বুধবার, ৩ জুন, ২০২০

ও হেনরি'র গল্প : শেষ পাতাটি

অনুবাদ : মণীন্দ্র দত্ত
ওয়াশিংটন স্কোয়ারের পশ্চিমে একটা ছোট মহল্লায় রাস্তাগুলো কেমন যেন পাগলাটে ধরনের; সেগুলো মাঝে মাঝেই কেটে গিয়ে ছোট ছোট ভূমিখণ্ডের সৃষ্টি হয়েছে; তাকে বলা হয় এক-একটা “বস্তি”। এই সব “বস্তি”-র কোণ ও বাঁকগুলো অদ্ভুত। একই রাস্তা হয়তো এক বা একাধিকবার নিজেকেই কেটে বেরিয়ে গেছে।

একদা জনৈক শিল্পী এমনি একটা রাস্তার মধ্যে একটা মুল্যবান সম্ভাবনা আবিষ্কার করে বসল । ধরুন, একজন সংগ্রাহক রং, কাগজ ও ক্যানভাস নিয়ে এই পথে চলতে চলতে হঠাৎ দেখল যে সে পুনরায় যাত্রা-স্থলেই পৌঁছে গেছে, অথচ তার জন্য একটা বাড়তি সেন্ট তাকে খরচ করতে হল না!

সুতরাং অচিরেই সেকেলে সেই গ্রীন উইচের গ্রামে শিল্প সম্পর্কিত লোকরা দলে দলে এসে ভিড় করে উত্তরের জানালা, অষ্টাদশ শতাব্দীর পাশকপালি বাড়ি ও ওলন্দাজ পুরাবস্তু এবং অল্প ভাড়ার ঘরের খোঁজ করতে লাগল। তারপর তারা আমদানি করতে লাগল কিছু মিশ্রধাতুর মগ, আর ষষ্ঠ এভেনিউ থেকে দু'একটা ডিস; ফলে গড়ে উঠল একটা “উপনিবেশ ।”

একটা জবর দখল-করা তিনতলা ইটের বাড়ির একেবারে উপরে ছিল 'সু এবং জন্সির' স্টুডিও। একজন এসেছিল মেইন থেকে; অপরজন ক্যালিফোর্নিয়া থেকে। অষ্টম স্ট্রিটের একটা হোটেলের টেবিলে দু'জনের প্রথম দেখা হয়; তখনই তারা বুঝতে পারল যে শিল্পকলা, চিকোরি স্যালাড ও বিশপ প্লিভ-এ দু'জনেরই সমান রুচি। অতএব গড়ে উঠল তাদের যুগ্ম স্টুডিও ।

সেটা মে মাসের কথা। নভেম্বর মাসে একটি অদৃশ্য শীতল আগন্তক--ডাক্তাররা তাকে বলে নিউমোনিয়া-- সেই উপনিবেশে হানা দিল এবং তার বরফ-ঠাণ্ডা আঙুল দিয়ে এখানে একজন আর ওখানে আরেক জনকে স্পর্শ করল। পূর্বাঞ্চলের দিকে এই আক্রমণকারী পা ফেলতে লাগল বেশ সাহসভরে, দলে দলে লোক তার শিকার হতে লাগল, কিন্তু বস্তি-অঞ্চলের সংকীর্ণ, শেওলা-ধরা গোলকধাঁধায় সে হেঁটে চলল ধীরে সুস্থে।

যাকে আপনারা সাহসী বৃদ্ধ ভদ্রলোক বলে থাকেন শ্রীনিউমোনিয়া কিন্ত তেমন কেউ নয়। জন্সির গায়ে সে ছোবল দিল; মেয়েটিও রং-করা লোহার খাটে শুয়ে পড়ল ; নড়তে-চড়তেও পারে না ; সারাক্ষণ ওলন্দাজ জানালাটার ভিতর দিয়ে তাকিয়ে থাকে পাশের ইটের বাড়িটার দিকে।

সু একদিন সকালে খোঁচা-খোঁচা পাকা ভুরুওয়ালা এক ব্যস্ত ডাক্তারকে তাদের হলঘরের প্রবেশ-পথে ডেকে নিয়ে এলেন। ক্লিনিক্যাল থার্মোমিটারের পারা নামাতে নামাতে ডাক্তার বললেন, “মেয়েটির ভাল হয়ে ওঠার সম্ভাবনা দশে-- ধরুন এক। আর সে সম্ভাবনা নির্ভর করছে তার নিজের বেঁচে থাকার ইচ্ছার উপর । এটা এমনই একটা ব্যাপার যা গোটা ফার্মাকোপিয়াকেই বুদ্ধু বানিয়ে দিতে পারে। তোমাদের ছোট মেয়েটি তো পণ করেই বসেছে যে সে কোন দিন ভাল হয়ে উঠবে না। তার মনের বাসনাটা কি বলতে পার ?”

সু বলল, “তার ইচ্ছা ছিল একদিন না একদিন নেপলস‌ উপসাগরের একটা ছবি আঁকবে।”

“ছবি আঁকবে ? অর্থহীন কথা! দু'বার ভাবা যায় এমন কিছু কি তার মনে হয়--যেমন কোন পুরুষ মানুষ?

“পুরুষ মানুষ ?” সু এমন ভাবে কথাটা বলল যেন তার গলায় একটা বাঁশির ঝংকার উঠল। “দু'বার ভাববার মত পুরুষ-- কিন্তু না ডাক্তার ; সে রকম কিছু নেই।”

“তাহলে তো দুর্বলতাটাই কারণ,” ডাক্তার বললেন। “ডাক্তারী শাস্ত্রমতে আমি যতদূর পারি অবশ্যই চেষ্টা করব। কিন্তু যখনই আমার কোন রোগী তার শবযাত্রার গাড়ির সংখ্যা গুণতে শুরু করে তখনই ওষুধের নিরাময়-ক্ষমতার শতকরা ৫০ ভাগ আমি বাদ দিয়ে দেই। মেয়েটি যদি শীতের জামার আস্তিনের নতুন স্টাইল সম্পর্কে একটা প্রশ্নও করে তাহলে আমি তোমাকে কথা দিতে পারি যে তার রোগ-নিরাময়ের সম্ভাবনা দশে একের বদলে পাঁচে এক হয়ে যাবে।”

ডাক্তার বিদায় হতেই সু তার কাজের ঘরে ঢুকে চোখের জলে একটা রুমাল ভিজিয়ে ফেলল। তারপর জন্সির ড্রয়িং-বোর্ডটা নিয়ে শিস দিতে দিতে জন্সির ঘরে ঢুকল।

জানালাটার দিকে মুখ রেখে জন্সি চুপচাপ বিছানায় শুয়ে আছে; বিছানার চাদরটাএকটু উঁচুনীচুও হয় নি। সে ঘুমিয়ে পড়েছে মনে করে সু শিসটা বন্ধ করল।

বোর্ডটাকে ঠিকমত সাজিয়ে সে একটা পত্রিকার প্রকাশিতব্য গল্পের ছবি আঁকতে শুরু করল। আর্টের পথটাকে সুগম করতে হলে তরুণ শিল্পীদের আঁকতে হয় পত্রিকার সেই সব গল্পের রেখাচিত্র যেগুলি তরুণ লেখকরা লেখে সাহিত্যের পথটাকে সুগম করার জন্য। একটা ছবির স্কেচ করতে করতেই সে একটা চাপা শব্দ শুনতে পেল-- বেশ কয়েকবার। তাড়াতাড়ি বিছানার পাশে গেল।

জন্সির চোখ দুটো সম্পূর্ণ খোলা । জানালাটার বাইরে তাকিয়ে কি যেন গুনছে--উল্টো দিকে।

সে বলল, “বারো”, আর একটু পরেই বলল, “এগারো” ; তারপর “দশ” - ও “নয়”; তারপর “আট” ও “সাত” প্রায় এক সঙ্গে। সে একদৃষ্টিতে জানালার বাইরেই তাকিয়ে আছে। সেখানে গুণবার মত কি আছে? চোখে পড়ছে শুধু একটা ফাঁকা উঠোন, আর বিশ ফুট দূরে ইটের বাড়ির ফাঁকা দিকটা। একটা বুড়ো, খুব বুড়ো সবুজ দ্রাক্ষালতা ইটের দেয়ালের আধাআধি পর্যন্ত বেয়ে উঠেছে; তার শিকড়গুলো ক্ষয়ে পঁচে গেছে। হেমন্তের ঠাণ্ডা বাতাসে দ্রাক্ষালতা সব পাতা ঝরে গেছে; কেবল তার শুকনো হাড়-সর্বস্ব ডালপালাগুলো ভাঙা ইটগুলোকে জড়িয়ে ধরে আছে।

“কি দেখছ তূমি ?” সু শুধাল।

“ছয়”, প্রায় ফিস্-ফিস্‌ করে জন্সি বলল। “সব দ্রুত ঝরে যাচ্ছে। তিন দিন আগে ছিল প্রায় এক শ। গুণতে গুণতে আমার মাথা ধরে যেত। কিন্তু এখন গোণা সহজ হয়ে গেছে। ওই আরও একটা গেল। এখন মাত্র পাঁচটা আছে।”

“পাঁচটা কি গো? তোমার সুদিকে বল।”

“পাতা । সবুজ দ্রাক্ষালতার পাতা । শেষ পাতাটা যেদিন ঝরবে সেদিনই আমিও চলে যাব। তিন দিন হল সেটা আমি জেনেছি। ডাক্তার তোমাকে বলে নি?”

“আঃ! এমন বাজে অর্থহীন কথা আমি জীবনে শুনি নি,” সু নালিশের সুরে বলল। “বুড়ো দ্রাক্ষালতার পাতার সঙ্গে তোমার ভাল হয়ে ওঠার কি সম্পর্ক? আর তুমিও মেয়ে কম দুষ্টু নও, এই দ্রাক্ষালতাকে তুমি এত ভালবাসতে । বোকা হাঁসের মত প্যাক-প্যাক করো না। আরে, আজ সকালেই তো ডাক্তার আমাকে বলেছে যে তোমার পুরোপুরি ভালো হয়ে ওঠার সন্তাবনা এখন--দাঁড়াও, মনে করে নিচ্ছি তিনি ঠিক কি বলেছেন-- দশে এক। আরে এটা তো সম্ভাবনা হিসাবে বেশ ভাল। নিউ ইয়র্কে আমরা যখন গাড়ি চড়ে যাই, অথবা কোন নতুন বাড়ির পাশ দিয়ে হেঁটে যাই, তখনও সম্ভাবনার হারটা এই রকমই থাকে। এখন একটু সুরুয়া খাও তো, আর তোমার সুদিকে ছেড়ে দাও যাতে সে তার আঁকার কাজে যেতে পারে এবং ছবিটা সম্পাদক মহাশয়কে বিক্রি করে তার রুগ্ন শিশুটির জন্য পোর্ট মদ এবং নিজের জন্য শুকরের মাংসের চপ কিনে আনতে পারে।”

চোখ দুটোকে জানালায় স্থিরনিবদ্ধ রেখে জন্সি বলল, “তোমাকে আর মদ কিনতে হবে না। আরও একটা পাতা ঝরল। না, আমি আর সুরুয়া খাব না। আর ঠিক চারটে পাতা আছে। অন্ধকার নেমে আসার আগেই আমি শেষ পাতাটার ঝড়ে পড়া দেখতে চাই। তারপর আমিও চলে যাব।”

তার উপর ঝুঁকে পড়ে সু বলল, “জন্সি, প্রিয় সখি, তুমি কি আমাকে কথা দেবে যে তোমার চোখ দুটি বন্ধ করে রাখবে এবং আমার কাজটা শেষ না হওয়া পর্যস্ত জানালার বাইরে তাকাবে না? ছবিগুলো কালকের মধ্যে তাকে দিতেই হবে। তাই আমার আলোর দরকার, নইলে আমি পর্দাটা টেনেই দিতাম।”

“তুমি কি অন্য ঘরে গিয়ে আঁকতে পার না?” জন্সি ঠাণ্ডা গলায় শুধাল।

“আমি যে তোমার পাশেই থাকতে চাই,” সু বলল। “তাছাড়া, আমি চাই না যে তুমি ওই সবুজ পাতাগুলোর দিকে তাকিয়ে থাক।”

মূর্তির মত ফ্যাঁকাসে ও নিথর হয়ে শুয়ে থেকেই জন্সি বলল, “কারণ শেষ পাতাটির ঝরে পড়াটা আমি দেখতে চাই। অপেক্ষা করে করে আমি ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। ভাবতে ভাবতেও আমি ক্লান্ত। সব কিছুই আমি ছেড়ে যেতে চাই। তারপর খেয়া বেয়ে চলে যেতে চাই ভাটির দেশে, আরও দূরে, ঠিক যেমন করে এই ক্লান্ত পাতাগুলো ঝরে পড়ে।”

সু বলল, “তুমি ঘুমতে চেষ্টা কর। আমি বেরম্যানকে ডাকতে যাচ্ছি আমার ছবির মডেল করার জন্য। যাব আর আসব। আমি না আসা পর্যস্ত একটুও নড়াচড়া করবে না।"

বুড়ো বেরম্যান এককালে ছবি আঁকত। ওদের ঠিক নিচে একতলার ঘরে থাকে।

বুড়োর বয়স ষাট পেরিয়ে গেছে ; দেখে মনে হয় যেন মাইকেল এঞ্জেলোর মোজেস-এর মত দাড়ি নেমে এসেছে এক যক্ষের মাথা থেকে এক শয়তানের দেহ বরাবর । বেরম্যান শিল্পী হিসাবে ব্যর্থ। চল্লিশ বছর ধরে ব্রাশ টেনেও কলাদেবীর কাছাকাছিও পৌঁছতে পারে নি। আঁকতে চেয়েছিল একখানা সেরা ছবি, কিন্তু আজও সেটা শুরু করতেই পারল না। কয়েক বছর ধরে ব্যবসায়িক অথবা বিজ্ঞাপনের বাজে ছবি ছাড়া আর কিছুই সে আঁকে নি। এই উপনিবেশের যে সব নতুন শিল্পী প্রফেশনাল মডেলদের উপযুক্ত টাকা দিতে পারেনা, বেরম্যান তাদের মডেল হয়েই কাজ করে, যৎসামান্য উপার্জন করে। অতিমাত্রায় জিন খায় আর আসন্ন সেরা ছবির গল্প শোনায়। এর বাইরে সে একটি সাংঘাতিক বুড়ো মানুষ ; কারও মধ্যে দুর্বলতার গন্ধ পেলেই তার দিকে থাবা বাড়ায়; নিজেকে ভাবে উপরতলার বাসিন্দা দুই তরুণ শিল্পীর পাহারাদার এক রামকুকুর।

সু বেরম্যানকে খুঁজে বের করল তার স্বল্পালোকিত নিচের ছোট ঘরে। গা থেকে বের হচ্ছে জুনিপারের তীব্র গন্ধ। ঘরের এক কোণে ইজেলের উপর দাঁড় করানো বয়েছে একটা ক্যানভাস। তার সেরা ছবির প্রথম তুলির টানের জন্য সেটা অপেক্ষা করে আছে পঁচিশ বছর ধরে। জন্সির উদ্ভট কল্পনার কথাটা সু তাকে খুলে বলল; আরও বলল, তার ভয় হচ্ছে পাতার মত লিকলিকে মেয়েটাও হয় তো বাতাসে উড়েই যাবে।

সব শুনে বেরম্যান তো এই সব উদ্ভট কল্পনাকে খুব গালমন্দ করল। চেঁচিয়ে বলতে লাগল, “ধুত্তোর! পৃথিবীতে এমন বোকা মানুষও আছে নাকি যারা একটা আধ-মরা দ্রাক্ষালতার পাতা ঝরে গেলেই মরে যাবে বলে ভয়ে সারা হয়? আমি তো এমন কথা কখনও শুনি নি। না, তোমার ছবির মডেলও আমি হতে পারব না। তুমিই বা মেয়েটার মাথার এই আজগুবি ভাবনাটাকে বাসা বাঁধতে দিয়েছ কেন ? আহা! বেচারি ছোট্ট মিস্‌ জন্সি।”

সু বলল, “সে-খুবই অসুস্থ ও দুর্বল হয়ে পড়েছে। জ্বরে জ্বরে তার মনটাও বিষম হয়ে উঠেছে, যত সব আজগুবি কল্পনা ঢুকেছে তার মাথায়। ঠিক আছে মিঃ বেরম্যান, আপনি যদি আমার ছবির মডেল হতে না চান তো হবেন না। আমি জানি আপনি একটা ভয়ংকর বুড়ো--”

বেরম্যান হৈ-হৈ করে চেঁচিয়ে বলল, “তুমি তো আচ্ছা মেয়েমানুষ ! কে বলেছে যে আমি তোমার মডেল হব না? চল, এখনই তোমার সঙ্গে যাচ্ছি। আধ ঘণ্টা ধরে আমি তো বলেই যাচ্ছি যে তোমার মডেল হতে আমি রাজি আছি। হা ঈশ্বর! মিস জন্সির মত একটি ভাল মেয়ে এ ভাবে এখানে থেকে রোগে ভুগতে পারে না। একদিন আমিও একটা সেরা মাপের ছবি আঁকব, আর তারপর আমরা সকলেই এখান থেকে চলে যাব। ঈশ্বর করুন, তাই যেন হয়।”

তারা যখন দোতলায় উঠে এল জন্সি তখন ঘুমিয়ে ছিল। সু জানালার পর্দা ঢুকেই তারা সভয়ে জানালা দিয়ে বাইরের দ্রাক্ষালতাটার দিকে তাকাল। কোন কথা না বলে এক মুহূর্ত পরস্পরের দিকে তাকিয়ে রইল। অবিরাম বৃষ্টি হচ্ছে। তার সঙ্গে বরফ। পুরনো নীল শাটটা গায়ে দিয়ে বেরম্যান মডেল সেজে বসে পড়ল।

পরদিন সকালে ঘণ্টাখানেক ঘুমের পরে জেগে উঠে সু দেখতে পেল, জন্সি কেমন যেন বিমূঢ় দৃষ্টিতে নামিয়ে-দেওয়া সবুজ পর্দাটার দিকে তাকিয়ে আছে।

“পর্দাটা তুলে দাও, আমি দেখতে চাই,” সে ফিসফিস‌ করে হুকুমের সুরে বলল।
বিরক্তি ভরে সু হুকুমটা তামিল করল।

কিন্ত, ও কি! সারা রাত মুষলধারে বৃষ্টি ও তীব্র দমকা হাওয়া বয়ে যাবার পরেও দ্রাক্ষালতার শেষ পাতাটাকে ইটের গায়ে তখনও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। দ্রাক্ষালতার ওটাই শেষ পাতা । বোটার কাছে তখনও ঘন সবুজ রং, কিন্তু পাতাটার চারদিকে হলুদের ছোপ ধরেছে। মাটি থেকে প্রায় বিশ ফুট উঁচুতে একটা ডালের সঙ্গে সেটা সাহসভরে ঝুলে আছে।

জন্সি বলল, “এটাই শেষ পাতা । আমি ভেবেছিলাম কাল রাতের ঝড়-জলে ওটা নির্ঘাৎ পড়ে গেছে। বাতাসের শব্দ আমার কানে এসেছে। ওটা আজ পডে যাবে-- ঝরে যাবে; আর সঙ্গে সঙ্গে আমি মরে যাব।”

শুকনো মুখটাকে বালিশের উপর রেখে সু বলল, “হয়েছে, হয়েছে; নিজের কথা যদি নাও ভাবতে চাও, আমার কথাটা একবার ভাব। আমি কি করব?”

জন্সি কোন জবাব দিল না। একটি আত্মা যখন তার রহস্যঢাকা সুদূর যাত্রার জন্য প্রস্তত হতে থাকে তার মত একাকিত্ব পৃথিবীতে আর কিছু নেই। যে বন্ধনগুলি তাকে বন্ধুত্ব ও পৃথিবীর সঙ্গে বেঁধে রেখেছিল। সেগুলি একটার পর একটা খুলে যেতেই কল্পনার বোঝা যেন ক্রমেই তার উপর বেশি করে চেপে বসছে।

দিনটা ফুরিয়ে গেল। গোধূলি নেমে এল। তখনও তারা দেখতে পেল, দ্রাক্ষালতার একটি মাত্র পাতা দেয়ালের গায়ে বোঁটার সঙ্গে ঝুলে আছে। তারপরে রাত নেমে আসতেই উত্তুরে হাওয়া আবার বইতে শুরু করল; বৃষ্টির ছাট এসে জানালার উপর আছড়ে পড়তে লাগল ।

আলো থাকতে থাকতেই নির্দয়, নিষ্ঠুর জন্সি হুকুম করল, পর্দাটা তুলে দেওয়া হোক।
দ্রাক্ষালতার পাতাটা তখনও সেখানেই আছে।
সেদিকে তাকিয়ে জন্সি অনেকক্ষণ শুয়ে থাকল। তারপর সুকে ডাকল।

“আমি খারাপ মেয়ে হয়ে গেছি সুদি। শেষ পাতাটা যে এখন বোঁটাতেই লেগে আছে তাতেই বোঝা যাচ্ছে আমি কতটা দুষ্টূ হয়ে গিয়েছিলাম। মরতে চাওয়া তো পাপ। এখন তুমি কিছুটা সুরুয়া এনে দিতে পার আর একটু পোর্ট মিশিয়ে খানিকটা দুধ, আর--না; আগে একটা হাত-আয়না এনে দাও, তারপর কয়েকটা বালিশ উঁচু করে আমাকে বসিয়ে দাও ; আমি বসে বসে তোমার রান্না দেখি।”

এক ঘন্টা পরে সে বলল, “সুদি, আশা করছি একদিন নেপলস‌ উপসাগরের ছবিটা আঁকতে পারব।”

বিকেলে ডাক্তার এলেন। সু-র হাত ধরে ঝাঁকুনি দিয়ে বললেন, “ভাল করে সেবা-শুশ্রুষা কর, তুমিই জয়ী হবে। এবার আমাকে নিচে আর একটি রোগী দেখতে হবে। তার নাম বেরম্যান-- একজন শিল্পী বলে শুনেছি। তারও নিউমোনিয়া। লোকটি বৃদ্ধ, দুর্বল, রোগটাও গুরুতর। বাঁচার কোন আশা নেই; তবু আরাম-বিরামের জন্য আজই সে হাসপাতালে যাচ্ছে।”'

পরদিন ডাক্তার সুকে বলল, "তোমার বন্ধুর বিপদ কেটে গেছে। তুমি জয়ী হয়েছ। এখন শুধু ভাল খাওয়া ও সেবাযত্ন। বাস।”

সেদিন বিকেলে সু জন্সির ঘরে ঢুকল। সে তখন মনের আনন্দে গাঢ় নীল রংয়ের একটা অদরকারি পশমি গলাবন্ধ বুনছিল। সু বালিশ ও অন্য সব কিছু সমেত তাকে জড়িয়ে ধরল। মুখে বলল, “তোমাকে একটা কথা বলার আছে সাদা ইদুর। মিঃ বেরম্যান নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে মারা গেছেন। মাত্র দু'দিন আগে তিনি অসুস্থ হন। প্রথম দিন সকালেই যন্ত্রণায় খুবই কাতর অবস্থায় দরোয়ান তাকে নিচের ঘরে দেখতে পায়। তার জুতো ও জামা ছিল জবজবে ভিজে আর বরফের মত ঠাণ্ডা।

তারা বুঝতেই পারে নি এ রকম ভয়ংকর রাতে তিনি কোথায় গিয়েছিলেন। তারপরে  তারা দেখতে পায় একটা লণ্ঠন তখনও জ্বলছে, অন্য জায়গা থেকে টেনে আনা একটা মই ইতস্তত ছড়ানো কয়েকটা ব্রাশ, আর সবুজ ও হলুদ রং লাগানো একটা প্যালেট, আর-- জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেয়ালের গায়ে দ্রাক্ষালতার শেষ পাতাটাকে লক্ষ্য কর ভাই। যখন জোরে বাতাস বইছিল তখনও পাতাটা উড়েও যায় নি, পড়েও যায় নি দেখে তুমি অবাক হয়ে গিয়েছিলে না? হায় বন্ধু, এটাই বেরম্যানের সবসেরা ছবি-- যে রাতে শেষ পাতাটা ঝরে পড়েছিল সেই রাতেই ওই পাতাটা সে ওখানে এঁকে দিয়েছিল।”

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন