বুধবার, ২৬ আগস্ট, ২০২০

রোয়াল্ড ডাল'এর গল্প : জন্ম ও প্রলয়ের এক সত্যি কাহিনি



অনুবাদ : মনিজা রহমান 


‘”সবকিছু স্বাভাবিক,” ডাক্তার বললেন, “শুধু পাশ ফিরে আরাম করে শুয়ে থাকুন।“ 

কয়েক মাইল দূর থেকে যেন তার কথা ভেসে আসছে। উনি যেন তার দিকে চেঁচিয়ে বললেন, “আপনার একটি পুত্রসন্তান হয়েছে’।” 

”কি”’ 

”আপনার ছেলে হয়েছে। সে ভালো আছে। আপনি বুঝতে পেরেছেন ? না, পারেননি? একটি সুন্দর ছেলে। আপনি কি তার কান্না শুনতে পাচ্ছেন? 

”ও কি ঠিক আছে, ডাক্তার?” 

”অবশ্যই ঠিক আছে।” 

”দয়া করে আমাকে ওকে দেখতে দিন।”

”আপনি তাকে কিছুক্ষণের মধ্যে দেখতে পাবেন।” 

”আপনি কি নিশ্চিত --ও ঠিক আছে?” 

”আমি যথেষ্ঠ নিশ্চিত।” 

“সে কি এখনো কাঁদছে?” 

”বিশ্রাম নেবার চেষ্টা করুন। দুশ্চিন্তা করার কিছু নাই।” 

”কেন ও কান্না থামাল ডাক্তার ? কি হল ?” 

”নিজেকে উত্তেজিত করবেন না, প্লিজ। সব ঠিক আছে।” 

”আমি তাকে দেখতে চাই। প্লিজ ডাক্তার আমাকে ওকে দেখতে দিন।” 

” প্রিয় ভদ্রে,” ডাক্তার তার হাতে চাপ দিয়ে বললেন, আপনার একটা শক্তপোক্ত ও স্বাস্থ্যবান সন্তানের জন্ম হয়েছে ! আমার কথা কি আপনি বিশ্বাস করতে পারছেন না?” 

’ওখানে ওই মহিলা আমার বাচ্চার সঙ্গে কি করছেন ডাক্তার?” 

”আপনাকে দেখানোর জন্যে আপনার বাচ্চাকে উনি সুন্দর করে প্রস্তুত করছেন!” ডাক্তার বললেন। ”আমরা ওকে একটু পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করছি—এই আর কি। এজন্য অবশ্যই আপনাকে কয়েক মুহূর্ত ধৈর্য্য ধরতে হবে।” 

”ডাক্তার, আপনি শপথ করে বলেন আমার ছেলে ঠিক আছে?” 

”আমি শপথ করে বলছি। এবার পাশ ফিরে শুয়ে আরাম করুন তো। চোখ বুজুন। চোখ বুজে থাকুন। এই তো—বেশ হয়েছে। আপনি খুব ভালো মেয়ে।“ 

”আমি প্রার্থনা করছি ডাক্তার, আমি প্রার্থনা করছি - এবার আমার বাচ্চা যেন বেঁচে থাকে ।” 

‘”অবশ্যই সে বাঁচবে। আপনি এসব কি বলছেন?” 

” আগের সন্তানরা কেউ বাঁচেনি!” 

”কি বলছেন?’’ 

”হ্যাঁ, ডাক্তার, আমার আগের কোনো সন্তান এখন বেঁচে নেই।” 


ডাক্তার বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে তরুণীর ফ্যাকাশে ক্লান্ত মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। 

এর আগে তিনি তরুণীকে কখনো দেখেননি। তিনি আর তার স্বামী শহরে নতুন এসেছেন। 

ডাক্তারকে ডেলিভারিতে সাহায্য করতে আসা সরাইখানার মালিকেরর স্ত্রী বলেছিল, মহিলার স্বামী সীমান্তে স্থানীয় কাস্টমস-হাউজে কাজ করতেন। তারা দুজন হঠাৎকরে একটি ট্রাঙ্ক আর একটি স্যুটকেস নিয়ে মাসখানেক আগে হাজির হন তাদের সরাইখানায়। 

স্বামী লোকটি অহংকারী, উদ্ধত, মাতাল--সরাইখানার মালিকের স্ত্রী আরো বলেছিল। কিন্তু তরুণীটি ভদ্র এবং ধার্মিক। তাকে সব সময় মনমরা দেখাতো। সে কখনো হাসত না। কয়েক সপ্তাহ ধরে সে এখানে ছিল। সরাইখানার মালিকের স্ত্রী একবারের জন্যেও তার মুখে হাসি দেখেনি। 

এছাড়া একটি গুজব ছিল যে, এটা তার স্বামীর তৃতীয় বিয়ে। একজন স্ত্রী মারা গেছে এবং অন্যজন তাকে তালাক দিয়েছে কোন কারণে। তবে এটা শুধু একটা গুজব ছিল। 

ডাক্তার ঝুঁকে রোগীর বুকের উপরের চাদরটা টেনে ওপরে তুলে দিলেন । ‘”আপনার কোন চিন্তা নেই,” ডাক্তার আস্তে আস্তে বললেন, “আপনার ছেলে একদম সুস্থ স্বাভাবিক শিশু।” 

"তারা আমাকে আমার অন্য সন্তানদের সম্পর্কে ঠিক একই কথা বলেছে। কিন্তু আমি তাদের সবাইকে হারিয়েছি, ডাক্তার। গত আঠারো মাসে আমি আমার তিন সন্তানকে হারিয়েছি। এজন্য উদ্বিগ্ন হওয়ার জন্য আপনি আমাকে দোষ দেবেন না।” 

"তিনজন?" 

"এটা আমার চতূর্থ সন্তান…. চার বছরের মধ্যে।” 

ডাক্তার ফাঁকা মেঝেতে অস্বস্তি নিয়ে তার পা পরিবর্তন করলেন। 

”আমার মনে হয়না ডাক্তার, আপনি বুঝতে পারবেন আমার তীব্র বেদনার কথা! তাদের সবাইকে হারালাম আমি। তাদের তিনজনকে। ধীরেধীরে। আলাদাভাবে। একের পর এক। আমি কিন্তু এখনও ওদের দেখতে থাকি। আমি এখনও গুস্তাভের মুখটা দেখতে পাই খুব স্পষ্ট করে যেন সে আমার বিছানার পাশে শুয়ে আছে। গুস্তাভ খুব সুন্দর ছেলে ছিল, ডাক্তার। কিন্তু সে সবসময় অসুস্থ থাকতো। আপনার সন্তান যখন সবসময় অসুস্থ থাকে এবং তাকে সাহায্য করার জন্য আপনি কিছুই করতে পারেননা, এর চেয়ে দুর্ভাগ্য আর কিছু নাই।” 

”আমি জানি।” 

তরুণীটি চোখ খুললেন। কয়েক সেকেন্ড ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর আবার বন্ধ করলেন। 

”আমার ছোট্ট সোনামনি ইদা। ক্রিসমাসের কয়েকদিন আগে সে মারা যায়। এই মাত্র চার মাস আগে। ইশ্ আপনি যদি ইদাকে দেখতে পেতেন ডাক্তার !” 

"আপনার কাছে এখন নতুন একজন আছে।" 

"কিন্তু ইদা খুব সুন্দর ছিল।" 

"হ্যাঁ," ডাক্তার বললেন। "আমি জানি ।" 

"আপনি কিভাবে জানেন?" তরুণীটি কাঁদতে কাঁদতে বলল । 

"আমি নিশ্চিত যে সে খুব সুন্দর শিশু ছিল । কিন্তু এই নতুন জনও একই রকম সুন্দর।” 

ডাক্তার বিছানা থেকে উঠে জানালার দিকে এগিয়ে গেলেন। বাইরে তাকিয়ে রইলেন । এপ্রিলের বিকেলটা সেদিন ভেজা ধূসর। রাস্তার দিকে তাকিয়ে তিনি বাড়ির লালছাদগুলো দেখতে পেলেন। টালির উপর বড় বড় বৃষ্টির ফোঁটা ছড়িয়ে পড়ছে। 

"ইদার বয়স ছিল দুইবছর, ডাক্তার... ও এত সুন্দর ছিল যে আমি সকালে ওকে পোশাক পরানোর সময় থেকে শুরু করে, রাতে আবার নিরাপদে বিছানায় না আসা পর্যন্ত ওর ওপর থেকে চোখ সরাতে পারতাম না। আমার শিশুর খারাপ কিছু হতে পার ভেবে আমি সব সময়ই আতঙ্কের মধ্যে থাকতাম। গুস্তাভ চলে গিয়েছিল। আর আমার ছোট্ট অটোও চলে গিয়েছিল । তখন আমার এই ছোট্ট মেয়েটিই ছিল আমার সবকিছু। মাঝেমাঝে আমি রাতে উঠে ওর দোলনার দিকে এগিয়ে যেতাম। ও নি:শ্বাস নিচ্ছে কিনা বোঝার জন্য আমি আমার কান ওর মুখের কাছে নিয়ে রাখতাম!” 

"বিশ্রাম নেবার চেষ্টা করুন,’ ডাক্তার বিছানায় ফিরে গিয়ে বললেন--‘দয়া করে বিশ্রাম নেবার চেষ্টা করুন।” 

তরুণী মায়ের মুখ সাদা এবং রক্তশুন্য। নাক এবং মুখের চারপাশে সামান্য নীল-ধূসর রঙের দাগ রয়েছে।কপালের ওপরে কয়েকটা আলগা চুল চামড়ায় আটকে আছে। 

”যখন আমার মেয়ে মারা যায়... তখন আমি গর্ভবতী ছিলাম ডাক্তার। ইদার মৃত্যুর চারমাস আগে এই সন্তান আমার পেটে আসে।” 

”আমি এটা চাইনি’। ইদার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার পর আমি চিৎকার করে বললাম।”আমি এই সন্তানকেওপাবনা! আমি যথেষ্ঠ শিশুকে কবর দিয়েছি, আর না!” 

”তখন আমার স্বামী অতিথিদের মধ্য দিয়ে এক গ্লাস বিয়ার হাতে নিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল... সে তাড়াতাড়ি ঘুরে এসে আমাকে বলল, 'আমার কাছে খবর আছে. কিয়ারা, আমার কাছে সুখবর আছে।' আপনি কি এটা কল্পনা করতে পারেন, ডাক্তার ? আমরা এইমাত্র আমাদের তৃতীয় সন্তানকে কবর দিয়েছি। হাতে এক গ্লাস বিয়ার নিয়ে সে দাঁড়িয়ে আছে এবং আমাকে বলছে যে তার কাছে সুখবর আছে!’ সে বলল, ‘আজ আমাকে ব্রাউনাউতে আমার কর্মস্থল দেওয়া হয়েছে। এখনই তুমি প্যাকিংশুরু করতে পার। নতুন করে আবার শুরু করতে পারবে এই সুযোগে, কিয়ারা।“ সে বলল, জায়গাটা তোমার কাছে নতুন হবে। আর সেখানে একজন নতুন ডাক্তার পাবে...।” 


”প্লিজ আর কথা বলবেন না।” 

”আপনি সেই নতুন ডাক্তার, তাইনা ?” 

”একদম ঠিক।” 

”আর এখানে-- আমরা ব্রাউনাউতে আছি। আমি ভয়পাচ্ছি, ডাক্তার।” 

”ভয় দূর করতে চেষ্টা করুন।” 

”চতুর্থজনের বাঁচার কতখানি সুযোগ আছে ডাক্তার?’ 

”আপনাকে এভাবে চিন্তা করা বন্ধ করতে হবে।” 

"আমি পারছি না ডাক্তার। আমি নিশ্চিত যে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া আমার কিছু সমস্যা আছে। সেজন্য আমার শিশুরা এভাবে মারা যাচ্ছে। অবশ্যই আছে সেরকম কিছু।” 

"এটা বাজে কথা।" 

"আপনি কি জানেন, অটোর জন্মের সময় আমার স্বামী আমাকে কী বলেছিল, ডাক্তার? সে ঘরে এসে ঢুকল এবং যে দোলনায় অটো শুয়ে ছিল সেই দিকে তাকাল এবং বললে, ‘আমার সব ছেলেমেয়েদের এত ছোট এবং দুর্বল হতে হবে কেন?” 

”আমি নিশ্চিত সে এটা বলেনি।” 

"সেতার মাথা সোজা অটোর দোলনায় ঢুকিয়ে দিল। মনে হল যেন সে একটা ছোট পোকা পরীক্ষা করছে। তারপর আমাকে বলল ‘ যা বলতে চাইছি-- এটা কেনো ভালো কোন নমুনা হতে পারল না!’ 

”তার তিনদিন পরে অটো মারা গেল। আমরা তৃতীয় দিনে তাড়াতাড়ি তাকে ব্যাপ্টিস্ট করেছিলাম এবং ওইদিন সন্ধ্যায় ও মারা যায়। আর তারপর গুস্তাভ মারা গেল।তারপর ইদা মারা গেল।তারা সবাই মারা গেছে, ডাক্তার... আর হঠাৎ পুরো বাড়ি ফাঁকা হয়ে গেল।” 

"এখন এটা নিয়ে ভাববেন না।’’’ 

”আমার সন্তান কি খুব ছোট?" 

"সে একটি স্বাভাবিক শিশু।" 

"কিন্তু ছোট?" 

"সে হয়তো একটু ছোট। কিন্তু ছোটগুলো প্রায়ই বড়গুলোর চেয়ে বেশী শক্তপোক্ত হয়। মিসেস হিটলার শুধু কল্পনা করুন, আগামী বছর আপনার ছেলে এই সময়ে প্রায় হাঁটতে শিখে যাবে। এটা কি চমৎকার একটা ভাবনা নয়?" 

তরুণীটি কথার উত্তর দিল না। 

"আর দুই বছর পরে সে সম্ভবত সব কথা বলতে শুরু করবে। আর তার বকবকানিতে আপনি পাগল হয়ে যাবেন। আপনি কি ওর জন্য কোন নাম ঠিক করেছেন?” 

"নাম?" 

"হ্যাঁ।" 

"আমি জানিনা। আমি নিশ্চিত না। আমার মনে হয় আমার স্বামী বলেছিল, যদি এবার ছেলে হয় তাহলে আমরা তাকে এডলফাস বলে ডাকব।” 

"তারমানে তাকে এডলফ বলা হবে।" 

"হ্যাঁ। আমার স্বামী এডলফ নামটি পছন্দ করেন কারণ এরসঙ্গে এলোইস নামের একটা চমৎকার মিল আছে। আমার স্বামীর নাম এলোইস।” 

"চমৎকার।" 

"ওহ্ না!" বালিশ থেকে উঠে তরুণীটি হঠাৎ কাঁদতে শুরু করল। ‘যখন অটোর জন্ম হয়েছিল ঠিক একই প্রশ্ন তারা আমাকে করেছিল! তার মানে সে মারা যাবে! আপনি কি ওকে একবারে বাপ্টিস্ট করতে যাচ্ছেন! " 

”এবার, এবার," ডাক্তার আলতো করে ভদ্রমহিলার কাঁধ স্পর্শ করে বললেন, "আপনার ধারণা একেবারে ভুল। আমি আপনাকে নিশ্চিত করে বলতে পারি-- আপনি ভুল বলছেন। আমি শুধু একজন কৌতূহলী বুড়োমানুষ হিসেবে এতগুলো প্রশ্ন করেছি। এটুকুই। আমি নাম নিয়ে কথা বলতে ভালোবাসি। এডোলফাস একটি অসাধারণ নাম। এটা আমার অন্যতম প্রিয়ও বটে। আর এখন দেখুন কে আসছে ! “ 

সরাইখানার মালিকের স্ত্রী শিশুটিকে তার বিশাল বুকের উপর উঁচু করে ধরে নিয়ে বিছানার দিকে এগিয়ে এলেন। ‘এই যে তোমার ছোট্ট সোনামানিক ! ’ মা তখন কাঁদতে শুরু করল। "তুমি কি তাকে পাশে রাখতো চাও লক্ষ্মী ? আমি কি তাকে তোমার পাশে শোয়াব ?" 

"সে কি ভালো ভাবে কাপড় দিয়ে জড়ানো আছে?" ডাক্তার জিজ্ঞাসাকরলেন। "এখানে অত্যন্ত ঠাণ্ডা। ” 

"অবশ্যই সে ভালোভাবে কাপড় দিয়ে জড়ানো আছে।" 

শিশুটিকে একটি সাদা পশমের শালে ভালোভাবে মুড়িয়ে রাখা হয়েছিল। শুধু তার ছোট গোলাপী মাথাটা দেখা যাচ্ছিল। সরাইখানার মালিকের স্ত্রী তাকে আস্তে আস্তে মায়ের পাশে বিছানায় রাখলেন। "এই যে তুমি," তরুণী মাকে উদ্দেশ্য করে সে বলল। "এখন তুমি শুয়ে শুয়ে তোমার কলিজার টুকরাকে মন ভরে দেখো।" 

"আমার মনে হয় আপনি তাকে পছন্দকরবেন," ডাক্তার হাসতে হাসতেবললেন। "সে একটি চমৎকার শিশু," 

"তার খুব সুন্দর ছোট ছোট দুটি হাত আছে !" সরাইখানার মালিকের স্ত্রী বিস্ময়ভরা মুগ্ধ কণ্ঠে বললেন। " আছে একদম লম্বা কোমল আঙ্গুল !" 

তরুণী মা নড়েনি। এমনকি সে তার মাথাও ঘোরায়নি দেখার জন্য। 

"ঘোরে—ঘুরে দেখো !" সরাইখানার মালিকের স্ত্রী ধমক দিয়ে বললেন, "সে তোমাকে কামড়াবে না!" 

"আমি ওকে দেখতে ভয় পাচ্ছি। আমার বিশ্বাস করতে সাহস হচ্ছে না! আমার আরেকটি বাচ্চা হয়েছে। আর সে ঠিক আছে। 

"এত বোকা হয়োনা তো।" 

ধীরে ধীরে মা মাথা ঘুরিয়ে পাশের বালিশের ওপর শুয়ে থাকা ছোট্ট, শান্ত, অবিশ্বাস্য সুন্দর মুখের দিকে তাকালেন। 

”এটা কি আমার সন্তান?” 

”অবশ্যই।” 

’ ওহ-- সে খুব সু্ন্দর।” 

ডাক্তার উঠে টেবিলের দিকে গেলেন। ওখানে গিয়ে তার সব জিনিষ একটা ব্যাগে ঢোকাতে শুরু করলেন। 

মা বিছানায় শুয়ে শুয়ে নবজাত সন্তানের দিকে তাকিয়ে রইলেন। হাসিমুখে তিনি শিশুকে স্পর্শ করতে লাগলেন। মাঝে মাঝে অনুচ্চ অথচ আনন্দময় কণ্ঠে বলতে লাগলেন, “হ্যাঁলো, এডলফাস’। গলা আরো নামিয়ে বললেন, ” হ্যাঁলো আমার ছোট্ট এডলফ।” 

”চুপ!’ সরাইখানার মালিকের স্ত্রী বললেন, “শোনো! আমার মনে হয় তোমার স্বামী আসছে।” 

ডাক্তার হেঁটে দরজার কাছে গেলেন। দরজা খুলে করিডোরের দিকে তাকালেন। 

”হের হিটলার?’ 

”হ্যাঁ” 

”প্লিজ, ভিতরে আসুন।” 

গাঢ় সবুজ রঙের ইউনিফর্ম পরা একজন ছোটখাটো লোক ধীর পায়ে ভিতরে ঢুকলেন। চারদিকে তাকিয়ে দেখলেন তিনি। 

”অভিনন্দন,” ডাক্তার বললেন। “আপনার একটি ছেলে হয়েছে।” 

লোকটির গোঁফজোড়া চমৎকার ভাবে ছাটাই করা। বোঝা যায় এর পিছনে তিনি বেশ সময় দেন। গোঁফজোড়া সম্রাট ফ্রাঞ্জ জোসেফকে মনে করিয়ে দেয়। ওনার শরীর থেকে বিয়ারের তীব্র গন্ধ আসছিল। 

“ছেলে হয়েছে?” 

”হ্যাঁ।’ 

”সে কেমন আছে?” 

”সে ভালো আছে। আপনার স্ত্রীও তাই।” 

”ভালো।” কথাটা বলেই শিশুর বাবা ঘুরে দাঁড়ালেন। উদ্দেশ্যপূর্ণভাবে হেঁটে গেলেন তার স্ত্রী যে বিছানায় শুয়ে আছে সেই দিকে। 

”তারপর ক্লারা, কেমন হল সব?” তার মুখের হাসি গোঁফ জোড়ায় ছড়িয়ে পড়ল। এরপর তিনি শিশুকে দেখার জন্য নীচু হলেন। তিনি আরো নীচু হলেন। আরো অনেকখানি। তার মুখ শিশুর থেকে ১২ ইঞ্চি যাওয়া অব্দি তিনি নীচু হতে লাগলেন। বালিশে মাথা দিয়ে শুয়ে থাকা তাঁর স্ত্রী বিনীত চেহারায় তাকিয়ে দেখছিল সব। 

”আপনার শিশুর ফুসফুস রীতিমত বিস্ময়কর।,” ঘোষণা দেবার ভঙ্গীতে বলে উঠলেন সরাইখানার মালিকের স্ত্রী। ”এই পৃথিবীতে আসার পরে ওর চিৎকার শোনা উচিত ছিল আপনার।” 

”কিন্তু হায় ইশ্বর, ক্লারা…” 

”কী হয়েছে সোনা?” 

”এটা অটোর চেয়েও ছোট!” 

ডাক্তার দ্রুত পায়ে এগিয়ে এলেন। “আপনাদের শিশুর কোন সমস্যা নাই।” 

ধীরে ধীরে তরুণীর স্বামী সোজা হয়ে বিছানা থেকে মুখ ফিরিযে ডাক্তারের দিকে তাকালেন। তাকে দেখে মনে হচ্ছিল সে বিস্মিত আর বিচলিত। ” এটা আপনার মিথ্যা আশ্বাস।” তিনি বললেন। ” আমি জানি এর মানে কি ! আবার একই ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে।” 

”এখন আমার কথা শুনতে হবে আপনাকে।” ডাক্তার বললেন শান্ত স্বরে। 

”কিন্তু, আপনি কি জানেন অন্যদের কী হয়েছিল, ডাক্তার?” 

”আপনাকে অবশ্যই অন্যদের কথা ভুলে যেতে হবে হের হিটলার। এটা একটা নতুন সুযোগ।” 

”কিন্তু, এত ছোট আর দুর্বল!” 

”শুনুন মশাই, শিশুটি মাত্র জন্মগ্রহণ করেছে।” 

”তবুও….” 

” আপনি কি বলতে চাইছেন?’ সরাইখানার মালিকের স্ত্রী তখন চেচিয়ে উঠল। “ আপনি কি এখনই তাকে কবরে নিয়ে যাবার কথা চিন্তা করছেন?” 

”যথেষ্ঠ হয়েছে!” ডাক্তার তীক্ষ্ণ স্বরে বললেন। 

তরুণী মা তখন কাঁদছিল। প্রচন্ড কান্নায় তার শরীর কেঁপে কেঁপে উঠছিল। 

ডাক্তার স্বামীর কাছে গিয়ে কাঁধে হাত রাখলেন। “আপনার স্ত্রীর সঙ্গে ভালো ব্যবহার করুন।” ডাক্তার ফিসফিস করে আরো জানালেন, “ এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।” 

তারপর ডাক্তার স্বামীর কাঁধ চেপে ধরে বিছানারার কিনারে ঠেলে নিয়ে গেলেন। স্বামী দ্বিধা করছিল। ডাক্তার আরো জোরে তার কাঁধ চেপে ধরে ধরলেন। বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে জরুরী ভিত্তিতে ইশারা করলেন। 

অবশেষে অনিচ্ছাসত্ত্বেও স্বামী ঝুঁকে তার স্ত্রীর গালে হালকা চুমু খেলেন। 

“ঠিক আছে, ক্লারা।” সে বলল। “এখন কান্না বন্ধ কর।” 

”এলোইস দেখ, আমি অনেক-- অনেক প্রার্থনা করব যাতে সে বেঁচে থাকে।“ 

”হ্যাঁ থাকবে।” 

”প্রতিদিন, মাসের পর মাস আমি চার্চে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে থাকবো ওর জীবন ভিক্ষা করে।” 

”হ্যাঁ, ক্লারা, আমি জানি।” 

”তুমি কি বুঝতে পারছ, পরপর তিন শিশুর মৃত্যুর মেনে নিতে আমার কত কষ্ট হয়েছে?” 

”বুঝতে পারছি।” 

”ওকে অবশ্যই বেঁচে থাকতে হবে এলোইস, ওকে অবশ্যই… ওহ খোদা, তুমি ওর প্রতি দয়ালু হও এখন….” 




অনুবাদক পরিচিতি
মনিজা রহমান
কথাসাহিত্যিক। অনুবাদক। সাংবাদিক।
বরিশালে বাড়ি। বর্তমানে নিউ ইয়র্কে থাকেন।

২টি মন্তব্য: