলো ‘কনফেডারেসির অন্তরাত্মা’র প্রতিনিধিত্ব করতে বলা হল। 



সাদা রঙের শালীন গ্রীক পোশাকে – লাল আর নীলের বেষ্টনী দিয়ে ঘেরা – তারা খচিত পতাকার দণ্ড এক হাতে নিয়ে, অন্য হাতে চার্লস আর ওর বাবার সোনার হাতল দেওয়া তরবারি ধরে, হাঁটু গেঁড়ে বসে থাকা অ্যালাবামার ক্যাপ্টেন ক্যারি আশবার্নের দিকে প্রসারিত করে – ওকে অত্যন্ত আকর্ষক লাগছিল।    



ট্যাবলো শেষ হয়ে যাবার পরে রেটের অভিব্যাক্তি জানবার জন্য ওঁর দিকে তাকানোর লোভ সামলাতে পারল না। খুব হতাশ হয়ে দেখল উনি কারও সঙ্গে কিছু একটা তর্ক-বিতর্কে এমন জড়িয়ে পড়েছেন যে ওর দিকে নজর দেবারই সময় পান নি। আশেপাশের লোকদের দেখে স্কারলেট বুঝতে পারল যে উনি এমন কিছু একটা বলেছেন যাতে সবাই বেশ ক্রুদ্ধ হয়েছেন। 



ও তাড়াতাড়ি ওঁদের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে আচমকা নেমে আসা এক অস্বাভাবিক নীরবতার মধ্যে শানীয় সেনাবাহিনীর উইলি গুইনান কে বলতে শুনল, “তাহলে স্যর আপনি বলতে চাইছেন যে আমাদের বীরেরা যে শপথ নিয়ে মৃত্যবরণ করছেন, সেটা পবিত্র নয়?” 



“মনে করুন কেউ যদি রেলগাড়িতে চাপা পড়ে মারা যায়, তাহলে কি রেলসংস্থা শুদ্ধ হয়ে যায়?” খুব বিনয়ের সঙ্গে যেন রেট বাটলার জানতে চাইলেন। 



“স্যর,” উইলির গলা উত্তেজনায় কাঁপছে, “যদি আমরা আজ এই ছাদের তলায় না থাকতাম ___” 



“তাহলে কি হবে ভেবে আমি কেঁপে উঠছি,” রেট বললেন, “কারন আপনার বীরত্ব কতখানি সেটা সকলেরই জানা আছে।” 



উইলি অপমানে লাল হয়ে উঠল। কথাবার্তা সেখানেই বন্ধ হয়ে গেল। একটা অস্বস্তি সবাইকে গ্রাস করে ফেলল। উইলি যথেষ্ট শক্তিশালী, যুদ্ধে যাবার উপযুক্ত বয়স, কিন্তু তবু সে লড়াইয়ের ময়দানে যায়নি। অবশয়ই সে তার মায়ের একমাত্র ছেলে, আর কাউকে না কাউকে রাষ্ট্রকে রক্ষা করার জন্য স্থানীয় সেনাবাহিনীতে থাকতেই হয়। কিন্তু আরোগ্যকামী কিছু সৈন্য রেট বাটলারের মুখে বীরত্বের কথা শুনে মুখ টিপে বেসুরোভাবে হাসল। 



“কেন যে উনি চুপ করে থাকতে পারেন না!” স্কারলেট বিরক্ত হয়ে ভাবল। “ওঁর জন্য পুরো পার্টিটা নষ্ট হয়ে যেতে বসেছে।” 



ডঃ মীডের চোখমুখ থমথমে। 



“কোন কিছুই হয়ত তোমার কাছে পবিত্র নয়, যুবক,” ভাষণ দেবার ভঙ্গীতে উনি বলে উঠলেন। “কিন্তু দক্ষিণের পুরুষ এবং মহিলার কাছে এমন অনেক ব্যাপারই আছে যেটাকে তাঁরা পবিত্র বলে মনে করেন। দখলকারীর হাত থেকে দেশকে রক্ষা করা তার মধ্যে অন্যতম। রাষ্ট্রের অধিকার আর ___” 



বেশ অলস ভঙ্গীতে, খুব মসৃণ কিন্তু নিরুত্তাপ কণ্ঠে রেট বললেন, “পবিত্র তো সব যুদ্ধই। বিশেষ করে যাঁদের লড়াই করতে হয়। আর যাঁরা যুদ্ধটা বাধালেন, তারা যদি এটাকে পবিত্র করে তুলে ধরতে না পারেন, তা হলে কে এমন আহম্মক আছে যে লড়াই করতে যাবে? কিন্তু যতই এই সব বাগ্মী জননেতারা এই সব মূর্খ লোকদের লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়বার জন্য আহ্বান জানান, যতই তাঁরা লড়াইয়ের প্রয়োজন নিয়ে নানারকম মহান উদ্দেশ্য আরোপ করার চেষ্টা করে যান, তবুও একটাই মাত্র কারন যে কোন যুদ্ধের। আর সেটা হল টাকা। সব যুদ্ধই আসলে হল টাকা-কড়ির ভাগ বাঁটোয়ারা নিয়ে ঝামেলা। কিন্তু ক’জন সেটা বুঝতে পারে? বিউগল আর ড্রামের আওয়াজ আর লড়াই থেকে নিরাপদ দূরত্বে থাকা নেতাদের জ্বালাময়ী ভাষণ এদের মাতিয়ে রেখেছে। কখনও ‘যীশু খৃষ্টের সমাধি ধর্মহীনদের হাত থেকে রক্ষা’ করার আহ্বান, তো কখনও বাঁ ‘পোপ প্রথা উচ্ছেদের’ ডাক, কখনও ‘স্বাধীনতা’র আহ্বান, আবার কখনও ‘তুলো, ক্রীতদাসপ্রথা আর রাষ্ট্রের অধিকার’ নিয়ে লড়াই করার ডাক! 



“এর মধ্যে পোপ আবার কোথা থেকে এলেন?” স্কারলেট মনে মনে ভাবল। “যীশু খ্রীষ্টের সমাধির সঙ্গেই বা কি সম্পর্ক?” 



স্কারলেট তাড়াতাড়ি ক্রুদ্ধ জটলার দিকে এগিয়ে গেল। কিন্তু ততক্ষণে রেট বাটলার হাল্কাভাবে ‘বাও’ ভিড়ের ভেতর দিয়ে করে দরজার দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। স্কারলেটও ওঁকে ধরবার জন্য এগিয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু মিসেজ় এলসিং ওর স্কার্ট টেনে ধরে বাধা দিলেন। 



“ওঁকে যেতে দাও।“ টানটান উত্তেজনায় নিস্তব্ধ ঘরে ওঁর গলার স্বর স্পষ্ট শোনা গেল। “ যেতে দাও ওঁকে। উনি একজন বিশ্বাসঘাতক, গুপ্তচর! একজন কালসাপ কে আমরা এতদিন দুধকলা দিয়ে পুষছিলাম।” 



হাতে টুপি নিয়ে হলে দাঁড়িয়ে থেকে রেট পুরো কথাটাই শুনতে পেলেন – মিসেজ় এলসিং যেটা চেয়েছিলেন। একবার ঘুরে দাঁড়িয়ে এক মুহুর্ত সবার দিকে তাকালেন। তারপর মিসেজ় এলসিং-এর সমতল বক্ষের দিকে দৃষ্টিনিক্ষেপ করে মৃদু হেসে ‘বাও’ করে বেরিয়ে গেলেন। 



মিসেজ় মেরিওয়েদার আন্ট পিটির গাড়িতে বাড়ি ফিরলেন। চারজন মহিলা বসতে না বসতেই উনি ফেটে পড়লেন। 

“দেখলে তো পিটিপ্যাট হ্যামিল্টন! আশা করছি তুমি খুব খুশী হয়েছ!” 

“কি ব্যাপারে?” পিটি সভয়ে আর্তনাদ করলেন। 

“আর কি ব্যাপারে! ওই যে বজ্জাত বাটলারের আচরণে – যাকে তুমি মাথায় তুলে দিয়েছ।” 

অভিযোগ শুনে পিটিপ্যাট এত অধীর হয়ে গেলেন যে ওঁর মনে পড়ল না যে মিসেজ় মেরিওয়েদারও বেশ অনেকবারই রেট বাটলারকে নিমন্ত্রণ করেছেন। স্কারলেট আর মেলানির মনে পড়লেও গুরুজনদের প্রতি সম্মানবশত কথাটার উল্লেখ করল না। মাথা নিচু করে নিজের নিজের দস্তানাবৃত হাতের দিকে চেয়ে রইল। 

“ও শুধু আমাদেরই নয় কনফেডারেসিকে অপমান করেছে!” মিসেজ় মেরিওয়েদার বললেন। বলতে বলতে ওঁর স্ফীত বক্ষদেশ ঝকঝকে পোশাকের তলায় দ্রুত ওঠানামা করতে লাগল। “বলে কিনা আমরা টাকার জন্য যুদ্ধ করছি! বলে যে আমাদের নেতারা আমাদের কাছে মিথ্যে কথা বলেছেন! ওকে জেলে দেওয়া উচিত। হ্যা সেটাই হওয়া উচিত। আমি ডঃ মীডের সঙ্গে এই ব্যাপারে কথা বলব। মিসেজ় মেরিওয়েদার বেঁচে থাকলে ওকে উচিত শিক্ষা দিতে পারতেন! আমার কথা শুনে রাখ, পিটিপ্যাট হ্যামিলটন! ওই কুলাঙ্গারকে খবর্দার আর বাড়িতে ডাকবে না!” 

“ওহ!” খুবই অসহায় ভাবে পিটি অস্ফুটে বললেন। যেন এর থেকে ওঁর মরে গেলেই ভাল হত। মিনতিভরা চোখে উনি মেয়ে দু’জনের দিকে তাকালেন, কিন্তু ওদের চোখ নিচের দিকে। তারপর আঙ্কল পিটারের ঋজু পিঠের দিকে। উনি জানতেন পিটার সবকিছুই মন দিয়ে শুনেছে। আশা করছিলেন ও যেমন প্রায়ই করে থাকে, ঘাড় ঘুরিয়ে এই কথাবার্তায় যোগ দেবে। আশা করছিলেন যে পিটার বলবে, “মিস ডলি, আপনি মিস পিটিকে জ্বালাতন করবেন না!” , কিন্তু পিটার নীরবই থাকল। রেট বাটলারকে পিটার দুচক্ষে দেখতে পারত না, আর সেটা বেচারা পিটি ভালমতই জানতেন। তাই দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “ঠিক আছে ডলি, যদি তুমি মনে কর __” 

“আমি মনে করি,” মিসেজ় মেরিওয়েদার জবাব দিলেন। “কোন আক্কেলে তুমি ওকে বাড়িতে আসতে দাও, সেটা আমার মাথায় ঢোকে না। আজ যা হল, তারপর মনে হয় না কোন ভদ্রলোকের বাড়িতে ওকে আর স্বাগত জানানো হবে। একটু কড়া হাতে তোমার বাড়িতে ওর আসা যাওয়া বন্ধ কর।” 



এরপর দুই মেয়ের দিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকালেন, “আশা করি আমি কি বললাম সেটা তোমাদের কানে গেছে,” উনি বলে চললেন, “এটার জন্য খানিকটা তোমরাও কম দায়ী নও, কারন তোমরা ওকে খাতির করতে। বিনয়ের সাথে কিন্তু অত্যনত দৃঢ়ভাবে ওঁকে জানিয়ে দেবে যে ওঁর উপস্থিতি আর অননুগত কথাবার্তা তোমাদের কাছে কাম্য নয়।” 



স্কারলেট ততক্ষণে মনে মনে রাগে ফুঁসতে শুরু করেছে – লাগামে অনভ্যস্ত হাত পড়লে ঘোড়া যেমন রেগে যায় – কিন্তু কিছু বলার সাহস হল না। মিসেজ় মেরিওয়েদার আবার মায়ের কাছে চিঠি লিখে দিতে পারেন। 



“তুমি একটা বুড়ি মোষের থেকে বেশি কিছু নও,” স্কারলেট রাগে লাল হয়ে মনে মনে গালি দিল। “আমি তোমার আর তোমার ফোঁপরদালালি সম্বন্ধে কি ভাবি সেটা যদি বলতে দিতে পারতাম তাহলে মনের ঝাল মিটত।” 



মিসেজ় মেরিওয়েদার উত্তপ্ত স্বরে বলে যেতে লাগলেন, “আমাদের মহান উদ্দেশ্য নিয়ে এরকম অপমানকর কথা শোনবার জন্য আমাকে বেঁচে থাকতে হবে, আমি কখনও ভাবিনি। যে মনে করে আমাদের উদ্দেশ্য মহান নয়, বা পবিত্র নয় – তার –তার ফাঁসি হওয়া উচিত! ওই লোকটার সাথে কথা বলতে তোমাদের দুজনকে আর কোনদিনও যেন না দেখি। আরে – মেলি – তোমার কি হয়েছে?” 



মেলানি একেবারে সাদা হয়ে গেছে আর চোখ দুটো ঠিকরে বেরোচ্ছে। 



“আমি ওঁর সঙ্গে আবার কথা বলব,” মেলানি খুব আস্তে আস্তে বলল। “আমি ওঁর সঙ্গে কোন রূঢ় আচরণ করতে পারব না। আমাদের বাড়িতে আসতে মানাও করব না।” 



যেন ওঁকে কেউ জোরে ঘুষি মেরেছে – মিসেজ় মেরিওয়েদারের বুক থেকে সজোরে একটা নিঃশ্বাস বেরিয়ে এল। আন্ট পিটির থলথলে মুখটা হাঁ হয়ে গেল। আঙ্কল পিটার ঘুরে তাকাল। 



“এই কথাটা বলতে আমার সাহসে কেন কুলোল না!” স্কারলেট মনে মনে তারিফ না করে পারল না। একটু ঈর্ষাও হল। “ঐ ছোট্ট খরগোশের মত মেয়েটা বুড়ি মেরিওয়েদারের মুখের ওপর বলে দেবার স্পর্ধা দেখাল কি করে?” 



মেলানির হাত কাঁপছিল, কিন্তু তবুও ও তাড়াতাড়ি বলে চলল, যেন দেরি করলে ওর সাহস চলে যাবে। 



“উনি কি বলেছেন – তার জন্য আমি ওঁর প্রতি রূঢ়তা দেখাতে পারব না – হ্যা সবাইকে জানান দিয়ে এসব কথা বলা হয়ত ওঁর বুদ্ধিমানের মত কাজ হয়নি – কিন্তু উনি যা বলেছেন – অ্যাশলেও সেই একই কথা বলে। আর যিনি ঠিক আমার স্বামীর মত একই ধরনের চিন্তা করেন – তাঁকে আমি বাড়িতে আসতে মানা করতে পারিনা। তাহলে খুব অন্যায় হবে।” 

মিসেজ় মেরিওয়েদার যেন আবার তাঁর নিঃশ্বাস ফিরে পেলেন। ঝাঁজিয়ে বললেন, 

“মেলি হ্যামিলটন, এত বড় মিথ্যে কথা আমি সারা জীবনে কখনও শুনিনি। উইল্কসরা কেউ কখনও কাপুরুষ হয় না!” 

“আমি কখনও বলিনি যে অ্যাশলে কাপুরুষ,” মেলানির চোখমুখ উজ্জ্বল। “আমি শুধু বলেছি, ও ঠিক সেই কথাটাই মনে করে যেটা ক্যাপ্টেন বাটলার মনে করেন। তবে ওর বলার ধরন আলাদা। আর হ্যা, সেটা ও নাচগানের আসরে গিয়ে বলে বেড়ায় না। কিন্তু ও আমাকে এমন কথাই লিখেছে।” 



অপরাধী বিবেক নিয়ে স্কারলেট মনে করার চেষ্টা করতে লাগল অ্যাশলে চিঠিতে কি এমন লিখে থাকতে পারে যাতে মেলানি এই রকম কথা বলল। কিন্তু সেই সব চিঠির বক্তব্য স্কারলেট পড়ার পরই বেমালুম ভুলে মেরে দিয়েছে। ওর মনে হল মেলানির নিশ্চয়ই মাথা খারাপ হয়ে গেছে। 



“অ্যাশলে আমাকে লিখেছে যে আমাদের ইয়াঙ্কিদের সাথে যুদ্ধ করা উচিত নয়। বড় বড় নেতা আর বক্তারা আমাদের ভাল ভাল কথায় ভুলিয়ে আমাদের এই যুদ্ধে শামিল করে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন,” মেলি দ্রুতলয়ে বলে চলল। “ও আরও বলেছে এই যুদ্ধের ফলে আমাদের চরম বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতে হবে। বলেছে, এই যুদ্ধে গর্ব করার মত কিছু নেই, শুধুই নোংরামি আর স্বার্থের হানাহানি।” 

“আচ্ছা, ওই চিঠিটা!” স্কারলেট মনে মনে ভাবল। “তাহলে ও এটাই কি বলতে চেয়েছিল?” 

“আমি বিশ্বাসই করিনা,” মিসেজ় মেরিওয়েদার ঘোষণা করলেন। “তুমি ওর কথার ভুল ব্যাখ্যা করেছ।” 

“অ্যাশলেকে আমি কখনওই ভুল বুঝি না,” যদিও ওর ঠোঁট কাঁপছিল, তবুও ও শান্ত ভাবেই বলল। “ওকে আমি ঠিকই বুঝেছি। ঠিক ক্যাপটেন বাটলার যা বলতে চেয়েছেন, ও ঠিক তাই বলেছে, শুধু ও অত রূঢ়ভাবে বলেনি।” 

“তোমার লজ্জা হওয়া উচিত – তুমি অ্যাশলে উইল্কসের মত একজন ভদ্রলোকের সাথে ওই পাজী ক্যাপ্টেন বাটলারটার তুলনা করছ। তাহলে তুমিও মনে কর যে আমাদের এই মহৎ উদ্দেশ্য একেবারে বাজে কথা!” 

“আমি – আমি ঠিক জানি না আমি কি ভাবি,” মেলানি কিছুটা অনিশিত ভাবে শুরু করল। যে সাহসে ভর করে এতক্ষণ কথাগুলো বলছিল, মনে হয় সেই সাহসটা আর টিকিয়ে রাখতে পারছে না। “আমি – আমি আমাদের উদ্দেশ্যের জন্য প্রাণ দিতে পারি – যেমন অ্যাশলেও পারে। আমার মনে হয় – আমি মনে করি – যে এই চিন্তাভাবনার ব্যাপারটা ছেলেদের ওপরই ছেড়ে দেওয়া উচিত – ওরা আমাদের থেকে অনেক বেশি বুদ্ধিমান।” 

“এরকম কথা আমি জীবনেও শুনিনি,” মিসেজ় মেরিওয়েদার নাক সিঁটকে বললেন। “আরে আঙ্কল পীটার থামো, থামো – আমার বাড়ি ছেড়ে তুমি এগিয়ে যাচ্ছ!” 



আঙ্কল পীটার ওঁদের কথাবার্তা শুনতে শুনতে মগ্ন হয়ে গিয়ে মিসেজ় মেরিওয়েদারের ব্লক ছেড়ে এগিয়ে গিয়েছিল। আবার ঘোড়া ঘুরিয়ে পিছিয়ে এল। মিসেজ় মেরিওয়েদার গাড়ি থেকে নামলেন। ওঁর বনেটের রিবন ঝড়ে যেমন মাস্তুলে দুলুনি লাগে, সেরকম ভাবে দুলে উঠল। 



“তোমাকে অনুতাপ করতে হবে,” উনি বললেন। 



আঙ্কল পীটার চাবুক মেরে ঘোড়া এগিয়ে নিল। 

“শোন মেয়েরা তোমাদের লজ্জা পাওয়া উচিত – মিস পিটি অসুস্থ বোধ করছেন।” আঙ্কল পীটার ধমক লাগালেন। 

“আমি মোটেই অসুস্থ বোধ করছি না,” এর থেকে অনেক কম চাপে যেখানে অসুস্থ হয়ে পড়েন, আশ্চর্যজনক ভাবে আন্ট পিটির গলা খুব সপ্রতিভ শোনাল। “আমি জানি মেলি সোনা, তুমি আমার জন্য এই লড়াই করেছ। আমি খুবই খুশী হয়েছি। ডলির মুখে তুমি ঝামা ঘষে দিয়েছ – যেটা খুব শক্ত কাজ। সারাক্ষণ ফোঁপরদালালি করবে। এত সাহস তুমি পেলে কি করে? অ্যাশলে সম্বন্ধে যা বললে সেটা ঠিক নয়, তাই না?” 

“কিন্তু ওটা সত্যি,” বলেই মেলানি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল। “আর ও এরকম ভাবে বলে আমার একটুও লজ্জা নেই। ও মনে করে এই যুদ্ধটা পুরোপুরি অন্যায় – তবুও জান বাজী রেখে লড়ার জন্য তৈরি। আর অন্যায় মনে করেও যে জীবন দিতে পিছপা হয় না তার সাহস যে অনেক বেশি সে কথা তোমাকে মানতেই হবে।” 

“হে ভগবান! মিস মেলি, এই পীচ স্ট্রীটের ওপর কান্নাকাটি কোরো না। লোকে উল্টোপাল্টা ভাববে,” আঙ্কল পীটার ঘোড়ার গতি বাড়াতে বাড়াতে বলে উঠল। “বাড়ি ফেরা অব্দি অপেক্ষা কর।” 



স্কারলেট কিছু বলল না। মেলানি সান্ত্বনা পাবার জন্য স্কারলেটের হাতটা চেপে ধরেছিল। ও সেটাতেও কোন চাপ দিল না। অ্যাশলের চিঠি পড়ার ওর একটাই উদ্দেশ্য ছিল – অ্যাশলে ওকে এখনও ভালবাসে কিনা সেটা জানা। এখন মেলানির কথায় চিঠিগুলোর অন্য একরকম মানে ওর কাছে ফুটে উঠল, যেটা ও আগে বুঝতে পারেনি। অ্যাশলের মত পরিশীলিত মনের একজন মানুষের সঙ্গে রেট বাটলারের মত দুশ্চরিত্র একটা লোকের মনের মিল আছে ভেবে ও যারপরনাই বিস্মিত হল। মনে মনে ভাবল, “ওরা দুজনেই এই যুদ্ধের পরিণাম সম্বন্ধে জানে – কিন্তু অ্যাশলে এর জন্য প্রাণ পর্যন্ত দিতে প্রস্তুত, আর রেট ঠিক তার উল্টো। এতেই রেটের চরিত্র বোঝা যায়।” তারপর একটা নতুন ভাবনা মাথায় আসতেই ভয় পেয়ে ভাবল যে অ্যাশলে সম্বন্ধে ও এরকম কথা কি করে ভাবতে পারল! “দুজনেই এই যুদ্ধের অপ্রীতিকর পরিণাম সম্পর্কে অবহিত। রেট এই সত্যটাকে মুখের ওপর বলে দিয়ে মানুষের বিরাগভাজন হচ্ছে, অথচ অ্যাশলের সত্যি কথাটা বলার সাহসই নেই!” 



মাথামুণ্ডু কিছুই বোঝা যাচ্ছে না! 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন