রবিবার, ৮ নভেম্বর, ২০২০

অনিন্দিতা গোস্বামীর গদ্য : কেনো লিখি, কী লিখতে চাই



কেন লিখি এই অমোঘ প্রশ্নটির সঠিক উত্তর আমার কাছে নেই। কারন লেখা কি, লেখক কাকে বলে এসব বুঝে ওঠার অনেক আগে থেকে লিখবার ইচ্ছা আমার মস্তিষ্কে প্রোথিত হয়ে গিয়েছিল। সে অনেক কাল আগেকার কথা, মা যখন ঠাকুরমার ঝুলি থেকে গল্প পড়ে শোনাতেন, ভূত প্রেত দৈত্য দানো, নীল পরী লাল পরী, রাজা রানির, এক মায়া জগতের মধ্যে আমি যেন চলে ফিরে বেড়াতাম। সব আমার চোখের সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠত। আমি অবাক হয়ে বইটার গায়ে হাত বুলাতাম, এর মধ্যে এত কিছু আছে! কিন্তু ঐ বইটার মধ্যে গল্পগুলো ভরে দিল কে? মা যখন পড়ছে তখন নিশ্চয়ই মা। এমনই একটা ধারনা ছিল মনে মনে।

রবিবার হলেই আমি চলে যেতাম মামাবাড়ি। সেখানে আমার প্রধান কাজই ছিল দাদুর কাছে গল্প শোনা। দাদু মানে মায়ের বাবা, ছিলেন ইংরেজির শিক্ষক। তার কাছে ছিল দেশ-বিদেশের নানান গল্পের ঝুলি। রামায়ণ মহাভারত, ইলিয়াড ওডিসি, মস্ত বড়ো কাঠের ঘোড়ার পেটের ভেতরে লুকানো সৈন্যদের গল্প, সাইলকের গল্প, মিরান্দার গল্প, গাধার দুধ দিয়ে স্থান করা ক্লিয়োপেট্রার গল্প, আবার তার সঙ্গেই দাদু জুড়ে দিতেন আধুনিক কল্প বিজ্ঞান, স্টারওয়ার, দেশভাগের গল্প কিম্বা তার নিজের ছেলেবেলার গল্প। আমি অবাক হয়ে প্রশ্ন করতাম এই সব গল্পগুলো বইয়ে লেখা আছে? ঘাড় নাড়তেন দাদু, কিছু আছে কিছু নেইও। সব কি আর বইয়ে লেখা থাকে? মানুষের মনেও থাকে অনেক গল্প। আমি মনে মনে ঘাড় ফুলিয়ে বলতাম, আমি সব লিখবো, এই সব গল্পগুলো আমি লিখে রাখব। 

সন্ধ্যে বেলা দিদা যখন গান গাইতেন, বলরে জবা বল, কোন সাধনায় পেলি শ্যামা মায়ের চরণতল, তখন কেমন একটা কষ্ট গুটিসুটি মেরে দলা পাকিয়ে ঢুকে যেত বুকের মধ্যে। পাহাড় ঘুমায় ওই, আকাশে হেলান দিয়েএ,এই সব গানগুলোর মধ্যে কষ্ট কোথায় আছে আমি জানতাম না কিন্তু আমার কষ্ট হতো, কেমন যেন কান্না পেত। রাতে ছাদে মাদুর পেতে শুলে মনে হতো দূর আকাশের তারাগুলো আমাকে ডাকছে।

এমনি করেই আস্তে আস্তে বড় হয়ে গেলাম। সুকুমার রায়ের অসংখ্য ছড়া, রবীন্দ্রনাথ, নজরুলের কবিতা টকটক করে আবৃত্তি করি তখন। রেডিওতে শুনি অনুরোধের আসর। এই রোকো রোকো পৃথিবীর গাড়িটা থামাও, আমি নেমে যাব, গানটা শুনলেই চমকে দাঁড়াই। তাই তো কোথা থেকে কোথায় নামবে লোকটা, পৃথিবীতো গোল!

বৃষ্টির জল জমে বাড়ির উঠোনে, আমি কাগজের নৌকা ভাসাই, বাগানে আপন মনে ঘুরে বেড়াই আর গাছ লতা পাতা সঙ্গে একা একাই বকবক করি, ওদের গল্প বলি। দাদুর কাছ থেকে শোনা গল্পের মধ্যে আমি মিশিয়ে দিই নিজের তৈরী গল্প। কিন্তু চুপিচুপি লিখতে গেলেই দেখি পেন্সিলের আগায় সব কথা ভ্যানিস! কি মুশকিল! এদিকে স্কুলে ম্যাগাজিন বেরব, সবাইকে কিছু না কিছু লিখে জমা দিতে হবে। তার মধ্যে বেস্ট দু তিনটে ছাপা হবে। প্রেস্টিজকা শওয়াল। কি লিখি কি লিখি, দুম করে আমার মাথার মধ্যে কে যেন বলে দিল কয়েকটা লাইন। বেশ মজা তো! লিখে ফেললাম ছড়টা তারপর জমা দিয়ে দিলাম। ওম্মা কী আনন্দ, ক্লাস থ্রি-র তিনটে লেখার মধ্যে আমার লেখাটাও আছে। আমাদের স্কুলটা বারো ক্লাস পর্যন্ত, বড়ো বড়ো দিদিরা গাল টিপে আমায় বলে যেতে লাগল কী সুন্দর হয়েছে রে তোর ছড়াটা। কিন্তু আমি তো জানি ঐ ছড়াটা আমি নিজে লিখিন, কে জেনো আমাকে বলে দিয়েছিল। তবে এসব কথা আমি কাউকে বলিনা। 


ভাই বোনকে নিয়ে মা যত ব্যস্ত হয়ে যেতে লাগল তত যেন আমি একা হয়ে যেতে লাগলাম। ততদিনে বই পড়তে শিখে গেছি। মা বই কিনে দেয়, দাদু বই কিনে দেয় সেসব আমি গোগ্রাসে পড়ি। এমন কি লুকিয়ে মায়ের আলমারি থেকে নিয়ে বড়দের বই পত্র পত্রিকা সব পড়ে ফেলি আর সারা জগতের সকলের কষ্টের ভার যেন আমার ওপরে এসে পরে। বাড়িতে কাজ করতে আসে হিয়ানু মাসি। তার কষ্টের কথা বকবক করে। জহর মেসো কাজ কাম ঠিক মত করে না। মাসির কাজের ঐ কটা টাকায় কি সংসার চলে,খড়ের চাল বেয়ে ঘরে জল পড়ে টুপটাপ। আহারে ওদের কী কষ্ট। আমি মাটির ঘট ঝাঁকিয়ে পয়সা বের করি, দাদুর মাথার পাকা চুল তুলে আমি ঐ পয়সা জমিয়েছি যে। আট টাকা তিরিশ পয়সা, মুঠো করে আমি মাসির হাতে দিই, মাসি নাও। আমাদের পাড়ার ভুলু কুঁই কুঁই করে ঘুরে বেড়ায় ওর ছোট্ট ছোট্ট বাচ্চাগুলো নিয়ে, শীতে ওদের কত কষ্ট হয়, ওদের বুকে করে নিয়ে বাড়ি আসি, মা আমি এদের পুষর। ওদের খেতে দি, খেলা দি, বেশ ওরা আমার সঙ্গী হয়ে ওঠে। ঝড় ওঠার সময় আমি আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখি মেঘের রঙ পরিবর্তন, নারকেল গাছের মাথা ঝাঁকানো, দেখি খুব বেশি জ্যোৎস্না উঠলে গাছের পাতাগুলো কেমন ভিজে যায়। অন্ধকারে কারা যেন নেমে আসে। আমার লিখতে ইচ্ছা করে সেইসব অশরীরীর কথা। কিন্তু কি করে লিখব তাতো আমি ভেবেই পাই না, সেই যে সেই কবে কে যেন একটা ছড়া বলে দিয়েছিল আমায় তারপর তো আর কিছুই বলে দেয় না। দু বছর হয়ে গেল আমি এখন ক্লাস ফাইভ, একদিন হঠাৎ করে লিখে ফেললাম আর একটা কবিতা। কিন্তু আমি যে এত্ত এত্ত গল্প বানিয়েছি ওগুলো তো লেখা হচ্ছে না। সারাদিন মায়ের পড়া, পড়া, পড়া, সময় কোথায় আমার অত লেখার। লুকিয়ে যে লিখব সেই জায়গাটাই বা কই।

লেখা তো এসেছে অনেক পরে। মানুষ তো আগে শুনে শুনেই গল্প মনে রেখেছে। বৈদিক ঋষিরা বলতেন বেদ নাকি অপৌরষেয়। আমার প্রতিটি লেখাই তাই। কেন লিখি তা আমি জানি না। কে যেন আমাকে ভেতর থেকে ধাক্কা দেয়, মাথার ভেতর বিন-বিন করে বলে গল্প। আজও মানুষের সুখ দুঃখ হাসি কান্না মান অভিমান ইর্ষা হিংসা আমার মাথার ভেতরে ঘুরপাক খায় তারপর শরীরের ভেতর তৈরি হয় এক অদ্ভূত তাড়না। আমি নিজে আজও কিছু লিখি না। কত সময় আমার নিজের লেখাই ফিরে পড়তে গিয়ে আমি দেখছি কত শব্দের অর্থ বা প্রয়োগ আমি সঠিকভাবে জানিনা হয়ত, কিন্তু কি অব্যর্থ ভাবে তা প্রয়োগ করেছি। চমকে যাই আমি। সাহিত্যিক সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় বলতেন, ওঁর লেখা পায়। সত্যি তো খিদে পায় বলেই তো আমরা খাই, ঘুম পায় বলেই আমরা ঘুমাই, তবে লেখাই বা পাবে না কেন। 


ক্লাস সিক্সে আমি হাতে পেয়েছিলাম বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কিশোর অপু, পথের পাঁচালী ও অপরাজিত একসঙ্গে। মনে হলো আরে এই লোকটা তো আমার মতো করে কথা বলে! আমি তখন দুর্গা মরে গেলে ভেউ ভেউ করে কাঁদি, অপুর মা মরে গেলে বুকের ভেতরে সুতীব্র কষ্ট হয়, তবু বারবার পড়ি। এক লাইন তিনবার করে, বইটা মাথার কাছে নিয়ে ঘুমাই, যেখান সেখান থেকে পড়তে আরম্ভ করি। সেই কাল থেকে আজ পর্যন্ত আমি কতবার যে পড়েছি বইটা! তারপর আরন্যক, আরো পরে ইছামতি, দেবাযান। ঐ মানুষটিই যেন আমায় লিখতে শিখিয়ে দিলেন। যদিও ততদিনে আমি পড়ে ফেলেছি বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ সবই। 

ক্লাস ইলেভেনে কবিতা লেখাটা যেন একটু ঘন ঘন হলো। একটা খাতা তৈরী করে ফেললাম গোপনে। মা জানতে পেরে মায়ের এক সহকর্মী বাংলার মিলি মাসিকে বললেন সেকথা। মিলি মাসি বিরক্ত হয়ে বললেন, এক্ষুনি কবিতা! আগে ওকে ছন্দ শিখতে বলো। এতটুকু হয়ে গেল মায়ের মুখ, তারপর কি মনে করে মাসি বললেন ঠিক আছে দিও তো খাতাটা, দেখবো। সেই খাতা দেখে মাসি বললেন, বাহ! তোমার মেয়ের তো সুন্দর ছন্দজ্ঞান আছে। মা খুশি হলেন বটে, আমি অবাক। আমি তো তখনো ছন্দ টন্দ পড়িই নি। ঐ পংক্তিগুলো তো আমার মাথার মধ্যে আসে! তবে হ্যাঁ আমার মা খুব ভালো আবৃত্তি করতেন, সেই সুবাদেই ছোট্ট থেকে আমি অনেক কবিতা শুনেছি আর মায়ের নির্দেশে গান গাইবার সময় রবীন্দ্র সংগীত আর নজরুল গীতির কথাগুলো খুব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়েছি। 


সেই মোটামুটি আমার লেখালেখির শুরু। কিছুদিন বাদেই মা আমাকে নিয়ে গিয়েছিলেন কবি দেবদাস আচার্যের বাড়ি। সেইখানেই দেখা কবি সঞ্জীব প্রামাণিকের সঙ্গে। তিনিই আমাকে শিখিয়েছিলেন প্রকৃত কবিতার পাঠ। কেটে কেটে মাত্রা ভেঙে শিখিয়ে ছিলেন ছন্দ। খাতা ভর্তি করে লিখে দিয়েছিলেন নানান পত্র পত্রিকার ঠিকানা। আমি ডাকযোগে পাঠাতাম সেসব কবিতা। আর দিয়েছিলেন বইয়ের হদিস। কি কি বই পড়তে হবে, কার কার কবিতা পড়তে হবে ইত্যাদি। একজন প্রকৃত শিক্ষক যেমন হন আর কি। সে সময় আমি প্রচুর কবিতা লিখেছি। পশ্চিমবঙ্গে হেন কোন পত্রিকা নেই যেখানে আমি কবিতা লিখিনি। দেশ, সানন্দা, কৃত্তিবাস, বিভাব, কৌরব, নৌকা, কবিসম্মেলন, আরো অনেক। আজ আর সব নামও মনে নেই আমার। বইও বেরল, প্রথম কবিতার বই, তা-ও ঐ কবি সঞ্জীব প্রামাণিকের উদ্যোগে, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন ১৯৯৫ সালে। 

ধীরে ধীরে আমার মধ্যে একটা অস্থিরতা তৈরী হচ্ছিল। যত কথা আমি বলতে চাই তত কথা যেন আমি বলে উঠতে পারছিলাম না। সবসময় লেখার মধ্যে থাকতে ইচ্ছে করছিল, মাদার উম্বে ক্যারি করতে ইচ্ছে করছিল লেখাকে কিন্তু কবিতা তো যখন আসে তখন আসে যখন নেই তখন নেই। ততদিনে আমি চাকরী পেয়ে গেছি একটা স্কুলে। আমার এক সহকর্মী একদিন আমাকে বললেন আচ্ছা অনিন্দিতা দি তুমি শুধু কবিতা লেখ কেন? কবিতা আমি বুঝতে পারি না, গল্প লেখো না, পড়ব। 

মেয়েটিকে বেশ ভালো বেসে ফেলেছিলাম। ওর সঙ্গে কখনো আলোচনা করতাম জেমস জয়েসের গঠনরীতি কিম্বা গ্রিক উপকথা। মেয়েটির কথায় কেমন যেন একটা ধাক্কা পেলাম, এতদিন যেটা সুপ্ত ইচ্ছা হয়ে ছিল মাথার মধ্যে সেটাই যেন উস্কে দিল মেয়েটি। ওকে পড়ানোর জন্যই লিখে ফেললাম একটা ছোট গল্প, তারপর একটা, তারপর আর একটা। ও সব গল্পগুলো খুব মন দিয়ে পড়ত তারপর লিখে দিত ওর মতামত। আমি বেশ উৎসাহ পাচ্ছিলাম। তারপর ও-ই একদিন বলল, তুমি লেখাগুলো কোথাও পাঠাও না কেন? পাঠাও না, আমি কপি করে দেবো। আমি বললাম না না তার দরকার নেই। ওগুলো আদৌ গল্প হয়েছে কিনা তারই ঠিক নেই, এগুলো বরং ফাইল বন্দি থাক।

মাঝে মাঝে ভাবি কি লিখতে চাই আমি? সত্যি কি কিছু লিখতে পেরেছি? কত মানুষের কত কষ্ট, নারী জীবনের কত যন্ত্রনা, নিরন্ন মানুষের বাঁচার লড়াই, কিভাবে সকল ক্ষেত্রে সবল মানুষ গ্রাস করছে দুর্বলকে। দেশ রাষ্ট্র থেকে ব্যক্তি মানুষ, সর্বত্র এই এক আগ্রাসন। আমি যেখানে পড়াতে যাই হতদরিদ্র পরিবারের বাচ্চারা আসে পড়তে। যেখানে মিড ডে মিলের ডিম সেদ্ধ দেখে চক্‌চক্‌ করে ওঠে শিশুদের চোখ, আলুনি সয়াবিনের ঝোল দিয়ে যারা গবগব করে ভাত খায়। যেখানে এখনো তের চোদ্দ বছরের মেয়েদের বিয়ে হয়ে যায়, হিষ্টিরিয়া হলে ভূতে ধরেছে বলে ওঝার কাছে ঝাড়াতে নিয়ে যায়, যেখানে এখনো শতকরা চল্লিশ ভাগ অভিভাবক অক্ষরজ্ঞান হীন, যেখানে দিন দুপুরে মেয়ে পাচার হয়ে যায় এক দেশ থেকে আর এক দেশে সেখানে কি লিখব আমি! কতটুকুই বা লিখব আমি! লিখে কি সত্যিই কিছু হয়! 

জীবনানন্দ পড়তাম খুব। এক ধূসর বিষন্নতা গ্রাস করে থাকত আমাকে। 

যেই সব বলিহাঁস মরে গেছে পৃথিবীতে
শিকারী গুলির আঘাতে; 
বিবর্ণ গম্বুজে এসে জড়ো হয়
আকাশে চেয়ে বড়ো রাতে;
প্রেমের খাবার নিয়ে ডাকিলাম তারে আমি
তবুও সে নামিল না হাতে। 

ভাস্কর চক্রবর্তীর কবিতা পড়ি,

আত্মজিজ্ঞাসায় ম্লান প্রথম দেবদূত এসে
বলেছিল, লিখো।
আমি এই ভারতবর্ষের সন্ধ্যা
তারপর থেকে এঁকে রেখেছি খাতায়।

বেলা হলো।
শীত আর গ্রীষ্ম আসে, বর্ষা এসে বলে যায়
“লিখেছ, লিখেছো তুমি?
আমি খাতা খুলি আর চেয়ে দেখি নীরবতা শুধু। 

এক সময় আমার ফাইল বন্দী গল্প গুলোর ডানা গজালো। হলো কি, এরই মধ্যে আনন্দবাজার পত্রিকায় একটি গল্প প্রতিযোগিতার বিজ্ঞাপন বেরল। আমি প্রায় খেলার ছলেই দিলাম সেখানে একটা গল্প পাঠিয়ে। আমাকে বাড়ি থেকে বলল, ওখানে কত রথি মহারথির গল্প ছাপা হয় জানো। আমি বললাম তা হোক না, আমার তো হারানোর কিছু নেই। এবং সবাইকে অবাক করে দিয়ে দ্বিতীয় গল্পটিই ছাপা হলো আমার। অসংখ্য ফোন অসংখ্য মানুষের ভালোবাসায় আমি যেন ভেসে গেলাম। সেটা ২০০৬ সাল।

ইতিমধ্যেই আমি পড়ে ফেলেছি সমরেশ বসু, কমলকুমার মজুমদার, জগদীশ গুপ্ত। রবীন্দ্রনাথের চিঠি পত্র গুলো আমার প্রাণ। ২০০৭ সালে আনন্দবাজার পত্রিকা আরো একটি গল্প প্রতিযোগিতার আয়োজন করলেন, যাতে তিনটি বিষয় দেওয়া হলো। বলা হলো প্রত্যেক বিষয় থেকে মাত্র দুটি গল্প ছাপা হবে। ততদিনে সাহসও বেড়েছে খানিক। একটি বিষয় নিয়ে লিখে ফেললাম একটি গল্প। আর হ্যাঁ সে বছরও দুটি গল্পের মধ্যে নির্বাচিত হল আমার গল্পটি। সেই গল্প শুধু যে সবার পছন্দ হল তাই নয়। একজন নাট্যপরিচালক তার থেকে করতে চাইলেন নাটক, একজন করতে চাইলেন ফিল্ম। যদিও শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়িত হয় নি। সে এক আশ্চর্য বিশ্বাসঘাতকতার গল্প। তারপর থেকে অনেক পত্র-পত্রিকায় আমার কাছে গল্প চাইতে লাগলেন।

এই সময়ে চন্দননগরের গল্প মেলায় আমার সঙ্গে আলাপ হলো সাহিত্যিক অমর মিত্রের। তিনি আমার কিছু গল্প ঠিকঠাক করে দিলেন। বলে দিলেন আমার কি কি বই পড়া দরকার। আমি শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় পড়লাম, প্রেমেন্দ্র মিত্র পড়লাম, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্‌র পড়লাম। 

কত যে বই পড়েছি, ফ্রাঞ্জ কাফকা, আলবেয়ার ক্যামু, লিও টলস্টয়, নিকোলাই গোগল, গাব্রিয়েল গাসিয়া মার্কেস, ওরান পাসুক আরো কত কী যে! পড়েছি আঘতারুজ্জামান ইলিয়াস, হাসান আজিজুল হক। তারও পরে পড়েছি সাহিত্যিক অমর মিত্র, স্বপ্নময় চক্রবর্তী, অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রফুল্ল রায়। আমার থেকে বেশি পড়েছেন হয়ত অনেকেই, আমি কেবল যে বইগুলো ভালো লেগেছে সেগুলো বারবার পড়েছি, বহুদিন ধরে পড়েছি, বসবাস করেছি সেই বইগুলোর সঙ্গে। তবে কারোর লেখাই সরাসরি আমাকে প্রভাবিত করে নি। একটা ভালো লেখা আমার মধ্যে এক নবতর বোধের উন্মেষ ঘটায়, আউটসাইডার কিম্বা মেটামরফসিস সেখানে মিলে মিশে যায়, নিঃসঙ্গতার একশ বছরের মধ্যে মিলে যায় কাঁদো নদী কাঁদো। 

আমি মনে করি লেখক জন্মান। লেখা একটা সহজাত পক্রিয়া। একই জিনিস দেখেন সবাই, লেখেন একজন। এমন কি কে কিভাবে লিখবেন সেটাও নির্ধারিত থাকে, শুধু পাঠ্যভ্যাস তাকে শান দিতে পারে মাত্র। তাই আমার আলাদা করে কোন ব্যক্তি জীবন নেই। সমগ্রটাই লেখক জীবন। যেন চলমান এক গতি প্রবাহে আমি ডিঙি নৌকা নিয়ে উঠে পড়েছি, ভাসছি, দোল খাচ্ছি, টাল খেয়ে উল্টো যেতে যেতে আবার ফিরে আসছি। ঘর সংসারে আমার মন নেই, কখনো আমার ভাত গলে যায়, জল উপচে পড়ে পাত্র থেকে, ধূলো জমে ঘরের কোণে। লেখালেখি ছাড়া আর কোন কিছুই ইচ্ছে করে না সেভাবে। এমন কি লেখা যখন মাথায় থাকে আমি কি খাচ্ছি না খাচ্ছি তার খেয়ালও থাকে না সেভাবে। লেখা সম্বন্ধীয় ছাড়া কোন কথা আমি মন দিয়ে শুনি না, বলিও না। যখন লেখা আমার কাছে থাকে না তখন মনে হয় ড্রাই হয়ে গিয়েছে আমার মস্তিষ্ক। কিছু ভালো লাগে না।যখন লিখি রাতের পর রাত আমি লিখে চলি,প্রথম উপন্যাস লিখতে গিয়ে টানা ১৬ দিন আমি ঘুমাইনি।

শুধু পাঠকের জিজ্ঞাসার কাছে আমি অক্লান্ত, অক্ষরের সম্পর্ক রক্তের সম্পর্কের চেয়ে বড়ো। তাদের হাজারো প্রশ্নের উত্তর আমি ধৈর্য ধরে দি। আসলে পাঠকের পাঠেই তো লেখকের লেখা সম্পূর্ণতা পায়। আমি যেখানেই লিখেছি পাঠকের ভালোবাসা পেয়েছি। কত মানুষ যে ভালোবাসেন আমাকে! কেউ আমাকে ট্রেনে জায়গা ছেড়ে দেন, কেউ পুঁথির পুতুল গড়িয়ে দেন, কেউ ছুঁতে চান শুধু হাতটুকু।

লক ডাউনের আগে আমি সোসাল মিডিয়ায় তেমন এ্যাক্টিভ ছিলাম না। সেখানে যে এমন সিরিয়াস পাঠক আছেন আমার জানা ছিল না। সম্প্রতি আমার একটা উপন্যাস একটি পত্রিকার ফেসবুক পেজে প্রকাশিত হচ্ছে প্রতি সোমবার। কিভাবে গ্রহণ করছে মানুষ সেই লেখা! তারা পড়ছেন, সুচিন্তিত মতামত দিচ্ছেন। আমি অভিভূত। আগের সংখ্যার গল্প পাঠে প্রকাশিত একটি গল্প “সেই বিরলতম মেয়েটি” কত মানুষের যে ভালো লেগেছে। মোচ্ছর গল্পেটির কথা আজও কত মানুষ বলেন!আমার সবচেয়ে আলোচিত গল্প বোধহয় মোচ্ছব ই,আর পরিষেবা সীমার বাইরে। তবে প্রিন্ট মিডিয়াও আমাকে অনেক ভালোবাসা দিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের সব বাণিজ্যিক পত্রপত্রিকা আনন্দবাজার, দেশ, বর্তমান, আজকাল, প্রতিদিন এছাড়া অনুষ্টুপ, প্রমা আরো অনেক পত্রিকায় আমি লিখেছি। প্রকাশিত হয়েছে আমার বারোটির বেশি উপন্যাস ও গল্প গ্রন্থ। এতো পাঠকের ভালোবাসা ছাড়া সম্ভব না। যেখানে প্রকাশক বইগুলো করেছেন নিজ অর্থ ব্যায়ে। 

তবে লেখক হিসাবে আমার কিছু ত্রুটি আছে। যেমন আমার মধ্যে হাস্যরসের ভীষণ অভাব। আমি নিজে যেহেতু সবসময়ই একটা মেলাংকলি স্বত্তা বহন করি তাই আমার অধিকাংশ লেখাতেও তার ছায়া পড়ে। হাসির গল্প আমি সেভাবে লিখতে পারি না। আর এখন একটা বাজে অভ্যাস গড়ে গেছে, মাথার মধ্যে বিষয়বস্তু ঘুরপাক খেলেও সম্পাদকের তাগাদা না পেলে গল্প যেন দানা বাঁধে না।

উপন্যাস আমি অবশ্য সময় নিয়ে লিখি, ভেবেচিন্তে, পড়াশোনা করে, একটা উপন্যাস লিখতে আমি সাত বছর সময় নিয়েছি এমন উপহারণও আছে। আনন্দ পাবলিশার্স থেকে প্রকাশিত হয়েছে আমার সেই সুবৃহৎ উপন্যাস। 

এ জীবনের কণামাত্র দাম নেই লেখার অক্ষর গুলো ছাড়া। আগে প্রেমে পড়লে লিখতাম এখন সব অবয়ব মুছে গেছে, এখন সর্ব কল্যাণময় ঈশ্বরের কাছে আমার সবটুকু নিবেদন। পাঞ্জাবী কবি অমৃতা প্রীতম বলেছিলেন এত প্রেমপত্র লেখ যাতে একসময় নাম ঠিকানা সব মুছে যায়। হ্যাঁ আমারও তাই হয়েছে, চোখের জলের সঙ্গে ভেসে গেছে সব ঠিকানা। শুধু রয়ে গেছে এক অবশেষ- অক্ষর।

৬টি মন্তব্য:

  1. খুব আন্তরিক লেখা । ভালো লগলো । তবে তোমাকে যখন, যেটুকু দেখেছিি, কখনোই মনে হয়নি তোমার ভেতর হাস্যরসের একটুও অভাব রয়েছে ।

    উত্তর দিনমুছুন
  2. চমৎকার। মেকিতাহীন প্রাণের কথা।

    উত্তর দিনমুছুন
  3. সুন্দরভাবেই লিখেছেন আপনার লেখালেখির ভেতর জগতের কথা।আপনার ধারাবাহিক উপন্যাসের অপেক্ষায় থাকি। খুব ভালো এগচ্ছে লেখা।

    উত্তর দিনমুছুন
  4. অনেক কাজ করেছেন দিদি। অশেষ শুভকামনা।

    উত্তর দিনমুছুন
  5. খুব ভালো লাগলো। শৈশব থেকে আপনার এমন পড়াশোনা আপনাকে এমন জায়গা পৌঁছে দিতে খুব সহায়ক হয়েছে,সর্বোপরি ঈশ্বরের কৃপা বোধ হয় আপনার উপর আছে । ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন আর সুন্দর লেখার উপহার আমাদের জন্য আপনার কলম থেকে মস্তিষ্ক দিয়ে বেরিয়ে আসুক।

    উত্তর দিনমুছুন
  6. ভালো লাগলো এই স্মৃতিকথা,লেখালেখি বিষয়ক জবানবন্দী। আমার আন্তরিক শুভেচ্ছা জানাই!

    উত্তর দিনমুছুন