বুধবার, ১ এপ্রিল, ২০২০

মার্গারেট মিচেল'এর ধারাবাহিক উপন্যাস : যে দিন ভেসে গেছে--সপ্তদশ অধ্যায়

অনুবাদ : উৎপল দাশগুপ্ত

১ 
৮৬৪ সালের মে মাস। শুকনো এবং গরম মে মাস – এত গরম যে ফুল কুঁড়িতেই শুকিয়ে যাচ্ছে। জেনারাল শেরম্যানের নেতৃত্বে ইয়াঙ্কিবাহিনী আবার জর্জিয়ায় হাজির ঠিক ডাল্টনের উত্তরে – অ্যাটলান্টা থেকে মাত্র একশ মাইল উত্তর-পশ্চিমে। শোনা যাচ্ছে জর্জিয়া আর টেনেসির সীমানায় কঠিন লড়াই হবে। পশ্চিম আর অ্যাটলান্টিক রেলপথের ওপর আক্রমণ হানবার জন্য ইয়াঙ্কিরা নাকি বিপুল সেনাসমাবেশ ঘটাচ্ছে। এই রেলপথই অ্যাটলান্টার সঙ্গে টেনেসি আর পশ্চিমকে জুড়েছে। এই পথ ধরে ধাওয়া করেই দক্ষিণের সেনাবাহিনী গত শরতে চিকামাওগায় জয়লাভ করেছিল।

ডাল্টনে যুদ্ধের সম্ভাবনা অবশ্য অ্যাটলান্টাকে সেরকম ভাবে বিচলিত করতে পারল না। এখন যেখানে ইয়াঙ্কিরা সৈন্য জড়ো করছে, সেই জায়গাটা চিকামাওগার যুদ্ধক্ষেত্রের কয়েক মাইলের মধ্যেই। পাহাড়ের ভেতর দিয়ে ওরা আগের বার যখন আক্রমণ করেছিল তখন ওদের হঠিয়ে দেওয়া গিয়েছিল। দরকার পড়লে আবার তাই করতে হবে।

অ্যাটলান্টা – বলতে গেলে পুরো জর্জিয়া রাজ্যটাই – কনফেডারেসির কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ – আর সে কথা মাথায় রেখেই জেনারাল জো জনস্টন নিশ্চয়ই ইয়াঙ্কিদের বেশিদিন সীমান্তে টিকে থাকতে দেবেন না। জো আর তাঁর বাহিনী ইয়াঙ্কিদের একজন সৈন্যকেও ডাল্টনের দক্ষিণ দিকে ঢুকতে দেবেন না। জর্জিয়ার নিরাপদ থাকার ওপর অনেক কিছুই নির্ভর করছে। এখনও পর্যন্ত অবিদ্ধস্ত জর্জিয়া পুরো দক্ষিণের শস্যভাণ্ডার – কল কারখানা আর গুদামও এখানে। যুদ্ধে ব্যবহার করার জন্য বেশিরভাগ গোলাবারুদ, অস্ত্রশস্ত্র, আর তুলো আর পশমের কাপড়-চোপড়ও এখানেই উৎপাদন করা হয়। অ্যাটলান্টা থেকে ডাল্টন যাবার পথে রোম শহরে কামান আর অন্যান্য সরঞ্জামের কারখানা, আর রিচমণ্ডের দক্ষিণে এটোয়া আর অ্যালাটুনায় রয়েছে সব থেকে বড় লোহার কারখানা। অ্যাটলান্টায় কেবল মাত্র পিস্তল, ঘোড়ার জিন, তাঁবু আর অস্ত্রশস্ত্র তৈরির কারখানাই নেই, দক্ষিণের সব থেকে বড় রোলিং মিলও এখানেই রয়েছে। সর্বোপরি বড় বড় রেলের কারখানা আর বড় বড় হাসপাতালও এখানেই রয়েছে। অ্যাটলান্টা হল চারটে রেলপথের সংযোগস্থল, যার ওপরে কনফেডারেসির সচল থাকাও নির্ভর করে।

তাই কেউই এ নিয়ে বিশেষ মাথা ঘামায় নি। তাছাড়া ডাল্টনও তো ঘরের খুব কাছে নয় – একেবারে টেনেসির সীমানায়। তিন বছর ধরে টেনেসিতে যুদ্ধ চলছে। সবাই এরকম ভাবতে অভ্যস্ত হয়ে গেছিল যে ওটা তো অনেক দূরের রাজ্য – যুদ্ধক্ষেত্র অনেক দূরে – প্রায় ভার্জিনিয়া আর মিসিসিপি নদীর মতই দূরে। বুড়ো জো আর তাঁর বাহিনী অ্যাটলান্টা আর ইয়াঙ্কিদের মাঝখানে রয়েছেন। জেনারাল লী’কে ছেড়ে দিলে – আর স্টোনওয়াল জ্যাকসনের মৃত্যুর পরে – জনস্টনই হলেন সব থেকে নির্ভরযোগ্য জেনারাল। 

মে মাসের এক উষ্ণ বিকেলে, আন্ট পিটির বাড়ির বারান্দায় বসে, ডঃ মীড এই ব্যাপারে তাঁর অসামরিক দৃষ্টিভঙ্গি খুব সরল ভাবে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। উনি বলেছিলেন যে অ্যাটলান্টার ভয় পাবার কোন কারণ নেই – জেনারাল জনস্টন পাহাড়ের গায়ে এক দুর্ভেদ্য প্রাচীর তৈরি করে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর শ্রোতাদের আবেগে তারতম্য ছিল। কারণ সেই পড়ন্ত বিকেলের ম্লান আলোয় যাঁরা অলস ভাবে চেয়ারে ঢুলতে ঢুলতে – মরশুমের প্রথম জোনাকির আলোর ফুলকি দেখতে দেখতে – ডাক্তারের বক্তৃতা শুনছিলেন, তাঁদের প্রত্যেকের মনই নানাভাবে ভারাক্রান্ত হয়ে ছিল। ফিলের বাহুতে হাত রেখে মিসেজ় মীড কামনা করছিলেন যেন ডাক্তারের কথাই ঠিক হয়। যদি যুদ্ধ আরও কাছাকাছি চলে আসে, তাহলে ফিলকেও যুদ্ধে পাঠাতেই হবে। এখন ওর ষোল বছর – হোমগার্ড হিসেবে যোগ দিয়েছে। গেটিসবার্গের শোক ফ্যানি এলসিংকে ভাল মত নাড়া দিয়ে গেছে। গত কয়েক মাস ধরে সেই দুঃখজনক ঘটনার ছবি প্রাণপণে মন থেকে সরিয়ে রাখার চেষ্টা করে চলেছে – মেরিল্যাণ্ডে পশ্চাদপসরণের সময় বৃষ্টির মধ্যে গরুর গাড়ি উলটে গিয়ে লেফটেনান্ট ডালাস ম্যাকলিয়োরের ভয়ানক মৃত্যু!

ক্যাপটেন ক্যারি অ্যাশবার্ণের অকেজো হাতটা আবার যন্ত্রণা দিতে শুরু করেছে। স্কারলেটের সঙ্গে পূর্বরাগের ব্যাপারটাও একটা অচল অবস্থায় এসে পৌঁছেছে। তাই কোনও কিছুতেই ও তেমন উৎসাহ পাচ্ছিল না। এই অচলাবস্থার সূত্রপাত অবশ্য অ্যাশলের বন্দী হওয়ার পর থেকেই। কিন্তু এই ঘটনার সঙ্গে স্কারলেটের হঠাৎ অনাগ্রহের একটা যোগ থাকতে পারে এ কথা ওর কল্পনাতেও আসেনি। স্কারলেট আর মেলানি দুজনেই অ্যাশলের কথা ভাবছিল। বিশেষ কোনও কাজ না থাকলে, বা অন্যদের কথাবার্তায় যোগ দেবার মত উৎসাহ না পেলে, ওরা দুজনেই অ্যাশলের কথা ভাবে। স্কারলেট বিষণ্ণ মনে ভাবছিলঃ “অ্যাশলে নিশ্চয়ই আর বেঁচে নেই, নাহলে কোন খবর পাওয়া যেত।” মেলানি মন থেকে ভয় সরিয়ে দেবার আপ্রাণ চেষ্টা করতে করতে ভাবছিলঃ “নাহ অ্যাশলে কিছুতেই মরতে পারে না। ও মরে গেলে আমি ঠিক বুঝতে পারতাম – আমি অনুভব করতে পারতাম যে ও আর বেঁচে নেই।” রেট বাটলার অন্ধকারে বসেছিলেন। ওঁর লম্বা পা দুটো অলসভাবে একটার ওপর একটা তুলে দেওয়া। জুতোগুলো চকচক করছে। মুখ দেখে উনি কি চিন্তা করছেন বোঝার উপায় নেই। ওয়েড ওঁর কোলে নিশ্চিন্ত মনে ঘুমিয়ে আছে – ছোট্ট হাতে একটা খেলনা ধরা। রেট এলে স্কারলেট ওয়েডকে অনেকক্ষণ জেগে থাকতে দিত। মুখচোরা ছেলেটা ওঁকে খুব পছন্দ করত। আর মজার ব্যাপার হল, রেটও ওকে খুব পছন্দ করতেন। সাধারণত, ছেলেটা জেগে থাকলে স্কারলেট একটু বিরক্তই হত। অথচ রেটের কোলে বসে ও একটুও দুষ্টুমি করত না। আন্ট পিটি একটা ঢেকুর চাপা দেবার আপ্রাণ চেষ্টা করছিলেন। আজ দুপুরে যে মোরগটা রান্না হয়েছিল, সেটা বেশ বুড়িয়ে গেছিল। 

সকালে আন্ট পিটি অতীব দুঃখের সঙ্গে ওই মোরগ কুলপতিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে দেন। নইলে বার্ধক্যজনিত কারণে ওটা নিজেই একদিন মরে যেত। ওর সঙ্গিনীরা আগেই উদরস্থ হয়ে গিয়েছিল। ফলে বেচারা একেবারে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছিল। ছুটোছুটি অনেকদিন হল বন্ধ। এমনকি ডাকাডাকির পাটও উঠে গিয়েছিল। আঙ্কল পিটার যেই ওর গলা মুচড়ে দিল, আন্ট পিটি খুবই বিবেকদংশনে ভুগতে লাগলেন। পাড়াপড়শিরা কত মাস হল মুর্তি খাওয়া ভুলেই গেছে! তাই একা একা মুর্গি খাবার বিলাসিতা উনি করেন কেমন করে? তাই উনি যখন পাড়াপড়শিদের নিমন্ত্রণ করার কথাটা তুললেন, মেলানি সজোরে প্রতিবাদ করল। মেলানির গর্ভাবস্থার এখন পাঁচ মাস চলছে –লোকজনের সামনে বিশেষ বের হচ্ছে না। কিন্তু এই প্রথম আন্ট পিটি নিজের সিদ্ধান্তে অনড় রইলেন। একটা মোরগ একা একা খেয়ে নেওয়া খুবই স্বার্থপরের মত হবে। আর মেলানি যদি একটু ঢোলাঢালা পোশাক একটু উঁচু করে পরে নেয় – এমনিতেই ওর বুক তো বোঝাই যায় না – তাহলে কেউ কিছু বুঝতে পারবে না, ইত্যাদি ইত্যাদি!

“ওহ আন্টি – আমি কারও সাথে দেখা করতে চাইছিলাম না যখন অ্যাশলে ____”

“এমন কথা বলছ – যেন – যেন অ্যাশলে চলেই গেছে,” আন্ট পিটির গলা কেঁপে উঠল। মনে মনে উনি এক রকম ভেবেই নিয়েছিলেন যে অ্যাশলে হয়ত আর বেঁচে নেই। “তুমি যেরকম বেঁচে আছ – অ্যাশলেও সেরকমই বেঁচেবর্তে আছে। লোকজনের সাথে দেখা হলে তোমার ভালই লাগবে। আমি ফ্যানি এলসিংকেও ডাকব। মিসেজ় এলসিং আমাকে বার বার বলছেন যে কিছু একটা করতে যাতে ও একটু উৎসাহ পায় – একটু লোকজনের সাথে কথাবার্তা বলে ___”

“কিন্তু আন্টি – ডালাস মারা গেছে – এখনও বেশিদিন হয়নি – এখন ওকে টেনে আনলে – ওকে কষ্ট দেওয়া হবে ___”

“দেখ মেলি! তুমি যদি আমার সঙ্গে এভাবে তর্ক কর তাহলে আমি কিন্তু কেঁদেই ফেলব। আমি তোমার পিসী। আমি জানি কি করতে হবে। পার্টি আমি দেবই!”

অতএব আন্ট পিটির দেওয়া পার্টি হয়ে গেল। একেবারে শেষ মুহুর্তে এমন একজন অতিথি এসে হাজির হলেন, যাঁকে আন্ট পিটি আশাও করেন নি, কিংবা তাঁর উপস্থিতিও কামনা করেন নি। ঠিক যখন চিকেন রোষ্টের গন্ধ চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে, তখন দরজায় কড়া নাড়ার আওয়াজ পাওয়া গেল। রেট বাটলার দাঁড়িয়ে আছেন – হাতে একটা বড় সুদৃশ্য বাক্স ভর্তি বনবন আর এক গাল হাসি নিয়ে আন্ট পিটির জন্য দু’মুখো প্রশস্তিবাক্য। মিস পিটির ওঁকে ভেতরে এসে বসতে বলা ছাড়া কোন উপায় ছিল না। অবশ্য ডঃ এবং মিসেজ় মীড ওঁর সম্বন্ধে কি মনোভাব পোষণ করেন সেটা ওঁর ভাল করেই জানা ছিল। এটাও জানতেন ইউনিফর্ম না পরা মানুষদের সম্বন্ধে ফ্যানির ঘৃণা কতখানি। রাস্তায় দেখা হলে মীড কিংবা এলসিংরা কেউই ওঁর সঙ্গে বাক্যালাপ করতেন না। তবে কোন বন্ধুর বাড়িতে দেখা হলে এড়িয়ে যেতে পারবেন না। ভদ্র ব্যবহার করতেই হবে। বিশেষ করে উনি এখন মেলানির সুদৃঢ় প্রশ্রয়ে সুরক্ষিত। অ্যাশলের সম্বন্ধে খবর নেওয়ার ব্যাপারে যখন থেকে উনি উদ্যোগী হয়েছেন তখন থেকে মেলানি জনসমক্ষে ঘোষণা করে দিয়েছে যে যে যাই বলুক না কেন, উনি যতদিন বেঁচে থাকবেন, এই বাড়িতে তাঁর দ্বার অবারিত। 

যখন দেখলেন যে রেট তাঁর চিরাচরিত শ্লেষ পরিহার করে সবার সাথে অত্যন্ত ভদ্র ভাবে কথাবার্তা বলছেন, তখন আন্ট পিটি মনে মনে একটু নিশ্চিন্ত হলেন। ফ্যানির সাথে এমন সহানুভুতির সঙ্গে কথা বলতে লাগলেন যে ফ্যানির মুখেও হাসি দেখা গেল। খাওয়াদাওয়ার পালা অত্যন্ত মসৃণভাবে সারা হয়ে গেল। ক্যারি অ্যাশবার্ণ খানিকটা চা নিয়ে এসেছিল – যেটা ও একজন অ্যাণ্ডার্সনভিলগামী বন্দী ইয়াঙ্কির তামাকের পাউচের মধ্যে পেয়েছিল। তাই সবাই হাল্কা তামাকের গন্ধযুক্ত চা পান করতেও পারল। সবার পাতেই এক টুকরো করে সেই বুড়ো মোরগের শক্ত মাংস পড়ল – কর্ন-মিল আর পেঁয়াজের ড্রেসিং দেওয়া। এক বাটি শুকনো মটরশুঁটি আর প্রচুর পরিমানে ভাত আর গ্রেভি। ময়দার অভাবে গ্রেভিটা বেশ পাতলা ছিল। ডেজ়ার্ট হিসেবে ছিল মিষ্টি আলুর পাই আর রেটের আনা বনবন। তারপর কালো জামের ওয়াইনে চুমুক দেবার সময় যখন রেট বাটলার সত্যিকারের হাভানা চুরুট ভদ্রলোকদের দিকে এগিয়ে দিলেন, তখন সবাই একবাক্যে মেনে নিল যে খাওয়াটা সত্যিই খুব শৌখিন হয়েছে।

সব মিটে যাবার পরে ভদ্রলোকেরা যখন ভদ্রমহিলাদের সাথে বারান্দায় এসে যোগ দিলেন, তখনই আলোচনার মোড় ঘুরে যুদ্ধের দিকে চলে গেল। আজকাল সব কথাবার্তাতেই যুদ্ধের প্রসঙ্গ এসে পড়ে –অন্য কথাবার্তা দিয়ে আলোচনা শুরু হলেও ঘুরে ফিরে যুদ্ধের কথা এসেই পড়ে – কখনও সেই কথাবার্তার মধ্যে দুঃখের রেশ থাকে – কখনও বা মজার। যাই থাকুক না কেন যুদ্ধ ঘুরে ফিরে আসবেই। যুদ্ধকালীন প্রেম, যুদ্ধ চলাকালীন বিবাহ, হাসপাতালে আর লড়াইয়ের ময়দানে মৃত্যু, বীরত্ব, কাপুরুষতা, মজার ঘটনা, দুঃখের ঘটনা, বঞ্চনা, আশা। নিরাশা নয়, কেবল আশা – আগের গ্রীষ্মের পরাজয় সত্ত্বেও। 

যখন ক্যাপটেন অ্যাশবার্ণ জানাল যে ও অ্যাটলান্টা থেকে ডাল্টনে বদলির জন্য আবেদন করেছে আর সেই আবেদন গ্রাহ্যও হয়েছে, তখন মহিলারা ওর আড়ষ্ট হাতের দিকে তাকিয়ে গর্বের সঙ্গে চোখের জল ফেলতে লাগলেন। জানালেন যে ওর কিছুতেই যাওয়া হবে না কারণ তাহলে ‘আমাদের’ মেয়েদের বিয়ে করবার মত কেউ থাকবে না! 

এই কথায় ক্যারি একটু বিভ্রান্ত হয়ে পড়ল। মনে মনে এই সব প্রবীণ আর নবীন মহিলাদের – যেমন মিসেজ় মীড, মেলানি, ফ্যানি – এদের আগ্রহে কিছুটা খুশিও হল। স্কারলেটের মনোভাবটা জানবার জন্য খুবই ইচ্ছে হতে লাগল। 

“আরে ও তো যাবে আর আসবে!” ওর কাঁধে হাত রেখে ডঃ মীড বললেন। “একটা ছোট্ট লড়াই হবে আর ইয়াঙ্কিরা আবার টেনেসিতে পালিয়ে যাবে। আর একবার যদি ওরা ওখানে চলে যায় তখন আমাদের জেনারাল ফরেস্ট ওদের ব্যবস্থা করে ফেলবেন। তাই মহিলারা ইয়াঙ্কিদের নিয়ে তোমরা চিন্তা কোরো না। জেনারাল জনস্টন তাঁর বাহিনী নিয়ে পাহাড়ের গায়ে এক দুর্ভেদ্য প্রাচীর তৈরি করে দাঁড়িয়ে আছেন।” কথাটা আবার বললেন। বাক্যবন্ধটা তাঁর খুব পছন্দ হয়েছে। “শেরম্যান ঢুকতে পারবে না। বুড়ো জো কে ডিঙিয়ে ঢোকার সাধ্য ওর নেই!

মহিলারা সপ্রশংস অনুমোদন করলেন, কারণ ডাক্তারবাবুর অভিজ্ঞ মতামতকে সবাই তর্কাতীতভাবে গ্রহণ করেন। যতই হোক, পুরুষ মানুষ এই সব ব্যাপার মহিলাদের থেকে অনেক বেশি বোঝেন। যদি উনি বলে থাকেন যে জেনারাল জনস্টন দুর্ভেদ্য প্রাচীর তৈরি করে দাঁড়িয়ে আছেন তাহলে উনি সত্যিই তাই করেছেন। 

এবারে রেট কথা বললেন। এতক্ষণ তিনি ছায়াতে একটা ঘুমন্ত শিশুকে কোলে নিয়ে বসে মাথা নীচু করে ঠোঁটের কোনে বাঁকা হাসি নিয়ে এইসব যুদ্ধের কথাবার্তা শুনছিলেন। 

“কার কাছে যেন শুনতে পেলাম শেরম্যানের বাহিনীতে নাকি এক লক্ষ সৈন্য আছে! অনেকেই ণতুন করে ওঁর বাহিনীতে এসে যোগ দিল কিনা।”

ডঃ মীড আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না। এখানে এসে অবধি এমন একজন লোকের সঙ্গে ওঁকে এক ছাদের তলায় কাটাতে হচ্ছে, যাকে উনি যারপরনাই ঘৃণা করেন। মিস পিটিপ্যাটের অতিথি বলেই এতক্ষণ ধরে সহ্য করে নিচ্ছিলেন। 

“ঠিক কি বলতে চাইছেন?” একটু উষ্মা প্রকাশ পেল গলার স্বরে। 

“ক্যাপটেন অ্যাশবার্ণকে বলতে শুনলাম, জেনারাল জনস্টনের কাছে রয়েছে মাত্র চল্লিশ হাজার – তাও আবার অনেকেই পালিয়ে গিয়েছিল! তাদের আবার ফিরে যেতে বলা হচ্ছে।”

“একদম মিথ্যে কথা!” রাগতস্বরে বললেন মিসেজ় মীড। “কনফেডারেট বাহিনীতে কোন পলাতক নেই।”

“মাফ করবেন,” ছদ্ম বিনয়ের সঙ্গে রেট বললেন। “ওই যারা ছুটি নিয়ে এসে আর ফিরে যায়নি, তাদের কথা বলছিলাম আর কি। প্রায় ছ’মাস হল হাসপাতাল থেকে ছুটি পেয়ে গেছে, কিন্তু ফিরে যায়নি। চাষবাস বা অন্যান্য কাজে লেগে পড়েছে।”

ওঁর চোখে চাপা হাসির ঝিলিক। মিসেজ় মীড রাগে ঠোঁট কামড়ালেন। স্কারলেটের খিল খিল করে হেসে উঠতে ইচ্ছে করল। রেট একেবারে মোক্ষম জায়গায় আঘাত দিয়েছেন। শয়ে শয়ে লোক প্রোভোস্ট গার্ডদের চোখ এড়িয়ে পাহাড় আর জলা জায়গায় লুকিয়ে রয়েছে। পাছে ওদের নজরে এলে যদি ফেরত যেতে হয়! এরা নাকি বলে বেড়াচ্ছে এটা নাকি আসলে বড় মানুষদের যুদ্ধ, আর ওরা নেহাতই তুচ্ছ সেপাই। এই বড় মানুষদের জন্য লড়াই করে মরতে হচ্ছে। অবশ্য এমন অনেকেই আছে, যারা কোম্পানির খাতায় পলাতক বলে লেখা আছে। কিন্তু এরা ম্যোটেই পালিয়ে থাকতে চায় না। এরা তিন বছর অপেক্ষা করে পরিওবারের সঙ্গে দেখা করার জন্য ছুটি পেয়েছে। অনেকের বাড়ি থেকেই করুণ আর্তিতে ভরা ভুল বানানে ভরা চিঠি এসেছে। “আমরা খেতে পাচ্ছি না!” “এবারে কোনও চাষবাস হয়নি। হাল ধরার লোক কোথায়?” “সব শুয়োরছানা কমিসারি নিয়ে চলে গেছে!” ‘কতদিন তোমরা টাকা পাঠাওনি!” 

এই সব আর্তনাদ ক্রমশঃ জোরালো হয়েছেঃ “আমরা ক্ষুধার্ত, তোমার বউ, তোমার বাচ্চারা, তোমার বাবা-মা। কখন যুদ্ধ শেষ হবে? কখন তুমি বাড়ি আসবে? আমরা খুবই ক্ষুধার্ত – খুবই।” দ্রুত কমে আসা বাহিনী থেকে এদের ছুটি যখন বার বার অস্বীকার করা হচ্ছিল, তখন এরা ছুটি না নিয়েই বাড়ি ফিরে সেসেছিল – চাষবাস করার জন্য, জমিতে শস্যরোপন করার জন্য, বাড়ি ঘর মেরামত করার জন্য, বাগানে বেড়া দেওয়ার জন্য। যুদ্ধের ভাবগতিক দেখে যখন বাহিনীর অফিসাররা বেগতিক বুঝলেন তখন এঁরা এদের বার বার ফিরে আসতে অনুরোধ করলেন – জানালেন যে ওদের চলে যাওয়া নিয়ে কোনরকম শাস্তি পেতে হবে না। বেশির ভাগই ফিরে গিয়েছিল – যখন ওরা দেখল অন্তত কয়েক মাস তাদের পরিবারের খাওয়াদাওয়ার সমস্যা হবে না। “চাষবাস করার জন্য ছুটি” নেওয়াকে শত্রুর মুখোমুখি হয়ে পালিয়ে যাওয়ার থেকে আলাদা ভাবে দেখা হয়েছিল। তা সত্ত্বেও সেনাবাহিনী যথেষ্ট দুর্বল হয়ে পড়েছিল। 

**ডঃ মীড ঝটিতি অস্বস্তিকর নীরবতাকে ভেঙ্গে দেবার জন্য সচেষ্ট হলেন। খুব শীতল গলায় বললেন, “ক্যাপটেন বাটলার, সংখ্যাগত বল দিয়ে ইয়াঙ্কি সৈন্য আর আমাদের কনফেডারেট সৈন্যের মধ্যে তুলনাই চলে না। আমাদের একজন সৈন্য ওদের এক ডজন সৈন্যের সমান।”

মহিলারা মাথা নেড়ে সমর্থন জানালেন। এ তো সবারই জানা!

“যুদ্ধের প্রথম দিকে কথাটা হয়ত সত্যি ছিল। হয়ত এখনও একই রকম থাকত, যদি কনফেডারেট সৈন্যদের বন্দুকে গুলি থাকত, পায়ে জুতো থাকত আর পেটে খিদে না থাকত। কি বলেন, ক্যাপটেন অ্যাশবার্ণ?”

কণ্ঠস্বর এখনও মোলায়েম, হাবভাবে বিনয়। ক্যারি অ্যাশপবার্ণকে অসুখী দেখাল। রেটকে অন্যদের মত সেও পছন্দ করত না। ওর ডাক্তারের পক্ষ নেবারই ইচ্ছে হচ্ছিল, কিন্তু সরাসরি মিথ্যে বলতে ওর মুখে বাধল। একটা হাত অকেজো হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও ও যুদ্ধক্ষেত্রে বদলির আবেদন করেছে শুধু এই জন্য যে অসামরিক মানুষজন এখনও আন্দাজই করতে পারেনি যে লড়াইয়ে ওরা কত অসুবিধেজনক অবস্থার মধ্যে আছে। এমন অনেকেই আরও আছে, যারা কাঠের পা নিয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছে, যারা কানা হয়ে গেছে, যাদের আঙ্গুল উড়ে গেছে, যারা একটা হাত হারিয়েছে – যারা নিঃশ্বব্দে কমিসারেটে, বা পোস্ট অফিস বা হাসপাতালের হাল্কা কাজ ছেড়ে ময়দানে যাবার জন্য বদলি নিয়েছে। ওরা জানে বুড়ো জো’র লোকবল দরকার – জরুরি ভিত্তিতে।

ও কোন কথা বলল না। ডঃ মীড হুঙ্কার দিয়ে বলে উঠলেন, “এর আগেও আমাদের সৈন্যরা জুতো, খাবারদাবার ছাড়া যুদ্ধ করে জিতেছে! ওরা আবার যুদ্ধ করবে এবং জিতবেও! জেনারাল জনস্টনকে অত সহজে কাবু করা যাবে না! পাহাড়ে দ্রুততা সব সময় কাজে এসেছে আর প্রাচীনকাল থেকেই আক্রান্ত ব্যক্তিদের পাহাড় রক্ষা করে এসেছে। একবার থার্মোপাইলীর১ কথা মনে কর!” 

( অনুবাদকের নোট.১ 
থার্মোপাইলী – এথেন্স শহরের উত্তর-পশ্চিম দিকে পাহাড় আর গ্রীস উপসাগরের মধ্য দিয়ে ২০০ কিমি ধরে সরু গিরিবর্ত্ম। এখন সমুদ্র সরে যাবার ফলে অনেক চওড়া হয়ে গেছে। খ্রীষ্টপূর্ব ৪৮০ সালে, এখানেই ৬০০০ গ্রীক সৈন্য পারস্যের সম্রাট জ়ার্ক্সেস ১ এর সৈন্যদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ তৈরি করেছিল। )


স্কারলেট অনেক চেষ্টা করেও থার্মোপাইলী কথাটার মানে বুঝতে পারল না।

“থার্মোপাইলীতে ওদের শেষ সৈন্যকে পর্যন্ত জীবন দিতে হয়েছিল, তাই না ডাক্তারবাবু?” রেট হাসি চেপে জিজ্ঞেস করলেন।

“আপনি কি আমাকে অপমান করার চেষ্টা করছেন? আপনার আস্পর্ধা দেখে আশ্চর্য হয়ে যাচ্ছি!”

“না না – আপনি আমাকে ভুল বুঝলেন ডাক্তারবাবু। ক্ষমা করবেন। আমি শুধু জানতে চেয়েছিলাম। আসলে প্রাচীন ইতিহাস আমার ঠিক মত মনে থাকে না!”

“যদি দরকার হয়, তাহলে আমাদের সৈনিকরা শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লড়াই করবে, ইয়াঙ্কিদের জর্জিয়াতে ঢোকাকে প্রতিরোধ করার জন্য,” ডাক্তার রেটকে থামিয়ে বললেন। “তবে তার দরকার হবে না। এক ঝটকাতেই ওরা জর্জিয়া থেকে পালাতে বাধ্য হবে!”

আন্ট পিটিপ্যাট উত্তেজনায় চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন, আর স্কারলেটকে বললেন একটু পিয়ানো বাজিয়ে গান শোনাতে। কথাবার্তা গতিপ্রকৃতি দেখে উনি আসন্ন ঝড়ের পূর্বাভাষ পাচ্ছিলেন। উনি আগে থেকেই জানতেন যে রেটকে সাপারে আমন্ত্রণ জানালেই একটা না একটা সমস্যা তৈরি হবে। কিন্তু সমস্যাটা যে কোথা থেকে তৈরি হয়ে যায় সেটা উনি কিছুতেই বুঝে উঠতে পারেন না। হায় কপাল! কি যে স্কারলেট ওই ভদ্রলোকের মধ্যে দেখে? আর মেলানিই বা কোন আক্কেলে ওঁকে সব সময় আড়াল করে চলে?

স্কারলেট যখন বাধ্য মেয়ের মত উঠে বসবার ঘরে চলে গেল, তখন একটা অস্বস্তিকর নীরবতা চারদিকে ছেয়ে গেল। রেটের প্রতি একটা নীরব অসন্তোষ। জেনারাল জনস্টন আর তাঁর বাহিনীর অপরাজেয়তা নিয়ে কেউ এরকম সন্দেহ প্রকাশ করতে পারে – মনে প্রাণে? এটা বিশ্বাস করাটাই অতুন্ত পবিত্র কর্তব্য! আর যারা বিশ্বাসঘাতকতা করে সেটা মনে না করে, তাদের উচিত অন্তত মুখ বন্ধ করে রাখা!

স্কারলেট পিয়ানোতে টুং টাং করে গাইতে শুরু করল। ওর সুরেলা বিষণ্ণ গলা বসবার ঘর থেকে বারান্দায় ভেসে এল। একটা খুব জনপ্রিয় গানঃ

“চুনকাম করা চার দেওয়ালের মাঝে,
যারা শুয়ে আছে মৃত আর মৃতপ্রায়,
বারুদে, বুলেটে ক্ষতবিক্ষত সাজে।
কোল খালি হবে কত জননীর হায়!

“কার প্রিয়তম! পাণ্ডুর মুখে ভরা –
গর্বের হাসি অসমসাহসিকতার।
কবরের নীচে ঢাকা পড়ে যাবে ত্বরা,
কিশোর মুখের শপথ দুর্নিবার! ”

“রক্তে জড়ানো সোনালী কেশের দাম,” উচ্চসপ্তকে গাইতে গিয়ে স্কারলেটের গলা কেঁপে গেল। ফ্যানি সামান্য উঠে দাঁড়িয়ে ভাঙ্গা গলায় বলল, “অন্য কিছু গাও!”

স্কারলেট একটু থতমত খেয়ে চুপ করে গেল। পিয়ানোও থেমে গেল। তারপর তাড়াতাড়ি করে “ধূসর রঙের জ্যাকেট” শুরু করেই আবার থেমে গেল। এই গানটাও খুবই হৃদয়বিদারক। আবার পিয়ানো বাজানো বন্ধ হয়ে গেল। ও কি করবে বুঝতে পারল না। সব গানেই মৃত্যু, দুঃখ আর বিরহের কথা বলা হয়েছে। 

রেট তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়িয়ে, ওয়েডকে ফ্যানির কোলে দিয়ে বসবার ঘরে চলে গেলেন। 

“কেনটাকির সেই স্বপ্ননীড়”টা বাজাও,” খুব মোলায়েম ভাবে উনি পরামর্শ দিলেন। স্কারলেট খুব কৃতজ্ঞতার সঙ্গে সেটাই বাজাতে শুরু করল। রেটের গলার পরিশীলিত খাদ আর স্কারলেটের গলা মিলে গানটা যখন দ্বিতীয় স্তবকে পৌঁছাল, তখন সকলে স্বস্তির নিঃশ্বাস নিল, যদিও এই গানটাও খুব একটা আনন্দের গান নয়।

“বাস্‌ ক’টা দিন, বয়ে যাব এই ভার,
ক্লান্তির বোঝা হাল্কা হবে কি আর?
শুধু ক’টা দিন পথ চলা বাকি আছে,
কেনটাকি – সেই স্বপ্ননীড়ের কাছে!” 

***

ডঃ মীডের কথাই শেষ পর্যন্ত ফলে গেল। জনস্টন, ডালটনের সীমানা থেকে একশ মাইল দূরে, পাহাড়ের ওপর দুর্ভেদ্য প্রাচীর তৈরি করে দাঁড়িয়ে রইলেন। সেই প্রাচীর এতই দুর্ভেদ্য ছিল আর যে ভাবে মরিয়া হয়ে শেরম্যানের বাহিনীকে প্রতিরোধ করলেন, যে শেষ পর্যন্ত ইয়াঙ্কিরা ভালয় ভালয় পিছু হঠে যেতে বাধ্য হল। ধূসর ইউনিফর্মের বাহিনীকে সামনাসামনি মোকাবেলা করা অসম্ভব দেখে ওরা রাতের অন্ধকারে গিরিপথ ধরে অর্ধচন্দ্রাকারে এগিয়ে গেল যাতে ওরা জনস্টনকে পেছন দিক থেকে আক্রমণ করতে পারে আর ডালটনের পনেরো মাইল দূরে রিসাকার সাথে রেলের সংযোগ যাতে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া যায়। 

এই দুই গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল আক্রান্ত হওয়ার ফলে কনফেডারেট বাহিনীকে ডালটনের প্রতিরোধ সরিয়ে নিয়ে, তারার আলোয় রিসাকার দিকে অগ্রসর হতে বাধ্য হল। ওরা গেল সিধে রাস্তা ধরে যেটার দূরত্ব অনেক কম। তার ফলে যতক্ষণে ইয়াঙ্কিরা ওদের মোকাবেলা করবার প্রস্তুতি নিল, ততক্ষণে কনফেডারেটরা মাটির প্রাচীর তুলে তার পেছন থেকে গোলাবারুদ আর বেয়নেট সহযোগে ওদের মোকাবেলা করার জন্য পুরোপুরি তৈরি হয়ে যেতে পেরেছে। 

ডালটনে যারা আহত হয়ে ফিরে গেল, তাদের মুখ থেকে অ্যাটলান্টার লোকেরা খানিকটা বিস্মিত হয়ে বুড়ো জোয়ের রিসাকায় পশ্চাদপসরণের বিকৃত বিবরণ শুনে চিন্তিত হয়ে পড়ল। যেন একটা কালবৈশাখীর ঝড় উত্তর-পশ্চিম দিক ছেয়ে ফেলেছে। জেনারাল কি মনে করে শত্রুপক্ষকে জর্জিয়ার ভেতর দিকে আরও আঠারো মাইল চলে আসতে দিলেন? ডঃ মীড যেমনটি বলেছিলেন, পাহাড়ই তো প্রাকৃতিক দূর্গের কাজ করতে পারত না? তাহলে বুড়ো জো ওদের ওখানে ধরে রাখলেন না কেন?

জনস্টন মরিয়া হয়ে ইয়াঙ্কিদের রিসাকায় প্রতিরোধ করায় ওরা আবার পিছু হাটল। কিন্তু শেরম্যান সেই আগের কৌশল অবলম্বন করে পিছু হঠে, অর্ধচন্দ্রাকারে উস্টানৌলা নদী পেরিয়ে অন্য একটা রেল পথকে পেছন থেকে আঘাত করল। ফলে ক্লান্ত, অভুক্ত, বিনিদ্র কনফেডারেট বাহিনীকে আবার উপত্যকা ছেড়ে ছুটতে হল সেই রেলপথ বাঁচানোর জন্য। রিসাকা থেকে ছয় মাইল দূরে ক্যালহুন নামে একটা ছোট্ট শহরে ওরা এসে ঘাঁটি গাড়ল। যথারীতি ইয়াঙ্কি সৈন্যরা আক্রমণ করার আগেই ওরা আক্রমণের জন্য পুরো তৈরি হয়ে গেল। জবরদস্ত লড়াই হল এবং ইয়াঙ্কি সৈন্যরা আবার পরাজিত হল। পরিশ্রান্ত কনফেডারেট বাহিনী ঈশ্বরের কাছে একটু বিশ্রাম নেবার জন্য প্রার্থনা করতে লাগল। কিন্তু শেরম্যান ওদের বিশ্রাম না নিতে দেবার জন্য বদ্ধপরিকর। একই কৌশলে ওরা পায়ে পায়ে গিয়ে অন্য একটা রেলপথের দখল নিল। ফলে কনফেডারেটদের আবার ছুটতে হল সেই রেলপথকে দখলমুক্ত করার জন্য। 

কনফেডারেটরা ক্লান্ত পা নিয়ে এগিয়ে চলল, চিন্তা করার শক্তিটুকুও নিঃশেষিত। একটাই শক্তি ওদের প্রেরণা দিচ্ছিল। ওরা বুড়ো জোয়ের ওপর ভরসা করে। হয়ত ওরা পশ্চাদপসরণ করছে, কিন্তু ওরা এটাও জানে ওরা হেরে যায়নি। ওদের লোকবল অল্প থাকার জন্য ওরা শেরম্যানের বাহিনীকে সব দিক থেকে ঘিরে ফেলে ওদের চলাফেরা বন্ধ করতে পারছে না। কিন্তু ইয়াঙ্কিরা যুদ্ধ শুরু করলেই ওদের পরাস্ত করে দিতে পারছে। বারবার এই পিছু হাটার ফল কি হবে ওরা সেটা জানেনা। কিন্তু বুড়ো জো জানেন উনি কি চাইছেন। সেটাই আসল কথা। প্রত্যেক পশ্চাদপসরণে উনি অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে দলকে নেতৃত্ব দিয়ে চলেছেন। খুব কমই ওদের সৈন্য হতাহত হয়েছে, সেই তুলনায় ইয়াঙ্কিদের হতাহতের সংখ্যা অনেক বেশি। ওদের একটা ওয়াগনও নষ্ট হয়নি, শুধু চারটে বন্দুক হারাতে হয়েছে। একটা রেলপথও ওদের হারাতে হয়নি। এত তৎপরতা সত্ত্বেও শেরম্যানের দল একটাতেও হাত লাগাতে পারেনি। 

রেলপথ। এখনও ওদেরই। লোহার লাইন পেতে তৈরি – আলো ঝলমলে উপত্যকার ভেতর দিয়ে এঁকে বেঁকে চলে গেছে অ্যাটলান্টা পর্যন্ত। এই রেল লাইনের ধারেই তারার আলোয় ওরা ঘুমিয়ে থাকে। এই রেল লাইন – প্রখর রৌদ্র অগ্রাহ্য করে – সুরক্ষিত রাখার জন্য ওরা জীবনপণ করতে পারে। 

উপত্যকার মধ্যে দিয়ে যেতে যেতে ওরা এক উদ্বাস্তুবাহিনীর দেখা পেল। তার মধ্যে প্ল্যান্টাররাও যেমন আছে, ক্র্যাকাররাও আছে, গরীব আছে, বড়লোক আছে, সাদা আর কালোমানুষরা আছে, মেয়েরা, বাচ্চারা, বুড়োরা, মৃত্যুপথযাত্রীরা, বিকলাঙ্গরা, গর্ভবতী মহিলারা – সবাই অ্যাটলান্টা যাবার রাস্তায় ভিড় করে আছে, কেউ পায়ে হেঁটে, কেউ ট্রেনে, কেউ বা ঘোড়ার গাড়িতে, কেউ ওয়াগন বোঝাই করে ঘরের জিনিষপত্র নিয়ে চলেছে। উদ্বাস্তুরা সেনাবাহিনীর থেকে পাঁচ মাইল আগে আগে চলছিল। পথের মধ্যে রিসাকা, ক্যালহুন, কিংস্টনে থামতে থামতে খবর নিতে নিতে যাচ্ছিল যে যদি সৈন্যরা ইয়াঙ্কিদের তাড়িয়ে দিয়ে থাকে, তাহলে ওরা আবার ঘরে ফিরে যেতে পারবে। কিন্তু সেই রোদে পোড়া রাস্তায় কাউকে ফিরতে দেখা গেল না। ধূসরবাহিনীরা যে পথ দিয়ে ফিরছিল সেখান বাড়ি ঘর দোর জনশূন্য, খামার খালি পড়ে আছে, দরজা জানলা খোলা পড়ে আছে। এখানে সেখানে দু’একজন মহিলাদের দেখা গেল আর জনা কতক ভীত ক্রীতদাস। সেনাবাহিনীকে দেখে ওরা এগিয়ে এসে অভিবাদন জানাল, তৃষ্ণর্তদের জল এনে খাওয়াল, আহতদের শুশ্রূষা করল, মৃতদের নিজেদের পারিবারিক কবরখানায় কবর দিল। কিন্তু বেশিরভাগ জায়গাই খালি। ফসল মাঠে অযত্নে শুকিয়ে নষ্ট হচ্ছে। 

ক্যালহুন থেকে ইয়াঙ্কিবাহিনী আবার সরে যাওয়ায়, জনস্টন তাঁর বাহিনীর মুখ ঘুরিয়ে অ্যাড্যেয়ার্সভিলে চললেন। ওখানে তীব্র সংঘর্ষ হওয়ার পরে আবার মুখ ঘুরিয়ে যেতে হল ক্যাসভিলে, তারপরে দক্ষিণে কার্টার্সভিলে। এইভাবে শত্রুপক্ষ ডালটন থেকে পঞ্চান্ন মাইল ভেতরে ঢুকে পড়েছে। নিউ হোপ চার্চে – সংঘর্ষপ্রবণ এলাকা থেকে আরও পনেরো মাইল ভেতরে এসে ধূসরবাহিনী একটা মরিয়া আক্রমণের প্রস্তুতি নিয়ে নিল। নীল ইউনিফর্মের বাহিনীও নিরলসভাবে ওখানে এসে হাজির হল – অজগর সাপের মত, নির্দয়ভাবে আঘাত হানতে শুরু করল – আহতদের সরিয়ে নিয়ে যেতে থাকল, কিন্তু সাথে সাথে আঘাত চালানোয় বিরতি দিল না। এগারো দিন ধরে নিউ হোপ চার্চে অবিরাম লড়াই চলল। প্রতিটা ইয়াঙ্কি আক্রমণের যথাযোগ্য জবাব ধূসরবাহিনী দিল। তারপর জনস্টনকে দ্রুতহ্রাসমান বাহিনী নিয়ে কয়েক মাইল পিছিয়ে যেতে হল। 

নিউ হোপ চার্চে কনফেডারেটদের আহত আর মৃতের সংখ্যা অনেক ওপরে চলে গেল। আহতদের ট্রেনে বোঝাই করে অ্যাটলান্টা পাঠিয়ে দেওয়া হল। শহরের সবাই হতভম্ব হয়ে গেল। চিকামাওগার যুদ্ধের পরে শহরে এত জখম সৈন্য আর আসেনি। হাসপাতাল ভরে গেল। অনেক আহতকে স্টরের মেঝেতে জায়গা দিতে হল - অনেককে গুদামে তুলোর গাঁঠরির ওপর শুতে দিতে হল। হোটেল, বোর্ডিং হাউস, লোকের বাড়িতে জখম সেনাতে ভর্তি হয়ে গেল। আন্ট পিটিও বাদ গেলেন না। অবশ্য মেলানির গর্ভাবস্থার উল্লেখ করে বাড়িতে এতজন অপরিচিত পুরুষমানুষ রাখার ব্যাপারে তিনি অসুবিধে ব্যক্ত করেছিলেন। আহতদের ভয়ঙ্কর অবস্থা দেখে ভয়ে গর্ভপাত না হয়ে যায়। মেলানি ওর পোশাক আরও খানিক উঁচু করে পরে নিল, যাতে ওর অবস্থাটা কম নজরে আসে। আহতরা এসে বাড়িতে ভিড় জমাল। তাদের জন্য রান্নাবান্না করা, তাদের ঘন ঘন পাশ ফিরিয়ে দেওয়া, হাওয়া করা, নোংরা ব্যান্ডেজ ধুয়ে আবার পাকিয়ে রাখা, গরমের রাত জেগে কাটানো, পাশের ঘর থেকে অনবরত ভেসে আসা অসুস্থ মানুষের কান্নাকাটি আর প্রলাপ – রাত দিন কোনও নিষ্কৃতি নেই। শেষে এমন হল যে সেই শহরের আর নতুন রুগী নেবার ক্ষমতা রইল না। এরপর নতুন রুগিদের ম্যাকন কিংবা অগাস্টার হাসপাতালে পাঠিয়ে দেওয়া ছাড়া কোন উপায় রইল না। 

লড়াইয়ে আহত হয়ে আসা মানুষদের কাছ থেকে পরস্পরবিরোধী খবর পেয়ে আর হাজার হাজার উদ্বাস্তু এসে শহরে ভিড় করায়, মানুষের মধ্যে একটা উদ্বেগ দানা বাঁধতে শুরু করল। ছোট্ট মেঘ দেখতে দেখতে আশঙ্কার ঝড়ের মেঘে রূপান্তরিত হল। 

এখনও কেউ – অন্তত বেসামরিক ব্যক্তিরা কেউই – তাদের সেনাবাহিনীর দুর্ভেদ্যতা নিয়ে বিশ্বাস হারাল না। কিন্তু জেনারালের সামর্থ্য নিয়ে ঘোর সন্দেহ দেখা দিল। নিউ হোপ চার্চ অ্যাটলান্টার থেকে মাত্র পঁয়ত্রিশ মাইল! মাত্র তিন সপ্তাহে জেনারাল শত্রুপক্ষকে পঁয়ষট্টি মাইল ভেতরে চলে আসতে দিয়েছেন! ক্রমাগত পিছিয়ে আসার বদলে উনি কেন ইয়াঙ্কিদের ওখানেই আটকে রাখতে পারলেন না? উনি শুধু বোকাই নন, বোকারও অধম! হোমগার্ডের মধ্যে প্রবীণ সদস্যরা – যাঁরা অ্যাটলান্টায় নিরাপদে কালাতিপাত করছেন – তাঁরা মনে করতে থাকলেন, এর থেকে ওঁরাই লড়াইটাকে ভাল পরিচালনা করতে পারতেন। টেবিলক্লথের ওপর নানারকম নকশা এঁকে ওঁরা ওঁদের যুক্তি বোঝাতে লাগলেন। সৈন্য সংখ্যা যত কমে যেতে থাকল, জেনারাল, উপায়ান্তর না দেখে, গভর্নর ব্রাউনের কাছে এইসব নিরাপদে বসে থাকা হোমগার্ডের বাহিনীতে পাঠানোর জন্য অনুরোধ করেছিলেন। যে গভর্নর কিনা স্বয়ং জেফ ডেভিসের আবেদনও গ্রাহ্যের মধ্যে আনেন নি, তিনি কেন হঠাৎ জেনারাল জনস্টনের কথা মেনে নেবেন?

লড়াই করা তারপর পিছিয়ে আসা! লড়াই করা তারপর আবার পিছিয়ে আসা! গত পঁচিশ দিন ধরে আর সত্তর মাইল জুড়ে কনফেডারেটরা প্রায় দিন রাত লড়াই চালিয়ে এসেছে। ধূসর বাহিনী নিউ হোপ চার্চ পেছনে ফেলে চলেছে। সাথে নিয়ে চলেছে অসঙ্ঘখ্য স্মৃতির বোঝা – নিদ্রাহীন দিন রাত, পথের ধুলো, অসহ্য গরমের স্মৃতি, এবড়ো খেবড়ো লাল রাস্তা দিয়ে খোঁড়াতে খোঁড়াতে চলার স্মৃতি, কর্দমাক্ত পেছল লাল পথের ভেতর দিয়ে পেরোনোর স্মৃতি, পশ্চাদপসরণ, ব্যুহ তৈরি করা, আবার লড়াই। নিউ হোপ চার্চ ছিল একটা দুঃস্বপ্নের মত, বিগ শ্যান্টিও তাই – যেখানে ওরা ইয়াঙ্কিদের সাক্ষাৎ বিভিষিকার মত প্রতিহত করেছিল। এমন লড়াই যে রণক্ষেত্র শুধু নীল ইউনিফর্মের সৈন্যদের মৃতদেহে ভর্তি হয়ে গেছিল। কিন্তু তাহলে কি হবে – ওদের জায়গায় নতুন ইয়াঙ্কি সৈন্য চলে আসে! ওরা ঠিক দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্ত ধরে পেছন থেকে রেলপথ ঘিরে থাকে। ধীরে ধীরে ওরা অ্যাটলান্টার দিকে এগিয়ে আসতে থাকে।

বিগ শ্যান্টি থেকে শ্রান্ত ক্লান্ত ধূসরবাহিনী কেনিসো পাহাড়ের গা বেয়ে মারিয়েট্টা নামে একটা ছোট শহরের কাছে একটা দশ মাইলের অর্ধবৃত্ত তৈরি করল। পাহাড়ের চড়াইয়ের দিকে ওরা গহ্বর খনন করে রাইফেল বসাল। চুড়োর ওপর ব্যাটারি বসাল। গরমে ঘামতে ঘামতে, গালি দিতে দিতে ওর ওই ভারী কামান নিয়ে পায়ে হেঁটে উঠল। খচ্চর ওই চড়াইতে উঠতে পারবে না। অ্যাটলান্টায় আসা পত্রবাহক আর আহত সৈনিকরা ভীত নাগরিকদের লড়াইয়ের এক আশাব্যঞ্জক ছবি দেবার চেষ্টা করছিল। কেনিসো পর্বতের উচ্চতা দুর্ভেদ্য। একই কারণে পাইন পর্বত আর লস্ট পর্বতও সুরক্ষিত। ইয়াঙ্কিরা অনেক চেষ্টা করেও বুড়ো জোর লোকদের কাবু করতে পারে নি। এছাড়া পাহাড়ের ওপর থেকে সেনাবাহিনী মাইলের পর মাইল রাস্তার ওপর নজর রেখে চলেছে, যাতে ইয়াঙ্কিরা আর ঘিরে ধরতে পারবে না। অ্যাটলান্টার মানুষ খানিকটা নিশ্চিন্ত হল, কিন্তু ____

কিন্তু কেনিসো পর্বত মাত্র বাইশ মাইল দূরে!

যেদিন কেনিসো পাহাড় থেকে লড়াইয়ে জখম হওয়া প্রথম দল অ্যাটলান্টায় এসে পৌঁছল, সেদিন মিসেজ় মেরিওয়েদারের গাড়ি সকাল সাতটা বাজতে না বাজতেই আন্ট পিটির বাড়িতে এসে হাজির। নীগ্রো আঙ্কল লেভিকে দিয়ে ওপরে খবর পাঠালেন যে স্কারলেট যেন তাড়াতাড়ি পোশাক পরে তৈরি হয়ে হাসপাতালে চলে আসে। ফ্যানি এলসিং আর বনেলের মেয়েদের জোর করে ঘুম থেকে তুলে পেছনের সিটে বসিয়ে নিয়ে এসেছেন। ঘুমের জড়তা না ভাঙায়, এখনও ওরা হাই তুলে যাচ্ছে। ফ্যানির ম্যামি গোমড়া মুখে বক্সের ওপর বসে আছে – ওর কোলে সদ্য ধোয়া আর পাট করা ব্যান্ডেজের একটা ঝুড়ি। স্কারলেট কতকটা অনিচ্ছাভরে রওয়ানা দিল – কারণ গত রাত্রের হোমগার্ডের পার্টিতে ও রাতভর নেচেছে আর তাই ওর পায়ে রাজ্যের ক্লান্তি ভর করে আছে। প্রিসি যখন ওকে হাসপাতালে যাবার জন্য রাখা পুরোনো আর শতছিন্ন ড্রেসটা পরতে সাহায্য করছিল, তখন ও মনে মনে দক্ষ আর ক্লান্তিহীন মিসেজ় মেরিওয়েদার আর পুরো কনফেডারেসিকে গালাগালি দিতে লাগল। কফির বদলে ভুট্টা দিয়ে বানানো তেতো পানা আর শুকনো মিষ্টি আলু খেয়ে ও অন্যান্য মেয়েদের সঙ্গে যোগ দিল।

নার্সিং করে করে ও বিরক্ত হয়ে গেছিল। আজই মিসেজ় মেরিওয়েদারকে বলে দিতে হবে যে এলেন ওকে বাড়ি আসতে বলেছেন। দৃশ্যটা কল্পনা করে ও মনে মনে ভয় পেয়ে গেল। নিশ্চয়ই ওই বুড়ি কটমট করে তাকিয়ে আস্তিন গুটিয়ে বলবেন, “ইয়ার্কি পেয়েছ না কি? এইরকম বোকা বোকা কথা আর বোলো না। আজই তোমার মাকে আমি চিঠি লিখছি, স্কারলেট হ্যামিলটন, যে এখানে তোমাকে আমাদের কত দরকার। উনি ঠিকই বুঝবেন আর তোমাকে থাকতে দেবেন। নাও এখন অ্যাপ্রন পরে ডঃ মীডের কাছে দৌড়ে যাও। ব্যান্ডেজ বাঁধবার জন্য ওঁর কিছু সাহায্যের প্রয়োজন।”

“এটাই তো মুশকিল,” স্কারলেট হাল ছেড়ে দিয়ে মনে মনে ভাবল। “মা ঠিক রাজী হয়ে যাবেন আমাকে এখানে রাখতে। উফ, আর আমি এই দুর্গন্ধ সহ্য করতে পারছি না! যদি আমি বয়স্ক মহিলা হতাম, তাহলে দেখে নিতাম – আর মিসেজ় মেরিওয়েদেরের মত সেকেলে আপদগুলোকে জাহান্নামে পাঠিয়ে ছাড়তাম!”

সত্যিই ও আর পেরে উঠছে না – ওই দুর্গন্ধ, উকুন, কাতরানি, অপরিষ্কার শরীর। যদি নার্সিং-এর মধ্যে কিছু নতুনত্ব, কিছু অনুরাগের ছোঁয়া পাওয়াও যেত, সে আজ প্রায় এক বছর হতে চলল, তার রেশ কেটে গেছে। তাছাড়া প্রথম দিকের লোকদের থেকে আজকাল যারা জখম হয়ে আসে তাদের আকর্ষণ অনেক কম। ওর সম্বন্ধে এদের মধ্যে বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। ওরা শুধুই মাঝে মাঝে জিজ্ঞেস করবে, “যুদ্ধের কি খবর? বুড়ো জো এখন কেমন চালাচ্ছেন? সত্যিই উনি কিন্তু অতুলনীয়!” স্কারলেট অবশ্য বুড়ো জো কে মোটেই অতুলনীয় বলে মনে করতে পারছে না। কাজের মধ্যে কাজ তিনি করেছেন, ইয়াঙ্কিদের জর্জিয়ার অষ্ট আশি মাইল ভেতরে ঢুকে যেতে দিয়েছেন। নাহ, এদের ও কিছুতেই ভাল লাগাতে পারছে না। এদের অনেকেই আবার পটাপট মরে যাচ্ছে। রক্তদূষন, অঙ্গ পচে যাওয়া, টাইফয়েড, নিউমোনিয়া এসব প্রতিরোধ করবার ক্ষমতাও এদের নেই। অ্যাটলান্টায় ডাক্তারের হাতে এসে পড়ার আগেই এদের সব রকম রোগ নাকাল করে দিয়েছে। 

বেশ গরম পড়েছে। খোলা জানালা দিয়ে মাছি ঢুকে ভনভন করছে। খুব বড় বড় আর অলস মাছি। ব্যথায় এরা যত না কাতর হয়েছে, মাছির জ্বালাতনে একেবারে জেরবার হয়ে পড়ল। স্কারলেটের চারদিকে শুধু দুর্গন্ধ আর কাতরানি। ডঃ মীডের পেছন পেছন একটা গামলা হাতে করে ঘুরতে ঘুরতে মাড় দেওয়া পোশাকের ভেতর ও একেবারে ঘেমে নেয়ে উঠল। 

ডাক্তার যখন বীভৎস ক্ষতের ওপর দিয়ে চকচকে ছুরি চালিয়ে দেন, তখন পাশে দাঁড়িয়ে থেকে স্কারলেট অনেক কষ্টে বমি আটকে রাখে। আর যে ওয়ার্ডে অঙ্গচ্ছেদ করা হচ্ছে, সেখান থেকে যে আর্তনাদ ভেসে আসে সেটা শুনতে পেলে গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে। কতজন অসুস্থ অবস্থায় অসহায় ভাবে ডাক্তারের অপেক্ষায় রয়েছে! হয়ত শুনবে, “আমি দুঃখিত, কিন্তু ওই হাতটা বাদ দিতেই হবে। আমি বুঝতে পারছি। কিন্তু ওই ঘা, ওটা তো থাকতে দেওয়া যাবে না।”

ক্লোরফর্ম এখন এত দূর্লভ যে শুধু মাত্র কঠিন অঙ্গচ্ছেদনের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে। আফিমও এত দূর্মূল্য যে তা দিয়ে শুধু মৃত্যুপথযাত্রীর যন্ত্রণা লাঘব করারও সুযোগ বিশেষ নেই। কুইনিন কিংবা আয়োডিনও একেবারেই নেই। স্কারলেটের কাছে সব কিছুই অসহ্য হয়ে উঠেছে। যদি ও মেলানির মত গর্ভাবস্থার অজুহাত খাড়া করতে পারত! এটাই এখন নার্সিং থেকে অব্যহতি পাবার সামাজিকভাবে গ্রাহ্য একমাত্র অজুহাত। 

দুপুর হতে না হতেই, স্কারলেট অ্যাপ্রন খুলে ফেলে, চুপি চুপি হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে পড়ল। মিসেজ় মেরিওয়েদার তখন একজন রোগা নিরক্ষর পর্বতারোহীর হয়ে চিঠি লিখে দিচ্ছিলেন। স্কারলেটের মনে হল ওর পক্ষে আর সহ্য করা সম্ভব নয়। ওর কাছে এটা একটা বোঝা বলে মনে হচ্ছিল। আর দুপুরে ট্রেন বোঝাই জখম সেনারা এসে পড়লে ওকে রাতভর পরিশ্রম করে যেতে হবে। খাবার সময়টাও পাবে না। 

দুটো ব্লক পেরিয়ে গিয়ে ও পীচট্রী স্ট্রীটে পড়ল। আঁট করে বাঁধা পোশাকের মধ্যে যতখানি সম্ভব, বুক ভরে নির্মল বাতাস টেনে নিল। একটা নিরিবিলি কোনে দাঁড়িয়ে এখন কি করবে ভাবতে লাগল। বাড়িতে ফিরে গিয়ে আন্ট পিটির সামনে দাঁড়াতে একটু লজ্জাই লাগছিল, কিন্তু হাসপাতালে যে আর ফিরে যাবে না সেটা মনে মনে ঠিক করে নিয়েছিল। ঠিক এমন সময় রেট বাটলার ওদিক দিয়ে যাচ্ছিলেন। 

“আরে তোমাকে একেবারে আস্তাকুড়ের বাচ্চাদের মত লাগছে যে!” স্কারলেটের দিকে তাকিয়ে এক গাল হেসে বললেন। ওর পরনে ল্যাভেন্ডার রঙের তালিমারা পোশাক। ঘামের দাহে সাদা হয়ে আছে। দু’এক জায়গায় গামলা থেকে জল পড়ে ভিজে গেছে। লজ্জায় আর রাগে স্কারলেট লাল হয়ে গেল। কেন যে ভদ্রলোক মেয়েদের পোশাকের দিকে অমন নজর দিয়ে দেখেন! আর ওর এই বেশভূষা নিয়ে এরকম রুঢ় মন্তব্য না করলেই কি নয়?

“আমি আপনার বক্তৃতা শুনতে চাই না। তার চেয়ে বরং আমাকে এমন কোন জায়গায় নিয়ে চলুন যেখানে কেউ আমাকে দেখতে পাবে না। হাসপাতালে আমি ফিরে যাব না, আমাকে ফাঁসিতে চড়ালেও না! এই সব যুদ্ধটুদ্ধ আমি শুরু করিনি আর সেজন্য আমাকে মুখে রক্ত তুলে খেটে মরতে হবে – এটা কোন যুক্তিই হল না আর ____”

“আমাদের মহান আদর্শের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা!”

“ও তাই! এ যে ছাঁকনি ছুঁচের পেছনে কেন ফুটো খুঁজে বেড়াচ্ছে! আমাকে সাহায্য করবেন কি না বলুন? কোথায় যাচ্ছেন জানতে চাই না, শুধু আমাকেও সঙ্গে নিয়ে চলুন।”

উনি গাড়ি থেকে নেমে পড়লেন। স্কারলেটের মনে হল এমন একজন লোকের দেখা পাওয়া ভাগ্যের কথা, যাঁর সব কটা অঙ্গপ্রত্যঙ্গই ঠিক ঠাক আছে, যাঁর একটা চোখ কিংবা একটা হাত বাদ চলে গেছে, যিনি ম্যালেরিয়া জ্বরে কাতরাচ্ছেন না, যাঁকে দেখে বোঝা যাচ্ছে যে ওঁর খাওয়াপরার কোন সমস্যাই নেই। উনি মানানসই কোট আর ট্রাউজ়ার পরে রয়েছেন। ঢোলাও নয় আবার টাইটও নয়। ছেঁড়াখোঁড়া নয়, এক্কেবারে নতুন। মনে হচ্ছে দুনিয়ার কোন কিছুতেই ওঁর যেন কোন পরোয়া নেই – আজকাল এরকম মানুষ দেখতেই পাওয়া যায় না। সবার মুখেচোখেই কেমন দুশ্চিন্তার ছায়া। উনি হাসিমুখে ওকে গাড়িতে তুলে নিলেন।

যখন ওর পাশে এসে বসলেন, তখন ওঁর সুদৃশ্য পোশাক ভেদ করে স্কারলেট ওঁর পেশি অনুভব করতে পারল। একজন বলশালী পুরুষমানুষের সান্নিধ্য পেলে যেরকম মনে হয়, স্কারলেটের সেরকমই অনুভুতি হল। চমৎকৃত হয়ে ওঁর চওড়া কাঁধের ওঠানামা লক্ষ্য করতে লাগল। মনে মনে একটু সম্ভ্রমের সঞ্চার হল। মনে হল ওঁর শরীর ওঁর মনের মতই শক্তসমর্থ। বিশ্রাম নেবার সময় এক চিতাবাঘের মতই মন্থর আবার শিকারের সময় চিতাবাঘের মতই ক্ষিপ্র।

“দূরাত্মার ছলের অভাব হয় না, কি বল!” ঘোড়ায় রাশ ধরে উনি বললেন। “কাল সারা রাত তুমি সৈন্যদের সঙ্গে কত নাচানাচি করলে – ওদের গোলাপ আর রিবন দিয়ে সম্বর্ধনা জানালে, বললে এই মহান যুদ্ধের জন্য তুমি প্রাণ দিয়ে দিতে পার – আর আজ দু’একজন জখম সৈন্যদের ব্যান্ডেজ বাধতেই আর একটা দুটো উকুন বাছতে ফিয়েই তুমি পালিয়ে এলে!”

“আপনি কি অন্য কিছু নিয়ে কথা বলতে পারছেন না? আর একটু তাড়াতাড়ি চালান! হয়ত এখুনি দাদু মেরিওয়েদার বেরিয়ে এসে আমাকে দেখে ফেলবেন আর ওই তালঢ্যাঙ্গা বুড়ি – মানে মিসেজ় মেরিওয়েদারকে – আমার নামে লাগাবেন!”

উনি আলতো করে ঘোড়ার পিঠে চাবুকটা ঠেকালেন, আর সেটাও ফাইভ পয়েন্ট পেরিয়ে যে রেল পথ শহরটাকে দুভাগে ভাগ করে দিয়েছে সেই পথ দিয়ে তাড়াতাড়ি চলতে শুরু করল। আহত সৈন্যের দল নিয়ে ট্রেন চলে এসেছে। প্রখর রোদের মধ্যে কিছু লোক ধরাধরি করে ওদের নিয়ে অ্যাম্বুলেন্সে আর ঢাকা দেওয়া অস্ত্রবাহী ওয়াগনে তুলছে। দেখেও স্কারলেটের কোন বিবেক দনশন অনভুত হল না, শুধু মনে মনে একটা স্বস্তির ভাব ছড়িয়ে পড়ল এই ভেবে যে ও পালিয়ে আসতে পেরেছে। 

“ওই পুরোনো হাসপাতালে সময় কাটাতে আমার একদম ভাল লাগছে না,” হাওয়াতে ওড়া স্কার্ট সামলাতে সামলাতে আর বনেটের ফিতে থুতনির নীচে শক্ত করে বাঁধতে বাঁধতে স্কারলেট বলল। “আর প্রত্যেক দিন এত নতুন নতুন জখম লোক চলে আসছে! পুরোটাই জেনারাল জনস্টনের ভুল। যদি ডালটনে ইয়াঙ্কিদের ঠেকিয়ে রাখতে পারতেন, তাহলে ____”

“উনি তো ইয়াঙ্কিদের ঠেকিয়ে রাখতেই চেয়েছিলেন, বোকা মেয়ে। ওখানে যদি উনি চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতেন, তাহলে ইয়াঙ্কিরা ওঁকে ঘিরে ফেলত আর দুদিক থেকে আক্রমণ চালিয়ে ওঁর বাহিনীকে গুঁড়িয়ে দিত। রেলপথ গুলো বেহাত হয়ে যেত – এই রেলপথ গুলো বাঁচানোর জন্যই জনস্টন লড়াই করছিলেন।”

“বেশ তো,” স্কারলেট বলল – রণকৌশল ওর মাথায় কিছুই ঢুকল না। “তবুও আমি বলব এটা ওঁরই ভুল। এই ব্যাপারে ওঁর কিছু একটা করা উচিত ছিল। আমার মনে হয় ওঁকে সরিয়ে দেওয়াই উচিত। উনি দাঁড়িয়ে থেকে যুদ্ধ না করে পিছিয়ে এলেন কেন?”

“অন্য কারোর থেকে তোমার কোন তফাৎ নেই – যেহেতু উনি অসম্ভব কাজটা করতে পারেন নি, তাই “তাঁর মাথা কেটে ফেল!” ডালটনে উনি ছিলেন যীশুর মত ত্রাণকর্তা, আর এখন কেনিসো পাহাড়ে গিয়ে উনি হয়ে গেছেন জুডাসের মত বিশ্বাসঘাতক! মাত্র ছ’সপ্তাহের মধ্যে! আবার যদি উনি ইয়াঙ্কিদের কুড়ি মাইল পেছনে ঠেলে দিতে পারেন তাহলেই আবার যীশু হয়ে উঠবেন! বৎসে, শেরম্যান জনস্টনের দ্বিগুণ সৈন্য নিয়ে জনস্টনের মোকাবেলা করছেন। আমাদের একজন বীর ছেলেদের একজন মারতে গিয়ে যদি ওঁর দুজন সৈন্য ঘায়েল হয় তাতে ওঁর খুব একটা ক্ষতি নেই। কিন্তু জনস্টনের একজন সৈন্যও যদি মারা যায় উনি বিপদে পড়ে যাবেন। ওঁর এখন দরকার অতিরিক্ত সৈন্য। তার বদলে উনি কি পাচ্ছেন? না জো ব্রাউনের পোষা কিছু অপদার্থ লোক! কি সাহায্য করবে ওরা?”

“সত্যিই কি স্থানীয় বাহিনীর ডাক পড়বে? আর হোম গার্ডদেরও? আমি তো সেরকম কিছু শুনিনি। আপনি কি করে জানেন?”

“এরকম একটা গুজব শোনা যাচ্ছে। আজ সকালে মিলেজভিল থেকে যে ট্রেন এসেছে, সেখানেই এই গুজবটা শুনতে পেয়েছি। স্থানীয় বাহিনী আর হোমগার্ড সবাইকেই যেতে হবে জেনারাল জনস্টনের দল ভারী করার জন্য। এবার গভর্নর ব্রাউনের পোষ্যদের লড়াইয়ের ময়দানে বারুদের গন্ধ শুঁকতে যেতেই হবে। আমার ধারণা, ওরা সবাই খুবই অবাক হবে। সত্যি লড়াই করার কথা ওরা স্বপ্নেও ভাবেনি। গভর্নর ওদের প্রায় কথাই দিয়ে রেখেছিলেন যে ওদের যেতে হবে না। কি অদ্ভুত রসিকতা! ভেবেছিল ওরা খুব নিরাপদেই আছে। জেফ ডেভিসকেও ভার্জিনিয়ায় যুদ্ধের সময় গভর্নর ওদের গায়ে হাত লাগাতে দেননি। অজুহাত দেওয়া হয়েছিল ওদের নাকি রাষ্ট্রের সুরুক্ষার জন্য দরকার। কে ভেবেছিল যে যুদ্ধ এত কাছাকাছি চলে আসবে আর ওদের সত্যি রাষ্ট্রের সুরক্ষার জন্য লড়াই করতে হবে!”

“আপনি নিষ্ঠুর বলেই এভাবে হাসতে পারছেন! বৃদ্ধ মানুষ আর বাচ্চা ছেলেদের কথাটা একবার ভাবুন – যাঁরা হোম গার্ডে রয়েছেন! বাচ্চা ফিল মীড, গ্র্যাণ্ডপা মেরিওয়েদার, আঙ্কল হেনরি হ্যামিল্টন – এঁদের যুদ্ধে যেতে হবে?”

“বাচ্চাদের কথা বলছি না – কিংবা মেক্সিকোর যুদ্ধের প্রবীণদের কথা বলছি না। বলছি উইলি গুইন্যানের মত কমবয়সিদের কথা – যারা সুন্দর ইউনিফর্ম পরে তলোয়ার ঘোরানো পছন্দ করে ___”

“আর আপনি নিজের কথা বললেন না তো?”

“আমাকে একটুও দুঃখ দিতে পারবে না! আমি তো আর ইউনিফর্ম পরে তলোয়ার উঁচিয়ে ঘুরে বেড়াই না। আর কনফেডারেসির কি হল না হল তাতে আমার কিছুই এসে যায় না! হোম গার্ড কিংবা সৈন্যবাহিনী আমাকে কিছু বলতেও পারবে না। ওয়েস্ট পয়েন্টে অনেক মিলিটারি অভিজ্ঞতা আমার আছে – সেটা দিয়েই আমি বাকি জীবন কাটিয়ে দিতে পারব .... অবশ্যই আমি বুড়ো জোয়ের ভাল চাই। জেনারাল লী ওঁকে কোন সাহায্য করতে পারছেন না, কারণ ইয়াঙ্কিরা ওঁকে ভার্জিনিয়াতে বিব্রত করে রেখেছে। তাই জর্জিয়ার রাষ্ট্রীয় বাহিনী ছাড়া জনস্টনের কোন গত্যন্তর নেই। এত কুশল একজন সমরকর্তার আরও একটু ভাল কিছু সাহায্য পাওয়া উচিত ছিল। ইয়াঙ্কিরা এসে পৌঁছানোর আগেই উনি সঠিক জায়গায় পৌঁছে যান। এভাবে ওঁকে পিছিয়ে আসতেই হবে। আর আমার কথাটা মনে রেখো – যেদিন ইয়াঙ্কিরা ওঁকে পাহাড়ের উঁচুনিচু রাস্তা থেকে সমতলে নামিয়ে ফেলতে পারবে, সেদিনই ওরা ওঁকে শেষ করে দেবে।” 

“মানে এখানে,” স্কারলেট ভয় পেয়ে চেঁচিয়ে উঠল। “আপনি খুব ভাল করেই জানেন যে ইয়াঙ্কিরা এত দূর এসে পৌঁছাতেই পারবে না!” 

“কেনিসো এখান থেকে মাত্র বাইশ মাইল দূরে, আর আমি বাজি ধরতে পারি ____”

“রেট, দেখুন রাস্তায় দেখুন! কত লোক দেখেছেন! কি আশ্চর্য ওরা তো সৈন্য নয়! ব্যাপারটা কি? আরে – ওরা তো নীগ্রোরা!”

চার দিকে ধুলোর মেঘ উড়ে যাচ্ছে – অনেক পায়ের শব্দ – আর ভারী গলায় গান গেয়ে একশর বেশি নীগ্রো নির্বিকার চিত্তে এগিয়ে আসছে। রেট গাড়িটাকে রাস্তার কিনারায় ফুটপাথের ওপর তুলে নিলেন। স্কারলেট অবাক হয়ে দেখল এক দঙ্গল নীগ্রো শাবল আর কোদাল কাঁধে নিয়ে ঘামতে ঘামতে একজন অফিসার আর কিছু ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের পোশাক পরা কিছু লোকের পেছন পেছন যাচ্ছে। 

“ব্যাপারটা কি রকম হল ___?” বলে স্কারলেট শুরু করল। 

বলতে বলতে সামনের সারির গান গাইতে থাকা কালো লোকটার দিকে চোখ পড়ল। প্রায় সাড়ে ছয় ফুট লম্বা – দৈত্যসুলভ গড়ন, কুচকুচে কালো। গানের সঙ্গে তালে তালে পা ফেলছে অবলীলায় এক শক্তিশালী জানোয়ারের মত। সবার সাথে গলা মিলিয়ে “Go down Moses” গাইবার সময় মাঝে মাঝে ওর ঝকঝকে সাদা দাঁত ঝিলিক মারছে। বিগ স্যাম ছাড়া আর কোন নীগ্রোরই এত ভরাট গলা নেই। স্যাম হল টারার ফোরম্যান। কিন্তু বিগ স্যাম এখানে কি করছে? বিশেষ করে যখন ওখানে কোন ওভারসীয়ার নেই – আর ও যে জেরাল্ডের ডান হাত! 

একটু ঝুঁকে পড়ে ভাল করে দেখার চেষ্টা করতেই, দৈত্যটা ওকে দেখতে পেল, আর চিনতে পেরে আনন্দে ওর মুখ উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। ও দাঁড়িয়ে পড়ে শাবলটা নামিয়ে রেখে স্কারলেটের দিকে এগিয়ে এল। কাছাকাছি যে সব নীগ্রোরা ছিল তাদের দিকে তাকিয়ে বলল, “আরে দেখ, দেখ! মিস স্কারলেট! এই লিজ, পোস্টল, প্রোফেট – এই দেখ মিস স্কারলেট এখানে!”

দলটার মধ্যে একটা ক্ষণিক বিভ্রান্তি দেখা গেল। অনিশ্চিতভাবে সবাই দাঁড়িয়ে পড়ল। হাসিমুখে বিগ স্যাম তিনজন দশাসই নীগ্রোকে নিয়ে রাস্তা পেরিয়ে দৌড়ে গাড়ির কাছে চলে এল। অফিসারও ওদের পেছন পেছন চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে ছুটতে লাগল। 

“এই – তোমরা – লাইনে ফিরে এস! ফিরে এস বলছি! নাহলে আমি কিন্তু – আরে মিসেজ় হ্যামিলটন আপনি যে! সুপ্রভাত ম্যাডাম! আরে আপনিও যে – আপনাকেও সুপ্রভাত! আপনারা কেন ওদের অবাধ্য হতে আশকারা দিচ্ছেন? ভগবান জানেন – সকাল থেকে এই লোকগুলোকে নিয়ে কি মুশকিলেই না পড়েছি!”

“ওহ ক্যাপটেন র‍্যান্ডাল, দোহাই ওদের বকবেন না! ওরা তো আমাদের লোক। এই হল বিগ স্যাম – আমাদের ফোরম্যান। আর এরা হল এলিজা, আপোস্টল আর প্রোফেট – ওরাও টারার লোক। ওরা তো আমার সঙ্গে কথা বলতেই পারে! হ্যা, বল তোমরা কেমন আছ?” 

ও একে একে সকলের সঙ্গে হাত মেলাল। ওর ছোট সাদা হাত ওদের কালো থাবার মধ্যে মিলিয়ে যেতে লাগল। হঠাৎ দেখা হয়ে যাওয়ায় চারজনেই খুব খুশি। ওদের মিস কত সুন্দরী সেটা বন্ধুদের দেখাতে পেরে মুখে গর্বের হাসি ফুটে উঠল। 

“টারা থেকে এত দূরে এসে তোমরা কি করছ? নিশ্চয়ই তোমরা পালিয়ে এসেছ! পাহারাদাররা তোমাদের ঠিক ধরে ফেলবে, দেখো।”

হাল্কা হাসি ঠাট্টায় ওরা মশগুল হয়ে গেল। 

“পালিয়ে এসেছি?” বিগ স্যাম বলল। “না মিস আমরা পালিয়ে আসিনি। ওরাই তো আমাদের নিয়ে এসেছে, কারণ আমরাই তো টারার সব থেকে বড় আর শক্তপোক্ত মজুর ছিলাম।” গর্বের হাসিতে ওর সাদা দাতগুলো বেরিয়ে পড়ল। “বিশেষ করে ওরা আমাকেই নিয়ে আসতে গেছিল। আমি ভাল গাইতে পারি। হ্যা মিস, মিস্টার কেনেডি নিজে এসে আমাদের নিয়ে যান।”

“কিন্তু কেন, বিগ স্যাম?”

“হে ভগবান, মিস স্কারলেট! আপনি শোনেননি! আমরা পরিখা খুঁড়ে রাখব – যেখানে সাদা ভদ্রলোকেরা লুকিয়ে পড়বেন – যখন ইয়াঙ্কিরা এসে পড়বে।”

ক্যাপটেন র‍্যাণ্ডাল আর গাড়ির অন্য সওয়ারিরা ওর রাইফেল রাখার গর্তের এই সরল ব্যাখ্যা শুনে হাসি চাপলেন। 

“মিস্টার জেরাল্ড তো বেঁকেই বসেছিলেন – বললেন আমাকে ছাড়া চালানো সম্ভব নয় ওঁর পক্ষে। কিন্তু মিস এলেন বললেন, ‘ওকে নিয়ে যান মিস্টার কেনেডি। বিগ স্যামকে আমাদের থেকে কনফেডারেসির বেশি দরকার।’ তারপর উনি আমাকে এক ডলার দিলেন, আর বললেন, যে এঁরা যা করতে বলবেন, তাই যেন আমি করি। তাই আমরা এখানে এসে পড়েছি।”

“এই সবের মানে কি, ক্যাপটেন র‍্যাণ্ডাল?”

“খুব সোজা। আটলান্টার সুরক্ষা ব্যবস্থা আমাদের পাকা করতে হবে – অনেক মাইল জুড়ে রাইফেল বসানোর জন্য খাদ তৈরি করে। জেনারাল তাঁর বাহিনী থেকে লোক দিতে পারবেন না। তাই আমরা গ্রামাঞ্চল থেকে শক্তিশালী মানুষ সংগ্রহ করে আনছি – এই কাজের জন্য।

“কিন্তু ___”

স্কারলেটের বুকের ভেতর দিয়ে একটা ঠাণ্ডা ভয়ের স্রোত বয়ে গেল। অনেক মাইল জুড়ে রাইফেল বসানোর খাদ। এত কিসের জন্য দরকার? এই গত বছরই তো অ্যাটলান্টাকে ঘিরে সুরক্ষাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে – শহরের মাঝখান থেকে এক মাইল দূরে। এগুলোর সাথে তো রাইফেল বসানোর খাদের সংযোগ করা হয়েছিল – আর সেগুলোও তো মাইলের পর মাইল জূড়ে ছিল। পুরো শহর ঘিরে। আরও রাইফেল বসাতে হবে!

“এতটা সুরক্ষিত থাকার পরেও আরও সুরক্ষার প্রয়োজন হচ্ছে! কিন্তু কেন? যেটা আছে সেটাই তো প্রয়োজনের বেশি। জেনারাল নিশ্চয়ই ____” 

“বর্তমান সুরক্ষা ব্যবস্থা শহরের থেকে মাত্র এক মাইল দূর পর্যন্ত ঘিরে রেখেছে,” ক্যাপটেন র‍্যাণ্ডেল সংক্ষেপে বললেন। “সেটা স্বস্তি দেবার পক্ষে যথেষ্ট নয়। নতুন বন্দোবস্ত আরও একটু দূরে গিয়ে করা হবে। বুঝতেই পারছেন, আর একবার পশ্চাদপসরণ হলেই ওরা অ্যাটলান্টার ঘাড়ের কাছে এসে পড়বে।”

বলেই উনি বুঝতে পারলেন কথাটা বলা অনুচিত হয়েছে, কারণ স্কারলেটের চোখ ভয়ে বিস্ফারিত হয়ে উঠল। 

“অবশ্য আর কোন পশাদপসরণ হবে না,” উনি তাড়াতাড়ি বলে উঠলেন। কেনিসো পাহাড় দূর্ভেদ্য।পুরো রাস্তার খুঁড়ে তোপ বসানো আছে। রাস্তাগুলোও আমাদের দখলে। সেটা পেরিয়ে ইয়াঙ্কিদের চলে আসার সম্ভাবনা প্রায় নেই।” 

স্কারলেট খেয়াল করল, কথা বলতে বলতে উনি রেটের মর্মভেদী দৃষ্টির সামনে পড়ে চোখ নামিয়ে নিলেন। স্কারলেট যথেষ্ট ভয় পেয়ে গেল। রেটের উক্তি মনে পড়ল, “আমার কথাটা মনে রেখো – যেদিন ইয়াঙ্কিরা ওঁকে পাহাড়ের উঁচুনিচু রাস্তা থেকে সমতলে নামিয়ে ফেলতে পারবে, সেদিন ওরা ওঁকে শেষ করে দেবে।”

“আচ্ছা ক্যাপটেন, আপনি কি মনে করেন ____”

“একদমই না! অত চিন্তা করবেন না, বুড়ো জো শুধু একটু সাবধান হওয়া পছন্দ করেন। আর সেই জন্যই নতুন কিছু সুড়ঙ্গ খোঁড়ার কথা ভাবা হচ্ছে। আচ্ছা – এবার আমাকে যেতে হবে .... আপনার সঙ্গে কথা বলে ভাল লাগল ... নাও তোমরা তোমাদের কর্ত্রীর কাছে বিদায় নাও, আর চল এগিয়ে যাই।”

“ঠিক আছে, ছেলেরা – আবার দেখা হবে। যদি তোমরা অসুস্থ হয়ে পড়, বা চোট লাগে বা কোন রকম অসুবিধ্যেয় পড়, তাহলে আসবে। আমি এই পীচট্রী স্ট্রীটেই একদম শেষের বাড়িটাতে থাকি। আর এক মিনিট –,” বলে স্কারলেট ওর থলি খুলে হাতড়ালো। “ওহ, একটা সিকি পয়সাও নেই দেখছি। রেট আমাকে কয়েকটা খুচরো টাকা ধার দিন তো। হ্যা ... এই নাও বিগ স্যাম ... তুমি সকলের জন্য একটু তামাক কিনে নিও ... আর লক্ষ্মী হয়ে থাকবে – ক্যাপটেন র‍্যাণ্ডালের কথা শুনে চলবে।”

আবার ওরা মিছিল করে চলতে শুরু করল। লাল ধুলো উড়তে লাগল। বিগ স্যাম আবার গান ধরল –

“Go do-wo Mos-es! Waaa-ay, do-own, in Ee-jup laa-an!
An’ te-el O-le Faa-ro-o
Ter let mah—pee-pul go!”

(মোজেস, তুমি সুদূর মিশরে যাও,/ ফারাওকে বল/ আমার লোকেদের যেন আসতে দেন।) 

“রেট, ক্যাপটেন র‍্যাণ্ডাল আমাকে মিথ্যে বললেন, তাই না? যেমন সব পুরুষমানুষই করে থাকেন – ভাবেন সত্যি কথা শুনলে হয়ত আমরা অজ্ঞান হয়ে পড়ব! সত্যিই কি উনি মিথ্যে বলছিলেন? আপনি বলুন রেট – যদি সত্যিই ভয়ের কিছু না থাকে তাহলে ওরা পরিখা খনন করছে কেন? আর সেনাবাহিনীতে লোকের এতই অভাব হয়ে পড়েছে, যে কালো মানুষদেরও কাজে লাগাতে হচ্ছে?” 

রেট একবার ঘোড়াটাকে আওয়াজ দিলেন।

“সেনাবাহিনীতে লড়াই করবার লোকের দুর্ভিক্ষ চলছে। না হলে শুধু শুধু হোমগার্ডদের টেনে নিয়ে যাবে কেন? আর পরিখা তৈরির ব্যাপারে বলতে পারি – অবরোধের সময় আত্মরক্ষায় কাজে আসবে। জেনারাল এখানে তাঁর শেষ লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন।”

“অবরোধ! আপনি ঘোড়া ঘুরিয়ে নিন। আমি বাড়ি চলে যাব – টারায় – আমাদের বাড়িতে – এক্ষুনি!”

“হঠাৎ হল কি তোমার?”

“কি বললেন? অবরোধ? হে ভগবান … বাপীর কাছে অবরোধের কথা শুনেছিলাম – উনি একবার অবরোধে পড়েছিলেন – নাকি ওঁর বাপী – ঠিক মনে পড়ছে না! বাপী বলেছিলেন __”

“কিসের অবরোধ?”

“দ্রোগেদার অবরোধ! ক্রমওয়েল আইরীশদের দখল নিয়েছিলেন। খিদের জ্বালায় ওঁদের ইঁদুর, বেড়াল, আরশোলা এমনকি নরমাংস পর্যন্ত খেতে হয়েছিল! শেষ পর্যন্ত ওঁরা আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হন। সত্যি মিথ্যে জানিনা, ক্রমওয়েল শহর দখল করার পরে মেয়েদের ধরে ধরে ____ মাগো অবরোধ!” 

“সত্যি বলতে কি তোমার মত এমন আগাপাশতলা অজ্ঞ মানুষ দুটো দেখেছি বলে মনে হয় না! ড্রোগেদার ব্যাপারটা ঘটেছিল ষোলশ কিছুতে – সেই সময় মিস্টার ও’হারার জন্মই হয়নি! আর একটা কথা বলি শোন, শেরম্যান আর ক্রমওয়েল এক নন।”

“হতেই পারে। সবাই বলে থাকে – উনি তার থেকেও খারাপ!”

“আহা সেই সময় আইরীশরা কত ভাল ভাল খাবার খেতে পেয়েছিল! আজকার হোটেলে যে সব খাবার দিচ্ছে – আর কিছুদিনের মধ্যে আমাকেও ইঁদুরের রোস্ট খেতে হতে পারে! এর চেয়ে রিচমন্ডে ফিরে যাওয়াই ভাল! পয়সা ফেললে ওখানে অন্তত ভাল খাবার পাওয়া যাবে,” স্কারলেটের ভয় পাওয়া মুখের ভাব নকল করে বললেন।

ভয় পাওয়ার ব্যাপারটা ধরা পড়ে যাওয়ায় স্কারলেট খুব চটে গেল। চেঁচিয়ে উঠল, “তাহলে মিছিমিছি এখানে পড়ে আছেন কেন! কেবল আয়েস করার চিন্তা, ভাল ভাল খাবারের লোভ আর পরকীয়া! ছিঃ!”  

“আয়েস, খাওয়া দাওয়া আর পরকীয়া ছাড়া কি করে ভাল থাকা যায় বল তো? আর সাধে কি এখানে পড়ে আছি? এই যে অবরোধ হবে হবে বলে শোরগোল উঠেছে – সে তো শুধু শুনেই গেলাম – দেখিনি তো কখনও! তা এই সুযোগে যদি একটা অভিজ্ঞতা হয়ে যায়। আমি তো আর যুদ্ধ করছি না। আমার আর ভয় কি? দ্যাখো স্কারলেট পিছিয়ে পোড়ো না। নতুন নতুন অভিজ্ঞতা দিয়ে নিজেকে সমৃদ্ধ করে তোলো।”

“আমি মোটেই পিছিয়ে নেই!”

“সে তুমিই ভাল বলতে পারবে! আর একটা কথা – যদিও কথাটা বলতে আমার বেশ লজ্জাই করছে – এখনও আমার কোনও অসহায়া রমণীকে উদ্ধার করার সুযোগ আসেনি। অবরোধ যদি হয়, আমি তোমাকে উদ্ধার করে নিয়ে যেতে পারব! সেটাও তো একটা অভিজ্ঞতা! কি বল?”

নিশ্চয়ই উনি পেছনে লাগছেন! কিন্তু মুহুর্তের জন্য মনে হল হালকাভাবে বললেও বলার ধরনে চপলতার বাইরেও গভীর কোনও অনুভুতির ছোঁয়া! 

মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, “কাজ নেই অত মহান হয়ে! প্রয়োজনে আমি নিজেকে রক্ষা করতে পারব!”

“একজন পুরুষমানুষকে এমন কথা বলতে নেই স্কারলেট! ইয়াঙ্কি মেয়েদের সমস্যা কোথায় জান? ওদের মধ্যেও আকর্ষণ কম নেই। কিন্তু ওই যে মুখের ওপর সত্যি কথা বলে দেবার বদ অভ্যাস! বাস্‌ সব আকর্ষণ খতম! ঈশ্বর ওদের রক্ষা করুন! ছেলেদেরও বলিহারি! কেন যে ওদের রক্ষা করার ভার ওদেরই ওপর ছেড়ে দেয় না, কে জানে!” 

“অসাধারণ! খুব বানিয়ে বানিয়ে কথা বলতে পারেন আপনি,” খুব ঠাণ্ডা গলায় স্কারলেট বলল। ইয়াঙ্কি মেয়েদের সাথে তুলনা করে আপনি আমাকে অপমান করতে চাইছেন! অবরোধের কথাটাও একদম মনগড়া! আপনি ভাল করেই জানেন, ইয়াঙ্কিরা অ্যাটলান্টার ধারে কাছেও ঘেঁষতে পারবে না।”

“লাগাও বাজি! এ মাসের মধ্যেই ওরা ঢুকে পড়ল বলে! এক বাক্স বনবনের বদলে তোমার একটা চুমু!” রেটের চোখ স্কারলেটের ঠোঁটের দিকে।

ইয়াঙ্কিদের আসার ভয়ে স্কারলেট একেবারে বিহ্বল হয়ে পড়েছিল। ‘চুমু’ কথাটা কানে আসতেই ও ভয় ভুলে ওঁর দিকে তাকাল। এটা ওর চেনা জায়গা। যুদ্ধ – সেনাবাহিনী – এসব মামুলি ব্যাপারের থেকে অনেক বেশি আকর্ষক। ভাবল ভদ্রলোককে ফাঁদে ফেলা গেছে। তবে ভাবনাটা প্রকাশ হতে দিল না। সেই যে সবুজ বনেটটা উনি দিয়েছিলেন, তারপরও উনি এমন কোনও ব্যবহার করেননি যাতে ভাবা যেতে পারে যে উনি ওর প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছেন। ওঁকে ফাঁদে ফেলার কোনও চেষ্টাই শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি। অথচ এখন নিজেই চুমুর কথা বলে ফাঁদে পা দিয়ে ফেলেছেন!

ভুরু কোঁচ করে খুব ঠাণ্ডা গলায় বলল, “শুনুন, বাজি ধজরতে আমার বয়েই গেছে! তাছাড়া একটা শুয়োরকে চুমু খেতে আমার কোনও আগ্রহই নেই!”

“সে কি? আইরীশদের শুয়োরের প্রতি একটা জন্মগত পক্ষপাত আছে বলেই শুনেছি! তোমরা নাকি খাটের নীচে শুয়োর রেখে দাও! কে জানে তোমার প্রেমিকরা কেন তোমাকে এত মাথায় তুলে নাচত? একটা চুমু তোমার ভীষণ দরকার – মানে সেই পুরুষের কাছ থেকে যে ঠিকঠাক মেয়েদের চুমু খেতে জানে!”

কথাটা যেভাবে চলার কথা ছিল, ঠিক যেন সেভাবে চলছে না! কথায় ও কোনও দিন ওঁর সঙ্গে পেরে ওঠেনি। কেবলই হেরে গিয়ে আঙ্গুল কামড়াতে হয়েছে।

গলায় শ্লেষ মিশিয়ে কিন্তু মাথা ঠাণ্ডা রেখে বলল, “মানে আপনি বলতে চাইছেন যে আপনিই একমাত্র লোক যিনি মেয়েদের ঠিকঠাক চুমু খেতে জানেন?”

“সে কথা আর বলতে!” খুব অবহেলার সঙ্গে রেট বললেন। “অবশ্য আমার যদি সেই কষ্ট স্বীকার করার ইচ্ছে হয়! তবে সেই সব মেয়েরা বলে থাকে যে আমি নাকি খুব সুন্দর চুমু খেতে পারি!”

একেবারে ওর আকর্ষণী ক্ষমতার ওপর কটাক্ষ! আস্পর্ধা দেখে স্কারলেট একেবারে রেগে আগুন হয়ে গেল। “আপনি তাহলে --?” ওঁর দিকে চোখ পড়তেই থেমে গেল। মুখে চটুল হাসি, কিন্তু ওঁর চোখের তারায় এ কিসের অভিব্যক্তি? অবশ্য মুহুর্তের জন্যই। স্কারলেট বিভ্রান্ত হয়ে পড়ল। 

“আচ্ছা একটা কথা বল তো। তোমাকে সবুজ বনেটটা দেবার পর আমি যে তোমার কাছ থেকে একটা চুমুও খেতে চাইনি – এতে তুমি আশ্চর্য হওনি?

“না – কখনোই না ____” 

“তাহলে তুমি কিন্তু সত্যি সত্যিই ভাল মেয়ে নও, স্কারলেট। শুনে খুব দুঃখ পেলাম। জানো তো ছেলেরা চুমু খাবার সুযোগ পেলেও যদি না খায়, তখন ভাল মেয়েরা একটু অবাকই হয়। এই চুমু খেতে চাওয়া যে উচিত কাজ নয়, এটা ওরা ভাল করেই জানে। আর এটাও জানে কেউ যদি সত্যিই চুমু খেয়ে ফেলে, তাহলে খুব অপমানিত হবার অভিনয় করতে হবে! তবে মনে মনে ওরা কিন্ত্য চায় যে ছেলেরা ওদের চুমু খাবার চেষ্টাটা অন্তত করুক! যাই হোক অত হতাশ হোয়ো না। একদিন না একদিন তোমাকে আমি চুমু খাব আর তোমার ভালও লাগবে। এখনই অত অধৈর্য হবার দরকার নেই।”

উনি যে আদতে রসিকতা করছেন, সেটা স্কারলেট বেশ বুঝতে পারল। আর উনি রসিকতা করলেই স্কারলেট বেদম রেগে যায়। এক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হল না। মুশকিল হল, ওঁর কথাগুলো খুব ফলে যায়! কুছ পরোয়া নেই! ফাঁদে নিজেই পা বাড়িয়েছেন! একবার অসভ্যতা করেই দেখুন না, স্কারলেট ওঁর সম্মান একেবারে ধুলোয় লুটিয়ে দেবে। 

“দয়া করে ঘোড়া ঘুরিয়ে নিন, ক্যাপটেন বাটলার? আমি হাসপাতালে ফিরে যেতে চাই।”

“ইহা কি বাস্তবিকই আপনার আন্তরিক অভিলাষ, হে নিবেদিতপ্রাণ দেশসেবিকা! তার মানে তুমি বলতে চাও আমার সঙ্গে আড্ডা মারার চাইতে উকুন আর আবর্জনা ঘাঁটা তোমার বেশি পছন্দের? তাহলে চল ফেরা যাক!” রেট ফাইভ পয়েন্টের দিকে ঘোড়া ঘুরিয়ে নিলেন। 

তারপর স্কারলেটের মেজাজের তোয়াক্কা না করেই বলে চললেন, “তাহলে বলেই ফেলি, সেদিন কেন তোমাকে চুমু খেতে চাইনি। আসলে বরাবরই আমি একটু স্বার্থপর। বাচ্চা মেয়েদের চুমু খেয়ে আমি কোনও মজা পাইনা। তাই চেয়েছিলাম তুমি আরও একটু বড় হও!” 

তারপর আড়চোখে স্কারলেটকের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলেন। প্রাণপনে ও রাগ চেপে রাখার চেষ্টা করে চলেছে।

“এছাড়া মাননীয় অ্যাশলে উইলক্সের স্মৃতিটাও একটু ফিকে হবার অপেক্ষা করছিলাম!”

অ্যাশলের নাম শোনা মাত্র বুকের ভেতরে মোচড় দিয়ে উঠল। চোখ থেকে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। ফিকে হয়ে যাবে? অ্যাশলের স্মৃতি কোনদিনও ফিকে হবে না! যদি ও হাজার বছর আগেও মরে গিয়ে থাকে তাহলেও না! কল্পনায় ওর মনে হল যেন অ্যাশলে লড়াই করতে গিয়ে জখম হয়ে পড়েছে – অনেক দূরের কোন ইয়াঙ্কিদের জেলখানায় মৃত্যুশয্যায় শুয়ে আছে, গায়ে দেবার মত কম্বল নেই, ভালবেসে হাতটা ধরবার মত কেউ নেই। আর এই সব ভেবে সঙ্গের লোকটার ওপর ঘৃণা উপচে পড়তে লাগল – যে কি না আরামসে খাচ্ছে দাচ্ছে আর গম্ভীর গলায় সব কিছু নিয়ে ঠাট্টা করে চলেছে। 

কোন কথা বলার ইচ্ছেই হল না ওর । চুপচাপ পথ চলতে লাগলেন দুজনে। 

“তোমার আর অ্যাশলের মধ্যের ব্যাপারটা আমি মোটামুটি ধরে ফেলেছি। টুয়েল্ভ ওকসে তোমার সেই লোক হাসানো দৃশ্য দেখার পর থেকে চোখ কান খোলা রেখে আমি অনেক কিছুই বুঝে নিয়েছি। এই যেমন স্কুলের বাচ্চা মেয়েদের মত বুকের মধ্যে অ্যাশলেকে নিয়ে তুমি একটা আবেগ পুষে রেখেছ! অ্যাশলেও হয়তো তার প্রতিদান দিয়ে থাকে। অবশ্যই নিজের ভদ্রলোক ভাবমূর্তি বাঁচিয়ে যতটুকু প্রতিদান দেওয়া সম্ভব ততটুকুই! এটাও বুঝে নিয়েছি মিসেজ় উইলক্স তোমাদের ব্যাপারটা নিয়ে কোনও সন্দেহই করেন না। জানি না কি জাদু করেছ ওঁকে! একটাই কথাই শুধু জানবার কৌতুহল হয় – মাননীয় অ্যাশলে কি তোমাকে একবারের জন্যও চুমু খেয়ে নিজের পবিত্রতাকে বিঘ্নিত হতে দিয়েছেন?”

স্কারলেট কোনও জবাব দিল না। 

“বেশ বেশ – বুঝে নিলাম! উনি তাহলে সত্যিই তোমাকে চুম্বন করেছেন। নিশ্চয়ই যখন উনি ছুটিতে এসেছিলেন? এখন হয়ত উনি আর এই ধরাধামে নেই! তুমি সেই স্মৃতিটুকু সম্বল করে দিন যাপন করে চলেছ। তবে আমার আশা আছে – একদিন না একদিন তুমি ভুলে যাবেই, আর তখন আমি ____”

রাগের চোটে স্কারলেট ঘুরে তাকাল।

“নরকে ঠাঁই হয় না আপনার!,” উত্তেজিত স্বরে বলে উঠল। “আর লাফ দিয়ে নেমে যাবার আগে গাড়ি থামিয়ে আমাকে নামিয়ে দিন। আর কোন দিনই আপনার সাথে আমি কথা বলব না।”

রেট গাড়ি থামালেন। আগে নেমে গিয়ে ওকে নামতে সাহায্য করার আগেই স্কারলেট লাফিয়ে গাড়ি থেকে নেমে পড়ল। ফ্রকের তলাটা গাড়িতে আটকে গেল। মুহুর্তের জন্য হলেও ফাইভ পয়েন্টের ভিড় ওর পেটিকোট আর অন্তর্বাস দেখতে পেল। রেট তাড়াতাড়ি ঝুঁকে পড়ে ওটা ছাড়িয়ে দিলেন। একবারও পেছনে না তাকিয়ে, কোন কথা না বলে স্কারলেট গট গট করে হেঁটে চলে গেল। উনি একবার মৃদু

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন