বুধবার, ২৬ আগস্ট, ২০২০

মার্গারেট মিচেল'এর ধারাবাহিক উপন্যাস : যেদিন ভেসে গেছে--উনিশ পর্ব


অনুবাদ : উৎপল দাশগুপ্ত

অবরোধের সেই প্রথম দিনগুলোতে, যখন ইয়াঙ্কিরা শহরে ইতস্তত বিক্ষিপ্ত প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভেঙ্গে দেবার জন্য উঠে পড়ে লেগেছিল, স্কারলেট গোলাগুলি আর তোপের আওয়াজে অসহায়ের মত দুহাত দিয়ে কান চেপে ধরে যে কোন মুহুর্তে মরে যেতে পারে ভেবে ভয়ে সিঁটিয়ে যাচ্ছিল। দূর থেকে সাইরেনের কর্কশ আওয়াজ যখন ওদের দিকে এগিয়ে আসছিল, তখন ছুটে মেলানির ঘরে গিয়ে বিছানায় উঠে মেলানির পাশে শুয়ে দুজনে দুজনকে জড়িয়ে ধরে রইল, আর মাঝে মাঝেই “ওহ! ওহ! বলে চেঁচিয়ে বালিশে মাথা গুঁজে পড়ে রইল। প্রিসি আর ওয়েড দৌড়ে সেলারে গিয়ে ঢুকল আর মাকড়সার জালে ঘেরা অন্ধকারে হামাগুড়ি দিয়ে বসে পড়ল। প্রিসি গলা ফাটিয়ে চেঁচাতে লাগল। ওয়েড ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে হেঁচকি তুলতে লাগল। 

পালকের বালিশে দম বন্ধ করে, ওপর দিয়ে মৃত্যুর হট্টগোল শুনতে শুনতে, স্কারলেট মেলানিকে মনে মনে গালি দিতে থাকল। শুধু ওর জন্য সিঁড়ির তলার নিরাপদ জায়গায় ও যেতে পারল না। ডাক্তার মেলানির হাঁটাচলা বারণ করে দিয়েছেন, আর স্কারলেটকেও ওর সাথে সাথেই থাকতে হবে। যে কোনো সময়ে গোলা লেগে খণ্ড খন্ড হয়ে মরে যাবার ভয়ের সঙ্গে মেলানির বাচ্চা যে কোন সময় এসে যেতে পারে এই ভাবনাটাও ওর মনের মধ্যে ত্রাসের সঞ্চার করল। কথাটা যতবার মনে হল, ও একেবারে ঘেমে নেয়ে একশা হয়ে গেল। যদি হঠাৎ বাচ্চাটা আসতে শুরু করে, তখন ও কি করবে? যখন বাইরে এপ্রিল মাসের বৃষ্টির মত গোলাগুলি চলছে, তখন ডাক্তারের খোঁজে রাস্তায় বেরোনোর থেকে মেলানিকে মরে যেতেই দেওয়াই ভাল। এটাও ও ভালই জানে প্রিসিকে মেরে ফেললেও বাড়ির বাইরে যাওয়ার জন্য রাজী করাতে পারবে না। বাচ্চাটা আসতে শুরু করলে ও কি করবে? 

মেলানির সাপার ট্রে সাজানোর সময় স্কারলেট ফিসফিস করে প্রিসির সঙ্গে এই ব্যাপারে আলোচনা করেও নিয়েছে। আশ্চর্যজনকভাবে, প্রিসি ওর আশঙ্কা দূর করে ওকে খানিকটা স্বস্তি দিয়েছে। 

“মিস স্কারলেট, যখন মিস মেলির বাচ্চার হবার সময় হবে আর আমরা ডাক্তার আনতে না যেতে পারি, তাহলে আপনি একটুও চিন্তা করবেন না। আমিই সামলে নেব। এই বাচ্চা হবার ব্যাপারটা আমি খুব ভাল করেই জানি। আমার মা তো ধাই, ঠিক কি না? আপনি ওটা আমার ওপর ছেড়ে দিন।” 

স্কারলেট বেশ স্বস্তির নিঃশ্বাস নিল – যাক অভিজ্ঞ একজন হাতের কাছেই আছে। তবুও ওর মনে হতে থাকল যে এই অগ্নিপরীক্ষা যত তাড়াতাড়ি শেষ হয় ততই মঙ্গল। গোলাগুলির আওয়াজে পাগল হয়ে আর টারার শান্ত নিরাপত্তায় চলে যাবার জন্য উন্মুখ হয়ে, ও প্রত্যেক দিনই প্রার্থনা করতে লাগল যে বাচ্চা যেন পরের দিনই হয়ে যায়, যাতে ও প্রতিজ্ঞা থেকে মুক্তি পেয়ে অ্যাটলান্টা ছেড়ে চলে যেতে পারে। টারা কত নিরাপদ আর এই সব দুর্বিপাক থেকে কত দূরে। 

টারার জন্য আর মায়ের জন্য স্কারলেটের খুব মন কেমন করতে লাগল। এরকম মন খারাপ ওর জীবনে কখনও হয়নি। এলেনের কাছাকাছি থাকতে পারলে, যাই হোক না কেন, ও কখনও ভয় পাবে না। সারা দিন ধরে কান ফাটানো গোলাগুলির আওয়াজ শোনার পরে, প্রতি রাতে শোবার আগে ও মোটামুটি ঠিকই করে নেয় যে পরের দিন সকালেই মেলানিকে বলবে যে ও আর একদণ্ডও অ্যাটলান্টায় থাকতে পারবে না, ওকে বাড়ি চলে যেতেই হবে, আর মেলানিকে মিসেজ় মীডের কাছে গিয়ে থাকতে হবে। কিন্তু বালিসে মাথা রাখলেই অ্যাশলের মুখটা ওর মনে ভেসে ওঠে – সেই শেষ যখন ওর সঙ্গে দেখা হয়েছিল – ম্লান হেসে বলেছিল, “তুমি মেলানির খেয়াল রেখো – রাখবে না? তুমি কত সবল ....... আমাকে কথা দাও।” ও কথা দিয়েছিল। কে জানে কোথায়, অ্যাশলে চিরনিদ্রায় শুয়ে আছে। কিন্তু যেখানেই থাকুক, ও ঠিক নজর রাখছে, ওর কাছে দেওয়া কথায় ওকে বেঁধে রেখেছে। বাঁচা মরা কোন অবস্থাতেই ওর কাছে কথার খেলাপ করতে পারবে না। যে কোন মূল্যেই। তাই ও দিনের পর দিন থেকেই যায়। 

এলেনের বারবার বাড়ি চলে আসতে বলার চিঠিগুলোর জবাবে, স্কারলেট অ্যাটলান্টায় অবরোধের বিপদকে যথাসম্ভব কমিয়ে লিখে, মেলানির বর্তমান অবস্থার কথা জানিয়ে লিখল যে মেলানির বাচ্চা হয়ে গেলেই ও বাড়ি চলে যাবে। আত্মীয় পরিজন – সেটা রক্তের বন্ধনই হোক কি বৈবাহিক – এলেন এ ব্যাপারে চির কালই সংবেদনশীল – তাই অনিচ্ছাসত্ত্বেও স্কারলেটকে থেকে যাওয়ারই পরামর্শ দিলেন, কিন্তু বললেন যে ওয়েড আর প্রিসিকে যেন সত্ত্বর বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হয়। কথাটা প্রিসির খুব মনে ধরল – কারণ এই সব অপ্রত্যাশিত আওয়াজ শুনে শুনে ওর দাঁতকপাটি লেগে যাচ্ছিল আর ডাহা মূর্খের মত আচরণ করছিল। প্রায় সারাটা সময় ও সেলারের মধ্যে গুড়িসুড়ি মেরে বসে থাকত, আর মিসেজ় মীডের শক্তসমর্থ বেটসি না থাকলে মেয়ে দুটো বেশ অসুবিধেয় পড়ে যেত। 

মায়ের মত স্কারলেটও ওয়েডকে অ্যাটলান্টার বাইরে পাঠিয়ে দেবার জন্য উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিল – কেবল বাচ্চাটার নিরাপত্তার কথা ভেবেই নয়, অনবরত ভয় পেয়ে যাওয়ায় ও বেশ বিরক্ত হয়ে পড়েছিল। বোমের আওয়াজে ওয়েডের গলা দিয়ে আওয়াজ বের হতে চায় না, এমন কি যখন আওয়াজ বন্ধ থাকে তখনো ও স্কারলেটের স্কার্ট আঁকড়ে ধরে থাকে, ভয়ে কাঁদতেও পারে না। রাত্রে শুতে যেতে পারে না, অন্ধকারে ভয় পায়, ঘুমোতে ভয় পায় পাছে ইয়াঙ্কিরা এসে ওকে ধরে নিয়ে যায়। সারারাৎ ধরে ওর দাঁত কিড়মিড় আর অবিরাম ফোঁপানি স্কারলেটের স্নায়ুর ওপর যথেষ্ট চাপ তৈরি করে ফেলেছে। ভেতরে ভেতরে ওর ভয়ও কম ছিল না, কিন্তু এই উদ্বেগের মধ্যে যদি প্রতি মুহুর্তে ছেলের ভয়ব্যাকুল মুখ সেই কথা মনে করিয়ে দেয়, তাহলে কার না রাগ হয়? ঠিকই ওয়েডকে টারাতেই পাঠিয়ে দেওয়া দরকার, এখনই। প্রিসি ওকে পৌঁছে দিয়েই ফিরে আসবে, যাতে বাচ্চা হওয়ার সময় ও থাকতে পারে। 

কিন্তু ওদের দুজনকে বাড়ি রওয়ানা করিয়ে দেবার আগেই স্কারলেট খবর পেল যে ইয়াঙ্কিরা দক্ষিণদিকে গিয়ে অ্যাটলান্টা থেকে জোন্সবোরোর রেলপথ ধরে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছে। ধরা যাক ইয়াঙ্কিরা যদি যে ট্রেনে করে ওয়েড আর প্রিসি যাচ্ছে, সেই ট্রেনটাকে আটকায় – কি হতে পারে ভেবে স্কারলেট আর মেলানি ভয়ে পাণ্ডুর হয়ে গেল। সবাই জানে অসহায় বাচ্চাদের ওপর ইয়াঙ্কিরা কিরকম নিষ্ঠুর ব্যবহার করে – এমন কি মেয়েদের থেকেও বেশি নির্যাতন করে! তাই ভয়ে ওকে পাঠানো গেল না আর ও অ্যাটলান্টাতেই থেকে গেল। সারাক্ষণ ভয়ে কাঁটা হয়ে মায়ের স্কার্ট ধরে পিছু পিছু ঘুরতে লাগল, মুঠো থেকে স্কার্ট কোন অবস্থায়ই ছাড়তে নারাজ। 

জুলাইয়ের গরমের দিনগুলোর মধ্যে অবরোধ চলতে লাগল, দিনের পর রাত আসতে থাকল – এক স্বাভাবিক স্তব্ধতায় সারা শহর ছেয়ে গেল, তারপর আস্তে আস্তে শহর এই পরিস্থিতির সাথে নিজেকে মানিয়ে নিল। যেন সব থেকে খারাপ যেটা ঘটার ছিল, সেটা তো ঘটেই গেছে, আর কি এমন ভয় পাওয়ার আছে? ওরা একটা অবরোধের আশঙ্কা করেছিল – তা সেটা তো হয়েই গেছে – আর সব মিলিয়ে তেমন সাংঘাতিক কিছু তো হয়নি। জীবন যেমন চলছিল তেমনই চলছে। ওরা জানে ওরা একটা আগ্নেয়গিরির ওপর বসে আছে – তা যতক্ষণ না অগ্নুৎপাত না হচ্ছে ততক্ষণ তো কিছু করার নেই! তাহলে এত দুশ্চিন্তা করার কি আছে? আর হয়ত সেই অগ্নুৎপাত কখনোই হতে পারবে না। জেনারাল হুড তো ইয়াঙ্কিদের শহরের বাইরে আটকে রাখতে পেরেছেন! আর দেখ অশ্বারোহী বাহিনী কেমন ম্যাকন যাবার রেলপথকে আগলে রেখেছে! শেরম্যান ওটা কখনোই দখল নিতে পারবে না! 

মাত্র আধ মাইল দূরে ইয়াঙ্কিদের অবিরাম গোলাবর্ষণ আর সীমিত রেশন কে অগ্রাহ্য করে এই যে আপাত ঔদাসিন্য, আর ছেঁড়াখোঁড়া পোশাকপরা ধূসরবাহিনীতে নিশ্চল বিশ্বাস সত্ত্বেও অ্যাটলান্টার মানুষের মনের ভেতরে এক অনিশ্চয়তা ঘোরাফেরা করছিল যে আগামী দিনগুলোতে কি দেখতে হবে! অনিশ্চয়তা, দুশ্চিন্তা, দুঃখ, খিদে এবং সর্বোপরি আশা নিরাশার দ্বন্দ্ব ভেতরে ভেতরে সবাইকে কুরে কুরে খাচ্ছিল। 

ধীরে ধীরে বন্ধুবান্ধবদের নির্ভিক মুখ দেখে দেখে আর প্রকৃতির নিয়মে যা এড়ানো যাবে না তাকে মেনে নিতে হয়, এই নীতিতে বিশ্বাস করে, স্কারলেট মনে মনে সাহস সঞ্চয় করে ফেলল। গোলাগুলির আওয়াজে এখনও চমকে ওঠে, কিন্তু দৌড়ে গিয়ে মেলানির বালিশে মুখ গুঁজে ফেলে না। শুধু কোন মতে ঢোঁক গিলে দুর্বলস্বরে জিজ্ঞেস করে, “খুব কাছে থেকেই আওয়াজটা এল, তাই না?” 

কেমন একটা ঘোরের মধ্য দিয়ে জীবনটা চলছে –ঠিক একটা দুঃস্বপ্নের মত – আর দুঃস্বপ্নটা এতই ভয়াবহ যে সেটা বিশ্বাস করতেই ইচ্ছে করে না। এরকম করে ভেবে স্কারলেটের ভয় আরও কমে গেল। সে – স্কারলেট ও’হারা – কি করে সারাক্ষণ এই রকম একটা দুশ্চিন্তা মাথায় নিয়ে চলতে পারে? একটা শান্ত নিরিবিলি জীবন – মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই এমন পালটে যেতে পারে? বিশ্বাসই হয় না! 

অবাস্তব, ভীষণভাবে অবাস্তব! ভোরের বেলা সুন্দর নীল আকাশটা কামানের ধোঁয়ায় কালো দেখায় এখন। ঝড়ের মেঘের মত সেই কালো ধোঁয়া সারা শহরে ঝুলে রয়েছে। দুপুরের উষ্ণতায় লতানে গোলাপ আর হানিসাক্‌ল ফুলের ঝোপ থেকে যে তীব্র সুগন্ধে চারদিক ম ম করত, তার জায়গায় এই বারুদের গন্ধ কি ভয়াবহ! গোলাগুলি থেকে লোহার টুকরোগুলো এদিক ওদিক ছিটকে পড়ে চকিতে কত প্রাণ নিয়ে নেয়! 

দুপুরে দিবানিদ্রা তো ভুলেই গেছে। গোলাগুলির আওয়াজ যে সব সময় আসে তা নয়, মাঝে মাঝ বন্ধও থাকে। কিন্তু ওদের এই পীচট্রী স্ট্রীটে শোরগোল কখনও বন্ধ হয় না। কামানের গড়িয়ে যাওয়ার ঘড় ঘড় শব্দ, অ্যাম্বুলেন্সের যাবার আওয়াজ, রাইফেল পিট থেকে জখম সৈন্যদের ঘসটে ওপরে ওঠার আওয়াজ, সৈন্যদের ডাব্‌ল মার্চ করতে করতে শহরের একদিক থেকে অন্যদিকে যাওয়ার শব্দ আর পত্রবাহকদের হেডকোয়ার্টারের দিকে ছুটে যাবার আওয়াজ – যেন কনফেডারেসির ভাগ্য ওদের তাড়াতাড়ি পৌঁছানোর ওপর নির্ভর করছে! 

রাতের দিকে একটা থমথমে নীরবতা বিরাজ করে। তখন সবই যেন বড় বেশি নীরব। গেছো ব্যাঙ, নিদ্রালু মকিং বার্ড, অন্যান্য পশু পাখিরা যেন কিসের ভয়ে স্তব্ধ হয়ে থাকে – গ্রীষ্মকালের সমবেত চেঁচামেচি বন্ধ করে। মাঝে মাঝে রাতের সেই স্তব্ধতা ভেঙ্গে যেত মুহুর্মুহু গুলির আওয়াজে। 

নিশুত রাতে, যখন মেলানি ঘুমিয়ে পড়েছে, সব ল্যাম্পও নিভিয়ে দেওয়া হয়েছে। সারা শহর জুড়ে একটা মৃত্যুকঠিন নীরবতা ছেয়ে গেছে। স্কারলেট হয়ত বিছানায় জেগে শুয়ে আছে। হঠাৎ কখনো বাইরে গেট খোলার আওয়াজ শুনতে পেত, তারপর বাইরের ঘরের দরজায় মৃদু টোকা। 

প্রায়ই অচেনা সৈন্যদের অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখত – ওরা নানা রকম গলায় নানা রকম কথা বলত – তার মাঝে হয়ত কখনো কখনো শিকশষিত কোন মানুষের আওয়াজও ভেসে আসত, “ম্যাডাম, অন্তন্ত দুঃখিত – এখন আপনাকে বিরক্ত করার জন্য – একটু জল পাওয়া যাবে কি? আমার জন্য আর আমার এই ঘোড়ার জন্য?” কারো কারো গলায় পার্বত্য সুর, কখনো শুনত উপকুলবর্তি এলাকার মানুষের গলা – ওর বুক কেঁপে উঠত –এলেনের কথা মনে পড়ে যেত। 

“মিস, আমার এই বন্ধু – ওকে আমি হাসপাতালে নিয়ে যেতে চাইছিলাম – কিন্তু মনে হচ্ছে ততক্ষণ সময় পাব না। ওকে কি একটু ভেতরে নিয়ে যেতে পারি?” 

“ম্যাডাম, একটু খাবার পেলে বড় ভাল হত। যদি একটুকরো শস্যের কেক পাওয়া যেত – অবশ্যই বাড়তি যদি থাকে!” 

“ম্যাডাম, কিছু মনে করবেন না। রাতটা আপনাদের এই বারান্দায় থাকতে পারি? গোলাপ আর হানিসাক্‌লের গন্ধটা বড় ভাল লাগছে। বাড়ির কথা মনে পড়ে গেল – তাই সাহস করে _____” 

না, এই সব রাতগুলো কিছুতেই সত্যি হতে পারে না। এগুলো একেকটা দুঃস্বপ্ন। আর এই মানুষগুলোও সেই দুঃস্বপ্নেরই একটা অংশ – অবয়বহীন – নামগোত্রহীন – অন্ধকারের ভেতর থেকে ভেসে আসা শুধুই একটা ক্লান্ত কণ্ঠস্বর! জল এনে দেওয়া, খাবার দেওয়া, বারান্দায় বালিশ বিছিয়ে দেওয়া, ক্ষতস্থান পরিষ্কার করে বেঁধে দেওয়া, মৃত্যুপথযাত্রীর অপরিস্কার মাথাটা ধরে রাখা। না না এসব সত্যি সত্যিই ওর সঙ্গে ঘটে চলতে পারে না! 

জুলাই মাসের শেষের দিকে, এক রাতে আঙ্কল হেনরি এসে দরজায় টোকা মারলেন। ছাতা ছাড়াই এসেছেন। কার্পেটের সেই থলিটাও সঙ্গে নেই। ভুড়িটাও না। মুখের গোলাপি চামড়া বুলডগের গলকম্বলের মত ঝুলে পড়েছে। শুভ্রকেশ অসম্ভব ময়লা। পায়ে সে ভাবে কিছু পরে নেই। শরীরে উকুন ঘোরাফেরা করছে। উনি খুবই ক্ষুধার্ত। কিন্তু ওঁর দুর্দমনীয় প্রাণচঞ্চলতা অটুট রয়েছে। 

মুখের যদিও বললেন, “এই অর্থহীন যুদ্ধে আমার মত বুড়ো বুদ্ধুরা বন্দুক কাঁধে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে”, মেয়েদের মনে হল আঙ্কল হেনরি ব্যাপারটাকে যথেষ্ট উপভোগ করছেন। যুবকদের মত যুদ্ধে তাঁকেও প্রয়োজন আর উনি যুবকদের কাজটাই করছেন। উনি মেয়েদের খুব উৎসাহের সঙ্গে বললেন যে গ্র্যাণ্ডপা মেরিওয়েদেয়ারের থেকে অনেক সহজে যুবকদের সঙ্গে মিশে যেতে পারেন। গ্র্যাণ্ডপার কোমরের ব্যথা খুব ভোগাচ্ছে, তাই ক্যাপটেন ওঁকে যুদ্ধ থেকে অব্যহতি দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু উনি রাজী হননি। উনি বলেই দিয়েছেন পুত্রবধুর প্রশ্রয় আর প্রতিদিন দাড়ি কামানোর আর তামাক খাওয়া ছেড়ে দেওয়ার জন্য জোর করার থেকে উনি বরং ক্যাপটেনের গালাগালি আর জবরদস্তি বেশি পছন্দ করেন। 

আঙ্কল হেনরি অবশ্য বেশিক্ষণ থাকতে পারলেন না। মাত্র চার ঘন্টার জন্য ছুটি পেয়েছেন, তার মধ্যে দু’ঘন্টাই কেটে যাবে প্রাকার থেকে লম্বা পথ বেয়ে পায়ে হেঁটে শহরে আসা আর ফিরে যাওয়ায়। 

“দেখ, মেয়েরা, তোমাদের সঙ্গে বেশ অনেক দিন আর দেখা হওয়ার সম্ভাবনা নেই,” মেলানির শোবার ঘরে বসে, স্কারলেটের দেওয়া গামলার ঠাণ্ডা জলে ফোস্কা পড়া পা যত্ন করে রগড়াতে রগড়াতে বললেন, “সকাল বেলাই আমাদের সেনাদল বাইরে চলে যাচ্ছে।” 

মেলানি ভয় পেয়ে ওঁর হাত চেপে ধরল, “কোথায়?” 

“আমার গায়ে তোমার হাত রেখোনা,” আঙ্কল হেনরি একটু বিরক্ত হয়েই বললেন, “আমার সারা গায়ে উকুন ঘোরাফেরা করছে। যুদ্ধ পিকিনিকের থেকে বেশি কিছু নয়, শুধু এই উকুন আর আমাশার উপদ্রব ছাড়া। আমরা কোথায় যাচ্ছি? আমাকে অবশ্য বলেনি ওরা – তবে আমি ভাল মত একটা আন্দাজ করে ফেলেছি। আমরা দক্ষিণে জোন্সবোরো যাচ্ছি কাল সকালবেলা – যদি না আমার আন্দাজে বিরাট কিছু ভুল হয়ে থাকে।” 

“ও, কিন্তু জোন্সবোরোর দিকে কেন?” 

“কারণ সেখানে একটা বড় ধরণের লড়াই হতে চলেছে, সোনা। ইয়াঙ্কিরা পারলে রেলপথ দখল করে নেবে। আর যদি নিয়ে ফেলতে পারে – তাহলে – বিদায় অ্যাটলান্টা!” 

“ও আঙ্কল হেনরি, তোমার কি মনে হয় – ওরা পেরে যাবে?” 

“ওহো, আরে না না, মেয়েরা! আমি ওখানে থাকলে, কার এত বুকের পাটা?” ওদের আতঙ্কিত মুখ দেখে আঙ্কল হেনরি হেসে ফেললেন। তারপর আবার গম্ভীর হয়ে বলতে লাগলেন, “খুব কঠিন লড়াই হবে, বুঝলে? জিততে আমাদের হবেই। জানো নিশ্চয়ই, ইয়াঙ্কিরা এই ম্যাকন পর্যন্ত রেলপথ বাদে সব রেলপথ দখল করে নিয়েছে। তোমরা হয়ত জানো না, কেবল রেলপথই নয়, সমস্ত সড়কপথ, ওয়াগন যাবার রাস্তা, এমনকি ঘোড়ায় চড়ে যাবার পথ, কিছুই কব্জা করতে বাদ রাখেনি – ম্যাকডোনোর রাস্তাটুকু ছাড়া। অ্যাটলাটা এখন একটা বস্তার মধ্যে বন্দী রয়েছে, আর সেই বস্তার দড়ি বাঁধা রয়েছে জোন্সবোরোতে। অতএব, ওদের রেলপথটা দখল করতে দেওয়া চলবে না। তাই এখন কিছুদিন আমি আসতে পারব না। আমি এসেছিলাম তোমাদের কাছে বিদায় নেওয়ার জন – আর খবর নিতে যে স্কারলেট তোমার কাছেই আছে , মেলি।” 

“হ্যা স্কারলেট আমার কাছেই আছে,” মেলি সস্নেহে বলল। “আর তুমি আমাদের জন্য চিন্তা কোরো না আঙ্কল হেনরি। নিজের যত্ন নেবে।” 

আঙ্কল হেনরি তোয়ালে দিয়ে পা মুছে ছেড়া বুটটা পায়ে গলাতে গলাতে ব্যথায় কঁকিয়ে উঠলেন। 

“এবার আমাকে যেতে হবে,” আঙ্কল হেনরি বললেন। “পাঁচ মাইল পথ হেঁটে যেতে হবে। স্কারলেট তুমি আমার জন্য কিছু খাবার বেঁধে দাও। যা পারবে।” 

মেলানিকে চুম্বন করে বিদায় নিয়ে উনি রান্নাঘরে, যেখানে স্কারলেট একটা ন্যাপকিনে কিছু শস্য দিয়ে তৈরি কেক আর কায়েকটা আপেল দিয়ে মোড়ক বানাচ্ছিল। 

“আঙ্কল হেনরি, সত্যিই – সত্যিই কি অবস্থা এত গুরুতর?” 

“গুরুতর? একদম ভগবানের ভরসায় রয়েছি আমরা। মনে কোন ভুল ধারণা রেখো না। একেবারে গাড্ডায় পড়ে গেছি!” 

“ওরা কি টারায়ও চলে যাবে?” 

একটু বিরক্ত হলেন। মেয়েদের এই স্বভাব – যখন আরও বৃহত্তর সমস্যা নিয়ে ভাববার সময় – মেয়েরা শুধু নিজেদের কথাই ভাববে! কিন্তু ওর ভীত, শোকার্ত মুখ দেখে নিজেকে সামলে নিলেন। 

“না ওখানে ওরা নিশ্চয়ই যাবে না। টারা তো রেল পথ থেকে পাঁচ মাইল ভেতরে। আর ওরা তো শুধু রেল পথ দখল করতে চাইছে। একেবারে বোকা মেয়ে!” বলেই হঠাৎ চুপ করে গেলেন। “এতটা পথ আমি শুধু তোমাদের কাছে বিদায় নেবার জনই আসিনি। মেলির জন্য একটা খারাপ খবরও নিয়ে এসেছি। কিন্তু বলি বলি করেও বলতে পারিনি। তোমার ওপর আমি সেই দায়িত্বুটা দিয়ে যাচ্ছি।” 

“অ্যাশলে – তার মানে অ্যাশলে – তুমি কি জানতে পেরেছ – ও কি মারা গেছে?” 

একটু বিরক্ত হয়ে বললেন, “অ্যাশলের ব্যাপারে আমি কি করে জানতে পারব – রাইফেল পিটে কোমর অব্দি কাদার মধ্য দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে? ওর বাবার কথা বলছিলাম। জন উইল্কস বেঁচে নেই।” 

স্কারলেট স্তম্ভিত হয়ে বসে পড়ল – আধমোড়া খাবার হাতে নিয়েই। 

“মেলিকে বলতে এসেছিলাম। পারলাম না। তুমি বলবে। আর এগুলো ওকে দিও।” 

পকেট হাতড়ে উনি একটা ভারী সোনার ঘড়ি – তাতে বহুদিন আগে মৃত মিসেজ় উইলক্সের ছোট একটা প্রতিমূর্তি ঝুলছে, আর এক জোড়া বড় কাফ্‌বাটন বের করলেন। ঘড়িটা স্কারলেট জন উইলক্সের হাতে অনেকবার দেখেছে। তার মানে আশলের বাবা সত্যিই মারা গেছেন! মনটা এমন বিকল হয়ে গেল যে ও কাদতেও পারল না, কথা বলতেও। আঙ্কল হেনরি উশখুশ করতে লাগলেন। পাছে ওর চোখে জল দেখে নিজেকে সামলাতে না পারেন, তাই দৃষ্টি সরিয়ে নিলেন। 

“খুবই সাহসী মানুষ ছিলেন উনি, স্কারলেট। মেলিকে এই কথাটা বোলো। ওঁর মেয়েদের কাছেইও যেন ও এই কথাটা লেখে। বয়স অনেক হলেও একজন ভাল যোদ্ধা ছিলেন। একটা শেল এসে ওঁকে আঘাত করেছিল। একেবারে সরাসরি ওঁর ওপর আর ওঁর ঘোড়ার ওপর। ঘোড়াটা ছটফট করছিল। আমি নিজে হাতে ওকে গুলি করে মারি – বেচারা অসহায় হয়ে পড়েছিল। তুমি মিসেজ় টার্লটনকে চিঠি লিখে জানিও। ওই ঘোড়াটাকে উনি খুব ভালবাসতেন। নাও, খাবারটা বেঁধে দাও। এবার যেতে হবে। যুবকদের মত কাজ করতে করতে মারা যাওয়ার থেকে একজন বৃদ্ধ মানুষ আর কি আশা করতে পারে?” 

“ওহ, উনি মারা না গেলেই ভাল হত! ওঁর যুদ্ধেই যাওয়া উচিত ছিল না। বেঁচে থেকে ওঁর নাতি-নাতনীদের বড় হতে দেখে শান্তিতে বিছানায় শুয়ে মারা যেতে পারতেন। কেন উনি গেলেন? উনি তো এই বিচ্ছিন্নতায় বিশ্বাস করতেন না – এই যুদ্ধকে ঘৃণা করতেন ____” 

“আমরা অনেকেই সেটাই ভাবি, কিন্তু তাতে কি?” আঙ্কল হেনরি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। “তুমি কি মনে কর –এই বয়সে – ইয়াঙ্কিরা আমাকে বন্দুকের লক্ষ্য তৈরি করবে – এটা আমি মানতে পারি? কিন্তু আজকাল কোন ভদ্রলোকের কাছে অন্য কোন পথই নেই। নাও একবার চুম্বন করে আমাকে বিদায় দাও, আর আমার জন্য একদম চিন্তা কোরো না। যুদ্ধের শেষে আমি নিরাপদে আবার ফিরে আসব।” 

স্কারলেট ওঁকে চুমু খাওয়ার পরেই উনি অন্ধকারের মধ্যে বেরিয়ে গেলেন। দরজা বন্ধ করার আওয়াজ শুনতে পেল। স্মরণচিহ্নগুলোর দিকে একবার তাকিয়ে সেগুলো নিয়ে ওপরতলায় চলে গেল। মেলানিকে বলতে হবে। 

*** 

আঙ্কল হেনরির আশঙ্কা মত জুলাইয়ের শেষদিকে দুঃসংবাদ এল যে ইয়াঙ্কিরা জোন্সবোরোর উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়ে গেছে। শহরের থেকে চার মাইল দূরে ওরা রেলপথকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে, যদিও কনফেডারেটের অশ্বারোহী বাহিনী ওদের হটিয়ে দিতে পেরেছে। ইঞ্জিনিয়ারবাহিনী রাত দিন ঘাম ঝরিয়ে আবার সেই পথ মেরামত করে ফেলেছে। 

স্কারলেট চিন্তায় দিশেহারা হয়ে গেল। তিন দিন চুপচাপ অপেক্ষা করল, কিন্তু মনে ভয় ক্রমশই বাড়তে থাকল। তারপর জেরাল্ডের কাছে থেকে একটা ভরসা জাগানো চিঠি পেল। শত্রুপক্ষ টারায় পৌঁছাতে পারেনি। লড়াইয়ের শব্দ শোনা গেলেও, কোন ইয়াঙ্কির দেখা মেলেনি। 

জেরাল্ডের চিঠি নানা রকম দম্ভোক্তিতে পূর্ণ – কেমনভাবে ইয়াঙ্কিদের রেলপথ থেকে বিতাড়িত করা হল তার বিবরণ সমেত – যাতে মনে হয় এই অসাধ্যসাধন তিনি একা হাতে লড়াই করে করেছেন। তিন পাতা জুড়ে ট্রুপের বীরত্বকাহিনী লিখে শেষে খুব সংক্ষেপে জানিয়েছেন যে ক্যারীন অসুস্থ। টাইফয়েড হয়েছে – মিসেজ় ও’হারার আশঙ্কা। তবে খুব বেশি অসুস্থ নয়, তাই স্কারলেট যেন বেশি চিন্তা না করে। স্কারলেট যেন কোনমতেই এখন বাড়ি আসার চেষ্টা না করে – এমনকি যদি রেলপথ আবার নিরাপদ মনে হয়, তাহলেও না। অবরোধ শুরু হওয়ার সময় স্কারলেট আর ওয়েড না আসায় মিসেজ় ও’হারা যথেষ্ট নিশ্চিন্ত বোধ করছেন। উনি স্কারলেটকে গির্জায় গিয়ে ক্যারীনের তাড়াতাড়ি ভাল হয়ে ওঠার জন্য প্রার্থনা করতে বলেছেন। 

শেষ কথাটায় স্কারলেটের বিবেকদংশন হল, কারণ বেশ কয়েক মাস হয়ে গেল ও গির্জায় যায়নি। এক এক সময় মনে হত সে এক গর্হিত পাপ করে চলেছে, কিন্তু আজকাল চার্চে না যাওয়াকে ততখানি পাপকাজ বলে মনে হচ্ছে না। তবে ও মায়ের কথা অবহেলা করতে পারল না। তাড়াতাড়ি নিজের ঘরে গিয়ে খানিক জপ করে নিল। প্রার্থনা হয়ে গেলে যখন উঠে দাঁড়াল, তখন আর আগের মত স্বস্তি পাচ্ছিল না। বেশ কিছুদিন হল ওর মনে হচ্ছিল যে ঈশ্বর ওর কাজকর্মের ওপর তেমন নজর রাখার সময় পাচ্ছেন না, কারণ কনফেডারেটরা আর পুরো দক্ষিণের হাজার হাজার প্রার্থনা শুনতেই উনি ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। 

সেদিন রাত্রে, সামনের বারান্দায় বসে জেরাল্ডের চিঠিটা বুকের কাছে ধরে মাঝে মাঝে ছুঁয়ে দেখতে লাগল – তাতে করে টারা আর এলেনকে নিজের কাছে অনুভব করতে পারছিল। লতাপাতায় ঢাকা বারান্দায়, লণ্ঠন থেকে হলুদ ছায়া ছড়িয়ে পড়ছিল। হানিসাক্‌লের ঝোপ থেকে সুবাস ওকে জড়িয়ে রেখেছিল। নিঝুম রাত – এমনকি সূর্যাস্তের পর থেকে রাইফেলের আওয়াজও পাওয়া যাচ্ছিল না, নিস্তব্ধতা ভাঙ্গার জন্য। পৃথিবীকে কোন দূরতম দ্বীপ মনে হচ্ছিল। চেয়ারে একা বসে বসে দোল খেতে খেতে ওর মনে হল কেউ – এমনকি মিসেজ় মেরিওয়েদারও যদি এই সময় ওর সঙ্গে থাকতেন তাহলে ভাল লাগত। চিঠিটা পড়ার পর থেকে ওর মনটা আনচান করছে। কিন্তু মিসেজ় মেরিওয়েদার আজ হাসপাতালে নাইট ডিউটি করছেন, মিসেজ় মীড বাড়িতে ফিলের জন্য খাবার বানাচ্ছেন। ফিল লড়াইয়ের ময়দান থেকে বাড়ি এসেছে। মেলানি ঘুমোচ্ছে। হঠাৎ কোন আগন্তুক এসে যাবার সম্ভাবনাও নেই। গত এক সপ্তাহ থেকে এই রকম আগন্তুক চলে আসাটাও কমে গেছে, কারণ যাদের একটু নড়াচড়ার ক্ষমতাও রয়েছে তারা সকলেই রাইফেল পিট আগলাচ্ছে। কিংবা জোন্সবোরোতে ইয়াঙ্কিদের তাড়া করছে। 

এরকম একলা থাকার সুযোগ ওর খুবই কম হয়, আর ও একলা থাকতে পছন্দও করে না। একলা থাকলেই এক রাশ আজে বাজে চিন্তা মাথায় ভিড় করে আসে, আর এখন তো সেই সব চিন্তা মোটেই সুখপ্রদ নয়। অন্যদের মত স্কারলেটও অতীত নিয়ে বেশি ভাবে, যা হারিয়ে গেছে। 

আজ রাতে, অ্যাটলান্টার এই নীরব জটিলতার মধ্যে বসে, চোখ বন্ধ করলেই টারার গ্রাম্য স্তব্ধতা কল্পনায় ভেসে উঠছে। মনে হচ্ছে জীবন আগের মতই রয়েছে – বদলে যাবার কোন সম্ভাবনাই যেন নেই। কিন্তু মনে মনে জানে কাউন্টির সেই আগের জীবন আর কোনকালেই ফিরে পাওয়া যাবে না। টার্লটন্দের চার ভাইয়ের কথা মনে পড়ল, লাল চুলো যমজভাই দুজন আর টম আর বয়েড। আবেগমথিত এক বেদনায় মনটা ছেয়ে গেল। স্ট্যূ কিংবা ব্রেন্ট – এর মধ্যে কেউ একজন তো ওর বর হতেই পারত! যুদ্ধ শেষ হয়ে গেলে, যখন আবার ও টারায় ফিরে যাবে, তখন আর ওদের হইচই শুনতে পাবে না, দেখতে পাবে না ওরা সেডার সারির পথ ধরে ঘোড়া নিয়ে দৌড়ে আসছে। তারপর রেফোর্ড ক্যালভার্ট – কি ভাল নাচতে পারত! আর কখনও স্কারলেটকে নাচের সঙ্গী করবে না! আর মুনরোর ছেলেরা – আর – আর খুদে জো ফোনটেন আর – 

“ওহ, অ্যাশলে!” ও ফুঁপিয়ে কাঁদতে লগল। হাতের ওপর মাথাটা ঝুঁকে পড়ল। “তোমার চলে যাওয়াটা আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারব না!” 

সামনের গেট থেকে একটা আওয়াজ এল। মাথা তুলে ও তাড়াতাড়ি হাত দিয়ে চোখের জল মুছে ফেলল। উঠে দাঁড়িয়ে দেখতে পেল রেট বাটলার এগিয়ে আসছেন, চওড়া পানামা টুপিটা ওঁর হাতে ধরা। ফাইভ পয়েন্টে সেই যে ওঁর গাড়ি থেকে নেমে গেছিল, তারপর থেকে ওঁকে আর দেখেইনি। সেদিন আর কোনদিন ওঁর মুখদর্শন করবে না বলে জানিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু এখন ওঁকে দেখে মনে মনে খুশি হল – কারও সঙ্গে কথা অন্তত বলতে পারবে, যাতে অ্যাশলের ভাবনা কিছুক্ষণ ভুলে যেতে পারে। তড়িঘড়ি ও মন থেকে সেই স্মৃতিটা দূর করে দিল। ওঁকে দেখে মনে হল সেদিনের স্মৃতি উনি ভুলেই গেছেন – অন্তত এমন ভাব দেখাচ্ছেন যেন কিছুই মনে নেই – কারণ উনি বারান্দার সিঁড়ির সবথেকে ওপরের ধাপে ওর পায়ের কাছে এসে বসে পড়লেন – আর সেদিনের ঝগড়ার কোনও উল্লেখ করলেন না। 

“তাহলে তুমি ম্যাকনে পালিয়ে যাওনি? শুনতে পেলাম মিস পিটি পালিয়ে গেছেন, আর ভেবেছিলাম তুমিও পালিয়ে গিয়ে থাকবে! তাই আলো জ্বলতে দেখে ভাবলাম ব্যাপারটা একবার দেখে আসি। তা থেকে গেলে কেন?” 

“মেলানিকে সঙ্গ দেবার জন্য। আপনি তো জানেন ও – মানে এখন ওর যাওয়ার মত অবস্থা নয়।” 

“সর্বনাশ!” উনি বলে ফেললেন। লণ্ঠনের আলোয় স্কারলেট দেখল ওঁর ভুরু কুঁচকে গেছে। “তুমি নিশ্চয়ই বলছ না যে মিসেজ় উইল্কস এখনও এখানেই থেকে গেছেন? এরকম বোকামি আমি কখনও আগে দেখিনি। ওঁর এই অবস্থায় এখানে থাকাটা খুবই বিপজ্জনক।” 

স্কারলেট একটু লজ্জা পেয়ে চুপ করে রইল, কারণ মেলানির অবস্থা নিয়ে একজন পুরুষমানুষের সঙ্গে আলোচনা করা যায় না। একথা ভেবেও লজ্জা পেল যে উনি মেলানির পক্ষে কেন বিপজ্জনক তাও জানেন। একজন অবিবাহিত পুরুষের এত কিছু জানাটা ঠিক রূচিসম্মত নয়। 

“আমারও যে আঘাত লাগতে পারে, এটা আপনার না ভাবাটা যথেষ্ট অমর্যাদাকর,” চাঁচাছোলা গলায় ও অভিযোগ করল। 

ওঁর চোখের কোনে চটুল হাসির আভাস পাওয়া গেল। 

“তোমাকে ইয়াঙ্কিদের হাত থেকে আমি সব সময় রক্ষা করব!” 

“কথাটা প্রশংসা করে বললেন, না সত্যি, সেটা বুঝতে পারলাম না,” একটু অনিশ্চিতভাবে ও বলল। 

“প্রশংসা নয়,” উনি বললেন। “আর কবে লোকের সাধারণ কথাকেও প্রশংসা বলে ভাবতে থাকবে?” 

“আমার মৃত্যুশয্যায়,” স্কারলেট হেসে ফেলল।মনে মনে বলল রেট বাটলার না করলেও, প্রশংসা করার লোকের অভাব হবে না। 

“অহঙ্কার! অহঙ্কার!, রেট বললেন। “তাও ভাল তুমি স্বীকার কর!” 

সিগার কেস খুলে একটা কালো সিগার বের করে কয়েক মুহুর্ত নাকের কাছে ধরে রইলেন। তারপর পলকের জন্য দেশলাইয়ের আগুন জ্বলে উঠল। তারপর একটা থামে হেলান দিয়ে হাঁটুর ওপর হাত জড়ো করে রেখে কিছুক্ষণ নীরবে ধূমপান করলেন। স্কারলেট আবার চেয়ারে দুলতে শুরু করল। নিস্তব্ধ অন্ধকার দুজনকে ঘিরে ধরল। গোলাপ আর হানিসাক্‌লের ঝোপে – যেখানে মকিংবার্ড বাসা বেধেছিল – ঘুম ভেঙ্গে একবার মৃদুস্বরে আওয়াজ দিল। তারপর কি ভেবে আবার চুপ করে গেল। 

বারান্দার আবছায়ার মধ্যে রেট হঠাৎ হেসে উঠলেন – খুবই মৃদুস্বরে। 

“তো তুমি মিসেজ় উইলক্সের সঙ্গে থেকে গেলে? খুবই আজব অবস্থা – আমার দেখার মধ্যে!” 

“আমি তো এর মধ্যে আজব কিছুই দেখতে পাচ্ছি না,” একটু অস্বস্তি সহকারে খুব সতর্কতার সাথে ও বলল। 

“তাই নাকি? তাহলে তোমার মধ্যে নৈর্ব্যক্তিক দৃষ্টিভঙ্গীর অভাব আছে। বেশ কিছুদিন ধরে আমার কেমন ধারণা হয়েছিল যে তুমি মিসেজ় উইল্কসকে সহ্য করতে পার না। তুমি ওঁকে বোকা আর সরল বলে ভাব আর ওঁর মধ্যে যে দেশপ্রেমের ধারণা রয়েছে তাতে তুমি বিরক্ত হও। সুযোগ পেলে তুমি ওঁকে কখনওই ছোট করতে পিছপা হওনা। তাই এই রকম গণ্ডগোলের মধ্যে তুমি নিঃস্বার্থভাবে ওঁর সঙ্গে থেকে গেছ সেটাই আমার কাছে অদ্ভুত লাগছে। বল তো, তুমি এরকম কেন করলে?” 

“তার কারণ ও চার্লির বোন – আর আমার বোনের মত,” স্কারলেট জবাব দিল – খুবই আত্মমর্যাদার সঙ্গে। ওর গাল দুটো গরম হয়ে উঠল। 

“তুমি বলতে চাইছ, যে যেহেতু ও অ্যাশলে উইলক্সের বিধবা!” 

রাগে স্কারলেট চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। 

“আগের গেঁয়ো ব্যবহার ভুলে গিয়ে আমি আপনাকে প্রায় ক্ষমা করে দিয়েছিলাম। কিন্তু আর আমি সহ্য করব না। আপনাকে এই বারান্দায় আসতে দেওয়াই উচিত হয়নি। এতটা মন খারাপ না লাগলে আর ____” 

“নাও বসে পড়, আর ফোলানো রোঁয়াগুলো গুটিয়ে নাও,” উনি বললেন। ওঁর গলার স্বর বদলে গেছে। এগিয়ে গিয়ে ওর একটা হাত নিজের হাতে তুলে নিয়ে ওকে চেয়ারে বসিয়ে দিলেন। “মন খারাপ – কেন?” 

“টারা থেকে একটা চিঠি পেলাম আজ। ইয়াঙ্কিরা ঘরের খুব কাছে – আর আমার ছোট বোন অসুস্থ – টাইফয়েড হয়েছে – আর সেই জন্য বাড়ি যাওয়ার মত অবস্থা হলেও – মা যেতে মানা করে দিয়েছেন – তাহলে আমারও হয়ে যাবে। ওহ আমার বাড়ি যেতে কত ইচ্ছে করছে!” 

“ঠিক আছে, কেঁদো না,” উনি খুব কোমল স্বরে বললেন। “অ্যাটলান্টায় তুমি অনেক নিরাপদে রয়েছ – টারার থেকে। ইয়াঙ্কিরা তোমার কোন ক্ষতি করবে না – কিন্তু টাইফয়েড করবে।” 

“ইয়াঙ্কিরা আমার কোন ক্ষতি করবে না! কি করে এরকম মিথ্যে কথা বলতে পারেন আপনি?” 

“বোকা মেয়ে! ইয়াঙ্কিরা শয়তান নয়। তোমরা যেরকম ভাব, ওদের মাথায় শিঙও নেই, পায়ে খুরও নেই! ওরা আমাদের দক্ষিণের লোকদের মতই – যদিও আচারব্যবহারে একটু অসভ্য - আর উচ্চারণটাও একটু বিটকেল।” 

“কেন ইয়াঙ্কিরা আমাকে ___” 

‘ধর্ষণ করবে? মনে হয় না। অবশ্য সেটা ওরা করতে চাইবে!” 

“আপনি যদি এরকম অসভ্যের মত কথা বলতে থাকেন, তাহলে আমি কিন্তু ঘরে ঢুকে পড়ব,” ও চেঁচিয়ে উঠল। অন্ধকারে ওর লাল হয়ে ওঠা মুখ দেখা গেল না বলে কৃতজ্ঞ। 

“সত্যি করে বল। তুমি কি এটাই ভাবনি?” 

“মোটেই না!” 

“অবশ্যই তাই। তোমার মনের কথা বুঝে ফেলার জন্য আমার ওপর রেগে যাবার দরকার নেই। আমাদের দক্ষিণের সযত্নে লালিত, নিষ্পাপ লেডিরা সবাই এরকম করেই ভাবে। ওরা সব সময় এরকম করেই ভেবে অভ্যস্ত। আমি হলফ নিয়ে বলতে পারি এমনকি মিসেজ় মেরিওয়েদারের মত সম্ভ্রান্ত বয়স্কা মহিলারাও ____” 


স্কারলেট অন্ধকারে ঢোঁক গিলল। ওর মনে পড়ে গেল, এই অশান্ত সময়ে, যখনই দুজন বয়স্কা মহিলা একত্রিত হন, ওঁরা ফিসফিস করে ভার্জিনিয়া, ল্যুইসিয়ানা কিংবা টেনেসিতে ঘটা এই সব ঘটনা নিয়ে আলোচনা করতে থাকেন –– অবশ্য এই শহরগুলো কোনটাই ঘরের কাছে নয়। ইয়াঙ্কিরা মহিলাদের ধর্ষণ করে, বাচ্চাদের পেটের মধ্যে দিয়ে বেয়নেট ঢুকিয়ে দেয়, বৃদ্ধ নরনারীর চোখের সামনে তাঁদের বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেয়। ঘটনাগুলো যে সত্যি সেটা সবাই জানলেও রাস্তার ধারে জোর গলায় কেউ আলোচনা করত না। রেটের যদি একটুও সৌজন্যবোধ থাকত তাহলে উনি বুঝতে পারতেন যে এগুলো সত্যিই ঘটছে। তাহলে উনি এসব নিয়ে আলোচনা করতেন না। এগুলো হেসে উড়িয়ে দেবার মত ব্যাপার নয় মোটেই। 

স্কারলেটের মনে হল উনি মুখ টিপে হাসছেন। কখনও কখনও উনি জঘন্য আচরণ করেন। বলতে গেলে, বেশির ভাগ সময়ই ওঁর আচরণ জঘন্য। মেয়েরা কি ভাবে, কি কথা বলে, এই সব নিয়ে কৌতুহল ছেলেদের শালীনতার অভাবের পরিচয়। যেন এভাবে ওরা একজন মেয়েকে নগ্ন করে ফেলতে চায়। কোন রূচিসম্পন্ন মহিলাদের কাছ থেকে উনি নিশ্চয়ই এসব জানেননি। ওর অনুভুতি উনি বুঝতে পেরে যাওয়ায় মনে মনে বেশ বিরক্তই হল। পুরুষদের কাছে নিজেকে রহস্যময়ী হিসেবে তুলে ধরতেই ও পছন্দ করে। অথচ ও ভালই বুঝতে পারে রেট মনে করেন ও কাঁচের মতই স্বচ্ছ্ব। 

“যে কথা বলছিলাম,” উনি বলতে লাগলেন, “বাড়িতে কোন বয়স্ক লোক কিংবা অভিভাবক আছেন তো? মিসেজ় মেরিওয়েদার বা মিসেজ় মীডের মত প্রশংসনীয় কোন ব্যক্তিত্য? ওঁরা তো আবার আমাকে দেখলেই মনে করেন যে নিশ্চয়ই কোন অসদুদ্দেশ্যে এখানে এসেছি।” 

“মিসেজ় মীড সাধারণত রাত্রের দিকে চলে আসেন,” প্রসঙ্গ ঘুরে যেতে স্বস্তির নিঃশ্বা ফেলে স্কারলেট বলল। “আজ আসতে পারেননি। ফিল – ওঁর ছেলে বাড়ি এসেছে।” 

“কি ভাগ্য!” চটুল হেসে উনি বললেন। “তোমাকে একা পাওয়া গেল।” 

ওঁর কণ্ঠস্বরে এমন কিছু ছিল যে বুকের ভেতর একটা ভাল লাগার ঢেউ খেলে গেল আর মুখে রক্তিমাভা ছড়িয়ে পড়ল। পুরুষমানুষের এই কণ্ঠস্বর – ওর অভিজ্ঞতা বলে – প্রায়ই প্রেম নিবেদন করার পূর্বলক্ষ্মণ হয়ে থাকে। কি মজা! একবার যদি উনি বলে ফেলেন যে উনি ওকে ভালবাসেন, তাহলে ওঁকে হাতের মুঠোয় পাওয়া যাবে, আর তিন বছর ধরে করা সব শ্লেষোক্তির যথাযথ জবাব দেবে! ওঁকে এমন ঘুরিয়ে ছাড়বে যে ওর অ্যাশলেকে চড় মারার দৃশ্যের সাক্ষী হয়ে থাকার অপমানটা উশুল করে নেবে। তারপর খুব মিষ্টি করে বলবে, যে ও ওঁর বোনের মত, আর তারপর খুব সন্তোষজনকভাবে যুদ্ধ সমাপ্তি হবে। সুখ কল্পনায় বিভোর হয়ে ওর মুখে একটা ঘাবড়ে যাওয়া হাসি ফুটে উঠল। 

“আর হেসে কাজ নেই,” এই বলে উনি ওর হাতটা তুলে নিয়ে একবার উলটে দেখলেন, তারপর ঠোঁট দিয়ে তালুতে একটা চাপ দিলেন। সেই উষ্ণ ওষ্ঠের স্পর্শে, ওর মধ্যে একটা বিদ্যুৎ খেলে গেল, আর সেটা ওর সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ল। আস্তে আস্তে ওঁর ঠোঁট কব্জির কাছে চলে এল। ও বুঝতে পারল ওর ধমনীর রক্তপ্রবাহের চাঞ্চল্য উনি অনুভব করতে পারছেন। ও হাতটা সরিয়ে নিতে চাইল। ওর বিশ্বাসঘাতক অনুভুতি চাইছিল ওঁর মাথার চুলের ভেতর দিয়ে হাত চালিয়ে দিতে, ওঁর ওষ্ঠের স্পর্শ নিজের ওষ্ঠে নিতে। কিন্তু ব্যাপারটা তো ঠিক এরকম হবার কথা নয়! 

ওঁকে তো আর ভালবাসে না এই বলে নিজেকে প্রবোধ দিতে চাইল। ও তো অ্যাশলেকে ভালবাসে। কিন্তু এটা কেমন অনুভুতি যে ওর হাত কাঁপতে লাগছে আর পেটের ভেতর ঠাণ্ডা লাগছে? 

উনি মৃদু হাসলেন। 

“টানাটানি কোরো না। আমি তোমাকে কোন আঘাত দেব না!” 

“আঘাত দেবেন? রেট বাটলার আমি আপনাকে ভয় পাই না - কোন পুরুষমানুষকেই ভয় পাই না!” ও রেগে বলল। ওর গলা আর হাত দুটোই কেঁপে গেল। 

“প্রশংসনীয় মনোভাব, কিন্তু গলা একটু নামিয়ে। মিসেজ় উইল্কস শুনে ফেলতে পারেন। আর নিজেকে একটু সামলে নাও।” এমন ভাবে কথাগুলো বললেন, যেন ওর বিক্ষোভে উনি খুব মজা পাচ্ছেন। 

“স্কারলেট, আমাকে তুমি পছন্দ কর, তাই না?” 

এরকম একটা কথাই তো ও আশা করছিল শুনবার। 

“কখনো কখনো, বলতেই পারেন,” খুব সাবধান হয়ে জবার দিল। “মানে যখন আপনি জঘন্য আচরণ করেন না।” 

আবার মৃদু হেসে ওর হাতটা নিয়ে নিজের রুক্ষ গালের ওপর ঘষে দিলেন। 

“আমার কি মনে হয় জানো, আমি জঘন্য বলেই তুমি আমাকে পছন্দ কর। তোমার এই বাঁধাধরা জীবনে তুমি এত কম জঘন্য লোকের সংস্পর্শে এসেছ যে আমার অন্য ধরণের কথাবার্তায় তুমি একরকম নিষিদ্ধ আকর্ষণ বোধ কর?।” 

কথাগুলো ঠিক যেমন ধরণের হবে বলে মনে করেছিল, ঠিক সেরকম তো হচ্ছে না! আবার ও হাতটা ছাড়িয়ে নেবার ব্যর্থ চেষ্টা করল। 

“কথাটা মোটেই সত্যি নয়। আমি ভদ্রলোকই পছন্দ করি – যাঁদের ওপর নির্ভর করা যায় – যাঁরা সব সময় ভদ্রলোকের মত কথাবার্তা বলেন।” 

“তার মানে তুমি বলতে চাইছ এমন ধরণের লোক যাদের তুমি নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরাতে পার। সে তুমি এদের যে নামেই ডাক না কেন! কিছু এসে যায় না।” 

ওর হাতের তালুতে আবার চুম্বন করলেন। আবার ওর ঘাড়ের কাছে শিহরণ জাগল। 

“কিন্তু তাও তুমি আমাকে পছন্দ কর। আচ্ছা স্কারলেট, তুমি কি আমাকে কখনও ভালবাসতে পারবে?” 

“আহা,” স্কারলেট মনে মনে ভাবল, “এবার বাগে পাওয়া গেছে!” তারপর গলায় বেশ একটা শীতল ভাব এনে বলল, “নিশ্চয়ই না। মানে – যতক্ষণ না আপনি নিজেকে বেশ খানিক শুধরে নিচ্ছেন।” 

“কিন্তু নিজেকে শুধরে নেওয়ার কোন ইচ্ছেই আমার নেই। তার মানে আমাকে তুমি ভালবাসতে পারবে না? এটাই আমি আশা করেছিলাম। তোমাকে পছন্দ করলেও আমি তোমাকে মোটেই ভালবাসি না। তাই তোমার পক্ষে দুবার এক তরফা ভালবাসার শোক সামলানো বেশ মুশকিল হয়ে যেত। ঠিক বলেছি কি না, প্রিয়? আমি কি তোমাকে ‘প্রিয়’ মিসেজ় হ্যামিল্টন বলে ডাকতে পারি? তুমি পছন্দ না করলেও আমি মাঝে মাঝেই তোমাকে ‘প্রিয়’ বলে ডাকব, অবশ্যি শোভন অশোভন খেয়াল রেখে।” 

“আপনি আমাকে ভালবাসেন না?” 

“কখনোই না। কেন তুমি কি তাই ভেবেছিলে?” 

“বেয়াদবিটা একটু কম করুন!” 

“বুঝেছি, তুমি সেটাই আশা করেছিলে! কি দুঃখ, তোমার আশায় জল ঢেলে দিলাম! আমার উচিত ছিল, তোমাকে ভালবাসা – তুমি কত সুন্দরী আর কত নিরর্থক ব্যাপারে তোমার এত পারদর্শিতা। কি জানো তোমার মত এরকম অনেক লেডিই আছেন যাঁরা সুন্দরী আর পারদর্শি অথচ তোমার মতই অপদার্থ! না আমি তোমাকে ভালবাসি না। কিন্তু তোমাকে খুবই পছন্দ করি – যেহেতু সুবিধেমত তোমার বিবেককে তুমি বিসর্জন দিতেও পিছিয়ে যাওনা। তোমার স্বার্থপর স্বভাবে জন্য – যেটা তুমি লুকোনোর চেষ্টাই কর না। আর তোমার কুটিল বাস্তববোধের জন্য – যেটা মনে হয় হালের কোন আইরিশ পূর্বপুরুষ চাষীর কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে তুমি পেয়েছ।” 

চাষী! উনি ওকে অপমান করছেন কেন? শব্দ না করেও ওর মুখ নড়ে উঠল। 

“আমাকে বলতে দাও,” ওর হাত দুটোয় নিজের হাত দিয়ে একটু চাপ দিয়ে অনুরোধ করলেন। “আমি তোমাকে পছন্দ করি কারণ তোমার মধ্যে ঠিক সেই গুণগুলো রয়েছে যেগুলো আমারও আছে। সমমনোভাবাপন্ন লোকে একে অন্যকে পছন্দ করে। আমি জানি তুমি এখনও অ্যাশলের মত এক বেরসিককে খুব উঁচু আসনে বসিয়ে ওর স্মৃতিতে বিভোর হয়ে আছ। মনে হয় সে অন্তত গত ছ’মাস ধরে কবরে শুয়ে ঘুমোচ্ছে। কিন্তু তোমার হৃদয়ে আমার জন্যও একটু জায়গা রাখা উচিত। স্কারলেট, হাত ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা বন্ধ কর! একটা কথা তোমাকে জানাতে চাই। যেদিন প্রথমবার টুয়েলভ ওকসে তোমাকে দেখি সেদিন থেকেই আমি তোমাকে কামনা করে এসেছি। সেই যখন তুমি বেচারা চার্লস হ্যামিল্টনকে সম্মোহিত করছিলে। অন্য যে কোন মেয়ের থেকেও আমি তোমাকে বেশি কামনা করেছি – আর অন্য যে কোন মেয়ের থেকেও আমি তোমার জন্য অনেক বেশিদিন অপেক্ষা করেছি।” 

ওঁর শেষের কথাগুলো শুনে অবাক হয়ে ওর দমবন্ধ হয়ে এল। অপমান করলেও, উনি ওকে ভালবাসেন আর সে কথাটা উনি খোলাখুলি বলতে পারছেন না, পাছে ও হাসাহাসি করে। ঠিক আছে, ওঁকে বুঝিয়ে দিতে হবে – আর খুব তাড়াতাড়ি। 

“আপনি কি আমাকে বিয়ে করতে চাইছেন?” 

ওর হাতদুটো ছেড়ে দিয়ে উনি এত জোরে হেসে উঠলেন, যে ও চমকে উঠল। 

“হে ভগবান – আমি কি তোমাকে বলিনি – যে আমি বিয়ে করবার মানুষ নই?” 

“কিন্তু – কিন্তু – কি ____” 

ঊনি উঠে দাঁড়িয়ে, হাতটাকে বুকের কাছে নিয়ে পরিহাসচ্ছলে একবার ‘বাও’ করলেন। 

“প্রিয়তমে, আমি তোমার বুদ্ধিমত্তার প্রশংসা করে তোমাকে আমার ‘মিস্ট্রেস’ হবার আহ্বান জানাচ্ছি – অবশ্যই আমার তরফ থেকে তোমাকে কোনরকম পটানোর প্রচেষ্টা ছাড়াই।” 

“মিস্ট্রেস!” 

কথাটা মনের মধ্যে খুব জোর ধাক্কা দিল। পরের মুহুর্তেই অনুভব করল খুব জঘন্য ভাবে ও অপমানিত হয়েছে। কিন্তু কথাটা ওকে এতটাই হতবাক করে দিয়েছিল যে এক মুহুর্ত ওর মধ্যে কোনও অনুভুতিই কাজ করছিল না। এক অন্ধ রাগে ওর সারা শরীর জ্বলে যাচ্ছিল – উনি কি ওকে এতটাই আহম্মক মনে করেন? যদি তাই মনে না করেন, তাহলে বিবাহের পরিবর্তে এমন নোংরা প্রস্তাব কেমন করে দিতে পারেন? রাগ, অসম্মান আর হতাশায় ওর মনের মধ্যে একটা প্রচণ্ড আলোড়ন শুরু হল, যার ফলে, ওঁকে নৈতিক যুক্তিতে ভর্ৎসনা করার জায়গায় মুখ থেকে বেরিয়ে গেল – 

“মিস্ট্রেস! আমি কি পাব এর থেকে – এক পাল জারজ সন্তান?” 

কি বলে ফেলেছে যখন উপলব্ধি করতে পারল, তখন বিস্ময়ে ও হাঁ হয়ে গেল। রুমাল দিয়ে মুখ চেপে ধরে ও অন্ধকারে বসে রইল আর উনি ওর দিকে তাকিয়ে হাসতে হাসতে বিষম খেলেন। 

“এই জন্যই তো আমি তোমাকে এত পছন্দ করি! আমি যত মহিলাদের জানি, তাদের মধ্যে তুমিই একমাত্র খোলামেলা – বাস্তবসম্মত কথা বলে থাক – কি পাপ – কি নৈতিক – এসব দিয়ে তোমার ভাবনাচিন্তাকে আচ্ছন্ন করে ফেল না! অন্য কোন মেয়ে হলে প্রথমেই তো অজ্ঞান হয়ে পড়ত আর তারপর আমাকে সোজা রাস্তা দেখিয়ে ছাড়ত।” 

স্কারলেট পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়াল – অপমানে মুখ কালো। কি করে ও এমন কথা বলতে পারল? এলেনের মেয়ে হয়ে – ও কি করে বসে বসে ওই অপমানজনক কথা শুনতে পারল – ওর শিক্ষাদীক্ষার পরোয়া না করে? ওর চিৎকার করা উচিত ছিল। অজ্ঞান হয়ে যাওয়া উচিত ছিল। বারান্দা থেকে ঠাণ্ডা মাথায় উঠে চলে যাওয়া উচিত ছিল। এখন বড্ড দেরি হয়ে গেছে! 

“বেরিয়ে যান এখান থেকে এই মুহুর্তে,” খুব চেঁচিয়ে বলল, মেলানি জেগে যেতে পারে বা রাস্তার ওপার থেকে মিসেজ় মীড শুনতে পেয়ে যাবেন – সেসবের পরোয়া না করেই বলল। “কোথা থেকে আমাকে এসব বলার সাহস আপনি পেলেন? কি এমন করেছি আমি যে আপনি ভাবতে পারলেন ____ বেরিয়ে যান – আর কোনদিন এখানে আসবেন না – আর এবার এটার কোন নড়চড় হবে না! আর কখনও এখানে আসবেন না – আপনার ওই সমস্ত পিন আর রিবন সঙ্গে নিয়ে – এই ভেবে যে আমি আপনাকে ক্ষমা করে দেব! আমি – আমি বাপীকে বলব – আপনাকে উনি খুন করে ফেলবেন!” 

উনি টুপিটা তুলে নিয়ে ওকে একটা ‘বাও’ করলেন। লন্ঠনের আলোয় স্কারলেট গোঁপের ফাঁক দিয়ে ওঁর সাদা দাঁতের হাসির ঝিলিক দেখতে পেল। তার মানে এত কথা বলেও ওঁর কোন অনুশোচনা হয়নি, উলটে ওর কথায় উনি মজা পেয়েছেন! আর এখন ওকে অভিনিবেশ সহকারে লক্ষ করছেন। 

ওহ উনি খুবই জঘন্ন লোক! এক ঝটকায় ঘুরে গিয়ে ও ঘরে ঢুকে পড়ল। দড়াম করে দরজা বন্ধ করতে চাইল, কিন্তু যে ছিটকিনি দিয়ে দরজাটা খুলে রাখা ছিল, সেটা এত ভারী যে ও হাঁপাতে লাগল। 

“আমি তোমাকে সাহায্য করতে পারে?” উনি জিজ্ঞেস করলেন। 

আর একটু ওখানে দাঁড়িয়ে থাকলে ওর মাথা দিয়ে আগুন ছুটবে, তাই ও দপদপিয়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে গেল। শুনতে পেল, উনি আস্তে আস্তে দরজাটা টেনে বন্ধ করে দিলেন। 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন