বুধবার, ৩ জুন, ২০২০

ইসাবেল আয়েন্দে'র গল্প: দুটি কথা - অনুবাদ : মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ

সবাই তাকে ডাকত বেলিসা ক্রিপাসকুলারিও নামে। কারণটা এই নয় যে, জন্মের পর খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত করার সময়ে তাকে এই নামটি দেয়া হয়েছিল অথবা তার মা তাকে এই নামে ডাকতেন। মূলত এই নামটিকেই সে অন্বেষণ করে বেড়াচ্ছিল। ফলে খুঁজে পাওয়ার পর থেকে এই নামটি দিয়েই সবাই তাকে সুশোভিত ও অলঙ্কৃত করেছিল।



বেলিসার পেশা ছিল শব্দ বিক্রি করা। এটা করার জন্যে সে সারাদেশ পরিভ্রমণ করেছিল। সবচেয়ে উঁচু ও শীতল পর্বতমালা থেকে সবচেয়ে উষ্ণতম সমুদ্র সৈকত পর্যন্ত। শব্দ বা গল্প বিক্রির জন্যে সে কোন মেলায় বা বাজারে গমন করত। সেখানে পৌঁছানোর পর প্রথমেই সে তাবুর চারটি খুঁটির উপরে লাইনেন এর তৈরী শামিয়ানা স্থাপন করত। যাতে নিজেকে রোদ-বৃষ্টি হতে রক্ষা করে ক্রেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারে।

এই ব্যবসার জন্যে তার কোন ধরণের বিজ্ঞাপনের প্রয়োজন হত না। কারণ তার যাযাবর ধরণের জীবনযাত্রাই তার কথাগুলোকে দাবানলের মত দিগ্বিদিক ছড়িয়ে দিত। এমন লোকও ছিল, যারা বছরের পর বছর তার জন্যে অপেক্ষা করত। এবং যখন সে গ্রামে পৌঁছাত, তখন তারা তার তাবুর বাইরে লম্বা লাইন দিয়ে অপেক্ষা করত। গাছের তলায়।
তার সাক্ষাৎকার ফী ছিল যুক্তিযুক্ত। পাঁচ সেন্টের বিনিময়ে সে পূর্বনির্ধারিত নির্দিষ্ট কিছু শব্দমালা উচ্চারণ করত। সাত সেন্টের বিনিময়ে ক্রেতাদের স্বপ্নকে উন্নত করত। নয় সেন্টের বিনিময়ে তাদেরকে লাভ-লেটারের খসড়া তৈরী করে দিত। এবং বার সেন্টের বিনিময়ে সে তাদেরকে সবচেয়ে খারাপ শ্ত্রুদের জন্যে অপমানজনক কথাবার্তা লিখে দিত।

বেলিসা গল্পও বিক্রি করত। কিন্তু সেগুলো কল্পকাহিনী ছিল না। সেগুলো ছিল দীর্ঘ বাস্তব গল্প, যা সে একাধারে বলে যেত। নিখুঁতভাবে। ফলে শীঘ্রই তার আগমনের খবর গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে ছড়িয়ে পড়ত। লোকজন তাকে অতিরিক্ত অর্থ প্রদান করত, যাতে সে তাদের জন্যে লেখা কথাগুলোর সাথে আরও এক দুইটা বাক্য যোগ করে।

কোন শিশুর জন্ম, কেউ মারা গেলে, কারো সন্তানের বিয়ের পর অথবা কারো শস্যক্ষেত্রে আগুন লাগলে লোকেরা তার কাছে আসত। সবখানেই তার চারপাশে ভিড় জমে যেত, কথা শোনার জন্যে। তারা তার কাছ থেকে অন্য অঞ্চলের মানুষ, দূরবর্তী এলাকায় বসবাসকারী আত্নীয়স্বজন, এমনকি গৃহযুদ্ধের গল্পও শুনত। তাকে পঞ্চাশ সেন্ট দিলে, সে তাকে দুঃখ তাড়ানোর মন্ত্র শিখিয়ে দিত। উল্লেখ্য, প্রতিজনের জন্যেই তার মন্ত্রটা ছিল স্বতন্ত্র, যাতে সেগুলো কোন ধরণের সামষ্ঠিক বিভ্রম সৃষ্টি না করতে সমর্থ হয়। প্রত্যেককেই সে এই মর্মে নিশ্চয়তা প্রদান করত যে, তাকে যা দেয়া হয়েছে - তা পৃথিবী বা পৃথিবীর বাইরের অন্য কাউকে দেয়া হয়নি।

বেলিসা ক্রিপাসকুলারিও’র জন্ম হয়েছিল খুবই দরিদ্র একটি পরিবারে। এতই দরিদ্র যে, সন্তানদের নাম রাখার সামর্থ পর্যন্ত ছিল না। জন্মের পর সে বড় হয়েছিল খুবই কঠিন জলবায়ুর এলাকায়। কোন কোন বছরে সেখানে প্রবল বন্যা হত। বন্যার জলে সবকিছু ভেসে চলে যেত। আবার কোন কোন বছরে আকাশ থেকে একবিন্দু জলও ঝরত না। সূর্যের প্রখর রোদ দিগন্তের পর দিগন্ত পর্যন্ত বিস্তৃত ভূমিকে মরুভূমিতে রূপান্তরিত করত।

বার বছর বয়স পূর্ণ হবার পূর্ব পর্যন্ত শতাব্দীব্যাপী ক্ষুধা ও শ্রান্তি হতে বাঁচার জন্যে বেলিসার কোন গুণ বা দক্ষতাই ছিল না। এক দীর্ঘ খরার সময়ে বেলিসার ছোট চার ভাই মারা গিয়েছিল। এবং যখন তার মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে আসল, তখন বেলিসা সিদ্ধান্ত নিল সমুদ্রের দিকে চলে যাওয়ার। যেখানে সমতল ভূমি আছে। আসলে সে নিশ্চিত হতে চেয়েছিল যে, ভ্রমণের সময়ে মৃত্যুকে ফাঁকি দিয়ে অতিক্রম করে যাওয়া সম্ভব কিনা।

ওটা ছিল একটা ক্ষয়ে যাওয়া বিস্তীর্ণ ভূমি, যার পাথর ছড়ানো ফাটলগুলোর ভেতরে গাছের জীবাশ্ম, কন্টাকীর্ণ ঝোপ এবং পশুদের কঙ্কালগুলো উত্তাপের কারণে দগ্ধ হচ্ছিল। কিছু কিছু সময়ে তার সাথে কিছু কিছু পরিবারের সাক্ষাৎ হত। এরা তারই মত দক্ষিনের দিকে যাচ্ছিল জলের মরীচিকার সন্ধানে। কেউ কেউ তাদের জিনিষপত্রগুলো কাঁধে বহন করে নিয়ে যাচ্ছিল। কেউ কেউ নিয়ে যাচ্ছিল ঠেলাগাড়িতে। তবে কিছুদূর হাঁটার পর জিনিষপত্রগুলোকে ফেলে দিয়ে শুধুমাত্র নিজের শরীরের ওজন নিয়ে এগিয়ে যেতে বাধ্য হচ্ছিল তারা। কেউ কেউ কঠিন পরিশ্রম সহকারে হামাগুড়ি দিয়ে এগোচ্ছিল। তাদের শরীরের চামড়ার রঙ পরিবর্তিত হয়ে টিকটিকির চামড়ার বর্ণ ধারণ করেছিল। সূর্যের উজ্জ্বল আলোতে তাদের চোখ পুড়ে যাচ্ছিল।

যাত্রাপথে বেলিসা তাদেরকে হাত নাড়িয়ে অভিবাদন জানালেও থামছিল না। মূহুর্তের জন্যেও না। কারণ সহমর্মী হয়ে সময় নষ্ট করার করার মত অবকাশ তার ছিল না।তার সহযাত্রীদের অনেকেই পথিমধ্যেই পড়ে গিয়েছিল। কিন্তু বেলিসা এতটাই একগুঁয়ে প্রকৃতির ছিল যে, শেষ পর্যন্ত সে একটা নরকসম প্রান্তর অতিক্রম করে শীর্ণ গাছপালার ভেতর দিয়ে প্রবাহিত অদৃশ্যপ্রায় একটি ঝর্ণা-জলের সূত্রকে স্পর্শ করতে সমর্থ হয়েছিল। যে ঝর্ণাগুলো পরবর্তীতে নদী ও মোহনায় রূপ নিয়েছিল।

এভাবেই বেলিসা ক্রিপাসকুলারিও শুধুমাত্র নিজের জীবন রক্ষাই নয়, কাঁকতলিয়ভাবে লেখার শিল্পকেও আবিষ্কার করতে সমর্থ হয়েছিল।

সমুদ্র উপকূলের গ্রামে পৌঁছার পর বাতাসের তোড়ে একটা খবরের কাগজের টুকরা তার পায়ের কাছে এসে পড়ল। হলুদ হয়ে যাওয়া ছেড়া কাগজটিকে সে হাতে তুলে নিল এবং অনেকক্ষণ যাবত সেটাকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষন করতে লাগল। ওটার সম্ভাব্য ব্যবহার কি হতে পারে তা না ভেবেই। এক সময়ে ঔৎসুক্য তার লজ্জাকে ছাড়িয়ে গেল। আস্তে আস্তে সে একজন লোকের দিকে এগিয়ে গেল। লোকটি কর্দমাক্ত ডোবার ভেতরে একটি ঘোড়াকে গোসল করাচ্ছিল। মেয়েটি এখানেই তৃষ্ণা নিবারণের জন্যে প্রথম এসেছিল।

“এটা কি?” সে জিজ্ঞেস করল।

“খবরের কাগজের খেলাধুলার পাতা,” লোকটি উত্তর করল। মেয়েটির অজ্ঞতায় অবাক না হয়ে।

উত্তর শুনে কম বয়সী যুবতী মেয়েটি স্তব্ধ হয়ে গেল। আর কোন প্রশ্ন করলে লোকটির কাছে সে নির্লজ্জ হিসেবে প্রতীয়মান হতে পারে বিধায় দ্রুত সেখান থেকে সে চলে আসল। সে পাতাটিতে অংকিত অসংখ্য মাছি সম্পর্কে তাকে জিজ্ঞেস করতে চেয়েছিল।

“এগুলো হল অক্ষর বা শব্দ, হে আমার বাছা। এখানে বলা হয়েছে ফুলগেনিসিও বারবা তৃতীয় রাউন্ডে নীরো টিযানো’কে পরাজিত করেছে।“

সেই দিনই প্রথম বেলিসা ক্রিপাসকুলারিও বুঝতে শিখেছিল যে, শব্দ বা কথারা কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয় এবং যে কেউ ইচ্ছে করলেই সেগুলোকে স্বাধীনভাবে ব্যবহার করতে পারে। সে আবিষ্কার করেছিল যে, একটু চেষ্টা করলেই যে কেউ শব্দগুলোকে নিয়ে আশ্চর্য খেলা খেলতে পারে। নিজের সম্পর্কে চিন্তা করে সে সিদ্ধান্তে উপনীত হল যে, পতিতাবৃত্তি অথবা ধনীদের বাড়িতে রান্নাঘরের কাজ করা ছাড়াও কিছু কিছু সম্মানের কাজ আছে, যেগুলো সে জীবন নির্বাহের জন্যে করা যেতে পারে। কথা বিক্রি করাকে তার কাছে এধরণের শালীন বিকল্প বলেই মনে হল। সেদিন থেকেই সে এই পেশাটি বেছে নিয়েছিল এবং জীবনে আর কিছুই করার চিন্তা করেনি।

প্রথমে সে জানত না যে শব্দ বা কথাকে খবরের কাগজের বাইরেও লেখা যেতে পারে। কিন্তু এটা আবিষ্কারের পরে সে নিজের পেশার সীমাহীন সুযোগ দেখতে পেল এবং বুঝতে পারল যে, শব্দের জ্ঞান দিয়ে সে অসংখ্য জিনিস করতে পারে। নিজের বাঁচানো অর্থ থেকে সে ২০ পেসো একজন পাদ্রীকে দিল তাকে পড়া ও লেখা শিখানোর জন্যে। বাকী পেসোগুলো দিয়ে সে একটি অভিধান কিনল। এ হতে জেড পর্যন্ত সমস্ত শব্দগুলোই সে মুখস্ত করে অভিধানটিকে সে সমুদ্রের জলে ছুঁড়ে ফেলে দিল।

কয়েক বছর পর একটা বাজারের কেন্দ্রে তাবুর ছায়ায় বসে একজন বৃদ্ধলোককে তার পেনশন সংক্রান্ত অধিকার সম্পর্কে বুঝাচ্ছিল। লোকটি বিগত ২৬ বছর যাবত অপেক্ষা করেও পেনশন তুলতে সমর্থ হয়নি। সেটি ছিল বাজারের ব্যস্ততম দিন। চারপাশে লোকজনের হৈ-হুল্লোড় চলছিল। অকস্মাৎ অশ্বের ক্ষুরের শব্দ ও কর্কষ তীক্ষ্ণ ধ্বনি শোনা গেল। বেলিসা ক্রিপাসকুলারিও নিজের লেখালেখি বাদ দিয়ে উপরের দিকে তাকাল। দেখতে পেল একটি ধুলার মেঘ এগিয়ে আসছে। পেছনে একদল অশ্বারোহী। বাজারের ভেতরে অসভ্যের মত ঢুকে পড়েছে । মূলত তারা কর্নেলের মানুষ। এখানে এসেছে মুলাটো’র হয়ে আদেশ শোনানোর জন্যে। মুলাটো হল একটি দৈত্যাকার মানুষ যে এই অঞ্চলে তার তরবারির দ্রুতগতি এবং তার প্রভূর প্রতি বিশ্বস্ততার জন্যে বিখ্যাত। কর্নেল ও মুলাটো দুজনেই এক সময়ে গৃহযুদ্ধে জড়িত ছিল। দুজনকেই রক্তপাত ও দুর্যোগের সমার্থক বলে ভাবা হয়ে থাকে।

যোদ্ধারা গ্রামের ভেতরে প্রবেশ করল ধাবমান মরুদস্যুদের মত। ঘর্মাক্ত কলেবরে তারা লোকজনকে ছত্রভঙ্গ করতে করতে এগিয়ে গেল। ঘুর্ণিঝড়ের মত। মোরগ-মুরগীগুলো দিগ্বিদিক ভুলে উড়তে থাকল। কুকুরগুলো বিশৃঙ্খলভাবে ছোটাছুটি করতে লাগল। মহিলারা তাদের সন্তানদের নিয়ে দৃশ্যপট থেকে পালিয়ে গেল। বেলিসা ক্রিপাসকুলারিও ছাড়া আর কোন জীবন্ত প্রাণী বাজারে অবশিষ্ট থাকল না। সেও মুলাটোকে তার দিকে আসতে দেখে স্তম্ভিত ও হতভম্ব হয়ে গেল। কারণ ইতিপূর্বে এরকমের বিশালাকার মানুষ সে দেখেনি।

“আমি তোমাকেই খুঁজছি,” সে চিৎকার করে বলল। কুণ্ডলীকৃত চাবুক দিয়ে বেলিসার দিকে নির্দেশ করে। তার কথা শেষ হবার পূর্বেই দুইজন লোক তার উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ল। তার শামিয়ানাটিকে গুঁড়িয়ে ফেলল এবং লেখার কালির দোয়াতটিকে ভেঙে ফেলল। তারা তার দুই পা এবং দুই হাত পেছনের দিকে আড়াআড়ি করে বেঁধে ফেলল এবং মুলাটো’র ঘোড়ার পৃষ্ঠদেশে সুটকেসের মত তাকে স্থাপন করল। অতঃপর তারা পাহাড়ের দিকে দ্রুতগতিতে চলতে শুরু করল।

কয়েক ঘন্টা পর বেলিসা ক্রিপাসকুলারিও’র মরণাপন্ন অবস্থা, ঘোড়ার অবিরত ঝাঁকুনির কারণে। সেই সময়ে মরুভূমির বালিপূর্ণ বাতাসে শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে নিতে অনুভব করল যে, তাকে বহনকারী ঘোড়াটি থেমেছে। পরক্ষণেই চারটি শক্তিশালী হাত তাকে ভূমির উপরে স্থাপন করল। সে চেষ্টা করল পায়ের উপরে দাঁড়াতে এবং সম্মানের সাথে মাথা খাঁড়া করতে। কিন্তু শক্তিতে কুলালো না। অবসন্ন হয়ে বিভ্রান্তকারী কোন স্বপ্নের ভেতরে ডুবে গেল। কয়েক ঘন্টা পর সে ঘুম থেকে জাগল। ঘর্ঘর শব্দে। কিন্তু শব্দটা কীসের তা উদ্ধার করতে পারল না। মুলাটো তার দিকে তাকিয়েছিল অস্থিরভাবে। তার পাশে হাঁটু গেড়ে। “অবশেষে তুমি ঘুম থেকে জেগেছ!” সে বলল, তার পানির বোতলটা বেলিসার দিকে এগিয়ে দিতে দিতে। যাতে সে ব্রান্ডি ও গানপাউডারের ককটেল পান করে নিজেকে উজ্জীবিত করতে পারে।
বেলিসা তাকে জিজ্ঞেস করল কেন তারা তাকে এভাবে টানাহেঁচড়া করেছে। প্রত্যুত্তরে সে তাকে বলল যে, কর্নেলের প্রয়োজন বেলিসার সার্ভিস। তার মুখে জলের ছিটা দেওয়ার ব্যবস্থা করে সে তাকে ক্যাম্পের শেষপ্রান্তে নিয়ে গেল। সে তার মুখমণ্ডলে জল ছিটানোর ব্যবস্থা করল এবং তাকে ক্যাম্পের একেবারে শেষপ্রান্তে নিয়ে গেল। সেখানে দেশের সবচেয়ে ভীতিকর মানুষটি একটা হ্যামকের উপরে শুয়েছিল। হ্যামকটি দুটো গাছের সাথে বাঁধা ছিল। সে তার মুখ দেখতে পেল না। কারণ, তা মাথার উপরের একটা বস্তার ছায়ার পেছনে অদৃশ্য হয়ে ছিল এবং দীর্ঘ সময় দস্যু হিসেবে জীবন যাপন করার অন্ধকার তার মুখে ভিড় করেছিল।

তবে বেলিসার কাছে মনে হল লোকটির প্রকাশভঙ্গীতে একটা ক্ষমার ব্যাপার ছিল। কারণ সে বেলিসার সংগে খুবই বিনীত আচরন করছিল। সে লোকটির নরম ও কোমল কণ্ঠস্বর শুনে খুবই অবাক হল।

"তুমি কি সেই মেয়ে যে শব্দ বিক্রি করে?" সে বেলিসাকে জিজ্ঞেস করল।

"জ্বী। আপনাদের সেবা করার জন্যে,” সে বিড়বিড় করে উচ্চারন করল। অন্ধকারের ভেতরে লোকটির মুখটি খুঁজতে খুঁজতে। কর্নেল উঠে দাঁড়াল এবং যে টর্চটি সে বহন করছিল, সেটার আলোতে তার মুখটি আলোকিত হল। মেয়েটি তার শরীরের গভীর কাল রঙের চামড়া এবং চিতার চোখের মত হিংস্র ও উজ্জ্বল চোখ দুটো দেখতে পেল।

এবং সেই মুহুর্তেই সে বুঝতে পারল যে, তার সামনে যে দাঁড়িয়ে আছে সে পৃথিবীতে সবচেয়ে একাকী একজন মানুষ।

“আমি দেশের প্রেসিডেন্ট হতে চাই,” সে বলল।

অনর্থক যুদ্ধে দেশের এক প্রান্ত হতে অন্য প্রান্তে ভ্রমণ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিল কর্নেল । এই যুদ্ধে তার জন্যে পরাজয় ভিন্ন কিছুই ছিল না। কোন কৌশল অবলম্বন করেই সে পরাজয়কে বিজয়ে রূপান্তরিত করতে সক্ষম হচ্ছিল না। অনেক বছর তাকে খোলা মাঠের ভেতরে ঘুমাতে হয়েছে। মশার কামড় সহ্য করতে হয়েছে। কিন্তু তার এই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সংগ্রামগুলো কখনই যথেষ্ট ছিল না নিয়তিকে পরিবর্তন করতে।

এই যুদ্ধে যা কর্নেলকে বেশী ক্লান্ত করেছিল তা হল অন্য মানুষদের চোখে তাকে নিয়ে শঙ্কা ও ভীতি। সে চাইত বিজয়ীর বেশে গ্রামগুলোতে প্রবেশ করতে। চাইত রঙিন পতাকা ও ফুলের ভেতর দিয়ে হেঁটে যেতে। চাইত সবাই তাকে প্রশংসা করুক। চাইত সবাই তাজা ডিম ও উষ্ণ খাবার নিয়ে তার জন্যে অপেক্ষা করুক। কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। যতবারই তার সাক্ষাৎ হত - পুরুষেরা তাকে এড়িয়ে চলত, নারীরা ভয়ে পালিয়ে যেত, এমনকি অন্যান্য প্রাণীরাও ভয়ে কম্পমান থাকত। এগুলো দেখতে দেখতে সে আসলেই ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিল। সুতরাং সে সিদ্ধান্ত নিল দেশের প্রেসিডেন্ট হবার।

মুলাটো তাকে পরামর্শ দিল যে তাদের উচিৎ হবে রাজধানীতে গমন করে রাজপ্রাসাদ আক্রমণ করা এবং সরকারের কর্তৃত্ব দখল করে নেয়া। ঠিক যেভাবে তারা ইতিপূর্বে অনেক জিনিসের দখল নিয়েছিল। কারও ইচ্ছা বা অনুমতির তোয়াক্কা না করেই। কিন্তু কর্নেল চাচ্ছিল না আবার কোন অত্যাচারী হতে। কারণ অনেক বারই তারা তা হয়েছিল। এছাড়াও, ওটা করে তারা কখনই জনগণের ভালবাসা অর্জন করতে সক্ষম হবে না। সুতরাং তার ইচ্ছা হল সামনের ডিসেম্বরের নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করার। এবং জনগণের ভোটে নির্বাচিত হবার।

“এই কারণে, একজন প্রার্থী হিসেবে জনগণের সাথে কথা বলা আমার জন্যে গুরুত্বপূর্ণ। তুমি কি আমাকে জনসভায় ভাষণের জন্যে বক্তৃতা শিখিয়ে দিতে পারবে?” কর্নেল বেলিসা ক্রিপাসকুলারিওকে জিজ্ঞেস করল।

বেলিসা ইতিপূর্বে বিভিন্ন ধরণের দায়িত্ব পালন করলেও এমন দায়িত্ব সে কখনই পায়নি। যাই হোক, সে ভীত ছিল যে মুলাটো তার দুই চোখের মধ্যখানে গুলি করতে পারে। তার চেয়েও খারাপ হতে পারে, যদি কর্নেল শোকের ভেতরে চলে যায়।

এই বাইরেও বেলিসা একটা আকস্মিক তাড়না অনুভব করছিল কর্নেলকে সাহায্য করার। নিজের চামড়ার নীচে একটা কম্পমান উষ্ণতার অনুভব থেকে। দুর্বোধ্য কোন কারণে সেই মানুষটিকে স্পর্শ করার একটা শক্তিশালী বাসনা তৈরী হয়ে গিয়েছিল তার ভেতরে। ইচ্ছে জাগছিল কর্নেলের চামড়ার উপর দিয়ে আঙুল সঞ্চালন করার। অথবা নিজের বাহুর ভেতরে তাকে আলিঙ্গন করার।

একটা সারারাত এবং পরেদিনের একটা বড় অংশ বেলিসা ক্রিপাসকুলারিও নাটকের সংলাপ খোঁজার মত করে প্রেসিডেন্টের বক্তৃতার শব্দগুলো অনুসন্ধান করতে লাগল। তাকে খুব নিবিড়ভাবে পাহাড়া দিয়ে রেখেছিল মুলাটো। তার চোখ কখনই বেলিসার সামর্থ পা ও কুমারী বুক থেকে সরছিল না।

বেলিসা নিজের কর্কশ ও শুষ্ক শব্দগুলোকে পরিত্যাগ করল। এমনকি যেগুলো বেশী ফ্লাওয়ারী বা পুষ্পিত, মিথ্যা প্রতিশ্রুতিময়, অপব্যবহারের কারণে বিবর্ণ, বা হতবুদ্ধিকর -সেগুলকেও। শুধুমাত্র সেই শব্দগুলোকেই সে ব্যবহার করল যেগুলো পুরুষদের হৃদয়ে আলোড়ন এবং নারীদের ভাবনায় আবেদন সৃষ্টি করে।

অবশেষে ধর্মযাজকের কাছ থেকে ২০ পেসো দিয়ে কেনা সমস্ত জ্ঞান ব্যবহার করে কাগজের উপরে সে একটা বক্তৃতা লিখল। অতঃপর মুলাটোর দিকে ঈশারা করল রশি খুলে দেয়ার জন্যে। যে রশিগুলো দিয়ে তার পায়ের গোড়ালি দুটো একটা গছের সাথে বাঁধা ছিল।

তারা তাকে পুনরায় কর্নেলের কাছে নিয়ে গেল। কর্নেলকে দেখার পর বেলিসার ভেতরে পুনরায় হৃদকম্পন শুরু হল। যা সে অনুভব করেছিল প্রথমবার তার সাথে সাক্ষাতের পর। সে কাগজটি তাকে হস্তান্তর করে অপেক্ষা করতে লাগল। কর্নেল সেটাকে আঙুলের শীর্ষে ধরে পর্যবেক্ষন করতে লাগলেন।
“কি বলা হয়েছে এতে?” শেষ পর্যন্ত কর্নেল তাকে জিজ্ঞেস করল।

“তুমি কি পড়তে পার না?” বেলিসা ক্রিপাসকুলারিও উত্তর করল, আরেকটা প্রশ্ন দিয়ে।

“যুদ্ধ ছাড়া পৃথিবীতে আমি আর কিছুই শিখিনি,” সে উত্তর করল।

বেলিসা উচ্চস্বরে বক্তৃতাটি পড়ল। তিনবার, যাতে তার গ্রাহক সেটিকে নিজের স্মৃতির ভেতরে স্থাপন করতে সমর্থ হয়। এটা করার পর সে কর্নেলের লোকজনদের মুখে মুখে উত্তেজনা দেখতে পেল, যারা বক্তৃতাটি শোনার জন্যে সেখানে ভিড় করেছিল। সে কর্নেলের দিকে তাকাল। তার হলুদ চোখের দৃষ্টিতে ছিল উদ্দীপনা। বক্তৃতার শব্দগুলো ব্যবহার করে নির্বাচনের জয়ী হবার বিষয়ে আত্নবিশ্বাসী ছিল কর্নেল। ভাবচিল যে, প্রেসিডেন্টের সিংহাসন অবশ্যই তার হবে।

“আমাদের ছেলেরা যদি এই বক্তৃতা তিনবার শোনার পর বিস্মিত হয়ে থাকে, তাহলে আমি নিশ্চিত যে নির্বাচনে আমরা ভাল অবস্থান অর্জন করব।“ মুলাটো বক্তৃতাটি অনুমোদনের সুরে বলল।

“এই কাজের জন্যে তোমাকে কত দিতে হবে, হে নারী?” কর্নেল বেলিসাকে জিজ্ঞেস করল।

“এক পেসো, কর্নেল।“

“ঠিক আছে, এটা কোন ব্যাপারই না,” বেল্ট থেকে ঝুলতে থাকা থলি খুলতে খুলতে সে বলল। ওটার ভেতরে তার শেষ লুট করা অর্থের অবশিষ্ট ছিল।

“এছাড়াও তোমার জন্যে আমার একটি ছোট্ট উপহার আছে, কর্নেল। আমি তোমাকে দুটো গোপন শব্দ দেব,” বেলিসা ক্রিপাস্কুলারিও বলল।

“সেটা কেমন?”

সে তাকে জানাল যে, প্রতি ৫০ সেন্টের বিনিময়ে সে কাস্টমারদের প্রতিজনকে একটা করে শব্দ দেয়, যা শধুমাত্র তারাই ব্যবহার করতে পারে। কর্নেল নিঃস্পৃহতার সাথে মাথা নাড়ল। এই প্রস্তাব তার কাছে খুব বেশী আকর্ষনীয় মনে হয়নি। কিন্তু তার পরেও সে মহিলার সাথে রুঢ় হতে চাইল না, কারণ সে তার জন্যে যথেষ্টই করেছে।

বেলিসা শান্তভাবে যে টুলের উপরে কর্নেল বসেছিল, সেদিকে এগিয়ে গেল। অতঃপর নীচু হল উপহারটি দেয়ার জন্যে। একটা স্তন্যপায়ী গন্ধে, যা এই নারীর দিক হতে আসছিল, কর্নেলের স্নায়ুগুলো আলোড়িত হল। বেলিসার শরীরের উত্তাপ, চুলের স্পর্শ, পুদিনার গন্ধের মত শ্বাস-প্রশ্বাস, দুটো শব্দ বলার সময়ে কানের কাছে ফিসফিস শব্দ - সবকিছুই কর্নেলের ভেতরে স্পন্দন সৃষ্টি করতে লাগল।

“এগুলো তোমার, কর্নেল,” বেলিসা পেছনে ফিরে যেতে যেতে বলল। “তুমি যেভাবে ইচ্ছে, সেভাবে এগুলোকে ব্যবহার করতে পারবে,” সে যোগ করল।

মুলাটো বেলিসার সাথে রাস্তার ধার পর্যন্ত গেল। নেড়ি কুকুরের মত লালসাপূর্ণ চোখে অনুসরণ করতে করতে। যখন সে তাকে স্পর্শ করতে যাচ্ছিল, বেলিসা তখন সুচিন্তিত কিছু শব্দ বাণে তাকে নিরস্ত করল। এই শব্দগুলো মুলাটোর লালসাকে তাড়িয়ে দিল। কারণ, শব্দগুলোকে মুলাটোর কাছে মনে হল অলঙ্ঘনীয় অভিশাপ বলে।

সেপ্টেম্বর, অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে কর্নেল অসংখ্যবার বক্তৃতাটি দিল। তার কাছে মনে হল প্রদীপ্ত আলোর মত প্রভাব সৃষ্টিকারী শব্দগুলো যদি সে প্রবল আতিশয্যের সাথে ব্যবহার না করত, তাহলে সেগুলো পুড়ে ছাই হয়ে যেত। সারাদেশময় সে ভ্রমণ করতে লাগলো। নগরের পর নগরে সে প্রবেশ করতে লাগল বিজয়ীর বেশে। সবচেয়ে দুর্লঙ্ঘ স্থানগুলোতেও সে থামলো, যেখানে ফেলে দেয়া মদের কৌটাগুলোই শুধুমাত্র মানব অস্তিত্বকে জ্ঞাপন করে। সবকিছুই সে করল শুধুমাত্র ভোটারদের মনে নিশ্চিত বিশ্বাস জন্মানোর জন্যে। যাতে তারা তাকে প্রেসিডেন্ট বানাতে পারে।

মঞ্চের উপরে দাঁড়িয়ে কর্নেল যখন বক্তৃতা করত, মুলাটো ও তার লোকজনেরা তখন মিষ্টি বিতরণ করে বেড়াত। এবং সোনালী রঙ দিয়ে দেয়ালে দেয়ালে তার নাম লিখত। কিন্তু কেউই তাদের প্রচার কৌশলগুলো মনযোগ দিয়েও দেখত না। কারণ, তারা সবাই যাদুমুগ্ধ ছিল কর্নেলের প্রস্তাবের স্বচ্ছতা ও প্রাঞ্জলতা দিয়ে এবং তার যুক্তির কাব্যিক সৌন্দর্যে। অতীতের ভুলগুলোকে শুদ্ধ করার জন্যে তার অপরিসীম আবেগগুলো সত্যিকার অর্থেই ছিল সংক্রামক ধরণের। এবং জীবনে প্রথমবারের মত লোকজন নিজেদেরকে মনে করছিল সুখী।

প্রার্থী হিসেবে বক্তৃতা দেয়ার পর কর্নেলের লোকজনেরা আকাশের দিকে গুলি ছুড়ত ও আতসবাজি ফুটাতো। চলে যাবার সময়ে তারা জনপদের ভেতরে একটা আশার আলো রেখে যেত, যা দিনের পর দিন বাতাসের ভেতরে স্থায়ী হয়ে থাকত। ঠিক যেমন করে হঠাৎ দৃশ্যমান হওয়া কোন উলকা মানুষের স্মৃতির ভেতরে দীর্ঘকাল জাগরূক হয়ে থাকে। এভাবে, অতি অল্প সময়ের মধ্যেই কর্নেল সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনীতিবিদ হয়ে গেল। হয়ে উঠল একটা দুষ্প্রাপ্য ও বিস্ময়কর মানুষ, যে গৃহযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে এসেছে, শরীরে আঘাতের চিহ্ন এবং মুখে রাজার ভাষণ নিয়ে। তার সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ল চতুর্দিকে। জনগণের হৃদয়কে আন্দোলিত করতে করতে।

প্রেস তাকে লুফে নিল। দূরদেশ থেকে সাংবাদিকরা আসল তার সাক্ষাৎকার নিতে এবং তার কথামালাকে উদ্ধৃত করতে। সমান তালে তার বন্ধু ও শত্রু সংখ্যা বাড়তে লাগল।

“আমরা খুবই ভাল করছি, কর্নেল!” মুলাটো বলল তাদের ১২ সপ্তাহের সাফল্যজনক প্রচারণা শেষ হবার পর।

কিন্তু প্রার্থী এসকল বিষয়ে কোনই মনোযোগ দিল না। সে গোপন শব্দদুটো পুনরাবৃত্তি করতে লাগল। সেগুলো প্রতিবার পুনরাবৃত্তির পর তার মস্তিষ্কের ভেতরেই প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। সে এগুলোকে আবৃত্তি করতে লাগল বারংবার, যখনই সে নস্টালজিয়া আক্রান্ত হয়ে নরম হয়ে যেত। সে তার ঘুমের ভেতরেও সেগুলোকে আবৃত্তি করতে লাগল। এগুলোকে নিয়েই সে অশ্বের উপরে আসীন হত। এমনকি সে তার বিখ্যাত বক্তৃতা আওড়ানোর পূর্বেও সেগুলোকে সে আবৃত্তি করত। প্রতিবারেই যখন তার শব্দদুটো তার মাথার ভেতরে খেলত, তার মনে পড়ে যেত বেলিসা ক্রিপাস্কুলারিওর কথা এবং নিজের চারপাশে তার উপস্থিতি অনুভব করত। অতঃপর তার স্নায়ুগুলো বেলিসার শারীরিক গন্ধের স্মৃতিতে ভরপুর হয়ে যেত। বেলিসার পশ্চাৎদেশ থেকে আসা উষ্ণতা, তার চুলের স্পর্শ কর্নেলকে স্পন্দিত করতে থাকত, যতক্ষণ পর্যন্ত না সে ঘুমের ঘোরে হাঁটতে থাকত। এক সময়ে তার লোকজনেরা ভয় পেতে শুরু করল যে, প্রেসিডেন্ট হবার আগেই না সে মরে যায়।

“তোমার কি হয়েছে, কর্নেল?” মুলাটো তাকে অনেকবারই জিজ্ঞেস করল। অবশেষে একদিন কর্নেল নিজেই ভেঙ্গে পড়লেন এবং স্বীকার করলেন যে, তার যন্ত্রণার পেছনে বেলিসার দেয়া গোপন শব্দদুটো ছাড়া আর কোন অপরাধী নেই। এবং শব্দদুটো তার মাথার ভেতরে গেঁথে গেছে।

“শব্দদুটো তুমি আমাকে বল, আমি দেখতে চাই সেগুলো তাদের শক্তি হারায় কিনা,” মুলাটো বলল, কর্নেলের চিরকালের বিশ্বস্ত হিসেবে।

"আমি বলতে পারব না। সেগুলো শুধুই আমার জন্যে,” কর্নেল প্রত্যুত্তর করল।

দিনের পর দিন মালিকের অবস্থার অবনতি দেখে ক্লান্ত হয়ে একদিন মুলাটো তার কাঁধের উপরে বন্দুক ছুঁড়ে দিল এবং বেলিসা ক্রিপাস্কুলারিওকে খুঁজতে বের হল। সে তার পদচিহ্ন অনুসরণ করে দেশের বিশাল ভূপ্রকৃতি অতিক্রম করল এবং অবশেষে তার সন্ধান পেল দক্ষিণের একটা ছোট্ট গ্রামে। সাময়িক তৈরী করা অফিসের ভেতরে সে জপমালা আওড়াচ্ছিল। মুলাটো বেলিসার সামনে গিয়ে নিজের পা দুটো প্রসারিত করে দাঁড়াল এবং হাতের অস্ত্রকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। তার শরীরের প্রতিটি কোষ থেকে কর্তৃত্ব উদগীরন হতে লাগল।

“তুমি আমার সাথে যাবে,” সে নির্দেশ দিল।

ঠিক এই আদেশের জন্যেই যেন বেলিসা ক্রিপাস্কুলারিও প্রস্তুত ছিল এবং সব সময়েই সে জানত যে, এমনটা হবে। একদিন মুলাটো আসবে তাকে নিয়ে যেতে। সে তার কলমের স্ট্যান্ডকে হাতে তুলে নিল। তাবুর ক্যানভাসকে ভাঁজ করল। নিজের শরীরের উপরে শাল জড়িয়ে নিল। এবং নিঃশব্দে ঘোড়ার গদির উপরে গিয়ে বসল। পথিমধ্যে তারা পরস্পরের মধ্যে কোন অভিবাদন পর্যন্ত বিনিময় করল না।

বেলিসার জন্যে মুলাটোর কামনা ক্রোধে পরিণত হয়েছিল। তবে শুধুমাত্র একটা ভয়ই তার ভেতরে কাজ করছিল। তা হল বেলিসার শব্দের প্রখরতা, যা তাকে বাধ্য করল তাকে ধ্বংস করা থেকে বিরত রাখতে। সে তাকে কর্নেলের কাছে নিয়ে যেতেও ইচ্ছুক ছিল না। কারণ কর্নেল ইতিমধ্যে নিজেই বিভ্রান্ত ছিল বেলিসাকে নিয়ে। আবার সে এটা বেলিসাকে জানিয়ে খুশীও করতে চাচ্ছিল না যে, বছরের পর বছর যুদ্ধ যা অর্জন করতে পারেনি, বেলিসা তাই অর্জন করতে পেরেছিল শুধুমাত্র কর্নেলের কানের কাছে ফিসফিস করে কিছু কথা বলে।

তিনদিন পর তারা কর্নেলের ক্যাম্পে পৌঁছল এবং মুলাটো তার বন্দীকে তাৎক্ষণিকভাবে কর্নেল ও তার সৈনিকদের সামনে উপস্থাপন করল।

“আমি এই ডাইনীকে তোমার কাছে এনেছি, যাতে তুমি তোমার গোপন কথা তাকে ফিরিয়ে দিতে পার এবং তার কাছ থেকে তোমার পৌরুষ ফিরিয়ে নিতে পার, কর্নেল।“ সে বলল বন্দুকের নাল বেলিসাক্রিপাস্কুলারিওর ঘাড়ের দিকে তাক করে।

কর্নেল ও বেলিসা দূর থেকে পরস্পরের সাথে দৃষ্টি বিনিময় করল।

আশেপাশের সকল লোকজনেরা স্পষ্ট দেখতে পেল যে, কর্নেলের বিপজ্জনক বনবিড়াল চোখের দৃষ্টি কোনক্রমেই বেলিসা ক্রিপাস্কুলারিওর শব্দের যাদুময়তা থেকে মুক্ত হতে পারছে না। বেলিসা ক্রিপাস্কুলারিও এগিয়ে এসে তার হাত ধরার পর পশুটিকে শেষ পর্যন্ত শান্ত করা গেল।






অনুবাদক পরিচিতি:
মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ
গল্পকার। অনুবাদক। প্রাবন্ধিক।



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন