বুধবার, ২৬ আগস্ট, ২০২০

ক্যাথরিন ম্যান্সফিল্ডে'র গল্প : এ কালের দাম্পত্য

                                
      
অনুবাদঃ বেগম জাহান অ্যাঁরা

স্টেশনে যাওয়ার পথে উইলিয়মের মনে হলো, বাচ্চাদের জন্য কিছুই নেয়া হয়নি। আর কথাটা মনে হওয়ার সাথে সাথেই নিজের অপারগতার ব্যর্থতায় বুকের ভেতর বেশ তীব্র একরকম কষ্ট হতে লাগলো। বেচারা ছোটো বাচ্চাগুলো! ওদের জন্য এটা খুব কষ্টের ব্যাপার। তাঁকে দৌড়ে স্বাগত জানাতে এসে তাদের প্রথম কথাই হলো, আমাদের জন্য কি এনেছো বাপী? অথচ তাদের দেবার মতো তাঁর কাছে কিছুই নেই। আহা, ঠিক হলো না। স্টেশন থেকে অবশ্যই কিছু মিষ্টি কিনে নিতে হবে তাঁকে। গত চার সপ্তা যাবত এই কাজটাই করছেন তিনি। একই রকম প্যাকেট বার বার দেখে বাচ্চাদের মুখ মলিন হয়ে গিয়েছিলো গত সপ্তায়।


প্যাডি বলেছিলো, এটা তো আমার ছিলো। আগে থেকেই ছিলো।

জনি বলেছিলো, আমার জন্য সবসময়য় গোলাপি কেন? আমি একটুও পছন্দ করি না এই রঙ।

কিন্তু কি করবে উইলিয়ম? এতো সহজ ছিলো না ব্যাপারটার নিষ্পত্তি। আগেকার দিন হলে, অবশ্যই তিনি ট্যাক্সিতে করে সুন্দর খেলনার দোকানে গিয়ে পাঁচ মিনিটের মধ্যে তাদের জন্য খেলনা পছন্দ করে ফেলতেন। কিন্তু এখন বাজার সয়লাব রুশ খেলনা, ফরাসি খেলনা, সার্বিয়ান খেলনা, এবং পৃথিবীর কোথাকার না খেলনা আসে, ঈশ্বর জানেন। যার ভেতর থেকে কোন টা নেবেন ভাবতেই অনেকটা সময় নষ্টের ঝামেলা। প্রায় এক বছর হলো ইসাবেল বাচ্চাদের পুরনো খেলনা এবং গাড়ি টুকরো টুকরো করে ভেঙে ফেলেছে। কারণ, ওগুলো “খুবই মন খারাপ করা” জিনিস ছিলো। তাছাড়া সেগুলোর আকার আকৃতি “ বাচ্চাদের মনে ভীতিকর অনুভূতির ধারণা জন্ম দেবে”।

ইসাবেল ব্যাখ্যা করে বলেছিলেন, একেবারে শুরু থেকেই বাচ্চাদের জন্য ঠিক জিনিসটা পছন্দ করা উচিত। এতে অনেক সময় বাঁচে পরবর্তীকালে। আসলেই, বেচারা বাচ্চারা যদি শিশুকাল থেকেই এই রকম ভীতিকর খেলনার দিকে চেয়ে চেয়ে বেড়ে ওঠে, তাহলে এই রকম বাড়ন্ত শৈশবের কথা ভেবে কেউ তাদেরকে রয়াল একাডেমিতে নেয়ার কথা বলতে পারে।

এমন ভাবে তিনি কথাগুলো বলেন, যেন রয়াল একাডেমিতে যাওয়া মানেই যে কারো জন্যেই অনতিবিলম্বে নিশ্চিত মৃত্যু।

ধীরে ধীরে বলেন উইলিয়ম, আমি এই সব জানি না। তবে আমি যখন ওদের বয়সি ছিলাম, তখন সাধারণত গেরো দেয়া একটা পুরনো তোয়ালে বুকে জড়িয়ে বিছানায় যেতাম।

ইসাবেল তাঁর দিকে দুই চোখ কুঁচকে দুই ঠোঁট হাঁ করে তাকালেন। বললেন, “ প্রিয় উইলিয়ম, আমি নিশ্চিত যে, তুমি এমনই করতে।” কিম্ভুত ভাবে হাসলেন তিনি।

বিষন্ন উইলিয়ম ভাবলেন, সে যাই হোক, মিষ্টি তো নিতেই হবে। ট্যাক্সি ভাড়া দেয়ার জন্য পকেটে হাত দিয়ে খুচরো খুঁজতে লাগলেন। দেখতে পেলেন, বাচ্চারা প্যাকেট ছুঁয়ে দেখে ঘুর ঘুর করছে। আহা, সোনা বাচ্চাগুলো সত্যিই খুব খুব ভালো। ইসাবেলের ভালো বন্ধুরা তাদেরকে সাহায্য করছেন…

ফল তো নেয়া হয়নি? স্টেশনের ভেতরের একটা দোকানের সামনে গিয়ে উইলিয়ম দোনোমনো ভাবে ঘুরছিলেন। প্রত্যেকের জন্য একটা করে তরমুজ নিলে কেমন হয়? তাদেরকে এটাও কি ভাগাভাগি করে নিতে হবে? অথবা একটা আনারস প্যাডের জন্য, এবং একটা তরমুজ জনির জন্য? নার্সারিতে বাচ্চাদের খাওয়ার সময়ে ইসাবেলের বন্ধুদের চুপি চুপি সেখানে যাওয়া কঠিন হবে। যাকগে! উইলিয়ম একটা তরমুজ কিনেই অবিশ্বাস্য এক দৃশ্য দেখলেন। ইসাবেলের এক তরুণ কবি বন্ধু নার্সারির দরজার পেছনেই চুক চুক শব্দ করে এক টুকরো তরমুজ খাচ্ছেন।

দুটো বেঢপ পার্সেল নিয়ে লম্বা লম্বা পা ফেলে ট্রেনের দিকে গেলেন উইলিয়ম। প্লাটফর্মে বেশ ভিড়। ট্রেনটা এসে গিয়েছিলো। দড়াম করে দরজা খুলে গেলো এবং বন্ধ হলো। ইঞ্জিন থেকে এতো জোরে হুশ হুশ শব্দ বের হলো যে, হতবুদ্ধি হয়ে এদিক ওদেক ছুটোছুটি করতে লাগলো মানুষ। উইলিয়ম সরাসরি ধুমপায়ীদের জন্য নির্ধারিত প্রথম শ্রেণির কামরায় উঠে সুটকেইস এবং পার্সেল গুছিয়ে রাখলেন। তারপর ভেতরের পকেট থেকে এক গোছা কাগজ বের করে দ্রুত গিয়ে কোনায় বসে পড়তে শুরু করলেন।

“আমাদের গ্রাহক বেশ ইতিবাচক … পুনর্বিবেচনার জন্য আমাদেরকে নমনীয় হতে হবে...এই ঘটনার জন্য...” আহা, ওটাই ভালো ছিলো। পাটিপাড়া চুলগুলো পেছনে চেপে ঠেলে দিয়ে গাড়ির পাটাতনে পা টান করে বসলেন উইলিয়ম। বুকের ভেতরের চাপা ব্যথাটা একটু কমেছে। “আমাদের সিদ্ধান্তের প্রতি শ্রদ্ধাসহ”... এই পর্যন্ত পড়ে একটা নীল পেন্সিল বের করলেন এবং পুরো অনুচ্ছেদটা দাগালেন ধীরে ধীরে।

দুজন মানুষ ভেতরে এসে তাঁকে ডিঙিয়ে চলে গেলেন আরও কোনার দিকে। তরুণ একজন গলফ ক্লাবের জিনিসপত্র প্রায় ছুঁড়ে ফেলে দিলেন বাংকের ওপর এবং বসে গেলেন উইলিয়মের উল্টোদিকে, মুখোমুখি। হালকা একটা দুলুনি দিয়ে তাঁদের ট্রেন চলতে শুরু করলো। উইলিয়ম চেয়ে দেখলেন, কলকাকলিতে মুখর ঝলমলে স্টেশনটা ধিরে ধিরে মিলিয়ে যাচ্ছে। একটা রাঙা মুখের মহিলা ট্রেনের পাশ দিয়ে দিশেহারার মতো বেপরোয়াভাবে দৌড়োচ্ছিলেন আর হাত নেড়ে হাঁকাহাঁকি করছিলেন। উইলিয়ম ভাবলেন, নিশ্চয় “হিস্টেরিয়ার রোগি”। তেল ঝোলে মাখা কালো মুখের একজন কাজের মানুষ প্লাটফর্মের শেষ দিক থেকে চলন্ত ট্রেনের দিকে তাকিয়ে দাঁত বের করে হাসছিলো। উইলিয়ম ভাবলেন, “কি নোংরা জীবন এদের!” তারপর আবার কাগজগুলো দেখতে শুরু করলেন তিনি।

বাইরের দিকে তাকালেন উইলিয়াম, দেখলেন অবারিত মাঠ, পশুরা বড়ো গাছের নিচে দাঁড়িয়ে আছে আশ্রয়ের জন্য। চওড়া নদী। অগভীর পানিতে উদোম ছেলেরা পানি ছিঁটিয়ে লাফাচ্ছে, ভিজছে। চোখের সামনে দৃশ্যগুলো এলো এবং সরে গেলো। দেখা যায় ফ্যাকাশে আকাশ। অনেক উঁচুতে লক্ষহীন ভাবে একটা পাখি উড়ে যাচ্ছে, যেন রত্নের গায়ে খচিত একটা কালো ফোঁটা।

“আমরা ক্লায়েন্টদের চিঠিপত্রের ফাইল পরীক্ষা করে দেখেছি ...” শেষ বাক্য পড়ার পর মনে তার প্রতিধ্বনি উঠলো। “আমরা পরীক্ষা করেছি ...” উইলিয়ম বাক্যটির ওপর ঝুলে থাকলেন, কিন্তু এটা ভালো লাগলো না। মাঝখানেই আটকে থাকলো উইলিয়মের দৃষ্টি। অন্য দিকে উদার আকাশ, প্রশান্ত উড়ন্ত পাখি, প্রাণবন্ত নদী, সবাই বলতে লাগলো “ইসাবেল”। একই জিনিস প্রতি শনিবারে ঘটে। তিনি যখন ইসাবেলের সাথে দেখা করার জন্য আসেন, তখন এমনি অসংখ্য কাল্পনিক জিনিস দেখতে পান। স্টেশনেই ছিলেন ইসাবেল। অন্যদের থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়েছিলেন; বাইরে খোলা ট্যাক্সিতে বসে ছিলেন, বাগানের গেইটের কাছে ছিলেন, রৌদ্রদগ্ধ ঘাসের ওপর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, দরজার কাছে ছিলেন, অথবা ঠিক হলের মধ্যে।

তাঁর স্পষ্ট পাতলা কন্ঠস্বর বলেছিলো, “এই তো উইলিয়ম”, অথবা “ হ্যালো, উইলিয়ম”, অথবা “এই তো এসে গেছেন উইলিয়ম”। তিনি ইসাবেলের ঠাণ্ডা হাত স্পর্শ করেছিলেন। তাঁর গাল স্পর্শ করেছিলেন।

ইসাবেলের নিখুঁত তাজা লাবণ্য! অপরূপ! যখন উইলিয়ম ছোটো ছিলেন, তখন বৃষ্টির পর দৌড়ে বাগানে যাওয়াটা তাঁর জন্য ছিলো খুব আনন্দের ব্যাপার। গোলাপের ঝোপ ঝাঁকিয়ে গায়ে পানি ফেলতে খুব মজা পেতেন। ইসাবেল সেই রকম গোলাপের ঝোপ। পাঁপড়ির মতো নরম, ঝকমকে এবং ঠাণ্ডা। এখনও তিনি সেই ছোটো বালকই আছেন মনে মনে। নেই শুধু সেই দৌড়ে বাগানে যাওয়া, নেই হাসি, নেই ঝাঁকাঝাঁকি। বুকের ভেতর সেই চাপা স্তিমিতপ্রায় ব্যথাটা আবার শুরু হলো। পা টেনে বসলেন তিনি। কাগজগুলো পাশে রেখে চোখ বন্ধ করলেন।

নরম গলায় তিনি বলেছিলেন, “ এটা কী ইসাবেল? কী এটা?” নতুন বাড়ির শোয়ার ঘরে ছিলেন তাঁরা। ড্রেসিং টেবিলের সামনে একটা রঙিন টুলে বসে ছিলেন ইসাবেল। টেবিলের ওপর ছড়িয়ে ছিঁটিয়ে ছিলো ছোটো ছোটো কালো এবং সবুজ বাক্সগুলো।

“কোনটা কী, উইলিয়ম?” তিনি সামনে ঝুঁকলেন। হালকা সুন্দর চুল ছলকে এসে পড়লো শ্রীময়ীর পেলব গালের ওপর।

“আহা, তুমি তো জানো!” ঘরের মধ্যখানে গিয়ে দাঁড়ালেন তিনি। নিজেকে মনে হলো একজন আগন্তুক। ইসাবেল তখন ফিনকি দিয়ে ঘুরে তাঁর মুখোমুখি দাঁড়ালেন।

বেশ জোরে মিনতিপূর্ণ কন্ঠে বলে উঠলেন ইসাবেল, “ওহ, উইলিয়ম!” চুল আঁচড়ানোর ব্রাশটা হাতে নিয়ে বললেন, “প্লিজ! প্লিজ এমন ভয়ঙ্কর শ্বাসরুদ্ধকারী দুঃখজনক আচরণ করো না। সব সময় তুমি হয় কিছু বলছো, নয় লক্ষ রাখছো, নতুবা ইঙ্গিত দিচ্ছো যে, আমি বদলে গেছি। কারণ, আমি স্বগোত্রীয়দের চিনতে চেয়েছি এবং আরও চিনতে চাই। এবং আমি খুব গভীর ভাবেই এগুলো চাই। তুমি এমন ব্যবহার করছো যেন আমি–” ইসাবেল তার চুল উলটে দিলেন এবং হাসলেন–“আমাদের ভালোবাসাকে হত্যা করেছি অথবা সাঙঘাতিক কিছু করেছি। এটা একেবারেই অবাস্তব” – ইসাবেল তাঁর ঠোঁট কামড়ে ধরলেন, “এটা অসম্ভব পাগলামী উইলিয়ম। এমন কি এই নতুন বাড়ি এবং কাজের লোকজন নিয়েও তুমি আমার ওপর নারাজ। বিড়বিড় করো।”

“ইসাবেল!”

“হ্যাঁ, হ্যাঁ, পক্ষান্তরে এটাই সত্যি।” ইসাবেল বলেন, “তুমি মনে করো এগুলোও এক ধরনের খারাপ কিছু। আমি জানি, তুমি তাই মনে করো। যখনই তুমি সিঁড়ি ভেঙে ওপরে আসো, এমনটাই ভাবো। কিন্তু তাই বলে তো আমরা ওই খুপরির মতো ছোট্ট বাড়িতে বাস করতে পারিনা, উইলিয়ম। অন্তত পক্ষে এটুকু বোঝার চেষ্টা করো। ওখানে বাচ্চাদের জন্য কোনো ঘরও ছিলো না, কেন, বলো?

পুরনো বাড়িতে বাচ্চাদের ঘর ছিলো না, সে কথা সত্যি। প্রতিদিন সকালে চেম্বার থেকে ফিরে ড্রয়িং রুমের পেছনে বাচ্চাদেরকে তিনি ইসাবেলের সাথে দেখতে পেতেন। সোফার পেছনে চিতা বাঘের চামড়া পেতে বাচ্চারা নানারকমের রাইড খেলতো, নয়তো ইসাবেলের ডেস্কটাকে দোকানের কাউন্টার বানিয়ে খেলতো। কখনও উনুনের সামনে পাতা কম্বলের ওপর বসে, হাতে একটা ছোটো পেতলের বেলচা নিয়ে নৌকা বেয়ে যাওয়ার খেলা খেলতো, আর তখন জনি হয়তো সাঁড়াশি দিয়ে জলদস্যুদের গুলি করার খেলা খেলছে। প্রতি সন্ধেবেলা তল্পিতল্পা গুছিয়ে সেগুলো পিঠে নিয়ে সরু সিঁড়ি ভেঙে বাচ্চারা তাদের সেই বয়সি মোটা ন্যানির কাছে যেত।

এটা ঠিক যে, আগের বাসাটা খুপরির মতো ছোটো ছিলো। তবে নীল পর্দা দেয়া ছোট্ট সাদা বাড়িটার জানালায় বিশেষ পাত্রে পিটুনিয়ার সমাহার ছিলো দেখার মতো। উইলিয়ম দরজার কাছে দাঁড়িয়ে বন্ধুদের সাথে দেখা করতেন। বন্ধুদের বলতেন,” পিটুনিয়াগুলো দেখেছেন? লন্ডনের জন্য কি অসাধারণ ফুল, ঠিক কি না বলেন?

কিন্তু মূর্খতা এবং চরম বিস্ময়কর ঘটনা হলো, ঐ বাসাটা তাঁর যতোই ভালো লাগুক, ইসাবেলের যে একটুও ভাল লাগত না, সেই ব্যাপারে বিন্দু বিসর্গ ধারণা ছিলো না। হায় ঈশ্বর, কি মূঢ়তা! যাপিত দিনগুলোতে উইলিয়ম ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারেননি যে, ইসাবেল সেই অসুবিধেজনক বাসাটাকে সত্যিই ঘৃণা করতেন। ইসাবেল ভাবতেন, বয়সি ন্যানিই তো বাচ্চাদের দেখা শোনার সব কাজ করে। ফলে তিনি নিরঙ্কুশ একাকী। তাই নতুন মানুষ, নতুন গান এবং নতুন ছবি, এমনি সব বিনোদনের খোঁজে থাকতেন। তাঁরা যদি মইরা মরিসনের স্টুডিও পার্টিতে না যেতেন, বিদায় নেয়ার সময় মরিসন যদি না বলতেন, “আমি তোমার বউকে উদ্ধার করার জন্য যাচ্ছি, স্বার্থপর মানুষ। সে একটা ব্যতিক্রমী ছোট্ট পরী” - যদি ইসাবেল মইরার সাথে প্যারিসে না যেতেন – যদি– যদি…

বেটিংফোর্ড স্টেশনে ট্রেনটা থামলো। আহ! বাঁচা গেলো। আর দশ মিনিটের মধ্যেই তাঁরা সেখানে পৌঁছাবেন। উইলিয়ম কাগজের গোছাগুলো পকেটে ঢুকিয়ে ফেললেন। তাঁর সামনে যে তরুণ বসেছিলেন, তিনি আগেই নেমে গেছেন। বাকি দুজন এখন নেমে গেলেন। পড়ন্ত সূর্যের আলো পড়েছে মহিলাদের সামান্য রোদপোড়া সুতির ফ্রকের ওপর। নগ্নপা শিশুদের ওপর। পাথরের পিঠের ওপর এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে থাকা খসখসে পাতা এবং মসৃণ হলুদ ফুলের ওপরও ছড়িয়ে পড়েছে সূর্যের আলো। সমুদ্রগন্ধবাহী অশান্ত বাতাস আসছে জানালা দিয়ে। এই সপ্তায়ও কি ইসাবেল তাঁর সাথে দঙ্গল নিয়ে থাকবেন? উইলিয়ম ভাবতে থাকেন।

সাধারণত সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলো কি ভাবে কাটাতেন, মনে পড়লো তাঁর। ওঁরা চারজন এবং রোজ নামের একটা ছোটো দেহাতি মেয়ে, যে বাচ্চাদের সামলাতো, সবাই থাকতো। ইসাবেল একটা জার্সি পরতো। বিনুনি করা চুল। দেখলে মনে হতো চৌদ্দ বছরের কন্যা। ঈশ্বর! তাঁরই লজ্জা লাগত তাদের কাজ কারবার দেখে। ওরা যে পরিমাণ খেতো, যে পরিমাণ ঘুমোতো ঐ নরম পালকের বিছানাতে, আর তাদের পাগুলো পরস্পরের পায়ের সাথে জড়িয়ে আটকে থাকতো… ভয়ঙ্কর বিরক্তিকর! এই মানসিক অবস্থার কথা যদি ইসাবেল জানতে পারতেন, তাহলে ভয়ানক আতঙ্কিত হতেন। কথাগুলো মনে তোলপাড় করার সময় ভয়ঙ্কর হিংস্র এক রকম হাসি চেপে রাখতে পারতেন না উইলিয়ম...

“হ্যালো, উইলিয়ম!” ইসাবেলের কন্ঠস্বর। তিনি স্টেশনে অন্য সবার থেকে দূরে আলাদা দাঁড়িয়ে আছেন। যেমনটা ভেবেছিলেন। আনন্দে নেচে উঠলো উইলিয়মের হৃদয়, আজ তিনি একা।

“হ্যালো , ইসাবেল!” উইলিয়ম তাকিয়ে দেখলেন, ওঁকে খুবই সুন্দর দেখাচ্ছে। কিছু একটা বলতে হয়। বললেন, “তোমার খুব ঠান্ডা লাগছে মনে হয়।”

“তাই মনে হচ্ছে?” ইসাবেল বলেন, “আমার খুব ঠাণ্ডা বোধ হচ্ছে না তো। এসো আমার সাথে। তোমার বিশ্রি ট্রেনটা দেরি করেছে। ট্যাক্সি বাইরে আছে।” উইলিয়মের বাহু ধরে টিকেট কালেক্টারের দায় সেরে বের হয়ে আসলেন তাঁঁরা। ইসাবেল বললেন, “আমরা সবাই তোমার সাথে দেখা করতে এসেছি। শুধু ববি কেইন আসেনি। সে রয়ে গেছে মিষ্টির দোকানে। তাকে তুলে নিতে হবে।”

“ ও!” সেই মুহূর্তে এই শব্দটুকু ছাড়া আর কিছুই বলতে পারলেন না উইলিয়ম।

চোখ ধাঁধানো আলো ঝলমলে জায়গায় ট্যাক্সি দাঁড়িয়ে ছিলো। পাশেই বিল হান্ট এবং ডেনিস গ্রিন টান টান হয়ে দাঁড়িয়ে। তাদের হ্যাট কাত হয়ে মুখের ওপর পড়ে আছে। আর মইরা মরিসন বনেটের ওপর বিরাট স্ট্র বেরির মতো লাফিয়ে উঠছেন এবং নামছেন।

“বরফ নেই! বরফ নেই! বরফ নেই!’’ আনন্দের সাথে চিৎকার করে বললেন ইসাবেল।

ইসাবেলের কথা শেষ হতে না হতেই হ্যাটের মধ্যে থেকে কথার মধ্যে বাধা দিয়ে ডেনিস বললেন, “শুধু মাছের ব্যবসায়িদের কাছ থেকেই পাওয়া যাবে।”

বিল হান্ট বলে উঠলেন, “সাথে একটা আস্ত মাছও পাওয়া যাবে।”

ইসাবেল বিরক্ত হয়ে বললেন, “কি আবোল তাবোল একঘেয়ে কথা!” তারপর বিষয়টা উইলিয়মকে ব্যাখ্যা করে বললেন, আমি যখন তোমার জন্য অপেক্ষা করছিলাম, তখন ওঁরা সারা শহর বরফ খুঁজেছে। কিন্তু সব চেষ্টাই বৃথা হয়েছে। ঠিক যেন দুর্গম পাহাড়ের খাঁড়ি, খাড়া নেমে সমুদ্রে ডুবে গেছে। কোথাও কিছু নেই। 

ডেনিস বললেন, “ খুব ভালো করে আমাদের পরস্পরের একটু গা ঘষাঘষি করতে হবে। উইলিয়ম তোমার মাথাও বাদ যাবে না।”

“এদিকে দেখো সবাই” উইলিয়ম বলেন, “আমরা কি ভাবে বসে যাবো? আমার জন্য ড্রাইভারের পাশে বসে যাওয়াই ভালো হবে, তাই না।”

ইসাবেল বলেন, “না, না, ড্রাইভারের পাশে বসবে ববি কেইন। তুমি বসবে মইরা এবং আমার মাঝখানে।” ট্যাক্সি চলতে শুরু করলে ইসাবেল জানতে চাইলেন, “ তোমার রহস্যজনক পার্সেলেগুলোর মধ্যে কি আছে গো?”

হ্যাটের নিচে শীতে কাঁপতে কাঁপতে বিল হান্ট বললেন, “ গুল্লি মারো কথার।”

ফুল্ল হয়ে ইসাবেল বললেন, “ও, ফল এনেছো! উইলিয়মের বুদ্ধি আছে। একটা তরমুজ, একটা আনারস। কি যে ভালো হয়েছে।”

মৃদু হেসে উইলিয়ম বলেন, “না না একটু থামো, ফলগুলো এনেছি বাচ্চাদের জন্য।” উইলিয়ম সত্যি সত্যি উদবিগ্ন হয়ে পড়েন।

ইসাবেল হেসে তার হাত উইলিয়মের বাহুর মধ্যে ঠেলে দেয় এবং হাতের ওপর হাত বুলায়। বলে, উইলিয়ম, জান আমার, দুঃখে গড়াগড়ি যাবে বাচ্চারা, যদি তাদেরকে এইগুলো খেতে হয়, বুঝেছো? পরের বার তুমি ওদেরকে কিছু এনে দেবে। আমি কিন্তু আনারসের ভাগ দেবো না কাউকে।”

মইরা বললেন, “নিষ্ঠুর ইসাবেল, আমাকে একটু শুঁকে দেখতে দাও অন্তত।” উইলিয়মকে ডিঙিয়ে হাত ছুঁড়ে দিলেন ইসাবেল বাঁচার জন্য। মইরা তাঁকে ধরার জন্য ঝুঁকে পড়লেন। অস্ফুট শব্দ করে উঠলো ইসাবেল।

ডেনিস বললেন, “ আহা, এক মহিলার কি আনারস প্রীতি!”

একটা ছোটো দোকানের সামনে ট্যাক্সি এসে দাঁড়ালো। হাত ভর্তি ছোটো ছোটো প্যাকেট নিয়ে বেরিয়ে এলেন ববি কেইন। বললেন, “আশা করি এগুলো ভালো হবে। কারণ আমি রং দেখে পছন্দ করেছি। এইগুলোর মধ্যে গোল গোল জিনিস কিছু আছে, যেগুলো দেখতে অতুলনীয়। এই যে দেখো তক্তিগুলো ( চিনি আর বাদাম দিয়ে বানানো মিষ্টি)।” উচ্ছ্বাসে আবেগে বেশ জোরে জোরে বললেন, “শুধু একবার এটার দিকে চেয়ে দেখো, একেবারে সাচ্চা ক্ষুদ্র শিল্প।”

এমন সময় দোকানের মালিক বেরিয়ে এলেন। ববি ভয় পেয়ে বললেন, “ও, বলতে ভুলে গেছি, এগুলোর কোনোটারই দাম দেয়া হয়নি।”

ইসাবেল দোকানের মালিকের হাতে একটা নোট দিলেন। উতফুল্ল হয়ে উঠলেন ববি। বললেন, “ হ্যালো, উইলিয়ম, আমি ড্রাইভারের পাশে বসছি।” ববির পরনে সাদা পোশাক, মাথায় কিছু নেই, সার্টের হাতা কাঁধ পর্যন্ত গুটানো। লাফ দিয়ে তিনি নিজের জায়গায় উঠে বসে চিৎকার করে বললেন, “ হ্যাঁ, বিন্দাস! এইবার চলা যাক ।”

চা-পর্বের পর উইলিয়ম ছাড়া সবাই বের হয়ে গেলেন স্নানের উদ্দেশ্যে। একটু শান্তির আশায় উইলিয়ম বাচ্চাদের সাথে থাকতে চাইলেন। কিন্তু জনি এবং প্যাডি ঘুমিয়ে পড়লো। আহা, বাচ্চাদের লালচে গোলাপি আভা ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। সন্ধে হয়ে এলো। বাদুড় উড়ছিলো আকাশে। তখনও স্নানার্থীদের ফেরার নাম গন্ধ নেই। উইলিয়ম নিচের তলায় নেমে গেলেন। হাতে একটা প্রদীপ নিয়ে পরিচারিকা তখন হলঘর পার হয়ে যাচ্ছিলেন। তার পেছন পেছন তিনি বসার ঘরে এলেন। হলুদ রঙের লম্বা একটা ঘর। উইলিয়মের উল্টো দিকের দেয়ালে কেউ মানুষ সাইজের এক যুবকের ছবি এঁকেছে। যুবকটা টলোমলো পায়ে এক তরুণীকে পূর্ণ প্রসফুটিত ডেইজি ফুল নিবেদন করছে। ছবির তরুণী ক্ষীণ দেহী। তার একটা হাত খুব ছোটো, আর একটা হাত খুব লম্বা। চেয়ার এবং সোফার ওপরে খুলে রাখা কালো কালো জিনিসপত্র ঝুলছে। তার ওপর ভাঙা ডিমের মতো ঘোলা পানি ছিঁটিয়ে একাকার করা। ঘরের যেখানে সেখানে পোড়া সিগারেটের টুকরো পড়ে আছে, কেউ পুরো ঘরটাকেই একটা ছাইদানিও মনে করতে পারে।

উইলিয়ম একটা হাতলওয়ালা চেয়ারে বসলেন। বর্তমানে একজন যদি মনে করে তার একহাত ঝুলে একদিক কাত হয়ে গেছে, তার মানে এই নয় যে, সেটা ‘নোয়ার হাত’ (বাইবেলে বর্ণিত মহা প্লাবনের সময় নোয়ার হাত) , এবং সেই হাত বেয়ে উঠে আসবে তিন পেয়ে ভেড়া বা একটা শিং হারানো গরু অথবা মোটা সোটা একটা ঘুঘু। একটা অসম্পূর্ণ এবং আর একটা ছোটো কাগজের মলাটের বইতে এলোমেলো ঝাপসা কিছু কবিতার মতো দেখা যায়। তাঁর পকেটের এক গোছা এলোমেলো কাগজের মতোই মনে হলো। খুব ক্ষুধার্ত এবং ক্লান্ত ছিলেন বলে পড়তে ইচ্ছে হলো না। দরজাটা খোলাই ছিলো। রান্নাঘর থেকে শব্দ আসছিলো। কাজের লোকেরা কথা বলছিলো এমন ভাবে, যেন তারাই শুধু আছে বাড়িতে। হঠাৎ একটা তীক্ষ্ণ হাসির শব্দ এবং একই রকম তীক্ষ্ণ “শশশ” শব্দ শোনা গেলো। তাঁর কথা মনে আছে বন্ধুদের। উইলিয়ম উঠে বাগানে চলে গেলেন। ছায়াতে দাঁড়িতে তিনি শুনতে পেলেন স্নানার্থীদের কলকাকলি। বালুময় রাস্তা দিয়ে ওপরে আসছেন তাঁরা। নীরবতা ভেদ করে ভেসে আসছে তাঁদের কণ্ঠস্বর।

“আমার মনে হয় মইরাকেই তাঁর ক্ষুদ্র শিল্প এবং ছলাকলা ব্যবহার করতে হবে।”

মইরার পক্ষ থেকে একটা বিষাদপূর্ণ আর্তনাদ শোনা গেলো।

“এই সপ্তায় অবশ্যই একটা গ্রামোফোন থাকতে হবে, এবং সেখানে বাজবে ‘পর্বত কুমারী’র সেই গানটা।”

উচ্চকন্ঠে ইসাবেল বলেন, “ওহ না, না। উইলিয়মের জন্য সেটা ভালো হবে না। বন্ধুরা, তাঁর আনন্দের কথাটা ভাবো। তিনি কাল সন্ধে পর্যন্তই শুধু আছেন।”

“আমার ওপর তাঁর ভার ছেড়ে দাও,” ববি কেইন বলেন, “ আমি অসম্ভব ভালোভাবে মানুষের দেখা শোনা করতে পারি।”

গেইটের দরজা দ্রুত খোলা এবং বন্ধ হওয়ার শব্দ হলো। উইলিয়ম টেরেসে এসে দাঁড়ালেন। ওঁরা দেখতে পেলেন তাঁকে। “ হ্যালো, উইলিয়ম!” ববি কেইন তাঁর তোয়ালে ঝেড়ে নিলেন। তারপর রৌদ্রদগ্ধ ঘাসের ওপর পায়ের এক আঙুলে ভর দিয়ে লাফালাফি নাচানাচি করতে লাগলেন। বললেন, “ আহা, কি আফসোস, তুমি এলে না। পানিটা ছিলো একেবারে স্বর্গীয়। স্নানের পরে আমরা সবাই একটা ছোটো পাবে গিয়েছিলাম, সেখানে কিছু ফল আর জিন( মদ বিশেষ) খেলাম।”

অন্যেরা বাসায় পৌঁছে গিয়েছিলেন। ববি ডেকে বলেন, “ইসাবেল, শোনো, তোমার কি মত, আজ রাতে আমি প্রাচীন প্যারিসের সেই টাইট নাচের ড্রেসটা পরবো?”

“ না।” ইসাবেল বলেন, কেউ ড্রেস পরতে যাবে না। আমরা সবাই ক্ষুধার্ত। উইলিয়মও ক্ষুধার্ত। আমার সাথে এসো বন্ধুরা, সার্ডিন দিয়ে শুরু করা যাক।”

মইরা বললেন, “আমি এনেছি সার্ডিনগুলো।”

ইসাবেল দৌড়ে হলের ভেতর গেলেন এবং উঁচু করে ধরে একটা বাক্স নিয়ে এলেন।

ডেনিস গম্ভীর ভাবে বললেন, “ এক বাক্স সার্ডিন সহ এক মহিলা দেখা যায়।”

হুইস্কির বোতলের কর্ক খুলতে খুলতে বিল হাণ্ট বললেন, “আচ্ছা উইলিয়ম, লন্ডন কেমন শহর ?”

“লন্ডনের তেমন বেশি কোনো পরিবর্তন হয়নি,” উত্তর দেন উইলিয়ম।

“ভালো, পুরনো লন্ডন খুব আন্তরিক;” সার্ডিন দিতে দিতে ববি বলেন।

নিমেষেই উইলিয়মের কথা , লন্ডন প্রসঙ্গ সব ভুলে গেলেন মইরা মরিসন। অবাক হয়ে ভাবতে লাগলেন, পানির নিচে তাদের পায়ের রঙ কেমন দেখা যাচ্ছিলো। “আমারটা ছিলো সবচেয়ে ফ্যাকাসে, সবচেয়ে ফ্যাকাসে মাশরুমের মতো।”

বিল এবং ডেনিস প্রচুর খেয়ে ফেললেন। ইসাবেল তাদের গ্লাস বারবার পূর্ণ করে দিচ্ছেন এবং প্লেট বদলে দিচ্ছেন হাসি হাসি মুখ করে। একসময় তিনি বললেন, “বিল, আমার ইচ্ছে, তুমি এটা পেইন্ট করবে।”

মুখের ভেতর রুটি গুঁজে দিতে দিতে জোর কন্ঠে বিল বলে উঠলো, “ পেইন্ট করবো? কি পেইন্ট করবো?”

“এই যে টেবিলের চারপাশে আমরা আছি, আমাদেরকে পেইন্ট করো। বিশ বছর সময় কালের মধ্যে এটা একটা অত্যাশ্চর্য পেইনন্টিং হবে। বুঝেছো?”

বিল চোখ ঘুরিয়ে ওপরে তুলে মুখের খাবার চিবোতে চিবোতে একটু কর্কশ স্বরে বললেন, “ আলো ঠিক নেই। বেশি বেশি হলুদ সব কিছু।” এবং আবার খেতে লাগলেন। এতেও মনে হলো ইসাবেল মুগ্ধ হয়ে গেলেন।

রাতের খাবারের পর তাঁরা এতো বেশি ক্লান্ত হলেন যে, হাই তুলতে লাগলেন যতক্ষণ না বিছানায় গেলেন…

পরদিন বিকেলে উইলিয়ম যখন ট্যাক্সির জন্য অপেক্ষা করছিলেন, তখন ইসবেলকে পেলেন একা। তিনি যখন নিচের তলায় হলের ভেতর দিয়ে সুটকেইস নিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন সবাইকে ছেড়ে ইসাবেল এলেন তাঁর কাছে। নতো হয়ে সুটকেইসটা নিলেন, বললেন, “ইস কি ভারি!” একটা অদ্ভুত হাসি দিয়ে বললেন, গেইট পর্যন্ত আমাকে নিতে দাও এটা।”

“না, তুমি কেন? অবশ্যই না। আমাকে দাও,” উইলিয়ম বলেন।

“ও, প্লিজ আমাকে করতে দাও কাজটা।” ইসাবেল বলেন,” আমি সত্যিই এই কাজটা করতে চাই।” তাঁরা নীরবে একসাথে হেঁটে এলেন গেইটের দিকে। উইলিয়ম ভাবলেন, তাঁর বলার কিছু নেই আর।

সুটকেইসটা মাটিতে রেখে বিজয়ের ভঙ্গীতে ইসাবেল বললেন, “এইখানে রাখলাম।” উদবিগ্ন হয়ে তিনি বালুময় পথের দিকে তাকাতে লাগলেন। এক নিঃশ্বাসে বললেন,“এইবার তোমাকে যেন দেখতেই পেলাম না উইলিয়ম। খুব সংক্ষিপ্ত ছিলো সময়, তাই না? মনে হচ্ছে, এখনই এলে তুমি। পরের বারে,---” ট্যাক্সি দেখা গেলো। “ আশা করি লন্ডনে তাঁরা খুব ভালোভাবে দেখাশোনা করবেন তোমার। কি দুঃখ দেখো তো, বাচ্চারা সারাদিন বাইরেই থাকলো। মিস নেইলই এই ব্যাবস্থা করেছিলো। আসলে, তোমাকে মিস করতে তাদের বয়েই গেছে। বেচারা উইলিয়ম লন্ডনে ফিরে যাচ্ছে, খেয়ালই নেই ওদের।”

ট্যাক্সি ঘুরলো। “গুড বাই উইলিয়ম।” চকিতে ত্বরিত একটা চুমু দিয়ে চলে গেলেন ইসাবেল।

মাঠ, বৃক্ষরাজি, ঝোপঝাড় স্রোতের মতো সরে সরে যাচ্ছে। শূন্যতায় ভরা সব। খুব সাধারণ বেরং ছোটো শহর। এবড়ো থেবড়ো রাস্তা তাঁকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে স্টেশনে।

ট্রেন দাঁড়িয়েই ছিলো। উইলিয়ম সরাসরি ধুমপায়ীদের প্রথম শ্রেণিতে উঠে দ্রুত কোনার দিকে চলে গেলেন। এইবার কাগজগুলো আর বের করলেন না। হাত দুটো ক্রস করে বুকের কাছে আনলেন যেখানে নিরন্তর চাপা ব্যথা অনুভব করেন। মনে মনে ইসাবেলকে চিঠি লেখতে লাগলেন…

বরাবরের মতোই ডাক এলো দেরিতে। বাড়ির বাইরে রঙিন ছাতার নিচে লম্বা চেয়ারে তাঁরা বসেছিলেন। শুধু ববি কেইন ইসাবেলের পায়ের কাছে ঘাসের ওপর শুয়েছিলেন। দিনটা কেমন ম্যাড়মেড়ে, নীরস। মনে হয় পতাকার মতো নিঃসাড়ে পড়ে আছে।

ববি ছেলেমানুষী করে জিজ্ঞাসা করলেন, “তোমরা কি মনে করো স্বর্গে সোমবার থাকবে?”

গজ গজ করে ডেনিস বললেন, “স্বর্গ হবে একটা লম্বা সোমবার।”

ইসাবেল ভেবেই পেলেন না, গত রাতে খাবার জন্য যে স্যামন মাছগুলো ছিলো, সেগুলো গেলো কোথায়? তিনি মনে করেছিলেন মাছ আর মেয়োনিজ খাওয়া যাবে লাঞ্চে। অথচ এখন…

মইরা ঘুমিয়ে পড়েছেন। ওঁর ঘুমটা ইসাবেলের শেষ আবিষ্কার। “কি চমৎকার! শোয়ার পর শুধু চোখ বন্ধ করবে, ব্যাস। কি ভীষণ মজার ঘটনা।”

লালচে রঙের পিওনটা রাস্তার ধুলো উড়িয়ে তিন চাকার সাইকেলে করে যখন আসে, তখন তার হ্যান্ডেল দেখে মনে হয়, ওগুলো বৈঠা হলেই ঠিক হতো।

বিল হান্ট বই নামিয়ে রেখে আনন্দের সাথে বলে উঠলেন, “চিঠি।” সকলে অপেক্ষা করতে লাগলেন। কিন্তু কি হৃদয়হীন পিওন, আর কি বিশ্রি পৃথিবী! মাত্র একটাই চিঠি এসেছে। একটা মোটা চিঠি ইসাবেলের জন্য। আর কোনও কাগজও আসেনি।

দুঃখিত কন্ঠে ইসাবেল বলেন, “আমার একটাই চিঠি শুধু উইলিয়মের কাছ থেকে।”

“ এর মধ্যেই উইলিয়মের চিঠিও এসে গেলো?”

“ তিনি হালকা পাতলা নোটিশ হিসেবে তোমার বিয়ের সার্টিফিকেট ফেরত পাঠিয়েছেন।”

“সকলেরই কি বিয়ের দলিল থাকে? আমার ধারণা, এটা শুধু পরিচারকদেরই থাকে।”

ডেনিস বললেন, “ একজন মহিলা চিঠি পড়েই যাচ্ছেন। পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা। চেয়ে দেখো, চেয়ে দেখো তার দিকে তোমরা।”

“ আমার প্রিয়তমা, আমার মণি মানিক্য ইসাবেল।” পাতার পর পাতা লেখা ছিলো। চিঠি পড়ার সময় চমতকৃত হতে হতে তাঁর অনুভব বদলে এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিতে পৌঁছালো। পৃথিবীর কোন জিনিসটা উইলিয়মকে এমন আবিষ্ট করে রেখেছে…? কি অসাধারণ ঘটনা… কি দিয়ে তৈরি সে…? ইসাবেল বিভ্রান্ত বোধ করেন। ক্রমেই উত্তেজিত বোধ করেন। ভয় পেতে থাকেন। এটা তো উইলিয়মই ছিলো। তাই না? এটা অযৌক্তিক, অবশ্যই অযৌক্তিক, হাস্যকর। “হা , হা, হা, প্রিয়তম।!” কি করতে পারে সে এখন? ইসাবেল ছূটে গিয়ে তাঁর চেয়ারে বসে হাসতে শুরু করলেন। এবং হাসতেই থাকলেন পাগলের মতো।

অন্যরা বললেন, “ আমাদেরকে বলো না কি ব্যাপার। অবশ্যই আমাদেরকে তুমি বলবে।

গলার ভেতর গড়গড়ার মতো শব্দ করে ইসাবেল বললেন, বলার চেষ্টাই তো করছি। একটু সময় দাও। তিনি উঠে বসলেন। চিঠিটা তুলে নিয়ে ছুঁড়ে দিলেন বন্ধুদের দিকে। “তুলে নাও, পড়ো সবাই। শোনো, এটা অতিশয় বিস্ময়কর জিনিষ, এটা একটা প্রেমপত্র!”

“একটা প্রেম পত্র! কিন্তু কি স্বর্গীয়!” “প্রিয়তম, মণিময় সম্পদ ইসাবেল।" এই রকম ভাবে কথা শুরু করতেই তাঁদের হাসিতে বাধা পেলেন তিনি।

“চালিয়ে যাও ইসাবেল, একদম ঠিক আছে সব।"

“ এটা সবচেয়ে বিস্ময়কর প্রাপ্তি।"

“আহা, চালিয়ে যাও, ইসাবেল।”

“ঈশ্বর ক্ষমা করুন, প্রিয়তম আমার, আমি তোমার প্রেমের পথে কাঁটা হবো।”

“ওঃ ওঃ ওঃ!”

“সশ! সশ! সশ!”

ইসাবেল তাল দিতে থাকলেন ওঁদের সাথে। এক সময় তিনি যখন থামলেন, তখন ওঁরা অপ্রকৃতিস্থ হয়ে গেছেন। ববি ঘাসের ওপর গড়াগড়ি খেতে খেতে প্রায় কেঁদেই ফেললেন।

ডেনিস খুব জোর দিয়ে বললেন, “আমার নতুন বইয়ের জন্য অবশ্যই তোমার পুরো প্রেম পত্রটা যেমন আছে তেমনি দিয়ে দিও। আমি এটা একটা পুরো অধ্যায়ে সাজাবো।”

মইরা বিলাপের মতো করে বললেন, “ওহো, ইসাবেল। উইলিয়মের তোমাকে দুহাতে বুকে জড়িয়ে ধরার কি যে অসাধারণ সেই মুহূর্ত!”

“আমি সব সময় ভাবতাম, তালাকের চিঠি কেমন হয়। এখন দেখছি সেটাও এর কাছে নস্যি।”

ববি কেইন বললেন, “চিঠিটা আমার হাতে দাও। আমাকে পড়তে দাও।”

সবাইকে অবাক করে দিয়ে ইসাবেল নিজের হাতে চিঠিটা ছিঁড়ে ফেললেন। হাসি বন্ধ হয়ে গেলো তাঁর। বন্ধুদের দিকে তাকালেন তিনি। পরিশ্রান্ত দেখাচ্ছিলো তাঁকে। জড়িয়ে জড়িয়ে বললেন, “না, ঠিক এখন নয়, এখনই নয়।”

বন্ধুরা কিছু বোঝার আগেই ইসাবেল দৌড়ে চলে গেলেন বাড়ির ভেতরে। হলের ভেতর দিয়ে সিঁড়ি ভেঙে ওপরে একেবারে শোয়ার ঘরে চলে এলেন। বিছানার পাশে বসে পড়লেন মাটিতে। বিড়বিড় করে উচ্চারণ করলেন, “কি ইতর, কি বিরক্তিকর! কি জঘন্য, কি অশালীন।” তিনি দুহাতের আঙুল দিয়ে চোখ চেপে ধরে এদিক ওদিক দুলতে লাগলেন। আবার বন্ধুদের দেখতে পেলেন। শুধু চারজন নয়, চল্লিশ জনের মতো। তিনি যখন উইলিয়মের চিঠি পড়ছিলেন, তখন তাঁরা হাসছিলেন, অভব্য মুখভঙ্গী করছিলেন, এবং নিজেদের হাত খামচা খামচি করছিলেন। ইস, কি বিশ্রি অশালীন আর অসভ্য কাজগুলো করা হয়েছিলো। কি ভাবে ওদের সাথে সায় দিতে পেরেছিলেন তিনি! “ ঈশ্বর ক্ষমা করুন, প্রিয়তম আমার, তোমার সুখের কাঁটা হয়েছিলাম আমি।” উইলিয়ম! ইসাবেল বালিশে মুখ চেপে ধরলেন। কিন্তু তিনি অনুভব করলেন, কবরের মতো এই শয়ন কক্ষও জানে তাঁকে, তিনি কেমন অগভীর, হালকা এবং মূল্যহীন…

এখন নিচের বাগান থেকে বন্ধুদের কন্ঠ শোনা যাচ্ছে।

“ ইসাবেল, আমরা সবাই মিলে স্নানে যাচ্ছি। তুমি এসো।”

“এসো, উইলিয়মের মহাসম্মানিত স্ত্রী।”

“তাঁকে একবার ডাকা হয়েছে। তুমি ডাকো আর একবার!”

ইসাবেল উঠে বসেন। এখনই সময় সিদ্ধান্ত নেয়ার। অবশ্যই সিদ্ধান্ত নিতে হবে তাঁকে। তিনি কি ওঁদের সাথে যাবেন, না এখানে থেকে উইলিয়মকে চিঠি লিখবেন? কোনটা, কোনটা হওয়া উচিত? “ অবশ্যই আমার মন ঠিক করতে হবে।” কিন্তু এখানে অন্য প্রশ্ন আসছে কেন? অবশ্যই তিনি এখানে থাকবেন এবং চিঠি লিখবেন।

মিহি সুরে টেনে টেনে ডাকলেন মইরা, “পরী- - -।”

“ইসা- - -বেল?”

নাহ, খুবই মুশকিল হলো তো। ঠিক আছে, আমি যাবো। যাবো তাঁদের সাথে। পরে চিঠি লেখবো উইলিয়মকে। অন্য সময়ে। পরে, এখন না। তবে আমি অবশ্যই লেখবো। দ্রুত মত বদলে গেলো তাঁর।


নতুন ক্যারিশমায় হেসে উঠলেন তিনি। সিঁড়ি দিয়ে তর তর করে দৌড়ে নামতে থাকলেন তারপর।


----------


মূল লেখকঃ ক্যাথেরিন ম্যান্সফিল্ড

জন্ম; ১৫ অক্টোবর, ১৮৮৮ খৃষ্ঠাব্দ, ওয়েলিংটন, নিউজিল্যান্ড। মৃত্যু ৯ জানুয়ারি, ১৯২৩ খৃষ্টাব্দ। লেখালেখির ভাষা, ইংলিশ। পরিবারে পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয়। মাত্র পঁয়তিরিশ বছরের স্বল্পায়ু জীবনের শেষ প্রান্তে আন্তর্জাতিক পরিচিতি পাওয়ার পর পরই যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত হন। তবু কলম থামিয়ে দেননি। প্রথাগত সাহিত্য ধারার বাইরে এই নারীবাদী লেখক বেশ কিছু আধুনিক ছোটো গল্প লেখেছেন। তাঁর প্রেরণা ছিলেন ভার্জিনিয়া উলফ , ডি এইচ লরেন্স, আন্তন চেখভ, প্রমুখ সাহিত্যিকরা।



মূল গল্প : " Marriage a la Mode "- by Katherine Mansfield.

অনুবাদকের পরিচিত
ডঃ বেগম জাহান অ্যাঁরা
গল্পকার। অনুবাদক।
জার্মানে বসবাস করেন।


                                                                                   
                                                                                    

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন