বুধবার, ২৬ আগস্ট, ২০২০

হারুকি মুরাকামি'র গল্প : এক শিনাগাওয়া বানরের স্বীকারোক্তি



 ভাষান্তর : অমিতাভ চক্রবর্ত্তী
বয়স্ক বানরটির সাথে প্রথম আলাপ, সে প্রায় বছর পাঁচেক হবে, গুন্মা প্রদেশের এক গরম জলের ঝর্ণার শহরে, এক ছোট জাপানী সরাইখানায়। নিতান্ত সাদামাটা, ঠিক করে বললে, জরাজীর্ণ একটা আস্তানা, কোনভাবে দাঁড়িয়ে আছে। স্রেফ রাতটা কাটানোর জন্য এই সরাইখানাটায় আশ্রয় নিতে হয়েছিল।

আমি সে সময়টা এখানে ওখানে ঘুরে বেড়াচ্ছি, অন্তরাত্মা যেদিন যেদিকে নিয়ে যায়। গরম জলের ঝর্ণার শহরটায় যখন ট্রেন থেকে নামলাম, রাত ৭ টা পার হয়ে গেছে। শরতকাল প্রায় শেষ। সূর্য ডুবে গেছে বহুক্ষণ। পাহাড়ি এলাকায় রাত নামে এক অদ্ভুত সমুদ্র-নীল রঙের অন্ধকার সঙ্গে করে। সেই আঁধার এখন চারিদিক ঢেকে ফেলেছে। পাহাড় চূড়া থেকে নেমে আসা কামড়ে ধরা ঠাণ্ডা বাতাসে মুঠো মুঠো পাতার ঘূর্ণী পাক খেতে খেতে গড়িয়ে যাচ্ছে রাস্তা বরাবর।

শহরের কেন্দ্রস্থলে প্রচুর ঘুরে বেড়ালাম একটা মাথা গোঁজার ঠাঁই পাওয়ার জন্য। কিন্তু ভাল আস্তানাগুলোর কোনটাই রাতের খাওয়ার সময় পার হয়ে যাওয়ার পর ঘর দিতে রাজী হল না। পাঁচ-ছয়টা জায়গায় চেষ্টা চালালাম, সব কটা সটান না করে দিল। শেষে শহরের বাইরে একটা প্রায় পরিত্যক্ত অংশে এই সরাইখানাটি পাওয়া গেল যেটা আমায় থাকতে দিতে রাজী হল। কেউ থাকে বলে মনে হল না, ভাঙ্গাচোরা, কোনভাবে মাথা গোঁজার মত একটা চটি বলা যায়। অনেক বছর পার হয়ে গেছে এর জীবনে। কিন্তু পুরনো সরাইগুলোর যে বিশেষ একটা আকর্ষণ থাকে, সেরকম কিছুর চিহ্নমাত্র চোখে পড়ল না। এখানে ওখানে জিনিসপত্র এমন বাঁকা-ত্যাড়া করে লাগানো যে মনে হয় যাহোক করে কাজ সারা হয়েছে, সেটা বাকী অংশের সাথে মিলুক চাই না মিলুক। আর একটা ভূমিকম্পও এটা টিঁকবে কিনা সন্দেহ আছে। আমি শুধু একটাই আশা করছিলাম যে আমি থাকা কালে কোন কাঁপাকাঁপি না ঘটে।

সরাইটায় রাতের খাবারের কোন ব্যবস্থা ছিল না। তবে সকালের জলখাবারটা ভাড়ার দামের মধ্যে ধরা ছিল। আর এক রাতের থাকার ভাড়াও ছিল অত্যন্ত সস্তা। ভিতরে ঢুকেই একটা রিসেপশান ডেস্ক, তার ওপাশে বসে আছে এক টেকো বুড়ো যার মাথায় একটা চুলও অবশিষ্ট নেই। বলতে কি, ভুরুটা পর্যন্ত ফাঁকা, একেবারে নির্লোম। আমার থেকে এক রাতের ভাড়া আগাম নিয়ে নিল। ভুরু না থাকায় লোকটার গোল্লা গোল্লা চোখদুটো কেমন অস্বাভাবিক রকম জ্বলজ্বল করছিল, গনগনে ভাঁটার মত। পাশে মেঝেতে গদির মত কিছু একটার উপরে একটা বিশাল বাদামী বেড়াল, একই রকম আদ্যিকালের জীব, থেবড়ে পড়ে আছে, গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন। নাকে নির্ঘাত কিছু গণ্ডগোল আছে ওটার, তা না হলে এত জোরে নাক ডাকে না, অন্তত আমি আর কোন বিড়ালকে ডাকতে শুনিনি। খুব মানানসই ভাবেই, নাকডাকার সুরটায় থেকে থেকে একটা ছন্দপতন হয়ে আবার ঠিক হয়ে যাচ্ছিল। সরাইখানাটার সমস্ত কিছুই যেন ভীষণ পুরান আর যে কোন সময় ভেঙ্গে পড়বে।

আমায় যে ঘরটা দেওয়া হল, বেজায় চাপা, বড়জোর একটা ফুটনের বিছানা ঠাসতে পারে এত সরু, ছাদ থেকে একটা টিমটিমে আলো ঝুলছে, শোয়ার তোষকটার নীচে মেঝেটা প্রত্যেকবার নড়াচড়ার সাথে এক অদ্ভুত অলুক্ষুণে বিলাপ করছিল। কিন্তু মত পাল্টানোর পক্ষে এখন অনেক দেরী হয়ে গেছে। আমি শুধু নিজেকে বললাম, মাথার উপরে ছাদ পেয়েছ, নীচে শোয়ার বিছানা পেয়েছ, আর কি চাই।

সঙ্গের মালপত্র বলতে একটাই জিনিষ ছিল আমার। গোব্দা একটা পিঠে বওয়ার ব্যাগ। সেটা মেঝেতে নামিয়ে রেখেই আবার শহরের দিকে পা বাড়ালাম। (এই ঘরে বেশীক্ষণ কাটানো খুব-ই মুস্কিল।) কাছাকাছি একটা সোবা-নুড্‌ল্‌-এর দোকানে কোন রকমে রাতের খাবারটা সেরে নিলাম। কাছাকাছি আর কোন খাবার দোকান খোলা ছিল না। তাই হয় এখানেই খাও না হলে উপোস। আমি একটা বিয়ার নিলাম, তার সাথে চাট হিসাবে কিছু বার-স্ন্যাক্স, আর খানিকটা গরম সোবা। একেবারেই সাদামাটা সোবা। স্যূপটাও সামান্যই গরম। কিন্তু ঐ যে বললাম, কোন অভিযোগ করছি না। আর যাই হোক, খালি পেটে রাতটা কাটানোর হাত থেকে তো বাঁচলাম। খাবার দোকান ছেড়ে বেরিয়ে আসার পর মনে হল কিছু স্ন্যাক্স আর একটা ছোট বোতল হুইস্কি কিনে নিলে হয়। কিন্তু কোন দোকান চোখে পড়ল না। রাত্রি আটটা বেজে গেছে। এখন শুধু ঐ বন্দুক দিয়ে টিপ করার খেলার দোকানগুলোই খোলা আছে। গরম জলের ঝরণাগুলোর কাছাকাছি ওগুলোকে সর্বত্র দেখা যায়। আমি তাই সরাইখানায় ফিরে একটা ইউকাতা গাউন চাপিয়ে নিয়ে নীচতলার স্নানঘরটার উদ্দেশ্যে পা চালালাম।

জরাজীর্ণ বাড়িটা আর তার অন্যান্য পড়োপড়ো অংশগুলোর তুলনায় গরম জলের ঝর্ণায় স্নানের জায়গাটা কিন্তু দিব্যি পরিপাটি। ঝর্ণার জলটা গাঢ় সবুজ রংয়ের, জল মিশিয়ে পাতলা করা নয়। গন্ধকের ঝাঁঝাল গন্ধটা, আমার অভিজ্ঞতায়, অন্য যে কোন ঝর্ণার থেকে রীতিমত চড়া। জমিয়ে বসে হাড় পর্যন্ত ভিজিয়ে ফেললাম। আর কেউ স্নান করার ছিল না (গোটা সরাইখানাটতেই আর কেউ ছিল কি না কে জানে), লম্বা সময় ধরে গা এলিয়ে চমৎকার কাটল সময়টা। কিছুক্ষণ পর মাথার ভিতর কেমন একটা হাল্কা অনুভূতি। উঠে পড়লাম এবার। একটু পায়চারী করে ঠাণ্ডা হয়ে আবার গিয়ে চৌবাচ্চায় ঢুকে বসে পড়লাম। ভেবে দেখলে, বড় বড় সরাইখানাগুলোয় হট্টমালার ভীড়ে গাদাগাদি করে স্নান করার চেয়ে এইটা অনেক শান্তির ছিল।

এইভাবে তৃতীয়বার গা ভিজিয়ে বসে থাকার সময় বানরের আবির্ভাব ঘটল, ঘর্ঘর করে কাঁচের দরজা খানিকটা ফাঁক করে ভিতরে এলো সে। “মাপ করবেন,” মৃদুস্বরে বলল। আমার বুঝতে বেশ খানিকটা সময় লেগে গেল যে সে আদপে একটি বানর। ঘন গরম জলের প্রভাবে এমনিতেই মাথা ঘুরছিল, তার উপরে আমি কখনোই ভাবিনি যে একটি বানরকে কথা বলতে শুনব। তাই প্রথমটায় আমি যা শুনছি আর যা দেখছি অর্থাৎ মানুষের গলা আর বানরের অবয়ব, এই দুটোকে মেলাতে পারছিলাম না। বানরটি তার পিছনে দরজাটি ভেজিয়ে দিল, ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ছোট জলপাত্রগুলোকে গুছিয়ে রাখল, তারপর একটা থার্মোমিটার জলে ডুবিয়ে জলটার তাপমাত্রা পরীক্ষা করল। গভীর মনোযোগ সহকারে থার্মোমিটারের চাকতিটার দিকে তাকিয়ে রইল, চোখ সরু হয়ে গেছে। যেন কোন জীবাণু বিশেষজ্ঞ নূতন কোন রোগজীবাণু আলাদা করছে।

 “স্নান করে ভালো লাগল আপনার?” বানরটি জিজ্ঞাসা করল আমায়।

“খুব ভালো লাগল। অনেক ধন্যবাদ” বললাম আমি। বাষ্পের ঘোরে আমার গলার স্বর নরম, গাঢ়। মনে হচ্ছিল আমার নিজের গলা নয়, পৌরাণিক যুগের কোন মানুষ কথা বলে উঠলো, অতি দূর সময়ের ওপার থেকে কারো কণ্ঠস্বর জঙ্গলের গভীরে প্রতিধ্বনি তুলে ফিরে এল। আর সেই প্রতিধ্বনি বলে গেল ... আরে, আরে, এক সেকেন্ড, কোন বানরের এখানে কি কাজ? আর এ মানুষের ভাষাতেই বা কথা বলছে কেন?

“আপনার পিঠটা কি ঘষে দেব একটু?” জিজ্ঞাসা করল বানর, নরম মৃদু গলায়। তার পরিষ্কার কন্ঠস্বরে ‘ডু-ওপ’ গানের দলের মেঘমন্দ্র ধ্বনির কুহক। ওর চেহারা দেখে যেমন মনে হয়, আদৌ সে রকম নয়। তা বলে অস্বাভাবিক ও লাগে নি। চোখ বন্ধ করে শুনলে মনে হবে, যেন কোন একজন সাধারণ মানুষ কথা বলছে।

“ঠিক আছে, দিন, ধন্যবাদ,” বললাম আমি। এমন নয় যে আমি বসে ছিলাম কতক্ষণে কেউ এসে আমার পিঠটা ঘষে দেবে। কিন্তু আশঙ্কা হল - একে ফিরিয়ে দিলে মনে করতে পারে যে বানর বলেই একে দিয়ে কাজটা করালাম না। আমার মনে হল বানরের দিক থেকে এই প্রস্তাব যথেষ্টই সহৃদয় এবং একে দুঃখ দেয়ার কোন মানে হয় না। আমি তাই আস্তে আস্তে চৌবাচ্চা থেকে উঠে এলাম, বানরের দিকে পিঠ ফিরিয়ে একটা ছোট্ট কাঠের পাটাতনের উপর ধপাস করে বসে পড়লাম।

বানরের পরনে কিছু ছিল না। একটি বানরের ক্ষেত্রে অবশ্য সেটা হতেই পারে। তাই আমার কাছে এটা অস্বাভাবিক কিছু লাগে নি। বানরটিকে দেখে মনে হল বেশ বয়স হয়েছে। গায়ের লোমে সাদার পরিমাণ ভালোই। সঙ্গে করে একটা ছোট তোয়ালে নিয়ে এসেছিল। সেটায় সাবান মাখিয়ে দক্ষ হাতে ভালো করে আমার পিঠটা ঘষে দিল।

“ঠাণ্ডাটা বড্ডই পড়েছে এখন, ঠিক কি না?” নিজের মতামত জানাল বানর।

“তা পড়েছে বটে।”

“আর কদিনের মধ্যেই এই জায়গাটা বরফে ঢেকে যাবে। ছাদ থেকে তখন বেলচা মেরে বরফ সরাতে হবে। কাজটা, বিশ্বাস করুন, মোটেও সোজা নয়।”

এই সময় বানরের কথায় মুহূর্তের জন্য একটা বিরতি পড়ল আর আমি তড়াক করে আমার প্রশ্নটা ছুঁড়ে দিলাম, “তুমি তা হলে মানুষের ভাষায় কথা বলতে পার?”

“তা পারি,” চটপট উত্তর এল বানরের কাছ থেক। এই প্রশ্ন ওকে নিশ্চয়ই অনেক বার শুনতে হয়। “খুব ছোট থেকেই আমি মানুষের হাতে বড় হয়েছি এবং কোন কিছু বুঝে ওঠার আগে থেকেই আমি মানুষের ভাষায় কথা বলতে পারি। লম্বা সময় ধরে আমি টোকিওতে ছিলাম, টোকিওর শিনাগাওয়াতে।”

“শিনাগাওয়ার কোথায়?”

“গোটেনিয়ামার কাছাকাছি।”

“চমৎকার জায়গা।”

“ঠিক। জানেন নিশ্চয়ই, থাকার জন্য খুব সুন্দর জায়গা। কাছেই গোটেনিয়ামা উদ্যান। ওখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অসাধারণ – খুব উপভোগ করেছি।”

এই পর্যায়ে এসে আমাদের কথাবার্তায় একটা বিরতি পড়ল। বানরটি শক্ত হাতে আমার পিঠ ঘষে যাচ্ছিল (খুব আরাম লাগছিল আমার) আর আমি চোখের সামনে ঘটে চলা ধাঁধাগুলোর যুক্তিসঙ্গত সমাধান খোঁজার চেষ্টা করে যাচ্ছিলাম। শিনাগাওয়ায় বড় হওয়া বানর? গোটেনিয়ামা উদ্যান? এমন ঝরঝর করে কথা বলা? কি করে সম্ভব? ভগবানের দোহাই, একটা বানর-ই তো? বানর ছাড়া আর কিচ্ছু নয়।

“আমি মিনাটো-কু-তে থাকি” স্রেফ বলার জন্য বললাম।

“তা হলে তো আমরা পড়শি-ই ছিলাম বলা চলে।” বানরের গলায় বেশ একটা বন্ধুত্বের সুর।

“কেমন ছিল তোমার মনিব?” জিজ্ঞেস করলাম আমি।

“আমার মালিক কলেজের প্রফেসর ছিলেন। পদার্থবিজ্ঞানের লোক। টোকিও গাকুগেই বিশ্ববিদ্যালয়ে বড় পদে কাজ করতেন।”

“রীতিমত বুদ্ধিজীবী লোক তা হলে।”

“তাই ছিলেন তিনি। গানবাজনা ভালবাসতেন খুব, অন্য সব কিছুর চেয়ে বেশীই হয়ত। বিশেষ করে ব্রুকনার আর রিচার্ড স্ট্রসের বাজনা। এর ফলে আমারও গানবাজনার জন্য একটা বিশেষ আকর্ষণ জন্মে যায়। সবসময়ই সুরের মধ্যে থাকা। বলতে পার, কিছু না জেনেই এই বিষয়ে একটা জ্ঞান তৈরী হয়ে গেছিল আমার।”

“ব্রুকনার ভালো লাগে তোমার?”

“খুব। বিশেষ করে সপ্তম সিম্ফনি। ওটার তৃতীয় চলনটা ত আমার সব সময়ই মন ভালো করে দেয়।”

“আমি প্রায়ই ওনার নবম সিম্ফনিটা শুনি।” একটু এগোলাম আমি। আদপে হয়ত আরো একটা অর্থহীন কথাবার্তা।

“তা ঠিক, খুবই চমৎকার বাজনা।” বানর স্বীকার গেল।

“ঐ অধ্যাপক-ই তা হলে তোমায় আমাদের ভাষাটা শিখিয়েছিল?”

“তা শিখিয়েছিলেন। ওনার নিজের কোন ছেলেমেয়ে ছিল না। হয়ত সেই কারণেই, যখন যেমন সময় পেতেন, বেশ কড়া শাসনেই অনেক কিছু শিখিয়েছিলেন আমায়। খুব ধৈর্য্যশীল লোক ছিলেন। শৃঙ্খলা আর নিয়মানুবর্তীতা এই দুটিকে গুরুত্ব দিতেন সব কিছুর উপরে। অত্যন্ত গুরুগম্ভীর লোক। তাঁর সবচেয়ে প্রিয় লব্জ ছিল, প্রকৃত ঘটনার বারংবার চর্চাই হচ্ছে জ্ঞানের রাজ্যে পৌঁছানোর একমাত্র পথ। ওনার স্ত্রী ছিলেন একজন শান্ত, মিষ্টি স্বভাবের মানুষ, আমার প্রতি সবসময় খুবই দয়ালু। নিজেদের মধ্যে ভালো মিলমিশ ছিল। জানি না কোন বাইরের লোকের কাছে এইভাবে বলা ঠিক হচ্ছে কি না, বিশ্বাস করুন, ওনাদের রাতের ব্যাপারস্যাপার খুবই ইয়ে মানে মাখোমাখো ছিল।”

“আচ্ছা,” বললাম আমি।

বানরটি তার ঘষাঘষির পালা শেষ করল এক সময়। “ধৈর্য্য ধরে থাকার জন্য অনেক ধন্যবাদ,” মাথা ঝুঁকিয়ে বলল সে।

“অনেক ধন্যবাদ,” বললাম আমি। “বেশ আরাম লাগছিল। তা, এই সরাইখানাতেই কাজ করো তুমি?”
“ঠিক। এঁরা অনেক অনুগ্রহ করে আমায় এখানে কাজ করতে দিয়েছেন। বড় বড় দামী সরাইগুলো কখনো কোন বানরকে কাজে রাখবে না। কিন্তু এখানে এদের সবসময়-ই কাজের লোকের টানাটানি – তাই যদি তুমি মন দিয়ে কাজ করো, তুমি বানর হও আর যাই হও, তোমায় রাখতে এদের কোন আপত্তি নেই। বানর বলে আমায় মাইনে দিতে লাগে নামমাত্র, আবার শুধু সেখানেই কাজ জুটবে যেখানে লোকজনের চোখের আড়ালে আড়ালে কাজ করতে পারব। স্নানের জায়গাটা গুছিয়ে রাখা, ধোয়া-মোছা-পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা, এই সব আর কি। কোন বানরকে চা এনে দিতে দেখলে বেশীর ভাগ অতিথিই আঁতকে উঠবে। রান্নাঘরের কাজও বাদ, অবশ্যই, কারণ খাদ্য-স্বাস্থ্যবিধির আইনে আটকে যাব।”

“অনেকদিন কাজ করছ এখানে?” জিজ্ঞাসা করলাম আমি।

“তা প্রায় বছর তিনেক হল।”

“কিন্তু এখানে কাজ নেওয়ার আগে নানা কিছুর মধ্য দিয়ে তোমায় যেতে হয়েছে, তাই না?”

“সে তো বটেই।” মাথা নড়ল বানর।

আমি একটু দোনামোনা করে শেষে আর থাকতে পারলাম না। জিজ্ঞাসা করলাম “কিছু যদি মনে না কর, তোমার সেইসব পুরানো দিনের কথা কিছু বলতে পারো আমায়?”

বানর ভাবল একটু, তারপর বলল “ঠিক আছে। আপনি যতটা ভাবছেন ততটা ভাল নাও লাগতে পারে। কিন্তু, আমার ধরুন, দশটা নাগাদ কাজ মিটে যায়, তার পরে আমি আপনার ঘরে আসতেই পারি। সেটা আপনার জন্য চলবে ত?”

“অবশ্যই,” উত্তর দিলাম আমি। “খুব ভালো হয় যদি আসার সময় সাথে কয়েকটা বিয়ার নিয়ে আসো।”

“বুঝেছি। ঠাণ্ডা বিয়ার চাই। সাপ্পোরো আনলে হবে?”

“খুব হবে। তুমি কি বিয়ার খাও?”

“খাই, অল্প-স্বল্প।”

“তা হলে বরং দুটো বড় বোতল নিয়ে এসো।”

“তাই আনবো। আমার হিসেব ঠিক থাকলে, আপনি উঠেছেন দোতলার ‘অ্যারাইসো’ স্যুইটে, ঠিক কিনা?”

“অবশ্যই ঠিক,” বললাম আমি।

“একটু বেশী বেশী না, আপনার কি মনে হয়?” বানর বলে চলল। “পাতি পাহাড়ী এলাকার সরাইখানায় ঘরের নাম ‘অ্যারাইসো’ – প্রস্তর সৈকত?” খুক খুক করে হাসল বানর। আমি এর আগে কখনো কোনও বানরকে হাসতে শুনিনি। কিন্তু বোঝাই যাচ্ছে, বানরেরা হাসে, কাঁদেও হয়ত কখনো-সখনো। তবে, এ বানর যখন মানুষের ভাষায় কথা বলতে পারে, এর হাসতে পারা নিয়ে আমার এত অবাক হওয়ার মত কিছু ছিল না।

“ভালো কথা, তোমার কোন নাম আছে?” প্রশ্ন করলাম আমি।

“নাঃ! সেরকমভাবে নাম বলে কিছু নেই। তবে সবাই আমাকে শিনাগাওয়া বানর বলে ডাকে।”

বানরটি দরজাটি একটু ফাঁক করল, আমার দিকে ফিরল, নম্রভাবে একবার মাথা ঝোঁকালো, তারপর আস্তে করে দরজাটি বন্ধ করে দিল।

দশটার একটু বাদে বানরটি অ্যারাইসো স্যুইটে ফিরে এলো, একটা ট্রেতে বড় দু’ বোতল বিয়ার নিয়ে। বিয়ার ছাড়াও একটা বট্‌ল্‌-ওপনার, দুটো গ্লাস, কিছু স্ন্যাক্স – শুকনো মশলাদার স্কুইড, এক ব্যাগ কাকিপি রাইস-ক্র্যাকার আর কিছু বাদাম। বার-স্ন্যাক্স যেমন হয় আর কি। মানতেই হবে, খুব গোছানো পরিপাটি বানর।
এখন কিন্তু বানর পুরো সেজেগুজে এসেছে – ধূসর সোয়েটপ্যান্ট, পুরু, লম্বাহাতা শার্ট, তার উপরে আবার “আই ♥ এন ওয়াই” লেখা, হয়ত কোন বাচ্চার কাছ থেকে পাওয়া।

ঘরে কোন টেবিল ছিল না। আমরা তাই একটা জাবুটন গদির উপর দেয়ালে হেলান দিয়ে পাশাপাশি বসলাম। বানর বট্‌ল্‌-ওপনার দিয়ে একটা বোতলের ঢাকনা খুলে দুটো গ্লাসে বিয়ার ঢালল। চুপচাপ আমাদের গেলাস ঠোকাঠুকি করে ছোট করে একটু টোস্ট করে নিলাম আমরা।

“বিয়ারের জন্য ধন্যবাদ।” এই বলে বানর খুশীমনে ঠাণ্ডা বিয়ারে চুমুক লাগাল। আমিও কয়েক ঢোঁক খেলাম। সত্যি বলতে কি একটা বানরের পাশে বসে এইভাবে বিয়ার খাওয়াটা খানিকটা অদ্ভুত লাগছিল। কিন্তু, সবই অভ্যাস হয়ে যায় মনে হয়।

“কাজকর্ম শেষ করে একটা বিয়ার – এর কোন তুলনা হয় না।” লোমশ হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে মুখটা মুছে নিয়ে বলল বানর। “তবে, একটা বানরের পক্ষে এইভাবে বিয়ার খাওয়ার সুযোগ পাওয়া - এ কিন্তু অতি বিরল, কালেভদ্রে জোটে।”

“তুমি কি এই সরাইতেই থাকো?”

“হ্যাঁ, ঘর আছে একটা, ছাদের উপরে, চিলেকোঠা বলতে পারেন, ঐখানেই থাকতে দিয়েছে আমায়। ইঁদুরের দেখা মেলে মাঝে মাঝে, তাই নিশ্চিন্তে থাকা মুস্কিল, তবে, আমি ত একটা বানর, তাই তিন বেলা পেটপুরে খাবার আর শোয়ার জন্য একটা বিছানা জুটলে, আমার এতেই কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। যদিও এমন নয় যে এ জায়গাটা কোন স্বর্গতুল্য কিছু।”
বানরের প্রথম গ্লাসটা শেষ হয়ে গিয়েছিল। আমি তাই আর একবার ভরে দিলাম।

“অনেক ধন্যবাদ,” বিনয়ের সাথে বলল সে।

“তুমি কি শুধু মানুষের সাথেই থেকেছো? নিজের লোকেদের মানে অন্যান্য বানরদের সাথে কখনো থাকো নি?” জিজ্ঞেস করলাম আমি। অনেক প্রশ্ন ভিড় করে আসছিল আমার মাথায়।

“নিশ্চয়, অনেক বার থেকেছি” বানর উত্তর দিল, মুখের উপর দিয়ে হাল্কা একটা ছায়া খেলে গেল তার। চোখের পাশের বলিরেখায় গভীর ভাঁজ পড়ল। “নানা কারণে জোর করে আমাকে শিনাগাওয়া থেকে খেদিয়ে দক্ষিণে বিখ্যাত বানর উদ্যান তাকাসাকিয়ামাতে ছেড়ে দিয়ে আসা হয়। প্রথমটায় ভেবেছিলাম, শান্তিতে কাটিয়ে দিতে পারব ওখানে, কিন্তু সে রকম হলনা। অন্যন্য বানররাও আমার প্রিয় বন্ধু, সঙ্গী-সাথী সব, ভুল বুঝবেন না আমায়, কিন্তু অধ্যাপক আর তাঁর স্ত্রীর সাথে মানুষের মধ্যে বড় হওয়ায় আমি আর আমার জাতভাইদের কাছে নিজের অনুভূতিগুলো ঠিকমত প্রকাশ করে উঠতে পারতাম না। আমাদের মধ্যে খুব সামান্যই মিল ছিল, ফলে আলাপচারিতা সহজ ছিল না। ‘অদ্ভুত কথাবার্তা তোমার’ তারা বলত আমায় আর, কি বলব, ঠাট্টা-বিদ্রূপ করত, গায়ের জোর ফলাত। মেয়ে বানররা আমায় দেখলে মুখ টিপে হাসত, খুব সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম পার্থক্য নিয়েও বানররা অত্যন্ত সংবেদনশীল হয়। ওদের কাছে আমার আচার আচরণ ছিল উপহাসের ব্যাপার, বিরক্তি উৎপাদনকারী, কখনো কখনো রীতিমত গায়ে জ্বালা ধরানো। আমার পক্ষে ওখানে থাকা কঠিন হয়ে উঠল। আমি তাই একসময় ওদের থেকে সরে এলাম, বলা ভাল, একটা দলছুট বানর হয়ে গেলাম।”

“তোমার জন্য ত খুব-ই নিঃসঙ্গ অবস্থা হয়ে গেল তা হলে।”

“একেবারে। কেউ ছিল না রক্ষা করবার, খাবারের জন্য উঞ্ছবৃত্তি করে বেড়িয়েছি, কোনমতে যাতে প্রাণটা থাকে। সবচেয়ে খারাপ অবস্থা হল, কারো সাথে কোন সংযোগ নেই, না পারি কোন বানরের সাথে কথা বলতে, না কোন মানুষের। এইরকমের একাকীত্ব বুক ভেঙ্গে দ্যায়। তাকাসাকিয়ামাতে মানুষ পর্যটকে গিজগিজ করছে। কিন্তু যার তার সাথে দেখা হওয়া মাত্র ত আর আলাপ জুড়ে দেয়া যায় না। একবার করে ফেললে আর দেখতে হবে না, ভয়ানক বিপদ হয়ে যাবে। ফলে আমার অবস্থাটা দাঁড়াল - না এদিকে আছি না ওদিকে, না হতে পারছি মানুষের সমাজের কেউ, না মিশে যেতে পারছি বানরদের দুনিয়ায়। চরম যন্ত্রণাকর অবস্থা।”

“এবং তুমি ব্রুকনার শুনতে পারছ না”

“একদম। জীবন থেকে উধাও হয়ে গেছে সে সব।” বলল শিনাগাওয়া বানর। আরো কয়েক বার বিয়ারে চুমুক দিল সে। আমি ওর মুখের দিকে তাকালাম। এমনিতেই লাল মুখ, আরো লাল হয়েছে কি না বোঝা দুঃসাধ্য। তবে মনে হল এ বানর মদটা ভালোই সামলাতে পারে। অথবা এমন হতে পারে, এ বানরের ক্ষেত্রে মুখ দেখে বোঝা সম্ভব নয় যে সে মাতাল হয়েছে কি হয়নি।

“অন্য আর যেটা আমায় পাগল করে দিচ্ছিল সেটা হচ্ছে মেয়েদের সাথে আমার সম্পর্ক।”
“আচ্ছা।” বললাম আমি। “মেয়েদের সাথে ‘সম্পর্ক’ বলতে তুমি ঠিক কি বোঝাতে চাইছ?”
“সংক্ষেপে বলতে গেলে, মেয়ে বানরদের প্রতি আমার কণামাত্র শারীরিক আকর্ষণ ছিল না। তাদের সাথে ঐ ভাবে মিশবার সুযোগ আমার অজস্র ছিল, কিন্তু আমার কখনো সেই ইচ্ছাটাই হয়নি।”

“তার মানে মেয়ে বানররা তোমার মধ্যে কোন উত্তেজনা জাগাত না, যদিও তুমি নিজে একজন বানর?”

“ঠিক তাই। পুরোপুরি ঠিক। লজ্জার ব্যাপার, কিন্তু, একেবারে সত্যি কথা যে, আমি শুধু মানুষ মেয়েদেরই ভালবাসতে পারতাম।”

আমি চুপ করে বসে রইলাম আর বিয়ারের গ্লাস খালি করতে থাকলাম। চুরমুরে স্ন্যাক্স-এর প্যাকেটটা খুলে এক খাবলা তুলে নিলাম। “সেটায় ত বড় রকম ঝামেলা বেঁধে যেতে পারত মনে হয়।”

“ঠিক, অনেক বড় ঝামেলা, অবশ্যই। যত যাই হোক, একটা বানর হয়ে আমি আশাই করতে পারি না যে কোন মানুষ মেয়ে আমার ইচ্ছায় সাড়া দেবে। তা ছাড়া এটা বংশানুগতির শাস্ত্র বিরুদ্ধও বটে।”

আমি অপেক্ষা করতে থাকলাম বানরের কথার জন্য। বানর তার কানের পিছনটা খুব করে ঘষতে ঘষতে একসময় আবার শুরু করল।

“তাই নিজের অচরিতার্থ বাসনার হাত থেকে মুক্তি পেতে আমায় অন্য পথ খুঁজে বার করতে হল।”

“অন্য পথ’ বলতে কি বোঝাতে চাইছ তুমি?”

বানরের মুখ ভ্রুকুটিকুটীল হয়ে উঠল। লাল মুখ আরো খানিকটা গাঢ়, টকটকে দেখাচ্ছে।

“তুমি আমায় বিশ্বাস না করতে পার,” মুখ খুলল বানর, “বলতে কি, তুমি হয়ত বিশ্বাস করবেই না আমায়। কিন্তু, একটা সময়ের পর থেকে যে মেয়েমানুষদের প্রেমে পড়েছি আমি, তাদের নামগুলো চুরি করতে থাকলাম।”

“নাম চুরি করতে থাকলে?”

“ঠিক, জানিনা কেন, তবে আমার মনে হয় জন্ম থেকেই আমার একটা বিশেষ প্রতিভা আছে। আমি যদি চাই, আমি যে কারো নাম চুরি করে নিয়ে সেটা নিজের করে নিতে পারি।”

আমার মাথা গুলিয়ে গেল।

“আমার মনে হয় না আমি আদৌ কিছু ধরতে পারছি।” বললাম আমি, “লোকেদের নাম চুরি করছ মানে কি বোঝাতে চাইছ, তারা নিজেদের নাম পুরো ভুলে যাচ্ছে?”

“না। পুরো নামটা ভুলে যাচ্ছে না। আমি তাদের নামের খানিকটা চুরি করে নেই, একটা ভগ্নাংশ। কিন্তু ঐ অংশটা চুরি করে নেয়ার পর বাকী নামটা অন্তঃসারশূণ্য হয়ে পড়ে, আগের থেকে হাল্কা হয়ে যায়। কিরকম বলি, সূর্য যখন মেঘে ঢাকা পড়ে, মাটিতে তোমার ছায়াটা তখন ম্লান হয়ে যায়। এবং যার নাম চুরি গেল সে হয়ত বুঝতেও পারবে না তার কতটা ক্ষতি হল। এটা পুরোপুরি সেই মানুষটার বোধের উপর নির্ভর করে। তারা হয়ত বড়জোর এইটুকু অনুভব করেছে যে তাদের কিছু একটা একটু অন্যরকম হয়ে গিয়েছে।”

“কিন্তু কেউ কেউ পরিষ্কার বুঝতে পারে, তাই না, যে তার নামের একটা অংশ চুরি হয়ে গেছে?”

“হ্যাঁ, তা পারে। কখনো কখনো তারা আর নিজেদের নামটা মনে করতে পারে না। খুব-ই অসুবিধার, রীতিমত ঝামেলার, বুঝতেই পারছেন। নামের যা হাল হয়, তাতে নিজের নামটাকে আর হয়ত চিনতেই পারে না। কোন কোন ক্ষেত্রে আত্মপরিচয়ের সংকটে পড়ে যায়। আর এটা পুরোটাই আমার দোষ, কারণ আমি-ই ত তার নামটা চুরি করেছি। খুব খারাপ লাগে আমার। মাঝে মাঝে একটা অপরাধ বোধ, একটা বিবেক যন্ত্রণা ভারী হয়ে চেপে বসে। আমি জানি কাজটা অন্যায় হচ্ছে, কিন্তু ছাড়তে পারি না, জানেন। আমি আমার কাজের সাফাই গাইছি না, কিন্তু আমার মগজের মধ্যে ডোপামিন ঝড় আমাকে এই কাজটা করতে বাধ্য করে। যেন কেউ আমায় নির্দেশ দেয় ‘অ্যাই, যা, চুরি কর নামটা, আরে বাবা, বেআইনি কিছু ত করছিস না’।”

আমি হাতদুটো বুকের কাছে ভাঁজ করে ভালো করে বানরটিকে দেখলাম। ডোপামিন? শেষে মুখ খুললাম “আর যাদের নামগুলো তুমি চুরি কর, তারা সবাই হচ্ছে যাদের তুমি ভালোবাস, বা যাদের থেকে তুমি শারীরিক সঙ্গ পেতে চাও, ঠিক বুঝেছি কি?”

“একদম ঠিক। ভাবনাচিন্তা ছাড়া, এলোমেলো ভাবে আমি কারো নাম চুরি করি না।”

“কত নাম চুরি করেছ তুমি?”

খুব চিন্তান্বিত মুখ করে বানর কড় গুনে হিসাব করল। গুনতে গুনতে ও কিছু একটা বিড়বিড় করছিল। গোনা শেষে মুখ তুলে বলল “সবশুদ্ধ সাত জন। সাতটি মেয়ের নাম চুরি করেছি আমি।”

সংখ্যাটি কি অনেক বেশী, না কি তেমন নয়? কে জানে!

“তা কি করে কাজটা করো তুমি?” জিজ্ঞেস করলাম আমি। “বলতে যদি আপত্তি না থাকে।”

“এটা মূলত ইচ্ছাশক্তির ব্যাপার। মনঃসংযোগ করে করতে হয়, মানসিক শক্তির সাহায্যে। তবে সেটা যথেষ্ট নয়, আরো কিছু দরকার পড়ে। আমার কিছু একটা লাগে, যেটায় মানুষটির নিজের নাম লেখা থাকে, গাড়ি চালানোর অনুমতি-কার্ড, ছাত্র-ছাত্রী পরিচিতি-কার্ড, বীমা-কার্ড, বা পাসপোর্ট, কিছু একটা। একটা নাম-নির্দেশক ব্যাজ হলেও চলবে। অর্থাৎ, হাতে ধরা যায় কি ছোঁয়া যায় এমন কোন একটা বস্তু আমার লাগবে, যেটায় তার নাম লেখা আছে। সাধারণতঃ চুরি করাটাই একমাত্র উপায়। লোকেরা যখন বাইরে আছে, তখন টুক করে তাদের ঘরে ঢুকে পড়াটা আমি বেশ ভালোই রপ্ত করেছি। চারপাশে খুঁজে দেখি তাদের নাম লেখা কোন কিছু পাওয়া যায় কি না, তারপর সেটা নিয়ে কেটে পড়ি।”

“তার মানে তুমি মেয়েটির নাম লেখা জিনিষটি নিয়ে সেটায় তোমার মানসিক শক্তি কাজে লাগিয়ে তার নামটা চুরি করো?”

“এক কথায় বলতে গেলে তাই। যে নামটা লেখা আছে সেটার দিকে আমি অনেকক্ষণ ধরে তাকিয়ে থাকি, আমার সমস্ত অনুভূতি এক করে, যাকে ভালবাসি তার নামটা আমি শুষে নেই। কাজটা অসম্ভব সময় নেয়, আর কি মানসিক, কি শারীরক, দু’ভাবেই একেবারে বিধ্বস্ত করে ফেলে। কাজটায় আমি একেবারে ডুবে যাই। কি ভাবে কে জানে, মেয়েটির খানিকটা অংশ আমার অংশ হয়ে যায়। আর এ ভাবেই, আমার ভালোবাসা, আমার কামনা যা এতক্ষণ কোন পথ পাচ্ছিলনা, নিরাপদে তৃপ্তি লাভ করে।”

“পুরো ঘটনাটায় তা হলে কোন শারীরিক ব্যাপার নেই?”

বানর তীব্রভাবে মাথা নাড়াল, “আমি জানি আমি একটা হতচ্ছাড়া বানর মাত্র, কিন্তু আমি কোনদিন অভাবনীয় কিছু ঘটাইনি। আমি শুধু আমার ভালোবাসার মেয়েটির নামের কিছুটা অংশ আমার করে নিয়েছি, আমার জন্য তাই যথেষ্ট। মানছি, এটা খানিকটা বিকৃতরুচির কাজই হচ্ছে, কিন্তু এটাও ঠিক যে এ কাজটা একেবারে বিশুদ্ধ ভালোবাসা, রজকিনী প্রেম, নিকষিত হেম। সেই নামটির প্রতি আমার এই বিপুল ভালোবাসা আমি আমার নিজের অন্তরে ধরে রাখি, গোপনে, একান্তে। যেন বিশাল প্রান্তরের উপর দিয়ে হিল্লোল তুলে বয়ে যাওয়া মৃদুমন্দ বাতাস।”

“হুম্‌ম্‌,” বললাম আমি, মন্ত্রমুগ্ধের মত, “আমার মনে হয়, এটাকে তুমি রোমান্টিক ভালোবাসার চরম প্রকাশও বলতে পারো।”

“একমত। কিন্তু একই সাথে, এটা একাকীত্বের চরম প্রকাশও। এক-ই মুদ্রার দুই পিঠ। দু’টি চরম বিপরীতকে একসাথে জুড়ে দেয়া হয়েছে এবং তাদের আর এর থেকে কোন ছাড়ান-কাটান নেই।”

আমাদের কথাবার্তা এইখানে এসে থেমে গেল, বানর আর আমি দু’জনেই নিঃশব্দে আমাদের বিয়ার পান করতে থাকলাম, মাঝে মধ্যে কাকিপি আর শুকনো স্কুইড দিয়ে মুখ চালানো।

“হালফিল কারো নাম চুরি করেছ তুমি?”

মাথা নাড়ল বানর। নিজের হাতের কয়েকটা চুল খিমচে ধরল, যেন নিজেই নিজেকে যাচাই করে নিচ্ছে, বানরই ত সে, অন্য কিছু নয় ত। “নাঃ হালফিল আর কারো নাম চুরি করিনি আমি। এই শহরে আসার পর আমি মনস্থির করে নিয়েছি, ঐ সব উৎপটাং কাজ আর নয়। ফলে যেটা হয়েছে, এই বেচারা বানরের আত্মাটা এক ধরণের একটু শান্তি পেয়েছে। যে সাতটি নাম আমি সংগ্রহ করেছি তাদের আমি হৃদয়ের মণিকোঠায় যত্ন করে রেখে দিয়েছি আর শান্তিতে জীবন কাটাবো বলে ঠিক করে নিয়েছি।”

“খুব খুশী হলাম শুনে।” বললাম আমি।

“আমি জানি আমার জন্য এটা কিছুটা ছোট মুখে বড় কথা হয়ে যায়, তবু ভাবছিলাম প্রেমের ব্যাপারে আপনি যদি আমায় আমার নিজের মতটা জানাতে দেন।”

“অবশ্যই,” বললাম আমি।

বানর বেশ কয়েকবার বড় করে চোখ পিটপিট করল। তার ঘন আঁখিপক্ষ্মগুলি তালপাতার ঝালরের মত কয়েকবার ওঠানামা করল। গভীর ভাবে মৃদু শ্বাস টানল সে, লম্বা লাফ দেয়ার জন্য দৌড় শুরু করার আগে প্রতিযোগী যেভাবে তার শ্বাস টানে।

“আমি মনে করি বেঁচে থাকার জন্য প্রেম হচ্ছে আমাদের অবশ্য প্রয়োজনীয় জ্বালানী। একদিন এই প্রেম শেষ হয়ে যেতে পারে। বা সেটা আর কোন কাজে লাগবে না হয়ত। কিন্তু প্রেম যদি মিলিয়েও যায়, এমনকি সেটা যদি একতরফা হয়, কোন প্রতিদান না জোটে, তা হলেও কাউকে ভালবাসতে পারার কি কারোর প্রেমে পড়ার স্মৃতিটুকুকে তুমি আঁকড়ে ধরে থাকতে পারো। এবং সেইটে হচ্ছে শক্তির এক অতি মূল্যবান উৎস। সেই উত্তাপটুকু না থাকলে, একজন মানুষের হৃদয়, এমনকি একটি বানরের হৃদয়ও এক হিম শীতল পরিত্যক্ত বিরানভূমিতে পরিণত হয়। একবিন্দু সূর্যের আলো সেখানে প্রবেশ করে না, শান্তির বনফুল, আশার তরুলতা সেখানে জীবনের মুখ দেখে না। এইখানে, আমার এই হৃদয়ের গভীরে আমি ঐ সাতটি মেয়ের নাম গুপ্তধনের মত আগলে রেখেছি।” বানরটি তার একটি হাতের তালু তার রোমশ বুকের উপর রাখল। “আমার এই স্মৃতি গুলোকেই বিরহের শীতল দিনে আমার নিজস্ব এক কুচি শক্তির উৎস করে আমি আমার ব্যক্তিগত জীবনের বাকি দিনগুলো কাটিয়ে দিতে চাই।”

বানর নিঃশব্দে হেসে নিজের মনে কয়েকবার আস্তে করে মাথা নাড়ল।

“কিরকম অদ্ভুত শোনায়, তাই না?” বিড়বিড় করল বানর “আমি একটি বানর, কোন ব্যক্তি নই। আমার আবার ব্যক্তিগত জীবন। হী-হী!”

অবশেষে দুই বড় বোতল বিয়ার খতম করে আমরা যখন উঠলাম, রাত তখন সাড়ে এগারোটা বেজে গেছে। “আমার এবার যাওয়া উচিত,” বলল বানর। “এত ভালো লাগছিল, আবেগে প্রচুর বড় বড় কথা বলে ফেলেছি মনে হয়, মাপ চেয়ে নিচ্ছি।”

“মোটেও না, আমার তো গল্পটা খুব আকর্ষণীয় লেগেছে।” বললাম আমি। হতে পারে ‘আকর্ষণীয়’ কথাটা যথেষ্ট হল না। মানে, বলছিলাম যে একটা বানরের সাথে বিয়ার খেতে খতে আড্ডা মারাটা এমনিতেই একটা অস্বাভাবিক অভিজ্ঞতা। তার সাথে যদি ধরা যায় যে এই বানর ব্রুকনার শুনতে ভালোবাসে, এবং, মহিলাদের নাম চুরি করে কারণ সেই সব মেয়েদের প্রতি সে শারীরিক আকর্ষণ বোধ করে (কিংবা ভালোবাসে তাদের), এক্ষেত্রে ‘আকর্ষণীয়’ বললে কমই বলা হয়। আজ পর্যন্ত এর থেকে আশ্চর্যের কিছু শুনেছি বলেছি আমার মনে পড়ে না। কিন্তু আমি বানরের আবেগ-অনুভূতিতে খামখা ঝামেলা পাকাতে চাইনি, তাই আমি বরং এই তুলনায় সাদামাটা, নিরীহ শব্দটা ব্যবহার করলাম।
আমরা যখন পরস্পরকে বিদায় জানালাম, আমি বানরকে একটা হাজার ইয়েন বখশিস দিলাম। “বেশী কিছু নয়”, বললাম আমি, “তবু রাখো এইটা, আর পছন্দসই কিছু খাবার কিনে নিও।”

বানর প্রথমে নিতে চায়নি, কিন্তু আমি বারবার বলায় শেষ পর্যন্ত নিয়ে নিল। সাবধানে টাকাটা ভাঁজ করে সোয়েটপ্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে রাখল।

“আপনার মন খুব নরম,” বলল সে। “আপনি আমার অদ্ভুত জীবন কাহিনী শুনলেন, আমাকে বিয়ার খাওয়ালেন, আর তারপরে এখন এত চমৎকার ব্যবহার করছেন, এটা যে আমার জন্য কতটা প্রাপ্তি সে আমি আপনাকে বলে বোঝাতে পারবনা।”

খালি বিয়ারের বোতল আর গ্লাসগুলো ট্রেতে তুলে নিয়ে বানর ঘর থেকে বিদায় নিল।

পরদিন সকালে আমি সরাইখানা থেকে পাওনাগণ্ডা মিটিয়ে বেরিয়ে এলাম এবং টোকিও ফিরে গেলাম। সামনের ডেস্কে সেই মাথা কি ভুরু কোথাও চুল না থাকা বিদঘুটে বুড়োকে ত্রিসীমানাতে দেখা গেল না। নাকের ঝামেলা-ওয়ালা সেই বুড়ো বেড়ালটাকেও কোথাও দেখলাম না। পরিবর্তে একটি মোটাসোটা নিশ্চিত মাঝবয়সী মহিলা বসেছিল সেখানে। এবং, আমি যখন বললাম যে কালকে রাতের বিয়ারের বোতলের জন্য বাড়তি দামটা আমি এখন মিটিয়ে দিতে চাই, সে প্রবল জোরের সাথে জানালো যে আমার বিল-এ কোন বাড়তি খরচ দেখা যাচ্ছে না। “একমাত্র খরচ যা দেখা যাচ্ছে আপনি ভেন্ডিং মেশিন থেকে নগদে কৌটোর বিয়ার কিনে নিয়েছেন,” সে জোরের সাথে জানালো, “আমরা কখনো বোতলে বিয়ার বিক্রী করি না।”

আমি আবারও দ্বিধায় পড়ে গেলাম। আমার মনে হল যেন বাস্তব আর অবাস্তব খেলাখুশীমত তাদের জায়গা বদল করে ফেলছে। কিন্তু আমি নিশ্চিত যে বানরের জীবনের গল্প শুনতে শুনতে আমি সাপ্পোরো বিয়ারের দুটি বোতল তার সাথে ভাগ করে নিয়েছিলাম।

আমি একবার ভাবলাম মাঝবয়সী মহিলাটিকে বানরের কথাটা বলি, তারপর চেপে গেলাম। কে জানে, আসলে হয়ত কোন বানর ছিলই না, সবটাই আমার কল্পনা, ঝর্ণার গরম জলে অতিরিক্ত সময় ধরে মাথা ভিজিয়ে মগজটা একেবারে আচার পাকিয়ে গিয়েছিল। অথবা আমি যেটা দেখেছিলাম তা ছিল, অদ্ভুত এক সত্যি মনে হওয়া স্বপ্ন। যদি ওনাকে বলতাম “আপনাদের এখানে এক বুড়ো বানর কাজ করে, যে মানুষের ভাষায় কথা বলে, তাই না?” কিসের থেকে যে কি হত কে জানে? সবচেয়ে যেটা খারাপ হতে পারত, আমাকে হয়ত পাগল বলেই ভেবে নিত। এমন হতে পারে যে বানরটি যে ওখানে কাজ করত, সেটা খাতায়-কলমে দেখানো হত না। এবং সরকারী খাজনার দপ্তর কি স্বাস্থ্য দপ্তরে জানাজানি হয়ে যাওয়ার ভয়ে সরাই কর্তৃপক্ষ বানরকে রাখার কথা জনসমক্ষে কোন দিন স্বীকার-ই করতে পারত না।
ট্রেনে বাড়ি ফেরার পথে, মনে মনে আমি একবার বানরের বলা সমস্ত কথাগুলো ফিরে দেখার চেষ্টা করলাম। খুঁটিনাটি সমস্ত, যতটা মনে পড়ল, আমার অফিসের কাজে যে নোটবুকটা ব্যবহার করতাম, সেটায় লিখে নিলাম যাতে, টোকিওতে ফেরার পর, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সমস্তটা বিশদে লিখে ফেলতে পারি।

যদি সত্যি-ই সেদিন কোন বানর এসে থাকে – আমি ত অন্য কিছু ভাবতেই পারছি না – বিয়ার খেতে খেতে সে যা বলেছিল তার কতটা যে আমি ঠিক বলে ধরে নেব সেটাও মনস্থির করতে পারছি না। আদৌ কি কোন মেয়ের নাম চুরি করা সম্ভব, এবং সেটা নিজের কাছে রেখে দেওয়া? এটা কি কোন বিশেষ ক্ষমতা যা ঐ শিনাগাওয়া বানরের-ই শুধু আছে? এও হতে পারে, বানরটা একটা অনর্গল মিথ্যেবাদী। কে বলতে পারে? আমি ত অন্তত এমন কোন বানরের কথা শুনিনি, একের পর এক বানিয়ে বানিয়ে বলে যাওয়াটা যার স্বভাবগত অভ্যাস। অন্য দিকে, মানুষের ভাষায় এমন চমৎকার সাজিয়ে গুছিয়ে কথা বলে যেতে পারে যে বানর, তার পক্ষে একটা স্বভাব-মিথাবাদী হওয়া কিছুই অসম্ভব নয়।

আমার কাজের অঙ্গ হিসেবে অজস্র লোককে জিজ্ঞাসাবাদ করতে হয় আমায়, এবং কাকে বিশ্বাস করা যায় আর কাকে যায় না এ আমি প্রায় গন্ধ শুঁকে বলে দিতে পারি। কেউ যখন এক নাগাড়ে কথা বলে যায়, তুমি কিছু কিছু সূক্ষ্ম ইঙ্গিত, কি সংকেত, ধরতে পারো, ভিতর থেকে কিছু একটা তোমায় বলে দেয় যে তাকে বিশ্বাস করা যায় কি যায় না। এবং আমার একবারের জন্যও মনে হয়নি যে শিনাগাওয়া বানর বানিয়ে বানিয়ে কিছু বলেছিল। ওর চোখ, ওর আচার-আচরণ, যে ভাবে ও থেকে থেকে অন্যমনস্ক হয়ে যাচ্ছিল, থেমে যাওয়া, কথা বলার ভঙ্গী, মাঝে মাঝে শব্দ হাতড়ানো – একবারের জন্যও মনে হয়নি ধান্দাবাজি কি জোর করে কিছু করছে। আর, সবচেয়ে বড় কথা হল, নিজের সম্পর্কে বলার সময় ও কিচ্ছু লুকায়নি, সে যত কষ্টই পাক।

আমার একা একা নিশ্চিন্তে ঘোরা এক সময় ফুরিয়ে গেল। আবার ফিরে এলাম শহরের ব্যস্ত জীবনের ঘুরণচাকিতে। যত বয়স বাড়ছে, এমনকি যখন আমার কোন বড় রকম চাপের কাজ নেই, তখনও দেখছি, কে জানে কেমন করে, আগের থেকে ব্যস্ততা বেড়ে গেছে। সময় যেন ক্রমাগত আরো তাড়াতাড়ি সরে যাচ্ছে। শেষ পর্যন্ত কাঊকেই আর আমি শিনাগাওয়া বানরের কথা কিছু বলিনি বা কোনদিন কিছু লিখিওনি তাকে নিয়ে। কেউ যখন আমাকে বিশ্বাস করবেই না, এ নিয়ে তখন আর কথা বাড়িয়ে লাভ কি? যতক্ষণ না আমি কোন প্রমাণ দিতে পারছি – প্রমাণ, যে ঐ বানর সত্যি সত্যিই ছিল – না হলে লোকেরা ত স্রেফ বলে দেবে যে “আবার বানিয়ে বানিয়ে গল্প বলছে।” আর যদি একে নিয়ে একটা গল্প লিখি, ত গল্পটা লিখব কি উদ্দেশ্য নিয়ে, কোন নির্দিষ্ট লক্ষ্য ত নেই। পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি, সম্পাদক হতভম্ব হয়ে আমায় প্রশ্ন করছেন, “জানি না জিজ্ঞাসা করা ঠিক হবে কি না, আপনি নিজেই যখন লিখেছেন, কিন্তু এই গল্পের বিষয় টা কি?”

বিষয়? আদৌ কোন বিষয় আছে কি এর? এটা নেহাতই এক বৃদ্ধ বানরের গল্প যে মানুষের ভাষায় কথা বলে, যে গুম্না প্রদেশের এক ছোট্ট শহরের গরম জলের ঝর্ণার ধারে অতিথিদের পিঠ ঘষে দিয়ে তাদের সেবা করে, যে ঠাণ্ডা বিয়ার উপভোগ করে, যে মানুষ মেয়েদের প্রেমে পড়ে, আর তাদের নাম চুরি করে। এর মধ্যে বিষয়ের আছেটা কি? আর নীতিকথাই বা কি থাকতে পারে?

যত দিন গড়াল, সেই গরম জলের ঝর্ণার শহরের স্মৃতি তত ঝাপসা হয়ে এল। স্মৃতি যত জীবন্তই হোক না কেন, সময়কে অতিক্রম করতে পারে না।

কিন্তু আজ, পাঁচ বছর বাদে, তখন যে সব টুকরো-টাকরা লিখে রেখেছিলাম সেগুলোর উপরেই ভিত্তি করে আমি এটা লিখে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। খুব সম্প্রতি ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা আমায় এই দিকে ভাবতে শুরু করিয়েছে। এই ঘটনাটা না ঘটলে আমি খুব সম্ভবতঃ এটা নিয়ে লিখতে বসতাম না।

আকাসাকায় এক হোটেলের কফি লাউঞ্জে আমার নিজের কাজের ব্যাপারে একজনের সাথে দেখা করার কথা ছিল। যার সাথে দেখা করার কথা তিনি একটি ভ্রমণ পত্রিকার সম্পাদক। খুব আকর্ষণীয়া মহিলা, তিরিশের কোঠায় বয়স, ছোটখাটো চেহারা, লম্বা চুল, চমৎকার দেখতে, আর নজর কাড়া বড় বড় চোখ। খুব দক্ষ সম্পাদক। এবং অবিবাহিতা। অনেকদিন একসঙ্গে কাজ করেছি আমরা, ভাল মেলে আমাদের। কাজ মিটে গেলে কফি নিয়ে বসে খানিকক্ষণ আড্ডা দিলাম।

মেয়েটির সেলফোন বেজে উঠলে সে আমার দিকে অনুমতি চাওয়ার মত করে চাইল। আমি স্বাভাবিকভাবেই কথা সেরে নিতে বললাম। কে কথা বলতে চাইছে দেখে নিয়ে সে উত্তর করল। মনে হল কোন একটা আসন সংরক্ষণ করা নিয়ে কথা হচ্ছে। কোন রেস্তোঁরা বা হোটেলে কিংবা কোন উড়ানের। ঐ রকম-ই কিছু হবে। বেশ খানিকক্ষণ কথা হল, পকেট-প্ল্যানার দেখে মিলিয়ে নিল, তারপর আমার দিকে বিব্রতভাবে তাকাল।

“খুব দুঃখিত,” ফোনটা হাত দিয়ে আড়াল করে নিচু গলায় বলল সে। “খুব-ই অদ্ভুত প্রশ্ন করছি, জানি আমি, কিন্তু আমার নামটা যেন কি?”

ধাক্কা খেলাম আমি, কিন্তু যথাসাধ্য স্বাভাবিক থেকে তাকে তার পুরো নামটা বললাম। সে মাথা নেড়ে নামটা ফোনের অপর প্রান্তে জানিয়ে দিল। এরপর ফোনটা শেষ করে আবার আমার কাছে ক্ষমা চাইল।

“ভীষণ দুঃখিত আমি। হঠাৎ করে নিজের নামটা মনে করতে পারলাম না। এমন লজ্জা লাগছে।”
“মাঝে মাঝেই হচ্ছে কি?”

সে উত্তর দিতে একটু দ্বিধা করল, শেষ পর্যন্ত ঘাড় নেড়ে বলেই ফেলল। “হ্যাঁ, আজকাল খুব বেশী হচ্ছে। কিছুতেই নিজের নামটা মনে পড়ে না। যেন মাথার মধ্যে কি একটা ফাঁকা হয়ে গেছে বা ঐরকম কিছু।”
“তুমি কি আরো অন্যান্য জিনিষও ভুলে যাচ্ছ? ধরো তোমার জন্মদিন বা টেলিফোন নাম্বার মনে আসছে না, বা পিন নাম্বার?”

মেয়েটি খুব দৃঢ়তার সাথে মাথা নাড়ল, “না, একদম নয়। আমার স্মরণশক্তি বরাবর খুব ভালো। আমার সমস্ত বন্ধুদের জন্মদিনের তারিখ আমি মন থেকে বলে যেতে পারি। অন্য কারো নাম ভুলে যাইনি আমি, একবারের জন্যও না। অথচ, মাঝে মাঝে আমি আমার নিজের নামটা মনে করতে পারছি না। কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। দু’-এক মিনিট বাদে নামটা মনে পড়ে, কিন্তু ঐ দু’ মিনিট যে কি অসুবিধা ঘটায়, আর আমি যে কি আতঙ্কিত হয়ে পড়ি। যেন আমি আর আমি নেই। কি মনে হয় তোমার, আলঝাইমারের প্রথম লক্ষণ দেখা যাচ্ছে?”

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম আমি। “ডাক্তারি মতে, আমি জানি না কি বলবে এটাকে, কিন্তু কখন এটা শুরু হয়েছিল, এই হঠাৎ করে নাম মনে না পড়াটা?”

ভুরু কুঁচকে সে ভাবল কিছুক্ষণ। “প্রায় মাস ছয়েক আগে, আমার ধারণা। যদ্দূর মনে পড়ে, সেই যখন আমি সামেজুতে চেরীফুল ফোটা দেখতে বেড়াতে গিয়েছিলাম। সেইবারই প্রথম।”

“প্রশ্নটা অদ্ভুত মনে হতে পারে, কিন্তু সে সময় তুমি কি কোন কিছু হারিয়েছিলে? কোন রকম পরিচয় পত্র, যেমন ধরো গাড়ি চালানোর অনুমতি-কার্ড, পাসপোর্ট, বীমা-কার্ড?”

সে ঠোঁট টিপে খানিকক্ষণ নিজের মনে চিন্তায় ডুবে গেল, তারপর উত্তর দিল। “জানো, তুমি বলায় এখন মনে পড়ল, আমি আমার গাড়ি চালানোর অনুমতি-কার্ড-টা সেইসময় হারিয়ে ফেলেছিলাম। সেদিন তখন দুপুরের খাবার সময় চলছে, আমি একটা পার্কের বেঞ্চিতে বসে জিরিয়ে নিচ্ছিলাম একটু, আর আমার হাতব্যাগটা নামিয়ে রেখেছিলাম বেঞ্চের উপরে ঠিক আমার পাশটায়। কম্প্যাক্টটা বার করে লিপস্টিকটা ঠোঁটে একবার বুলিয়ে নিলাম আর তারপরেই তাকিয়ে দেখি, ব্যাগটা হাওয়া। আমি কিচ্ছু বুঝতে পারলাম না। মাত্র একটা মিনিটের জন্য আমি চোখ সরিয়েছি এবং একবারের জন্যও মনে হয়নি কাছাকাছি কেউ আছে, বা কারো পায়ের আওয়াজ শোনা গেছে। চারদিকে তাকালাম, কেউ নেই, আমি একা। পার্কটা সুনসান নিঃশব্দ, এবং আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি যে কেউ যদি আমার ব্যাগ চুরি করতে আসত সে ঠিক আমার চোখে পড়ত।”

আমি তার কথা চালিয়ে যাওয়ার অপেক্ষায় রইলাম।

“তবে সেটাই কিন্তু একমাত্র আশ্চর্যের ব্যাপার ছিল না। ঐ দিন বিকেলে আমায় পুলিসের থেকে জানায় যে আমার হাতব্যাগটা পাওয়া গেছে। পার্কের পাশে একটা ছোট থানার সামনে কেউ এটা রেখে দিয়ে গেছিল। টাকা পয়সা সব ঠিক ছিল, ক্রেডিট কার্ড, এ. টি. এম কার্ড, যেমন কে তেমন, কেউ ছুঁয়েও দেখে নি। শুধু গাড়ি চালানোর অনুমতি-কার্ড-টা নেই। পুলিশের লোকটা খুব অবাক হয়েছিল। এমন কে হতে পারে যে টাকাপয়সা কিচ্ছু না নিয়ে শুধু অনুমতিপত্রটা নেবে আর তারপর ব্যাগটা থানার সামনে নামিয়ে রেখে যাবে?”

আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম, কিন্তু কিছু বললাম না।

“তখন মার্চ মাসের শেষ। আমি এক মুহুর্ত দেরী না করে সামেজুর যান নিয়ন্ত্রণের দপ্তরে চলে গেলাম আর ওদের দিয়ে একটা নতুন অনুমতি-কার্ড করিয়ে নিলাম। পুরো ঘটনাটা কিরকম অদ্ভুত লেগেছিল, তবে কপাল ভালো যে সত্যিকারের কোন ক্ষতি হয়নি।”

সামেজু জায়গাটা শিনাগাওয়াতে, তাই না?

“ঠিক। শিনাগাওয়ার মধ্যে, হিগাশিওই-তে। আমার কোম্পানির দপ্তর তাকানাওয়ায়, তাই ট্যাক্সি ধরে চলে গেলে চট করে পৌঁছে যাওয়া যায়,” বলল সে। তারপর আমার দিকে একটা সন্দেহাকুল দৃষ্টিতে তাকাল।

“তোমার কি মনে হচ্ছে, একটা কোন যোগাযোগ আছে? আমার নিজের নাম মনে না পড়া আর অনুমতি-কার্ড-টা হারানোর মধ্যে?”

আমি দ্রুত মাথা নাড়লাম। কিভাবে শিনাগাওয়া বানরের কথাটা তুলব, বুঝতে পারছিলাম না।

“না, যোগাযোগ সম্ভবতঃ নেই,” বললাম আমি। “মনে এল আর কি। তোমার নাম নিয়ে ত কথাটা, তাই।”
সে আমার কথাটা মানল বলে মনে হল না। আমি বুঝতে পারছি ঝুঁকির হয়ে যাচ্ছে, কিন্ত আর একটা প্রশ্ন আমায় করতেই হবে।

“একটা কথা, কোন বানরের সঙ্গে কি তোমার আলাপ হয়েছে, কিছুদিনের মধ্যে?”

“বানর?” জিজ্ঞাসা করল সে। “মানে, জানোয়ার বানর?”

“ঠিক, সত্যিকারের জ্যান্ত বানর,” বললাম আমি।

মাথা নাড়ল সে। “আমার মনে হয় না বহু বছরের মধ্যে আমি কোন বানর দেখেছি। চিড়িয়াখানাতে না, কোথাওই না।”

শিনাগাওয়া বানর কি আবার তার পুরনো খেলা শুরু করেছে? না কি অন্য কোন বানর ওর কাজের কৌশলটা ব্যবহার করে একই রকম অপরাধ করতে নেমে পড়েছে? (ধরো একটা নকলি বানর?) না কি বানর নয়, অন্য কোন কিছু, এই কাজটা করছে এখন?

আমি সত্যিই ভাবতে চাই না যে শিনাগাওয়া বানর আবার নাম চুরি করতে শুরু করেছে। সে আমায় পরিষ্কার বলেছিল যে, সাতটি মেয়ের নাম তার অন্তরের পক্ষে যথেষ্ট, এবং জীবনের বাকি কটা দিন স্রেফ নিরিবিলিতে গরম জলের ঝর্ণার ঐ ছোট্ট শহরটায় কাটিয়ে দিতে পারলেই সে খুশী।

আর ওর কথা থেকে মনেও হয়েছিল যে ও সত্যি কথাই বলছে। কিংবা কে বলতে পারে, বানরটা হয়ত কোন দুরারোগ্য মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত, যা শুধুমাত্র যুক্তি দিয়ে সামলানো যায় না। হতে পারে ওর অসুস্থতা, ওর ডোপামিনের ঝামেলাটা ওকে এই কাজটা না করে থাকতে দিচ্ছে না। আর হয়ত সেইটাই ওকে শিনাগাওয়াতে ওর পুরানো শিকারের জায়গায়, ওর সেই পুরানো সর্বনাশা অভ্যাসে ফিরিয়ে এনেছে।

আচ্ছা, আমিও কি একবার চেষ্টা করে দেখব? কোন কোন নিদ্রাহীন রাতে এই লাগামছাড়া, অলীক চিন্তা পেয়ে বসে আমায়। কোন একটা মেয়ে, যাকে আমি ভালোবাসি, তার একটা পরিচিতি-কার্ড কি নামপরিচয়, চুপিসাড়ে তুলে নেব, তারপর একটা লেসার রশ্মির মত মনঃসংযোগ করব সেটায়, শুষে নেব তার নামটাকে আমার ভিতরে, আর তার একটা অংশ আমার, শুধু আমার হয়ে যাবে। কেমন হবে সে অনুভূতিটা?

নাঃ। কোনদিন হবে না সেটা। আমার হাতে সেই যাদু নেই, আমার নিজের নয় এমন কোন কিছু আমি কারো কাছ থেকে কোনদিন চুরি করে উঠতে পারবো না। এমনকি সেটা যদি ধরাছোঁয়া যায় না এমন কিছুও হয়, আর সেটা চুরি করা আইনবিরুদ্ধ না হয়, তবুও পারবো না।

তীব্র প্রেম, চূড়ান্ত একাকীত্ব। সেই দিনের পর থেকে, যখনি ব্রুকনারের সিম্ফনি শুনেছি, শিনাগাওয়া বানরের ব্যক্তিগত জীবনটার কথা ভাবি। কল্পনা করি সেই বুড়ো বানরটিকে, গরম জলের ঝর্ণার ছোট্ট শহরে, একটা ভগ্নপ্রায় সরাইখানায় চিলেকোঠার ঘরে, একচিলতে সরু ফুটনে ঘুমিয়ে আছে। মনে পড়ে স্ন্যাক্সের কথা – কাকিপি আর শুকনো স্কুইড – বিয়ার খেতে খেতে একসাথে উপভোগ করা, দেয়ালে ঠেসান দিয়ে।

ভ্রমণ-পত্রিকার সেই সুন্দরী সম্পাদকের সাথে আর আমার দেখা হয়নি, তাই আমার কোন ধারণা নেই, তার নামটির ভাগ্যে এরপর কি ঘটেছিল। আশা করি এর জন্য তার কোন সত্যিকারের ঝামেলা ঘটেনি। আর যাই হোক, সে কোন দোষ করে নি। তার কোন ভুল ছিল না। ঘটনাটার জন্য আমার সত্যিই খারাপ লাগে, কিন্তু কিছুতেই আজও তাকে আমি শিনাগাওয়া বানরের কথা বলে উঠতে পারিনি।


--------------

মূল গল্প: Confessions of a Shinagawa Monkey

By Haruki Murakami

(Translated in English, from the Japanese, by Philip Gabriel.)


লেখক পরিচিতিঃ

বিখ্যাত জাপানী লেখক হারুমি মুরাকামি কথায় ছবি আঁকেন। ত্রিমাত্রিক ছবি। পাঠকের চোখের সামনে ধরা ছোঁয়ার দৃশ্যপটে চরিত্ররা ঘুরে বেড়ায়। আর সেই চলমান জগতে বাস্তব আর অবাস্তব জায়গা বদল করতে থাকে। একসময় পাঠক আবিষ্কার করেন গল্পটি পাঠকের নিজের অন্তরকে তার সামনে এনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। ‘শিনাগাওয়া বানরের স্বীকারোক্তি’ মুরাকামির অনেকদিন আগে প্রকাশিত ‘একটি শিনাগাওয়া বানর’ নামের গল্পের দ্বিতীয় বা পরবর্তী পর্ব। স্বীকারোক্তির গল্পের শেষে গল্পের কথক আর তার হাত ধরে গল্পের পাঠক শিনাগাওয়া বানরকে নিজের মধ্যে বা শিনাগাওয়া বানরের মধ্যে নিজেকে ... নাঃ, জাদুবাস্তবতার এই কুহক পাঠক বরং নিজেই ভেদ করুন।


-----------------







অনুবাদক পরিচিত :
অমিতাভ চক্রবর্ত্তী।
কবি। গল্পকার। অনুবাদক। প্রাবন্ধিক।
টেনেসি, যুক্তরাষ্ট্রে থাকেন।








                                                                                        

২টি মন্তব্য:

  1. অভিনব একটা গল্প। অনুবাদকের প্রাঞ্জল অনুবাদের কারণে পড়ার সুযোগ হলো। আশা করছি বিশ্বসাহিত্যের লেখকদের গুরুত্বপূর্ণ গল্পগুলো এভাবেই অনুবাদক আর গল্পপাঠের হাত ধরে আমাদের সামনে আসতেই থাকবে।

    উত্তর দিনমুছুন
  2. গল্পপাঠ এ এই গল্পটাই আগে পড়েছি, দ্বিতীয়বার পড়লাম, অনুবাদককে ধন্যবাদ

    উত্তর দিনমুছুন