বুধবার, ৩ জুন, ২০২০

আলবেয়ার কামু'র উপন্যাস : দ্য প্লেগ --প্রথম খণ্ড

ভাবানুবাদঃ মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ 


(প্রথম খন্ড) 


এই করচাতে বর্ণিত অসাধারণ ঘটনাগুলো ঘটেছিল ১৯৪- সনে, ওরান শহরে। তবে সেই সময়ে শহরটির সবাই বিশ্বাস করত যে, ঘটনাগুলো ছিল অসাধারণ ও অদ্ভুত প্রকৃতির, যেগুলোর ওরান শহরে ঘটার কোন যৌক্তিকতা ছিল না। কারণ, ওরান ছিল আসলেই সাধারণ ধরণের একটা শহর এবং সেটি সম্পর্কে উল্লেখ করার মত একটাই বিষয় ছিল। সেটা হল শহরটি ছিল আলজেরিয়ান উপকূলে অবস্থিত একটি পোতাশ্রয় এবং সেখানে ছিল একটি ফরাসী প্রতিষ্ঠানের সদরদপ্তর।

শহরটি সম্পর্কে আমরা ধরে নিই যে, সেটা ছিল কুৎসিত ধরণের। তবে সময় নিয়ে পর্যবেক্ষন করলে বোঝা যেত যে, শহরের বাতাস ছিল পরিচ্ছন্ন ও এবং তার প্রবাহ মৃদু ধরণের। এবং একারণেই এই শহর পৃথিবীর অন্য সকল অংশে স্থাপিত বিজনেস সেন্টারগুলো থেকে ভিন্নতর ছিল। 

আপনি একটি শহরের কথা কল্পনা করুন, যেখানে কবুতর, গাছপালা অথবা বাগান নেই; যেখানে কেউ কোনদিন পাখার আঘাতের শব্দ অথবা পাতার মর্মরধ্বনি শুনতে পায়নি। মোট কথা আদ্যোপান্ত একটি অবসবাসযোগ্য জায়গা। ওরান ছিল সেই ধরণের শহর। ওরান শহরে বছরের ঋতুগুলোকে আলাদা করে বোঝা যেত শুধুমাত্র আকাশ থেকে। বছরের এক সময়ে বাতাসের অনুভব বলে দিত যে, বসন্তের আগমন সমাসন্ন। অথবা উপশহর থেকে আগত ফেরিওয়ালাদের ফুলের ঝুড়িগুলো থেকে সবাই বুঝতে পারত বাজারে বসন্তের সমারোহ শুরু হয়েছে। ওরানের গ্রীষ্মকাল ছিল খুবই প্রখর। সূর্যের তাপে ঘরগুলো পুড়ে শুকনো হাড়ের মত হয়ে যেত। ধূসর বর্ণের ধুলিতে আবৃত হয়ে যেত দেয়ালগুলো। এবং এই অগ্নিদগ্ধ দিনগুলোতে বদ্ধ ঘরে কপাট বন্ধ করে বেঁচে থাকা ছাড়া কারো আর কিছুই করার থাকত না। শরৎকাল এখানে কাদামাটির প্লাবন বয়ে আনত। শুধুমাত্র শীতকালেই কিছুটা প্রশান্তির আবহাওয়া বিরাজ করত। ফলে, এই শহরের সাথে পরিচিত হওয়ার সবচেয়ে সহজ উপায় ছিল এর নাগরিকদেরকে পর্যবেক্ষন করেঃ কিভাবে তারা কাজ করে, ভালবাসে এবং মরে যায়। 

আমাদের এই ছোট্ট শহরে জলবায়ুর কারণে তিন ঋতুতেই প্রতিনিয়ত উষ্ণ ও জ্বরাক্রান্ত বাতাস বইত। সত্য হল, এখানে সবাই খুব পরিশ্রান্ত থাকত এবং কাজকর্মে নিজেরকে নিয়োজিত করে রাখত। এবং শহরের নাগরিকদের কঠোর পরিশ্রমের উদ্দেশ্য ছিল একটাই – ধনী হওয়া। তাদের জীবনের প্রধান লক্ষ্য ছিল ব্যবসা-বানিজ্য করা। তারা ভালবাসা, সহবাস, সিনেমা দেখতে যাওয়া - এই ধরণের সাধারণ আনন্দগুলোকে উপভোগ করত না। তবে সবাই সযত্নে শনিবার বিকেল ও রবিবারকে অবসর যাপনের দিন হিসেবে আলাদা করে রাখত এবং সপ্তাহের অবশিষ্ট দিনগুলোতে নিজেদেরকে নিয়োজিত রাখত অর্থ উপার্জনের নিমিত্তে। সর্বতভাবে। বিকেলে অফিস থেকে ফেরার পথে তারা নির্ধারিত এক ঘন্টার জন্যে ক্যাফেতে যেত, একই মহাসড়ক ধরে হাঁটাহাঁটি করত, অথবা ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে বাতাস সেবন করত। শহরের যুবক-যুবতীদের আবেগ ছিল খুবই উন্মত্ত ধরণের এবং সাময়িক। বয়স্কদের দোষগুলো ছিল মাদকাসক্তি হতে শুরু করে ভোজনোৎসব, সামাজিক অনুষ্ঠান অথবা ক্লাবের ভেতরে সীমাবদ্ধ। সেখানে তারা বৃহৎ অংকের অর্থ এক হাত হতে অন্যহাতে বিনিময় করত। তাস খেলার মাধ্যমে। তবে নিশ্চিতভাবে বলা যেতে পারে যে, এই অভ্যাসগুলো শুধুমাত্র আমাদের শহরের জন্যে একক ছিল না। অন্য শহরগুলোর পরিস্থিতিও প্রায় একই রকমের ছিল। প্রায় সকল শহরের জন্যে এটাই স্বাভাবিক ছিল যে, লোকজনেরা সকাল থেকে রাত অবধি কাজ করার পর তাসের টেবিলে অথবা ক্যাফেতে বসবে এবং নিজেদেরকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আলাপচারিতায় ব্যপৃত করবে অবশিষ্ট সময়ের জন্যে। 

তারপরেও পৃথিবীতে অনেক দেশ বা শহর ছিল, যেগুলোতে নাগরিকেরা কখনও কখনও একটু ভিন্ন ধরণের আচরণ করত। যদিও সেই আচরণগুলো তাদের জীবনকে পরিবর্তন করার সামর্থ রাখত না, তথাপি সেগুলো ছিল অপেক্ষাকৃত ভাল। তবে ওরান ছিল আসলেই ভিন্ন প্রকৃতির শহর। বলা যেতে পারে সম্পূর্ণভাবে আধুনিক শহর। এই শহরে পুরুষ ও নারীরা সল্পতম সময়ের ভেতরে পরস্পরকে নিঃশেষ করে ফেলত, যাকে আমরা বলতাম ‘সহবাস’ অথবা নিজেদেরকে মৃদু ধরণের দাম্পত্য সম্পর্কে আবদ্ধ করা। চরম ধরণের এই দুটো কাজের কোন গড় কখনই খুঁজে পাওয়া যেত না। এই না পাওয়াটাও আমাদের জন্যে ব্যতিক্রম কিছু ছিল না। সুতরাং নিজের শহর বলে একে ভালবাসতেই হবে এমন বাধ্যতা আমার ছিল না। 

পৃথিবীর অন্য সকল জায়গার মত ওরানেও চিন্তা করার সময়ের ঘাটতি ছিল। এখানে লোকজন পরস্পরকে ভালবাসত ভালবাসা সম্পর্কে তেমন কিছু না জেনেই। এই শহরে সবচেয়ে ব্যতিক্রম ছিল মৃত্যুর সময়কালের কষ্টকর অভিজ্ঞতা। কষ্টকর শব্দটা এখানে হয়ত যৌক্তিক হবে না। বরং অস্বস্তি বা আরামহীনতা শব্দটাই বেশী যৌক্তিক হবে। অসুস্থ হওয়া কোন উপযোগী বিষয় না হলেও পৃথিবীতে অনেক শহরই আছে, যেখানকার মানুষেরা অসুস্থদের পাশে এসে দাঁড়ায়। কারণ, অসুস্থরা সামান্য কিছু মনোযোগ চায়, অন্যদের উপরে নির্ভর করতে চায় - এই বিষয়গুলোকে তারা প্রাকৃতিক হিসেবেই বিবেচনা করে থাকে। কিন্তু ওরানের চরম উষ্ণ তাপমাত্রা, ব্যবসার জরুরী প্রয়োজন, চারদিকের অনুপ্রেরণাহীন পরিবেশ, রাত্রির আকস্মিক আগমন, এবং আনন্দময়তার প্রকৃতির কারণেই মানুষের সুস্থ থাকা দরকারী ছিল। ফলে একজন অসুস্থ্য মানুষই এখানে খুবই একাকী অনুভব করত। সহমর্মিতার অভাবে। সেক্ষেত্রে আপনি চিন্তা করে দেখুন এই শহরে একজন মৃত্যুমুখী মানুষের অবস্থা কি ছিল? প্রচন্ড গরমের ভেতরে চারদেয়ালের ভেতরে বন্দী হয়ে তারা যখন একাকী মৃত্যু বরণ করত, তখন অন্যরা টেলিফোনে কথা বলত, জাহাজে মাল চালানের কথা আলোচনা করত, বিল অফ লেডিং, ডিসকাউন্ট ইত্যাদি নিয়ে নিজেদেরকে ব্যাপৃত রাখত। এই টুকু বুঝলেই আপনি বুঝতে পারবেন মৃত্যুর সময়ের অস্বস্তি বলতে কি বুঝাতে চেয়েছি আমি। ওরান ছিল এমনই এক আধুনিক শহর। 

এই ধরণের বিচ্ছিন্ন কিছু পর্যবেক্ষন আপনাকে এই শহর সম্পর্কে সম্যক একটা ধারণা দেবে। তবে আমাদের কখনই অতিরঞ্জন করা উচিৎ হবে না। আমি এগুলো আপনাদেরকে বলেছি শুধুমাত্র শহরের অবয়ব ও জীবনকে বোঝানোর জন্যে। আপনি ইচ্ছে করলেই এই শহরে সমস্যাহীনভাবে বসবাস করতে সক্ষম হতেন, অভ্যাস হয়ে যাওয়ার পর। কারণ অভ্যাসই ছিল একমাত্র জিনিস, যা আমাদের এই শহর পছন্দ করত। এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে আমাদের শহর কোন উত্তেজনাপূর্ণ শহর ছিল না, তা আমি স্বীকার করছি, তবে এখানে সামাজিক অস্থিরতা বলে কোন কিছু ছিল বলে আমরা জানি না। আমাদের স্পষ্টভাষী অথচ নম্র ও পরিশ্রমী নাগরিকেরা বহিরাগত অতিথিদেরকে যথেষ্টই সম্মান করত। ফলে দিনশেষে বৃক্ষহীন, গ্ল্যামারহীন, আত্নাহীন ওরান শহরকে প্রশান্তিময় জায়গা বলেই মনে হত, যেখানে যে কেউ আত্নপ্রসাদের সাথে ঘুমাতে পারত। 

আরও একটা কথা এপ্রসঙ্গে যোগ করা যৌক্তিক হবে বলে আমি মনে করি। সেটা হল ওরান শহরকে গড়ে তোলা হয়েছিল অনন্য ধরণের একটা ভূমির উপরে। এটার কেন্দ্রস্থলে ছিল একটা মালভূমি, যার চারদিকে ছিল উজ্জ্বল সব পাহাড়ের সারি। এবং শহরটি অবস্থিত ছিল একটি যথার্থ আকৃতির উপসাগরের উপরে। যদিও আমাদের একটু খারাপ লাগতে পারে এই ভেবে যে, শহরের পেছনটা উপসাগরের দিকে মুখ করে ছিল, সামনের দিকটা নয়। যেকারণে শহর থেকে কখনই সাগর দৃশ্যমান হত না। উপসাগরটিকে সব সময়েই খুঁজে নিতে হত। 

ওরানের স্বভাবিক জীবনের এই বর্ণনা আমাদেরকে বুঝতে সহায়তা করবে কি কারণে ওরানের জনগণ বিন্দুমাত্র ধারণাও করতে পারেনি সেই বছর বসন্তকালে সেই ঘটনাটি কেন ঘটেছিল? যা অশনি সংকেত হিসেবে কাজ করেছে সেই দুর্যোগময় ঘটনা সমুহের জন্যে, যার বর্ণনা আমি আপনাদেরকে দেব। কিছু কিছু মানুষের কাছে বর্ণনাকে মনে হবে স্বাভাবিক। অন্যদের কাছে সেগুলোকে অবিশ্বাস্য বলে মনে হবে। কিন্তু একজন বর্ণনাকারী এই মতপার্থক্যকে বিবেচনায় নিতে পারেন না। তার কাজ হল শুধুমাত্র বলা, ”এটাই হল সত্যিকারের ঘটনা।” এবং মানুষেরা নিজেই জানবে কি ঘটেছিল তখন, কিভাবে সেই ঘটনা সমগ্র জনপদের জীবনকে প্রভাবিত করেছিল। শুধু তাই নয় ঘটনার আরও সহস্র স্বাক্ষীরা তাদের হৃদয়ে সেই সত্যের মুখোমুখি হবেন, যা বর্ণনাকারী লিখবেন। আমরা জানি যে, এই ধরণের একটি কাজ সম্পাদন করার জন্যে বর্ণনাকারী (যার পরিচয় আপনাদেরকে যথাসময়ে দেয়া হবে) কোন সময়েই যথেষ্ট যোগ্যতা ধারণ করেন না। কারণ, এধরণের ঘটনা সম্পর্কিত সংবাদ সংগ্রহ করার অবকাশ সকলের হয় না, যদি না ভাগ্য তাকে অকুস্থলে টেনে নিয়ে যায় এবং নিবিড়ভাবে তাকে বিষয়টির সাথে সংশ্লিষ্ট রাখে। ইতিহাসবিদ হিসেবে তার দায়িত্ব সম্পাদনের যৌক্তিকতাও এটাই। 

সাধারণত একজন ইতিহাসবিদ (যিনি সৌখীনও হতে পারেন), সকল সময়েই তথ্য বা ডাটা (সেগুলো ব্যক্তিগত অথবা সেকেন্ডারি হতে পারে) দ্বারা নির্দেশিত হয়ে থাকেন। এই বিশেষ ক্ষেত্রে আমাদের বর্ণনাকারীর তিন ধরণের তথ্য বা ডাটা ছিল। প্রথমত, তিনি যা প্রত্যক্ষ করেছিলেন। দ্বিতীয়ত, প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য (বর্ণনাকারীকে ধন্যবাদ যে তিনি সাক্ষীদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও অনুভূতিগুলোকে অক্ষুণ্ণভাবে তুলে আনতে সমর্থ হয়েছিলেন)। এবং তৃতীয়ত, ঘটনা পরবর্তী সময়ে সংগৃহীত নথিপত্রগুলো। উল্লেখ্য, বর্ণনাকারী এই নথিপত্রগুলোকে বিভিন্ন সময়ে টেনে এনেছেন, প্রয়োজন অনুযায়ী। সেগুলোকে তিনি ব্যবহার করেছেন সবচেয়ে ভাল ভাবে। যদিও সময়াভাবের কারণে তিনি প্রিলিমিনারিজ (preliminaries) এবং সতর্কতামূলক মন্তব্যের অংশটি মূল বর্ণনার সাথে দিতে পারেননি। অবশ্য ঘটনাসমূহের প্রথম দিককার দিনকাল সমূহের বর্ণনা বিস্তারিতভাবে দিয়েছেন। 

এপ্রিল মাসের ১৬ তারিখের সকাল। সার্জারি কক্ষ হতে বের হবার সময়ে ডাক্তার বার্নার্ড রিও পায়ের নীচে নরম কিছু একটা অনুভব করল। সিঁড়িতে নামার পথের জায়গায়। একটা মৃত ইঁদুর। মুহুর্তের উত্তেজনায় সে সেটাকে পা দিয়ে একদিকে সরিয়ে দিল। অতঃপর কোনধরণের ভাবনা-চিন্তা ছাড়াই নীচ তলার দিকে এগিয়ে গেল। শুধুমাত্র মহাসড়কে উঠার সময়েই তার মনে হল যে, মৃত ইঁদুরটির কোনক্রমেই সিঁড়িতে অবতরণের স্থানে থাকার কথা নয়। সুতরাং সে ফিরে গেল এবং বিল্ডিং এর প্রহরী মিঃ মিশেলকে বলল সেটাকে ওখান থেকে সরিয়ে ফেলতে। মিঃ মিশেল ইঁদুরের বিষয়ে বিস্ময় প্রকাশ করার পূর্ব পর্যন্ত ডক্টর রিও বুঝতেই সক্ষম হল না তার সদ্য আবিষ্কারের অদ্ভুত প্রকৃতি সম্পর্কে। ব্যক্তিগতভাবে সে মনে করেছিল যে, সিঁড়ির দোরগোড়ায় একটা মৃত ইঁদুরের পড়ে থাকাটা অস্বাভাবিক। এই পর্যন্তই। 

কিন্তু প্রহরী মিশেল খুবই রেগে গেল এবং রাখঢাক না করেই বলল, “ওখানে কোন ইঁদুর থাকার প্রশ্নই উঠে না।“ 

সুতরাং বৃথাই ডাক্তার তাকে নিশ্চিত করার চেষ্টা করল যে, আসলেই সেখানে একটা ইঁদুর ছিল এবং সম্ভবত তা ছিল মৃত। 

“এই বিল্ডিং এ কোন ইঁদুর নেই,” মিশেল জোর দিয়ে পুনরাবৃত্তি করল। 

অবশ্য ইঁদুরটাকে দেখার পর সে খুবই চমৎকৃত হল এবং বলল যে, হয়ত বা কেউ সেটাকে বাইরে থেকে এনে এখানে ফেলেছে। সম্ভবত কোন বাচ্চাছেলে, যে কৌতুক করার উদ্দেশ্যে এটা করে থাকতে পারে। 

সেদিন বিকেলে ডাক্তার রিও বিল্ডিংটির প্রবেশদ্বারের কাছে দাঁড়াল। নিজের এপার্টমেন্টে যাবার পূর্বে পকেটে চাবি হাতড়াচ্ছিল সে। ঠিক এই সময়েই সে দেখতে পেল যে, একটা বড় আকারের ইঁদুর তার দিকে আসছে। গমনপথের অন্ধকার প্রান্ত হতে। খুবই অগোছালোভাবে এগিয়ে আসছিল সেটা। এবং তার শরীরের লোমগুলো ছিল ভেজা। রিওর কাছাকাছি এসে ইঁদুরটি থামল এবং নিজের শরীরের ভারসাম্য ঠিক করার চেষ্টা করল। তারপর একটু এগিয়ে আসল ডাক্তারের দিকে। পুনরায় থামল। অবশেষে নিজের চারপাশ দিয়ে ঘুর্ণন দিয়ে একদিকে কাঁত হয়ে পড়ে গেল। ইঁদুরটির মুখ সামান্য খোলা ছিল এবং সেখান থেকে রক্ত ঝরছিল। সেটিকে কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষন করার পর ডাক্তার রিও উপরের তলায় গেল। 

ইঁদুরটি নিয়ে কোন চিন্তা করছিল না সে। রক্ত ঝরার দৃশ্যটি তার চিন্তাকে অন্য একটা বিষয়ের দিকে ধাবিত করেছিল। এই বিষয়টা নিয়েই সে সারাদিন চিন্তা করেছিল। 

ডাক্তারের স্ত্রী বিগত কয়েক বছর যাবৎ অসুস্থতায় ভুগছিল। পরদিন সকালে তাকে রিও পাহাড়ের ভেতরে অবস্থিত স্বাস্থ্যনিবাসে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বাসায় ফেরার পর রিও তাকে বিছানায় শুয়ে থাকতে দেখল। অবসর নিচ্ছিল, ঠিক যেভাবে রিও তাকে উপদেশ দিয়েছিল অবসর নিতে। পরেদিনের ক্লান্তিকর ভ্রমণের পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে। রিওকে দেখে সে মৃদু হাসল। 

“তুমি কি জান আজ আমি খুবই ভাল বোধ করছি?” সে বলল। 

স্ত্রীর মুখের দিকে তাকাল রিও। স্ত্রী পাশের ল্যাম্পের আলোতে মুখ ফিরিয়ে রিও’র পানে তাকাল। মহিলার বয়স তিরিশ বছর। দীর্ঘদিনের অসুস্থতা তার মুখের উপরে একটা মলিন ছাপ ফেলে গেলেও রিও’র মনের ভেতরে যে ভাবনাটা এল, তা হল,” কি অল্প বয়সীই না লাগছে তাকে। ঠিক যেন ছোট্ট একটা শিশু!” 

“এখন ঘুমানোর চেষ্টা কর,” সে তাকে পরামর্শ দিল। “নার্স আসবে এগারোটায়। তোমাকে দুপুরের ট্রেন ধরতে হবে।“ স্ত্রীর ভেজা কপালে সে চুমু দিল। স্ত্রীর মৃদু হাসি তাকে দরজা পর্যন্ত পৌঁছে দিল। 

পরের দিন, ১৭ এপ্রিল তারিখে, সকাল আটটার সময়ে প্রহরী মিশেল তার মনযোগ আকর্ষণ করল, যখন সে বাসা হতে বের হয়ে যাচ্ছিল।

“কয়েকটা দুষ্ট ছেলে,” সে বলল, “তিনটা মৃত ইঁদুরকে হলঘরের ভেতরে ফেলে গেছে।“ সেই সাথে সে এটাও জানাতে ভুলল না যে, ইঁদুরগুলোকে কেউ একজন শক্ত স্প্রিং দিয়ে তৈরী ফাঁদ পেতে ধরেছিল, এবং সেগুলোর মুখ দিয়ে অনবরত রক্ত ঝরছিল। 

প্রহরী দরজার কাছে কিছুক্ষণ দাঁড়াল। হাত দিয়ে ইঁদুরগুলোর পা ধরে। এই সময়েও সারাক্ষণই সে রাস্তার উপরে পথচারীদের উপরে খেয়াল রাখছিল, যাতে সেই দুষ্কৃতিকারী শিশুদেরকে তাদের কোন অসচেতন মূহুর্তের মৃদু হাসি বা মুখের অভিব্যক্তি ব্যবহার করে ধরতে সমর্থ হয়। 

“তবে আমি ওদেরকে ধরবই,” মিশেল আশান্বিতভাবে বলল। 

যথেষ্টই হতবাক হয়ে রিও সিদ্ধান্ত নিল শহরের প্রান্ত এলাকা দিয়ে ঘুরে আসতে। সেখানে তার গরীব রোগীরা বাস করে। সুতরাং এই বিলম্বিত সকালে কার নিয়ে এলাকাগুলোতে ঘুরতে গেল। রোগী দেখার নাম করে। পথিমধ্যে সে ফুটপাতের পাশে সারি করে রাখা ময়লা ফেলার ডাস্টবিনগুলোর দিকে তাকাল। এবং, অবাক হল শুধুমাত্র একটা রাস্তাতেই ডজন খানেক মৃত ইঁদুর দেখতে পেয়ে। সেগুলোকে কেউ সব্জি ও অন্যান্য আবর্জনার উপরে ফেলে দিয়েছিল। 

সে তার প্রথম রোগীর বাড়িতে গেল। দীর্ঘকাল ধরে এই রোগী এজমায় ভুগছিল। রিও দেখতে পেল সে একটা রুমের ভেতরে শুয়ে আছে। এই রুমটিকে একইসাথে ডাইনিং রুম ও বেডরুম হিসেবে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। লোকটির চেহারা কঠিন ও মুখের আকৃতি এবড়ো-থেবড়ো ধরণের। স্পেনদেশীয়। রিও ঘরে প্রবেশ করার সময়ে সে উঠে বসার চেষ্টা করল। হাঁপাতে হাঁপাতে এবং সাঁসাঁ করে নিঃশ্বাস নিতে নিতে। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল যে, তার শ্বাস নিতে খুবই কষ্ট হচ্ছে। এই সময়ে তার স্ত্রী এক গামলা জল নিয়ে আসল। 

“ডাক্তার,” লোকটি বলল, যখন তাকে ইনজেকশন পুশ করা হচ্ছিল,“ ওরা সবাই বের হয়ে আসছে, তুমি কি লক্ষ্য করেছ?” 

“ইঁদুর, সে বলতে চাচ্ছে,” তার স্ত্রী ব্যাখ্যা করল। “আমাদের উল্টোদিকের বাসায় তিনটে পাওয়া গেছে।“ 

“ওরা বের হয়ে আসছে, তুমি সেগুলোকে দেখতে পাবে ডাস্টবিনগুলোতে।“ 

কিছুক্ষণের ভেতরেই রিও আবিষ্কার করতে সমর্থ হল যে, ইঁদুরদের নিয়ে এই এলাকায় প্রবল আলোচনা চলছে। পুরো এলাকা ঘুরে দেখার পর সে গাড়ি চালিয়ে নিজের বাড়িতে এল। 

“উপরে তোমার জন্যে একটা টেলিগ্রাম আছে,” মিঃ মিশেল তাকে অবহিত করল। 

ডাক্তার তাকে জিজ্ঞেস করল সে আর কোন ইঁদুর দেখেছে কিনা। 

“না, দারোয়ান উত্তর করল, ”আর একটাও দেখিনি আমি। তবে আমি কড়া নজর রাখছি।“ 

টেলিগ্রাম থেকে রিও জানতে পারল যে, পরের দিন তার মা আসবেন। তিনি রিও’র স্ত্রীর সাময়িক অনুপস্থিতির ছেলের সংসার দেখেশুনে রাখবেন। ঘরে প্রবেশ করতেই রিও দেখতে পেল যে, নার্স চলে এসেছে। সে নিবিড় দৃষ্টিতে স্ত্রীর দিকে তাকাল। 

তার স্ত্রী দর্জি দিয়ে বানানো একটা জামা পরেছিল। রিও খেয়াল করল যে, সে লাল লিপস্টিক দিয়েছে। রিও তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল। 

“চমৎকার,’ সে বলল। “তোমাকে অসাধারণ লাগছে।“ 

কয়েক মিনিট পর সে তাকে একটা স্লিপিং কারের (শয়ন যান) ভেতরে শুইয়ে দিল। স্ত্রী কারের কুঠুরিটির চারদিকে তাকাল। 

“এটা আমাদের জন্যে খুবই ব্যয়বহুল, তাই না?” 

“এটা ভিন্ন আর উপায় ছিল না,” রিও উত্তর করল। 

“এই যে ইঁদুরের গল্প শুনছি, এগুলো কি?” 

“আমি তোমকে ব্যাখ্যা করতে পারব না। অবশ্যই এটা একটা অদ্ভুত সমস্যা। তবে আমি নিশ্চিত যে, এটা শেষ হয়ে যাবে।“ 

অতঃপর খুব দ্রুত সে স্ত্রীর কাছে প্রার্থনা করল তাকে ক্ষমা করে দেয়ার জন্যে। এই সময়ে সে এটাও অনুভব করল যে, তার উচিৎ ছিল স্ত্রীকে আরও ভালভাবে দেখাশুনা করার, এ বিষয়ে সে আসলেই অমনোযোগী ছিল। তার স্ত্রী মাথা নাড়ল, তাকে বাঁধা দেয়ার উদ্দেশ্যে। 

তখন সে বলল, “যাই হোক, তুমি ফিরে আসার পর সবকিছুই আরও ভাল হবে। আমরা সবকিছুই নতুন করে শুরু করব।“ 

“অবশ্যই,” তার চোখ দুটো জ্বলজ্বল উঠল। 

কিন্তু তারপর সে মাথা ঘুরিয়ে নিল। মনে হল যে, কারের জানালা দিয়ে সে বাইরের প্লাটফর্মের দিকে তাকিয়ে আছে। সেখানে কয়েজকজন লোক পরস্পরের সাথে ধাক্কাধাক্কি করছিল। দ্রুত সেখান থেকে চলে যাওয়ার জন্যে। গাড়ির হিসহিস ধ্বনি ইতিমধ্যেই তাদের কানে পৌঁছে গিয়েছিল। 

রিও ভদ্রভাবে স্ত্রীকে তার প্রথম নাম ধরে ডাকল। স্ত্রী ফিরে তাকালে সে দেখতে পেল তার মুখ ভিজে গেছে অশ্রুতে। 

“কেঁদো না,” সে বিড়বিড় করে বলল। 

অশ্রুর পেছন থেকে স্ত্রীর মুখে মৃদু হাসি ফিরে আসল। যদিও কিছুটা অস্থির। রিও একটা দীর্ঘশ্বাস টানল। 

“এখন যাও। সবকিছু দ্রুতই ঠিক হয়ে যাবে। 

সে স্ত্রীকে মূহুর্তের জন্যে নিজের বাহুর ভেতরে জড়াল। তারপর প্লাটফর্ম থেকে সরে গেল। এই মূহুর্তে সে শুধুমাত্র স্ত্রীর মৃদু হাসি দেখতে পাচ্ছিল। জানালার ভেতর দিয়ে। 

“প্লিজ প্রিয়া,” সে বলল, “নিজের যত্ন নেবে।“ 

কিন্তু তার স্ত্রী তাকে শুনতে পেল না। 

স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম ত্যাগ করে বের হবার ফটকের কাছে পৌঁছুতেই রিও দেখতে পেল পুলিশের ম্যাজিস্ট্রেট মিঃ ওথোনকে। তিনি ছোট একটি বালককে হাত দিয়ে শক্ত করে ধরে রেখেছিলেন। ডাক্তার তাকে জিজ্ঞেস করল যে, তিনি চলে যাচ্ছেন কিনা। দীর্ঘদেহী ও কাল বর্ণের মিঃ ওথোনের অভিব্যক্তির ভেতরে এমন কিছু ছিল, যার কারণে নগরের লোকজন তাকে খুবই কঠিন মানুষ, এমনকি আজরাইলের সহকারী বলেও মনে করত। 

“না, আমি আমার স্ত্রীকে বিদায় দিতে এসেছিলাম। সে আমার পরিবারের সদস্যদেরকে দেখার জন্যে এসেছিল।“ 

ট্রেন চলে যাওয়ার হুইসেল বাজল। 

“এই ইঁদুরগুলো, এখন?” ম্যাজিস্ট্রেট শুরু করল। রিও ট্রেনের চলার গতির দিকে একটু এগিয়ে গেল, তারপর বের হবার ফটকের দিকে ঘুরে দাঁড়ালো। 

“কোন ইঁদুরগুলো?” সে বলল। 

সেই মূহুর্তের দৃশ্যপট, যা পরবর্তীতে রিও মনে করতে সক্ষম হয়েছিল তা হল, ট্রেনের একটা পোর্টার এক বাক্সভর্তি মরা ইঁদুর বহন করে নিয়ে যাচ্ছিল। 

সেদিন বিকেলে রোগীদেরকে রিও পরামর্শ দিতে যাবার মূহুর্তে এক যুবক তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসল। যুবকটি সকালেও তার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল বলে রিও স্মরণ করতে পারল। যুবকটির পেশা সাংবাদিক। নাম রেয়মন্ড র‍্যাম্বার্ট। আকৃতিতে খাটো। কাঁধ চারকোণা। মুখে দৃঢ় আত্নবিশ্বাস। দেখে মনে হয় যে, সে যেকোন ধরণের পরিস্থিতিতে স্থির ও সিদ্ধান্তে অটল থাকতে সক্ষম। স্পোর্টস ধরণের একটা পরিচ্ছদ পরেছিল সে। 

বিষয়ান্তরে না গিয়ে যুবক সরাসরি আলোচনার বিষয়ে কথা শুরু করল। যুবকের পত্রিকাকে, যা প্যারিসের প্রথম সারির একটা পত্রিকা, দায়িত্ব দেয়া হয়েছে এই শহরের আরব জনগোষ্ঠীর জীবন ও জীবিকার উপরে প্রতিবেদন তৈরির জন্যে। বিশেষ করে তাদের স্যানিটারি পরিস্থিতি নিয়ে। 

রিও তাকে জানাল যে, পরিস্থিতি খুব একটা অবস্থা ভাল নয়। তবে এইটুকু বলার পূর্বেই সে সাংবাদিককে জিজ্ঞেস করল যে, সে তার পত্রিকায় সত্য প্রকাশ করতে সক্ষম কিনা। 

“নিশ্চয়ই,” র‍্যাম্বার্ট উত্তর করল। 

“আমি বলতে চাচ্ছি।“ রিও পুনরায় ব্যাখ্যা করল, “তুমি কি তোমার পত্রিকায় শর্তহীনভাবে বিরাজমান অব্যবস্থার নিন্দা জানাতে পারবে?” 

“শর্তহীন ভাবে? না, অতদূর পর্যন্ত আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি না। তবে পরিস্থিতি নিশ্চয়ই এখনও ততটা খারাপ নয়?” 

~না, রিও শান্তভাবে বলল, “পরিস্থিতি এখনও ততটা খারাপ নয়।“ 

আসলে প্রশ্নটা তার করার দরকার ছিল না, তবুও সে করল, শুধুমাত্র বোঝার জন্যে যে, র‍্যাম্বার্ট তার সঙ্গে কোন চাতুরী করছে কিনা। 

“আমার কাছে এখন পর্যন্ত তেমন তথ্য নেই, যা আমি তোমার প্রতিবেদনের জন্যে প্রদান করতে পারি,” রিও যোগ করল। 

“তুমি Saint-Just এর ভাষায় কথা বলছ, ডাক্তার,” সাংবাদিক বলল। 

কোন বিতর্কে না গিয়ে রিও তাকে জানাল যে, Saint-Just এর ভাষা সম্পর্কে তার কোন ধারণা নেই। এবং সে যে ভাষা ব্যবহার করেছে, তা একজন ব্যক্তির ভাষা, যে পৃথিবী সম্পর্কে ইতিমধ্যেই ত্যক্ত-বিরক্ত। অবশ্য, এখনও সে তার আশেপাশের লোকজনকে যথেষ্টই পছন্দ করে, এবং বর্তমান পর্যন্ত তাকে অবিচার মেনে নিতে বা সত্যের সাথে আপোষ করতে হয়নি। কথাগুলো বলার সময়ে ডাক্তারের কাঁধ ঝুলে ছিল। র‍্যাম্বার্ট কথা না বলে কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল। 

অতঃপর সে, “আমার মনে হয় আমি তোমাকে বুঝতে পারছি,” বলল। চেয়ার থেকে উঠতে উঠতে। 

ডাক্তার দরজা পর্যন্ত তার সাথে এগিয়ে এল। 

“তুমি বিষয়টাকে এভাবে নিয়েছ বলে আমি খুশি হলাম,” সে বলল। 

“হ্যা, হ্যা, আমি বুঝতে পেরেছি, বুঝতে পেরেছি,” র‍্যাম্বার্ট পুনরাবৃত্তি করল। রিও’র কাছে এবারে মনে হল তার কথার স্বরে কিছুটা অধৈর্য প্রকাশিত হচ্ছে। 

“দুঃখিত,আমি তোমার জন্যে হয়ত বা অসুবিধার সৃষ্টি করলাম,“ র‍্যাম্বার্ট শেষবারের মত বলল। 

র‍্যাম্বার্টের সাথে হাত মিলানোর সময়ে রিও জানাল যে, সে যদি খবরের কাগজের জন্যে সত্যিই ভিন্ন ধরণের সংবাদ সংগ্রহের জন্যে বের হয়ে থেকে থাকে, তবে সে তাকে শহরের ভেতরে বর্তমানে যে বিস্ময়কর সংখ্যার মৃত ইঁদুর পাওয়া যাচ্ছে, সে সম্পর্কে বলতে পারে। 

“আহা,” র‍্যাম্বার্ট উচ্ছ্বসিত ভাবে বলল। “অবশ্যই, আমি এ সম্পর্কেই জানতে আগ্রহী।” 

বিকেল ৫ টায় রিও আরেকবার নগর পরিভ্রমণে বের হল। যাবার পথে, সিঁড়ির উপরে রিও’র দেখা হল গাঁট্টাগোট্টা ধরণের অন্য এক যুবকের সাথে। তার মুখমন্ডলটি অনেক বড়। সারামুখে গভীর ভাঁজ ও চোখের ভ্রু এতই ঘন যে দেখতে ঝোপের মত লাগে। যুবকের সাথে ইতিপূর্বেও রিও’র সাক্ষাৎ হয়েছে। একবার অথবা দু’বার। একবার তার সাথে দেখা হয়েছিল নিজের বাসার উপরের তলার এপার্টমেন্টে। কয়েকজন পুরুষ স্প্যানিশ ডান্সারদের সাথে। যুবকের নাম জ্যা ত্যারু। 

সিগারেটে ফুঁক দিতে দিতে যুবক সিঁড়ির উপরে পড়ে থাকা সামনের একটা মৃত ইঁদুরের ফুলে উঠা শরীরের দিকে তাকিয়ে ছিল। রিও’কে দেখার পর সে উপরের দিকে তাকাল। তার বাদামী চোখের দৃষ্টি কিছুক্ষণের জন্যে ডাক্তারের উপরে নিবদ্ধ হল। তারপর মন্তব্য করল যে, ইঁদুরদের এভাবে মরে যাওয়ার বিষয়টা আসলেই অদ্ভুত। বিশেষ করে গর্তের ভেতর থেকে বের হয়ে এসে খোলা জায়গায় মৃত্যবরণ করার বিষয়টি। 

‘খুবই অদ্ভুত,” রিও সম্মতি জানাল, ‘বিষয়টি স্নায়ুর উপরে প্রবল চাপ সৃষ্টি করে। 

“ঠিক বলেছ, ডাক্তার। আমরা ইতিপূর্বে কখনই এই ধরণের ঘটনা ঘটতে দেখিনি। ব্যক্তিগতভাবে আমি এটাকে কৌতূহলোদ্দীপক বলেই মনে করি।“ 

ত্যারু আঙুল দিয়ে নিজের মাথার ভেতরে চালনা ও কপালকে পরিষ্কার করতে করতে পুনরায় মৃত ইঁদুরটির দিকে তাকাল। ওটা ততক্ষণে স্থির হয়ে গেছে। সে রিও’র দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল। 

“কিন্তু, ডাক্তার এটা তো আমাদের সমস্যা নয়। এটা দারোয়ানের সমস্যা, তাই নয় কি?” 

তার কথা শেষ না হতেই দারোয়ান পাশে এসে দাঁড়াল। সে দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে ছিল। তাকে যথেষ্টই ক্লান্ত দেখাচ্ছিল। তার স্বাভাবিক লালচে মুখটাকে মনে হচ্ছিল পাংশুটে ও রক্তহীন। 

“হ্যা, আমি জানি,” বৃদ্ধ লোকটি রিও’কে বলল। সেই তাকে ইঁদুর বিষয়ক সর্বশেষ আপতনের কথা জানিয়েছিল। 

“আমি এগুলোকে প্রতিবারেই দেখতে পাই দুই বা তিনটা করে। তবে এই ঘটনা শুধুমাত্র আমাদের বাড়িতে ঘটছে না। এই রাস্তার সকল বাড়িতেই একই ঘটনা ঘটছে।“ 

মিশেলকে উদ্বিগ্ন ও হতাশ বলে মনে হল। সে নিজের অজান্তেই ঘাড় চুলকাচ্ছিল। রিও তাকে জিজ্ঞেস করল যে, সে অসুস্থ্যবোধ করছে কিনা। কিন্তু দারোয়ান কোনক্রমেই স্বীকার করল না। নিজের সম্পর্কে তার মত হল যে, সে কিছুটা উদ্বিগ্ন আছে মৃত ইঁদুরগুলোর কথা ভেবে। এটা থেকে মুক্তি পাওয়া তখনই সম্ভব হবে, যখন তারা গর্তগুলো হতে বের হয়ে এসে যত্রতত্র মরে যাওয়া বন্ধ করবে। 

পরের দিন সকাল। এপ্রিলের ১৮ তারিখ। রিও তার মাকে স্টেশন থেকে বাসায় নিয়ে আসছিল। সে দেখল মিঃ মিশেল তখনও ইঁদুর নিয়ে ব্যস্ত এবং বাসার নীচের ভূগর্ভস্থ কক্ষ হতে শুরু করে চিলেকোঠা পর্যন্ত সিঁড়িতে অসংখ্য মৃত ইঁদুর ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। দশ বারটা হবে। এমনকি সড়কের পাশে রাখা বাসার ডাস্টবিনগুলোকেও দেখতে পেল ইঁদুরে পরিপূর্ণ। তবে রিও’র মা বিষয়টিকে সহজভাবেই গ্রহণ করলেন বলে মনে হল। 

“কিছু কিছু সময়ে আমি ইঁদুরের মরে যাওয়া অপছন্দ করি না,” অনুভূতিহীনভাবে তিনি বললেন। একজন রূপালী চুলের খর্বকায় আকৃতির মহিলা। আপাতভাবে নম্র চোখের। 

“তোমার কাছে আসতে পেরে আমি খুবই খুশী হয়েছি, বার্নার্ড,” তিনি যোগ করলেন। “বিড়ালের বিষয়টিতে আমার তেমন কিছুই যায় আসে না।“ 

রিও সম্মতিসূচক মাথা নাড়ল। মা’র অবস্থানকালে রিও’র জন্যে সকলকিছুই সহজ হয়ে যায়। 

যাই হোক, সে মিউনিসিপ্যাল অফিসে টেলিফোন করল, কীট-মূষিকাদি ধ্বংসের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে। যাকে সে পূর্ব হতেই চিনত। নাম মারসিয়ার। তাকে জিজ্ঞেস করল যে, এলাকার ইঁদুরেরা গর্ত হতে বের আসছে এবং খোলা জায়গায় তারা মরে যাচ্ছে – এ সম্পর্কে তিনি জানেন কিনা। হ্যা, মিঃ মারসিয়ার এ সম্পর্কে সবই জানতেন। 

সত্য বলতে গেলে তিনি বিরক্তই হলেন। ডাক্তারকে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কি মনে কর যে, এটা খুব গুরুতর ব্যাপার?” 

রিও তাকে কোন নিশ্চিত মতামত দিতে পারল না। কিন্তু সে জানাল যে, স্যানিটারি সার্ভিসের উচিৎ কিছু একটা করা। মারসিয়ার সম্মত হল। 

“তুমি যদি সত্যিই মনে কর যে এটা আসলেই বড় সমস্যা, তাহলে এ বিষয়ে আমি একটা সরকারী নির্দেশও জারী করতে পারি।“ 

“অবশ্যই এটা বড় ধরণের সমস্যা,” রিও উত্তর করল। 

তার বাসার অস্থায়ী কাজের বুয়া তাকে জানিয়েছে যে, তার স্বামীর ফ্যাক্টরি হতে কয়েক শত মৃত ইঁদুর সংগ্রহ করা হয়েছে। 

বলতে গেলে এই সময় হতেই শহরের নাগরিকেরা প্রথম অস্বস্তি প্রদর্শন করতে শুরু করেছিল। কারণ এপ্রিল মাসের ১৮ তারিখ থেকেই প্রচুর সংখ্যায় মৃত ইঁদুর পাওয়া যেতে থাকে। ফ্যাক্টরী ও ওয়্যারহাউজগুলোতে। অনেক সময়ে এদেরকে মেরে ফেলা শুরু হয় নাগরিকদের মানসিক যন্ত্রনাকে দূর করার জন্যে। শহরতলী থেকে শুরু করে শহরের কেন্দ্রস্থল পর্যন্ত, যেসব গলিতে ডাক্তার কর্তব্য পালনের জন্যে যেত, প্রত্যেকটা রাস্তায় - ইঁদুরগুলোকে জমা করা হচ্ছিল ডাস্টবিনের ভেতরে। অথবা রাস্তার পাশের নর্দমার ভেতরে দীর্ঘ লাইন দিয়ে সেগুলো পড়েছিল। 

সেদিনের বিকেলের পত্রিকা বিষয়টিকে নিয়ে খবর ছাপল। প্রশ্ন তুলল নগরপিতারা এবিষয়ে কিছু করছেন কিনা, এবং কি ধরণের জরুরী ব্যবস্থা তারা গ্রহন করেছেন এই নিদারুণ বিরক্তিকর উপদ্রব থেকে মুক্তি পেতে। 

বাস্তবে মিউনিসিপ্যালিটি কর্তৃপক্ষ এ সংক্রান্ত কোন কার্যক্রমই সেই সময় পর্যন্ত গ্রহণ করেনি। তবে পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশের পর তারা সিদ্ধান্ত নিয়ে একটা সভা ডাকল। পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করার জন্যে। 

শহরের স্যানিটারি কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ প্রদান করা হল প্রতিদিন ভোরে মৃত ইঁদুরগুলোকে সংগ্রহ করতে। সংগ্রহের পর সেগুলোকে পাঠিয়ে দেয়া হল চুল্লীতে পুড়িয়ে ফেলার জন্যে। দুটো ট্রাকে করে। কিন্তু অব্যবহিত পরের দিনগুলোতে পরিস্থিতি ক্রমশ আরও খারাপ হতে শুরু করল। 

চতুর্থ দিন থেকে ইঁদুরগুলো বের হয়ে এসে মরতে লাগল। বেইসমেন্ট, ভূগর্ভস্থ কুঠুরী ও নর্দমার অন্ধকার হতে সেগুলো সূর্যের আলোতে আগমন করতে থাকল। দলে দলে। সাগরের লম্বা ঢেঊয়ের মত সারি বেঁধে। এবং শেষে অসহায় কোন নর্তকীর মত এক আঙুলে ভর দিয়ে ঘুরপাক খেয়ে পথচারীদের পায়ের কাছে আছড়ে পড়ল। মৃত হিসেবে। 

রাতের বেলায় নগরের অলিতে-গলিতে ইঁদুরদের ক্ষীণ মৃত্যু চিৎকার স্পষ্টভাবে শোনা যেতে লাগল। সকালের আলোতে শরীরগুলো আবিষ্কৃত হল নর্দমার ভেতরে। সারিবদ্ধ হয়ে মরে পড়েছিল। প্রতিটা মৃত ইঁদুরের মুখেই ছিল রক্তের ছোপ। লাল ফুলের মত। 

নর্দমার শেষ প্রান্তেও দেখা গেল কিছু ইঁদুরকে। ইতিমধ্যেই সেগুলো ফুলে উঠেছিল এবং তাদের শরীর পচতে শুরু করেছিল। অবশিষ্ট ইঁদুরগুলোকে পাওয়া গেল শক্ত ও স্থবির হিসেবে। শুধু অলিতে-গলিতে নয়, শহরের ব্যস্ততম এলাকাগুলোতেও দেখা গেল ছোট ছোট মৃত ইঁদুরের স্তূপ। সর্বত্র, সিঁড়ি হতে অবতরনের পথে, বাড়ির বাসস্থানের পেছনের উঠোনে। 

কিছু সংখ্যক ইঁদুরকে দেখা গেল সরকারী অফিসের হলঘর, স্কুলের খেলার মাঠ, এমনকি হোটেলের বারান্দাতে। এখানে এসে এগুলো একাকী মরে গেল। আমাদের নগরের মানুষেরা অবাক হয়ে দেখতে পেল শহরের ব্যস্ত কেন্দ্র যেমন, প্যারেড স্কোয়ার, বুলেভার্ড, সরোবরের পার্শ্ববর্তী এলাকা – সবখানেই বীভৎস ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ইঁদুরেরা মরে পড়ে আছে। বিন্দুর মত ছড়িয়ে ছিটিয়ে। 

শহরকে প্রতিদিন সকালে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করার পর সামান্য সময় বিরতি দিয়ে পুনরায় ইঁদুরগুলো আসতে শুরু করল এবং সারাদিন ধরে এদের সংখ্যা বাড়তে থাকল। রাতে পথে থাকা মানুষেরা প্রতিনিয়ত তাদের পায়ের নীচে গোলাকার ঈষদুষ্ণ নরম শরীরের স্পর্শ অনুভব করতে লাগল। ঠিক যেন পৃথিবী নিজের শরীরের ভেতরে লুকিয়ে রাখা রসিকতা দিয়ে অন্ত্রদেশের ঘরবাড়ীগুলোকে উগড়ে দিচ্ছিল পৃথিবীপৃষ্ঠের উপরে। ফোঁড়া থেকে নির্গত ক্লেদের মত। বর্তমান পর্যন্ত আমাদের শান্ত ছোট শহরের ভয়ার্ত অবস্থা যদি আপনি কল্পনা করেন, তাহলে আপনি আপনি বুঝতে পারবেন যে ওটার অন্তঃস্থল পর্যন্ত কেঁপে গিয়েছিল। আকস্মিক কোন আঘাতে। এটাকে তুলনা করা যেতে পারে একজন সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষের হঠাৎ করে তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার সাথে, যখন তার রক্তের প্রবাহ দাবানলের মত শিরায় শিরায় ছড়িয়ে পড়ে। 

ব্যাপারটি এতটাই বিস্তৃত হয়ে গিয়েছিল যে, নগরের তথ্যকেন্দ্র (যারা প্রতিটা বিষয়য়েই তাৎক্ষণিক ও যথাযথ উত্তর দিয়ে থাকে) পর্যন্ত এদের সঠিক সংখ্যা বলতে পারত না। তারা তাদের দৈনন্দিন ঘোষনাই শুরু করত এভাবে যে, ২৫ এপ্রিল তারিখ সারাদিনে অন্ততপক্ষে ৬,২৩১টি ইঁদুর সংগ্রহ করে পুড়ে ফেলা হয়েছে। এই ধরণের পরিবেশনা বিষয়টির অধিকতর বিস্তৃতি ও বাস্তব অবস্থা আমাদের চোখের সামনে তুলে ধরত। এই বিশাল সংখ্যা সাধারণ মানুষের স্নায়ুর উপরে প্রবল ধাক্কা সৃষ্টি করতেও সমর্থ ছিল। এই সময়ে জনসাধারণ শুধুমাত্র দৈবের উপরে নির্ভর করা শুরু করে দিল এবং মেনে নিল যে, পুরো ব্যাপারটাই অদ্ভুত, যার উৎস ও বিস্তৃতি সম্পর্কে প্রকৃত ধারণা করা অসম্ভব। 

সেই স্পেনীয় রোগী, যাকে এজমার রোগী হিসেবে রিও চিকিৎসা করছিল, সেই শুধুমাত্র তার হাত ঘষতে ঘষতে মুখ টিপে হেসে বলেছিল, “তারা বেরিয়ে আসছে, তারা বেরিয়ে আসছে।” 

২৮ এপ্রিল তারিখে তথ্যকেন্দ্র থেকে ঘোষণা করা হল যে, উক্ত দিনে ৮,০০০ ইঁদুর সংগ্রহ করা হয়েছে। খবরটি পুরো শহরকে শোকার্ত করে তুলল। নাগরিকরা কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবী জানাল। তারা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ঢিলেমি করার অভিযোগ আনল। সমুদ্র উপকূলে যাদের বাড়ি ছিল, তারা সেখানে চলে যাওয়ার জন্যে মনঃস্থির করল। কিন্তু পরদিনই তথ্যকেন্দ্র হতে জানানো হল যে, হঠাৎ ইঁদুর মরে যাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে এবং স্যানিটারি কর্তৃপক্ষ শুধুমাত্র কয়েকটা ইঁদুর সংগ্রহ করতে সমর্থ হয়েছে। সবাই তখন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। 

যাই হোক, সেদিন দুপুরে ডাক্তার রিও যখন তার এপার্টমেন্টের নীচে কার পার্কিং করছিল, তখন সে দারোয়ানকে দেখতে পেল রাস্তার দিক হতে হেঁটে আসতে। সে নিজেকে টেনে নিয়ে আসছিল। তার মাথাটা নীচু হয়েছিল। তার দুই বাহু ও দুই পা তীর্যকভাবে পড়ছিল। ঠিক যেমন করে ঘড়িচালিত পুতুল নড়াচড়া করে থাকে। বৃদ্ধ লোকটি একজন পাদ্রীর বাহুর উপরে ভর করে এগোচ্ছিল, যে পাদ্রীকে রিও চিনত। তিনি ছিলেন ফাদার প্যানেলো। একজন শিক্ষিত স্বাধীনচেতা খ্রীস্টীয় যাজক। তার সঙ্গে রিও’র কয়েকটা অনুষ্ঠানে সাক্ষাৎ হয়েছে। তাকে আমাদের শহরে খুবই গণ্যমান্য ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হত। ধর্মীয় অঙ্গনের বাইরেও। রিও তাদের কাছে আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করল। মিঃ মিশেলের চোখ রক্ত বর্ণ ধারণ করেছিল এবং সে শব্দ করে শ্বাস-প্রশ্বাস নিচ্ছিল। মিশেল তাকে বলল যে, সে একটু খারাপ অনুভব করার কারণে বায়ু সেবন করতে গিয়েছিল। কিন্তু তার সমস্ত শরীরে ব্যাথা শুরু হয়ে গিয়েছিল। বিশেষ করে পায়ে, বগলে ও কটিসন্ধিতে। ফলে তাকে ফিরে আসতে হয়েছে ফাদার প্যানেলো’র সাহায্য নিয়ে। 

“ওটা শুধু ফুলে গিয়েছে,” সে বলল। “সম্ভবত আমি কোথাও বেশি চাপ দিয়ে ফেলেছি।“ 

কারের জানালা দিয়ে হাত বের করে ডাক্তার মিশেলের কাঁধের উপরে রাখল। একটা শক্ত পিন্ড ছিল সেখানে। বনের ভেতরে কাঠের গিটের মত। 

“তুমি তাড়াতাড়ি বিছানায় যাও এবং তোমার শরীরের তাপমাত্রা নাও। আমি আজ বিকেলে এসে তোমাকে দেখব।“ 

মিশেল চলে যাওয়ার পর রিও ফাদারকে জিজ্ঞেস করল, ইঁদুরদের সম্পর্কিত এই অদ্ভুত ব্যাপার নিয়ে তিনি কি ভাবেন। 

“সম্ভবত এটা একটা মহামারী।“ ফাদারের চোখগুলো তার বড় গোল চশমার পেছন থেকে মৃদু হাসছিল। 

লাঞ্চ করার পর রিও তার স্ত্রীর কাছ থেকে দ্বিতীয় টেলিগ্রাম পেলো স্বাস্থ্যনিবাস থেকে। সে ফিরে আসছে বলে জানিয়েছে। একটা ফোন আসল তার এক সাবেক রোগীর কাছ থেকে। সে মিউনিসিপ্যাল অফিসের একজন কেরানী। অনেক বছর ধরে সে মহাধমনীর অসুখে ভুগছিল। গরীব হবার কারণে রিও তাকে ফি না নিয়েই চিকিৎসা দিয়েছিল। 

“ধন্যবাদ ডাক্তার, আমাকে মনে রাখার জন্যে। তবে আমি নিজের জন্যে রিং করিনি। আমার পাশের বাসার একটি লোক দুর্ঘটনায় পড়েছে। আপনি কি একটু দ্রুত আসতে পারবেন?” 

লোকটির কথা শুনে রিও’র মনে হচ্ছিল যে, লোকটি শ্বাস নিতে পারছে না। রিও দ্রুত ভাবল যে, দারোয়ানকে সে পরে দেখতে যেতে পারবে। 

কয়েক মিনিট পরে রিও শহরের প্রান্তে অবস্থিত একটা বাসায় প্রবেশ করল। দুর্গন্ধময় একটা সিঁড়ি বেয়ে অর্ধেক পথ উঠতেই সে জোসেফ গ্র্যান্ডকে দেখতে পেল। সেই করনিক। সে তাকে দেখে ছুটে আসল। বয়স আনুমানিক ৫০ বছর। লম্বা হবার কারণে সামনের দিকে কিছুটা ঝুলে থাকে। সরু কাঁধ, চিকন ডানা এবং হলুদাভ গোঁফের অধিকারী। 

“সে এখন কিছুটা ভাল বলে মনে হচ্ছে,” সে রিও’কে বলল। ” তবে আমি সত্যিই ভেবেছিলাম যে, তার সময় শেষ হয়ে গেছে।“ গ্র্যান্ড তার নাক দিয়ে জোরে জোরে শব্দ করছিল। 

তার সাথে উপরের তলায় উঠার পর রিও লক্ষ্য করল বামদিকের দেয়ালে লাল চক দিয়ে কিছু একটা লেখা আছে, “ভেতরে আস। আমি ফাঁসি দিয়েছি।“ 

তারা ঘরে প্রবেশ করে দেখতে পেল একটা রশি উপর থেকে ঝুলছে। একটা ঝুলন্ত বাতি হতে। পাশেই একটা চেয়ার পড়ে আছে। ডাইনিং টেবিলটাকে ধাক্কা দিয়ে কর্ণারের দিকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। কিন্তু রশিতে কিছুই বাঁধা নেই। 

“আমি যথাসময়ে তাকে নামাতে পেরেছিলাম।“ গ্র্যান্ডকে মনে হচ্ছিল সে কি বলবে তা বুঝে উঠতে পারছে না। যদিও সে সবচেয়ে সরলভাবেই তার কথাগুলো বলে থাকে। 

“আমি বের হয়ে যাবার সময়ে শব্দটা শুনেছিলাম। দেয়ালের লেখা দেখে আমি প্রথমে কৌতুক বলে ভেবেছিলাম। কিন্তু পরক্ষণেই আমি গোঙানির শব্দ শুনতে পেলাম। আমার রক্ত শীতল হয়ে গেল।“ 

এইটুকু বলে সে তার মাথা চুলকাল, এবং বলল, “ তারপর আমি দ্রুত ঘরের ভেতরে প্রবেশ করলাম।“ 

গ্র্যান্ড দরজা খুলতেই তারা দুজনে একটা উজ্জল অথচ কম আসবাবপত্রের বেডরুমের মুখোমুখি হল। কক্ষের ভেতরে তামার তৈরী খাট ছিল একটা দেয়ালের পাশে। সেই খাটটিতে একজন স্থুল কিন্তু ক্ষুদ্রাকার ব্যক্তি শুয়েছিল। সে খুব জোরে জোরে শ্বাস-প্রশ্বাস নিচ্ছিল। লোকটি তাদের দিকে আরক্ত চোখে তাকাল। রিও হঠাৎ করে থেমে গেল। লোকটার শ্বাস-প্রশ্বাসের মধ্যবর্তী সময়ে রিও’র মনে হল সে ইঁদুরের কিচিরমিচির শব্দ শুনতে পেল। কিন্তু সে ঘরের ভেতরে বা কোণায় কোনকিছুকেই নড়াচড়া করতে দেখা গেল আ। তারপর সে বিছানার পাশে গেল। স্পষ্টতই লোকটি খুব উপর থেকে পতিত হয়নি। অথবা আকস্মিক কোন কারণে তার কলারবোন ভাঙেনি। প্রাকৃতিক কারণেই হয়ত তার শ্বাস বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। একটা এক্সরে ছবি দরকার হবে নিশ্চিত করার জন্যে। ডাক্তার তাকে একটা camphor ইনজেকশন দিল এবং তাকে নিশ্চিত করল যে, কয়েকদিনেই সে ঠিক হয়ে যাবে। 

“ধন্যবাদ, ডাক্তার,” লোকটি বিড়বিড় করে বলল। 

অতঃপর রিও গ্র্যান্ডকে জিজ্ঞেস করল যে, বিষয়টা সে পুলিশকে জানিয়েছে কিনা। লোকটি তাকে জানাল যে, সে জানায়নি। 

“ঠিক আছে, আমি বিষয়টা দেখছি,” রিও বলল। 

কিন্তু অক্ষম লোকটি মেজাজ তিরিক্ষি করে বিছানায় উঠে বসল। জানাল যে, সে ভাল আছে এবং এবিষয়ে পুলিশকে জানানোর কোন প্রয়োজন নেই। 

“ভয় পেয়ো না, এটা শুধু মাত্র একটা ছোট ফরমালিটি। তবে বিষয়টা আমাকে পুলিশকে অবহিত করতেই হবে,“ রিও বলল। 

লোকটি গা ছেড়ে দিয়ে বিছানার উপরে শুয়ে পড়ল এবং মিনমিন করে কাঁদতে লাগল। গ্র্যান্ড তার বিছানার পাশে গেল। 

“মিঃ কটার্ড, বুঝতে চেষ্টা করুন, পুলিশকে না জানালে লোকজন ডাক্তারকে দোষী ভাবতে পারে,” সে বলল। 

কটার্ড তাকে আশ্বস্থ করল যে, এরকম কিছু হবার সম্ভাবনা একেবারেই নেই। পাগলের মত মানসিক অবস্থায় সে ঘটনাটি ঘটিয়ে থাকলেও এখন সে সম্পূর্ণ ঠিক আছে এবং এ বিষয়ে সে আর কোন ধরণের ঝামেলায় জড়াতে চায় না। 

রিও তার প্রেসক্রিপশন লিখছিল। 

“ঠিক আছে, এ বিষয়ে আমরা আর কথা বলব না। আমি দুই-এক দিনের মধ্যে এসে পুনরায় তোমাকে দেখে যাব। তবে বোকামির মত আর কোন কাজ করো না।“ 

সিঁড়ি দিয়ে নামার সময়ে সে গ্র্যান্ডকে জানাল যে, পুলিশকে তার অবহিত করতেই হবে। তবে সে পুলিশ ইন্সপেক্টরকে সে বলবে কয়েকদিনের জন্যে তার তদন্ত স্থগিত রাখতে। 

“কিন্তু আজ রাতে কেউ একজন কটার্ডকে পাহারা দেয়া উচিৎ,’ সে যোগ করল। 

“তার কি কোন আত্নীয় আছে?” 

“আমি জানি না। তবে আমি তার সাথে থাকতে পারি। আমি যে তাকে খুব চিনি তা নয়, তবে বিপদের সময়ে পড়শিরা সাহায্যের জন্যে এগিয়ে আসবে, এটাই তো স্বাভাবিক, তাই নয় কি?” 

সিঁড়ি দিয়ে নামার সময়ে রিও খেয়াল করল যে, গ্র্যান্ড বাসার অন্ধকার কোণের দিকে তাকাচ্ছে। রিও তাকে জিজ্ঞেস করল শহরের এই অংশ হতে ইঁদুরেরা চলে গেছে কিনা। গ্র্যান্ডের এসম্পর্কে কোন ধারণাই ছিল না। সত্য যে, সে ইঁদুর নিয়ে কিছূ আলাপচারিতা সে শুনেছে, তবে সে কখনই সেগুলোতে মনযোগ দেয়নি। 

“আমি অন্য অনেক বিষয় নিয়ে ব্যস্ত থাকি,” সে যোগ করল। 

রিও তাড়ার ভেতরে ছিল। ফিরে যাবার পর স্ত্রীর কাছে তাকে একটা চিঠি লিখতে হবে। এছাড়াও প্রথমেই তাকে মিশেলকে দেখতে যেতে হবে। 

শহরের বুকে যে হকাররা ইঁদুর সম্পর্কিত সর্বশেষ খবর নিয়ে চিৎকার করত, তারা আকস্মিকভাবে অদৃশ্য হয়ে গেল। 

রিও ফিরে আসার পর মিশেলকে দেখতে পেল বিছানার প্রান্তদেশের সাথে হেলান দিয়ে আছে। তার এক হাত পেট চেপে ধরে আছে। অন্যহাতে নিজের ঘাড় ধরে আছে। তার মুখ থেকে গোলাপী পাচক রস পড়ছে রান্নাঘরের বালতির ভেতরে। কিছুক্ষণ বমি করার পর সে পুনরায় শুয়ে পড়ল। তার শরীরের তাপমাত্রা ১০৩ ডিগ্রি। তার ঘাড় ও অঙ্গসমূহের স্নায়ুগ্রন্থিগুলো ফুলে উঠেছিল। এবং তার দুই ঊরুর উপরে দুটো কাল দাগ জন্মাচ্ছিল। এখন সে শরীরের ভেতরের ব্যাথার কথা বলল। 

“আগুনের মত ব্যাথা,” সে ফিসফিস করে বলল। “আমাকে ভেতর থেকে পুড়িয়ে দিচ্ছে।“ 

জ্বরাক্রান্ত মুখ দিয়ে তার কথা বলতে খুবই কষ্ট হচ্ছিল। ফুলে উঠা চোখ দিয়ে সে ডাক্তারের দিকে তাকাচ্ছিল। প্রচন্ড মাথাব্যাথার কারণে তার চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরছিল। তার স্ত্রী উদ্বিগ্ন দৃষ্টিতে রিও’র দিকে তাকাল, কিন্তু রিও কিছুই বলল না। 

“প্লিজ, ডাক্তার, এটা কি হয়েছে, তার?” 

“এটা অনেক কিছুই হতে পারে। এখন পর্যন্ত নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়। তাকে হালকা খাবার দেবেন এবং প্রচুর তরল দেবেন পান করতে।“ মিশেল প্রবল জলের তৃষ্ণার অভিযোগ করছিল। 

এপার্টমেন্টে ফেরার পর রিও তার সহকর্মী রিচার্ডকে রিং দিল। সে শহরের প্রথম সারির একজন ডাক্তার। 

“না,” রিচার্ড বলল, “আমি এখন পর্যন্ত অস্বাভাবিক ধরণের কিছু দেখিনি।“ “এটা কি জ্বরের সাথে লোকাল ইনফ্ল্যামেশন হতে পারে? একটু অপেক্ষা কর। আমার কাছে স্নায়ুগ্রন্থি ফুলে যাওয়ার দুটো কেইস এসেছে।“ 

“সেগুলো কি অস্বাভাবিক?” 

“নির্ভর করে স্বাভাবিক বলতে তুমি কি বোঝ।“ 

সে রাতে মিশেলের শরীরের তাপমাত্রা ১০৪ ডিগ্রীতে উঠল। সে প্রলাপ বকতে শুরু করল। প্রলাপের ভেতরে সে বিড়বিড় করে বলতে লাগল, “সেই ইঁদুরগুলো”। রিও মিশেলের একটা জমাট বাঁধা ফোঁড়াকে সার্জারি করে ঠিক করার চেষ্টা করল। কিন্তু যখনই মিশেল তার্পিন তেলের উষ্ণতা অনুভব করল, সাথে সাথে চিৎকার করে উঠল বাস্টার্ড বলে। তার স্নায়ুসন্ধিগুলো আরও ফুলে উঠেছে। সেগুলোকে মনে হচ্ছিল মাংশের উপরে কঠিন আঁশ জাতীয় পদার্থ। মিশেল সম্পূর্ণ রুপে ভেঙ্গে পড়েছিল। 

“তার সাথে থাকুন।প্রয়োজন হলে আমাকে ডাকবেন,“ রিও তার স্ত্রীকে বলল। 

পরেরদিন, ৩০ এপ্রিল। সেদিন আকাশের রঙ ছিল নীল এবং কিছুটা কুয়াশাচ্ছন্ন। উষ্ণ মৃদু বায়ু প্রবাহিত হচ্ছিল। বাতাসের সাথে প্রান্তবর্তী উপশহর থেকে ভেসে আসছিল ফুলের গন্ধ। রাস্তার উপরে সকালের কোলাহল উচ্চকিত হচ্ছিল। আমাদের ক্ষুদ্র শহরের প্রত্যেকের জন্যে এই দিনটি একটি নতুন প্রত্যাশা নিয়ে আবির্ভূত হচ্ছিল। নতুন কোন জীবনের হাতছানি। ঠিক যেন, যে আতঙ্কের ছায়ার নীচে আমরা এতদিন বাস করছিলাম, তা হঠাৎ করে সরে গেছে। রিও নিজেও খোশমেজাজে ছিল। তার স্ত্রীর কাছ থেকে আসা চিঠি তাকে আনন্দিত করেছে। 

মিশেলের শরীরের তাপমাত্রা ৯৯ ডিগ্রিতে নেমে গিয়েছিল। যদিও সে দুর্বল, তথাপি সে মৃদু হাসছিল। 

“সে এখন ভাল আছে, তাই না ডাক্তার?” তার স্ত্রী জিজ্ঞেস করল। 

“এত আগে থেকে নিশ্চিত করে কিছু বলা সম্ভব নয়,“ রিও উত্তর করল। 

দুপুরের দিকে মিশেলের দেহের তাপমাত্রা হঠাৎ করে ১০৪ ডিগ্রীতে উঠে গেল। সে সারাক্ষণ প্রলাপ বকতে লাগল এবং বমি করা শুরু করল আবার। তার ঘাড়ের স্নায়ুগ্রন্থিগুলো স্পর্শ করলেই প্রবল ব্যাথায় কুঁকড়ে যাচ্ছিল। তাকে দেখে মনে হচ্ছিল, সে নিজের মাথাকে শরীর হতে পৃথক করে স্থির করতে চাচ্ছিল। তার স্ত্রী বিছানার পায়ের দিকে বসেছিল। তার হাত বিছানার উপরে। আলতোভাবে স্বামীর পা স্পর্শ করে ছিল। জিজ্ঞাসার দৃষ্টিতে সে রিও’র দিকে তাকাল। 

“শুনুন,” সে বলল, “তাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে এবং বিশেষ চিকিৎসা দিতে হবে। আমি এম্বুলেন্সের জন্যে ফোন করছি।“ 

দুই ঘন্টা পর রিও এবং মিসেস মিশেল এ্যাম্বুলেন্সের ভেতরে রোগীর উপরে ঝুঁকেছিল। মিশেলের খুলে থাকা মুখ থেকে অসংলগ্ন কথাবার্তা বের হচ্ছিল। মুখটি ঢেকে গিয়েছিল কালশিটে ঘা দিয়ে। সে পুনরাবৃত্তি করছিল, ” সেই ইঁদুরগুলো! সেই মৃত ইঁদুরগুলো!” 

তার মুখ ফ্যাকাসে ও ধূসর সবুজাভ হয়ে গিয়েছিল। তার ঠোঁটগুলো ছিল রক্তশূন্য। অকস্মাৎ সে হাঁপাচ্ছিল। অবশেষে অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো স্নায়ুসন্ধি ফুলে উঠার কারণে বিস্তৃত হয়ে গেল। পরস্পর থেকে। এ্যাম্বুলেন্সের বার্থের ভেতরেই। মনে হচ্ছিল এখানেই সে নিজেকে কবর দেয়ার চেষ্টা করছে। অথবা পৃথিবীর অন্তঃস্থল থেকে কেউ তাকে ডাকছে। অদেখা কোন চাপের কাছে সে খাবি খাচ্ছিল বারংবার। তার স্ত্রী কাঁদছিল। 

“আর কি কোন আশা নেই, ডাক্তার?” 

“সে মারা গেছে,” রিও বলল। 

মিশেলের মৃত্যুকে বলা যেতে পারে এই হতবুদ্ধিকর ঘটনার প্রথম পর্বের সমাপ্তি এবং পরবর্তী পর্বের শুরু। যেটা পূর্বেরটার চেয়ে অধিকতর কঠিন হবে। এবং প্রাথমিক সময়ের হতবুদ্ধিতা ক্রমশ রূপ নেবে আতংকে। 


পরবর্তী ঘটনা সমূহের সাপেক্ষে প্রথম পর্বকে বিশ্লেষণ করার পর নগরের জনগণ একটা বিষয়ে উপলব্ধি করতে সক্ষম হল। তা হল এমন একটা অদ্ভুত বিষয় ঘটানোর জন্যে স্রষ্টা যে তাদের শহরকে বেছে নেবেন, এটা তারা স্বপ্নেও চিন্তা করতে পারেনি। বিশেষ করে দিনের উজ্জ্বল আলোতে ইঁদুর বা অদ্ভুত বিদেশী রোগে প্রহরী মরে যাবে এই ধরণের ঘটনা। এটা তাদের মস্ত একটা ভুল ছিল। 

তারপরেও খুব বেশী কিছু যদি না ঘটত, তবে হয়ত তারা সামলে উঠতে পারত। নিজেদের অভ্যাসগত কারণেই। কিন্তু আমাদের সমাজের অন্যান্যরাও (শুধুমাত্র শ্রমিক বা গরীবরা নয়) যখন মিঃ মিশেলের পথ অনুসরণ করতে লাগল, তখন আসলেই তা ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করল। তবে পরবর্তী পর্বের বিস্তারিত আলোচনায় প্রবেশের পূর্বে বর্ণনাকারী পূর্ববর্তী পর্বের আরও একজন প্রত্যক্ষদর্শীর অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিতে ইচ্ছুক। 

জ্যা ত্যারু। তার পরিচয় সম্পর্কে আমরা ইতিপূর্বেই জেনেছি। মাত্র কয়েক সপ্তাহ পূর্বে ওরানে এসেছিল। এবং শহরের কেন্দ্রস্থলের একটা বড় হোটেলে উঠেছিল। আপাতভাবে সে ব্যক্তিগতভাবে কিছু একটা করত এবং কোনরূপ ব্যবসার সাথে সে জড়িত ছিল না। যদিও সে ক্রমান্বয়ে সবার সাথে পরিচিত হয়ে উঠেছিল, তথাপি কেউই জানত না যে তার বাড়ি কোথায়? এবং কি কারণে সে ওরানে আগমন করেছিল? 

প্রায়শই তাকে জনসাধারন্যে এবং বসন্তকালের প্রথমদিকে প্রতিদিন বিভিন্ন সৈকতে দেখা যেত। সাঁতার কাটতে সে ভালবাসত। তার স্বভাব ছিল রসিক প্রকৃতির। সব সময়ে তার মুখে হাসি দেখা যেত। সকল স্বাভাবিক আনন্দের বিষয়ে নেশাতুর থাকলেও সেগুলো তাকে কখনই দাসে পরিণত করতে পারেনি। আসলে তার একমাত্র জানা অভ্যাস ছিল স্পেনীয় ডান্সার ও মিউজিসিয়ানদের সাথে চলাফেরা করা, আমাদের শহরে যারা প্রচুর সংখ্যায় ছিল। 

তার নোটবই আমাদের জীবনের অদ্ভুত ঘটনাবলীর বর্ণনায় পরিপূর্ণ ছিল। তবে সেখানে ঘটনাগুলোর বিস্তারিত বর্ণনা ছিল না। সামান্য কিছু বর্ণনা ছিল। যেগুলো পড়লে প্রাথমিকভাবে আপনার কাছে মনে হবে যে, ত্যারিও’র একটা বিচিত্র অভ্যাস ছিল। সেটা হল মানুষজন ও ঘটনাপ্রবাহকে দূরবীনের ভুল প্রান্ত থেকে পর্যবেক্ষন করা। সেই দুর্যোগের দিনগুলোতে সে লিপিবদ্ধ করেছিল ঐসব ঘটনাবলীকে, যেগুলো সাধারণ ঐতিহাসিকগণ এড়িয়ে যেত। 

অবশ্যই আমরা তার এই অদ্ভুত ঔৎসুক্য ও খেয়ালী ইচ্ছাকে যথাযথ অনুভূতির অভাব বলে বিবেচনা করতে পারি। তবে এটাও ঠিক যে, তার নোটবুক, যা ছিল অপ্রাসঙ্গিক তথ্য সমৃদ্ধ করচা, তা ঐ সময়ের আপাত তুচ্ছ বিষয়গুলোকেও তুলে এনেছিল। এবং সেই তথ্যগুলো একেবারেই অগুরুত্বপূর্ণ ছিল না। অন্তত এই তথ্যগুলোর খাপছাড়া বৈশিষ্ট পাঠকদেরকে বাঁধা দিত তাৎক্ষণিক কোন উপসংহারে উপনীত হতে। 

জ্যা ত্যারু’র প্রথমদিকের লিপিবদ্ধ করা তথ্যসমূহ তার ওরানে আগমনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। প্রথম থেকেই সে আপাত বৈপরীত্য দিয়ে এই শহরের অন্তর্গত কুৎসিত রূপকে প্রকাশ করেছিল। এগুলোর ভেতরে আমরা খুঁজে পাই মিউনিসিপ্যাল অফিসের সামনের দুটো ব্রোঞ্জের তৈরী সিংহ বিষয়ে বিস্তারিত বর্ণনা, শহরে গাছপালার অনুপস্থিতির বিষয়ে মন্তব্য, বাসস্থানসমূহের বীভৎস রূপ, এবং হাস্যকর ও কিম্ভূতকিমাকার নগর পরিকল্পনা। 

ত্যারু তার বর্ণনাগুলোকে বিস্তৃত করেছিল আকস্মিকভাবে শুনে ফেলা রাস্তার উপরের বা গাড়ির ভেতরের কোন আলাপচারিতার খণ্ডাংশ যোগ করে। এগুলোর সাথে সে কখনই নিজের কোন মন্তব্য যোগ করত না। যেমন, নিম্নের দুইজন গাড়ির কন্ডাকটরের মধ্যকার কথোপকথনঃ 

“তুমি কি জানতে না, ক্যাম্পস?” একজন জিজ্ঞেস করল। 

“ক্যাম্পস, সেই কাল গোঁফওয়ালা লম্বা লোকটি?” 

“হ্যা, আমি তার কথাই বলছি। সে একজন সুইচম্যান ছিল।“ 

“হ্যা, মনে পড়ছে এখন।“ 

“সে মারা গেছে।“ 

“কখন মরল সে?” 

“ইঁদুরদের সেই ঘটনার পর।“ 

“কি রোগে মারা গেল সে?” 

“আমি নিশ্চিত বলতে পারব না। এক ধরণের জ্বরে। তার বাহুর নীচে ফোঁড়া হয়েছিল। সম্ভবত সেটা থেকেই।“ 

“কিন্তু তাকে দেখতে তো কখনই অসুস্থ্য মনে হয়নি?” 

“আমি অবশ্য তা বলব না। তার ফুসফুস দুর্বল ছিল। সে শহরের ব্যান্ডদলের trombone বাদক ছিল। তার ফুসফুসের জন্যে ওটা বাজানো কঠিনই ছিল।“ 

“ঠিক, ফুসফুস দুর্বল থাকলে, এই ধরণের বড় যন্ত্র বাজানো শরীরের জন্যে আসলেই ভাল না।“ 

সংলাপটি লিপিবদ্ধ করার পর ত্যারু কল্পনা করার চেষ্টা করেছিল যে, স্বাস্থ্যের জন্যে খারাপ হওয়া স্বত্ত্বেও ক্যাম্পস কেন ব্যান্ডদলে যোগ দিয়েছিল এবং কেনই বা সে নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রবিবার সকালের প্যারেডে অংশগ্রহণ করেছিল। 

আমরা দেখতে পাই যে, ত্যারু তার হোটেলের কক্ষের জানলার বিপরীত দিকে অবস্থিত অন্য একটি বাসস্থানের ব্যালকনিতে প্রাতহিকভাবে ঘটে যাওয়া একটি ছোট্ট দৃশ্য দেখে খুবই প্রভাবিত হয়েছিল। হোটেলে তার কক্ষটি ছিল ছোট একটি পার্শ্বরাস্তার বিপরীত দিকে। সেখানে সবসময়ে কয়েকটি বিড়াল দেয়ালের ছায়ার মধ্যে ঘুমাত। প্রতিদিন লাঞ্চ সময়ের পর যখন শহরের বেশীরভাগ লোকজনেরাই ঘরের ভেতরে অবস্থান করে মধ্যাহ্নকালীন নিদ্রা উপভোগ করত, তখন সপ্রতিভ স্বভাবের একটি ক্ষুদ্রদেহী বৃদ্ধলোক ব্যালকনি দিয়ে বেরিয়ে এসে রাস্তার অন্যদিকে আসত। তার চেহারা ছিল সৈনিকদের মত। সোজা শরীর। মিলিটারি স্টাইলে পোশাক পরিধান করত। বরফের মত শুভ্র চুলগুলোকে সে মসৃণ করে আঁচড়ে রাখত। ব্যালকনির উপরে হেলান দিয়ে সে একই সাথে সে কর্কশ ও স্নেহময় কন্ঠে ডাকতঃ ”পুসি! পুসি!” 

বিড়ালগুলো তার দিকে ঘুম জড়ানো চোখে পিটপিট করে তাকাত। কিন্তু কোনধরনের নড়াচড়া করত না। তারপর সে কিছু কাগজ ছিড়ে রাস্তার উপরে ছুঁড়ে দিত। উড়ন্ত সাদা প্রজাপতির ঝাঁক মনে করে বিড়ালগুলো তাদের নখ বাড়িয়ে কাগজের টুকরাগুলোকে ধরার চেষ্টা করত। এই সময়ে সতর্কভাবে লক্ষ্য নিয়ে বৃদ্ধলোকটি প্রবল বেগে বিড়ালগুলোর দিকে থুথু ছুড়ে মারত। যখন সেই নিক্ষিপ্ত তরল বিড়াল দলের উপরে পড়তেই সে আনন্দে উদ্ভাসিত হয়ে উঠত। 

সার্বিকভাবে ত্যারু’র নিকটে শহরের বাণিজ্যিক চরিত্রটা যথেষ্টই আকর্ষনীয় বলে মনে হয়েছিল। যদিও সেটার সকল কার্যক্রম, এমনকি আনন্দও ব্যবসায়িক বিবেচনাপ্রসূত ছিল। শহরের এই চারিত্রিক মুদ্রাদোষ ত্যারু উষ্ণভাবেই অনুমোদন করেছিল। বিষয়টা বোঝা যায় তার একটি প্রশংসাসূচক মন্তব্য থেকে। 

আসলে ত্যারু’র লিপিবদ্ধ করা বর্ণনাগুলো ছিল তার ব্যক্তিগত অনুভূতির পরিচায়ক। এগুলোর গুরুত্ব ও আন্তরিকতা সাধারণ পাঠকের অমনোযোগী পাঠে দৃষ্টি এড়িয়ে যেতেই পারে। উদাহরণ হিসেবে মৃত ইঁদুরের আবিষ্কার কিভাবে হোটেলের ক্যাশিয়ারের বিল তৈরী কার্যক্রমে ভুলের সৃষ্টি করেছিল, তা উল্লেখ করা যেতে পারে। ত্যারু এ বিষয়ে লিখেছিলঃ 

“প্রশ্নঃ কিভাবে আমরা সময়ের অপচয় বন্ধ করতে সক্ষম হব? উত্তরঃ সারাক্ষণ সতর্ক থেকে। কিভাবে এটা করা যেতে পারেঃ দাঁতের ডাক্তারের ওয়েটিং রুমে দিনের পর দিন অপেক্ষা করে; ব্যালকনিতে রবিবারের বিকেল কাটিয়ে; অজানা কোন ভাষায় বক্তৃতা শুনে; সবচেয়ে অসুবিধাজনক ট্রেনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দীর্ঘতম ভ্রমণ করে; সিনেমার টিকেটের লাইনে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থেকেও টিকেট না কিনে; এবং এ ধরণের আরও কাজ করে।“

ত্যারু’র এই খামখেয়লীপূর্ণ চিন্তা ও ভাবের প্রকাশ অনুসরণ করে আমরা শহরের যানবাহন সার্ভিসের একটা বিস্তারিত বর্ণনা পাই। এই বর্ণনাগুলোতে গাড়িগুলোর আকৃতি, অনির্ধারিত রঙ, অপরিচ্ছন্নতা সবকিছুই লিপিবদ্ধ করা ছিল।এমনকি তার বর্ণনার উপসংহারে একটা পর্যবেক্ষণ লিপিবদ্ধ ছিল “খুবই অদ্ভুত”, যেটার কোন ব্যাখ্যা দেয়া ছিল না। 

ইঁদুরদের বিষয়ে ত্যারু’র মন্তব্য ছিল নিম্নরূপঃ 

“বিপরীতদিকের বৃদ্ধলোকটিকে আজ খুবই বিষন্ন বলে মনে হল। দেয়ালের ছায়ার নীচে কোন বিড়াল ছিল না। নগরের রাস্তার উপরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকা ইঁদুরগুলোকে দেখে হয়ত বা তাদের শিকারের ইচ্ছা জাগ্রত হয়েছিল বলে সেখানে তাদেরকে দেখা যাচ্ছে না। আমার ধারণা বিড়ালগুলো মরা ইঁদুর খাবে না এবং আমি দেখেছিলামও যে, মৃত ইঁদুরগুলো থেকে বিড়ালগুলো মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছিল। পরিবর্তে সম্ভবত তারা ভূগর্ভস্ত কুঠুরিতে শিকার করছিল। আমি খেয়াল করলাম যে, অন্যদিনের মত লোকটির মাথার চুল আজ আঁচড়ানো নেই। তার দৃষ্টিও তেমন সতর্ক নয় এবং তার ভেতরের সামরিক ভাবটা একেবারেই অনুপস্থিত। তাকে দেখেই বোঝা যাচ্ছিল যে, সে খুবই উদ্বিগ্ন। কিছুক্ষণ পর বৃদ্ধ লোকটি তার কক্ষে চলে গিয়েছিল এবং যাবার পূর্বে থুথু ছুঁড়ে মেরেছিল শূন্য রাস্তার উপরে।“ 

“শহরের রাস্তায় আজ একটি গাড়িকে থামানো হয়েছিল। কারণ সেটার ভেতরে একটা মৃত ইঁদুর পাওয়া গিয়েছিল। (প্রশ্নঃ ওটা গাড়ির ভেতরে কিভাবে ঢুকেছিল?) দুই তিনজন মহিলা গাড়িটি থেকে নেমে এসেছিল এবং ইঁদুরটিকে বাইরে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল। তারপর গাড়িটা চলে গিয়েছিল।“ 

“হোটেলের রাত্রিকালীন পাহারাদার আমাকে নিশ্চিত করল যে, এই ইঁদুরগুলোর চলে যাওয়ার অর্থই হল যে, শহরে কোন বিপদ আসছে।” “যখন ইঁদুরেরা জাহাজ পরিত্যাগ করে.........” আমি উত্তর করলাম যে, সেটাকে সৌভাগ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। কিন্তু এই শহরের ক্ষেত্রে এখনো তা দেখা যায়নি।“ কিন্তু পাহারাদার তার বক্তব্যে অটুট থাকল। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম কি ধরণের সমস্যার মুখোমুখি আমরা হতে পারি। সেটা সে বলতে পারল না; তবে জানাল যে, দুর্বিপাক সব সময়ে পূর্বাভাস দিয়ে আসে না। তবে সে অবাক হবে না, যদি কোন ভূমিকম্প হয়। আমি স্বীকার করলাম যে, ভূমিকম্পের সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেয়া যায় না। তখন সে আমাকে জিজ্ঞেস করল ভূমিকম্পকে আমি ভয় পাই কিনা। আমি তাকে বললাম,”পৃথিবীতে একটা বিষয় নিয়েই আমি আগ্রহী, সেটা হল মনের শান্তি অর্জন করা।“ সে আমাকে পুরোপুরিই বুঝতে পেরেছিল।“ 

“আমি একটা পরিবারকে পেলাম যারা এই হোটেলে নিয়মিত আহার করে থাকে। পরিবারের পিতা দীর্ঘদেহী ও শীর্ণ একজন মানুষ। সবসময়েই কাল পোশাক পরে থাকে। তার মাথার উপরিভাগে টাক। দুই পাশে দুই গুচ্ছ বাদামী চুল ঝুলে আছে। গুটিকা সদৃশ চোখ, সরু নাক, সমতল মুখের কারণে তাকে দেখতে বড় একটি পেঁচার মত লাগে। হোটেলের প্রবেশদ্বারে সেই প্রথমে উপস্থিত হয়। পাশে সরে দাঁড়ায় এবং স্ত্রীকে প্রথমে ভেতরে ঢুকতে দেয়। স্ত্রী মহিলাটি যথেষ্টই ছোট। দেখতে একটা কাল বিড়ালের মত। অতঃপর সে তার দুই সন্তানকে নিয়ে ভেতরে ঢুকে। একটি ছেলে ও একটি মেয়ে। সার্কাসের কুকুরছানার মত পোশাক পরা। স্ত্রী টেবিলে বসার পূর্ব পর্যন্ত লোকটি দাঁড়িয়ে থাকে। ততক্ষণ পর্যন্ত বাচ্চারাও দাঁড়িয়ে থাকে। পরিবারের সদস্যদের সাথে সে কোন স্নেহমূলক কথা বলে না। বরং নম্রভাবে তীর্যক মন্তব্য ছুঁড়ে দেয় স্ত্রীর প্রতি এবং মুখের উপরে সন্তানদেরকে বলে দেয়, যা সে তাদের সম্পর্কে ভাবে। “নিকোলে, খুবই অসভ্য আচরণ করছ, তুমি।“ তার কথা শুনে ছোট মেয়েটির চোখে অশ্রু চলে আসে, যা খুবই স্বাভাবিক। ছেলেটি উত্তেজনার সাথে ইঁদুর সম্পর্কে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল। “ফিলিপ, খাবার টেবিলে কেউ ইঁদুর নিয়ে কথা বলে না। ভবিষ্যতের জন্যে এই শব্দটি ব্যবহার করতে আমি তোমাকে নিষেধ করছি।““তোমার বাবা ঠিকই বলেছে,” ইঁদুরটি অনুমোদন করল। দুই ক্ষুদ্র কুকুরের বাচ্চা প্লেটে নাক ডুবিয়ে খেতে লাগল। পেঁচা মানুষটি তখন চাঁচাছোলা ও ভাসাভাসা কন্ঠে বলতে লাগলঃ “শহরের সবাই ইঁদুর নিয়ে কথা বলছে। স্থানীয় পত্রিকাতেও তা প্রকাশিত হয়েছে। শহর বিষয়ক কলামে নগর কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে সমালোচনা চলছে। আমাদের নগরপিতারা কি জানে যে, এই পচনশীল ইঁদুরগুলো থেকে নগরের মানুষদের জন্যে বিশাল বিপদের সৃষ্টি হতে পারে?” 

“হোটেলের ম্যানেজার এ সম্পর্কে ইদুর সম্পর্কে কিছুই বলতে পারল না। তবে এ বিষয়ে তার একটি ব্যক্তিগত ক্ষোভ আছে। সেটা হল মৃত ইঁদুরগুলোকে থ্রি-স্টার হোটেলের লিফটের ভেতরে পাওয়া যাচ্ছে। এর চেয়ে খারাপ বিষয় আর কিছুই হতে পারে না। আমি তাকে সান্ত্বনা দেয়ার জন্যে বললাম, ‘কিন্তু, আমরা সকলেই তো এখন একই নৌকায়।‘ “ঠিক বলেছ,” সে তখন উত্তর করল। ‘আমাদের সকলের অবস্থা এখন একই রকমের।‘ এই লোকটিই আমাকে আমাকে প্রথম জানিয়েছিল যে, নগরে অদ্ভুত ধরণের একটা জ্বর শুরু হয়েছে, যা রীতিমত ভীতির সঞ্চার করেছে। তার এক পরিচারিকাও জ্বরে ভুগছে।‘ তবে আমি নিশ্চিতভাবে মনে করি যে, এটা সংক্রামক নয়,’ সে তাড়াতাড়ি করে আমাকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করল। ‘আমি জানি, আমার মত তুমিও একজন অদৃষ্টবাদী মানুষ।‘ আমি তাকে বলেছিলাম,’“এই ধরণের কিছুই আমি বলিনি এবং আরও যেটা সত্য তা হল আমি অদৃষ্টবাদী নই।‘“ 

এরপর ত্যারু’র লেখাগুলোতে কিছু বিস্তারিত বর্ণনা ছিল সেই অদ্ভুত জ্বর সম্পর্কে, যা শহরের মানুষদের ভেতরে উদ্বিগ্নতার জন্ম দিয়েছিল। ত্যারু’র বর্ণনা হতে আমরা জানতে পারি অন্তত ডজন খানেক জ্বরের কথা, যেগুলোর প্রত্যেকটারই অবসান ঘটেছিল মৃত্যুর মধ্য দিয়ে। 

ত্যারু’র ডাইরিতে ডাক্তার রিও সম্পর্কে কিছু বর্ণনা দেয়া ছিল। বর্ণনাকারীর বিচারক্ষমতা অনুযায়ী তা ছিল যথেষ্টই নির্ভুল ও সঠিকঃ 

“ডাক্তার রিও। প্রায় ৩৫ বছর বয়সী। মধ্যম উচ্চতার। প্রসারিত কাঁধ। প্রায় চতুষ্কোণ মুখমন্ডল। গভীর ও স্থির চোখ। তবে চোয়ালদ্বয় উচ্চকিত। একটু বড় কিন্তু নান্দনিক নাক। ছোট ছোট করে ছাঁটা কাল চুল। একটু বাঁকানো ধরণের মুখ। সেই মুখে পরস্পরের সাথে শক্তভাবে এঁটে থাকা ভারী দুটো ঠোঁট। তামাটে রঙের চামড়া। হাত ও বাহুর উপরে ঝুলে থাকা ঘন কাল আস্তিন। সব মিলিয়ে তাকে একজন সিসিলিয়ান কৃষকের মত দেখতে মনে হয়।“ 

“সে দ্রুত হাঁটে। রাস্তা অতিক্রম করার সময়ে নিজের অজান্তেই তার পা ফুটপাথের বাইরে চলে যায়। গতিবেগ না বাড়ালেও। তবে প্রতি তিনবারে দুইবার সে ছোট্ট একটা লাফ দিয়ে ফুটপাথের অন্যপ্রান্তে ফিরে আসে। কিছুটা আনমনা স্বভাবের সে। গাড়ি চালানোর সময়ে কর্ণার অতিক্রম করার পর প্রায়ই সাইড-সিগন্যাল অন করে রাখে। সারাক্ষণ খালি মাথায় থাকে। দেখতে মনে হয় একজন জ্ঞানী মানুষ।“ 

ত্যারু’র বর্ণনা যথেষ্টই সঠিক ছিল। ডাক্তার রিও শুধুমাত্র ঘটনার মোড়গুলো সম্পর্কেই সচেতন ছিল। অন্যকিছু সম্পর্কে নয়। দ্বাররক্ষীর দেহ সৎকারের পর রিও রিচার্ডকে টেলিফোন করেছিল এবং জানতে চেয়েছিল কুঁচকির-জ্বরের কেসগুলো সম্পর্কে আর কি কি বিষয় সে জানতে পেরেছে। 

“আমি কিছুই বের করতে পারিনি,” রিচার্ড স্বীকার করেছিল। “দুটো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। একটা গত ৪৮ ঘণ্টার ভেতরে। অন্যটা পূর্বের তিনদিনে। দ্বিতীয় রোগীটি ক্রমশ আরোগ্য লাভ করছিল বলে আমার কাছে মনে হয়েছিল, যখন আমি তাকে দেখতে গিয়েছিলাম।“ 

“আমাকে অনুগ্রহ করে জানিয়ো তোমার কাছে যদি আর কোন নতুন কেস আসে,” রিও বলেছিল। 

সে তার অন্য কয়েকজন সহকর্মীকেও টেলিফোন করেছিল। এই অনুসন্ধানগুলো থেকে সে জানতে পেরেছিল যে, বিগত কয়েকদিনের মধ্যেই প্রায় ২০টি একই ধরনের কেস পাওয়া গিয়েছিল। এর প্রায় সবগুলো ক্ষেত্রেই রোগীরা মরে গিয়েছিল। এরপর রিও রিচার্ডকে (যে স্থানীয় মেডিক্যাল এসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান ছিল) অনুরোধ করেছিল যাতে সে নতুন আসা কেসগুলোকে আইসোলেশন ওয়ার্ডে স্থানান্তর করে। 

“দুঃখিত,” রিচার্ড বলেছিল,” এ বিষয়ে আমার পক্ষে কিছু করা সম্ভব নয়। নগর প্রধান কর্তৃক এ বিষয়ে আদেশ জারী করার প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু কিসের উপরে ভিত্তি করে তুমি সিদ্ধান্তে উপনীত হচ্ছ যে, এতে সংক্রমণের ঝুঁকি রয়েছে?” 

“ না, কোন নির্দিষ্ট কোন ভিত্তি নেই। তবে লক্ষণগুলো আসলেই ভীতিকর।“ 

যাইহোক, রিচার্ড তাকে পুনরায় জানিয়েছিল যে, আইসলেশন ওয়ার্ডে প্রেরণের ব্যবস্থা গ্রহণ করার ক্ষমতা তার নেই। সে যা করতে পারত তা হল বিষয়টিকে নগর প্রধানের নিকটে উপস্থাপন করতে। 

এই ধরণের কথাবার্তা যখন চলছিল, তখন পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে মোড় নিল। মিশেলের মৃত্যুর পরদিন আকাশে মেঘ করল এবং সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্যে প্রবল বৃষ্টি হল। কয়েকবার। প্রতিবার বৃষ্টির পরই কয়েক ঘন্টার জন্যে তাপমাত্রা বেড়ে যচ্ছিল এবং কুয়াশাচ্ছন্ন আর্দ্রতার সৃষ্টি করছিল। সাগরের পরিবেশও বদলে গিয়েছিল। আকাশের গাঢ়-নীল স্বচ্ছতা উবে গিয়েছিল। তৎপরিবর্তে নীচু হয়ে আসা আকাশে ইস্পাতের মত বা রূপালী আলোর ঝলকানি দেখা যাচ্ছিল। এগুলোর দিকে তাকালে চোখ জ্বলত। বসন্তের আর্দ্র তাপ সবার কাছে অসহনীয় হয়ে উঠেছিল এবং সবাই অপেক্ষা করছিল শুষ্ক পরিষ্কার গ্রীষ্মের উত্তাপের জন্যে। 

এক ধরনের উদাসীনতা সাপের মত এঁকে-বেঁকে মালভূমির উপরে অবস্থিত শহরের উপরে নেমে এসেছিল। এবং শহরটির চতুর্দিক সাগর থেকে বন্ধ ছিল। সাদা চুনকাম করা দেয়াল বেষ্টিত শহরে ধুলাচ্ছন্ন দোকানের সারির মধ্য দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে অথবা অপরিচ্ছন্ন স্ট্রীট-কার দিয়ে যেতে যেতে আপনার কাছে মনে হত যেন আপনি জলবায়ু দ্বারা বন্দী হয়ে আছেন। 

অবশ্য রিও’র সেই বৃদ্ধ রোগীর ক্ষেত্রে এটা সত্য ছিল না। সে এই আবহাওয়াকে স্বাগতম জানিয়েছিল। 

“এই আবহাওয়া আমাদেরকে উত্তপ্ত ও সিদ্ধ করে,” সে বলল। “এজমা রোগীদের জন্যে এটা খারাপ নয়।“ 

বাস্তবে ওটা আমাদেরকে সিদ্ধ করেছিল ঠিকই, তবে এজমা রোগীদের অনুকূলতা দিয়ে নয়,। জ্বর যেভাবে সিদ্ধ করে, ঠিক সেভাবে। পুরো শহর তখন জ্বরাক্রান্ত হয়ে গিয়েছিল। অন্তত রিও’র কাছে তাই মনে হয়েছিল। ‘ফাইদহার্বে’ সড়ক দিয়ে গাড়ি চালিয়ে কটার্ড কেন আত্নহত্যা করার চেষ্টা করেছিল, সেটা তদন্ত করতে যাবার সময়ে। 

অবশ্য এই ধরণের ভাবনাকে তার নিকটে অযৌক্তিক বলে মনে হয়েছিল এবং সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিল যে, এই ধরণের ভাবনার জন্যে নিজের স্নায়বিক ক্লান্তিই দায়ী। মোটকথা, সেই মূহূর্তগুলোতে সে আসলেই খুব উদ্বিগ্ন হয়ে গিয়েছিল এবং নিজের স্নায়ুর উপরে নিয়ন্ত্রণ স্থাপন করা তার জন্যে খুবই জরুরী হয়ে দাঁড়িয়েছিল। 

কটার্ডের বাসস্থানে পৌঁছার পর সে দেখতে পেল পুলিশ ইন্সপেক্টর তখনও ঘটনাস্থলে পৌঁছায়নি। গ্র্যান্ডের সাথে দেখা হতেই সে তাকে পরামর্শ দিল দরজা খোলা রেখে অপেক্ষা করার। মিউনিসিপ্যাল করণিকের দুটো কক্ষ ছিল। দুটোই ছিল কম আসবাবপত্র দিয়ে সজ্জিত। কক্ষে চোখে পড়ার মত একটা জিনিসই ছিল। সেটা হল একটা বুকশেলফ। ওটাতে দুই তিনটা অভিধান রাখা ছিল। আর ছিল একটা ছোট্ট ব্ল্যাকবোর্ড, যেটাতে অর্ধেক মুছে যাওয়া দুটো শব্দ লেখা ছিলঃ ‘পুষ্পিত পথ’। 

গ্র্যান্ড জানালো যে, কটার্ড রাতে যথাসময়েই ঘুমিয়েছিল। কিন্তু সকালে সে ঘুম থেকে উঠেছিল মাথাব্যাথা নিয়ে। এছাড়াও খুবই দুর্বল অনুভব করছিল সে। গ্র্যান্ডকেও দেখতে ক্লান্ত ও অবসন্ন মনে হচ্ছিল। সে কক্ষের এক প্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে পায়চারি করছিল। টেবিলের উপরে রাখা হস্তাক্ষরে ভর্তি কটার্ডের পোর্টফোলিওটি বার বার নেড়েচেড়ে দেখছিল। 

রিও’কে সে জানাল যে, কটার্ড সম্পর্কে সে আসলেই খুব কম জানত। কটার্ড ছিল একটা অদ্ভুত পাখির মত। অনেকদিন পর্যন্ত তাদের সম্পর্ক সিঁড়িতে দেখা হবার সময়ে পারস্পারিক অভিবাদন বিনিময়ের ভেতরেই সীমাবদ্ধ ছিল। 

“তার সাথে আমার দুইবার আলাপচারিতা হয়েছিল। কয়েকদিন পূর্বে সিঁড়ির সামনে আমার হাত থেকে একটা চকের বাক্স পড়ে গিয়েছিল। সেগুলো ছিল লাল ও নীল রঙের চক। সেই সময়ে কটার্ড তার কক্ষ হতে নেমে এসে আমাকে সেগুলো তুলতে সাহায্য করেছিল। সে আমাকে রঙিন চক নিয়ে আসার কারণ জিজ্ঞেস করেছিল।“ 

গ্র্যান্ড তাকে ব্যাখ্যা করেছিল যে, সে তার ল্যাটিন ভাষার জ্ঞানকে ঘষেমেজে উজ্জ্বল করার চেষ্টা চালাচ্ছিল। স্কুলে সে যে ল্যাটিন ভাষা শিখেছিল, কিন্তু স্মৃতিতে তা অস্পষ্ট হয়ে এসেছিল। 

“দেখ, ডাক্তার, আমাকে বলা হয়েছিল যে, ল্যাটিন ভাষার চর্চা ফরাসী শব্দের অর্থকে সত্যিকারভাবে বুঝতে সাহায্য করে।“ 

সুতরাং সে ল্যাটিন শব্দকে ব্ল্যাকবোর্ডের উপরে বার বার নীল চক দিয়ে লিখত এবং সেগুলোর ধাতুরূপ ও শব্দরূপ নিরীক্ষা করে দেখত। আর লাল চক দিয়ে সে লিখে রাখত শব্দের সেই অংশ, যেগুলো কখনই পরিবর্তিত হত না। 

“আমি জানি না কটার্ড আমার এই বিষয়টি অনুসরণ করেছিল কিনা। তবে তাকে আমার এ বিষয়ে আগ্রহী বলে মনে হয়েছিল। এবং সে আমাকে অবাক করে দিয়ে একটা লাল চক চেয়েছিল। আমি আসলেই ধারণা করতে পারিনি চক দিয়ে সে কি করতে চেয়েছিল।“ 

রিও তাকে তাদের দ্বিতীয় আলাপচারিতার বিষয় সম্পর্কে জানতে চাইল। কিন্তু এই সময়েই একজন করণিক সহ ইন্সপেক্টর চলে আসলেন এবং জানালেন যে, তিনি গ্র্যান্ডের সাক্ষ্য দিয়ে তার শুনানির কার্যক্রম শুরু করতে চান। 

ডাক্তার খেয়াল করল যে, কটার্ড সম্পর্কে কথা বলার সম্পর্কে সবসময়ে গ্র্যান্ড তাকে ‘দুর্ভাগ্যবান মানুষ’ হিসেবে অভিহিত করছিল। এমনকি ‘তার মারাত্মক সিদ্ধান্ত’ এই ধরণের শব্দগুলোও ব্যবহার করছিল। কটার্ডের আত্নহত্যার চেষ্টার উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলার সময়ে রিও লক্ষ্য করল যে, গ্র্যান্ড শব্দের সল্পতায় ভুগছে। অবশেষে সে ‘একটি গোপন ব্যাথা’ এই শব্দটি দ্বারা তার ভাব প্রকাশ করতে সমর্থ হল। 

ইন্সপেক্টর তাকে জিজ্ঞেস করলেন কটার্ডের আচরণে সে এমনকিছু খেয়াল করেছে কিনা যা থেকে তার আত্নহত্যার ইচ্ছা প্রকাশিত হয়। 

“গতকাল সে আমার দরজায় আঘাত করে আমার কাছ থেকে এক বক্স দিয়াশলাই চেয়েছিল। আমি তাকে তা দিতেই সে আমাকে বলেছিল যে, আমাকে বিরক্ত করার জন্যে সে দুঃখিত, কিন্তু যেহেতু আমরা প্রতিবেশী সেহেতু সে মনে করে যে, আমি কিছুই মনে করব না। আমাকে সে দিয়াশলাই বক্সটা ফিরিয়ে দেবে বলেও জানিয়েছিল। তবে আমি তাকে বলেছিলাম সেটা তার কাছেই রেখে দিতে।‘ 

ইন্সপেক্টর গ্র্যান্ডকে জিজ্ঞেস করলেন, কটার্ডের কোন কিছু তার কাছে অদ্ভুত বলে দৃষ্টিগোচর হয়েছে কিনা। 

“যে বিষয়টা আমার কাছে অদ্ভুত লেগেছে, তা হল, তাকে দেখলে আমার সবসময়ে মনে হত যে, সে কিছু একটা বলতে চায়। তবে সম্ভবত আমি ব্যস্ত থাকার কারণে সে তার কথাগুলো বলতে পারেনি।“ 

নিজের ব্যস্ততার বিষয়ে গ্র্যান্ড রিও’র দিকে ফিরে কিছুটা লজ্জার সাথে বললঃ “কিছু ব্যক্তিগত ধরণের কাজ করছিলাম আমি।“ 

ইন্সপেক্টর এই সময়ে বললেন যে, তিনি অসুস্থ লোকটির সাথে দেখা করতে চান। এবং তার কাছ থেকে তার ভাষ্য শুনতে চান। রিও নিজেও ভাবল যে কটার্ডকে নিয়ে আসা উচিৎ। 

কটার্ড ঘরে আসতেই রিও দেখতে পেল সে একটা বাদামী ফ্লানেল কাপড়ের নাইটশার্ট পরে আছে এবং তার মুখে একটি ভীতসন্ত্রস্ত ভাব। 

“ইনি কি পুলিশ?” 

“হ্যা,” রিও বলল। “তবে তোমার ভয় পাবার কিছু নেই। কয়েকটা ফর্মালিটি সম্পন্ন করতে হবে। তারপর তুমি তোমার কক্ষে ফেরত যাবে।“ 

কটার্ড প্রত্যুত্তরে জানাল যে, এর কোনই প্রয়োজনই ছিল না, এবং পুলিশের উপস্থিতিকে সে পছন্দ করেনি। তার কথায় রিও কিছুটা বিরক্তি প্রদর্শন করল। 

“আমিও তাদেরকে খুব বেশী পছন্দ করি না। তবে তোমাকে সংক্ষেপে তার কয়েকটা প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে সঠিকভাবে। আর কিছু নয়।“ 

কটার্ড কিছুই বলল না। রিও দরজার দিকে এগিয়ে গেল। সে একটা পদক্ষেপও না ফেলতেই লোকটি তাকে ডাকল। রিও বিছানার ধারে যেতেই সে তার হাত আঁকড়ে ধরল। 

“তুমি কি মনে কর পুলিশ আমার মত একজন অসুস্থ ও ফাঁসিতে ঝুলতে যাওয়া মানুষের সাথে খারাপ আচরণ করবে?” 

রিও তার দিকে মূহুর্তের জন্যে তাকাল। তাকে আশ্বস্ত করল যে, এরকম কোনকিছুই হবার সম্ভাবনা নেই। এবং ডাক্তার হিসেবে অবশ্যই তার রোগীকে রক্ষা করবে। তার কথায় কটার্ড আশ্বস্ত হয়ে ইন্সপেক্টরের দিকে এগিয়ে গেল। 

তার সম্পর্কে গ্র্যান্ডের সাক্ষ্য তাকে পড়ে শোনানোর পর কটার্ডকে তার কার্যক্রমের পেছনের সঠিক উদ্দেশ্য বর্ণনা করতে বলা হল। 

সে পুলিশ অফিসারের দিকে না তাকিয়েই উত্তর দিল, “একটি গোপন ব্যাথা”। 

ইন্সপেক্টর তারপর তাকে জিজ্ঞেস করল যে, একই কাজ তার ভবিষ্যতে করার ইচ্ছে আছে কিনা। 

মুখে কিছুটা সতেজ ভাব এনে কটার্ড বলল, “অবশ্যই না। আমি শুধু শান্তিতে বাস করত চাই।“ 

“তুমি আমার কথা শোন, “ পুলিশ অফিসার বিরক্তি সহকারে বলল, ”এই মূহুর্তে অন্যেরা নয়, তুমিই অন্যদের শান্তি বিনষ্ট করছ।“ 

রিও তাকে সংকেত দিল কটার্ডকে আর কিছু না বলতে। 

“একটা ঘন্টা খামাখা নষ্ট হল এখানে!” ইন্সপেক্টর ঘর থেকে বের হয়ে আসার পর বলল। “আপনি জানেন যে, আমাদের অনেক বিষয় নিয়ে চিন্তা করতে হয়। এমনকি জ্বর নিয়ে সবাই কথা বলছে, সেটা নিয়েও।“ 

তারপর সে ডাক্তাররের কাছে জানতে চাইল যে, শহরে কোন কঠিন রোগ এসেছে কিনা। রিও তাকে জানল যে, সে জানে না। 

“অবশ্যই আবহাওয়ার কারণে এমনটা হচ্ছে,” পুলিশ অফিসার উপসংহারে উপনীত হল। 

কিন্তু সময় অতিক্রম করার সাথে সাথে দিনগুলো ক্রমশ আরও উষ্ণ ও আর্দ্র হতে লাগল। প্রতিবার রোগী দেখার পরই রিও আরও বেশী উদ্বিগ্নতা অনুভব করতে লাগল। একদিন বিকেলে উপশহরে তার বৃদ্ধ রোগীর প্রতিবেশী কটিসন্ধিতে হাত দিয়ে চেপে ধরে বমি করতে শুরু করল। প্রবল জ্বরের সাথে প্রলাপ বকতে শুরু করল। তার স্নায়ুসন্ধিগুলো মিশেলের চেয়ে অনেক বেশী স্ফীত ছিল। এর একটা স্নায়ুসন্ধি পাঁকতে সুরু করল এবং এক সময়ে পাকা ফলের মত ফেটে গেল। এপার্টমেন্টে ফিরে আসার পর রিও জেলার মেডিক্যাল স্টোর ডিপার্টমেন্টে টেলিফোন করল। তার প্রফেশনাল ডায়রীতে সেদিন শুধুমাত্র একটা এন্ট্রিই ছিলঃ “নেতিবাচক উত্তর।“ 

শহরের বিভিন্ন অংশ হতে একই ধরণের কেইস আসতে থাকল তার কাছে। স্ফীত হয়ে উঠা ফোঁড়াগুলোকে অস্ত্রপচার করার দরকার হল। ছুরি দিয়ে ক্রসের মত করে একটু কাটতেই সেগুলো থেকে রক্ত ও পুঁজের মিশ্রণ বেরিয়ে আসছিল। রোগীদের অঙ্গগুলো প্রসারিত হয়ে যেতে লাগল। যতদূর সম্ভব। প্রতিটা রোগীর শরীর থেকেই রক্তপাত হতে লাগল। তাদের পা ও পাকস্থলীর উপরে গাঢ় রেখা দৃশ্যমান হয়ে উঠল। কোন কোন সময়ে ফোঁড়াগুলোতে জল জমা বন্ধ হয়ে গেল। আবার হঠাৎ করে সেগুলো ফুলে উঠতে লাগল। 

প্রতিটা রোগীই মারা যেতে লাগল আমাদের অবহেলা ও অনিয়মের কারণে। 

স্থানীয় পত্রিকাগুলো পূর্বে অজস্র ইঁদুর সম্পর্কিত সংবাদ প্রকাশ করেছিল। কিন্তু মানুষের মৃত্যু নিয়ে তারা কোন সংবাদই ছাপল না। কারণ ইঁদুরগুলো মরেছিল রাস্তায়, আর মানূষগুলো মারা যাচ্ছিল তাদের বাড়িতে। এবং আমরা জানি যে, পত্রিকাগুলো আসলেই বাসস্থানের চেয়ে রাজপথ নিয়েই বেশী ব্যস্ত থাকে। 

অবশ্য ততক্ষণে সরকারী ও মিউনিসিপ্যাল অফিসের কর্তারা বিষয়টা নিয়ে ভাবছিল। কারণ, বিচ্ছিন্নভাবে প্রত্যেক ডাক্তার একটা অথবা দুটো ঘটনা প্রত্যক্ষ করার বিপরীতে কোন কার্যক্রম গ্রহণ করার প্রয়োজন অনুভূত না হলেও এক্ষণে বিচ্ছিন্ন সংখ্যাগুলোকে একসাথে যোগ করার পর তা অবাক করা বিশাল সংখ্যায় গিয়ে দাঁড়িয়েছিল। 

পরের দিনগুলোতে মৃত্যুর সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে লাগল। সকলের কাছেই সুস্পষ্ট হল যে, রোগটা মহামারীর আকার ধারণ করেছে। এটা আরও স্পষ্ট হল যখন একদিন ক্যাস্টেল নামের রিও’র একজন জ্যেষ্ঠ সহকর্মী তার সাথে সাক্ষাৎ করতে আসল। 

“ডাক্তার হিসেবে স্বাভাবিকভাবেই তুমি জান যে, এইটা কি রোগ,” সে রিও’কে বলল। “আমি ময়নাতদন্তের ফলাফলের জন্যে অপেক্ষা করছি।“ 

“অবশ্যই আমি জানি এবং এটা বোঝার জন্যে আমার কোন ময়নাতদন্তের দরকার নেই। চাকুরীর একটা বড় সময় আমি চীন দেশে ছিলাম। এছাড়াও আমি বিশ বছর পূর্বে প্যারিসেও কিছু ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছিলাম। আমি জানি যে, সেই সময়েও কেউই স্পষ্টভাবে রোগটির নাম উচ্চারণ করতে সাহস পায়নি। ওটা বলা নিষিদ্ধ ছিল। কারণ তা সাধারণ মানূষকে তা শঙ্কিত করত। এমনকি আমার একজন সহকর্মীও তখন বলেছিল, ‘অসম্ভব, এই রোগ হতেই পারে না; সবাই জানে যে, এই রোগ পশ্চিম ইউরোপে আর হয় না।‘ হ্যা, মৃত মানুষেরা ছাড়া সবাই তাই জানত।“ 

“রিও, আমরা দুজনেই জানি যে, আসলে সেটা কি রোগ ছিল।” 

রিও চিন্তার ভেতরে নিমজ্জিত হল। সার্জারি কক্ষের জানালা দিয়ে সে বাইরে দেখছিল। দূর দিগন্তে একটা খাঁড়া উঁচু পাহাড় অর্ধ বৃত্তাকারের মত করে উপসাগরকে ঢেকে রেখেছিল। যদিও নীল, তথাপি আকাশের দীপ্তি মরে যাচ্ছিল গোধূলির আগমনের সাথে সাথে। 

“হ্যা, ক্যাসেল,” সে উত্তর করল। “ এখনও বিশ্বাসযোগ্য নয়। তবুও সবকিছুই কিন্তু এটাকে প্লেগ বলেই নির্দেশ করছে।“ 

ক্যাসেল উঠে দাঁড়াল এবং দরজার দিকে হাঁটতে শুরু করল। 

“তুমি কি জান,” বয়ষ্ক ডাক্তারটি বলল, “তারা আমাদেরকে কি বলবে? বলবে যে, রোগটি অনেক পূর্বেই নাতিশীতোষ্ণ দেশগুলো হতে বিলুপ্ত হয়ে গেছে।“ 

“বিলুপ্ত? এই শব্দের আসল অর্থ কি?” রিও তার কাঁধ নাড়ল। 

“হ্যা, এবং এটাও ভুলে যেয়ো না যে, প্রায় বিশ বছর পূর্বে ওটা প্যারিস হতেও বিলুপ্ত হয়ে গেছে।“ 

“ঠিক আছে। আশা করি যে, এবারেরটি তখনকারটার চেয়ে অধিকতর খারাপ হবে না। কিন্তু আমার কাছেও অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে।“ 

‘প্লেগ’ শব্দটি প্রথমবারের মত উচ্চারিত হল। এই বর্ণনার সময়ে বর্ণনাকারী ডাক্তার রিও’র সাথে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে তার অনিশ্চয়তা ও বিস্ময়কেই হয়ত সমর্থন করেছিল। কারণ, সামান্য কিছু মতপার্থক্য ছাড়া তার প্রতিক্রিয়াও ছিল শহরের সিংহভাগ মানুষদের মত। 

আমরা প্রত্যেকেই জানি যে, মহামারী কোন না কোনভাবে পৌনঃপুনিকভাবে পৃথিবীতে ঘটতে পারে, আমাদের কাছে তা অবিশ্বাস্য বলে মনে হলেও। কারণ, পৃথিবীর ইতিহাসে যুদ্ধের মত অসংখ্যবার প্লেগ এসেছে। তারপরেও যখন প্লেগ আসে বা যুদ্ধ সংঘটিত হয়, ততবারই আমরা আশ্চর্য হই। পূর্বের মত। 

আসলে আমাদের শহরের নাগরিকদের মত রিও নিজেও প্রবলভাবে বিস্মিত হয়েছিল, যা আমরা তার ইতস্তত ভাব থেকে বুঝতে পারি। তবে সেই সাথে আমরা এটাও বুঝি যে, সংশয় ও আত্নবিশ্বাসের দোলাচলে সে দুলছিল। যুদ্ধ শুরু হলে যেমন মানূষেরা ভাবে যুদ্ধ খুবই নির্বোধ কাজ, এটা কখনই দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না, কিন্তু তাদের ভাবনা যুদ্ধকে দীর্ঘস্থায়ী হতে বিরত রাখতে পারে না। অনেকটা সেরকম। নির্বুদ্ধিতারও একটি নিজস্ব চলার পথ আছে। আমরা সেটাকে বুঝতে পারব তখনই, যখন আমরা নিজেদের নিয়ে বেশী নিমগ্ন থাকব না। এই বিষয়ে শহরের মানুষেরাও ছিল একই রকমের। তারা নিজেদেরকে নিয়েই নিমগ্ন ছিল। অন্য কথায় তারা ছিল মানবিক। ফলে তারা মহামারীতে অবিশ্বাস করত। 

মহামারী মানুষের অনুধাবনযোগ্য কোন জিনিস নয়। সেকারণেই আমরা বলি যে, মহামারী বলে কিছু নেই: ওটা মনের ধোঁকাবাজি মাত্র। মনে করি যে, ওটা এক ধরণের দুঃস্বপ্ন যা দ্রুতই শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু তা চলে যায় না, বরং আমাদেরকে এক দুঃস্বপ্ন থেকে অন্য দুঃস্বপ্নে তাড়িয়ে নিয়ে যায়। ওটার উপস্থিতি শুধু বুঝতে পারে সেই মানুষেরাই যারা মরে যায়, পূর্বসতর্কতা গ্রহণ না করার কারণে। 

এই না বুঝতে পারার কারণে আমাদের নাগরিকদেরকে আমরা অন্যদের তুলনায় বেশী দোষ দিতে পারি না। স্বাভাবিক কারণেই অন্যদের মত তারাও বিনয়ী হতে ভুলে গিয়েছিল। ভেবেছিল যে, তাদের পক্ষে পার্থিব সবকিছুই করা সম্ভব। এবং সেকারণেই ধরে নিয়েছিল যে, মহামারী একটা অসম্ভব ব্যাপার। 

তারা ব্যবসা করছিল, ভ্রমণ করছিল এবং বিভিন্ন বিষয় নিয়ে নিজেদের মতাদর্শ অনুযায়ী ধ্যানধারণা জন্মাচ্ছিল। কিভাবে তারা প্লেগের মত বিষয় নিয়ে চিন্তা করবে, যে বিষয় ভবিষ্যৎকে অস্বীকার করে, ভ্রমণ বাতিল করে দেয়, এবং একমাত্র নীরবতার মধ্য দিয়ে যার সাথে মত বিনিময় সম্ভব? সুতরাং তারা নিজেদেরকে মনে করেছিল মুক্ত মানুষ, অথচ মহামারীর উপস্থিতিতে মুক্ত বা স্বাধীন বলে কিছুই থাকতে পারে না। 

এমনকি রিও যখন তার বন্ধুদের স্বীকার করেছিল যে, শহরের বিভিন্ন স্থানে কয়েকজন মানুষ প্লেগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে, প্লেগের পূর্বসতর্কতা ছাড়াই, তখনও বিপদকে তাদের কাছে অলীক বলেই মনে হচ্ছিল। কারণ, তাদের কাছে মনে হয়েছিল যে, একজন মানুষ যখন একই সাথে ডাক্তার হয়, তখন সে শারীরিক ভোগান্তি সম্পর্কে নিজস্ব কিছু ধারণার অধিকারী হয় এবং সাধারণের ভিন্নতর কল্পনাশক্তি অর্জন করে থাকে। 

এইরকম অপরিবর্তিত মন নিয়ে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকার সময়ে ডাক্তার রিও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে একটা সংশয় বা অস্পষ্ট অস্বস্তি অনুভব করল। সে রোমন্থন করার চেষ্টা করল রোগটি সম্পর্কে, যা সে ইতিপূর্বে পাঠ করেছে। অবশেষে তার মনের ভেতরে অনেকগুলো সংখ্যা ভাসতে লাগল। ইতিহাস থেকে সে মনে করতে সক্ষম হল প্রায় ত্রিশটি অথবা তার চেয়েও বেশী সংখ্যক প্লেগের কথা। যেগুলোতে একশত মিলিয়নেরও অধিক সংখ্যক মানুষ মারা গিয়েছিল। 

এক’শ মিলিয়ন মৃত্যু বলতে আমরা আসলে কি বুঝি? যুদ্ধক্ষেত্রে যোদ্ধারা কিছুকালের মধ্যেই লাশ কি সেটাই ভুলে যায়। আসলে কেউ যদি স্বচক্ষে লাশ না দেখে থাকে, তবে তার কাছে লাশ শব্দটিও অস্তিত্বহীন বিষয় হয়ে পড়ে। সুতরাং ইতিহাস থেকে পাওয়া এক’শ মিলিয়ন লাশ আমাদের কল্পনায় এক ফুঁয়ে উড়িয়ে দেয়া ধুঁয়ার চেয়ে বেশী কিছুই নয়। 

ডাক্তার রিও কনস্টান্টিনোপলের মহামারী সম্পর্কে স্মরণ করার চেষ্টা করল। ঐতিহাসিক প্রোকোপিয়াস (Procopius) অনুযায়ী এই মহামারীর সময়ে প্রতিদিন দশ হাজার মানুষের মৃত্যু হত। দশ হাজার লাশ বলতে বোঝায় বড় ধরণের একটা সিনেমাহলের দর্শক সংখ্যার পাঁচগুণ। অর্থাৎ আপনি যদি পাঁচটি সিনেমাহলের দর্শকদেরকে একত্রিত করে নগরকেন্দ্রের মাঠে নিয়ে তাদেরকে হত্যা করে স্তূপীকৃত করে রাখেন, তাহলে হয়ত এই সংখ্যা সম্পর্কে একটা পরিষ্কার ধারণা পেতে পারেন। কিন্তু বাস্তবে তা সম্ভব নয়। এছাড়া কোন মানুষই কি দশ হাজার মানুষকে একত্রে চেনে? কাজেই প্রোকোপিয়াসের মত প্রাচীন ঐতিহাসিকদের দেয়া তথ্যের উপরে আমরা নির্ভর করতে পারি না। ওটা ছিল তার দেয়া সাধারণ ধারণা মাত্র। 

মাত্র সত্তুর বছর পূর্বের ক্যানটনের কথাই ভাবুন না। সেখানকার অধিবাসীদের ভেতরে মহামারী বিস্তারের পূর্বেই ৪০ হাজার ইঁদুর প্লেগে মারা গিয়েছিল। এই মহামারীতেও মৃত ইঁদুরদের সংখ্যা গণনা করার কোন নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি ছিল না। এ ক্ষেত্রেও ত্রুটির প্রশস্ত একটা মার্জিন রেখে মোটামুটি অনুমানই করা হয়েছিল। 

“যদি একটা ইঁদুরের দৈর্ঘ ১০ ইঞ্চি হয়, তাহলে চল্লিশ হাজার ইঁদুরকে যদি আমরা একটার পর একটা স্থাপন করি, তাহলে তা কত দীর্ঘ হবে?” 

দ্রুত রিও নিজেকে নিরস্ত করল। নিজের কল্পনাশক্তিকে নিয়ে এই ধরণের কৌতুক করার কোন ইচ্ছেই তার ছিল না। 

কয়েকটি ঘটনা, সে নিজেকে বলল, কোন মহামারীর সৃষ্টি করে না। তারা শুধুমাত্র অতিরিক্ত কিছু সতর্কতা গ্রহণের অনুভব সৃষ্টি করে। সুতরাং, তার যা করা উচিৎ হবে তা হল পর্যবেক্ষিত ঘটনাসমূহকে বিবেচনায় নিয়ে বিচার করা। যেমন, শারীরিক অসাড়তা, শয্যাশায়ী হওয়া, যৌন রোগ বা বাগী (buboes) রোগে আক্রান্ত হওয়া, প্রচন্ড রকমের পিপাসা পাওয়া, প্রলাপ বকা, শরীরে কাল ফুসকুড়ি উঠা, আভ্যন্তরীণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গের প্রসারণ (dilatation), এবং শেষ পর্যন্ত ...... 

শেষ পর্যন্ত কিছু শব্দ ডাক্তারের মনের ভেতরে এল, যেগুলো মেডিক্যাল হ্যান্ডবুকে যথাযথ লক্ষণ হিসেবে লিপিবদ্ধ রয়েছেঃ 

“নাড়ির স্পন্দন উঠানামা করা বা অনিয়মিত ও ভুল হওয়া, এবং সামান্যতম নড়াচড়ার কারণে মৃত্যুমুখে পতিত হওয়া,” হ্যা, শেষ পর্যন্ত রোগীর জীবন ঝুলে থাকে সুতার উপরে। একটু এদিক-সেদিক হলেই অবধারিত মৃত্যু। প্রতি চারজনে তিনজন (সে সঠিক সংখ্যাটিই মনে করতে পারল) রোগীর মৃত্যু রিও’র কাছে আসলেই ভীতিকর বলে মনে হল। 

সে তখনও জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়েছিল। বাইরে শান্ত আলো ছড়াচ্ছিল বসন্তের আকাশ এবং তার কক্ষের ভেতরে একটা শব্দই ঘুরপাক খাচ্ছিল। সেটা হল ‘প্লেগ’। এই শব্দ ডাক্তারের মনকে আচ্ছাদিত করে রাখার সমান্তরালে তার দৃষ্টির সামনে অবস্থিত ধূসর ও হলুদ রঙের শহরের উপরেও একটা কাল্পনিক প্রভাব বিস্তৃত করে রেখেছিল। তবে শহরকে তখনও তার নিকটে আপাতভাবে মনে হচ্ছিল কর্মব্যস্ত ও সুখী, যা নৈমিত্তিক ও চিন্তাহীন শান্ততা দিয়ে প্লেগের পুরনো এই সকল ছবিগুলোকে ভুল প্রমাণিত করছিলঃ 

এথেন্স, মৃত ব্যক্তিদের অস্থি রাখার স্থানে পরিণত হয়েছিল। পাখিরাও সেস্থান ত্যাগ করে চলে গিয়েছিল। চীনদেশের শহরগুলো পরিপূর্ণ হয়ে গিয়েছিল নীরব বেদনার্ত মানুষদের দ্বারা। মারসেইলি শহরের আসামীরা মৃতদেহগুলোকে স্তূপীকৃত করে রাখছিল। Provence এর গ্রেট ওয়ালের ইমারতগুলো প্রবল প্লেগ-বায়ুকে প্রতিহত করার চেষ্টা করছিল। কনস্টান্টিনোপলের কূষ্ঠরোগীদের কুঠুরিগুলোতে আর্দ্র, পচনশীল তৃণশয্যাগুলো কাদার মেঝেতে ডুবে যাচ্ছিল। সেখানে বিছানা থেকে আংটা দিয়ে রোগীদেরকে উপরে তুলে ঝুলিয়ে রাখা হচ্ছিল। ইংল্যান্ডের ব্ল্যাক ডেথ (Black Death) এর সময়ে মাস্ক পরিহিত ডাক্তাররা উৎসব করছিল। মিলানের সমাধিক্ষেত্রে নারী-পুরুষেরা মেতে উঠেছিল অবাধ যৌনসংগমে। লন্ডনের অলিতে-গলিতে ছড়িয়ে ছিল স্তূপীকৃত গলিত লাশ। এবং প্রতিটি জায়গাই মানুষের নিরন্তর ক্রন্দনের জায়গায় পরিণত হয়েছিল। 

এই বিভীষিকাগুলোর কোনটিরই ধারেপাশে ছিল না উরানের বসন্তের সেই বিকেল। অদৃশ্য গাড়ির হুইসেলের শব্দ শোনা যাচ্ছিল। সেটা ভবিষ্যৎ কোন নিষ্টুরতা ও বেদনার সম্ভাবনাকে অস্বীকার করছিল। শুধুমাত্র বাড়িগুলোর পেছনে সাগরের মর্মর-ধ্বনি জানান দিচ্ছিল পার্থিব অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার। 

সেদিকে তাকিয়েই ডাক্তার রিও’র মনের ভেতরে ভেসে উঠল এথেন্সবাসীর জ্বালানো প্লেগ-আগুনের (plague-fires) কথা, যা লুক্রেটাস ( Lucretius) বলে গেছেন। রাতের অন্ধকারে মৃতদেরকে আনা হয়েছিল, কিন্তু তাদেরকে রাখার কোন জায়গা হচ্ছিল না। ফলে জীবিতরা টর্চের আলোতে পরস্পরের সাথে মারামারি করছিল। নিজেদের প্রিয়জনদের জন্যে সমাধির জন্যে জায়গা দখল করতে। এবং শেষ পর্যন্ত তারা নিজেরাই রক্তাক্ত হয়েছিল। 

অতঃপর রিও’র চোখের সামনে একটা দৃশ্য ভেসে উঠল। চিতার লালচে আভা প্রতিবিম্বিত হচ্ছিল অন্ধকার ঘুমন্ত সাগরের উপরে। যুদ্ধরত টর্চগুলো সেখানে অন্ধকারের ভেতরে অগ্নিস্ফুলিঙ্গের সৃষ্টি করছিল। ঘন পূতিগন্ধময় ধুঁয়া উড়ে যাচ্ছিল বিনিদ্র আকাশের দিকে। এবং অমঙ্গলের অশনিসংকেত দোদুল্যমান হয়ে কার্যকারন ক্ষমতাকে গ্রাস করছিল। এবং যে মূহুর্তে প্লেগ শব্দটি উচ্চারিত হয়েছিল, সেই মূহুর্ত হতেই এক বা একাধিক ব্যক্তি তাৎক্ষণিকভাবে রোগটি দ্বারা আক্রান্ত হচ্ছিল। 

তারপরেও সেটাকে থামানো সম্ভব ছিল। যদি তার বহিরাগত অস্তিত্বকে আমরা স্বীকার করে নিতাম, এবং যা করা প্রয়োজন ছিল, তাই করতাম। কারণ শুধুমাত্র সেক্ষেত্রেই আমরা জানতে পারতাম যে, সেটা আসলেই কী ছিল এবং তাকে প্রতিহত করতে কী ধরণের চূড়ান্ত পদক্ষেপ আমাদের গ্রহণ করা প্রয়োজন হত। কিন্তু আমরা সকলেই ভ্রান্তির ভেতরে নিমজ্জিত ছিলাম। এবং ধরেই নিয়েছিলাম যে, মহামারী বলে কোন কিছু কখনই আমাদেরকে আক্রমণ করবে না। 

ডাক্তার জানালা খুলতেই তাৎক্ষণিকভাবে নগরের শব্দ উচ্চকিত হতে লাগল। পার্শ্ববর্তী কোন কাঠ চেরাইয়ের কল থেকে সংক্ষিপ্ত ও সবিরাম হিসহিস শব্দ ভেসে আসতে লাগল। প্রতিদিনকার মত রোগীদের দেখতে যাওয়ার জন্যে রিও উঠে দাঁড়াল। এই একটা মাত্র কাজের ভেতরেই সে সকল সময়ে অনাবিল শান্তি ও আসল স্বস্তি খুঁজে পায়। এই সময়ে অন্য সমস্ত কাজই তার নিকটে তুচ্ছ বলে মনে হয়। সুতরাং সেগুলোর পেছনে অযথা সময় ব্যয় না করে নিজের কাজকে যথাযথভাবে সম্পাদন করতেই যে মনঃস্থির করল। 

ডাক্তারের চিন্তার শেষের দিকে জোসেফ গ্র্যান্ড এসে উপস্থিত হল। মিউনিসিপ্যাল অফিসে গ্র্যান্ড বিভিন্ন ধরনের কাজ করে। অনেক সময়েই তাকে পরিসংখ্যান বিভাগের পক্ষ হতে জন্ম, বিবাহ, এবং মৃত্যু সংক্রান্ত হিসাব লিপিবদ্ধ করতে হত। ফলে গত কয়েকদিন মৃত্যুর সংখ্যা যোগ করার দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়েছিল সে। ডাক্তারের প্রতি ঋণী হবার কারণে সে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে সর্বশেষ মৃত্যুসংখ্যার একটা কপি এনেছে। গ্র্যান্ডের সাথে এসেছে তার প্রতিবেশী কটার্ড। 

“সংখ্যা তো প্রতিনিয়তই বাড়ছে, ডাক্তার। গত ৪৮ ঘন্টায় ১১ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে।“ 

রিও তার সাথে হ্যান্ডশেক করার পর কটার্ডকে জিজ্ঞেস করল সে কেমন আছে? গ্র্যান্ড রিওকে জানাল যে, কটার্ড এসেছে তাকে ধন্যবাদ দিতে এবং সমস্যা সৃষ্টি করার জন্যে মাফ চাইতে। কিন্তু রিও তখন কাগজের উপরে লিখিত সংখ্যাগুলোর উপরে ভুরু কুঁচকিয়ে তাকিয়েছিল। 

“ঠিক আছে,” সে বলল, “সম্ভবত এখন আমাদের মনকে প্রস্তুত করা উচিৎ রোগটিকে সঠিক নামে ডাকার জন্যে। এতদিন পর্যন্ত আমরা শুধু ইতস্তত ভাবই প্রদর্শনই করেছি। আমি এখন ল্যাবরেটরিতে যাব। তোমরা কি আমার সাথে যেতে চাও?” 

“অবশ্যই, অবশ্যই,” গ্র্যান্ড ডাক্তারের সাথে নীচে নামতে নামতে বলল। “আমিও এটাই ভাবি যে, কোনকিছুকে সঠিক নামেই ডাকা উচিৎ। কিন্তু এই ক্ষেত্রে রোগটার নাম কি?” 

“সেটা আমি তোমাকে বলব না, কারণ জেনে তোমার লাভ নেই।“ 

“দেখ,” গ্র্যান্ড মৃদু হাসল। “ সঠিক নামে ডাকতে পারাটাও আসলে খুব সহজ নয়।“ 

তারা ডি’আরমেস নামক স্থানের দিকে যাত্রা শুরু করল। কটার্ড নীরবে তাদেরকে অনুসরণ করল। রাস্তাঘাটগুলো অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে আসছিল। সংক্ষিপ্ত গোধূলির সময় পেরিয়ে ইতিমধ্যেই শহরে রাত নেমে এসেছিল, এবং দিগন্তের উপরে সন্ধ্যার প্রথম তারাগুলো ঝিকমিক করছিল। কিছুক্ষণ পর সবগুলো স্ট্রীটলাইট একসাথে জ্বলে উঠল, আকাশকে কিছুটা নিস্প্রভ করে দিয়ে। একই সাথে রাস্তার উপরে মানুষদের কন্ঠস্বরগুলো উচ্চকিত হয়ে উঠল। 

“আমাকে এখনই চলে যেতে হবে,” গ্র্যান্ড বলল ডি’আরমেসের কাছাকাছি পৌঁছার পর। “আমাকে গাড়ি ধরতে হবে। সন্ধ্যাগুলো আমার জন্যে আসলেই পবিত্র। আমাদের অঞ্চলে আমরা বলে থাকিঃ ‘কখনই আজকের কাজ কালকের জন্যে রেখে দিও না।‘” 

রিও লক্ষ্য করেছে যে, গ্র্যান্ড তার অঞ্চলের (অঞ্চলের নাম Montélimar) বরাত বা রেফারেন্স দিয়ে প্রায়শই নিজের বক্তব্যের ভেতরে কিছু উদ্ধৃতি এবং বহুল ব্যবহৃত কিছু বাক্যাংশ যেমন, ‘স্বপ্নের ভেতরে হারিয়ে যাওয়া’, ‘ছবির মত সুন্দর’ ইত্যাদি ব্যবহার করে থাকে। 

“ঠিক,” কটার্ড যোগ করল। “গ্র্যান্ড কখনই সন্ধ্যার ডিনারের পর বাসা থেকে বের হয় না।“ 

রিও গ্র্যান্ডকে জিজ্ঞেস করল সন্ধ্যার পর তাকে মিউনিসিপ্যাল অফিসের জন্যে কোন অতিরিক্ত কাজ করতে হয় কিনা। কিন্তু গ্র্যান্ড তাকে জানাল যে, বাসায় তাকে কখনই অফিসের কাজ করতে হয় না। তবে নিজ থেকেই সে কিছু কাজ করে থাকে। 

“আসলেই?’ রিও আলাপচারিতা চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্যে বলল। “তুমি কি কাজটা খুবই পছন্দ কর?” 

“যেহেতু আমি অনেক বছর যাবতই কাজটা করে আসছি, সেহেতু কাজটা ভাল লাগে না, এমন বলাটা আমার জন্যে শোভনীয় হবে না। যদিও কাজটা নিয়ে আমি খুব একটা এগুতে পারিনি।“ 

“আমি কি তোমাকে জিজ্ঞেস করতে পারি,” ডাক্তার তাকে থামিয়ে দিল,” কী সেই কাজটা কি যা তুমি দীর্ঘদিন ধরে করছ?” 

গ্র্যান্ড তার মাথার হ্যাটের উপরে হাত রেখে সেটিকে তার বৃহৎ উৎকীর্ণ কান পর্যন্ত নামিয়ে দিল। অতঃপর বিড়বিড় করে অর্ধেক স্পষ্ট কিছু মন্তব্য করল। তার বক্তব্য থেকে রিওর কাছে মনে হল যে, সে ‘ব্যক্তিত্বের বিকাশ’ সংশ্লিষ্ট কোন বিষয় বা কাজের সাথে জড়িত আছে। 

গ্র্যান্ড চলে যাবার পর রিও দ্রুত পিছন ফিরে সংক্ষিপ্ত পদক্ষেপে ফিগ গাছের নীচ দিয়ে boulevard de la Marne সড়ক বরাবর হাঁটতে লাগল। ল্যাবরেটরি গেটের কাছে পৌঁছার পর কটার্ড তাকে বলল যে, সে তার নিকট থেকে কিছু বিষয়ে পরামর্শ নিতে ইচ্ছুক। রিও পকেটের ভেতরের কাগজটি নাড়াচাড়া করতে করতে তাকে জানাল যে, সে তার সঙ্গে কনসাল্টিং আওয়ারে এসে সাক্ষাৎ করতে পারে। পরক্ষণেই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে জানাল যে, কটার্ডদের এলাকায় পরেরদিন দিন সে গমন করবে। এবং দুপুরের পর সেখানে নিজেই তার সাথে সাক্ষাৎ করবে। 

কটার্ডকে ছেড়ে দেয়ার পর ডাক্তার লক্ষ্য করল যে, এতক্ষণ সে গ্র্যান্ড সম্পর্কে চিন্তা করছিল এবং তাকে সে কল্পনা করার চেষ্টা করছিল অতীত কালের প্লেগ বা মহামারীর প্রাদুর্ভাবের সময়ে। যা বর্তমান সময়ের প্লেগ (কারণ এই প্লেগ সম্ভবত কোন কঠিন রূপ ধারণ করবে না) হতে খুবই ভয়াবহ ছিল। সে কল্পনা করল যে, গ্র্যান্ড দৈবানুগ্রহে সেখানে উপস্থিত ছিল। 

“গ্র্যান্ড এমন ধরণের মানুষ, যে সকল সময়েই বিপদ থেকে পলায়ন করতে সমর্থ হয়,“ রিও মনে মনে বলল। কোথাও এক জায়গায় সে পড়েছিল যে, প্লেগ দুর্বল ধরণের মানুষদেরকে আক্রমণ করে না। শিকার বানায় শক্তিশালী গঠনের মানুষদেরকে। 

গ্র্যান্ড সম্পর্কে ভাবনাচিন্তার পর সে সিদ্ধান্তে উপনীত হল যে, গ্র্যান্ড হল উপরের ধরণের একটা ‘রহস্যময় মানুষ’। সত্য যে, প্রথম দৃষ্টিতে তাকে দেখে স্থানীয় প্রশাসনের একজন নম্র স্বভাবের কর্মচারী বলেই শুধু মনে হয়। শীর্ণ ও দীর্ঘদেহী। মনে হয় যে, সে তার চেয়ে অনেক বড় আকৃতির পরিচ্ছদের ভেতরে হারিয়ে গেছে। কারণ অদ্ভুত কোন কারণে সে নিজের আকৃতি এবং নিজের দৈর্ঘের চেয়ে যথাক্রমে অনেক বড় ও বেশী দীর্ঘ পরিচ্ছদ পরিধান করে থাকে। 

গ্র্যান্ডের নীচের চোয়ালে প্রায় সবগুলো দাঁতই আছে। তবে উপরের চোয়ালের সবগুলো দাঁতই পড়ে গেছে। ফলে যখন সে উপরের ঠোঁট নাড়াচাড়া করে হাসে, তখন তার নীচের ঠোঁট নড়ে না বললেই চলে। এবং তার মুখটাকে মনে হয় মুখমন্ডলের ভেতরে ছোট্ট একটা কাল গর্তের মত। 

তার হাঁটার ভঙ্গী দেখে মনে হয় একটা লজ্জিত ভিক্ষু দেয়ালের গা ঘেষে হাঁটতে হাঁটতে এক সময়ে ইঁদুরের মত দরজার ফাঁক দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে। 

তার মুখ থেকে অনর্গল একটা নির্জীব ধরণের ধুঁয়া ও বেইসমেন্ট কক্ষের গন্ধ বের হয়। 

সংক্ষেপে বলতে গেলে একজন অকিঞ্চিৎকর মানুষের সকল বৈশিষ্ট তার ভেতরে বিদ্যমান, এবং বাস্তবিক পক্ষেই তাকে ডেস্কের উপরে মাথা নীচু করে শহরের টয়লেট সমূহের শুল্ক গণনা অথবা একজন কনিষ্ঠ সেক্রেটারির জন্যে ময়লা সংগ্রহের প্রতিবেদন জোগাড় করা করণিক ছাড়া অন্য কোন কিছু হিসেবে কল্পনা করা কঠিন। শুধু তাই নয়, আপনি তাকে চেনার পূর্বে অর্থাৎ তার সাথে প্রথম দেখাতেই মনে হবে যে, সে কী কাজ করে আপনি তা জানেন। এবং দেখার পর এটাই অনুভব করবেন যে, পৃথিবীতে এই লোকটির আগমনের একমাত্র হেতুই হল সে মিউইসিপ্যাল অফিসে সহকারী মিউনিসিপ্যাল করণিক হিসেবে কাজ করবে এবং যার বেতন হবে মাসিক ৬২ ফ্রাঙ্কস এবং দৈনিক ৩০ সেন্ট। 

২০ বছর পূর্বে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় পাশের পর টাকার অভাবে পড়াশুনা চালাতে না পেরে গ্র্যান্ড মিউনিসিপ্যাল অফিসের এই সাময়িক চাকুরীটি সে গ্রহণ করেছিল। এবং খুব দ্রুতই সে তার চাকুরিতে স্থায়ী হয়ে গিয়েছিল নগর প্রশাসনের কিছু স্পর্শকাতর সমস্যাকে সার্থকভাবে সমাধান করতে পারার কারণে। এবং তখন অফিস থেকে তাকে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল যে, দ্রুতই তাকে একটি গ্রেড দেয়া হবে, যা দিয়ে সে আরামদায়ক জীবন যাপনে সমর্থ হবে। 

উচ্চাকাঙ্ক্ষা, কখনই জোসেফ গ্র্যান্ডের ভেতরে উদ্দীপনার সৃষ্টি করে না। শুষ্ক হাসি দিয়ে নিজেও সে তা স্বীকার করে থাকে। মোটের উপরে যা সে আশা করে, তা হল এমন একটা জীবন, যা সততার সাথে কাজ করে যাপন করে নিজের অবসর সময়কে নিজের সখের পেছনে ব্যয় করতে সমর্থ হবে। কিন্তু তার চাকুরীর ‘সাময়িক’ প্রকৃতি না বদলানোর কারণে জীবিকা নির্বাহের বৃদ্ধিপ্রাপ্ত খরচের বিপরীতে বেতন না বাড়ায় সে যথেষ্টই অসুবিধার ভেতরে ছিল। বিষয়টি সে রিও’র কাছে স্বীকার করলেও অন্য কেউই তা জানত না। 

আসলে এখানেই নিহিত ছিল গ্র্যান্ডের মৌলিকত্ব, অথবা মৌলিকত্বের ইঙ্গিত। সে চাইলে অন্তত কর্তৃপক্ষ কর্তৃক তাকে দেয়া গ্রেড সম্পর্কিত প্রতিশ্রুতির বিষয়টি অফিস কর্তৃপক্ষের গোচরে আনতে পারত। অনুযোগ হিসেবে। কিন্তু তার ডিপার্টমেন্টের প্রধান (যিনি এসম্পর্কিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন) কিছুদিন পুর্বে মারা যাবার কারণে তা করেনি। এছাড়াও চাকুরী শুরুর সময়ে যে শর্তাবলী দেয়া হয়েছিল, সেগুলো সে ভুলে গিয়েছিল। 

তার সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল যে, সে সঠিক কথা খুঁজে পেত না। রিও খেয়াল করেছিল যে, এই বিশেষত্বই মূলত তার ব্যক্তিত্বের চাবিকাঠি ছিল। এবং এটাই তাকে বিরত রেখেছিল কর্তৃপক্ষ বরাবর অনুযোগ জানিয়ে চিঠি লিখতে অথবা এ বিষয়ে অন্য কোন ব্যবস্থা নিতে। 

তার বক্তব্য অনুযায়ী নিজের ‘অধিকার’ নিয়ে কথা বলতে কখনই তার ভাল লাগত না। এমনকি ‘প্রতিশ্রুতি’ শব্দটি উচ্চারণ করতেও সে স্বচ্ছন্দ বোধ করত না। অন্যদিকে ‘আপনার দয়া’ ‘কৃতজ্ঞতা’, এমনকি ‘অনুরোধ’ এই শব্দগুলোও ছিল তার আত্নসম্মান বোধের সাথে সাংঘর্ষিক। ফলে সঠিক শব্দ খুঁজে না পাওয়া ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক কারণে সে অনেক বছর যাবতই তার কম বেতনের চাকুরীটি করে আসছিল। 

ডাক্তার রিওকে সে সবসময়েই বলত যে, সে সকল সময়েই তার আয়ের ভেতরে বসবাস করে এসেছে। এমনকি তার দরকারগুলোকেও কাটছাঁট করেছে তার আয়ের সাথে সঙ্গতি রাখার জন্যে। 

সে প্রায়শই আমাদের শহরের মেয়রের (যে একই সাথে একজন বিজনেস ম্যাগনেট ছিল) একটা মতামতকে সমর্থন করত। মতামতটা ছিল,”এটা বিশ্বাস করার কোন কারণই নেই যে, এই শহরের কেউ কোনদিন অনাহারে মৃত্যুবরণ করেছে।“ মোটকথা, নিরলংকার ও সন্ন্যাসীদের মত জীবনযাপনই সকল ধরণের উদ্বিগ্নতা থেকে রক্ষার কবচ বলে গ্র্যান্ড বিশ্বাস করত। এছাড়াও নিজেকে প্রকাশ করার জন্যে সর্বক্ষন সঠিক শব্দ খুঁজত সে। এই প্রেক্ষিতে বলা যেতে গ্র্যান্ডের জীবন ছিল একটি অনুকরণীয় জীবন। সে সেই সকল সল্প সংখ্যক লোকদের অন্তর্ভূক্ত ছিল, যারা নিজেদেরকে নিয়েই আনন্দে মেতে থাকে। 

গ্র্যান্ড নিজের ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে যতটুকুই সে বলত, তা তার দয়া ও স্নেহ ইতাদি বোধের আতিশয্যকেই প্রকাশ করত। নিজের পিতামাতা সম্পর্কে (যাদেরকে সে শৈশবে হারিয়েছিল) সে বলত যে, তাদের অনুপস্থিতি তাকে কষ্ট দেয়। সে কখনই লুকানোর চেষ্টা করেনি যে, প্রতিদিন বিকেলে শহরে নিজ এলাকায় গীর্জার ঘন্টাধ্বনি তাকে টানে। তারপরেও এই ধরণের অতি সাধারণ আবেগের বিষয় প্রকাশ করতে তার কষ্ট হত, শব্দের সল্পতার জন্যে। 

মোটের উপর শব্দ খুঁজে পাওয়ার সমস্যা তার জন্যে অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। 

“ডাক্তার, তুমি জান না নিজেকে প্রকাশ করা শিখতে আমি কতটা আগ্রহী!” যতবারই রিও’র সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হত, ততবারই সে বলত। 

সেই বিকেলে গ্র্যান্ডের অপসৃয়মান অবয়বের দিকে তাকিয়ে রিও’র মনে হল যে, গ্র্যান্ড তাকে বলতে চেয়েছিল যে, সে বই অথবা সে ধরণের কিছু একটা লিখার সাথে সম্পর্কিত রয়েছে। অদ্ভুতভাবে রিও ল্যাবরেটরিতে প্রবেশের সময়ে নিশ্চিতভাবে তা পুনর্বার অনুভব করল। 

পরিশেষে রিও কোনভাবেই বিশ্বাস করতে পারল না যেই শহরে গ্র্যান্ডের মত নির্দোষ ধরণের মাথাপাগল লোক বসবাস করে, সেই শহরে কি করে মহামারী ধরণের বিশাল মাপের বিপদ নেমে আসতে পারে? সঠিকভাবে বললে বলতে হয়, এই ধরণের মাথাপাগল লোকের অস্তিত্ব সে ইতিহাসের প্লেগ জর্জরিত কোন সমাজেই খুঁজে পায়নি। 

সুতরাং সে উপসংহারে উপনীত হল যে, এই শহরের মানুষদের উপরে প্লেগের মত বিপর্যয় নেমে আসতে পারে না। 

পরেরদিন রিও অনেক চেষ্টার মাধ্যমে নগর কর্তৃপক্ষকে রাজী করাতে সমর্থ হল নগর প্রধানের অফিসে একটি স্বাস্থ্য কমিটি গঠন করাতে। 

“এটা সত্য যে, শহরের লোকজন ঘাবড়ে যাচ্ছে,” ডাক্তার রিচার্ড স্বীকার করল। “তবে এটাও ঠিক যে শহরে বিভিন্ন ধরণের গুজব ছড়ানো হচ্ছে। নগর প্রধান আমাকে বলেছেন, 'তোমরা চাইলে অবিলম্বে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পার, তবে আমি চাচ্ছি না লোকজনের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে।‘ তার ব্যক্তিগত ধারণা যে, এটা একটা ভুল বিপদসংকেত।“ 

রিও গাড়িতে করে ক্যাসেলকে মেয়রের অফিসে লিফট দিল। 

“তুমি কি জান,” গাড়িতে ক্যাসেল বলল, “যে আমাদের পুরো জেলায় এক গ্রাম পরিমাণেও জীবাণুনাশক (serum) নেই?” 

“হ্যা, জানি। আমি ঔষধের ডিপোতে টেলিফোন করেছিলাম। ডেপোর পরিচালককে মনে হল জীবানুনাশকের প্রসঙ্গ আসাতে খুবই অবাক হয়েছে। আমাকে তিনি বললেন যে, প্যারিস থেকে serum আমদানী করতে হবে।“ 

“আশা করছি যে, দ্রুতই তারা ব্যবস্থা নেবে।“ 

“আমি গতকাল তাদেরকে একটা টেলিগ্রাম পাঠিয়েছি,” রিও বলল। 

নগর প্রধান তাদেরকে যথেষ্ট ভদ্রতার সাথেই স্বাগত জানালেন। কিন্তু তাকে দেখে বোঝাই যাচ্ছিল তিনি রেগে আছেন। 

“আসুন, আমরা কাজ শুরু করি,’ তিনি সবার উদ্দশ্যে বললেন। “সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে আমাদের কি পর্যালোচনা করার দরকার আছে?” 

রিচার্ড বলল যে, সেটার দরকার হবে না। সে ও তার সহকর্মীরা সকলেই ঘটনা সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবহিত রয়েছে। তাদের একটাই প্রশ্ন, তা হল কি কি ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। 

“প্রশ্ন,” বয়স্ক ক্যাসেল প্রায় অভদ্র ভাবে বলল,” প্রশ্নটা হল যে আমাদেরকে জানতে হবে এটা আসলেই কি প্লেগ, নাকি প্লেগ নয় ?“ 

উপস্থিত দুই অথবা তিনজন ডাক্তার তার কথার প্রতিবাদ করে উঠল। অন্যদেরকে ইতস্তত করতে দেখা গেল। নগর প্রধান একটা ভূমিকা দিয়ে শুরু করলেন এবং তাড়াহুড়ো করে দরজার দিকে তাকালেন নিশ্চিত হবার জন্যে যে, ক্যাসেলের অভদ্রজনোচিত মন্তব্য করিডোর থেকে কেউ শুনতে পায়নি। 

রিচার্ড বলল যে, তার মতে এ বিষয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করার দরকার নেই। বর্তমান সময়ে সকলকে যা বলা যেতে পারে তা হল, আমাদেরকে একটা বিশেষ ধরণের জ্বরের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিতে হবে, যে জ্বরে কুঁচকিসংক্রান্ত সমস্যা আছে। এবং এই সময়ে আদৌ যৌক্তিক হবে না দ্রুত কোন উপসংহারে উপনীত হওয়া। 

বৃদ্ধ ক্যাসেল শান্তভাবে তার হলুদাভ গোঁফ চিবাতে চিবাতে তার ফ্যাঁকাসে কিন্তু উজ্জ্বল চোখে রিও’র দিকে তাকাল। তারপর কমিটির অন্য সকল সদস্যদের দিকে বন্ধুত্বপূর্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলল যে, সে নিশ্চিতভাবে জানে যে, এটা প্লেগ, যা অফিসিয়ালি আমাদের সবার স্বীকার করে নেয়া উচিৎ। শুধুমাত্র সেক্ষেত্রেই কর্তৃপক্ষ বাধ্য হবে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে। তার সহকর্মীরা যেহেতু সত্যের মুখোমুখি হতে ভয় পাচ্ছেন, সেহেতু তারা রোগটিকে প্লেগ নয় বলে উড়িয়ে দিচ্ছেন। 

নগর প্রধানকে বিশৃঙ্খল মনে হল। তিনি মন্তব্য করলেন যে, ক্যাসেলের এই ধরণের বক্তব্য তার কাছে যুক্তিহীন বলে মনে হয়েছে। 

ক্যাসেল প্রতি উত্তরে বলল, ” বক্তব্য যুক্তিহীন বা অন্যকিছু, তা গুরুত্বপূর্ণ নয়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করা।“ 

রিও যে এখন পর্যন্ত কিছুই বলেনি, তাকে মতামত দিতে বলা হল। 

“আমরা মুখোমুখি হয়েছি ,” সে বলল,” টাইফয়েডের মত একটি জ্বরের সাথে। এই যে জ্বরের সাথে বমি ও বাগীরোগ (যে রোগে লিম্ফনোড স্ফীত হয়ে যায়) হয়। আমি বাগী বা ফোড়াগুলোকে অপারেশন করে এর পুঁজকে নিরীক্ষা করে দেখেছি। আমাদের ল্যাবরেটরি বিশেষজ্ঞও বিশ্বাস করে যে, এগুলোর ভেতরে সে প্লেগের জীবাণু পেয়েছে। তবে সেই সাথে আমি নিজে এটাও বলতে চাই যে, এই জীবানুতে বিশেষ কিছু মডিফিকেশন রয়েছে, যা প্লেগ জীবানুর প্রচলিত বর্ণনার সাথে মিলে না।“ 

রিচার্ড বলল যে, এ কারণেই আমাদের ‘অপেক্ষা ও পর্যবেক্ষন’ নীতি অনুসরণ করা উচিৎ। এবং আমাদের জন্যে যৌক্তিক হবে সংখ্যাতাত্বিক বিশ্লেষণ প্রতিবেদনের জন্যে অপেক্ষা করা, যেটা গত কয়েকদিন যাবত পরিচালিত হচ্ছে। 

“যখন একটা অনুজীব,” রিও বলল,” সামান্য বিরতির পর মাত্র তিনদিনেই স্প্লিনকে চারগুণ বড় করে দেয়, স্নায়ুগ্রন্থিকে স্ফীত করে আপেলের মত করে ফেলে, এবং যেটা সারাক্ষণ যন্ত্রণা দিতে থাকে, তখন ‘অপেক্ষা ও পর্যবেক্ষন’ নীতি আমার কাছে কখনই যৌক্তিক মনে হয় না। একই সাথে এর সংক্রমণের কেন্দ্রও ক্রমাগত প্রসারিত হচ্ছে, দৃঢ়তার সাথে। খুবই দ্রুততার সাথে এই রোগ বাড়ছে। আমরা যদি এখনই একে বন্ধ না করতে পারি, তবে আগামী দুই মাস শেষ হবার পূর্বেই শহরের অর্ধেক মানুষের মৃত্যুর কারণ হবে। সেক্ষেত্রে আমরা একে যত কম গুরুত্বের প্লেগ বা বিরল জ্বরই বলি না কেন, তাতে কিছুই আসবে-যাবে না। আমাদের জন্যে আসল গুরুত্বপূর্ণ হল শহরের অর্ধেক মানূষ মেরে ফেলার পূর্বেই ওটাকে প্রতিহত করা।“ 

রিচার্ড বলল যে, এই ধরণের হতাশ একটি ছবি আঁকা আমাদের একেবারেই উচিৎ নয়। তাছাড়া রোগটি সংক্রামক তা এখনও প্রমাণিত হয়নি। কারণ, দেখা গেছে এই সব রোগীদের আত্নীয়স্বজনরা একই ছাদের নীচে বসবাস করার পরেও আক্রান্ত হয়নি। 

“কিন্তু অনেকেই মারা গেছে,” রিও প্রত্যুত্তর করল। “ সংক্রমণ এখনও পূর্ণরূপ ধারণ করেনি, নতুবা গাণিতিক হারে এই সংক্রমণ হলে মৃত্যুর হার বিপদজনকভাবে বেড়ে যেত। সুতরাং এটা কখনই বিষণ্ণ ছবি আঁকার বিষয় নয়, বরং এটা পূর্বসতর্কতা গ্রহণের প্রশ্ন।“ 

যাইহোক, রিচার্ড পুরো পরিস্থিতিকে সে যেভাবে অনুধাবন করে, সেভাবেই ব্যাখ্যা করল। এবং দেখালো যে, মহামারী যদি নিজ থেকে না থামে, একমাত্র তখনই তারা কঠোর প্রতিষেধক ব্যবহার করবে। যেমনটা স্বাস্থ্যবিধিতে লিখা আছে। উল্লেখ্য, কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্যে অফিসিয়ালি ঘোষণা করার প্রয়োজন রয়েছে যে, মহামারীর প্রাদুর্ভাব হয়েছে। কিন্তু যেহেতু মহামারী সংঘটনের কোন নিশ্চয়তা নেই, সেহেতু কোন তরান্বিত ব্যবস্থা গ্রহণই তারা অনুমোদন করতে ইচ্ছুক নয়। 

রিও তার যুক্তিতে অনড় থাকল। 

“বিষয় এটা নয় যে, স্বাস্থ্যবিধিতে প্রদত্ত ব্যবস্থাসমূহ কঠোর কিনা। বিষয় হল ব্যবস্থাটি অর্ধেক সংখ্যক জন্যগণের মৃত্যুকে ঠেকানোর জন্যে যথেষ্ট কিনা। বাকী সকল ব্যবস্থাই হল প্রশাসনিক কার্যক্রম। এবং আমার মনে হয় না যে, কাউকে মনে করিয়ে দেয়ার প্রয়োজন রয়েছে যে, আমাদের সংবিধানে এই ধরণের পরিস্থিতি সামাল দেয়ার জন্যে নগর প্রধানকে প্রয়োজনীয় ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে, যাতে তিনি প্রয়োজন অনুযায়ী নির্দেশনা প্রদান করতে পারেন। 

“অবশ্যই সত্য,” নগর প্রধান স্বীকার করলেন, “কিন্তু সেক্ষেত্রে আমার প্রয়োজন হবে আপনাদের নিকট হতে প্রফেশনাল ঘোষণা যে, বাস্তবেই এই মহামারী প্লেগ হতে সৃষ্ট।“ 

“আমরা যদি এই ঘোষণা না দেই,” রিও বলল,”তাহলে শহরের অর্ধেক জনসংখ্যা শেষ হয়ে যেতে পারে।“ 

রিচার্ড কিছুটা অস্থিরতা প্রদর্শন করল। 

‘সত্য হল যে, আমাদের সহকর্মী বিশ্বাস করেন যে, এটা প্লেগ। লক্ষণ সম্পর্কে তার বর্ণনা তাই প্রমাণ করে,“ সে বলল। 

রিও উত্তর দিল যে, সে কোন ‘লক্ষণ’ বর্ণনা করেনি। সে শুধু বলেছে যা সে নিজ চোখে দেখেছে। এবং যা সে দেখেছে, তা হল বাগীরোগ (buboes) ও উচ্চ জ্বর। সাথে প্রলাপ বকা। যা মৃত্যুর মধ্য দিয়ে মাত্র ৪৮ ঘন্টার মধ্যেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। ডাক্তার রিচার্ড কি ঘোষণা করতে পারবেন যে, কঠোর প্রতিষেধক ব্যবস্থা গ্রহণ না করলেও মহামারী নিঃশেষ হয়ে যাবে? 

রিচার্ড ইতস্তত করল এবং তারপর দৃষ্টিকে রিও’র উপরে নিবদ্ধ করল। 

“অনুগ্রহ করে অকপটে আমাকে বল, তুমি কি নিশ্চিত যে, ওটা প্লেগ?” 

“সমস্যাটাকে তুমি ভিন্নভাবে বর্ণনা করছ। আমি সেটাকে কি নামে ডাকি সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। গুরুত্বপূর্ণ হল সময়।“ 

“তাহলে কি তোমার মত হল যে,” নগর প্রধান তাদের দুইজনের কথার ভেতরে ঢুকলেন, “ যদি সেটা প্লেগ নাও হয়ে থাকে, তবুও প্লেগের জন্যে নির্ধারিত কঠোর প্রতিষেধক ব্যবস্থা এক্ষুনি বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন?” 

“আপনারা যদি আমার মতকে গ্রহণ করেন, তাহলে এটাই আমার সত্যিকারের মতকে প্রকাশ করে।“ 

ডাক্তাররা সবাই স্বীকার করে নিল, রিচার্ডই তাদের মুখপাত্র। রিও নয়। 

“তার মানে আমরা দায়িত্ব গ্রহণ করছি এই বলে যে, এই মহামারীই প্লেগ,“ রিচার্ড বলল। এভাবেই সে বিষয়টিকে সাধারণ অনুমোদনের জন্যে উপস্থাপন করল। 

“আমার কিছুই যায় আসে না,” রিও বলল,”আপনারা কীভাবে তা বর্ণনা করেন। আমার বক্তব্য হল, আমাদের এমন কিছু করা উচিৎ হবে না যাতে শহরের অর্ধেক জনসংখ্যা বিলোপ হয়ে যায়।“ 

অনেক চোখ রাঙ্গানি এবং বাদ-প্রতিবাদের পর রিও কমিটি কক্ষ ত্যাগ করে বের হয়ে আসল। কয়েক মিনিট পর সে শহরের পেছনদিকের একটা রাস্তার উপরে গাড়ি চালাচ্ছিল। রাস্তা থেকে শুঁটকি মাছ ও পেশাবের গন্ধ আসছিল। একটা মহিলা যন্ত্রণায় চিৎকার করছিল। তার কটিসন্ধি হতে রক্ত ঝরছিল। মহিলাটি রিও’র দিকে হাত বাড়িয়ে দিল। 

কমিটি মিটিং এর পরদিন থেকে জ্বরের প্রকোপ আরও বেড়ে গেল। সেগুলো খবরের কাগজেও জায়গা করে নিল। যদিও গোপনভাবে। শুধুমাত্র সংক্ষিপ্ত বরাত হিসেবে। 

রিও দেখতে পেল যে, শহরের বিভিন্ন স্থানে কিছু ছোট ছোট নোটিশ টাঙানো হয়েছে। এমন সব জায়গায়, যেখানে সেগুলো মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে না। এই সকল নোটিশ থেকে নগর কর্তৃপক্ষ যে সর্বোতভাবে পরিস্থিতি মোকাবেলা করার চেষ্টা করছে, সে সম্পর্কে ইংগিত পাওয়া কঠিন। কারণ, নোটিশগুলোতে অন্তর্ভূক্ত নির্দেশাবলী কর্তৃপক্ষের কঠোরতাকে নির্দেশ না করে বরং জনগণ যাতে ভীতসন্ত্রস্ত না হয় সেই ইচ্ছেকেই প্রতিফলিত করেছিল। নোটিশটি শুরু হয়েছিল সাদামাটাভাবে; কোন ব্যাখ্যা প্রদান ছাড়াই। সেখানে বলা হয়েছিল যে, উরান শহরে কিছু মারাত্মক ধরণের জ্বর সম্পর্কে জানা গেছে। তবে বর্তমান পর্যন্ত নিশ্চিত নয় যে, এই জ্বর সংক্রামক কিনা। এর লক্ষণগুলোও স্পষ্ট বা উদ্বেগ সৃষ্টিকারী নয়। এবং কর্তৃপক্ষ এই পরিস্থিতি সামাল দেয়ার জন্যে জনগণের সামর্থের উপরে যথেষ্টই নির্ভর করতে সক্ষম। তবে নগরপ্রধান ইতিমধ্যেই নিজের দূরদর্শিতা থেকে কতিপয় পূর্বসতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন। এই ব্যবস্থাগুলো যদি সতর্কভাবে নীরিক্ষাপূর্বক যথাযথভাবে প্রয়োগ করা হয়, তাহলে মহামারীর সম্ভাবনা পরিহার করা সম্ভব হবে। এমতাবস্থায়, নগরপ্রধান মনে করেন যে, শহরের প্রত্যেকেই নিজ নিজ বিবেচনা সাপেক্ষে তার এই ব্যক্তিগত প্রচেষ্টা সমুহকে সহযোগিতা প্রদান করবেন। 

নোটিশটিতে কর্তৃপক্ষের সাধারণ পরিকল্পনার একটা রূপরেখাও অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছিল। এদের মধ্যে ছিল নর্দমাগুলোর ভেতরে বিষপ্রয়োগ করে শহরের সকল ইঁদুর মেরে ফেলা, এবং শহরর পানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে কঠোরভাবে তত্ত্বাবধান করা। সেখানে শহরের লোকজনকে উপদেশ দেয়া হয়েছিল কঠোর পরিচ্ছন্নতা অনুশীলন করতে, এবং যে কেউই আক্রান্ত হলে মিউনিসিপ্যাল ডিসপেনসারিতে যেতে বলা হয়েছিল। এছাড়াও প্রতিটি গৃহকর্তাকে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল কোন জ্বরের কেইস সনাক্ত করা হলে দ্রুততম সময়ে তাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে এবং পরিবারের অসুস্থ সদস্যদেরকে হাসপাতালের বিশেষ ওয়ার্ডে আইসোলেশনে রাখতে। বলা হয়েছিল যে, এই ওয়ার্ড সমুহকে তাৎক্ষনিক চিকিৎসার সকল সরঞ্জামাদি দ্বারা সজ্জিত করা হয়েছে, যা রোগমুক্তির সর্বোচ্চ সম্ভাবনা সৃষ্টি করবে। চিকিৎসা কক্ষ এবং যানবাহনগুলোকে (যেগুলোতে রোগী বহন করা হয়) বাধ্যতামূলকভাবে জীবাণুমুক্ত করার জন্যে কিছু সম্পূরক নীতিমালাও প্রণয়ন করা হয়েছিল। এগুলোর বাইরে নগরপ্রধান ইতিমধ্যেই যারা রোগীর সংস্পর্শে এসেছে, তাদেরকে উপদেশ দিয়েছিলেন স্যানিটারি পরিদর্শকের সাথে আলোচনা ও তার উপদেশ সমুহকে কঠোরভাবে প্রতিপালন করতে। 

ডাক্তার রিও পোস্টারগুলো থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে তার সার্জারি বিল্ডিং এর দিকে যাত্রা শুরু করল। গ্র্যান্ড সেখানে তার জন্যে অপেক্ষা করছিল। রিওকে আসতে দেখে সে নাটকীয়ভাবে তার বাহু উত্তোলন করল। 

“আমি জানি,” রিও বলল, “সংখ্যা বাড়ছে।“ পূর্বের দিনে মৃত্যু সংখ্যা ছিল দশ। 

ডাক্তার গ্র্যান্ডকে বলল যে, সে বিকেলে কটার্ডকে দেখতে যাবে। সেখানে তার সাথেও পুনর্বার দেখা হতে পারে। 

“চমৎকার, এটা তার জন্যে খুবই ভাল হবে, কারণ সম্প্রতি সে খুবই বদলে গেছে।“ 

“কি রকম?” 

“সে আগের চেয়ে অনেক বেশী ভদ্র মেজাজী হয়েছে।“ 

“আগে কি সে বদমেজাজী ছিল?” 

গ্র্যান্ডকে কিছুটা বিভ্রান্ত মনে হল। কটার্ডকে বদমেজাজী বলা সঠিক হবে না। তবে সে খেয়াল করেছে যে, কটার্ড একজন চুপচাপ ও লুকানো স্বভাবের মানুষ, যার ভেতরে কিছু একটার উপস্থিতি তাকে বন্য শূকরের কথা মনে করিয়ে দেয়। শোবার কক্ষ, সস্তা হোটেলে খাওয়া যাওয়া করা, রহস্যজনক চলাচল – এসব মিলিয়ে যথেষ্টই ভিন্ন ধরণের জীবন যাপন করে থাকে কটার্ড। নিজেকে সে পরিচয় দিয়ে থাকে মদের চালান-ব্যবসায়ী বলে। প্রায়ই কটার্ডের সাথে দুই তিন জন মানুষ দেখা করতে আসে। সম্ভবত তারা তার খদ্দের। কখনও কখনও সে রাস্তার ওপারে সিনেমা দেখতে যায়। গ্র্যান্ডের ধারণা কটার্ড গ্যাংস্টার ধরণের সিনেমা দেখতে পছন্দ করে। তবে সামগ্রিকভাবে কটার্ডের যে বিষয়টা তকে সবচেয়ে বেশী অবাক করে তা হল তার নির্জনতা প্রিয়তা এবং মানুষ সম্পর্কে তার অবিশ্বাস। 

অবশেষে গ্র্যান্ড কটার্ডের পরিবর্তনগুলোকে ব্যাখ্যা করল এভাবেঃ 

“আমি জানি না কীভাবে বিষয়টা বলা উচিৎ, তবে আমার কাছে মনে হয় যে, সে চেষ্টা করছে সবার নিকটে তার গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে এবং প্রত্যেকের কাছে ভাল মানুষ হতে। ইদানীং সে প্রায়ই আমার সাথে কথা বলে এবং তার সাথে একত্রে বেড়াতে যেতে বলে। আমিও তার অনুরোধকে উপেক্ষা করতে পারি না। বড় কথা হল যে, সে আমাকে পছন্দ করে, যেহেতু আমি তার জীবন রক্ষা করেছি।“ 

কটার্ড আত্নহত্যার চেষ্টা করার পর থেকে নতুন কেউ আর তাকে দেখতে আসেনি। এই সময়কালে সে রাস্তায়, দোকানে – সর্বত্রই লোকজনের সাথে বন্ধুত্ব পাতানোর চেষ্টা করছিল। মুদির দোকানদারের কাছেও সে ছিল খুবই প্রিয়পাত্র। তামাক-দোকানের আলাপচারীতাতেও সে ছিল মধ্যমণি। 

“এই মহিলা তামাক-বিক্রেতা,“ গ্র্যান্ড তাকে বলেছিল, “ভয়ঙ্কর ধরণের। কিন্তু সে উত্তর করেছিল যে, আমি নাকি পক্ষপাতমূলক চিন্তা করছি। সেই মহিলার আসলেই অনেক গুণ আছে, যা শুধু খুঁজে বের করতে হয়।“ 

দুই বা তিনবার কটার্ড গ্র্যান্ডকে তার সাথে শহরের বিলাসবহুল রেস্টুরেন্ট ও ক্যাফেতে আমন্ত্রণ করেছিল। সাম্প্রতিক অতীতে তাকে এগুলোরও পৃষ্ঠপোষকতা করতে দেখা গেছে। 

“এখানে খুবই আনন্দময় পরিবেশ,” সে ব্যাখ্যা করেছিল,”এবং ভাল সাহচর্য পাওয়া যায়।“ 

গ্র্যান্ড খেয়াল করেছিল যে, কটার্ডের সঙ্গী তাকে দিয়ে প্রচুর লাভবান হত এবং তাকে প্রচুর বখশিশ প্রদান করত। বিনিময়ে কটার্ড তার সাথে খুবই নম্র ধরণের আচরণ করত। 

একদিন যখন হোটেলের প্রধান ওয়েটার তাকে দরজায় পৌঁছে দিচ্ছিল এবং তার গায়ে ওভারকোট পরাতে সাহায্য করছিল, তখন সে গ্র্যান্ডকে বলেছিল,” সে খুবই ভাল মানুষ এবং ভাল একজন সাক্ষী হতে পারে।“ 

“একজন সাক্ষী? বুঝতে পারলাম না।“ 

কটার্ড উত্তর করার আগে ইতস্তত করে কৌতুকের সাথে বলেছিলঃ 
“আমি যে একজন ভাল মানুষ, সেই সাক্ষ্যই সে দেবে।“ 

কিন্তু তার এই কৌতুকবোধ সব সময়ে একই রকমের থাকত না। একদিন সেই ওয়েটার তাকে একটু কম তোষামোদি করার কারণে সে রাগে গজগজ করতে ঘরে প্রত্যাবর্তন করেছিল। 

“সে অন্যদের পক্ষালম্বন করছে, বদমাইশ একটা!” 

“অন্যরা কারা?” 

“ওরা সকলেই।“ 

গ্র্যান্ড নিজ চোখেও তামাক বিক্রেতার দোকানে অদ্ভুত একটা ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছিল। একটা প্রাণবন্ত আলোচনার সময়ে কাউন্টারের পেছন হতে তামাক-বিক্রেতা মহিলা আলজিয়ার্সে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া একটি হত্যাকান্ড সম্পর্কে নিজের মতামত দিচ্ছিল। যে ঘটনায় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের একজন যুবক কর্মচারী নিহত হয়েছিল। 

“আমি সব সময়েই বলি, “ মহিলাটি শুরু করল,”তারা যদি সেই অপদার্থগুলোকে জেলখানায় ঢুকাত, তাহলে ভাল মানুষগুলো সমাজে সহজভাবে শ্বাসপ্রশ্বাস গ্রহণ করতে পারত।“ 

মহিলা এই কথায় কটার্ডের প্রতিক্রিয়া দেখে অবাক হয়ে গিয়েছিল। সে কোন কথা না বলেই হনহন করে তার দোকান থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল। গ্র্যান্ড ও মহিলাটি হতবাক হয়ে তার যাত্রাপথের দিকে তাকিয়ে ছিল। 

এভাবেই গ্র্যান্ড ডাক্তারের কাছে কটার্ডের চরিত্রের বিভিন্ন পরিবর্তনগুলো বর্ণনা করেছিল। ইতিপূর্বে কটার্ড সবসময়েই উদারনৈতিক ধারণা প্রচার করত। তার প্রধানতম অর্থনৈতিক অনুশাসন বাক্য ছিল, “বড় মাছেরা ছোট মাছ খায়।“ কিন্তু বর্তমানের এই সময়ে সে ওরান শহরে প্রকাশিত একমাত্র কট্টরপন্থী পত্রিকা কিনছে এবং তা সে জনসমক্ষ্যে পড়তেও চাইছে বলে দেখা গেছে। 

সিক-বেড ত্যাগ করার অব্যবহিত পূর্বে প্রায় একই ধরণের একটা অনুরোধ সে গ্র্যান্ডকে করেছিল। সেদিন গ্র্যান্ড পোস্ট অফিসে যাচ্ছিল। কটার্ড অনুরোধ করেছিল দূরে বসবাস করে তার এমন একজন বোনের কাছে তার পক্ষ হতে এক’শ ফ্রাঙ্কের একটা মানি-অর্ডার প্রেরণ করতে, যে বোনকে সে প্রতিমাসেই কিছু অর্থ প্রেরণ করে থাকে। কিন্তু গ্র্যান্ড যখন তার রুম থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিল, তখন সে তাকে পুনরায় ডেকে পাঠিয়েছিল এবং বলেছিল, “না। তাকে তুমি দুই’শ ফ্রাঙ্ক পাঠাও। সে খুবই আশ্চর্য হবে, কারণ সে বিশ্বাস করে যে, আমি কখনই তার জন্যে চিন্তা করি না। কিন্তু আসলে তা সত্য নয়; আমি তাকে যথেষ্টই স্নেহ করে থাকি।“ 

এমনকি সে গ্র্যান্ডকে ক্রমাগতভাবে জ্বালাতনও করছিল জানার জন্যে যে, কি সেই রহস্যময় ‘ব্যক্তিগত কাজ’ যার জন্যে সে প্রতি বিকেল উৎসর্গ করে থাকে। 

“আমি জানি,” কটার্ড চিৎকার করে বলে উঠেছিল, “তুমি নিশ্চয়ই একটা বই লিখছ, তাই নয় কি?” 

“সেধরণেরই কিছূ একটা। তবে তেমন সহজ কিছু নয়।“ 

“আহা,” কটার্ড বেদনার্ত কন্ঠে বলেছিল, “আমার যদি লেখার দক্ষতা থাকত!” 

গ্র্যান্ড বিস্ময় প্রকাশ করলে কটার্ড কিছুটা হতবুদ্ধি হয়ে তাকে ব্যাখ্যা করেছিল যে, একজন সাহিত্যমনা মানুষ যে কোন বিষয়কে সহজে সমাধান করতে পারে। 

“কিভাবে? গ্র্যান্ড জিজ্ঞেস করেছিল। 

“একজন লেখকের সাধারণ মানুষ থেকে যোগ্যতা থাকে বেশী।ফলে লোকজন তার কাছ থেকেই শেখে।“ 

“মনে হয়,” রিও বলেছিল,”ইঁদুরের বিষয়টি তার মাথাকে ঘোলা করে দিয়েছে, যেমনটা করেছে অন্যদের মাথাও। আমার নিশ্চিত ধারণা যে, সে জ্বরের ভয়ে খুবই ভীত হয়ে আছে।“ 

“আমার অবশ্য এ বিষয়ে সন্দেহ রয়েছে, ডাক্তার। তুমি কি আমার মতামত শুনতে চাও?” এই টুকু বলে সে থেমেছিল। ইঁদুর ধ্বংস করার ভ্যান হতে মেশিনগানের ঘর্ঘর শব্দ শোনা যাচ্ছিল। রিও কিছুক্ষণ নীরব ছিল , যতক্ষণ পর্যন্ত না তাকে স্পষ্ট শোনা যায়। অতঃপর তেমন কোন আগ্রহ ছাড়াই গ্র্যান্ডের মতামত জানতে চেয়েছিল। 

“সে মূলত খুবই নীতিবান একজন মানুষ,” গ্র্যান্ড গম্ভীরভাবে বলেছিল। ডাক্তার তার কাঁধ নাড়িয়ে সম্মতি জানিয়েছিল। 

সেদিন বিকেলে রিও পুনরায় ক্যাসেলের সাথে কথা বলেছিল। জানিয়েছিল যে, জীবাণুনাশক তখন পর্যন্ত আসেনি। 

“যাই হোক,” রিও এটাও বলেছিল,”আমার মনে হয় না সেগুলো তেমন কোন কাজে দেবে। এই জীবাণুটা আসলেই অদ্ভুত ধরণের।“ 

“আমি তোমার সাথে একমত নই,” ক্যাস্টেল বলেছিল, “এই অণুজীবগুলোকে সব সময়েই মনে হয় সম্পূর্ণ নতুন ধরণের, কিন্তু বাস্তবে তারা সবসময়েই একই জিনিস।“ 

“ওটা তোমার মতবাদ হতে পারে। বাস্তবে এ বিষয়ে আমরা আসলে কিছুই জানি না।“ 

সারাদিন ধরে ডাক্তার সচেতনতার সাথে উপলব্ধি করল যে, যখনই সে ভাবছিল প্লেগ তীব্রতা পাচ্ছে, তখনই এক ধরণের তন্দ্রালু ভাব তার উপরে ভর করছিল। শেষে সে বুঝতে পারল যে, সে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে আছে। দুইটার সময়ে সে একটি জনাকীর্ণ ক্যাফেতে প্রবেশ করল। কটার্ডের মত অনুভব করল বন্ধুদের সংস্পর্শ এবং মানবিক উষ্ণতা। 

“এটা একটা বোকা ধরণের এই সংস্কার,” রিও নিজেকে বলল। 

কটার্ড ডাইনিং টেবিলের পাশে দাঁড়িয়েছিল। সেই সময়ে ডাক্তার তার কক্ষে প্রবেশ করল। একটা ডিটেকটিভ গল্পের বই টেবিলক্লথের উপরে খুলে রাখা হয়েছিল। কিন্তু প্রায়ান্ধকারের কারণে সেটির লেখাগুলো পড়া যাচ্ছিল না। রিও দরজায় বেল বাজানোর সময়ে কটার্ড সম্ভবত গোধূলির আলোতে বসে চিন্তায় নিমগ্ন ছিল। রিও তাকে জিজ্ঞেস করল সে কেমন অনুভব করছে। কটার্ড রুক্ষভাবে উত্তর দিল যে, সে মোটামুটিভাবে ভাল অনুভব করছে, তবে সে আরও ভাল অনুভব করত যদি তাকে একাকী শান্তিতে থাকতে দেয়া হত। 

রিও মন্তব্য করল যে, একজন মানুষ কখনই একাকী থাকতে পারে না। 

“আমি ওটা বুঝাইনি। আমি ভাবছিলাম যে, যারা তোমার ব্যাপারে আগ্রহ দেখায়, তারা প্রকারান্তরে তোমার জন্যে সমস্যারই সৃষ্টি করে।“ 

রিও কিছু না বলাতে সে পুনরায় বলতে শুরু করলঃ 

“এটা শুধু আমার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। আমি একটা ডিটেকটিভ গল্প পড়ছিলাম। গল্পটি একটা বেচারা ধরণের শয়তান সম্পর্কে, যাকে গ্রেফতার করা হয়েছিল কোন একটি সুন্দর সকালে। আকস্মিকভাবে লোকজনেরা তার সম্পর্কে আগ্রহ দেখানো শুরু করেছিল এবং এ সম্পর্কে সে কিছুই জানত না। তারা সবাই তার সম্পর্কে আলাপচারিতায় মেতে উঠেছিল। তুমি কি মনে কর যে, তাদের এই কাজ যৌক্তিক ছিল? তোমার কি ধারণা যে, মানুষের অধিকার আছে অন্য একজন মানুষের সাথে এমন আচরণ করার?” 

“আসলে এটা আপেক্ষিক,” রিও বলল। “একভাবে চিন্তা করলে আমি তোমার সাথে একমত যে, কারুরই এধরণের আচরণ করার অধিকার নেই। যাই হোক, এগুলো সম্পর্কে চিন্তা করা বাদ দাও। তোমার জন্যে যা গুরুত্বপূর্ণ তা হল মাঝে-মধ্যেই বাসা থেকে বের হয়ে কোথাও থেকে ঘুরে আসা। একাধারে ঘরের ভেতরে দীর্ঘসময় থাকা খুবই অনুচিত।“ 

কটার্ডকে দেখে মনে হল সে যথেষ্টই বিরক্ত হয়েছে এই কথায়। সে বলল যে, সে বাইরে যায় না, এটা সঠিক নয়। প্রায় সময়েই সে বাইরে গমনাগমন করে থাকে। শহরের অনেক মানুষই এ বিষয়ে তার পক্ষে সাক্ষ্য দেবে। এমনকি সে শহরের অন্য অংশের অনেক লোকজনের সাথেও পরিচিত। 

“তুমি কি আর্কিটেক্ট মশিয়ে রিগাডকে চেন? সে আমার একজন বন্ধু।“ 

কক্ষটি সম্পূর্ণ অন্ধকারে আবৃত হয়ে গিয়েছিল। বাইরে রাস্তার উপরে লোকজনের কোলাহল শোনা যাচ্ছিল। স্ট্রীট ল্যাম্পগুলো একসাথে জ্বলে উঠার পর এক ধরণের মুক্তির মর্মর ধ্বনি সেই মূহুর্তকে স্বাগত জানাল। রিও কক্ষ থেকে বের হয়ে ব্যালকনিতে গেলে কটার্ড তাকে অনুসরণ করল। বাইরের জেলাগুলো থেকে প্রতিটি বিকেলের মত মৃদু বাতাসের প্রবাহ মানুষের কণ্ঠস্বরের গুঞ্জন ও ঝলসানো মাংশের গন্ধের সাথে একদল মুক্ত যুবকদের আনন্দিত কোলাহলকে বয়ে আনছিল। এরা সবাই অফিস অথবা দোকান থেকে ফিরছিল। রাত্রির আগমনের সাথে সাথে দূরের উপসাগরের অদৃশ্য জাহাজগুলো এবং রাস্তার উপরের আনন্দিত জনাকীর্ণতা থেকে জনরব ভেসে আসছিল। অতীতে এর সবটাই রিও’র জন্যে বিশেষ আকর্ষন ছিল। কিন্তু আজ সকল কিছুই তার কাছে তিক্ত মনে হচ্ছিল। যেটার কারণ রিও’র অজানা ছিল না। 

“আলো জ্বালিয়ে দিলে কেমন হয়?” সে বলল তারা কক্ষে ফিরে আসার পর। আলো জ্বালানোর পর ক্ষুদ্র মানুষটি পিটপিট করা চোখে রিও’র দিকে তাকাল। 

“বল তো ডাক্তার, আমি যদি কখনও অসুস্থ হয়ে পড়ি, তাহলে কি তোমার হাসপাতালের ওয়ার্ডে আমাকে স্থান দেবে?” 

“কেন নয়?” 

অতঃপর সে তাকে জিজ্ঞেস করল যে, হাসপাতালে বা নার্সিং হোমে চিকিৎসাধীন কাউকে গ্রেফতার করা হয় কিনা। রিও তাকে জানাল যে, এটা হয়ে থাকে, তবে তা নির্ভর করে অসুস্থ মানুষটির অবস্থার উপরে। 

“তুমি তো জান, ডাক্তার,” কটার্ড বলল,”যে তোমার উপরে আমার প্রবল আস্থা আছে।“ তারপর সে ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করল যে, শহরে ফেরার পথে তাকে লিফট দিতে পারবে কিনা। 

শহরের কেন্দ্রস্থলে রাস্তাগুলো তখন ক্রমেই জনহীন হয়ে পড়ছিল এবং আলোও কমে আসছিল। শিশুরা তাদের দরজার সামনে খেলছিল। কটার্ডের অনুরোধে ডাক্তার একদল শিশুর পাশে তার কার থামাল। তারা কুতকুত খেলছিল এবং খুবই চিৎকার-চেঁচামেচি করছিল। একটা শীর্ণদেহী বালক, সুন্দর আঁচড়ানো চুল, কিন্তু অপরিচ্ছন্ন মুখমণ্ডল নিয়ে উজ্জ্বল ও সাহসী দৃষ্টিতে রিও’র দিকে তাকাল। ডাক্তার তার দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল। ফুটপাথের উপরে দাঁড়িয়ে কটার্ড তার মাথা নাড়াল। তারপর কর্কষ ও কঠোর স্বরে কিছুটা অপ্রস্তুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললঃ 

“সবাই মহামারীর কথা বলছে। এই কথাগুলো কি সত্য, ডাক্তার?” 

“লোকজন সবসময়েই এধরণের কথা বলে থাকে,” রিও উত্তর দিল। “তাদের কাছ থেকে এর চেয়ে বেশী আশা করতে পার না তুমি।“ 

“ঠিক বলেছ। দশটা মৃত্যু দেখলেই তার মনে করে থাকে যে, পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।“ 

কারের ইঞ্জিন ঘর্ঘর শব্দ করছিল। রিও’র হাত স্থাপিত ছিল ক্লাচের উপরে। কিন্তু সে পুনরায় বালকটির দিকে তাকাল, যে তাকে অদ্ভুত অভিনিবেশ সহকারে দেখছিল। কঠিন দৃষ্টিতে। হঠাৎ করে শিশুটি হেসে উঠল,তার সকল দাঁত বের করে। 

“ আমাদের এখানে কি দরকার?” রিও বালকটির হাসি ফিরিয়ে দিতে দিতে কটার্ডকে বলল। 

কটার্ড আকস্মিকভাবে কারের দরজা আঁকড়ে ধরল এবং রাগান্বিত ও আবেগী কন্ঠে বললঃ 

“একটা ভূমিকম্প! বিশাল ভূমিকম্প!” 

কিন্তু কোন ভূমিকম্প হল না। পরের কয়েকদিন রিও শহরের প্রতিটি কোণায় গাড়ি চালিয়ে গেল এবং অসুস্থ রোগী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের সাথে বাক্যালাপ ও বিতর্ক করল। কখনই নিজের পেশাকে এত ভারী বলে মনে হয়নি ইতিপূর্বে তার কাছে। রোগীরা সব সময়েই তার কাজকে সহজ করতে সাহায্য ও খুশীমনে নিজেদেরকে তার হাতে সমর্পন করত। এই প্রথম ডাক্তার অনুভব করল যে, তারা তাকে এড়িয়ে চলছে। রোগে আক্রান্ত হবার পরেও তারা তার প্রতি শত্রুতামূলক মনোভাব পোষণ করছে। এটা ছিল রিও’র জন্যে সম্পূর্ণই নতুন ধরণের সংগ্রাম, যার সাথে সে ইতিপূর্বে পরিচিত ছিল না। ফলে, সেদিন রাত দশটার দিকে সর্বশেষ যখন সে তার পুরনো এজমা রোগীকে দেখার জন্যে তার বাড়ির সামনে পৌঁছাল, তখন নিজেকে খুবই পরিশ্রান্ত মনে হচ্ছিল। এমনকি গাড়ির আসন থেকে নিজেকে টেনে তুলতেও তার কষ্ট হচ্ছিল। আসন থেকে উঠার পূর্বে কিছুক্ষণ গড়িমসি করল সে। অতঃপর অন্ধকার সড়কের দিকে তাকাল, যেখানে রাত্রির অন্ধকারে তারারা আসা-যাওয়া করছিল। 

রিও কক্ষে প্রবেশ করার পর বৃদ্ধ লোকটি বিছানায় উঠে বসল এবং শুকনো মটরশুঁটির দানা গুনে গুনে এক পাত্র থেকে অন্য পাত্রে রাখতে লাগল, যা সে সকল সময়েই করে থাকে। ডাক্তারকে দেখে সে উপরের দিকে তাকাল, আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে। 

“ডাক্তার, এটা কলেরা, তাই নয় কি?” 

“কে তোমাকে বলেছে?” 

“পত্রিকায় এসেছে। এমনকি রেডিওতেও বলেছে।“ 

“সঠিক বলেনি। এটা কলেরা নয়।“ 

বৃদ্ধ লোকটি উত্তেজিতভাবে হাসল। “নিশ্চয়ই তাহলে বড় লোকেরা বিষয়টিকে অতিরঞ্জন করছে। তারা খুবই ভয় পেয়েছে, তাই নয় কি?” 

“তুমি কখনই এসব কথাবার্তা বিশ্বাস করবে না,” ডাক্তার বলল। 

বৃদ্ধলোকটিকে পরীক্ষা শেষ করার পর সে লোকটির ডাইনিং কক্ষের মাঝখানে গিয়ে দাঁড়াল। সে নিজেও এখন ভীত। এই উপশহরেই অন্তত আট থেকে দশজন রোগী বাগী বা ফোঁড়া নিয়ে রিও’র পরিদর্শনের অপেক্ষা করছে। এগুলোর মধ্যে মাত্র দুই তিনটা কেইস সে অস্ত্রোপচার করে উন্নতি ঘটাতে পেরেছে। সুতরাং এদেরকে হাসপাতালে প্রেরণ করতে হবে। তবে রোগীদের কেউই হাসপাতাল সম্পর্কে ভাল ধারণা পোষণ করে না। 

“আমি চাই না হাসপাতালে তারা তার উপরে পরীক্ষা বা গবেষণা করুক,” রোগীদের একজনের স্ত্রী তাকে বলল। 

তবে রোগীকে নিয়ে সেখানে আসলেই কোন গবেষণা হবে না; সে শুধু মৃত্যুবরণ করবে সেখানে। কারণ, রোগীদেরকে নিয়ে কি করা হবে সে সম্পর্কে প্রচলিত ব্যবস্থাদি যে খুবই অপ্রতুল তা দিবালোকের মত স্পষ্ট। ‘বিশেষ সরঞ্জামাদি দিয়ে সজ্জিত’ হাসপাতালগুলো সম্পর্কেও তার সম্যক ধারণা আছে। হাসপাতালের বহির্বিভাগের দুটো বিল্ডিং হতে রোগী সরিয়ে সেগুলোর জানালাগুলোকে নিশ্ছিদ্রভাবে বন্ধ করে দিয়ে প্রাচীর দিয়ে পৃথক করা হয়েছে। এবং একমাত্র ভরসা তাদের যে, মহামারীটি আপনা হতেই নিঃশেষ হয়ে যাবে। 

বাস্তবে কর্তৃপক্ষ কর্তৃক গৃহীত ব্যবস্থাদি রোগকে প্রতিহত করার জন্যে আদৌ যথেষ্ট নয়। তবে সরকারী ঘোষণাপত্রে সেগুলো সম্পর্কে ইতিবাচক প্রচারণা করা হচ্ছে। পরেরদিন নগরকাউন্সিল হতে ঘোষণা করা হল যে, স্থানীয় কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রণীত নীতিমালা সাধারণ অনুমোদন লাভ করেছে এবং ইতিমধ্যেই ত্রিশ জন রোগী হাসপাতালে আগমন করেছে। ক্যাসেল রিও’কে রিং করল। 

“বিশেষ ওয়ার্ডে মোট কয়টা বেড আছে?” 

“আশিটি।“ 

“শহরের রোগীর সংখ্যা নিশ্চয়ই ত্রিশ থেকে অনেক বেশী? 

“অবশ্যই। সেই সাথে ভুলে যেয়ো না যে, দুই ধরণের রোগী আছেঃ একদল আছে যারা ভীত, এবং অন্যদল আছে যারা এদের চেয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও ভীত হবার সময় নেই তাদের।“ 

“তারা কি মৃতদেরকে সমাহিত করার ব্যবস্থা করছে?” 

“না, আমি রিচার্ডকে বলেছি যে, শুধু কথাই যথেষ্ট নয়, রোগের বিরুদ্ধে কার্যকরী প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। নতুবা কিছুই করার দরকার নেই।“ 

“কি বলল সে?” 

“কিছুই করছে না সে। তার কোন ক্ষমতাই নেই। আমার মতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।“ 

বাস্তবেও তাই হল। তিনদিনের মধ্যে দুটো ওয়ার্ডই পরিপূর্ণ হয়ে গেল। রিচার্ডের দেয়া তথ্য অনুযায়ী একটা স্কুলকে রিকুইজিশন করার করার আলোচনা চলছিল, যেখানে একটি সহযোগী হাসপাতাল স্থাপন করা হবে। এই সময়কালে রিও বাগীগুলোকে অপারেশন করে চলছিল এবং এন্টি-প্লেগ সিরামের জন্যে অপেক্ষা করছিল। ক্যাসেল পাবলিক লাইব্রেরীতে গিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা পুরনো বইপুস্তকগুলোকে পাঠ করছিল। 

“ইঁদুরগুলো সব প্লেগরোগে মারা গেছে,” এটাই ছিল ক্যাসেলের উপসংহার, “অথবা সেই ধরণের গুরুতর কোন রোগে। সেগুলো শহরে হাজার হাজার মাছি ছড়িয়েছে, যা আক্রান্তের সংখ্যাকে জ্যামিতিক হারে বাড়িয়ে দেবে, যদি যথাসময়ে সেগুলোকে ধ্বংস না করা যায়।“ 

রিও কিছুই বলল না। এই সময়ে আবহাওয়া পরিষ্কার হওয়া শুরু করল। রৌদ্রের প্রখর উত্তাপে সাম্প্রতিক বৃষ্টিতে সৃষ্টি হওয়া ডোবাগুলো শুকিয়ে গেল। প্রতিদিন সকালে নির্মেঘ নীলাকাশ সোনালী আলোতে ভরে যেতে লাগল। প্রান্তরগুলো ক্রমবর্ধমান তাপে উত্তপ্ত হতে লাগল। পৃথিবীর সবকিছুকেই মনে হতে লাগল সুন্দরভাবে এগিয়ে চলছে। তারপরেও অবাক গতিতে জ্বরের সংখ্যা বাড়তে লাগল। ষোলটি মৃত্যু, চব্বিশটি, আটাশটি, বত্রিশটি - এভাবে বাড়তে লাগল প্রতিদিন। 

চতুর্থদিনে প্রাইমারী স্কুল প্রাঙ্গণে সহযোগী হাসপাতাল স্থাপনের বিষয়টি সরকারীভাবে ঘোষণা করা হল। স্থানীয় জনগণ যারা এতদিন যাবত রসিক ধরণের মন্তব্য দিয়ে নিজেদের উদ্বিগ্নতাকে গোপন করার চেষ্টা করছিল, তাদেরকে দেখা গেল নির্বাক হয়ে গেছে। 

রিও নগরপ্রধানকে টেলিফোন করার সিদ্ধান্ত নিল। 

“রোগ প্রতিরোধের জন্যে যে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে, সেগুলো প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্টই অপ্রতুল।“ 

“হ্যা,” নগরপ্রধান উত্তর করলেন, “আমি পরিসংখ্যান দেখেছি, বলতে পার সেগুলো খুবই দুশ্চিন্তা সৃষ্টিকারী।“ 

“দুশ্চিন্তা সৃষ্টি করার চেয়েও উদ্বেগজনক; সেগুলো আসলে উপসংহার মুলক।“ 

“আমি সরকারকে বলব এ বিষয়ে দ্রুত আদেশজারী করতে।“ 

পরবর্তীতে রিও যখন ক্যাসেলের সাথে দেখা করল, নগরপ্রধানের মন্তব্য তখনও তাকে পীড়া দিচ্ছিল। 

“আদেশজারী?” ক্যাসেল ঘৃণাপূর্ণভাবে উচ্চারণ করল। “কখন কি দরকার তার জন্যে প্রয়োজন কল্পনাশক্তির, যা তাদের নেই।সিরাম সম্পর্কে কোন খবর আছে?” 

“ওটা এ সপ্তাহেই আসবে।“ 

নগরপ্রধান রিচার্ডের মাধ্যমে রিও’কে কেন্দ্রীয় প্রশাসনের আদেশজারীর জন্যে একটি প্রস্তাবনা তৈরী করতে বললেন। সেটাতে রিও ক্লিনিক্যাল ডায়াগনোসিস এবং মহামারীর পরিসংখ্যান অন্তর্ভূক্ত ও চল্লিশটি মৃত্যুর কথা উল্লেখ করল। 

নগরপ্রধান কঠোর নীতি প্রণয়ন করে (তার বক্তব্য অনুযায়ী) দায়িত্ব গ্রহণ করলেন। সব ধরণের জ্বর সম্পর্কে কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা এবং রোগীদেরকে পৃথিকীকরন করা বাধ্যতামূলক করা হল। রোগাক্রান্ত ব্যক্তিদের বাসস্থানগুলোকে বন্ধ করে দিয়ে সেগুলোকে জীবাণুমুক্ত করার এবং একই বাসস্থানে বসবাসকারী ব্যক্তিদেরকে কোয়ারেন্টাইনে রাখতে নির্দেশ দেয়া হল। মৃতদেরকে সমাধিস্থ করার দায়িত্ব স্থানীয় কর্তৃপক্ষের উপরে ন্যস্ত করা হল এবং বলা হল যে, এ সম্পর্কে পরবর্তীতে বিস্তারিত নির্দেশ প্রদান করা হবে। 

পরেরদিন বিমানযোগে সিরাম আসল। তাৎক্ষণিক প্রয়োজন পূরণ করার জন্যে যথেষ্ট হলেও, মহামারী বিস্তৃত হলে তা যথেষ্ট ছিল না। রিও’র টেলিগ্রামের উত্তরে জানানো হল যে, ইমার্জেন্সী রিজার্ভ শেষ হয়ে গেছে, তবে নতুন সরবরাহের জন্যে প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। 

এরই মধ্যে দুরবর্তী জেলাগুলো হতে বসন্তকাল শহরের দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। হাজার হাজার ঝুড়ি ভর্তি করে গোলাপ ফুল নিয়ে ফুলিবিক্রেতারা বাজারে ও মহাসড়কে ভিড় করতে লাগল। বিতৃষ্ণাকর ফুলের গন্ধে বাতাস ভারী হয়ে গেল। আপাতভাবে এই বসন্তও ছিল পূর্বের অন্যান্য বসন্তের মতই। 

রাস্তার গাড়িগুলো ব্যস্তসময়ে সারাক্ষণই ভর্তি এবং অন্যসময়ে অপরিচ্ছন্ন ও খালি থাকত। ত্যারিও সেই ক্ষুদ্র বৃদ্ধলোকটিকে পুনরায় নিরীক্ষা এবং সেও বিড়ালগুলোর দিকে থুথু নিক্ষেপ করতে লাগল। গ্র্যান্ড পূর্বের মতই প্রতি বিকেলে ঘরে ফিরে তার রহস্যময় সাহিত্য কর্মকান্ড চালাতে লাগল। কটার্ড পূর্বের মত সচরাচর রুক্ষ আচরণ করতে লাগল। ম্যাজিস্ট্রেট মিস্টার ওথোন তার খোঁয়াড়ে বিভিন্ন লোকদের প্রদর্শন করতে লাগল। বৃদ্ধ স্পেনীয় লোকটি শুষ্ক মটরশুটির দানা এক পাত্র হতে অন্য পাত্রে স্থানান্তর করতে থাকল। এবং কখনও কখনও র‍্যাম্বার্টকে দেখা গেল নিবিড় দৃষ্টিতে কোনকিছুর দিকে তাকিয়ে আছে। বিকেলের বিকেল রাস্তা পূর্বের মত জনাকীর্ণ হল এবং সিনেমাহলের বাইরে দীর্ঘ অপেক্ষার সারি দেখা গেল। 

সবচেয়ে বড় কথা হল মহামারীকে মনে হল আস্তে আস্তে কমে যাচ্ছে। কোন কোন দিন মাত্র দশ বা এরকমের আক্রান্ত সংখ্যা প্রতিবেদিত হল। তারপর আকস্মিকভাবে পুনরায় এই সংখ্যা উলম্বভাবে উপরে উঠে গেল, এবং মৃত্যু সংখ্যা ত্রিশকে স্পর্শ করল। 

নগরপ্রধান একদিন ‘অবশেষে তারা শঙ্কিত হয়েছে’ এমন মন্তব্য করে ডাক্তার রিও’কে একটি টেলিগ্রাম হস্তান্তর করলেন। টেলিগ্রামটিতে লেখা ছিলঃ 

“প্লেগের জরুরী অবস্থা জারী করুন এবং শহরকে বন্ধ করে দিন।“





--------------------------
(প্রথম খন্ডের সমাপ্তি) 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন