বুধবার, ৩ জুন, ২০২০

শ্যন ও’ফেইলেন 'এর গল্প : অনঘ

অনুবাদক : রঞ্জনা ব্যানার্জী 

(গল্পকার পরিচিতি-- বিশ শতকের প্রভাবশালী কথাসাহিত্যিক শ্যন ও’ফেইলেন ১৯০০ খ্রিস্টাব্দে আয়ারল্যান্ডে জন্মগ্রহণ করেন। সাহিত্য-সমালোচক হিসেবেও তাঁর খ্যাতি রয়েছে। ১৯৯১ খ্রিস্টাব্দে আয়ারল্যান্ডের ডাবলিন শহরে তিনি মারা যান। ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে তাঁর প্রথম গল্প প্রকাশিত হয়। আট খণ্ডে তাঁর গল্পসংকলন প্রকাশিত হয়েছে। লিখেছেন চারটি উপন্যাস। তিনটি ভ্রমণকাহিনী। সারাজীবনই তাঁকে ঘিরে এক ধরনের বিতর্ক ছিল। তাঁর দুটো বই অশ্লীলতার দায়ে নিষিদ্ধ হয়েছিল। প্রকাশিত কয়েকটি বই-- Midsummer Night Madness and Other Stories (1932, short stories) A Nest of Simple Folk (1933, novel) The Average Revolutionary (1934, biography) Constance Markievicz (1934, biography) Bird Alone (1936, novel)

The Autobiography of Theobald Wolfe Tone (1937)
শ্যন ও’ফেইলেন 'এর গল্প : অনঘ 

পুরো মাস ধরে ভগিনীগণ আমার শিশু পুত্রটিকে তার প্রথম আনুষ্ঠানিক স্বীকারোক্তির জন্য তৈরি করছেন। আর ক’দিন পরেই স্কুল থেকে সার বেঁধে সে আমাদের স্থানীয় উপাসনালয়ে আসবে। এরপর সারি সারি আসনগুলোর ঠিক মাঝখান দিয়ে হেঁটে কোণের সেই অদ্ভুতদর্শন কক্ষটিতে প্রবেশ করবে এবং সেই গোপন-খোপের জাফরির ওধারে অপেক্ষারত কোনো এক বৃদ্ধ যাজকের সাক্ষাৎ পাবে। অতঃপর কাটাকুটিময় ফ্যাকাশে মুখটির উদ্দেশ্যে সে তার দুষ্টুমির ফিরিস্তি দেবে। এই সময় সে খানিক ভীত থাকলেও বিষয়টি বেশ উপভোগ করবে কারণ যা বলবে তার কোনোটিই সে বিশ্বাস করবে না - পুরো ব্যাপারটাই তার কাছে যাজক এবং ভগিনীদের মধ্যেকার মজার খেলা বৈ কিছুই নয়। 

তাছাড়া ও বিশ্বাসই বা করবে কীভাবে? ভগিনীগণ বলেছেন, ও দুষ্টুমি করলেই শিশু যিশু বিষণ্ণ হবেন। কিন্তু ও তো কখনো দুষ্টুমিই করে না তবে এসবের আর প্রয়োজন কি? অবশ্য ভগিনীগণ যদি আমাদের বাড়ির ঢালের মাঠগুলিতে থাকা সেইসব নেউল কিংবা দু-আঙুলে অথবা গরুর কানের ভেতরে বাস করা ছোট্ট রবিন পাখির মতো মনগড়া প্রাণীদের জ্বালাতন করার কারণে ওকে দোষী করত, তাহলেও এমনই হতো। বলতে বাধা নেই, ও বেশ মিথ্যা বলে। অবশ্য মিথ্যাবাদী হিসেবে ও এক্কেবারে যাচ্ছেতাই। এছাড়াও আমার সঙ্গে ‘রামি’ খেলার সময় ও সুযোগ পেলেই চাল চুরি করে এবং যেদিন ও পিছিয়ে থাকে এবং আমি তাড়া লাগাই সেদিন ওর রাগের কোনো সীমা-পরিসীমা থাকে না। ওর দুই চোখ উপচে জল গড়াতে থাকে, তাসটাস ছুঁড়ে ও লঙ্কাকাণ্ড বাঁধায় এবং আমাকে ‘শুয়োর’ বলে গাল পাড়ে। আর এই সময়গুলোতেই আমি ওর অন্তরের অনাবিল স্বচ্ছতা দেখতে পাই এবং অতল ভালোবাসায় ওকে বুকে চেপে রাখি। রাতে ওর জলভরা চোখজোড়ার কথা মনে পড়লেই আমার ইচ্ছে হয় ওর ঘরে গিয়ে বিছানায় এলানো তুলতুলে হাতখানি ছুঁয়ে থাকি যার মুঠিতে ও আঁকড়ে রেখেছে ফাঁপা-ঘূর্ণির মতো কোনো অমূল্য সম্পদ। তবেই ভাবুন, ও কীভাবে বিশ্বাস করবে যে মিথ্যা বলা কিংবা বাবাকে ‘শুয়োর’ ডাকা অপরাধ এবং এই কারণে ঈশ্বর ওর ওপর রুষ্ট হতে পারেন? 

তবুও প্রথম স্বীকারোক্তির জন্য ওকে এমন ঘটা করে তৈরি হতে দেখে আমার অসহ্য লাগছে। কেননা আমি জানি কোনো একদিন সে আক্ষরিক অর্থেই ‘দুষ্টুমি’ করবে এবং সেদিন তার যে ভীতিকর অভিজ্ঞতা হবে সেটি আমার চেনা--- আমি তা ঠেকাতেও পারব না। 

আমি সেদিনের কথা কিছুতেই ভুলতে পারি না যেদিন আমি প্রথম জেনেছিলাম যে আমি পাপ করেছি। তার আগে ওর মতোই সাতে পা দেওয়ার পর থেকেই ফি-বছর সেই আলো-আঁধারির খোপে বসে একই কথা বারবার আওড়ে গেছি যা কদিন পরে সেও বলবে : ‘ফাদার, আমি মিথ্যে বলেছি...ফাদার, আমি সকালের প্রার্থনা করতে ভুলে গিয়েছিলাম...ফাদার আমি মা-বাবার কথা শুনিনি ... ব্যস আর কিছু দুষ্টুমি করিনি ফাদার।’ এই অন্যায়গুলোর সবকটিই ঐ বয়সে আমিও করেছি; কিন্তু ওর মতোই আমার কাছেও এগুলো ছিলো রূপকথা কিংবা যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলার মতই অপরাধ যার কোনোটিই শিশুতোষ মিথ্যা বা রাগের চেয়ে অধিক দোষের নয়। অবশ্য সেই ম্যাড়ম্যাড়ে মেঘলা দুপুরে আমার পাপ-সংক্রান্ত এই অনুভব পাল্টে গিয়েছিল। সেবার ক্রিস্টমাসের পরপরই নিয়মিত স্বীকারোক্তির জন্য পুরোনো, অন্ধকার এবং হাওয়ায় ভরপুর সেই চার্চটাতে গিয়েছিলাম। এই চার্চের নাম সেইন্ট অগাস্টিন চার্চ। শহরের ভিড় পেরিয়ে গলির শেষ মাথায় কবরের মতই ঠান্ডা, দুর্গন্ধযুক্ত এবং স্যাঁতস্যাঁতে একটা চার্চ। চার্চটা অবশ্য এরপরেই ভেঙে ফেলা হয়েছিল, যদিও না- ভাঙলে সে নিজেই ধ্বসে পড়ত। এটা হলো সেইধরনের চার্চ যার দেউড়ি কিংবা পেছনের বারান্দার অন্ধকার কোণে রোদ-ঝড় এড়াতে দু’একজন ভিখিরি নিত্য আশ্রয় নেয়। এবং যেখানে অবশ্যই গায়ে শাল জড়ানো দরিদ্র কোনো মহিলা পাতলা স্লেটের গায়ে হাওয়া চলাচলের মতো ফিসফিসিয়ে অবিরাম প্রার্থনা আওড়ান। এর দেওয়ালগুলো ঝকঝকে রঙ করা কিন্তু বংশপরম্পরায় অতি ব্যবহারের ফলে বসার জায়গা কিংবা কাঠের নক্‌শা এবং মেঝের দশা বড়ই জীর্ণ। যাজকেরা সেইন্ট অগাস্টিনের প্রথাসিদ্ধ কালো আলখাল্লা, সূচালো টুপি এবং চামড়ার কোমরবন্ধ পরিধান করেন। সব মিলিয়ে নতুন যে কারুর জন্যেই এই পরিবেশ যথেষ্ট বিষণ্ণ মনে হলেও প্রথম দিনই আমার সঙ্গে জায়গাটার বেশ ভাব হয়ে গিয়েছিল। মা সেদিন আমাকে সেইন্ট অগাস্টিনের মাতা, সেইন্ট মনিকার কাছে সমর্পণের জন্যে নিয়ে এসেছিলেন। সেইন্ট মনিকার প্রতিকৃতির সামনে রাখা উজ্জ্বল মোমবাতি, বারান্দার প্রান্তের অন্ধকার কোণ, সিলিঙে আঁকা যিশুর জন্মালেখ্যের চক্রাকার-চিত্র এবং আঁটসাঁট বাক্সসদৃশ স্বীকারোক্তির কক্ষটি যার গাঢ়-বেগুনি ভারী পর্দার নিচ থেকে গ্রিলের প্রান্তে নতজানু অনুতাপীর গোড়ালি দৃশ্যমান ...সবকিছুই আমি নিমেষেই ভালোবেসে ফেলেছিলাম।

এরপর কোনো এক ঠান্ডা জানুয়ারির দুপুর ঠেলে চার্চের ভেতরে সেইন্ট মনিকার ছবিটির সামনে আমি বেশ খুশি মনেই হাঁটু গেড়ে বসেছিলাম। ভক্তদের জ্বালানো মোমবাতির আলোয় ছবিটি সেদিন অদ্ভুত দীপ্তি ছড়াচ্ছিল। আমি আমার ঈশ্বরের মহিমা বইয়ের ‘পাপকর্মসমূহের তালিকা’ পড়ছিলাম। যে সব অপুণ্যের অভিজ্ঞতা আমার ইতোমধ্যে হয়েছে, সেগুলোই আমি মন দিয়ে দেখছিলাম এবং অচেনা অপুণ্যের শিরোনামগুলো দ্রুত পেরিয়ে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ তেমনই এক অচেনা শিরোনাম, যা আমি এর আগে টপকে গেছি; তাতে আমার চোখ আটকে গিয়েছিল। 

এই মুহূর্তে যখন আমি কথাগুলো লিখছি,ঠিক তেমনই ঠান্ডা সাপের মতোই আতঙ্ক নামছে আমার পিঠ বেয়ে। সেদিন সেই ভয়ঙ্কর শব্দগুলোর দিকে তাকিয়ে যে ভয় আমাকে চেপে ধরেছিল, পুলিশের শক্ত হাত হঠাৎ কোনো ‘আসামী’র বাহুতে পড়লে সেও এর চেয়ে বেশি ভয় পেতো না... 

দেয়ালে ঠেস দিয়ে অপেক্ষমান নীরব অনুতাপীদের লম্বা সারিতে আমিও সেদিন যোগ দিয়েছিলাম। অবশেষে আমার পালা এলে আমি সেই অন্ধকার পর্দাঘেরা খোপটিতে ঢুকেছিলাম। রেওয়াজ মতো একঘেয়ে প্রার্থনাটি বলা শেষে নিচুস্বরে তাঁকে জানিয়েছিলাম আমার পাপের বিবরণ। 

স্বীকারোক্তির কক্ষে সেদিন যে প্রবীন যাজক ছিলেন, বয়সের হিসাবেও তিনি বেশ প্রাচীন। তিনি এতটাই ন্যুব্জ ছিলেন যে মণ্ডলী তাঁকে ‘শেষ-ভোজের’ আনুষ্ঠানিক প্রার্থনা কিংবা স্বীকারোক্তি শোনা ভিন্ন কদাচিৎ অন্য কোনো দায়িত্ব দিত। যদি তাঁকে উপাসনা পরিচালনা করতে দেওয়া হতো তবে তিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা দিশাহীন বকে যেতেন এবং প্রার্থনাসভায় উপস্থিত লোকেরা বেরিয়ে যেতো। তাদের ঠেকাতে তখন গীর্জার ঘণ্টাবাদক মরিয়া হয়ে কক্ষের বাইরে উঁকিঝুঁকি দিতো। তাতেও তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণে সমর্থ হতো না অতঃপর সাহায্যকারী বালকদের একজনকে পাঠানো হতো যে কি না বেদির পায়ের কাছে রাখা বিশাল চাকতি আকারের ঘণ্টাটি পিটিয়ে তাঁকে ক্ষান্ত করার চেষ্টা করত। একবার আমি তাঁকে মঞ্চ থেকে নামানোর সকল প্রলোভন ব্যর্থ হতে দেখেছিলাম। সেবার তাঁকে থামাতে সাহায্যকারী বালকটিকে তিন-তিনবার কক্ষ থেকে বেরিয়ে বেদির সেই ঘণ্টা পেটাতে হয়েছিল। 

এই অতি বৃদ্ধ যাজক সেদিন আমার স্বীকারোক্তি শুনে এমনই আর্তনাদ করে উঠেছিলেন যে আমি নিশ্চিত চার্চের শেষ মাথা পর্যন্ত তাঁর আওয়াজ পৌঁছে গিয়েছিল। তিনি তারের কাছে মুখ টেনে আমাকে ‘প্রিয় সন্তান’ সম্বোধন করেছিলেন, যাজকেরা সচারচর অনুতাপকারীদের এমন সম্বোধনই করেন। এর পর পরই তিনি আমার কৃত অপরাধ সম্পর্কে বিস্তারিত জানার জন্য প্রশ্ন করতে শুরু করেছিলেন। এই পর্বটির জন্য আমি মোটেও তৈরি ছিলাম না। আমি ভেবেছিলাম পাপ-স্বীকারের পরপরই ক্ষমা পেয়ে যাব : অন্যান্যবার এমনই হয়েছে, ওপারে বসা সকল যাজকের কাছেই শুনেছি যে, আমি একজন উত্তম বালক, এবং তাঁরা প্রায় সকলেই আমাকে তাঁদের জন্য প্রার্থনা করবার অনুরোধ জানিয়েছেন যেন আমি কোনো শিশু দেবদূত যার প্রার্থনা কার্যকর হবেই। তাঁদের এমন আশিস নিয়ে প্রতিবারই আমি খুশিমনে লাফাতে লাফাতেই খোপ থেকে বেরিয়ে এসেছি।

সেই দিন সেই বৃদ্ধ যাজকের প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে আমি রীতিমত কাঁপছিলাম, ‘হ্যাঁ, একাধিকবার এমনটি ঘটেছে’- কী দ্রুতই না আমরা সত্য এড়িয়ে ঘুরপথে হাঁটতে শুরু করেছিলাম সেদিন! - পরের উওরে ফের জানিয়েছিলাম, ‘হ্যাঁ ফাদার অন্য একজনের সঙ্গেই ঘটেছে’। এই উত্তরটি শুনে তিনি দ্বিতীয়বার ফের আর্তনাদ করে উঠেছিলেন। আমার তখন মনে হয়েছিল তাঁকে মিনতি করে বলি যেন তিনি চুপ করেন, নতুবা বাইরের লোকজনের কানে পৌঁছে যাবে তাঁর আওয়াজ। কিন্তু তাঁর পরের প্রশ্নটি শুনে জাফরিকাটা সেই তাকের প্রান্তে রাখা আমার জোড়-করের দুই তালু ঘেমে থরথর কাঁপতে শুরু করেছিল। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, কেউ আমার কোনো ক্ষতি করেছিল কি না। প্রথমে আমি প্রশ্নটিই বুঝিনি! তারপরেই নানা আকারের ভয়ঙ্কর সব অর্থ নিয়ে তাঁর সেই প্রশ্ন আমার অবুঝ মনের কালো রাস্তা ঘষে ধেয়ে আসছিল কারণ কোনো এক আবছা জ্ঞানে আমি বুঝতে পেরেছিলাম তিনি আমাকে মেয়ে অনুশোচনাকারী ভাবছেন। তাঁর এই ভুল ভাঙাতে আমি মরিয়া হয়ে চেঁচাচ্ছিলাম, ‘আমার সঙ্গে কিছুই হয়নি, ফাদার! কিচ্ছু না, কিচ্ছু না, কিচ্ছু না!’ তিনি তখন দখিন-হাওয়ার মতো ফোঁস করে দীর্ঘনিঃশ্বাস উড়িয়ে বলেছিলেন : বোকা মেয়ে, ক’মাস না গেলে তুমি কিছুই টের পাবে না। 

সেই মুহূর্তে আমি কেবল ভাবছিলাম কীভাবে এই গোলকধাঁধা থেকে পালানো যায়। আমি যে কোনো গল্প, যে কোনো মিথ্যা বলতে মরিয়া হয়ে উঠেছিলাম যাতে তিনি তাঁর প্রশ্ন থামান। কীভাবে জানি না, তবে শেষ পর্যন্ত আমি তাঁকে এটি বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলাম যে আমি একজন পুরুষ অনুতাপী। কারণ তাঁর পরের যে প্রশ্নটি আমাকে চুড়ান্তভাবে বিধ্বস্ত করেছিল তা ছিল : 

‘আচ্ছা আচ্ছা। এবার বলো দেখি সে কি বিবাহিতা নাকি অবিবাহিতা?’ 

বলা বাহুল্য এই বিশেষ বাক্যটি মনে পড়লে এখন আমার হাসি পায় এই ভেবে যে কী এক অবিশ্বাস্য অভিজ্ঞতাই না ছিল সেটি! মাঝে মাঝে বন্ধুদের আড্ডায় তাঁর সেইসব প্রশ্ন এবং আঁতকে ওঠার বিশদ বিবরণ দিয়ে আমি আসর মাতাই, এমন কি একজোড়া লিকলিকে গোড়ালি ভারী পর্দার নিচে অসহায় করতালের মত ঠকঠক বেজে যাচ্ছে এবং অপেক্ষমান অনুশোচনাকারীরা সেই ঘেরাটোপের অন্ধকারে কী ঘটছে ভেবে ব্যাকুল হচ্ছে– এই দৃশ্যকল্পের বর্ণনা দিয়ে আমি নিজেকে নিয়েও মজা করি। কিন্তু সেই দিন, সেই সময়ে, আমার অবস্থা ছিলো কাঁটাঝোঁপে আটকানো ছোট্ট কুকুরছানার মতো, যে কি না উদ্ভ্রান্তের মতো হাতড়ে ফিরছিল কী করলে যা বলেছে তা প্রত্যাহার করা যায় কিংবা স্বীকার করা যায়, যাতে করে সেই বৃদ্ধ যাজক কাঙ্ক্ষিত আশিসবাণীটি শোনাবেন, ‘এবসল্ভো তে...’ এবং সেই অবোধ্য পাপের প্রায়শ্চিত্তের বিধানটিও বাতলে দেবেন ... 

সেদিন আমি ঠিক কী বলেছিলাম তা আজ আর পরিষ্কার মনে নেই। কেবল এইটুকু স্পষ্ট মনে করতে পারি, অজস্র অপেক্ষমান দৃষ্টির নিচ দিয়ে, সার সার আসনের মাঝ দিয়ে সেইন্ট মণিকার দীপ্তিময় ছবিটি পেরিয়ে দূরবর্তী অন্ধকার কোণটির লক্ষ্যে আমি একা হাঁটছিলাম যেখানে রবিবারের হতদরিদ্র লোকেরা বসে। আমি ধোঁয়ার ভেতরেই সবকিছু দেখছিলাম। পবিত্র লণ্ঠনের আগুনে-লাল চোখ যা কি না বেদির মোমবাতিগুলোর আলোকসজ্জার বাইরের একমাত্র আলোর উৎস ---- সেও আমার দিকে স্থির তাকিয়ে ছিলো। সেই শাল জড়ানো মহিলা আমাকে দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলেছিলেন। আমার নগ্ন হাঁটুর গা ঘেঁষে হাওয়ারাও পিছলে দূরে সরে যাচ্ছিল। কোণায় বসা ভিক্ষুকটি বিরামহীন নাক খুঁটছিল এবং গা চুলকে যাচ্ছিল কিন্তু তবুও সেই মুহূর্তে তাকে আমার নিজের চেয়ে অধিক পবিত্র মনে হচ্ছিল। 

ক্রিস্টমাস শেষের মলিন আকাশের নিচে রাস্তায় দাঁড়ানো বাড়িগুলোকে সেই বিকেলে ভেজা ও কালো দেখাচ্ছিল। শহর ছাড়িয়ে অনেক উঁচুতে, বিন্দুর মতো একটাই তারা জ্বলছিল। ওকে দেখতে আমার সদ্য খুঁইয়ে ফেলা সরল শৈশবের মতই মৃদু এবং দূরের মনে হচ্ছিল। উদোম জানালাগুলো যাদের কাচে শীতের আকাশ ভাসছিল তারাও যেন বড়ো বিষণ্ণ! সিমেন্টের ভেজা দেওয়ালগুলোতে নিকষ কালো আঁধার থমকেছিল। সেদিন আমি দীর্ঘক্ষণ উদ্দেশ্যবিহীন ঘুরে বেরিয়েছিলাম। চুপিসারে বাড়িতে ঢুকতে গিয়েই মায়ের রোষানলে পড়েছিলাম। আমি কোথায় ছিলাম এতক্ষণ, তা জানতে মা রীতিমত জেরা করেছিলেন। আমি তাঁকে আক্ষরিক অর্থেই মিথ্যে বলেছিলাম, কারণ তাঁকে আমি বিভ্রান্ত করতে চেয়েছিলাম এবং আমি জেনে গিয়েছিলাম যে এখন থেকে সবাইকে এভাবেই বিভ্রান্ত করতে হবে আমার, কেননা আমার ভেতরে এমন কিছু প্রোথিত আছে যার হদিশ কাউকেই জানতে দেওয়া যাবে না। আমি তখনও আমার সামনের কালো রাত্রিটির ভয়ে ত্রস্ত ছিলাম। তখনও আমার জন্য অপেক্ষা করছিল আরও একটি স্বীকারোক্তির পর্ব যা সেই বৃদ্ধ যাজকের প্রশ্নবাণ এড়াতে এবং মায়ের কাছে সত্য গোপনের জন্য বলা মিথ্যাগুলোর পাপের দায় এড়াতে অবধারিত ছিলো। 



চল্লিশ বছর পেরিয়ে গেছে ; এতগুলো বছর ধরে কিছু বিষয় মগজের অপ্রয়োজনীয় কোনো কোণে জমা করা ছিলো। তবুও কোনোভাবে সেই ছোট্ট মানুষটির ঘর্মাক্ত হাতে ‘ঈশ্বরের মহিমা’ বইটি চেপে ধরে, নাক কুঁচকে উঁচুতে তুলে, কঠিন শব্দগুলিকে পড়ার আপ্রাণ চেষ্টা করার দৃশ্যটি যখন চোখে ভাসে , তখন আমি হাসতে পারি না। এমন কি সেই দ্বিতীয়বারের স্বীকারোক্তির দিনটি মনে করেও আমি কোনো সান্ত্বনা পাই না। সেইদিন নিবন্ধিত অপরাধগুলো সন্তর্পণে যাচাই করে আমার করা অপরাধটির একটি যথার্থ নাম আমি খুঁজে পেয়েছিলাম! এবং দ্বিতীয় যাজকের কাছে আমি যা বলেছিলাম তা ছিলো : ফাদার আমি ব্যাভিচার করেছি। তিনি অসীম স্নেহে আমাকে আশ্বস্ত করেছিলেন যে আমি ভুল বুঝেছি, এমনতরো পাপ করবার মতো যথেষ্ট বড়ো আমি হইনি। তাছাড়ৎ এই অপকর্মটি করতে হলে আমাকে আগে ‘বিয়ে’ করতে হবে। এর পরেই তিনি তাঁর জন্য প্রার্থনা করার অনুরোধ জানিয়ে আমাকে বিদায় করার আগে বলেছিলেন আমি একজন উওম বালক। তাঁর আশিস নিয়ে ঠিক আগের মতই লাফাতে লাফাতে আমিও বেরিয়ে এসেছিলাম। তবুও সেই ঘটনাটি যখন ভাবি এবং আজকের শিশু আদমকে দেখি, তখন তাকে আমার সেই অস্পষ্ট এবং নাজুক একলা তারাটির মতোই মনে হয় এবং সেই বৃদ্ধ,মৃত যাজকের মতো আমিও দীর্ঘশ্বাস ফেলি এবং চল্লিশ বছর আগেকার সেই বাচ্চাটির মতো সেও এই কালে ‘ফাদার আমি মিথ্যা বলেছি...ফাদার আমি সকালের প্রার্থনা বলতে ভুলে গেছি কিংবা ফাদার আমি আমার বাবাকে শুয়োর ডেকেছি ...’ এইসব রূপকথাসম মিথ্যা স্বীকারোক্তির চেনা-খেলা খেলছে, এমন ভাবনা আমাকে বিচলিত করে।





অনুবাদক
রঞ্জনা ব্যানার্জী

জন্ম : চট্টগ্রাম। বাংলাদেশ।  এক সম্ভ্রান্ত শিল্পানুরাগী পরিবারে।
২০০৪ এর শুরুর দিকে স্বামীর কর্মসূত্রে পাড়ি জমান উত্তর আমেরিকায়। বর্তমানে কানাডার সবচেয়ে ছোট প্রদেশ প্রিন্স এডওয়ার্ড আইল্যান্ডের রাজধানী শারলট টাউনের বাসিন্দা।
প্রকাশিত বই ‘আহেলি’ (গল্প সঙ্কলন), ২০১৭। তেত্তিরিশ--প্রকাশক : বাতিঘর, ২০২০। একে শূন্য-- প্রকাশক : বাতিঘর, ২০১৯।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন