রবিবার, ৮ নভেম্বর, ২০২০

জয়েস ক্যারল ওটস'এর গল্প : আমি আপনার ছেলে নই, আমি আপনার চেনা কেউ নই



অনুবাদ: অমিতাভ চক্রবর্ত্তী 


খবর্দার চোখেচোখে তাকাবিনা, ভাই সাবধান করে দিল আমায়। 
ঠিক ভিতরেই অপেক্ষা করবে ওরা। তাকাবি না ওদের দিকে। 

নিখুঁত ভাবে ভাই সংকেতটা টিপে দিল। ওটা ওর মনের ভিতর গাঁথা হয়ে রয়েছে। আমি মুগ্ধ, হওয়ারই কথা, এ আমার ছোট ভাই, জীবনের কত অন্ধকার দিক জেনে বসে আছে ও, এমন সব ব্যাপার যা নিয়ে আমার বিন্দুপাত্র জ্ঞান নেই। 

বিশাল ভারী দুই পাল্লার দরজা, তাতে ভিতরে তারজাল লাগানো কাঁচের জানালা বসানো আছে। ছাদের কাছাকাছি ভিডিও মনিটর। ভাই সংকেত টিপে দেওয়ার সাথে সাথেই দরজা পাল্লারা মসৃণ ভাবে পাশে সরে খুলে গেল, আর আমরা ভিতরে ঢোকার পরেই আবার গড়িয়ে এসে বন্ধ হয়ে গেল। বড়জোর দু-তিন সেকেন্ড সময় পাওয়া যায়, তার বেশী নয়। বিমানবন্দরের ট্রেনগুলোর পাশে-সড়া দরজাগুলো যেমন থাকে, ঐ রকম। সর্বোচ্চ প্রহরার কোন জেলখানা যেন। আগে থেকেই ভিতরে হাজির চেহারাগুলো ঠেলাঠেলি করে এগিয়ে এল। তিনজন তারা। বাবা থাকবে না এদের মধ্যে, ভাই বলে রেখেছিল আমায়। তবু আমার বুকটা ধড়াস ধড়াস করে ছুটোছুটি শুরু করে দিল। মনে হল আমার বিপর্যস্ত শরীরের সমস্ত রন্ধ্র দিয়ে বেরিয়ে আসা ঘামে আমি চুপচুপে হয়ে ভিজে যাচ্ছি। 

এই যে? এই দিকে? এই দিকে? 
ও ছেলে? ছেলে রে? আয় বাবা? এইদিকে মাণিক আমার? 

ভাই ভালোই জানে আমায় সাথে আনার ঝুঁকি কতটা, তাই আমি এইসব কিভাবে নিচ্ছি সেটা নজরে রেখে আমায় পাশে থেকে পাহারা দিতে দিতে নিয়ে গেল। আমার বাহুতে ওর হাতের আলতো চাপ দিয়ে বুঝিয়ে দিচ্ছিল আমায় কি করতে হবে। আমায় আগে থেকেই পই পই করে সাবধান করে দিয়েছিল আমি যেন কারো দিকে না তাকাই। কিন্তু আমি যে না-তাকিয়ে থাকতে পারছিলাম না। স্বরগুলো আমাদের আকুল হয়ে ডাকছিল, মিনতি করছিল। আমার ভিতরটা আমায় বলছিল থেমে যেতে, অন্ততঃ একবার মুখ তুলে তাকাতে। এক বৃদ্ধা, মাথার খুলি থেকে সাদা চুলগুলো বিদ্যুতায়িত তারের ছাঁটের মতন উঠে আছে, বুক-চুপসে-যাওয়া এক বয়স্ক মানুষ, মুখটা তার জীবনের তাপে যেন ঝলসে গেছে, বামনাকৃতির এক মানুষ, মেয়ে না ছেলে বোঝা যাচ্ছে না, একটা হাঁটা-সহায়কে ভর দিয়ে ঝুঁকে আছে আর একটা উদ্গ্রীব টিয়াপাখীর মত সুর করে বলে চলেছে, এই যে? এদিকে? এই দিকে? বৃদ্ধা মহিলাটি এবার প্রায় বকতে লাগলেন, সোনা আমার, মানিক আমার, এই যে, এখানে, এখানে, এইদিকে আমি, সোনা মানিক! বুক-চুপসানো বুড়োলোকটি ঠেলেঠুলে সবার সামনে এগিয়ে এসে একটা লাঠিতে ভর দিয়ে নিজেকে সামলে নিয়ে এমনভাবে দাঁড়ালেন যেন বাকিরা আড়ালে পড়ে যায়, কাতরভাবে অনুনয় করতে থাকলেন, আমায় নেবে? আমায় নেবে? ও ছেলেরা? ও বাপজানেরা? আমি একেবারে প্রস্তুত। আমার সব কিছু গোছানো আছে। নেবে আমায় সঙ্গে করে? অস্থিসার মুণ্ডুর সাথে পুরু-কাঁচের চশমাটা একটা ইলাস্টিক ব্যান্ড দিয়ে আটকানো। তাদের গায়ের গন্ধ পাঁঠার বোঁটকা গন্ধের মত গা-গুলানো। ছাগলগুলো যেখানে গাদাগাদি করে থাকে, সেইরকম, ভিজে স্যাঁতস্যাঁতে পচা খড়ের মত। 

আমার ভাই আমায় চোখ টিপে ঈশারা করল। জঘন্য! বলেছিলাম তোকে, আয় চলে আয়। 

তা সত্ত্বেও কেন কে জানে, সেই মুহুর্তটায় আমি পাথরের মত স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম, নিশ্চল। কারণ, আমার মনে হচ্ছিল এই অপরিচিত বয়স্ক মানুষগুলো আমায় চেনে - কিভাবে? তারা কাকুতি-মিনতি করছিল, বকাবকি করছিল, গোঙ্গাচ্ছিল। তাদের মুখগুলো আমার কেন এত চেনা-চেনা লাগছিল আমি কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছিলাম না। পাকাচুলের বৃদ্ধাটি, এক বাটি পুডিং-এর মত মোটা থলথলে চেহারা, কিন্তু তার চোখদুটো সন্ধানী, ছোবল দেয়ার জন্য সবসময় তৈরি। এক মা সে, ডাকছে আমাদের – সোনা আমার? মাণিক আমার? ফিরে এস এইখানে! খবর্দার, আমি যখন তোমার সাথে কথা বলছি, কোত্থাও যাবে না তুমি! আমি এখন তোমার সাথে কথা বলছি, এক পাও নড়বে না তুমি।– আমায় তুমি ফেলে যেতে পারো না। আর বাকিরা আমায় কান্নাকাটি করে ডাকছিল, আমায় তাদের ছেলে বলে ডাকছিল, ছেলে! 

আমার ভাই আমায় টেনে সরিয়ে নিল। অন্ধের মত বারান্দাটা ধরে হেঁটে চললাম আমরা। কিন্তু এখনও আমার তীব্র ইচ্ছা হচ্ছিল পিছন ফিরে তাকানোর। আমার ইচ্ছে করছিল বুঝিয়ে বলতে, ক্ষমা চাইতে। আমি তোমাদের ছেলে নই, আমি তোমাদের চেনা কেউ নই। আমার মুখ পুড়ে কালো হয়ে গেছে, নিজেকে নিয়ে লজ্জা হচ্ছিল আমার। অন্তরের গভীর অন্তঃস্থল থেকে ছেয়ে ফেলা অসীম লজ্জা। যে তোমার কাছে ভিক্ষা চাইছে এমন আরো একজনের থেকে তার কোন কথাটুকু না শুনে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার লজ্জা। অপরিচিত মানুষগুলোর কি অদ্ভুত রকম চেনা-চেনা মুখ। মুখের ধ্বংসাবশেষ। মরিয়া আকুতি মুখগুলোয়। মনে হচ্ছিল যেন, চিনতাম, আমি একদিন চিনতাম, ঐ ঝলসানো মুখের বুক-চুপসানো বৃদ্ধকে, কিন্তু আমার ভাই আমার কানের ভিতর মন্ত্র পড়ে যাচ্ছিল, চলতে থাক। ওরা আমাদের পিছনে আসবে না কেউ। বলেছি ত তোকে, ওরা সবার সাথে ঐ রকম করে। প্রথমবারে আমাকেও একেবারে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু অভ্যাস হয়ে যায়। দেখবি, ওরা কিছু মনে রাখতে পারে না। মাত্র পাঁচ মিনিট বাদেই কোন কথা ওদের মনে থাকবে না। এখনই ভুলে যেতে শুরু করেছে ওরা। আমরা চলে যাওয়ার সময়ও আবার একই কাণ্ড ঘটবে। কেননা, ওদের মনে হবে সেই প্রথমবার সেটা ঘটছে কারণ আমাদের কথা ওদের কিচ্ছু মনে থাকবে না। শুধু ওদের চোখের দিকে তাকাবি না, ব্যাস তা হলেই আর কোন চিন্তা নেই। 

আমি আমার হাত থেকে ভাইয়ের আঙ্গুলগুলো ঠেলে সরিয়ে দিলাম। ঠাণ্ডা গলায় বললাম, বুড়ো মানুষদের সাথে অভদ্রতা করতে আমার ভালো লাগে না। 

খ্রিষ্টের দোহাই, আমরা কোন অভদ্রতা করছি না। যা করতে হবে সেটাই শুধু করছি। 
আমার ভয়ংকর রাগ হচ্ছিল, ছোট ভাই আমার হাতে ওর হাতের চাপ দিল। 

আমি ওকে জিজ্ঞাসা করলাম বৃদ্ধ মানুষগুলো আমাদের চেনাজানা কেউ ছিল কি না। 

এক হিংস্র হাসিতে আমার ভাই তার দাঁতগুলো মেলে ধরল। ঠিক করে বলতে গেলে, না, ছিল না। চলে আয় এখন। 



বাবার সাথে দেখা করা। ম্যানর-এ আমার প্রথম বার।

যতটা দিন পারি দূরে সরে থেকেছি, কিন্তু এখন আমি এইখানে। সময় থাকতে কোন প্রস্তুতি নিইনি এই সাক্ষাতের, আর এখন অনেক দেরী হয়ে গেছে, এখন আমি এইখানে। বাবাকে নিয়ে আমি কিছু বলব না। বাবাকে নিয়ে কথা বলার কোন ইচ্ছেই নেই আমার। দেখা হওয়া নিয়ে এইটুকু বলতে পারি, হ্যাঁ, এটা ঘটেছিল। গাড়ি চালিয়ে ম্যানরে যাওয়ার পথে ভাই আমায় কথায় কথায় জানিয়েছিল যে বাবা প্রথমদিকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিল। এই মন্তব্যের পরে ভাই আর আমার মধ্যে একটা নীরবতা নেমে এল। নীরবতাটা হয়ত দুঃখের ছিল, কিংবা স্তম্ভিত করে দেওয়া, অথবা নিতান্তই হতবুদ্ধিকর। কিন্তু কোনভাবেই সেটি নির্লিপ্ত ধরণের ছিল না। এবং তা সত্ত্বেও আমি একবারও জানতে চাইনি যে কতবার বাবা এই পালানোর চেষ্টা করেছিল, কিংবা এই পালানোর চেষ্টা করেছিল কথাটার আক্ষরিকভাবেই ঠিক কি অর্থে ছিল। কতটা প্রচেষ্টায়, ঠিক কোন আবেগে, ধূর্ততায়, মরিয়াপনায়, কোন প্রেরণায়। অথবা জানতে চাইনি কতটা বলপ্রয়োগের সাথে পালিয়ে যাওয়ার এই চেষ্টার মোকাবিলা হয়েছিল কর্তৃপক্ষের লোকজনের হাতে। 

বাবা, কেমন আছ তুমি, শুনতে পাচ্ছ, বাবা? 

বাবা! শুনছ। তোমায় কিন্তু বেশ ভালো দেখাচ্ছে বাবা ... 

বাবা, এ হচ্ছে নর্ম, আর আমি ভিন্স, জান ত তুমি ... 

আমরা তোমার ছেলে। কথা বলো, বাবা। 

তোমারই ছেলে, বাবা। যাই বলো, এই জায়গাটার কিন্তু একটা ব্যাপার আছে। বেশ একটা, কি বলব ... 

এই ভাবে বাবার সাথে আমাদের কথাবার্তা শুরু হয়েছিল, বেশ একটা উচ্ছ্বাসের মন নিয়ে, হাসি হাসি উৎফুল্ল গলায়। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই আমার মন আমাদের চারপাশের এই দৃশ্য থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে নিল। আমি রীতিমত মুগ্ধ – আমার ভাই, যে আমার থেক তিন-তিনটা বছরের ছোট, আজ দেখছি, সে-ই আমার থেকে তিন কি আরো বেশী বছরের বড় হয়ে গেছে। তার চোখ দুটো যেন আরো বয়স্ক কোন মানুষের চোখ। আমার আর ভাইয়ের মনের মধ্যে এখন যে শঙ্কাটা কাজ করছিল সেটা এই যে, এই লোকটি আমাদের বাবা নয়। এই বুড়ো লোকটি। এ আর আমাদের বাবা নয়। আমরা একে অন্যের দিকে তাকাতে পারছিলাম না। এই আতংক থেকে আমরা আর একে অপরের চোখে চোখ রাখতে পারছিলাম না যে আমরা দুজনে তা হলে আর কেউ কারো ভাই নই, কারণ, এখন থেকে ত আমাদের আর বাবা বলেই কেউ রইল না। 

আমি জানালাটা খোলার জন্য এগিয়ে গেলাম। হঠাৎ করেই মনে হচ্ছিল, দম আটকে আসছে আমার। যেন সবুজ থকথকে দলাদলা কফের মধ্যে দিয়ে অক্সিজেন টানতে চাইছি, আর সেই কফও আমার নয়, অন্য কারো। কি করি এখন! পরিষ্কার কাচা সাদা সূতির জামার মধ্যে আমি ঘেমে নেয়ে উঠেছি, অন্তর্বাসটা পিছনের খাঁজে আটকে বসে গেছে। বাবার ঘরে সেই স্যঁতস্যাঁতে ছাগুলে গন্ধটা তেমন তীব্র ছিল না বটে, কিন্তু আরো নানা বিশ্রী গন্ধ ছিল। একটাই মাত্র জানালা, সেটাও বন্ধ, খুলতে পারছি না। ভাই বলল, শোন, ঐ জানালাটা খোলা যায় না। এমনভাবে আমার দিকে তাকিয়ে হাসল, যেন খুব একটা রসিকতার কথা বলেছে। আমি নীচের দিকে তাকিয়ে দেখি, হা কপাল, জানালাটা দেয়ালের খাঁজের মধ্যে কংক্রিটের মত গেঁথে বসানো। এ জানালা কেউ জোর করে খুলতে গেলে তার পেট ফেটে নাড়িভুঁড়ি বেরিয়ে যাবে। 

ভাই আর আমি যেখানটায় ছিলাম, আমরা ছিলাম ই-ভবনে। মীডোব্রুক ম্যানর-এর ই-ভবনে বাবার সাথে দেখা করতে এসেছি। গাঁ-গঞ্জের ভিতর দিয়ে যাওয়া দুই লেনের এক হাইওয়ের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এই মীডোব্রুক ম্যানরের সাথে, প্রচারপত্রে যেরকম জানিয়েছিল সেইরকম কোন অ্যাসিস্টেড কেয়ার ফেসিলিটির তুলনায় বরং বেশী মিল পাওয়া যেতে পারে ভালোরকম অর্থসাহায্য পাওয়া কোন কমিউনিটি কলেজের। হাইওয়ে থেকে ম্যানরটাকে দেখলে আদৌ বোঝা যায় না যে এর কোন কোন ভবন কিরকম কড়া নিরাপত্তা আর জেলখানার মত পাহারায় রাখা হয়। ঐ সব ভবন থেকে যদি কোন রোগী বন্দিত্ব থেকে মুক্তি পেতে চায়, অথবা নিছকই তার মানসিক বিভ্রান্তির কারণে কাউকে দেখে যদি মনে হয় যে সে পালাতে চাইছে, ভাবতে পারবে না, কি দ্রুততায় সতর্কতা ঘন্টিগুলো বেজে উঠবে। ই-ভবনের বাবার মত রোগীদের বাঁ হাতের কব্জিতে বালা পরিয়ে রাখা হয়। রোগীরা সেগুলো খুলে ফেলতে পারে না। এই বালায় যে ধাতব ট্যাগ লাগানো থাকে সেটা যদি বিনা-অনুমতিতে কোন বৈদ্যুতিন সনাক্তকরণ যন্ত্রের পাল্লায় এসে পড়ে, গোটা বাড়িটা জুড়ে সতর্কতা-ঘন্টি বেজে উঠবে। 

আমার ভাই বলেছিল সে একবার এই সতর্কতা-ঘন্টি বাজতে শুনেছিল। কান ফাটানো আওয়াজ। 

ভাই বলেছিল আমায়, আশেপাশের একশ মাইলের মধ্যে এই মীডোব্রুক ম্যানর-ই হচ্ছে সবচেয়ে ভালো অ্যাসিস্টেড কেয়ার ফেসিলিটি। 

সত্যি বলতে কি, ছোট ভাই বলছিল আমায়, বাবাকে এখানে সবাই খুব ভালোবাসে। যেটা ওরা বলে, সব নার্সরা বলে সেটা, তোমার বাবা, যতবার আমি বাবাকে দেখতে আসি প্রত্যেকবার ওরা বলে আমায়, কী মিষ্টি একজন বুড়োমানুষ তোমার বাবা । 

আমি যেটা নজর করলাম, ম্যানরটার সব কিছু খুব আলোকোজ্জ্বল, অনেকটা নাটকের মঞ্চসজ্জার মত। আসবাবপত্র চড়া প্যাস্টেল রঙের ভাইনিলের। নার্সরা বা তাদের সহকারীরা, বেশীরভাগ-ই কালো মেয়ে তারা, ঝকঝকে সাদা ইউনিফর্ম পরা, আমাদের অর্থাৎ দেখা করতে আসা মানুষজনের দিকে সবসময় হাসিমুখে তাকাচ্ছে। ভাই ত ডাক্তারদের সম্পর্কেও প্রশংসা করল। অবশ্য, ভাই নিজে ডাক্তারদের সাথে কথা বলেছে, ও ত বলবেই। ভাইয়ের মতে বাবার জন্য এইটাই সবচেয়ে ভালো ব্যবস্থা। ওর মুখের হাসিটা খুব-ই সাহস যোগানো, আর সংক্রামকও বটে। 

ভাইনিল চেয়ারটায় বসে বাবাকে দেখতে দেখতে আমি ভাবছিলাম, বাবা কতবার এখান থেকে পালানোর চেষ্টা করেছে, শেষবার কবে করেছে, বা সবচেয়ে সম্প্রতি কবে করেছে। ভাবছিলাম, সংকেতঘন্টি বেজে ওঠার আগে সবচেয়ে বেশী কতটা দূর পর্যন্ত যেতে পেরেছিল বুড়ো মানুষটা। আটকে ফেলার আগে, কতটা দূর পর্যন্ত। আর ঠিক কিভাবেই বা তাকে আটকানো হয়েছিল। কোন শারীরিক বেঁধে ফেলার ব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়েছিল কি। এখনও আষ্টেপৃষ্ঠে চেপে বেঁধে ফেলা স্ত্রেইট জ্যাকেট-এর চল আছে কি না। ভাই ওর উঁচু জোরালো গলায় নার্সিং-এর কর্মচারীদের প্রশংসা করে যাচ্ছিল। খুব ভালো ওরা। খুব যত্ন করে। ভাই বলে যাচ্ছিল, কী রকম কাছের মানুষ মনে করে তারা তাদের বাবা-মায়েদের, তারপর হেসে ফেলে বলল, মানে রোগীদের আর কি: রোগীদের এরা সত্যিই নিজেদের লোক মনে করে। 

জোরালো গমগমে গলায় ভাই জিজ্ঞাসা করল আমায় ও বলেছে কি না যে বাবাকে এখানে সবাই খুব ভালোবাসে। 
দেয়াল ছাড়িয়ে, খুলতে না পারা জানালার ওপাশে, গল্‌ফ খেলা যাবে এমন সবুজ লনটা পেরিয়ে, হাইওয়ে দিয়ে একটা ট্রাক গর্জন করে ছুটে গেল। 

আমি জিজ্ঞাসা করতে যাচ্ছি না যে বাবা ঠিক কোথায় পালিয়ে যাবার কথা ভেবেছিল। আমাদের পুরনো বাড়িটা আর নেই। যে অতীতে বাবা তার জীবনটা কাটিয়ে এসেছে, সেটা হারিয়ে গেছে। তার আর কোন অস্তিত্ব নেই। একজন বুড়ো বিপর্যস্ত মানুষ সম্ভবতঃ সেই সময়টাতে পালাতে চাইবে যেখানে সে না ছিল বুড়ো, না বিপর্যস্ত। কিন্তু সেই বছরগুলো ত চলে গেছে। এক ভোরে জেগে উঠে তুমি জানতে পারো যে সেই সমস্ত বছরগুলো আর নেই, হারিয়ে গেছে। এই ঘটনাটার মধ্যে একটা কোন নিশ্চিন্ততা আছে, হয়ত। আমি ভাবতে চেষ্টা করি যে, সেই সমস্ত ঘটনা যা আমরা পাল্টাতে পারব না, তাদের সব কিছুর মধ্যে কিছু একটা নিশ্চিন্ততা আছে। 

নিকুচি করেছে, বাবার গলায় বলে উঠল সামনের লোকটা, ফালতুর একশেষ সব। 



একটু ঘুরে আসা যাক? 

ভাই এক পায়ে খাড়া। দেখতে পাচ্ছি, ওর সারা চোয়াল জুড়ে মাঠে পড়ে থাকা কাটা খড়ের মত খোঁচা খোঁচা দাড়ি। খড়ের গায়ে সাদার ঝিলিক। আমার ছোট ভাইটি এখন আর ছোট নেই। বুড়োটে দেখাবে এই ভয়ে আমি দিনে দুবার করে দাড়ি কামাতাম। আমি ধরতে পারলাম না বাবা কোন কথা বলল কি না, কারণ আমার মনে হল যেন বাবার গলা শুনতে পেলাম। আমি নিশ্চিত নই বাবা যথেষ্ট জোরে কথা বলেছে কি না। ম্যানরের ভিতরটায় সমস্ত আওয়াজ অনেক বড় করে শোনায়, মনে হয় যেন স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক উঁচু স্বরে কথা হচ্ছে। সেই সাথে শোনা যায় মরীচিকার মত শব্দদের, যাদের আসলে হয়ত কোন অস্তিত্ব নেই। মরুভূমিতে দিগন্তরেখায় যেমন উল্টো হয়ে ফুটে থাকে অলীক প্রতিবিম্বরা। আর সেই সব শব্দের ঠিক তলায় তলায় গুনগুন করে চলতে থাকে নিঃশব্দে হেসে চলা টিভি-কণ্ঠেরা। আমি যখন কথা বলছিলাম, যেটা বাবার ঘরের ভিতর খুব একটা ঘটেনি, আমার কথাগুলো কোন এলোমেলোভাবে আস্ফালিত ছুরি বা চাপাতির মত চারপাশের বাতাসকে কুপিয়ে ফালাফালা করছিল। আর আমার মনে হয় আমি তখন ভেবে যাচ্ছিলাম, বুক-চুপসানো লোকটি কে ছিল। 

কে যে ছিল ঐ বুক-চুপসানো লোকটি। 

আমরা তিনজন হাঁটার জন্য প্রস্তুত। ছোট ভাই পথ দেখিয়ে নিয়ে চলল। আমরা আস্তে আস্তে হাঁটছিলাম। ই-ভবনে কারো কোন তাড়া নেই। মীডোব্রুক ম্যানরে দৃশ্যতঃ কোন তাড়ার চিহ্ন চোখে পড়ে না। আমার ভাই এখানে সব চেনে-জানে, সে-ই আমাদের এগিয়ে নিয়ে চলল, টিভি লাউঞ্জ ছাড়িয়ে, খাড়া পিয়ানোটা ছাড়িয়ে, পা ছড়িয়ে ঘুমিয়ে থাকা আবাসিক মোটা কুকুরটার পাশ দিয়ে। আমার ভাই যে পথ দিয়ে আমাদের নিয়ে যাচ্ছিল তার এক ধারে এক জায়গায় কোন নার্সের সহকারী নোংরা ডায়াপার ভর্তি একটা কালো প্লাস্টিকের ব্যাগ একটা গাড়িতে তুলছিল। বাগানে যাওয়ার জোড়া পাল্লার দরজায় তালাটা খোলাই ছিল। বাগানটা অবশ্য খুব সুরক্ষিত ছিল, ঊইস্টেরিয়ার ঘন আস্তরণের আড়ালে সাত-ফুট উঁচু তারজালের প্রহরা লোকজনের চোখে পড়ে না। বাগানের প্রতিটি বর্গইঞ্চিতে তন্ন তন্ন করে ভিডিও ক্যামেরা দিয়ে খুঁজলেও এই বেড়া নজরে আসবে না। ভাই তার স্বভাবসিদ্ধ উঁচু গলায় উৎফুল্ল স্বরে বলে যাচ্ছিল, বাবা এখানকার সবচেয়ে সেরা মালীদের একজন। বাবা, তোমার টম্যাটোগুলো আমাদের দেখাও দেখি। 

টম্যাটোগুলো সত্যি দারুণ পুরুষ্টু, প্রায় চার-পাঁচ ফুট উঁচু পর্যন্ত থরে থরে ফলে আছে। বাবার সেই অর্থে আমাদের কোন টম্যাটো দেখিয়ে দেওয়ার দরকার ছিল না। আমাদের চোখে সামনেই আমরা সেগুলো পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি। 

বাবা, দেখাও ত আমাদের কোন ফুলগুলো তোমার নিজের। জিনিয়ারা? 
জিনিয়ারা কথাটা বিভ্রান্তি সৃষ্টি করল। বাবাকে দেখে বোঝা গেল না জিনিয়ারা কথাটা বাবা বুঝেছে কি না। 

আমরা ধীরে পায়ে বাগানটা ধরে গোল করে ঘুরছিলাম। নুড়ি বিছানো পথ, ঘড়ির কাঁটার উল্টো দিকে হাঁটছিলাম আমরা। যদিও প্রায় সমতলেই হাঁটছিলাম আমরা, মনে হচ্ছিল মাধ্যাকর্ষণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে পা ফেলতে হচ্ছে আমাদের। কারণ, সময় এখানে কার্যত থেমে গেছে। মনে হচ্ছে, একটি হৃৎস্পন্দন থেকে আরেক হৃৎস্পন্দনের মাঝের সময়টুকু অনন্ত হয়ে গেছে। ভয় হচ্ছিল সময়ের এক ধারে হেলে পড়ে যাব, বাইসাইকেলে খুব আস্তে প্যাডেল ঘোরালে যেমন একপাশে হেলে যায় লোক, সেইরকম। আমার ডানহাতে ধরা আছে, এই থেমে যাওয়া সময়ের সাথে কোন এক উপায়ে সম্পর্কিত এক বৃদ্ধ মানুষের হাত। হাড়সর্বস্ব, প্রতিবাদহীন। ছোট ভাই বাঁ হাত দিয়ে শক্ত করে ধরে আছে বয়স্ক মানুষটির অন্য হাতটি। কি অদ্ভুত একটি কথা – জিনিয়ারা! আমার মনে হল, কথাটা আমি এই প্রথম শুনলাম। কতকগুলো ধ্বনির সমন্বয়, যেন গরম তারের পাকানো কুন্ডলী, যে কোন সময় যা স্প্রিংয়ের মত ছিটকে উঠে ছোবল মারবে। জিনিয়ারা। খানিকটা বোলতা কি ভিমরুলের আওয়াজের মতোও শোনাচ্ছে। আমি চাইছিলাম ভাই যেন কিছুতেই আর ওর স্নায়ু বিকল করা চড়া গলার উচ্ছ্বসিত স্বরে বারবার জিনিয়ারা শব্দটা না বলে। দেখতে পাচ্ছিস, কি চমৎকার বিশাল বিশাল জিনিয়ারা। এই জিনিয়ারা সব বাবার নিজের। অনেকটা প্রায়, হাতে বৈদ্যুতিক সংবেদনশীল বালা পড়া কারো মনে হতেই পারে যে জিনিয়ারা কথাটা একটা সাংকেতিক শব্দ, কিংবা, একটা যন্ত্রণা দেওয়ার উপায়। 

বাবার হাতটা কাঁপছিল, কিন্তু কোন প্রতিরোধ ছিল না সেখানে, যেন অল্প অল্প খসে খসে আসছে এমন মাটি দিয়ে বানানো একটা হাত। 

বাগানে শুধু আমরাই ছিলাম না। আরো প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানেরা তাদের বয়স্ক বাবা-মা-পরিজনদের দেখতে এসেছে। অনেক দর্শনার্থী, বেশীরভাগ-ই মহিলা, অথবা দম্পতি। কোন দলেই তিনজনের বেশী নয়। কারণ দর্শনার্থীর সংখ্যা বেশী হয়ে গেলে ই-ভবনের বয়স্ক বাসিন্দারা খেই হারিয়ে ফেলে। ঘটনাচক্রে আমরা সবাই ঘড়ির কাঁটার বিপরীতক্রমে নুড়িপথ ধরে হেঁটে চলেছিলাম। আমরা কেউ কারো দিকে তাকাচ্ছিলাম না। আয়নায় তাকিয়ে ফেলার মত একটা অন্তর্লীন ভয় ছেয়ে আছে। আমরা তোমাদের দেখছি না, তোমরাও আমাদের দেখছ না। আমাদের সত্যিই কোন ধারণা নেই কেমন দেখতে আমাদের। ই-ভবনের দরজা খোলার সঙ্কেত টেপবার আগেই ভাই আমায় বলে দিয়েছিল, বাবা আর আয়নায় নিজেকেই চিনতে পারে না, কাজেই আমাদেরকে সে চিনতে পারবে এমন আশা করার কোন কারণ নেই। 
আমার সে আশা ছিলও না। 
আমি ভাইয়ের থেকে শিখে নিয়েছি, হাসি দিলাম একটা। আমার বাধা পাওয়ার কি বিদ্রূপ শুনতে পাওয়ার মত কোন আশা ছিল না। 

সময়টা শরৎকাল। কিন্তু আগাস্ট মাসের মত গরম চলছে। বিশাল বড় কোন আলোর বাতির ভিতরের প্রায় অদৃশ্য ফিলামেন্টের অলক্ষুণে জটের মতন বাতাসটা দপদপ করছিল। আমার চোখ পিটপিট করছিল, ধাঁধিয়ে যাচ্ছিল। তবুও আমি শান্তভাবে মনে করছিলাম: ঝলসানো মুখের বুক-চুপসানো লোকটিকে, মিস্টার এম- যিনি জুনিয়ার হাইস্কুলের অঙ্ক শেখাতেন। আমায় পড়িয়েছেন, আমার ছোট ভাইকেও পড়িয়েছেন। তিরিশেরও বেশী বছর আগে পড়িয়েছেন আমাদের। মিস্টার এম- এই নাম মনে আনার ইচ্ছা ছিল না আমার। আমার ভাইও মিস্টার এম-একে মনে করতে চায়নি। কারণ মিস্টার এম- পরীক্ষায় যতটা বাজে ভাবে আমায় নম্বর দিয়েছিলেন, আমার ভাইকে নম্বর দিয়েছিলেন তার থেকেও বহু গুণ খারাপ ভাবে। অথচ, আমার ছোট ভাই অত্যন্ত ভালো ছাত্র ছিল, এমনকি যেই অঙ্ক মিস্টার এম-এর পড়ানোর সুবাদে আমার কাছে এক দুর্বিষহ বিষয় হয়ে গিয়েছিল, সেই অঙ্কে সে অনার্স নিয়ে পড়েছিল। অবসর নিতে বাধ্য করানোর আগে পর্যন্ত দীর্ঘকাল মিস্টার এম ইয়ুভিল জুনিয়ার হাইস্কুলে শিক্ষকতা করেছেন। মিস্টার এম-কে যে শেষ পর্যন্ত অবসরে পাঠানো গেছে, এই ঘটনাটা এলাকায় এক গল্প হয়ে গিয়েছিল। আইনি লড়াই অথবা গ্রেফাতারির ভয়, কিছু একটা ঘটেছিল। এক কথায় বলতে গেলে, উনি একটি বাচ্চা ছেলেকে বেশী অন্তরঙ্গভাবে ছোঁয়াছুঁয়ি করেছিলেন, অনেকটা সময় ধরে। অন্য কোন একটি ছেলেকে বিদ্রূপ করে করে কাঁদিয়ে ছেড়েছিলেন। একটি ছেলেকে চিমটি কেটেছিলেন, সুড়সুড়ি দিয়েছিলেন, থাপ্পড় মেরেছিলেন। আর একটি ছেলের কানের নরম লতি একটু বেশী মুচড়ে ধরেছিলেন, লাল দাগ ফেলে দিয়েছিলেন যাতে অভিভাবকরা আবিষ্কার করে হতবাক হয়ে যেতে পারেন। অথবা, একটি বাচ্চাকে বিদ্যালয় ছুটি হয়ে যাওয়ার পরেও তার শ্রেণীকক্ষে আটকে রেখে দিয়েছিলেন - নিতান্তই খেলাচ্ছলে। কিংবা হয়ত, অতটা খেলাচ্ছলেও নয়, "নিয়মানুবর্তীতার কারণে।" চর্বিতে থলথলে মুখের রং ক্রমাগত টকটকে হয়ে উঠেছে, চন্দ্রবদনে শিরা উপশিরাগুলো ভিতরের দপদপে রাগে গনগনে করছে। ক্লাস চলাকালীন নিজের জায়গায় শক্ত হয়ে স্থিরভাবে বসে থাকতে হত। চেষ্টা করতে হত কিছুতেই যেন সদাসন্ধানী মিস্টার এম-এর নজরে না পড়ে যাও। কালো প্লাস্টিকের ফ্রেমের শিক্ষক-সুলভ চশমার পিছনে চোখদুটো ডেস্কের সারিগুলোয় সবসময় শিকার খুঁজছে। চোখদুটো লালচে হয়ে গেলে কি হবে, এইসব সময় সেগুলো যৌবনের উত্তেজনায় জ্বলজ্বল করত। চোখ পিটপিট করে একবার নিজের ডেস্কের দিকে নামিয়েছ কি, মিস্টার এম- তোমায় দেখে নিয়েছেন এবং ধরে ফেলেছেন যে তুমি ওনার নজরদারী থেকে বেঁচে যাওয়ার আশা করছিলে। তুমি যদি একটি বারের জন্যও দুঃসাহস দেখাও ওনার চোখের দিকে পলক না ফেলে নিষ্পাপভাবে তাকিয়ে থাকার, মিস্টার এম- তোমায় দেখে নিয়েছেন এবং ধরে ফেলেছেন যে তুমি আশা করছিলে ওনার নজরদারী থেকে বেঁচে যেতে পারবে। কারণ মিস্টার এম-এর নজরদারী থেকে রেহাই পাওয়ার কোন সম্ভাবনাই ছিল না। 

কোন কোন ছেলেকে মিস্টার এম-এর তাগ করা থাকত। অন্যদিকে, পরিষ্কার বোঝা যেত কোন কোন ছেলে কখনোই কেন মিস্টার এম-এর লক্ষ্য হত না। কারণ মিস্টার এম- কখনো কোন দৃঢ় মনের কিংবা ঘাড়-ত্যাড়া ছেলেকে বেছে নেওয়ার সাহস করতেন না, অথবা কোন নামকরা ঘরের ছেলেকে, এবং অল্পবুদ্ধির ছেলেদেরও এড়িয়ে যেতেন; কিন্তু এর বাইরে যে বিপুল সম্ভাবনা রয়ে গেল তার থেকে কখন যে কাকে অত্যাচার করার জন্য বেছে নেবেন তার কোন স্থিরতা ছিল না। বিপন্ন ছেলেরা, লাজুক ছেলেরা। লজ্জা পাওয়া একরোখা ছেলেরা। সপ্রতিভ ছেলেরা। ছোটখাটো চেহারার ছেলেরা। মেয়েলী মুখের ছেলেরা। কদাচিৎ ঘরোয়া ধরণের ছেলেরা। কখনোই কোন প্রতিবন্ধী ছেলে নয়, ইতালিয়ান বা কালো ছেলেরাও নয়। প্রথমে উনি ক্লাসে তোমার নাম ধরে ডেকে একটি প্রশ্ন করবেন। যদি তুমি ঠিক উত্তর দিতে পারলে তবে বারে বারেই তোমায় ডাকতে থাকবেন যতক্ষণ না তুমি ভুল উত্তর দিচ্ছ। একটা অঙ্কের সমাধান করবে বলে ব্ল্যাকবোর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে আছ তুমি, আঙ্গুলে ধরা চকটা কাঁপছে। মিস্টার এম-এর ভ্রুকুটি এমন কৌতুকময়, ওনার ঠাট্টা গুলো এমন বিদ্রূপাত্মক, তুমি সবসময় ধরতেই পারবে না, কেন এমনকি তোমার বন্ধুদের কাছেও তুমি হাসির পাত্র হয়ে উঠেছ। তোমার মুখ পুড়ে গেছে, চোখ জলে ভরে কটকট করছে। তোমার মনে হচ্ছে তলপেটটা ফেটে যাবে, এক্ষুণি হিসি করে আসা দরকার। একবার আমায় ক্লাসের সকলের সামনে ওনার ডেস্কে ডেকে নিলেন। সাক্ষী থাকার জন্য। লাল কালির কলমে একটা ছোটখাটো উন্মাদ বাজপাখির মত ক্ষিপ্র হাতে বিদ্ধ করতে করতে নামছেন আমার অঙ্কের উত্তরপত্রের পৃষ্ঠা ধরে। আমি উত্তরগুলোর কোনটা কোন প্রশ্নের সেইটা লিখতে ভুল করে ফেলেছিলাম। আমি একটু বেখেয়ালি ছেলে ছিলাম। আটানব্বই পাওয়ার কথা। তার বদলে এখন নম্বর এসে দাঁড়ালো আটচল্লিশে। এবং এইটা যথোপযুক্ত ভাবে আমার অন্তর্বর্তী পরীক্ষার প্রতিবেদনে লিখে বাড়িতে আমার মায়ের কাছে স্বাক্ষরের জন্য পাঠানো হবে। আমার চোখ ঠেলে জল উপচে এল। নাক দিয়ে জল পড়তে লাগল। বীতশ্রদ্ধ মিস্টার এম- আমার দিকে নাক মোছার কাগজ ছুঁড়ে দিলেন। সে কাগজটা আবার এর মধ্যেই ব্যবহার করা কাগজও হতে পারে, ওনারই ব্যাগী প্যান্টের পকেট থেকে ওটা টেনে বের করেছিলেন। নাক মোছ, মিস্টার এম- বললেন। সোজা হয়ে দাঁড়া, বললেন মিস্টার এম-। কি অমনোযোগী ছেলে হয়েছিস, যতটা নিজেকে ওস্তাদ ভাবিস, আদৌ তার ধারে কাছে নস তুই। তোর নাম্বার নিয়ে রেখেছি আমি। এইটা একটা ব্যাপার ছিল, কিছু কিছু ছেলে ছিল (কিন্তু কখনোই কোন মেয়ে নয়, জানি না কেন), যাদের সম্পর্কে মিস্টার এম-কে পাঁয়তারা কষতে শোনা যেত, তোর নাম্বার নিয়ে রেখেছি আমি। 

রাতের খাওয়ার সময় হয়ে এল, বাবা। আমার ভাই এমন উচ্ছ্বাসের সঙ্গে কথাটা বলল যেন সে একটা নূতন কিছু আবিষ্কার করেছে আর সেটা নিয়ে খুব খুশী হয়ে উঠেছে। । 

বাবা? সময়টা এসে গেছে। 

আমরা আবার ই-ভবনে ঢুকে এলাম। একবার নয়, দু’বার আমারা বাগানটা চক্কর দিয়েছি, আস্তে আস্তে। টম্যাটোরা প্রশংসা পেয়েছে। এবং রহস্যময় জিনিয়ারা। আমি ভুলে গিয়েছিলাম যে সময় কংক্রিটের মত স্থির নয়, বরং বলা যায়, সে গড়িয়ে চলে, বালির মত, কিংবা জলের মত। আমি ভুলে গেছিলাম যে এমন কি দুর্দশার দিনও একসময় শেষ হতে পারে। 


নাম্বার নিয়ে রেখেছি, তোর নাম্বার নিয়ে রেখেছি আমি। ঠিক সামনেই বুক-চুপসানো ঝলসানো মুখের বুড়ো লোকটা, পুরু-কাঁচের চশমাটা মাথায় ফিতে দিয়ে বাঁধা, হাতের লাঠিতে ভর দিয়ে ঝুঁকে আছে। আবারও এই লোকের একেবারে কাছ দিয়ে তাকে পার হয়ে যেতে হবে। কারণ এ লোক ছাড়বে না। কারণ এর মতলব-ই হচ্ছে আমাদের পথ আগলে দাঁড়িয়ে থাকা। পাকা চুলের বুড়ি মহিলাটি চলে গেছে। বামনাকৃতির লোকটি দেয়ালে পিঠ ঠেসান দিয়ে বসে আছে। এই যে, মিস্টার এম- ঠিক এখানে দাঁড়িয়ে আছে - হাড়সর্বস্ব খুনখুনে একটা বাচ্চার মত কুঁকড়ে গেছে। মুখ থেকে সমস্ত চর্বি ঝরে গেছে, গালদুটো কাগজের মত পাতলা, জ্বরগ্রস্ত রোগীর মত লালচে হয়ে আছে। আমি দেখলাম কিভাবে ওর চোখদুটো আমাদের দেখে আলো জ্বলার মত জ্বলে উঠল। মিস্টার এম-এর মুখের ভাব আশাময়, চতুর হয়ে উঠল। এই প্রথমবারের মত আমি লক্ষ্য করলাম ওর বাঁধানো দাঁতগুলো কিরকম সস্তা পোর্সিলেনের মত চকচক করছে। এই যে ছেলেরা? আমায় সাথে নিচ্ছ ত? তোমাদের সাথে নিচ্ছ ত আমায়? আমার দিকে প্রায় ঝাঁপিয়ে এলেন, ওনার কেঁপে কেঁপে ওঠা হাতে আমার হাত খিমচে ধরতে চাইলেন, আর আমি ওনাকে ধাক্কা মেরে আমার কাছ থেকে সরিয়ে দিলাম। আমার মুখের উপর মিস্টার এম-এর দুর্গন্ধ নিঃশ্বাস, আমার প্রায় বমি উঠে এল। ছোঁবেন না আমায়, বললাম আমি। 

আমার থেকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে ওনাকে বললাম আমি, আপনি কারো সাথে কোথাও যাচ্ছেন না, বুড়ো বেজন্মা কোথাকার! আপনার জায়গা এইখানেই, আপনি এইখানেই পচে মরবেন। 

আমার ভাই হতভম্ব হয়ে আমার দিকে তাকাল। একটা হ্যাঁচকা টান লাগাল আমার হাতে, ঐ বুড়োটার থেকে দূরে সরিয়ে নেওয়ার জন্য, যে তখন টলতে টলতে আমার দিকে এগিয়ে আসছিল, যেন আমার কোন কথাই তার কানে ঢোকেনি। 

নর্ম, করছিসটা কি! 
আমার ভাই এমন রাগে কাঁপছিল যে, দরজা খোলার সংকেত টিপতে গণ্ডগোল হয়ে যাচ্ছিল তার। 

দ্বিতীয়বারের চেষ্টায় সফল হল ও। আমাদের পিছনের যাবতীয় কান্না আর কাকুতিমিনতি থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকলাম আমরা। দরজা খোলা মাত্র বের হয়ে এলাম। একবারের জন্যও পিছনে না তাকিয়ে দ্রুত বারান্দা পেরিয়ে লবিতে চলে গেলাম আমরা। চাপা স্বরে আমার ভাই আমায় গালাগালি করে যাচ্ছিল। আমি জীবনে কারো উপর ওকে এত রাগারাগি করতে দেখিনি। গোল্লায় যা, গোল্লায় যা তুই, পাগল হয়ে গেছিস না কি, মর গে যা তুই। 

আমায় তুই জানাসনি কেন? ভাইকে জিজ্ঞাসা করলাম আমি। তুই ভাল করে জানতিস ঐ লোকটা কে ছিল। 

কোন লোকটা কে ছিল? কোনটা? ঐ হতচ্ছাড়া বুড়ো লোকটা? ও কেউ না। 

তুই জানতিস, ভালো রকম জানতিস তুই। শয়তানের একশেষ তুই। 

লবির দরজা ঠেলে ছিটকে বের হলাম আমরা। একটা কথাও না বলে পার্কিং লটে ভাইয়ের গাড়িটা পর্যন্ত হেঁটে গেলাম দু’জনে। একবারের জন্যও না তাকিয়েছি একে অপরের দিকে, না তাকিয়েছি পিছনে পড়ে থাকা ম্যানরের দিকে। গাড়ির ভিতরটা তেতে পুড়ে নরকের থেকেও বেশী গরম হয়ে আছে। গাড়ি রেখে যাওয়ার সময় আমার ভাই জেদ ধরেছিল গাড়ির সব কাঁচ বন্ধ করে গাড়ির দরজায় তালা দিয়ে যেতে। মিডোব্রুক ম্যানরে! আমার প্রতি বীতশ্রদ্ধ ভাই একবারও আমার দিকে না তাকিয়ে গাড়ির চালকের আসনে গিয়ে বসে গেল। আমায় যে কোন একটা উপায় বেছে নিতে হত। হয় গাড়িতে উঠে ভাইয়ের পাশে গিয়ে বসা। নয়ত, হাঁটতে হাঁটতে ভাইয়ের বাড়ি ফিরে চলা, এই প্রখর রোদে গ্রামের ভিতর দিয়ে যাওয়া হাইওয়ে ধরে অন্ততঃ তিন মাইল পথ পার হয়ে। 

এটাকে কোন উপায় বলা যায় না।

1 টি মন্তব্য: