বুধবার, ২৬ আগস্ট, ২০২০

সালমান রুশদি'র গল্প : ক্রিস্টোফার কলম্বাস এবং স্পেনের রাণী ইসাবেলা তাঁদের লিপ্সাতৃপ্তি করলেন


ভাষান্তরঃ উৎপল দাশগুপ্ত

কলম্বাস, একজন বিদেশী, অনন্তকাল ধরে রাণী ইসাবেলার অনুবর্তী হয়ে কাটিয়েছেন,
কামনা সম্পূর্ণরূপে কখনোই বিসর্জন না দিয়ে।
- তাঁর শরীরী ভাষার বৈশিষ্টগুলি কি প্রকার ছিল?

উদ্ধত অথচ সনির্বন্ধ আবেদকের ভূমিকায়, উচ্চশিরে কিন্তু নতজানু হয়ে। বশংবদ অথচ নির্ভীক। আচার আচরণে দুর্বিনীত অশ্লীলতা, কিন্তু আত্মপ্রত্যয়ের যাদুমন্ত্রে পরিত্রাণ পেয়ে থাকতেন।

অবশ্য, দিন যত গেছে, তাঁর কৃপাপ্রার্থীসুলভ চেহারাটাই বেশি জোরালো হয়ে উঠেছে, জলদস্যুসুলভ উচ্ছৃঙ্খলতা ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে। যেমন হাল হয়েছে তাঁর জুতোজোড়ার।

 তাঁর প্রত্যাশা। সেটা কিসের জন্য?

যেটা প্রত্যক্ষগোচর সেটার জবাব প্রথমে। প্রতিষ্ঠা লাভের ক্ষেত্রে অগ্রগণ্যতা। রাণীর আনুকূল্য তিনি তাঁর শিরস্ত্রাণে নিবন্ধিত করতে চান, নাইটরা প্রেমের উপন্যাসে যেমন করে থাকতেন। (ওঁর কোনও শিরস্ত্রাণ ছিল না।) তাঁর প্রত্যাশা ছিল নগদ অর্থ, আর তিনটি ঊর্ধকায় জাহাজ, নিনা পিন্তা, সান্তা মারিয়া; চৌদ্দশ
বিরানব্বইতে মহাসমুদ্রের নীলিমায় পাড়ি জমানো। অথচ, রাজসভায় ওঁর প্রথম আগমনের পর – যখন রাণী নিজে জানতে চেয়েছিলেন ওঁর অভিলাষ – রাণীর জলপাই রঙের হাতের ওপর ঝুঁকে পড়ে, এবং ক্ষমতার অঙ্গুরীয় পরিহিত অঙ্গুলির মাত্র এক নিঃশ্বাস দূর থেকে ওঁর ওষ্ঠে একটি মাত্র বিপজ্জনক শব্দবন্ধ উচ্চারিত হয়েছিল।

‘লিপ্সাতৃপ্তি।’
- এরা কথা বলার অযোগ্য বিদেশী! কি আস্পর্ধা! বলে কিনা, লিপ্সাতৃপ্তি! আনুকূল্য লাভে বঞ্চিত হবেন না ধরে নিয়েই, উনি মাসের পর মাস, রাণীর

অনুবর্তী হয়ে রইলেন। ওঁর অমার্জিত পত্রাবলী, উন্মুক্ত বাতায়নের অন্তরাল থেকে থেকে বেসুরো প্রেমের গান পরিবেশন, রাণী বাতায়ন বন্ধ রেখে শীতল বায়ু সেবনে বঞ্চিত থাকতে বাধ্য হয়েছিলেন। অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ই তাঁর মনযোগ আকর্ষণের দাবি রাখে – জয় করবার জন্য সমগ্র পৃথিবী পড়ে রয়েছে – এবং আরও কত কি! লোকটা নিজেকে কি মনে করে?

এই বিদেশি লোকগুলো খুব জেদি হয়। ভাষা সমস্যা থাকার জন্য ইশারাগুলোও ঠিক ঠিক ধরতে পারে না। দেশের স্বার্থে কিছু কিছু বিদেশিকে বরদাস্ত না করলেই নয়।

ওরা থাকলে শহরের একটা অসাম্প্রদায়িক চেহারা ফুটে ওঠে। এরা অনেকেই দরিদ্র হয়। ফলে এদের দিয়ে নানা ধরণের জরুরী অথচ নীতিবিগর্হিত কাজ করিয়ে নেওয়া যায়। এরা ঘাড়ের ওপর থাকলে আমরা আত্মসন্তুষ্টিতে মগ্ন হওয়া থেকেও সতর্ক থাকতে পারি। আমাদের মধ্যে এদের উপস্থিতি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় (যদিও ব্যাপারটা মেনে নেওয়া কঠিন) যে বেশ কিছু জায়গায় আমরাও বিদেশি হিসেবে
প্রতিপন্ন হতে পারি।

- তাই বলে রাণীর সঙ্গে এমন অশালীন কথাবার্তা!

 নিজেদের অবস্থান ভুলে যায় বিদেশিরা (নাকি সেই অবস্থান ছেড়ে আসার জন্যই)। ধীরে ধীরে ওরা নিজেদের আমাদের সমকক্ষ বলে মনে করতে শুরু করে। এ এক অনিবার্য বিপত্তি। আমাদের কঠোর মনোভাবকে লঘু করতে এরা ইতালীয় চাটুবাক্যের আমদানি করে। সেটা অবশ্য এমন কিছু ব্যাপার নয়। না শোনার ভান করলেই হল, মনযোগ না দিলেই মিটে যায়। ক্ষতি করার মনোভাব কমই থাকে, আর
বিশেষ বাড়াবাড়িও ক্বচিৎ কখনো করে। নিশ্চিন্ত থাকুন, রাণী নিজের ভাল মন্দ অনুধাবন করতে সক্ষম।

খুব শীঘ্রই ইসাবেলার সভায় কলম্বাস একজন মাথা পাগল লোক হিসেবে প্রতিপন্ন হলেন। তাঁর পোশাকপরিচ্ছদ ছিল অত্যধিক বর্ণময়, এবং তিনি ছিলেন মাত্রাতিরিক্ত

পানাসক্ত। সামরিক বিজয়লাভের পর এগারো দিন ধরে রাণী ইসাবেলা ঋত্বিকদের উচ্চনাদী কঠোর মন্ত্রোচ্চারণের মাধ্যমে উৎসব পালন করতেন। কলম্বাস প্রধান গির্জার বহির্ভাগে সুরার পাত্র নিয়ে উচ্ছৃঙ্খলভাবে পাকদণ্ডী কাটতেন। মাত্রাছাড়া লাম্পট্যের একক নিদর্শন।

- একবার দেখ লোকটাকে! মদ্যপ ; ঝাঁকড়া চুলো বিশাল মাথা ভর্তি কেবলই ছাইপাশ! বিদ্যমানতার পশ্চিমতম প্রান্তে কনকময় নন্দনকাননের দিবাস্বপ্নে নিমজ্জিত থাকা চকচকে চোখের এক আহম্মক।

‘লিপ্সাতৃপ্তি।’
রাণী কলম্বাসকে খেলাতে শুরু করলেন।

মধ্যাহ্নভোজের সময় কল্পতরু হয়ে তাঁর যাবতীয় প্রত্যাশা পূরণের প্রতিশ্রুতি দিলেন, আবার সেদিন বিকেলেই মর্মভেদী দৃষ্টিপাতে তাঁকে অনাবৃত করে অতলান্ত হতাশায় নিক্ষেপ করলেন।

এক পরবের দিনে রাণী কলম্বাসকে তাঁর খাসকামরায় তলব করে, পরিচারিকাদের বিদায় করে, ওঁকেই কেশের কবরী রচনা করার অনুমতি দিলেন, এবং অল্পক্ষণের জন্য স্তন স্পর্শ করারও। পরক্ষণেই প্রহরীদের ডেকে এনে ওঁকে গলাধাক্কা দিয়ে বের করিয়ে, আস্তাবল আর শুয়োরের খোঁয়াড়ে চল্লিশ দিনের জন্য নির্বাসনের হুকুম জারি করলেন।

ভগ্নহৃদয়ে অশ্বচর্বিত খড়ের ওপর বসে থেকেও কলম্বাসের মন অনাসন্ন স্বর্ণালি মরীচিকার আনাচে কানাচে ঘোরাফেরা করছিল। স্বপ্নে রাণীর দেহনির্গত সৌরভ অনুভব করেন, জেগে ওঠেন শুয়োরের খোঁয়াড়ের অবরুদ্ধতায়। কলম্বাসকে হেলাফেলা করে রাণী পরিতৃপ্তি লাভ করেন।

রাণীর পরিতৃপ্তি লাভ – মনে মনে নিজেকে স্মরণ করিয়ে দেন কলম্বাস – তাঁর উদ্দেশ্য সিদ্ধ হওয়ার পক্ষে সহায়ক হবে। শুয়োরগুলো ঘোঁত ঘোঁত করে ওঁর পায়ের ওপর দিয়ে চলে যায়। উনি দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করেন।

‘রাণীর পরিতৃপ্তির পরিণাম ভালই হবে।’

কলম্বাস ভেবে দেখলেনঃ
কেবল খেলার পুতুল মনে করেই কি রাণী তাঁকে উৎপীড়ন করেন?

নাকি উনি বিদেশি তাই! ওঁর আদবকায়দা কিংবা অর্থবহ ইঙ্গিত রাণীর পছন্দ নয় বলে? অথবা অনামিকায় সেই চুম্বন, সেই নিঃশ্বাস – কি ভাবে বলা যেতে পারে – স্পর্শ করার স্মৃতি এখনও মলিন না হওয়ার কারণে? অনামিকা থেকে সেই ঊষ্ণতা নিশ্চয়ই ওঁর হৃদয় পর্যন্ত প্রসারিত হয়ে একটা আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।

অথবা ওঁর পরিকল্পনাকে একজন প্রেমিকার প্রশ্রয়ে গ্রহণ করা উচিত না প্রচলিত পন্থা এবং যেটা অধিক তৃপ্তিদায়ক (বিদ্বেষপূর্ণভাবে) সম্ভাবনা হিসেবে সুপরিকল্পিত ছলনার মাধ্যমে তাঁকে সম্পূর্ণভাবে বিনষ্ট করা এবং পরিশেষে তাঁর কৃপাপ্রার্থীসুলভ নির্বোধ সত্ত্বাকে পরিহাস করা উচিত – এই দুটো সম্ভাবনার মধ্যে থেকে কোনটা নির্বাচন করা হবে সেটা নিয়ে রাণীর মনে টানাপোড়েন চলছে?

নানা রকম সম্ভাবনা নিয়ে মনে মনে আলোচনা করে কলম্বাস নিজেকে প্রবোধ দিতে চাইলেন। তবে সব সম্ভাবনাই যে প্রবোধ দিতে সক্ষম তাও নয়।

ওঁকে বলা যেতে পারে একজন স্বৈরাচারী রাজ্ঞী। (ওঁর পতিদেব স্বৈরহীন, পরাক্রমশূন্য নপুংসক, ধোকার টাটী। ওঁর ব্যাপারে আমরা আর কিছুই বলতে চাই না।) অঙ্গুরীয়তে চুম্বন ওঁকে অনেকেই করে থাকে। সেই খণ্ড মুহুর্তের আবেদন ওঁর মনে সাড়া জাগিয়েছে সেটা মনে হয় না। চাটুবাক্য শুনতেও উনি অভ্যস্ত। অনায়াসে সেই প্রলোভন থেকেও নিজেকে রক্ষা করতে পারেন।

উনি স্বেচ্ছাচারী। চারশ উনিশ জন মহামূর্খ মানুষের সমষ্টিকে উনি নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন। এদের অর্ধেকই হাস্যকরভাবে কদাকার, বাকি অর্ধেক প্রত্যুষের মতই মনোহর। কলম্বাস নিজে হলেন রাণীর চারশ কুড়িতম আহম্মক। সেটাকেও এক ধরণের বিশ্বাসযোগ্য সম্ভাবনা বলে ধরে নেওয়া যায়।

হয় রাণী ওঁর দৃশ্যমান পৃথিবীর সীমানা অতিক্রম করে যাওয়ার ইচ্ছে অনুধাবন করতে পারেন। ব্যাপারটা ওঁকে এত গভীরভাবে বিচলিত করে যে উনি আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। ফলে কখনোসখনো প্রলুব্ধ হলেও, পরমুহুর্তেই পিছিয়ে যান।

আর নয়ত রাণী হয়ত ওঁকে বুঝতেই পারেন না, বা বোঝবার প্রয়োজনও বোধ করেন না।

“এবার তুমিই বেছে নাও কোন সম্ভাবনাটা সঠিক!”

একটা ব্যাপারে কলম্বাস নিঃসন্দেহ যে রাণীর মনের জটিলতা উনি কিছুই বুঝতে উঠতে পারেননি। জলের মত যেটা পরিস্কার সেটা হল, উনি হলেন প্রবল পরাক্রমশালী রাণী ইসাবেলা। আর কলম্বাস হলেন রাণীর জীবনের অন্তরালবর্তী (যদিও কর্কশ, অস্থিরচিত্ত, মদ্যপ) পুরুষ মানুষ।

‘লিপ্সাতৃপ্তি।’

বয়োবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে পুরুষ মানুষের যৌনলিপ্সা হ্রাস পেতে থাকে, কিন্তু নারীর ক্ষেত্রে ক্রমবর্ধমান। ইসাবেলা হচ্ছেন কলম্বাসের অন্তিম আশা। ওঁর সাম্ভাব্য অনুগ্রহকারীর সংখ্যা ঘাটতির দিকে, পণ্য বিপণন সম্বন্ধে কথাবার্তা স্তব্ধ হওয়ার মুখে, ছলপ্রণয় চালিয়ে নেওয়ার প্রত্যয়, কেশরাশি, এবং উদ্দীপনা ক্রমহ্রাসমান।

দিনের পরে দিন কেটে যায়।

রাণী ইসাবেলার লম্ফ ঝম্ফ, বিজয় যাত্রা, মূরদের তাদের শক্ত ঘাঁটি থেকে উচ্ছেদ করা নিরন্তরভাবে চলতে থাকল। দিনে দিনে রাণীর বিজিগীষা বেড়েই চলে। যত রাজ্য জয় করেন ততই বেশি সৈনিককে নিজের বশ্যতা স্বীকারে বাধ্য করেন, এবং তাঁর উচ্চাশা বাড়তেই থাকে। কলম্বাস ভেতরে ভেতরে এক মোচড়ানো ব্যথা অনুভব করতে থাকেন, নিজেই নিজেকে তিরস্কার করেন। পরিস্থিতি যা সেটা ওঁর মেনে নেওয়া উচিত।

বাহ্যজ্ঞান ফিরে আসা দরকার। কতটা সুবিধে করতে পারবেন এখানে? অনেকদিন রাণী ওঁকে দিয়ে পায়খানাও পরিস্কার করান। আবার কখনো দেন শরীর প্রক্ষালনের দায়িত্ব।

যুদ্ধ থেকে ফিরে আসা শরীরগুলো মোটেই পরিস্কার থাকে না। যুদ্ধে যাবার সময় সৈন্যরা বর্মের নীচে পূর্ণবয়স্কদের ডায়াপার পরে যায়। ওদের আশঙ্কা মৃত্যুভয়ে হয়ত ওদের পেট খারাপ হয়ে যেতে পারে। প্রতিবার তাই হয়ও। কলম্বাস এই ধরণের কাজে মোটেও অভ্যস্ত নন। নিজেকে বোঝাতে থাকেন ইসাবেলাকে চিরদিনের মত ত্যাগ করে চলে যাওয়া উচিত।

কিন্তু সমস্যা আছে। বয়স হয়ে গেছে তাঁর। যথেষ্ট পৃষ্ঠপোষকের অভাব। একবার পালিয়ে গেলে, পৃথিবীর পশ্চিমতম প্রান্তের উদ্দেশে সমুদ্রযাত্রা করার আকাঙ্খা চিরতরে বিসর্জন দিতে হবে। দার্শনিকদের জীবনকে অর্থহীন আখ্যা দেবার প্রস্তাব উনি কখনও মনে থেকে গ্রহণ করতে পারেননি। একজন কর্মবীর উনি, ক্রিয়াকলাপের মধ্য দিয়েই নিজেকে দৃষ্টিগোচর করে থাকেন। অথচ এই পশ্চিমযাত্রা সফল না হলে তাঁকে জীবনের অর্থহীনতাকেই মেনে নিতে হবে। এটাও এক ধরণের পরাজয়। ক্রান্তীয় বর্ণালির উগ্রতায় নিজেকে প্রচ্ছন্ন রেখে, প্রতিদানের প্রত্যাশা না করে, কলম্বাস একগুঁয়ের মত রাণীর পদাঙ্ক অনুসরণ করে চললেন, যদি তাঁর কৃপাদৃষ্টিতে অভিষিক্ত হতে পারেন। 

“অর্থ এবং আনুকূল্যের অন্বেষণ,” কলম্বাস ভাবেন, “আর প্রকৃত প্রেম খুঁজে পাওয়া,
এই দুয়ের মধ্যে তেমন কোনও তফাৎ নেই।”

- তিনি সর্বশক্তিমান। রাজপ্রাসাদের পর রাজপ্রাসাদ তাঁর পদতলে লুটিয়ে পড়ে।

ইহুদীরা বহিষ্কৃত। চুড়ান্ত আত্মসমর্পণের জন্য মূর জাতি প্রস্তুত হচ্ছে। রাণী এখন গ্র্যানাডায়, তাঁর সৈন্যবাহিনীর পুরোভাগে।

= সর্বত্রই রাণীর পূর্ণগ্রাসের করাল ছায়া। তাঁর ঈপ্সিত বস্তু কখনোই প্রত্যাখ্যাত হয় না।
- তাঁর প্রত্যেক স্বপ্নই ভবিষ্যদ্বাণী।
= স্বপ্নে পাওয়া নির্দেশ অনুযায়ী তিনি সমস্ত সমর পরিকল্পনা রচনা করেন। ঘাতকের ষড়যন্ত্র নির্মূল করেন। অনুগামী এবং প্রতিপক্ষের বিশ্বাসঘাতকতা এবং দুর্নীতির আভাস পেয়ে তাদের ব্ল্যাকমেল করেন (যাতে তারা বিরুদ্ধাচরণ করার সাহস না পায়)। স্বপ্ন তাঁকে আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেয়, চুক্তি নিষ্পাদনে সাহায্য করে। বাণিজ্যিক বিনিয়োগে বিচক্ষণতার পরিচয় দেন।

- ঘোড়ার মত আহার করতে পারেন, কিন্তু স্থুলকায়া হয়ে পড়েন না।
= পৃথিবী তাঁর পদধ্বনির বন্দনা করে। তাঁর চোখের উজ্জ্বল দিপ্তিতে অন্ধকার দূরে সরে যায়।
- এক সমুদ্র কেশরাশি মধ্য থেকে জেগে ওঠা এক উপদ্বীপের মত সতেজ তাঁর মুখমণ্ডল।
= তাঁর কোষাগারতুল্য বক্ষ অব্যয়।
- প্রশ্নচিহ্ন স্বরূপ তাঁর কোমল কর্ণদ্বয় অনিশ্চয়তার দ্যোতক।
= তাঁর পদযুগল।
- তাঁর পদযুগল তেমন বিশিষ্ট নয়।
= তিনি অপ্রসন্নতার শিকার।
- কোনও বিজয়ই ওঁকে প্রসন্ন করতে পারে না। চরম পুলকিত অবস্থাতেও তিনি পরমানন্দ স্পর্শ করতে পারেন না।
= আলহাম্ব্রার তোরণদ্বারের দিকে তাকাও – ভাগ্যহীন বোবডিল – স্পেনে কয়েক শতাব্দীর আরব সাম্রাজ্যের শেষ সুলতান এবং দুর্গাধীশ। আর ওই দেখ দুর্গের

চাবির গোছা রাণীর হাতে উনি এই মুহুর্তেই তুলে দিচ্ছেন! সেই ভারি চাবির গোছা যেই ওঁর হাত থেকে রাণীর হাতে গিয়ে পড়ল – রাণী একটা হাই তুললেন।

কলম্বাস আশা পরিত্যাগ করলেন।

যখন ইসাবেলা উদাসীনভাবে বিজিত আলহাম্ব্রায় প্রবেশ করছিলেন, সেই সময় কলম্বাস তাঁর খচ্চরে জীন পরানোয় ব্যস্ত ছিলেন। রাণী যখন আলসভরে সিংহদের প্রাঙ্গন পরিভ্রমণ করছিলেন, তখন কলম্বাস অসংখ্য চাবুক কনুই আর খুরের দ্রুত আন্দোলনে উদ্ভুত ধুলোর মেঘ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন।

অদৃশ্যমানতা তাঁকে গ্রাস করে ফেলল। পরিস্থিতির অনিবার্যতায় নিজেকে সমর্পণ করে দিলেন। জেনে বুঝেই তিনি ভাগ্যকে নিয়তির হাতে ছেড়ে দিলেন। নিষ্ফল ক্রোধে তিনি ইসাবেলাকে পরিত্যাগ করে চললেন। খচ্চরের পিঠে চেপে দিন রাত এক করে চলতেই থাকলেন। তারপর যখন খচ্চরটা মরে গেল, ওঁর তালি লাগানো হাস্যকর যাযাবর ঝোলা কাঁধের ওপর ফেলে হাঁটতে লাগলেন। ধুলো আর ব্যবহারে সেই ঝোলার উগ্রবর্ণ চাপা পড়ে গেছে।

পথের দু’পাশে রাণীর সেনাবাহিনীর দ্বারা পদানত উর্বর সমভূমি। জমির উর্বরতা কিংবা জনমানবহীন সদ্য পদানত সুউচ্চ অট্টালিকাশ্রেণী – কলম্বাস কোনো কিছুই লক্ষ্য করছিলেন না। এক সভ্যতার প্রেতাত্মা সবার অলক্ষ্যে বয়ে চলেছে গুয়াডালথিস আর গুয়াডালথ্যাট নামের দুই নদীর জলের ধারা বেয়ে বিলুপ্ত অতীতের অনুরণন তুলে।

মাথার ওপরে অসীম ধৈর্য নিয়ে পাক খেয়ে চলেছে বাজপাখিরা। ডানা দুপাশে বিস্তার করা, পা ছড়িয়ে দেওয়া পেছন দিকে। দৃষ্টি তাদের নিম্ন অভিমুখী।

লম্বা সারি বেঁধে ইহুদীরা কলম্বাসের পাশ দিয়ে চলে যায়। এদের উচ্ছেদ হবার বেদনা কলম্বাসের মনে কোনও দাগ কাটে না। একজন তাঁকে টোলেডোর তরবারি বিক্রি করবার চেষ্টা করে, তিনি ইশারায় ওকে চলে যেতে বলেন। নিজস্ব জাহাজের স্বপ্নভঙ্গ হয়ে

যাওয়ার বেদনা বুকে নিয়ে কলম্বাস ইহুদীদের ক্যাডিজ় পোতাশ্রয়ে অপেক্ষমান জাহাজে চেপে নির্বাসিত হবার জন্য ফেলে রেখে এগিয়ে যান।

অবসাদে কলম্বাসের সমস্ত অনুভূতি লোপ পেয়ে গেছে। পুরোনো এই পৃথিবী অতি বৃদ্ধ, আর নতুন পৃথিবী অনাবিষ্কৃতই রয়ে গেল।

“আর্থিক ক্ষতি আর পৃষ্ঠপোষক খোয়ানো,” কলম্বাস ভাবেন, “ব্যর্থ প্রেমের বেদনার
মতই নির্মম।”

অবসাদ অগ্রাহ্য করে, সহনশীলতার সীমা অতিক্রম করে তিনি হেঁটে চলেন। পথের প্রান্তে কোনও নাম না জানা জায়গায় তিনি ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন, অপ্রকৃতিস্থ মানসিকতায় জীবনে তিনি প্রথমবার এবং কেবল একবারের জন্য এক অলীক দর্শন করেন।

একটা স্বপ্নের স্বপ্ন।

স্বপ্নে ইসাবেলাকে অলস পদক্ষেপে আলহাম্ব্রা পরিদর্শন করতে দেখলেন। সেই মূল্যবান রত্ন যা তিনি সর্বশেষ নাসরিড বোডবিলের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়েছেন।

প্রস্তরনির্মিত সিংহরা বড় আকারের একটা প্রস্তরনির্মিত পাত্রকে শূন্যে ধরে আছে – রাণীর দৃষ্টি সেদিকে। শোণিতপূর্ণ সে পাত্র। সেই পাত্রে রাণী দেখতে পান – অর্থাৎ কলম্বাসের স্বপ্নে দেখতে পান রাণী – নিজেরই স্বপ্নের সার্থকতা।

পাত্র তাঁকে দেখিয়ে দেয় যে সর্বস্ব – বিদিত পৃথিবীর সব কিছুই – এখন তাঁর। যারা এখানে আছে, যা কিছু এখানে আছে, সবই তাঁর হাতের মুঠোয়। এদের নিয়ে উনি যা খুশি করতে পারেন। ব্যাপারটা যেই উনি অনুধাবন করলেন – মানে কলম্বাসে স্বপ্নে যা দেখতে পেলেন সেই মত – রক্তটা জমাট বাঁধতে শুরু করল, ঘন হতে হতে কীটাদিপরিপূর্ণ কর্দমে পরিণত হল। কলম্বাসের ক্লান্ত অথচ প্রতিহিংসাপরায়ণ কল্পনায়, রাণী শিহরিত হয়ে উঠলেন এটা বুঝতে পেরে যে বিদিত পৃথিবীর সব কিছু দখল করলেও তিনি
কোনোভাবেই – কখনোই – কস্মিনকালেও পরিপূর্ণ সন্তোষ লাভ করতে পারবেন না।

হয়ত অজানা কিছু – এমনকি এমন কিছু যাকে জানা যায় না – একমাত্র সেটাই তাঁকে পূর্ণ পরিতৃপ্তি দিতে পারে।

সঙ্গে সঙ্গে কলম্বাসের কথা তাঁর মনে পড়ে গেল (কলম্বাস কল্পনায় দেখতে পেলেন যে রাণীর তাঁকে মনে পড়ল)। কলম্বাস – অদৃশ্য সেই মানুষ যিনি অগোচরে থাকা সেই পৃথিবীতে প্রবেশ করবার স্বপ্ন দেখেছিলেন, বিদ্যমানতার পশ্চিমতম প্রান্তে যার অবস্থান। নৈমিত্তিক প্রস্তরপাত্র ছাড়িয়ে, জমাট বাঁধা শোণিতের সমুদ্র অতিক্রম করে। কলম্বাসের সেই বেদনাদায়ক স্বপ্নে রাণী ইসাবেলা তাঁর প্রকৃত মনোবাঞ্ছা
হৃদয়ঙ্গম করতে পারলেন। বুঝতে পারলেন কলম্বাসের তাঁকে যতটা প্রয়োজন ঠিক ততটাই তাঁর কলম্বাসকে প্রয়োজন। হ্যা! এতদিনে তিনি বুঝতে পেরেছেন সে কথা!

কলম্বাসকে অর্থ, জাহাজ, যা কিছু ওঁর প্রয়োজন সব কিছু দেওয়া উচিত। রাণীর ধ্বজা উড়িয়ে এবং তাঁর অনুগ্রহ নিয়ে কলম্বাসের পৃথিবীর শেষ সীমানা অতিক্রম করে খ্যাতি আর অমরত্বের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছে যাওয়া উচিত। তাঁর আর কলম্বাসের মেলবন্ধন এমন এক অবিনশ্বরতা লাভ করুক শারীরিক প্রেমের অনেক ঊর্ধে যার স্থিতি, এমন কোনও শক্তি নেই যা তাকে বিলীন করতে পারে – গভীর, দেবত্বারোপিত এক ঐতিহাসিক মেলবন্ধন।

‘লিপ্সাতৃপ্তি।‘

কলম্বাসের অমার্জিত স্বপ্নে রাণী নিজের চুল ছিঁড়তে লাগলেন, সিংহপ্রাঙ্গন থেকে ছুটে বেরিয়ে গেলেন, চিৎকার করে দূতদের ডাকাডাকি করতে লাগলেন।

“খুঁজে বের কর ওকে!” হুকুম জারি করলেন।

স্বপ্নের মধ্যে কলম্বাস তাঁকে খুঁজে বের করতে দিতে চাইলেন না। ধূলাধূসরিত আলখাল্লাটা দিয়ে নিজেকে আপাদমস্তক মুড়ে অদৃশ্য হয়ে রইলেন। দূতেরা এখানে সেখানে পাগলের মত খোঁজাখুঁজি করতে লাগল।

ইসাবেলা চেঁচামেচি করলেন, মিনতি করলেন, সনির্বন্ধ অনুরোধ করলেন।

শয়তানি! হারামজাদি! এবার দ্যাখ, কেমন লাগে! কলম্বাস টিটকারি দিলেন। রাজসভায় হাজিরা না দিয়ে, নিজেকে এরকম চূড়ান্ত আত্মঘাতী প্রচ্ছন্নতায় রেখে, রাণীকে তাঁর মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হওয়া থেকে বঞ্চিত তো করতে পারলেন! বেশ হয়েছে! হারামজাদি!

ওঁর তামাম স্বপ্নকে টুঁটি টিপে মেরে ফেলেছে! মেরে ফেলা ছাড়া আর কি? তার জন্য যতটা নীচে নামা যায়, নেমেছে! কৃতকর্মের ফল ভোগ কর এখন! শঠে শাঠ্যং!


----


স্বপ্নের একেবারে শেষে পৌঁছে কলম্বাস অবশ্য রাণীর দূতদের তাঁকে খুঁজে পাওয়ার সুযোগ দিলেন। অশ্বচালনা করে ওদের হন্যে হয়ে দৌড়োদৌড়ি। অনুনয় বিনয় থেকে শুরু করে, তোষামোদ এমনকি উৎকোচেরও লোভ দেখাতে লাগল। এখন অনেক দেরি হয়ে গেছে! এখন নিজেকে ক্ষতবিক্ষত করেও, সমস্ত সম্ভাবনাকে বিনাশ করে সুমধুর প্রতিশোধের আনন্দ উপভোগ করার সময়।

দূতদের জানিয়ে দিলেন। মাথা ঝাঁকিয়ে।

“না!”

স্বপ্ন ভেঙে গিয়ে বাস্তবে ফিরে এলেন তিনি।

উর্বর জমিতে হাঁটু গেড়ে বসে আছেন। মৃত্যুর প্রতীক্ষা। ঘোড়ার খুরের শব্দ। তাঁর দিকে এগিয়ে আসছে। চোখ তুলে দেখলেন। একটা অস্পষ্ট আশঙ্কা – হয়ত মৃত্যুদূতেরা ওঁকে বন্দী করে নিয়ে যেতে এসেছেন। বিজয়গর্বে। মসীবর্ণ পক্ষ বিস্তার করে, একঘেয়েমির উদাসীনতায়।

ইসাবেলার দূতেরা ওঁকে বেষ্টন করে ফেলল। খাদ্য পানীয় এমনকি একটা অশ্ব পর্যন্ত তাঁকে প্রদান করল। সকলে সমস্বরে কথা বলতে শুরু করল।

- ভীষণ ভাল খবর! রাণীমা আপনাকে এত্তেলা দিয়েছেন।

= আপনার সমুদ্রযাত্রাঃ চমৎকার খবর আছে।


- রাণীমা স্বপ্নাদিষ্ট হয়েছেন। স্বপ্ন দেখে উনি শঙ্কিত হয়েছেন।
- তাঁর প্রত্যেক স্বপ্নই ভবিষ্যদ্বাণী।
অশ্ব থেকে নেমে এল দূতেরা। অনুনয় বিনয় থেকে শুরু করে, তোষামোদ এমনকি
উৎকোচেরও লোভ দেখাতে লাগল।
- আপনার নাম ধরে চেঁচাতে চেঁচাতে উনি সিংহপ্রাঙ্গন থেকে ছুটে বেরিয়ে গেছিলেন।
= বিদিত পৃথিবীর প্রস্তরপাত্র ছাড়িয়ে, জমাট বাঁধা শোণিতের সমুদ্র পেরিয়ে,
বিদ্যমানতার পশ্চিমতম প্রান্তে থাকা সেই বিশ্বে উনি আপনাকে পাঠাবেন।
- সান্তা ফে’তে উনি আপনার প্রতীক্ষায় আছেন।
= কালবিলম্ব না করে আপনি চলুন।

প্রতিদত্ত প্রেমিকের মতন উনি উঠে দাঁড়ালেন। বিবাহের উদ্দেশ্যে যাত্রার জন্য প্রস্তুত বরের মতন। কিছু বলবার জন্য মুখ খুললেন। তীব্র বেদনায় মুখ থেকে প্রত্যাখ্যানের শব্দ প্রায় বেরিয়ে এলঃ না।

“হ্যা,” দূতদের উদ্দেশ্যে বলে উঠলেন। হ্যা। আমি যাব।
-----------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------


লেখক পরিচিতঃ সালমান রুশদী – স্যর আহমেদ সালমান রুশদী (জন্ম ১৯ জুন ১৯৪৭)
জন্মসূত্রে ভারতীয় একজন ব্রিটিশ উপন্যাসকার এবং প্রাবন্ধিক। ওঁর দ্বিতীয়
উপন্যাস মিডনাইট’স চিল্ড্রেন ১৯৮১ সালে বুকার প্রাইজ় দ্বারা সম্মানিত হয়। ওঁর
চতুর্থ উপন্যাস দ্য স্যাটানিক ভার্সেস প্রকশিত হবার পর যথেষ্ট বিতর্ক তৈরি করে।
ওঁর অনেক উপন্যাসই ভারতীয় উপমহাদেশের পটভূমিকায় লেখা। ওঁর অনেক লেখাই
ঐতিহাসিক ঘটনার সঙ্গে জাদুবাস্তববাদের মিশেল দিয়ে লেখা। বর্তমান গল্পটা “ইস্ট-
ওয়েস্ট” নামে একটা ছোটগল্প সঙ্কলন থেকে নেওয়া।

২টি মন্তব্য:

  1. অত্যন্ত ভালো লাগলো, ভাষান্তর করার পরেও মূল রচনার অন্তর্নিহিত সুরটা বজায় আছে বলেই মনে হলো যদিও মূল রচনাটা আমি পড়িনি I একটা অদ্ভুত সম্পর্ক, যার আকর্ষণী ক্ষমতা, কথার জাল ভেঙে, ভাষার গন্ডি পেরিয়ে মনকে নাড়া দিতে সমর্থ হলো I

    উত্তর দিনমুছুন