বুধবার, ৩ জুন, ২০২০

ওলগা তোকারজুক 'এর গল্প : সীমান্তভূমি

অনুবাদঃ ফজল হাসান 


আমি লেখালেখির জন্য সকালের সেটুকু সময় আলাদা করে রাখি, যখন সূর্য্যের উজ্জ্বল আলো আমার ঘরের ভেতর এসে টিবিলের কোণে ঠিকরে পড়ে এবং প্রশস্ত সাদা পাথরের পুরো মেঝে আলোয় আলোকিত হয় । তার জন্য তখন ঘরের জিনিসপত্র সবচেয়ে বেশি জ্বলজ্বলে দেখায় এবং আমার মাথাও স্বচ্ছ থাকে । আমি নিয়মিত লেখার পরিকল্পনা করি । কেননা নিয়ম মেনে চলাটাই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ।
ফাদার বেসিল আমাদের তাই শিক্ষা দিয়েছেন । তিনি শিখিয়েছেন যে, পুনরাবৃত্তি হলো বিশ্বের সত্যিকার চালিকা শক্তি এবং বিশৃঙ্খলা থেকে মন্দ জিনিসের উদ্ভব হয় । এই বিশৃঙ্খলা চালিকা শক্তিকে বাধা দেয় এবং বিভ্রান্তির সৃষ্টি করে । কিন্তু এখনো আমার মস্তিস্ক ভাবতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠেনি, এমনকি আমার হাতের আঙুলগুলোও লেখালেখির জন্য প্রস্তুত হয়নি । এ কারণে আমি এমন পদ্ধতি আয়ত্ত্ব করার জন্য আপাণ চেষ্টা করবো যে, আমি যা সহজে বলতে চাই তা যেন গুটি কয়েক শব্দ ব্যবহার করে বলতে পারি, বিশেষ করে যেহেতু এই সব চিন্তা-ভাবনা তাদের দয়ার কারণে আমার মাথায় সহজে আসে । তাদের উপর আমার কোন নিয়ন্ত্রণ নেই – তারা কোন সতর্ক সঙ্কেত ছাড়াই আমার স্মৃতিতে বিস্তারিত ভাবে জাগ্রত অবস্থায় থাকে এবং সবচেয়ে খারাপ মুহূর্তে সম্প্রসারিত বাক্য গঠন করে, যখন বিভিন্ন রঙে আমার হাত পরিপূর্ণ থাকে এবং আমি লেখার জন্য কোন কিছু পর্যন্ত পৌঁছুতে পারি না, অথবা যখন বাচ্চাদের সঙ্গে খেলা করার পালা আসে, যা করতে আমি পছন্দ করি । সত্যি কথা বলতে কি, আমি অন্য সব কাজ থেকে বাচ্চাদের সঙ্গে খেলতে বেশি ভালোবাসি । 

কিন্তু লেখালেখির প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করে নেওয়ার পর – তা ছিল ফাদার বেসিলের মৃত্যুর পর, যখন মনে হয়েছিল সবকিছু ভেঙেচুরে যাবে এবং ধ্বংস হবে – আমি আমার আগের শান্তি হারিয়েছি এবং জানতাম যে, চিরদিনের জন্য তা হারিয়ে যাবে । ঘুমও আমাকে এখন বিশ্রাম দিতে পারে না – এমনকি আমার সমস্ত আরাধনা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে এবং কিছুই অবশিষ্ট নেই । আমি ওগুলোর মধ্যে ঝাপ দিতে পারি না, যেমন কেউ বাতাসে ভাসমান তুষারপুঞ্জে ঝাপ দিতে পারে । এখন আমার হতভাগা মস্তিস্কের দরোজায় করাঘাত করে এবং পাঠকদের উপস্থিতির দাবি নিয়ে বাক্যরা যে কোন মুহূর্তে আসতে পারে । একমাত্র তাদেরকে যখন লিখে রাখি, তখন আমি শান্তি পাই । তারপর তারা চলে যায় । 

মহান প্রজ্ঞার অধিকারী ফাদার বেসিলের অবশ্যই জানা ছিল যে, ধীরে লেখার অভ্যাস এবং শব্দের অভাব সত্ত্বেও আমাদের মধ্যে কাজ সম্পাদন করার জন্য একমাত্র আমিই ছিলাম সবচেয়ে উপযুক্ত । তিনি সচেতন থাকার মুহূর্তেও তার অবরুদ্ধ কন্ঠ ও নিঃশেষিত গলার স্বর এবং উপস্থিত সবার সম্মুখে আমাকে অসংখ্য দায়িত্ব থেকে রেহাই দিয়েছেন, যেন আমি লেখালেখির জন্য পর্যাপ্ত সময় পাই । তিনি আমাকে রান্না করা থেকে নির্ভার করেন, অপছন্দনীয় দায়িত্ব থেকে অব্যহতি দেন এবং পরিস্কার করার কাজ থেকে নিস্কৃতি দেন । সীমান্তভূমির যত কাগজপত্র তার কাছে গচ্ছিত ছিল, তিনি সব আমার কাছে নিয়ে আসেন । এছাড়া তিনি লেখার জন্য আমাকে বিভিন্ন সহায়ক সরঞ্জামাদি দিয়েছেন। যদিও ওসব সরঞ্জামাদির মধ্যে অনেক কিছুই ছিল, কিন্তু শুকিয়ে গিয়েছিল । তাই সেসব শুকিয়ে যাওয়া সরঞ্জামাদি ব্যবহার করা যাবে না । আমার কাছে পুরো এক বাক্স রঙিন পেন্সিল আছে । গত শীতের পর আমরা যখন আমাদের দোকানে আর্দ্রতার উপস্থিতি আবিস্কার করি, তখন আমি রীমের পর রীম প্রতিটি কাগজের ছত্রাক পরিস্কার করেছি । অনেক চেষ্টার পরও খুব বেশি কাগজ উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি । যাহোক, ইতোমধ্যে একটা কাগজ অনেক পুরোনো হয়ে গেছে । কেননা কাগজটি পুনঃবিভাজনের আগের সময়ের ছিল । এছাড়া কাগজটির মধ্যে এক ধরনের ঘ্রাণ ছিল । আমি দোকানের ভেতর একটি পরিষ্কার কোণ থেকে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে গন্ধ পেয়েছি এবং কাগজের একাংশ চিবিয়ে অনুসন্ধান করেছি । কাগজটিতে আধ্যাত্বিক গভীর চিন্তার স্বাদ ছিল – সবচেয়ে খাঁটি এবং পবিত্রতম । এছাড়া কাগজটি ছিল আধ্যাত্বিক চিন্তার অন্যান্য কাগজের মধ্যে সবচেয়ে শুদ্ধতম । 
আমার মনে হয় আমি যা লেখি, তা নেহায়েত প্রথম খসরা । সুতরাং আমি উদ্ধার করা অনুপযোগী কাগজের রীম সরিয়ে সেখানে এক পাশে ছাপা লম্বা আকৃতির এক বাক্স অদ্ভূত কাগজ রাখি । সময়ের সঙ্গে সেসব কাগজের লেখা প্রায় অস্পষ্ট হয়ে গেছে । আমি যখন একটা কাগজ স্পর্শ করি, তখন আমার আশঙ্কা করার প্রয়োজন পড়ে না যে, কাগজের কোন দিক উপরে কিংবা কোন দিক নিচে আছে । আমি শুধু লিখি । কাগজের একদিকে লেখা দেখে মনে হয় কোন এক সোনালি সময়ে লেখা হয়েছিল এবং অবহেলায় পড়েছিল – আজ সেই অহংকার অনুধাবন করা অসম্ভব – কাগজের উল্টো দিক পরিস্কার, অলিখিত সাদা পাতা, যা নিস্ক্রিয় এবং অকেজো পাপে ভরা । কেমন করে অলিখিত পাতাগুলো নীরবতা বজায় রাখে, যেখানে তাদের উল্টোদিকের পাতায় বিভিন্ন ঘটনার সাক্ষী বহন করে, এমনকি চুক্তিনামা, পরিকল্পনা এবং চিন্তা-ভাবনা … । চতুষ্কোন সমতল পাতায় নানান ধরনের শব্দ উল্লেখ করা হয়েছে । তারপর ডান দিকে আছে পরিসংখ্যান । যেমন: 

শুরু ব্যালান্স . . . . . . . . . . . . . . . . ২,৩৫৫.৮৯ 
ঋণের সীমা . . . . . . . . . . . . . . . . . ৫,০০০.০০ 

এবং নীচে লেখা: 
মোট বিবেচনাহীন লেনদেন . . . . . . . . . ১১,৮১২.০০ 
আমি জানি না এসবের অর্থ কি । 

আমি প্রতিদিন সকালে দু’ঘন্টা লিখি । তখন আমি সকালের নরম রোদে পা গরম করি এবং বিরানভূমি থেকে নদীর ওপর দিয়ে ভেসে আসা শুষ্ক বাতাসের মধ্যে আমি নিজেকে সম্পূর্ণ ডুবিয়ে রাখি । অনেক সময় – তবে সচারচর নয় – যেহেতু অন্য পাড়ে দূর্গের মতো সংরক্ষিত আমাদের লক্ষ্যবস্তু রয়েছে, তাই আমার মনোযোগ গোলাবারুদের মতো নির্গত হয় । আমার মনে হয় বেশির ভাগ সময়ই উল্টো দিকে যেসব লক্ষ্যবস্তু আছে, তা অনেক আগেই আমাদের বিরক্ত করা বন্ধ করে দিয়েছে । টেবিলের ওপর দুষ্পাচ্য অনেক জিনিস আছে এবং সেগুলো ফাদার বেসিল বিশ্বাস করে আমার কাছে গচ্ছিত রেখেছেন, যেমন কাঁচি, রঙিন পেন্সিল, কলম এবং সেই কলমের কালি আমি নিজের হাতে তৈরি করি। এছাড়া আমার কাছে এমন একটা জিনিস আছে যা আমি তার, অর্থাৎ উদিনার, কাছ থেকে গ্রহণ করেছি, অবশ্যই তার নিঁখোজ হওয়ার আগে । বলাবাহূল্য, জিনিসটি সুন্দর, কিন্তু জটিল । জিনিসটির নিচের দিকে এগারোটি সরু কাঠি গোল করে তার দিয়ে বাঁধা এবং একটা মোটা সাদা কাগজ দিয়ে সংযুক্ত । তবে দূভাগ্যবশত যে, সেটা এখন নোংরা হয়ে গেছে । যাহোক, কেউ যদি কাঠিগুলো ছড়িয়ে দেয় এবং কাগজ খুলে বিছিয়ে দেয়, তখন দেখা যাবে যে কাগজের মধ্যে কালো কালির বিভিন্ন ধরনের নকশা রয়েছে এবং অবশ্যই সেসব নকশা অদ্ভূত লেখার প্রতীক হবে । আমি যখন চিন্তার খেই হারিয়ে ফেলি, তখন কাগজটি খুলি এবং পুনরায় ভাঁজ করি – এখন যেমন – এবং এই কাজটি আমাকে সাহায্য করে । কাগজটি হাতের নাগালের মধ্যে রাখি এবং খুবই আকর্ষণীয় । হাতের মুঠোয় নিয়ে ধরলে এক ধরনের আনন্দ দেয় । সেই আনন্দ উপভোগ করার সময় সত্যি জানার কোন প্রয়োজন পড়ে না যে, কাগজটি কোন কাজে ব্যবহার করা হয়েছিল । 

আমাদের সবার মতো, আমি কাজকর্ম শেষ করে ফাদার বেসিলকে ধন্যবাদ জানানোর জন্য এসেছি, যদিও আমি হুবহু বলতে পারবো না যে ঘটনাটি কেমন করে ঘটেছে । তখন আমার বয়স মাত্র কয়েক বছর এবং আমি স্মরণ করতে পারি – যদিও কুয়াশার মতো ঝাপসা – এক বৃদ্ধা মহিলা আমার যত্ন করেছিলেন । ফাদার বেসিল আমাকে বলেছিলেন যে, বৃদ্ধা ছিলেন আমার ঠাকুরমা, যিনি মারা গেছেন। ফাদার বেসিল প্রায়ই আমাদের বলতেন, কিভাবে অন্ধকার নেমে আসার পর বিরাট বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছিল এবং পতন ঘটেছে । কিন্তু সেই ঘটনা সংঘটিত হওয়ার আগে মানুষের নড়াচড়া করার জন্য এক ধরনের ভয়ঙ্কর ক্ষমতা ছিল এবং এমনকি দূরত্বে থেকেও একজন আরেকজনের সঙ্গে কথা বলতে পারতো । অনেকদিন আগে তিনি মাটির নিচের ঘরে এমন একটি ক্ষুদ্র যন্ত্রের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন । একজন লোকের যন্ত্রের প্রতি যখন বিশ্বাস থাকে, তখন যন্ত্রটি সামান্য একটা বুদুবুদ থেকে আলোকসজ্জা আনতে পারে । কিন্তু তারপর সেই ক্ষুদ্র যন্ত্রটি কাজ করা বন্ধ করে দেয় এবং ভেতরের স্বচছ বাল্ব ভেঙে যায় । 

যা কিছু ঘটুক না কেন, যুদ্ধ এবং বিশৃঙ্খলা সেসব জিনিসকে ধ্বংস করে দিয়েছে কিংবা ক্রুদ্ধ লোকজন চুরি করে নিয়ে গেছে । তারপর সবকিছু এবং সবই হারিয়ে যায় । ফাদার বেসিল কখনো আমাদের সঙ্গে বসতেন এবং বিভিন্ন জিনিসের স্কেচ করতেন, যা দৃশ্যত আমাদের দখলে চলে যেত । সেসব স্কেচের মধ্যে কিছু ছিল অদ্ভূত, আমি মনে করেছি – তিনি আমাকে ক্ষমা করুন – সেগুলো কল্পিত কাহিনী । কিন্তু ফাদার বেসিল আমাদের – এবং নিজেকে – একসময় বিশ্বজগত কেমন ছিল, তা স্মরণ করিয়ে দেওয়ার জন্য পরবর্তীতে সবার মাঝে স্কেচ সরবরাহ করা বন্ধ করে দিয়েছিলেন । তিনি প্রতিদিন আমাদের বলতেন যে, সীমান্তভূমিতে বাস করার জন্য আমরা ছিলাম সবচেয়ে পবিত্র দায়িত্বের অধিকারী: বর্বরদের হাত থেকে সভ্যতাকে রক্ষা করা প্রয়োজন এবং অতীতের জন্য আবেগপ্রবণ হওয়ার পরিবর্তে যা আছে, তার প্রতি আমাদের মনোনিবেশ করা উচিত । এছাড়া আমাদের সীমান্তভূমিতে আর যা কিছু আছে, প্রুট নদী, যা সভ্য বিশ্বের বিশৃঙ্খলা থেকে আলাদা করেছে, এমনকি সৈন্যবাহিনীর দূর্গের অভ্যন্তরে যা কিছু অবশিষ্ট আছে, যেখানে প্রায়ই পথভ্রষ্ট লোকজন দাঁড় টানা নৌকা করে নদী পাড়ি দিয়ে আসার চেষ্টা করতো । তখন কেউ না কেউ তাদের নৌকা ডুবিয়ে দিত । এত কিছুর পরও সেখানে আছে পবিত্র কুমারী১, বিশ্বমাতা এবং বিশ্বরানী । তাদের জন্য প্রতিবছর আমরা বিশৃঙ্খলার সময় নিজেদের উন্মোচিত করি । এই কাজ অব্যহত থাকবে, যতদিন না পর্যন্ত সভ্য জগত পবিত্র কুমারী, বিশ্বমাতা এবং বিশ্বরানীর পথনির্দেশনায় আরো একবার একত্রিত হবে এবং দেশভাগের পূর্বে যেমন ছিল, সেই অবস্থায় ফিরে যাবে । 

শুরুতে আমি ছিলাম ক্যালফ্যাক্টর২ এবং অস্বাভাবিক সব কাজ করতাম । অন্য ছেলেদের মতো – ফাদার বেসিল আমার মতো যেসব ছেলেদের দেখভালের দায়িত্ব নিয়েছিলেন – এভাবে আমার কাজ শুরু হতো: আমরা সীমান্তভূমিতে কাঠ সরবরাহ করতাম । আমাদের জন্য সেই কাজ অত্যন্ত কষ্টের ছিল । কেননা অভিবাসীরা এসে অনেক গাছ কেটে ফেলেছিল । কাঠ সংগ্রহ করে আমরা ছোট ছোট আঁটি বাঁধতাম এবং সেগুলো নিয়ে দক্ষিণে যেতাম । জায়গাটি ছিল এখান থেকে অনেক দূরে, পাহাড়ের পাদদেশে । আমাদের কাছে যেই পরিমাণ কাঠ থাকতো, আমরা তা চেরাই করতাম । সেই সময় বড় ছেলেরা প্রুট নদীর স্রোতের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিশাল আকৃতির কাঠের গুড়ি পানিতে ভাসিয়ে সীমান্তভূমিতে নিয়ে যেত । এই কাজ পুরো গ্রীষ্মকাল ধরে চলতো । তারপর শীতকালে, যা খুবই দুঃখজনক এবং অত্যাচারেরও, ফাদার বেসিল আমাদের শেখাতেন কেমন করে সূতা রঙিন করতে হয় এবং সুঁই দিয়ে কাপড়ে কারুকাজ করতে হয় । আমার শারীরিক কষ্ট হতো এবং সেই কষ্টের মধ্যে আমি শীতের রাতের কথা ভাবতাম, যখন আমরা সবাই মিলে প্রজ্জ্বলিত অগ্নির পাশে জড়ো হয়ে আমাদের মন ও হাতগুলোকে আগুনের তাপে উষ্ণ করে নিতাম । এছাড়া সেই শীতের রাতে আমরা ফাদার বেসিলের প্রার্থনাগুলোও মুখস্ত করতাম । 

ফাদার বেসিল একবার আমাকে দোকানে কাঠ নিয়ে যেতে দেখেছেন এবং তারপরই আমার ওপর তার স্নেহ-মমতা জন্মে । আমি জানি না, তার আনুকল্য পাওয়ার জন্য আমি কি এমন বিশেষ কাজ করেছি। যাহোক, সেসব কঠিন কাজ থেকে তিনি আমাকে মুক্ত করে কাপড় রঙ করার কাজে নিয়োজিত করেছিলেন এবং আমাকে লেখার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছিলেন – সম্ভবত পরে আমি যা করেছি, তা লেখালেখির কিছুই করিনি । ফাদার বেসিল সবসময় প্রত্যেকের প্রতি স্নেহ-মমতার দৃষ্টিতে নজর রাখতেন, যা ছিল সহানুভূতির লক্ষণ এবং তাতে কোন সন্দেহ ছিল না । তিনি আমাকে চুলার আগুন দেখাশুনার দায়িত্ব দিয়েছিলেন । সকালে আমি সিঁড়ি বেয়ে নিচে-উপরে দৌঁড়ের ভঙ্গিতে উঠানামা করতাম এবং চুল্লি থেকে ভস্ম বের করে মাঠে নিয়ে ছড়িয়ে দিতাম, যদিও তখন ধূসর রঙের সমস্ত ছাই পশ্চিমা বাতাসে উড়িয়ে এনে সরাসরি আমার চোখেমুখে ছড়িয়ে দিত । তাতে আমাকে নোংরা দেখাত এবং সবার কাছে আমি হাসির খোরাক হতাম । 

আজকের তুলনায় অতীতে সীমান্তভূমি বেশি জনবহুল ছিল । তবে এখনো পশ্চিমা দেশ থেকে জোর করে লোকজন এনে এখানে জড়ো করা হয় । যদিও আমরা কাউকে আমাদের কাছে আসার অনুমতি দিতাম না, তারপরও তাদের মধ্যে অনেকেই আমাদের সংস্পর্শে আসতে চাইতো । তখন আমরা শুধু আমাদের আস্তাবল এবং বাগানে প্রবেশের অনুমতি দিতাম । ফাদার বেসিল চাইতেন না যে, তারা আমাদের ওপর কোন ধরনের প্রভাব বিস্তার করুক । সেসব লোকজনের মধ্যে কেউ আমাদের এপাশের নদীর উঁচু তীরে দৃষ্টি ছড়িয়ে দিত । অন্যেরা নদীর ওপর পাড়ে, যা ছিল বন্য, সমতল এবং অবিশ্বাস্য, তাকিয়ে থাকতো যতক্ষণ না পর্যন্ত তারা মুখ ঘুরিয়ে যেখান থেকে এসেছিল, সেখানে ফিরে যায় । সেখানেও ছিল বড় ধরনের বিক্ষোভ । শুষ্ক ও তৃণাবৃত জমি অতিক্রম করে ভিনদেশীরা আসতে পারে এবং যখন তারা সত্যি আসতো, তখন তাদের মৃত- ক্লান্ত পশুর মতো মনে হত । তারা যে কোন মূল্যে নদী পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করতো । কিন্তু সেনাবাহিনীর দূর্গ থেকে তাদের ওপর গুলি বর্ষণ করা হত এবং তারা দলছুট হয়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত । পশ্চিম থেকে যারা আসতো, তারা আমাদের লোকজন এবং একই ভাষায় কথা বলতো অথবা অত্যন্ত একই ধরনের ভাষা ব্যবহার করতো । তারা নদীর উঁচু তীরে এসে দাঁড়াতো । সামনের উল্টো দিকের বসতী এবং একঘেঁয়েমীর ভূখন্ড তাদের বাস্তবে ফিরিয়ে আনতো । সেটাই ছিল শেষ এবং আরো এগিয়ে যাওয়ার কোন প্রয়োজন ছিল না – এখানেই ছিল পৃথিবীর বন্ধন, যা অনেক পরে ছিঁড়ে যায় এবং কখনই আর জোড়া লাগানো সম্ভব নয় । সুতরাং কিছু সময়ের জন্য তারা আমাদের সঙ্গেই থাকতো এবং তারপর তারা হতাশায় জবুথবু হয়ে পড়তো । সন্ধ্যায় তারা আগুন জ্বালাতো এবং আগুনের চারপাশে আমাদের উঠানের পুরোটা জুড়ে বিশাল বৃত্ত তৈরি করতো । বিভিন্ন কন্ঠের সঙ্গীতের মুর্চ্ছনা স্বর্গ পর্যন্ত ওপরে উঠে পবিত্র কুমারী এবং শিশুপুত্রের কাছে পৌঁছুতো । বিশাল বড় হাঁড়ি থেকে শুকনো কাঠের ওপর খাবার পরিবেশন করা হতো । তখন আমি ভাবতাম মটরশুঁটির তৈরি স্যুপের গন্ধই তামাম দুনিয়ার সবচেয়ে সুন্দর ঘ্রাণ । 

আমি জানি না এটা কি আমার স্মৃতি, নাকি অন্যকিছু । এখন সেসব দৃশ্যাবলী আরো গভীর ভাবে জড়িয়ে একসঙ্গে, বিশুদ্ধ এবং আপন হয়ে ধরা দেয় । তখন সবকিছুরই অধিক ছিল – সূর্য্য, আলো, গন্ধ, বিশদ বিবরণ, এমনকি জিনিসপত্রও । আমরা যেই লিনেন বুনেছিলাম, যা ছিল পোক্ত এবং মসৃন, তাতে সূতার রঙ ছিল প্রাণবন্ত এবং পরিধান করার জন্য ছিল আরো বেশী প্রতিরোধমূলক । কাজ করার কাঁচি ছিল ধারালো এবং দরোজার হাতল, যেখানে ছিটকানি দিয়ে লাগানোর কথা, ঠিক সেখানেই লাগানো থাকত । পাত্রের ঢাকনা ঠিকমত বসানো যেত, এমনকি এখনো কিছু ধরনের জুতায় লিনেন থেকে তৈরি নরম সূতার পরিবর্তে শক্ত ফিতা আছে । আমি এমন আরো অনেক উদাহরণ দিতে পারি । এখন আমাদের এই পৃথিবীতে একটা অদ্ভূত কিছু ঘটেছে – যেমন এটা ভেঙেচুরে গেছে, যেমন এটা তার সজীবতা হারিয়ে ফেলেছে এবং যেমন এটা পচে গেছে । 

কিন্তু আমি অস্বীকার করতে পারি না – ফাদার বেসিল শীতকালীন রাতে আমাদের শিখিয়েছেন – যে, আমরা শুধু আমাদের জন্য নিজেদের ইন্দ্রিয় দিয়ে তামাম দুনিয়াকে অবলোকন করতে পারি । অবশ্য ইতোমধ্যে আমার বয়সের সঙ্গে কুড়ি বছর যুক্ত হয়েছে এবং একটি হারিয়ে যাওয়া ছেলে থেকে আমি বড় হয়ে পুরুষ হয়েছি । এখন আমি সীমান্তভূমির একজন অভিভাবক এবং এই পবিত্র পরিবারের একজন সদস্য । স্বীকার করছি, যদিও বর্তমানে পরিবারটি আগের তুলনায় ছোট, কিন্তু তারপরেও এটা একটি পরিবার । আমি এত বদলে গেছি যে, মাঝেমধ্যে মনে হয় আমি অন্য কেউ, সম্পূর্ণ আলাদা একজন মানুষ । সুতরাং হয়তো এটা সবচেয়ে ভালো হবে যদি এই বিশ্বকে জানার জন্য আমার কোন আগ্রহ না থাকে এবং আত্ম-অনুভূতির পরিবর্তে নিজেকে গুটিয়ে রাখি । 

যাহোক, আমার কাছে সবকিছু একই মনে হয় । তবে ফাদার বেসিল একটি ভুল করেছেন: তিনি আমাদের যা কিছু বলেছেন, তা নিয়মিত টুকে রাখার প্রয়োজন ছিল না । এখন আমি অনুভব করতে পারি, তার শেখানো কিছু কিছু বিষয় বিস্মৃতির খেরোপাতায় অষ্পষ্ট হয়ে যাবে । আমাদের তত্ত্বাবধায়ক দ্বিতীয় ম্যাথুস, যাকে মুমূর্ষ ফাদার বেসিল শীতকালে আমাদের লেখাপড়ার দায়িত্ব নেওয়ার জন্য মনোনীত করেছিলেন, ফাদার বেসিলের মৃত্যুর পরে তার শূন্যতাকে উপলব্ধি করে মানসিক ভাবে ভেঙে পড়েছিলেন । অবশেষে তিনি গত বসন্তে আমাদের অন্যান্য ব্রাদ্রারদের মতো হাওয়া হয়ে যান । যারা থেকে গিয়েছিলেন, তারা ক্রমশ নিজেদের গুটিয়ে নেন । এখন আগের মতো এক সঙ্গে থাকাটা আমাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে । অনেক সময় ভাবি, ফাদার বেসিলের শেখানো কতগুলো গল্প আমি ভুলে গিয়েছি । তার বলা গল্পগুলো আমার মাথার ভেতর মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে, এমনকি কতগুলো জরুরী বিষয়ের বিবরণ আমি হারিয়ে ফেলেছি । আমাদের দৈনন্দিন কাজগুলোকে তিনি কতই না সহজ করে দিতেন । উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, আমি এখন আর প্রভুর নিকট আত্মীয়দের নাম স্মরণ করি না । আমি শুধু এটুকু জানি, তারা ছিল বারো জন, যা আমাদের গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত বইয়ের সংখ্যার সমান । 

তিন বছর আগে জানুয়ারী মাসের শুরুর দিকে দীর্ঘ, মলিন এবং প্রচন্ড শীতের কোন এক প্রত্যুষের খানিকক্ষণ আগে ফাদার বেসিল মৃত্যুবরণ করেন । আমরা তার মৃতদেহ থেকে হৃদপিন্ডকে বের করে একটা বাক্সের ভেতর রাখি । তারপর তার মৃতদেহের অবশিষ্ট অংশ বাইরের দেওয়ালের পাশে সুন্দর জায়গায় এমন ভাবে সমাহিত করেছি যেন তিনি পশ্চিমের ভালো দৃশ্য অবলোকন করতে পারেন, যা এত দীর্ঘ সময় ধরে তিনি আকুল আকাঙ্খায় ছিলেন । যাহোক, পরের দিন সন্ধ্যায় তিন ব্রাদার, চতুর্থ মারেক, প্রথম ম্যাথুস এবং প্রথম মারেক, বাক্সের ঢাকনা খোলেন এবং হৃদপিন্ড বের করে মাঝখানে কেটে দ্বিখন্ডিত করেন । তাদের স্মরণে ছিল ফাদার বেসিলের কথা: ‘প্রভুর ক্রুশ চিহ্ন আমার হৃদয়ের গভীরে প্রোথিত ।’ এবং সত্যি তার হৃদপিন্ড ছিল অন্যদের হৃদপিন্ডের তুলনায় বড় – প্রথম ম্যাথুস তাই বলেছেন, যিনি এসব বিষয়ে ভালো জানতেন । তারা হৃদপিন্ডের ভেতর ছোট্ট ক্রুশের মতো একটা কিছু পেয়েছিলেন, যা ছিল হাঁড়ের মতো জিনিস দিয়ে তৈরি । তখন আমাদের মধ্যে একধরনের উত্তেজনা টগবগ করতে থাকে । কেননা আমরা জানতাম যে, সেটা ফাদার বেসিলের পবিত্র আত্মার প্রমাণ । অন্ধকারের মধ্যে ঠান্ডায় এবং আমাদের বিচ্ছিন্নতার মাঝে সিদ্ধান্ত নেই যে, আমরা সম্পূর্ণ সমাহিত দেহ ময়নাতদন্ত করবো । তারপরই ঘটে এক সত্যিকারের অলৌকিক ঘটনা – পিত্তকোষে তিনটি বৃত্তাকার বস্তু, যা আমরা ট্রিনিটি৩-র প্রতীক হিসাবে সনাক্ত করি । এছাড়া আমরা ফাদার বেসিলের দেহের অভ্যন্তরে আরো জিনিস পেয়েছি, যেগুলো ছিল তার দেহের মাংস দিয়ে তৈরি, যেমন মুকুটের কাঁটা, চাবুক এবং নখ । আমরা এখন সেসব জিনিস কড়া পাহাড়ার মধ্যে রেখেছি । 

আবহাওয়া এবং ক্যালেন্ডার সম্পর্কে আমাদের যেটুকু জ্ঞান ছিল, দ্বিতীয় ম্যাথুস-এর প্রস্থানের সঙ্গে সঙ্গে সেটুকুও উধাও হয়ে যায় । সত্যি কথা বলতে কি, আমাদের জন্য তা ছিল বেদনাদায়ক ক্ষতি । যেহেতু ঘটনা ঘটেছে, তার জন্য আমরা বসন্ত এবং গ্রীষ্মকালীন ঋতু পরিবর্তন নিরূপন করতে সক্ষম হইনি । তার পরিবর্তে আমরা যা কিছু দেখি, সেই দেখার ওপর ভিত্তি করে অনুমান করি । জন্মান্তরের মহারাত্রি এখন দিনের বেলা পালন করা হয়, যখন প্রুট নদীতে জমে থাকা বরফ গলে যায় এবং আমরা জন্মদিন পালন করি যখন রাত গভীর অন্ধকারে ডুবে যায় । অসহনীয় ঠান্ডায় আমরা দুঃখ ও হতাশায় ডুবে থাকি । কিন্তু আমাদের সবচেয়ে জাঁকজমকপূর্ণ ছুটির দিন হলো স্ট্যান্ডার্ড৪ দিবস । এই বিশেষ দিনটি স্মরণ করা হয় যখন সূর্য্য এবং জীবনের প্রতি বিশ্বজগত সবচেয়ে বেশী উন্মুক্ত হয়, যখন আকাশ পরিস্কার এবং বন্ধুত্বপূর্ণ হয়, এবং স্বচ্ছ হাওয়া শুষ্ক এবং তৃণাবৃত সমতল প্রান্তর জুড়ে আমাদের ভাবমূর্তি ছড়িয়ে পড়ে । 

ফাদার বেসিলের সময় স্ট্যান্ডার্ড দিবস সত্যি মনে রাখার মতো আনন্দময় ছুটি ছিল এবং এতে পুরো সৈন্যবাহিনী অংশগ্রহণ করতো । এই জাঁকালো দিনটির সম্মানার্থে সেনাবাহিনীর অনেকগুলো ডিভিশন সারাদিন তোপধ্বনির মাধ্যমে উদযাপিত হতো । কামানের গর্জণে নদীর অপর তীরে অসভ্য মানুষেরা ভয়ে ভীত ছিল এবং তারা তাজ্জব বনে যেত । ফাদার বেসিল দাবি করতেন – এবং শৈশবে আমি নিজের দু’চোখে দেখেছি – যে, যখন বর্বর যাযাবর লোকেরা ভয়ে পৃথিবীতে নেমে এসেছিল, তখন স্ট্যান্ডার্ড উজ্জ্বল দ্যুতি ছড়াতো, যা প্রায় দ্বিতীয় সূর্য্যের মতো ছিল । কিন্তু বিগত কয়েক বছর ধরে অসভ্য মানুষজন সানন্দে আসেনি । তারা বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছে । যদিও এখন নৌকা করে নদী পাড়ি দিয়ে আসাটা অনেক সহজ হয়েছে, তারপরেও ঘটনাক্রমে তারা হাল ছেড়ে দিয়েছে । 

এসব কারণেই আমি মাঝেমাঝে লেখালেখি থেকে ছুটি নেই । কেননা, আমি আগেই উল্লেখ করেছি, স্ট্যান্ডার্ড দিবস পালন করার প্রস্তুতি ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে । আমাকে সুতার রঙ পরীক্ষা করতে হবে, দেখতে হবে কাপড় যথেষ্ট মসৃণ কি না, এবং কাপড়ের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের কাজ একে অপরের পরিপূরক কি না । গত বছর স্ট্যান্ডার্ড নষ্ট হয়ে গিয়েছিল এবং আমরা ভয়ঙ্কর শীতের সময় প্রতি সেন্টিমিটার করে পুরোটা মেরামত করেছি । আর্দ্রতার জন্য স্ট্যান্ডার্ডের কিছু নির্দিষ্ট অংশের রঙ হালকা হয়ে গিয়েছিল অথবা নষ্ট হয়েছিল এবং সেগুলো বদলাতে হয়েছিল । স্ট্যান্ডার্ডের বেশির ভাগ অংশ পুনঃব্যবহার করার সিদ্ধান্ত আমরা নিয়েছি এবং নতুনত্বের জন্য বিভিন্ন উপাদান দিয়ে সেটা আরো বেশি সমৃদ্ধ করার সুযোগ গ্রহণ করেছি । অবশ্যই এ কাজের ফাঁকে আমাকে আমাদের দু’সন্তানের দেখভাল করতে হয়েছে । 

আমাদের ছেলেমেয়েদের নাম পিটার এবং পল, কিন্তু পল হলো মেয়ে । আমিই ওদের নাম রেখেছি । এক সময় পর্যন্ত ওরা আমার দেওয়া নামেই পরিচিত ছিল, কিন্তু পরবর্তীতে ওরা বর্বর নামে পরিচিতি লাভ করে, যা উচ্চারণ করা কিংবা মনে রাখা আমার জন্য ভীষণ কঠিন । আমি ওদের সভ্য নাম চেয়েছিলাম, যেন ওরা আমাদের এই জগতে একটু সহজ হয় এবং অনায়াসে মিশতে পারে । আমি ওদের মা ক্রিস্টোফারকে বলেছিলাম, কিন্তু সে আমার কথায় কোন আমল দেয়নি, বরং অনেক সময় আমার কথা তার হাসির খোরাক যুগিয়েছে । আমরা তার নাম পছন্দ করি, কিংবা না করি, তা উপেক্ষা করে সে নিজেকে উদিনা নামে পরিচয় দিত । যাহোক, শেষপর্যন্ত তার মতো আমরাও একই কাজ করতে বাধ্য হয়েছিলাম । এটা লজ্জার বিষয় ছিল, কেননা ক্রিস্টোফার, ফাদার বেসিল আমাদের যেমন বলেছিলেন, সে ছিল একজন মহান ব্যক্তি । সে তখন তরুণ ছিল এবং পানিতে সাঁতার কাটা শেখার আগে সে প্রভুকে বহন করে নদী পাড়ি দিয়েছিল । আমি এই ভেবে গর্ব অনুভব করি যে, তাদের দু’জনের কাহিনীর মধ্যে সাদৃশ্য খুঁজে পেয়েছি । কারণ উদিনাও বসন্তের শুরুতে আমাদের কাছে এসেছিল, ঠিক পুনর্জন্মের আগের দিন । শক্ত কাপড় দিয়ে মোড়ানো তার পিঠে এবং পেটের সঙ্গে বাঁধা ছিল সন্তানেরা । সে ভাসমান তুষারস্তরের একটা থেকে অন্যটায় গিয়েছে । তখন শুধু তার নাকের চামড়া ভেসেছিল এবং বরফশীতল পানিতে তলিয়ে যাওয়া থেকে নিজেদের রক্ষা করেছিল । শেষপর্য্ন্ত তারা আমাদের তীরে পৌঁছুতে পেরেছিল । আমি এখনো বুঝতে পারছি না, সৈন্যবাহিনীর দূর্গ থেকে কেন তাদের লক্ষ্য করে কোন গুলি ছোড়া হয়নি । হয়তো সৈনিকেরা তখন মাতাল ছিল কিংবা নদীতে অদ্ভূত আকৃতির অবয়ব দেখে তারা ভয় পেয়েছিল । যখন আমাদের কাছে এসে পৌঁছে, তখন উদিনা ছিল প্রায় প্রাণহীন, এমনকি ভীষণ নোংরা । বাচ্চাগুলোর অবস্থাও তথৈবচ । একটা ভয়ঙ্কর দৃঢ়মুষ্টি, ঠান্ডা এবং ক্ষুধায় নীল হয়ে গেছে । দূর্গের অভ্যন্তরে যারা ছিল, ঘটনা শোনার পরে এবং আমাদের সঙ্গে কয়েকজন ভিনদেশী থাকার খবর পেয়ে তারা চটজলদি ছুটে এসে তাদের উদ্ধার করতে চেয়েছে। এটাই হলো সীমান্তভূমির আইন, যেখানে বলা হয়েছে, নদীর অপর পাড়ের মানুষের এপাড়ে থাকার কোন অনুমতি নেই । আমি সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত দায়িত্ব নিয়েছি এবং সৈনকদের বোঝাতে সক্ষম হয়েছি যে, এই তিনজন, এখনো যারা জীবিত আছে, সভ্য বিশ্বের কাছে কোন ধরনের হুমকি নয় এবং যেই মাত্র তারা সুস্থ হয়ে উঠবে, তখনই আমরা তাদের একটা নৌকায় তুলে দেব এবং তারা যেখান থেকে এসেছে, সেই জায়গায় ফেরত পাঠাবো । 

উদিনা ছিল আমার দেখা একমাত্র প্রাপ্তবয়স্কা নারী । সুতরাং আমি এখন বলতে পারি যে, নারীত্বের তিনটি স্বতন্ত্র পর্যায়ের সঙ্গে আমি পরিচিত: আমার ঠাকুরমা, যার কথা আমার কদাচিৎ মনে পড়ে (সর্বোপরি তার শুষ্ক এবং হাড্ডিসার হাতের আলিঙ্গণ), পরিণত নারী রূপে উদিনা, যে বেড়ে ওঠার চুড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে, এবং পল, ক্ষুদ্র নারী, যে কি না সদ্য হাঁটা শিখেছে । অবশ্যই অত্যন্ত আশ্চর্যের বিষয় যে শারীরিক বৈশিষ্ট্য ছাড়া কোন দৃষ্টিকোণ থেকে উদিনা পৃথক নয় । কিন্তু প্রশংসা ঈশ্বরের, বাইরের ট্যাঁরা দৃষ্টি থেকে তাদেরকে আড়ালে রাখা হয়েছে । 

উদিনাকে নিয়ে লেখা আমার জন্য কঠিন । কেননা তার প্রতিটি স্মৃতি একধরনের কঠিন যন্ত্রণা এবং দুঃখ দিয়ে আমার হৃদয়কে ভরিয়ে দিয়েছে । তাকে আমাদের মধ্যে রাখার জন্য আমরা সাধ্যমত চেষ্টা করেছি এবং একটা উষ্ণ ঘর ও খাবার দিয়েছি । যদিও তার সঙ্গে কথাবার্তা বলা কঠিন ছিল । তার কারণ ছিল সে বর্বরদের ভাষায় কথা বলতো । আমাদের মাঝে আমরা তাকে ব্রাদারদের মতো গ্রহণ করেছিলাম । আমি তাকে কাপড়ে রঙ করা শিখিয়েছি এবং এক টুকরো কাঁচ থেকে কেমন করে আগুন জ্বালাতে হয়, তাও দেখিয়ে দিয়েছি । এছাড়া তাকে সূঁচিকাজ এবং সুতার রঙ পছন্দ করার কৌশলও শিখিয়েছি । তার দেহের গড়ন ছিল দীর্ঘ, চুল ছিল কালো এবং চোখ ছিল হালকা বাদামি রঙের । এছাড়া তার মুখ ছিল মসৃন । কিন্তু উদিনা ছিল বর্বর । সে আমাদের ভয় করতো । আমি যে জায়গা তার জন্য বরাদ্দ করেছিলাম, সন্ধ্যায় সে সন্তানদের নিয়ে সেই নির্দিষ্ট জায়গায় অবরুদ্ধ থাকতো এবং দিনের বেলা যখন কোন ব্রাদার তার কাছে যেত, তখন সে ভয়ে উচ্চ এবং তীক্ষ্ণ স্বরে চিৎকার করে উঠতো । সৎ ভাবে আমাকে বলতে হবে যে, আমিই একমাত্র লোক ছিলাম যাকে সে বিশ্বাস করতো এবং ক্রমশ আমরা আমাদের মধ্যে একটা সার্বজনীন ভাষার নিয়মকানুন প্রতিষ্ঠা করেছিলাম । সেই সার্বজনীন ভাষায় ছিল কিছু আলাদা শব্দ এবং দেহের অঙ্গভঙ্গি । কখনো কখনো সে খুশিতে হেসে উঠতো, বিশেষ করে যখন আমরা একটা শব্দ দু’জনেই জানতাম । ‘নদী’, বলেই আমি প্রুট নদীর দিকে আঙুল তুললে সে-ও প্রায় একই ভাবে উচ্চারণ করতো । তার হাসি আমার খুবই ভালো লাগতো । তাই যতটা সম্ভব তাকে হাসানো ছিল আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এবং তার সঙ্গে আমিও আনন্দিত হতাম । আমি তাকে একটা ভালো কাপড় উপহার দিয়েছিলাম এবং সেটা দিয়ে সে নিজের হাতে একটা লম্বা স্কার্ট বানিয়েছিল । তার ভালো লেগেছিল যে, আমাদের রঙিন সুতা দিয়ে সে স্কার্টের মধ্যে সুঁই দিয়ে একটা প্রাণবন্ত মাছের ছবির কারুকাজ করেছিল । সে জানতো, কেমন করে বিভিন্ন কায়দায় চুল বাঁধতে হয় এবং যার জন্য আমাদের মধ্যে একটা নতুন পদ্ধতি চালু হয়েছিল । তারপর থেকে সব ব্রাদাররা একই কায়দায় চুল বাঁধতো । এছাড়া সে আমাদের একধরনের খাবার রান্না করার পদ্ধতিও শিখিয়েছিল – প্রথমে আটার খামির তৈরী করতে হয়, তারপর খুবই পাতলা গোলাকার একটা ট্রের তলানীর পুরোটা সেই খামির দিয়ে ঢাকতে হয় এবং তার উপর সেদ্ধ ডিম এবং পনির দিতে হয় । কিন্তু যখন বরফ গলতে শুরু করে, তখন প্রুট নদীর উল্টোদিকের শুষ্ক তৃণভূমি পুনরায় সবুজ হত এবং সে তখন দেখার জন্য প্রায়ই দেওয়ালের কাছে যেত । সে শুধু দুঃখ ভারাক্রান্ত মনে দাঁড়াত এবং নদীর অপর পাড়ের দিকে বোবা দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতো । এটা পরিস্কার ছিল যে, ফেলে আসা জায়গার অভাব সে ভীষণ ভাবে উপলব্ধি করতো । সবাইকে না দেখার দুঃখবোধ তার মনের মধ্যে জমা ছিল । আমি যেমন ফাদার বেসিলের শূন্যতা অনুভব করি । আমি জানি, তা কতটুকু বেদনাদায়ক, মনের ওপর তার ওজন কত এবং হৃদয়ের কতটা গভীরে পৌঁছুতে পারে । এমন পরিস্থিতিতে কেউ কিছু একটা করতে চায়, মন থেকে বের করতে চায় দুঃখবোধ, কিন্তু তা করা মোটেও সহজ নয় । অন্তত সে কোথাও পালিয়ে যেতে পারতো । কিন্তু তাহলে আমাদের অবস্থা কেমন হতো? ফাদার বেসিলকে শুধুমাত্র এক ঝলক দেখার জন্য আমরা কোথায় যেতে পারতাম? 

যদিও আমি এখনো নিজে উপলব্ধি করতে পারিনি, তবুও নির্ঘাত বুঝতে পেরেছি সে পালিয়ে যাবে । আমি তা প্রতিরোধ করতে চেয়েছি এবং বিবেচনা করে দেখতে চেয়েছি যে, আসলে সবচেয়ে ভালো কাজ হবে যদি তাকে দেখাতে পারি, কোন ধরনের জিনিস আমাদের সবাইকে এখানে একত্রিত করে রেখেছে, একই জায়গায় প্রতিদিন ভোরবেলা জেগে ওঠার জন্য কে আমাদের অনুপ্রাণিত করে এবং নিজেদের ও বিরতিহীন ভ্রমণ উপড়ে ফেলার পাগলামীর কাছে হার না মানা – যা বর্বরদের থেকে আমাদের পৃথক করে রেখেছে । আমাদের বিশ্বস্ততা এবং শৃংঙ্খলার মূলে রয়েছে সভ্যতার স্তম্ভ । সভ্য জগত থাকার কারণ হলো এক জায়গার সঙ্গে সম্পৃত্ত থাকা, যেমন চঞ্চল পাখিদের চেয়ে বেশির ভাগ ছিল স্থবির গাছ-গাছালির মতো । এ সবই ছিল ফাদার বেসিলের শিক্ষা । 

আমি উদিনাকে আমাদের দোকানে নিয়ে গিয়েছিলাম এবং জানালা খুলে মেঝের ওপর স্ট্যান্ডার্ড ছড়িয়ে দিয়ে দেখিয়েছি । সে নিশ্চয়ই স্ট্যান্ডার্ডের বিশাল আকৃতি, বৈভব এবং রঙ দেখে অভিভূত হয়েছে, যদিও এখানে-সেখানে কয়েক জায়গায় রঙ বিবর্ণ হয়ে গেছে । সে রীতিমতো দম আটকে রেখে স্ট্যান্ডার্ডের চতুর্দিকে ঘোরে । হ্যাঁ, আমি ঠিক ভেবেছিলাম যে, অন্য সবার মতো সে-ও অনুভব করবে স্ট্যান্ডার্ডের সৌন্দর্য এবং ক্ষমতা । তারপর সে উপুড় হয়ে ঝুকে খুব কাছ থেকে নিরীক্ষণ করে জরির কারুকাজের নকশা এবং সেলাই । একসময় উদিনা ভুলবশত খাঁজ-কাটা কোণা স্পর্শ করে দেখার সময় ঘষা দিয়ে এক জায়গার রঙ তুলে ফেলে । আমি স্বীকার করি, তার আগ্রহ এবং নিবিষ্টতা আমাকে মুগ্ধ করেছে । তার অর্থ হলো সেই থেকে সে ভূগর্ভস্থ কক্ষে অযথা সময় নষ্ট না করে, যেখান থেকে নদীর অপর তীরের সমতল তৃণভূমি দেখা যায় না, আমাদের দোকানে এসে এই অলোকিক কাজে শ্রম দিতে শুরু করে । সে আমার কাছে ধাতুর একটা আসল সুঁই চেয়েছিল । অত:পর কয়েকদিন ধরে সে স্ট্যান্ডার্ডের ছেঁড়া কোণা রিপু করে । তার সরু এবং দক্ষ আঙুল দেখে আমার কাছে ভালো লাগে । সেই থেকে আমরা সন্ধ্যাবেলায় অন্যান্য ব্রাদারদের সঙ্গে বসতাম । তখন আমরা সেলাই, রিপু এবং সূঁচির কাজ করতাম । উদিনা তার নিজের ভাষায় গল্প বলতো এবং আমরা খানিকটা বুঝতাম । গল্পের বিষয় ছিল জন্তু-জানোয়ার, মিছিল, শিকার, পূবের কোন এলাকার দিগন্তবিস্তৃত বিরান ভূমি, পৃথিবীর শেষ প্রান্তের পাহাড়-পর্বত, এবং এমন এক সীমাহীন সমুদ্র, যা হয়তো আমাদের থেকে দক্ষিণে অবস্থিত এবং যেখানে গিয়ে আমাদের প্রুট নদী মিশে গেছে । এছাড়া সে বাতাস চালিত বিশাল নৌকার গল্প বলতো, এমনকি লৌহ নির্মিত রাস্তার গল্পও করতো । সে সান্ধ্যকালীন আকাশে ধাবমান অগ্নিগোলকের কথা বলেছে এবং একসময় সে যখন চলে যেত, তখন আমি তাকে আমার মনের আকাশের চলমান তারা বলে ডাকতাম । অবশেষে একদিন সে আমার কাছে প্রস্তাব করে যে, তার লম্বা স্কার্টে যেই মাছের কারুকাজ করেছিল, স্ট্যান্ডার্ডের মধ্যে সেই একই মাছের কাজ করতে চায় । আমি রাজী হয়েছি । কেন সে তার অস্তিত্বকে ছেড়ে আসতে পারবে না? কেন আমাদের সবাই তা করতে পারলো না? সুতরাং প্রত্যেক ব্রাদার কোন প্রজাতীর প্রাণী অথবা অন্য কিছু উদ্ভাবন করে । তারা নকশার বাহ্যিক সীমারেখা আঁকে এবং পরবর্তীতে রঙ করে নকশা সম্পূর্ণ করে । তাদের অঙ্কিত নকশার মধ্যে ছিল বক, হেজহগ, পেঁচা, এমনকি বিষধর সাপও ছিল । আমি কুকুরের নকশা পছন্দ করেছি । কেননা আমি যা করি, আমার মনে হয়েছে কুকুরের সঙ্গেই আমার কাজের মিল আছে। কুকুরের মতো আমিও একজন অভিভাবক । একসময় উদিনা সুন্দর একটা মাছের কাজ সম্পন্ন করে, যার পুরোটাই রঙিন সূতায় আবৃত । সে কাঁচের টুকরো দিয়ে মাছের চোখ তৈরি করেছে, যেন আলোয় জ্বলজ্বল করে এবং বাঁকানো লেজ এমন ভাবে তৈরি করছে যেন মনে হয় লেজটা দ্রুত নড়াচড়া করছে । উদিনা নিঁখুত হাতে একের পর এক সূঁচের কাজ করেছে । যতক্ষণ না পর্যন্ত মাছটিকে জীবন্ত দেখা যায়, ততক্ষণ সে বিভিন্ন রঙের আলাদা কাপড় দিয়ে মাছটি সেলাই করেছে । 

তারপর যখন বাইরের আবহাওয়া সম্পূর্ণ তপ্ত হয়, তখন উদিনা অদৃশ্য হয়ে যায় । ফাদার বেসিল বলতেন, বর্বর মানুষেরা আসলেই বর্বর, কারণ খুব অল্প সময়ে তারা অধৈর্য্য হয়ে পড়ে । এ জন্যই তারা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ভ্রমণ করে এবং তারা সভ্য জগতের অংশ হতে পারে না । কেননা আমাদের মূল্যবোধ সম্পর্কে তাদের কোন ধারণা নেই – এক জায়গায় থিতু হয়ে থাকা এবং নিয়ম মাফিক জীবনযাত্রা অনুসরণ করা । 

প্রথমে ভেবেছিলাম উদিনা ফিরে আসবে । তারপর থেকে আমি নিজেই দেওয়ালের পাশে দাঁড়িয়ে নদীর উল্টোদিকের বিশাল তৃণভূমির দিকে তাকিয়ে থাকি এবং ভুল করে তার জন্য প্রতিটি মুহূর্ত অপেক্ষা করি । কেমন করে সে নদীর উল্টো পাড়ে গিয়েছে? আমি জানি না । সে হয়তো অন্য পথ দিয়ে গিয়েছে, পশ্চিমের পথ ধরেছে । হয়তো আলাদা অন্য কিছু, অপরিচিত, এবং আমাদের অজানা, তার চেতনাকে জাগিয়ে দিয়েছে । কিন্তু স্বীকার করার সেই সাহস আমাদের নেই, হয়তো অন্য কোথাও তার অস্তিত্ব রয়েছে, কিংবা ভিন্ন ভাবে রক্ষিত আছে । আমাদের কাছে সে তার সন্তানদের রেখে গেছে। আমার মনে হয়, তার আসল কারণ সে ফিরে আসবে । সত্যি কথা বলতে কি, সে ঘনিষ্ঠ ভাবে আমাদের সঙ্গে জড়িয়ে আছে । 

ছেলেমেয়েরা কর্মচঞ্চল এবং আনন্দপূর্ণ । আমরা সবাই ওদের অত্যন্ত ভালোবাসি, এমনকি ব্রাদাররা পর্যন্ত ওদের দেখাশুনা করার জন্য মুখিয়ে আছে । তাদের কাছে মনে হয়েছে, মাঠে কাজ করা, কিংবা সূতায় রঙ লাগানো ও ভেজা কাপড় শুকিয়ে ভাঁজ করার চেয়ে বাচ্চাদের দেখভাল করাটা বেশি দায়িত্বের কাজ । ব্রাদার দ্বিতীয় জন ওদেরকে আমাদের ভাষা এবং সভ্য সমাজের অন্যান্য নিয়মকানুন শিক্ষা দেয় । এছাড়া তিনি বর্ণমালার অক্ষর, বইপড়া, বাগানে শাক-সব্জি চাষ করা এবং পনির বানানোর কাজ শেখায় । তবে বিশেষ করে পিটারকে শেখানো হয় । কেননা পল এখনও খুবই ছোট মেয়ে । ওরা আমাদের কাজে সাহায্যে করে – বিশেষ করে স্ট্যান্ডার্ড তৈরির কাজে । কেননা ছুটির দিন তাড়াতাড়ি ঘনিয়ে আসছে । দিন ক্রমশ দীর্ঘ হচ্ছে । ওদের কারণে এ বছর আমরা আরেকটা বাড়তি নকশা সংযোজন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি এবং সেটা আগের মতো কোন জন্তু-জানোয়ারের নয়, বরং একটা মানুষের নকশা হবে । আমরা নিশ্চিত ছিলাম যে, বেঁচে থাকলে আমাদের এই সিদ্ধান্তকে ফাদার বেসিল নির্ঘাত তারিফ করতেন । তার কারণ এখন স্ট্যান্ডার্ড একটি সত্যিকারের ট্রিনিটির মতো হবে, এবং আমরা জানি, তার হৃদয়ের গভীরে ট্রিনিটি বিদ্যমান ছিল । 

আমাদের পরিশ্রম অব্যহত থাকে । আমার হাত রঙ দিয়ে নীল ও লাল হয়ে গেছে এবং আমার আঙুলে সুঁই ফুটে রক্ত বের হয়েছে । আমরা ভোরে জাগি, যেন এক বিন্দু আলোর মতো কোন সময় অপব্যয় না হয় । ইতোমধ্যে আমাদের বাগানের টমোটো পেকে গেছে । তাই টমেটো এবং একমাত্র পনিরের উপর নির্ভর করে আমাদের জীবন চলে । কেননা শুধু রুটি তৈরি করার জন্য চুল্লি জ্বালানো অপচয় ছাড়া আর কিছু নয় । আজ ব্রাদার চতুর্থ লুকাস আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, আমরা স্ট্যান্ডার্ডের জন্য সেই কাজ করবো যা ফাদার বেসিল বলতেন – সে অনেক, অনেক দিন আগে, অরাজকতা এবং দেশভাগের আগে, প্রতি সন্ধ্যায় চমৎকার স্ট্যান্ডার্ড দেখানো হতো । সেই সময় স্ট্যান্ডার্ড ছিল সম্পূর্ণ শুভ্র, কুমারীদের মতো পবিত্র । তারপরও পুরো অন্ধকারে সুঁইয়ের কারুকাজ স্ট্যান্ডার্ডের মধ্যে জ্বলজ্বল করতো । তখন স্ট্যান্ডার্ডের কন্ঠস্বর শোনা যেতো – নকশাগুলো কথা বলতো, চারপাশে ঘুরতো এবং পবিত্র সঙ্গীত পরিবেশন করতো । প্রতি সন্ধ্যায় অগণিত লোকজন এসে দেখতো এবং তারা সেই অলৌকিক দৃশ্যের সাক্ষী হতো । অথচ বিশ্ব যখন ভেঙেচুরে পড়ে যাচ্ছিল এবং বিশৃঙ্খলার মধ্যে ডুবছিল, তখন স্ট্যান্ডার্ড নীরব থেকেছে । সেই কারণে আরেকবার ধরে রাখার জন্য আমাদের সুঁই দিয়ে সুন্দর কারুকাজ করতে হবে এবং অবশ্যই আমাদের তা করতে হবে । তাহলেই পুরনো ভাবমূর্তি নতুনত্ব পাবে । 

ওহ, উদিনা, ওহ, ক্রিস্টোফার, নদীর তীর ঘেঁষে হেঁটে যাচ্ছো, যদি তুমি আশেপাশে থাকতে, তাহলে দেখতে পারতে আমরা কিভাবে নিষ্ঠা এবং একাগ্রতার সঙ্গে কাজ করছি: কেমন করে ছেলেমেয়েকে প্রস্তুতি করছি, ওদের ত্বক এখন অনেক বেশি মসৃন দেখায়, কিভাবে আমরা অ্যাঞ্জেলিকার কান্ড থেকে তৈরি করা দীর্ঘ বাঁশি পরিস্কার করছি, দূর্গের অভ্যন্তরে সৈনিকেরা কামান পরিস্কার করে প্রস্তুতি নিচ্ছে, তাদের টাটকা পালিশ করা নল চকচক করছে এবং কিভাবে তারা অত্যন্ত উত্তেজনা ও ব্যস্ততায় সময় কাটাচ্ছে । ইতোমধ্যে একটা দীর্ঘ শক্ত খুঁটি দাঁড় করানো হয়েছে, যাতে আমরা সেই খুঁটিতে পূর্ব দিকে মুখ করে স্ট্যান্ডার্ড ঝুলাতে পারি, এবং সম্ভবত আমাদের কার্যকলাপ আরো একবার শুষ্ক তৃণভূমির লোকজনের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে, যা তারা বাৎসরিক অনুষ্ঠানে করতো । তারা কি জানে, তারা কি ধরে নিয়েছে যে, এ কাজ আমরা তাদের জন্য করছি? পবিত্র কুমারী তাদের উপর নজর রাখার জন্য, যিনি সভ্য জগতের রানী এবং সমগ্র সীমান্তভূমি ও রুক্ষ তৃণভূমির অধিশ্বর । তিনি এখন আরো বেশি ক্ষমতার অধিকারিনী । কেননা তার পাশে আমরা দ্বিতীয় শিশু হিসাবে আরো একটা বাচ্চাকে রেখেছি। সুতরাং তিনি এখন তার সমস্ত স্বর্গীয় জ্যোতি দেখাতে সক্ষম, নিজের সঙ্গে ধরে রেখেছেন এক সন্তান এবং আরেক সন্তান হাতে ধরে আছেন । 

আমি যৎসামান্য আশা করার সাহস পাই যে, উদিনা দূরে কোথাও থেকে সব লক্ষ্য করছে এবং আমাদের কাছে ফিরে আসার প্রবল ইচ্ছাকে সে প্রতিহত করতে পারবে না । 




-----------------------------------------------------------------------------------------------------------
[অনুবাদকের টীকা: মূল গল্পে কোন টীকা নেই, কিন্তু পাঠকের সুবিধার্থে কয়েকটি অপরিচিত শব্দের টীকা জুড়ে দেওয়া হলো: 

১. পবিত্র কুমারী – হৌলি ভার্জিন বা ভার্জিন মেরী, যিনি ছিলেন যিশুর জন্মদাত্রী । 

২. কালফ্যাক্টর – সামরিক প্রধানের প্রতিদিনের সাধারণ কাজের ওয়েটার । জার্মানি থেকে ১৭ শতকে সুইডিশ ভাষায় নামটি এসেছে । উনিশ শতকের শেষের দিকে ইংরেজির বাটলার-এর পরিবর্তিত শব্দ । 

৩. ট্রিনিটি – ত্রিত্ববাদী খ্রিষ্টান ধর্মানুসারীদের মতে ঈশ্বরের তিন রূপ: পিতা, পুত্র এবং পবিত্র আত্মা । 


৪ স্ট্যান্ডার্ড – কাপড়ের তৈরি সামরিক বা আনুষ্ঠানিক পতাকা বা ব্যানার, যা কোন স্মরণীয় উৎসব বা বিশেষ দিনে উঁচু খুঁটিতে টাঙানো হয় ।] 


গল্পসূত্র: ‘সীমান্তভূমি’ গল্পটি নোবেল বিজয়ী পোলিশ ঔপন্যাসিকা ওলগা তোকারজুকের ‘বর্ডারল্যান্ড’ গল্পের অনুবাদ । পোলিশ ভাষা থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন জেনিফার ক্রফ্ট । গল্পটি ‘গ্রান্টা’ ম্যাগাজিনের ১৪৬ সংখ্যায় (১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯) প্রকাশিত হয় এবং সেখান থেকে নেয়া হয়েছে । 







কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন