বুধবার, ৩ জুন, ২০২০

জর্জ সন্ডার্স 'এর গল্প : ভাসমান বস্তুকক্ষে শৃংখলাহীনতা

অনুবাদ : উৎপল দাশগুপ্ত


ব্যাপারটা অনেকটা এই রকম, আর একটুও স্বপ্ন নয়। প্রথমেই নজরে আসছে প্লাস্টিকের তৈরি প্যালোমিনো (সোনালী রঙের ঘোড়া – কেশর আর লেজ সাদা) আর আড়ষ্ট-বাহু এক আরোহী। খেলনার বাক্সের ওপর ভেসে আছে। আরোহী একজন সামরিক প্রধান, পুরোটাই লাল রঙে রাঙানো। জুতো, রুমাল, পিস্তল রাখার খাপ এমনকি ওর চোখের পালক পর্যন্ত। জেরবার এবং সঙ্কুচিত হয়ে যাওয়া এক অশ্বারোহী সৈনিক। ছাঁচে ঢেলে বানানো। পা দুটো বিপজ্জনক ভাবে ধনুকের মত বাঁকানো। সরল যুক্তি দিয়ে বলা যেতে পারে ঘোড়াটার ওপর দু’পা ফাঁক করে বসার জন্যই ওর সৃষ্টি। বিতাড়িত কমানচেদের (উত্তর আমেরিকার একটা জাতি) একজন।
অশ্ব এবং আরোহী অবশ্য ভাসমান অবস্থায় চারপাশে ঘুরে চলেছে। যেন লুঠেরাদের ওপর নজরদারি চালিয়ে যাচ্ছে। মিনিটে একবার করে আবর্তন – বাক্সের গায়ের লেখা থেকে জানা যাচ্ছে। এছাড়া কাপড়ের তৈরি একটা বাস্কেট-বল – সত্যিকারের বলের অর্ধেক – একটা দোলনার ওপর থেকে হাওয়ায় ঝুলে আছে। আলমারি থেকে ছোট্ট জ্যাকেটের বাহু আর সোয়েটার বেরিয়ে এসে বন্যভাবে দুলছে আর মাঝে মাঝে অভিবাদনের ভঙ্গি করছে। কার্পেটের সুতোগুলো চেপটে গেছে – হেলিকপ্টারের তলার ঘাসের যে অবস্থা হয়ে থাকে। কক্ষের কেন্দ্র থেকে কেন্দ্রাতীত তরঙ্গে বাইরের পানে ছুটে আসছে। তরঙ্গের গতি থেমে গেলেই আবার সেই সাধারণ কার্পেট। এক একবার পাক খেতে সাড়ে তিন মিনিট লাগছে। একটা দোলনা চেয়ার – দুলছে – ফাঁকা – একজন ঠাকুমা বসে যত জোরে দোলাতে পারতেন – তার থেকেও জোরে। 

কক্ষের অন্য প্রান্তের প্রশস্ত জানলা থেকে কাস্তের মত চাঁদ দেখা যাচ্ছে, গাছের একটা বাঁকা ডালের ভেতর দিয়ে; বাইরের গ্রামের সাদা কাঠের বাড়িগুলোর শার্সি থেকে বাদামি আলোর আভাস; হাওয়ার ঝাপট লেগে গাছগুলো এলোমেলো – আঁকাবাঁকা ধোঁয়ার মেঘের মত। প্রত্যেকটা বাড়ির দরজা জানলা হাট করে খোলা, নির্ভয়ে। বালিশের হাওয়ায় শিশুরা শ্বাস নিচ্ছে। গৃহের সারির পেছন দিয়ে চারণভূমির মত টিলার বিস্তার। স্নিগ্ধ নীল। কক্ষের অভ্যন্তরেও নীলের স্পর্শ। রাতের প্রাণোচ্ছল দৃশ্যময়তার নীল। রাত্রির আচ্ছাদন আর কি কি সব। ওই যে, যে সব রাতে বাচ্চারা চাঁদের দিকে আঙুল দেখিয়ে কি সব উদ্ভট কথা বলতে থাকে। খুব পরিচ্ছন্ন কার্পেটের সুবাস। ঝিঁঝিঁর ডাক নেই, দোলনা চেয়ারের দুলুনির আওয়াজ নেই, বাতাসের শব্দ বা জানলার শার্সিতে কোনো কিছুর ধাক্কা লেগে শব্দ – তাও নেই। তবু শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের অস্পষ্ট গুঞ্জন তোমার কানে আসবে। জানলাটা মুছে পরিস্কার করে একটা হালকা পানীয়ের আস্বাদ নিলাম। 

এটা কেমন হল? এক মাঝবয়সী দম্পতির অনুপ্রবেশ মনে হচ্ছে! লক্ষ্য করঃ ওরা এসে দাঁড়াল। আমার উদ্বিগ্ন হবার মত কিছু নয়। দরজার বাইরে ওরা দাঁড়িয়ে। লোকটা মাথার বেসবলের টুপিটা একটু পেছনে সরিয়ে নিল। মহিলা ক্যামেরার দিকে এগিয়ে গেল, তারপর বলল, “চেঁচিয়ে ‘পীট’ বল, এদিকে একটু তাকাও …” এ পর্যন্ত ঠিকই আছে। হাত দুটো পেছনে ধরা, লোকটা ভেতরে ঢুকে পড়ল। ব্যাপারটা কিভাবে হতে চলেছে বোঝার জন্য। ড্রেসারের সামনে গিয়ে মহিলা নিজের সাজসজ্জা পরখ করে নিল। ওটা স্পর্শ করতেই পারে। তাতে আমার আপত্তি নেই। লোকটা আস্তে আস্তে জানলার কাছে চলে গেল (এবং বাদামি আলোর পল্লীর কাছাকাছিও)। এখন পর্যন্ত সব কিছুই আসল বলেই মনে হচ্ছে। এমনকি দোলনায় লোকটা পায়ের আঙ্গুলগুলো ঠেকে যাওয়াটাও আসল বলে মনে হল। দোলনাটা জানলার সামনেই সাবধানে রাখা আছে। তারপরেই লোকটা ধুলো মাখা জুতো দোলনার ওপর তুলে দিল। হাতটা জানলার ফ্রেমে রেখে সোজা হয়ে সার্শি ঘেঁসে দাঁড়াল। এটা আর মেনে নিতে পারলাম না। মাইকের সুইচটা অন করে বললাম, “দয়া করে জিনিসপত্রের থেকে দূরত্ব বজায় রাখুন, মশাই!” এভাবে বলাটা কি ঠিক হল? কি করি, সবই তো জীবন্ত মনে হচ্ছে। 

ঊরূতে যেন কেউ চিমটি কেটেছে এমন ভাব করে লোকটা লাফিয়ে নামল। কনুইটা দোলনায় ধাক্কা খেল, টুপিটা পাক খেয়ে দোলনার প্লাস্টিকের পাখিদের গায়ে গিয়ে পড়ল। মুখটা তপ্ত আর লাল হয়ে উঠল। কয়েক গাছি পাকা চুল বেমানানভাবে কপালের ওপর চেপটে লেগে রয়েছে। দরজার সামনে গিয়ে দুজনেই অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। মনে হচ্ছিল না যাবার কোনও তাড়া আছে ওদের। 

হলো-চিক-হাউজ় থেকে আমি একটা জুয়ারেজ় বেছে নিলাম। হলো-চিক-হাউজ় বর্ডার টেস্ট রায়টের ডানদিকে। হলো-চিক মুরগির মাংস দিয়ে তৈরি ফুটবলের মত বড় এক ধরণের খাবার, মাঝখানটা ফাঁপা। তোমার পছন্দের সব কিছুই ওখানে পেতে পার, ক্রুটন, টক-মিষ্টি পোর্ক, এমনকি হালকা স্যালাডও। জুয়ারেজ়ের ভেতরটা দম্বল, ভাজা বীনস আর ফালি করা কালো মত কিছু দিয়ে ভরা। অতিরিক্ত কয়েকটা স্যসের প্যাকেটও নিয়ে নিলাম। 

হলো-চিক দেশের সব জায়গাতেই আছে। হান্স দ্য হলো-চিককে সবাই চেনে। টিভির বিজ্ঞাপনে ওকে অ্যালপাইন বনভূমির ভেতর দিয়ে পায়চারি করতে দেখা যায়। ঠোঁট থেকে ঊষ্ণ বাষ্প ঝরে। রঙচঙে বিশাল একটা ডানা কয়েকজন শিশুর ওপর মেলে দেওয়া। শিশুদের চেহারায় খুশির ছোঁয়া। নেপথ্য কণ্ঠে শোনা যায়, “বাইরে যেমন, মুরগির ভেতরও এতটাই বিশাল - আর বেশি সুস্বাদুও!” 

জুয়ারেজ় খাওয়া শেষ করে বেঁচে যাওয়া স্যসের প্যাকেটগুলো অ্যানির কাছে ফেরত দিলাম। আমার বউ। আগে ও স্টোরের পাশের হাউজ়টাতেই কাজ করত। এখন ওর বদলি হয়ে গেছে। ও বলে এখানেও খাদ্য বিন্যাস একই রকম, তবে নিয়মকানুন একটু কড়া। কাউন্টার থেকেই জানাল যে ওকে একটু বেশি রাত পর্যন্ত থাকতে হবে। আসলে আজ হল কর্মচারী মূল্যায়ন সন্ধ্যা। ভুলেই গেছিলাম। মাথা ঝুঁকিয়ে দাঁড়িয়ে স্টেনলেস-স্টীল কাউন্টারে বুড়ো আঙুলের ছাপ লাগিয়ে দিলাম। 

গরম করবার ল্যাম্প আর অ্যানের মাঝখানে হান্স ইউনিটের পোশাক পরে ম্যানেজার বার্ট চেপেচুপে বসে আছে। পছন্দ হল না ব্যাপারটা – মানে ওই চেপেচুপে বসাটা। অ্যানের কাঁধে বাঁ দিকের ডানাটা রেখে আমাকে চিন্তা করতে মানা করল, বলল ওকে বাড়ি পৌঁছে দেবে। অন্তত আমার সেটাই মনে হল। মুখোশের ঠোঁটের ভেতর দিয়ে কথাটা অস্পষ্ট শোনাল। তারপর আবার চাপাচাপি করে নিজের জায়গায় ফিরে গেল। ওই পোশাকটা পরে কতটা সান্নিধ্য অনুভব করা সম্ভব – আন্দাজ করার চেষ্টা করি। একটা ফ্রী কোক অ্যানি হাতে ধরিয়ে দিল। সুড়ঙ্গ বেয়ে কক্ষে ফিরে আসার সময় খেয়ে নিলাম। যদি মনে কর আমি বাড়িয়ে চাড়িয়ে কিছু বলছি তাহলে বলব তোমার মাথার ঠিক নেই। 

নিজে হাতে সব কিছু বন্ধ করে আমি বাইরে এলাম। মন্থর গতিতে ভাসতে ভাসতে সব নীচে নেমে এল। কক্ষে আলো প্রবেশ করল। সাদা আসবাবপত্রে রঙতুলির আঁচড় ধরতে পারার মত জোরালো। জানলাটা সাদা হয়ে গেছে, ঠিক সিনেমার পর্দার মত লাগছে। কারুর বসার ঘরে যেন আঙ্কল পীটের মোজাভে ভ্রমণের চলচিত্র দেখানোর অপেক্ষা। বাস্তবের এক শিশুর বাস্তবের একটা কক্ষের সকালবেলা বলে মনে হচ্ছে, যদিও আসলে এখন মাঝরাত। কার্পেটের ধুলো পরিস্কার করলাম। স্কার্টিং ঘষে ঘষে ময়লা তুলতে লাগলাম। প্যালোমিনোর গতিপথের তারগুলো সচল আছে কিনা পরীক্ষা করলাম। বিছানাটা ঝেড়ে নতুন করে পাতলাম। ড্রেসারের ধুলো ঝাড়লাম। এই সব করলে, কর্মচারিদের গাড়ি রাখবার জায়গাটা জানলার পেছনেই আছে এটা মনে করে নেওয়াটা সহজ হয়ে যায়। যেটা অবশ্য সত্যি। কতবার যে অ্যানির ওপর চোটপাট করেছি – ওখানেই – আমার গাড়িতেও –কোনও হিসেব নেই। এমনকি পলিয়েস্টারের ইউনিফর্ম পরা অবস্থাতেও। গায়ে মরচে রঙের ভেস্ট, মাথায় জালি টুপি, চামড়ার ট্রাউজ়ার। তাও। রাগ সামলাতেই পারি না। হাজার হোক, আমি তো পুরুষ মানুষ। 


ফোনে অ্যানি কাল রাতে দেখা স্বপ্নের কথা বলছিলঃ বার্ট – ওই ম্যানেজারটা – একটা ছোট মাপের টাক্সেডো জ্যাকেট পরে অ্যানির চুলের গোছায় হাত রাখল। তারপর ওকে একটা উৎকট অন্তর্বাস পরতে বাধ্য করল। হান্সের পোশাক ছেড়ে ওকে নাকি খুব ছিপছিপে লাগছিল। লালচে মুখ আর পাতলা গোঁপ দিয়ে অ্যানিকে চুমু খেল। অনেকবার। টিভিটা চালু রেখে। ওরা পপকর্ন বানাচ্ছিল, আর ও অ্যানিকে চুমু খেয়ে যাচ্ছিল। মেয়েটা ছেলেটার ওপরে মাখন আর লবন পরীক্ষা করে দেখছিল। ছেলেটা মেয়েটাকে যৌবনের কোনও এক বেদনাদায়ক কাহিনী বলছিল – সাঁতারের পোশাক আর কুকুর নিয়ে কোনও গল্প – আর চুমু খাবার জন্য জোরাজুরি করছিল। মেয়েটা ঊষ্ণ হয়ে উঠছিল। ক্রমে বেশি বেশি করে। হালকা পাগলামির পর্যায়ে গড়িয়ে গেল ব্যাপারটা। এক সমর্পণের দৃশ্যকল্প – যেখানে ছেলেটা মাখন কাটার ছুরি দিয়ে ভয় দেখিয়ে মেয়েটাকে টিভিটা গ্যারেজে নামিয়ে রেখে আবার ফিরে আসতে বলল। ওরা নতুন উচ্চতার শিখরে পৌঁছে গেল। “সত্যি বলছি, স্বপ্নটা একদম সত্যি বলে মনে হচ্ছিল,” অ্যানি খুব উত্তেজিতভাবে বলল। বললাম স্বপ্নটা খুবই মজাদার ছিল। 


বেশ অল্পবয়স্ক দম্পতি। অন্ধকারে চোখটা সইয়ে নিল দুজনেই। তারপর মেয়েটা বলে উঠল, “বিচ্ছিরি গরম!” ছেলেটা শান্তভাবে চারপাশটা দেখে নিল, তারপর বলল, “চেঁচিয়ে বল ব্যাবিলন।” মেয়েটা বলল, “তবুও কিছু একটা ব্যাপার আছেই এর মধ্যে।” ছেলেটা জবাব দিল, “একেবারে স্বপ্নের মত, সোনা।” বলে পেছন থেকে হাত বাড়িয়ে মেয়েটার বুক চটকাতে লাগল। তারপর কিছু বুঝতে না দিয়ে ঘুরে একেবারে মেয়েটার সামনে চলে এল। মেয়েটা যেদিকে তাকিয়ে আছে সেদিকে তাকাল। ওর হাত ধরে নিজের দিকে টেনে আনল। তারপর ওকে টানতে টানতে দেওয়ালের পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড় করাল। মা রাজহংসীর ছবিটার পাশে। আপত্তিকর কিছু হবে বলে মনে হয়নি, কিন্তু মেয়েটা সত্যি সত্যিই ছেলেটার প্যান্ট খুলে ফেলল। আমি মাইকের বোতামে হাত রাখলাম। ওদের শরীর এখন দ্রুতগতিতে ওঠানামা করছে। কাপড়চোপড় তালগোল পাকিয়ে একশেষ। ছেলেটার নিতম্ব পল্লীর বাদামি আলোয় গোলকের মত চকচক করে উঠল। এবার ওদের শরীর সুসংগতভাবে উঠছে নামছে। কটির ওপর থেকে মেয়েটার শরীর এক দলা পুডিংএর মত। মাইক চালু করলাম না। কথাও বললাম না। ভেবো না শুধু মাত্র ঈক্ষণকামনার বশবর্তী হয়ে। ভাসমান বস্তুকক্ষে ওরা দুজনে দাঁড়ানো অবস্থাতেই সঙ্গমে লিপ্ত হয়েছে, এজন্যেও নয়। মূল আকর্ষণ ওদের দুজনের বাক্যালাপ। দুজনের শরীরের উদ্দাম উত্থানপতনের সঙ্গে সঙ্গে ওরা একদৃষ্টে পরস্পরের পানে চেয়ে আছে আর কি ভাবে যেন কানে কানে একজন আরেকজনের নৈকট্য অনুভব করছে। সংলাপ একবারের জন্যেও থেমে থাকেনি। রেলপথ সংক্রান্ত সময় নিয়ে কি যেন কথা হল। বারান্দা থেকে বুনোহাঁস দেখা। ছেলেটা বলল যে ও একসাথে মেয়েটার সঙ্গে সমাধিতে যাবে। তবে তার আগে মেক্সিকো আর সেই সংশ্লিষ্ট ব্যাপারস্যাপার বলতে যা যা বোঝায়। হে ভগবান, কি আবোলতাবোল বকবক করে চলেছে দুটোতে মিলে! বিদেশি কোনও ভাষা হবে। আমি জানতে চাই। 

এখনও আমি দাঁড়িয়ে আছি একই ভাবে। এমনকি সব কিছুর শেষে ছেলেটা যখন কড়া-পড়া চওড়া হাত বাড়িয়ে বাস্কেট-বলটার গায়ে বাড়ি মারল আর ওটা শূন্যে উঠে গিয়ে ঘরের অন্য প্রান্তে চলে গেল, তখনও। ঘরের কোনে রাখা আবর্জনা ফেলার লোহার পাত্রে ধাক্কা খেল। পাত্রটা ঝনঝন করে উঠল। আগে কখনও এমন ঝনঝন করেনি। আমি ওদের শেষ করার সময় দিলাম। হ্যা দিলাম। 

ছেলেটা জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিচ্ছে। মেয়েটার চুলের মধ্যে মাথাটা ডুবিয়ে দিয়েছে। বলে উঠল, “ব্যাবিলন বলে চেঁচিয়ে ওঠা হয়েছে (হাঁপাল), এক দিক দিয়ে …” আর সময় নষ্ট না করে আমি মাইকের বোতামটা চেপে ধরে বললাম, “ধুর, ছাই!” মাঝবয়সী সেই দম্পতির মত ওরাও পলকের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। মনটা খারাপ হয়ে গেল আমার। তবে খুব তাড়াতাড়ি ধাক্কা সামলে নিল। ছেলেটা বলে উঠল, যেখানেই লুকিয়ে থাক, বেরিয়ে এস, আর আমিও আনাড়ির মত হেসে তাই করলাম। ও আমার পশ্চাদ্দেশে এত জোরে লাথি মারল যা আমাকে টোপেকাতে নিয়ে ফেলতে পারত। কাপড়ের বাস্কেট-বলটা দিয়ে আমার ঠোঁটের রক্ত মুছে দিল। কক্ষ একেবারে লণ্ডভণ্ড। 

বুঝতে পারলাম ওরা আমাকে উঠে দাঁড়াতে সাহায্য করল। চোখের সামনে রাত্রি দৃশ্যে আগাছাহীন পাহাড়ের পরিপাটি। গাছের সারিতে এখনও কাল্পনিক ঝড়ের দৌরাত্ম্য। আমার পাশ থেকেই মেয়েটার আঘ্রাণ পেলাম। ঘামের গন্ধ, পারফিউমের অবশেষ, আর এসব মিলেমিশে মেয়েটার শরীর থেকে যেটা ভেসে আসছে। ছেলেটা কিছু বলে চলেছে। ওর কথা শেষ হবার অপেক্ষা করলাম একটুক্ষণ, তারপর কি বলছে সেটা শুনতে লাগলাম। খানিকটা ক্ষমাপ্রার্থনার মত শোনাচ্ছে। কিংবা কৈফিয়তও বলা যায়। বলছে আমি নাকি কিছু নিয়ম লঙ্ঘন করেছি। । আরও অনেক কিছু। কথাগুলো প্রথম প্রথম অনুশাসনের মত শোনাচ্ছিল। শেষের দিকে আমন্ত্রণের মত। 


এক সুন্দর বাতিকগ্রস্ত মরুভূমির ভেতর দিয়ে আমরা গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছি। সস্তার মদ খাচ্ছি। রক্তাক্ত স্বাদ আমার মদে। কিন্তু আমি পরোয়া করলাম না। চকচকে মালভূমির ওপরে আমরা গোলাপি তারা দেখলাম আর লাল সাদা রঙের ছোট ছোট বাজার আর বিল ক্রসবির মত সাজগোজ করা এক হিচ-হাইকারকে। মরুভূমি যেন অনাগত প্রত্যাশা, বালি-কাদা-মাটি আর মরচে ধরা গ্যাসের ট্যাংক। কি বলতে চাইছি যদি বুঝতে পার। ওদের দুজনের মাঝখানে বসে আছি, আমাদের হাঁটু স্পর্শ করছে। ছেলেটা আমাকে দোস্ত বলে সম্বোধন করছে। অজ্ঞাত সব গান গাইছি আমরা। আমি যে সেগুলো জানতাম সেটাই জানা ছিল না। পাংশুল সব লোকগাথা। ষাটের দশকের গান। অনেকটা ঐক্য সঙ্গীতের মত। পাশের বাড়ির বারান্দায় বসে থাকা ফর্সা কোনও মেয়ের উদ্দেশ্যেও। এই সব আরও অনেক। বেশ সময় কেটে যাচ্ছে। গলা ছেড়ে গান গাইছি। রঙ্গ রসিকতা করছি। 

একটু পরে ওদের বললাম আমাকে মরুভূমিতে নামিয়ে দিতে। ওরা আমাকে মরুভূমিতে নামিয়ে দিয়ে চলে গেল। এক বোতল মদ রেখে গেল। বড় একটা পাথরে বসে আমি ওটা পান করলাম। পাথরটার মধ্যে ছোট ছোট গর্ত। একটা তোবড়ানো মাউন্টেন ডিউয়ের ক্যান। ঠোঁটে খুব ব্যথা লাগছিল। তবুও আমি পান করে যেতে লাগলাম। আবাঁর ওই সব গান গাইতে চেষ্টা করলাম। যতটুকু জানি আর কি। ফোরম্যান বলল, চমৎকার! জিতে রহো! অন্ধকার পরিমণ্ডলে গভীর ক্ষতযুক্ত মরুভূমি উন্মত্তভাবে ঝিকমিক করছে। লাল লাল পাথর তুলে নিয়ে তীরের মত অন্ধকারে নিক্ষেপ করে চলেছি। আর ভেবেই চলেছি, ভেবেই চলেছি, শুধু ভেবেই চলেছি। 

……………………………………………………………………………………………… 

অনুবাদঃ উৎপল দাশগুপ্ত 

…………………………………………………… 

জর্জ সন্ডার্স একজন মার্কিন ছোটগল্পকার, প্রাবন্ধিক, ৌপন্যাসিক এবং শিশু সাহিত্যিক। বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় তাঁ লেখা প্রকাশিত হয়ে থাকে। অনেক সাহিত্য বিষয়ক পুরস্কারেও ভূষিত হয়েছেন তিনি। জন্ম ২ ডিসেম্বর ১৯৫৮। 















কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন