বুধবার, ৩ জুন, ২০২০

জেনিফার জর্ডন'এর গল্প : ঘরণী

অনুবাদ : তৃপ্তি সান্ত্রা

(লেখক পরিচিতি :
কৃষ্ণ-আমেরিকান লেখক জেফার জর্ডন জর্জিয়াতে জন্মগ্রহণ করেছেন ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে। বেড়ে উঠেছেন আলাবামাতে। হাওয়ার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক।)

আজ রাতে ভদ্রলোকের নাক ডাকছে খুব জোরে। বিরক্তিকর। নাক ডাকার আওয়াজ তাকে কীভাবে পটিয়েছিল ভেবে অবাক হতে হয়। স্মৃতি কাতর হয়ে সে কখনও বিভ্রান্ত—কীভাবে যে হয়েছিল ব্যাপারটা! বিরহের দীর্ঘ খরা পেরিয়ে যখন খানিক বিরক্তি আর সকৃতজ্ঞ মুক্তির স্বাদ নিয়ে ভালোবাসাবাসি হয়েছে, নাসিকা গর্জন তখন রীতিমতো আরামদায়ক ছিল। ছোটো ছোটো ঢেউয়ের ওঠা নামার শব্দ শুনতে শুনতে এবং সেই গুড়গুড় শব্দকে ধরে রেখে, যেন সেটা একটা জীবনদায়ী খড়কুটো- তাদের দুজনকে একসঙ্গে বেঁধে রেখেছে, মাথা জলের ওপর রাখতে সাহায্য করছে এই রকম ভাবতে ভাবতে সে ঘুমিয়ে পড়তো।

কিন্তু আজকের রাতটা মোটেও মধুরাত্রি নয়। সে প্রচুর মদ খেয়েছে। উপুড় হয়ে স্থির ভাবে মড়া মানুষের মতো শুয়ে আছে। পুরো বিছানা দখল করে রেখেছে ছড়ানো পা। জোরে নাক না ডাকলে, লোকটার নীথরতা দেখে, হার্টের স্পন্দন দেখার জন্য ব্যস্ত হতে হত। কিন্তু সে বেশ জোরে নাক ডাকছে। অনেকক্ষণ ধরে এর শব্দটা অনেকটা খুব ঠাণ্ডা সকালে পুরনো গাড়ির কিছুতেই স্টার্ট নিতে না চাওয়া ঘেনঘেনে শব্দের মতো মনে হয়। বা মনে হয় তার গালিচা পরিষ্কারের যন্ত্র হুবেরের মতো — প্রাচ্যের গালিচার ওপর যে থাবা বসিয়েছে। শব্দটা শুনে তার গা গুলিয়ে ওঠে। সে পুরুষটির খুব সংবেদনশীল অঙ্গে আঘাত করতে চাইল বা খুব পরিপার্টি করে তা দেওয়া গোঁফের থেকে একগাছি চুল ছিঁড়ে নিতে চাইল।

বড় সড় পালঙ্কের প্রায় এক তৃতীয়াংশ জুড়ে ছড়িয়ে থাকা হাল্কা কম্বলটি বউটির চিবুক প্রায় ঢেকে ফেলেছে – সে হাল্কা কম্বলটি সরাল। মাসটা জুলাই, বাইরে তীব্র গরম। কিন্তু জোনাথন, তার স্বামী বরফ-ঠাণ্ডা ঘরে ঘুমোতে ভালোবাসে। যদিও প্রতি মাসেই ইলেকট্রিক বিল সৌভাগ্যজনক, ঠাণ্ডা তাকে প্রায় জাগিয়ে রাখে, কিন্তু সে অনেক দিন আগেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে থার্মোস্ট্যাটের সেটিং নিয়ে তর্ক করার চাইতে কম্বল ব্যবহার করা ভালো।

যুবক বেলা থেকেই, জোনাথন নিজের মতোই চলেছে। হাওয়ার্ড ল স্কুলে যখন ছাত্র, মেয়েটির সাথে দেখা হয়। মাউন্ট প্লেজেন্ট স্ট্রিটের একটা প্রাচীন দোকানের ওপর এক কামরার কিচেন-কাম ড্রয়িং-কাম বেডরুম কামরায় সে থাকত, উচ্চশিক্ষার জন্য কৃচ্ছতারত মধ্যবিত্ত শ্রেণির গ্র্যাজুয়েট ছাত্ররা যেমন থাকে। জোনাথন সেখানে স্বচ্ছন্দ্য ছিল। সস্তা মদ খেয়ে আলাপ চালাতো, হিস্পানিক পড়শিদের সাথে দু-একটা স্প্যানিশ শব্দে আলাপ সারতো, আরশোলাদের সইয়ে নিত। বাউন্ডুলে জীবন সম্বন্ধে এই ছিল তাঁর ধারণা।

মার্তা, জোনাথনের মতোই মধ্যবিত্ত শ্রেণির কিন্তু আদতে দক্ষিণ ক্যারোলিনার গ্রামের মেয়ে হওয়ার জন্য এই পরিবেশে খাপ খাওয়াতে পারত না। মাতালদের মহল্লায় সে সবসময় নার্ভাস থাকতো, তাদের দুর্বোধ্য কথাবার্তা চিৎকারকে তার মনে হতো অশ্লীল কিছু বলছে। উত্তরপূর্বের প্রতিবেশীদের সে বেশি পছন্দ করতো। চার্চে এক কাথবার্ট দম্পতির সাথে আলাপের সূত্রে সে তাঁদের বাড়ির তলার দিকে একটি ঘর ভাড়া নেয়। মিস্টার কাথবার্ট ছিলেন সেই রকম বয়স্ক মানুষদের মতো একজন যারা অল্প বয়সী তরুণীদের খোলা মাংসল হাতে চাপড় মারতে ভালোবাসে, কামপ্রবৃত্তিতে অথবা পিতৃস্নেহে। কোনটা ঠিক তার মতো বয়সে বলা শক্ত। মিসেস কাথবার্ট নিজেকে বিখ্যাত প্রাচীন ওয়াশিংটন পরিবারের দেশি ভদ্রলোক গোষ্ঠীর বলে দাবি করতেন। নীচু ঘরে বিয়ে হয়েছে মনে করে তার মেজাজ ছিল তিরিক্ষি।

মিলনবেলার দ্বিতীয় দিনে মার্তা, জোনাথনের ঘরে যায় তাকে তুলতে। জোনাথনের দশ বছরের পুরনো Triumph আবার দোকানে। জোনাথনের অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিংয়ের কোনও ইন্টারকম ব্যবস্থা না থাকায় মার্তা নীচুতলায় নিজের অবস্থান জানাবার জন্য বেল বাজাতে থাকে। তার শেভ্রলে মালিবুর জোরদার ভেঁপু তাঁকে আত্ম-প্রত্যয়ী করে তোলে। যদিও নর্থ ক্যারোলিনা বার-বি-বিউ এর সামনের ঝুলতে থাকা লোকেরা বাজনার তালে অঙ্গভঙ্গি করার সুযোগ একবারের জন্যও ছাড়েনি। সঙ্গে সঙ্গে নিজের পোশাক নিয়ে অনিশ্চিত হয়ে পড়ে মার্তা। স্কুলের দিদিমণির মতো আর Cheraw, দক্ষিণ ক্যারোলিনার শিক্ষকদের মেয়েদের মতো লাগছিল তাকে-- আসলে সে তো তাই। উঁচু হিল; ছোটো টাইট স্কার্ট, একগাছি মুক্তোর মালা পরা একটু ছোটো চুলের জ্যাকি কেনেডির সংস্করণ। সে জানতো এই সাজ খুবই যত্ন নিয়ে করা, অবশ্যই কোনও চলতি হাওয়ার ফ্যাশনপন্থী এরকম করবে না। অবশ্য সেই বাইশ বছর বয়সেই সে জানতো, সে চলতি হাওয়ার পন্থী নয়।

জোনাথন বিল্ডিং-এর বন্ধ তালা খুলেছিল। ভেতরে বোতাম দেওয়া একটি গোলাপি রঙের শার্ট পরেছিল ধূসর রঙের জিনস আর জুতো। কুড়ি বছর আগে এমনই রেওয়াজ ছিল, সে কোনও জুতো পরেনি। তক্ষুণি মার্তা তার নিজের অতিসতর্ক আবির্ভাবের জন্য কৈফিয়ত দেবার প্রয়োজন অনুভব করে। সে অতিরিক্ত শোভনতা বা শালীনতার মোড়কে থাকতে চায় না।

‘ওপরে চল’, জোনাথন বলে, যেন সে নিজের ছোট্ট ঘরে যাবার জন্য মার্তাকে সামনে রেখে তিন ধাপ পেরোতে চাইছে।

‘পরের ধাপে তৃতীয় পদক্ষেপে নজর রাখবে। কার্পেটটা ছেঁড়া। শেষবার সেই মেয়েটা উঁচু জুতো পরে তাড়াহুড়ো করে ওঠার সময় আমার ওপর গড়িয়ে পড়েছিল’ – কাষ্ঠ হাসি হেসে সে বলল। ‘সেও বেশ নাদুস নুদুস সুন্দরী। আমার তো মনে হয়েছিল ম্যাকট্রাকের সাথে ধাক্কা খেলাম জোর।’

মার্তা হাসলেও অবাক হয়ে ভাবছিল রোজ কতজন মেয়ে এই সিঁড়িতে চড়ে। তার মনে হচ্ছিল জন হয়তো খুব ভালোলাগা নিয়ে তার পা আর পশ্চাৎ দেশ দেখছে কারণ মার্তা মাত্র কয়েক ইঞ্চি আগে রয়েছে। এই ভাবনা তাকে স্নায়ুচাপে পীড়িত করতে থাকে। জনের উপস্থিতিতে তার সবসময় মনে হয় তাকে যেন পরীক্ষা করা হচ্ছে আর কামনা করা হচ্ছে।

জন অবশ্যই তাকে মুগ্ধ করার জন্য সচেতন ছিল না। তার ঘরটা ছিল একটা মূর্তিমান বিশৃঙ্খলা। সিঙ্কে নোংরা বাসন। লোকজনের ওপর স্বাভাবিক অশ্রদ্ধা নিয়েই ওয়াশিংটনের আক্রমণাত্মক আরশোলাদের একজন দেখা দেয়। জন মোটেও বিব্রত নয়। সে মারতেও চাইল না আরশোলাকে। যে মার্তা, D.C তে এসেছিল এই ভেবে যে অনামী আর তুচ্ছদের বাড়িতে আরশোলা থাকে সেই মার্তাই সেই আরশোলাকে পিষে ফেলার একটা তাগিদ অনুভব করেছিল।

‘তোমার গ্রীক খাবার পছন্দ?’ জন জানতে চায়।

‘জানি না-- আমি কখনও খাইনি।’

মার্তা আরো একটু যোগ করে বলতে পারতো, বিচ্ছিন্ন দক্ষিণ ক্যারোলিনার অধিকাংশ কালো মানুষ মনে করে পিজ্জা একটা বিদেশী থালা।

‘অন্য কোথাও যাবে? চাইনিজ খেলে কেমন হয়? ইতালিয়ান? এই নতুন গ্রীক রেস্তোঁরা ‘তাভার্নায়’ (Tavernas) ভেড়ার ঠ্যাং আর বাকলাভা পাওয়া যায়, কিন্তু আমাদের ওখানে যাওয়ার দরকার নেই।’

গ্রীক খাবার তার কাছে গ্রীক খাবার। আর ইতালিয়ান খাবার সমস্যাজনক। স্প্যাগোটির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা থাকা সত্ত্বেও মার্তার ধারণা ব্লাউজের ওপর কিছু না পরলে সে খাবার সামলাতে পারবে না।

সাহস এনে সে বলল, ‘চাইনিজ ভালো হতে পারে’। জনকে হতাশ দেখালো এমন কী খানিকটা বিরক্তও। তার মনে গেঁথে আছে গ্রীক। মার্তা কে, তাকে প্রত্যাখ্যান করার?

‘অবশ্যই, গ্রীক খাবার খেতে ভালোই লাগবে; আমি সব সময়ই নতুনত্বের পিয়াসী’ তাৎক্ষণিক তৃপ্তিতে ছেয়ে গেল জনের মুখ ‘আহা গ্রীক’! মার্তা নিজেকে যথেষ্ট ভালো গাড়ি চালক হিসেবে মনে করে কিন্তু জন নিজে গাড়ি চালাবার জন্য জোর করতে লাগল। জন একবার মাত্র তার ক্যানারি হলুদ Malibu ছুঁতে দিল। জনের প্রতিক্রিয়া ছিল কিছুটা ঘৃণার। আমেরিকার গাড়ি ভালো। কিন্তু মোটেও টেঁকসই নয়’, বলে ‘এখন গাড়ি হচ্ছে ‘BMW’র।’ ‘BMW’ সম্বন্ধে মার্তা খুব জানত না। সে যেখান থেকে এসেছে লোকে বুইকআর ক্যাডিলাকের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। গাড়ি সম্বন্ধে নিজের কম জ্ঞান নিয়ে দুঃখ থাকলেও তার মনে হল যে শেভ্রলে দৌঁড়ায় সে, যে ট্রাম্প দৌড়ায় না তার চেয়ে অনেক বেশি বাঞ্ছনীয়।

আচ্ছা এক্লিসিয়াসটিজের এর কবিতাটা যেন কী! মরা সিংহর চেয়ে জ্যান্ত কুকুর অনেক ভালো, এই রকমই কিছু একটা। অশ্রদ্ধা অস্থায়ী। সে প্রতিজ্ঞা করল বিদেশি গাড়ি সম্বন্ধে জানবে। ‘Taverna’-র ডিনার সফল। শুরু থেকেই এই যে লোকটা গ্রীক ওয়েটারদের মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখল, জানে কি খাবারের অর্ডার করতে হবে আর নিজের স্বজ্ঞায় মার্তার ভয়কে নিরসন করে বলল যে সে সেখানে যায়, সেখানেরই হয়ে যায় – মার্তা বিশ্বাস করতে শুরু করল, সে লোকটার প্রেমে পড়েছে। তাকে মনে হয় বিশ্বপরিব্রাজক যদিও সে বড় হয়েছে দক্ষিণ ক্যারোলিনার মতো নিয়ন্ত্রিত এবং বর্ণবাদী ওয়াশিংটনে। মিসেস কাথবার্ট মার্তাকে বলেছে, এমন সময় ছিল, যখন ঝাড়ু হাতে না থাকলে, কালো মানুষরা ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে যেতে পারত না, কিন্তু মার্তার মতো জোনাথনের সাদাদের নিয়ে ভয় ছিল না। তার মনে হত সে যা চায়, তার সব কিছু নিয়েই পৃথিবী তাকে ঋণ দিতে বসে রয়েছে।

মার্তার, জনের মতো উচ্চাশা ছিল না। খ্যাতি বা সৌভাগ্যের প্রত্যাশী ছিল না সে। কিন্তু সে জানতো চেরা (Cheraw), সাউথ ক্যারোলিনা এমনকী উত্তরপশ্চিম ওয়াশিংটনের নিছক সাদামাটা দায়িত্ব এবং গোদা নিষেধাজ্ঞার বাইরেও আরো কিছু আছে।

১৯৫০ সালে পেপসী বাণিজ্যিক রোমান্টিক উপন্যাস ‘ফাদার নোজ বেস্ট’ (‘Father Knows Best’) পড়ে মার্তা পারিবারিক ভবিষ্যৎ নিয়ে একটা স্বপ্ন রচনা করেছিল – সেখানে সে হবে সৎ এবং প্রিয়। তার বাড়ির জোট অটুট, ভেঙে পড়ে না। স্বামী ভালোবাসে। ছেলেমেয়েরা অসম্মান করে না। সমস্ত বিল সময়ে মিটিয়ে দেওয়া হয়। একই সঙ্গে সে প্যারিসে বেড়ানোর, আর সপ্তাহ শেষে ভার্জিনিয়ার শিকার দেশের রোমান্টিক সরাইখানায় যাবার স্বপ্ন দেখতো। সে তখনও স্থির করতে পারেনি যে জোনাথন তাকে এই জিনিসগুলো দিতে পারবে কিন্তু সে বিশ্বাস করেছিল যে সে সেইরকম একটা মানুষ যে এই জীবনের রাস্তাটা বোঝে। যদি লোকটা তার হয় এই ভেবে মার্তা তার কাছে আসতে চেয়েছিল।

এমন নয় যে নিজেকে অপদার্থ মনে করে। নিজের অজ্ঞতা সত্ত্বেও সে জানতো, সে বুদ্ধিমতী, সুন্দরী নয় তবে গলি ঘুপচি থেকে ছেলেছোকরাদের কাছে আওয়াজ খাওয়ার মতো যথেষ্ট সুশ্রী। তার উপর তার ছিল সেইরকম বিশ্বস্ততা যা সাধারণত ছোটো শিশু এবং বড় কুকুরদের মধ্যে দেখা যায়। সে আশা করেছিল তার এইসব কিছু একটা জোনাথন কামনা করবে।

খাওয়ার পর মার্তা জোনাথনের সিঁড়িতে উঠল আর সকালের আগে নামতে পারল না। ঘরের পেছনে একটা জোড়াখাট যা সোফার কাজ করে, সেটাই একমাত্র স্থান যা তাদের দুজনকে জায়গা দিতে পারে। বাতানুকুল ব্যবস্থা না থাকার জন্য ক্ষমা চেয়ে জোনাথন একটা জানালা খুলে একটা ফ্যান চালিয়ে দিল। রাস্তার কোলাহলের সঙ্গে মিশে গেল পাখার সম্মোহিত গুঞ্জন ধ্বনি। দূরে কারো ঘর থেকে ভেসে এলো লাতিন আমেরিকার সালসা বাজনার শব্দ। ‘একটু বোসো, আমি এক গ্লাস মদ নিয়ে নিই’ জোনাথন বলল। আদেশ। অনুরোধ নয়।

মার্তা তার চোখে খুঁজছিল একটা চিহ্ন যা মোহাবিষ্ট করে প্রলোভিত করে। কালো মুখে জনের দারুচিনি রঙের চোখ দুটো ছিল চমকপ্রদ। সে দুটি বন্ধুত্বপূর্ণ কিন্তু শীতল। তার উদাসীন ভানে মার্তা একটু হতাশ হল।

তার দুটো পানপাত্রের একটিতে সে মার্তাকে গোলাপি রঙের বুদ্ধুদের কী একটা পানীয় দিল মার্তা চিনতে পারল না।

‘আমি জানি না তুমি সাদা না লাল মদ ভালোবাস। ল্যান্সারের Lancer-এর একটা বোতল খুলেছি, মনে হল ঝিলিমিলি গোলাপ একটা চমৎকার সমঝোতা। এই সুন্দর সন্ধ্যাকে মনে রাখার জন্য গরিব মানুষের শ্যাম্পেন।’

মার্তা গ্লাসের তরল নিরীক্ষণ করল। ভাবছিল তাকে সে মাতাল করার চেষ্টা করছে কী না। দক্ষিণ ক্যারোলিনা-র সব কালোরা অধিকাংশই বিয়ার বা রাম আর কোক খায়। সে দুজন মেয়েকে জানতো যারা রোজ খায়, একটা চার্লসটনের বুনো ঘিচি মেয়ে আর একজন নিউইয়র্কের সাংস্কৃতিক আঘাত সহ্য করতে না পেরে উত্তরে ফিরে গেছে। মার্তা আর তার মেয়ে বন্ধুকে প্রায়ই সৌভ্রার্ত পার্টিতে যেতে হয় এবং সেখানে সে বাধ্যতামূলক একটা বিয়ার খায়। চার্চে প্রথম রবিবার সে আঙুল সাইজের গ্লাসে মদ খায়। আর তুমি যদি হও ওমেগা বা কাপ্পা তুমি রিপল এবং থানডারবার্ডের বিধ্বংসী ক্ষমতা নিয়ে বড়াই করতে পার। মার্তা এক ঢোঁক খেলো যেন ভালোই লেগেছে তার কিন্তু মনস্থির করল এই এক গ্লাসেই সেই সন্ধ্যাটা কাটাবে। কখন চুমু খাবে তাকে – অবাক হচ্ছিল সে।

জোনাথন তখনও তার সঙ্গে বসেনি। হাতে গ্লাস নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল সে, তার পুরুষালি শরীর শান্ত কিন্তু পাকাপাকি ভাবে ভারসাম্য রেখেছে তার উপর।

যখন সে গতি নিল, খুব ধীর, অলস ভাবে স্বচ্ছন্দ। খানিকটা ফুটবল খেলার মাঠে প্রায় অর্ধেক বিরোধী দলকে দুরমুশ করে গাদাগাদি করে বাড়ি ফিরে আসা ল্যারি জোন্সের মতো। জোনাথন তার সামনে পেছন ফিরে দাঁড়িয়ে ছিল। যেন জুরির সামনে বয়ানে আরো কিছু যোগ করছে।

জন বিছানায় মার্তার পাশে বসে যে হাতে মদের গ্লাস নেই সেই হাতটা ধরল। মার্তা মদের গ্লাস নামিয়ে রেখে স্থির হয়ে ছিল দৃঢ় আলিঙ্গন এবং অনুভবের জন্য। বদলে সে মার্তার হাতটা তুলল, হালকা ভাবে তার গোঁফ আর ঠোঁট দিয়ে হাতের তালুটা ঘষে দিল। এই অঙ্গভঙ্গিতে তক্ষুণি মার্তার ভেতর উদ্বেগ জাগাতে পারল। সে, জোনাথনের সব চুমুকে আর হাত বোলানোকে ছাড় দিতে ইচ্ছুক এমন কী ধীরেসুস্থে পোশাক খুলে নেবার দক্ষতাতেও। কিন্তু এত তাড়াতাড়ি সব দিতে সে চাইছিল না যদিও প্রথাগত ভাবে সে কুমারি নয়। স্টেটে জুনিয়র থাকা কালীন সে একজন বাস্কেটবল খেলোয়াড়ের সঙ্গী হয় নিতান্ত কৌতূহল বসে। আবেগ ততটা ছিল না। কিন্তু রুণির কথাবার্তা ছিল তার গেল ম্যাচের হাইলাইট সংক্রান্ত সুতরাং মার্তা আর দ্বিতীয়বার ওর সাথে শোয়নি।

সে জিনিয়াস বা লক্ষপতির খোঁজ করেনি। চেয়েছিল এমন একজন মানুষ যে অনেক কিছু জানে, যা সে জানে না, যে ভয় পায় না। এই রকম একটা মানুষের অপেক্ষায় ছিল সে। সে জীবনটা উপভোগ করতে চেয়েছিল, সে এতো ভীতু যে একা সম্ভব ছিল না। সে রাত্রে সরু বিছানায় জোনাথন যা করেছিল মার্তার বলার কথা হ্যাঁ আমি রাজি কিন্তু অন্য যা কিছু সে চায় সে সব কথা ভেবেছিল : ভেবেছিল মায়ের সতর্ক বাণী, খুব সস্তা হয়ে গেলে, ছেলেরা বিয়ে করে না। যতক্ষণ না সে জানছে লোকটা সঠিক, তার উত্তর হবে না।

প্রত্যাখ্যানের উত্তরে সে রাগ, অন্তত দীর্ঘস্থায়ী গোমড়া মুখ আশা করেছিল। অনেকদিন আগে নিজের জামা কাপড় খুলে মার্তার সঙ্কল্প পরীক্ষার জন্য জন তাকে কয়েকটি দীর্ঘ চুম্বন দিয়ে তক্ষুণি ঘুমোতে চলে গেছিল। কীভাবে উঠে চলে যেতে হবে তা ঠিক না জানতে পেরে জানলা দিয়ে পালাবার সাহস অর্জন করতে না পেরে আর মাউন্ট প্লেসান্ট স্ট্রিটের ধর্ষকদের ভয়ে মার্তা সারা রাত ধরে অপেক্ষা করল। পাখার হাওয়ায় তখন আরাম নেই। ঠাণ্ডা। কিন্তু সে ভাবেনি যে এই জায়গাটি থেকে কেটে পড়তে হবে। সামান্য নাকডাকা শুনে এবং রাস্তার আলোর সামান্য আভায় দীর্ঘক্ষণ তার মুখ দেখে, মার্তার সাহস হল না তাকে ডাকার।

পরদিন সকালে ভার মাথা এবং মাথার যন্ত্রণা। কোঁচকানো পোশাক পরে মার্তা সোজা উত্তরপূর্ব ডি.সি.তে ফিরে এলো। তাড়াহুড়ো করে পাশের দরজা দিয়ে ঢোকার সময় মিসেস কাথবার্ট এর কৌতূহলী চোখের সামনে পড়ে গেল সে, দরজা খুলে তিনি ‘দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট’ কুড়োচ্ছিলেন।

মনলোভা খাবারের অনুষ্ঠান, ভালো ভালো কথোপকথন আর প্রলোভনের চেষ্টা চলল গোটা জুন মাস ধরে। পায়ে হেঁটে তারা জর্জটাউন আর আলেকজান্দ্রিয়া ঘুরল। চিনা, থাইল্যান্ড, ব্রাজিল আর কিউবার হেঁসেল চেপে বেড়াল। তারা অন্তত জোনাথন, জন কেনেডির গল্প করত, বিশেষ করে ক্রুশ্চেভ, কালো মানুষ এবং জ্যাকির সাথে তাঁর সম্পর্কের গল্প, মার্টিন লুথার কিং এবং অহিংস আন্দোলনের কার্যক্ষমতার কথা। মার্তা ভালো শ্রোতা, আর চটপট বুঝে নেবার ক্ষমতায় জোনাথনের জ্ঞান দেখে অবাক হয়ে যেত। তার বিচারকে বেদবাক্য বলে মেনে নিত। জুলাই মাসে বিছানায় শুয়ে ঘুমনো ছাড়া সে আরো অন্য কাজও করছিল। ইতিমধ্যে মার্তা, জনের ভাড়ার টাকার সম্পূরক দাতা, যে টাকা জন, ওইসব নানা ধরনের অদ্ভুত ছোটো রেঁস্তোরায় তাকে খাইয়ে খরচ করে ফেলে। অক্টোবরে তারা আর্থিক এবং যৌনতার একটা চুক্তি করে, যা দেখে মনে হয় বিয়েটা অবশ্যম্ভাবি। এইভাবে মিসেস কাথবার্ট যেদিন যুবতী ভাড়াটের আকছার বাইরে রাতকাটানো নিয়ে অশ্রদ্ধা প্রকাশ করলেন, মার্তা জানালো, সে আর জোনাথন বিয়ে করছে।

এখন যখন মার্তা সারা বছরের এবং পরের মাসের বিদ্যুতের বিল গোছাচ্ছে, সে ঠাণ্ডা নির্লিপ্তিতে জনের মুখ খুঁটিয়ে দেখে। এই রকম নির্লিপ্ততা সাধারণত অচেনা আগন্তকের জন্য থাকে। ঘুমন্ত অবস্থায় জোনাথনের মুখে এতটুকু যুযুৎসা নেই, যা তাকে সফল আইনজীবী করেছিল মার্তাকে ভীত করেছিল তাকে চ্যালেঞ্জ জানাতে। পাহাড়ের মতো শক্ত চিবুক নিয়ে তার গাঢ়বাদামি রঙের মুখ প্রবল নিশ্চিন্তিতে বাচ্চাদের মতো গোল হয়ে গেছে। কোনও কোনও রাতে তাকে ঘুমের অসহায়তার মধ্যে দেখতে দেখতে সে দ্বিধা দীর্ণতায় দোলে-- লাথি মারবে না চুমু খাবে। আজ রাতে আটাশ বছরের বিবাহিত জীবনে, এই প্রথম তার কষে আঘাত করার ইচ্ছে হল।

সমস্ত মায়া এবং অন্যান্য নীলিমা কীভাবে ঘুচে গেল, মার্তা জানতে চাইছিল। পাঁচ বছরের মধ্যেই জোনাথনের প্রতিভা তাকে আর মোহিত করতে পারছিল না। জোনাথন তাকে যা শিখিয়েছে, সে সব আত্মস্থ করার পর এবং আরো পড়াশোনা করে, মার্তা আবিষ্কার করে যে তার নিজেরও মতামত আছে। শেষ পর্যন্ত জন ব্যাপারটাকে এই জায়গায় নিয়ে গেল যে মার্তার যে কোনও স্বাধীন ভাবনাকে সে তুচ্ছ মনে করে দমন করত, এমন কী কখনও বাইরের লোকজনের সামনেই। মার্তা নিজে আত্মম্ভরি এই কারণে জনের নিরাপত্তাহীনতা তাকে দুঃখী করতো এমন নয়। মার্তা দুঃখী কারণ তার চোখে জন এখন অনেক কম পুরুষালী। কালো দৈত্য, গোঁয়ার আর নির্বিকার – এসব নিয়ে জনের এই যে সুন্দর ভাবমূর্তি- এটা কলঙ্কিত হয়েছিল।

বর্মে ফাটল সত্ত্বেও, সেখানে যে জীবনীশক্তি, মার্তা তার গুণগ্রাহী ছিল। শহরে সমস্ত ক্রিমিনাল উকিলদের মধ্যে জন, নামীদামী একজন উপযুক্ত উকিল। কিন্তু সারাক্ষণ ডি.সি.-র শত শত সাদাকালো পাব্লিক যাদের অনেক সম্মান এবং টাকা, তাদের সঙ্গে নিজেকে অনবরত তুলনা করার ফলে তার অন্ত্রে একটা ঢিমে ব্যথা দেখা দিয়েছিল। অধিকাংশ লোক ভাবত সে বেশ ভদ্রসম্মত রোজগার করে কিন্তু মাসের পর মাস মার্তার শিক্ষকতার অর্থ, জনের বন্ধক ছাড়াতে খরচ হত। BMW-এর সুবিধা নিয়ে হাইতি সফরের অফার, হাতে তৈরি শার্ট কিনে জোনাথন তার পরিবারকে ঋণে ফেলে রাখতো। মার্তা মরশুমি অফারে পোশাক কিনতো, পুরনো গাড়ি চালাত, জন যখন তার মতো ট্যারা মেয়েকে বিয়ে করেছে বলে দোষ দিত সে নিজের যন্ত্রণার শুশ্রুষা নিজেই করত।

খাবার খরচ, তাদের প্রয়োজনীয়তা, তাদের মেয়ের প্রাইভেট-স্কুলের বিল এই নিয়ে একমাত্র তারই চিন্তা ছিল। কিম, তাদের আবেগের ফসল, বাবাকে ভাবতো ‘খাঁটি’ আর মাকে একটা, ‘যন্ত্রণা’। ড্যাডি কলেজ যাবার গাড়ি দেবার প্রতিজ্ঞা করে। মা, সম্ভবত টিউশ্যন ফি আর বইয়ের দাম দিয়ে থাকে। গেল বছর প্রাক ঋতুস্রাব লক্ষণ এর কথা মনে করে, মার্তা প্রায় সারাক্ষণ জিদ্দি মাথা ব্যথায় ভুগল। ব্যথার কারণটা চিহ্নিত করতে পারল সে-- জোনাথনের মনমুগ্ধ জীবন দেখে তার বিরক্তির উদ্রেক হচ্ছে। যন্ত্রণা হচ্ছে। যাইহোক, জন যে কবে থেকে ভান করেও তার প্রতি আগ্রহ দেখায় না – সেই দূরবর্তী মুহূর্তের কথাও সে মনে করতে পারল না। বাড়িতে জন প্রায় থাকেই না। তারা কখনও সে ভাবে কথা বলত না। কিন্তু এখন সে মোটেও সেই সব জ্ঞানগর্ভ বক্তৃতাগুলোও দিতে চায় না, খুব অল্প সময়ের সেই সব দিনগুলোতে, মার্তা যে বক্তৃতা খুব আগ্রহ নিয়ে শুনতো। জোনাথনের একজন মুগ্ধ, মনোযোগী শ্রোতা দরকার। কিন্তু বিয়ের পঁচিশ বছর পর যে মেয়ের মাথায় এক আউন্স মগজ রয়েছে, সম্পূর্ণতা রয়েছে, সে মুগ্ধ দৃষ্টিতে – চোখ বড় বড় করে, প্রতি মুহূর্তে যুক্তির স্পর্শে সাড়া দিয়ে, ঠোঁটে স্মিত হাসি ঝুলিয়ে, শরীর সামনে এগিয়ে যেন শীগ্গিরি জ্ঞানের মণিমুক্তো কুড়িয়ে নিতে হবে এই ভাব নিয়ে শ্রোতা হতে পারবে না।

আজ ক্যাপিটল হিলের আমেরিকান কাফেতে হেঁটে যাবার সময়, জনকে ডায়াহান ক্যারেলের ধাঁচের ছদ্মবেশী কঠোরতা ঝেড়ে ফেলা এক যুবতী স্ত্রীলোকের সাথে দেখার আগে অব্দি সে বুঝতে পারেনি জোনাথনের ওপর এইরকম নিখাদ ভক্তি কত জরুরি ছিল। তরুণী, আইনজীবীর মতো দেখতে। পোশাকে সাফল্য এবং জয় করার বাসনা। শোনা এবং জানার আগ্রহে সে টেবিলে ঝুঁকে পড়েছে। গোপনে মাথা হেলিয়ে এবং অন্যমনস্ক ভাবে পুরুষটি যেভাবে মেয়েটির গুচ্চি ঘড়ির ব্যান্ড নিয়ে খালা করছে। মেয়েটি তার দিকে সব আগ্রহ নিয়ে যেভাবে তাকিয়ে আছে, বোঝা যায় ধনী, ফিটফাট পুরুষটির সঙ্গে সে শুয়েছে। পুরুষটির স্পর্শে মালিকানার আবেশ। মার্তা চমকে গেল। জোনাথন জেগে উঠলো তার টেবিলে। ‘জোনাথন তোমাকে এখানে দেখে খুব ভালো লাগছে।’ মার্তার কথায় হেলদোল নেই জোনাথনের। কোনও রকম অস্বস্তি দেখালে জোনাথন আর জোনাথন কিসে!

‘প্রিয়ে, আমি সাধারণতঃ আমেরিকান কাফেতে যাই না, কিন্তু মিস লরেন্স খুব তাড়াতাড়ি লাঞ্চ করার জন্য এই জায়গাটা ঠিক করলেন। মার্তা ইনি সন্দ্র লরেন্স, সিটি কাউন্সিল জোনিং কমিটির ব্যারিস্টার। সন্দ্র, ইনি মার্তা। প্রিয়ে তোমাকে আমি আমাদের সাথে যোগ দিতে বলতাম কিন্তু এখুনি আমাদের একটা মিটিং-এ যেতে হবে।’

জোনাথনের সঙ্গিনীর সাথে তার সম্পর্ক নিয়ে মার্তার সন্দেহ থাকলেও, মিস লরেন্সের সাড়া সে সব দূর করে দিল। মহৎ মানুষটির স্ত্রীর মুখোমুখি হয়ে সে কার্যত নার্ভাস। কিন্তু এতটা নার্ভাস নয় যে প্রতিযোগিতাটি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিচার করতে ভুল করেছে। সে দেখেছে ধূসর উত্তুঙ্গ শরীর আর শরীরের কাঠামো, খুঁটিয়ে দেখেছে কাপড় জামার রুচি, চোখ খুঁজে বেড়িয়েছে যে কোনও আদর বা আঘাতের চিহ্ন। ভালো হবার জন্য লোকের সাথে ভালো ব্যবহার করা খুব কঠিন।

মার্তা হাসল, তাদের স্বস্তি দিল যে সে মোটেও নিজেকে অবাঞ্ছিত মনে করছে না।

‘আচ্ছা, আচ্ছা ঠিক আছে। আর কয়েক মিনিটের মধ্যে আমার ফিলিসের সাথে লাঞ্চ খাবার কথা। কয়েক মাস ধরে ওর সাথে দেখা নেই। কত গল্প বাকী আছে। মিস লরেন্স আপনার সাথে আলাপ হয়ে ভালো লাগল।’

বাড়িতে ফিরে মার্তা চিৎকার করে কাঁদল। কান্নাটা জরুরি ছিল। সে নিজের এই রকম ভয়ঙ্কর প্রতিক্রিয়া দেখে অবাক হল। সে সব সময় ভেবেছে ডি.সি.-র অন্যান্য লোকের মতো জোনাথনও আকর্ষণীয় সপ্রতিভ, অবিবাহিত কালো, সাদা এবং হিস্পানিক মেয়েরা – যারা চাকরির জন্য লড়াই করে আর ছেলেদের সঙ্গে কুকুরের মোকাবিলা কুকুরের সঙ্গে এই লড়াকু মনোভাবে লড়ে তাদের নিয়ে সুযোগগুলো কাজে লাগিয়েছে। কিন্তু বাস্তবে কী ভাবে অবিস্বস্ততার মোকাবিলা করতে হয় তার ধারণা ছিল না। এমন হতে পারে সে ন্যান্সি উইলসনের ‘বল প্রিয়, ধারণা কর, কাকে আমি আজ দেখেছি’-- গেয়ে ছুটে তার ব্যাগ গুছিয়ে ফেলছে। কিন্তু তারপর কিমকে নিয়ে কি করবে? কে নিশ্চিন্ত করে বলতে পারে যে সে বাবার সাথেই থাকবে? এমন কী সে ভান করতে পারে যে, সে কিছু জানে না, তবুও সত্যের মুখোমুখি না হবার স্পৃহাও তাকে যে অবস্থা তাকে অসুস্থ ও দুঃখী করে তুলছে তাকে উপেক্ষা করতে সম্মতি দেবে না।

আজ রাতে যখন তারা বিছানায় বসে। জন টিভি দেখছে সে বই পড়ছে, কোনও রকম ভূমিকা ছাড়াই সে তার সন্দেহের কথা প্রকাশ করে।

‘‘জোনাথন, কাল যে মেয়েটির সঙ্গে আমার আলাপ করিয়ে দিলে, তার সাথে কি তোমার প্রেম চলছে?’’ মার্তা কোলের বই থেকে মুখ না তুলেই জানতে চাইল। সে ভেবেছিল, জন ভুরু কুঁচকাবে, তার বাদামি চোখ হিংস্র হয়ে উঠবে। কয়েক বার সে যুদ্ধ করার চেষ্টা করেছিল জন শক্ত হাতে শত্রুকে শেষ করে দিয়েছিল। এরপর যখন শেষমেষ সে জনের দিকে তাকালো, সে তখনও ১১টার খবর শুনছে। তার শরীর খুব স্বাভাবিকভাবে বিশ্রাম নিচ্ছে।

‘মার্তা, একটু সীরিয়াস হও। আমি প্রশ্নটাকে উত্তর দেবার মতো সম্মানজনক মনে করছি না। তুমি রেস্টোরেন্টে গেছ, আমার সঙ্গে এক মহিলাকে দেখেছো, যার সঙ্গে আমার চাকুরিগত সম্পর্ক রয়েছে, তাই দেখে একটা সাংঘাতিক সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলে যে আমি তার সঙ্গে শুই! তুমি সব সময়ই হিংসুটে আর ভীতু। আমি তোমার পাগলামিকে প্রশ্রয় দিয়ে নিজের জীবন হালাল করে দিতে চাই না।’

এরপরই সাধারণত জন বাথরুমে যায় আর ধড়াম করে দরজা বন্ধ করে। সাধারণত মার্তা পিঠটান দেয় আর তার যে রাগ আর দুশ্চিন্তা সে সব দমিয়ে রাখার চেষ্টা করে। আজ রাতে সে নিজেকে সামলাবার চেষ্টা করল না। তার গলায় যেন পিত্তির মতো কিছু উঠে এসেছে এবং জন বিছানা থেকে ওঠার চেষ্টা করতেই মার্তা তার পোশাকের বেল্ট ধরে এতো জোরে টান দিল যে সে একটা ঘাট ছিঁড়ে ফেলল।

‘‘শুনছো তুমি আমার কথা? তুমি কি মনে কর তুমি ডি.সিতে ফূর্তি করবে আর আমি ঘরে বসে থাকব? আমি জানি, আমি ছাড়া সবাই এটা জানে। লাঞ্চ খাবার সময়, সমস্তটা সময় ফিলিস সম্ভবত আমার জন্য দুঃখ পেল। ভাবল, ‘বেচারি মার্তা বয়স হয়ে যাচ্ছে। পাশুটে যৌন চুল, ঝোলা বুক আর পেটটা তো আর নামবে বলে মনে হয় না। দরিদ্র জিনিস কোনও দৌড়ের মধ্যে নেই।’ বেশ জোনাথন, আমি কারো সহানুভূতি চাই না। কারো না।’’

মার্তা তখনও কাঁপতে কাঁপতে তার বেল্ট ধরে আছে। জোনাথন বাইরে বেরোবার জন্য তার পোশাক টানছে।

‘ভদ্রমহিলা, তুমি তোমার সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছ। পরিবর্তনে তোমাদের মাথা ঘুরে গেছে। বাইরে যাচ্ছি। ফিরে এসে দেখবো তুমি আবার নিজেকে গুছিয়ে নিয়েছো। এক গ্লাস মদ নেবো। তুমি কি নিতে চাও লাল না সাদা?’

মার্তা তার হাতের বেল্টের দিকে তাকাল। যখন সে উত্তর দিল না, জন ঘর ছাড়ল ঢিপিঢিপি ভীতিপূর্ণ দৃষ্টি হেনে। এটা একটা ইঙ্গিত যে সামাজিক উদাসীনতায় তারা যেরকম পারস্পরিক ভাবে ছিল; আজকের রাতটা তার থেকে আলাদা হবে। পরবর্তী সময়ে, যখন সে বিছানায় শুয়ে ঠাণ্ডায় আর নিজের অবদমিত রাগ আর আঘাতের হিংস্রতায় কাঁপছে, সে বোঝার চেষ্টা করল, এ সবের মানে কী! স্বামী অন্য তরুণীর সাথে মহিলার সাথে বিছানায় শুধু এই জন্য তার যন্ত্রণা নয়। ব্যাপারটা এই রকম বিয়ের এত বছরের মধ্যে, জন কখনও তাদের জীবনে তাঁর অবদানের জন্য বাহবা দেয়নি। বস্তুত জোনাথনের ওপর অধিকার ছিল তার সবচেয়ে বড় ভুল। জন তাকে ঘৃণা করতে শুরু করেছে কারণ সে আর সেই ছোট্ট সাউথ ক্যারোলিনার মেয়েটি নয় যে ভাবত পুরুষটি ডাকাবুকো কারণ সে বৃটিশ গাড়ি চালায় আর শহরের সব রেস্তোঁরা চেখে দেখে। সে জনের দিকে পেছন ফিরে কান অব্দি ঢাকা টেনে দিল। জোনাথন, মার্তার বিছানার দিকে গড়িয়ে শুয়ে একটা হাত দিয়ে তার পাছা জড়িয়ে ধরল। মার্তা, জনকে তার নাম ধরে ডাকতে শুনল এমন একটা কণ্ঠে, যেন সে সাহায্য চাইছে। নাকডাকার পরিচিত শব্দ কমে এলে, সে বুঝলো জন ঘুমিয়ে পড়েছে। অনেক বছর ধরে মাঝেমধ্যে রাতের ডাক মার্তাকে তাতিয়ে ছিল একসাথে থাকার একটা গল্প বুনতে। জনের যে তাকে প্রয়োজন – এটা ছিল সেই উপলব্ধি। ওইসব গোলমেলে রাতের শব্দেই জেগে থাকা প্রহরগুলো কাটানো সম্ভব করেছিল।

মার্তা জানতো, সে কোথাও যাচ্ছে না। তার অতো জীবনীশক্তি নেই। কোনও কোনও দিন সে এমন কী ভাবতো যে জনকে সে ভালোবাসে। আগামীকাল সে উঠবে, অফিসে যাবে। আগামীকাল রাতে দুজন বিছানায় বসবে। মার্তা ‘কালার পার্পল’-এর শেষ অধ্যায় পড়ে শেষ করবে। জন রাত এগারোটার খবর শুনবে। এর মধ্যে খারাপ স্মৃতির ঝোলায় সে এই তিক্ত বটিকাগুলো আর হতাশাগুলো রাখবে। প্রার্থনা করবে পরের আঘাতের সময় সে যেন এক ফোঁটা মধুর স্মৃতি মনে রাখতে পারে।


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন