বুধবার, ৩ জুন, ২০২০

সের্গেই ত. সেমিয়োনভে'র গল্প: চাকর


ভাষান্তর: জ্যোতির্ময় নন্দী

[রুশ কথাশিল্পী সের্গেই তেরেন্তিয়েভিচ সেমিয়োনভ ১৮৬৮’র ২৮ মার্চ মস্কো গভর্নরেটের একটা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। দারিদ্র্যের কারণে তিনি শৈশবেই গ্রাম ছাড়তে বাধ্য হন, এবং এদিক ওদিক ফেরিওয়ালা, ঝালাইওয়ালা, মজুর, এমনকি এক অন্ধ ব্যবসায়ীর পথপ্রদর্শক প্রভৃতি নানা ছুটকো কাজ করে বেড়িয়েছেন। এসব অভিজ্ঞতাই তাঁর লেখার মালমশলা যুগিয়েছে।

মস্কোর সাহিত্য চক্র ‘স্রেদা’র সদস্য ছিলেন সেমিয়োনভ। রুশ তথা বিশ্ব কথাসাহিত্যের অগ্রণী পুরুষ লিও তলস্তয়, রুশ কথাসাহিত্যের আরেক স্তম্ভ ম্যাক্সিম গর্কি প্রমুখের কাছের মানুষ ছিলেন। সেমিয়োনভের সাথে পরিচয়ের দীর্ঘ সময় ধরে তাঁকে সমর্থন এবং অনুপ্রেরণা যুগিয়ে গেছেন তলস্তয়। সেমিয়োনভের লেখা প্রথম গল্প ‘দুই ভাই’ (১৮৮৭)-এর উচ্চ প্রশংসা করেছেন। ১৮৯৪-এ সেমিয়োনভের প্রথম গল্প সংগ্রহ ‘ক্রেস্ত্যানস্কিয়ে রাসকাজি’ (চাষীদের কাহিনি’)’র ভূমিকাও তলস্তয় লিখে দিয়েছিলেন। সেখানে তিনি সেমিয়োনভের লেখার প্রধান বৈশিষ্ট্য হিসেবে “সততা, বাস্তবতা, সরলতা, গভীরতা তথা লোকউপমা সমৃদ্ধ ভাষাশৈলী”র কথা উল্লেখ করেছেন।

গল্প ছাড়াও কিছু কবিতা, কয়েকটা নাটক, কিছু প্রবন্ধ এবং ’গ্রামে পঁচিশ বছর’ নামে তাঁর একটা স্মৃতিকথাও লিখেছেন সেমিয়োনভ। পস্রেদ্নিক প্রকাশনী (Posrednik Publishers)) প্রকাশিত স. ত. সেমিয়োনভের রচনাসমগ্র ১৯১২ সালে রুশ বিজ্ঞান একাডেমি পুরস্কার লাভ করে।বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে ১৯০৬ সালে তিনি নির্বাসিত হন। ১৯১৭’র রুশ সমাজতন্ত্রী বিপ্লবের পর স্বদেশের পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় সক্রিয় অংশ নেন। ১৯২২-এর ৩ ডিসেম্বর তিনি এক ডাকাতদলের হাতে খুন হয়ে যান। সেমিয়োনভের এই মর্মান্তিক মৃত্যু তাঁর ঘনিষ্ট বন্ধু মাক্সিম গর্কিকে গভীরভাবে আলোড়িত করেছিলো। সেই সময়ে তিনি লিখেছিলেন, সেমিয়োনভের লেখার গুরুত্ব স্বীকৃতি পেয়েছে, আর এর থেকে গুরুত্বপূর্ণ একজন লেখকের জীবনে কী হতে পারে? কোনো হত্যা বা মৃত্যু তাঁকে মুছে ফেলতে পারবে না।]
ইংরেজিতে টমাস সেল্টজারের রুশ গল্প সংগ্রহ ‘বেস্ট রাশিয়ান স্টোরিজ’-এ সেমিয়োনভের ‘চাকর’ (The Servant) গল্পটি ইংরেজি ভাষান্তরে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সেখান থেকেই এই বাংলা তরজমাটা করা হলো।
.........................................................................................................................................

১.

বড়দিনের একটু আগে এমন একটা সময়ে গেরাসিম মস্কোতে ফিরে এলো, যখন কাজ পাওয়া সবচেয়ে কঠিন, যখন মানুষ তার সবচেয়ে গরিব চাকরিটায়ও লেগে থাকে একটা উপহারের আশায়। চাষির ছেলেটা তিনটে হপ্তা কাটিয়ে দিলো একটা চাকরির চেষ্টায় বৃথা ঘোরাঘুরিতে।

সে থাকতো তার গ্রাম থেকে আসা আত্মীয় স্বজন আর বন্ধুদের সঙ্গে। আর যদিও তখনও তাকে তেমন বড় কোনো অভাবের মুখোমুখি হতে হয় নি, তবুও তার মতো একজন সুস্থসবল জোয়ানমর্দ কিছু না করে বসে কাটাবে, এটা তার ভালো লাগতো না।

গেরাসিম মস্কোতে আছে একেবারে শৈশব থেকেই। নিতান্ত শিশুবয়সেই তাকে বোতল ধোয়ার কাজ নিতে হয়েছিলো একটা চোলাই কারখানায়, আর তারপর নিম্নপদমর্যাদার ভৃত্য হিসেবে কাজ নিয়েছিলো একটা বাড়িতে। গত দু বছর ধরে সে কাজ করছিলো একজন ব্যবসায়ীর কর্মচারী হিসেবে। ফৌজি ডিউটির জন্যে গাঁয়ে ডেকে পাঠানো না হলে এখনও সে ওই চাকরিতেই থাকতো। তাকে অবশ্য সেনাবাহিনীতে নেয়া হয় নি। গাঁয়ে থাকাটা তার খুব একঘেয়ে মনে হচ্ছিলো। গ্রামীণ জীবনে সে অভ্যস্ত নয়। তাই সে স্থির করলো, গ্রামে থাকার চেয়ে সে বরং মস্কোর রাস্তায় বসে নুড়িপাথর গুণবে।

কিন্তু অলসভাবে মস্কোর রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ানোটা দিন দিন তার কাছে অসহ্য থেকে অসহ্য হয়ে উঠছিলো। যে-কোনোরকমের একটা কাজের সন্ধানে সে চেষ্টার কোনো ত্রুটি রাখে নি। পরিচিত সবাইকে সে জ্বালিয়ে মেরেছে। এমনকি রাস্তাঘাটে মানুষের পথ আটকে জানতে চেয়েছে তাদের কাছে কোনো কাজকর্মের খবর আছে কিনা। সব বৃথা চেষ্টা।

নিজের লোকদের ওপর বোঝা হয়ে ওঠাটা শেষপর্যন্ত গেরাসিমের অসহ্য হয়ে উঠলো। ওদের কেউ কেউ বিরক্ত হতো ওদের কাছে গেরাসিমের আসা যাওয়ায়। কাউকে কাউকে তার কারণে অপ্রীতিকর কথা শুনতে হয়েছিলো তাদের মালিকদের কাছ থেকে। কী যে করবে, সে কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলো না। মাঝে মাঝে তার পুরো এক-একটা দিন কাটছিলো একদম না খেয়ে।


২.

হাঁটতে হাঁটতে গেরাসিম একদিন চলে গেলো তার একই গাঁয়ের লোক এক বন্ধুর বাড়িতে। সে থাকতো মস্কোর একেবারে সর্বশেষ প্রান্তে, সকোলনিকের কাছে। লোকটা ছিলো শারোভ নামের একজন ব্যবসায়ীর ঘোড়ার গাড়ির কোচম্যান। বহুবছর ধরে এ চাকরি করছে সে। মালিকের বিশেষ অনুগ্রহভাজন হয়ে উঠেছিলো সে। এতটাই যে শারভ তাকে মনে-প্রাণে বিশ্বাস করতো এবং তাকে যে খুবই নেকনজরে দেখে তার বহু প্রমাণ রেখেছিলো। মূলত লোকটার অসম্ভব বাকপটুতাই তাকে তার মালিকের আস্থাভাজন করে তুলেছিলো। সব চাকরবাকরের বিষয়ে সে মালিককে বলতো, এবং এটার জন্যে শারভ তাকে দাম দিতো।
গেরাসিম এগিয়ে গিয়ে তাকে সম্ভাষণ জানালো। কোচম্যান তার অতিথিকে ঠিকমতো অদর আপ্যায়ন করলো। তাকে চা খাওয়ালো, এবং চায়ের সঙ্গে কিছু টা-ও। তারপর তাকে জিজ্ঞেস করলো কাজকম্মো কী করছে।
“তোমার মালিককে বলো নি, তোমাকে চাকরিতে ফিরিয়ে নিতে?”
“বলেছিলাম।”
“সে তোমাকে আর নেবে না?”
“ওই কাজে সে একজনকে এর মধ্যেই নিয়ে নিয়েছে।”
“এই হলো অবস্থা। এই হলো তোমরা ছেলেছোকরাদের অবস্থা। তোমরা তোমাদের মালিকের ওখানে যেনতেনভাবে কাজ করো, আর তারপর একবার কাজ ছেড়ে দিলে, ফিরে আসার পথটা নোংরা করে রাখো। মালিককে এমনভাবে সেবা দেবে যেন সে তোমার সম্পর্কে অনেক ভাবতে বাধ্য হয়, যাতে তুমি আবার ফিরে এলে সে তোমাকে ফেরাতে না পারে, বরং তোমার জায়গায় নতুন যাকে নিয়েছে তাকেই বাতিল করে দেয়।”

“এটা কী করে করা যাবে? আজকালকার দিনে ওরকম মালিকই নেই, আর আমরাও তো ঠিক দেবতা নই।”
“বাজে কথা বলে কী লাভ? আমি তোমাকে শুধু আমার নিজের সম্পর্কে বলতে চাইছি। যদি কোনো কারণে আমি এই চাকরিটা ছেড়ে দিয়ে বাড়ি চলে যাই, আমি ফিরে এলে শারভ সায়েব একটা কথাও না বলে শুধু যে আমাকে আবার কাজে নিয়ে নেবেন তা-ই না, খুব খুশি হয়েই নেবেন।”
গেরাসিম তখন মাথা নিচু করে বসে ছিলো। সে দেখতে পেলো, তার বন্ধু বড়াই করছে। তবে তার কথায় সায় দিয়ে তাকে তুষ্ট করাটাই গেরাসিমের ভালো মনে হলো।
“সেটা আমি জানি,” সে বললো। “কিন্তু তোমার মতো লোক খুঁজে পাওয়া কঠিন, ইয়েগর দানিলিচ। তুমি যদি কাজের লোক হিসেবে খারাপ হতে, তোমার মালিক নিশ্চয় তোমাকে বারো বছর ধরে চাকরিতে রাখতো না।”
ইয়েগর হাসলো। প্রশংসটা তার ভালো লেগেছে।
“এই হলো গিয়ে কথা,” সে বললো। “আমি যেভাবে থাকি আর কাজ করি তুমিও যদি সেটা চাও, মাসের পর মাস তুমি কাজ ছেড়ে কোথাও যেতে পারবে না।”
গেরাসিম কথাটার কোনো জবাব দিলো না।
ইয়েগরকে তার মালিক ডেকে পাঠালো।
“একটুখানি বসো,” গেরাসিমকে বললো সে, “আমি এক্ষুণি ফিরে আসছি।”
“ঠিক আছে।”


৩.

ফিরে এসে ইয়েগর জানালো যে, আধঘণ্টার মধ্যে তাকে ঘোড়াগুলোকে লাগাম পরিয়ে তার মালিককে শহরে নিয়ে যাওয়ার জন্যে তৈরি করে নিতে হবে। নিজের পাইপটা ধরিয়ে তার কামরার মধ্যে কয়েক পাক পায়চারি করে নিলো সে। তারপর গেরাসিমের ঠিক সামনেটায় এসে দাঁড়িয়ে গেলো।
“শোনো, ছেলে,” সে বললো, “তুমি চাইলে তোমাকে এখানে চাকর হিসেবে কাজে নেয়ার জন্যে আমি মালিককে অনুরোধ করতে পারি।”
“তার কি লোকের দরকার আছে?”
“আমাদের একজন লোক আছে, কিন্তু সে অত ভালো না। সে বুড়ো হয়ে যাচ্ছে, এবং কাজ করা তার জন্যে দিন দিন খুবই খঠিন হয়ে পড়ছে। আমাদের ভাগ্যি ভালো বলতে হবে যে, এ এলাকাটা খুব বেশি চনমনে না এবং যেভাবে এখানে সবকিছু রাখা হচ্ছে। তা নিয়ে পুলিস খুব বেশি উচ্চবাচ্য করে না। তা না হলে আমাদের বুড়ো সায়েবের পক্ষে জায়গাটাকে ওদের জন্যে যথেষ্ট পরিষ্কার রাখাটা শক্ত হয়ে দাঁড়াতো।”

“ওহ্, তা হলে দয়া করে আমার জন্যে দুটো কথা বোলো, ইয়েগর দানিলিচ। আমি সারা জীবন তোমার জন্যে ভগবানের কাছে প্রার্থনা করবো। কাজ ছাড়া থাকাটা আমার একদম সহ্য হচ্ছে না।”
“ঠিক আছে, মালিককে আমি তোমার কথা বলবো। কালকে তুমি আরেকবার এসো, আর এখন তুমি এই দশটা কোপেক নিয়ে যাও। তোমার কাজে আসতে পারে।”
“ধন্যবাদ, ইয়েগর দানিলিচ। তা হলে আমার জন্যে একটু চেষ্টা করবে তো? দয়া করে আমার দিকে একটু মুখ তুলে চাও।”
“ঠিক আছে। তোমার জন্যে যথাসাধ্য চেষ্টা করবো আমি।”
“গেরাসিম চলে গেলো, এবং ইয়েগর তার ঘোড়াগুলোকে লাগাম পরিয়ে নিলো। তারপর সে কোচোয়ানের পোশাক পরে নিয়ে গাড়ি চালিয়ে বেরিয়ে এলো সামনের দরজা দিয়ে। অন্যদিকে শারভ সাহেবও বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে গাড়িতে উঠলেন, আর ঘোড়া দুটো খুরের শব্দ তুলে গাড়িসহ বেরিয়ে গেলো। শহরে ব্যবসার কাজ দেখাশোনা করে তিনি একসময় বাড়ি ফিরে এলেন। মালিক খোশমেজাজে আছে দেখে ইয়েগর তাকে বললো:
“ইয়েগর ফিওদরিচ, আপনাকে আমার একটা অনুরোধ রাখতে হবে।”
“কী অনুরোধ?”
“আমাদের গ্রাম থেকে একটা ছেলে এসেছে। খুব ভালো ছেলে। তার জন্যে একটা কাজ দরকার।”
“ঠিক আছে।”
“আপনি তাকে কাজে নিতে পারবেন না?”
“আমি ওকে নিয়ে কী করবো?”
“এখানকার সব কাজকম্মে ওকে লাগিয়ে দেবেন।”
“তা হলে পলিকারপিচকে নিয়ে কী করবো?”

“লোকটা তো কোনো কাজের না! ওকে আপনার বিদেয় করার সময় এসে গেছে।”
“ওটা ঠিক হবে না। সে আজ কত বছর ধরে আমার সঙ্গে আছে। কোনো কারণ ছাড়া আমি তাকে ওভাবে বিদায় করতে পারবো না।”
“বুঝলাম সে অনেক বছর ধরে আপনার জন্যে কাজ করেছে। কিন্তু সে তো মিনিমাগনায় করে নি। তার জন্যে তাকে নিয়মিত মাইনে দেয়া হয়েছে। নিজের বুড়ো বয়েসের জন্যে সে নিশ্চয় কিছু টাকা জমিয়ে রেখেছে।”
“জমিয়ে রেখেছে! কী করে? কোত্থেকে? এ দুনিয়ায় সে তো একা না। তাকে তার বউয়ের ভরণ পোষণও করতে হয়।”

“তার বউ নিজেই টাকা কামায়। দিনের বেলা ঠিকে-ঝিয়ের কাজ করে সে।”
“সে কত টাকা কামায় আমার জানা আছে। ক্ভাস* কেনার পয়সা জোটে কিনা সন্দেহ!”
“পলিকারপিচ আর তার বউকে নিয়ে আপনি অত ভাবছেন কেন? আপনাকে সত্যি কথাটা বলি-- চাকর হিসেবে সে খুবই খারাপ। কেন আপনি তার পেছনে আপনার টাকাগুলো বাজে খরচ করছেন? সে কখনোই দরজার বরফগুলো সময়মতো পরিষ্কার করে না। কোনোকিছুই সে ঠিকমতো করতে পারে না। আর যখন রাতের পাহারায় তার পালা আসে, সে রাতপিছু অন্তত দশবার পাহারা ছেড়ে কোথায় সরে পড়ে। বাইরে তার নাকি বড্ড ঠান্ডা লাগে। দেখবেন, তার কারণেই কোন্ দিন আপনি পুলিসের ঝামেলায় পড়ে যাবেন। পুলিসের পরিদর্শক শিগগিরই এখানে আসছেন। পলিকারপিচের নানা কীর্তির জন্যে তাঁর কাছে জবাবদিহি করাটা আপনার নিশ্চয় ভালো লাগবে না।”
“তারপরও কাজটা খুব বাজে হবে। সে পনের বছর ধরে আমার কাছে আছে। আর এখন তার এই বুড়ো বয়সে তাকে বের করে দেয়াটা-- এতে পাপ হবে।”
“পাপ হবে! কেন, এতে আপনি কোন্ অন্যায়টা করছেন? সে না খেয়ে মরবে না। সে সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যাবে। সেটাই তার জন্যে ভালো হবে। বুড়ো বয়েসে শান্তিতে থাকতে পারবে।”

শারভ ভাবতে লাগলো।
“ঠিক আছে,” অবশেষে বললো সে। “নিয়ে এসো তোমার বন্ধুকে। দেখি, তার জন্যে কী করতে পারি।”

“ওকে নিয়ে নিন, সায়েব। ওর জন্যে আমার এত দুঃখ হয়! এত ভালো একটা ছেলে, অথচ আজ কতদিন ধরে বেকার। আমি জানি, সে তার কাজকম্মো খুব ভালো করবে এবং আপনার বিশ্বাসী হবে। ফৌজি ডিউটির জন্যে গাঁয়ে ফিরতে বাধ্য হয়ে সে আগের চাকরিটা হারিয়েছে। তা না হলে তার মালিক কখনোই তাকে ছাড়তেন না।”


৪.

পরদিন সন্ধ্যায় গেরাসিম ফের এসে জিজ্ঞেস করলো:
“কী, আমার জন্যে কিছু করতে পারলে?”
“খানিকটা পেরছি মনে হয়। এসো, আগে একটু চা খেয়ে নিই। তারপর আমরা আমার মালিকের সঙ্গে দেখা করতে যাবো।”
এমনকি চা খাওযার দিকেও গেরাসিমের মন যাচ্ছিলো না। একটা সিদ্ধান্ত শোনার জন্যে সে আকুল হয়ে ছিলো। কিন্ত তার শুভানুধ্যায়ী বন্ধুর প্রতি ভদ্রতাবশত সে দু গ্লাস চা খেয়ে ফেললো। তারপর তারা গেলো শারভের কাছে।
শারভ গেরাসিমকে জিজ্ঞেস করলো আগে সে কোথায় চাকরি করতো এবং সে কী কী কাজ করতে পারে। তারপর জানালো, সে তাকে বাড়ির সব কাজের লোক হিসেবে নিয়োগ করতে চায়, এবং সে যেন কাজের দায়িত্ব নিতে তৈরি হয়ে পরদিন চলে আসে।
ভাগ্যের এই বিরাট বদান্যতায় গেরাসিম একেবারে স্তম্ভিত হয়ে গেলো। সে এত বেশি খুশি হলো যে, তার মনে হলো, সে যেন হেঁটে নয়, উড়ে চলেছে। কোচোয়ানের কামরায় গেলো সে। তখন ইয়েগর তাকে বললো:
“তো বাছা, এখন তোমার কাজকম্মগুলো ঠিকঠাক করার দিকে খেয়াল রেখো, যাতে তোমার জন্যে আমাকে লজ্জায় পড়তে না হয়। মালিকরা কেমন হয় তা তো তুমি জানো। তুমি যদি একবার ভুল করো, তারা সারাক্ষণ তোমার নানা ভুল খুঁজে বের করার চেষ্টায় থাকবে এবং তোমাকে একদম- শান্তিতে থাকতে দেবে না।”
“ও নিয়ে তুমি ভেবো না, ইয়েগর দানিলিচ।”
“আচ্ছা-- আচ্ছা।”
ইয়েগরের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে উঠোনটা পেরিয়ে গেরাসিম এগিয়ে গেলো ফটকের দিকে। উঠোনের একধারে ছিলো পলিকারপিচের কামরা, আর সেখান থেকে চওড়া একফালি আলো এসে পড়েছিলো গেরাসিমের হেঁটে যাওয়ার পথে। সামনে তো সে ওই কামরাতেই থাকবে, আর তাই তার খুব ইচ্ছে হলো ঘরটাকে একনজর দেখার। কিন্তু কামরাটার জানালার কাঁচে এমনভাবে তুষার জমেছিলো যে, ভেতরে উঁকি দিয়ে কিছুই দেখার উপায় ছিলো না। তবে সে শুনতে পেলো, ভেতরে কারা যেন কথা বলছে।
“এখন আমরা কী করবো?” একটা নারীকণ্ঠ বললো।
“জানি না-- আমি জানি না,” একটা পুরুষকণ্ঠ-- নিঃসন্দেহে পলিকারপিচ-- উত্তর দিলো। ‘ভিক্ষে করতে হবে মনে হয়।”
“ওটা করাই শুধু বাকি। আর কিছু তো আমাদের করার নেই,” মেয়েছেলেটা বললো। “আহা, আমরা গরিবেরা কী কষ্টের জীবনই-না কাটাই! সকাল থেকে গভীর রাত অব্দি আমরা শুধু কাজ করেই মরি, দিনের পর দিন। আর যখন আমরা বুড়ো হয়ে যাই তখন বলা হয়, ‘যাও, বিদায় হও!’”
“আমরা কী করতে পারি বলো? আমাদের মালিক আমাদের লোক নন। ওনাকে এ মুহূর্তে কিছু বলাটাও নিরর্থক। উনি শুধু নিজের সুবিধেটাই দেখছেন।”
“সব মালিকরাই এত নীচু মনের! ওরা শুধু নিজেদেরটা ছাড়া আর কারো কথা ভাবে না। এটা ওদের মনে আসে না যে, আমরা বছরের পর বছর ধরে তাদের জন্যে সৎ আর বিশ্বস্তভাবে কাজ করি। আমাদের সেরা শক্তি-সামর্থ্যটা তাদের জন্যেই খরচ করে ফেলি। আর ওরা বাড়তি একটা বছরও আমাদেরকে রাখতে ভয় পায়, এমনকি তাদের কাজ করার মতো শক্তি আমাদের পুরোপুরি থাকা সত্ত্বেও। আমাদের গায়ে যথেষ্ট জোর না থাকলে আমরা নিজেরাই স্বেচ্ছায় চলে যেতাম।”

“আসলে এর জন্যে মালিক যতটা না, কোচোয়ানই তার চেয়ে বেশি দায়ী। ইয়েগর দানিলিচ চায়, তার এক বন্ধু এখানে একটা ভালো কাজ পাক।”
“হ্যাঁ, সে আস্ত একটা সাপ। কিভাবে জিভ নাড়াতে হয়, সে জানে। দাঁড়া, ব্যাটা নোংরা জিভের জানোয়ার, তোর সঙ্গে সব হিসেব আমি চুকিয়ে দেবো। আমি সোজা মালিকের কাছে গিয়ে জানিয়ে দেবো কীভাবে এই লোকটা তাঁকে ঠকায়, কীভাবে সে ঘোড়ার খড় আর জাব চুরি করে। আমি এটা লিখিতভাবে জানাবো, আর তখন তিনি বুঝতে পারবেন এ লোকটা তাঁকে আমাদের সম্পর্কে কেমন সব মিথ্যে কথা বলে।”

“না, ওটা কোরো না, বউ। পাপ কোরো না।”

 “পাপ? আমি যা যা বললাম, সব কি সত্যি নয়? যা বলছি, তার প্রতিটা অক্ষর আমি জানি, আর এখন এটা সোজাসুজি মালিকের মুখের ওপর বলতে চাইছি। তাঁর নিজের চোখে সব দেখা উচিত। কেন দেখবেন না? আমরা এখন আর কীই-বা করতে পারি? আমরা কোথায় যাবো? সে আমাদের শেষ করে দিয়েছে, শেষ করে দিয়েছে।”
বয়স্ক মেয়েমানুষটা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলো।
কথাগুলো সব শুনলো গেরাসিম। ওগুলো যেন ছুরির মতো বিঁধে গেলো তার বুকে। এ দুটো বুড়ো-বুড়িকে সে যে কী দুর্ভাগ্যের দিকে ঠেলে দিতে যাচ্ছে, এটা বুঝতে পেরে তার হৃৎপিণ্ডটা যেন কুঁকড়ে গেলো। দুঃখভারাক্রান্ত, চিন্তাকুল মনে অনেকক্ষণ ওখানে দাঁড়িয়ে রইলো সে। তারপর সে আবার ফিরে গেলো কোচোয়ানের কামরায়।
“এ্যাঁ, কিছু ফেলে গেছো নাকি?”
“না, ইয়েগর দানিলিচ,” গেরাসিম আমতা আমতা করে বললো, “আমি এসেছি-- শোনো-- আমাকে তুমি যেভাবে নিয়েছো, আমার জন্যে এত যে কষ্ট করেছো, তার জন্যে আমি তোমাকে বার বার ধন্যবাদ জানাচ্ছি-- কিন্তু-- আমি চাকরিটা নিতে পারবো না।”
“কী! এর অর্থ কী?”
“কিছু না। এ চাকরিটা আমি চাই না। আমি নিজে পরে আরেকটা খুঁজে নেবো।”

রাগে ফেটে পড়রো ইয়েগর।
“তুমি কি সবার সমানে আমাকে বোকা বানালে, তুমি, ব্যাটা গর্দভ? এখানে যখন এসেছিলে, তখন তো কেমন মিউ মিউ করছিলে-- ‘আমার জন্যে একটু চেষ্টা করো, একটুখানি চেষ্টা করো’-- আর এখন তুমি চাকরিটা নিতে চাইছো না। হতচ্ছাড়া কোথাকার! তুমি আমার মুখটা পুড়িয়ে ছাড়লে!”
এর জবাব দেয়ার মতো কোনো কথা গেরাসিম খুঁজে পেলো না। তার মুখ লাল হয়ে গেলো, চোখ নামিয়ে নিলো সে। এক ঝটকায় ঘুরে গিয়ে গেরাসিমের দিকে পেছন করে দাঁড়ালো ইয়েগর, এবং আর কিছু বললো না।
তারপর নিজের টুপিটা তুলে নিয়ে কোচোয়ানের কামরা থেকে বেরিয়ে এলো গেরাসিম। দ্রুত পায়ে উঠোনটা পেরুলো সে। তারপর ফটকটা পেরিয়ে নেমে এলো রাস্তায়।
রাস্তা দিয়ে পা চালিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিলো সে। খুশি খুশি লাগছিলো তার। মনটা হাল্কা লাগছিলো।

 ***


অনুবাদক পরিচিতি: জ্যোতির্ময় নন্দী একজন সু-অনুবাদক হিসেবে তিনি ইতোমধ্যেই সুধিজনের নজর কেড়েছেন। সংস্কৃত, ইংরেজি, ফরাসি, হিন্দি প্রভৃতি ভাষা থেকে ধ্রুপদী ও সমকালীন সাহিত্যের নানা মনিমুক্তো তিনি বাংলায় অনুবাদ করে চলেছেন অনেকদিন ধরে, অবিরাম, অক্লান্তভাবে। তাঁর বেশকিছু অনুবাদকর্ম ইতোমধ্যে মুদ্রিত ও গ্রন্থিত হয়েছে।
জ্যোতির্ময়ের জন্ম ১৯৫৬’র ১ আগস্ট চট্টগ্রাম শহরে। তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা পাঁচ। এগুলোর মধ্যে রয়েছে: কবিতার বই ‘শিশু তুমি মাটির কাছে’ (বলাকা প্রকাশন, চট্টগ্রাম), ‘পানপাত্রে গচ্ছিত রাত্রি’ (অ্যাড কমিউনিকেশান, চট্টগ্রাম) ও ‘আমার কবিতা যেন থাকে দুধেভাতে’ (অন্য মুখ প্রকাশনী, ঢাকা); বানান শিক্ষামূলক ছড়া-কবিতার বই ‘যুক্তাক্ষরের ছড়াছড়ি’ (মিতাক্ষরা, চট্টগ্রাম), ইংরেজি সাহিত্যের ধ্রুপদী নভলেট, জোসেফ কনরাডের ‘হার্ট অব ডার্কনেস’এর বাংলা ভাষান্তর ‘অন্ধকারের অন্তঃস্থলে’ (পরমানন্দ প্রকাশনী, ঢাকা), উর্দু ছোটগল্পের অনুবাদ ‘উর্দুওয়ালি’ ও জাপানি কবিতার অনুবাদ ‘হ্যাকুনিন্ ইস্শু: শত কবির শত কবিতা’ (থড়িমাটি, চট্টগ্রাম)।
পেশায় তিনি একজন সাংবাদিক। গত প্রায় সাড়ে তিন দশক ধরে ঢাকা ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন নামি দৈনিক, নিউজ পোর্টাল ও টিভি চ্যানেলে কাজ করার পর বর্তমানে ফ্রি-ল্যান্সার হিসেবে ঢাকায় কর্মরত।


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন