বুধবার, ৩ জুন, ২০২০

হারুকি মুরাকামি'র গল্প : দ্যা ইয়ার অফ স্প্যাগেটি

অনুবাদ: আলভী আহমেদ 


খ্রিস্টের জন্মের ঠিক এক হাজার নয় শত সত্তর বছর পরের ঘটনা। ১৯৭১ সাল - সেটা ছিল আমার স্প্যাগেটির বছর। 

বছর জুড়ে বেঁচে থাকার জন্য আমি শুধু স্প্যাগেটি খেয়েছি এবং বেঁচে থাকতাম শুধুমাত্র স্প্যাগেটি খাব বলে। স্প্যাগেটি রান্না করা ছিল আমার জীবনের একমাত্র বিনোদন। চুলায় স্প্যাগেটি সিদ্ধ হচ্ছে, সেখান থেকে গরম ভাপ উঠছে- এই মহান দৃশ্য নিয়ে আমার বড় গর্ব হত। কড়াইতে টমেটো সসের বুদবুদ ছিল আমার বেঁচে থাকার প্রেরণা।

বেশ আয়োজন করেই আমি আমার স্প্যাগেটি অভিযান শুরু করেছিলাম। 

প্রথমেই, একটা বড়সড় দোকান আমি খুঁজে বের করলাম- যেখানে সব ধরনের রান্নাবান্নার জিনিস পাওয়া। বেশ বাছাবাছির পর একটা কিচেন টাইমার কিনলাম। স্প্যাগেটি কতক্ষণ ধরে সিদ্ধ হবে সেই সময়টুকু নিয়ে আমি কোনও আপোষ করতে চাইনি। সিদ্ধ করার জন্য একটা বড় এলুমিনিয়ামের পাত্র কিনলাম। পাত্রটা এত বিশাল ছিল যে, অনায়াসে একটা জার্মান শেফার্ড টাইপের কুকুরকে সেখানে বসিয়ে গোসল করানো যাবে। আমাকে প্রচুর স্প্যাগেটি খেতে হবে। তাই, রান্নার পাত্রটাও বড় হওয়া প্রয়োজন ছিল। 

এরপর স্প্যাগেটি রান্নায় কি কি জিনিস ব্যবহার করা যেতে পারে, সেগুলো খুঁজে বের করার পালা। আগেই বলেছি, আমি ছিলাম আপোষহীন। যাবতীয় মসলা, পেঁয়াজ, রসুন আমি খুঁজে খুঁজে কিনলাম। বাজারের সেরা জিনিসটা আমার চাই। মানুষ একটা দুটো করে টমেটো কেনে- আমি কিনলাম ডজনে। বইয়ের দোকান থেকে বেছে নিলাম রান্নার বই, যেখানে স্প্যাগেটি রান্নার কলাকৌশল নিখুঁতভাবে লেখা আছে। 

এরপর মূল জিনিস কেনার পালা। বাজারে যত প্রকার স্প্যাগেটি পাওয়া যায়, সব কিনে ফেললাম। ইতালি থেকে সে বছর জাপানে যত ধরণের স্প্যাগেটি এসেছিল- তার কোনোটাই বাদ গেল না। পেঁয়াজ, রসুন আর অলিভ অয়েল এর গন্ধ মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল আমার অ্যাপার্টমেন্টে। সে গন্ধ যেন মেঘ হয়ে ভাসতে ভাসতে আমার জামা কাপড়, বই-খাতা, কাগজ-কলম, ফাইল-পত্র, একটা পুরনো টেনিস র‍্যাকেট সবকিছুতে ছড়িয়ে পড়ল। 

খ্রিস্টের জন্মের ঠিক এক হাজার নয় শত সত্তর বছর পরের ঘটনা। ১৯৭১ - সেটা ছিল আমার স্প্যাগেটির বছর। 

এ বছরের একটাই নিয়ম ছিল। আমি স্প্যাগেটি রান্না করব এবং খাব। একা। এই বিশেষ বছরটার আগে পৃথিবীর বোকা মানুষগুলো মনে করত, স্প্যাগেটি হচ্ছে এমন একটা খাবার যা কখনও একার জন্য রান্না করতে হয় না। কয়েকজনের জন্য তৈরি করে একসাথে মিলেমিশে খেতে হয়। কিন্তু, আমি এই সনাতন ধ্যান ধারণায় একটা বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনলাম। বিপ্লব কাউকে না কাউকে আনতেই হত। আমি এই মহান দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিলাম। শুধুমাত্র নিজের জন্য রান্না করে একা একা পেট পুরে খেতে শুরু করলাম। 

স্প্যাগেটি, সাথে লেটুস আর শসা দিয়ে তৈরি সালাদ। শেষে চা। সবকিছু টেবিলে সুন্দরভাবে সাজানো থাকত। একঘেয়ে ভাবে চলতে চলতে, পৃথিবীটা এসে থমকে যেত আমার কিচেন টেবিলে। আমি ধীরেসুস্থে খাবারগুলো খেতাম। আয়েশ করে, পত্রিকা পড়তে পড়তে । 

রবিবার থেকে শনিবার প্রতিটা দিনই ছিল আমার স্প্যাগেটি দিন। প্রতিটা সপ্তাহ ছিল আমার স্প্যাগেটি সপ্তাহ এবং শেষ পর্যন্ত গোটা বছরটা হয়ে উঠল স্প্যাগেটিময়। খ্রিস্টের জন্মের ঠিক এক হাজার নয় শত সত্তর বছর পরের ঘটনা। ১৯৭১ - সেটা ছিল আমার স্প্যাগেটির বছর। 

প্রতিটা বিপ্লবের কিছু প্রতিবিপ্লব থাকে। আমার ক্ষেত্রেও সেগুলোর লক্ষণ দেখতে শুরু করলাম। 

মনে করেন, একদিন বিকালে ঝুম বৃষ্টি। কিচেন টেবিলে এক প্লেট স্প্যাগেটি নিয়ে বসেছি। আমার মনের মধ্যে কোথায় যেন এরকম একটা অনুভূতি হত, এখনই বোধহয় কেউ দরজা নক করবে। এই ‘কেউ’টা কোনও নির্দিষ্ট মানুষ নয়। একেক দিন, একেক জন। পরিচিত হতে পারে। আবার অপরিচিতও হতে পারে। একবার দরজায় নক করা মানুষটা ছিল একটা মেয়ে- যার সাথে কলেজে পড়ার সময় আমার হালকা প্রেম ছিল। আরেকবার হল কি- সেই মানুষটা হয়ে গেলাম আমি নিজে। বেশ কয়েক বছর আগের ‘আমি’। হুট করে নতুন ‘আমি’কে দেখতে এসেছি। দরজার বাইরে দাঁড়ানো। এখনই নক করব। আরেকবার হলিউড থেকে এলো বিখ্যাত উইলিয়াম হোল্ডেন, সাথে জেনিফার জোনস। 

এই প্রত্যেকটা মানুষই দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকত। মনে হত, এখনই বুঝি তারা দরজায় নক করবে। কিন্তু, না। তারা শেষ পর্যন্ত নক করত না। চলে যেত। 

বসন্ত গেল, গ্রীষ্ম এলো, তারপর একদিন শরৎ। বিপ্লব দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হতে হতে প্রায় দীর্ঘজীবী হয়ে গেল। আমি রান্না করে যেতে লাগলাম। এ যেন নিজের উপর এক ধরণের প্রতিশোধ। 

ধরা যাক, একটা মেয়ে প্রেমে ছ্যাকা খেয়েছে। সে প্রথম যে কাজটা করবে- সেটা হচ্ছে, তার পুরনো প্রেমপত্রগুলো খুঁজে বের করবে। তারপর সেগুলো মুঠোয় নিয়ে, চুলার আগুনে ছুঁড়ে দেবে। আমিও ঠিক তেমন করে মুঠোভরতি স্প্যাগেটি নিতাম এবং সেগুলো রান্নার পাত্রে ছুঁড়ে ছুঁড়ে মারতাম। 

সরু সুতোর মতো স্প্যাগেটিগুলো আমি চোখে চোখে রাখতাম। যেন, আমি চোখ সরিয়ে নিলেই ওরা ফুটন্ত পানি থেকে এক লাফে বেরিয়ে আসবে এবং অদৃশ্য হয়ে যাবে। 

যেটুকু পারতাম, গপগপ করে খেতাম। বাকিটুকু থেকে যেত ফ্রিজে। সেখান থেকে ওদের জায়গা হত ময়লার ঝুড়িতে। তারপর অন্যান্য ময়লা-আবর্জনার সাথে সেগুলোর শেষ ঠিকানা হতো নদীর বুকে। 

আগুনে তার জন্ম - মৃত্যু নদীর স্রোতে। বাহ, আমার প্রাণপ্রিয় স্প্যাগেটি আমার মধ্যে বেশ কাব্য বোধের জন্ম দিচ্ছে! 


তিনটা বেজে ঠিক কুড়ি মিনিটে ফোনটা বাজল। আমি তখন তোষকের ওপর চিত হয়ে শুয়ে ছিলাম। চোখ ছিল ছাদ বরাবর। জানালা দিয়ে একটা রোদ এসে আমার শরীরে পড়ছিল। শীতের দিনে এই রোদটা ভারি আরামের। একটা মৃত মানুষ যেভাবে শুয়ে থাকে, আমি ঠিক সেভাবেই শুয়ে ছিলাম। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসের কোনও এক বিকেল। সময় তিনটা বেজে কুড়ি। 

প্রথমে আমি ঠিক বুঝতেই পারিনি, ফোনটা বাজছিল। একটা অপরিচিত শব্দ বাতাসে ভাসতে ভাসতে আমার দিকে এগিয়ে এলো। ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না, শব্দটা কিসের। অবশেষে সেই অপরিচিত শব্দটা আমার মাথার কোষগুলোতে এক ধরণের পরিচিত রূপ ধারণ করল। বুঝতে পারলাম, ফোনটা বাজছে। উঠে গিয়ে রিসিভারটা কানে লাগালাম। 

ওপ্রান্তে একটা মেয়ে ছিল। আমার এক বন্ধুর সাবেক প্রেমিকা। কোনও এক কারণে তারা জীবনের কোনও এক মুহূর্তে প্রেমে পড়েছিল এবং অনিবার্যভাবে তাদের সম্পর্কটা একসময় ভেঙে যায়। তাদের সম্পর্ক গড়ার পেছনে আমার কিঞ্চিৎ অবদান ছিল। 

“তোমাকে বিরক্ত করছি,” সে বলল, “তুমি কি জানো ও কোথায় আছে?” 

মেয়েটার কন্ঠে এমন কিছু একটা ছিল, যেটা বলে দেয়- কোনও একটা সমস্যা হয়েছে। সমস্যাটা কি, আমি সেটা জানি না। কিন্তু এটা জানি, তাতে আমি জড়াতে চাই না। 

মেয়েটা এবার বেশি ঝাঁঝের সাথেই বলল, “কেউ আমাকে বলছে না, ও কোথায় আছে। সবাই এমন একটা ভাব করছে, তারা জানে না। কিন্তু, আমার খুব জরুরী কিছু কথা আছে ওর সাথে। প্লিজ আমাকে বল, কোথায় ও? আমি তোমাকে কথা দিচ্ছি, তোমাকে এর ভেতর জড়াব না। তুমি শুধু আমাকে এটুকু বল, ও কোথায় আছে?” 

“সত্যিই আমি জানিনা,” তাকে বললাম, “অনেকদিন হয়ে গেছে, ওর সাথে আমার কোনও যোগাযোগ নেই।” 

আমার গলাটা নিজের গলা বলে মনে হচ্ছিল না। আমি যখন মিথ্যা কথা বলি, গলার স্বরটা অন্যরকম হয়ে যায়। আমি টের পাই। হ্যাঁ, এটা সত্যি যে, অনেকদিন তার সাথে আমার ঠিকই যোগাযোগ হয়নি। কিন্তু, তার মানে এই না যে, সে কোথায় থাকে- সেটা আমি জানি না। আমি খুব সহজেই আমার বন্ধুর বাসার ঠিকানা, ফোন নাম্বার এগুলো মেয়েটাকে দিয়ে দিতে পারি। কিন্তু, তার বদলে বললাম, “জানি না।” 

সে কোনও উত্তর দিল না। ফোনটা যেন বরফের মত জমে গিয়েছিল। 

তারপর একটা অদ্ভুত ব্যাপার ঘটতে শুরু করল। শুধু ফোন নয়, আমার চারদিকের প্রত্যেকটা জিনিস একটু একটু করে বরফের মত জমে যেতে শুরু করল। আইজ্যাক আসিমভ, তুমি আছ আশেপাশে? এটা নিয়ে একটা বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী লিখে ফেল তো চট করে। 

নাহ। শীত শীত লাগছে। বরফ গলাবার জন্য বললাম, “তুমি বোধহয় বিশ্বাস করছ না। কিন্তু, আমি আসলেই কিছু জানি না। অনেকদিন ধরেই আমি ও’র কোন সাড়া শব্দ পাচ্ছি না।” 

মেয়েটা হাসল। 

“হাসির মত কিছু বললাম?” 

“তুমি এমন মজার কথা বল! এমন একটা লোকের সম্পর্কে বললে যে, তুমি তার কোনও সাড়া শব্দ পাচ্ছ না! ও কি এমন মানুষ, যে সাড়াশব্দ না দিয়ে থাকতে পারে?” 

মেয়েটার কথাটা ঠিক। থাকে না, এমন কিছু মানুষ যারা কিছু করবার আগেই অনেক বেশি সাড়া শব্দ দিয়ে ফেলে। ঐ যে, “খালি কলসি, বাজে বেশি”- এইসব প্রবাদ প্রবচন আপনারা ছোটবেলায় পড়েননি? আমার বন্ধুটা ছিল তেমন। 

কিন্তু, আমি এত বোকা নই যে, মেয়েটা আমার সাথে কথার খেলা খেলবে আর আমি ধুপ করে বলে দেব- বন্ধুটা কোথায় আছে। অন্যদের ব্যক্তিগত ঝামেলার মধ্যে আমি নিজেকে জড়াতে চাই না। ইতিমধ্যে অনেকবার জড়িয়েছি। এর ফলাফল আমার কাছে কখনও ভাল মনে হয়নি। আমি আসলে মাটির মধ্যে একটা গর্ত করতে চাই এবং সে গর্তে আমার জীবনের যত অপ্রয়োজনীয় ব্যাপার আছে - এই বন্ধুটার মত, সেগুলোকে কবর দিতে চাই। কবর দেবার পরে, সেখানে একজন পাহারাদার নিয়োগ করতে চাই, যেন সেই কবর খুঁড়ে কেউ পুরনো মরাগুলো তুলে না নিয়ে আসে। 

“আমি আসলেই সরি। আমি জানি না।” 

“তুমি আমাকে একেবারেই পছন্দ কর না- না?” 

এর মধ্যে পছন্দ করার ব্যাপার কোথা থেকে এলো, সেটা আমি ঠিক বুঝে পেলাম না। মেয়েরা না! কিছু একটা হলেই ইমোশনাল ব্লাকমেইলের রাস্তা ধরে। উফ! আর পারি না এদের নিয়ে। 

আমি মেয়েটাকে অপছন্দ করতাম না। আবার পছন্দ করার মতো কোনও চিন্তা-ভাবনাও আমার মাথায় আসেনি কখনও। সত্যি কথা বলতে কি, মেয়েটার ব্যাপারে আমার কোনও অনুভূতি কখনও কাজ করেনি। ভাল, খারাপ কিছু না। 

“আমি সরি”, আমাকে রাখতে হবে, “আমি আসলে রান্না করছি।” 

“কী রান্না করছ?” 

“স্প্যাগেটি।” 

“কি!” 

“কেন? রান্না করা যাবে না। সরকার কি বিশেষ ধরণের কোনও নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে, স্প্যাগেটি রান্নার ব্যাপারে? আমার কি জেল জরিমানা টাইপ কিছু হয়ে যাবে?” 

আমি মিথ্যে বললাম কেন, কে জানে। মুখ ফসকে বেরিয়ে গেছে আসলে। কিন্তু, ব্যাপার হচ্ছে, আমি বলে ফেলেছি। এখন এটাকে আর ফিরিয়ে নেয়া যাবে না। এটাকে যতদূর পারা যায়, সত্যের রূপ দিতে হবে। সত্যি কথা বলতে কি, মিথ্যেটা আমার কাছে ঠিক মিথ্যা মনে হচ্ছে না। 

আমি মনে মনে একটা কাল্পনিক পাত্র তুলে নিলাম। তারপর সেটা পানি দিয়ে ভরলাম। একটা কাল্পনিক ম্যাচ দিয়ে কাল্পনিক চুলা জ্বালালাম। 

মেয়েটি অবাক হয়ে বলল, “তুমি স্প্যাগেটি রান্না করছ। এ কারণে কথা বলতে পারবে না?” 

“ঠিক তাই।” 

কাল্পনিক কিছু লবণ হাতে তুলে নিলাম। তারপর ফুটন্ত পানিতে ছড়িয়ে দিলাম। মুঠোভরতি কিছু কাল্পনিক স্প্যাগেটি পাত্রে ঢাললাম। এরপর আমার কাল্পনিক কিচেনের টাইমারটা এগার মিনিটে সেট করলাম। আমি তো আগেই বলেছি, স্প্যাগেটি সিদ্ধ হবার সময় নিয়ে আমি আপোষহীন। 

মেয়েটাকে বললাম, “কথা বলতে একটু অসুবিধা হচ্ছে। তুমি তো জানো, ছেলেরা রান্নায় অত পটু হয় না। একটু এদিক সেদিক হলেই, আমার খাবারটা নষ্ট হয়ে যেতে পারে।” 

মেয়েটা কিছু বলল না। 

“আমি আসলেই খুব সরি। কিন্তু তুমি জানো, স্প্যাগেটি রান্না করাটা একটু জটিল। বিশেষ করে একটা ছেলের জন্য।” 

মেয়েটা এবারও চুপ করে রইল। 

ফোন এবং ফোনের চারপাশের সবকিছু আবারও একটু একটু করে জমতে শুরু করল। জমাট বরফ। 

বললাম, “তুমি কি আমাকে একটু পরে ফোন করতে পারবে?” 

“পরে কেন ফোন করবো? এখন তুমি রান্না করছ, তোমার কথা বলতে অসুবিধা হচ্ছে, এজন্য?” 

“একদম ঠিক ধরেছ।” 

“কার জন্য রান্না করছ? কেউ কি তোমার গেস্ট আছে? নাকি তুমি একা একা খাবে?” 

“গেস্ট কোত্থেকে পাবো আমি? একাই খাব।” 

দীর্ঘক্ষণ সে কোনও কথা বলল না। মনে হল, নিঃশ্বাস আটকে রেখেছে। তারপর ধীরে ধীরে নি:শ্বাস ছাড়ল। 

“তুমি আসলেই জানো না, আমি কত বড় সমস্যার মধ্যে আছি! আমি জানি না, আমি কি করবো? কি করলে এই সমস্যা থেকে বের হতে পারব?” মেয়েটা বলল। 

“যদি সাহায্য করতে পারতাম, তাহলে খুব খুশি হতাম। কিন্তু, আমি তো বললাম, কিছু জানি না।” উত্তর দিলাম আমি। 

“দেখ, সমস্যাটা আসলে টাকা-পয়সা কেন্দ্রিক।” 

“ও আচ্ছা।” 

“আমার কাছ থেকে কিছু টাকা ধার নিয়েছিল ও,” সে বলল, “ধারটা আমার আসলে দেয়া উচিত হয়নি। কিন্তু, দিতে বাধ্য হয়েছিলাম।” 

কাল্পনিক স্প্যাগেটি রান্না করতে করতে একটু থেমে গেলাম। 

“আমি সরি। আসলে এটা খুবই বাজে ব্যাপার হয়েছে। তোমার জন্য আসলেই খুব খারাপ লাগছে। কিন্তু, সত্যি কথা বলতে কি, আমি তোমাকে আগেই বলেছি, এখন রান্না করছি । পরে যদি ফোন করতে!” 

ওপাশ থেকে যেন একটা হাসির শব্দ শুনতে পেলাম। হাসিটা বিদ্রূপের কি না, ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না। 

“ঠিক আছে, রাখছি। আমার পক্ষ থেকে তোমার মহান স্প্যাগেটিকে শুভেচ্ছা দিও। আমি ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করব, মহান স্প্যাগেটি যেন তোমার খাবার উপযোগী হয়ে ওঠে।” 

“বাই।” ন্যূনতম সুযোগ না দিয়ে ফোনটা নামিয়ে রাখলাম। 

তোশকের ওপর গিয়ে আবার শুয়ে পড়লাম। জানালা দিয়ে যে রোদটা আসছিল কিছুক্ষণ আগে, সেটা বেশ কয়েক ইঞ্চি সরে গেছে । রোদের সাথে সামঞ্জস্য রেখে শরীরের অবস্থান কিছুটা পরিবর্তন করতে হল। 

শুয়ে শুয়ে একটু ভাবলাম। মেয়েটার জন্য একটু কষ্টই হল। আমার বোধ হয় মেয়েটাকে সত্য কথা বলা উচিত ছিল। কিছু কিছু মানুষ থাকে, যাদের ভেতরটা থাকে ফাঁপা। কিন্তু, তারা যখন কোনও কিছু উপস্থাপন করে, সেটাকে খুব সুন্দরভাবে করতে পারে। সুতরাং, ধান্দাবাজি করে বেঁচে থাকতে তাদের তেমন কোনও অসুবিধা হয় না। মেয়েটার বয়ফ্রেন্ড, মানে আমার বন্ধুটা ছিল তেমন একজন মানুষ। আমরা বন্ধুমহলে বিষয়টা জানতাম। মেয়েটা জানত না। না জেনে বোকার মত, ছেলেটার প্রেমে পড়ে গিয়েছিল। 

আহা! মেয়েটার অনেকগুলো টাকা গচ্চা গেল। নিশ্চয়ই অনেক কষ্টের টাকা। এই টাকা সে ফেরত পাবে, তেমন কোনও সম্ভাবনা আমি দেখি না। মনটা একটু দুর্বল হয়ে এলো। 

পরে ফোন করতে বলেছিলাম। ভয়ে ছিলাম, কখন যেন ও ফোন করে বসে। কিন্তু ও আর আমাকে ফোন করেনি। কখনও না। ওর কোনও খবরও আর পাইনি। 

মেয়েটা কেন ফোন করল না? ও কি তবে হারিয়ে গেল? চিরতরে? শেষ বিকেলের দীর্ঘ ছায়া কি তাকে গিলে ফেলল? পুরো ব্যাপারটাতে আমি কি কোনও ভাবে দোষী? 

আমি জানি, আপনারা আমাকে দোষী ভাবছেন। কোনও না কোনও ভাবে ভাবছেন। কিন্তু, আপনাদেরকে আমার অবস্থাটা একটু বুঝতে হবে। ওটা ছিল সেই সময়, যে সময়ে- আমি কোনও ঝামেলার সাথে জড়াতে চাইতাম না। সবকিছু থেকে নিজেকে দূরে রাখতে চাইতাম। যে কারণে, আমি জীবনে একটি মাত্র উদ্দেশ্য বেছে নিয়েছিলাম। তা হল, স্প্যাগেটি রান্না করা। 

সেটা ছিল ১৯৭১ সাল। আমার স্প্যাগেটির বছর। পৃথিবীর অর্ধেক স্প্যাগেটি সে বছর আমি একাই রান্না করেছিলাম। সুদূর ইতালি থেকে আমদানি করা আমার মহান স্প্যাগেটি। 

সে বছর জাপান আসলে ইতালি থেকে স্প্যাগেটি আমদানি করেনি। আমদানি করেছিল- মুঠো ভরা নিঃসঙ্গতা। 





অনুবাদক পরিচিতি
আলভী আহমেদ
চলচ্চিত্রকার। অনুবাদক।
ঢাকায় থাকেন। 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন